📘 সীরাত বিশ্বকোষ > 📄 এক: এক নজরে তাঁহার কার্যাবলী

📄 এক: এক নজরে তাঁহার কার্যাবলী


মুহাম্মাদ তাঁহার চাচা আবূ তালিবের যত্নে ও স্নেহে লালিত-পালিত হন এবং পচিশ বৎসর বয়স পর্যন্ত তাহারই পরিবারের সদস্য হিসাবে বসবাস করিতে থাকেন। পরিবারের অন্যান্য সন্তান, বিশেষ করিয়া তাঁহার চাচাতো ভাইদের ন্যায় তিনি স্বভাবতই পরিবারের বিষয়াদি ও কর্মকাণ্ডে অংশগ্রহণ করিতেন। তখনকার মক্কার সমাজে সর্বপ্রধান পেশা ছিল ব্যবসায় এবং মেষ, ছাগল ও উট পালন। মুহাম্মাদ যে তাঁহার প্রথম জীবনে মক্কার উপত্যকাগুলিতে মেষ চরাইতেন তাহা তাঁহার নিজের উক্তি হইতেই জানা যায়। কারণ তিনি যখন তাঁহার লোকদের অবিসম্বাদিত নেতা তখনও তাঁহার প্রথম জীবনের পরিমিত অবস্থা সম্পর্কে কথা বলিতে লজ্জাবোধ করিতেন না। সুতরাং আবূ হুরায়রা (রা) বর্ণিত একটি হাদীছে উল্লিখিত হইয়াছে যে, “একদা মহানবী মন্তব্য করেন যে, এমন কোন নবী ছিলেন না যিনি মেষ চরান নাই। তাঁহাকে জিজ্ঞাসা করা হইল যে, তিনি নিজেও উহা করিয়াছেন কিনা? তিনি উত্তরে বলিলেন যে, তিনি নিজেও তাহা করিয়াছেন"।১ মহানবী-এর ভিন্ন ভিন্ন সাহাবী কর্তৃক বর্ণিত আরও কয়েকটি হাদীছেও একই মর্ম উল্লেখ রহিয়াছে। উহাদের কোন কোনটিতে মহানবী যে সকল স্থানে মেষ চরাইতেন উহাদের একটি হিসাবে আজয়াদ নামক স্থানের বিশেষভাবে উল্লেখ রহিয়াছে। ২ এইরূপও বর্ণিত আছে যে, মেষ চরাইবার সময় কখনও কখনও তিনি 'আরাক নামক এক প্রকার বন্য গাছের ফল আহরণ করিতেন। ৩
অর্থ উপার্জনের জন্য তিনি অন্যের মেষ চরাইতেন কিনা তাহা স্পষ্ট নহে। প্রশ্নটি প্রধানত একটি হাদীছের ব্যাখ্যার উপর আবর্তিত যেখানে উক্ত হইয়াছে যে, তিনি "মক্কার লোকদের জন্য কারারীত-এ (বা ইহার বিনিময়ে) মেষ চরাইতেন। কেহ কেহ কারারীতকে একটি স্থানের নাম হিসাবে গ্রহণ করিয়াছেন। কিন্তু যেহেতু এই নামে মক্কায় কিংবা উহার নিকটে কোন স্থান ছিল বলিয়া জানা নাই তাই অন্যরা ইহাকে একটি মুদ্রার নাম কীরাত-এর বহুবচনরূপে গণ্য করিয়াছেন। কিন্তু এই ব্যাখ্যাতেও সমস্যার সম্পূর্ণ সমাধান হয় নাই। কারণ কীরাত নামে কোন মুদ্রা তৎকালে আরবে প্রচলিত ছিল না। ৫
কৈশোরে মেষ চরানো মুহাম্মাদকে নিঃসন্দেহে মরুভূমির জীবন এবং শহরের পরিবেশ, যেখানে তিনি বড় হইয়াছেন, উভয়ের সহিত সুপরিচিত করিয়া তুলিয়াছিল। এই অভিজ্ঞতা তাঁহাকে তাঁহার কর্ম ও সংগ্রামের সময় টিকিয়া থাকিতে সাহায্য করে। ইহাও অসম্ভব নহে যে, প্রকৃতির বিশাল বিস্তার আপাত দৃষ্টিতে সীমাহীন মরুভূমি, গহীন উপত্যকা ও নির্জন দৃশ্য দ্বারা বিচ্ছিন্ন ঊষর ও খাড়া পর্বতমালা যেখানে তিনি ঘুরিয়া বেড়াইতেন এবং বিশাল গম্বুজের ন্যায় দৃশ্যমান ও সন্ধ্যাবেলা তারকা খচিত পরিষ্কার নীল আকাশ তাঁহার মনে গভীর রেখাপাত করিয়া থাকিবে। কারণ প্রথম জীবন হইতেই তিনি ছিলেন চিন্তাশীল, গম্ভীর, অত্যধিক বুদ্ধিমান এবং লক্ষণীয়ভাবে প্রাজ্ঞ ব্যক্তি।
