📘 সীরাত বিশ্বকোষ > 📄 নবম অধ্যায়: হারবুল ফিজার এবং হিলফুল ফুযূল সম্পর্কে ওয়াটের তত্ত্ব

📄 নবম অধ্যায়: হারবুল ফিজার এবং হিলফুল ফুযূল সম্পর্কে ওয়াটের তত্ত্ব


হারবুল ফিজার এবং হিলফুল ফুযূল সম্পর্কে ওয়াট একটি নূতন তত্ত্ব উপস্থাপন করিয়াছেন। মহানবী-এর শৈশব ও প্রথম যৌবনকালে মক্কা নগরীর সামাজিক ও রাজনৈতিক জীবনে যে দুইটি গুরুত্বপূর্ণ ঘটনা সংঘটিত হইয়াছিল তাহা ছিল এই হারবুল ফিজার এবং হিলফুল ফুযূল সম্পর্কিত ঘটনা। ইতোপূর্বে উল্লেখ করা হইয়াছে যে, ওয়াট ধরিয়া লইয়াছিল যে, কুরায়শ গোত্রের দুইটি দলের দীর্ঘকাল যাবৎ ব্যবসা-বাণিজ্য লইয়া প্রতিদ্বন্দ্বিতা চলিয়া আসিতেছিল। হারবুল ফিজার এবং হিলফুল ফুযূল সম্পর্কে ব্যাখ্যা প্রদান করিতে গিয়া সেই প্রতিদ্বন্দ্বিতাকে তিনি আন্তর্জাতিক সম্পর্ক ও আন্তর্জাতিক বাণিজ্যের ক্ষেত্র পর্যন্ত সম্প্রসারিত করিয়াছেন। তাঁহার মতে, কুরায়শ গোত্রের এই দুই দলের মধ্যে কেবল বাণিজ্য ক্ষেত্রেই নিজেদের এই প্রতিদ্বন্দ্বিতা বিদ্যমান ছিল তাহাই নহে, বরং অপরদিকে তাহাদিগের অপেক্ষা অধিকতর শক্তিশালী দুইটি পক্ষ ছিল উত্তরে হীরা-পারস্য এবং দক্ষিণে ইয়ামান, যে প্রতিদ্বন্দ্বিতা বৃহত্তর পরিসরে ধর্মীয় স্বার্থ, বাণিজ্যিক স্বার্থ এবং রাজনৈতিক স্বার্থ লইয়া বায়যান্টাইন ও পারসিক সাম্রাজ্যের মধ্যে বিদ্যমান ছিল এবং এই দুই দলের সঙ্গে সম্পর্কিত ছিল। ওয়াটের মতে, এই ফিজারের যুদ্ধ শক্তিশালী কুরায়শ গোত্র এবং হীরা-পারস্যের মধ্যে বাণিজ্যিক প্রতিযোগিতার ফল। সেই প্রেক্ষিতে তিনি বলেন:
(ক) হিলফুল ফুযূল ছিল "মুতায়‍্যাবৃন-এর পরবর্তী কালের উদ্ভাবন" অর্থাৎ তথাকথিত দুর্বলতর গোত্রের এবং "অবিচারের বিরুদ্ধে সর্বসাধারণের প্রতিরোধ নয়”। ১
(খ) ইহা ছিল আব্দ শাম্স এবং নাওফালের মত শক্তিশালী গোত্রের বিরুদ্ধে পরিচালিত ২ এবং
(গ) গোত্রের মধ্যকার শক্তিশালী দল যাহাতে আন্তর্জাতিক বাণিজ্য একচ্ছত্রভাবে দখল করিয়া লইতে না পারে সেই উদ্দেশ্যে দুর্বলতর দলের প্রচেষ্টা ও সেই দলেরই প্রতিনিধিত্বকারী।
ওয়াট যে ধারণা পোষণ করিতেন নিম্নে তাহার সংক্ষিপ্ত আলোচনা করা হইল: সাধারণ আন্তর্জাতিক অবস্থা, বিশেষ করিয়া পারস্য সাম্রাজ্য ও বায়যান্টাইন সাম্রাজ্যের মধ্যে বিদ্যমান প্রতিযোগিতা সর্বজনবিদিত এবং ইহাকে ইসলামের জাগরণের কারণ হিসাবে ইতোপূর্বে অনেক পণ্ডিতই তুলিয়া ধরিয়াছেন; ৪ কিন্তু এই অবস্থা হইতে ওয়াট যে পরিণতি দেখাইয়াছেন তাহা অসম্ভব ও অযৌক্তিক।
তিনি বলেন যে, জাস্টিনিয়ানের মৃত্যুর (৫৬৫ খৃ.) পর পারস্য সাম্রাজ্য ও বায়যান্টাইন সাম্রাজ্যের মধ্যকার বিরোধ "চূড়ান্ত পর্যায়ে উপনীত হয়" এবং ৫৭০ অথবা ৫৮৫ সালের মধ্যে পারসিকরা আরবভূমি হইতে আবিসিনীয়দেরকে বিতাড়িত করে অর্থাৎ ইয়ামান হইতে বিতাড়িত করে। আবিসিনীয়রা ছিল বায়যান্টীয়দের মিত্র। পারসিকরা অতঃপর ইয়ামানে তাহাদের তাবেদার রাজত্ব কায়েম করে, "যদিও রাজধানী হইতে কঠোরভাবে নিয়ন্ত্রণ করিতে পারিত না", এই কথা বলিয়া তিনি বলেন যে, ইয়ামানের উপর পারসিকদের যে প্রভাব প্রতিষ্ঠিত হইয়াছিল তাহা তেমন কার্যকর হয় নাই। এই বক্তব্য রাখার পরই ওয়াট বলেন, "আল-হীরার লাখমী যুবরাজদের সহায়তায় পারসিকরা ইয়ামান হইতে পারস্যে বাণিজ্য বহর স্থলপথে পরিচালনা করিতে চেষ্টা করিয়াছিল”। অতঃপর তাহার সর্বশেষ বক্তব্যকে প্রতিষ্ঠিত করিতে গিয়া তিনি আরেও বলেন যে, "আল-হীরা হইতে ইয়ামানে প্রেরিত পারস্যের বাণিজ্য কাফেলার কারণেই ফিজারের যুদ্ধ ও যুকারের যুদ্ধ সংঘটিত হইয়াছিল”। ৬
এখন লক্ষণীয় যে, হীরার ক্ষুদ্র রাজত্ব পারস্য সীমান্তে অবস্থিত ছিল এবং ইহার অধীনস্থ ছিল; কিন্তু ইয়ামান ও এই রাজ্যের মধ্যবর্তী যে এলাকা উহা বিশাল আরব ভূমি দ্বারা বিচ্ছিন্ন এবং আরব উপদ্বীপের উপর পারস্যের কোন নিয়ন্ত্রণই ছিল না। তাহা ব্যতীত পারস্যের বাণিজ্য কাফেলার যাতায়াতের কারণে কোন যুকারের যুদ্ধ সংঘটিত হয় নাই, অথচ ওয়াট স্পষ্টভাবে সেই কথাই বলিয়াছেন। হীরার যুবরাজ নু'মান ইবনুল মুনযির এবং পারস্যের শাসকের মধ্যে যে ব্যক্তিগত মতবিরোধ ছিল তাহার কারণেই এই যুদ্ধ সংঘটিত হইয়াছিল। অথবা বলা চলে, আল-হীরা নিয়ন্ত্রণ করার পারসিক অভিলাষের কারণেই এই যুদ্ধ হইয়াছিল। অন্যদিকে ফিজার যুদ্ধের কথা বলিতে গিয়া ওয়াট সাহেব তাহার বক্তব্যে অনেক সত্যকে বিকৃত করিয়াছেন।
প্রথমত, চতুর্থ ফিজার যুদ্ধের কারণ হিসাবে যে বাণিজ্য বহরের কথা বলা হইয়াছে সেই বাণিজ্য বহর পারস্যের পক্ষ হইতে অথবা তাহাদের স্বার্থ নু'মান ইবনুল মুনযির কর্তৃক প্রেরিত হইয়াছিল তাহার কোন সঠিক প্রামাণ্য তথ্য পাওয়া যায় না।
দ্বিতীয়ত, বাণিজ্য বহর প্রেরিত হইয়াছিল তায়েফের নিকটবর্তী 'উকায মেলায় যোগদানের উদ্দেশ্যে, ইয়ামানের উদ্দেশ্যে নয়। কোন ঐতিহাসিক সামান্যতম ইঙ্গিতও দেন নাই যে, বাণিজ্য বহর সেই দেশের উদ্দেশ্যে গিয়াছিল।
