📄 দুই: এই মূলতত্ত্বে মন্টগোমারী ওয়াট-এর অবদান
দুই : এই মূলতত্ত্বে মন্টগোমারী ওয়াট-এর অবদান
উপরিউক্ত বক্তব্যের আলোকে ইসলামের জড়বাদী ব্যাখ্যা-বিশ্লেষণের সমাবেশে ওয়াট-এর অবদান উপলব্ধি করা সহজ হইবে। বৈষয়িক উপকরণগুলির ব্যাপারে "পরিপূর্ণ মনোনিবেশ করিয়াছেন" বলিয়া ওয়াট যে দাবি করিয়াছেন তাহা একদিকে তাহার পূর্ববর্তীদের উল্লিখিত অভিমতের প্রতিফলন, তেমনি অন্যদিকে গ্রন্থের বিষয় উপস্থাপনায় সকল বিভিন্ন মতামতের অভিযোজন ও সমন্বয়ও বটে। তাই পূর্ববর্তীদের অভিমতসমূহের বিশদায়ন করিতে গিয়া ওয়াট বাস্তব তথ্যাদিকে প্রভাবিত করিয়া উল্লিখিত অভিমতগুলির পাঠের সাথে জবরদস্তিমূলক খাপ খাওয়ানোর ব্যবস্থা করিয়াছেন। আর অভিমতগুলি তাহার বক্তব্যে আত্মস্থ করিতে গিয়া এমন কিছু বিষয় তাহার মনোযোগ এড়াইয়াছে যাহার ফলে তাহার বক্তব্য অন্যান্য বাস্তবতার সহিত সাংঘর্ষিক।
গোড়াতেই বলা যায়, ওয়াট ল্যামেন্সের এই রায় মানিয়া লইয়া বলিয়াছেন, "ইসলামের অভ্যুদয়কালে মক্কা কেবল একটি বর্ধিষ্ণু বাণিজ্য কেন্দ্রই ছিল না, বরং একটি গুরুত্বপূর্ণ আর্থিক কেন্দ্রও ছিল। এই আর্থিক কেন্দ্রে জটিল ধরনের আর্থিক লেনদেন অনুষ্ঠিত হইত”। ২৪
মনে রাখা দরকার, অন্যান্য প্রাচ্য বিশারদদের মধ্যে মার্গোলিয়থও মক্কার বাণিজ্যিক বিকাশের বিষয়টির প্রতি গুরুত্ব আরোপ করেন। ওয়াট ল্যামেন্সের এই অভিমতও গ্রহণ করিয়াছেন যে, কুরায়শ গোত্র পশ্চিম ও পশ্চিম-মধ্য আরবের প্রতিবেশী গোত্রগুলির মধ্যে প্রাধান্য ভোগ করিত। তবে ল্যামেন্স কুরায়শগণ তাহাদের আধিপত্য বলবৎ করিতে ও তাহা বজায় রাখার জন্য দাসদের লইয়া গঠিত এক ভাড়াটে সেনাবাহিনী লালন করিত বলিয়া যে উল্লেখ করিয়াছেন তাহা ওয়াট প্রত্যাখ্যান করিয়াছেন। ল্যামেন্স-এর তত্ত্ব অনুযায়ী, উহার পরিবর্তে ল্যামেন্স অন্য একটি বিষয়, যথা কুরায়শদের রাজনৈতিক নৈপুণ্য বা হিল্ল্ম তত্ত্বের অবতারণা করিয়া বলিতে চাহিয়াছেন যে, "কুরায়শদের আধিপত্য তাহাদের ব্যক্তিগত সামরিক সামর্থ্যেই নিহিত ছিল না, বরং উহা নিহিত ছিল যে কোন বৈরী প্রতিপক্ষের বিরুদ্ধে সমবেত সামরিক শক্তি সমাবেশ ও প্রয়োগে তাহাদের সামর্থ্যে”। এই সামরিক শক্তির উৎস ছিল বিভিন্ন গোত্র সমবায় বা গোত্রমৈত্রীর মধ্যে। তাহারা মৈত্রী গড়িয়া তোলে তাহাদের বাণিজ্যিক উদ্যম ও উদ্যোগের ভিত্তিতে। ওয়াটের মতে, ইয়ামান, সিরিয়া ও অন্যত্র চলাচলকারী কুরায়শদের বাণিজ্যিক কাফেলাগুলির জন্য পথ-প্রদর্শক, সঙ্গী প্রহরা কাজ ও উষ্ট্রচালক হিসাবে বহু সংখ্যক বেদুঈনের প্রয়োজন ছিল। আর সে কারণে তাহারা একজন বেদুঈন সর্দারকে তাহাদের এলাকা দিয়া বাণিজ্যিক কাফেলা চলাচলের এবং পানি ও অন্যান্য রসদ সরবরাহের জন্য অর্থ প্রদান করিত। এমনি করিয়া কুরায়শগণ বেদুঈন গোত্রগুলিকে তাহাদের বাণিজ্যিক নেটওয়ার্কভুক্ত করে। বেদুঈনগণও দ্রুত এক্ষেত্রে তাহাদের নিজ নিজ স্বার্থও উপলব্ধি করিতে সক্ষম হয়। মক্কার সাথে বেদুঈন গোত্রগুলির "এই সংহতিবোধ" কুরায়শ গোত্রপ্রধানদের বিভিন্ন গোত্রের সঙ্গে বিবাহ সূত্রে আঁতাত এবং মক্কার ব্যবসায়-বাণিজ্যের যৌথ মূলধনী সংস্থায় বেদুঈন গোত্রপ্রধানদেরকে শেয়ার বরাদ্দ দানের মধ্য দিয়া মক্কার আরও শক্তিবৃদ্ধি ঘটে। ২৫
মক্কার ব্যবসায়ীদের বাণিজ্যিক প্রয়াসকে "যৌথ মূলধনী কোম্পানী" বলিয়া মূলত যিনি আখ্যায়িত করেন তিনি হইলেন মার্গোলিয়থ। ২৬ অবশ্য ওয়াট কেবল "মক্কার পরিবার/খানা প্রধানের" কথাই উল্লেখ করিয়াছেন। ওয়াট এই মক্কার পরিবার প্রধানদের মধ্যে প্রতিবেশী ও বেদুঈন গোত্রগুলিকেও অন্তর্ভুক্ত করিয়াছেন। তিনি অবশ্য এমন কোন দৃষ্টান্তের কথা সুনির্দিষ্টভাবে উল্লেখ করেন নাই যে দৃষ্টান্তে "বেদুঈন গোত্রপ্রধানগণ মক্কার যৌথ মূলধনী সংস্থা হইতে শেয়ার পাইয়াছে বলিয়া জানা যায়”। আবদুল মুত্তালিবের মত মক্কার নেতৃস্থানীয় ব্যক্তিরা তাহাদের প্রতিবেশী কোন কোন গোত্রের সহিত বৈবাহিক মৈত্রী সম্পাদন করেন এবং এই ধরনের প্রতিবেশী গোত্রের সহিত কুরায়শদের মাঝে মাঝে মৈত্রী স্থাপিত হয়। এই সবের পরিপ্রেক্ষিতে উক্ত গোত্রগুলি মক্কার বাণিজ্য কাফেলাগুলিতে মাঝে মাঝে অংশীদার হইবে এমন সম্ভাবনা উড়াইয়া দেওয়া যায় না। যদিও আমাদের কখনও ইহাও ভুলিলে চলিবে না যে, যাযাবর বা বেদুঈন জীবন
১৩২ সীরাত বিশ্বকোষ
