📘 সীরাত বিশ্বকোষ > 📄 এক: প্রাথমিক পর্যায়ের ব্যাখ্যা-বিশ্লেষণ

📄 এক: প্রাথমিক পর্যায়ের ব্যাখ্যা-বিশ্লেষণ


এক : প্রাথমিক পর্যায়ের ব্যাখ্যা-বিশ্লেষণ
ওয়াট তাঁহার রচনার শুরুতেই তাহার দৃষ্টিভঙ্গির ব্যাখ্যা ও ঘোষণা দিয়াছেন এই বলিয়া, "একজন একেশ্বরবাদী" হিসাবে তিনি এই রচনায় প্রবৃত্ত হইয়াছেন। তিনি "ইতিহাসের নিরপেক্ষতায় জড়জাগতিক দৃষ্টিভঙ্গি প্রচ্ছন্ন" বলিয়া মনে করেন না। তবে কিছু কাল ধরিয়া মুহাম্মাদের এক নূতন জীবনী রচনার প্রয়োজন অনুভূত হইয়া আসিতেছে। কারণ বিগত অর্ধ শতক বা অনুরূপ কাল-পরিক্রমায় ঐতিহাসিকগণ "ইতিহাসের অন্তর্নিহিত জড় উপাদানসমূহের বিষয়ে অধিকতর সচেতন হইয়া উঠিয়াছেন”। তিনি আরও বলেন, এমনকি তাহার মত যাহারা স্বীকার করেন না, “এই ধরনের যেসব উপাদান ঘটনাপ্রবাহের গতি নির্ধারণ করে তাহাদেরকে এইগুলির গুরুত্ব স্বীকার করিতেই হইবে”। তাই তিনি দাবি করেন, তাহার রচিত মুহাম্মাদের জীবনচরিত-এর “বৈশিষ্ট্য” এই যে, “তাহার লেখায় এইসব বৈষয়িক উপাদানের প্রতি পরিপূর্ণ মনোযোগ সন্নিবেশিত হইয়াছে এবং অতীতে যেসব প্রশ্নের অবতারণা কচিৎ করা হইয়াছে সেইসব প্রশ্নের জবাব দেওয়ার প্রয়াস পাইয়াছে”। ১
ওয়াটের নিজের স্বীকারোক্তি অনুযায়ী, বিংশ শতাব্দীর প্রথমার্ধের ইতিহাস রচনার বিশেষ বৈশিষ্ট্য ইতিহাসে নিহিত বৈষয়িক উপাদানের প্রতি অধিকতর মনোনিবেশের প্রবণতারই অনুসরণ করিয়াছেন তিনি। তাহার লেখা মহানবীর জীবনীতে তিনি নূতন কি সংযোজন করিলেন তাহা পরিদৃষ্ট হইবে—আমরা যদি মহানবী ও ইসলামের অভ্যুদয়ের ব্যাপারে তাহার পূর্ববর্তীরা কি কি প্রধান ব্যাখ্যা-বিশ্লেষণ করিয়াছেন ঐগুলির প্রতি সামান্য দৃষ্টিপাত করি।
এই বিষয়ে সর্বপ্রথম উল্লেখযোগ্য তত্ত্বটি আমরা পাইয়াছি হিউবার্ট গ্রিমের (Hubert Grimm) লেখায়। ১৮৯২ সালে তিনি ইসলামের অভ্যুদয় সম্পর্কে সরাসরি সমাজতান্ত্রিক ব্যাখ্যার অবতারণা করেন। তাহার এই বক্তব্য অনুযায়ী মহানবী ও ইসলামের আবির্ভাব ছিল 'বিত্তবান' ও 'বিত্তহীন' (Haves & Have-nots)-এর মধ্যে সাধারণ সংঘাতেরই এক সরল ফল।২
এই ধরনের অতি সরলীকৃত ব্যাখ্যার গলদ ও অযথার্থতার বিষয়গুলির দিকে ত্বরিৎ ও নিষ্পত্তিমূলকভাবে মনোযোগ আকর্ষণ করেন সি সুক হারগ্রোনযে। তাহার সুতীক্ষ্ণ বিশ্লেষণের পর হইতে প্রাচ্যতত্ত্ব বিশারদগণ এই ধরনের ব্যাখ্যা-বিশ্লেষণের ব্যাপারে সতর্কতা অবলম্বন করেন। যুগপৎ তাহারা এই বিষয়ের প্রতিও মনোনিবেশ করেন যে, মক্কাবাসীরা ইসলামের অভ্যুদয়ের আগে অন্ততপক্ষে কয়েক দশক কাল প্রধানত ব্যবসায়ী ও সওদাগর জনসমাজ ছিল।
১২৪ সীরাত বিশ্বকোষ
এই বাস্তব তথ্যটির উপর আরও সুনির্দিষ্ট ও বিশেষভাবে আলোকপাত করিয়াছেন জে. ওয়েলহাওসেন। তিনি মক্কার গুরুত্ব ও তাৎপর্যের কারণ হিসাবে কুরায়শদের সামর্থ্য ও যোগ্যতার উল্লেখ করিয়াছেন। তাহার বর্ণনা অনুযায়ী, পানি কেমন করিয়া কূপ হইতে তুলিতে হয় এবং পানির প্রবাহ পথে প্রতিবেশীদের পানি কেমন করিয়া প্রবাহিত করাইতে হয় এইসব বিষয় কেবল কুরায়শরা অন্যদের তুলনায় সুপরিজ্ঞাত ছিল। ৪
এই একই বিষয়ে আলোচনা করিয়াছেন সি. সি. টোরি-ও। তিনি কুরআনে ব্যবহৃত বাণিজ্যিক পারিভাষিক শব্দাবলী ও অন্যান্য বাক্যালঙ্কারমূলক শব্দ বিবেচনায় গ্রহণ করিয়া বলিতে চাহিয়াছেন যে, মক্কায় তখন ব্যবসা-বাণিজ্যে বড় রকমের আর্থিক লেনদেনের পরিবেশ বিরাজ করিতেছিল। ৫ মক্কার প্রাক-ইসলামী জনসমাজের বাণিজ্যিক বৈশিষ্ট্যের উপর নূতন করিয়া গুরুত্ব আরোপ এবং সেই সাথে আরব জনজীবনে ইয়াহুদী ধর্ম ও খৃষ্ট ধর্মের প্রভাবকেই প্রাধান্য দেওয়ার সাধারণ প্রবণতা বজায় থাকার চিন্তাধারা বিকাশ লাভ করে। এই নূতন চিন্তাধারা অনুযায়ী নিকৃষ্ট পৌত্তলিক ধর্ম প্রাগ্রসরমান মক্কাবাসী এবং আল-লাত ও আল-'উয্যা দেবীর একনিষ্ঠ বিশ্বাসী, যাহারা বৃহত্তর বহির্বিশ্বের সহিত যোগাযোগ রক্ষা করিত, তাহাদের ধর্মীয় চাহিদা পূরণের জন্য অপর্যাপ্ত ও কালের দাবির সহিত বেখাপ্পা বলিয়া প্রতিভাত হয়। ৬
এইসব অভিমতের প্রতিফলন বজায় রাখিয়া মার্গোলিয়থ বিংশ শতাব্দীর গোড়ার দিকে লিখিয়াছেন, "মক্কার পরিবার-প্রধানরা বিদেশে বাণিজ্যের উদ্দেশে এক যৌথ মূলধনী কোম্পানির প্রতিনিধিতুল্য হইয়া উঠে। কেননা বৈদেশিক বাণিজ্যে প্রতিটি উপলক্ষে অর্জিত মুনাফা বিনিয়োগকারীদের মধ্যে আনুপাতিক হারে বিলি-বণ্টন করিয়া দেওয়া হইত এবং মক্কাবাসীরা ঐ অর্থ ব্যয় করিত, সঞ্চিত রাখিত অথবা নূতন কোন ফটকাবাজিতে বিনিয়োগ করিত।” তিনি আরও বলেন, মক্কার জনসমাজের এই "সুস্থ” বৈশিষ্ট্যের কারণে মক্কায় মুহাম্মাদ-এর মিশন ব্যর্থতায় পর্যবসিত হইলেও মদীনায় তাহা তাৎক্ষণিক সহানুভূতি আকর্ষণে সমর্থ হয়। মদীনা তৎকালে বৎসরের পর বৎসর গৃহযুদ্ধের কারণে দুর্গতির মধ্যে নিপতিত ছিল। এই বিষয়ে মার্গোলিয়থ সিদ্ধান্ত গ্রহণ করেন:
"মক্কার দূরদর্শী নেতাদের নেতৃত্বে মক্কার বিত্ত ও ক্ষমতা যদি ক্রমাগত বাড়িয়াই যাইতে থাকে, তাহা হইলে তেমন পরিস্থিতিতে মক্কাবাসীদেরকে এমন সব দেশ হইতে শিক্ষা ও জ্ঞান-বিজ্ঞান গ্রহণ করিতে হয় যেসব দেশে বর্বর বিবেচিত ধর্ম লইয়া তাহারা তৃপ্ত থাকিবে। ইহা আর যাহা হউক সম্ভব নহে। তবুও বাস্তবতা এই যে, মক্কাবাসীর পুরাতন ধর্মই তাহাদের বৈষয়িক সমৃদ্ধির উৎস ছিল। ইহা সত্য হইয়া থাকিলে খৃষ্টধর্ম ও ইয়াহুদী ধর্ম তাহাদের ধর্মের বিকল্প হইবে, তাহা বাস্তবসম্মত নহে। তবুও ঐ সময় নাগাদ মুহাম্মাদ লক্ষ্য করেন যে, এই দুই আলোকপ্রাপ্ত ধর্মকে ডিঙাইয়া অন্য ধর্ম প্রতিষ্ঠাই স্পষ্টত ঐ সমস্যার আদর্শ সমাধান। আর সেই সঙ্গে সম্পদ-সমৃদ্ধির পুরাতন উৎসটিকেও বহাল রাখা প্রয়োজন। তবে মক্কার ব্যবস্থা মোটেও পশ্চাদপদ তো ছিলই না, বরং রোমক সাম্রাজ্যের ধর্মীয় পদ্ধতি অপেক্ষাও আগাইয়া ছিল”।
হযরত মুহাম্মাদ (স) ১২৫
ইহা অবশ্য সত্য যে, ইসলামের অভ্যুদয়ের পূর্বাহ্নে মক্কাবাসীরা প্রধানত বণিক সম্প্রদায় ছিল। তবে উল্লিখিত লেখায়, বিশেষ করিয়া সি.সি. টোরির লেখায় এই বাস্তব বিষয়টির অতিরঞ্জন ঘটানো হইয়াছে। এখানে উল্লেখ প্রয়োজন, বিশেষত কুরআনে কৃষি সম্পর্কিত পারিভাষিক শব্দ ও চিত্রকল্পসমূহ তথাকথিত বাণিজ্যিক-ধর্মতাত্ত্বিক পারিভাষিক শব্দাবলীর তুলনায় কম প্রাণবন্ত ও সজীব নহে। ১০ কুরআনে গোটা জড়জাগতিক জীবনকে কর্ষিত কৃষিভূমির সহিত তুলনা করা হইয়াছে, যেখান হইতে ইহকাল ও পরকালের ব্যবস্থা সংগ্রহ করা যায়। ১১
একত্ববাদ (তাওহীদ) কুরআনের প্রধান প্রতিপাদ্য বিষয়। আল্লাহ্র অপার মহিমা ও রহমতের বারংবার উল্লেখ করিয়া একত্ববাদী তত্ত্ব প্রতিষ্ঠিত করা হইয়াছে। কুরআনে বলা হইয়াছে, আসমান হইতে আল্লাহ্র রহমত ও প্রাচুর্য বর্ষিত হয় এবং উহা দ্বারা তিনি বন্ধ্যা ধরাপৃষ্ঠকে ফুলফল, তরুলতা ও শস্যাদিতে প্রাণবন্ত ও সজীব করিয়া তোলেন। এমনকি বেহেশতকে সাধারণত এক সুচর্চিত ও সুবিন্যস্ত উদ্যান হিসাবে বর্ণনা করা হইয়া থাকে, যে স্থান সুস্বাদু ফলবৃক্ষে পরিপূর্ণ। এই নিসর্গের মধ্য দিয়া বহিয়া চলিয়াছে অসংখ্য স্রোতস্বিনী। আল্লাহ যেমন পৃথিবীর মৃত্তিকা হইতে নানা উদ্ভিদ ও তরুলতা সৃষ্টি করেন, তেমনি করিয়াই তিনি পুনরুত্থান দিবসে মৃতদেরকে পুনরুজ্জীবিত করিবেন। ১২ এমনকি সন্তান জন্মদানের প্রক্রিয়াকে তথা মানবজাতির ধারাকে চির প্রবহমান রাখার প্রক্রিয়াকে 'একজন মানুষের তাহার নিজ কৃষিজমিতে ১৩ চাষাবাদের' সহিত তুলনা করা হইয়াছে। এই ধরনের অভিব্যক্তি ও বিবৃতির ভিত্তিতে কোন একজনের পক্ষে সমান আস্থার সাথে ইহাও বলা সম্ভব যে, কুরআনের আবির্ভাব ঘটিয়াছে মূলত কৃষি পটভূমি হইতে।
উল্লিখিত সিদ্ধান্ত অবশ্য আরেক বিভ্রান্তিকর সিদ্ধান্তেও পৌছায়। কুরআনের অন্য কোন সূত্রে সন্নিবেশিত একক কোন তথ্যে অতি গুরুত্ব আরোপ করিলে, আবার অন্য দিকগুলিকে উপেক্ষা করা হইলে তাহা গোটা পরিস্থিতির আরও এক ভুল ও বিকৃত দৃশ্যপটের জন্ম দিতে বাধ্য। ইহার সমভাবে সঠিক দৃষ্টান্ত হইল মার্গোলিয়থ উল্লিখিত বক্তব্য। ইহার প্রধান ত্রুটি হইল, ইসলামের অভ্যুদয়ের এই কারণ যেমন ইহা একদিকে উল্লেখ করিয়াছে, তেমনি মক্কার 'ব্যর্থতার'ও একই কারণ উল্লেখ করিয়াছে। মার্গোলিয়থের মতে, “মক্কা জনপদ যেহেতু একটি বাণিজ্যিক বসতি হিসাবেই উন্নতি লাভ করিতে থাকে, সেহেতু মুহাম্মাদ ঐ একই কারণে যেই সামাজিক ও ধর্মীয় অসঙ্গতি দেখা দেয় সেই সমস্যারই এক 'আদর্শ সমাধান' দেন এমন এক 'পদ্ধতি' দ্বারা যে পদ্ধতি বা ব্যবস্থা বিত্তের আদি উৎস অক্ষুণ্ন রাখিয়া দেয় এবং একই সঙ্গে রোমক সাম্রাজ্যের ধর্মীয় ব্যবস্থা হইতে যাহা উন্নততর প্রতিভাত হয়। কিন্তু মক্কায় মুহাম্মাদ -এর এই মিশন ব্যর্থতায় পর্যবসিত হয়। কারণ মক্কা ছিল এক 'সুস্থ' বাণিজ্য বসতি”।
এখানে যে স্ববিরোধিতা লক্ষণীয় তাহা কেবল উল্লিখিত দুই অনুমানেরই মৌলিক অসত্যতার আভাস দেয়। ইসলামের আবির্ভাবের প্রাক্কালে মার্গোলিয়থ যেমনটি কল্পনা করিয়াছেন, মক্কার জনপদ তেমন সুস্থ যেমন ছিল না, তেমনি মুহাম্মাদও মক্কার আর্থ-সামাজিক বিকাশ ও উহার
১২৬ সীরাত বিশ্বকোষ
আদিম ধরনের ধর্মীয় ব্যবস্থার মধ্যকার বিষমতার ভারসাম্যহীনতাতেই কেবল ভারসাম্য বিধায়ক কোন সামঞ্জস্য প্রতিষ্ঠার প্রয়াস পান নাই এমন এক ব্যবস্থামাত্র করিয়া যাহাতে বিত্তের আদি সূত্রটি অক্ষত রাখা হয়।
মক্কার আর্থ-সামাজিক ব্যবস্থার প্রয়োজনে সাড়া দেওয়াই যদি মুহাম্মাদ-এর ভূমিকা হইত তাহা হইলে নিশ্চয়ই তাঁহাকে প্রত্যাখ্যাত ও মক্কা হইতে উৎখাত হইতে হইত না যাহা মার্গোলিয়থ দাবি করিয়াছেন।
মার্গোলিয়থের রচনা প্রকাশিত হইবার অল্প কালের মধ্যেই সি. এইচ. বেকার একান্তভাবে এক অর্থনৈতিক ব্যাখ্যা দিয়াছেন যাহার প্রধান বক্তব্য হইল পার্শ্ববর্তী দেশগুলির উপর রাজনৈতিক আধিপত্য বিস্তার। ইসলামের আবির্ভাব এক্ষেত্রে তেমন গুরুত্ববহ নহে। বেশ অনেক কাল আগে দক্ষিণ আরবের কিছু গোত্রের লোকজনের মদীনা, সিরিয়া ও মেসোপটেমিয়ায় (ইরাক) দেশান্তর গমন এবং দক্ষিণ আরবের জন-পানি সরবরাহ ব্যবস্থার অবক্ষয়ের দৃষ্টান্ত দিয়া বেকার এই মর্মে বক্তব্য প্রদান করিয়াছেন যে, খৃস্টীয় সপ্তম শতাব্দীতে আরবদের যে বহির্মুখী সম্প্রসারণ ঘটে "উহা ছিল আরবের অর্থনৈতিক অবক্ষয়ের কারণ জনিত সেমিটিক লোকদের সর্বশেষ বড় ধরনের দেশান্তর গমনের ঘটনা”। তাহার মতে, “এই ঘটনা ছিল কয়েক শতাব্দীর পরিক্রমা জুড়িয়া এক প্রক্রিয়ার চূড়ান্ত পর্যায়বিশেষ”। তিনি লিখিয়াছেন, "ধর্ম নহে, খাদ্যের আকাল ও লিপ্সাই ছিল আরবদের নূতন করিয়া বহির্মুখী সম্প্রসারণের বাধ্যবাধকতা আরোপকারী বিষয়। তবে ইসলাম এই উদ্দেশ্যে "অত্যাবশক ঐক্য ও শক্তির" মত উপকরণ সরবারহ করে। ইসলাম এই জন-স্থানান্তর গমনের ক্ষেত্রে "দলীয় শ্লোগান ও সাংগঠনিক" প্রেরণা যোগায়”। ১৪