তৃতীয়ত, চতুর্থ ফিজার যুদ্ধের কারণ হিসাবে যে ঘটনা ঘটিয়াছিল তাহাকেই সকল যুদ্ধের সাধারণ কারণ হিসাবে ফিজার যুদ্ধগুলি ঘটিয়াছিল বলিয়া বর্ণনা করা হইয়াছে। ইতোপূর্বে সংঘটিত হইয়াছিল তিনটি যুদ্ধ এবং প্রতিটি যুদ্ধের কারণ ছিল ভিন্ন ভিন্ন। আন্তর্জাতিক বাণিজ্য কার্যক্রমের সঙ্গে ইহার কোনটির কোন সম্পর্ক ছিল না।
চতুর্থত, বিরোধপূর্ণ কার্যাবলীর ফলে শেষাবধি যে চতুর্থ যুদ্ধ সংঘটিত হইয়াছিল উহা নু'মানের বাণিজ্য বহরের উপর আক্রমণ হিসাবে পরিচালিত হয় নাই, হীরার কোন একজন সওদাগরের উপরও হয় নাই, হইয়াছিল তায়েফের একজন বাসিন্দা উরওয়াহর উপর। সে ছিল মক্কার বাররাদ-এর ব্যক্তিগত পক্ষ। উরওয়াহ তাহার বাণিজ্য বহরের জামিনদার হইয়া তাহাকে ঠকাইয়াছিল। তায়েফে যে বাণিজ্য বহর আসিতেছিল ইহারা দুইজনই তাহার পক্ষের লোক ছিল।
ইয়ামান হইতে পারস্যে স্থলপথে বাণিজ্য বহর প্রেরণের পারসিকদের প্রচেষ্টা, এই তত্ত্ব কতকগুলি ভ্রান্ত ধারণার উপর প্রতিষ্ঠিত, তাহাতে কোন সন্দেহ নাই। ওয়াটের আপন বক্তব্য হইতেও ইহার দুর্বলতা ধরা পড়ে। ধরা পড়ে যখন তিনি নিজেই কিছু পূর্বে বলেন যে, ইয়ামান সরকারের উপর তাহাদের তেমন কোন কর্তৃত্ব ছিল না অর্থাৎ পারস্য সরকারের কোন কর্তৃত্ব বা নিয়ন্ত্রণ কার্যকর ছিল না। একই কথা তিনি কয়েক পৃষ্ঠা পরে নিজেই লিখিয়াছেন। সেই স্থানে বলিয়াছেন, "মনে রাখিতে হইবে যে, এই বিজয় (পারস্য কর্তৃক ইয়ামান বিজয়) সমুদ্রপথে সাধিত হইয়াছিল এবং সেই কারণে এই অঞ্চল তাহাদের কঠোর নিয়ন্ত্রণে রাখা সম্ভব হয় নাই। অপরপক্ষে সমগ্র আরবভূমি বা আরব উপদ্বীপ পারসিকদের নিয়ন্ত্রণে ছিল না"। ইহাই যদি প্রকৃত অবস্থা হইয়া থাকে তাহা হইলে একজন কী করিয়া বলেন যে, পারস্য চেষ্টা করিয়াছিল স্থলপথে বাণিজ্য বহর ইয়ামান হইতে পারস্যে প্রেরণ করিতে যেখানে সমগ্র ভূভাগ, যাহার উপর দিয়া বাণিজ্য বহর যাইবে সেইটি তাহাদের নিয়ন্ত্রণের বাহিরে অবস্থিত ছিল? সে যদি সত্যই ইয়ামানের সঙ্গে তার বাণিজ্যিক আমদানী বা রপ্তানী পরিচালনা করিতে ইচ্ছুক থাকিত তবে তাহা অবশ্যই সমুদ্রপথ তাহার জন্য অধিকতর নিরাপদ মনে হইত অথবা বিকল্প পথ হিসাবে আরবের পূর্ব উপকূল পথ তাহার জন্য অনেক বেশী আকর্ষণীয় হইতে পারিত, আরবের পশ্চিম দিক ঘুরিয়া এবং হীরার প্রতিনিধির মাধ্যমে নহে।
ওয়াটের তত্ত্ব বর্ণনায় ফিরিয়া আসা যাক। তিনি তাহার এই তত্ত্বকে এমনভাবে উপস্থাপন করিয়াই পরবর্তী অনুচ্ছেদে বলিতেছেন, "দুই দৈত্যের সংগ্রামের মাঝে মক্কার অবস্থান কী হইতে পারে”? উত্তর নিজেই দিতেছেন। তিনি বলিতেছেন, ইব্‌ন কুতায়বার একটি মন্তব্য হইতে প্রতীয়মান হয় যে, কুসায়্যি যিনি মক্কা শরীফে বানু খুযা'আর বিরুদ্ধে কুরায়শদের আধিপত্য প্রতিষ্ঠিত করিয়াছিলেন, তিনি গাস্সানীদের অথবা অন্যান্য বায়যান্টীয়দের সহযোগিতা লাভ করিয়াছিলেন এবং কুসায়্যির এই "মক্কা বিজয়"-এর সঙ্গে এই নগরের সিরিয়ার বাণিজ্যের উন্নতি সম্পর্কিত। ওয়াট আরও বলেন, "কুসায়্যির পরে বেশ কিছুকাল পর্যন্ত ইয়ামান হইতে মক্কা পর্যন্ত স্থলপথ প্রধানত ইয়ামানীদের দখলেই ছিল, বিশেষ করিয়া একজন ইয়ামানী সওদাগর ফুদূল কনফেডারেসি গঠিত হইবার সময় মক্কায় সওদা লইয়া আসিয়াছিলেন (৫৮০ খৃ.)। যদি মক্কার বাণিজ্য প্রধানত উত্তরের সঙ্গে রক্ষা করিতে হয় তাহা হইলে ইহাকে বায়যান্টাইন ও তাহার মিত্রদের সঙ্গে সুসম্পর্ক রাখিতেই হইবে”। ১০
এখন আমরা বায়যান্টাইন এবং মক্কার মধ্যে যে ঐতিহ্যগত বন্ধুত্বপূর্ণ সম্পর্ক বিদ্যমান ছিল সেই ধারণার ক্ষেত্রে কোন প্রকার ত্রুটি দেখিবার প্রয়োজনীয়তা বোধ করি না অথবা উত্তরমুখী বাণিজ্যের স্বার্থে "বায়যান্টাইন ও তাহার মিত্রদের সঙ্গে সুসম্পর্ক রাখিতেই হইবে” এই বিষয়ে কোন আপত্তি তুলিতেছি না। আমরা ইহাও অনুধাবন করি যে, ইয়ামান হইতে মক্কা পর্যন্ত স্থলপথ “প্রধানত ইয়ামানীদের দখলে “ই থাকা উচিৎ ছিল। কিন্তু ওয়াট সাহেব যেভাবে বলেন, "কিছু দিনের জন্য” তাহা সত্য নয়, বরং শত শত বৎসর যাবৎ সেই কুসায়্যির সময় হইতে এই পথ তাহাদের দখলেই ছিল। কারণ হযরত মুহাম্মাদ -এর যৌবনকালে যখন হিলফুল ফুযূল প্রতিষ্ঠিত হইয়াছিল তখন পর্যন্ত এই পথ ইয়ামানীদের দখলেই ছিল। ওয়াট সাহেব সেই কথাই বলিয়াছেন এবং রাসূলুল্লাহ ছিলেন কুসায়্যির অধস্তন পঞ্চম পুরুষ। তাহা ব্যতীত ওয়াট সাহেব হিলফের তারিখ হিসাবে যে ৫৮০ খৃ. -এর উল্লেখ করিয়াছেন তাহাও ঠিক নহে। হিল্ফ সংগঠিত হইবার সময় হযরত মুহাম্মাদ -এর যৌবন কাল। তখন তাঁহার বয়স ২০ বৎসরের অধিক। যে সভায় এই হিলফুল ফুযূল সংগঠিত হইয়াছিল তিনিও সেই সভায় উপস্থিত ছিলেন। এই তথ্য প্রমাণ করে যে, তখন সময়কাল ছিল কমপক্ষে ৫৯০ খৃ.।
