📄 এক: বংশপরিচয়
মক্কার সম্ভ্রান্ত কুরায়শ বংশের ততোধিক সম্ভ্রান্ত বানু হাশিম গোত্রের সম্ভ্রান্ততম পরিবারে হযরত মুহাম্মাদ জন্মগ্রহণ করেন। ১ মক্কায় কুরায়শের এমন কোন গোত্র ছিল না যাহার সহিত তাঁহার রক্ত বৈবাহিক ক্ষেত্রে ঘনিষ্ঠ ছিল না। ২ তাঁহার পিতা আবদুল্লাহ ছিলেন আবদুল মুত্তালিবের পুত্র, তিনি হাশিমের পুত্র, তিনি আব্দ মানাফের পুত্র, তিনি কুসায়্যি-এর পুত্র, তিনি কিলাবের পুত্র, তিনি মুররাহ-র পুত্র, তিনি কা'বের পুত্র ছিলেন ইত্যাদি। এইরূপে তাঁহার বংশধারা নবী ইসমাঈল (আ) ও ইবরাহীম (আ) পর্যন্ত পৌছিয়াছে। তাঁহার মাতা আমিনা ছিলেন ওয়াহবের কন্যা, তিনি আবদ মানাফের পুত্র, তিনি যুহ্রাহ্-র পুত্র, তিনি কিলাবের পুত্র, তিনি মুররাহ্-র পুত্র ছিলেন ইত্যাদি। তিনি (ওয়াহ্হ্ব) যুহরা গোত্রের নেতা ছিলেন। সুতরাং পিতা ও মাতা উভয়ের বংশধারা কিলাব ইবন মুররাহ-তে মিলিত হইয়াছে। তাঁহার বংশতালিকা নিম্নরূপঃ৩
ইবরাহীম (আ)
ইসমাঈল (আ)
আদনান
মা'আদ্দ আক্ক (আল-হারিছ)
নিযার 'ইয়াদ কানাস উবায়দ আদ-দাহহাক
মুদার রাবী'আ ইয়াদ্ আনমার (?)
ইলয়াস কায়স 'আয়লান
মুদারিকা 'আমর 'উমায়র (আমের) (তাবীখাহ) (কামা'আহ)
খুযায়মাহ হুযায়ল গালিব (?)
কিনানা আসাদ আল-হুন
আন-নাদর মালক মিলকান আব্দ মানাফ H মালিক ইয়াখলিদ (?) H ফিহর (কুরায়শ) আস-সালত (?) গালিব মুহারিব আল-হারিছ (বানুল হারিছের আদি পুরুষ) লু'আয়্যি তামীম কায়স (আল-আদরাম) কা'ব 'আমের (অপর পাঁচ পুত্র) (বানু 'আমেরের আদি পিতা) আইদাহ, সামাহ, সা'দ 'আওফ ও আল-হারিছ?) মুররাহ 'আদিয়্য হুমায়স (বানু 'আদিয়্যির আদিপিতা) 'আমর সাহম জুমাহ কিলাব (বানু সাহমের আদি পিতা) (বানু জুমাহর আদি পিতা) তায়ম ইয়াকাযাহ (বানু তায়মের আদি পিতা) মাখযূম (বানু মাখযূমের আদি পিতা) কুসায়্যি যুহরাহ (বানূ যুহরাহর আদি পিতা) 'আবদুদ দার 'আব্দ মানাফ 'আবদুল উয্যা 'আব্দ 'আবদ মানাফ (বানু আবদুদ দারের (বানু আসাদের ওয়াহ্হ্ আদি পিতা) আদি পিতা) 'আব্দ শাম্স হাশিম আল-মুত্তালিব নাওফাল (বানু আব্দ শামস-এর আদি পিতা। 'উমায়্যা রাবী'আ 'আবদ আল-মুত্তালিব (বানূ উমায়্যার আদি পিতা) আল-হারিছ ৭জন অপর সাত পুত্র আবু লাহাব 'আবদুল্লাহ আল-আব্বাস প্রমুখ আমিনা
মুহাম্মাদ
'আদনানের দশম অধস্তন পুরুষ ফিত্র কুরায়শ নামে পরিচিত ছিলেন। তাঁহার নামানুসারেই তাঁহার সকল বংশধর কুরায়শ বা কুরায়শ গোত্র নামে পরিচিতি লাভ করে। ফিত্র-এর ষষ্ঠ অধস্তন পুরুষ কুসায়্যি ছিলেন মহানবী -এর পিতামহ 'আবদুল মুত্তালিবের প্র-পিতামহ। এই কুসায়্যি-ই, যেরূপ পূর্বে উল্লেখ করা হইয়াছে, মক্কায় কুরায়শদের বসতি স্থাপন, সেখানে তাহাদের পূর্ণ নিয়ন্ত্রণ প্রতিষ্ঠা এবং মক্কার জনজীবনের পাঁচটি ঐতিহ্যবাহী কার্য নিজ হাতে কেন্দ্রীভূত করিয়াছিলেন। ইহাও বলা হইয়াছে যে, কিভাবে এই কার্যগুলি পরবর্তীতে কুসায়্যি-এর বংশধর বানু 'আবদ মানাফ ও বানু 'আবদুদ দার কর্তৃক ভাগাভাগির ভিত্তিতে পরিচালিত হইয়াছিল এবং কিভাবে মহানবীর প্র-পিতামহ হাশিম আস-সিকায়া ও আর-রিফাদা-র কার্যাবলী পালন ছাড়াও, উত্তরে বায়যান্টাইন কর্তৃপক্ষ ও পারস্য এবং দক্ষিণে ইয়ামান ও আবিসিনিয়ার শাসকদের সহিত একাধিক সংখ্যক বাণিজ্যচুক্তি সম্পাদনের মাধ্যমে সামগ্রিকভাবে কুরায়শদের আন্তর্জাতিক বাণিজ্যের উন্নয়ন সাধন করিয়াছিলেন। তিনি কুরায়শদের বাণিজ্যপথে অবস্থিত আরব গোত্রসমূহের সহিতও বাণিজ্য চুক্তি সম্পাদন করিয়াছিলেন।