যদিও অন্যদের মত তিনিও পরিবারের কাজ ও বিষয়াদিতে অংশগ্রহণ করিতেন, কিন্তু চরিত্র, মেজাজ ও আচরণে তিনি তাঁহার সমকক্ষদের হইতে সম্পূর্ণ ভিন্ন প্রকৃতির ছিলেন। ইহার লিখিত প্রমাণ রহিয়াছে যে, সর্বগ্রাসী পৌত্তলিকতার মধ্যে ও কুসংস্কারে আচ্ছন্ন, স্বাভাবিকভাবে মদ ও নারীতে অবাধ ভোগ-বিলাসের সহিত সম্পৃক্ত পঙ্কিলতায় নিমজ্জিত সমাজে বাস করিয়াও তিনি সকল কালিমা ও ঘৃণ্য কাজ হইতে মুক্ত জীবন পরিচালনা করিয়াছেন। ইবন ইসহাকের বরাতে আত-তাবারী একটি বর্ণনা উদ্ধৃত করিয়াছেন যাহাতে উক্ত হইয়াছে যে, মহানবী অন্যান্য বালকদের সহিত মেষ চরাইবার কালে দুইবার মক্কার নৈশকালীন জীবন উপভোগের কথা ভাবিয়াছিলেন, কিন্তু উভয় সময়ই আল্লাহ্র তরফ হইতে হস্তক্ষেপের ফলে তিনি ফাঁদে জড়ানো হইতে বাঁচিয়া যান এইভাবে যে, সংশ্লিষ্ট স্থানে পৌছিবার পূর্বেই তিনি নিদ্রামগ্ন হইয়া পড়েন। ৬ ইন্ন কাছীর যথার্থই উল্লেখ করিয়াছেন যে, ইহা খুবই অদ্ভূত এবং অস্বাভাবিক বর্ণনা এবং বলেন যে, বর্ণনাকারী সম্ভবত তাহার নিজের বিষয়কে মহানবী-এর বিষয়ের সহিত তালগোল পাকাইয়া ফেলিয়াছেন। ৭

📘 সীরাত বিশ্বকোষ > 📄 দুই: শিমূলক কার্যাবলী পরিহার

📄 দুই: শিমূলক কার্যাবলী পরিহার


বাল্যকাল হইতেই মহানবী তাঁহার লোকদের শেরেকী (পৌত্তলিক) আচার-অনুষ্ঠানের প্রতি দারুণ ঘৃণাভাব পোষণ করিতেন এবং নিজে কখনও কোন শেরেকী উপাসনা বা উৎসবে অংশগ্রহণ করেন নাই। পরিবারের তরুণী উম্মু হানী (রা) কর্তৃক বর্ণিত আছে যে, একবার আবূ তালিব কোন এক দেবতার সম্মানে একটি বার্ষিক উৎসবে যোগদানের জন্য বারবার বলা সত্ত্বেও উহাতে বালক মুহাম্মাদের দৃঢ় অস্বীকৃতি জ্ঞাপনের জন্য তাঁহার প্রতি ভীষণ রাগান্বিত হইয়াছিলেন। ৮ উম্মুল মু'মিনীন 'আইশা (রা) বর্ণিত অপর এক হাদীছে উক্ত হইয়াছে যে, তিনি মহানবী-কে বলিতে শুনিয়াছেন: "আমি কখনও কোন দেবতার বেদীতে উৎসর্গীকৃত কোন কিছুর স্বাদ গ্রহণ করি নাই, এমনকি আল্লাহ আমাকে তাঁহার বার্তা দ্বারা সম্মানিত করার পূর্বেও নহে”।৯
'আবদুল্লাহ ইবন 'উমার (রা) বর্ণিত অপর এক হাদীছে উল্লেখ রহিয়াছে যে, নবুওয়াত প্রাপ্তির অনেক পূর্বে একবার মহানবী-এর সামনে কিছু গোশতের তরকারী আনা হয়। কিন্তু তিনি এই বলিয়া উহা গ্রহণ করিতে অস্বীকার করিলেন যে, বেদীতে উৎসর্গীকৃত কোন কিছু তিনি ভক্ষণ করেন না। ১০ যায়দ ২ হারিছা (রা) বর্ণিত আর একটি হাদীছে রহিয়াছে যে, মহানবী, নবুওয়াত প্রাপ্তির পূর্বেও আস-সাফা ও আল-মারওয়ার মধ্যখানে স্থাপিত মূর্তিগুলিকে স্পর্শ করিতেন না, যেরূপ কুরায়শগণ উক্ত স্থান দুইটির মধ্যে দৌড়াইবার সময় অথবা কা'বাঘর প্রদক্ষিণ কালে করিত। ১১
পুনরায় 'আলী ইব্‌ন আবী তালিব (রা) বর্ণিত একটি হাদীছে উক্ত হইয়াছে, "একবার মহানবী -কে প্রশ্ন করা হইল 'আপনি কি কখনও কোন মূর্তির পূজা করিয়াছেন? তিনি উত্তরে বলিলেন: 'না'। লোকজন জিজ্ঞাসা করিল, 'আপনি কখনও মদ পান করিয়াছেন? তিনি উত্তরে বলিলেন: 'না'। কারণ আমি জানিতাম, "তাহারা যাহা করে তাহা কুফরী, যদিও আমি তখন কিতাব বা ঈমান সম্পর্কে অবহিত ছিলাম না"। ১২
বস্তুতপক্ষে মহানবীর-এর নবুওয়াত পূর্ববর্তী ধর্মীয় অবস্থা সম্পর্কে বর্ণনা করা যাইতে পারে যে, কিতাব (কুরআন) এবং ঈমানের বিস্তারিত সম্পর্কে তাঁহার জ্ঞানের অভাব ছিল। ইহাই কুরআনের ৪২ঃ ৫২ নং আয়াতে উল্লিখিত হইয়াছে:
مَا كُنْتَ تَدْرِي مَا الْكِتَبُ وَلَا الْإِيْمَانُ .