কিন্তু ওয়াট সাহেব ইহার পর যে কথা বলিয়াছেন তাহা রীতিমত বিভ্রান্তিকর। বায়যানটীয়দের সঙ্গে কুরায়শদের সুসম্পর্ক বর্ণনা করিতে গিয়া তিনি পুনরায় আবিসিনিয়া কর্তৃক ইয়ামান বিজয়ের কথা বলিয়াছেন, অতঃপর আরও জোর দিয়া বলিয়াছেন, যেহেতু আবিসিনিয়া ও বায়যান্টাইনের মধ্যকার সম্পর্ক বন্ধুত্বপূর্ণ ছিল তাই এই সময় “তুলনামূলকভাবে শান্তিপূর্ণ হওয়ায় মক্কাবাসীরা তাহাদের ব্যবসা-বাণিজ্য সম্প্রসারিত করিতে পারিয়াছিল এবং চারিদিকে তাহাদের বাণিজ্য বহর পাঠাইয়াছিল”। ১১ এই অবধি অগ্রসর হইয়া একদিকে মক্কা এবং অন্যদিকে আবিসিনিয়া ও বায়যান্টাইনের মধ্যকার বন্ধুত্বপূর্ণ সম্পর্কের তত্ত্ব উত্থাপন করিয়া ওয়াট সাহেব নিজেই এক চরম সত্যের মুখোমুখি হইতেছেন এবং দেখিতে পাইতেছেন যে, আবিসিনিয়ার ভাইসরয় আবরাহা মক্কা আক্রমণ করিতেছে। তখন তিনি দ্রুত পরিবর্তিত সুরে বলিতেছেন, যাহা হউক “আবিসিনিয়ার সঙ্গে সম্পর্কের নিশ্চয় অবনতি ঘটিয়াছিল, ইয়ামান অধিকারের শেষের দিকে আবরাহা মক্কার বিরুদ্ধে অভিযান পরিচালনা করেন”। ওয়াট সাহেবের অনুমিত আবিসিনিয়া সরকারের সঙ্গে সম্পর্কের ক্ষেত্রে অবনতির কারণ হিসাবে কোন ইঙ্গিতই তিনি দিলেন না।
অনেকের মত ওয়াট সাহেবও বরাত দিয়া থাকেন যে, ধর্মীয় ও বাণিজ্যিক প্রভাব বিস্তারের উদ্দেশ্যেই আবরাহার আক্রমণ পরিচালিত হইয়াছিল, ইহার পর আবদুল মুত্তালিবের আক্রমণকারীদের সঙ্গে যোগাযোগ স্থাপনের একটি দূর সম্পর্কীয় ও অযৌক্তিক ধারণার উল্লেখ করিয়া বলেন, যাহার কথা পূর্বেই উল্লেখ করা হইয়াছে, আবদুল মুত্তালিব নাকি কুরায়শদিগের মধ্যে তাহার প্রতিদ্বন্দ্বী দলগুলির বিরুদ্ধে আবিসিনিয়ার সাহায্য লাভের চেষ্টা করিয়াছিলেন। ১২ প্রতিদ্বন্দ্বী দলগুলির মধ্যে ছিল আবদুস শাম্স, নাওফাল ও মাখযূম গোত্র। বাহ্যত প্রথম দুই গোত্র ইতোমধ্যেই সিরিয়া ও ইয়ামানের বাণিজ্যের অধিকাংশই হস্তগত করিয়াছিল, যাহা ইতোপূর্বে হাশিম ও আল-মুত্তালিবের দখলে ছিল। ১৩
এই সর্বশেষ মন্তব্য করার পূর্বে ওয়াট কেবল মক্কার সঙ্গে বায়যানটীয়দের ঐতিহ্যগত বন্ধুত্বের কথা বলিয়াছেন। সেই স্থলে তিনি বিশেষ করিয়া আব্দ মানাফের চার পুত্রের কথা বলিয়াছেন: আব্দ শাম্স, হাশিম, আল-মুত্তালিব ও নাওফাল। তাহারা যথাক্রমে আবিসিনিয়া, সিরিয়া, ইয়ামান ও ইরাকের সঙ্গে বাণিজ্যিক সম্পর্ক স্থাপনের চেষ্টা করিয়াছিলেন। তিনি কোথাও এক পক্ষে হাশিম ও আল-মুত্তালিবের পুত্রগণ এবং অপর পক্ষে আব্দ শাসম ও নাওফালের পুত্রগণের মধ্যে বাণিজ্য লইয়া প্রতিযোগিতার সৃষ্টি হইয়াছে এইরূপ কোন একটি ঘটনারও উল্লেখ করেন নাই। এখন আকস্মিকভাবে যখন তিনি দেখিলেন, আবরাহার আক্রমণ একটি সত্য ঘটনা তখন তিনি অনুমান করিলেন যে, অনুরূপ পরিস্থিতি বিদ্যমান ছিল। তিনি সেই স্থলে "আবরাহার সঙ্গে আবদুল মুত্তালিবের আলাপ-আলোচনার মধ্যে” স্বার্থপরতার গন্ধ আবিষ্কার করিলেন।
অতঃপর এই সর্বশেষ ধারণার বশবর্তী হইয়া অনুমান করিতে ব্রতী হইলেন যে, আব্দ শাম্স ও নাওফালের বংশধরগণ "ইতোমধ্যে বাহ্যত সিরিয়া ও ইয়ামানের সকল বাণিজ্য বাজার দখল করিয়া লইয়াছিল, যাহা কিনা এক সময় হাশিম ও আল-মুত্তালিবের অধিকারে ছিল"। সত্যই যদি আবিসিনিয়ার সহিত সম্পর্কের অবনতি ঘটিয়াই থাকে যাহার কারণে আবরাহার আক্রমণ, প্রকৃতই সম্পর্কের অবনতি হইয়াছিল এবং ওয়াট তাহাও স্বীকার করিয়াছেন, তাহা হইলে আব্দ শাম্স ও নাওফাল গোত্র সেই একই সময় হাশিম ও আল-মুত্তালিব গোত্রকে আবিসিনিয়া ও ইয়ামানের বাণিজ্য হইতে বহিষ্কার করিতে উদ্যত হইবে, ইহা রীতিমত বিভ্রান্তিকর। আগেই দেখানো হইয়াছে যে, ১৪ আবদুল মুত্তালিবের বিরুদ্ধে ওয়াটের অভিযোগ যুক্তিতে টিকে না।
ওয়াটের মতে তথাকথিত ধনী কুরায়শ গোত্রগুলির মনোভাব সম্পর্কে তাহার মন্তব্য অধিকতর বিভ্রান্তিকর। ওয়াট বলেন, "আবিসিনিয়ার পক্ষে আবদুল মুত্তালিবের নীতির বিপক্ষে ধনী গোত্রগুলি নিরপেক্ষতা অবলম্বন করিত, কারণ উহাই ছিল তাহাদের সর্বাধিক স্বার্থের অনুকূল”। ১৫ এই ক্ষেত্রে যে কেহ প্রশ্ন তুলিতে প্রলুব্ধ হইতে পারেন যে, নিরপেক্ষতা কিসের প্রতি অথবা কাহার প্রতি? ওয়াটের অনুমান মত আবদুল মুত্তালিব যদি চাহিতেন তবে আবিসিনীয়দের সহায়তায় তাহার প্রতিপক্ষ ধনী গোত্রগুলির বিরুদ্ধে সকল কিছু উল্টাইয়া ফেলিতে পারিতেন তাহা হইলে তাহাদের নিরপেক্ষ থাকার ফলে তাহাদের স্বার্থ কি প্রকারে রক্ষিত হইত? এবং নিরপেক্ষ থাকিবার কারণে তাহারাই ক্ষতিগ্রস্ত হইত অধিক। অন্যদিকে আবরাহা আসিয়াছিল কা'বা শরীফ ও বাণিজ্যে মক্কার প্রাধান্য ধ্বংস করিতে। সেই ক্ষেত্রে মক্কার ধনিক গোত্রগুলির সহিত বায়যানটীয়দের যতই সদ্ভাব থাকুক না কেন তাহারা কি প্রকারে এই ক্ষেত্রে নিষ্ক্রিয় বা নিরপেক্ষ থাকিতে পারে? পারসিকগণ তখনও দৃশ্যপটে আসে নাই। ফলে দুই বৃহৎ শক্তির মধ্যে নিরপেক্ষ থাকিবার প্রশ্নও আসিতেছে না। প্রকৃতপক্ষে স্বীকার করিতেই হইবে যে, তিনি আব্দ শাম্স ও অন্যান্য গোত্রের 'নিরপেক্ষ নীতি' বলিতে কি বুঝাইয়াছেন উহার মাথামুণ্ড বোধগম্য হওয়া সম্ভব নহে।
