📄 ছয়: পবিত্র কুরআনের বিবরণের সহিত বাইবেলের বিবরণের পার্থক্য
উপরে উল্লিখিত আয়াতসমূহে বর্ণিত ঘটনা এবং পবিত্র কুরআনে বর্ণিত একই নবী সম্পর্কিত ঘটনাসমূহ এবং বাইবেলে বর্ণিত সেই একই নবী সম্পর্কিত ঘটনাসমূহের মধ্যে লক্ষণীয় তথ্যগত পার্থক্য হইতে আরও প্রমাণিত হয় যে, মহানবী বাইবেল বিষয়ে বিজ্ঞ কোন ব্যক্তির নিকট হইতে কোন তথ্য লাভ করেন নাই। প্রথমে উল্লিখিত আয়াত ১১:৪৯ নূহ (আ)-এর ঘটনা সম্পর্কিত। ওল্ড টেস্টামেন্টে যেরূপ ঘটনা বর্ণনা করা হইয়াছে পবিত্র কুরআনে সেইরূপ বর্ণনা নাই। পবিত্র কুরআনে স্পষ্টভাবে বর্ণিত আছে, তিনি একত্ববাদ প্রচার করিতে এবং তাহার জাতিকে আল্লাহ্ ইবাদত করিতে বলিতেন।
পুনরায় বাইবেলে যেভাবে বলা হয় নাই পবিত্র কুরআনে তাহা বলা হইয়াছে যে, যতক্ষণ না নূহ (আ) তাঁহার আদর্শ প্রচার করিতে গিয়া বিভিন্ন প্রকার বিরোধিতা ও সমস্যার সম্মুখীন হইলেন এবং যতক্ষণ না তাঁহার সম্প্রদায় তাঁহার উপদেশ গ্রহণে তাঁহাকে হতাশাগ্রস্ত করিয়া ফেলিল এবং যতক্ষণ না আল্লাহ তাঁহার নিকট প্রকাশ করিলেন যে, তাহারা ঈমান আনিবে না ততক্ষণ পর্যন্ত তাহাদের উপর বিপদ নামিয়া আসে নাই।
তৃতীয়ত, পবিত্র কুরআনে আছে, যাহারা এক আল্লাহতে বিশ্বাস স্থাপন করিয়াছিল তাহারা রক্ষা পাইয়াছিল। পুনরায় পবিত্র কুরআনে আছে যে, কিভাবে নূহ (আ)-এর পুত্র সত্যকে গ্রহণ করিতে অস্বীকার করিয়াছিল এবং সে কিভাবে ডুবিয়া গিয়াছিল।
চতুর্থত, বাইবেলে আছে যে, আল্লাহ এই মহাপ্লাবন ঘটাইয়া কিছুটা অনুতপ্ত (?) হইয়াছিলেন এবং সিদ্ধান্ত গ্রহণ করিয়াছিলেন অনুরূপ ঘটনা আর তিনি ঘটাইবেন না এবং নিজেকে স্মরণ করাইয়া দিবার জন্য এবং নূহ (আ)-এর সহিত 'চুক্তি সাধনের' পর আসমানে একটি ধনু (রংধনু) সৃষ্টি করিলেন, যাহার অর্থ তাঁহারও ভুল হইবার মত দুর্বলতা থাকিতে পারে (নাউযুবিল্লাহ)। ৮৪ অপরপক্ষে পবিত্র কুরআন চমৎকারভাবে আল্লাহ্র মর্যাদা বিরোধী দোষারোপ হইতে সম্পূর্ণরূপে মুক্ত। পবিত্র কুরআনে বলা হয় নাই যে, আল্লাহ্ ক্রোধকে ৮৫ প্রশমিত করার উদ্দেশ্যে নূহ (আ) একটি কুরবানী দিয়াছিলেন, অথচ তাহাই বাইবেলে আছে। বাইবেলে অনুলিখিত ঘটনাবলী পবিত্র কুরআনে উল্লেখ করিয়া স্পষ্টভাবে চ্যালেঞ্জ করিয়া মহানবীকে ও তাঁহার জনগণকে বলা হইয়াছে যে, তিনি ও তাঁহার সম্প্রদায় কেহই এই ঘটনার কথা পূর্বে জানিতেন না।
