📘 সীরাত বিশ্বকোষ > 📄 পাঁচ: দ্বিতীয়বার সিরিয়া সফর এবং খাদীজা (রা)-এর সহিত বিবাহ

📄 পাঁচ: দ্বিতীয়বার সিরিয়া সফর এবং খাদীজা (রা)-এর সহিত বিবাহ


প্রকৃতপক্ষে হিলফুল ফুদূল প্রতিষ্ঠার মাধ্যমে মহানবী প্রথম জনজীবনে প্রবেশ করেন। এই সময় তিনি স্বীয় সততা, পূর্ণতা, সত্যবাদিতা, নির্ভরযোগ্যতা ও উচ্চ নৈতিক চরিত্রের জন্য সুখ্যাতি অর্জন করিয়াছিলেন। আর তাই তিনি সাধারণ্যে আল-আমীন বা "বিশ্বস্ত" বলিয়া অভিহিত হইয়াছিলেন। এইরূপ খ্যাতি ও তাঁহার চরিত্রের জনস্বীকৃতি নিজ লোকদের সহিত তাঁহার দৈনন্দিন সম্পর্কের, বিশেষ করিয়া সময় সময় তাঁহার উপর অর্পিত আমানত ও দায়িত্ব পালনের মাধ্যমে তিনি অর্জন করিয়া থাকিবেন। তবে তাঁহার এইরূপ কর্মকাণ্ড সম্পর্কে বিস্তারিত তথ্য আমাদের জানা নাই। উৎসসমূহে যতদূর পাওয়া যায় তাহা হইতেছে মক্কায় তাঁহার কিছু ব্যবসায়িক কর্মকাণ্ডের প্রতি কিছু পরোক্ষ ও অস্পষ্ট উল্লেখ মাত্র: ৩৫
তবে ইতিহাসে ইহার বিশেষভাবে উল্লেখ রহিয়াছে যে, তাঁহার বয়স যখন প্রায় পঁচিশ বৎসর তখন তিনি খাদীজা (রা)-এর বাণিজ্য-সম্ভার লইয়া দ্বিতীয়বার সিরিয়া ভ্রমণ করিয়াছিলেন। ঐতিহাসিকগণ ঘটনাটি কিছুটা বিশদভাবে বর্ণনা করার ব্যাপারে সর্তক ছিলেন স্পষ্টত এই কারণে যে, ইহা তাঁহার জীবনের এক সন্ধিক্ষণ বলিয়া প্রমাণিত হয়। তবুও তাঁহাকে এইরূপ বাণিজ্যিক দায়িত্ব প্রদান হইতে অনুমিত হয় যে, তিনি সেই পর্যন্ত এই জাতীয় লেনদেনের ক্ষেত্রে কিছু স্বীকৃত অভিজ্ঞতা অর্জন করিয়াছিলেন। কারণ খাদীজা (রা)-এর ন্যায় ব্যবসায়-বাণিজ্যে সফল হিসাবে বিজ্ঞ ও অভিজ্ঞ মহিলা কিছুতেই একজন যুবকের উপর, সে যতই সৎ ও ন্যায়পরায়ণ হউক না কেন, তাহার পুঁজি ও বাণিজ্য-সম্ভার অর্পণের ঝুঁকি গ্রহণ করিতেন না—যদি তিনি এই ব্যাপারে তাঁহার যোগ্যতা ও উপযুক্ততা সম্পর্কে পুরাপুরি নিশ্চিত না হইতেন। তবুও ইহা নিশ্চিত যে, তিনি মক্কায় যেরূপ বাণিজ্যিক কর্মকাণ্ডেই নিয়োজিত থাকুন না কেন, তিনি পূর্বে কখনও বিদেশে কোন বাণিজ্য-সম্ভার লইয়া গমন করেন নাই। যদি তিনি অনুরূপ করিতেন তাহা হইল উক্ত তথ্য অবশ্যই ঐতিহাসিকগণ ও হাদীছবিদগণ, অন্তত খাদীজার পক্ষে এই বাণিজ্যিক মিশন প্রসংগে, উল্লেখ করিতেন।
খাদীজা (রা) খুওয়ায়লিদের কন্যা, তিনি আসাদের পুত্র, তিনি 'আবদুল 'উযযার পুত্র, তিনি কুসায়্যির পুত্র, তিনি কিলাবের পুত্র এবং তিনি মুররার পুত্র ছিলেন। সুতরাং তাঁহার বংশ মহানবী ﷺ-এর বংশের সহিত কুসায়্যি-তে গিয়া মিলিত হইয়াছে। এই সময় তিনি প্রায় চল্লিশ বৎসর বয়সের ছিলেন। পূর্বে তিনি পরপর দুই ব্যক্তির সহিত বিবাহ বন্ধনে আবদ্ধ হইয়াছিলেন। তাহাদের উভয়ে তাঁহার জন্য দুইটি সন্তান রাখিয়া মৃত্যুবরণ করেন। তাঁহার স্বাস্থ্য, যৌবন ও সৌন্দর্য তখনও অটুট ছিল। তবে তাঁহার প্রকৃত সৌন্দর্য তাঁহার চরিত্র ও আচরণে নিহিত ছিল। তিনি সারা জীবন পূত-পবিত্র জীবন যাপন করিয়াছেন এবং তাঁহার নগরী ও সমাজের সকল প্রকার কলঙ্ক হইতে সম্পূর্ণ মুক্ত ছিলেন। এইজন্য বন্ধু ও শত্রু, উচ্চ ও নীচু সকলেই তাঁহাকে শ্রদ্ধার সহিত 'আত-তাহিরাহ্' (পবিত্র