📄 সাত: আনুষ্ঠানিক শিক্ষার অভাব
মহানবী-এর নবুওয়াত-পূর্ব জীবনের অপর এক লক্ষণীয় বৈশিষ্ট্য হইল তাঁহার কোন প্রকার আনুষ্ঠানিক শিক্ষার অ-প্রাপ্তি এবং তাঁহার পঠন ও লিখনে অপারগতা। ঐতিহাসিকগণ যদিও মহানবী-এর জীবন ও কার্যাবলীর অনেক ক্ষুদ্র বিষয় সম্পর্কে সতর্ক, কিন্তু তাহারা তাঁহার প্রথম জীবন ও যৌবনে কখনও তিনি কোন প্রকার শিক্ষা গ্রহণ করিয়াছেন এইরূপ কোন আভাস প্রদান করেন নাই। বিপরীতক্রমে মহানবী-এর নিজের এই মর্মে একাধিক উক্তি রহিয়াছে যে, তিনি ছিলেন একজন নিরক্ষর (উম্মী) অর্থাৎ প্রশিক্ষণপ্রাপ্ত ছিলেন না। স্বয়ং কুরআনেও একাধিক উক্তি রহিয়াছে যাহা অভ্রান্তরূপে প্রমাণ করে যে, তিনি কোন আনুষ্ঠানিক শিক্ষা গ্রহণ করেন নাই অথবা পড়িতে ও লিখিতেও জানিতেন না। এই তথ্যের প্রকাশ ঘটায়াছে 'উম্মিয়্যি' শব্দ হইতে যাহা একবচন ও বহুবচন আকারে কুরআনে সর্বমোট ছয়টি স্থানে উক্ত হইয়াছে যাহার অর্থ একজন নিরক্ষর ও অশিক্ষিত লোক উভয়ই (অর্থাৎ শিক্ষা সম্পর্কে যে ব্যক্তি তাহার মায়ের কোলে রহিয়াছে বলিয়া বিবেচিত) ৫৪ এবং যাহার আরও অর্থ "যে ব্যক্তি কোন অবতীর্ণ গ্রন্থ প্রাপ্ত হন নাই"। ৫৫ এইগুলি ব্যতীত কুরআনে আরও কতকগুলি আয়াত রহিয়াছে, যথা ১৬: ১০৩, ২৫: ৪-৫ ও ২৯: ৪৮ যাহাতে 'উম্মিয়্যি' শব্দটির উল্লেখ নাই কিন্তু যাহা স্পষ্টরূপে প্রমাণ করে যে, মহানবী পড়িতে ও লিখিতে জানিতেন না। কুরআনের এই উভয় প্রকার আয়াতের তাৎপর্য সম্পর্কে মহানবী-এর "নিরক্ষরতা" সম্পর্কে প্রাচ্যবিদগণের মতামত এবং তাঁহাদের এই অভিযোগ যে, তিনি মক্কার একজন "তথ্যদাতা" বা "তথ্যদাতাগণের" নিকট হইতে তাঁহার জ্ঞান লাভ করিয়াছিলেন প্রসঙ্গে আলোচনা করা হইবে। ৫৬
হুদায়বিয়ার সন্ধি সম্পাদনকালীন সুবিখ্যাত ঘটনাটি এই প্রসঙ্গে বিশেষ উল্লেখযোগ্য। বর্ণিত আছে যে, মহানবী-এর পক্ষে হযরত 'আলী (রা) কর্তৃক যখন সন্ধির শর্তাবলী লিখিত হইতেছিল তখন কুরায়শ নেতা সুহায়ল মহানবীর নামের সহিত 'রাসূলুল্লাহ' (আল্লাহ্র দূত) শব্দাবলীর ব্যবহারে আপত্তি উত্থাপন করিয়াছিল। মহানবী সন্ধি সম্পাদন নির্বিঘ্ন করার উদ্দেশ্যে "আলীকে উক্ত শব্দাবলী রহিত করিয়া