অনুরূপভাবে দ্বিতীয় আয়াত (৩ : ৪৪) আসিয়াছে মেরী ও যীশুর কাহিনীর প্রেক্ষিতে। তাহাদের লইয়া যে কাহিনী বাইবেলে ও পবিত্র কুরআনে আছে তাহার পার্থক্য আরও চমৎকার। সেই আয়াতেই তাঁহার যত্ন ও রক্ষণাবেক্ষণের কথা বলা হইয়াছে। দ্বিতীয়ত, পবিত্র কুরআন স্পষ্টতই সকল মূল্যহীন চারিত্রিক বৈশিষ্ট্য হইতে (মারয়ামকে) দোষমুক্ত ঘোষণা করিয়াছে এবং অত্যন্ত গুরুত্বের সহিত ঘোষণা করা হইয়াছে, তিনি পবিত্র ও সতীসাধ্বী এবং আল্লাহ তাআলা তাঁহাকে বিশ্বের সকল মহিলার মধ্যে মহত্তম মহিলারূপে নির্বাচন করিয়াছেন। কুরআন এই প্রকারে তাঁহাকে যীশুর মাতা হওয়ার অসাধারণ সম্মান প্রদান করিয়াছে : مَرْيَمُ إِنَّ اللَّهَ اصْطَفَكِ وَطَهَّرَكِ وَاصْطَفَكِ عَلَى نِسَاءِ الْعُلَمِينَ.
"হে মারয়াম! আল্লাহ তোমাকে মনোনীত ও পবিত্র করিয়াছেন এবং বিশ্বের নারীদের মধ্যে তোমাকে মনোনীত করিয়াছেন। ৮৬
একই সংগে স্পষ্ট করিয়া বলা হইয়াছে যে, তিনি একজন মানুষ বই আর কিছু নন এবং কোন কিছু চাহিতে হইলে তাঁহাকে অন্যান্যের মত আল্লাহ্র নিকটই চাহিতে হইবে: ৮৭
يَريمُ اقْنُتِي لِرَبِّكِ وَاسْجُدِي وَارْكَعِي مَعَ الرَّاكِعِينَ .
"হে মারয়াম! তোমার প্রতিপালকের অনুগত হও ও সিজদা কর এবং যাহারা রুকু করে তাহাদের সহিত রুকূ কর" (৩:৪৩)।
যীশু সম্পর্কে তাঁহার অলৌকিক ক্ষমতার কথা বলা হইয়াছে এবং এইরূপ কথাও বলা হইয়াছে যাহা নিউ টেস্টামেন্টেও নাই। যেমন, তিনি যখন দোলনায় শিশু তখন তিনি কথা বলেন, ৮৮ আল্লাহ্ হুকুমে মাটির পুতুল পাখির মধ্যে প্রাণ সঞ্চার করেন। ৮৯ অতঃপর তাঁহার নিকট আসমান হইতে খাদ্যপূর্ণ খাঞ্চা নামিয়া আসিয়াছিল। এই সকল কথা কুরআন শরীফেই আছে। এই সকল কথা ব্যতীত পবিত্র কুরআনে সামগ্রিক ধারণার কথাও বলা হইয়াছে। পবিত্র কুরআনে স্পষ্টভাবেই বলা হইয়াছে যে, যীশু নবী বা রাসূল ব্যতীত আর কিছুই নহেন, তিনি ঈশ্বর নহেন, ৯০ তিনি ঈশ্বরের পুত্রও নহেন, ৯১ তিনি ত্রিত্বের অন্যতমও নহেন, ৯২ তিনি ক্রুশবিদ্ধও হন নাই। ৯৩
