📘 সীরাত বিশ্বকোষ > 📄 চার: একত্ববাদী এক বা একাধিক তথ্য সরবরাহকারী সম্পর্কিত পবিত্র কুরআনের তথাকথিত সাক্ষ্য

📄 চার: একত্ববাদী এক বা একাধিক তথ্য সরবরাহকারী সম্পর্কিত পবিত্র কুরআনের তথাকথিত সাক্ষ্য


মক্কার পৌত্তিলিক নেতৃবৃন্দের অভিযোগ যে, মহানবী অন্যের নিকট হইতে পরামর্শ বা উপদেশ লাভ করিতেন। এই বিষয়ে কুরআনের যে বক্তব্য ইহা আমাদের বর্তমান আলোচ্য বিষয়। ইহা প্রধানত কাফিরদের সেই অভিযোগ যে বিষয়ে ওয়াট ও তাহার পূর্ববর্তীগণ তাহাদের অনুমানের ভিত্তি রচনা করিয়াছেন যে, রাসূল মুহাম্মাদের এক বা একাধিক সংবাদদাতা ছিল যাহারা তাঁহাকে একত্ববাদ সম্পর্কে তথ্য সরবরাহ করিত। এই কাজ করিতে গিয়া ওয়াট অথবা সি.সি.টোরি কুরআনের বক্তব্যের মারাত্মকভাবে ভুল ব্যাখ্যা করিয়াছেন। ইহা কি প্রকারে করা হইয়াছে তাহা দেখিবার জন্য আমাদের প্রয়োজন-ওয়াট তাহার অনুমানের সমর্থনে কুরআন শরীফের যে দুইটি আয়াত উদ্ধৃত করিয়াছেন সেই দুইটি আয়াতের মূল আরবীসহ ওয়াটকৃত অনুবাদ নিম্নে দেওয়া হইল :

وَلَقَدْ نَعْلَمُ أَنَّهُمْ يَقُولُونَ إِنَّمَا يُعَلِّمُ بِشَرٌ لِسَانُ الَّذِي يُلْحِدُوْنَ إِلَيْهِ أَعْجَمِيٌّ وَهُذَا لِسَانُ عَرَبِيُّ مُّبِينٌ . (نحل : ١٦: ١٠٣)

"We know they say, It is only a person teaches him. The tongue of the one they hint at is foreign, but this (the Quran) is (in) a clear Arabic tongue" (Muhammad's Mecca, 45).

"আমি তো জানি, তাহারা বলে, ইহা ত এক ব্যক্তি তাহাকে শিক্ষা দেয়। তাহারা যাহার প্রতি ইহা আরোপ করে তাহার ভাষা বিদেশী, কিন্তু ইহা (কুরআন) তো স্পষ্ট আরবী ভাষা" (১৬: ১০৩)।

وَقَالَ الَّذِينَ كَفَرُوا إِنْ هذا الا افْكُ افْتَرَهُ وَأَعَانَهُ عَلَيْهِ قَوْمٌ أَخَرُونَ ، فَقَدْ جَاءُوْ ظُلْمًا وَزُورًا ، وَقَالُوا أَسَاطِيرُ الْأَوَّلَيْنَ اكْتَتَبَهَا فَهى تُمْلَى عَلَيْهِ بُكْرَةً وَأَصِيلاً .

"The unbelievers say: This is only a folsehood he invented; other people helped him with it... They said, Old-World fables, he has had written down; they are dictated to him morning and evening".

"অবিশ্বাসীরা বলে, ইহা তো একটি মিথ্যা মাত্র, সে উহা উদ্ভাবন করিয়াছে। অন্য লোকজন ইহাতে সাহায্য করিয়াছে; এইরূপে উহারা অবশ্যই যুলুম ও মিথ্যায় উপনীত হইয়াছে। তাহারা বলিল, প্রাচীন বিশ্বপৌরাণিক কাহিনী, যে উহা লিখাইয়া লইয়াছে; এইগুলি সকাল-বিকাল তাহার নিকট পাঠ করা হয়") ২৫:৪-৫)।

টোরি-কে ৫৪ অনুসরণ করিয়া ওয়াট এই দুইটি বক্তব্য, বিশেষ করিয়া প্রথম বক্তব্য এইভাবে ব্যাখ্যা করিয়াছেন যে, 'মুহাম্মাদ অস্বীকার করেন না যে, তাহার এক মানব শিক্ষক ছিল কিন্তু কেবল দাবি করেন যে, উহা আসমান হইতে অবতীর্ণ হইয়াছিল'। ৫৫ ওয়াট তাহার সর্বশেষ গ্রন্থে সেই বক্তব্যকে বিশদ ব্যাখ্যা করিতে গিয়া বলেন, "কুরআন অস্বীকার করে না যে, মুহাম্মাদ এইভাবে তথ্য লাভ করিতেন" কিন্তু কেবল "দাবি করেন যে, তিনি যে সকল তথ্য লাভ করিতেন সেইগুলিই কুরআন নহে, কারণ একজন বিদেশী স্পষ্ট আরবী ভাষায় নিজেকে প্রকাশ করিতে পারে না"। অতএব সংবাদ সরবরাহকারী যে সকল তথ্য সরবরাহ করিত তাহা "সত্য ঘটনা সম্পর্কিত জ্ঞান", অথচ "সত্য ঘটনার অর্থ ও ব্যাখ্যা তাহার নিকট আগমন করে স্বাভাবিক প্রত্যাদেশ যে প্রকারে আসে সেই প্রকারে"। ৫৬ ওয়াটের এবং টোরীর এই ব্যাখ্যা সম্পূর্ণ ভুল।

ওয়াটের পক্ষ হইতে ইহা ছিল এমন একটি প্রচেষ্টা যাহাতে এই পাঠে, বিশেষ করিয়া প্রথম অনুচ্ছেদে ওহী সম্পর্কিত তাহার ধারণাকে কাজে লাগানো যায়, যাহাকে তিনি প্রফেটিক ইনটিউশন বা এক প্রকার পয়গাম্বর সুলভ নিজস্ব চেতনা বলিয়াছেন। অর্থাৎ এমন কিছু যাহা 'অর্থ' ও 'ব্যাখ্যা'সূচক যাহা বাস্তবতা ও শব্দ হইতে ভিন্ন। ওয়াটের সেই ধারণা সম্পর্কে পরে আলোচনা করা হইবে যখন আমরা 'ওহী' সম্পর্কে আলোচনা করিব। ৫৭ লক্ষণীয় যে, উক্ত আয়াত হইতে সর্বাধিক যে অর্থ বাহির করা যাইতে পারে তাহা হইতেছে, মক্কা নগরীতে একজন বিদেশী ছিল, সম্ভবত তাহার ইয়াহুদী ধর্ম ও খৃস্ট ধর্ম বিষয়ে কিছু জ্ঞান ছিল এবং তাহার সহিত মহানবী -এর পরিচয় ছিল। স্বাভাবিক কারণেই মহানবীর বিরুদ্ধাচারিগণ ইহার সুযোগ গ্রহণ করিয়া তাঁহার বিরুদ্ধে অভিযোগ উত্থাপন করিয়াছিল যে, তিনি যে প্রত্যাদেশ লাভ করিয়াছেন উহা রচনা করিতে সেই ব্যক্তিই তাঁহাকে "শিক্ষা" দিয়াছিল। পবিত্র কুরআন এই অভিযোগকে অস্বীকার ও মিথ্যা বলিয়া উল্লেখ করিয়াছে। কল্পনাকে যতই দীর্ঘ করা হউক না কেন তাহা দ্বারা ইহা অনুমান করা সম্ভব নহে যে, পবিত্র কুরআন অস্বীকার করে না যে, তিনি সেই ব্যক্তির নিকট হইতে ইঙ্গিতবহ তথ্য প্রাপ্ত হইয়াছিলেন এবং ইহা নিছক "দাবি" করে যে, তিনি যে সকল বস্তু এই প্রকারে লাভ করিতেন তাহা "কুরআন হইতে পারে না। কারণ একজন বিদেশী নিজেকে স্পষ্ট ভাষায় প্রকাশ করিতে সক্ষম নহে" ইহা ওয়াটের নিজের ব্যাখ্যা অথবা "উদ্দেশ্যমূলক" আকার প্রদান। কুরআন স্পষ্টভাবেই বলিতেছে যে, সেই কটাক্ষপাতকারী ব্যক্তির ভাষা 'আজমী' অর্থাৎ "বিদেশী"। কিন্তু অর্থের যতই প্যাঁচ খাটানো হউক না কেন ইহা কি যুক্তিসঙ্গত যখন বলা হয়, একজন বিদেশী, যে স্পষ্ট আরবী ভাষায় নিজেকে প্রকাশ করিতে পারে না, সে মহানবী -কে ইয়াহুদী ধর্ম ও খৃস্ট ধর্মের বিস্তারিত ও সূক্ষ্ম বিষয়ের শিক্ষা দান করিতে সক্ষম হইবে, যখন তিনি নিজে কোন প্রকারেই কোন বিদেশী ভাষা জানেন না?

প্রকৃতপক্ষে ইহা মারাত্মক বিভ্রান্তিমূলক এবং বেশ কিছুটা স্ববিরোধীও বটে। টোরি ও ওয়াট বলেন যে, মুহাম্মাদ অস্বীকার করেন না যে, "তাঁহার এক মানব শিক্ষক ছিল, কিন্তু কেবল দাবি করেন যে, উহা আসমান হইতে অবতীর্ণ হইয়াছিল"। তাঁহার দাবি যদি কেবল তাহাই হইত যে, শিক্ষা "আসমান হইতে অবতীর্ণ হইয়াছিল" তাহা হইলে উহা কি অস্বীকার করা নয় যে, তাহার একজন মানব শিক্ষক ছিল? কিন্তু শিক্ষা "আসমান হইতে অবতীর্ণ হইয়াছিল” ইহাই কেবল বলা হয় নাই, তাহা অপেক্ষা অনেক জোরালোভাবে এবং বারংবার বলা হইয়াছে যে, প্রত্যাদিষ্ট গ্রন্থের "মূল পাঠ”-ও আসমান হইতে অবতীর্ণ হইয়াছে। প্রকৃতপক্ষে কুরআন শরীফের মূল চ্যালেঞ্জ ছিল যে, কেহ আসিয়া সূরার অনুরূপ একটি পাঠ রচনা করুক। সেই চ্যালেঞ্জ আজও রহিয়াছে।

অবিশ্বাসিগণের অভিযোগের মধ্যে আরও রহিয়াছে যে, গ্রন্থের "মূল পাঠ"ও সুকৌশলে প্রবিষ্ট সেই ব্যক্তি নাকি রচনা করিয়া দিয়াছিল। শব্দটি ছিল 'ইয়ু'আল্লিমু', সমকালীন আরবী বাচনভঙ্গির দিক হইতে ইহার অর্থ কেবল তথ্য সরবরাহ করা নহে, বরং একটি পাঠ পৌঁছাইয়া দেওয়া অর্থে ব্যবহৃত হইত যাহা সাধারণত মুখস্ত করিয়া করা হইত। সেকালে জ্ঞান বা তথ্য সম্পূর্ণরূপে মুখে মুখে স্থানান্তরিত হইত এবং যেহেতু অভিযোগে ওহীর মূল পাঠের কথা বলা হইয়াছে, ইহার অস্বীকৃতি অধিকতর শক্তিশালী হইয়াছে যখন কেবল দেখানো হইয়াছে সুকৌশলে প্রবিষ্ট সেই ব্যক্তি স্পষ্ট আরবী পাঠ উচ্চারণ করিতে অক্ষম তখন ইহা একেবারেই অযৌক্তিক। অস্বীকৃতির মধ্যে কিছু পরিমাণে সুকৌশলে প্রবিষ্ট সেই ব্যক্তির প্রতি বক্রোক্তিও রহিয়াছে। প্রকৃতই ওয়াট যে উদ্ধৃতি দিয়াছেন সেই দ্বিতীয় আয়াতে অবিশ্বাসিগণের অভিযোগের প্রকৃতি অধিকতর স্পষ্টরূপে বর্ণিত হইয়াছে। বর্তমানে আমরা ইহার প্রতি মনোযোগ দিব।

ওয়াট প্রথম আয়াতের (১৬: ১০৩) যে ব্যাখ্যা দিয়াছেন উহা তিন দিক হইতে ত্রুটিপূর্ণ। (এক) উহা সম্পূর্ণরূপে যে প্রেক্ষিতে বলা হইয়াছে তাহা মোটেই গ্রাহ্য করা হয় নাই। উহা অবিশ্বাসিগণের অভিযোগকে মিথ্যা প্রতিপন্ন করার জন্যই বলা হইয়াছে। ৫৮ ইহার পরিপ্রেক্ষিত অত্যন্ত স্পষ্ট, আয়াতটি এমনিতেই পরিষ্কার, আবার ইহার পূর্ববর্তী দুইটি আয়াতও (১০১ ও ১০২) স্পষ্ট। যেমন ১০১ আয়াত অবিশ্বাসিগণের অভিযোগ যে, মহানবী "জালিয়াতি” করিয়াছেন সেই সম্পর্কিত এবং অতঃপর এই কথা বলিয়া অভিযোগ খণ্ডন করা হয় যে, যাহারা এই সকল অভিযোগ উত্থাপন করে তাহারা প্রকৃতই কিছু জানে না।

قَالُوا إِنَّمَا أَنْتَ مُفْتَرٍ بَلْ أَكْثَرُهُمْ لَا يَعْلَمُونَ . "তাহারা বলে, তুমি তো কেবল মিথ্যা উদ্ভাবনকারী, কিন্তু উহাদিগের অধিকাংশই জানে না” (১৬৪ ১০১)।

একই অস্বীকৃতি অব্যাহত রহিয়াছে এবং ১০২ আয়াতে ইতিবাচকরূপে বলা হইয়াছে, যেখানে অত্যন্ত গুরুত্ব সহকারে বলা হইয়াছে প্রত্যাদেশ "তোমার প্রতিপালকের" নিকট হইতে ফেরেশতা জিবরাঈল কর্তৃক অবতীর্ণ হইয়াছে।

قُلْ نَزَّلَهُ رُوحُ الْقُدُسِ مِنْ رَّبِّكَ بِالْحَقِّ . "বল, তোমার প্রতিপালকের নিকট হইতে রূহুল কুদুস (জিবরাঈল) সত্যসহ কুরআন অবতীর্ণ করিয়াছে"।

ওয়াট ১০৩ আয়াত উদ্ধৃত করিয়াছেন উহাও অবিশ্বাসিগণের অভিযোগ সংক্রান্ত বিষয়ের অনুবর্তন মাত্র এবং একই জোরালো অস্বীকৃতি। প্রকৃতপক্ষে وَلَقَدْ نَعْلَمُ أَنَّهُمْ يَقُولُونَ "আমি তো জানিই, তাহারা বলে," এই বক্তব্য বিশেষ করিয়া অপ্রধান পদ ও সর্বনাম 'আন্নাহুম' স্পষ্ট পূর্ববর্তী আয়াতের সহিত সংযুক্তি বুঝায়। অথচ ওয়াট তাহার ব্যাখ্যায় পরিপ্রেক্ষিতকে সম্পূর্ণ উপেক্ষা করিয়াছেন এবং মহানবী-এর প্রতিপক্ষের অভিযোগগুলি নিশ্চিন্তে গ্রহণ করিয়াছেন।

(দুই) ওয়াট আর একটি ভুল করিয়াছেন যখন তিনি বলেন যে, কুরআন অস্বীকার করে না, যাহাকে তিনি বলেন, বিদেশীর নিকট হইতে তথ্যপ্রাপ্তি। যে প্রেক্ষিতে আয়াত নাযিল হইয়াছিল সেই প্রেক্ষিতকে যদি বিবেচনা করা নাও হয় তাহা হইলেও এই ১০৩ আয়াতের 'ইউলহিদূনা' (يُلْحِدُونَ) শব্দের মধ্যে রহিয়াছে নির্ভেজাল ও নির্ভুল অস্বীকৃতি। ইহাতে রহিয়াছে অবমাননাকর ভর্ৎসনা, যথা সত্য হইতে এবং সঠিক পথ হইতে বিচ্যুত হওয়া অথবা বিকৃতি ঘটানো।

সকল পারদর্শী বিশেষজ্ঞ স্বীকার করেন যে, ইলহাদ (اَلْحَاد) শব্দের অর্থ "মিথ্যা বর্ণনা" অথবা "অসত্যভাবে তুলিয়া ধরা, তাকযীব" (التَّكْذِيْبُ)। ৫৯ প্রকৃতপক্ষে 'ইউলহিদূনা' শব্দটি কুরআন শরীফে আর মাত্র দুইটি জায়গায় ব্যবহৃত হইয়াছে, যেমন ৭ : ১৮০ ও ৪১ : ৪০ আয়াতে; এবং উভয় ক্ষেত্রে ইহার স্পষ্ট অর্থ অন্যায় ও অবাঞ্ছিত আচরণ। ৬০ লক্ষণীয় যে, এ.জে. আরবেরি তাহার কুরআন অনুবাদে এই দুই ক্ষেত্রেই blaspheming কথাটি ব্যবহার করিয়াছেন leave those who blaspheme His names (যাহারা তাহার নাম বিকৃত করে) and those who blaspheme Our signs (যাহারা আমাদের নিদর্শন বিকৃত করে)। ৬১ আরও উল্লেখযোগ্য ও গুরুত্বপূর্ণ বিষয় যে, কুরআন শরীফে যুলম-অবিচার (ظُلْم) ২২: ২৫ শব্দের ব্যাখ্যাকারী শব্দ হিসাবে এই শব্দের মূল শব্দ ইলহাদ (اِلْحَاد) ব্যবহৃত হইয়াছে এবং আরবেরি ইহা যথাযথভাবেই অনুবাদ করিয়াছেন :

وَمَنْ يُرِدْ فِيهِ بِإِلْحَادِ بِظُلْمِ نُذِقْهُ مِنْ عَذَابِ أَلِيْم . "আর যে ইচ্ছা করে সীমালঙ্ঘন করিয়া ইহাতে পাপকার্যের" (২২ : ২৫)।

And whosoever purposes to violate it wrongfully ইত্যাদি। ৬২ যদিও প্রাচ্যবিদগণ ১৬ : ১০৩ আয়াতের বক্তব্যকে সাদামাটাভাবে অনুবাদ করিয়া বলিতেছেন They hint at