তৎপরিবর্তে শুধু "আবদুল্লাহর পুত্র” লিখিতে বলিলেন। কিন্তু 'আলী বোধগম্য ভাবাবেগ ও ভক্তির কারণে 'রাসূলুল্লাহ' অভিব্যক্তিটি মুছিয়া ফেলিতে অস্বীকার করিলেন। ইহাতে মহানবী তাহার নিকট হইতে কাগজটি টানিয়া নিলেন এবং কোন বর্ণনামতে, কোথায় উক্ত অভিব্যক্তিটি লিখিত হইয়াছে তাহা 'আলীকে দেখাইতে বলিলেন এবং তাহা দেখান হইলে তিনি উহা কাটিয়া দেন এবং তদস্থলে কুরায়শ নেতার দাবি মোতাবেক বিকল্প অভিব্যক্তি 'আবদুল্লাহ্ পুত্র” লিখার ব্যবস্থা করেন। অন্যান্য বর্ণনায় শুধু উক্ত হইয়াছে যে, 'রাসূলুল্লাহ' অভিব্যক্তিতে কুরায়শ নেতার আপত্তির কারণে মহানবী উহার পরিবর্তে 'আবদুল্লাহ্র পুত্র' লিখিলেন। ৫৮ এই শেষোক্ত বর্ণনা সম্পর্কে খুব সঙ্গত কারণেই উল্লেখ করা হইয়াছে যে, উক্তিটিকে সেই অর্থে গ্রহণ করিতে হইবে যে অর্থে সন্ধিপত্র রাষ্ট্র বা প্রতিষ্ঠান প্রধান কর্তৃক লিখিত হয় অর্থাৎ তাহারা নিজেরা সন্ধিপত্র লিখেন না বা উহার খসড়া তৈয়ার করেন না, বরং তাহাদের ক্ষমতার অধীনে লিখিত হয়। ৫৯ এমনকি এই শেষোক্ত বর্ণনাতেও দ্ব্যর্থহীনভাবে উক্ত হয় নাই যে, মহানবী স্বয়ং শব্দগুলি লিখিয়াছিলেন।
কেহ কেহ এই শেষোক্ত বর্ণনাকে মহানবী-এর নিরক্ষরতা সম্পর্কে কুরআনের সাক্ষ্যের সহিত সমন্বয় সাধন করার প্রয়াস পাইয়াছেন এই ভাবিয়া যে, মহানবী তাঁহার জীবনের শেষদিকে এবং আলোচ্য কুরআনের আয়াত নাযিলের পরবর্তীতে কিছু কিছু পড়িতে ও লিখিতে শিখিয়াছিলেন। ৬০ এই অভিমতের ভিত্তি সম্ভবত 'আওন ইব্ন 'আবদুল্লাহ বর্ণিত একটি হাদীছ যাহাতে উক্ত হইয়াছে যে, "মহানবী পড়িবার ও লিখিবার পূর্বে ইনতিকাল করেন নাই।” ৬১ এই বিশেষ হাদীছটি সর্বসম্মতভাবে অত্যন্ত 'দুর্বল' বলিয়া বিবেচিত এবং কুরআনের সাক্ষ্যের সহিত ইহার বিরোধিতার কারণে প্রত্যাখ্যাত হইয়াছে। ৬২ ইহাও উক্ত হইয়াছে যে, মহানবী পরবর্তী কালে যদি পড়িতে এবং লিখিতে শিখিয়া থাকেন তাহা হইলে এই উল্লেখযোগ্য বিষয়টি এবং যে ব্যক্তি বা ব্যক্তিগণ তাঁহাকে উহা অর্জনে সহায়তা করিয়াছিলেন তাহার বা তাহাদের নাম তাঁহার অনেক সাহাবীই উল্লেখ ও বর্ণনা করিতেন। ৬৩ তাই এই ধারণা গ্রহণযোগ্য হইতে পারে না।