তৃতীয় আয়াত (১২: ১০২) ইউসুফ ('আ)-এর কাহিনীর শেষ অংশে আছে। পবিত্র কুরআন এই কাহিনীকে সর্বাপেক্ষা সুন্দর কাহিনী বলিয়া আখ্যায়িত করিয়াছে (احسن القصص = আহসানুল কাসাস)। পবিত্র কুরআনে এই কাহিনী সম্পূর্ণরূপে বিধৃত হইয়াছে। উহাতে আধ্যাত্মিকতার ইংগিত রহিয়াছে, যাহা ওল্ড টেস্টামেন্টে নাই। বাইবেল ও পবিত্র কুরআনের হযরত ইউসুফ (আ)-এর প্রধান কিছু অংশ পাশাপাশি স্থাপন করিলে উহাদের মধ্যকার পার্থক্য স্পষ্ট প্রতীয়মান হয়। যেমন:
১. পবিত্র কুরআনে বলা হইয়াছে যে, ইয়াকূব (আ) তাঁহার পুত্র ইউসুফকে অধিকতর ভালবাসিতেন, কারণ তিনি স্বপ্ন দেখিয়াছিলেন ও তাঁহার পুত্রের উজ্জ্বল ভবিষ্যত বিষয়ে তাঁহার বিশ্বাস ছিল (দ্র. ১২:৪-৬)।
কুরআন ১. পবিত্র কুরআনে বলা হইয়াছে যে, ইয়াকূব (আ) তাঁহার পুত্র ইউসুফকে অধিকতর ভালবাসিতেন, কারণ তিনি স্বপ্ন দেখিয়াছিলেন ও তাঁহার পুত্রের উজ্জ্বল ভবিষ্যত বিষয়ে তাঁহার বিশ্বাস ছিল (১২:৪-৬)।
২. পবিত্র কুরআন বলে, ইউসুফের ভাইয়েরা তাঁহাকে তাহাদের সঙ্গে লইবার পূর্বেই তাঁহার বিরুদ্ধে ষড়যন্ত্র করিয়াছিল (১২ঃ ৯-১০)।
৩. কুরআন বলে যে, ইউসুফ (আ)-এর ভাইয়েরা তাঁহাকে সঙ্গে লইয়া যাইতে দেওয়ার
বাইবেল ১. ওল্ড টেস্টামেন্ট বলে, ইউসুফের প্রতি ইয়াকুবের ভালবাসার কারণ তিনি বৃদ্ধ বয়সের পুত্র ছিলেন (জেনেসিস, ৩৭ঃ৩)।
২. ওল্ড টেস্টামেন্টে এই বিষয়ে কোন উল্লেখ নাই।
৩. অপরপক্ষে ওল্ড টেস্টামেন্ট বলে যে, ইয়াকূব তাঁহার পুত্রদের সঙ্গে যাইবার জন্য তাহাদের পিতাকে অনুরোধ করিয়াছিল (১২:১১-১৪)।
৪. পবিত্র কুরআন বলে যে, ইউসুফ (আ) স্বপ্নের কথা তাঁহার ভাইদের নিকট বলেন নাই (১২:৫)।
৫. পবিত্র কুরআন বলে যে, ইউসুফের ভাইয়েরা তাঁহাকে একটি কূপে ফেলিয়া দেয়, সেই স্থান দিয়া গমনকালে এক কাফেলা তাঁহাকে উদ্ধার করিয়া মিসরে দাসরূপে বিক্রয় করে (১২: ১৫, ১৯)।
৬. পবিত্র কুরআন বলে যে, ইউসুফের ভাইয়েরা তাহাদের পিতাকে বলে, ইউসুফকে কোন জন্তু খাইয়া ফেলিয়াছে। কিন্তু তিনি উহা বিশ্বাস করেন নাই, তাঁহাকে ফিরিয়া পাইবার ব্যাপারে নিরাশ হইয়াও যান নাই (১২: ১৬-১৮)।
৭. পবিত্র কুরআন বলে যে, আযীযের স্ত্রীই ইউসুফকে বিপথগামী করিতে প্ররোচিত করিয়াছিল এবং সেই উদ্দেশ্যে কক্ষের দরজা বন্ধ করিয়া দিয়াছিল। তখন ইউসুফ (আ) দৌড়াইয়া পলায়ন করিলে সে পশ্চাত হইতে তাঁহার জামা টানিয়া ধরিলে জামার পিছন দিক ছিঁড়িয়া যায় (১২: ২৩-২৫)।