বেকারের এই তত্ত্বে স্পষ্টতই অনেক দুর্বলতা রহিয়াছে। ইসলামের অভ্যুদয়ের প্রাককালে এই তত্ত্বগুলি মক্কার অর্থনৈতিক ও বাণিজ্যিক সমৃদ্ধির কথা উপেক্ষা করে। সুদুর দক্ষিণ আরবের অর্থনৈতিক অবক্ষয়ে সাধারণীকরণের মাধ্যমে সমগ্র উপদ্বীপের ক্ষেত্রে ইহা প্রয়োগ করা হইয়াছে। এই তত্ত্বে দক্ষিণ আরবীয় গোত্রগুলির উত্তর দিকে দেশান্তর গমন এবং সপ্তম শতাব্দীর আরবের বিস্তারের মধ্যকার সময়ের বিস্তর ব্যবধানকে উপেক্ষা করা হইয়াছে। বেকার এই ধারণাকে যথেষ্ট প্রমাণ করিতে পারেন নাই যে, ইসলামের অব্যবহিত পূর্বে সমগ্র আরবে চরম অর্থনৈতিক অবক্ষয় ঘটিয়াছিল। তদুপরি পরবর্তী কালের বিস্তার সঠিকভাবে দেশান্তর গমন বলিয়া আখ্যায়িত করা যায় না। যদি বেকারের বর্ণনা অনুযায়ী ইহা সত্য হয় যে, ইসলাম ধর্ম নহে, বরং ইহার রাজনৈতিক প্রভাব প্রথমে বিস্তার লাভ করিয়াছিল, অতঃপর ইহা সমানভাবে সত্য যে, সেই রাজনৈতিক প্রভাব কোন দেশান্তরের ঘটনা ছিল না। কারণ প্রাথমিক যুগে আরবদের বিজিত অঞ্চলে বসতি স্থাপন করায়ও নিষিদ্ধতা কার্যকর ছিল। অবশ্য বেকারের তত্ত্ব এক দিক হইতে গ্রিম-এর সমাজতাত্ত্বিক ব্যাখ্যার সঙ্গে একমত। ইহা ধরিয়া লওয়া হয় যে, সমস্ত আরব উপদ্বীপে সকল অধিবাসীই বিত্তহীন ছিল যাহারা বিত্তবান প্রতিবেশীর ভূমি দখলের জন্য ঝাপাইয়া পড়িত। ইহাতে মুইর, মার্গোলিয়থ
হযরত মুহাম্মাদ (স) ১২৭
প্রমুখের এই ধারণার কিছু ইঙ্গিত পাওয়া যায় যে, নবী করীম ইচ্ছাকৃতভাবে এবং উচ্চাভিলাষীরূপে সমস্ত আরবে রাজনৈতিক ঐক্য প্রতিষ্ঠার লক্ষ্য নির্ধারিত করিয়াছিলেন, যে 'ঐক্য' ও 'ক্ষমতা' নব্য সম্প্রসারণের ভিত্তি হিসাবে কাজ করে।
বেকারের এই তত্ত্বের দুর্বলতা অত্যন্ত প্রকট। ইহাতে ইসলামের অভ্যুদয়ের প্রাক্কালে গোটা আরবে সাধারণ অর্থনৈতিক অবক্ষয় দশা চলিতেছিল বলিয়া বেকার যে উল্লেখ করিয়াছেন তাহা পণ্ডিতবর্গের মধ্যে তেমন ব্যাপক স্বীকৃতি পাইয়াছে বলিয়া মনে হয় না। বরং ইহার বিপরীতক্রমে ওয়েলহাওসেন-টোরি-মার্গোলিয়থ প্রমুখ প্রাচ্যবিদ মক্কার বাণিজ্যিক বিকাশের প্রতি অধিকতর গুরুত্ব আরোপ করিয়াছেন বলিয়াই দেখা যায়। মক্কার এই বাণিজ্যিক উন্নতির বুনিয়াদেই অর্থনৈতিক ব্যাখ্যা-বিশ্লেষণের প্রক্রিয়ার বিকাশ ঘটিয়াছে। বেকার-এর অল্পকাল পরের লেখক এইচ. ল্যামেন্স এই তথ্যের ক্ষেত্রে এক নূতন মাত্রা যোগ করিয়াছেন। আবদুল মুত্তালিব যমযম কূপের পানি হজ্জযাত্রীদের নিকট বিক্রয় করিতেন বলিয়া মার্গোলিয়থ যে অভিযোগ করিয়াছেন তাহারই কিছুটা স্ফীতি ঘটাইয়া ল্যামেন্স বলেন, সিকায়াহ-র আওতায় সুযোগ-সুবিধাকে কাজে লাগাইয়া হজ্জযাত্রীদের ১৫ যমযমের পানি ব্যবহারের উপর কিছু কর ধার্য করিয়া বিত্ত সঞ্চয়ের ব্যবস্থা করা হয়। ল্যামেন্স আরও সুনির্দিষ্টভাবে গোটা পশ্চিম আরবে মক্কার বাণিজ্যিক গুরুত্বের উল্লেখ করিয়া বলিয়াছেন, মক্কা কুরায়শদের রাজনৈতিক নৈপুণ্য ও সেই সাথে সামরিক শক্তির কারণে তাহারা তৎসন্নিহিত অঞ্চলের যাযাবর বেদুঈন গোত্রগুলির উপর আধিপত্য অর্জন করিয়াছিল। ১৬ তিনি আরও বলিয়াছেন, মক্কা বাণিজ্যিক কেন্দ্র তো ছিলই, সেইসাথে আর্থিক কেন্দ্র হিসাবে সেখানে জটিল আর্থিক কার্যক্রমও পরিচালিত হইত। ১৭ তিনি এই বিষয়ের প্রতিও মনোযোগ আকর্ষণ করিয়াছেন যে, ব্যক্তিস্বার্থ ও আত্মকেন্দ্রিক স্বার্থপরতাকে অনেক সময় গোত্র স্বার্থের উপরে স্থান দেওয়া হইত। আর সেই পরিপ্রেক্ষিতে গোত্র সংহতিতে অবক্ষয় সূচিত হয় এবং সমানুপাতিকভাবে মক্কার জনসমাজে ইসলামের অভ্যুদয়ের প্রাক্কালে 'ব্যক্তিবাদের' বিকাশ ঘটে। ১৮
তাৎক্ষণিকভাবে ইহাও উল্লেখ আবশ্যক যে, যমযমের পানি ব্যবহারের জন্য হজ্জযাত্রীদেরকে কর প্রদান করিতে হইত, এই দাবির সমর্থনে কোন গ্রহণযোগ্য প্রামাণ্য কর্তৃপক্ষীয় উৎস বা সূত্রের অস্তিত্ব নাই। সে যাহাই হউক, ল্যামেন্স যে বিস্তারিত বিবরণ দিয়াছেন এবং যেসব সূত্র ব্যবহার করিয়াছেন সেসবের যথার্থতা সম্পর্কে প্রশ্ন উত্থাপিত হইয়াছে। সাম্প্রতিক কালের এক লেখক অত্যন্ত যথার্থ উল্লেখ করিয়াছেন যে, ল্যামেন্স "কুখ্যাত অনির্ভরযোগ্য লেখক যাহার নাম কিছু সতর্কতা বা অনুমোদন ছাড়া কদাচিৎ উচ্চারিত হয়”। ১৯
তবু ল্যামেন্স ও তাহার পূর্ববর্তীদের বক্তব্য ইসলামের অভ্যুদয়ের আর্থ-সামাজিক ব্যাখ্যা-বিশ্লেষণের বেলায় আরও প্রয়াসে প্রভাব রাখিয়াই চলিয়াছে। এমনি করিয়া একদিকে ওয়েলহাওসেন, টোরি ও মার্গোলিয়থ এবং অন্যদিকে ল্যামেন্স ও তাহার সমগোত্রীয় লেখকদের
১২৮ সীরাত বিশ্বকোষ