(তাহারা ইংগিত করে) অথচ ইহার সঠিক অনুবাদ হওয়া উচিত, 'তাহারা অন্যায়ভাবে ইঙ্গিত করে' (They wrongfully suggest) অথবা 'তাহারা অবিবেচকের মত ইশারা করে' (They unjustly hint at) অথবা অনুরূপ শব্দ ব্যবহার করা উচিত ছিল। প্রসঙ্গত আরও বলা যায় যে, They hint at -এর আরবী হয় 'ইউশিরূনা ইলা', 'ইউলহিদূনা' নহে। আয়াত ১৬: ১০৩-এর প্রকৃত অর্থ হইবেঃ "আমরা তো জানিই, তাহারা বলে, 'তাহাকে শিক্ষা দেয় এক মানুষ'। উহারা যাহার প্রতি ইহা আরোপ করে তাহার ভাষা তো আরবী নহে, কিন্তু কুরআনের ভাষা স্পষ্ট আরবী ভাষা"। অভিযোগ অস্বীকার না করা তো দূরের কথা, বরং আয়াতের পাঠে ইহাকে স্পষ্ট বলা হইতেছে যে, উহা ইলহাদ বা অন্যায় বক্রোক্তি।

(তিন) ওয়াট নিষ্পত্তিকারক অথবা বলা চলে অভিযোগ খণ্ডনকারী শব্দাবলী যাহা আয়াতের শেষাংশে রহিয়াছে তাহাকে অবজ্ঞা করিয়াছেন। অথচ উহাতে জোরের সঙ্গে বলা হইয়াছে, যে ব্যক্তির প্রতি অন্যায়ভাবে ইংগিত করা হইয়াছে তাহার ভাষা বিদেশী।

প্রকৃতপক্ষে এই স্থলে একই বক্তব্যের মধ্যে অভিযোগের প্রতি দুই প্রকার অস্বীকৃতি বুঝানো হইয়াছে। প্রথমে বলা হইয়াছে, যেহেতু সেই ব্যক্তির ভাষা বিদেশী সেই ক্ষেত্রে মহানবী -এর পক্ষে, যিনি বিদেশী ভাষা জানিতেন না, পরামর্শ অনুধাবন করা ছিল অসম্ভব। দ্বিতীয়ত, কুরআনের ভাষা যেহেতু আরবী সেহেতু বিদেশী ব্যক্তি উহা মহানবীকে শুনাইতে সক্ষম হইতে পারে না।

এমতাবস্থায় 'তথ্য' বা 'উপাত্ত' যাহাই বলা হউক না কেন অথবা ওহীর পাঠ রচনা ও শব্দ চয়ন, কোন কিছুতেই একজন বিদেশীর পক্ষে মহানবী-এর প্রশিক্ষক হিসাবে কাজ করা সম্ভব ছিল না।

অবিশ্বাসীগণের কটাক্ষপাতকে খণ্ডন ও প্রত্যাখ্যান কুরআন শরীফের পরবর্তী দুই আয়াতেও আছে (১৬ : ১০৪-১০৫)। আয়াত ১০৪, সেখানেও আল্লাহ্ নিদর্শনকে অস্বীকার করার কুফল সম্পর্কে অবিশ্বাসীগণকে সতর্ক ও সাবধান করা হইয়াছে। ১০৫ আয়াতে সমুচিত জবাব দিয়া বলা হইয়াছে :

إِنَّمَا يَفْتَرِي الْكَذِبَ الَّذِينَ يُؤْمِنُونَ بِأَيْتِ اللَّهِ وَأُولَئِكَ هُمُ الْكَذِبُونَ . "যাহারা আল্লাহ্ নিদর্শনে বিশ্বাস করে না তাহারা তো কেবল মিথ্যা উদ্ভাবন করে এবং তাহারাই মিথ্যাবাদী" (১৬ঃ ১০৫)।

এই প্রকারে আমরা দেখিতে পাইতেছি, আয়াত ১৬: ১০-এর পূর্ববর্তী ও পরবর্তী আয়াতসমূহে মিলিতভাবে একটি পরিপূর্ণ পৃথক স্পষ্ট বক্তব্য নির্মিত হইয়াছে যাহার উদ্দেশ্য অবিশ্বাসীগণের বানোয়াট অভিযোগ ইতিবাচক, জোরালো ও নিঃসংশয়ভাবে খণ্ডন ও প্রত্যাখ্যান

করা। এই প্রসঙ্গে আরও লক্ষণীয় যে, এই আয়াতে এইরূপ কিছুই নাই যাহা হইতে অবিশ্বাসীগণ এমন ধারণা দিতে সচেষ্ট হইয়াছে যেমনটি ওয়াট আমাদিগকে বিশ্বাস করাইতে চাহিতেছেন অর্থ ও ব্যাখ্যা হইতে সম্পূর্ণ ভিন্ন তথ্য ও সংবাদ গ্রহণ বিষয়ে। অন্যদিকে প্রত্যাখ্যানের প্রকৃতি ও শব্দ ব্যবহার, বিশেষ করিয়া যে মানুষটিকে আনা হইয়াছে তাহার ভাষার প্রতি গুরুত্ব আরোপ ইহাই স্পষ্ট করিয়া তোলে যে, ওহীর পাঠ নির্মাণে মহানবী-এর নিজের অক্ষমতার প্রতি নির্দেশ করাই ছিল অভিযোগের লক্ষ্য।

২৫:৪-৫ আয়াতে অবিশ্বাসীগণের অভিযোগের এই প্রকৃতি অনেক বেশী সুনির্দিষ্টভাবে বর্ণিত হইয়াছে। ওয়াট এই আয়াতই উল্লেখ করিয়াছেন। এই আয়াত ১৬: ১০৩ আয়াতের সঙ্গে বিবেচনা করা প্রয়োজন। ২৫:৪-৫ আয়াত বলে, অবিশ্বাসীগণের অভিযোগ ছিল যে, মহানবী এইরূপ ওহী লাভ করিয়াছিলেন যাহা তাহাদের নিকট “প্রাচীন কালের রূপকথা”, যাহা মহানবী-এর জন্য লিখিত হইয়াছিল এবং সকাল-সন্ধ্যা পাঠ করিয়া শোনানো হইত। লক্ষণীয় যে, ওয়াট অনুবাদ করিতে গিয়া আয়াত ৪-এর শেষ অংশ বাদ দিয়া গিয়াছেন, যেখানে বলা হইয়াছে:

فَقَدْ جَاءُو ظُلْمًا وَزُورًا

"এইরূপে উহারা অবশ্যই জুলুম ও মিথ্যায় উপনীত হইয়াছে" (২৫:৪)।

বাদ দেওয়ার কারণ এই যে, অবিশ্বাসীগণ কর্তৃক আনীত অভিযোগ খণ্ডন করা হয় নাই বলিয়া তাহাদিগের এই ধারণাকে যাহাতে সহজেই উপস্থাপন করা যায়।

আয়াত ২৫:৪-৫ বা এই সূরা সর্বজন স্বীকৃত যে, ১৬ সূরার আগে অবতীর্ণ সূরা। ৬৩ এই আর একটি কারণ যে কারণে ১৬: ১০৩ আয়াতটির অভিযোগের সহিত ২৫:৪-৫ আয়াতের অভিযোগ একত্রে বিবেচনা করিতে হইবে। কারণ ইহার ফলে স্বাভাবিকভাবেই অবিশ্বাসীগণের পক্ষে এই কথা বলা অসম্ভব হইয়া পড়িবে যে, মহানবী-এর জন্য অন্য কেহ ওহী লিখিয়া দিত এবং সকাল-সন্ধ্যা তাঁহাকে পাঠ করিয়া শুনাইত এবং তাহার পর একথা বলা যে, তিনি একজনের নিকট হইতে কেবল তথ্য ও সংবাদ লাভ করিতেন। ইহাই স্বাভাবিক যে, তাহাদের অভিযোগ যে, মহানবী-এর নিজের পক্ষে ওহী রচনা করা সম্ভব নহে তাহাও তথ্য ও সংবাদের উল্লেখ যেমন রহিয়াছে তেমনি ওহীর পাঠ ও ভাষারও উল্লেখ আছে। কিন্তু কেহ যদি ধরিয়া লয় যে, কেবল তথ্য ও সংবাদের উল্লেখ আছে অথবা কেহ যদি স্বীকারও করে যে, স্বাভাবিক সত্য হইতেছে অভিযোগে উভয়ের উল্লেখ রহিয়াছে সেই ক্ষেত্রে ২৫:৪ আয়াত, যে আয়াত ওয়াট পাঠকের নিকট হইতে অগোচরে রাখিয়াছেন, তাহাতে অবিশ্বাসীগণের অভিযোগকে বলা হইয়াছে অন্যায় বা জুলম (ظُلْمًا) এবং সরাসরি মিথ্যার (زُورًا) বহিপ্রকাশ। ইহা অপেক্ষা অধিকতর ও জোরালো অস্বীকৃতি আর কিছুই হইতে পারে না।

ওয়াট যথার্থই বলিয়াছেন যে, মুসলমান তফসীরকারগণ, অবিশ্বাসিগণ যে ব্যক্তি বা ব্যক্তিগণ সম্পর্কে ইঙ্গিত করিয়াছেন তাহাদের পরিচয় সম্পর্কে একমত পোষণ করেন না, বরং একাধিক ব্যক্তির নাম উল্লেখ করিয়াছেন, মক্কায় বসবাসকারী তাহারা অধিকাংশই খৃস্টান দাস। ৬৪ কিন্তু তিনি কাহিনী সমাপ্তও করেন নাই, আবার তাহার ধারণা হইতে উদ্ভুত বিষয় লইয়া আলোচনার অগ্রগতিও সাধন করেন নাই। স্বাভাবিকভাবেই তাহার ধারণা লইয়া কিছু প্রশ্ন উঠিতে পারে। কিন্তু তিনি এই বিষয় লইয়া অগ্রসর হন নাই। প্রশ্নগুলি এইরূপ হইতে পারে:

(ক) মুহাম্মাদ যখন রিসালাতের দাবি করিলেন এবং প্রকাশ্যে তিনি মক্কাবাসীকে তাঁহাকে বিশ্বাস করিতে বলিলেন ও বেশ কিছু দিন অতিবাহিত হইল, তখন কি কারণে কোন ইয়াহুদী ও খৃস্টান বিজ্ঞ ব্যক্তি ইয়াহুদী ও খৃষ্ট ধর্ম সম্পর্কে তাঁহাকে তথ্য সরবরাহ করিয়া তাঁহার দাবিকে প্রতিষ্ঠিত করিতে সাহায্য করিবার নিমিত্ত আগাইয়া আসিয়াছিলেন?

(খ) কুরায়শ নেতৃবৃন্দ তাহাদের ক্ষমতা, প্রভাব-প্রতিপত্তি ও তাহাদের জ্ঞান ও মক্কার ন্যায় খুব বড় নয় এমন একটি নগরীর নিয়ন্ত্রণ করার ক্ষমতাসহ, বিশেষ করিয়া যখন তাহারা মহানবী -এর চলাফেরার সর্বক্ষণ নজরদারি করিতে সক্ষম তখন কেন তাহারা মহানবীর তথাকথিত 'সংবাদদাতা' সম্পর্কে তথ্যকে কাজে লাগাইয়া মহানবীর 'বানোয়াট' রিসালাতকে প্রকাশ করিয়া দেয় নাই?

(গ) তাহা ব্যতীত যদি সত্যই 'সংবাদদাতা' বা 'সংবাদদাতাগণ' খৃস্টধর্ম অথবা ইয়াহুদী ধর্ম হইতে আসিয়া ইসলাম ধর্ম গ্রহণ করিবার পর যখন জানিতে পারিয়াছিল যে, মুহাম্মাদ ওহী হিসাবে যে বাণী ও মতবাদকে আল্লাহ্ ওহী হিসাবে প্রচার করিতেছিলেন উহা রচনা করিবার জন্য তাহাদের সাহায্য ও সহযোগিতা প্রয়োজন, তখন তাঁহারা কেন তাঁহার উপর বিশ্বাস অব্যাহত রাখিয়াছিল?

অধিকতর উল্লেখযোগ্য বিষয় যে, অত্যন্ত যুক্তিসঙ্গত এইসব অত্যন্ত প্রাসঙ্গিক প্রশ্ন ওয়াট উত্থাপন তো করেনই নাই, অধিকন্তু এই সকল প্রশ্নের জবাবও অন্বেষণ করেন নাই। তিনি যদি কোন একটি কাজও করিতেন তাহা হইলে দেখিতে পাইতেন, মুসলমান তাফসীরকারগণ স্পষ্ট করিয়া প্রদর্শন করিয়াছেন যে, কুরায়শ নেতৃবৃন্দ যখন দেখিতে পাইল যে, কয়েকজন খৃস্টান ইসলাম ধর্ম গ্রহণ করিয়াছে তখন আলোচ্য এইসব প্রশ্নসহ অভিযোগ উত্থাপন করিয়াছিল। মক্কার নেতৃবৃন্দ অভিযোগ উত্থাপন করিয়াই ক্ষান্ত হয় নাই, তাহারা তাহাদিগের উপর এই মর্মে চরম নির্যাতন চালাইয়াছিল যে, তাহারা যেন বলে যে, তিনি তাহাদের নিকট হইতে সাহায্য লাভ করিয়াছেন। এই প্রসঙ্গে আরও উল্লেখ আছে, অনুরূপভাবে নির্যাতিত জাবর নামক এক মুসলিম যখন চরমভাবে নির্যাতিত হইয়াছিলেন তখন তিনি যে উত্তর প্রদান করিয়াছিলেন তাহা প্রণিধানযোগ্য। তিনি বলিয়াছিলেন, 'আমি মুহাম্মাদকে শিক্ষা দেই নাই, বরং তিনিই আমাকে শিক্ষা দিয়াছেন এবং পথপ্রদর্শন করিয়াছেন'। ৬৫

📘 সীরাত বিশ্বকোষ > 📄 পাঁচ: বাইবেলীয় তথ্যের ক্রমান্বয়ে যথাযথ হইবার তথাকথিত অগ্রগতি