হাশিম তাঁহার এক বাণিজ্যিক সফরের সময় ইয়াছরিবের (মদীনা) বাজার পরিদর্শন করেন। সেখানে তিনি এক মহিলার সৌন্দর্য ও কর্তৃত্বমূলক ব্যক্তিত্বে অভিভূত হন। তিনি উক্ত মহিলাকে পণ্য ক্রয় ও বিক্রয়ে নিজ কর্মচারীদের তত্ত্বাবধান করিতে দেখেন। এই মহিলা ছিলেন বানু 'আদিয়্যি ইব্ন আন-নাজ্জার গোত্রের সালামা বিন্ত 'আমর। পূর্বে তাহার 'উহায়হা ইবনুল জুলাহ্-র সহিত বিবাহ হইয়াছিল। কিন্তু তখন তিনি ছিলেন তালাকপ্রাপ্তা। হাশিম তাহাকে বিবাহের প্রস্তাব করেন। মহিলা স্বীয় আভিজাত্য ও নিজ লোকদের মধ্যে তাহার গুরুত্বের কারণে এই শর্তে সম্মতি দান করেন যে, তাহাকে তাহার নিজ বিষয়াদি ব্যবস্থাপনার ব্যাপারে স্বাধীনতা প্রদান করিতে হইবে। হাশিম ইহাতে সম্মত হইয়া তাহাকে বিবাহ করেন এবং ব্যবসায় ও অন্যান্য বিষয় দেখাশুনার জন্য তাহাকে মদীনায় অবস্থান করিবার অনুমতি দিলেন। সেখানে তিনি পরবর্তী কালে হাশিমের এক পুত্র সন্তানের জন্মদান করেন। শিশুর নাম রাখা হয় শায়বা। স্বাভাবিকভাবে হashিম শিশুটিকে তাহার মাতার নিকট লালন-পালনের জন্য রাখিয়া দিলেন এবং মনে মনে ভাবিলেন যে, কৈশোরে পদার্পণ করিলে তাহাকে মক্কায় নিয়া আসিবেন। যখন সেই সময় আসন্নপ্রায় তখন হাশিম গাযায় (তখন সিরিয়ার, বর্তমানে ফিলিস্তীনের অন্তর্ভুক্ত) এক বাণিজ্যিক সফরে থাকা অবস্থায় হঠাৎ করিয়া ইন্তিকাল করেন। পুনরায় উল্লেখ্য যে, হাশিমই কুরায়শদের জন্য বৎসরে প্রধান দুইটি বাণিজ্য সফরের প্রথা প্রবর্তন করিয়াছিলেন : একবার গ্রীষ্মকালে সিরিয়ায় ও বায়যান্টাইন অঞ্চল অভিমুখে এবং দ্বিতীয়বার শীতকালে ইয়ামান ও আবিসিনিয়া অভিমুখে।
আস-সিকায়া ও আর-রিফাদার কার্যাবলী এখন হাশিমের কনিষ্ঠ ভ্রাতা আল-মুত্তালিবের উপর বর্তায়। তিনি তাহার পরলোকগত ভ্রাতার পুত্র শায়বাকে যথাসময়ে মদীনা হইতে মক্কায় লইয়া আসেন। তিনি যখন ছেলেটিকে সঙ্গে করিয়া লইয়া আসিয়াছিলেন তখন লোকেরা ঠাট্টার ছলে বলাবলি করিতেছিল যে, ছেলেটি আল-মুত্তালিবের ক্রীতদাস ('আবদুল মুত্তালিব)। আল-মুত্তালিব জনতার উদ্দেশ্যে চিৎকার করিয়া বলিলেন, "তোমাদের মুখে ছাই পড়ুক, সে তো আমার ভাই-এর পুত্র” । তখন হইতে ছেলেটির আসল নাম ঢাকা পড়িয়া যায় এবং সাধারণ্যে 'আবদুল মুত্তালিব নামে পরিচিতি লাভ করে।
ভাই হাশিমের ন্যায় আল-মুত্তালিবও আস-সিকায়া ও আর-রিফাদার কার্যাবলী কৃতিত্ব ও মহত্ত্বের সহিত সম্পাদন করেন। প্রকৃতপক্ষে তিনি ঐ সকল কার্য সম্পাদনে এইরূপ মহত্ত্বের পরিচয় দিয়াছিলেন যে, কুরায়শগণ তাহাকে আল-ফায়দ (মহৎ হৃদয়) নামে আখ্যায়িত করে। ১০ অনেক দিন যাবত উক্ত কার্যাবলী সম্পাদনের পর তিনি ইয়ামানের রাদমান নামক স্থানে ইনতিকাল করেন। সেখানে তিনি এক বাণিজ্য মিশনে গমন করিয়াছিলেন। তাহার অবশিষ্ট ভ্রাতা নাওফালও তাহার মৃত্যুর অল্প কালের মধ্যে ইনতিকাল করেন। ১১
'আবদুল মুত্তালিব এই সময় একজন পরিণত বয়সের যুবক। তিনি অত্যন্ত সুদর্শন ছিলেন এবং একই সঙ্গে তাঁহার মধ্যে কর্তৃত্বমূলক উপস্থিতি, তীক্ষ্ণ বুদ্ধিমত্তা ও একজন জন্মগত নেতার অন্যান্য গুণের সমাহার ঘটিয়াছিল। তিনি আস-সিকায়া ও আর-রিফাদার দায়িত্বে অভিষিক্ত হন। তাঁহার ব্যবস্থাপনায় এই দুইটি কার্য মক্কার জনজীবনের সর্বাধিক গুরুত্বপূর্ণ দুইটি গণকার্যে পরিণত হয়। তাঁহার প্রধানতম সাফল্য, যেরূপ পূর্বেই উল্লেখ করা হইয়াছে, যমযম কূপের পুনঃখনন। ১২ ইহা সামগ্রিকভাবে কুরায়শ গোত্রকে সমৃদ্ধি ও প্রতিপত্তি দান করিয়াছিল।
