📄 (খ) 'উযায়র (আ) সম্পর্কিত বক্তব্য
কুরআনে বলা হইয়াছে যে, ইয়াহুদীরা 'উযায়র (আ)-কে ঈশ্বরের পুত্র বলে। এই বক্তব্য সম্পর্কে ওয়াট ব্যঙ্গ করিয়া বলেন, 'ইয়াহুদী ধর্ম সম্পর্কে ইহা কুরআনের সর্বাপেক্ষা বড় ত্রুটি' এবং গুরুত্ব সহকারে বলেন, যখন একথা সত্য যে, ওল্ড টেস্টামেন্টে "ঈশ্বরের পুত্র” কথাটি ব্যবহৃত হইয়াছে মসিহের ক্ষেত্রে; যাহার আগমনের কথা ছিল, কিন্তু এইরূপ কোন প্রমাণ নাই যে, উহা এযরার ক্ষেত্রে প্রযোজ্য হইতে পারে। ৯
অবশ্য ইহা সত্য যে, ওল্ড টেস্টামেন্ট গ্রন্থে ইহার কোন প্রমাণ নাই। কিন্তু পবিত্র কুরআন 'উযায়র সম্পর্কে ওল্ড টেস্টামেন্ট গ্রন্থে কি রহিয়াছে তাহা উল্লেখ করে নাই, উল্লেখ করিয়াছে সেকালে কিছু সংখ্যক ইয়াহুদী বিশ্বাস করিত যে, উযায়র ঈশ্বরের পুত্র; কুরআন তাহাদের কথাই বলিয়াছে। প্রকৃতপক্ষে আলোচ্য আয়াত শুরুই হইয়াছে )وقالت اليهود( "আর ইয়াহুদীরা বলে" বলিয়া। তাফসীরকার আল-বায়দাবী, যাঁহার কথা ওয়াট তাহার পুস্তকে অনেকবার উল্লেখ করিয়াছেন ১০ এই আয়াত প্রসঙ্গে পরিষ্কার ভাষায় বলেন, 'যেহেতু উযায়রই ওল্ড টেস্টামেন্টের বর্তমান রূপ দান করিয়াছিলেন, তাই অনেক ইয়াহুদী তাঁহাকে 'আল্লাহ্র পুত্র' মনে করিত, বিশেষত মদীনায় এইরূপ বিশ্বাসী একদল ইয়াহুদী বসবাস করিত। আল-বায়দাবী আরও উল্লেখ করেন যে, আলোচ্য আয়াত যথারীতি মদীনায় পঠিত ও আবৃত্তি করা হইত, কিন্তু মদীনার কোন ইয়াহুদী ইহার প্রতিবাদ করে নাই। ১১ ইহাও লক্ষণীয় যে, এই আয়াত সর্বসম্মতিক্রমে মদীনায় অবতীর্ণ হইয়াছিল। তাই এই ব্যাপারে সেখানকার ইয়াহুদীদের নীরবতা যথেষ্ট তাৎপর্যবহ, বিশেষত যেহেতু তাহারা রাসূলুল্লাহ-এর ঘোর সমালোচক ছিল।
শুধু আল-বায়দাবী নহেন, অন্যান্য তাফসীরকারগণও উল্লেখ করেন যে, এই আয়াত ইয়াহুদীদের একটি গোষ্ঠীর মতের প্রকাশ ঘটায়। দৃষ্টান্তস্বরূপ আত-তাবারী বর্ণনাকারীদের নামোল্লেখসহ বেশ কয়েকটি রিওয়ায়াত উদ্ধৃত করিছেন, মদীনার নেতৃস্থানীয় ইয়াহুদীদের নাম বিশেষভাবে উল্লেখ করিয়াছেন যাহারা উযায়রকে 'আল্লাহ্র পুত্র' বলিয়া বিশ্বাস করিত। এইসব ইয়াহূদীর মধ্যে সর্বাধিক উল্লেখযোগ্য ব্যক্তিরা ছিল ফিনহাস, সাল্লাম ইব্ন