📄 পাঁচ: বাইবেলীয় তথ্যের ক্রমান্বয়ে যথাযথ হইবার তথাকথিত অগ্রগতি


সত্যই কোন প্রকার যুক্তিতে ইহা অনুধাবন করা যায় না যে, মুহাম্মাদ -এর ন্যায় একজন অনন্যসাধারণ বুদ্ধিসম্পন্ন ব্যক্তি সাধারণ লোকের জনশ্রুতির গৌণ সূত্র হইতে ইয়াহুদী ও খৃস্ট ধর্মগ্রন্থের অসম্পূর্ণ ও ভাসা ভাসা জ্ঞান অর্জন করিবেন এবং প্রাচ্যবিদগণের মতে সেই ভাসা ভাসা জ্ঞানের ভিত্তিতে একটি মতবাদ প্রচার করিবেন এবং এমন সব কাহিনী বলিতে গিয়া দাবি করিবেন যে, উহা প্রত্যাদেশ। ওয়াট তথাপি তাহার পূর্ববর্তীদের অনুসরণে কেবল অনুরূপ অবাস্তব প্রস্তাব উত্থাপন করিয়াই ক্ষান্ত হন নাই, বরং আরও বলিতে চাহিয়াছেন যে, মহানবী একজন সরল বোকা কিসিমের মানুষ ছিলেন এবং চিন্তা-ভাবনা না করিয়াhei তাড়াহুড়া করিয়া প্রথমেই ওল্ড টেস্টামেন্টের একটি কাহিনী যতখানি জানিতে পারিয়াছিলেন তাহাই প্রত্যাদেশ হিসাবে প্রকাশ করিয়াছিলেন এবং পরবর্তী কালে যখন তিনি সেই বিষয়ে অধিকতর জ্ঞান লাভ করেন তখন উহা সংশোধন বা পরিবর্তন করেন। এইভাবে তিনি ইবরাহীম (আ) ও লূত (আ) সম্পর্কিত কয়েকটি আয়াত উল্লেখ করিয়াছেন এবং উহা নাকি তাহার মতে, 'ওল্ড টেস্টামেন্টের কাহিনী' যাহা পরিচিতির মাধ্যমে ক্রমান্বয়ে যথাযথ হইয়া উঠিয়াছে। ওয়াট এইভাবে সমাপ্তি টানিয়াছেন যে, "ওল্ড টেস্টামেন্টের কাহিনী সম্পর্কিত মুহাম্মাদ -এর জ্ঞান বৃদ্ধি পাইতেছিল এবং তিনি সেই কাহিনী সম্পর্কে অবহিত একজন বা একাধিক জনের নিকট হইতে জানিতে পারিতেছিলেন”। ৬৬
ওয়াট যে সকল আয়াত উদ্ধৃত করিয়াছেন সেইগুলি হইতেছে ৩৭: ১৩৫ C; ২৬:১৭১ E (D); ২৭:৫৮ E (D); ৭:৮১ DE; ১৫:৬০ D, ১১:৮৩ E + এবং ২৯: ৩২ E + ।
লক্ষণীয় যে, ওয়াট আয়াতের যে সংখ্যা দিয়াছেন ফ্লগেল যে সংখ্যা দিয়াছেন তাহাই, তবে বর্তমানে প্রচলিত ও প্রমিত যে নির্দেশ সংখ্যা রহিয়াছে তাহা হইতে সামান্য ভিন্ন। কিন্তু আয়াতের অর্থ দেখিয়া তাহা শনাক্ত করিতে অসুবিধা হয় না। তিনি আয়াতগুলির মূল আরবী দেন নাই, এমনকি অনুবাদও দেন নাই। তদুপরি একটি সূরার একটি আয়াত উল্লেখ করিতে গিয়া নিশ্চয়ই তাহার সম্মুখে সেই বিষয় সংক্রান্ত অন্যান্য আয়াতও ছিল। তিনি প্রতিটি আয়াতের পার্শ্বে যে হরফ বসাইয়াছেন উহা দ্বারা আর, বেল আয়াতগুলির তারিখ নির্দেশ করিয়াছেন, C বসাইয়াছেন মক্কা বুঝাইতে, মদীনার প্রথম দিকে বুঝাইতে E বসাইয়াছেন এবং E + বসাইয়াছেন মদীনা বুঝাইতে। ৬৭
সর্বপ্রথম লক্ষণীয় যে, 'যথাযথ হইয়া উঠা' বা ক্রমান্বয়ে সঠিক হইয়া উঠা সম্পর্কিত তাহার যে ধারণা উহার মূল ভিত্তি হইতেছে কয়েকটি আয়াতের উপরিউক্ত তারিখ। কিন্তু এই যে তারিখ তিনি দিয়াছেন উহা চূড়ান্ত নহে, 'অস্থায়ী'। ৬৮ ওয়াট নিজেও সেই তারিখ সঠিক কিনা সে বিষয়ে সন্দেহ পোষণ করেন। ৬৯ তদুপরি তিনি তাহার নিজের সর্বশেষ রচনায় বেল কর্তৃক প্রদত্ত তারিখকে বাতিল করিয়াছেন এবং তাহার পরিবর্তে আর, ব্লাশেয়ার প্রদত্ত তারিখ গ্রহণ করিয়াছেন। তিনি আবার মোটামুটি নোলডেকে-কে অনুসরণ করিয়াছেন। ৭০ তাহা ব্যতীত তিনি দুইটি তারিখ বুঝাইতে যে দুইটি অক্ষর যেভাবে আয়াতের পার্শ্বে ব্যবহার করিয়াছেন তাহা রীতিমত বিভ্রান্তিকর। আরও লক্ষণীয়, যে সকল আয়াত তিনি উদ্ধৃত করিয়াছেন সেইগুলি সবই মক্কায় অবতীর্ণ বলিয়া অবিসম্বাদিত মর্যাদাসম্পন্ন সকল মুসলমান বিশেষজ্ঞ মনে করেন। যাহা হউক, লেখক স্বয়ং যেখানে তারিখ সম্পর্কে সন্দেহ পোষণ করেন সেই সন্দেজনক তারিখের উপর এবং লেখক নিজে যখন তাহার নিজের সর্বশেষ রচনায় উহা বাতিল করিয়াছেন—তাহার উপর ভিত্তি করিয়া ক্রমান্বয়ে সঠিক হইয়া উঠা সম্পর্কিত ধারণা রীতিমত বিভ্রান্তিকর ও বিপদজনক।
তারিখ নির্ধারণের প্রশ্ন উত্থাপন না করিলেও আয়াতগুলি নিজেই 'ক্রমান্বয়ে সঠিক হইয়া উঠা' সম্পর্কিত তত্ত্বকে সমর্থন করে না। প্রথমেই যেভাবে ওয়াট দেখাইতে চাহিয়াছেন যে, উল্লিখিত দুইটি আয়াতে (৩৭ : ১৩৫ এবং ২৬: ১৭১) দূতের 'দলের' যে সদস্য রক্ষা পায় নাই সে 'এক বৃদ্ধা', অন্যান্য সকল আয়াতে সে তাঁহার স্ত্রী। ওয়াটের মন্তব্য মোটেই সঠিক নহে এবং আলোচ্য দুই আয়াত সম্পর্কে ভুল ব্যাখ্যা। দুইটি স্থানেই বাক্য আরম্ভ হইয়াছে ইল্লা (=ব্যতীত) দ্বারা যাহার মাধ্যমে বুঝানো হইয়াছে যে, ইহা আয়াতের পূর্বে যাহা তাহার ক্রমানুবর্তন মাত্র।
লক্ষণীয় যে, প্রতিটি ক্ষেত্রে আয়াতের পূর্বে যে পরিভাষা ব্যবহৃত হইয়াছে উহা হইতেছে 'আহ্ল'। তাহার ফলে উভয় ক্ষেত্রেই অর্থ দাঁড়াইতেছে "এক বৃদ্ধা ব্যতীত" ভূতের সকল 'আহ্ল' রক্ষা পাইয়াছিল। 'আহ্ল'-এর প্রধান অর্থ "পরিবার”, এমনকি "স্ত্রী"; ইহার গৌণ অথবা পরোক্ষভাবে বর্ণিত অর্থ হইতে পারে "সম্প্রদায়" অথবা "অধিবাসী”। এই গৌণ অর্থ এই স্থলে স্পষ্টতই প্রযোজ্য নহে। কারণ এই স্থলে যাহা স্বাভাবিক তাহা হইতেছে "ভূতের সম্প্রদায়ের সকলে রক্ষা পাইবে কেবল এক বৃদ্ধা ব্যতীত” তাহা নহে। অপরপক্ষে ইহাও বলা যায় না যে, দূতের সম্প্রদায়ের সকল ব্যক্তি ধ্বংসপ্রাপ্ত হইবে ও শাস্তি লাভ করিবে, সেখানে মাত্র এক বৃদ্ধাই ছিল। প্রতিটি স্থানে পরপর দুইটি আয়াতের স্বাভাবিক অর্থ হইতেছে, ভূতের পরিবারের সকল সদস্য রক্ষা পাইয়াছিল একমাত্র "বৃদ্ধা নারী” ব্যতীত। এইভাবে উভয় ক্ষেত্রে দূতের সহিত মহিলার সম্পর্ক পরোক্ষভাবে প্রকাশ করা হইয়াছে। এই ক্ষেত্রে "বৃদ্ধা মহিলা" কথাটি ব্যবহৃত হইয়াছে, কারণ সে অবিশ্বাসী থাকার কারণে তাহাকে গ্রহণ করা হয় নাই, দূতের সহিত তাহার কি সম্পর্ক ছিল তাহা না জানার কারণে নহে। অবশ্য অন্য সকল ক্ষেত্রে তাহাদের সম্পর্ক সরাসরি ও স্পষ্টভাবে প্রকাশ করা হইয়াছে। এমতাবস্থায় প্রথম দুইটি আয়াতে যাহা বলা হইয়াছে তাহা কোন ভুল তথ্য নহে এবং অন্যান্য পাঁচটি আয়াতে 'ক্রমান্বয়ে সঠিক হইয়া উঠা' নহে।
অনুরূপভাবে ওয়াটের দ্বিতীয় সিদ্ধান্ত অবিবেচনাপ্রসূত কল্পনা। উপরিউক্ত প্রথম চারটি আয়াতে "আবরাহাম ও ভূতের মধ্যে কোন সম্পর্ক ছিল" বলিয়া কোন অবহিতি নাই। অথচ অপর তিন আয়াতে আবরাহামের সহিত সম্পর্ক স্পষ্টরূপে বর্ণিত হইয়াছে। ৭১
এখন, ১৫ : ৬০, ১১ : ৮৩ এবং ২৯ : ৩২ আয়াতগুলিতে দেখা যায় যে, "আবরাহাম ও লুতের সম্পর্কের" মধ্যে ওয়াট কেবল সমসাময়িকতার ইশারা দেখেন। ইহা আসলে ঘটনাক্রমে বর্ণিত যেখানে দূতের সম্প্রদায়ের উপর পতিত আল্লাহ্র অভিসম্পাত ও শাস্তির বিবরণ দেওয়া হইয়াছে। আয়াতে বলা হইয়াছে যে, আল্লাহ কয়েকজন ফেরেশতাকে পাঠাইয়াছিলেন। তাহারা লূতের সম্প্রদায়ের নিকট যাইতেছিলেন, পথিমধ্যে ইবরাহীম (আ)-এর সঙ্গে দেখা করেন এবং তাঁহাকে শুভ সংবাদ দেন যে, তাঁহার আর একটি পুত্র সন্তান হইবে। তাঁহারা আরও জানাইয়াছিলেন যে, তাঁহারা লূতের সম্প্রদায়কে শাস্তি দিবার জন্যই যাইতেছেন। তখন তিনি লূতের জন্য সুপারিশ করেন। স্বাভাবিকভাবেই এই ঘটনাপ্রসূত বিবরণ অন্যান্য আয়াতে আসে নাই। কারণ সেই স্থলের বিষয়বস্তু ও প্রেক্ষিত ভিন্ন। প্রকৃতপক্ষে প্রথম চারটি আয়াতে (৩৭: ১৩৫; ২৬:১৭১; ২৭:৫৮ এবং ৭:৮১) উল্লিখিত নবীগণের উপর আল্লাহ্র রহমতের গুরুত্ব বর্ণনা করা হইয়াছে এবং কি প্রকারে তাঁহারা আপন সম্প্রদায়ের শত্রুতা ও পরীক্ষায় আল্লাহ্র সহায়তা লাভ করিয়া জয়যুক্ত হইয়াছেন তাহা বলা হইয়াছে। অপরপক্ষে অন্য তিন আয়াতে (১৫:৬০; ১১:৮৩ এবং ২৯: ৩২) নবীগণের বিরোধিগণের আচরণ এবং তাহাদের প্রতি যে বাণী প্রেরণ করা হয় উহা প্রত্যাখ্যান ও তাহাদের বিরোধিতার ফলাফল কি তাহার উপর গুরুত্ব আরোপ করা হইয়াছে।
চার আয়াতের প্রথম গুচ্ছ প্রধানত মহানবীকে উদ্দেশ্য করিয়া এবং তাঁহার অনুসারীগণকে সান্ত্বনা ও সাহস দেওয়ার জন্য, অপর তিন আয়াত প্রধানত অবিশ্বাসিগণকে উদ্দেশ্য করিয়া বলা হইয়াছিল। এখানে অবিশ্বাসিগণকে তাহাদের অবিশ্বাস ও বিরোধিতার ভয়াবহ পরিণতি সম্পর্কে সতর্ক করা হইয়াছে। প্রথম চারটি আয়াতে সত্য প্রত্যাখ্যানকারিগণের উপর যে শাস্তি আপতিত হইবে তাহার বিস্তারিত বিবরণ দেওয়া হয় নাই, এমনকি দেওয়া হয় নাই লূত সম্প্রদায়ের উপর শাস্তি আরোপকারী ফেরেশতাগণের বিবরণও। অপরপক্ষে অপর তিন আয়াতে সেই বিস্তারিত বিবরণ দেওয়া হইয়াছে। তাহার মধ্যে ফেরেশতার আগমন এবং হযরত ইবরাহীম (আ)-এর সহিত তাহাদের কথোপকথন যাহাতে তাহার সহিত লূত (আ)-এর তথাকথিত সম্পর্কের উল্লেখ দেখা যায়। এইরূপে প্রথম চার আয়াতে কোন কিছুর ঘাটতি নাই এবং অপর তিন আয়াতে তথ্য সঠিক হইয়া ওঠা ঠিক নহে।
প্রসঙ্গক্রমে বলা আবশ্যক যে, পবিত্র কুরআনে ইতিহাস বর্ণনার জন্য অথবা কোন গল্প বলার জন্য ঐতিহাসিক ঘটনা ও পূর্ববর্তী নবীগণের কাহিনী উল্লেখ করা হয় নাই; বরং শিক্ষা গ্রহণের নিমিত্ত অথবা উপদেশ হিসাবে উল্লেখ করা হইয়াছে। এই কারণে কোন একজন নবীর জীবন কাহিনীর একই বিষয় অথবা বিভিন্ন বিষয় বিভিন্ন স্থানে বর্ণনা করা হইয়াছে। সাধারণত যেমন কোন ইতিহাস গ্রন্থে বা কোন গল্প গ্রন্থে বর্ণনা করা হয় তেমনভাবে কোথাও কোন বিশেষ ঐতিহাসিক ঘটনা অথবা কোন নবীর পরিপূর্ণ জীবন কাহিনী একাধারে বর্ণনা করা হয় নাই।
কাহিনীর বাহ্যিক পুনরাবৃত্তি বা অসম্পূর্ণতাকে প্রাচ্যবিশারদগণ তাহাদের 'সঠিকতার দিকে অগ্রগতি' তত্ত্বকে প্রতিষ্ঠিত করার জন্য ধরিয়া লইয়াছেন। কিন্তু যদি একটু গভীরভাবে এই সকল অনুচ্ছেদ বা সূরা অবলোকন করা যায় তাহা হইলে স্পষ্টই পরিদৃষ্ট হইবে যে, তাহাদের তত্ত্ব আপাত দৃষ্টিতে সত্য মনে হইলেও তাহা আদৌ সত্য নহে। এই প্রসঙ্গে আরও বলা যায় যে, কোন এক স্থানে বিষয় ও প্রেক্ষিত বিচারে নিছক বিস্তারিত বর্ণনা না করা এবং অপর ক্ষেত্রে বিষয় ও প্রেক্ষিতের কারণে বিস্তারিত বর্ণনা করাকে যুক্তি হিসাবে দাঁড় করানো চলে না যে, প্রথমটি সঠিক নহে এবং দ্বিতীয়টি 'সঠিকতার দিকে অগ্রগতি'।
পুনরায়, ধীরে ধীরে সত্য উদ্ঘাটন ও বিস্তারিত বর্ণনা একথা প্রমাণ করে না যে, কোন এক বা একাধিক ব্যক্তি নবীর তথ্য সরবরাহকারীরূপে কাজ কারিয়াছিল। পবিত্র কুরআনে ইসলামের যাবতীয় শিক্ষণীয় বিষয়, ইসলামের আচার-অনুষ্ঠান ও আদেশ-নিষেধ ধীরে ধীরে ক্রমান্বয়ে দীর্ঘ তেইশ বৎসর ধরিয়া বর্ণনা করা হইয়াছে। এই বিষয়কে যদি কেহ কোন এক বা একাধিক শিক্ষকের নিকট হইতে নবীর ক্রমান্বয়ে জ্ঞান লাভের প্রমাণ বলিয়া দাবি করে তাহা হইলে তাহাকে কল্পনা বা অনুমানের চূড়ান্ত ব্যতীত আর কিছুই বলা যায় না।
অবশ্য এই সকল কারণের পরও আরও কিছু কথা আছে। সত্যই যদি গভীরভাবে সূরাগুলি পাঠ করা যায় তাহা হইলে দেখা যাইবে যে, উল্লিখিত চারটি সূরায় তথ্যের দিক হইতে কোন ঘাটতি বা অসম্পূর্ণতা নাই। 'আদ ও ছামূদ জাতির নিকট নবীগণের (হৃদ ও সালিহ) কথা বাদ দিলেও বলিতে হয় যে, তাঁহাদের কথা পবিত্র কুরআনে আলোচিত হইয়াছে, কিন্তু বাইবেলে উল্লেখ নাই। এমনকি এই সকল সূরায় ইবরাহীম (আ)-এর ক্ষেত্রে যেরূপ বিস্তারিত বিবরণ দেওয়া আছে সেইরূপ কিছুই বাইবেলের ওল্ড টেস্টামেন্টে নাই। এইরূপে এই সকল সূরায় হযরত ইবরাহীম (আ)-কে একত্ববাদের প্রবক্তা হিসাবে চিত্রিত করা হইয়াছে এবং এই আদর্শের জন্য তিনি যে কঠোর সংগ্রাম করিয়াছেন, তাঁহার পিতা ও স্বজাতি যে ভ্রান্ত ধারণা পোষণ করিত সেই বিষয়ে তাহাদের সহিত যে বিতর্ক করিয়াছেন তাহার বিস্তারিত তথ্যাদি বর্ণনা করা হইয়াছে। তাঁহার মূর্তি ভাঙ্গা, ভ্রান্ত বিশ্বাসে অস্বীকৃতি, অগ্নি পরীক্ষা, হিজায গমন ইত্যাদির কথা বর্ণনা করা হইয়াছে। তাঁহার জীবনের এই সকল দিকের কোন বিষয় ওল্ড টেস্টামেন্টে (বাইবেলে) উল্লেখ নাই। অপরপক্ষে আলোচ্য তিনটি আয়াতে যে স্থলে 'সঠিকতার দিকে অগ্রগতির' অনুমান করা হইয়াছে তাহাতে ইবরাহীম (আ)-এর নিকট ফেরেশতাদের আগমন ও তাঁহার কথোপকথনকে ইহার কারণ হিসাবে ধরা হইয়াছে। অথচ লক্ষ্য করার বিষয় এই যে, পবিত্র কুরআনে এই ঘটনার যে বিবরণ রহিয়াছে তাহা বাইবেলে উল্লিখিত বিররণ হইতে ভিন্ন। যেমন আলোচ্য তিন আয়াতে বলা হইয়াছে যে, ইবরাহীম (আ) 'মেহমানদের' (মানবরূপী ফেরেশতাগণ) সম্পর্কে কৌতূহলী হইয়া উঠিয়াছিলেন যখন তাহাদের জন্য প্রস্তুত খাদ্য তাহারা গ্রহণ করিতে অস্বীকার করিলেন, যাহার ফলে তাহারা তাহাদের পরিচয় প্রকাশ করিতে বাধ্য হইয়াছিলেন।