ওয়াট সাহেব আরও বলিয়াছেন, "যখন পারসিকগণ দক্ষিণ আরব জয় করিয়া লইল তখন মক্কার জন্য নিরপেক্ষ নীতি অবলম্বন করা অধিকতর জরুরী হইয়া পড়িয়াছিল”। ১৬ ওয়াটের এই বৃক্সখ্যাটি দ্বারা বোধগম্য হয় যে, তিনি যখন ইতোপূর্বে নিরপেক্ষতার কথা বলিয়াছিলেন তখন তাহার নিকট পারস্য বিবেচনাধীন ছিল না। অতএব সেই স্থলে নিরপেক্ষতা বলিতে তিনি বায়যানটীয়দের সঙ্গে ঐতিহ্যগত বন্ধুত্বপূর্ণ সম্পর্কের কথাই বুঝাইয়াছিলেন। যাহা হউক, অতঃপর তিনি বলিয়াছেন যে, আরব ভূভাগে পারস্যের অবস্থান যাহা ছিল তাহাতে মনে হয় না যে, মক্কার নিরপেক্ষ থাকিবার সেইরূপ কোন প্রয়োজন ছিল। কারণ উপরিউক্ত বক্তব্য রাখিবার পরই ওয়াট সাহেব পাঠকের দৃষ্টি দক্ষিণ আরবে পারস্যের প্রভাব যে মোটেই কার্যকর নহে তাহার প্রতি আকৃষ্ট করিয়া বলেন, "যেহেতু অধিকাংশ আরবভূমি তাহাদের নিয়ন্ত্রণে ছিল না" সেইহেতু "মক্কাবাসিগণ এই অবস্থার সুযোগে নিজেদের শক্তিকে সুসংহত করিয়া লইয়াছিল”। এই প্রকারে তিনি পরবর্তী বিবৃতি ব্যাখ্যা করিতে গিয়া পুনরায় ফিজার যুদ্ধের উৎপত্তি সম্পর্কিত তাহার অনুমান উপস্থাপন করিয়া বলেন, 'ফিজারের যুদ্ধ, যাহা সম্ভবত আরম্ভ হইয়াছিল আবিসিনীয়দের উৎখাত করিবার পরবর্তী কোন এক সময়ে, হীরা হইতে তায়েফ হইয়া ইয়ামান যাইবার পথে মক্কার কোন বন্ধু প্রতীম গোত্র কর্তৃক আর একটি কাফেলা বিনা উস্কানিতে আক্রান্ত হইবার কারণে ফিজারের যুদ্ধ সংঘটিত হইয়াছিল। অর্থনীতির পরিভাষায় ইহার অর্থ মক্কাবাসিগণ এই পথ চিরতরে বন্ধ করিয়া দিতে চাহিতেছিল অথবা এই পথ যেন তাহাদের নিয়ন্ত্রণে থাকে সেই ব্যবস্থা করিতে সচেষ্ট ছিল। ১৭
এইরূপে ওয়াট সাহেব আমাদিগকে বিশ্বাস করাইতে চেষ্টা করিয়াছেন যে, মক্কার সম্ভ্রান্ত সওদাগরগণ বায়যানটীয়দের সঙ্গে ঐতিহ্যগত বন্ধুত্বের কারণে আবরাহা যখন তাহাদের নগরী আক্রমণ করিয়াছিল তখন নিরপেক্ষ ছিল এবং যখন পারসিকরা দক্ষিণ আরব হইতে আবিসিনীয়দের বিতাড়িত করিল তখন মক্কাবাসিগণ চেষ্টা করিবে হীরা-পারস্যের বাণিজ্য পথ, যাহা তায়েফ হইয়া দক্ষিণ আরব গিয়াছিল, নিয়ন্ত্রণ করিতে অথবা বন্ধ করিয়া দিতে। এই অনুমানের সর্বাপেক্ষা স্পষ্ট মিথ্যা যুক্তি এই যে, হীরা হইতে যে কাফেলার ইয়ামানের উদ্দেশ্যে যাত্রা করিবার কথা বলা হইয়াছে এবং যাহার উপর ভিত্তি করিয়া তাহার তত্ত্ব দাঁড় করাইয়াছেন সেই কাফেলা মোটেই ইয়ামানের উদ্দেশ্যে ছিল না, ইহা পূর্বেই বলা হইয়াছে। নিজ রচনার ১২ পৃষ্ঠায় ওয়াট সাহেব বলিতেছেন, 'পারসিক কাফেলা আল-হীরা হইতে ইয়ামান', এখন তিনি বলিতেছেন, 'আল-হীরা হইতে একটি কাফেলা', সঙ্গে যোগ করিতেছেন 'তায়েফ হইয়া' তথাকথিত গন্তব্যস্থল ইয়ামানে 'একটি কাফেলা' এই পরিবর্তন সঠিক; কিন্তু বিবৃতিটি সামগ্রিকভাবে বিভ্রান্তিকর। প্রকৃতই সেখানে একটি কাফেলা ছিল, অনেকগুলি কাফেলা নহে এবং ইহাকে ইয়ামান হইতে তায়েফে প্রেরণ করা হইয়াছিল অর্থাৎ উহার নিকটে উকাযের মেলায় প্রেরণ করা হইয়াছিল, কিন্তু তায়েফ হইয়া ইয়ামানের উদ্দেশ্যে নহে।
ইতোপূর্বে বলা হইয়াছে, কাফেলার উপর যে আক্রমণ পরিচালিত হইয়াছিল উহা প্রকৃতপক্ষে পরিচালিত হইয়াছিল সেই কাফেলার জামিনদারের উপর যিনি একজন তায়েফবাসী ছিলেন। সেই আক্রমণকারীও ছিলেন জামিনদারের ব্যক্তিগত প্রতিপক্ষ। মক্কার সওদাগরদের পক্ষ হইতে সেই আক্রমণ পরিচালিত হয় নাই। এই আক্রমণ কোনক্রমেই হীরার বিপক্ষে বাণিজ্যপথ বন্ধ করিবার জন্য ছিল না, ছিল না সেই পথের উপর মক্কাবাসীদের নিয়ন্ত্রণ প্রতিষ্ঠা করিবার জন্য। প্রকৃতপক্ষে হীরা হইতে উকায মেলায় গমনকারী এই একটিমাত্র কাফেলার ঘটনা ব্যতীত হীরা বা পারস্য হইতে তায়েফ হইয়া ইয়ামানে বাণিজ্য করার জন্য অন্য কোন কাফেলা গিয়াছিল অথবা যাওয়ার চেষ্টা করিয়াছিল ওয়াট এইরূপ আর কোন ঘটনার উল্লেখ করেন নাই। যেহেতু তাহার মূল অনুমানটি ভ্রান্ত অর্থাৎ কাফেলাটিকে ইয়ামানের উদ্দেশ্যে প্রেরণের ধারণাটিই ভ্রান্ত, সেইহেতু এই অনুমানের উপর ভিত্তি করিয়া তিনি যে সিদ্ধান্তে উপনীত হইতে চাহিতেছেন যে, কুরায়শ নেতৃবৃন্দ এই কাফেলার উপর আক্রমণ পরিচালনা করিয়া হীরা বা পারস্যের বিপক্ষে পথটি বন্ধ করিয়া দেওয়া অথবা পথের উপর তাহাদের নিয়ন্ত্রণ প্রতিষ্ঠা করার চেষ্টা করিয়াছিল, ইহা সম্পূর্ণ ভ্রান্ত। কারণ ইহার ফলে যে যুদ্ধ সংঘটিত হইয়াছিল উহা একান্তই মক্কা ও তায়েফের মধ্যে সীমাবদ্ধ ছিল। প্রত্যক্ষ বা পরোক্ষ কোন প্রকারেই হীরা বা পারস্য এই বিবাদে জড়িত হইয়া পড়ে নাই। সত্যই যদি মূল ঘটনা তাহাদের স্বার্থের বিরুদ্ধে যাইত তাহা হইলে তাহারা অবশ্যই তায়েফের পক্ষ অবলম্বন করিত, অন্ততপক্ষে ইরাক ও ইয়ামানের সহিত মক্কার বাণিজ্যের ক্ষেত্রে প্রতিশোধ গ্রহণ করিত। কারণ বিশেষত ইয়ামান তখন পারস্যের নিয়ন্ত্রণে ছিল। এইরূপ প্রচেষ্টার কোন প্রমাণ পাওয়া যায় না।