"কিতাব কিংবা ঈমান সম্পর্কে তুমি অবহিত ছিলে না"।
قُلْ إِنَّنِي هَدْنِي رَبِّي إِلَى صِرَاطٍ مُسْتَقِيمٍ دِيْنًا قَيِّمًا مِّلَّةَ إِبْرَاهِيمَ حَنِيفًا আয়াত ৬: ১৬১-ও কিছু মাত্রায় একই অর্থ বহন করে, যাহা নিম্নরূপঃ
"বল, নিশ্চয় আমার প্রভু আমাকে সোজা পথ, সুপ্রতিষ্ঠ দীন এবং ইবরাহীমের সঠিক পথে পরিচালনা করিয়াছেন"
উল্লিখিত দুইটি আয়াতের প্রেক্ষিতে আয়াত ৯৩ঃ ৭-এর মর্ম গ্রহণ করিতে হইবে। আয়াতটি নিম্নরূপ:
وَوَجَدَكَ ضَالاً فَهَدَى .
"এবং তিনি কি তোমাকে পথহারারূপে পান নাই, অতঃপর তোমাকে পথ প্রদর্শন করিয়াছেন"?
অবতরণের ক্রম অনুসারে তিনটি আয়াতের মধ্যে এই আয়াতটি প্রথম। আয়াতটিতে মহানবী -এর নবুওয়াত প্রাপ্তির পূর্ববর্তী সময়ে তাঁহার কঠিন মানসিক চাপ ও উত্তেজনা, আধ্যাত্মিক আকুল আকাঙ্খা ও উদ্বেগ-উৎকণ্ঠার বিষয় উল্লেখ করা হইয়াছে। একই সঙ্গে ইহাতে তাঁহার নূতন আলোকপ্রাপ্তিতে দারুণ উপশম ও কৃতজ্ঞতাবোধেরও ইঙ্গিত রহিয়াছে। উল্লিখিত তিনটি আয়াতের একটিরও অর্থ এই মর্মে করা যায় না যে, মহানবী নবুওয়াত প্রাপ্তির পূর্বে পৌত্তলিকতায় আকীর্ণ অর্থে পথভ্রষ্ট (ضال) ছিলেন। এই প্রসঙ্গে ইহা মনে রাখিতে হইবে যে, ضال শব্দটি কুরআনের অন্য অনেক শব্দের ন্যায় বিভিন্ন প্রসঙ্গে বিভিন্ন অর্থ প্রকাশ করিয়া থাকে। ১৩ পৌত্তলিক আচার-অনুষ্ঠান হইতে বিরত থাকা ছাড়া মহানবী কুরায়শ গোত্রের 'অন্যান্যদের ন্যায় ইবরাহীমী অনুষ্ঠান হজ্জ, 'উমরাহ ও কা'বাঘর প্রদক্ষিণ ইত্যাদি পালন করিতেন। তদুপরি তিনি তাহাদের ন্যায় মুহাররাম মাসের প্রথম দিনগুলিতে, বিশেষ করিয়া 'আশূরার দিন রোযা রাখিতেন। ১৪ বাল্যকাল হইতেই মহানবী -এর মধ্যে প্রগাঢ় বিনয় ও শালীনতাবোধ বিদ্যমান ছিল।
ইবন ইসহাক মহানবী-এর নিজ যবানীতে একটি ঘটনার বর্ণনা দিয়াছেন নিম্নরূপ : তিনি বলেন, "আমি কুরায়শ বালকদের মধ্যে নিজেকে দেখিতে পাইলাম যাহারা পাথর বহন করিতেছিল, যেমন বালকগণ উহা দ্বারা খেলা করিয়া থাকে। আমরা সকলে নিজেদের দেহ উন্মুক্ত করিয়াছিলাম, প্রত্যেকে নিজের জামা খুলিয়া গলার চারিদিকে পেঁচাইয়া রাখিয়াছিলাম এবং পাথর বহন করিতেছিলাম। আমি একই পথে যাইতেছিলাম এবং ফিরিতেছিলাম। এমন সময় আমাকে অদৃশ্য কেহ জোরে চড় মারিল যাহাতে আমি খুব ব্যথা পাইলাম এবং সে বলিল, 'জামা পরিধান কর'। সুতরাং আমি উহা লইয়া পরিধান করিলাম এবং আমার সঙ্গীদের মধ্যে আমি একাই জামা পরিয়া আমার ঘাড়ের উপর পাথর বহন করিতে লাগিলাম”। ১৫
কা'বাঘর পুনর্নির্মাণ প্রসঙ্গেও একইরূপ ঘটনার উল্লেখ রহিয়াছে। ১৬ এই কারণে সুহায়লীর ধারণা, ঘটনাটি মহানবী -এর জীবনে একাধিকবার ঘটিয়াছিল। ১৭ যাহা হউক, বর্ণনাটি এই কথাই স্মরণ করাইয়া দেয় যে, মহানবী এমনকি তাঁহার বাল্যাবস্থায়ও স্বাভাবিক কাজকর্ম সম্পাদনকালে নিজের শরীর বিবস্ত্র রাখা হইতে বিরত থাকিতেন। যখন বড় হইলেন তখন তিনি স্বীয় দৃষ্টান্তমূলক চরিত্র, আন্তরিকতা, সততা, ন্যায়পরায়ণতা, সত্যবাদিতা ও বিশ্বস্ততা দ্বারা খ্যাতি অর্জন করেন। ইবন ইসহাক এই কথাই নিম্নবর্ণিত অর্থপূর্ণ বাক্যে সংক্ষেপে বর্ণনা করিয়াছেন :