৮. পবিত্র কুরআন বলে যে, ইউসুফ (আ) যখন দৌড়াইয়া পালাইতেছিলেন তখন দরজার নিকট আযীযের স্ত্রীও ছিল, একই সময়ে আযীযও আসিয়া উপস্থিত হয়। তখন আযীযের স্ত্রী তাহার নিকট অভিযোগ করে যে, ইউসুফ তাহার শালীনতা ভঙ্গ করিতে গিয়াছিল এবং আযীযের জবাব না শুনিয়াই দাবি করে যে, ইউসুফকে এখনই কারাগারে নিক্ষেপ করিতে হইবে, শাস্তি দিতে হইবে (১২: ২৫)।
৯. পবিত্র কুরআন বলে যে, ইউসুফ তৎক্ষণাৎ সেখানেই দরজার নিকট নিজেকে নির্দোষ বলিয়া স্বপক্ষ সমর্থন করেন এবং সত্য কথা বলিতে গিয়া জবানবন্দী দেন যে, আযীযের স্ত্রীই তাঁহাকে বলাৎকার করিতে চেষ্টা করিয়াছে (১২: ২৬)।
১০. পবিত্র কুরআন বলে যে, গৃহের একজন সাক্ষী বলে, যদি ইউসুফের জামার সম্মুখভাগ ছিন্ন হইত তাহা হইলে সে দোষী হইত, কিন্তু জামার পশ্চাত ভাগ ছিন্ন থাকায় প্রমাণিত হয় যে, আযীযের স্ত্রীই দোষী (১২: ২৬-২৭)।
১১. পবিত্র কুরআন বলে যে, জামার পিছন দিক যেহেতু ছিন্ন ছিল তাই আযীয প্রকৃত সত্য অনুধাবন করিতে পারিয়াছিলেন এবং ইউসুফকে নীরবে চলিয়া যাইতে বলেন। অতঃপর স্ত্রীকে ভর্ৎসনা করিয়া আল্লাহ্র নিকট স্বীয় পাপের জন্য ক্ষমা চাহিতে বলেন (১২: ২৮-২৯)।
১২. ঘটনার কথা চাপা থাকেনি কোনভাবে। নগরের মহিলা মহলে কানাঘুষা চলিতে থাকে যে, আযীযের স্ত্রী তাহার ক্রীতদাসের সহিত দৈহিক সম্পর্ক স্থাপনের চেষ্টা করিয়াছিল। কানাঘুষার কথা আযীযের স্ত্রীও শুনিতে পায়। তখন সে একদিন সকল মহিলাকে নৈশভোজের দাওয়াত দেয়। ভোজন সমাপ্ত হইবার পর সকল মহিলার হাতে একটি আপেল ও আপেল কাটার একটি করিয়া ধারালো ছুরি দেওয়ার পর ইউসুফকে সেই সমাবেশে উপস্থিত করা হয়। মহিলাগণের প্রত্যেকেই ইউসুফের সৌন্দর্য ও দেহসৌষ্ঠব অবলোকন করিয়া এইরূপ বিমুগ্ধ হইয়া পড়ে যে, তাহারা ফল না কাটিয়া নিজেদের আঙ্গুল কাটিয়া ফেলে। তখন আযীযের স্ত্রী বিজয় উল্লাসে সকলের সম্মুখে আপন অপরাধ স্বীকার করিয়া বলে যে, ইউসুফ যদি তাহার ইচ্ছা পূরণ না করে তবে তাহাকে অবশ্যই কারাবরণ করিতে হইবে এবং কষ্টভোগ করিতে হইবে (১২: ২৯-৩২)।
১৩. ইউসুফ (আ) তখন আযীযের স্ত্রীর বাসনা পূরণ অপেক্ষা কারাবরণ অধিকতর শ্রেয় মনে করেন এবং আযীযও দুর্নাম হইতে পরিত্রাণের জন্য ইউসুফকে কারাগারে প্রেরণ করেন (১২: ৩৩-৩৫)।