কিন্তু তাঁহার একটি অভাব ছিল। যমযম কূপ পুনঃখননকালে তাঁহার মাত্র একজন পুত্র ছিল এবং তিনি আন্তরিকভাবে আল্লাহ্র নিকট প্রার্থনা করিয়াছিলেন তাঁহাকে যেন অন্তত দশজন পুত্র সন্তান দান করা হয়। কথিত আছে যে, 'আবদুল মুত্তালিবের অধিক সংখ্যক পুত্রের আকাঙ্খা এত প্রবন ছিল যে, তিনি আল্লাহ্র নিকট প্রতিজ্ঞা করিয়াছিলেন, তাঁহাকে যদি কমপক্ষে দশটি পুত্র সন্তান দান করা হয় তাহা হইলে তিনি একজনকে আল্লাহ্র উদ্দেশ্যে কুরবানী করিবেন। অংশত তাঁহার এই আকাঙ্খার কারণে তিনি পরপর চারজন স্ত্রী গ্রহণ করেন : একজন বানু 'আমের হইতে, দুইজন বানু খুযা'আ হইতে এবং চতুর্থজন ফাতিমা বিন্ত 'আমর ইব্ন 'আইদকে বানু মাখযূম হইতে। আল্লাহ তাঁহার প্রার্থনা মনজুর করেন। কালক্রমে তাঁহার দশ (এবং আরও অধিক) পুত্র সন্তান জন্মগ্রহণ করে। দশম এবং তখন পর্যন্ত কনিষ্ঠতম ছিলেন 'আবদুল্লাহ এবং তিনি ছিলেন 'আবদুল মুত্তালিবের মাখযূমী স্ত্রী ফাতিমার গর্ভজাত। 'আবদুল্লাহ নিখুঁত স্বাস্থ্য ও দৈহিক গঠনের অধিকারী এক অসাধারণ সুদর্শন বালক ছিলেন। তিনি বড় হইতেই 'আবদুল মুত্তালিব তাঁহার প্রতিজ্ঞা পালনে অগ্রসর হইলেন। তিনি তাঁহার সকল পুত্রকে কা'বা ঘরের নিকটে লইয়া আসেন এবং কোন্ পুত্রকে কুরবানী করিবেন তাহা নির্বাচনের জন্য স্বাভাবিক পদ্ধতিতে লটারী অনুষ্ঠান করেন। লটারীতে 'আবদুল্লাহ্ নাম উঠে যিনি ছিলেন পিতার কনিষ্ঠতম ও প্রিয়তম পুত্র। ১৩
'আবদুল মুত্তালিব তৎক্ষণাৎ তাঁহার প্রতিজ্ঞা পালনে তৎপর হন, পরে যাহাতে স্নেহ ও ভালবাসার কারণে বাধাগ্রস্ত না হন। কিন্তু কুরায়শ নেতৃবৃন্দ ইহার বিরোধিতা করিলেন এবং কঠোরতম বিরোধিতা করিলেন বানু মাখযূম নেতা আল-মুগীরা ইবন 'আবদুল্লাহ ইবন 'আমর ইব্
মাখযূম। কারণ 'আবদুল্লাহ ছিলেন তাহাদেরই কন্যা ফাতিমা বিন্ত 'আমর ইবন 'আইদ-এর পুত্র। ১৪ অবশেষে 'আবদুল মুত্তালিব একদিকে আল্লাহ্র সহিত তাঁহার প্রতিজ্ঞা এবং অন্যদিকে কুরায়শ নেতৃবৃন্দের কঠোর বিরোধিতা হইতে উদ্ভূত জটিলতার সমাধান খুঁজিয়া পাইবার জন্য ইয়াছরিবের (মদীনা) এক প্রসিদ্ধ মহিলা ভবিষ্যদ্বক্তার পরামর্শ প্রার্থনা করিতে বাধ্য হন। মহিলা তাঁহাকে এই বলিয়া পরামর্শ দেয় যে, তিনি যেন একদিকে ১০টি উট এবং অন্যদিকে 'আবদুল্লাহকে রাখিয়া লটারী অনুষ্ঠান করেন এবং যতক্ষণ লটারী উটের অনুকূলে না যায় ততক্ষণ প্রতিবারে উটের সংখ্যা ১০টি করিয়া বৃদ্ধি করেন।
আবদুল মুত্তালিব বাড়ীতে প্রত্যাবর্তন করিয়া কা'বার নিকট গমন করিয়া পরামর্শ মোতাবেক লটারী অনুষ্ঠান করেন। লটারীতে উটের সংখ্যা যখন ১০০-তে পৌছায় তখন লটারী উহাদের অনুকূলে যায়। কিন্তু 'আবদুল মুত্তালিব অত্যন্ত সতর্ক ও সচেতন ছিলেন। তিনি এই ব্যাপারে আল্লাহ্র অভিপ্রায় সম্পর্কে সম্পূর্ণ নিশ্চিত হইতে চাহিলেন। তাই তিনি আরও দুইবার লটারী অনুষ্ঠান করিলেন এবং প্রতিবারেই লটারী উটের অনুকূলে প্রমাণিত হইল। এইভাবে ১০০ উটের কুরবানীর বিনিময়ে 'আবদুল্লাহ্র জীবন রক্ষা পাইল। ১৫ এই সুবিখ্যাত ঘটনার কারণেই মহানবী পরবর্তী কালে বলিতেন, তিনি দুই কুরবানীকৃত ব্যক্তিত্বের পুত্র: নবী ইসমাঈল (আ) ও 'আবদুল্লাহ ইব্ন 'আবদুল মুত্তালিব।
আল-মুগীরার পক্ষে তাহাদের কন্যার পুত্র 'আবদুল্লাহ্র জীবন রক্ষার্থে আগাইয়া আসা নিঃসন্দেহে বুদ্ধিমানের কাজ ছিল। কিন্তু দুঃখের বিষয়, কিছুকাল পরে আল-মুগীরার পুত্র আল-ওয়ালীদের পক্ষে 'আবদুল্লাহ্ পুত্রের বিরোধিতা করা সমভাবেই নির্বুদ্ধিতার পরিচায়ক ছিল। ১৬ আল-ওয়ালীদ তাহার পিতার নীতির পরিবর্তন করিলেও ইহার তো কোন পরিবর্তন সম্ভব ছিল না যে, বানু হাশিম ও বানু মাখযূম উভয় গোত্রের রক্তই 'আবদুল্লাহ্র শিরায়-উপশিরায় সমভাবে প্রবাহিত ছিল এবং এই দুই রক্তধারার সহিত শীঘ্রই তৃতীয় এক রক্তধারা বানু যুহরার রক্তধারা মিলিত হইতে চলিল। কারণ 'আবদুল্লাহ শীঘ্রই পূর্ণ যৌবনে পদার্পণ করিলেন। তাঁহার বয়স এখন বিশের কোঠার প্রথমদিকে এবং 'আবদুল মুত্তালিব তাঁহার পুত্রের জন্য উপযুক্ত পাত্রীর সন্ধান করিতেছিলেন। বানু যুহরা নেতা ওয়াব ইব্ন আব্দ মানাফের কন্যা আমিনার উপর তাঁহার দৃষ্টি পড়িল। যথাসময়ে 'আবদুল্লাহ ও আমিনার মধ্যে বিবাহ অনুষ্ঠিত হইল। 'আবদুল মুত্তালিব নিজে কিছুকাল পূর্বে আমিনার চাচাতো বোন ও ওয়াহবের ভাই উহায়ব ইবন 'আব্দ মানাফের কন্যা হালাহকে বিবাহ করিয়াছিলেন।