"সুতরাং আল্লাহ্র রাসূল, আল্লাহ্ শান্তি ও রহমত তাঁহার উপর বর্ষিত হউক, বড় হইলেন। আর আল্লাহ তাঁহার যত্ন নিলেন, তাঁহাকে ধর্মহীনতার পঙ্কিলতা হইতে রক্ষা করিলেন ও দূরে রাখিলেন। কারণ তিনি তাঁহাকে সম্মানিত করিতে ও তাঁহার রাসূলরূপে মনোনীত করিতে চাহিয়াছিলেন, যতক্ষণ না তিনি পূর্ণ বয়স লাভ করেন এবং মানুষ হিসাবে তাঁহার লোকদের মধ্যে সর্বোত্তমরূপে পরিণত হন। চরিত্রে তাহাদের মধ্যে মহত্তম, বংশে সর্বাপেক্ষা সম্ভ্রান্ত, প্রতিবেশী হিসাবে তাহাদের মধ্যে সর্বোত্তম, বুদ্ধিতে তাহাদের মধ্যে শ্রেষ্ঠতম, সর্বাপেক্ষা বিশ্বাসী, সর্বাপেক্ষা বিশ্বস্ত এবং মহত্ত্ব ও আভিজাত্যের মাধ্যমে হীন কার্য ও আচরণ হইতে সর্বাধিক দূরত্বে অবস্থানকারী যাহাতে তিনি 'বিশ্বাসী' বলিয়া পরিচিত হন। কারণ তাঁহার মধ্যে আল্লাহ সমস্ত ভাল গুণের সমাহার ঘটাইয়াছিলেন”। ১৮

📘 সীরাত বিশ্বকোষ > 📄 তিন: ফিজার যুদ্ধ

📄 তিন: ফিজার যুদ্ধ


মহানবী -এর প্রথম যৌবনের দুইটি বিখ্যাত ঘটনা ছিল ফিজার (পবিত্রতা হানিকর অন্যায়) যুদ্ধ এবং 'হিলফুল-ফুদূল' নামক সজ্জনদের সেবাসংঘ প্রতিষ্ঠা।
মহানবী -এর বয়স যখন আনুমানিক চৌদ্দ হইতে বিশ বৎসরের মধ্যে তখন ফিজার যুদ্ধগুলি সংঘটিত হয়। প্রকৃতপক্ষে এইগুলি অন্যূন পাঁচ বৎসরকাল ব্যাপী ধারাবাহিকভাবে সংঘটিত প্রায় চারিটির মত যুদ্ধ ছিল। ইহাদেরকে ফিজার (বা পবিত্রতা হানিকর অন্যায়) যুদ্ধ বলা হয় এই কারণে যে, ইহাদের সূচনা কিংবা সংঘটন হইয়াছিল পবিত্র মাস যুল-কা'দাতে যখন শান্তিভঙ্গ ও আন্তগোত্রীয় বিবাদ ঐতিহ্যগতভাবে পবিত্রতাহানির কাজ বলিয়া বিবেচিত হইত।
এই যুদ্ধগুলির সূত্রপাত হয় বিখ্যাত উকায মেলায়, যাহা বার্ষিক যুল-কা'দা মাসের প্রথম তিন সপ্তাহব্যাপী তায়েফ ও নাখলার মধ্যবর্তী এক স্থানে অনুষ্ঠিত হইত। গোত্রীয় অহমিকা এবং সঠিক বা ভুল যাহাই হউক না কেন—কোন গোত্রের একজন সদস্য বা মিত্রকে রক্ষা ও সমর্থন করার মধ্যে মিথ্যা সম্মান ও মর্যাদাবোধের সহিতও অনেকাংশে ইহাদের সম্পর্ক ছিল। উপদ্বীপের সকল অংশ হইতে উকাযে কেবল ব্যবসায়ী ও বণিকরাই তাহাদের পণ্যসামগ্রী লইয়া হাজির হইত না, বরং কবি, সঙ্গীতজ্ঞ, নৃত্যশিল্পী ও অন্যান্য বিনোদনকারীও নিজ নিজ কলা-কৌশল প্রদর্শন ও উহা হইতে অর্থ উপার্জনের জন্য আগমন করিত। মেলার অন্যতম প্রধান সাংস্কৃতিক বৈশিষ্ট্য ছিল বিভিন্ন গোত্রের কবিদের মধ্যে এক প্রকার জাতীয় প্রতিযোগিতা। তাহারা তাহাদের নিজ নিজ কবিতা আবৃত্তি করিত এবং প্রত্যেকেই নিজের ও নিজ গোত্রের মর্যাদা ও প্রাধান্য অন্যান্য গোত্রের উপর প্রতিষ্ঠায় আগ্রহী থাকিত। স্বভাবতই এইরূপ অবস্থায় গোত্রীয় চেতনা ও উত্তেজনা চরমে থাকিত এবং অনেক ক্ষেত্রে ইহা ঝগড়া-বিবাদ, দ্বন্দ্ব ও রক্তপাত পর্যন্ত গড়াইত।
প্রথম ফিজার যুদ্ধ সংঘটিত হওয়ার কারণ ছিল, কোন এক গোত্রের জনৈক ব্যক্তি উক্ত মেলায় দম্ভ করিয়া নিজেকে সকল আরবের মধ্যে সর্বাপেক্ষা সম্মানিত বলিয়া দাবি করিয়াছিল এবং অন্য এক গোত্রের একইরূপ একগুঁয়ে আরেক ব্যক্তি উক্ত দাবির প্রতিবাদ ও প্রথমোক্ত ব্যক্তিকে তরবারি দ্বারা আঘাত করিয়াছিল। দ্বিতীয় ও তৃতীয় যুদ্ধ বাঁধার কারণ ছিল যথাক্রমে এক গোত্রের এক মহিলাকে অপর এক গোত্রের এক পুরুষ কর্তৃক অপমানিত করা এবং এক গোত্রের এক ব্যক্তি অপর এক গোত্রের আরেক ব্যক্তির নিকট ঋণ পরিশোধ সংক্রান্ত বিষয়।