মহিলা) বলিয়া উল্লেখ করিত। এই নিখুঁত গুণের সহিত তাঁহার আরও ছিল বিরল বিচক্ষণতা, মানুষ ও অবস্থা বুঝিবার তীক্ষ্ণ ধীশক্তি এবং প্রকৃত ব্যবসায়িক সূক্ষ্ম বুদ্ধি। তিনি বিপুল ধন-সম্পদেরও মালিক ছিলেন অংশত উত্তরাধিকার সূত্রে, কিন্তু প্রধানত তাঁহার ব্যবসায়ের দক্ষ ব্যবস্থাপনার দ্বারা বহু গুণ বৃদ্ধির কারণে। কথিত আছে যে, তাঁহার বাণিজ্যিক পণ্যসম্ভার ও বাণিজ্য কাফেলা তখনকার মক্কার অন্যান্য সকল কুরায়শ ব্যবসায়ীদের পণ্যসম্ভার ও বাণিজ্য কাফেলার সমষ্টির যদি অধিক না হয়, তার প্রায় সমান ছিল। স্বভাবতই তিনি নগরীর পরম শ্রদ্ধেয়া মহিলা ছিলেন এবং কাহারও অপেক্ষা কম কাম্য ছিলেন না।
ইবন ইসহাক কর্তৃক বর্ণিত আছে যে, খাদীজা (রা) মুহাম্মাদ-এর চরিত্র ও যোগ্যতার কথা শুনিয়া তাঁহার সহিত তাঁহার চাচা আবু তালিবের মাধ্যমে যোগাযোগ করেন এবং সিরিয়ায় তাঁহার বাণিজ্য কাফেলার নেতৃত্ব দানের জন্য তাঁহাকে অনুরোধ করেন, আর এইজন্য তিনি অন্যদেরকে যাহা প্রদান করিতেন তাহার দ্বিগুণ পারিশ্রমিক তাঁহাকে প্রদানের প্রস্তাব করেন। ৩৬ মুহাম্মাদ তাঁহার চাচা এবং শুভাকাঙ্খী আবূ তালিবের সহিত পরামর্শক্রমে এই প্রস্তাব গ্রহণ করেন এবং খাদীজা (রা)-এর বাণিজ্য কাফেলা লইয়া সিরিয়া গমন করেন, আর এই সময় তাঁহার সহকারী হিসাবে সঙ্গে ছিলেন খাদীজা (রা)-এর ভৃত্য মায়সারা।
স্বীয় চাচার সহিত প্রথমবার সিরিয়া ভ্রমণের ক্ষেত্রে যেরূপ ঘটিয়াছিল সেইরূপ দ্বিতীয়বার ভ্রমণের ক্ষেত্রেও ঐতিহাসিকগণ অপর এক ধর্মযাজক নেসতোরিয়াসের ঘটনা বর্ণনা করিয়াছেন, যিনি প্রায় একই স্থানে বসবাস করিতেন, যেখানে প্রায় বার অথবা চৌদ্দ বৎসর পূর্বে বাহীরা বসবাস করিতেন এবং যিনি একইরূপে মুহাম্মাদ-এর মধ্যে ভবিষ্যৎ নবীর লক্ষণসমূহ সনাক্ত করিয়াছিলেন এবং সেই মর্মে তাঁহার ও মায়সারার নিকট ব্যক্ত করিয়াছিলেন। ৩৭ আরও বর্ণিত আছে যে, মায়সারা স্বয়ং ফিরতি ভ্রমণের সময় মুহাম্মাদ-কে দুইজন ফেরেশতা (অন্য এক বর্ণনামতে মেঘখণ্ড) কর্তৃক রৌদ্র হইতে ছায়াদান করিতে দেখিয়াছেন। এই সকল বর্ণনার যথার্থতা অবশ্য তর্কসাপেক্ষ। যাহা হউক, ব্যবসায় অভিযান আশাতীতরূপ সফল প্রমাণিত হয়। মহানবী খাদীজা (রা)-এর পণ্যসম্ভার শুধু প্রচুর মুনাফাতেই বিক্রয় করেন নাই, বরং তিনি বিক্রয়লব্ধ অর্থ দ্বারা আরও পণ্য ক্রয় করিয়া আনেন যাহা দ্বারা মক্কায় ফেরত ত্যাগমনের পর প্রায় দ্বিগুণ মুনাফা অর্জিত হইয়াছিল।
মুহাম্মাদ ও খাদীজা (রা)-এর মধ্যে প্রতিষ্ঠিত এই যোগাযোগ অবশেষে তাঁহাদের বিবাহ পর্যন্ত গড়ায়। মহানবী খাদীজা (রা)-এর পক্ষে আরও কোন ব্যবসায় পরিচালনা করিয়াছিলেন কিনা তাহা স্পষ্ট নহে। তবে সকল বর্ণনাই একমত যে, খাদীজা (রা) ক্রমান্বয়ে মহানবী-এর ব্যক্তিত্ব, চরিত্র ও গুণাবলীতে আকৃষ্ট হইয়া পড়েন এবং তিনিই বিবাহের প্রস্তাবদানে আগ্রহী ভূমিকা পালন করেন, যদিও পূর্বে তিনি একাধিক অবস্থাপন্ন কুরায়শ বংশীয় লোকের প্রস্তাব প্রত্যাখ্যান করিয়াছিলেন। তিনি তাঁহার বিশ্বস্ত সহচরী ও বান্ধবী নাফীসা বিন্ত মুনায়াকে এই বিষয়ে মুহাম্মাদ-এর মতামত জানার জন্য নিয়োগ করেন। ৩৮