এই সকল আনন্দঘন ঘটনা শেষ হইতে না হইতেই মক্কা ও সাধারণভাবে আরব সমাজ আবরাহা কর্তৃক মক্কা ও কা'বা অভিযানের কারণে দারুণভাবে আন্দোলিত হইয়া উঠে। ১৭ কা'বার বিরুদ্ধে আবরাহার ধ্বংসাত্মক অভিযান অন্তত তিনটি প্রধান বিষয়ে গুরত্বপূর্ণ। কা'বার গুরুত্ব লোপ পাওয়ার পরিবর্তে বরং উহার গুরুত্ব ও মর্যাদা এখন আরবদের নিকট অত্যধিক বৃদ্ধি পায় এবং ইহার সহিত কুরায়শদের মর্যাদাও সাধারণভাবে আরবদের নিকট বৃদ্ধি পায়। দ্বিতীয়ত, মক্কার সমাজে 'আবদুল মুত্তালিবের নেতৃত্ব ও কা'বা গৃহের ব্যাপারে অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ কর্মকর্তা হিসাবে তাঁহার অবস্থান এই ঘটনা হইতে স্পষ্ট ও সমর্থিত হয়। তৃতীয়ত, এই ঘটনা মহানবী -এর জীবন-ইতিহাসে এবং অতঃপর ইসলামের ইতিহাসে শেষ আশ্রয় হিসাবে পরিগণিত। কারণ তিনি হস্তীবর্ষে জন্মগ্রহণ করেন।
📄 দুই: জন্ম ও শৈশব
মহানবী -এর পিতা 'আবদুল্লাহ হস্তীর ঘটনার এক বৎসরেরও কম সময়ের পূর্বে আমিনাকে বিবাহ করেন। দাম্পত্য জীবন খুব বেশী দিন উপভোগ করা তাঁহাদের ভাগ্যে ছিল না। স্ত্রীর সহিত কিছু দিন অতিবাহিত করিয়া 'আবদুল্লাহ এক বাণিজ্য সফরে সিরিয়া গমন করেন এবং ফিরতি যাত্রায় অসুস্থ হইয়া পড়েন। বাণিজ্য কাফেলা তাঁহাকে ইয়াছরিবের (মদীনা) বানু 'আদিয়্যি ইব্ন আন-নাজ্জার গোত্রে তাঁহার পিতার মাতৃকূলের আত্মীয়-স্বজনের নিকট রাখিয়া যায়। অল্পদিন পর সেখানেই 'আবদুল্লাহ উক্ত অসুস্থতায় ইনতিকাল করেন। ইনতিকালের সময় তাঁহার বয়স খুব বেশী হইলে পঁচিশ বৎসর ছিল। ১৮ আমিনার গর্ভে সেই সময় হযরত মুহাম্মাদ মাত্র কয়েক মাসের ছিলেন। 'আবদুল্লাহকে মদীনায় সমাহিত করা হয়। মহানবী তাঁহার জন্মের পূর্বেই ইয়াতীম হইলেন।
উৎস গ্রন্থসমূহ সাধারণভাবে একমত যে, মহানবী হস্তীবর্ষের রবীউল আওয়াল মাসের কোন এক সোমবার জন্মগ্রহণ করেন। ১৯ ইহা এখন একটি প্রতিষ্ঠিত বিষয় যে, মহানবী -এর মদীনায় হিজরত ৬২২ খৃস্টাব্দে সংঘটিত হইয়াছিল, যখন তিনি তাঁহার জীবনের ৫৩তম বৎসর অতিবাহিত করিতেছিলেন। এই শেষোক্ত সন হইতে পিছনদিকে হিসাব করিলে এবং ৫৩ চান্দ্র বৎসরকে ৫১ সৌর বৎসরের সমান ধরা হইলে তাঁহার জন্মের সাল হয় ৫৭১ খৃ.। রবীউল আওয়াল মাসের সঠিক দিন সম্পর্কেও মতপার্থক্য রহিয়াছে। উদাহরণস্বরূপ ইবন ইসহাক ১২ তারিখ উল্লেখ করিয়াছেন, আল-ওয়াকিদীর বরাতে ইবন সা'দ ১০ তারিখ বলিয়াছেন এবং মাসউদী ৮ তারিখ বলিয়া উল্লেখ করিয়াছেন। ২০ ৮ ও ১২ তারিখের মধ্যবর্তী সময়কাল এবং মহানবী সোমবার জন্মগ্রহণ করিয়াছেন এই তথ্যের ভিত্তিতে আরও হিসাব করা হইয়াছে। মিসরের মাহমূদ পাশা আল-ফালাকী কর্তৃক পরিচালিত জ্যোতির্বিদ্যা বিষয়ক পুঙ্খানুপুঙ্খ হিসাব অনুসারে ৫৭১ খৃস্টাব্দের রবীউল আওয়াল মাসের ৮ ও ১২ তারিখের মধ্যবর্তী একমাত্র সোমবার ৯ তারিখে পড়ে। ২১ এই হিসাব গ্রহণ করিয়া বহু সংখ্যক মনীষী মনে করেন যে, মহানবী সোমবার ৯ রবীউল আওয়াল মোতাবেক ২০ এপ্রিল, ৫৭১ খৃ. জন্মগ্রহণ করেন। ইহার সহিত দ্বিমত পোষণকারী মনীষিগণও রহিয়াছেন যাহারা মনে করেন যে, ৫৩ চান্দ্র বৎসর ৫২ সৌর বৎসরের সমান হইবে। আর তাই তাহারা মার্চ/এপ্রিল ৫৭০ খৃ. জন্মতারিখ নির্ধারণ করেন। ২২ কিন্তু প্রথমোক্ত মত অধিকতর যুক্তিসঙ্গত বলিয়া মনে হয়।