মিশকাম, নুমান ইব্ন আওফা, শা'ছা ইবন কায়স এবং মালিক ইবনুস সায়ফ। ১২ আল-কুরতুবীও উল্লিখিত নামসমূহসহ অনুরূপ বর্ণনা করিয়াছেন। তিনি আরও যোগ করেন যে, আয়াতের ক্ষেত্রে ইয়াহুদী বলিতে বিশেষ একদল ইয়াহুদী বুঝানো হইয়াছে। ঠিক যেভাবে "লোকেরা তাহাদিগকে বলিল" বলিতে পৃথিবীর সকল মানুষকে বুঝায় না, বরং বিশেষ একদল লোককে বুঝায়। তিনি আরও বলেন যে, উযায়র ('আ)-কে "আল্লাহ্ পুত্র” বলিয়া ইয়াহুদীদের যে গোষ্ঠী বিশ্বাস করিত তাঁহার (কুরতুবীর) সময় তাহাদের অস্তিত্ব লোপ পাইয়া গিয়াছিল। ১৩
قَالَ لَهُمُ النَّاسُ
এইভাবে মারয়াম ('আ) বা উযায়র ('আ) কাহারও সম্পর্কে কুরআনের বক্তব্যে কোন ভুল বা ত্রুটি নাই। ইহাও বলা যাইবে না যে, কুরআন শুধু জনপ্রিয় প্রচলিত ভুল ধারণাগুলিরই পুনরাবৃত্তি করিয়াছে এবং এইভাবে অন্যায়ভাবে ইয়াহুদী ও খৃস্টানদের বিরুদ্ধে বিষোদগার করিয়াছে। কেননা কুরআন এইসব বিশ্বাসকে 'ভ্রান্ত' বলিয়া উল্লেখ করে এবং এইসব ভ্রান্তিতে বিশ্বাস করাকে ভুল বলিয়া নির্দেশ করে। সেইগুলি যদি ইয়াহুদী ও খৃস্টানদের আদি-অকৃত্রিম ধর্মের অংশ না হয় তাহা হইলে পবিত্র কুরআন কেবল সেই সত্যের প্রতি নির্দেশ করিয়াছে মাত্র।
পবিত্র কুরআনে কেবল সেই সকল ত্রুটি নির্দেশ করিয়া ক্ষান্ত হয় নাই। ইহা অন্যান্য ত্রুটিও নির্দেশ করিয়াছে। যেমনঃ (ক) মরয়াম সম্পর্কে ইয়াহূদীদের কুৎসা ও অবমাননাকর উক্তির বিরুদ্ধে পবিত্র কুরআন দ্বিধাহীনভাবে স্পষ্ট করিয়া তাঁহার সতীত্ব ও চারিত্রিক বিশুদ্ধতা ঘোষণা করিয়াছে; (খ) অন্যদিকে ট্রিনিটি তত্ত্বের বিরুদ্ধে কোন প্রকার সমঝোতা না করিয়া দৃঢ়ভাবে ঘোষণা করিয়াছে যে, আল্লাহ এক এবং অদ্বিতীয়, তাঁহার কোন অংশিদার নাই। অনুরূপভাবে ঈশ্বরের পুত্র থাকা সম্পর্কে ইয়াহূদী ও খৃস্টানদের ধারণা বিষয়ে দ্বিধাহীনভাবে ঘোষণা করিয়াছে তাহার কোন পুত্র নাই এবং তিনি কাহারও পিতা নহেন; (গ) ঠিক তেমনিভাবে যীশুর ঈশ্বরত্ব সম্পর্কে ঘোষণা করিয়াছে যে, তিনি ছিলেন মানুষ, কিন্তু তিনি ছিলেন আল্লাহ্র রাসূল। তদুপরি আরও বলা হইয়াছে যে, যাহারা তাহাকে ঈশ্বররূপে আরাধনা করে তাহারা কাফির-অবিশ্বাসী। সর্বাধিক মজার বিষয় এই যে, কোন প্রাচ্য