চতুর্থ বা শেষ যুদ্ধ বাঁধে আরও গুরুতর বিষয় লইয়া। হীরার রাজা নু'মান ইবনুল মুনযির উকায মেলায় তাহার বাণিজ্যদল প্রেরণের ইচ্ছা করেন এবং সেই উদ্দেশ্যে একজন উপযুক্ত যামিন (কাফীল) খুঁজিতেছিলেন। মক্কার বানু কিনানা গোত্রের বাররাদ ইব্‌ন কায়স এবং তায়েফের বানু হাওয়াযিন গোত্রের উরওয়া ইবন 'উতবা এই পদের জন্য প্রতিদ্বন্দ্বিতা করে এবং পদটিতে নিঃসন্দেহে কমিশন প্রাপ্তির ব্যবস্থা ছিল। নু'মান অবশেষ 'উরওয়াকে যামিনরূপে নির্বাচিত করেন। বাররাদ এই পরাজয়ের গ্লানি সহ্য করিতে না পারিয়া পথিমধ্যে 'উরওয়াকে আক্রমণ ও হত্যা করে। ১৯ পরিণতিতে যে যুদ্ধের দামামা বাজিয়া উঠে উহাতে একদিকে কুরায়শ ও কিনানা গোত্র ও তাহাদের মিত্রবৃন্দ এবং অন্যদিকে হাওয়াযিন ও কায়স গোত্র ও তাহাদের মিত্রবৃন্দ একে অপরের বিরুদ্ধে ঝাঁপাইয়া পড়ে।
দীর্ঘ সাময়িক বিরতিসহ যুদ্ধ চার বৎসর স্থায়ী হয়। প্রধানত মেলার সময় যুদ্ধ সংঘটিত হইত এবং পালাক্রমে একেকবার একেক প্রতিদ্বন্দ্বী পক্ষের জয় হইত। পরিশেষে এক চুক্তি দ্বারা যুদ্ধের পরিসমাপ্তি ঘটে। চুক্তিপত্রে এই শর্ত সন্নিবেশিত হয় যে, যুদ্ধে যে পক্ষের লোক অধিক সংখ্যক নিহত হইয়াছে সেই পক্ষ উহার অতিরিক্ত সংখ্যক নিহত লোকের জন্য অপর পক্ষ হইতে ক্ষতিপূরণ লাভ করিবে।
ইবন ইসহাকের মতানুসারে যখন সর্বশেষ ফিজার যুদ্ধ সংঘটিত হয় তখন মহানবী -এর বয়স ছিল বিশ বৎসর। ২০ কিন্তু ইব্‌ন হিশাম ১৪ অথবা ১৫ বৎসর বয়সের কথা উল্লেখ করেন এবং আরও বলেন যে, যুদ্ধের 'সময়' একদিন মহানবী তাঁহার চাচাগণ কর্তৃক যুদ্ধক্ষেত্রে নীত হইয়াছিলেন। অধিকন্তু তিনি একটি বিবরণ লিপিবদ্ধ করিয়াছেন যেখানে মহানবী -কে নিম্নরূপ উক্তি করিতে দেখা যায়: "আমি তাহাদের (আমার চাচাদের) নিকট তাহাদের প্রতি তাহাদের শত্রুগণ কর্তৃক নিক্ষিপ্ত তীর কুড়াইয়া আনিয়া দিতাম”। ২১
ইবন হিশাম মহানবী -এর এই বিশেষ উক্তির পক্ষে কোন নির্ভরযোগ্য উৎসের উল্লেখ করেন নাই। ইবন হিশামের বক্তব্য সঠিক বলিয়া ধরিয়া লইলে নিম্নবর্ণিত বিষয়গুলি বাহির হইয়া আসে:
(ক) ইহা প্রতীয়মান হয় যে, মহানবী স্বয়ং যুদ্ধক্ষেত্রে গমন করেন নাই, বরং তাঁহার চাচাগণ তাহাদের সহিত তাঁহাকে সেখানে "লইয়া যান”।
(খ) তাঁহার চাচাগণ কর্তৃক তাঁহাকে সেখানে লইয়া যাওয়ার বিষয়টি প্রমাণ করে যে, তিনি স্বাধীনভাবে কাজ করার অথবা যুদ্ধে সক্রিয়ভাবে অংশগ্রহণ করার মত বয়সের লোক ছিলেন না।
(গ) সেখানে তাঁহার ভূমিকা ছিল একজন বেসামরিক সহায়কের, তাঁহার চাচাদের প্রতি তাহাদের শত্রুগণ কর্তৃক নিক্ষিপ্ত তীর সংগ্রহ করিয়া তাহাদের নিকট ফেরত প্রদান ছিল তাঁহার একমাত্র দায়িত্ব (স্পষ্টতই তাঁহার চাচাগণ কর্তৃক উহাদের পুনর্ব্যবহারের জন্য)।