১৪. কেবল পবিত্র কুরআনেই বলা হইয়াছে যে, মিসরের রাজা ইউসুফকে কারামুক্ত করার এবং উচ্চপদে নিয়োগের সিদ্ধান্ত জানাইতে ইউসুফের নিকট দূত প্রেরণ করেন। তখন ইউসুফ সঙ্গে সঙ্গে লাফ দিয়া প্রস্তাব গ্রহণ না করিয়া বরং দাবি করেন যে, ঘটনাটির পূর্ণ তদন্ত করিতে হইবে। কেন তাঁহাকে কারাবরণ করিতে হইয়াছে তাহা জানিতে হইবে এবং তিনি যে নির্দোষ তাহা সকলের নিকট প্রকাশ করিতে হইবে (১২:৫০)।
১৫. সর্বসমক্ষে ঘটনার বিচার হয়, সেখানে আযীযের স্ত্রী নিজেই সব কথা স্বীকার করে এবং সে বিষয়ে হাত কর্তনীয় মহিলারাও সাক্ষ্য প্রদান করে যে, আযীযের স্ত্রী নিজেই তাহাদের কাছে স্বীয় দোষ স্বীকার করিয়াছিল। ফলে ইউসুফ (আ) যে নির্দোষ ছিলেন তাহা সকলে জানিতে পারে (১২৪ ৫১-৫২, ১২ঃ ৩২)।
১৬. পবিত্র কুরআনে কাহিনীর পরিসমাপ্তিতে বলা হইয়াছে যে, ইউসুফ (আ) তাঁহার পিতা-মাতা ও ভাইদের সঙ্গে মিলিত হন এবং স্বপ্ন যে বাস্তব রূপ লাভ করিয়াছিল তাহাই দেখানো হইয়াছে (১২: ১০০)।
১৭. অবশেষে পবিত্র কুরআন যথাযথভাবে মিসরের শাসনকর্তাকে রাজা বলিয়া আখ্যায়িত করিয়াছে, ফিরআওন নহে। কারণ ফিরআওন পদবী প্রচলিত হইয়াছিল ১৮শ রাজবংশের পূর্বে নহে, সঠিকভাবে বলিতে গেলে ৩য় থেটমস-এর রাজত্বের পূর্বে (১৪৯০-১৪৩৬ খৃ. পূ.) নহে।
ইউসুফ ('আ)-এর কাহিনী লইয়া পবিত্র কুরআন ও ওল্ড টেস্টামেন্টের বিবরণের মধ্যে যে তথ্যগত পার্থক্য রহিয়াছে তাহার কিছু উল্লেখ করা হইল। এইরূপে যদি আরও বিস্তারিত তুলনা করা হয় তাহা হইলে আরও অনেক পার্থক্য ধরা পড়িবে।
অনুরূপভাবে আলোচ্য চতুর্থ আয়াত (২৮:৪৪-৪৬) হযরত মূসা (আ) সম্পর্কিত কিছু ঘটনা (২৮: ২-৪৩) বর্ণনা প্রসঙ্গে সর্বশেষে বলা হইয়াছে। ঘটনাক্রমে এই কাহিনী একটি বক্তব্য দিয়া আরম্ভ হইয়াছে : "আমরা তোমার নিকট সোনাই মূসার বিষয়ে কয়েকটি কাহিনী"। পবিত্র কুরআনে সত্যই মূসা ও তাঁহার ভাই হারূন ('আ)-এর কাহিনী বর্ণনা করা হইয়াছে, ইসরাঈলদের সম্পর্কে ওল্ডটেস্টামেন্টে যাহা আছে তাহা অপেক্ষা ইহাতে অনেক বেশি বর্ণনা রহিয়াছে। অবশ্য দুইটি বিবরণের মধ্যে অনেক মিলও রহিয়াছে। কিন্তু পার্থক্যসমূহ কুরআনে যে নূতন তথ্য রহিয়াছে তাহা মৌলিক। ৯৪ সর্বাপেক্ষা গুরুত্বপূর্ণ পার্থক্য পরিলক্ষিত হয় যে, ওল্ড টেস্টামেন্টে মূসা ('আ)-কে ও তাঁহার ভাই হারূনের উপর অনুচিত কার্যের অভিযোগ আনয়ন করা হইয়াছে, যদিও মূসাকে বলা হইয়াছে যে, তিনি ছিলেন তাঁহাদের 'আইনদাতা'। অপরপক্ষে