নাফীসা বলেন, যখন তিনি প্রাথমিক কিছু কথাবার্তা বলার পর বিবাহের প্রসঙ্গ উত্থাপন করিলেন তখন মুহাম্মাদ তাঁহার জীবনের সেই পর্যায়ে বিবাহের জন্য আর্থিক অসচ্ছলতার কথা ব্যক্ত করেন এবং যখন তিনি তাহার আসল উদ্দেশ্য ও তাহার নিয়োগকর্ত্রী ও প্রস্তাবিত পাত্রীর পরিচিতি প্রকাশ করিলেন তখন মহানবী বিস্ময়াভিভূত হইয়া মন্তব্য করিলেন: "আমার জন্য তাহা কি করিয়া সম্ভব?" নাফীসা জবাব দিলেন "তাহা আমার উপর ছাড়িয়া দিন"। ইহার পর মহানবী বিষয়টি লইয়া অগ্রসর হওয়ার জন্য তাহাকে সম্মতি দান করেন।
নাফীসা সম্পূর্ণ সন্তুষ্ট হইয়া খাদীজা (রা)-এর নিকট ফিরিয়া আসেন এবং তাহার দৌত্যকার্যের ফলাফল সম্পর্কে তাঁহাকে অবহিত করেন। ৩৯ অতঃপর দুই পক্ষের মধ্যে আরও আলোচনা অনুষ্ঠিত হয় এবং নির্ধারিত দিনে তাঁহাদের বিবাহ অনুষ্ঠিত হয়। বর্ণিত আছে যে, মহানবী -এর চাচা আবূ তালিব অথবা হামযা (রা) এই উপলক্ষে তাঁহার অভিভাবকের দায়িত্ব পালন করেন এবং খাদীজার চাচা 'আমর ইবন আসাদ খাদীজা (রা)-এর পক্ষে অভিভাবকের দায়িত্ব পালন করেন। এই সময় খাদীজা (রা)-এর বয়স ছিল চল্লিশ বৎসর এবং মুহাম্মাদ-এর বয়স ছিল মাত্র পঁচিশ বৎসর। ৪০
এই বিবাহ সম্পূর্ণ সুখী ও সফল হইয়াছিল। ইহা খাদীজা (রা)-র ইনতিকাল পর্যন্ত পঁচিশ বৎসর পর্যন্ত স্থায়ী হয়। এই দীর্ঘ এক-চতুর্থাংশ শতাব্দীতে যখন মহানবী-এর পূর্ণ যৌবনকাল অতিক্রান্ত হইতেছিল, তিনি অন্য কোন স্ত্রী গ্রহণ করেন নাই। একজন (ইবরাহীম) ব্যতীত তাঁহার সকল সন্তান খাদীজার গর্ভজাত। তাঁহারা ছিলেন দুই পুত্র: আল-কাসিম ও আত-তাহির ('আবদুল্লাহ) এবং চার কন্যা যয়নব, রুকায়্যা, উম্মু কুলছুম ও ফাতিমা (রা)। ইবরাহীমসহ, যিনি পরবর্তী সময়ে মারিয়ার গর্ভে জন্মগ্রহণ করেন, সকল পুত্র শৈশবেই ইনতিকাল করেন। অন্যদিকে কন্যাগণ দীর্ঘদিন বাঁচিয়াছিলেন এবং ইসলাম গ্রহণ ও মদীনায় হিজরত করিয়াছিলেন। কন্যাদের দুইজনকে প্রথমে আবু লাহাবের দুই পুত্রের সহিত বাগদান করা হইয়াছিল। কিন্তু আবূ লাহাবের স্ত্রী উম্মু জামীল (আবূ সুফ্যানের ভগ্নী)-এর বিদ্বেষ ও বিরোধিতার কারণে শেষ পর্যন্ত তাহাদের বিবাহ অনুষ্ঠিত হয় নাই। অবশেষে যয়নবের বিবাহ হয় আবুল 'আস ইবনুর রাবী' (ইবন 'আবদুল 'উযযা ইব্‌ন 'আব্দ শামস ইবন 'আব্দ মানাফ)-এর সহিত। ৪১ রুকায়্যা এবং উম্মু কুলছুম (রা)-এর বিবাহ, পরপর একজনের মৃত্যুর পর অন্যজনের, উছমান ইবন 'আফফান (রা)-এর সহিত হয় এবং ফাতিমা (রা)-এর বিবাহ হয় আলী ইব্‌ন আবী তালিব (রা)-এর সহিত।
খাদীজা (রা)-এর সহিত বিবাহ মুহাম্মাদ-কে তাঁহার অসচ্ছল আর্থিক অবস্থা হইতে মুক্তি দেয়। এখন হইতে তিনি তাঁহার চাচা আবু তালিবের গৃহ ত্যাগ করিয়া স্বাধীনভাবে খাদীজা (রা)-এর সহিত বসবাস করিতে শুরু করেন। খাদীজা (রা) তাঁহার সকল ধন-সম্পদ মুহাম্মাদ-এর অধীনে ন্যস্ত করেন। ইহা নিঃসন্দেহে তাঁহাকে তুলনামূলকভাবে স্বচ্ছন্দ ও পরিতৃপ্ত জীবন দান করিয়াছিল। তাঁহার অবস্থার এই অনুকূল পরিবর্তন কুরাঅনের ৯৩: ৮ আয়াতে স্পষ্ট ভাষায় উল্লিখিত হইয়াছেঃ "তিনি কি তোমাকে নিঃস্ব পান নাই, অতঃপর সমৃদ্ধশালী করিয়াছেন?"