অতঃপর তাহারা তাঁহার সহিত আরও কথাবার্তা বলেন এবং যাহার মধ্যে তাঁহার আরও একটি পুত্র সন্তান জন্মগ্রহণ করিবে এই সুসংবাদও ছিল এবং তাহারা যে লূত (আ)-এর জাতিকে শাস্তি দিতে আসিয়াছেন সেই কথাও ছিল।
অপরপক্ষে ওল্ড টেস্টামেন্টে আছে, যখনই ইবরাহীম (আ) 'তিনজন মানুষকে' দেখিলেন তিনি দৌড়াইয়া গেলেন 'তাঁবুর দরজা হইতে তাহাদিগের সহিত মিলিত হইবার জন্য', তাহদিগকে দাওয়াত করিলেন আহার করিবার জন্য এবং তাহারা দাওয়াত গ্রহণ করিবার পর আহার প্রস্তুত করিলেন, 'এবং তাহারা খাদ্য গ্রহণ করিলেন'। ৭২ অনুরূপভাবে লূত (আ) ৭৩ তাহাদের জন্য যে খাদ্য তৈয়ারি করিয়াছিলেন তাহারা সেই 'খাদ্য গ্রহণ করিলেন'। এই প্রকারে দেখা যায় কোন ক্ষেত্রেই তথ্য কম ছিল না। প্রথম চার আয়াত লইয়া তাহারা যে বক্তব্য প্রতিষ্ঠা করিতে চাহিয়াছেন পরবর্তী তিন আয়াতে তথ্য পূর্ণতাপ্রাপ্ত হইয়াছিল তাহাও সঠিক নহে। কারণ উভয় ক্ষেত্রে কুরআনের তথ্যে ওল্ড টেস্টামেন্টের বক্তব্য অপেক্ষা অতিরিক্ত তথ্য রহিয়াছে এবং বস্তুগতভাবে তাহা ভিন্ন। তাহা হইতে বোঝা যায়, মুহাম্মাদ-এর সূত্র পুরাতন বাইবেলও নহে এবং এই বিষয়ে অভিজ্ঞ কোন মানব সন্তানও নহে। অতএব যুক্তিযুক্তভাবে 'সঠিকতার দিকে অগ্রগতি'র তত্ত্ব কোন প্রকারেই গ্রহণযোগ্য হইতে পারে না।
প্রকৃতপক্ষে কোন একজন 'তথ্য সরবরাহকারী' অথবা একাধিক 'তথ্য সরবরাহকারী' যেই হউক না কেন তাহার নিকট হইতে মহানবী তথ্য পাইয়াছেন এইরূপ কথা পবিত্র কুরআন সরাসরি অস্বীকার তো করিয়াছেই, অধিকন্তু পবিত্র কুরআন চ্যালেঞ্জ দিয়া দাবি করিয়াছে যে, মহানবী ও তাঁহার স্বজাতির কেহই বর্তমানে প্রত্যাদেশের মাধ্যমে যাহা জানান হইয়াছে তাহা পূর্বে জানিত না। ৭৪ এমনিভাবে ১১:৪৯ আয়াতে বলা হইয়াছে:
تِلْكَ مِنْ أَنْبَاءِ الْغَيْبِ نُوحِيهَا إِلَيْكَ مَا كُنْتَ تَعْلَمُهَا أَنْتَ وَلَا قَوْمُكَ مِنْ قَبْلِ هذا .
"এই সমস্ত অদৃশ্যলোকের সংবাদ আমি তোমাকে ওহী দ্বারা অবহিত করিতেছি, যাহা ইহার পূর্বে তুমি জানিতে না এবং তোমার সম্প্রদায়ও জানিত না" (১১:৪৯)। ৭৪
উপরিউক্ত আয়াত এবং সেই সঙ্গে আরও অন্যান্য আয়াত পবিত্র কুরআনের শক্তিশালী সাক্ষ্য যেখানে বলা হইয়াছে যে, মহানবীকে ওহী প্রসূত যে জ্ঞান দান করা হইয়াছে উহা পূর্বে কখনও তাঁহার জানা ছিল না। তাঁহার 'অক্ষরজ্ঞানহীনতার' ৭৫ সমর্থনে তাই কুরআনের এই সাক্ষ্য। অথচ এই উদাহরণের ক্ষেত্রেও ওয়াট তাহার ধারণাকে প্রতিষ্ঠিত করার জন্য আয়াতের ভুল ব্যাখ্যা প্রদান করিয়াছেন। ধারণার উপর ভিত্তি করিয়া তিনি দেখাইতে অগ্রসর হইয়াছেন যে, পবিত্র কুরআনেও আছে যে, মহানবী কাহারও নিকট হইতে তথ্য গ্রহণ করিতেন। ওয়াট বলেন যে, এই ১১:৪৯ আয়াত নাকি তাহাদের জন্য 'বিব্রতকর, যাহারা মুহাম্মাদের আন্তরিকতাকে প্রতিষ্ঠিত' করিতে চাহেন এবং তাহার পরে তিনি এই তথাকথিত বিব্রতকর অবস্থাকে ব্যাখ্যা করিতে উদ্যোগ নেন। সেজন্য তিনি ওহী সম্পর্কিত তাহার অদ্ভুত ধারণার সাহায্য গ্রহণ করেন। তিনি বলেন, নবীগণের কাহিনীর ঘটনা ও তথ্য মুহাম্মাদ পাইয়াছিলেন মানবিক সূত্র হইতে, কিন্তু 'শিক্ষা' ও সেই কাহিনীর আন্তর্নিহিত উদ্দেশ্য মুহাম্মাদের নিকট আসিয়াছিল প্রত্যাদেশের দ্বারা'। ৭৬ কিন্তু এই বক্তব্যের পরই ওয়াট মনে হয় তাহার সাধারণ তত্ত্বের কথা স্মরণ করিয়া বলেন যে, এমনকি চিন্তা ও ভাবনার ক্ষেত্রে মহানবী ইয়াহুদী-খৃস্টান সূত্র হইতে উহা ধার করিয়াছেন। তখন দ্রুত যোগ করেন, যেহেতু 'ইয়াহুদী-খৃস্টান ধারণা হিজাযে অনেকাংশে পরিচিত ছিল', যে ধারণা পবিত্র কুরআনে 'ধরিয়া লওয়া সত্ত্বেও বিশেষভাবে অপরকে জানানোর প্রয়োজন ছিল না', কিন্তু 'সঠিকভাবে' যাহা কিনা এমনভাবে সন্নিবেশিত 'করার প্রয়োজন ছিল যাহাতে তদানীন্তন পরিবেশে খাপ খায় যা কেবল রাসূলের মানসিক অন্তজ্ঞান দ্বারাই সম্ভব। ৭৭
এখন এই কথা পরিষ্কারভাবে বলা যায় যে, মহানবী কোন মানুষের নিকট হইতে তথ্য লাভ করিয়াছিলেন এই ধারণা সম্পূর্ণ ভিত্তিহীন ও ভ্রান্ত, এই বিষয়ে কোন সন্দেহ নাই। তদুপরি মহানবী ও তাঁহার স্বজাতি ওই সকল বিষয়ে কিছুই জানিতেন না যাহা প্রত্যাদেশ বা ওহীর মাধ্যমে জানানো হইয়াছিল। ফলে উপরে উল্লিখিত আয়াত কোন প্রকারেই বিব্রতকর পরিস্থিতির সৃষ্টি করে নাই। এমনকি প্রত্যাদেশের অর্থ ও সুযোগকে সীমিত করিয়া 'সঠিকভাবে' উপস্থাপনের মাধ্যমে তথাকথিত বিব্রতকর অবস্থাকে ব্যাখ্যা করিতে উদ্যোগ নেয়ারও প্রয়োজন হয় নাই, যাহার মধ্যে কাহিনী ও কিছু তথ্য দিয়া তৎকালীন অবস্থার সঙ্গে খাপ খাওয়ানোর প্রচেষ্টারও প্রয়োজন হয় না।
পবিত্র কুরআনের আয়াত হইতেই ইহা স্পষ্ট যে, মহানবী সকল তথ্য ও ভাষা প্রত্যাদেশ্যের মাধ্যমেই লাভ করিতেন। উপরিউক্ত আয়াতের (১১:৪৯) মূল শব্দটি হইতেছে আনবা )انباء(, ওয়াট নিজে এই শব্দের অনুবাদ করিয়াছেন 'কাহিনী' বলিয়া। যাহা হউক, তিনি পরামর্শ দেন যে, এখানে এইগুলির কোন শিক্ষা এবং 'গুরুত্ব' বুঝিতে হইবে। তাহার এই প্রস্তাবনার কারণ তাহার অনুমান বা ধারণার সহিত যাহাতে এই আয়াত খাপ খায়। প্রকৃতপক্ষে এই শব্দের সহজ আরবী অর্থ 'আখবার' )اخبار( এবং উভয় শব্দের অর্থ 'ঘটনা' বা 'বিবরণ'। এ. জে. আরবেরি ইহার অর্থ করিয়াছেন 'শুভ সংবাদ'। ইহাই শব্দটির নিকটতম সমার্থবোধক শব্দ যাহা দ্বারা অনেকাংশে মূল ভাব প্রকাশিত হইয়াছে। প্রকৃতই যখন আনবা' আল্লাহ্র নিকট হইতে আসে ৭৮ তখন ইহার অর্থ হয় 'প্রকৃত ঘটনা বা সঠিক বিবরণ', যাহার সম্পর্কে বিন্দুমাত্র সন্দেহ বা অসত্য নাই। কিন্তু আমরা যদি শব্দটির অনুবাদ ওয়াটের মনের মত করিয়া গ্রহণ করি যে, উহার অর্থ 'কাহিনী' তথাপি পবিত্র কুরআনে অথবা অন্য কোথায়ও ইহার দ্বারা এই কথা কোন প্রকারে প্রতিষ্ঠা করা যায় না যে, উহার অর্থ প্রকৃত ঘটনা বাদ দিয়া 'শিক্ষা' এবং 'গুরুত্ব'। প্রসঙ্গত লক্ষণীয়, নাবা )نبا( শব্দের মূল ধাতুর যাবতীয় ব্যুৎপত্তি যাহাই থাকুক না কেন পবিত্র কুরআনে এই শব্দের একবচন কম করিয়া হইলেও সতের স্থানে ৭৯ ব্যবহৃত হইয়াছে এবং ইহার বহুবচন ব্যবহৃত হইয়াছে ১২ স্থানে। ৮০ এই ২৯ স্থানের সর্বত্রই শব্দটি ঘটনা ও পরিস্থিতি অর্থে ব্যবহৃত হইয়াছে। প্রতিটি ক্ষেত্রে (শব্দটির অর্থ তদারক করিয়া) দেখার কোন প্রয়োজন নাই। ১১:৪৯ আয়াত ব্যতীত আর মাত্র দুইটি স্থান দেখিলেই চলিবে। সেই স্থানে এই শব্দটি অনুরূপ জোরের সহিত ব্যবহৃত হইয়াছে যে, ওহীর মাধ্যমে যে জ্ঞান আসিয়াছিল তাহা ইতোপূর্বে কখনও মহানবী -এর জানা ছিল না। ইহার একটি ৩:৪৪ আয়াত যে স্থানে বলা হইয়াছে: ذلِكَ مِنْ أَنْبَاءِ الْغَيْبِ نُوحِيهِ إِلَيْكَ وَمَا كُنْتَ لَدَيْهِمْ إِذْ يُلْقُونَ أَقْلَامَهُمْ أَيُّهُمْ يَكْفُلُ مَرْيَمَ وَمَا كُنْتَ لَدَيْهِمْ إِذْ يَخْتَصِمُونَ .
"ইহা অদৃশ্য বিষয়ের সংবাদ যাহা তোমাকে ওহীর দ্বারা আমি অবহিত করিতেছি। মারয়ামের তত্ত্বাবধানের দায়িত্ব তাহাদের মধ্যে কে গ্রহণ করিবে, ইহার জন্য যখন তাহারা কলম নিক্ষেপ করিয়াছিল এবং তাহারা যখন বাদানুবাদ করিতেছিল তখনও তুমি তাহাদের নিকট ছিলে না" (৩:৪৪)। ৮১
অপর আয়াত ১২:১০২ যে স্থানে বলা হইয়াছে: ذلِكَ مِنْ أَنْبَاءِ الْغَيْبِ نُوحِيْهِ إِلَيْكَ وَمَا كُنْتَ لَدَيْهِمْ إِذْ أَجْمَعُوا أَمْرَهُمْ وَهُمْ يَمْكُرُونَ
"ইহা অদৃশ্যলোকের সংবাদ যাহা তোমাকে আমি ওহী দ্বারা অবহিত করিতেছি; ষড়যন্ত্রকালে যখন উহারা মতৈক্যে পৌঁছিয়াছিল তখন তুমি তাহাদের সংগে ছিলে না" (১২ঃ১০২)। ৮২
ইহা লক্ষণীয় যে, উভয় আয়াতের প্রারম্ভে রহিয়াছে 'তখন তুমি তাহাদের সঙ্গে ছিলে না'। উহা মহানবী-কে প্রদত্ত আনবাআ-র ব্যাখ্যা হিসাবে বলা হইয়াছে এবং উহা নির্দিষ্ট ঘটনা ও পরিস্থিতি বুঝাইতে ব্যবহৃত হইয়াছে, কোন ঘটনার 'অর্থ' ও 'গুরুত্ব' বুঝাইতে বলা হয় নাই।
মহানবী যে ছিলেন মাসুম ও সরল এবং ওহীর মাধ্যমে তাঁহাকে যে সকল ঘটনা জ্ঞাত করানো হইয়াছিল তাহা পূর্বে তিনি জানিতেন না-এই বিষয়ে অত্যন্ত গুরুত্বের সঙ্গে পুনর্বার পবিত্র কুরআনের অপর আয়াতে স্পষ্ট বলা হইয়াছে। উক্ত ২৮:৪৪-৪৬ আয়াতে বলা হইয়াছে: وَمَا كُنْتَ بِجَانِبِ الْغَرْبِي إِذْ قَضَيْنَا إِلَى مُوسَى الْأَمْرَ وَمَا كُنْتَ مِنَ الشَّهِدِينَ وَلَكِنَّا أَنْشَأْنَا قُرُونَا فَتَطَاوَلَ عَلَيْهِمُ الْعُمُرُ وَمَا كُنْتَ ثَاوِيًا فِي أَهْلِ مَدِّينَ تَتْلُوا عَلَيْهِمْ أَيْتَنَا وَلَكِنَّا كُنَّا مُرْسَلِينَ ، وَمَا كُنْتَ بِجَانِبِ الطُّورِ إِذْ نَادَيْنَا وَلَكُنْ رَّحْمَةً مِّنْ رَبِّكَ لِتُنْذِرَ قَوْمًا مَّا أَتَهُمْ مِّنْ نُذِيرٍ مِّنْ قَبْلِكَ لَعَلَّهُمْ يَتَذَكَّرُونَ
"মূসাকে যখন আমি বিধান দিয়াছিলাম তখন তুমি পশ্চিম প্রান্তে উপস্থিত ছিলে না এবং তুমি প্রত্যক্ষদর্শীও ছিলে না। বস্তুত আমি অনেক মানবগোষ্ঠীর আবির্ভাব ঘটাইয়াছিলাম; অতঃপর উহাদের বহু যুগ অতিবাহিত হইয়া গিয়াছে। তুমি তো মাদইয়ানবাসীর মধ্যে বিদ্যমান ছিলে না তাহাদের নিকট আমার আয়াতসমূহ আবৃত্তি করিবার জন্য। আমিই তো ছিলাম রাসূল প্রেরণকারী। মূসাকে যখন আমি আহ্বান করিয়াছিলাম তখন তুমি তূর পর্বতপার্শ্বে উপস্থিত ছিলে না। বস্তুত ইহা তোমার প্রতিপালকের নিকট হইতে দয়াস্বরূপ, যাহাতে তুমি এমন এক সম্প্রদায়কে সতর্ক করিতে পার, যাহাদের নিকট তোমার পূর্বে কোন সতর্ককারী আসে নাই, যেন তাহারা উপদেশ গ্রহণ করে” (২৮:৪৪-৪৬)।৮৩
এই সকল (১১:৪৯, ৩:৪৪, ১২:১০২, ২৪:৪৪-৪৬) আয়াতে সন্দেহাতীতভাবে স্পষ্ট ভাষায় বারংবার বলা হইয়াছে যে, মহানবী মুহাম্মাদ ছিলেন শিশুর মত সরল। তিনি ওহীর মাধ্যমে প্রাপ্ত তথ্য ও ঘটনাই প্রকাশ করিয়াছেন এবং ওই সকল বিষয়ে পূর্বে তিনি কিছুই জানিতেন না। উহাতেই রহিয়াছে অখণ্ডনীয় অনুমানের অসঙ্গতি যে, তিনি মনুষ্য সূত্র হইতে তথ্য ও ধারণা লাভ করিয়াছিলেন এবং অতঃপর ওহী বা প্রত্যাদেশের আশ্রয় গ্রহণ করিলেন, যাহাতে তৎকালীন পরিস্থিতির সহিত সামঞ্জস্য বিধানের ক্ষেত্রে যথাযথ বা নির্ভুল হয়। ইতোপূর্বে বলা হইয়াছে, উপরিউক্ত আয়াতগুলি মহানবী-এর সমকালীন প্রতিপক্ষের প্রতি চ্যালেঞ্জ-স্বরূপ। তাহারাও অনুরূপভাবে কটাক্ষ করিয়া বলিত যে, তিনি নাকি কোন মানুষের নিকট হইতে তথ্য লাভ করিতেন।
প্রসঙ্গত উল্লেখ্য যে, পবিত্র কুরআনের প্রতিটি অংশ যখনই যে মুহূর্তে প্রত্যাদিষ্ট নাযিল হইত তৎক্ষণাৎ উহা সর্বসাধারণের নিকট প্রকাশ করা হইত। প্রকৃতপক্ষে অবিশ্বাসিগণের বিভিন্ন অভিযোগ এবং তাহাদের অভিযোগ খণ্ডনকারী সাক্ষ্য-প্রমাণ যে প্রকারে পবিত্র কুরঅনে বিধৃত হইয়াছে তাহাই তাৎক্ষণিক ওহীর বক্তব্য (প্রত্যাদেশ) হওয়ার অকাট্য ও অভ্রান্ত প্রমাণ। উপরিউক্ত আয়াতসমূহ মক্কার প্রাথমিক কাল হইতে মদীনার মাঝামাঝি সময়কালে নাযিল হইবার বিভিন্ন তারিখগুলি যদি লক্ষ্য করা যায় (ওয়াট নিজেই প্রথমে উল্লিখিত আয়াত শ্রেণীবিন্যাস করিয়াছেন, ১১:৪৯ = C + অর্থাৎ মক্কার প্রথম কাল হইতে মদীনার মাঝামাঝি কাল) তাহা হইতে প্রমাণিত হয় যে, চ্যালেঞ্জ বারংবার ঘোষিত হইয়াছে, কেবল মক্কায় নহে, বরং মদীনায়ও, সেখানে অনেক অভিজ্ঞ ইয়াহুদী বসবাস করিত। তাহারা মহানবী-এর বিপক্ষেই ছিল। তথাপি কোন সূত্র হইতে এইরূপ কোন তথ্য পাওয়া যায় নাই যাহা হইতে দেখা গিয়াছে যে, তাহারা কোন প্রকারে উক্ত চ্যালেঞ্জ গ্রহণ করিয়াছিল অথবা তাহারা এইরূপ কোন ব্যক্তিকে দেখাইয়া অথবা কোন সূত্রকে নির্দেশ করিয়া বলে নাই যে, মুহাম্মাদ সেই ব্যক্তি অথবা সূত্রের নিকট হইতে তথ্য লাভ করিয়াছিলেন। পূর্বেই বলা হইয়াছে যে, অবিশ্বাসী কুরায়শ নেতৃবৃন্দ মক্কার (ইসলামে) ধর্মান্তরিত খৃস্টানদের উপর দিনের পর দিন অকথ্য অত্যাচার ও নির্যাতন চালাইবার পরও তাহাদের নিকট হইতে এইরূপ কোন স্বীকারোক্তি লাভ করিতে পারে নাই যে, মহানবী-কে তাহারা কিছু শিখাইয়াছিল।