বর্ণিত আছে যে, আমিনা তাঁহার শিশুর জন্মের পূর্বে স্বপ্নে কিংবা ফেরেশতা কর্তৃক অদিষ্ট হইয়াছিলেন যে, তিনি যেন সন্তান ভূমিষ্ঠ হওয়ার পর তাঁহার নাম রাখেন মুহাম্মাদ (অথবা আহমাদ) ২৩ এবং পিতামহ 'আবদুল মুত্তালিব একইরূপ স্বপ্ন দেখিয়াছিলেন। ২৪ এইরূপ স্বপ্ন দেখা মোটেও অস্বাভাবিক নহে। অনেকে আজকালও এইরূপ স্বপ্ন দেখেন যাহা লক্ষণীয়রূপে সত্যে পরিণত হয়। বাইবেলেও হযরত ঈসা (আ) ও অন্যান্য নবীদের জন্মের ব্যাপারে অনুরূপ স্বপ্নের উল্লেখ রহিয়াছে। যাহা হউক, ইহাতে কোন সন্দেহ নাই যে, ভাবী নবীর জন্মের প্রায় অব্যবহিত পরেই তাঁহার মুহাম্মাদ নাম রাখা হয় এবং বিকল্প স্বরূপ তাঁহাকে জীবনের প্রাথমিক দিনগুলি হইতেই 'আহমাদ' নামে অভিহিত করা হয়। ২৫ মহানবী -এর জন্মের সময় সংঘটিত কিছু অলৌকিক ও অতি-প্রাকৃতিক ঘটনারও বিবরণ রহিয়াছে। ২৬
তদানীন্তন মক্কার সম্ভ্রান্ত ও অভিজাত পরিবারসমূহের এই প্রথা প্রচলিত ছিল যে, তাহাদের নবজাত শিশুদিগকে দুগ্ধ পান ও লালন-পালনের জন্য উপযুক্ত সেবিকার হেফাজতে রাখা হইত। মুহাম্মাদ -কে তাঁহার জন্মের পর কিছু দিনের জন্য ছুওয়ায়বা নামীয় মহানবীর চাচা আবু লাহাবের জনৈকা ক্রীতদাসীর দুধ পান করান। বর্ণিত আছে যে, আবু লাহাব তাহার পরলোকগত ভাই 'আবদুল্লাহর পুত্রের জন্মগ্রহণে এইরূপ খুশী হইয়াছিল যে, সে তাহার এই ক্রীতদাসীকে মুক্ত করিয়া দিয়াছিল। এই ক্রীতদাসী মহানবীর অপর এক চাচা হামযাকেও, যিনি মহানবীর প্রায় সমবয়সী ছিলেন, দুধ পান করাইয়াছিলেন। কিছুদিন পর মহানবীকে কুরায়শের হাওয়াযিন শাখার বানূ সা'দ গোত্রের হালীমা বিন্ত আবূ যু'আয়বের তত্ত্বাবধানে অর্পণ করা হয়। তাহারা হুদায়বিয়ার উন্মুক্ত ও স্বাস্থ্যকর সমভূমি এলাকায় বাস করিতেন এবং নির্ভেজাল আরব সংস্কৃতি ও নিজেদের ভাষার উচ্চ মানের জন্য বিখ্যাত ছিলেন। হালীমার স্বামী ছিলেন আল-হারিছ ইব্ন আবদুল উযযা ইব্ন রিফা'আহ (সম্ভবত আবূ কাবশাহ্ নামেও অভিহিত ছিলেন)। এই দম্পতির নিজেদের 'আবদুল্লাহ নামে একটি পুত্র সন্তান এবং উনায়সা ও হুযাফা নামে দুইটি কন্যা সন্তান ছিল। শেষোক্ত কন্যাটি সাধারণ্যে শায়মা নামে অধিকতর পরিচিত ছিলেন। তিনি ও তাঁহার মাতা প্রধানত শিশু মুহাম্মাদের দেখাশুনা করিতেন। ২৭ মহানবী তাঁহার শেষ জীবনে শায়মা ও দুধ সম্পর্কের অন্যান্য আত্মীয়দের প্রতি স্নেহ ও শ্রদ্ধা প্রদর্শন করিয়াছিলেন। ২৮
মুহাম্মাদ প্রথমে দুই বৎসর হালীমার তত্ত্বাবধানে ও লালন-পালনাধীনে ছিলেন। এই সময় হালীমা শিশু মুহাম্মাদকে প্রতি ছয় মাস অন্তর অন্তর আমিনার নিকট নিয়া আসিতেন বেড়াইবার জন্য এবং শিশুর দৈহিক বৃদ্ধি ও সুস্বাস্থ্য দেখিয়া তাঁহার সন্তুষ্টির জন্য। প্রথম দুই বৎসর পূর্ণ হইবার পর হালীমা শিশুকে আমিনার নিকট চূড়ান্তরূপে ফেরত প্রদানের উদ্দেশ্যে লইয়া আসেন। কিন্তু আমিনা মক্কার তৎকালীন অস্বাস্থ্যকর আবহাওয়া এবং শিশুর সন্তোষজনক বৃদ্ধি ও স্বাস্থ্যের কারণে তাঁহাকে আরও কিছুদিন হালীমার নিকট রাখিবার জন্য তাহাকে অনুরোধ করেন। হালীমা শিশুকে ফেরত পাইয়া অতিশয় আনন্দিত হইলেন। কারণ তিনি ইতোমধ্যে এই অসাধরণ স্বাস্থ্যবান সুদর্শন ও মধুর আচরণবিশিষ্ট বালকটির জন্য দৃঢ় মাতৃসুলভ স্নেহ ও মমতা অনুভব করিতেছিলেন। এইরূপে তিনি তাঁহার দুধ সম্পর্কীয় পিতা-মাতার নিকট আরও দুই বৎসর বা অনুরূপ কাল অবস্থান করেন।