ঐতিহাসিকগণ খাদীজা (রা)-এর সহিত তাঁহার বিবাহের পরবর্তী প্রায় দশ বৎসর যাবত তাঁহার কর্মকাণ্ড সম্পর্কে সম্পূর্ণ নীরব। এই সময়ের তাঁহার উল্লেখযোগ্য কর্মকাণ্ড সম্পর্কে আমরা কেবল পরোক্ষ আভাস পাই খাদীজা (রা)-এর তাৎক্ষণিক প্রতিক্রিয়া ও মন্তব্য সম্পর্কিত বিখ্যাত বর্ণনা হইতে, যাহা তিনি মহানবীর প্রথম ওহী প্রাপ্তির পর, চরম উৎকণ্ঠিত ও ভয়ার্ত অবস্থায় তাঁহার নিকট আগমনের পর করিয়াছিলেন। তিনি তাঁহাকে এই বলিয়া সান্ত্বনা দিয়াছিলেন যে, আল্লাহ তাঁহার কোন ক্ষতি করিতে পারেন না। কারণ "আপনি সর্বদা সত্য কথা বলেন, মেহমানদের আপ্যায়ন করেন, আত্মীয়দের দেখাশুনা করেন, গরীব ও দুর্দশাগ্রস্ত লোকদের সাহায্য ও সহায়তা করেন" ইত্যাদি। ৪২ স্পষ্টত ইহাই ছিল তাঁহার দৈনন্দিন জীবন ও চরিত্রের বাস্তব চিত্র যাহা খাদীজা (রা)-র নিকট তাঁহাদের জীবনের সেই গুরুত্বপূর্ণ সন্ধিক্ষণে তাঁহার ও তাঁহার মহান স্বামীর আশ্বস্ততা ও সান্ত্বনার কারণস্বরূপ তাৎক্ষণিকভাবে দেখা দিয়াছিল। ইহাতে কোন সন্দেহ নাই যে, মহানবী তাঁহার নূতন অর্জিত সচ্ছন্দ অবস্থাকে কল্যাণকর কাজে নিয়োজিত করিয়াছিলেন এবং খাদীজা (রা) কর্তৃক উল্লিখিত কল্যাণমূলক কার্যাবলীতে নিজেকে খ্যাতিমান করিয়াছিলেন।
তাঁহার বিবাহিত জীবনের প্রথম দশ বৎসর কালের কমপক্ষে দুইটি সুনির্দিষ্ট কাজ সম্পর্কে আমরা অবহিত যাহাকে স্পষ্টভাবে খাদীজা (রা) কর্তৃক উল্লিখিত কল্যাণমূলক কার্যাবলী শ্রেণীর অন্তভুক্ত করা যায়। একটি আবূ তালিবের পুত্র 'আলী (রা)-কে প্রতিপালনের জন্য তাঁহার গ্রহণ। বর্ণিত আছে যে, বৃহৎ পরিবার ও এক বৎসর খরার কারণে আবূ তালিব কঠিন সময় অতিবাহিত করিতেছিলেন। এই অবস্থায় মহানবী তাঁহার অপেক্ষাকৃত সচ্ছল অবস্থাপন্ন চাচা 'আব্বাস (রা)-কে বলিলেন, আবূ তালিবের কষ্ট লাঘবের জন্য তাঁহাদের উভয়ের কিছু করা দরকার। তখন তাঁহারা উভয়ে আবূ তালিবের নিকট গমন করিলেন এবং তাহার কয়েকজন পুত্রের লালন-পালন ভার তাঁহাদের উপর অর্পণ করার জন্য তাহাকে প্রস্তাব করিলেন। বৃদ্ধ আবূ তালিব রাজি হইলেন। তারপর মহানবী 'আলীকে গ্রহণ করেন এবং 'আব্বাস গ্রহণ করেন জা'ফারকে। মহানবী 'আলীকে তাঁহার পুত্রের ন্যায় লালন-পালন করেন। তিনি ইসলাম গ্রহণকারী প্রথম কয়েকজন অন্যতম ছিলেন এবং যেরূপ উপরে বর্ণিত হইয়াছে তাঁহার নিকট মহানবী পরবর্তীতে তাঁহার কনিষ্ঠা কন্যা ফাতিমাকে বিবাহ দেন।
অন্য কাজটি যায়দ ইবন হারিছাকে দত্তকরূপে গ্রহণ। যায়দ যখন বালক ছিলেন তখন তাঁহার পরিবারের শত্রুগণ অথবা একদল দস্যু কর্তৃক ধৃত হইয়া বিখ্যাত উকায মেলায় ক্রীতদাসরূপে বিক্রীত হন এবং সেখানে খাদীজার ভাতিজা বা ভাগিনেয় হাকীম ইবন হিযাম তাহাকে ৪০০ দিরহামের বিনিময়ে খাদীজা (রা)-র জন্য ক্রয় করেন। খাদীজা (রা) মহানবী -এর সহিত বিবাহের পর তাঁহাকে বালক ভৃত্যটি উপহার দেন। মহানবী তাহাকে দাসত্বের সকল বন্ধন হইতে মুক্ত করিয়া দেন এবং তাঁহার প্রতি এইরূপ পিতৃসুলভ স্নেহ ও ভালবাসা দেখাইতে থাকেন যে, লোকেরা অচিরেই তাঁহাকে যায়দ ইব্‌ন মুহাম্মাদ বলিতে শুরু করে। পরবর্তী কালে যায়দের পিতা হারিছা এবং চাচা কা'ব তাঁহার খোঁজ পাইয়া মহানবী-এর নিকট আগমন করিয়া দাসত্বের অর্থের বিনিময়ে তাহাদের ছেলেকে তাহাদের নিকট ফেরত দেওয়ার জন্য তাঁহার আনুকূল্য কামনা করিয়াছিলেন। মহানবী অর্থ গ্রহণ করিতে অস্বীকার করিলেন, তবে যায়দকে তাঁহার সঙ্গে থাকার অথবা তাহার পিতা ও চাচার সহিত নিজ পরিবারে