বিশারদই এ পর্যন্ত বলেন নাই যে, তৎকালীন ইয়াহুদীদের বিশ্বাস অনুসারে পবিত্র কুরআনের এই সকল উদ্ধৃতি 'অনুধাবনযোগ্য' ত্রুটি। কারণ এইগুলি 'নামমাত্র আরব খৃস্টানদের' বা 'মক্কার কিছু লোকের' বা 'মক্কাবাসীর' বিশ্বাস ছিল। প্রকৃত সত্য এই যে, সেই সময়ে ইয়াহুদী ও খৃস্টানদের মধ্যে এই প্রকার ধারণা ছিল এবং অনুরূপ আরও ভ্রান্ত ধারণা বিদ্যমান ছিল যেগুলি পবিত্র কুরআন কখনও সমর্থন করে নাই।
এই দুই ধর্মের আধুনিক অনেক অনুসারী পুরাতন বিশ্বাসের অনেক কিছু পরিহার করিয়াছে, অনেক পুরাতন আচার-অনুষ্ঠান পরিত্যাগ করিয়াছে এবং এই নব পর্যায়ে পরিবর্তনের কারণে তাহাদের অনেকেই এই প্রস্তাব লইয়া আগাইয়া আসিয়াছেন পবিত্র কুরআনে ইয়াহুদী ও খৃস্টানদের কিছু কিছু বিশ্বাস ও আচার-অনুষ্ঠান সম্পর্কে যে বরাত দেওয়া হইয়াছে তাহা ত্রুটি বলিয়া 'গণ্য করা' হয়, এমতাবস্থায় মহানবী স্বয়ং বাইবেল পাঠ করেন নাই তবে সম্ভবত লোকমুখে ওই সকল তথ্য শুনিয়াছেন বা সেইভাবেই জানিয়াছেন। মূল বিষয় হইতেছে, পবিত্র কুরআন ও মহানবী তদানিন্তন ইয়াহুদী ও খৃস্টানদের কিছু বিশ্বাস ও আচারকে অবৈধ ও ভ্রান্ত বলিয়া ঘোষণা করিয়াছিলেন, এমনকি কোন বিষয়ে পবিত্র গ্রন্থে যাহাকে তাহাদের মতে অনুমোদন করিয়াছিল তাহাকেও। কেবল তাহাই নহে, পবিত্র কুরআন ইহাও বলে যে, ইয়াহুদী ও খৃস্টানদের প্রাচীন গ্রন্থ যাহা বর্তমানে বিদ্যমান তাহাও মূল গ্রন্থের পরিবর্তিত সংস্কারণ যাহাতে যথেষ্ট পরিমাণে ভ্রান্তি অনুপ্রবেশ করিয়াছে। ১৪ এমতাবস্থায় মহানবী যে সূত্র হইতে এই জ্ঞান লাভ করিয়াছিলেন তাহা নিশ্চয়ই বাইবেল ব্যতীত অন্য কোন সূত্র, উহা অবশ্যই প্রত্যক্ষ বা পরোক্ষ কোনভাবেই বাইবেল নহে।
📄 (গ) ক্রুশবিদ্ধ হওয়ার বিষয়ে
অনুরূপভাবে পবিত্র কুরআনে যীশুর জীবনাবসান বিষয়ে সাধারণ জনশ্রুতি বা প্রচলিত ভ্রান্ত ধারণা বর্ণিত হয় নাই; বরং অত্যন্ত গুরুত্ব সহকারে বলা হইয়াছে যে, সেই বিষয়ে সাধারণ জনশ্রুতি বা প্রচলিত ধারণা ভ্রান্ত। এই বিষয়ে যে আয়াত অবতীর্ণ হইয়াছে তাহা নিম্নে উল্লেখ করা হইল :