প্রকৃত প্রস্তাবে তায়েফ বা অন্য কোন স্থানে আগমনকারী কোন কাফেলাকে মক্কাবাসিগণ বাধা দান করিবে এমন প্রশ্নই উঠিতে পারে না। ইতোপূর্বে দেখানো হইয়াছে যে, বিবাদের উৎস ছিল দুই ব্যক্তির ব্যক্তিগত প্রতিযোগিতা। তারা দুইজনই চাহিতেছিলেন যে, কাফেলা তায়েফে (উকায মেলায়) আসুক। মক্কার বাররাদ কর্তৃক তাহার তায়েফী প্রতিপক্ষ উরওয়ার উপর যে আক্রমণ পরিচালিত হইয়াছিল তাহা ছিল ব্যক্তিগত এবং এই ব্যাপারে মক্কাবাসীদের কোন ভূমিকাই ছিল না, এই কথা মি.ওয়াট তাহার রচনায় তিন পৃষ্ঠা পূর্বেই স্বীকার করিয়াছেন। ১৮ সেই স্থানে তিনি স্পষ্টভাবেই বলিয়াছেন যে, 'তিনি (বাররাদ) যে কাজ করিয়াছিলেন তাহা মূলত ছিল আপন ব্যক্তিস্বার্থ চরিতার্থ করিবার নিমিত্ত এবং মক্কাবাসীর প্ররোচনায় নহে'। এমতাবস্থায় ইহা অতীব আশ্চর্যের বিষয় যে, উত্তমরূপে জানিয়া এবং ঘটনার প্রকৃত সত্য বর্ণনা করিয়া ওয়াট সাহেব কী প্রকারে পরবর্তী পর্যায়ে ইহাকে বিকৃত করিয়া ব্যবহার করিয়াছেন এবং উহার উপর ভিত্তি করিয়া তাহার মক্কা এবং হীরা-পারসিক বাণিজ্য যুদ্ধের তত্ত্ব নির্মাণ করিয়াছেন! কেবল তাহাই নহে, উহার উপরই ভিত্তি করিয়া তিনি একের পর এক ধারণা, অনুমান ও সিদ্ধান্ত দাঁড় করাইয়াছেন, ইহা ভাবিতেও আশ্চর্য লাগে।
অনুরূপ বাণিজ্য যুদ্ধের যুক্তিসঙ্গত কারণও পরিদৃষ্ট হয় না। কারণ মক্কাবাসিগণ তখন অন্যান্য দেশের সঙ্গে নিয়মিত বাণিজ্য চালাইয়া যাইতেছিল, যেমন উত্তরে সিরিয়া ও ইরাক এবং দক্ষিণ ও দক্ষিণ-পশ্চিমে ইয়ামান ও আবিসিনিয়ার সঙ্গে বাণিজ্য চালাইতেছিল। তাহাদের নিজেদের স্বার্থেই প্রয়োজন ছিল কেবল বায়যানটাইনই নহে, সকলের সহিত সুসম্পর্ক রক্ষা করা। কুরায়শ সওদাগরগণ নিশ্চয়ই এত নির্বোধ ছিল না যে, মক্কার নিকটে পাইয়া হীরা বা ইয়ামানের কোন বাণিজ্য বহরকে আক্রমণ করিয়া বসিবে এবং নিজেদেরকে অহেতুক বিপদের মধ্যে ফেলিবে। তদুপরি তাহারা অবশ্যই জানিত যে, এইরূপ আচরণ করিলে ভবিষ্যতে তাহারাও অনুরূপ আচরণ লাভ করিবে। তাহারা যখন উহাদিগের দেশের নিকট দিয়া বাণিজ্য বহর লইয়া যাইবে তাহাদিগকে অনুরূপ আক্রমণের মোকাবিলা করিতে হইবে। ঐরূপ দায়িত্বজ্ঞানহীন কাজ তাহারা করিবে এমন সম্ভাবনাও নাই। কারণ কুরায়শ নেতৃবৃন্দ জানিতেন যে, তাহাদের বাণিজ্য পথের নিকটে অবস্থিত বিভিন্ন গোত্রের সহায়তা তাহাদের প্রয়োজন। এই বিষয়ে ওয়াট নিজেই দৃষ্টি আকর্ষণ করিয়াছেন। বলিয়াছেন, 'কোন এলাকার মধ্য দিয়া যাইবার সময় সেই এলাকার গোত্র-প্রধানকে পানি ও অন্যান্য প্রয়োজন মিটাইবার জন্য মূল্য দিতে হয়'। ১৯ ওয়াট মক্কার নেতৃবৃন্দের মধ্যে তাহাদের আপন ঘরের নিকট যে প্রকার একচ্ছত্র আধিপত্য লাভের অভিলাষ দেখাইতে চাহিতেছেন সেই ক্ষেত্রে মক্কার উত্তর ও দক্ষিণে যে বাণিজ্য পথ তাহার দুই পাশে অবস্থিত নানা মতের নানা দলের যে বিভিন্ন গোত্র বসবাসরত ছিল তাহাদের সকলের সহিত সহযোগিতা ও সম্পর্ক রক্ষা করা মক্কার নেতৃবৃন্দের প্রয়োজন ছিল (উনিশ শতকের মাঝামাঝি সময়ে ইউরোপে প্রোশিয়ার নেতৃত্বে বিভিন্ন জার্মান রাষ্ট্রের মধ্যে বিদ্যমান বাণিজ্য কর অবলুপ্ত করার মাধ্যমে সমগ্র জার্মান জাতিকে একীভূত করার উদ্যোগ গ্রহণ করা হইয়াছিল যাহাকে বলা হয় যোল্লেভেরেইন)। ষষ্ঠ শতকের শেষে এবং সপ্তম শতকের প্রথমদিকে আরব উপদ্বীপে অনুরূপ যোল্লেভেরেইনের উদ্যোগের বিষয় কল্পনা করা যায় না। পক্ষান্তরে তায়েফ অন্যান্য গোত্রের সঙ্গে মিলিত হইয়া ফিজারের যুদ্ধে মক্কার বিরুদ্ধে দাঁড়ানোর যুক্তি যেমন একটি অর্থনৈতিক ঐক্য বিরোধী, তেমনি মক্কার আধিপত্যে সামরিক প্রয়োজনে পশ্চিম আরবের বিভিন্ন গোত্রকে সম্মিলিত করিয়া একটি রাষ্ট্র-সংঘ গঠন সম্পর্কিত ওয়াট-এর তত্ত্ব অযৌক্তিক।
মি.ওয়াট এই কথা বলিয়া ক্ষান্ত হন নাই যে, কুরায়শ নেতৃবৃন্দ হীরা হইতে তায়েফে আগমনকারী কাফেলাকে বাধাগ্রস্ত করিবার উদ্যোগ নিয়াছিল। তিনি চাহিয়াছেন যে, আমরা আরও বিশ্বাস করি তাহারা ইয়ামানী কাফেলাকে উত্তর দিকে অগ্রসর হইতেও বাধা দান করিয়াছিল, এমনকি তাহারা যেন মক্কা পর্যন্তও না যাইতে পারে। এই সকল বক্তব্য তিনি কতগুলি অনুমানের উপর ভিত্তি করিয়া দাঁড় করাইয়াছেন, যেমন একই সঙ্গে উত্তর ও দক্ষিণের সহিত মক্কার বাণিজ্য যুদ্ধ। কেবল তাহাই নহে, তাহার আর একটি অনুমান যে, মক্কার অভ্যন্তরেই কুরায়শদের দুই গোত্রের মধ্যে প্রচণ্ড বাণিজ্যিক প্রতিযোগিতা ছিল এবং এই প্রকারেই মি. ওয়াট তাহার হিলফুল ফুযূলের প্রকৃতি সম্পর্কিত তত্ত্বকে স্থাপন করিয়াছেন। ২০ উহা নিম্নরূপ:
"এই পটভূমিতে ফুযূলের রাষ্ট্র-সংঘ...... একটি নূতন গুরুত্ব লাভ করিল"। ইয়ামানী ব্যবসায়ীর নিকট হইতে পণ্য লইয়া কোন এক সাহমীর মূল্য পরিশোধে অস্বীকৃতি জ্ঞাপন এবং বানু হাশিম ও অন্যান্য গোত্রের প্রতিক্রিয়া সম্পর্কে ওয়াট লিখিয়াছেন, ইহা হইতে অনুমিত হয় যে, তাহাদের নীতিতে নূতন গুরুত্বপূর্ণ ধারার প্রবর্তন হইয়াছিল: "ধনী গোত্রসমূহ কর্তৃক দক্ষিণের বাণিজ্য হইতে ইয়ামানীদিগকে বহিষ্কার করার চূড়ান্ত প্রচেষ্টা এবং উহাকে নিজেদের করতলগত করা”। ওয়াটের ধারণায় বানু হাশিম এবং অন্যান্য গোত্র ইয়ামানে তাহাদের নিজেদের কাফেলা প্রেরণের মত অর্থনৈতিকভাবে যথেষ্ট শক্তিশালী ছিল না। তাই তাহারা "মক্কায় অবস্থানকারী ইয়ামানী সওদাগরদিগের নিকট হইতে ব্যবসা করিয়া কিছু উপার্জন করিত”। তাহা হইলে সেই সকল গোত্র, যেমন বানু আব্দ শাম্স ও বানু মাখযূম কর্তৃক যদি ইয়ামনগামী কাফেলা সম্পূর্ণরূপে নিয়ন্ত্রিত হইত, তাহা হইলে দুর্বলতর গোত্রগুলির "সিরিয়াতে লইয়া যাইবার মত কোন পণ্যই ছিল না; তাহা না হইলে ধনী গোত্র কর্তৃক নির্ধারিত শর্তে তাহাদের কাফেলার অংশগ্রহণ ব্যতীত তাহাদিগের আর কোন উপায় ছিল না”।
এভাবেই ওয়াট তাহার পরিসমাপ্তি টানিয়াছেন যে, একজন সাহমীর (আল-আস ইব্‌ন ওয়াইল) কারণে যিনি একজন ইয়ামানী সওদাগরের নিকট হইতে পণ্য ক্রয় করিয়াছেন অথচ তাহার মূল্য পরিশোধ করেন নাই এবং তাহার ফলেই বনু হাশিম ও অন্যান্য গোত্র মিলিয়া হিলফুল ফুদূল গঠন করিয়াছিল। তথাকথিত "ধনী গোত্র”, যেমন আব্দ শাম্স ও মাখযূম, নিশ্চয়ই চেষ্টা করিয়াছিল ইয়ামানে কাফেলা পাঠানোর একচ্ছত্র অধিকার কেবল তাহাদের থাকিবে এবং তাহারা "দুর্বল গোত্রগুলি”কে ভীত করিয়া তুলিবে যে, তাহাদের "কোন মালামালই নাই সে ক্ষেত্রে সিরিয়ায় কি প্রকারে কাফেলা প্রেরণ করিবে”।
সর্বাপেক্ষা মজার বিষয় পূর্ববর্তী পৃষ্ঠায় ওয়াট দেখাইয়াছেন যে, "আবরাহার আক্রমণের পূর্ব হইতেই বানু আব্দ শাম্স ও নাওফাল সিরিয়া ও ইয়ামানের অধিকাংশ বাণিজ্য দখল করিয়া লইয়াছিল যাহা পূর্বে হাশিম ও আল-মুত্তালিবের অধিকারে ছিল”। ২১ হিলফুল ফুযূল গঠনের মাত্র বিশ বৎসর পূর্বে ইহাই যদি অবস্থান হইয়া থাকে তাহা হইলে ইহা বোধগম্য নয় যে, কেন বানু আব্দ শাম্স ও তাহার মিত্রগণ ইয়ামানের কাফেলার ক্ষেত্রে তখনও একচ্ছত্র কর্তৃত্ব স্থাপনের প্রচেষ্টা চালাইয়া যাইবে? বর্তমান ক্ষেত্রে ঘটনা এইরূপ যে, একজন ইয়ামানী সওদাগর আসিয়াছেন ও তাহার প্রাপ্য পরিশোধ করা হয় নাই। মক্কার কোন কাফেলা ইয়ামানের উদ্দেশে রওয়ানা হইতেছে তাহাও নহে। তাহা হইলে এই ক্ষেত্রে প্রশ্ন থাকিয়া যায় যে, কী প্রকারে "তুলনামূলকভাবে ধনী" গোত্রসমূহ ইয়ামানগামী কাফেলার নিরাপত্তা নিশ্চিত করিবে যখন তাহারা নিজেরাই মক্কায় অবস্থানরত ইয়ামানীদিগের সহিত দুর্ব্যবহার করে অথবা সেখানে আসিতে বাধা প্রদান করে? পুনরায়, তাহারা কী প্রকারে আশা করিতে পারে যে, তাহারা একচ্ছত্র আধিপত্য প্রতিষ্ঠা করিতে সফল হইবে, যেমনটি ওয়াটের ধারণা, যেখানে খোদ মক্কা নগরীতেই একটি দল রহিয়াছে, সেই দল যতই দুর্বল হউক না কেন, যাহারা তেমন নীতির বিরোধিতা করিতেছে? কিন্তু ওয়াট কী বলিতেছেন? তিনি বলিতেছেন যে, বানু হাশিম ও অন্যান্য গোত্র যাহারা হিল্ল্ফ গঠন করিয়াছিল তাহারা আর্থনৈতিকভাবে যথেষ্ট শক্তিশালী ছিল না যে, তাহারা "নিজেদের কাফেলা ইয়ামানে পাঠাইবে”। ইহা তাহার অনুমান মাত্র এবং সেই অনুমান তিনি নিজেই খণ্ডন করিয়াছেন যখন তিনি প্রকৃত ঘটনা বর্ণনা করেন। ওয়াট নিজেই স্বীকার করিয়াছেন যে, হিল্ল্ফ সংগঠনে নেতৃত্ব দিয়াছিলেন বানু তায়ম গোত্রের আবদুল্লাহ ইব্‌ন জুদ'আন এবং তিনি "ফিজার যুদ্ধের প্রারম্ভকালে মক্কা নগরীর একজন নেতৃস্থানীয় ব্যক্তি ছিলেন”। ২২ সূত্রমতে জানা যায়, প্রকৃতপক্ষে তিনি সেই সময় মক্কা নগরীর সর্বাপেক্ষা ধনী না হইলেও অন্যতম ধনী ব্যক্তি ছিলেন। তদুপরি সত্যই যদি হিলফ গঠনের পরবর্তী কালে আবু তালিবের আর্থিক অবস্থার কিছু অবনতি হইয়া থাকে তাহা হইলেও তাহার গোত্রে এইরূপ বহু ধনী ব্যক্তি ছিলেন, যেমন আবু লাহাব ও আব্বাস, যাহারা সম্পদের দিক হইতে আব্দ শাম্স ও বানু মাখযূম গোত্রের অনেক ধনী ব্যক্তির সমতুল্য ছিলেন।