ইন্ন হিশামের একজন বয়োজ্যেষ্ঠ সমসাময়িক আল-ওয়াকিদী এই ঘটনার যে বর্ণনা দিয়াছেন তাহা ইবন ইসহাক ও ইন হিশাম উভয়ের বর্ণনার সংমিশ্রণ বলিয়া প্রতীয়মান হয়। সুতরাং স্পষ্টত ইবন ইসহাকের অনুসরণে আল-ওয়াকিদী বলেন, মহানবী সেই সময় ২০ বৎসর বয়সের ছিলেন এবং তারপর ইবন হিশামের ন্যায় মহানবী -এর এই উক্তি উদ্ধৃত করেন, "আমি উহাতে (অর্থাৎ ফিজার যুদ্ধে) আমার চাচাদের সহিত উপস্থিত ছিলাম এবং উহাতে তীর নিক্ষেপ করিয়াছিলাম। আমি যদি উহা না করিতাম তাহাই ভাল হইত"। ২২
পুনরায় ইবন হিশামের ন্যায় আল-ওয়াকিদীও এই বিবরণের পক্ষে কোন নির্ভরযোগ্য উৎসের উল্লেখ করেন নাই। তাহার পক্ষে এই অনুল্লেখ আরও বিস্ময়কর এই কারণে যে, একই স্থানে এবং একই বিষয় সম্পর্কে তিনি হাকীম ইন্ন হিযাম (রা)-এর উক্তির পূর্ণ ইসনাদ প্রদান করিয়াছেন যেখানে তিনি বলিয়াছেন যে, তিনি মহানবীকে ফিজার যুদ্ধে উপস্থিত থাকিতে দেখিয়াছেন। ২৩ ইহা যথেষ্ট তাৎপর্যপূর্ণ যে, হাকীম ইন্ন হিযামের এই উক্তিতে মহানবী কর্তৃক তীর সংগ্রহ বা নিক্ষেপের কোন উল্লেখ নাই। বর্ণনাসমূহের এই সকল অসামঞ্জস্যের কারণে যুদ্ধে মহানবী -এর ভূমিকার সঠিক প্রকৃতি সম্পর্কে নিশ্চিত হওয়া খুবই কঠিন। স্পষ্টত ইব্‌ন হিশাম এবং আল-ওয়াকিদী কর্তৃক প্রদত্ত মহানবী -এর কথিত উক্তির দুইটি ভিন্ন ভিন্ন রূপের উভয়টিই তিনি যাহা বলিয়াছেন, যদি আদৌ এই বিষয়ে কিছু বলিয়া থাকেন, তাহার একই সময়ে সঠিক বর্ণনা হইতে পারে না।

📘 সীরাত বিশ্বকোষ > 📄 চার: হিলফুল্ ফুদূল

📄 চার: হিলফুল্ ফুদূল


ফিজার যুদ্ধের অবসানের পরপরই হিলফুল্ ফুদূল (حلف الفضول) নামে অভিহিত একটি চুক্তি সম্পদিত হয়। এই চুক্তি উক্ত যুদ্ধের কোন সরাসরি ফল ছিল না। তবে ইহা স্পষ্টত সেই শুভবুদ্ধি হইতে উদ্ভূত হইয়াছিল যাহা উক্ত যুদ্ধের অবসান ঘটাইয়াছিল এবং দেশে সাধারণভাবে প্রচলিত নিরাপত্তাহীনতা ও অরাজকতার ধ্বংসাত্মক পরিণতির স্বীকৃতি ছিল।
চুক্তি সম্পাদনের তাৎক্ষণিক কারণ ছিল এইরূপ: মক্কার বানু সাহম গোত্রের আল-'আস ইব্‌ন ওয়াইল নামক এক ব্যক্তি জনৈক সফরকারী ইয়ামানী (যুবায়দী) ব্যবসায়ীর নিকট হইতে কিছু পণ্য গ্রহণ করে, কিন্তু তাহাকে উহার মূল্য পরিশোধ করে নাই। শেষোক্ত ব্যক্তি আহলাফ নামক একটি গোষ্ঠীর নিকট আবেদন করে। গোষ্ঠীটি ইতিপূর্বে বানু 'আবদুদ-দার, বানু মাখযূম, বানু জুমাহ, বানু সাহম ও বানু 'আদিয়্যি ইব্‌ন কা'ব সমন্বয়ে গঠিত হইয়াছিল২৪ এবং আল-'আস ইব্‌ন ওয়াইল এই গোষ্ঠীরই অন্যতম সদস্য ছিল।
আহ্লাফ বিষয়টিতে হস্তক্ষেপ করিতে অস্বীকার করে। তাই সংক্ষুব্ধ ইয়ামানী বিষয়টি কুরায়শদের সাধারণ সভায় পেশ করে। এই সভা কা'বা প্রাঙ্গণে অনুষ্ঠিত হইত। এখানে মহানবী -এর এক চাচা যুবায়র ইবন 'আবদুল মুত্তালিব ('আবদুল্লাহর সহোদর ভাই) ইয়ামানীর বিষয়টি গ্রহণ করেন। তাহার উদ্যোগে বানু হাশিম, বানু আল-মুত্তালিব, বানু যুহ্রা; বানু আসাদ ও বানু তায়মের নেতৃবৃন্দ শেষোক্ত গোত্রের এবং নগরীর অন্যতম শ্রেষ্ঠ ধনাঢ্য ব্যক্তি, যদি নগরীর সর্বশ্রেষ্ঠ ধনাঢ্য ব্যক্তি না হন, 'আবদুল্লাহ ইব্‌ন জুদ'আনের গৃহে মিলিত হন। শেষোক্তজন এই উপলক্ষে বিরাট ভোজের আয়োজন করেন। সেখানে নেতৃবৃন্দ এবং তাহাদের উপস্থিত অনুগামীবৃন্দ একটি চুক্তিতে আবদ্ধ হন এবং সশ্রদ্ধ চিত্তে নিম্নবর্ণিত বিষয়সমূহে প্রতিশ্রুতি প্রদান করেন:
(ক) নির্যাতিতকে রক্ষা ও সমর্থন করা;
(খ) ন্যায়সম্মত মালিককে কোন সম্পত্তি হইতে অন্যায়ভাবে বঞ্চিত বা অধিকারচ্যুত করা হইলে উহা তাহাকে প্রত্যার্পণ করা: এবং
(গ) সংক্ষুব্ধ পক্ষের প্রতি অবিচার রোধ করা এবং ন্যায়বিচারের যাবতীয় ব্যবস্থা করা, সংশ্লিষ্ট পক্ষদের গোত্র ও গোষ্ঠী আনুগত্য অথবা তাহাদের সামাজিক মর্যাদা অথবা তাহাদের আবাসন নির্বিশেষে করা হইবে। ২৫
চুক্তির এই সৎ উদ্দেশ্যের কারণে ইহা হিলফুল ফুদূল বা "সজ্জনদের চুক্তি" নামে পরিচিতি লাভ করে। নামকরণের অপর এক ব্যাখ্যায় বলা হইয়াছে যে, চুক্তিটির নাম এইরূপ হইয়াছে এই কারণে যে, ইহার উদ্দেশ্য কোন ব্যক্তির অধিকার হইতে এই পরিমাণ সম্পত্তি ছিনাইয়া লওয়া যাহা তাহার ন্যায়সঙ্গত দাবির অতিরিক্ত (অর্থাৎ ফুদূল)। তৃতীয় একটি মত এই যে, ইহার এইরূপ নামকরণের কারণ চুক্তি সম্পাদনের পিছনে যাহারা সক্রিয় ছিলেন তাহাদের মধ্যে তিনজনের প্রত্যেকের নাম ছিল ফাদিল (অর্থাৎ আল-ফাদিল ইব্‌ন ফুদালা, আল-ফাদিল ইব্‌ন ওয়াদা'আ এবং আল-ফাদিল ইবনুল হারিছ) এবং ফুদূল ফা-এর বহুবচন। আরও একটি ব্যাখ্যা আমাদিগকে বিশ্বাস করাইতে চায় যে, ইহা এই নামে অভিহিত হইবার কারণ যাহারা এই চুক্তি সম্পাদন পছন্দ করে নাই তাহারা অবজ্ঞার সহিত মন্তব্য করিয়াছিল যে, চুক্তিবদ্ধ সদস্যগণ একটি অপ্রয়োজনীয় (ফুদুল) বিষয়ে শুধু শুধু নিজদিগকে কষ্টে ফেলিল। ২৬
ইহা অবশ্যই বলিতে হয় যে, সর্বশেষ উল্লিখিত তিনটি ব্যাখ্যা যে পরিস্থিতিতে চুক্তিটি সম্পাদিত হয় উহার সহিত সামঞ্জস্যপূর্ণ নহে। ইহা যে অন্যায়ের বিরুদ্ধে একটি সংগঠন ছিল এবং ইহার নাম যে যথার্থ করা হইয়াছিল তাহা যে শুধু উহা যে পটভূমিতে গঠিত হইয়াছিল উহা হইতেই পরিষ্কার তাহা নহে, বরং উহার পরবর্তী কার্যাবলী হইতেও উহা স্পষ্ট। ইহা প্রতিষ্ঠার পিছনে তিন ফাদিল-এর সক্রিয় থাকিবার গল্প সুবিদিত তথ্য দ্বারা সমর্থিত নহে, বরং যুবায়র ইবন 'আবদুল মুত্তালিব ও 'আবদুল্লাহ ইব্‌ন জুদ'আনই ইহার গঠনের পিছনে প্রধান ব্যক্তিত্ব ছিলেন। একইরূপে "অতিরিক্ত” বা অন্যায় অধিকার প্রসংগে নামের ব্যাখ্যা চুক্তির প্রকৃত উদ্দেশ্যই কেবল অনুমোদন করে। তদুপরি একটি প্রতিকূল গোষ্ঠীর অসর্তক ও দুঃখপূর্ণ মন্তব্য চুক্তিটির এইরূপ নাম প্রদান করিতে পারে না যদ্দ্বারা ইহা মানবজাতির ইতিহাসে খ্যাতি অর্জন করিয়াছে।
গোত্রসমূহের একটি দল যে ইহার গঠন পছন্দ করিত না অথবা ইহার উদ্দেশ্যের সহিত স্পষ্টত একমত ছিল না তাহা কেবল হিল্ফ গঠনের সহিত সম্পৃক্ত ঘটনাবলী হইতেই পরিষ্কার নহে, বরং ইবন ইসহাক কর্তৃক ইহার বর্ণনা কুসাই (কুসায়্যি)-এর মৃত্যুর পর কুরায়শ নেতৃবৃন্দের মধ্যে সৃষ্ট মতবিরোধ এবং পরিণতিতে আহ্লাফ ও মুতায়্যাবৃন নামে গোত্রগুলির দুইটি স্বতন্ত্র দলে বিভক্তি ২৭ সংক্রান্ত বর্ণনার অব্যবহিত পরে করা হইতেও স্পষ্ট। তিনি ইহার বর্ণনা মহানবী -এর প্রাথমিক জীবনের বিবরণের পর প্রদান করেন নাই, যদিও অন্যত্র তাহার বর্ণিত ঘটনাবলী এবং অন্যান্য উৎস হইতে ইহা স্পষ্ট যে, ফিজার যুদ্ধ অবসানের অত্যল্প কাল পরেই হিল্‌ফ প্রতিষ্ঠিত হইয়াছিল। মহানবী স্বয়ং উল্লেখ করিয়াছেন যে, ইহা প্রধানত মুতায়্যাবৃন দলের গোত্রসমূহের চুক্তি ছিল। ২৮ ইহা সাধারণভাবেও স্বীকৃত ঘটনা। ২৯