সত্যই কোন প্রকার যুক্তিতে ইহা অনুধাবন করা যায় না যে, মুহাম্মাদ -এর ন্যায় একজন অনন্যসাধারণ বুদ্ধিসম্পন্ন ব্যক্তি সাধারণ লোকের জনশ্রুতির গৌণ সূত্র হইতে ইয়াহুদী ও খৃস্ট ধর্মগ্রন্থের অসম্পূর্ণ ও ভাসা ভাসা জ্ঞান অর্জন করিবেন এবং প্রাচ্যবিদগণের মতে সেই ভাসা ভাসা জ্ঞানের ভিত্তিতে একটি মতবাদ প্রচার করিবেন এবং এমন সব কাহিনী বলিতে গিয়া দাবি করিবেন যে, উহা প্রত্যাদেশ। ওয়াট তথাপি তাহার পূর্ববর্তীদের অনুসরণে কেবল অনুরূপ অবাস্তব প্রস্তাব উত্থাপন করিয়াই ক্ষান্ত হন নাই, বরং আরও বলিতে চাহিয়াছেন যে, মহানবী একজন সরল বোকা কিসিমের মানুষ ছিলেন এবং চিন্তা-ভাবনা না করিয়াhei তাড়াহুড়া করিয়া প্রথমেই ওল্ড টেস্টামেন্টের একটি কাহিনী যতখানি জানিতে পারিয়াছিলেন তাহাই প্রত্যাদেশ হিসাবে প্রকাশ করিয়াছিলেন এবং পরবর্তী কালে যখন তিনি সেই বিষয়ে অধিকতর জ্ঞান লাভ করেন তখন উহা সংশোধন বা পরিবর্তন করেন। এইভাবে তিনি ইবরাহীম (আ) ও লূত (আ) সম্পর্কিত কয়েকটি আয়াত উল্লেখ করিয়াছেন এবং উহা নাকি তাহার মতে, 'ওল্ড টেস্টামেন্টের কাহিনী' যাহা পরিচিতির মাধ্যমে ক্রমান্বয়ে যথাযথ হইয়া উঠিয়াছে। ওয়াট এইভাবে সমাপ্তি টানিয়াছেন যে, "ওল্ড টেস্টামেন্টের কাহিনী সম্পর্কিত মুহাম্মাদ -এর জ্ঞান বৃদ্ধি পাইতেছিল এবং তিনি সেই কাহিনী সম্পর্কে অবহিত একজন বা একাধিক জনের নিকট হইতে জানিতে পারিতেছিলেন”। ৬৬
ওয়াট যে সকল আয়াত উদ্ধৃত করিয়াছেন সেইগুলি হইতেছে ৩৭: ১৩৫ C; ২৬:১৭১ E (D); ২৭:৫৮ E (D); ৭:৮১ DE; ১৫:৬০ D, ১১:৮৩ E + এবং ২৯: ৩২ E + ।
লক্ষণীয় যে, ওয়াট আয়াতের যে সংখ্যা দিয়াছেন ফ্লগেল যে সংখ্যা দিয়াছেন তাহাই, তবে বর্তমানে প্রচলিত ও প্রমিত যে নির্দেশ সংখ্যা রহিয়াছে তাহা হইতে সামান্য ভিন্ন। কিন্তু আয়াতের অর্থ দেখিয়া তাহা শনাক্ত করিতে অসুবিধা হয় না। তিনি আয়াতগুলির মূল আরবী দেন নাই, এমনকি অনুবাদও দেন নাই। তদুপরি একটি সূরার একটি আয়াত উল্লেখ করিতে গিয়া নিশ্চয়ই তাহার সম্মুখে সেই বিষয় সংক্রান্ত অন্যান্য আয়াতও ছিল। তিনি প্রতিটি আয়াতের পার্শ্বে যে হরফ বসাইয়াছেন উহা দ্বারা আর, বেল আয়াতগুলির তারিখ নির্দেশ করিয়াছেন, C বসাইয়াছেন মক্কা বুঝাইতে, মদীনার প্রথম দিকে বুঝাইতে E বসাইয়াছেন এবং E + বসাইয়াছেন মদীনা বুঝাইতে। ৬৭
সর্বপ্রথম লক্ষণীয় যে, 'যথাযথ হইয়া উঠা' বা ক্রমান্বয়ে সঠিক হইয়া উঠা সম্পর্কিত তাহার যে ধারণা উহার মূল ভিত্তি হইতেছে কয়েকটি আয়াতের উপরিউক্ত তারিখ। কিন্তু এই যে তারিখ তিনি দিয়াছেন উহা চূড়ান্ত নহে, 'অস্থায়ী'। ৬৮ ওয়াট নিজেও সেই তারিখ সঠিক কিনা সে বিষয়ে সন্দেহ পোষণ করেন। ৬৯ তদুপরি তিনি তাহার নিজের সর্বশেষ রচনায় বেল কর্তৃক প্রদত্ত তারিখকে বাতিল করিয়াছেন এবং তাহার পরিবর্তে আর, ব্লাশেয়ার প্রদত্ত তারিখ গ্রহণ করিয়াছেন। তিনি আবার মোটামুটি নোলডেকে-কে অনুসরণ করিয়াছেন। ৭০ তাহা ব্যতীত তিনি দুইটি তারিখ বুঝাইতে যে দুইটি অক্ষর যেভাবে আয়াতের পার্শ্বে ব্যবহার করিয়াছেন তাহা রীতিমত বিভ্রান্তিকর। আরও লক্ষণীয়, যে সকল আয়াত তিনি উদ্ধৃত করিয়াছেন সেইগুলি সবই মক্কায় অবতীর্ণ বলিয়া অবিসম্বাদিত মর্যাদাসম্পন্ন সকল মুসলমান বিশেষজ্ঞ মনে করেন। যাহা হউক, লেখক স্বয়ং যেখানে তারিখ সম্পর্কে সন্দেহ পোষণ করেন সেই সন্দেজনক তারিখের উপর এবং লেখক নিজে যখন তাহার নিজের সর্বশেষ রচনায় উহা বাতিল করিয়াছেন—তাহার উপর ভিত্তি করিয়া ক্রমান্বয়ে সঠিক হইয়া উঠা সম্পর্কিত ধারণা রীতিমত বিভ্রান্তিকর ও বিপদজনক।
তারিখ নির্ধারণের প্রশ্ন উত্থাপন না করিলেও আয়াতগুলি নিজেই 'ক্রমান্বয়ে সঠিক হইয়া উঠা' সম্পর্কিত তত্ত্বকে সমর্থন করে না। প্রথমেই যেভাবে ওয়াট দেখাইতে চাহিয়াছেন যে, উল্লিখিত দুইটি আয়াতে (৩৭ : ১৩৫ এবং ২৬: ১৭১) দূতের 'দলের' যে সদস্য রক্ষা পায় নাই সে 'এক বৃদ্ধা', অন্যান্য সকল আয়াতে সে তাঁহার স্ত্রী। ওয়াটের মন্তব্য মোটেই সঠিক নহে এবং আলোচ্য দুই আয়াত সম্পর্কে ভুল ব্যাখ্যা। দুইটি স্থানেই বাক্য আরম্ভ হইয়াছে ইল্লা (=ব্যতীত) দ্বারা যাহার মাধ্যমে বুঝানো হইয়াছে যে, ইহা আয়াতের পূর্বে যাহা তাহার ক্রমানুবর্তন মাত্র।
লক্ষণীয় যে, প্রতিটি ক্ষেত্রে আয়াতের পূর্বে যে পরিভাষা ব্যবহৃত হইয়াছে উহা হইতেছে 'আহ্ল'। তাহার ফলে উভয় ক্ষেত্রেই অর্থ দাঁড়াইতেছে "এক বৃদ্ধা ব্যতীত" ভূতের সকল 'আহ্ল' রক্ষা পাইয়াছিল। 'আহ্ল'-এর প্রধান অর্থ "পরিবার”, এমনকি "স্ত্রী"; ইহার গৌণ অথবা পরোক্ষভাবে বর্ণিত অর্থ হইতে পারে "সম্প্রদায়" অথবা "অধিবাসী”। এই গৌণ অর্থ এই স্থলে স্পষ্টতই প্রযোজ্য নহে। কারণ এই স্থলে যাহা স্বাভাবিক তাহা হইতেছে "ভূতের সম্প্রদায়ের সকলে রক্ষা পাইবে কেবল এক বৃদ্ধা ব্যতীত” তাহা নহে। অপরপক্ষে ইহাও বলা যায় না যে, দূতের সম্প্রদায়ের সকল ব্যক্তি ধ্বংসপ্রাপ্ত হইবে ও শাস্তি লাভ করিবে, সেখানে মাত্র এক বৃদ্ধাই ছিল। প্রতিটি স্থানে পরপর দুইটি আয়াতের স্বাভাবিক অর্থ হইতেছে, ভূতের পরিবারের সকল সদস্য রক্ষা পাইয়াছিল একমাত্র "বৃদ্ধা নারী” ব্যতীত। এইভাবে উভয় ক্ষেত্রে দূতের সহিত মহিলার সম্পর্ক পরোক্ষভাবে প্রকাশ করা হইয়াছে। এই ক্ষেত্রে "বৃদ্ধা মহিলা" কথাটি ব্যবহৃত হইয়াছে, কারণ সে অবিশ্বাসী থাকার কারণে তাহাকে গ্রহণ করা হয় নাই, দূতের সহিত তাহার কি সম্পর্ক ছিল তাহা না জানার কারণে নহে। অবশ্য অন্য সকল ক্ষেত্রে তাহাদের সম্পর্ক সরাসরি ও স্পষ্টভাবে প্রকাশ করা হইয়াছে। এমতাবস্থায় প্রথম দুইটি আয়াতে যাহা বলা হইয়াছে তাহা কোন ভুল তথ্য নহে এবং অন্যান্য পাঁচটি আয়াতে 'ক্রমান্বয়ে সঠিক হইয়া উঠা' নহে।
অনুরূপভাবে ওয়াটের দ্বিতীয় সিদ্ধান্ত অবিবেচনাপ্রসূত কল্পনা। উপরিউক্ত প্রথম চারটি আয়াতে "আবরাহাম ও ভূতের মধ্যে কোন সম্পর্ক ছিল" বলিয়া কোন অবহিতি নাই। অথচ অপর তিন আয়াতে আবরাহামের সহিত সম্পর্ক স্পষ্টরূপে বর্ণিত হইয়াছে। ৭১
এখন, ১৫ : ৬০, ১১ : ৮৩ এবং ২৯ : ৩২ আয়াতগুলিতে দেখা যায় যে, "আবরাহাম ও লুতের সম্পর্কের" মধ্যে ওয়াট কেবল সমসাময়িকতার ইশারা দেখেন। ইহা আসলে ঘটনাক্রমে বর্ণিত যেখানে দূতের সম্প্রদায়ের উপর পতিত আল্লাহ্র অভিসম্পাত ও শাস্তির বিবরণ দেওয়া হইয়াছে। আয়াতে বলা হইয়াছে যে, আল্লাহ কয়েকজন ফেরেশতাকে পাঠাইয়াছিলেন। তাহারা লূতের সম্প্রদায়ের নিকট যাইতেছিলেন, পথিমধ্যে ইবরাহীম (আ)-এর সঙ্গে দেখা করেন এবং তাঁহাকে শুভ সংবাদ দেন যে, তাঁহার আর একটি পুত্র সন্তান হইবে। তাঁহারা আরও জানাইয়াছিলেন যে, তাঁহারা লূতের সম্প্রদায়কে শাস্তি দিবার জন্যই যাইতেছেন। তখন তিনি লূতের জন্য সুপারিশ করেন। স্বাভাবিকভাবেই এই ঘটনাপ্রসূত বিবরণ অন্যান্য আয়াতে আসে নাই। কারণ সেই স্থলের বিষয়বস্তু ও প্রেক্ষিত ভিন্ন। প্রকৃতপক্ষে প্রথম চারটি আয়াতে ( ৩৭: ১৩৫; ২৬:১৭১; ২৭:৫৮ এবং ৭:৮১) উল্লিখিত নবীগণের উপর আল্লাহ্র রহমতের গুরুত্ব বর্ণনা করা হইয়াছে এবং কি প্রকারে তাঁহারা আপন সম্প্রদায়ের শত্রুতা ও পরীক্ষায় আল্লাহ্র সহায়তা লাভ করিয়া জয়যুক্ত হইয়াছেন তাহা বলা হইয়াছে। অপরপক্ষে অন্য তিন আয়াতে (১৫:৬০; ১১:৮৩ এবং ২৯: ৩২) নবীগণের বিরোধিগণের আচরণ এবং তাহাদের প্রতি যে বাণী প্রেরণ করা হয় উহা প্রত্যাখ্যান ও তাহাদের বিরোধিতার ফলাফল কি তাহার উপর গুরুত্ব আরোপ করা হইয়াছে।
চার আয়াতের প্রথম গুচ্ছ প্রধানত মহানবীকে উদ্দেশ্য করিয়া এবং তাঁহার অনুসারীগণকে সান্ত্বনা ও সাহস দেওয়ার জন্য, অপর তিন আয়াত প্রধানত অবিশ্বাসিগণকে উদ্দেশ্য করিয়া বলা হইয়াছিল। এখানে অবিশ্বাসিগণকে তাহাদের অবিশ্বাস ও বিরোধিতার ভয়াবহ পরিণতি সম্পর্কে সতর্ক করা হইয়াছে। প্রথম চারটি আয়াতে সত্য প্রত্যাখ্যানকারিগণের উপর যে শাস্তি আপতিত হইবে তাহার বিস্তারিত বিবরণ দেওয়া হয় নাই, এমনকি দেওয়া হয় নাই লূত সম্প্রদায়ের উপর শাস্তি আরোপকারী ফেরেশতাগণের বিবরণও। অপরপক্ষে অপর তিন আয়াতে সেই বিস্তারিত বিবরণ দেওয়া হইয়াছে। তাহার মধ্যে ফেরেশতার আগমন এবং হযরত ইবরাহীম (আ)-এর সহিত তাহাদের কথোপকথন যাহাতে তাহার সহিত লূত (আ)-এর তথাকথিত সম্পর্কের উল্লেখ দেখা যায়। এইরূপে প্রথম চার আয়াতে কোন কিছুর ঘাটতি নাই এবং অপর তিন আয়াতে তথ্য সঠিক হইয়া ওঠা ঠিক নহে।
প্রসঙ্গক্রমে বলা আবশ্যক যে, পবিত্র কুরআনে ইতিহাস বর্ণনার জন্য অথবা কোন গল্প বলার জন্য ঐতিহাসিক ঘটনা ও পূর্ববর্তী নবীগণের কাহিনী উল্লেখ করা হয় নাই; বরং শিক্ষা গ্রহণের নিমিত্ত অথবা উপদেশ হিসাবে উল্লেখ করা হইয়াছে। এই কারণে কোন একজন নবীর জীবন কাহিনীর একই বিষয় অথবা বিভিন্ন বিষয় বিভিন্ন স্থানে বর্ণনা করা হইয়াছে। সাধারণত যেমন কোন ইতিহাস গ্রন্থে বা কোন গল্প গ্রন্থে বর্ণনা করা হয় তেমনভাবে কোথাও কোন বিশেষ ঐতিহাসিক ঘটনা অথবা কোন নবীর পরিপূর্ণ জীবন কাহিনী একাধারে বর্ণনা করা হয় নাই।
কাহিনীর বাহ্যিক পুনরাবৃত্তি বা অসম্পূর্ণতাকে প্রাচ্যবিশারদগণ তাহাদের 'সঠিকতার দিকে অগ্রগতি' তত্ত্বকে প্রতিষ্ঠিত করার জন্য ধরিয়া লইয়াছেন। কিন্তু যদি একটু গভীরভাবে এই সকল অনুচ্ছেদ বা সূরা অবলোকন করা যায় তাহা হইলে স্পষ্টই পরিদৃষ্ট হইবে যে, তাহাদের তত্ত্ব আপাত দৃষ্টিতে সত্য মনে হইলেও তাহা আদৌ সত্য নহে। এই প্রসঙ্গে আরও বলা যায় যে, কোন এক স্থানে বিষয় ও প্রেক্ষিত বিচারে নিছক বিস্তারিত বর্ণনা না করা এবং অপর ক্ষেত্রে বিষয় ও প্রেক্ষিতের কারণে বিস্তারিত বর্ণনা করাকে যুক্তি হিসাবে দাঁড় করানো চলে না যে, প্রথমটি সঠিক নহে এবং দ্বিতীয়টি 'সঠিকতার দিকে অগ্রগতি'।
পুনরায়, ধীরে ধীরে সত্য উদ্ঘাটন ও বিস্তারিত বর্ণনা একথা প্রমাণ করে না যে, কোন এক বা একাধিক ব্যক্তি নবীর তথ্য সরবরাহকারীরূপে কাজ কারিয়াছিল। পবিত্র কুরআনে ইসলামের যাবতীয় শিক্ষণীয় বিষয়, ইসলামের আচার-অনুষ্ঠান ও আদেশ-নিষেধ ধীরে ধীরে ক্রমান্বয়ে দীর্ঘ তেইশ বৎসর ধরিয়া বর্ণনা করা হইয়াছে। এই বিষয়কে যদি কেহ কোন এক বা একাধিক শিক্ষকের নিকট হইতে নবীর ক্রমান্বয়ে জ্ঞান লাভের প্রমাণ বলিয়া দাবি করে তাহা হইলে তাহাকে কল্পনা বা অনুমানের চূড়ান্ত ব্যতীত আর কিছুই বলা যায় না।
অবশ্য এই সকল কারণের পরও আরও কিছু কথা আছে। সত্যই যদি গভীরভাবে সূরাগুলি পাঠ করা যায় তাহা হইলে দেখা যাইবে যে, উল্লিখিত চারটি সূরায় তথ্যের দিক হইতে কোন ঘাটতি বা অসম্পূর্ণতা নাই। 'আদ ও ছামূদ জাতির নিকট নবীগণের (হৃদ ও সালিহ) কথা বাদ দিলেও বলিতে হয় যে, তাঁহাদের কথা পবিত্র কুরআনে আলোচিত হইয়াছে, কিন্তু বাইবেলে উল্লেখ নাই। এমনকি এই সকল সূরায় ইবরাহীম (আ)-এর ক্ষেত্রে যেরূপ বিস্তারিত বিবরণ দেওয়া আছে সেইরূপ কিছুই বাইবেলের ওল্ড টেস্টামেন্টে নাই। এইরূপে এই সকল সূরায় হযরত ইবরাহীম (আ)-কে একত্ববাদের প্রবক্তা হিসাবে চিত্রিত করা হইয়াছে এবং এই আদর্শের জন্য তিনি যে কঠোর সংগ্রাম করিয়াছেন, তাঁহার পিতা ও স্বজাতি যে ভ্রান্ত ধারণা পোষণ করিত সেই বিষয়ে তাহাদের সহিত যে বিতর্ক করিয়াছেন তাহার বিস্তারিত তথ্যাদি বর্ণনা করা হইয়াছে। তাঁহার মূর্তি ভাঙ্গা, ভ্রান্ত বিশ্বাসে অস্বীকৃতি, অগ্নি পরীক্ষা, হিজায গমন ইত্যাদির কথা বর্ণনা করা হইয়াছে। তাঁহার জীবনের এই সকল দিকের কোন বিষয় ওল্ড টেস্টামেন্টে (বাইবেলে) উল্লেখ নাই। অপরপক্ষে আলোচ্য তিনটি আয়াতে যে স্থলে 'সঠিকতার দিকে অগ্রগতির' অনুমান করা হইয়াছে তাহাতে ইবরাহীম (আ)-এর নিকট ফেরেশতাদের আগমন ও তাঁহার কথোপকথনকে ইহার কারণ হিসাবে ধরা হইয়াছে। অথচ লক্ষ্য করার বিষয় এই যে, পবিত্র কুরআনে এই ঘটনার যে বিবরণ রহিয়াছে তাহা বাইবেলে উল্লিখিত বিররণ হইতে ভিন্ন। যেমন আলোচ্য তিন আয়াতে বলা হইয়াছে যে, ইবরাহীম (আ) 'মেহমানদের' (মানবরূপী ফেরেশতাগণ) সম্পর্কে কৌতূহলী হইয়া উঠিয়াছিলেন যখন তাহাদের জন্য প্রস্তুত খাদ্য তাহারা গ্রহণ করিতে অস্বীকার করিলেন, যাহার ফলে তাহারা তাহাদের পরিচয় প্রকাশ করিতে বাধ্য হইয়াছিলেন।