দর্শনের সঙ্গে বাণিজ্যের সম্পর্ক কার্যত থাকিতে পারে না। সে যাহাই হউক, মাঝে মাঝে মক্কার বাণিজ্য কাফেলার যৌথ উদ্যোগ বা সামরিক মৈত্রী বা গোত্র মৈত্রীসমবায়ে এই ধরনের রায় বা কল্পনা খুবই কষ্টকল্পিত। গোত্রগুলির সহযোগিতার প্রকৃতি যাহাই হউক না কেন, এই ধরনের মৈত্রী বা গোত্রমৈত্রী সমবায়ের কুরায়শ প্রতিবেশী গোত্রগুলির উপর তাহাদের সামরিক শক্তির প্রভাব আরোপ করা হয়—এমন বক্তব্য একান্তই স্ববিরোধী।
ওয়াট কুরায়শদের বাণিজ্য কার্যকলাপ এবং মক্কায় ক্ষমতা ও নেতৃত্ব লইয়া তাহাদের আন্তগোত্র প্রতিদ্বন্দ্বিতার যোগসূত্র সন্ধান প্রয়াসে বলিয়াছেন যে, "মক্কার বাণিজ্য প্রধান জনসমাজে ক্ষমতার জন্য বরাবরই সংঘাতের অস্তিত্ব ছিল”। তিনি যদিও উল্লেখ করেন নাই যে, মহানবী -এর মিশন এই ক্ষমতা ও নেতৃত্বের জন্য গতানুগতিক প্রতিদ্বন্দ্বিতারই একটি পর্যায়মাত্র, তবুও কার্যত তিনি বলিতে চাহিয়াছেন যে, যেহেতু মুহাম্মাদ প্রথম হইতেই কোন না কোনভাবে একজন রাষ্ট্রনায়কও ছিলেন সেহেতু অন্ততপক্ষে প্রধান বিষয়গুলি বিবেচনা করিয়া দেখা দরকার। ২৭ এইসব প্রধান বিষয় বা কুরায়শদের মধ্যকার "রাজনৈতিক গ্রুপিংগুলির" অন্যতম হিসাবে ওয়াট বানু খুযা'আর নিকট হইতে মক্কার নিয়ন্ত্রণ কুসাই কর্তৃক ছিনাইয়া লওয়া, তাহার উত্তরাধিকারী বানু আবদুদ দার ও বানু আব্দ মানাফের মধ্যে কা'বার বিভিন্ন পদ ও কা'বার প্রশাসনিক কার্যাবলী লইয়া দ্বন্দ্ব-সংঘাত, আল-আহলাফ ও আল-মুতায়্যাবুন নামে তাহাদের দুইটি গ্রুপ গঠন এবং এই বিষয় লইয়া তাহাদের শেষ পর্যন্ত সমঝোতায় উপনীত হওয়ার উল্লেখ করিয়াছেন। ২৮ ওয়াট এই ঘটনার সঙ্গে পরবর্তী কালের হিলফুল ফুযূল গঠনের ঘটনাপ্রবাহের সম্পর্ক থাকার বিষয়েরও উল্লেখ করিয়াছেন। ২৯
মক্কার বিষয়াবলীর নিয়ন্ত্রণ সম্পর্কে বলিতে গিয়া ওয়াট অবশ্য আল-লিওয়া, আস-সিকায়া, আর-রিফাদা ইত্যাদির মত ঐতিহ্যিক পদের গুরুত্বকে খাটো করিয়াছেন, যদিও তাহার মত মার্গোলিয়থ ও ল্যামেন্স-এর মতের, বিশেষ করিয়া ল্যামেন্স-এর প্রতিধ্বনি বৈ আর কিছুই নহে। ওয়াট অভিমত প্রকাশ করিয়াছেন যে, আস-সিকায়া পদের আওতায় অর্থাগমের সুযোগ ছিল। কেননা হজ্জযাত্রী কর্তৃক যমযম কূপের পানি ব্যবহারের জন্য কর হিসাবে কিছু অর্থ আদায় করিতে হইত। ৩০ ইহার পর আরও এই মর্মে অভিমত প্রকাশ করা হইয়াছে যে, মক্কা নগরীর বিষয়াবলীর পরিচালনায় ব্যক্তিবিশেষের প্রভাব, তাহার ব্যক্তিগত যোগ্যতা ও গুণাবলী তাহার নিজ শাখা গোত্রের শক্তি-সামর্থ্য ও ধন-সম্পদের উপর নির্ভর করিত। ওয়াটের বর্ণনা অনুযায়ী, বানু 'আব্দ শাম্স ও বানু মাখযূম ছিলেন মহানবী -এর মিশন শুরু হওয়ার সময়ে মক্কার নেতৃস্থানীয় গোত্রগুলির মধ্যে শীর্ষ মর্যাদার অধিকারী। এই সময়ে বানু 'আব্দ শাম্স-এর আবূ সুফ্যান ছিলেন কূটনীতি, বাণিজ্য ও অর্থ বিষয়ে যোগ্যতা, বিচক্ষণতা ও বুদ্ধিমত্তায় মক্কার নীতি নির্ধারণে আধিপত্যের অধিকারী। ওয়াট এমনকি আবূ সুফ্যানের এই অবস্থানগত মর্যাদাকে এথেন্সের পেরিক্লিসের মর্যাদার সহিত তুলনা করিয়াছেন। ৩১
হযরত মুহাম্মাদ (স) ১৩৩
আরও সবিশেষ উল্লেখ্যযোগ্য বিষয় এই যে, ওয়াট মক্কার ক্ষমতা ও নেতৃত্বের জন্য আন্ত-গোত্রীয় প্রতিদ্বন্দ্বিতার বিষয়কে তাহাদের আন্তর্জাতিক বাণিজ্যের ক্ষেত্রেও সম্প্রসারিত করিয়াছেন। তিনি বৈদেশিক বাণিজ্য ক্ষেত্রে আন্ত-গোত্রীয় বাণিজ্যিক প্রতিদ্বন্দ্বিতার কথাও অনুমান করিয়াছেন। তিনি অভিমত প্রকাশ করিয়াছেন যে, বাণিজ্যিক জনসমাজে এই "রাজনৈতিক দলাদলির প্রভাব ক্রমান্বয়ে অন্যান্য গোত্রগুলির মধ্যকার সম্পর্ককেও প্রভাবিত করিয়াছে, যাহারা পরবর্তী কালে মক্কার বাণিজ্য কাফেলাগুলির সংস্পর্শে আসে। ইহা ছাড়াও তাহারা যেসব বৃহৎ শক্তির বাজারে আরব গোত্রগুলির পণ্য যাইত সেইসব বৃহৎ শক্তির সংস্পর্শে আসে”। ৩২ তিনি আরব গোত্রগুলির সহিত যে "মৈত্রী সমবায়ের" কথা বলিয়াছেন এবং যাহার উল্লেখ বক্ষমাণ রচনায় ইতোপূর্বে করা হইয়াছে, বাস্তবিকপক্ষে উহার পরিচয়ই তুলিয়া ধরা হইয়াছে। বাণিজ্যিক পর্যায়ে আন্ত-গোত্রীয় প্রতিদ্বন্দ্বিতার এই একই মূল ভাবটিকে তিনি বৃহৎ শক্তি পর্যন্ত টানিয়া লইয়া গিয়াছেন। তিনি দাবি করিয়াছেন যে, মক্কায় আবরাহার আক্রমণের সময় 'আবদুল মুত্তালিব আবিসিনিয়ার এই আক্রমণকারীর ৩৩ নিকট হইতে নিজের জন্য অনুকূল ব্যবসায়িক সুবিধা আদায়ের প্রয়াস পাইয়াছিলেন। ৩৩ মুহাম্মাদ তাঁহার যুব বয়সে অত্যন্ত লাভজনক ব্যবসায় কার্য পরিচালনার ক্ষেত্র হইতে উৎখাত হইয়াছিলেন বলিয়া ওয়াট যে ধারণা দিয়াছেন উহারও নেপথ্যে একই ধারণা ক্রিয়াশীল ছিল। ৩৪ আন্ত-গোত্রীয় ব্যবসায়িক প্রতিদ্বন্দ্বিতার নেপথ্যে তিনি একই অনুমান করিয়াছেন। ওয়াট ইহার বিশদায়ন করিয়াছেন হারবুল ফিজার ও হিলফুল ফুযূল সম্পর্কিত তাঁহার নিজ তত্ত্বে। ৩৫