অভিমতের প্রতিফলন ঘটাইয়া আর, বেল ১৯৩০-এর দশকের গোড়ার দিকে অভিমত প্রকাশ করিয়াছেন যে, (ক) মক্কার বিত্ত ও সমৃদ্ধির অভ্যুদয় অপেক্ষাকৃত সাম্প্রতিক ঘটনা; (খ) জড়জাগতিক জীবনযাত্রার ব্যাপারে মক্কার সহিত সংস্কৃতিবান দেশগুলির যোগাযোগ ছিল। আর এইসব দেশের অবস্থান ছিল আরব সীমান্তের ঠিক বাহিরে; (গ) এইসব দেশের ধর্মীয় জীবনের কোন প্রভাব যদি মক্কাবাসীদের উপর পড়িয়া থাকে তাহা হইলে উহা ছিল সম্ভবত নেতিবাচক, যাহার ফলে মক্কার পুরাতন ধর্ম ক্ষুণ্ণ হইয়াছিল; (ঘ) বিত্ত জনিত নব সমৃদ্ধি মক্কার পুরাতন জীবনযাত্রার মহানুভবতা সাম্যের মত বৈশিষ্ট্যমূলক গুণের উপর ভয়ানক বিরূপ প্রতিক্রিয়ার সৃষ্টি করে এবং (ঙ) মুহাম্মাদ মক্কাবাসীদের "বৈষয়িক বিষয়ে বিত্তবান অথচ আধ্যাত্মিক বিষয়ে পশ্চাদপদ" লক্ষ্য করিয়া তাহাদের মন-মানসে উন্নততর আলোকপ্রাপ্ত দেশবাসীর ২০ ধর্মীয় জ্ঞান স্থানান্তরের চেষ্টায় নিয়োজিত হন।
শেষোক্ত দুইটি বিষয়ের উপর সবিশেষ গুরুত্ব আরোপ করিয়া বেল সুনিদিষ্টভাবে মুহাম্মাদ -এর ধর্মীয় কার্যকলাপের সূচনার আলোচনায় লিখিয়াছেন, মুহাম্মাদ আল্লাহ্র রহমত ও করুণায় মানুষের নির্ভরশীলতায় ও "নিঃসন্দেহে ধর্মীয় অবক্ষয় এবং বিত্তের নব প্রবাহ, অহঙ্কারী ও উদ্ধত কুরায়শদের কল্যাণমূলক দায়-দায়িত্বের অবহেলায় আকৃষ্ট হইয়া ধর্মীয় শক্তির পুনরুজ্জীবনের কাজে নিজেকে নিয়োজিত করেন”। বলা আবশ্যক যে, "কুরায়শদের ইতোপূর্বেকার কল্যাণমূলক দায়িত্ব পালন মক্কার জনসমাজের গোত্রজীবনে ধনী-দরিদ্র নির্বিশেষে সকলকে ঐক্যবদ্ধ রাখিয়াছিল এবং তাহাতে গোটা জনজীবনের কাঠিন্য অনেকটাই প্রশমিত ছিল”। মুহাম্মাদ তাঁহার মিশনের লক্ষ্য পূর্ণ করার জন্য "যাহারা ইতোমধ্যে একত্ববাদী ও একক প্রভুর উপাসক" তাহাদের ধ্যান-ধারণার শরণ লইয়াছিলেন”। অবশ্য যাঁহারা মনে করেন যে, মুহাম্মাদ উচ্চাভিলাষ লইয়া একত্বের উপাসনা ২১ তাঁহার নিজের প্রতি আনুগত্যের মাধ্যমে গোটা আরবকে ঐক্যবদ্ধ করার কাজে নামিয়াছিলেন তাহাদের সহিত বেল একমত নহেন। তিনি উল্লেখ করেন, "এই ধারণার ব্যাপারটি হইবে সূচনার সহিত ফলাফলকে তালগোল পাকাইয়া ফেলা”। কেননা বেলের মতে, নিঃসন্দেহে প্রথম হইতেই মুহাম্মাদ -এর "লক্ষ্য ছিল ধর্মীয় এবং সে লক্ষ্য রাজনৈতিক নানা পাঁয়তারামূলক কার্যকলাপ সত্ত্বেও মৌলিক দিক হইতে শেষাবধি অক্ষুণ্ণ ছিল যে রাজনৈতিক কার্যকলাপে মুহাম্মাদ নিজে জড়িত ছিলেন এবং শেষ পর্যন্ত তাহাতে সাফল্যও লাভ করিয়াছিলেন”। ২২
এমনিভাবে গুরুত্ব আরোপের তাৎপর্য হইল, গোড়া হইতেই মহানবী রাজনৈতিক প্রেরণায় কাজ করেন নাই। গোড়া হইতে শেষাবধি তাঁহার লক্ষ্য ছিল "ধর্মীয়"-এই দুই বিষয়ে গুরুত্ব আরোপ করিয়া বেল বাস্তবিকপক্ষে সত্যের অধিকতর নিকটবর্তী হইয়াছেন। কিন্তু মুহাম্মাদ কেবল প্রচুর ধনাগমের পটভূমিকায় তাঁহার নিজ জনসমাজের আর্থ-সামাজিক ও আধ্যাত্মিক সমস্যাবলী সামাধানের চেষ্টা করিয়াছেন ধর্মীয় শক্তিকে পুনরুজ্জীবিত করিয়া-এই বক্তব্য দিয়া বেল মূলত তাহার পূর্ববর্তী, বিশেষত মার্গোলিয়থের অভিমতেরই প্রতিধ্বনি করিয়াছেন মাত্র।
হযরত মুহাম্মাদ (স) ১২৯
তাহার বক্তব্য এই যে, এক নূতন ধর্মব্যবস্থা দিয়া তিনি তাঁহার আর্থ-সামাজিক সংস্কার প্রকল্প বাস্তবায়িত করিতে চাহিয়াছিলেন। বেলের অন্যান্য বক্তব্যও কম-বেশি তাহার পূর্ববর্তীদের অভিমতের পুনরুক্তি। তাই মক্কা সাম্প্রতিক কালে বিত্ত ও সমৃদ্ধির নূতন স্তরে উন্নীত হওয়ার পর কুরায়শরা যে "সংস্কৃতিবান বিভিন্ন দেশের সংস্পর্শে ছিল" সেহেতু তাহাদের নিজ সমাজ ও সংস্কৃতির আদিমতা বা প্রাচীনতা সম্পর্কে তাহাদেরকে কিছু সচেতন করিয়া তোলে। এইসব দেশের সঙ্গে এই ধরনের যোগাযোগে, বিশেষ করিয়া ইয়াহুদী ও খৃস্ট ধর্মের সঙ্গে যোগাযোগ তাহাদের পৌত্তলিক ধর্মবিশ্বাসকে কিছুটা ক্ষুণ্ণ করে। মহানবী কেবল তাহার জনগণের বৈষয়িক সমৃদ্ধি ও আধ্যাত্মিক পশ্চাৎপদতার মাঝে অস্তিত্বশীল অসংলগ্নতা দূর করিবারই চেষ্টা করিয়াছিলেন। আর উহা করিতে প্রেরণা গ্রহণ করিতে গিয়া "যাহারা ইতোমধ্যে একত্ববাদের উপাসক" (অর্থাৎ ইয়াহুদী ও খৃস্টান) ছিলেন তাহাদের নিকট হইতে ধ্যান-ধারণা গ্রহণ করিয়াছেন, এই ধরনের প্রতিটি ও সকল বক্তব্যই ইতোপূর্বে দিয়াছেন বেল-এর পূর্বসূরী মুইর, মার্গোলিয়থ, টোরি ও অন্যরা। ইহা ছাড়া বিত্তের নয়া প্রবাহ কুরায়শদেরকে স্বার্থপর, অহঙ্কারী এবং তাহাদের পুরাতন জীবনের দয়াধর্ম ও সাম্যের ব্যাপারে উদাসীন করিয়া তোলে বলিয়া যাহা তিনি বলিতে চাহিয়াছেন তাহা স্পষ্টত "গোত্রগত সংহতি ও ব্যক্তিবাদের" বিকাশের অবক্ষয় সংক্রান্ত ল্যামেন্স-এর অভিমতের এক ধরনের টীকাভাষ্য ছাড়া আর কিছুই নহে।
মনে হয় বেল সর্বশেষ বক্তব্যটি দিতে কুরআনের গোড়ার দিকে নাযিলকৃত আয়াতসমূহের ব্যাখ্যা-বিশ্লেষণের উপরই নির্ভর করিয়াছেন। কুরআনের এইসব আয়াতের কয়েকটিতে কুরায়শ নেতাদের জড়জাগতিকতার এবং অভাবী ও ইয়াতীমদের জন্য তাহাদের সহানুভূতি ও কর্তব্য পালনের প্রয়োজনীয়তার উপর জোর দেওয়া হইয়াছে। কিন্তু কুরআনে কোথাও এমন কোন আভাস নাই যে, কুরায়শ নেতাদের ইহজাগতিকতা অথবা তাহাদের কর্তব্যের প্রতি অবহেলা তথাকথিত নূতন সম্পদের কারণে হইয়াছিল। বেল এই মর্মে ধারণা করিয়াছিলেন বলিয়া মনে হয় যে, যেহেতু আমরা প্রাক-ইসলামী আরব আতিথেয়তা, মহানুভবতা ও দানশীলতা সম্পর্কে এত শুনিয়াছি সেহেতু "নবলব্ধ” বিত্ত অবশ্যই কুরায়শদেরকে অহঙ্কারী, উদ্ধত এবং বেল-এর ভাষায়-তাহাদেরকে "পুরাতন জীবনের দয়াধর্ম ও সাম্যের চেতনার" ব্যাপারে অহঙ্কারী, উদ্ধত ও উদাসীন করিয়া থাকিবে।