অতঃপর তাহারা তাঁহার সহিত আরও কথাবার্তা বলেন এবং যাহার মধ্যে তাঁহার আরও একটি পুত্র সন্তান জন্মগ্রহণ করিবে এই সুসংবাদও ছিল এবং তাহারা যে লূত (আ)-এর জাতিকে শাস্তি দিতে আসিয়াছেন সেই কথাও ছিল।
অপরপক্ষে ওল্ড টেস্টামেন্টে আছে, যখনই ইবরাহীম (আ) 'তিনজন মানুষকে' দেখিলেন তিনি দৌড়াইয়া গেলেন 'তাঁবুর দরজা হইতে তাহাদিগের সহিত মিলিত হইবার জন্য', তাহদিগকে দাওয়াত করিলেন আহার করিবার জন্য এবং তাহারা দাওয়াত গ্রহণ করিবার পর আহার প্রস্তুত করিলেন, 'এবং তাহারা খাদ্য গ্রহণ করিলেন'। ৭২ অনুরূপভাবে লূত (আ) ৭৩ তাহাদের জন্য যে খাদ্য তৈয়ারি করিয়াছিলেন তাহারা সেই 'খাদ্য গ্রহণ করিলেন'। এই প্রকারে দেখা যায় কোন ক্ষেত্রেই তথ্য কম ছিল না। প্রথম চার আয়াত লইয়া তাহারা যে বক্তব্য প্রতিষ্ঠা করিতে চাহিয়াছেন পরবর্তী তিন আয়াতে তথ্য পূর্ণতাপ্রাপ্ত হইয়াছিল তাহাও সঠিক নহে। কারণ উভয় ক্ষেত্রে কুরআনের তথ্যে ওল্ড টেস্টামেন্টের বক্তব্য অপেক্ষা অতিরিক্ত তথ্য রহিয়াছে এবং বস্তুগতভাবে তাহা ভিন্ন। তাহা হইতে বোঝা যায়, মুহাম্মাদ-এর সূত্র পুরাতন বাইবেলও নহে এবং এই বিষয়ে অভিজ্ঞ কোন মানব সন্তানও নহে। অতএব যুক্তিযুক্তভাবে 'সঠিকতার দিকে অগ্রগতি'র তত্ত্ব কোন প্রকারেই গ্রহণযোগ্য হইতে পারে না।
প্রকৃতপক্ষে কোন একজন 'তথ্য সরবরাহকারী' অথবা একাধিক 'তথ্য সরবরাহকারী' যেই হউক না কেন তাহার নিকট হইতে মহানবী তথ্য পাইয়াছেন এইরূপ কথা পবিত্র কুরআন সরাসরি অস্বীকার তো করিয়াছেই, অধিকন্তু পবিত্র কুরআন চ্যালেঞ্জ দিয়া দাবি করিয়াছে যে, মহানবী ও তাঁহার স্বজাতির কেহই বর্তমানে প্রত্যাদেশের মাধ্যমে যাহা জানান হইয়াছে তাহা পূর্বে জানিত না। ৭৪ এমনিভাবে ১১:৪৯ আয়াতে বলা হইয়াছে:
تِلْكَ مِنْ أَنْبَاءِ الْغَيْبِ نُوحِيهَا إِلَيْكَ مَا كُنْتَ تَعْلَمُهَا أَنْتَ وَلَا قَوْمُكَ مِنْ قَبْلِ هذا .
"এই সমস্ত অদৃশ্যলোকের সংবাদ আমি তোমাকে ওহী দ্বারা অবহিত করিতেছি, যাহা ইহার পূর্বে তুমি জানিতে না এবং তোমার সম্প্রদায়ও জানিত না" (১১:৪৯)। ৭৪
উপরিউক্ত আয়াত এবং সেই সঙ্গে আরও অন্যান্য আয়াত পবিত্র কুরআনের শক্তিশালী সাক্ষ্য যেখানে বলা হইয়াছে যে, মহানবীকে ওহী প্রসূত যে জ্ঞান দান করা হইয়াছে উহা পূর্বে কখনও তাঁহার জানা ছিল না। তাঁহার 'অক্ষরজ্ঞানহীনতার' ৭৫ সমর্থনে তাই কুরআনের এই সাক্ষ্য। অথচ এই উদাহরণের ক্ষেত্রেও ওয়াট তাহার ধারণাকে প্রতিষ্ঠিত করার জন্য আয়াতের ভুল ব্যাখ্যা প্রদান করিয়াছেন। ধারণার উপর ভিত্তি করিয়া তিনি দেখাইতে অগ্রসর হইয়াছেন যে, পবিত্র কুরআনেও আছে যে, মহানবী কাহারও নিকট হইতে তথ্য গ্রহণ করিতেন। ওয়াট বলেন যে, এই ১১:৪৯ আয়াত নাকি তাহাদের জন্য 'বিব্রতকর, যাহারা মুহাম্মাদের আন্তরিকতাকে প্রতিষ্ঠিত' করিতে চাহেন এবং তাহার পরে তিনি এই তথাকথিত বিব্রতকর অবস্থাকে ব্যাখ্যা করিতে উদ্যোগ নেন। সেজন্য তিনি ওহী সম্পর্কিত তাহার অদ্ভুত ধারণার সাহায্য গ্রহণ করেন। তিনি বলেন, নবীগণের কাহিনীর ঘটনা ও তথ্য মুহাম্মাদ পাইয়াছিলেন মানবিক সূত্র হইতে, কিন্তু 'শিক্ষা' ও সেই কাহিনীর আন্তর্নিহিত উদ্দেশ্য মুহাম্মাদের নিকট আসিয়াছিল প্রত্যাদেশের দ্বারা'। ৭৬ কিন্তু এই বক্তব্যের পরই ওয়াট মনে হয় তাহার সাধারণ তত্ত্বের কথা স্মরণ করিয়া বলেন যে, এমনকি চিন্তা ও ভাবনার ক্ষেত্রে মহানবী ইয়াহুদী-খৃস্টান সূত্র হইতে উহা ধার করিয়াছেন। তখন দ্রুত যোগ করেন, যেহেতু 'ইয়াহুদী-খৃস্টান ধারণা হিজাযে অনেকাংশে পরিচিত ছিল', যে ধারণা পবিত্র কুরআনে 'ধরিয়া লওয়া সত্ত্বেও বিশেষভাবে অপরকে জানানোর প্রয়োজন ছিল না', কিন্তু 'সঠিকভাবে' যাহা কিনা এমনভাবে সন্নিবেশিত 'করার প্রয়োজন ছিল যাহাতে তদানীন্তন পরিবেশে খাপ খায় যা কেবল রাসূলের মানসিক অন্তজ্ঞান দ্বারাই সম্ভব। ৭৭
এখন এই কথা পরিষ্কারভাবে বলা যায় যে, মহানবী কোন মানুষের নিকট হইতে তথ্য লাভ করিয়াছিলেন এই ধারণা সম্পূর্ণ ভিত্তিহীন ও ভ্রান্ত, এই বিষয়ে কোন সন্দেহ নাই। তদুপরি মহানবী ও তাঁহার স্বজাতি ওই সকল বিষয়ে কিছুই জানিতেন না যাহা প্রত্যাদেশ বা ওহীর মাধ্যমে জানানো হইয়াছিল। ফলে উপরে উল্লিখিত আয়াত কোন প্রকারেই বিব্রতকর পরিস্থিতির সৃষ্টি করে নাই। এমনকি প্রত্যাদেশের অর্থ ও সুযোগকে সীমিত করিয়া 'সঠিকভাবে' উপস্থাপনের মাধ্যমে তথাকথিত বিব্রতকর অবস্থাকে ব্যাখ্যা করিতে উদ্যোগ নেয়ারও প্রয়োজন হয় নাই, যাহার মধ্যে কাহিনী ও কিছু তথ্য দিয়া তৎকালীন অবস্থার সঙ্গে খাপ খাওয়ানোর প্রচেষ্টারও প্রয়োজন হয় না।
পবিত্র কুরআনের আয়াত হইতেই ইহা স্পষ্ট যে, মহানবী সকল তথ্য ও ভাষা প্রত্যাদেশ্যের মাধ্যমেই লাভ করিতেন। উপরিউক্ত আয়াতের (১১:৪৯) মূল শব্দটি হইতেছে আনবা )انباء(, ওয়াট নিজে এই শব্দের অনুবাদ করিয়াছেন 'কাহিনী' বলিয়া। যাহা হউক, তিনি পরামর্শ দেন যে, এখানে এইগুলির কোন শিক্ষা এবং 'গুরুত্ব' বুঝিতে হইবে। তাহার এই প্রস্তাবনার কারণ তাহার অনুমান বা ধারণার সহিত যাহাতে এই আয়াত খাপ খায়। প্রকৃতপক্ষে এই শব্দের সহজ আরবী অর্থ 'আখবার' )اخبار( এবং উভয় শব্দের অর্থ 'ঘটনা' বা 'বিবরণ'। এ. জে. আরবেরি ইহার অর্থ করিয়াছেন 'শুভ সংবাদ'। ইহাই শব্দটির নিকটতম সমার্থবোধক শব্দ যাহা দ্বারা অনেকাংশে মূল ভাব প্রকাশিত হইয়াছে। প্রকৃতই যখন আনবা' আল্লাহ্র নিকট হইতে আসে ৭৮ তখন ইহার অর্থ হয় 'প্রকৃত ঘটনা বা সঠিক বিবরণ', যাহার সম্পর্কে বিন্দুমাত্র সন্দেহ বা অসত্য নাই। কিন্তু আমরা যদি শব্দটির অনুবাদ ওয়াটের মনের মত করিয়া গ্রহণ করি যে, উহার অর্থ 'কাহিনী' তথাপি পবিত্র কুরআনে অথবা অন্য কোথায়ও ইহার দ্বারা এই কথা কোন প্রকারে প্রতিষ্ঠা করা যায় না যে, উহার অর্থ প্রকৃত ঘটনা বাদ দিয়া 'শিক্ষা' এবং 'গুরুত্ব'। প্রসঙ্গত লক্ষণীয়, নাবা )نبا( শব্দের মূল ধাতুর যাবতীয় ব্যুৎপত্তি যাহাই থাকুক না কেন পবিত্র কুরআনে এই শব্দের একবচন কম করিয়া হইলেও সতের স্থানে ৭৯ ব্যবহৃত হইয়াছে এবং ইহার বহুবচন ব্যবহৃত হইয়াছে ১২ স্থানে। ৮০ এই ২৯ স্থানের সর্বত্রই শব্দটি ঘটনা ও পরিস্থিতি অর্থে ব্যবহৃত হইয়াছে। প্রতিটি ক্ষেত্রে (শব্দটির অর্থ তদারক করিয়া) দেখার কোন প্রয়োজন নাই। ১১:৪৯ আয়াত ব্যতীত আর মাত্র দুইটি স্থান দেখিলেই চলিবে। সেই স্থানে এই শব্দটি অনুরূপ জোরের সহিত ব্যবহৃত হইয়াছে যে, ওহীর মাধ্যমে যে জ্ঞান আসিয়াছিল তাহা ইতোপূর্বে কখনও মহানবী -এর জানা ছিল না। ইহার একটি ৩:৪৪ আয়াত যে স্থানে বলা হইয়াছে: ذلِكَ مِنْ أَنْبَاءِ الْغَيْبِ نُوحِيهِ إِلَيْكَ وَمَا كُنْتَ لَدَيْهِمْ إِذْ يُلْقُونَ أَقْلَامَهُمْ أَيُّهُمْ يَكْفُلُ مَرْيَمَ وَمَا كُنْتَ لَدَيْهِمْ إِذْ يَخْتَصِمُونَ .
"ইহা অদৃশ্য বিষয়ের সংবাদ যাহা তোমাকে ওহীর দ্বারা আমি অবহিত করিতেছি। মারয়ামের তত্ত্বাবধানের দায়িত্ব তাহাদের মধ্যে কে গ্রহণ করিবে, ইহার জন্য যখন তাহারা কলম নিক্ষেপ করিয়াছিল এবং তাহারা যখন বাদানুবাদ করিতেছিল তখনও তুমি তাহাদের নিকট ছিলে না" (৩:৪৪)। ৮১
অপর আয়াত ১২:১০২ যে স্থানে বলা হইয়াছে: ذلِكَ مِنْ أَنْبَاءِ الْغَيْبِ نُوحِيْهِ إِلَيْكَ وَمَا كُنْتَ لَدَيْهِمْ إِذْ أَجْمَعُوا أَمْرَهُمْ وَهُمْ يَمْكُرُونَ
"ইহা অদৃশ্যলোকের সংবাদ যাহা তোমাকে আমি ওহী দ্বারা অবহিত করিতেছি; ষড়যন্ত্রকালে যখন উহারা মতৈক্যে পৌঁছিয়াছিল তখন তুমি তাহাদের সংগে ছিলে না" (১২ঃ১০২)। ৮২
ইহা লক্ষণীয় যে, উভয় আয়াতের প্রারম্ভে রহিয়াছে 'তখন তুমি তাহাদের সঙ্গে ছিলে না'। উহা মহানবী-কে প্রদত্ত আনবাআ-র ব্যাখ্যা হিসাবে বলা হইয়াছে এবং উহা নির্দিষ্ট ঘটনা ও পরিস্থিতি বুঝাইতে ব্যবহৃত হইয়াছে, কোন ঘটনার 'অর্থ' ও 'গুরুত্ব' বুঝাইতে বলা হয় নাই।
মহানবী যে ছিলেন মাসুম ও সরল এবং ওহীর মাধ্যমে তাঁহাকে যে সকল ঘটনা জ্ঞাত করানো হইয়াছিল তাহা পূর্বে তিনি জানিতেন না-এই বিষয়ে অত্যন্ত গুরুত্বের সঙ্গে পুনর্বার পবিত্র কুরআনের অপর আয়াতে স্পষ্ট বলা হইয়াছে। উক্ত ২৮:৪৪-৪৬ আয়াতে বলা হইয়াছে: وَمَا كُنْتَ بِجَانِبِ الْغَرْبِي إِذْ قَضَيْنَا إِلَى مُوسَى الْأَمْرَ وَمَا كُنْتَ مِنَ الشَّهِدِينَ وَلَكِنَّا أَنْشَأْنَا قُرُونَا فَتَطَاوَلَ عَلَيْهِمُ الْعُمُرُ وَمَا كُنْتَ ثَاوِيًا فِي أَهْلِ مَدِّينَ تَتْلُوا عَلَيْهِمْ أَيْتَنَا وَلَكِنَّا كُنَّا مُرْسَلِينَ ، وَمَا كُنْتَ بِجَانِبِ الطُّورِ إِذْ نَادَيْنَا وَلَكُنْ رَّحْمَةً مِّنْ رَّبِّكَ لِتُنْذِرَ قَوْمًا مَّا أَتَهُمْ مِّنْ نُذِيرٍ مِّنْ قَبْلِكَ لَعَلَّهُمْ يَتَذَكَّرُونَ
"মূসাকে যখন আমি বিধান দিয়াছিলাম তখন তুমি পশ্চিম প্রান্তে উপস্থিত ছিলে না এবং তুমি প্রত্যক্ষদর্শীও ছিলে না। বস্তুত আমি অনেক মানবগোষ্ঠীর আবির্ভাব ঘটাইয়াছিলাম; অতঃপর উহাদের বহু যুগ অতিবাহিত হইয়া গিয়াছে। তুমি তো মাদইয়ানবাসীর মধ্যে বিদ্যমান ছিলে না তাহাদের নিকট আমার আয়াতসমূহ আবৃত্তি করিবার জন্য। আমিই তো ছিলাম রাসূল প্রেরণকারী। মূসাকে যখন আমি আহ্বান করিয়াছিলাম তখন তুমি তূর পর্বতপার্শ্বে উপস্থিত ছিলে না। বস্তুত ইহা তোমার প্রতিপালকের নিকট হইতে দয়াস্বরূপ, যাহাতে তুমি এমন এক সম্প্রদায়কে সতর্ক করিতে পার, যাহাদের নিকট তোমার পূর্বে কোন সতর্ককারী আসে নাই, যেন তাহারা উপদেশ গ্রহণ করে” (২৮:৪৪-৪৬)।৮৩
এই সকল (১১:৪৯, ৩:৪৪, ১২:১০২, ২৪:৪৪-৪৬) আয়াতে সন্দেহাতীতভাবে স্পষ্ট ভাষায় বারংবার বলা হইয়াছে যে, মহানবী মুহাম্মাদ ছিলেন শিশুর মত সরল। তিনি ওহীর মাধ্যমে প্রাপ্ত তথ্য ও ঘটনাই প্রকাশ করিয়াছেন এবং ওই সকল বিষয়ে পূর্বে তিনি কিছুই জানিতেন না। উহাতেই রহিয়াছে অখণ্ডনীয় অনুমানের অসঙ্গতি যে, তিনি মনুষ্য সূত্র হইতে তথ্য ও ধারণা লাভ করিয়াছিলেন এবং অতঃপর ওহী বা প্রত্যাদেশের আশ্রয় গ্রহণ করিলেন, যাহাতে তৎকালীন পরিস্থিতির সহিত সামঞ্জস্য বিধানের ক্ষেত্রে যথাযথ বা নির্ভুল হয়। ইতোপূর্বে বলা হইয়াছে, উপরিউক্ত আয়াতগুলি মহানবী-এর সমকালীন প্রতিপক্ষের প্রতি চ্যালেঞ্জ-স্বরূপ। তাহারাও অনুরূপভাবে কটাক্ষ করিয়া বলিত যে, তিনি নাকি কোন মানুষের নিকট হইতে তথ্য লাভ করিতেন।
প্রসঙ্গত উল্লেখ্য যে, পবিত্র কুরআনের প্রতিটি অংশ যখনই যে মুহূর্তে প্রত্যাদিষ্ট নাযিল হইত তৎক্ষণাৎ উহা সর্বসাধারণের নিকট প্রকাশ করা হইত। প্রকৃতপক্ষে অবিশ্বাসিগণের বিভিন্ন অভিযোগ এবং তাহাদের অভিযোগ খণ্ডনকারী সাক্ষ্য-প্রমাণ যে প্রকারে পবিত্র কুরঅনে বিধৃত হইয়াছে তাহাই তাৎক্ষণিক ওহীর বক্তব্য (প্রত্যাদেশ) হওয়ার অকাট্য ও অভ্রান্ত প্রমাণ। উপরিউক্ত আয়াতসমূহ মক্কার প্রাথমিক কাল হইতে মদীনার মাঝামাঝি সময়কালে নাযিল হইবার বিভিন্ন তারিখগুলি যদি লক্ষ্য করা যায় (ওয়াট নিজেই প্রথমে উল্লিখিত আয়াত শ্রেণীবিন্যাস করিয়াছেন, ১১:৪৯ = C + অর্থাৎ মক্কার প্রথম কাল হইতে মদীনার মাঝামাঝি কাল) তাহা হইতে প্রমাণিত হয় যে, চ্যালেঞ্জ বারংবার ঘোষিত হইয়াছে, কেবল মক্কায় নহে, বরং মদীনায়ও, সেখানে অনেক অভিজ্ঞ ইয়াহুদী বসবাস করিত। তাহারা মহানবী-এর বিপক্ষেই ছিল। তথাপি কোন সূত্র হইতে এইরূপ কোন তথ্য পাওয়া যায় নাই যাহা হইতে দেখা গিয়াছে যে, তাহারা কোন প্রকারে উক্ত চ্যালেঞ্জ গ্রহণ করিয়াছিল অথবা তাহারা এইরূপ কোন ব্যক্তিকে দেখাইয়া অথবা কোন সূত্রকে নির্দেশ করিয়া বলে নাই যে, মুহাম্মাদ সেই ব্যক্তি অথবা সূত্রের নিকট হইতে তথ্য লাভ করিয়াছিলেন। পূর্বেই বলা হইয়াছে যে, অবিশ্বাসী কুরায়শ নেতৃবৃন্দ মক্কার (ইসলামে) ধর্মান্তরিত খৃস্টানদের উপর দিনের পর দিন অকথ্য অত্যাচার ও নির্যাতন চালাইবার পরও তাহাদের নিকট হইতে এইরূপ কোন স্বীকারোক্তি লাভ করিতে পারে নাই যে, মহানবী-কে তাহারা কিছু শিখাইয়াছিল।