পরবর্তী অধ্যায়ে হারবুল ফিজার ও হিলফুল ফুযূল সম্পর্কে সবিস্তার আলোচনা রহিয়াছে। ৩৬ আবরাহার মক্কা অভিযানকালে আবদুল মুত্তালিবের ভূমিকা সম্পর্কে ওয়াটের ধারণার অযৌক্তিকতা সম্পর্কেও এই গ্রন্থের পরবর্তী পর্যায়ে উল্লেখ করা হইবে। ৩৭ ইহা ছাড়াও তাহার ধারণায় মহানবী তাঁহার সবচাইতে লাভজনক ব্যবসায়কার্য হইতে উৎখাত হইয়াছিলেন—এই মর্মে তাহার ধারণার আপাত যৌক্তিকতা ও স্ববিরোধী প্রকৃতির আসল চেহারা যথাস্থানে উন্মোচিত করা হইবে। ৩৮
মক্কাবাসীদের রাজনৈতিক দলাদলির ঘটনা, যেমন কুসাই কর্তৃক মক্কা হইতে বানু খুযআকে উৎখাত, বানু আবদুদ-দার ও বানু আব্দ মানাফের মধ্যে ক্ষমতার দ্বন্দ্ব, আল-আহলাফ ও আল-মুতায়্যাবৃন ইত্যাদি গঠনের ঘটনা আদৌ মক্কাবাসীদের নিজেদের মধ্যে বাণিজ্যিক প্রতিদ্বন্দ্বিতা হইতে উদ্ভূত নহে, বরং ইহার উৎপত্তি কা'বাঘরের ও মক্কার নগর প্রশাসন সম্পর্কিত পদ ও ক্ষমতার লড়াই হইতে। এই বিরোধেরও নিষ্পত্তি হয় সমঝোতার মাধ্যমে। বস্তুতপক্ষে হাশিম ইবন আব্দ মানাফ কর্তৃক বায়যান্টীয় ইয়ামানী কর্তৃপক্ষের সহিত বাণিজ্যিক চুক্তি সম্পাদনের আগে কয়েকটি আরব গোত্র উল্লিখিত দ্বন্দ্ব-সংঘাতের পর কুরায়শরা বাস্তবিকপক্ষে কোন উল্লেখযোগ্য পরিসর ও ব্যাপ্তির আন্তর্জাতিক বাণিজ্যিক তৎপরতায় প্রবেশ করিতে পারে নাই। হাশিমের মক্কার বাণিজ্য উদ্যোগে আরব গোত্রগুলির সহযোগিতা বা অংশীদারিত্বের যে চিত্র
আমরা পাই তাহাতে এমন কোন ধারণা আদৌ মিলে না যে, কুরায়শদের একটি গোত্রের একটি গ্রুপের বিরুদ্ধে আন্তগ্রুপ দ্বন্দ্বজনিত কারণে মৈত্রী কার্যকর হয়। মক্কা নগরীর চৌহদ্দির মধ্যে কুরায়শ বংশের বিভিন্ন গোত্র ক্ষমতা ও প্রভাবের জন্য পরস্পরের সহিত প্রতিযোগিতায় অবতীর্ণ হইলেও কুরায়শদের দুই প্রধান গোষ্ঠীর মধ্যে কখনও কথিত "বাণিজ্য যুদ্ধ” অনুষ্ঠিত হয় নাই। তাহাদের মধ্যে কথিত বাণিজ্য প্রতিদ্বন্দ্বিতা থাকিলেও বিষয়টি কখনও তাহারা অন্য দেশের দরবারে বা বাজারে কিংবা বিজাতীয় গোত্রের নিকট উত্থাপিত করে নাই। এই ধরনের কাজ করিলে ইহা তাহাদের বাণিজ্যিক স্বার্থ, বিশেষত অন্যান্য গোত্রের সহিত তাহাদের সম্পর্ক এবং মক্কার কাফেলা গোত্রীয় এলাকা গমনকালে নিরাপত্তার জন্য আত্মহত্যামূলক বিষয় হইত। কুরায়শ গোত্রগুলির কোন গোষ্ঠী তাহাদের অন্য কোন গোষ্ঠীর বিরুদ্ধে বাণিজ্যিক বা রাজনৈতিক কোন উদ্দেশ্যেই কোন বিদেশী শক্তি বা বেদুঈন গোত্রের সহিত আঁতাত করে নাই। 'উছমান ইবনুল হুওয়ায়রিছ একবার বায়যান্টীয় শক্তির সহায়তায় রাজনৈতিক ক্ষমতা দখল করার যে চেষ্টা করিয়াছিল তাহাতে তাহার নিজ গোত্র বানু আসাদই বরং তাহার পক্ষ ত্যাগ করে এবং ঐ চক্রান্তে যোগ দিতে অস্বীকৃতি জানায়। ৩৯
মক্কার বিষয়াবলী নিয়ন্ত্রণের ব্যাপারে ওয়াট যেভাবে ব্যাখ্যা দেওয়ার চেষ্টা করিয়াছেন সে বিষয়ে বলা যায়, তিনি স্পষ্টত মহানবী -এর গোত্র বানু হাশিমকে গৌণ ভূমিকায় দেখানোর স্পষ্ট প্রয়াস পাইয়াছেন। আর এই কারণেই কা'বাঘর ও মক্কা নগর প্রশাসনের সঙ্গে সংশ্লিষ্ট পদগুলির কাজকে খাটো করিয়া দেখানো হইয়াছে। একই সাথে আস-সিকায়া নামে যে পদটি ছিল বানু হাশিমের দখলে সেই পদের আওতায় কেবল মক্কার হজ্জযাত্রীদের নিকট হইতে কিছু অর্থ আদায়ের সুযোগমাত্র ছিল বলিয়া উল্লেখ করা হইয়াছে। এই কটাক্ষপাতের সঙ্গে সঙ্গে আবরাহার মক্কা অভিযানকালে তাহার নিকট হইতে আবদুল মুত্তালিবের বাণিজ্যিক সুবিধা আদায়ের অভিযোগ তোলার প্রধান উদ্দেশ্য ছিল বানু হাশিমকে অপবাদ দেওয়া। একই উদ্দেশ্যে আবদুল মুত্তালিব আবরাহার তথা আবিসিনীয় আক্রমণের পরেও প্রায় পাঁচ বৎসরসহ মোট অর্ধ শতকেরও বেশি কাল কী করিয়া মক্কার কার্যত প্রধানের পদে বহাল রহিয়া গেলেন এবং দেশের অভ্যন্তরে ও বৈদেশিক সম্পর্কের ক্ষেত্রে কেমন করিয়া আধিপত্য বজায় রাখিলেন তাহার কোন প্রকার উল্লেখই ওয়াট করেন নাই। এমনকি তাহার মৃত্যুর পরও বানু হাশিম গোত্র কা'বা প্রশাসনে নানা ধরনের ঐতিহ্যিক ভূমিকা পালন করা ছাড়াও মক্কার নানা বিষয়ে অত্যন্ত প্রধান ও বিশিষ্ট ভূমিকা পালন করে। ইহার প্রমাণ পাওয়া যায়, মহানবী -এর ইসলাম প্রচার মিশনের অন্তত সপ্তম বৎসর অবধি সকল গোত্রের সম্মিলিত বিরোধিতার মুখেও বানু হাশিম-এর সফল মর্যাদাগত অবস্থান রক্ষার ঘটনায়। এইসব তথ্যের কোনটিরই উল্লেখ ওয়াটের মক্কার বিষয়াবলী সংক্রান্ত বর্ণনায় নাই।