وَقَوْلُهُمْ إِنَّا قَتَلْنَا الْمَسِيحَ عِيسَى ابْنَ مَرْيَمَ رَسُولَ اللَّهِ وَمَا قَتَلُوهُ وَمَا صَلَبُوهُ وَلَكِنْ شُبِّهَ لَهُمْ وَإِنَّ الَّذِينَ اخْتَلَفُوا فِيهِ لَفِي شَكٍّ مِّنْهُ مَا لَهُمْ بِهِ مِنْ عِلْمٍ إِلَّا اتَّبَاعِ الظَّنِّ وَمَا قَتَلُوهُ يَقِينًا
"আর 'আমরা আল্লাহ্র রাসূল মারয়াম তনয় 'ঈসা মসীহকে হত্যা করিয়াছি' তাহাদের এই উক্তির জন্য। অথচ তাহারা তাহাকে হত্যা করে নাই, ক্রুশবিদ্ধও করে নাই; কিন্তু তাহাদের এইরূপ বিভ্রম হইয়ছিল। যাহারা তাহার সম্পর্কে মতভেদ করিয়াছিল তাহারা নিশ্চয় এই সম্বন্ধে সংশয়যুক্ত ছিল। এই সম্পর্কে অনুমানের অনুসরণ ব্যতীত তাহাদের কোন জ্ঞানই ছিল না। ইহা নিশ্চিত যে, তাহারা তাহাকে হত্যা করে নাই" (৪ : ১৫৭)।
এই আয়াতে স্পষ্টভাবে তাহাদের বক্তব্যকে খণ্ডন করা হইয়াছে : উহাতে ইয়াহুদীগণ যাহা বলে সেই সম্পর্কে বলা হইয়াছে, কারণ সমগ্র আয়াতটি ইয়াহুদীগণ সম্পর্কে। সেখানে স্পষ্টভাবে তাহাদের বক্তব্যকে অস্বীকার করা হইয়াছে। বলা হইয়াছে যে, তাহারা যীশুকে হত্যা করিতে পারে নাই, বাস্তবে তাহারা যীশুকে ক্রুশবিদ্ধও করিতে পারে নাই। আরও বলা হইয়াছে যে, তাহারা যখন দাবি করিতেছিল যে, তাহারা যীশুকে ক্রুশবিদ্ধ করিয়াছে তখন তাহারা নিজেরাও এই বিষয়ে সন্দিহান ছিল। যাহাকে তাহারা ক্রুশবিদ্ধ করিয়াছিল তাহার পরিচয় সম্পর্কে তাহারা নিশ্চিত ছিল না এবং তাহাদের মনে সন্দেহ সৃষ্টি হইয়াছিল। ১৫ আয়াতে বলা হইয়াছে যে, সেই বিষয়টি দেখিতে যেন তাহা মনে হয় ( شُبِّهَ لَهُمْ ) তাহা করা হইয়াছিল, অর্থাৎ ইয়াহূদীগণের মনে হইয়াছিল যে, তাহারা যীশুকে হত্যা করিয়াছে, কিন্তু প্রকৃত সত্য তাহারা জানে না, তাহারা একটি ধাঁধার মধ্যে ছিল। অবশেষে বলা হইয়াছে, 'তাহারা যীশুকে অবশ্যই হত্যা করিতে পারে নাই'।
এই প্রসঙ্গে বলা যাইতে পারে যে, প্রাথমিক যুগে খৃস্টানদের মধ্যে এইরূপ সম্প্রদায় ছিল যাহারা বিশ্বাস করিত না যীশু ক্রুশবিদ্ধ হইয়া মারা গিয়াছিলেন। যেমন বার্সিলিবাসিগণ মনে করিত, যীশুর পরিবর্তে তাহার মত দেখিতে অপর এক ব্যক্তিকে ক্রুশবিদ্ধ করা হইয়াছিল। ক্রুশে তাঁহার পরিবর্তে অন্য কাহারও হত্যার তত্ত্ব গসপেল অব সেন্ট বারনাবাস সমর্থন করে। ডায়ওকেটি অপর এক তত্ত্বের কথা বলেন। তিনি বলেন যে, প্রকৃতপক্ষে যীশুর