মূসা ও তাঁহার ভাই হারুনকে ব্যক্তি হিসাবে চিত্রিত করা হইয়াছে যে, তাহারা আল্লাহর অবাধ্য হইয়াছেন ও আল্লাহ্র রোষ তাহাদের উপর পতিত হইবার কারণ ছিল। ৯৫ এমনকি এইরূপ অভিযোগও আনয়ন করা হইয়াছে যে, হারুনের কারণেই তাহারা স্বর্ণ গোবৎস পূজা প্রবর্তন করিয়াছিল। অপরপক্ষে পবিত্র কুরআন তাহাদিগকে সকল অভিযোগ হইতে মুক্ত দেখাইয়াছে এবং অত্যন্ত দৃঢ়তার সহিত ঘোষণা করিয়াছে যে, তাঁহারা ছিলেন আল্লাহ্ নির্বাচিত পয়গাম্বর ও আল্লাহর অনুগ্রহভাজন প্রত্যাদেশপ্রাপ্ত ও কিতাবপ্রাপ্ত। তাঁহাদের প্রতি অনোচিত্যমূলক কর্মের যে অভিযোগ আনয়ন করা হইয়াছে তাঁহারা ছিলেন উহা হইতে সম্পূর্ণ মুক্ত। তাঁহারা ছিলেন আল্লাহ্র পয়গাম্বর হিসাবে মানুষকে আল্লাহ্র পথে আহ্বানকারী উৎসর্গকৃত প্রাণ, নিবেদিত প্রাণ, আন্তরিক মানুষ। তাঁহারা মানুষকে আহ্বান করিয়াছিলেন যে, তাহারা যেন একমাত্র আল্লাহ্ই উপাসনা করে এবং আল্লাহ ব্যতীত অপর কাহারও উপাসনা না করে। ৯৬ পবিত্র কুরআনে আরও বলা হইয়াছে যে, স্বর্ণ-গোবৎসের উপাসনা প্রবর্তন করিয়াছিল ইসরাইলী সামিরই, মূসার ভ্রাতা হারূন নহেন। ৯৭ পুনরায়, একমাত্র পবিত্র কুরআনের দুই সাগরের মিলনক্ষেত্র অবধি মূসার ভ্রমণ বৃত্তান্ত বর্ণনা করা হইয়াছে। আবার পবিত্র কুরআনেই সেই গুরুত্বপূর্ণ ঘটনার উল্লেখ আছে যে, মূসাকে হত্যা করিবার জন্য ফিরআওন যে চক্রান্ত করিয়াছিল তাহা প্রকাশ হইয়া যায় এবং ফিরআওনের দরবারের একজন 'বিশ্বাসী' ব্যক্তি তাহাকে পরিকল্পনা বাস্তবায়ন হইতে বিরত করিয়াছিল। ৯৮
এমনকি বিস্তারিত বিবরণ প্রদানের ক্ষেত্রেও পার্থক্য রহিয়াছে। সংক্ষিপ্ত ইসলামী বিশ্বকোষ গ্রন্থের লেখক যথাযথই দেখাইয়াছেন যে, পবিত্র কুরআনে আছে—শিশু মূসাকে নদী হইতে ফিরআওনের স্ত্রী উদ্ধার করিয়াছিল, ফিরআওনের কন্যা নহে। বাইবেলে আছে সাতজন মেষ পালক বালিকাকে মূসা সাহায্য করিয়াছিলেন; কিন্তু পবিত্র কুরআনে আছে মাত্র দুইজনকে। দশটি প্লেগের ঘটনার পরিবর্তে পবিত্র কুরআনে নয়টি অলৌকিক ঘটনার উল্লেখ আছে। কুরআনে আরও আছে যে, মূসা প্রস্তরে আঘাত করিলে সেই প্রস্তর হইতে বার গোত্রের জন্য বারটি প্রস্রবণ নির্গত হইয়াছিল। "অতঃপর নূতন বিষয়ে রহিয়াছে: একজন মিসরীয়কে হত্যা করিবার জন্য মূসা অনুতপ্ত হইয়াছিলেন। রাত্রিকালে মূসা দূরে জ্বলন্ত অগ্নি দেখিতে পাইলে সেই অগ্নি হইতে আগুন সংগ্রহ করিতে চাহিয়াছিলেন..."। পবিত্র কুরআনে আরও বলা হইয়াছে যে, ফিরআওনের যাদুকরগণকে আল্লাহতে ঈমান আনার কারণে মৃত্যুবরণ করিতে হইয়াছিল।১০০