কুরায়শ এবং খোদ মক্কা নগরী গুরুত্ব ও অবস্থানগত এমন মর্যাদা ভোগ করিয়াছে কেবল সেখানে কা'বাগৃহ অস্তিত্বশীল ছিল বলিয়া, বিষয়টি বিতর্কাতীত। এই কা'বার প্রতি শ্রদ্ধাবান ছিল
হযরত মুহাম্মাদ (স) ১৩৫
সকল আরববাসী। তাহারা মক্কা সফর করিত এবং বৎসরে একবার হজ্জ পালন করিত। মক্কার অভ্যন্তরীণ ব্যবসায়-বাণিজ্য সামগ্রিকভাবে এবং বৈদেশিক বাণিজ্যের সিংহভাগ সংশ্লিষ্ট ছিল আল্লাহ্র গৃহ কা'বার সহিত। অতএব সুনিশ্চিতভাবেই কা'বার প্রশাসন এবং বার্ষিক হজ্জ অনুষ্ঠানের ব্যবস্থাপনা, বিশেষ করিয়া হজ্জ মৌসুমে খাদ্য ও পানির ব্যবস্থা করা ছিল মক্কানগরীর বিষয়াবলীর মধ্যে সর্বাপেক্ষা গুরুত্বপূর্ণ অংশ। শহরের নাগরিক জীবনের এই গুরুত্বপূর্ণ ও সকল মনোযোগের দাবিদার কাজটির দায়িত্ব ছিল কুরায়শদের মধ্যে সর্বসম্মতিক্রমে বানু হাশিমের। এই কাজ বা পদটির গুরুত্ব কতখানি তাহা আরও স্পষ্ট হইবে যদি ইহা মনে রাখা হয় যে, প্রাচীন ও মধ্যযুগের গোড়ার দিকে ধর্মীয় বিষয় যাহারা নিয়ন্ত্রণ করিত তাহাদেরকেই সংশ্লিষ্ট জনসমাজে সবচেয়ে উন্নত অবস্থানের মর্যাদার অধিকারী ও গুরুত্বপূর্ণ মনে করা হইত। "ধর্মীয় বিষয়াবলীর" প্রশাসন ও ব্যবস্থাপনার কাজ কখনও সঙ্কীর্ণ ধারণায় একান্তভাবে "ধর্মীয়” প্রকৃতির ছিল না। আর এই কাজগুলিকে রাষ্ট্রীয় বিষয়াবলীর মধ্যে সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ বিষয় বলিয়াও মনে করা হইত। ওয়াট অবশ্য মক্কার বিষয়াবলী নিয়ন্ত্রণ সম্পর্কিত তাহার লেখায় এইসব বিষয় পুরাপুরি উপেক্ষা করিয়াছেন।
বিপরীতক্রমে তিনি তাহার মনোযোগ প্রধানত সন্নিবেশিত করিয়াছেন মালা (মা’লা) অর্থাৎ নগরীর বয়োজ্যেষ্ঠদের পরিষদের গুরুত্বের প্রশ্নে। এই মালা বা বয়োজ্যেষ্ঠদের পরিষদ কার্যত ছিল আন-নাদওয়া যাহা মক্কার বিষয়াবলী প্রশাসন কর্তৃপক্ষের পাঁচ বা ছয়টি বিভাগের অন্যতম চিরায়ত বিভাগ। মালার কার্যাবলীর প্রতি গুরুত্ব আরোপ করিতে যাইয়া ওয়াট বলিয়াছেন যে, নগরীর বিষয়াবলীর ক্ষেত্রে কোন গোত্রের গুরুত্ব ও প্রভাব নির্ভর করিত ঐ গোত্রের ব্যক্তি সদস্যদের বিত্ত ও বুদ্ধিমত্তার উপর।
ধনসম্পদ ও বুদ্ধিমত্তা নিশ্চয়ই এই বিষয়ে বিবেচ্য ছিল নিঃসংশয়ে যাহা সকল যুগের সকল সমাজের ক্ষেত্রেই সত্য ও বাস্তব। কিন্তু বানু 'আব্দ শাম্স ও তাহাদের মিত্রগোত্রগুলি মালা বা বয়োজ্যেষ্ঠ পরিষদের অধিবেশন বা সমাবেশের ক্ষেত্রে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করিত। ইহা তাহারা করিত কেবলই এইসব গোত্রের সদস্যরা কূটনীতি, বাণিজ্য ও আর্থিক বিচক্ষণতার ক্ষেত্রে বিত্ত ও মেধার অধিকারী বলিয়া নহে, বরং প্রধানত তাহারা ঐ ভূমিকা পালন করিত আহ্হ্বাফ ও মুতায়্যাবৃনের মধ্যে সম্পাদিত আপোষ-রফাক্রমে। আর একই ভিত্তিতে আন-নাদওয়া ও আল-লিওয়ার কাজগুলির দায়িত্ব প্রদান করা হয় বানু আবদ শাম্স গোত্রকে। এখানে উল্লেখ যথার্থ যে, সকল গোত্রের সম্মতি ছাড়া কোন সিদ্ধান্ত গ্রহণ ও বাস্তবায়ন করা যাইত না। ওয়াট এই সম্মতির বিধানটির উল্লেখ করিয়াছেন ঠিকই, তবে এই সাথে আরও উল্লেখ করিলে ভালো করিতেন যে, মক্কায় আবরাহার আক্রমণের সময় 'আবদুল মুত্তালিব প্রকাশ্যে আবরাহার সহিত দর কষাকষির যে আলোচনায় অংশগ্রহণ করেন তাহা তিনি নিশ্চয় সকল গোত্রের সম্মতিক্রমেও করিয়াছিলেন। ইহার সহজ-সরল কারণটি হইল, 'আবদুল মুত্তালিব আর যাহাই হউক এককভাবে মক্কার নগর জীবন সংক্রান্ত বিষয়ে কোন বড় সিদ্ধান্ত লইতে পারেন না।
১৩৬ সীরাত বিশ্বকোষ
পরিশেষে ওয়াট স্পষ্টত মক্কার অন্যান্য নেতাকে উপেক্ষা করিয়া আবূ সুফ্যানের মর্যাদা ও অবস্থানকে স্ফীত করিয়াছেন। আবূ সুফ্যান কোনক্রমেই মক্কার পেরিক্লিসের মর্যাদা পাইতে পারেন না তো বটেই, তিনি মহানবী -এর মদীনায় হিজরতের আগে অবধি মক্কার দৃশ্যপটে বিশিষ্ট ব্যক্তি হিসাবে উদিত হইতেই পারেন নাই। মক্কায় মহানবী -এর হিজরতের আগে তাঁহার বিরোধিতায় নেতৃত্বে ছিল আবূ জাল্, উতবা ইবন রাবী'আহ, আল-ওয়ালীদ ইব্ন মুগীরা, এমনকি বানু হাশিমের আবু লাহাব; আবূ সুফ্যান মোটেও নহে। এইসব ব্যক্তির ক্ষেত্রে ওয়াটের মক্কার বিষয়াবলী সংক্রান্ত বিবরণ স্পষ্টত পক্ষপাতদুষ্ট ও উদ্দেশ্যপ্রণোদিত।