তবে এই সিদ্ধান্ত দুইটি কারণে ভ্রমাত্মক। ইহাতে ধরিয়া লওয়া হইয়াছে যে, পুরাতন যুগের আরব জনসমাজ কেবলই সদগুণে ভরা ছিল। ঐ সমাজে কোন অনাচার, ভ্রান্তি ও অবিচার ছিল না। অথচ বাস্তবিকপক্ষে প্রাক-ইসলামী আমলে এমন কাল্পনিক আদর্শ আরব সমাজ আদৌ ছিল না। এমন দৃষ্টান্তের অভাব নাই যাহাতে প্রমাণিত হয় যে, পুরাতন আরব সমাজে বঞ্চনা, প্রতারণা, লোভ, কৃপণতা, অহঙ্কার, ঔদ্ধত্য, বিশ্বাসঘাতকতা, অন্যের অধিকার লঙ্ঘন ও সম্পত্তি গ্রাস ইত্যাদির মত বিপরীত দোষও ঐ সমাজে, বিশেষ করিয়া বেদুঈন যাযাবর গোত্রগুলিতেই বিদ্যমান
১৩০ সীরাত বিশ্বকোষ
ছিল, যদিও এই বেদুঈনদের আর যাহাই হউক মক্কার উল্লিখিত নূতন বিত্তে তাহাদের কোন অবস্থা পরিবর্তনের কোন কথা থাকিতে পারে না।
দ্বিতীয়ত, মক্কার কুরায়শদের আন্তর্জাতিক বাণিজ্য মহানবী -এর প্রপিতামহ হাশিম কর্তৃক বায়যান্টীয় কর্তৃপক্ষ, ইয়ামান, আবিসিনিয়া ২৩ ইত্যাদি দেশের সহিত কয়েক দফা বাণিজ্য চুক্তি সম্পাদনের পর মক্কার বাণিজ্য সম্প্রসারণ এক নব পর্যায়ে উপনীত হওয়ার বিষয়টি সন্দেহাতীত হইলেও ইহার অর্থ অবশ্য ইহা নহে যে, মক্কার কুরায়শদের এই নূতন বিত্ত হঠাৎ করিয়া প্রবাহিত হইতে শুরু করে এবং তাহারা এমন বিপুল বিত্তের অধিকারী হয় যাহার পরিণামে মক্কাবাসীদের দয়াধর্ম ও সাম্যনীতির পুরাতন ঐতিহ্য বাতিল হইয়া যায়। কেননা, যে কোন ও প্রতিটি জনসমাজে বিত্ত ও সমৃদ্ধি আসিলেই উহার অনিবার্য পরিণাম হিসাবে মহানুভবতার অবক্ষয় ও স্বার্থপরতার প্রসার ঘটায় না। আর ইহাও উল্লেখ আবশ্যক যে, গোত্রগত সংহতি সত্ত্বেও গোত্রের ব্যক্তি/সদস্যও দান ও উত্তরা িকার সূত্রে প্রাপ্ত সম্পত্তির অধিকারীরা তাহাদের ব্যক্তিগত বিষয়াবলীর ক্ষেত্রে বেশ স্বাধীনতা ভোগ করিত। আর তাহারা গোত্রস্বার্থের উপরে তাহাদের ব্যক্তিস্বার্থকে সাধারণত বড় করিয়া দেখিত না। কথাটিকে এইভাবেও বলা যায় যে, "স্বার্থপরতা" ও "ব্যক্তিকেন্দ্রিকতাবাদ" যাহার কথা ল্যামেন্স বলিয়াছেন ও বেলের লেখায় প্রচ্ছন্ন, এইসব বস্তুর বেশ ভাল রকমের অস্তিত্ব ছিল প্রাক-ইসলামী জনসমাজে। মোটকথা এইসব বৈশিষ্ট্য নূতন ঘটমান ঘটনাপ্রবাহের কেবল একান্ত বিষয় বলা যায় না, সেগুলি আসিয়াছে বাণিজ্যের নয়া সম্প্রসারণের অনুষঙ্গ হিসাবে। যাহা বাস্তবিকপক্ষে সত্য তাহা হইল, প্রাক-ইসলামী জনসমাজে সম্ভবত কালের প্রতিটি জনসমাজ ও দেশের মতই ভালো-মন্দের যুগপৎ সমাবেশ ছিল। কুরআন পূর্ববর্তী সকল ঐশী প্রত্যাদেশের মত ভাল বা উৎকর্ষের অনুমোদন দেয় ও উৎসাহিত করে এবং মন্দের নিন্দা করে ও সংস্কার সাধন করে।

টিকাঃ
১. Watt, M. at M., Introduction, x-xi, এমনকি জড়বাদী দৃষ্টিভঙ্গি সম্পর্কে সতর্ক সংশয় প্রকাশ সত্ত্বেও ওয়াট সমালোচনা এড়াইতে পারেন নাই। তাহাকে এইজন্য তাহার সমগোত্রীয় লেখকদের মধ্যে মার্কসবাদের "Episcopalean clergyman" of Marxism বলিয়া সমালোচনা করা হইয়াছে (G.H. Busquet-এর মন্তব্য; সূত্র: Maxime Rodinson. A Critical survey of modern studies on Muhammad," Studies on Islam, ed. Marlin Swartz, O.U.P. 1981, p.47) রডিনসন স্বঘোষিতভাবে একজন জড়বাদী হইলেও তিনি ওয়াটের বক্তব্যের 'তীক্ষ্ণতা' ও 'প্রাঞ্জলতার' সুখ্যাতি করিয়াছেন (প্রাগুক্ত, পৃ. ৪৬, ৪৭) এবং ওয়াটের লেখা হইতে তাহার দৃষ্টিভঙ্গি তিনি তাহার নিজ রচনা Muhammad-এ পরিগ্রহণও করিয়াছেন।
২. Hubert Grimme. Mohammed (Darstellungen etc., Band 7), vol. I, Munster 1892, Ch. 1, especially p. 14.
৩. C. Snouck Hurgronje, "Une nouvelle biographie de Mohammed, R.H.R., 1894, pp. 48-70, reproduced in Hurgronje, Selected Works etc., Leiden 1957, pp. 109-149.
৪. J. Wellhausen, Reste Arabischen Heidentums, 2nd edition, Berlin 1897, p.93. quoted in Margoliouth, op. cit., p. 32.
৫. C.C. Torrey, The Commercial-Theoligical Terms of the Koran, Leiden 1892.
৬. Margoliouth, op. cit., p.24.
৭. প্রাগুক্ত, পৃ. ৩০-৩১।
৮. প্রাগুক্ত, পৃ. ৩১।
৯. প্রাগুক্ত, পৃ. ৪৪।
১০. দৃষ্টান্তস্বরূপ দ্র. কুরআন ২ঃ ৭১, ২:২২৩, ২: ২৬৪-২৬৬, ৬: ১৩৬-১৩৮, ৬: ১৪১; ১৩: ৩-৪, ১৬ : ১১, ১৮: ৩২-৪২, ২৬ : ১৪৬-১৪৮, ৩৪: ১৫-১৬, ৩৬: ৩৩-৩৬, ৪৪: ২৫-২৭; ৪৮: ২৯, ৫০: ৭-১১, ৫৬: ৬৩-৬৪, ৬৮: ২২, ৭১: ১১-১২, ৭৮: ১৬ ইত্যাদি।
১১. কুরআন, ৪২ঃ ২০।
১২. কুরআন, ৩৫: ৪৯, ৫০: ১১।
১৩. কুরআন, ২ঃ ২২৩।
১৪. The Cambridge Medieval Histiry, vol. II (ed. H.M. Gwatkin and J.P. Whitney), Cambridge 1913, pp. 330-332.
১৫. H. Lammens, La Mecque a la Veille de l'Hegire, Beirut 1924, p.55.
১৬. প্রগুক্ত, পৃ. ১৭৭।
১৭. প্রাগুক্ত, পৃ. ২৩১।
১৮. H. Lammens, Le Berceau de l'Islam : l'Arabie Occidentale a la Veille de l'Hegrie, Rome 1914, pp. 187 ff., cited in Watt, M.at M., p. 18.