অনুরূপভাবে যখন অন্যান্য পয়গাম্বরদিগের বিবরণ বর্ণনা করা হইয়াছে তখন পবিত্র কুরআনের বর্ণনা ও বাইবেলের বর্ণনার মধ্যে মৌলিক পার্থক্য লক্ষ্য করা যায়। ইবরাহীম ('আ)-এর কাহিনী বর্ণনার ক্ষেত্রে কিছু সংখ্যক পার্থক্য ইতিপূর্বে উল্লেখ করা হইয়াছে। যেমন দাউদ ও সুলায়মান ('আ) সম্পর্কে বিবরণ, তাঁহারা দুইজন ছিলেন পরাক্রমশালী মহান পয়গাম্বর। কিন্তু তাঁহাদিগের সম্পর্কে বাইবেলে যে চিত্র অংকন করা হইয়াছে তাহাতে প্রতিভাত হয় যে, তাহারা ছিলেন অত্যাচারী, উৎপীড়নকারী, ভোগবিলাসী, লম্পট, এমনকি অন্যায় সম্ভোগের জন্য অপরের স্ত্রীকে অপহরণ করিতে দ্বিধা করিতেন না। ১০১ পয়গাম্বর দূতও নাকি আপন কন্যাদের সহিত দৈহিক সম্পর্ক স্থাপন করিয়াছিলেন (নাউযুবিল্লাহ)। ১০২ অপরপক্ষে পবিত্র কুরআন এককভাবে পয়গাম্বরদের চরিত্রে কোন প্রকার কালিমা লেপন হইতে বিরত রহিয়াছে এবং হযরত দাউদ (আ) সম্পর্কে যাহা বলিয়াছে তাহা হইতে জানা যায় যে, তিনি ছিলেন আল্লাহ্র আদর্শ প্রতিনিধি। সেই কারণে তাঁহাকে দেওয়া হইয়াছিল সাম্রাজ্য, প্রজ্ঞা, কিতাব ও ক্ষমতা। ১০৩ অনুরূপভাবে সুলায়মান (আ)-কে আল্লাহ্র অনুগ্রহভাজন হিসাবে প্রদান করা হইয়াছিল ক্ষমতা, সাম্রাজ্য ও সকল প্রাণীর ভাষা বুঝিবার অসাধারণ ক্ষমতা। ১০৪ তাঁহারা উভয়ই ছিলেন আদর্শ চরিত্রের মানুষ ও আল্লাহ্র নবী।
এইরূপে পবিত্র কুরআন ও বাইবেলে পয়গাম্বরগণ সম্পর্কিত যে বিবরণ রহিয়াছে তাহা তুলনা করিলে স্পষ্ট দেখা যায়, কুরআনের বিবরণ বাইবেলের বিবরণের নকল নহে। অবশ্য দুইটি বিবরণের মধ্যে অনেক মিলও রহিয়াছে, কিন্তু কুরআনের বিবরণ অনেক বেশি ভিন্ন প্রকৃতির ও মৌলিক। কোন কোন প্রাচ্যবিশারদ স্বীকার করেন যে, কুরআনে অনেক নূতন তথ্য আছে, কিন্তু সাধারণভাবে তাহাদের বিবেচনাগুলিতে তিনটি সাধারণ দুর্বলতা পরিলক্ষিত হয়।