ওয়াটের অর্থনৈতিক বিশ্লেষণ প্রসঙ্গে আমরা বলিতে পারি, কুরায়শদের নিজেদের মধ্যে আন্ত-গোত্রগত বাণিজ্যিক প্রতিদ্বন্দ্বিতা ছিল বলিয়া যদি ধরিয়াও লওয়া হয় তবুও বলিতেই হইবে যে, সেই কাঠামোর পরিসরে ওয়াট তাহার ধ্যান-ধারণার বিস্তার করিয়াছেন, ধারণা পরিগ্রহণ করিয়াছেন তাঁহারই পূর্ববর্তীদের নিকট হইতে, বিশেষ করিয়া এই ধারণা গ্রহণ করিয়াছেন যে:
(ক) মক্কায় বাণিজ্যিক সমৃদ্ধি ও বিত্তের নবপ্রবাহ পুরাতন যুগের দয়াধর্ম ও দানশীলতার গুণকে ধ্বংস করিয়াছে এবং তৎপরিবর্তে স্বার্থপরতা ও ব্যক্তিকেন্দ্রিকতা স্থান করিয়া লইয়াছে; বর্ধিষ্ণু ব্যক্তিস্বাতন্ত্রবাদ ও সেই সাথে বহির্বিশ্ব এবং ইয়াহুদী ও খৃস্ট ধর্মের সহিত যোগাযোগের কারণে মক্কার পৌত্তলিক ধর্ম ও গোত্রগত সংহতিতে অবক্ষয় দেখা দেয়;
(গ) নব জড়বাদী বিকাশ এবং আদিম আধ্যাত্মিক ও নৈতিক শৃঙ্খলার মাঝে এইভাবে অসঙ্গতি সৃষ্টি হওয়ার কারণে এইগুলির মধ্যে সামঞ্জস্য বিধানের প্রয়োজন দেখা দেয়;
(ঘ) এই ধরনের সামঞ্জস্য বিধানের উদ্দেশ্যে মুহাম্মাদ মূলত আর্থ-সামাজিক সমস্যাবলী সমাধানের জন্য এক ধর্মীয় সমাধান প্রদান করেন;
(ঙ) এই মিশন সম্পন্ন করিতে যাইয়া মুহাম্মাদ ইয়াহুদী ও খৃষ্ট ধর্ম হইতে ধ্যান-ধারণা গ্রহণ করেন।
এইগুলি হইল ওয়াটের পূর্বসূরীদেরই অভিমত। ওয়াট ইসলামের সামাজিক, নৈতিক, বুদ্ধিবৃত্তিক ও ধর্মীয় পটভূমিকার বিশ্লেষণ করিয়াছেন ঐসব অভিমতেরই বিশদায়নের মাধ্যমে। ৪০ তাহা ছাড়া তিনি তাহার বক্তব্যে কুরআনের প্রথম দিকের অবতীর্ণ আয়াতগুলির বক্তব্যের সঙ্গে আলোচ্য কালের পরিস্থিতির সহিত সম্পর্ক খুঁজিবার ব্যর্থ চেষ্টা করিয়াছেন। ৪১ সামাজিক পটভূমির আলোচনায় ওয়াট দেখাইবার চেষ্টা করিয়াছেন যে, ঐ সময়ে গোত্র সংহতিতে একটা অবক্ষয় ঘটে এবং আনুপাতিকভাবে ব্যক্তিবাদ বিকশিত হয়। তিনি বলিয়াছেন যে, গোত্র সংহতির ধারণাটি "সাধারণভাবে মক্কা নগরীর জন্য প্রযোজ্য”, তাহা কখনও সর্বাত্মক ছিল না। গোত্রের সদস্যরা সাধারণত যান্ত্রিকভাবে আত্মকেন্দ্রিক নহে, বরং তাহারা স্বার্থপরতাপ্রবণ মানুষ যাহা ল্যামেনসের ভাষায় "ব্যক্তিবাদ”। তাই যদি কখনও গোত্র সদস্যরা তাহাদের নিজ ও একান্ত স্বার্থকে গোত্র
হযরত মুহাম্মাদ (স) ১৩৭
স্বার্থের উপরে স্থান দিয়া থাকে উহা অস্বাভাবিক নহে। ৪২ ইহা ছাড়াও যদিও মক্কার সেরা ব্যক্তিদের কার্যকলাপে গোত্র সংহতির বিষয়টি নিয়ন্ত্রিত হইত তবুও ইহাও সত্য যে, তাহাদের ধ্যান-ধারণায় কিছু ব্যক্তিবাদী ধারণার উদয় ঘটিয়াছিল। আর এই ব্যক্তি স্বার্থপ্রবণতা লালিত হইয়াছিল মক্কায় তৎকালীন বাণিজ্যিক পরিবেশে। এইজন্য ওয়াট বলিয়াছেন যে, আবু লাহাব তাহার গোত্রের অভিমতের সহিত একমত ছিল না। সে মহানবী এর বিরোধিতা করে, উছমান ইবনুল হুওয়ায়রিছের প্রতি বিরোধিতা তাঁহার নিজ গোত্রের মধ্য হইতেই আসে" এবং তাহাদের গোত্রের অসম্মতি, এমনকি পিতা-মাতার অসম্মতি সত্ত্বেও বহু লোক ইসলাম গ্রহণ করে। ৪৩
ঐ একই সময়ে আরও "একটি কৌতূহলোদ্দীপক নূতন বিষয় মক্কায় পরিলক্ষিত হয়”। উহা হইল অভিন্ন বৈষয়িক স্বার্থের ভিত্তিতে সংহতি ও একতাবোধ। এই কারণেই ব্যবসায়ে অংশীদারির ব্যাপারটি অনেক সময় গোত্র সম্পর্ক জলাঞ্জলি দিয়াও গড়িয়া উঠে। বৈষয়িক স্বার্থের এই অভিন্নতাবোধই আহ্হ্লাফ ও মুতায়্যাবৃন সংগঠনকে তাহাদের বিরোধ নিষ্পত্তিতে অনুপ্রাণিত করে। এই বৈষয়িক স্বার্থের অভিন্নতাবোধই তাহাদের দ্বন্দ্ব ভুলিয়া গিয়া বদর যুদ্ধের পর একটা কোয়ালিশন সরকার গঠনে প্রেরণা জোগায়। এইসব কিছুরই তাৎপর্য এই ছিল যে, এতদিন রক্তের আত্মীয়তা যে বন্ধন হিসাবে কাজ করিতেছিল উহার বাঁধন শিথিল হইয়া যায় এবং কোন এক নূতন ভিত্তিতে এক ব্যাপকতর ঐক্য প্রতিষ্ঠার সুযোগ ও সম্ভাবনা দেখা দেয়। ৪৪ ওয়াট ৪৫ তাহার চূড়ান্ত বক্তব্যে বলিয়াছেন, "আমরা যদি ইসলামের উৎপত্তির সহিত মক্কার অর্থনৈতিক পরিবর্তনের সম্পর্কসূত্র সন্ধানে প্রয়াসী হই"-