কোন বাস্তব বা স্বাভাবিক প্রাকৃতিক শরীর ছিল না, তাঁহার ছিল বাহ্যিক বায়বীয় দেহ যাহা দেখা যায়, স্পর্শ করা যায় না। ফলে আপাতদৃষ্টিতে মনে হইয়াছে তাহাকে ক্রুশবিদ্ধ করা হইয়াছিল কিন্তু উহা সত্য নহে। অপর আর এক মতদৃষ্টে, মারসিওনাইট গসপেল মতে যীশুর জন্মই হয় নাই, তিনি কেবল মানুষের অবয়বে দেখা দিয়াছিলেন।
এই প্রসঙ্গে বলা চলে না যে, পবিত্র কুরআন উল্লিখিত খৃস্টান সম্প্রদায়ের মতামত সমর্থন করে অর্থাৎ তাহারা যেভাবে যীশুর ক্রুশবিদ্ধ হওয়া মৃত্যু অস্বীকার করে পবিত্র কুরআন তাহা সমর্থন করে; কিন্তু তাহা নহে। কারণ পবিত্র কুরআন সেই সকল মতাদর্শের মূল কথা-যিশুর ঈশ্বরত্ব অথবা অলীক ছায়াশরীর স্বীকার করে না। বরং এই বিষয়ে সন্দেহ ও ভিন্নমত থাকার কারণে দৃঢ় প্রত্যয়ের সঙ্গে সত্যকে প্রতিষ্ঠা করে এবং ইতিবাচকভাবে ও সুনিশ্চিতভাবে ইয়াহূদীগণের দাবি (قَوْلُهُمْ) অস্বীকার করে যে, তাহারা যীশুকে হত্যা করিয়াছিল। তৎকালে প্রচলিত ভ্রান্ত ধারণা পুনরুল্লেখ করা দূরের কথা, কুরআনের অবস্থান সম্পূর্ণ ভিন্ন। প্রকৃতপক্ষে পবিত্র কুরআনের বক্তব্য ইয়াহুদী ও খৃস্টান উভয়ের বিরুদ্ধে। ইয়াহুদীদের দাবি ছিল যে, তাহারা যীশুকে হত্যা করিয়াছিল। অতএব তিনি পয়গাম্বর ছিলেন না, কারণ তাহার 'অভিশপ্ত মৃত্যু' হইয়াছিল; এই দাবি পবিত্র কুরআন অস্বীকার করে। অনুরূপভাবে খৃস্টানদের তত্ত্ব যীশুর ঈশ্বরত্ব ও সেই তত্ত্বের ভিত্তি 'রক্তের ঋণ' ধারণা এবং যীশুর প্রতিনিধিত্বমূলক প্রায়শ্চিত্ত, তাহাও পবিত্র কুরআন স্বীকার করে না।
পবিত্র কুরআনে বলা হইয়াছে, 'তাহারা তাহাকে হত্যা করে নাই', এই বক্তব্য বাইবেলেও সমর্থিত হইয়াছে, যেমন (১) যে দিন যীশু ধৃত হন তাহার পূর্ব রাত্রিতে তিনি আল্লাহ্র নিকট ক্রুশবিদ্ধ হইয়া অভিশপ্ত মৃত্যু হইতে রক্ষা পাইবার জন্য প্রার্থনা করিয়াছিলেন (মার্ক ১৪ : ৩৬; মথি ২৬: ৩৯; লুক ২২-৪৪) এবং তাঁহার প্রার্থনা কবুল হইয়াছিল। ইহার অর্থ তিনি মরিতে চাহেন নাই এবং আল্লাহও তাঁহার অভিশপ্ত মৃত্যুর সুযোগ দেন নাই।
(২) গসপেলে কোথাও নাই, যে ব্যক্তি ক্রুশবিদ্ধ হইয়াছিল তাহার মৃত্যু কেহ স্বচক্ষে দেখিয়াছিল অথবা ক্রুশ হইতে যখন তাহাকে নামানো হইয়াছিল তখন তাহা কেহ দেখিয়াছিল।
(৩) পিলাত ছিলেন বিচারকের দায়িত্বে। মনে হয় তিন সমগ্র বিচারকার্য সম্পর্কে নিজেই সন্দিহান ছিলেন এবং সম্ভবত তিনি এইরূপ ব্যবস্থা গ্রহণ করিয়াছিলেন যেন যীশু পালাইয়া যাইতে সক্ষম হন। শুক্রবারে বিচার কার্য হইয়াছিল। পিলাত ইচ্ছাকৃতভাবে বিচারকার্য বিলম্বিত করিয়াছিলেন এবং এইভাবে সূর্যাস্তের মাত্র তিন ঘণ্টা পূর্বে রায় প্রদান করিয়াছিলেন যাহাতে যীশুকে দীর্ঘ সময় ক্রুশে থাকিতে না হয়। খুব বেশি হইলে মাত্র দুই ঘণ্টা থাকিতে হয়, কারণ সূর্য অস্ত যাইবার সঙ্গে সাবাথ দিবস আরম্ভ হইবে এবং শাস্তিপ্রাপ্ত ব্যক্তিকে ক্রুশ হইতে নামাইয়া আনিতে হইবে। পিলাত আরও অতিরিক্ত ব্যবস্থা গ্রহণ করিয়াছিলেন। ইহাতে যীশুকে ক্রুশে আরোহণের পূর্বে কিছুটা সিরকা বা মদ্য পান করিতে দেওয়া হইয়াছিল যাহাতে ক্রুশবিদ্ধ ব্যক্তি কম যন্ত্রণা অনুভব করে। ইহার ফলে যীশুকে তিন ঘণ্টার অধিক সময় ক্রুশে থাকিতে হয় নাই (মার্ক, ১৫: ২৫; জন, ১৯: ১৪)। সাধারণভাবে স্বাভাবিক সুস্থ শরীরের মানুষ এত অল্প সময় ক্রুশে থাকিলে মারা যায় না। লক্ষণীয় যে, যীশুর সহিত অপর দুই ব্যক্তিকে ক্রুশবিদ্ধ করা হইয়াছিল; তাহাদিগকে ক্রুশ হইতে নামাইয়া আনার পর তাহারা জীবিত ছিল বলিয়া কথিত আছে। পিলাত নিজেও বিশ্বাস করেন নাই যে, এত অল্প সময়ে যীশু মারা যাইবেন (মার্ক, ১৫:৪৪)।
(৪) ক্রুশ হইতে নামানোর পর অপর দুই ব্যক্তির পদযুগল ভাঙ্গিয়া ফেলা হইয়াছিল, কিন্তু যীশুর ক্ষেত্রে তাহা করা হয় নাই বলিয়া বাইবেলে কথিত আছে (জন, ১৯ঃ ৩২, ৩৩)।
(৫) যীশুকে ক্রুশ হইতে অবতরণ করানোর পর তাহার শরীরের পার্শ্বদেশ ছিদ্র করিলে রক্ত নির্গত হইয়াছিল (জন ১৯: ৩৪)। ইহার অর্থ যীশু তখনও জীবিত ছিলেন।
(৬) আরিমাসিয়ার জোসেফ আবেদন করিবার সঙ্গে সঙ্গে পিলাত যীশুর 'দেহ' তাহার নিকট হস্তান্তর করিবার আদেশ দিয়াছিলেন। সে যীশুর দেহের প্রতি অপরিমিত যত্ন প্রদান করিয়া উহাকে পাহাড়ের পার্শ্বে নির্মিত বিশেষ সমাধি ভবনে রাখিয়াছিল (মার্ক, ১৫:৪৬)। ইহাতে প্রতীয়মান হয় যে, যীশুর শত্রুগণকে ধোঁকা দেওয়ার জন্যই এই ব্যবস্থা করা হইয়াছিল।