প্রথমত, তাহারা যেখানে মিল আছে সেইগুলি সকল অমিল বাদ দিয়া দেখাইয়াছেন অথবা কোনরূপ গুরুত্ব না দিয়া গৌণ বিষয় হিসাবে উল্লেখ করিয়াছেন। দ্বিতীয়ত, তাহারা অনুরূপ ঘটনা বা ধারণা অন্যান্য পৌরাণিক গ্রীক, হিব্রু ও লাতিন রচনায় চিহ্নিত করিতে চেষ্টার বিন্দুমাত্র ত্রুটি করেন নাই এবং তৎক্ষণাৎ ঝাঁপাইয়া পড়েন ও বলেন যে, কুরআনে বর্ণিত ঘটনা সেই সূত্র হইতে লওয়া হইয়াছে অথবা উহার ভিত্তিতে রচিত হইয়াছে। তাহারা তখন ভুলিয়া যান যে, কোন ঘটনার বা ধারণার উল্লেখ পূর্ববর্তী কোন রচনায় থাকিলেই প্রমাণিত হয় না যে উহা সেই পূর্ববর্তী রচনা হইতে গ্রহণ করা হইয়াছে। কোন সময় উক্ত বিষয় হয়তো কয়েক সহস্র বৎসর পূর্বের রচনা। পরবর্তী কালের কোন কিছুতে সেই ধারণা বা ঘটনা থাকার অর্থ ইহা নহে যে, উহাকে ভিত্তি করিয়াই পরবর্তী কালে রচনা রচিত হইয়াছে। আরও কিছু সাক্ষ্য প্রয়োজন হয়। যেমন যোগাযোগ স্থাপিত হইয়াছিল তাহার প্রমাণ অথবা সেই সূত্রের সহিত যোগাযোগের সম্ভাবনার কোন প্রমাণ থাকিতে হয়। এই বিষয়টি হযরত মুহাম্মাদ-এর ক্ষেত্রে অধিকতর প্রযোজ্য। কারণ এই কথা বলা চলে না যে, তিনি অসংখ্য পৌরাণিক রচনা ও সূত্র অধ্যয়ন করিয়াছিলেন, এমনকি সেই সকল রচনা লুপ্ত ভাষায় থাকিলেও তিনি সেই ভাষা জানিতেন। সেই সকল পৌরাণিক কাহিনী ও জ্ঞান অর্জন করিতে হইলে নিছক পথচারীর মুখ হইতে শুনিয়া অথবা ধর্মান্তরিত ক্রীতদাসের নিকট হইতে শুনিয়া সম্ভব নহে। অথচ তাঁহার বিরুদ্ধে এইরূপ অভিযোগই আনয়ন করা হইয়াছে।
এইরূপ কোন তথ্য নাই যাহাতে দেখা যায়, সেকালে মক্কা নগরীতে অথবা আশেপাশে কোন গ্রন্থাগার বা যাদুঘর ছিল যেখানে প্রাচীন গ্রন্থ ও পাণ্ডুলিপি ছিল, যে সকল গ্রন্থ ও পাণ্ডুলিপির প্রতি প্রাচ্যবিশারদগণ পাঠকের দৃষ্টি আকর্ষণ করেন, অথবা সেখানে এইরূপ কোন জ্ঞানী পণ্ডিত অথবা ভাষাবিজ্ঞানী ছিলেন না যিনি সেই সকল গ্রন্থের রহস্য ভবিষ্যতে যিনি পয়গাম্বর হইবেন তাঁহার নিকট ওই সকল তথ্য উদ্ঘাটন করিতে পারিতেন। তৃতীয়ত, যখন অনিচ্ছাকৃতভাবে তাচ্ছিল্যের সহিত প্রাচ্যবিশারদগণ স্বীকার করেন যে, পবিত্র কুরআনে অনেক নূতন তথ্য রহিয়াছে তখন তাহারা মনে হয় কখনও মনোযোগ দিয়া চেষ্টা করেন নাই যে, উক্ত তথ্য কোন্ সূত্র হইতে আসিয়াছে তাহা উদ্ধার করিতে। তাহারা যদি সত্যই আন্তরিকভাবে সেই চেষ্টা করিতেন তাহা হইলে নিশ্চয়ই অনুধাবন করিতে পারিতেন, যে ধারণা-অনুমানকে প্রতিষ্ঠিত করিবার জন্য তাহারা একনিষ্ঠভাবে প্রচেষ্টা করিতেছেন সেই অনুমান ও ধারণার পরিবর্তন প্রয়োজন।