📘 সীরাত বিশ্বকোষ > 📄 ছয়: পবিত্র কুরআনের বিবরণের সহিত বাইবেলের বিবরণের পার্থক্য

📄 ছয়: পবিত্র কুরআনের বিবরণের সহিত বাইবেলের বিবরণের পার্থক্য


উপরে উল্লিখিত আয়াতসমূহে বর্ণিত ঘটনা এবং পবিত্র কুরআনে বর্ণিত একই নবী সম্পর্কিত ঘটনাসমূহ এবং বাইবেলে বর্ণিত সেই একই নবী সম্পর্কিত ঘটনাসমূহের মধ্যে লক্ষণীয় তথ্যগত পার্থক্য হইতে আরও প্রমাণিত হয় যে, মহানবী বাইবেল বিষয়ে বিজ্ঞ কোন ব্যক্তির নিকট হইতে কোন তথ্য লাভ করেন নাই। প্রথমে উল্লিখিত আয়াত ১১:৪৯ নূহ (আ)-এর ঘটনা সম্পর্কিত। ওল্ড টেস্টামেন্টে যেরূপ ঘটনা বর্ণনা করা হইয়াছে পবিত্র কুরআনে সেইরূপ বর্ণনা নাই। পবিত্র কুরআনে স্পষ্টভাবে বর্ণিত আছে, তিনি একত্ববাদ প্রচার করিতে এবং তাহার জাতিকে আল্লাহ্ ইবাদত করিতে বলিতেন।
পুনরায় বাইবেলে যেভাবে বলা হয় নাই পবিত্র কুরআনে তাহা বলা হইয়াছে যে, যতক্ষণ না নূহ (আ) তাঁহার আদর্শ প্রচার করিতে গিয়া বিভিন্ন প্রকার বিরোধিতা ও সমস্যার সম্মুখীন হইলেন এবং যতক্ষণ না তাঁহার সম্প্রদায় তাঁহার উপদেশ গ্রহণে তাঁহাকে হতাশাগ্রস্ত করিয়া ফেলিল এবং যতক্ষণ না আল্লাহ তাঁহার নিকট প্রকাশ করিলেন যে, তাহারা ঈমান আনিবে না ততক্ষণ পর্যন্ত তাহাদের উপর বিপদ নামিয়া আসে নাই।
তৃতীয়ত, পবিত্র কুরআনে আছে, যাহারা এক আল্লাহতে বিশ্বাস স্থাপন করিয়াছিল তাহারা রক্ষা পাইয়াছিল। পুনরায় পবিত্র কুরআনে আছে যে, কিভাবে নূহ (আ)-এর পুত্র সত্যকে গ্রহণ করিতে অস্বীকার করিয়াছিল এবং সে কিভাবে ডুবিয়া গিয়াছিল।
চতুর্থত, বাইবেলে আছে যে, আল্লাহ এই মহাপ্লাবন ঘটাইয়া কিছুটা অনুতপ্ত (?) হইয়াছিলেন এবং সিদ্ধান্ত গ্রহণ করিয়াছিলেন অনুরূপ ঘটনা আর তিনি ঘটাইবেন না এবং নিজেকে স্মরণ করাইয়া দিবার জন্য এবং নূহ (আ)-এর সহিত 'চুক্তি সাধনের' পর আসমানে একটি ধনু (রংধনু) সৃষ্টি করিলেন, যাহার অর্থ তাঁহারও ভুল হইবার মত দুর্বলতা থাকিতে পারে (নাউযুবিল্লাহ)। ৮৪ অপরপক্ষে পবিত্র কুরআন চমৎকারভাবে আল্লাহ্র মর্যাদা বিরোধী দোষারোপ হইতে সম্পূর্ণরূপে মুক্ত। পবিত্র কুরআনে বলা হয় নাই যে, আল্লাহ্ ক্রোধকে ৮৫ প্রশমিত করার উদ্দেশ্যে নূহ (আ) একটি কুরবানী দিয়াছিলেন, অথচ তাহাই বাইবেলে আছে। বাইবেলে অনুলিখিত ঘটনাবলী পবিত্র কুরআনে উল্লেখ করিয়া স্পষ্টভাবে চ্যালেঞ্জ করিয়া মহানবীকে ও তাঁহার জনগণকে বলা হইয়াছে যে, তিনি ও তাঁহার সম্প্রদায় কেহই এই ঘটনার কথা পূর্বে জানিতেন না।
অনুরূপভাবে দ্বিতীয় আয়াত (৩ : ৪৪) আসিয়াছে মেরী ও যীশুর কাহিনীর প্রেক্ষিতে। তাহাদের লইয়া যে কাহিনী বাইবেলে ও পবিত্র কুরআনে আছে তাহার পার্থক্য আরও চমৎকার। সেই আয়াতেই তাঁহার যত্ন ও রক্ষণাবেক্ষণের কথা বলা হইয়াছে। দ্বিতীয়ত, পবিত্র কুরআন স্পষ্টতই সকল মূল্যহীন চারিত্রিক বৈশিষ্ট্য হইতে (মারয়ামকে) দোষমুক্ত ঘোষণা করিয়াছে এবং অত্যন্ত গুরুত্বের সহিত ঘোষণা করা হইয়াছে, তিনি পবিত্র ও সতীসাধ্বী এবং আল্লাহ তাআলা তাঁহাকে বিশ্বের সকল মহিলার মধ্যে মহত্তম মহিলারূপে নির্বাচন করিয়াছেন। কুরআন এই প্রকারে তাঁহাকে যীশুর মাতা হওয়ার অসাধারণ সম্মান প্রদান করিয়াছে : مَرْيَمُ إِنَّ اللَّهَ اصْطَفَكِ وَطَهَّرَكِ وَاصْطَفَكِ عَلَى نِسَاءِ الْعُلَمِينَ.
"হে মারয়াম! আল্লাহ তোমাকে মনোনীত ও পবিত্র করিয়াছেন এবং বিশ্বের নারীদের মধ্যে তোমাকে মনোনীত করিয়াছেন। ৮৬
একই সংগে স্পষ্ট করিয়া বলা হইয়াছে যে, তিনি একজন মানুষ বই আর কিছু নন এবং কোন কিছু চাহিতে হইলে তাঁহাকে অন্যান্যের মত আল্লাহ্র নিকটই চাহিতে হইবে: ৮৭
يَريمُ اقْنُتِي لِرَبِّكِ وَاسْجُدِي وَارْكَعِي مَعَ الرَّاكِعِينَ .
"হে মারয়াম! তোমার প্রতিপালকের অনুগত হও ও সিজদা কর এবং যাহারা রুকু করে তাহাদের সহিত রুকূ কর" (৩:৪৩)।
যীশু সম্পর্কে তাঁহার অলৌকিক ক্ষমতার কথা বলা হইয়াছে এবং এইরূপ কথাও বলা হইয়াছে যাহা নিউ টেস্টামেন্টেও নাই। যেমন, তিনি যখন দোলনায় শিশু তখন তিনি কথা বলেন, ৮৮ আল্লাহ্ হুকুমে মাটির পুতুল পাখির মধ্যে প্রাণ সঞ্চার করেন। ৮৯ অতঃপর তাঁহার নিকট আসমান হইতে খাদ্যপূর্ণ খাঞ্চা নামিয়া আসিয়াছিল। এই সকল কথা কুরআন শরীফেই আছে। এই সকল কথা ব্যতীত পবিত্র কুরআনে সামগ্রিক ধারণার কথাও বলা হইয়াছে। পবিত্র কুরআনে স্পষ্টভাবেই বলা হইয়াছে যে, যীশু নবী বা রাসূল ব্যতীত আর কিছুই নহেন, তিনি ঈশ্বর নহেন, ৯০ তিনি ঈশ্বরের পুত্রও নহেন, ৯১ তিনি ত্রিত্বের অন্যতমও নহেন, ৯২ তিনি ক্রুশবিদ্ধও হন নাই। ৯৩
তৃতীয় আয়াত (১২: ১০২) ইউসুফ ('আ)-এর কাহিনীর শেষ অংশে আছে। পবিত্র কুরআন এই কাহিনীকে সর্বাপেক্ষা সুন্দর কাহিনী বলিয়া আখ্যায়িত করিয়াছে (احسن القصص = আহসানুল কাসাস)। পবিত্র কুরআনে এই কাহিনী সম্পূর্ণরূপে বিধৃত হইয়াছে। উহাতে আধ্যাত্মিকতার ইংগিত রহিয়াছে, যাহা ওল্ড টেস্টামেন্টে নাই। বাইবেল ও পবিত্র কুরআনের হযরত ইউসুফ (আ)-এর প্রধান কিছু অংশ পাশাপাশি স্থাপন করিলে উহাদের মধ্যকার পার্থক্য স্পষ্ট প্রতীয়মান হয়। যেমন:
১. পবিত্র কুরআনে বলা হইয়াছে যে, ইয়াকূব (আ) তাঁহার পুত্র ইউসুফকে অধিকতর ভালবাসিতেন, কারণ তিনি স্বপ্ন দেখিয়াছিলেন ও তাঁহার পুত্রের উজ্জ্বল ভবিষ্যত বিষয়ে তাঁহার বিশ্বাস ছিল (দ্র. ১২:৪-৬)।
কুরআন ১. পবিত্র কুরআনে বলা হইয়াছে যে, ইয়াকূব (আ) তাঁহার পুত্র ইউসুফকে অধিকতর ভালবাসিতেন, কারণ তিনি স্বপ্ন দেখিয়াছিলেন ও তাঁহার পুত্রের উজ্জ্বল ভবিষ্যত বিষয়ে তাঁহার বিশ্বাস ছিল (১২:৪-৬)।
২. পবিত্র কুরআন বলে, ইউসুফের ভাইয়েরা তাঁহাকে তাহাদের সঙ্গে লইবার পূর্বেই তাঁহার বিরুদ্ধে ষড়যন্ত্র করিয়াছিল (১২ঃ ৯-১০)।
৩. কুরআন বলে যে, ইউসুফ (আ)-এর ভাইয়েরা তাঁহাকে সঙ্গে লইয়া যাইতে দেওয়ার
বাইবেল ১. ওল্ড টেস্টামেন্ট বলে, ইউসুফের প্রতি ইয়াকুবের ভালবাসার কারণ তিনি বৃদ্ধ বয়সের পুত্র ছিলেন (জেনেসিস, ৩৭ঃ৩)।
২. ওল্ড টেস্টামেন্টে এই বিষয়ে কোন উল্লেখ নাই।
৩. অপরপক্ষে ওল্ড টেস্টামেন্ট বলে যে, ইয়াকূব তাঁহার পুত্রদের সঙ্গে যাইবার জন্য তাহাদের পিতাকে অনুরোধ করিয়াছিল (১২:১১-১৪)।
৪. পবিত্র কুরআন বলে যে, ইউসুফ (আ) স্বপ্নের কথা তাঁহার ভাইদের নিকট বলেন নাই (১২:৫)।
৫. পবিত্র কুরআন বলে যে, ইউসুফের ভাইয়েরা তাঁহাকে একটি কূপে ফেলিয়া দেয়, সেই স্থান দিয়া গমনকালে এক কাফেলা তাঁহাকে উদ্ধার করিয়া মিসরে দাসরূপে বিক্রয় করে (১২: ১৫, ১৯)।
৬. পবিত্র কুরআন বলে যে, ইউসুফের ভাইয়েরা তাহাদের পিতাকে বলে, ইউসুফকে কোন জন্তু খাইয়া ফেলিয়াছে। কিন্তু তিনি উহা বিশ্বাস করেন নাই, তাঁহাকে ফিরিয়া পাইবার ব্যাপারে নিরাশ হইয়াও যান নাই (১২: ১৬-১৮)।
৭. পবিত্র কুরআন বলে যে, আযীযের স্ত্রীই ইউসুফকে বিপথগামী করিতে প্ররোচিত করিয়াছিল এবং সেই উদ্দেশ্যে কক্ষের দরজা বন্ধ করিয়া দিয়াছিল। তখন ইউসুফ (আ) দৌড়াইয়া পলায়ন করিলে সে পশ্চাত হইতে তাঁহার জামা টানিয়া ধরিলে জামার পিছন দিক ছিঁড়িয়া যায় (১২: ২৩-২৫)।
৮. পবিত্র কুরআন বলে যে, ইউসুফ (আ) যখন দৌড়াইয়া পালাইতেছিলেন তখন দরজার নিকট আযীযের স্ত্রীও ছিল, একই সময়ে আযীযও আসিয়া উপস্থিত হয়। তখন আযীযের স্ত্রী তাহার নিকট অভিযোগ করে যে, ইউসুফ তাহার শালীনতা ভঙ্গ করিতে গিয়াছিল এবং আযীযের জবাব না শুনিয়াই দাবি করে যে, ইউসুফকে এখনই কারাগারে নিক্ষেপ করিতে হইবে, শাস্তি দিতে হইবে (১২: ২৫)।
৯. পবিত্র কুরআন বলে যে, ইউসুফ তৎক্ষণাৎ সেখানেই দরজার নিকট নিজেকে নির্দোষ বলিয়া স্বপক্ষ সমর্থন করেন এবং সত্য কথা বলিতে গিয়া জবানবন্দী দেন যে, আযীযের স্ত্রীই তাঁহাকে বলাৎকার করিতে চেষ্টা করিয়াছে (১২: ২৬)।
১০. পবিত্র কুরআন বলে যে, গৃহের একজন সাক্ষী বলে, যদি ইউসুফের জামার সম্মুখভাগ ছিন্ন হইত তাহা হইলে সে দোষী হইত, কিন্তু জামার পশ্চাত ভাগ ছিন্ন থাকায় প্রমাণিত হয় যে, আযীযের স্ত্রীই দোষী (১২: ২৬-২৭)।
১১. পবিত্র কুরআন বলে যে, জামার পিছন দিক যেহেতু ছিন্ন ছিল তাই আযীয প্রকৃত সত্য অনুধাবন করিতে পারিয়াছিলেন এবং ইউসুফকে নীরবে চলিয়া যাইতে বলেন। অতঃপর স্ত্রীকে ভর্ৎসনা করিয়া আল্লাহ্র নিকট স্বীয় পাপের জন্য ক্ষমা চাহিতে বলেন (১২: ২৮-২৯)।
১২. ঘটনার কথা চাপা থাকেনি কোনভাবে। নগরের মহিলা মহলে কানাঘুষা চলিতে থাকে যে, আযীযের স্ত্রী তাহার ক্রীতদাসের সহিত দৈহিক সম্পর্ক স্থাপনের চেষ্টা করিয়াছিল। কানাঘুষার কথা আযীযের স্ত্রীও শুনিতে পায়। তখন সে একদিন সকল মহিলাকে নৈশভোজের দাওয়াত দেয়। ভোজন সমাপ্ত হইবার পর সকল মহিলার হাতে একটি আপেল ও আপেল কাটার একটি করিয়া ধারালো ছুরি দেওয়ার পর ইউসুফকে সেই সমাবেশে উপস্থিত করা হয়। মহিলাগণের প্রত্যেকেই ইউসুফের সৌন্দর্য ও দেহসৌষ্ঠব অবলোকন করিয়া এইরূপ বিমুগ্ধ হইয়া পড়ে যে, তাহারা ফল না কাটিয়া নিজেদের আঙ্গুল কাটিয়া ফেলে। তখন আযীযের স্ত্রী বিজয় উল্লাসে সকলের সম্মুখে আপন অপরাধ স্বীকার করিয়া বলে যে, ইউসুফ যদি তাহার ইচ্ছা পূরণ না করে তবে তাহাকে অবশ্যই কারাবরণ করিতে হইবে এবং কষ্টভোগ করিতে হইবে (১২: ২৯-৩২)।
১৩. ইউসুফ (আ) তখন আযীযের স্ত্রীর বাসনা পূরণ অপেক্ষা কারাবরণ অধিকতর শ্রেয় মনে করেন এবং আযীযও দুর্নাম হইতে পরিত্রাণের জন্য ইউসুফকে কারাগারে প্রেরণ করেন (১২: ৩৩-৩৫)।