ফিরিয়া যাইবার সম্পূর্ণ স্বাধীনতা প্রদান করিলেন। যায়দ সেই পর্যন্ত মহানবী -এর আচরণে এইরূপ মুগ্ধ হইয়াছিলেন যে, তিনি তাঁহার সহিত থাকিতেই পছন্দ করিলেন। যায়দের পিতা ও চাচাকে অধিকতর আশ্বস্ততার প্রতীকস্বরূপ মহানবী তখন কা'বা প্রাঙ্গণে গমন করিলেন এবং প্রকাশ্যে যায়দকে পুত্র হিসাবে তাঁহার দত্তক গ্রহণের কথা ঘোষণা করিলেন। ৪৩ যায়দ তাঁহার অবশিষ্ট জীবন মহানবী-এর সহিত অতিবাহিত করেন এবং তাঁহার নবুওয়াতে বিশ্বাস স্থাপনকারী ও ইসলাম গ্রহণকারী প্রথম কয়েকজনের মধ্যে তিনি অন্তর্ভুক্ত ছিলেন।

📘 সীরাত বিশ্বকোষ > 📄 ছয়: কা'বাঘর পুনর্নির্মাণ ও মহানবী (সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম)-এর মধ্যস্থতা

📄 ছয়: কা'বাঘর পুনর্নির্মাণ ও মহানবী (সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম)-এর মধ্যস্থতা


মহানবী -এর বয়স যখন প্রায় পঁয়ত্রিশ বৎসর তখন তাঁহার চরিত্র ও ব্যক্তিত্ব একটি ঘটনার মাধ্যমে জাতীয় স্বীকৃতি লাভ করে। ঐতিহাসিকগণ এই ঘটনাটি বোধগম্য কারণেই যত্ন সহকারে কিছুটা বিস্তারিতভাবে লিপিবদ্ধ করিয়াছেন। ইহা ছিল কা'বার পুনর্নির্মাণ। প্রচুর বৃষ্টিপাতের কারণে সৃষ্ট বন্যায় ইহার দেয়ালে ফাটল দেখা দিয়াছিল। এই পর্যন্ত ইহাতে কোন ছাদও ছিল না এবং সম্প্রতি এক চোর ইহাতে রক্ষিত কিছু মূল্যবান জিনিসপত্র চুরি করিয়া নিয়া গিয়াছিল। এই কারণে কুরায়শ নেতৃবৃন্দ সিদ্ধান্ত গ্রহণ করিলেন, কাঠামোর ভিত্তি উচু করা, আরও উচু করিয়া ইহার দেয়াল পুনর্নির্মাণ এবং ইহার উপর একটি ছাদ নির্মাণের। মক্কায় সেই সময় মিসরীয় কপ্‌ট সম্প্রদায়ভুক্ত একজন উপযুক্ত কারিগর সহজলভ্য হওয়ায় পরিকল্পনাটির বাস্তবায়ন সহজতর হয় এবং সেই সঙ্গে জেদ্দা উপকূলের অদূরে একটি গ্রীক জাহাজ ধ্বংস হইয়া বায়ু ও ঢেউ তাড়িত হইয়া উহার কাঠ তীরে জমা হইলে পরিকল্পনাটির বাস্তবায়ন আরও সহজ হইয়া উঠে। কুরায়শ নেতৃবৃন্দ ছাদ নির্মাণের উদ্দেশ্যে উক্ত কাঠসমূহ ক্রয় করে। ৪৪ মহানবী -এর পিতা 'আবদুল্লাহর এক মামা বানু মাখযূম গোত্রের আবূ ওয়াহ্হ্ব ইব্‌ন 'আমর নির্মাণ পরিকল্পনায় একজন উপদেষ্টার ভূমিকা পালন করেন। ৪৫ কুরায়শ গোত্রগুলির সকলে কা'বাঘর পুনর্নির্মাণ কাজ নিজেদের মধ্যে ভাগাভাগি করিয়া লইবার সিদ্ধান্ত গ্রহণ করে।
পুনর্নির্মাণ কাজের সহিত প্রথমে বিদ্যমান দেয়াল ভাঙ্গার কাজ জড়িত ছিল; আর এই কাজটিতে প্রথমে যথেষ্ট দ্বিধা ও সঙ্কোচের সৃষ্টি হইয়াছিল। কারণ আল্লাহ্‌র ঘরে এইরূপ হস্তক্ষেপের কারণে, যদিও তাহা ভাল উদ্দেশ্যেই ছিল, ভাঙ্গন কাজে অংশগ্রহণকারীদের উপর আল্লাহ্‌র রোষ ও শাস্তি নামিয়া আসিবার আশঙ্কা করা হইয়াছিল। কিন্তু আল-ওয়ালীদ ইবনুল মুগীরার দুঃসাহসিকতা এই দ্বিধার পরিসমাপ্তি ঘটায়। তিনি এক কোণার দেয়ালের একটি ক্ষুদ্র অংশ প্রথম ভাঙিয়া ফেলেন এবং তারপর সকলে এক রাত অপেক্ষা করে তাহার কোন অমঙ্গল হয় কিনা দেখার জন্য। ৪৬ কিন্তু ঐ সময়ে তাহার কিছু না হওয়ায় সকলেই দেয়াল ভাঙার কাজ শুরু করিয়া দেয়। কুরায়শ গোত্রগুলি চারিটি স্বতন্ত্র দলে নিজেদের সংগঠিত করে। প্রত্যেক দল গৃহের চারি পার্শ্বের একপার্শ্ব ভাঙা ও পুনর্নির্মাণের দায়িত্ব গ্রহণ করে। মুহাম্মাদ -এর নবুওয়াত প্রাপ্তির মাত্র পাঁচ বৎসর পূর্বে এই বিখ্যাত গণপূর্ত কাজের জন্য গোত্রসমূহের এইরূপ শ্রেণীতে বিভক্ত হওয়ার ঘটনা উল্লেখ করা একটি কৌতূহল উদ্দীপক বিষয়। এই শ্রেণীবিভক্তি ছিল নিম্নরূপ:
গোত্র দায়িত্ব (ক) বানু 'আব্দ মানাফ দরজা ও সেইদিকের (অর্থাৎ পূর্বদিকের) ও বানু যুহরা দেয়াল। (খ) বানু মাখযূম ও কালো পাথর ও ইয়ামানী কোণের মধ্যবর্তী অন্য কয়েকটি গোত্র দেয়াল। (গ) বানু জুমাহ ও দরজার বিপরীত দিকের (অর্থাৎ বানু সাহম পশ্চিম দিকের) দেয়াল। (ঘ) বানু 'আবদিদ দার ও হাতীম ও ঐদিকের দেয়াল। বানু আসাদ ইবন 'আবদুল 'উযযা ও বানু কা'ব ইবন লু'আই
চাচা 'আব্বাসের সহিত একসঙ্গে নিজ কাঁধে পাথর বহন করিয়া মহানবী কা'বাঘর পুনর্নির্মাণ কাজে অংশগ্রহণ করিয়াছিলেন। ৪৯ পুনর্নির্মাণ কাজ স্বাভাবিক গতিতে অগ্রসর হইতেছিল, কিন্তু যখন দেয়ালগুলি এইরূপ উচ্চতায় পৌঁছিল যেখানে কালো পাথরকে (হাজরে আসওয়াদ) উহার স্থানে পুনঃস্থাপন করা প্রয়োজন, তখন গোত্রগুলির মধ্যে মতপার্থক্যের সৃষ্টি হয়। প্রতিটি গোত্রই পাথরটি পুনঃস্থাপনের সম্মান অর্জন করিতে আগ্রহী ছিল। সম্মত কার্যবণ্টন অনুযায়ী দেখা যায় যে, এই কাজের দায়িত্ব উপরে উল্লিখিত (ক) ও (খ) শ্রেণীর যে কোন বা উভয় শ্রেণীর গোত্রসমূহের উপর বর্তায়। কিন্তু অন্যান্যরা, বিশেষ করিয়া (ঘ) শ্রেণীর গোত্রসমূহ ইহার বিরোধিতা করে। ইবন ইসহাকের বর্ণনা অনুযায়ী, তাহারা আপোষহীনভাবে তাহাদের দাবি আদায়ের ঘোষণা করে এবং রক্তপূর্ণ পাত্রে নিজেদের হাত ডুবাইয়া, যাহাকে তাহারা বিরল সম্মান বলিয়া মনে করিয়াছে তাহা অর্জনের জন্য যুদ্ধ করিয়া তাহাদের জীবন উৎসর্গ করার অঙ্গীকার করে। ৪৮ ইহা লইয়া ঝগড়া বা অচলাবস্থা চার বা পাঁচ দিন অব্যাহত থাকে।
অতঃপর বর্ণিত আছে, বানু মাখযূম গোত্রের উমায়্যা ইবন মুগীরা, যিনি সকল কুরায়শের মধ্যে বয়োজ্যেষ্ঠতম ছিলেন, তাহাদিগকে এই মর্মে রাজী করাইতে সমর্থ হন যে, পরবর্তী ভোরে একটি নির্দিষ্ট দিক হইতে কা'বা প্রাঙ্গনে যে ব্যক্তি প্রথম প্রবেশ করিবে তাঁহার নিকট বিষয়টি মীমাংসার জন্য ন্যস্ত হইবে। ৪৯ (প্রকৃতপক্ষে পরের দিনের নয়, বরং তাৎক্ষণিকভাবে প্রথম আগমনকারীকে মধ্যস্থকারী মনোনীত করা হইয়াছিল, ইসলামী বিশ্বকোষ, ২০খ., পৃ. ৫৭৫, সম্পাদনা পরিষদ)। তাহাদের সকলের জন্য সৌভাগ্যবশত যে লোকটি সেদিন কা'বা প্রাঙ্গনে প্রথম প্রবেশ করিয়াছিলেন তিনি ছিলেন মুহাম্মাদ এবং প্রত্যেক ব্যক্তি তাঁহাকে সাদর অভ্যর্থনা জানাইল ও উচ্চস্বরে বলিল, "এই হইলেন বিশ্বস্ত ব্যক্তি; আমরা তাঁহাকে মানি, তিনি তো মুহাম্মাদ”। ৫০
মনোনীত সালিশ সময়ের দাবি পূরণ করিতে সক্ষম হইয়াছিলেন। তিনি একখণ্ড কাপড় আনিতে বলিলেন। কাপড় আনা হইলে তিনি উহাতে পাথরটি রাখিলেন এবং গোত্রগুলির নেতৃবৃন্দকে কাপড়ের চারিদিক ধরিতে বলিলেন এবং তারপর সকলে কাঙ্খিত স্থানে এবং কাঙ্খিত উচ্চতায় পাথরটি উত্তোলন করিল। যখন এইরূপ করা হইল তখন তিনি নিজে পুনরায় পাথরটি হাতে লইলেন এবং তাহা উহার জন্য নির্দিষ্ট স্থানে স্থাপন করিলেন।
এইভাবে বিবাদের নিষ্পত্তি হইল, আসন্ন যুদ্ধের ভয়াবহতা দূরীভূত হইল এবং নেতৃবৃন্দের গোত্রীয় অহমিকা পরিতৃপ্ত হইল। যদিও ঘটনাটি এইভাবেই সেই নাটকের সুখকর পরিসমাপ্তি ঘটাইয়াছে, কিন্তু ইহার শেষ অঙ্ক ইহা সম্পর্কে অনেক কিছু বলার সুযোগ স্পষ্টতই সৃষ্টি করিয়াছে। কেবল এইটুকু বলাই যথেষ্ট ব্যাখ্যা নহে যে, যে বিবদমান গোত্রগুলি ভ্রান্ত ধারণাপ্রসূত সম্মান অর্জনের জন্য নিজেদের জীবন বাজি রাখিয়াছিল তাহারা হঠাৎ এলাকায় কোন একটি নির্দিষ্ট দিক হইতে প্রথম প্রবেশকারী এক অপরিচিত ব্যক্তির সিদ্ধান্তের উপর তাহাদের