দুধ সম্পর্কীয় পিতা-মাতার সহিত তাঁহার এই দ্বিতীয় মেয়াদের অবস্থানকালে তাঁহার জীবনে এক অলৌকিক ও অতি-প্রাকৃতিক ঘটনা সংঘটিত হয়। ইহা শাকুস সাদর বা বক্ষ বিদারণ নামে পরিচিত। ২৯ ঘটনার বিস্তারিত বিষয় ও উহার তারিখ ও স্থান সম্পর্কে বর্ণনাকারিগণ ভিন্ন ভিন্ন মত পোষণ করেন। ৩০ এই ঘটনার অল্পদিন পরেই হালীমা তাঁহাকে তাঁহার মাতার নিকট চূড়ান্তরূপে ফেরত প্রদান করেন।
📄 তিন: বাল্যকাল ও সিরিয়া ভ্রমণ
হালিমার তত্ত্বাবধান হইতে প্রত্যাবর্তনের পর মহানবী তাঁহার মায়ের সান্নিধ্য ও ভালবাসা খুব বেশীদিন ভোগ করিতে পারেন নাই। ছেলের দায়িত্ব গ্রহণের পর মাত্র দেড় বৎসর অতিবাহিত হইয়াছে এমন সময় তাঁহাকে লইয়া আমিনা পারিবারিক পরিচারিকা উম্মু আয়মানসহ মদীনায় তাঁহার স্বামীর মাতৃকুলের আত্মীয়-স্বজনের নিকট বেড়াইতে যান। কিন্তু মদীনা হইতে ফেরত আগমনের পথে আমিনা অসুস্থ হইয়া পড়েন এবং মদীনা ও মক্কার মধ্যবর্তী আবওয়া নামক স্থানে ইনতিকাল করেন। পারিচারিকা উম্মু আয়মান মহানবী-কে লইয়া মক্কায় ফেরত আসেন। এইভাবে তিনি সম্পূর্ণ ইয়াতীম হইলেন যখন মাত্র শৈশব অতিক্রম করিয়া বাল্যে পদার্পণ করিয়াছেন। মাতৃহারা হইবার সময় তিনি মাত্র ছয় বৎসরের বালক ছিলেন।
বালকটির দায়িত্ব এখন স্বাভাবিকভাবেই পিতামহ আবদুল মুত্তালিবের উপর বর্তায়, যিনি তখন প্রায় ৮০ বৎসরের বৃদ্ধ ছিলেন। এই বৃদ্ধ লোকটি ইয়াতীম বালককে সকল প্রকার যত্ন ও ভালবাসা দান করেন এবং সকল সময় তাঁহাকে সাহার্যে রাখেন। বর্ণিত আছে যে, 'আবদুল মুত্তালিব অধিকাংশ সময় কা'বার ছায়াতলে তাহার জন্য বিছানো চাদরের উপর বসিয়া অতিবাহিত করিতেন। তাঁহার পুত্রগণ তাঁহার চতুর্দিকে বসিতেন কিন্তু তাহার সম্মানার্থে চাদরের উপর বসিতেন না; কিন্তু বালক মুহাম্মাদ উহার উপর বসিতেন। তাঁহার চাচাগণ তাঁহাকে উহা হইতে সরাইয়া নিতে চাহিলে 'আবদুল মুত্তালিব তাহাদিগকে বারণ করিতেন এবং বলিতেন, তিনি বালকটির মধ্যে ভবিষ্যৎ শ্রেষ্ঠত্বের লক্ষণ দেখিতে পাইতেছেন এবং তাঁহার পিঠ চাপড়াইয়া তাঁহাকে আদর করিতেন। বালক মুহাম্মাদ তাঁহার নিকট বসিয়া যাহা করিতেন তাহা দেখিয়া 'আবদুল মুত্তালিব আনন্দ বোধ করিতেন। ৩১
'আবদুল মুত্তালিবের ইতোমধ্যেই অনেক বয়স হইয়াছে এবং তিনি দুই বৎসর পর বিরাশি বৎসর বয়সে ইনতিকাল করেন। তিনি যখন বুঝিতে পারিলেন যে, তাঁহার জীবনাবসান অত্যাসন্ন তখন তিনি বিশেষ করিয়া বালক মুহাম্মাদের দায়িত্ব তাঁহার চাচা আবূ তালিবের উপর অর্পণ করেন। উল্লেখ্য যে, আবূ তালিব 'আবদুল্লাহ্র সহোদর ভাই ছিলেন। ৩২ মহানবী মাত্র আট বৎসরের বালক ছিলেন যখন তাঁহার পিতামহ তাঁহাকে ছাড়িয়া চিরতরে বিদায় নেন। আবু তালিব তাঁহাকে নিজের পুত্রের মত মনে করিতেন এবং যেরূপ পরে দেখা যাইবে, তাঁহার নিজের ও মহানবীর জীবনের সংকটতম মুহূর্তেও তাঁহাকে ত্যাগ করেন নাই। মহানবী তাহাকে চাচাতো ভাইদের, বিশেষ করিয়া আবূ তালিবের পুত্র জাফর ও 'আলীর সহিত বড় হইয়া উঠেন, যাঁহারা তাঁহার বাল্যকাল হইতেই ঘনিষ্ঠতম বন্ধুতে পরিণত হইয়াছিলেন।
এই কচি বয়সে মহানবী-এর কর্মকাণ্ড সম্পর্কে খুব সামান্য উল্লেখ পাওয়া যায়। একমাত্র এইটুকু জানা যায় যে, তিনি কখনও কখনও নিজ চাচাতো ভাইদের সহিত মেষ চরাইতেন। ইহারও উল্লেখ রহিয়াছে যে, এই বয়সের অন্যান্য শিশুদের ন্যায় তিনি অপ্রয়োজনীয় ও অলস খেলাধূলা ও ক্রীড়ায় নিজেকে নিয়োজিত করিতেন না। তিনি কখনও কোন ব্যক্তির নিকট অথবা কোন প্রতিষ্ঠানে শিক্ষা গ্রহণ করিয়াছেন অথবা তিনি পড়িতে ও লিখিতে শিখিয়াছেন এইরূপ কোন তথ্যের উল্লেখ কোথায়ও নাই।