১৪. কেবল পবিত্র কুরআনেই বলা হইয়াছে যে, মিসরের রাজা ইউসুফকে কারামুক্ত করার এবং উচ্চপদে নিয়োগের সিদ্ধান্ত জানাইতে ইউসুফের নিকট দূত প্রেরণ করেন। তখন ইউসুফ সঙ্গে সঙ্গে লাফ দিয়া প্রস্তাব গ্রহণ না করিয়া বরং দাবি করেন যে, ঘটনাটির পূর্ণ তদন্ত করিতে হইবে। কেন তাঁহাকে কারাবরণ করিতে হইয়াছে তাহা জানিতে হইবে এবং তিনি যে নির্দোষ তাহা সকলের নিকট প্রকাশ করিতে হইবে (১২:৫০)।
১৫. সর্বসমক্ষে ঘটনার বিচার হয়, সেখানে আযীযের স্ত্রী নিজেই সব কথা স্বীকার করে এবং সে বিষয়ে হাত কর্তনীয় মহিলারাও সাক্ষ্য প্রদান করে যে, আযীযের স্ত্রী নিজেই তাহাদের কাছে স্বীয় দোষ স্বীকার করিয়াছিল। ফলে ইউসুফ (আ) যে নির্দোষ ছিলেন তাহা সকলে জানিতে পারে (১২৪ ৫১-৫২, ১২ঃ ৩২)।
১৬. পবিত্র কুরআনে কাহিনীর পরিসমাপ্তিতে বলা হইয়াছে যে, ইউসুফ (আ) তাঁহার পিতা-মাতা ও ভাইদের সঙ্গে মিলিত হন এবং স্বপ্ন যে বাস্তব রূপ লাভ করিয়াছিল তাহাই দেখানো হইয়াছে (১২: ১০০)।
১৭. অবশেষে পবিত্র কুরআন যথাযথভাবে মিসরের শাসনকর্তাকে রাজা বলিয়া আখ্যায়িত করিয়াছে, ফিরআওন নহে। কারণ ফিরআওন পদবী প্রচলিত হইয়াছিল ১৮শ রাজবংশের পূর্বে নহে, সঠিকভাবে বলিতে গেলে ৩য় থেটমস-এর রাজত্বের পূর্বে (১৪৯০-১৪৩৬ খৃ. পূ.) নহে।
ইউসুফ ('আ)-এর কাহিনী লইয়া পবিত্র কুরআন ও ওল্ড টেস্টামেন্টের বিবরণের মধ্যে যে তথ্যগত পার্থক্য রহিয়াছে তাহার কিছু উল্লেখ করা হইল। এইরূপে যদি আরও বিস্তারিত তুলনা করা হয় তাহা হইলে আরও অনেক পার্থক্য ধরা পড়িবে।
অনুরূপভাবে আলোচ্য চতুর্থ আয়াত (২৮:৪৪-৪৬) হযরত মূসা (আ) সম্পর্কিত কিছু ঘটনা (২৮: ২-৪৩) বর্ণনা প্রসঙ্গে সর্বশেষে বলা হইয়াছে। ঘটনাক্রমে এই কাহিনী একটি বক্তব্য দিয়া আরম্ভ হইয়াছে : "আমরা তোমার নিকট সোনাই মূসার বিষয়ে কয়েকটি কাহিনী"। পবিত্র কুরআনে সত্যই মূসা ও তাঁহার ভাই হারূন ('আ)-এর কাহিনী বর্ণনা করা হইয়াছে, ইসরাঈলদের সম্পর্কে ওল্ডটেস্টামেন্টে যাহা আছে তাহা অপেক্ষা ইহাতে অনেক বেশি বর্ণনা রহিয়াছে। অবশ্য দুইটি বিবরণের মধ্যে অনেক মিলও রহিয়াছে। কিন্তু পার্থক্যসমূহ কুরআনে যে নূতন তথ্য রহিয়াছে তাহা মৌলিক। ৯৪ সর্বাপেক্ষা গুরুত্বপূর্ণ পার্থক্য পরিলক্ষিত হয় যে, ওল্ড টেস্টামেন্টে মূসা ('আ)-কে ও তাঁহার ভাই হারূনের উপর অনুচিত কার্যের অভিযোগ আনয়ন করা হইয়াছে, যদিও মূসাকে বলা হইয়াছে যে, তিনি ছিলেন তাঁহাদের 'আইনদাতা'। অপরপক্ষে মূসা ও তাঁহার ভাই হারুনকে ব্যক্তি হিসাবে চিত্রিত করা হইয়াছে যে, তাহারা আল্লাহর অবাধ্য হইয়াছেন ও আল্লাহ্র রোষ তাহাদের উপর পতিত হইবার কারণ ছিল। ৯৫ এমনকি এইরূপ অভিযোগও আনয়ন করা হইয়াছে যে, হারুনের কারণেই তাহারা স্বর্ণ গোবৎস পূজা প্রবর্তন করিয়াছিল। অপরপক্ষে পবিত্র কুরআন তাহাদিগকে সকল অভিযোগ হইতে মুক্ত দেখাইয়াছে এবং অত্যন্ত দৃঢ়তার সহিত ঘোষণা করিয়াছে যে, তাঁহারা ছিলেন আল্লাহ্ নির্বাচিত পয়গাম্বর ও আল্লাহর অনুগ্রহভাজন প্রত্যাদেশপ্রাপ্ত ও কিতাবপ্রাপ্ত। তাঁহাদের প্রতি অনোচিত্যমূলক কর্মের যে অভিযোগ আনয়ন করা হইয়াছে তাঁহারা ছিলেন উহা হইতে সম্পূর্ণ মুক্ত। তাঁহারা ছিলেন আল্লাহ্র পয়গাম্বর হিসাবে মানুষকে আল্লাহ্র পথে আহ্বানকারী উৎসর্গকৃত প্রাণ, নিবেদিত প্রাণ, আন্তরিক মানুষ। তাঁহারা মানুষকে আহ্বান করিয়াছিলেন যে, তাহারা যেন একমাত্র আল্লাহ্ই উপাসনা করে এবং আল্লাহ ব্যতীত অপর কাহারও উপাসনা না করে। ৯৬ পবিত্র কুরআনে আরও বলা হইয়াছে যে, স্বর্ণ-গোবৎসের উপাসনা প্রবর্তন করিয়াছিল ইসরাইলী সামিরই, মূসার ভ্রাতা হারূন নহেন। ৯৭ পুনরায়, একমাত্র পবিত্র কুরআনের দুই সাগরের মিলনক্ষেত্র অবধি মূসার ভ্রমণ বৃত্তান্ত বর্ণনা করা হইয়াছে। আবার পবিত্র কুরআনেই সেই গুরুত্বপূর্ণ ঘটনার উল্লেখ আছে যে, মূসাকে হত্যা করিবার জন্য ফিরআওন যে চক্রান্ত করিয়াছিল তাহা প্রকাশ হইয়া যায় এবং ফিরআওনের দরবারের একজন 'বিশ্বাসী' ব্যক্তি তাহাকে পরিকল্পনা বাস্তবায়ন হইতে বিরত করিয়াছিল। ৯৮
এমনকি বিস্তারিত বিবরণ প্রদানের ক্ষেত্রেও পার্থক্য রহিয়াছে। সংক্ষিপ্ত ইসলামী বিশ্বকোষ গ্রন্থের লেখক যথাযথই দেখাইয়াছেন যে, পবিত্র কুরআনে আছে—শিশু মূসাকে নদী হইতে ফিরআওনের স্ত্রী উদ্ধার করিয়াছিল, ফিরআওনের কন্যা নহে। বাইবেলে আছে সাতজন মেষ পালক বালিকাকে মূসা সাহায্য করিয়াছিলেন; কিন্তু পবিত্র কুরআনে আছে মাত্র দুইজনকে। দশটি প্লেগের ঘটনার পরিবর্তে পবিত্র কুরআনে নয়টি অলৌকিক ঘটনার উল্লেখ আছে। কুরআনে আরও আছে যে, মূসা প্রস্তরে আঘাত করিলে সেই প্রস্তর হইতে বার গোত্রের জন্য বারটি প্রস্রবণ নির্গত হইয়াছিল। "অতঃপর নূতন বিষয়ে রহিয়াছে: একজন মিসরীয়কে হত্যা করিবার জন্য মূসা অনুতপ্ত হইয়াছিলেন। রাত্রিকালে মূসা দূরে জ্বলন্ত অগ্নি দেখিতে পাইলে সেই অগ্নি হইতে আগুন সংগ্রহ করিতে চাহিয়াছিলেন..."। পবিত্র কুরআনে আরও বলা হইয়াছে যে, ফিরআওনের যাদুকরগণকে আল্লাহতে ঈমান আনার কারণে মৃত্যুবরণ করিতে হইয়াছিল।১০০
অনুরূপভাবে যখন অন্যান্য পয়গাম্বরদিগের বিবরণ বর্ণনা করা হইয়াছে তখন পবিত্র কুরআনের বর্ণনা ও বাইবেলের বর্ণনার মধ্যে মৌলিক পার্থক্য লক্ষ্য করা যায়। ইবরাহীম ('আ)-এর কাহিনী বর্ণনার ক্ষেত্রে কিছু সংখ্যক পার্থক্য ইতিপূর্বে উল্লেখ করা হইয়াছে। যেমন দাউদ ও সুলায়মান ('আ) সম্পর্কে বিবরণ, তাঁহারা দুইজন ছিলেন পরাক্রমশালী মহান পয়গাম্বর। কিন্তু তাঁহাদিগের সম্পর্কে বাইবেলে যে চিত্র অংকন করা হইয়াছে তাহাতে প্রতিভাত হয় যে, তাহারা ছিলেন অত্যাচারী, উৎপীড়নকারী, ভোগবিলাসী, লম্পট, এমনকি অন্যায় সম্ভোগের জন্য অপরের স্ত্রীকে অপহরণ করিতে দ্বিধা করিতেন না। ১০১ পয়গাম্বর দূতও নাকি আপন কন্যাদের সহিত দৈহিক সম্পর্ক স্থাপন করিয়াছিলেন (নাউযুবিল্লাহ)। ১০২ অপরপক্ষে পবিত্র কুরআন এককভাবে পয়গাম্বরদের চরিত্রে কোন প্রকার কালিমা লেপন হইতে বিরত রহিয়াছে এবং হযরত দাউদ (আ) সম্পর্কে যাহা বলিয়াছে তাহা হইতে জানা যায় যে, তিনি ছিলেন আল্লাহ্র আদর্শ প্রতিনিধি। সেই কারণে তাঁহাকে দেওয়া হইয়াছিল সাম্রাজ্য, প্রজ্ঞা, কিতাব ও ক্ষমতা। ১০৩ অনুরূপভাবে সুলায়মান (আ)-কে আল্লাহ্র অনুগ্রহভাজন হিসাবে প্রদান করা হইয়াছিল ক্ষমতা, সাম্রাজ্য ও সকল প্রাণীর ভাষা বুঝিবার অসাধারণ ক্ষমতা। ১০৪ তাঁহারা উভয়ই ছিলেন আদর্শ চরিত্রের মানুষ ও আল্লাহ্র নবী।
এইরূপে পবিত্র কুরআন ও বাইবেলে পয়গাম্বরগণ সম্পর্কিত যে বিবরণ রহিয়াছে তাহা তুলনা করিলে স্পষ্ট দেখা যায়, কুরআনের বিবরণ বাইবেলের বিবরণের নকল নহে। অবশ্য দুইটি বিবরণের মধ্যে অনেক মিলও রহিয়াছে, কিন্তু কুরআনের বিবরণ অনেক বেশি ভিন্ন প্রকৃতির ও মৌলিক। কোন কোন প্রাচ্যবিশারদ স্বীকার করেন যে, কুরআনে অনেক নূতন তথ্য আছে, কিন্তু সাধারণভাবে তাহাদের বিবেচনাগুলিতে তিনটি সাধারণ দুর্বলতা পরিলক্ষিত হয়।
প্রথমত, তাহারা যেখানে মিল আছে সেইগুলি সকল অমিল বাদ দিয়া দেখাইয়াছেন অথবা কোনরূপ গুরুত্ব না দিয়া গৌণ বিষয় হিসাবে উল্লেখ করিয়াছেন। দ্বিতীয়ত, তাহারা অনুরূপ ঘটনা বা ধারণা অন্যান্য পৌরাণিক গ্রীক, হিব্রু ও লাতিন রচনায় চিহ্নিত করিতে চেষ্টার বিন্দুমাত্র ত্রুটি করেন নাই এবং তৎক্ষণাৎ ঝাঁপাইয়া পড়েন ও বলেন যে, কুরআনে বর্ণিত ঘটনা সেই সূত্র হইতে লওয়া হইয়াছে অথবা উহার ভিত্তিতে রচিত হইয়াছে। তাহারা তখন ভুলিয়া যান যে, কোন ঘটনার বা ধারণার উল্লেখ পূর্ববর্তী কোন রচনায় থাকিলেই প্রমাণিত হয় না যে উহা সেই পূর্ববর্তী রচনা হইতে গ্রহণ করা হইয়াছে। কোন সময় উক্ত বিষয় হয়তো কয়েক সহস্র বৎসর পূর্বের রচনা। পরবর্তী কালের কোন কিছুতে সেই ধারণা বা ঘটনা থাকার অর্থ ইহা নহে যে, উহাকে ভিত্তি করিয়াই পরবর্তী কালে রচনা রচিত হইয়াছে। আরও কিছু সাক্ষ্য প্রয়োজন হয়। যেমন যোগাযোগ স্থাপিত হইয়াছিল তাহার প্রমাণ অথবা সেই সূত্রের সহিত যোগাযোগের সম্ভাবনার কোন প্রমাণ থাকিতে হয়। এই বিষয়টি হযরত মুহাম্মাদ-এর ক্ষেত্রে অধিকতর প্রযোজ্য। কারণ এই কথা বলা চলে না যে, তিনি অসংখ্য পৌরাণিক রচনা ও সূত্র অধ্যয়ন করিয়াছিলেন, এমনকি সেই সকল রচনা লুপ্ত ভাষায় থাকিলেও তিনি সেই ভাষা জানিতেন। সেই সকল পৌরাণিক কাহিনী ও জ্ঞান অর্জন করিতে হইলে নিছক পথচারীর মুখ হইতে শুনিয়া অথবা ধর্মান্তরিত ক্রীতদাসের নিকট হইতে শুনিয়া সম্ভব নহে। অথচ তাঁহার বিরুদ্ধে এইরূপ অভিযোগই আনয়ন করা হইয়াছে।
এইরূপ কোন তথ্য নাই যাহাতে দেখা যায়, সেকালে মক্কা নগরীতে অথবা আশেপাশে কোন গ্রন্থাগার বা যাদুঘর ছিল যেখানে প্রাচীন গ্রন্থ ও পাণ্ডুলিপি ছিল, যে সকল গ্রন্থ ও পাণ্ডুলিপির প্রতি প্রাচ্যবিশারদগণ পাঠকের দৃষ্টি আকর্ষণ করেন, অথবা সেখানে এইরূপ কোন জ্ঞানী পণ্ডিত অথবা ভাষাবিজ্ঞানী ছিলেন না যিনি সেই সকল গ্রন্থের রহস্য ভবিষ্যতে যিনি পয়গাম্বর হইবেন তাঁহার নিকট ওই সকল তথ্য উদ্ঘাটন করিতে পারিতেন। তৃতীয়ত, যখন অনিচ্ছাকৃতভাবে তাচ্ছিল্যের সহিত প্রাচ্যবিশারদগণ স্বীকার করেন যে, পবিত্র কুরআনে অনেক নূতন তথ্য রহিয়াছে তখন তাহারা মনে হয় কখনও মনোযোগ দিয়া চেষ্টা করেন নাই যে, উক্ত তথ্য কোন্ সূত্র হইতে আসিয়াছে তাহা উদ্ধার করিতে। তাহারা যদি সত্যই আন্তরিকভাবে সেই চেষ্টা করিতেন তাহা হইলে নিশ্চয়ই অনুধাবন করিতে পারিতেন, যে ধারণা-অনুমানকে প্রতিষ্ঠিত করিবার জন্য তাহারা একনিষ্ঠভাবে প্রচেষ্টা করিতেছেন সেই অনুমান ও ধারণার পরিবর্তন প্রয়োজন।

লিঙ্ক শেয়ার করুন
close

লিঙ্ক কপি করুন

0:00
0:00