"তাহা হইল সেই ক্ষেত্রে আমাদেরকে অবশ্যই উহার কারণ মক্কায় নববিত্ত ও ক্ষমতার প্রবাহের দিকে দৃষ্টি নিবদ্ধ করিতে হইবে। উহা করিলে আমরা দেখিব যে, যাযাবর অর্থনীতি সওদাগরি ও পুঁজিবাদী অর্থনীতির দিকে মোড় নিয়াছে। মুহাম্মাদ -এর সময়ে অবশ্য মক্কার জনসমাজে সামাজিক, নৈতিক, বুদ্ধিবৃত্তিক ও ধর্মীয় মনোভাবে কোন পুনঃসমন্বয় ঘটে নাই, বরং মক্কার জনসমাজের আচরণ তখনও বহুলাংশেই যাযাবর জনসমাজের আচরণের অনুরূপ ছিল। মুহাম্মাদ ও তাঁহার কতিপয় সমসাময়িক ব্যক্তি যে উদ্বেগ অনুভব করেন তাহা নিঃসন্দেহে চূড়ান্ত বিশ্লেষণে মানুষের সচেতন মনোভাব ও তাহাদের জীবনের অর্থনৈতিক ভিত্তির মধ্যকার বৈপরীত্যের কারণে ঘটে”।
প্রাক-ইসলামী 'নৈতিক আদর্শ ৪৬ এবং "ধর্মীয় ও বুদ্ধিবৃত্তিক পটভূমি”৪৭ সম্পর্কে এইসব ধারণাই কমবেশি তাহার লেখায় প্রকাশ পাইয়াছে। ওয়াট উল্লিখিত বিষয়গুলি সম্পর্কে সংক্ষেপে বলিয়াছেন:
(ক) সাধারণভাবে ইহা স্বীকার্য যে, পুরাতন পৌত্তলিক ধর্মকে অবক্ষয় দশায় ধরিয়াছিল; ৪৮ (খ) মরু'আ (ব্যক্তিত্ব)-র নৈতিক আদর্শও অবক্ষয় দশায় পড়িয়াছিল। এই মুরু'আর আদর্শাবলীর অন্তর্ভুক্ত ছিল মহানুভবতা, দানশীলতা, বিশ্বস্ততা ইত্যাদি যাহা গোত্রীয় মানবতাবাদেরই
১৩৮ সীরাত বিশ্বকোষ
অনুরূপ। এইসব আদর্শ ও ব্যক্তিবাদের (স্বার্থপরতা, হীনতা ও কার্পণ্য) ৪৯ বিকাশের কারণে গোত্রীয় মানবধর্ম ক্ষয়িষ্ণু হইতে থাকে;
(গ) আরবদের মাঝে একত্ববাদী প্রাক-প্রবণতা আবশ্যিকভাবে প্রধানত ইয়াহুদী ও খৃস্ট ধর্মের প্রভাবে আসিয়াছিল”। ৫০
এখানে বলা অনাবশ্যক যে, ওয়াটের উল্লিখিত বক্তব্যগুলি তাহার পূর্ববতী, বিশেষত মার্গোলিয়থ ও বেলের অত্যন্ত অনুরূপ। খৃষ্টান ও ইয়াহুদী প্রভাবের বিষয়টি সম্পর্কে স্বতন্ত্রভাবে আলোচিত হইয়াছে। ৫১ এখানে এই মূল অনুমান, যেমন মক্কার বাণিজ্যিক উন্নতি ও সমৃদ্ধির কারণে ব্যক্তিবাদের প্রসার ঘটে, গ্রহণযোগ্য নহে। আবার ব্যক্তিবাদের জন্য মক্কার গোত্র সংহতিতে ফাটল ধরে এবং মুরু'আর (ব্যক্তিত্বের) পুরাতন আদর্শ অবক্ষয়ের মুখে পড়ে, এই দাবিও উল্লিখিত কারণেই গ্রাহ্য নহে।
প্রথমত, বৈষয়িক স্বার্থের অভিন্ন কারণ জনিত ঐক্যবোধের ফলে আহলাফ ও মুতায়্যাবূনকে দুই তরফে তাহাদের বিরোধ মিটাইয়া সমঝোতা করিতে হইয়াছে বলিয়া ওয়াট সঠিকভাবেই উল্লেখ করিয়াছেন। যদি একই ধরনের উপলব্ধি কুরায়শ গোত্রগুলিকে বদরের যুদ্ধে পরাজয় বরণের পর "কোয়ালিশন সরকার" গঠনে বাধ্য করিয়া থাকে তাহা হইলে "নূতন বিষয়" অবশ্য কোনভাবেই ওয়াটের ধারণার মত "কৌতূহলোদ্দীপক" হইতে পারে না। প্রায় এক শতকের কালপরিক্রমায় দুইটি ঘটনা ঘটে। ইহার একটি হইল মহানবী -এর ৫২ বৎসর বয়সে বদরের যুদ্ধ। তিনি যখন জন্মগ্রহণ করেন তখন তাঁহার পিতা আবদুল্লাহ্র বয়স ছিল আনুমানিক ২৫ বৎসর। আবদুল্লাহ যখন জন্মগ্রহণ করেন তখন তাঁহার পিতা আবদুল মুত্তালিব ইন্ন হাশিমের বয়সও অনুরূপভাবে ২৫ বৎসরের মত। হাশিমের যৌবনকালে আহলাফ ও মুতায়্যাবৃনের মধ্যে আপোষ নিষ্পত্তি হয়। এই বিষয়টিও উপেক্ষার নহে যে, কুরায়শদের বাণিজ্য প্রয়াসের সম্প্রসারণ ঐ সমঝোতা বা নিষ্পত্তির ঘটনার পরও প্রধানত হাশিমের বিচক্ষণ নীতি ও নেতৃত্বের সুবাদে ঘটে। অভিন্ন বৈষয়িক স্বার্থভিত্তিক ঐক্যবোধ কিংবা বলা যায়, ওয়াট যে সাধারণ কাণ্ডজ্ঞানের কথা বলিয়াছেন উহা মহানবী -এর আমলের কোন নূতন ঘটনা নহে কিংবা উহার উৎপত্তি বাণিজ্যিক বিকাশ হইতেও ঘটে নাই। এই ধরনের সাধারণ জ্ঞান কিংবা বাস্তবতাবোধ সাধারণত আরবজাতি, বিশেষত কুরায়শদের মত কঠিন ও মরু পরিবেশে বসবাসকারী লোকজনের বৈশিষ্ট্য।
দ্বিতীয়ত, অভিন্ন বৈষয়িক স্বার্থজনিত ঐক্যবোধ হাশিমের আমলে ও বদরের যুদ্ধের পরেও কুরায়শদের মধ্যে বিরাজমান ছিল। এই কারণে ইহা আদৌ যুক্তিসঙ্গত নহে যে, একই কুরায়শ গোত্রগুলি আন্তর্জাতিক ব্যবসায়-বাণিজ্যের ছোটখাটো বিষয় লইয়া মক্কায় তাহাদের পারস্পরিক দ্বন্দ্ব-কলহ অব্যাহত রাখিবে ও এই বিরোধ বিদেশী রাষ্ট্রের দরবারে ও বেদুঈন গোত্রগুলির সমীপে উত্থাপন করিবে। অভিন্ন বৈষয়িক স্বার্থের অভিন্ন চেতনা নিশ্চয়ই তাহাদের এই ধরনের বিবাদ-বিরোধে লিপ্ত হইবার অপরিণামদর্শিতা সম্পর্কে হুঁশিয়ার করিয়া দিবে। ইতিমধ্যেই উল্লেখ
হযরত মুহাম্মাদ (স) ১৩৯ করা হইয়াছে যে, নিজেদের গোত্রস্বার্থের বিরুদ্ধে যাইয়া কোন কুরায়শ গোত্র কখনও কোন বিদেশী শক্তি বা কোন বেদুঈন গোত্রের সহিত কোনরূপ বাণিজ্যিক বা সামরিক চুক্তি করিয়াছে এমন কোন নজির নাই।