হিলফুল ফুদূল গঠন নিঃসন্দেহে একটি তাৎপর্যপূর্ণ ঘটনা ছিল এই হিসাবে যে, চুক্তিবদ্ধ গোত্রগুলি, তাহাদের অন্য বিবেচনা যাহাই হউক না কেন, কেবল গোত্র চেতনা ও স্থানিক বিবেচনার ঊর্ধ্বে উঠিয়া অভিন্ন মঙ্গলের জন্য উচ্চতর নীতি অনুযায়ী জীবন ধারণ ও কর্ম সম্পাদন করিতে আগাইয়া আসে। আরও তাৎপর্যপূর্ণ এই ঘটনা যে, মহানবী, যিনি তখনমাত্র যৌবনে পদার্পণ করিয়াছেন, 'আবদুল্লাহ ইব্‌ন জুদ'আনের গৃহের সম্মেলনে উপস্থিত ছিলেন এবং দল গঠনে সক্রিয় অংশগ্রহণ করেন। ৩০ ইহা তাঁহার জনগণের কাজে প্রথম রেকর্ডকৃত অংশগ্রহণ এবং তিনি ইহাকে তাঁহার জীবনের একটি গুরুত্বপূর্ণ ঘটনা হিসাবে স্বরণ করিতেন। তাঁহার জীবনের অনেক পরবর্তী পর্যায়ে এবং দীন ইসলাম প্রতিষ্ঠিত হইবার পর তিনি এইরূপ মন্তব্য করিয়াছেন বলিয়া বর্ণিত আছে যে, "এমনকি তখনও যদি কোন নির্যাতিত ব্যক্তি উক্ত হিল্ল্ফ-এর নামে তাঁহার সাহায্য প্রার্থনা করে তাহা হইলে তিনি তাহা আনন্দের সহিত করিবেন”। ৩১
প্রধানত ইহার প্রসংগে তিনি আরও বলিয়াছেন যে, "যদিও ইসলামে কোন চুক্তির (হিল্‌ল্ফ) আর কোন প্রয়োজন নাই, তবুও ইসলামের আবির্ভাবের পূর্বে যাহা কিছু সম্পাদিত হইয়াছে তাহা ইসলাম কর্তৃক সমর্থিত ও জোরদার করা হইয়াছে”। ৩২
হিল্‌ল্ফ উহার তাৎক্ষণিক উদ্দেশ্য পূরণে সফল হইয়াছিল। চুক্তি সম্পাদনের পর নেতৃবৃন্দ আল-'আস ইব্‌ন ওয়াইল-এর নিকট গমন করেন এবং ইয়ামানী ব্যবসায়ীকে পণ্য ফেরত দানে তাহাকে বাধ্য করেন। এই ঘটনা প্রমাণ করে যে, দলটি নগরীর সমাজ জীবনে একটি শক্তিশালী ফ্যাক্টররূপে কাজ করিত এবং আহ্হ্লাফ গোত্রগুলির বিরুদ্ধে নিজ শক্তি প্রয়োগ করিতে পারিত।
ইহারও উল্লেখ রহিয়াছে যে, অল্প কিছুদিন পর বানু খাছ'আম গোত্রের এক ব্যক্তি তাহার সুন্দরী কন্যাসহ মক্কায় হজ্জ বা 'উমরাহ করিতে আসে। নুবায়হ ইবনুল হাজ্জাজ নামক মক্কার জনৈক অধিবাসী অসৎ উদ্দেশ্যে মেয়েটিকে জোরপূর্বক অপহরণ করে। বেচারা পিতা হিলফুল ফুদূলের সাহায্য প্রার্থনা করিয়া কা'বা প্রাঙ্গণে চিৎকার দিতে থাকে। তৎক্ষণাৎ চুক্তিবদ্ধ গোত্রগুলির নেতৃবৃন্দ অস্ত্রশস্ত্রে সজ্জিত হইয়া আগাইয়া আসে এবং দুষ্কৃতকারীকে মেয়েটিকে তাহার পিতার নিকট প্রত্যর্পণ করিতে বাধ্য করে। ৩৩
ইসলাম প্রতিষ্ঠার পরেও হিলফ একটি জীবন্ত শক্তি হিসাবে অব্যাহত থাকে। খলীফা মু'আবিয়া (রা)-র আমলেও তাঁহার মদীনার গভর্নর আল-ওয়ালীদ ইবন 'উতবা আল-হুসায়ন ইন্ন 'আলী (রা)-এর পাওনা পরিশোধ করিতে বাধ্য হইয়াছিলেন যখন শেষোক্তজন তাঁহার অধিকার আদায়ের জন্য হিল্ল্ফ-এর সাহায্য কামনার হুমকি প্রদান করেন এবং যখন 'আবদুল্লাহ ইবনুয যুবায়র (রা) আল-হুসায়ন (রা)-এর পক্ষে তাঁহার সমর্থন ঘোষণা করেন। ৩৪

লিঙ্ক শেয়ার করুন
close

লিঙ্ক কপি করুন

0:00
0:00