তদুপরি হিলফের অপর এক সদস্য বানু আসাদ গোত্রও যথেষ্ট ধনী ছিল এবং তাহারা বিভিন্ন অঞ্চলে তাহাদের বাণিজ্যিক কাফেলা পরিচালনা করিত। খাদীজা (রা) ছিলেন সেই গোত্রের। নির্ভরযোগ্য সূত্র হইতে জানা যায় যে, হিল্ল্ফ গঠনের পাঁচ বৎসর পর যখন হযরত মুহাম্মাদ 'বিবি খাদীজা (রা)-র কাফেলা লইয়া সিরিয়া গমন করিয়াছিলেন তখন তাঁহার বাণিজ্য-সম্পদ ও কাফেলা মক্কার অন্যান্য সকল সওদাগরের মিলিত সম্পদের প্রায় সমান ছিল। এই তথ্য এবং সেই সঙ্গে বালক মুহাম্মাদকে লইয়া আবূ তালিবের সিরিয়ায় বাণিজ্য ভ্রমণ সংক্রান্ত সর্বজনবিদিত ঘটনা ওয়াটের সেই অনুমান বা ধারণাকে খণ্ডন করে যে, আবরাহার মক্কা আক্রমণের সময় হইতে বানু হাশিম গোত্র সিরিয়ার বাণিজ্যক্ষেত্র হইতে বিতাড়িত হইয়াছিল। তাহার বক্তব্য, "দুর্বলতর" গোত্রগুলি অর্থনৈতিকভাবে ইয়ামানে বাণিজ্য কাফেলা পরিচালনার শক্তি রাখিত না এবং সেই কারণে তাহারা একদিকে "মক্কায় অবস্থানকারী ইয়ামানী সওদাগরদিগের সহিত সওদা করিয়া কিছু ফায়দা কুড়াইয়া লইত" এবং অপরপক্ষে যদি ইয়ামানগামী কাফেলা সম্পূর্ণরূপে আব্দ শাম্স ও মাখযূম গোত্র কর্তৃক নিয়ন্ত্রিত হইত তাহা হইলে দুর্বলতর গোত্রের উত্তরে সিরিয়ায় লইয়া যাইবার মত মালামাল ছিল না, কথাটি একে অপরকে খণ্ডন করে। কারণ তাহারা যদি পারিত এবং এখানে যেভাবে বলা হইয়াছে তাহাতে মনে হয় তাহারা উত্তরে সিরিয়ায় কাফেলা প্রেরণ করিত, সেই ক্ষেত্রে তাহারা কেন ইয়ামানে কাফেলা পাঠাইতে পারিবে না ইহা বোধগম্য নয়। তদুপরি তাহারা যদি এতই গরীব হইত যে, ইয়ামানে কাফেলা পাঠাইতে পারিত না ওয়াট যেমন ধারণা পোষণ করেন, তাহার অর্থ তথাকথিত ধনী গোত্রগুলি প্রকৃতপক্ষে বাণিজ্যের ক্ষেত্রে একচ্ছত্র আধিপত্য ও নিয়ন্ত্রণ প্রতিষ্ঠা করিয়াছিল।
তাহা হইলে একচ্ছত্র আধিপত্য অর্জনের জন্য সেই ক্ষেত্রে মক্কায় আগত ইয়ামানী সওদাগরদিগকে আপন স্বার্থে শোষণ করার প্রয়োজন হইত না। প্রকৃতপক্ষে এমনকি ইয়ামানী সওদাগরদিগের নিকট হইতে সওদা গ্রহণ করা হইতে কেবল দুর্বলতর গোত্রগুলিকে নিবৃত্ত করাই যদি উদ্দেশ্য হইত তাহা হইলে সহজ সাধারণ বাণিজ্যিক জ্ঞান বলে, অধিকতর ধনিক শ্রেণীর গোত্রগুলি অতি সহজেই মূল্য পরিশোধ করিয়া ইয়ামানী সওদাগরদের মালপত্র খরিদ করিয়া প্রতিদ্বন্দ্বীকে হটাইয়া দিতে পারিত এবং তাহাকে আপন স্বার্থে শোষণ না করিয়া ইয়ামানে মক্কার কাফেলা প্রেরণকে ক্ষতিগ্রস্ত করিত না।
এমতাবস্থায় যে অনুমানের উপর ভিত্তি করিয়া ওয়াট তাহার হিলফুল ফুযূল তত্ত্ব দাঁড় করাইয়াছেন তাহা সম্পূর্ণরূপে ভুল এবং অযৌক্তিক। তিনি ধরিয়া লইয়াছেন যে, আবরাহার আক্রমণের সময় মক্কা নগরীতে বিভিন্ন গোত্রের মধ্যে প্রচণ্ড বাণিজ্যিক প্রতিদ্বন্দ্বিতা বিদ্যমান ছিল।
আবরাহার আক্রমণ হইয়াছিল হিলফুল ফুযূল গঠনের কমপক্ষে বিশ বৎসর পূর্বে। তিনি আবরাহার আক্রমণের পূর্বে অথবা পরে বিশ বৎসরের মধ্যে এমন কোন ঘটনার উল্লেখ করিতে পারেন নাই যাহাতে প্রমাণিত হয় যে, মক্কায় সেই সময় বিভিন্ন গোত্রের মধ্যে কোন দীর্ঘকালীন বাণিজ্যিক কলহ বিদ্যমান ছিল। কিন্তু যেহেতু বানু হাশিম ও সমমনা গোত্র কর্তৃক হিল্ফ প্রতিষ্ঠিত হইয়াছিল এবং যেহেতু ইহার অব্যবহিত পূর্বে এবং বানু সাহমের এক ব্যক্তি কর্তৃক একজন ইয়ামানী সওদাগরকে প্রবঞ্চনা করার ঘটনা ঘটিয়াছিল, ওয়াট ইহাকেই কুরায়শদিগের নিজেদের দুই দলের মধ্যে চরম বাণিজ্যিক প্রতিদ্বন্দ্বিতা ছিল বলিয়া পশ্চাৎকালীন সাক্ষ্য হিসাবে ব্যবহার করিয়াছেন এবং তাহার সেই ধরিয়া লওয়া প্রতিদ্বন্দ্বিতাকে এক প্রকার অতীত হইতে বর্তমান ধারণায় (Retrospective Effect) বলিতে চাহিতেছেন যে, উহা আবরাহার আক্রমণের সময়ে বিদ্যমান ছিল এবং উহাকে টানিয়া ফিজার যুদ্ধে পরিণতি দান করিয়াছেন। ওয়াট এই কাজটি করিয়াছেন। কারণ স্পষ্টতই তিনি উপরে উল্লিখিত সত্য ঘটনার প্রতি চোখ বন্ধ করিয়া রাখিয়াছিলেন। এমনকি চতুর্থ ফিজার যুদ্ধ পর্যন্ত প্রতিটি যুদ্ধে বানু হাশিম গোত্র এবং অন্যান্য গোত্রের লোকেরা তথাকথিত ধনী গোত্রের লোকের সঙ্গে কাঁধে কাঁধ মিলাইয়া যুদ্ধ করিয়াছিল সেই অতি বাস্তব ঘটনাটি না দেখিবার ভান করিয়াছেন। ওয়াটের ধারণামত সেই যুদ্ধ যদি তথাকথিত দুর্বলতর গোত্রের ক্ষতি সাধনের বিনিময়ে ধনী গোত্রের একচ্ছত্র বাণিজ্য সুবিধা সৃষ্টির উদ্দেশ্যে ঘটানো হইয়া থাকিত তাহা হইলে দুর্বল গোত্রগুলি সেই যুদ্ধকে ধনী গোত্রের সঙ্গে সাধারণ উদ্দেশ্য হিসাবে কখনও বিবেচনা করিত না।
হিল্ল্ফ সম্পর্কিত ওয়াটের ধারণায় যে আরও কিছু ভুল তথ্য রহিয়াছে তাহা লক্ষণীয়। অন্যান্য সূত্রের সঙ্গে হালাবীও দেখাইয়াছেন যে, ২৩ প্রধানত মুতায়্যাবৃনের উৎসাহে ইহা সংগঠিত হইয়াছিল কিন্তু ইহা কেবল সেই দলের মধ্যে সীমাবদ্ধ ছিল না। খলীফা আবদুল মালিক এবং বানূ নাওফাল গোত্রের একজন সদস্যের মধ্যে একটি কথোপকথনের কাহিনী ইবন ইসহাক উল্লেখ করিয়াছেন যাহা ওয়াট নিজেও লক্ষ্য করিয়াছেন। সেখানে দেখা যায়, বানু আব্দ শাম্স ও বানূ নাওফাল উভয় গোত্রই হিলফে যোগদান করিয়াছিল, যদিও পরবর্তী কালে তাহারা উহা পরিত্যাগ করিয়াছিল। ২৪ ওয়াট স্বীকার করিয়াছেন যে, বানু আসাদ গোত্রও উহাতে যোগদান করিয়াছিল। ২৫ ধনী ও শক্তিশালী গোত্রের বিরুদ্ধে দুর্বলতর ও দরিদ্র গোত্রগুলি সম্মিলিত হইয়াছিল ইহাও সত্য নহে। তাহারা যে দুর্বল ও অকার্যকর ছিল না তাহা প্রমাণিত হয় যখন দেখা যায়, তাহারা ইয়ামানী সওদাগরকে বানূ সাহম গোত্রের যে আল-আস ইব্‌ন ওয়াইল নামক ব্যক্তি প্রতারিত করিয়াছিল