১৯. Patricia Crone, Meccan trade and the rise of Islam, Oxford 1987, p.3.
২০. R. Bell, "Who were the hanifs", M.W., 1930, pp. 121-122.
২১. R. Bell, "The beginning of Muhammad's religious activity", T.G.U.O.S., VII (pp. 16-24), p.23.
২২. প্রাগুক্ত, পৃ. ২৪।
২৩. Patricia Crone, প্রাগুক্ত, বাস্তবিকপক্ষে তিনি অসহনীয় চরম মনোভাবে আক্রান্ত হইয়া এই মর্মে প্রস্তাব করিয়াছেন যে, "মক্কার বাণিজ্যিক কার্যকলাপ” সংক্রান্ত বরাবরের সনাতন দৃষ্টিভঙ্গিটি "ইসলামের আবির্ভাবের আনুমানিক ছয় শত বৎসর আগে দক্ষিণ আরব ও ভূমধ্যসাগরীয় দেশগুলির মধ্যকার বাণিজ্যিক লেন-দেনের প্রাচীন বিবরণের ভিত্তিতে এই বিষয়ে প্রচলিত দৃষ্টিভঙ্গি গড়িয়া উঠিয়াছে।

📘 সীরাত বিশ্বকোষ > 📄 দুই: এই মূলতত্ত্বে মন্টগোমারী ওয়াট-এর অবদান

📄 দুই: এই মূলতত্ত্বে মন্টগোমারী ওয়াট-এর অবদান


দুই : এই মূলতত্ত্বে মন্টগোমারী ওয়াট-এর অবদান
উপরিউক্ত বক্তব্যের আলোকে ইসলামের জড়বাদী ব্যাখ্যা-বিশ্লেষণের সমাবেশে ওয়াট-এর অবদান উপলব্ধি করা সহজ হইবে। বৈষয়িক উপকরণগুলির ব্যাপারে "পরিপূর্ণ মনোনিবেশ করিয়াছেন" বলিয়া ওয়াট যে দাবি করিয়াছেন তাহা একদিকে তাহার পূর্ববর্তীদের উল্লিখিত অভিমতের প্রতিফলন, তেমনি অন্যদিকে গ্রন্থের বিষয় উপস্থাপনায় সকল বিভিন্ন মতামতের অভিযোজন ও সমন্বয়ও বটে। তাই পূর্ববর্তীদের অভিমতসমূহের বিশদায়ন করিতে গিয়া ওয়াট বাস্তব তথ্যাদিকে প্রভাবিত করিয়া উল্লিখিত অভিমতগুলির পাঠের সাথে জবরদস্তিমূলক খাপ খাওয়ানোর ব্যবস্থা করিয়াছেন। আর অভিমতগুলি তাহার বক্তব্যে আত্মস্থ করিতে গিয়া এমন কিছু বিষয় তাহার মনোযোগ এড়াইয়াছে যাহার ফলে তাহার বক্তব্য অন্যান্য বাস্তবতার সহিত সাংঘর্ষিক।
গোড়াতেই বলা যায়, ওয়াট ল্যামেন্সের এই রায় মানিয়া লইয়া বলিয়াছেন, "ইসলামের অভ্যুদয়কালে মক্কা কেবল একটি বর্ধিষ্ণু বাণিজ্য কেন্দ্রই ছিল না, বরং একটি গুরুত্বপূর্ণ আর্থিক কেন্দ্রও ছিল। এই আর্থিক কেন্দ্রে জটিল ধরনের আর্থিক লেনদেন অনুষ্ঠিত হইত”। ২৪
মনে রাখা দরকার, অন্যান্য প্রাচ্য বিশারদদের মধ্যে মার্গোলিয়থও মক্কার বাণিজ্যিক বিকাশের বিষয়টির প্রতি গুরুত্ব আরোপ করেন। ওয়াট ল্যামেন্সের এই অভিমতও গ্রহণ করিয়াছেন যে, কুরায়শ গোত্র পশ্চিম ও পশ্চিম-মধ্য আরবের প্রতিবেশী গোত্রগুলির মধ্যে প্রাধান্য ভোগ করিত। তবে ল্যামেন্স কুরায়শগণ তাহাদের আধিপত্য বলবৎ করিতে ও তাহা বজায় রাখার জন্য দাসদের লইয়া গঠিত এক ভাড়াটে সেনাবাহিনী লালন করিত বলিয়া যে উল্লেখ করিয়াছেন তাহা ওয়াট প্রত্যাখ্যান করিয়াছেন। ল্যামেন্স-এর তত্ত্ব অনুযায়ী, উহার পরিবর্তে ল্যামেন্স অন্য একটি বিষয়, যথা কুরায়শদের রাজনৈতিক নৈপুণ্য বা হিল্ল্ম তত্ত্বের অবতারণা করিয়া বলিতে চাহিয়াছেন যে, "কুরায়শদের আধিপত্য তাহাদের ব্যক্তিগত সামরিক সামর্থ্যেই নিহিত ছিল না, বরং উহা নিহিত ছিল যে কোন বৈরী প্রতিপক্ষের বিরুদ্ধে সমবেত সামরিক শক্তি সমাবেশ ও প্রয়োগে তাহাদের সামর্থ্যে”। এই সামরিক শক্তির উৎস ছিল বিভিন্ন গোত্র সমবায় বা গোত্রমৈত্রীর মধ্যে। তাহারা মৈত্রী গড়িয়া তোলে তাহাদের বাণিজ্যিক উদ্যম ও উদ্যোগের ভিত্তিতে। ওয়াটের মতে, ইয়ামান, সিরিয়া ও অন্যত্র চলাচলকারী কুরায়শদের বাণিজ্যিক কাফেলাগুলির জন্য পথ-প্রদর্শক, সঙ্গী প্রহরা কাজ ও উষ্ট্রচালক হিসাবে বহু সংখ্যক বেদুঈনের প্রয়োজন ছিল। আর সে কারণে তাহারা একজন বেদুঈন সর্দারকে তাহাদের এলাকা দিয়া বাণিজ্যিক কাফেলা চলাচলের এবং পানি ও অন্যান্য রসদ সরবরাহের জন্য অর্থ প্রদান করিত। এমনি করিয়া কুরায়শগণ বেদুঈন গোত্রগুলিকে তাহাদের বাণিজ্যিক নেটওয়ার্কভুক্ত করে। বেদুঈনগণও দ্রুত এক্ষেত্রে তাহাদের নিজ নিজ স্বার্থও উপলব্ধি করিতে সক্ষম হয়। মক্কার সাথে বেদুঈন গোত্রগুলির "এই সংহতিবোধ" কুরায়শ গোত্রপ্রধানদের বিভিন্ন গোত্রের সঙ্গে বিবাহ সূত্রে আঁতাত এবং মক্কার ব্যবসায়-বাণিজ্যের যৌথ মূলধনী সংস্থায় বেদুঈন গোত্রপ্রধানদেরকে শেয়ার বরাদ্দ দানের মধ্য দিয়া মক্কার আরও শক্তিবৃদ্ধি ঘটে। ২৫
মক্কার ব্যবসায়ীদের বাণিজ্যিক প্রয়াসকে "যৌথ মূলধনী কোম্পানী" বলিয়া মূলত যিনি আখ্যায়িত করেন তিনি হইলেন মার্গোলিয়থ। ২৬ অবশ্য ওয়াট কেবল "মক্কার পরিবার/খানা প্রধানের" কথাই উল্লেখ করিয়াছেন। ওয়াট এই মক্কার পরিবার প্রধানদের মধ্যে প্রতিবেশী ও বেদুঈন গোত্রগুলিকেও অন্তর্ভুক্ত করিয়াছেন। তিনি অবশ্য এমন কোন দৃষ্টান্তের কথা সুনির্দিষ্টভাবে উল্লেখ করেন নাই যে দৃষ্টান্তে "বেদুঈন গোত্রপ্রধানগণ মক্কার যৌথ মূলধনী সংস্থা হইতে শেয়ার পাইয়াছে বলিয়া জানা যায়”। আবদুল মুত্তালিবের মত মক্কার নেতৃস্থানীয় ব্যক্তিরা তাহাদের প্রতিবেশী কোন কোন গোত্রের সহিত বৈবাহিক মৈত্রী সম্পাদন করেন এবং এই ধরনের প্রতিবেশী গোত্রের সহিত কুরায়শদের মাঝে মাঝে মৈত্রী স্থাপিত হয়। এই সবের পরিপ্রেক্ষিতে উক্ত গোত্রগুলি মক্কার বাণিজ্য কাফেলাগুলিতে মাঝে মাঝে অংশীদার হইবে এমন সম্ভাবনা উড়াইয়া দেওয়া যায় না। যদিও আমাদের কখনও ইহাও ভুলিলে চলিবে না যে, যাযাবর বা বেদুঈন জীবন
১৩২ সীরাত বিশ্বকোষ
দর্শনের সঙ্গে বাণিজ্যের সম্পর্ক কার্যত থাকিতে পারে না। সে যাহাই হউক, মাঝে মাঝে মক্কার বাণিজ্য কাফেলার যৌথ উদ্যোগ বা সামরিক মৈত্রী বা গোত্র মৈত্রীসমবায়ে এই ধরনের রায় বা কল্পনা খুবই কষ্টকল্পিত। গোত্রগুলির সহযোগিতার প্রকৃতি যাহাই হউক না কেন, এই ধরনের মৈত্রী বা গোত্রমৈত্রী সমবায়ের কুরায়শ প্রতিবেশী গোত্রগুলির উপর তাহাদের সামরিক শক্তির প্রভাব আরোপ করা হয়—এমন বক্তব্য একান্তই স্ববিরোধী।