(৭) তৃতীয় দিবসে দেখা গেল, সমাধির প্রবেশ প্রস্তর সরানো (মার্ক, ১৫: ৪৬), যাহার অর্থ উহা পূর্বেই সরানো হইয়াছিল, সম্ভবত এই স্থলে রাখার প্রথম বা দ্বিতীয় দিনে।
(৮) মেরী মাগদলিনি যখন ক্রুশের দিকে তাকাইলেন তখন তিনি দেখিলেন যীশু সেখানে নাই। তিনি দেখিলেন তিনি দাঁড়াইয়া আছেন, প্রথমে ভাবিলেন, "বাগানের মালি দাঁড়াইয়া আছে", অতঃপর
(১৭) যীশু তাহাকে বলিলেন, আমাকে স্পর্শ করিও না, কারণ এখনও আমি আমার পিতার নিকট, তোমাদের পিতার নিকট; আমার আল্লাহ্র নিকট, তোমাদের আল্লাহ্র নিকট গমন করি নাই। (১৮) মেরী মাগদলিনি আসিয়া যীশুর শিষ্যদিগের নিকট বলিলেন যে, তিনি যীশুকে দেখিয়াছেন এবং তিনি তাহাকে এই কথা বলিয়াছেন। (১৯) অতঃপর সেই দিন সন্ধ্যায়, সপ্তাহের প্রথম দিনের আরম্ভ, যখন দরজা বন্ধ ছিল, যেখানে শিষ্যগণ ইয়াহূদীগণের ভয়ে ভীত হইয়া সমবেত হইয়াছিল, যীশু আসিলেন এবং মধ্যস্থলে দাঁড়াইলেন এবং তাহাদিগকে বলিলেন, তোমাদের উপর শান্তি বর্ষিত হউক। (২০) এবং যখন তিনি এইরূপ বলিলেন, তিনি তাহাদিগকে তাহার হস্তদ্বয় ও দেহের পার্শ্বদেশ প্রদর্শন করিলেন। তখন শিষ্যগণ তাহাদিগের প্রভুকে দেখিয়া আনন্দিত হইল" (জন, ২০: ১৪-১৫, ১৭-২০)।
(৯) ইহা ছিল একই রক্ত-মাংসের শরীর যাহা ছিল যীশুর, তাঁহার ক্ষত এতই গভীর যাহাতে কোন মানুষের হাত প্রবিষ্ট হইতে পারে (জন, ২০: ২৫-২৮)।
(১০) তাহাকে দেখা গিয়াছিল একই রক্তমাংসে। তখনও তিনি ক্ষুধা অনুভব করিয়াছিলেন। তাহার শিষ্যগণ যেরূপে খাদ্য গ্রহণ করিয়াছিল তিনিও তদ্রূপ ভক্ষণ করিয়াছিলেন।
৩৬. "তাহারা পরস্পর এই সকল কথোপকথন করিতেছেন, ইতোমধ্যে তিনি আপনি অ৩৬৩৯হাদের মধ্যস্থানে দাঁড়াইলেন ও তাহাদের বলিলেন, তোমাদের শান্তি হউক। ৩৭. ইহাতে তাহারা মহাভীত ও ত্রাসযুক্ত হইয়া মনে করিলেন, আত্মা দেখিতেছি। ৩৮. তিনি তাহাদিগকে কহিলেন, কেন উদ্বিগ্ন হইতেছ? তোমাদের অন্তরে বিতর্কের উদয়ই বা কেন হইতেছে? ৩৯. আমার হাত ও আমার পা দেখ, এ আমি স্বয়ং; আমাকে স্পর্শ কর, আর দেখ; কারণ আমার যেমন দেখিতেছ, আত্মার এরূপ অস্থি-মাংস নাই। ৪০. ইহা বলিয়া তিনি তাহাদিগকে হাত ও পা দেখাইলেন। তখনও তাহারা আনন্দ প্রযুক্ত অবিশ্বাস করিতেছিল। ৪১. তাই তিনি তাহাদিগকে কহিলেন, তোমাদের কাছে এখানে কি কিছু খাদ্য আছে? ৪২. তখন তাহারা তাহাকে একখানি ভাজা মাছ ও মৌচাকের টুকরা দিলেন। ৪৩. তিনি তাহা লইয়া তাহাদের সাক্ষাতে ভোজন করিলেন" (লুক, ৩৬-৪২)।