তাহাকে অপরাধ স্বীকার করিতে বাধ্য করিয়াছিল এবং ইয়ামানীর প্রাপ্য পরিশোধ করিতে বাধ্য করা হইয়াছিল। ২৬ সর্বাপেক্ষা গুরুত্বপূর্ণ বিষয় এই যে, এইরূপ কোন তথ্য পাওয়া যায় না যাহা হইতে বুঝা যায় যে, তথাকথিত ধনী ও শক্তিশালী দল, তাহার ধারণায়, যাহাদিগের স্বার্থে সে এই দুষ্কর্মটি করিয়াছিল, হিল্ল্ফ যখন শাস্তিমূলক ব্যবস্থা গ্রহণ করিল তখন তাহার সাহায্যার্থে কিছুই করে নাই, এমনকি হিলফের নীতি ও প্রভাবকে খর্ব করিবার নিমিত্ত কোনই ব্যবস্থা গ্রহণ করে নাই। অথচ ওয়াট গুরুত্ব দিতেছেন যে, আল-আস ইব্‌ন ওয়াইলের কাজটি ছিল "ধনী গোত্রগুলি কর্তৃক দক্ষিণের বাণিজ্যে একচ্ছত্র আধিপত্য বিস্তারের চূড়ান্ত প্রচেষ্টা"। এই ঘটনার স্বাভাবিক ব্যাখ্যা ইহাই যে, আল-আস যাহা করিয়াছিল তাহা সে নিজের ভুলে করিয়াছিল। ইহার সহিত তাহার গোত্রের একচ্ছত্র আধিপত্য বিস্তারের অনুমিত প্রচেষ্টার কোন সম্পর্ক ছিল না। এই সকল গোত্র ইয়ামানীর পক্ষে কোন প্রকার হস্তক্ষেপ করিতে অস্বীকার করিয়াছিল। অথচ গোত্রের ধর্মই হইতেছে গোত্রের কোন সদস্য বা সদস্যের কোন মিত্রকে যে কোন প্রকার ঘটনায় সমর্থন করা। কিন্তু তাহারা যখন দেখিতে পাইল যে, হিল্ল্ফ বিষয়টি গ্রহণ করিয়াছে যেখানে উচ্চতর বিচার নীতির ভিত্তিতে ব্যবস্থা গ্রহণ করা হইবে এবং সুবিচার করা হইবে তখন তাহারা জানিত যে, হিল্ল্ফ যাহা করিতেছে তাহা সকলের স্বার্থেই করিতেছে। সেই কারণে তাহারা নীরবে সমগ্র বিষয়টি ছাড়িয়া দিয়াছিল। তাহার অর্থ ছিল প্রকারান্তরে হিল্ফের নীতির প্রতি সমর্থন জ্ঞাপন।
হিল্ল্ফ প্রকৃতই তাহাদের নীতিতে "উল্লেখযোগ্য" ধারা প্রবর্তন করিয়াছিল; কিন্তু সেই ধারা কোনক্রমেই "ধনী গোত্রের একচ্ছত্র আধিপত্য প্রতিষ্ঠা প্রচেষ্টার প্রতিক্রিয়া" হিসাবে নহে, যাহা ওয়াট ধরিয়া লইয়াছেন। ফিজার যুদ্ধের উৎস ছিল এক মাথাগরম ব্যক্তির চিন্তা-ভাবনাহীন কর্ম এবং তেমনি সমান অযৌক্তিক তথাকথিত মিথ্যা সম্মান, যে কারণে ঘটনার গুণাগুণ যাহাই হউক না কেন, তাহা যদি গোত্রের কোন সদস্য অথবা তাহার মক্কেল যেই হউক না কেন, তাহার দ্বারা সংঘটিত হয় তাহাকে গোত্র কর্তৃক সমর্থন প্রদান। কিন্তু বাণিজ্যিক ক্ষতি এবং অর্থ ও জনবলের ক্ষয়ক্ষতি কুরায়শদের মধ্যে এই বোধোদয়ের সৃষ্টি করিয়াছিল যে, অনুরূপ নীতির প্রতি অন্ধ আনুগত্য নিছক নির্বুদ্ধিতা ব্যতীত আর কিছুই নহে। এই বোধোদয় অধিকতর জোরালো হইয়াছিল, যখন ফিজার যুদ্ধের পরপর বানু সাহম গোত্রের আল-আস ইব্‌ন ওয়াইল ইয়ামানী সওদাগরকে প্রতারণা করিয়াছিল। তখন মক্কার ব্যবসায়ীরা অনুধাবন করিতে পারিয়াছিল যে, এখন দক্ষিণের ইয়ামানী ও তাহাদের মিত্র গোত্রসমূহ প্রতিশোধমূলক ব্যবস্থা গ্রহণ করিতে পারে।
অতঃপর মক্কার ধীরস্থির বুদ্ধিমান ব্যক্তিবর্গ অনুধাবন করিতে পারিয়াছিলেন যে, মক্কার ব্যবসা-বাণিজ্যর স্বার্থে এবং সামাজিক সুশৃঙ্খলার জন্য ন্যূনতম ন্যায়বিচার ও যুক্তিসঙ্গত আচার-বিধি প্রবর্তন করা প্রয়োজন। এই প্রয়োজনের তাগিদেই হিলফুল ফুযূল-এর জন্ম হইয়াছিল। ওয়াট নিজেই তাহার রচনার পরবর্তী পর্যায়ে এই বিষয়ে সামান্য আলোচনা করিয়াছেন, অবশ্য ভিন্ন প্রেক্ষিতে। তিনি সেখানে গুরুত্ব দিয়া বলিয়াছেন যে, "বিশ্বাস রক্ষা করার ক্ষেত্রে চরম সততাই বেদুঈনদের ধর্ম ও অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ বিষয়; ব্যবসার চাকায় তৈল দিতে হইলে নির্ভর করার ক্ষেত্রে উৎসাহ সৃষ্টি করিতে পারে এইরূপ ন্যূনতম মাত্রার সততার প্রয়োজন। বিবেক বর্জিত অসৎ আচরণের প্রতিবাদেই ফুযূল কনফেডারেশনের উৎপত্তি হইয়াছিল। "২৭
প্রকৃতই ব্যবসার ক্ষেত্রে অসদাচরণের বিরুদ্ধে প্রতিবাদ স্বরূপ এবং ন্যূনতম মাত্রায় বাণিজ্যিক সততা রক্ষা করার উদ্দেশ্য হইতেই হিল্ফ-এর জন্ম হইয়াছিল। কুরায়শদের দুই দলের প্রতিদ্বন্দ্বিতার ফলস্বরূপ ফিজার যুদ্ধ সংঘটিত হয় নাই। অথবা ক্ষমতাবান সওদাগরদিগের হীরা-পারস্যের বাণিজ্যপথের উপর অথবা অন্যদিকে ইয়ামানের বাণিজ্যপথের উপর একচ্ছত্র অধিকার প্রতিষ্ঠার প্রচেষ্টার কারণে ফিজার যুদ্ধ সংঘটিত হয় নাই। ওয়াট অসদাচরণের বিরুদ্ধে প্রতিবাদ হিসাবে যে হিলফের জন্ম—এইটুকু স্বীকার করিয়াছেন এবং ইহা স্বীকার করিয়া প্রকৃতপক্ষে ইতোপূর্বে তিনি যে মন্তব্য করিয়াছিলেন সেই মন্তব্যকেই খণ্ডন করিয়াছেন। ২৮ অর্থাৎ তিনি ইতোপূর্বে বলিয়াছিলেন যে, হিলুফ প্রকৃতপক্ষে অন্যায়ের বিরুদ্ধে কোন প্রতিবাদ নহে। ঘটনাক্রমে ফিজার যুদ্ধ সম্পর্কে জে. ডাবলিউ ফুক (J. W. Fuck) বাহ্যত ওয়াটের মতামত গ্রহণ করিয়াছেন। ফলে তিনিও মন্তব্য করিতে গিয়া ভুল করিয়াছেন। তিনিও বলিয়াছেন, “ইহার উদ্দেশ্য ছিল নজদের বাণিজ্যপথ নিয়ন্ত্রণ করা এবং তাহার ফলে এই বাণিজ্য হইতে প্রভূত লাভবান হওয়া”। ২৯

লিঙ্ক শেয়ার করুন
close

লিঙ্ক কপি করুন

0:00
0:00