ওয়াট কুরায়শদের বাণিজ্য কার্যকলাপ এবং মক্কায় ক্ষমতা ও নেতৃত্ব লইয়া তাহাদের আন্তগোত্র প্রতিদ্বন্দ্বিতার যোগসূত্র সন্ধান প্রয়াসে বলিয়াছেন যে, "মক্কার বাণিজ্য প্রধান জনসমাজে ক্ষমতার জন্য বরাবরই সংঘাতের অস্তিত্ব ছিল”। তিনি যদিও উল্লেখ করেন নাই যে, মহানবী -এর মিশন এই ক্ষমতা ও নেতৃত্বের জন্য গতানুগতিক প্রতিদ্বন্দ্বিতারই একটি পর্যায়মাত্র, তবুও কার্যত তিনি বলিতে চাহিয়াছেন যে, যেহেতু মুহাম্মাদ প্রথম হইতেই কোন না কোনভাবে একজন রাষ্ট্রনায়কও ছিলেন সেহেতু অন্ততপক্ষে প্রধান বিষয়গুলি বিবেচনা করিয়া দেখা দরকার। ২৭ এইসব প্রধান বিষয় বা কুরায়শদের মধ্যকার "রাজনৈতিক গ্রুপিংগুলির" অন্যতম হিসাবে ওয়াট বানু খুযা'আর নিকট হইতে মক্কার নিয়ন্ত্রণ কুসাই কর্তৃক ছিনাইয়া লওয়া, তাহার উত্তরাধিকারী বানু আবদুদ দার ও বানু আব্দ মানাফের মধ্যে কা'বার বিভিন্ন পদ ও কা'বার প্রশাসনিক কার্যাবলী লইয়া দ্বন্দ্ব-সংঘাত, আল-আহলাফ ও আল-মুতায়্যাবুন নামে তাহাদের দুইটি গ্রুপ গঠন এবং এই বিষয় লইয়া তাহাদের শেষ পর্যন্ত সমঝোতায় উপনীত হওয়ার উল্লেখ করিয়াছেন। ২৮ ওয়াট এই ঘটনার সঙ্গে পরবর্তী কালের হিলফুল ফুযূল গঠনের ঘটনাপ্রবাহের সম্পর্ক থাকার বিষয়েরও উল্লেখ করিয়াছেন। ২৯
মক্কার বিষয়াবলীর নিয়ন্ত্রণ সম্পর্কে বলিতে গিয়া ওয়াট অবশ্য আল-লিওয়া, আস-সিকায়া, আর-রিফাদা ইত্যাদির মত ঐতিহ্যিক পদের গুরুত্বকে খাটো করিয়াছেন, যদিও তাহার মত মার্গোলিয়থ ও ল্যামেন্স-এর মতের, বিশেষ করিয়া ল্যামেন্স-এর প্রতিধ্বনি বৈ আর কিছুই নহে। ওয়াট অভিমত প্রকাশ করিয়াছেন যে, আস-সিকায়া পদের আওতায় অর্থাগমের সুযোগ ছিল। কেননা হজ্জযাত্রী কর্তৃক যমযম কূপের পানি ব্যবহারের জন্য কর হিসাবে কিছু অর্থ আদায় করিতে হইত। ৩০ ইহার পর আরও এই মর্মে অভিমত প্রকাশ করা হইয়াছে যে, মক্কা নগরীর বিষয়াবলীর পরিচালনায় ব্যক্তিবিশেষের প্রভাব, তাহার ব্যক্তিগত যোগ্যতা ও গুণাবলী তাহার নিজ শাখা গোত্রের শক্তি-সামর্থ্য ও ধন-সম্পদের উপর নির্ভর করিত। ওয়াটের বর্ণনা অনুযায়ী, বানু 'আব্দ শাম্স ও বানু মাখযূম ছিলেন মহানবী -এর মিশন শুরু হওয়ার সময়ে মক্কার নেতৃস্থানীয় গোত্রগুলির মধ্যে শীর্ষ মর্যাদার অধিকারী। এই সময়ে বানু 'আব্দ শাম্স-এর আবূ সুফ্যান ছিলেন কূটনীতি, বাণিজ্য ও অর্থ বিষয়ে যোগ্যতা, বিচক্ষণতা ও বুদ্ধিমত্তায় মক্কার নীতি নির্ধারণে আধিপত্যের অধিকারী। ওয়াট এমনকি আবূ সুফ্যানের এই অবস্থানগত মর্যাদাকে এথেন্সের পেরিক্লিসের মর্যাদার সহিত তুলনা করিয়াছেন। ৩১
হযরত মুহাম্মাদ (স) ১৩৩
আরও সবিশেষ উল্লেখ্যযোগ্য বিষয় এই যে, ওয়াট মক্কার ক্ষমতা ও নেতৃত্বের জন্য আন্ত-গোত্রীয় প্রতিদ্বন্দ্বিতার বিষয়কে তাহাদের আন্তর্জাতিক বাণিজ্যের ক্ষেত্রেও সম্প্রসারিত করিয়াছেন। তিনি বৈদেশিক বাণিজ্য ক্ষেত্রে আন্ত-গোত্রীয় বাণিজ্যিক প্রতিদ্বন্দ্বিতার কথাও অনুমান করিয়াছেন। তিনি অভিমত প্রকাশ করিয়াছেন যে, বাণিজ্যিক জনসমাজে এই "রাজনৈতিক দলাদলির প্রভাব ক্রমান্বয়ে অন্যান্য গোত্রগুলির মধ্যকার সম্পর্ককেও প্রভাবিত করিয়াছে, যাহারা পরবর্তী কালে মক্কার বাণিজ্য কাফেলাগুলির সংস্পর্শে আসে। ইহা ছাড়াও তাহারা যেসব বৃহৎ শক্তির বাজারে আরব গোত্রগুলির পণ্য যাইত সেইসব বৃহৎ শক্তির সংস্পর্শে আসে”। ৩২ তিনি আরব গোত্রগুলির সহিত যে "মৈত্রী সমবায়ের" কথা বলিয়াছেন এবং যাহার উল্লেখ বক্ষমাণ রচনায় ইতোপূর্বে করা হইয়াছে, বাস্তবিকপক্ষে উহার পরিচয়ই তুলিয়া ধরা হইয়াছে। বাণিজ্যিক পর্যায়ে আন্ত-গোত্রীয় প্রতিদ্বন্দ্বিতার এই একই মূল ভাবটিকে তিনি বৃহৎ শক্তি পর্যন্ত টানিয়া লইয়া গিয়াছেন। তিনি দাবি করিয়াছেন যে, মক্কায় আবরাহার আক্রমণের সময় 'আবদুল মুত্তালিব আবিসিনিয়ার এই আক্রমণকারীর ৩৩ নিকট হইতে নিজের জন্য অনুকূল ব্যবসায়িক সুবিধা আদায়ের প্রয়াস পাইয়াছিলেন। ৩৩ মুহাম্মাদ তাঁহার যুব বয়সে অত্যন্ত লাভজনক ব্যবসায় কার্য পরিচালনার ক্ষেত্র হইতে উৎখাত হইয়াছিলেন বলিয়া ওয়াট যে ধারণা দিয়াছেন উহারও নেপথ্যে একই ধারণা ক্রিয়াশীল ছিল। ৩৪ আন্ত-গোত্রীয় ব্যবসায়িক প্রতিদ্বন্দ্বিতার নেপথ্যে তিনি একই অনুমান করিয়াছেন। ওয়াট ইহার বিশদায়ন করিয়াছেন হারবুল ফিজার ও হিলফুল ফুযূল সম্পর্কিত তাঁহার নিজ তত্ত্বে। ৩৫
পরবর্তী অধ্যায়ে হারবুল ফিজার ও হিলফুল ফুযূল সম্পর্কে সবিস্তার আলোচনা রহিয়াছে। ৩৬ আবরাহার মক্কা অভিযানকালে আবদুল মুত্তালিবের ভূমিকা সম্পর্কে ওয়াটের ধারণার অযৌক্তিকতা সম্পর্কেও এই গ্রন্থের পরবর্তী পর্যায়ে উল্লেখ করা হইবে। ৩৭ ইহা ছাড়াও তাহার ধারণায় মহানবী তাঁহার সবচাইতে লাভজনক ব্যবসায়কার্য হইতে উৎখাত হইয়াছিলেন—এই মর্মে তাহার ধারণার আপাত যৌক্তিকতা ও স্ববিরোধী প্রকৃতির আসল চেহারা যথাস্থানে উন্মোচিত করা হইবে। ৩৮
মক্কাবাসীদের রাজনৈতিক দলাদলির ঘটনা, যেমন কুসাই কর্তৃক মক্কা হইতে বানু খুযআকে উৎখাত, বানু আবদুদ-দার ও বানু আব্দ মানাফের মধ্যে ক্ষমতার দ্বন্দ্ব, আল-আহলাফ ও আল-মুতায়্যাবৃন ইত্যাদি গঠনের ঘটনা আদৌ মক্কাবাসীদের নিজেদের মধ্যে বাণিজ্যিক প্রতিদ্বন্দ্বিতা হইতে উদ্ভূত নহে, বরং ইহার উৎপত্তি কা'বাঘরের ও মক্কার নগর প্রশাসন সম্পর্কিত পদ ও ক্ষমতার লড়াই হইতে। এই বিরোধেরও নিষ্পত্তি হয় সমঝোতার মাধ্যমে। বস্তুতপক্ষে হাশিম ইবন আব্দ মানাফ কর্তৃক বায়যান্টীয় ইয়ামানী কর্তৃপক্ষের সহিত বাণিজ্যিক চুক্তি সম্পাদনের আগে কয়েকটি আরব গোত্র উল্লিখিত দ্বন্দ্ব-সংঘাতের পর কুরায়শরা বাস্তবিকপক্ষে কোন উল্লেখযোগ্য পরিসর ও ব্যাপ্তির আন্তর্জাতিক বাণিজ্যিক তৎপরতায় প্রবেশ করিতে পারে নাই। হাশিমের মক্কার বাণিজ্য উদ্যোগে আরব গোত্রগুলির সহযোগিতা বা অংশীদারিত্বের যে চিত্র