(১১) যীশু গ্যালিলির পথে যাত্রা করিলেন ও তথায় তাহার শিষ্যগণ তাহাকে দেখিল (মথি, ২৮: ১০-১৭)।
বিভিন্ন গসপেলের এই সকল বক্তব্য পবিত্র কুরআনের এই ঘোষণাকেই নিশ্চিতভাবে সমর্থন করে যে, তাহারা যীশুকে অবশ্যই হত্যা করিতে পারে নাই। প্রকৃতপক্ষে উপরোল্লিখিত গসপেলের বিভিন্ন বক্তব্য হইতে স্পষ্ট প্রতীয়মান হয় যীশু ক্রুশে মৃত্যুর হাত এড়াইয়া গিয়াছিলেন এবং তাঁহার শত্রুদের নিকট হইতে নিজেকে লুকাইয়া রাখিতে সমর্থ হইয়াছিলেন।
এই প্রসঙ্গে একটি বিষয় লক্ষণীয় যে, সাম্প্রতিক কালের গবেষণায় প্রমাণিত হইয়াছে যে, যীশু ক্রুশবিদ্ধ হইয়া কষ্টকর মৃত্যুবরণ করেন নাই। অস্ট্রেলিয়ান গবেষক বারবারা থিয়োরিং মরু সাগর নিপি (ডেড সি স্ক্রল) বিশ্লেষণ করিয়া যুক্তিযুক্তভাবে দেখাইয়াছেন যে, যীশু ক্রুশবিদ্ধ হইয়া মারা যান নাই। ১৬
প্রায় সমসাময়িক দুইজন ইউরোপিয়ান পণ্ডিত হলগার কার্স্টেন এবং এলমার ই গ্রুবার অত্যন্ত পরিশ্রম করিয়া তুরিন কাফনের কাহিনী রেডিও কার্বন পরীক্ষা পরিচালনা করেন ১৭ এবং ইহা প্রমাণ করেন যে, যীশু ক্রুশবিদ্ধ হইয়া মৃত্যুবরণ করেন নাই। ১৮
যীশুর পরিণাম সত্যই একটি কঠিন ঐতিহাসিক ও ধর্মীয় প্রশ্ন এবং সহজ-সরলভাবে ইহার পরিসমাপ্তি টানা যথাযথ হইবে না। অথচ মি. ওয়াট কুরআনের বক্তব্যকে বাজারের লোকশ্রুতি হইতে গৃহীত জনপ্রিয় ভ্রান্তি আখ্যায়িত করিয়া তাহাই করিতে চাহিয়াছেন। ১৯
টিকাঃ
১৫. দৃষ্টান্তস্বরূপ দ্র. আত-তাবারী, তাফসীর, ৬খ, পৃ. ১৬-১৭।
১৬. Barbara Thiering, Jessus The Man (First Published 1993), Corgi ed. 1993. See especially the book cover page.
১৭. তুরিনে যে কাফন আবিষ্কৃত হয় তাহা ঐ জামা বলিয়া বিশ্বাস করা হয় যে, ইহা দ্বারা যীশুর শরীর আবৃত করা হইয়াছিল যখন তাঁহার ভাস্কর্যে স্থাপন করা হইয়াছিল।
১৮. Holger Kersten & Elmor R. Gruber. The Jessus conspiracy The Turin Shroud and the Truth about the Resurrection, Element books Ltd, Shaftesbury 1994.
১৯. M's M. ৪৫-৪৬।