তৃতীয়ত, ব্যবসায়ে অংশীদারির বেলায় অনেক সময় গোত্র সম্পর্ক উপেক্ষিত হইয়াছে, এমন কথা বলা এবং ব্যক্তিবাদের বিকাশের বেলায় ইহার দৃষ্টান্ত দিয়া ওয়াট একটি মৌলিক ভুলের ধাঁধাঁয় বৃথাই শ্রম ও সময় অপচয় করিয়াছেন বলিয়া মনে হয়। মনে হয় তিনি বলিতে চাহেন যে, এই ঘটনার আগে কুরায়শদের ব্যবসায়িক কার্যকলাপ গোত্র সম্পর্ক-পরস্পরা ভিত্তিতে অনুষ্ঠিত হইত। কিন্তু উহা বাস্তবিকপক্ষে কখনও ঘটে নাই। কুরায়শ উপজাতি বা গোত্র কখনও এমনভাবে ব্যবসায় কার্য পরিচালনা করিয়াছে বলিয়া দেখা যায় না। তাহারা ব্যবসায় করিয়াছে গোত্রের সদস্য ও ব্যক্তি হিসাবে, তাহাদের গোত্রের নামে বা পক্ষে নহে। আন্তর্জাতিক ও অভ্যন্তরীণ উভয় প্রকার বাণিজ্যের ক্ষেত্রেই ইহা প্রযোজ্য। বিদেশগামী একটি বাণিজ্য কাফেলায় কয়েকজন ব্যবসায়ী অন্তর্ভুক্ত থাকিত। আর তাহারা বলিতে গেলে প্রায় সকল ক্ষেত্রেই হইত বিভিন্ন গোত্রের লোক, যাহাদের সঙ্গে থাকিত পরিবারবর্গ ও অন্যান্য সাজ-সরঞ্জাম। এই কাফেলাকে কেবল এই ধারণাতেই কোম্পানি বলা যায় যে, ইহা ছিল ব্যবসায়ীদের একটা সাহচর্যবিশেষ, যাহা আর যাহাই হউক তাহাদের নিজ নিজ ব্যক্তিগত মূলধনের মিলিত পুঁজির ধারণা ভিত্তিক কোন যৌথ মূলধনী সংস্থা নহে, বরং এই কাফেলাকে একত্রে ভ্রমণের যৌথ উদ্যোগ বলা চলে, যাহাতে নিরাপত্তা পাওয়া যায় ও অন্যান্য সুবিধাও পাওয়া যায়। বাস্তবিকপক্ষে প্রতিটি ব্যবসায়ী ব্যক্তি তাহার নিজ মূলধন দিয়া ব্যবসায় করিত এবং সেইসাথে তাহাদের ব্যবসায়ে অনুপস্থিত অংশীদারের মূলধন লইয়াও তাহারা ব্যবসায় করিত। যেমন বিভিন্ন গোত্রের ব্যক্তিবিশেষে বিবাহের ভিত্তিতে মৈত্রী বা আঁতাত গড়িয়া উঠিতে পারে, তেমনি একইভাবে তাহারা অংশীদারি ব্যবসায়েও চুক্তিবদ্ধ হইতে পারে, হইয়াও থাকে। আর তাহা গোত্রগত মৈত্রী ক্ষুণ্ণ না করিয়াও সম্ভব। বিষয়টি নূতন কোন কিছু নহে এবং তাহাতে গোত্রসম্পর্ক ক্ষুণ্ণ না হইবারও কোন প্রশ্ন উঠিতে পারে না।
চতুর্থত, ওয়াট ল্যামেন্স-এর অনুসরণে স্বার্থপরতা বা কারও নিজ স্বার্থকে অগ্রাধিকার দেওয়ার বিষয়টিকে স্বাতন্ত্রবাদ বলিয়া সবকিছু গুলাইয়া ফেলিয়াছেন। এই ব্যক্তিস্বাতন্ত্রবাদের ব্যাখ্যায় ওয়াট আবূ লাহাবের দৃষ্টান্ত দিয়াছেন। আবু লাহাব তাহার গোত্রের বিরুদ্ধে মহানবী-এর বিরোধিতা করে। উছমান ইবনুল হুওয়ায়রিছ তাহার গোত্রের তুলনায় ভিন্ন অবস্থান গ্রহণ করে এবং প্রথম যাহারা মুসলমান হইয়াছিলেন তাহারা তাহাদের গোত্র বা পরিবারের অসম্মতি সত্ত্বেও তাঁহারা তাঁহাদের ঐ নূতন ধর্মবিশ্বাস গ্রহণ করিয়াছিলেন।
এই ধরনের দৃষ্টান্তগুলি অন্তত একটি বিষয়ে হইলেও গলদপূর্ণ। একদিকে আবু লাহাবের ইসলাম বিরোধিতায় এত বিভ্রান্তিকর ও স্ববিরোধী আচরণ এবং অন্যদিকে প্রথমদিকে যাহারা ইসলাম গ্রহণ করিয়াছিলেন তাহাদের এতখানি নিষ্ঠায় ইসলাম গ্রহণ অভিন্ন কোন বিষয়ের বা একই
১৪০ সীরাত বিশ্বকোষ
ধরনের ব্যক্তিস্বতন্ত্রবাদের কারণে হইতে পারে না। আবু লাহাব ও উছমান ইবনুল হুওয়ায়রিছ যাহা করিয়াছিল নিঃসন্দেহে তাহা আত্মস্বার্থ প্রণোদিত, কিন্তু ইসলাম প্রচারের গোড়ার দিকে যাহারা ইসলাম গ্রহণ করিয়াছিলেন তাহাদের বিচার-বিবেচনা যাহাই হউক না কেন নিশ্চয়ই স্বার্থপরতা বা নিজ বৈষয়িক স্বার্থ দেখার জন্য তাহারা তাহা করেন নাই। এমনকি তাহাদের কাজকে যদি ব্যক্তিবাদের লক্ষণ বলিয়াও ধরা হয় তাহা হইলেও ল্যামেন্স ও ওয়াট যে সংজ্ঞা দিয়াছেন তাহা এই ক্ষেত্রে প্রযোজ্য হইতে পারে না। ইহার উৎস ও প্রেরণা আবশ্যিকভাবে নিশ্চয়ই এমন কিছু যাহা বাণিজ্য বা নূতন অর্থাগমের সহিত সম্পর্কিত ছিল না। অন্য কথায়, তাঁহারা উভয়ে যে ব্যক্তিস্বাতন্ত্রবাদের কথা বলিয়াছেন তাহা স্মরণাতীত কাল হইতে আরবদের মাঝে যে ব্যক্তি স্বাতন্ত্রবাদ অস্তিত্বশীল ছিল উহার সহিত অভিন্ন।
তাই বাণিজ্যিক উন্নতি ও প্রগতি ব্যক্তিবাদের অভ্যুদয় ঘটায় এবং যাহার কারণে গোত্র সংহতি ও মুরু'আর আদর্শ ক্ষুণ্ণ হইয়াছে এবং সেই অবকাশে নূতন ভিত্তিতে জনসমাজের পুনর্গঠনের সুযোগ হইয়াছে বলিয়া যে বক্তব্য দেওয়া হইয়াছে তাহা ভ্রমাত্মক। ঐ ঐতিহাসিক কালপরিক্রমায় যে ব্যক্তিস্বাতন্ত্রবাদ বোধগম্য তাহা আরব উপজাতীয় সমাজের সহজাত প্রকৃতি। ইহা অতি প্রাচীন কাল হইতেই অস্তিত্বশীল। স্বার্থপরতা, কার্পণ্য, ক্রুরতা, অভাবী ও অশক্ত মানুষের ব্যাপারে ঔদাসীন্যের মত দোষ, দানশীলতা, মহানুভবতা, আতিথেয়তা ও বিশ্বস্ততার মত মানবীয় মহৎ গুণাবলী তৎকালের আরব সমাজে পাশাপাশি সহাবস্থান করিয়াছে। তাই গোত্র