তাঁহার প্রাথমিক জীবন সম্পর্কে ঐতিহাসিকগণ কর্তৃক বর্ণিত একমাত্র উল্লেখযোগ্য ঘটনা হইতেছে চাচা আবূ তালিবের সহিত এক বাণিজ্য কাফেলায় তাঁহার সিরিয়া সফর। মহানবী তখন প্রায় ১০ কিংবা ১২ বৎসর বয়সের বালক ছিলেন। ইবন ইসহাক কর্তৃক প্রদত্ত তাঁহার এই সফরের বিবরণ নিম্নরূপ: একবার আবু তালিব একটি বণিক দলের সহিত সিরিয়া গমনের পরিকল্পনা করেন। যখন সকল প্রস্তুতি সম্পন্ন এবং বণিক দল যাত্রার জন্য প্রস্তুত, তখন বালক মুহাম্মাদ এমনভাবে তাঁহার চাচার নিকট থাকার আবদার ধরিলেন যে, তাঁহার জন্য চাচার দয়া হইল এবং তাঁহাকে লইয়াই তিনি সফরে রওয়ানা হইলেন।
বাণিজ্য দলটি এক সময় বুসরা আগমন করে, সেখানে বাহীরা নামক জনৈক খৃস্টান পাদ্রী তাহার জন্য নিবেদিত কোন এক গীর্জা বা গুহায় বাস করিতেন। তিনি খৃষ্ট ধর্ম ও উহার ধর্মগ্রন্থে সুপণ্ডিত ছিলেন। পূর্বে অনেকবার কুরায়শ বণিক দল একই পথে এবং তাহার বাসস্থানের নিকট দিয়া গমন করিয়াছে, কিন্তু তিনি কখনও তাহাদের সম্পর্কে কোনরূপ আগ্রহ দেখান নাই। কিন্তু এইবার তিনি তাহাদিগকে বিশেষ মর্যাদার সহিত গ্রহণ করিলেন এবং ইহার কারণ এই ছিল যে, "মনে করা হয়" যে, তিনি বণিক দলটিতে বিশেষ কিছু লক্ষ্য করিয়াছিলেন। তিনি তাহার প্রকোষ্ঠ হইতে লক্ষ্য করিয়াছিলেন যে, বণিক দলটি আগমন করিতেছে, আর এক খণ্ড মেঘ দলের লোকদের মধ্যে একমাত্র মহানবী-কে ছায়াদান করিয়া আসিতেছে। দলটি সেই প্রকোষ্ঠের নিকট আসিল এবং একটি বৃক্ষের নিচে থামিল, মেঘখণ্ডটিও অমনি সেখানে থামিল এবং বৃক্ষের শাখাগুলি মহানবী-কে সূর্যের তাপ হইতে রক্ষা করার জন্য ঝুঁকিয়া পড়িল।
বাহীরা খৃস্ট ধর্মগ্রন্থে বর্ণিত অনাগত নবীর লক্ষণসমূহ বালকের মধ্যে শনাক্ত করিয়া দলটির জন্য এক ব্যয়বহুল ভোজের আয়োজন করিলেন এবং তাহাদিগকে উক্ত ভোজে আমন্ত্রণ জানাইলেন। তিনি বিশেষভাবে বলিলেন, যেন ভোজে কেহ অনুপস্থিত না থাকেন। তাহা সত্ত্বেও দলটি যখন বাহীরার স্থানে গমন করে তখন মহানবীকে মালপত্রের নিকট রখিয়া যায়। তাহারা ধারণা করিয়াছিল যে, মহানবী এত অল্প বয়সের যে, তাঁহার ভোজসভায় উপস্থিত থাকার প্রয়োজন নাই।
বাহীরা যখন দেখিতে পাইলেন যে, মহানবী তাঁহার মেহমানদের মধ্যে নাই তখন তিনি তাহাদের নিকট জানিতে চাহিলেন সকলেই আসিয়াছেন কিনা এবং তাহাকে এই কথা বলাতে যে, একমাত্র একটি ছেলেকে মালপত্রের নিকট রাখিয়া আসা হইয়াছে, তিনি তাঁহাকেও আনিবার জন্য অনুরোধ করিলেন। তাহার এই অনুরোধ রক্ষা করা হইল। মহানবী আগমন করিলে বাহীরা উঠিয়া দাঁড়াইলেন এবং তাঁহাকে আলিঙ্গন করিলেন এবং লোকদের সহিত তাঁহাকে বসাইলেন। বাহীরা তাঁহাকে ঘনিষ্ঠভাবে পর্যবেক্ষণ করিলেন এবং তাঁহার দৈহিক বৈশিষ্ট্য ও খৃস্ট ধর্মগ্রন্থে অদূর ভবিষ্যতে প্রত্যাশিত নবীর লক্ষণ হিসাবে বর্ণিত অন্যান্য জিনিসের প্রতি লক্ষ্য করিলেন।
লোকজন আহার শেষ করিয়া চলিয়া গেলে বাহীরা মহানবী -এর সহিত আলাপ করেন, তাঁহাকে তাঁহার নিজের সম্পর্কে কিছু প্রশ্ন করেন এবং অত্যন্ত প্রীত হন যে, উত্তরগুলি "তাহার বিবরণ সম্পর্কে বাহীরা যাহা জানিতেন তাহার সহিত" মিলিয়া গিয়াছে। অতঃপর পাদ্রী মুহাম্মাদ -এর পৃষ্ঠদেশে তাকাইলেন এবং তাঁহার দুই স্কন্ধের মধ্যখানে, ধর্মগ্রন্থে "ঠিক যে স্থানের বর্ণনা রহিয়াছে নবুওয়াতের মোহর" দেখিতে পাইলেন। বাহীরা তারপর বালকের চাচা আবু তালিবের নিকট গমন করেন এবং ছেলেটির সহিত তাঁহার সম্পর্কের কথা জিজ্ঞাসা করেন। আবূ তালিব যখন বলিলেন যে, ছেলেটি তাঁহার পুত্র, বাহীরা মন্তব্য করিলেন, তাহা হইতে পারে না। "কারণ ইহা হইতে পারে না যে, এই ছেলের পিতা জীবিত আছেন"। তারপর আবূ তালিব বলিলেন যে, ছেলেটি