সম্ভাবনার ঝুঁকি ধরিতে সম্মত হইয়াছিল। বিষয়টি এবং ভাবী সালিশের চরিত্র ও যোগ্যতা সম্পর্কে নিশ্চয়ই অনেক আলোচনা ও শলা-পরামর্শ হইয়াছিল। ইহাও অসম্ভব যে, মুহাম্মাদ যিনি স্বয়ং কা'বার পুনর্নির্মাণ কাজে সক্রিয়ভাবে অংশগ্রহণ করিয়াছিলেন এবং তাহা ছাড়া নিজ সমাজের একজন বুদ্ধিমান ও সম্মানিত সদস্য ছিলেন, এই বিবাদ ও তাহার সহিত জড়িত অন্যান্য বিষয়, বিশেষ করিয়া সালিশের মাধ্যমে উহা নিষ্পত্তির সিদ্ধান্ত সম্পর্কে অনবহিত ছিলেন এবং তারপর কেবল ঘটনাক্রমে এবং কোন একটি দিক হইতে কা'বা প্রাঙ্গনে প্রথম প্রবেশকারী হওয়ার সুবাদে নিজেই উক্ত সালিশ হন। ঘটনা যাহাই হউক না কেন—এই কাহিনী হইতেও ইহা স্পষ্ট যে, কুরায়শ নেতৃবৃন্দ তাঁহাকে সালিশ হিসাবে সাদর অভ্যর্থনা জ্ঞাপন করিয়াছিল কেবল এইজন্যই নহে যে, তিনি ঐ এলাকায় প্রথম প্রবেশকারী ব্যক্তি ছিলেন, বরং স্পষ্টত ও চূড়ান্তরূপে এই কারণে যে, তিনি "আল-আমীন, বিশ্বস্ত ব্যক্তি” যাঁহার ছিল প্রমাণিত বিশ্বস্ততা ও নির্ভরযোগ্যতা এবং যাঁহার সততা ও নিরপেক্ষতায় ছিল সবচাইতে অগাধ আস্থা। সমগ্র কাহিনীর ইহাই মূল বক্তব্য। সালিশী তৎকালীন কুরায়শ নেতৃবৃন্দের গোত্র-চেতনা ও বংশ-গৌরবের উপর মুহাম্মাদ-এর চরিত্র ও ব্যক্তিত্বের অভ্রান্তরূপে বিজয় ঘোষণা করিয়াছিল। ইহা প্রকৃতই ছিল তাঁহার সম্পূর্ণ কল্পনামুক্ত চরিত্র, তাঁহার সত্যবাদিতা, নিরপেক্ষতা ও জনপ্রিয়তার প্রতি জাতীয় অনুমোদন।
সূত্রসমূহ সাধারণত এই মর্মে একমত যে, কা'বার পুনর্নির্মাণ কাজ মহানবী-এর নবুওয়াত প্রাপ্তির পাঁচ বৎসর পূর্বে সম্পন্ন হইয়াছিল। ইহার অর্থ, সেই সময় অর্থাৎ প্রায় পঁয়ত্রিশ বৎসর বয়স পর্যন্ত তিনি সমাজের একজন সাধারণ ও সম্মানিত সদস্য হিসাবে জীবন যাপন করিতেছিলেন। তিনি সমাজের দৈনন্দিন কার্যাবলীতে অংশগ্রহণ করিতেন, তাঁহার মহৎ চরিত্র ও সত্যবাদিতার জন্য সুপরিচিত ছিলেন এবং সকলেই তাঁহাকে পছন্দ ও বিশ্বাস করিত। নির্জনবাস ও ধ্যানমগ্ন থাকার সময়, যাহা সকল বর্ণনামতে ওহী আগমনের পূর্বে ঘটিয়াছিল, স্পষ্টত তখনও শুরু হয় নাই। সঠিক কোন বৎসর বা তারিখ হইতে তাঁহার জীবন যাপন পদ্ধতিতে এই লক্ষণীয় পরিবর্তন সূচিত হইয়াছিল তাহা জানা যায় না। তবে এইরূপ ধারণা করিয়া যে, ইহা কা'বাঘর পুনর্নির্মাণের বেশীদিন পরে সংঘটিত হয় নাই। বলা যাইতে পারে যে, নির্জনবাস ও ধ্যানমগ্ন থাকার সময়কাল সর্বোচ্চ চার বৎসরের অধিক ছিল না।

📘 সীরাত বিশ্বকোষ > 📄 সাত: আনুষ্ঠানিক শিক্ষার অভাব

📄 সাত: আনুষ্ঠানিক শিক্ষার অভাব


মহানবী-এর নবুওয়াত-পূর্ব জীবনের অপর এক লক্ষণীয় বৈশিষ্ট্য হইল তাঁহার কোন প্রকার আনুষ্ঠানিক শিক্ষার অ-প্রাপ্তি এবং তাঁহার পঠন ও লিখনে অপারগতা। ঐতিহাসিকগণ যদিও মহানবী-এর জীবন ও কার্যাবলীর অনেক ক্ষুদ্র বিষয় সম্পর্কে সতর্ক, কিন্তু তাহারা তাঁহার প্রথম জীবন ও যৌবনে কখনও তিনি কোন প্রকার শিক্ষা গ্রহণ করিয়াছেন এইরূপ কোন আভাস প্রদান করেন নাই। বিপরীতক্রমে মহানবী-এর নিজের এই মর্মে একাধিক উক্তি রহিয়াছে যে, তিনি ছিলেন একজন নিরক্ষর (উম্মী) অর্থাৎ প্রশিক্ষণপ্রাপ্ত ছিলেন না। স্বয়ং কুরআনেও একাধিক উক্তি রহিয়াছে যাহা অভ্রান্তরূপে প্রমাণ করে যে, তিনি কোন আনুষ্ঠানিক শিক্ষা গ্রহণ করেন নাই অথবা পড়িতে ও লিখিতেও জানিতেন না। এই তথ্যের প্রকাশ ঘটায়াছে 'উম্মিয়্যি' শব্দ হইতে যাহা একবচন ও বহুবচন আকারে কুরআনে সর্বমোট ছয়টি স্থানে উক্ত হইয়াছে যাহার অর্থ একজন নিরক্ষর ও অশিক্ষিত লোক উভয়ই (অর্থাৎ শিক্ষা সম্পর্কে যে ব্যক্তি তাহার মায়ের কোলে রহিয়াছে বলিয়া বিবেচিত) ৫৪ এবং যাহার আরও অর্থ "যে ব্যক্তি কোন অবতীর্ণ গ্রন্থ প্রাপ্ত হন নাই"। ৫৫ এইগুলি ব্যতীত কুরআনে আরও কতকগুলি আয়াত রহিয়াছে, যথা ১৬: ১০৩, ২৫: ৪-৫ ও ২৯: ৪৮ যাহাতে 'উম্মিয়্যি' শব্দটির উল্লেখ নাই কিন্তু যাহা স্পষ্টরূপে প্রমাণ করে যে, মহানবী পড়িতে ও লিখিতে জানিতেন না। কুরআনের এই উভয় প্রকার আয়াতের তাৎপর্য সম্পর্কে মহানবী-এর "নিরক্ষরতা" সম্পর্কে প্রাচ্যবিদগণের মতামত এবং তাঁহাদের এই অভিযোগ যে, তিনি মক্কার একজন "তথ্যদাতা" বা "তথ্যদাতাগণের" নিকট হইতে তাঁহার জ্ঞান লাভ করিয়াছিলেন প্রসঙ্গে আলোচনা করা হইবে। ৫৬
হুদায়বিয়ার সন্ধি সম্পাদনকালীন সুবিখ্যাত ঘটনাটি এই প্রসঙ্গে বিশেষ উল্লেখযোগ্য। বর্ণিত আছে যে, মহানবী-এর পক্ষে হযরত 'আলী (রা) কর্তৃক যখন সন্ধির শর্তাবলী লিখিত হইতেছিল তখন কুরায়শ নেতা সুহায়ল মহানবীর নামের সহিত 'রাসূলুল্লাহ' (আল্লাহ্র দূত) শব্দাবলীর ব্যবহারে আপত্তি উত্থাপন করিয়াছিল। মহানবী সন্ধি সম্পাদন নির্বিঘ্ন করার উদ্দেশ্যে "আলীকে উক্ত শব্দাবলী রহিত করিয়া তৎপরিবর্তে শুধু "আবদুল্লাহর পুত্র” লিখিতে বলিলেন। কিন্তু 'আলী বোধগম্য ভাবাবেগ ও ভক্তির কারণে 'রাসূলুল্লাহ' অভিব্যক্তিটি মুছিয়া ফেলিতে অস্বীকার করিলেন। ইহাতে মহানবী তাহার নিকট হইতে কাগজটি টানিয়া নিলেন এবং কোন বর্ণনামতে, কোথায় উক্ত অভিব্যক্তিটি লিখিত হইয়াছে তাহা 'আলীকে দেখাইতে বলিলেন এবং তাহা দেখান হইলে তিনি উহা কাটিয়া দেন এবং তদস্থলে কুরায়শ নেতার দাবি মোতাবেক বিকল্প অভিব্যক্তি 'আবদুল্লাহ্ পুত্র” লিখার ব্যবস্থা করেন। অন্যান্য বর্ণনায় শুধু উক্ত হইয়াছে যে, 'রাসূলুল্লাহ' অভিব্যক্তিতে কুরায়শ নেতার আপত্তির কারণে মহানবী উহার পরিবর্তে 'আবদুল্লাহ্র পুত্র' লিখিলেন। ৫৮ এই শেষোক্ত বর্ণনা সম্পর্কে খুব সঙ্গত কারণেই উল্লেখ করা হইয়াছে যে, উক্তিটিকে সেই অর্থে গ্রহণ করিতে হইবে যে অর্থে সন্ধিপত্র রাষ্ট্র বা প্রতিষ্ঠান প্রধান কর্তৃক লিখিত হয় অর্থাৎ তাহারা নিজেরা সন্ধিপত্র লিখেন না বা উহার খসড়া তৈয়ার করেন না, বরং তাহাদের ক্ষমতার অধীনে লিখিত হয়। ৫৯ এমনকি এই শেষোক্ত বর্ণনাতেও দ্ব্যর্থহীনভাবে উক্ত হয় নাই যে, মহানবী স্বয়ং শব্দগুলি লিখিয়াছিলেন।
কেহ কেহ এই শেষোক্ত বর্ণনাকে মহানবী-এর নিরক্ষরতা সম্পর্কে কুরআনের সাক্ষ্যের সহিত সমন্বয় সাধন করার প্রয়াস পাইয়াছেন এই ভাবিয়া যে, মহানবী তাঁহার জীবনের শেষদিকে এবং আলোচ্য কুরআনের আয়াত নাযিলের পরবর্তীতে কিছু কিছু পড়িতে ও লিখিতে শিখিয়াছিলেন। ৬০ এই অভিমতের ভিত্তি সম্ভবত 'আওন ইব্‌ন 'আবদুল্লাহ বর্ণিত একটি হাদীছ যাহাতে উক্ত হইয়াছে যে, "মহানবী পড়িবার ও লিখিবার পূর্বে ইনতিকাল করেন নাই।” ৬১ এই বিশেষ হাদীছটি সর্বসম্মতভাবে অত্যন্ত 'দুর্বল' বলিয়া বিবেচিত এবং কুরআনের সাক্ষ্যের সহিত ইহার বিরোধিতার কারণে প্রত্যাখ্যাত হইয়াছে। ৬২ ইহাও উক্ত হইয়াছে যে, মহানবী পরবর্তী কালে যদি পড়িতে এবং লিখিতে শিখিয়া থাকেন তাহা হইলে এই উল্লেখযোগ্য বিষয়টি এবং যে ব্যক্তি বা ব্যক্তিগণ তাঁহাকে উহা অর্জনে সহায়তা করিয়াছিলেন তাহার বা তাহাদের নাম তাঁহার অনেক সাহাবীই উল্লেখ ও বর্ণনা করিতেন। ৬৩ তাই এই ধারণা গ্রহণযোগ্য হইতে পারে না।

লিঙ্ক শেয়ার করুন
close

লিঙ্ক কপি করুন

0:00
0:00