সংহতির কোন অবক্ষয় যেমন ঘটে নাই, তেমনি সমাজ সংহতি ব্যবস্থার কোন বিকল্প সংস্থান কোন আশু ও বোধগম্য আবশ্যকতাও দেখা দেয় নাই। ইহা ছাড়া "মক্কার অভ্যুদয়ে সেখানে যাযাবর অর্থনীতি হইতে সওদাগরি ও পুঁজিবাদী অর্থনীতির উত্তরণ ঘটিয়াছে" বলিয়া যে বক্তব্য দেওয়া হইয়াছে উহা কার্যত এক জটিল পরিস্থিতির সরলায়ন ও ভ্রমাত্মক উপস্থাপনাবিশেষ। যাযাবর জনসমাজের পাশাপাশি ব্যবসায় কার্যকলাপ ও বাণিজ্যবাদী ব্যবস্থা স্মরণাতীত কাল হইতেই আরবে অস্তিত্বশীল ছিল বলিয়াই দেখা যায়। ৫২ মহানবী-এর শত বৎসর আগে তাঁহার প্রপিতামহের পিতা হাশিম পার্শ্ববর্তী কয়েকটি দেশ ও কিছু বেদুঈন গোত্রের সহিত কয়েক দফায় কয়েকটি বাণিজ্য চুক্তি সম্পাদন করিয়াছিলেন যাহা বাস্তবিকপক্ষেই ছিল উত্তম বাণিজ্যিক ঐতিহ্য ও অভিজ্ঞতার পরিচায়ক। আর ইহাকে যাযাবর জনসামাজিক বৈশিষ্ট্য হইতে কোনক্রমে নূতন বাণিজ্য সমাজে রূপান্তর বুঝায় না।
বাস্তবিকপক্ষে ওয়াট মার্গোলিয়থ ও বেল-এর এই তত্ত্বকে যৌক্তিক প্রতিষ্ঠা দিতে প্রয়াস পাইয়াছেন যে, মক্কার নূতন পরিস্থিতির কারণে সেখানকার পুরাতন সামাজিক ও ধর্মীয় মনোভাব পুনর্বিন্যাসের প্রয়োজন দেখা দিয়াছিল। শুধু ইহাই নহে, গ্রিমে (Grimme) মক্কায় ইসলামের আবির্ভাবের যে সমাজতাত্ত্বিক ব্যাখ্যা দেওয়ার চেষ্টা করিয়াছেন তাহার কিছু উপাদানও ওয়াট তাঁহার বক্তব্যে আত্মস্থ করিবার প্রয়াস পাইয়াছেন। আর এইভাবে ওয়াট প্রয়াস পাইয়াছেন প্রথমদিকে
হযরত মুহাম্মাদ (স) ১৪১
অবতীর্ণ হওয়া কুরআনের আয়াতগুলির সহিত সমসাময়িক পরিস্থিতির ৫৩ একটা সম্পর্ক প্রদর্শন অথবা তিনি যে আর্থ-সামাজিক বিশ্লেষণ দিয়াছেন উহার যৌক্তিকতা প্রদান করিতে।
ওয়াট কেবল ব্যক্তিবাদের বিষয়েরই পুনরুক্তি করেন নাই কিংবা সংহতির অবক্ষয়সহ উহার বিস্তারিত বিশদায়নই করেন নাই, তিনি বরং আরও অগ্রসর হইয়া মন্তব্য করিয়াছেন যে, বাণিজ্যবাদের বিকাশের কারণে মক্কায় একান্ত বিশুদ্ধ অর্থে দারিদ্র্য বৃদ্ধি পাওয়ার সম্ভাবনা কম থাকিলেও "ধনী ও দরিদ্রদের মধ্যে" এবং ধনীদের মধ্যে বা খুব বেশী ধনী নয় বা খুব বেশি গরীব নয় এমন লোকজনের মধ্যে ব্যবধান বৃদ্ধি পায় ৫৪ এবং এই পরিস্থিতির পটভূমিকায় দীন ইসলাম সমাজের একেবারে তৃণমূল পর্যায় তথা সবচেয়ে গরীবদের মধ্য হইতে নহে, বরং মধ্য স্তরের জনগণের সমর্থন লাভ করে। ইহা তাই 'যাহারা বিত্তবান' ও 'যাহারা নিতান্তই বিত্তহীন' ৫৫ তাহাদের মধ্যকার, বরং 'যাহাদের ছিল' ও 'যাহারা প্রায় সচ্ছল' তাহাদের মধ্যকার সংগ্রামের বিষয়। এই বক্তব্য সন্দেহতীতভাবেই মক্কায় ইসলামের আবির্ভাবের কারণ সম্পর্কে গ্রিমে তাঁহার যে সমাজতাত্ত্বিক ব্যাখ্যা দিয়াছেন উহার কথাই স্মরণ করাইয়া দেয়। তবে ওয়াটের বক্তব্যে ইহার ঈষৎ সংশোধন করা হইয়াছে মাত্র। এইসব অবশ্য মহানবী -এর ইসলাম প্রচার মিশনের প্রথম পর্যায়ের অন্তর্ভুক্ত প্রথমদিকে অবতীর্ণ কুরআনের আয়াতগুলির বিষয়বস্তুও। ওয়াটের এই বক্তব্য ও অন্যান্য বিষয় সম্পর্কিত বক্তব্য উল্লিখিত কারণে এই রচনার শেষদিকে আলোচিত হইয়াছে। ৫৬
টিকাঃ
২৪. Watt, M, at M, 3.
২৫. প্রাগুক্ত, পৃ. ১০-১১।
২৬. উপরে দ্র. পৃ. ৯৬, আরও দ্র. Margoliouth, op. cit.. 30-31.
২৭. Watt, M. at M., 4.
২৮. প্রাগুক্ত, পৃ. ৪-৫।
২৯. প্রাগুক্ত, পৃ. ৬-৮।
৩০. প্রাগুক্ত, পৃ. ৮-৯।
৩১. প্রাগুক্ত, পৃ. ৯।
৩২. প্রাগুক্ত, পৃ. ৪।
৩৩. নিম্নে দ্র. পৃ. ১৩৮-১৩৯।
৩৪. নিম্নে দ্র. অধ্যায় ৮, পৃ. ২।
৩৫. Watt. M. at M., 6-8, 14-16.
৩৬. দ্র. অধ্যায় ৯।
৩৭. নিম্নে দ্র. পৃ. ১৩৯-১৪০।
৩৮. নিম্নে দ্র. পৃ. ১৮৯-১৯০।
৩৯. Watt. M. at M., 15-16.
৪০. Watt, M. at M., 16-24.
৪১. প্রাগুক্ত, পৃ. ৭২-৯৬।
৪২. প্রাগুক্ত, পৃ. ১৮।
৪৩. প্রাগুক্ত, পৃ. ১০।
৪৪. প্রাগুক্ত।
৪৫. প্রাগুক্ত, পৃ. ১৯-২০।
৪৬. প্রাগুক্ত, পৃ. ২০-২৩।
৪৭. প্রাগুক্ত, পৃ. ২৩-২৯।
৪৮। প্রাগুক্ত, পৃ. ২৩।
৪৯. প্রাগুক্ত, পৃ. ২০, ২৪, ২৫।
৫০. প্রাগুক্ত, পৃ. ২৭।
৫১. নিচে দ্র. অধ্যায় ১১।
৫২. আমরা এখানে প্যাট্রিসিয়া ক্রোনির তত্ত্বটির বিষয় আবার স্মরণ করিতে পারি। তিনি উহাতে বলিয়াছেন, আরবের বাণিজ্যিক কার্যকলাপের যে প্রাচীন বিবরণ পাওয়া যায় উহা ইসলামের আবির্ভাবের আনুমানিক ছয় শত বৎসর আগের।
৫৩ Watt. M. at M., 72-96.
৫৪. প্রাগুক্ত, পৃ. ৭২।
৫৫. প্রাগুক্ত, পৃ. ৯৬।
৫৬. দ্র. অধ্যায় ২৪।