তাঁহার ভাতিজা এবং তাঁহার জন্মের পূর্বেই তাঁহার পিতা মারা গিয়াছেন। "আপনি সত্য কথা বলিয়াছেন" বাহীরা বলিলেন। তিনি আরও বলিলেন, "আপনার ভাতিজাকে লইয়া নিজের দেশে ফিরিয়া যান এবং ইয়াহুদীদের বিরুদ্ধে তাঁহাকে সতর্কতার সহিত প্রহরায় রাখুন। কারণ আল্লাহ্র কসম! তাহারা যদি তাঁহাকে দেখিতে পায় এবং তাঁহার সম্পর্কে আমি যাহা জানি তাহা জানিতে পারে তাহা হইলে তাহারা তাঁহার অনিষ্ট করিবে। আপনার এই ভাতিজার জন্য এক মহান ভবিষ্যৎ অপেক্ষমান। সুতরাং তাঁহাকে দ্রুত বাড়ী লইয়া যান।"
তাঁহার চাচা তাঁহাকে দ্রুত সেখান হইতে লইয়া আসেন এবং সিরিয়ায় তাঁহার ব্যবসায়িক কাজ শেষ করিয়া মক্কায় ফেরত লইয়া আসেন। ইবন ইসহাক আরও লিখিয়াছেন যে, "ধারণা করা হয়" আরও তিনজন আহলে কিতাব মহানবী -এর মধ্যে তাহাই লক্ষ্য করিয়াছিল যাহা বাহীরা দেখিয়াছিলেন এবং তাহারা তাঁহার নিকট আসার চেষ্টা করিয়াছিল, কিন্তু বাহীরা তাহাদিগকে দূরে রাখিয়াছিলেন। ৩৩
ঘটনাটি কমবেশি একইভাবে অন্যান্য গ্রন্থেও বর্ণিত হইয়াছে। ৩৪ জামে' আত-তিরমিযীর বর্ণনায় উক্ত হইয়াছে যে, দলটি গীর্জার নিকট যাত্রাবিরতি করামাত্র বাহীরা তাহাদের নিকট আগমন করেন, দলের মধ্যে মহানবী -কে শনাক্ত করেন এবং চীৎকার করিয়া বলিয়া উঠেন, "এই হইলেন বিশ্বের নেতা, আল্লাহ্র দূত, যিনি মানবজাতির জন্য আশীর্বাদস্বরূপ প্রেরিত হইবেন।" কুরায়শ দল বিস্ময়ে হতবাক হইয়া বাহীরার নিকট তাহার এইরূপ মন্তব্যের কারণ জানিতে চাহিল। তিনি উত্তরে বলিলেন, তিনি লক্ষ্য করিয়াছেন যে, যখন হইতে দলটি মক্কা ত্যাগ করিয়াছে তখন হইতে পথিমধ্যে প্রতিটি গাছ ও প্রতিটি পাথর মহানবীর সাম্মানে মস্তক অবনত করিয়াছে এবং নবীর সহিত সম্পর্ক না থাকিলে গাছ ও পাথর কখনও এইরূপ আচরণ করিত না। আরও উল্লিখিত হইয়াছে যে, বাহীরা লক্ষ্য করিয়াছেন যে, একটি গাছের ছায়া মহানবী-এর সহিত একস্থান হইতে অন্য স্থানে গমন করিতেছে এবং কয়েকজন "রোমক" মহানবী-এর সন্ধানে আগমন করিয়াছিল। কারণ তাহারা তাহাদের ধর্মগ্রন্থ হইতে জানিতে পারিয়াছিল যে, প্রতিশ্রুত নবীর ঐ সময় আবির্ভূত হইবার কথা। বিবরণ এই বলিয়া শেষ হইয়াছে যে, বাহীরা আবু তালিবকে আন্তরিকভাবে অনুরোধ করিলেন ছেলেটিকে এমন দেশে লইয়া না যাইবার জন্য যেখানে শত্রুভাবাপন্ন ইয়াহুদীরা সংখ্যায় প্রচুর এবং আবূ তালিব তাঁহাকে মক্কায় ফেরত প্রেরণ করিলেন এবং আবূ বাক্স (রা) তাঁহার সহিত বিলাল (রা)-কে পাঠাইলেন। ৩৫
উল্লিখিত ঘটনার অনেক বিষয়েরই সত্যতা সম্পর্কে মুসলিম মনীষীদের মধ্যে মতদ্বৈধতা বিদ্যমান, যদিও মহানবী-এর চাচার সহিত সিরিয়া ভ্রমণ এবং বাহীরার সহিত সাক্ষাতের ব্যাপারে কাহারও কোন সন্দেহ নাই। ইবন ইসহাক তাহার বর্ণনায় তথ্যপূর্ণ বর্ণনার পূর্বে একবার করিয়া অন্তত পাঁচবার 'যেরূপ তাহারা মনে করেন' (فيما يزعمون আল্লাহ يزعمون) সীমিতকরণ সূচক শব্দগুলি ব্যবহার করিয়াছেন। তিরমিযী বর্ণনাটি "ভাল" (حسن) বলিয়া অভিমত প্রদান করিলেও তিনি ইহাকে বিরল (غریب) বলিয়াও অভিহিত করিয়াছেন এবং তিনি ইহা অন্য কোন উৎস হইতে জানেন নাই বলিয়াও উল্লেখ করিয়াছেন। ৩৬ বর্ণনার সর্বশেষ উক্তির- যেখানে আবূ বাক্স (রা) মহানবী-এর সহিত বিলালকে পাঠাইয়াছেন বলিয়া উল্লেখ রহিয়াছে-সুস্পষ্ট ভ্রম সম্পর্কে একই সঙ্গে আয-যাহাবী (মৃ. ৭৪৮ হি.)৩৭ এবং ইব্ন কায়্যিম আল-জাওযিয়্যা (মৃ. ৭৫১ হি.) ৩৮ উভয়েই উল্লেখ করিয়াছেন যে, বিলাল সেই সময় জন্মগ্রহণই করেন নাই এবং আবূ বাক্স মাত্র বালক ছিলেন।
মহানবী-এর প্রাথমিক জীবনের অন্য কোন ঘটনার উল্লেখ কোথায়ও নাই।