আমরা পাই তাহাতে এমন কোন ধারণা আদৌ মিলে না যে, কুরায়শদের একটি গোত্রের একটি গ্রুপের বিরুদ্ধে আন্তগ্রুপ দ্বন্দ্বজনিত কারণে মৈত্রী কার্যকর হয়। মক্কা নগরীর চৌহদ্দির মধ্যে কুরায়শ বংশের বিভিন্ন গোত্র ক্ষমতা ও প্রভাবের জন্য পরস্পরের সহিত প্রতিযোগিতায় অবতীর্ণ হইলেও কুরায়শদের দুই প্রধান গোষ্ঠীর মধ্যে কখনও কথিত "বাণিজ্য যুদ্ধ” অনুষ্ঠিত হয় নাই। তাহাদের মধ্যে কথিত বাণিজ্য প্রতিদ্বন্দ্বিতা থাকিলেও বিষয়টি কখনও তাহারা অন্য দেশের দরবারে বা বাজারে কিংবা বিজাতীয় গোত্রের নিকট উত্থাপিত করে নাই। এই ধরনের কাজ করিলে ইহা তাহাদের বাণিজ্যিক স্বার্থ, বিশেষত অন্যান্য গোত্রের সহিত তাহাদের সম্পর্ক এবং মক্কার কাফেলা গোত্রীয় এলাকা গমনকালে নিরাপত্তার জন্য আত্মহত্যামূলক বিষয় হইত। কুরায়শ গোত্রগুলির কোন গোষ্ঠী তাহাদের অন্য কোন গোষ্ঠীর বিরুদ্ধে বাণিজ্যিক বা রাজনৈতিক কোন উদ্দেশ্যেই কোন বিদেশী শক্তি বা বেদুঈন গোত্রের সহিত আঁতাত করে নাই। 'উছমান ইবনুল হুওয়ায়রিছ একবার বায়যান্টীয় শক্তির সহায়তায় রাজনৈতিক ক্ষমতা দখল করার যে চেষ্টা করিয়াছিল তাহাতে তাহার নিজ গোত্র বানু আসাদই বরং তাহার পক্ষ ত্যাগ করে এবং ঐ চক্রান্তে যোগ দিতে অস্বীকৃতি জানায়। ৩৯
মক্কার বিষয়াবলী নিয়ন্ত্রণের ব্যাপারে ওয়াট যেভাবে ব্যাখ্যা দেওয়ার চেষ্টা করিয়াছেন সে বিষয়ে বলা যায়, তিনি স্পষ্টত মহানবী -এর গোত্র বানু হাশিমকে গৌণ ভূমিকায় দেখানোর স্পষ্ট প্রয়াস পাইয়াছেন। আর এই কারণেই কা'বাঘর ও মক্কা নগর প্রশাসনের সঙ্গে সংশ্লিষ্ট পদগুলির কাজকে খাটো করিয়া দেখানো হইয়াছে। একই সাথে আস-সিকায়া নামে যে পদটি ছিল বানু হাশিমের দখলে সেই পদের আওতায় কেবল মক্কার হজ্জযাত্রীদের নিকট হইতে কিছু অর্থ আদায়ের সুযোগমাত্র ছিল বলিয়া উল্লেখ করা হইয়াছে। এই কটাক্ষপাতের সঙ্গে সঙ্গে আবরাহার মক্কা অভিযানকালে তাহার নিকট হইতে আবদুল মুত্তালিবের বাণিজ্যিক সুবিধা আদায়ের অভিযোগ তোলার প্রধান উদ্দেশ্য ছিল বানু হাশিমকে অপবাদ দেওয়া। একই উদ্দেশ্যে আবদুল মুত্তালিব আবরাহার তথা আবিসিনীয় আক্রমণের পরেও প্রায় পাঁচ বৎসরসহ মোট অর্ধ শতকেরও বেশি কাল কী করিয়া মক্কার কার্যত প্রধানের পদে বহাল রহিয়া গেলেন এবং দেশের অভ্যন্তরে ও বৈদেশিক সম্পর্কের ক্ষেত্রে কেমন করিয়া আধিপত্য বজায় রাখিলেন তাহার কোন প্রকার উল্লেখই ওয়াট করেন নাই। এমনকি তাহার মৃত্যুর পরও বানু হাশিম গোত্র কা'বা প্রশাসনে নানা ধরনের ঐতিহ্যিক ভূমিকা পালন করা ছাড়াও মক্কার নানা বিষয়ে অত্যন্ত প্রধান ও বিশিষ্ট ভূমিকা পালন করে। ইহার প্রমাণ পাওয়া যায়, মহানবী -এর ইসলাম প্রচার মিশনের অন্তত সপ্তম বৎসর অবধি সকল গোত্রের সম্মিলিত বিরোধিতার মুখেও বানু হাশিম-এর সফল মর্যাদাগত অবস্থান রক্ষার ঘটনায়। এইসব তথ্যের কোনটিরই উল্লেখ ওয়াটের মক্কার বিষয়াবলী সংক্রান্ত বর্ণনায় নাই।
কুরায়শ এবং খোদ মক্কা নগরী গুরুত্ব ও অবস্থানগত এমন মর্যাদা ভোগ করিয়াছে কেবল সেখানে কা'বাগৃহ অস্তিত্বশীল ছিল বলিয়া, বিষয়টি বিতর্কাতীত। এই কা'বার প্রতি শ্রদ্ধাবান ছিল
হযরত মুহাম্মাদ (স) ১৩৫
সকল আরববাসী। তাহারা মক্কা সফর করিত এবং বৎসরে একবার হজ্জ পালন করিত। মক্কার অভ্যন্তরীণ ব্যবসায়-বাণিজ্য সামগ্রিকভাবে এবং বৈদেশিক বাণিজ্যের সিংহভাগ সংশ্লিষ্ট ছিল আল্লাহ্‌র গৃহ কা'বার সহিত। অতএব সুনিশ্চিতভাবেই কা'বার প্রশাসন এবং বার্ষিক হজ্জ অনুষ্ঠানের ব্যবস্থাপনা, বিশেষ করিয়া হজ্জ মৌসুমে খাদ্য ও পানির ব্যবস্থা করা ছিল মক্কানগরীর বিষয়াবলীর মধ্যে সর্বাপেক্ষা গুরুত্বপূর্ণ অংশ। শহরের নাগরিক জীবনের এই গুরুত্বপূর্ণ ও সকল মনোযোগের দাবিদার কাজটির দায়িত্ব ছিল কুরায়শদের মধ্যে সর্বসম্মতিক্রমে বানু হাশিমের। এই কাজ বা পদটির গুরুত্ব কতখানি তাহা আরও স্পষ্ট হইবে যদি ইহা মনে রাখা হয় যে, প্রাচীন ও মধ্যযুগের গোড়ার দিকে ধর্মীয় বিষয় যাহারা নিয়ন্ত্রণ করিত তাহাদেরকেই সংশ্লিষ্ট জনসমাজে সবচেয়ে উন্নত অবস্থানের মর্যাদার অধিকারী ও গুরুত্বপূর্ণ মনে করা হইত। "ধর্মীয় বিষয়াবলীর" প্রশাসন ও ব্যবস্থাপনার কাজ কখনও সঙ্কীর্ণ ধারণায় একান্তভাবে "ধর্মীয়” প্রকৃতির ছিল না। আর এই কাজগুলিকে রাষ্ট্রীয় বিষয়াবলীর মধ্যে সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ বিষয় বলিয়াও মনে করা হইত। ওয়াট অবশ্য মক্কার বিষয়াবলী নিয়ন্ত্রণ সম্পর্কিত তাহার লেখায় এইসব বিষয় পুরাপুরি উপেক্ষা করিয়াছেন।
বিপরীতক্রমে তিনি তাহার মনোযোগ প্রধানত সন্নিবেশিত করিয়াছেন মালা (মা’লা) অর্থাৎ নগরীর বয়োজ্যেষ্ঠদের পরিষদের গুরুত্বের প্রশ্নে। এই মালা বা বয়োজ্যেষ্ঠদের পরিষদ কার্যত ছিল আন-নাদওয়া যাহা মক্কার বিষয়াবলী প্রশাসন কর্তৃপক্ষের পাঁচ বা ছয়টি বিভাগের অন্যতম চিরায়ত বিভাগ। মালার কার্যাবলীর প্রতি গুরুত্ব আরোপ করিতে যাইয়া ওয়াট বলিয়াছেন যে, নগরীর বিষয়াবলীর ক্ষেত্রে কোন গোত্রের গুরুত্ব ও প্রভাব নির্ভর করিত ঐ গোত্রের ব্যক্তি সদস্যদের বিত্ত ও বুদ্ধিমত্তার উপর।
ধনসম্পদ ও বুদ্ধিমত্তা নিশ্চয়ই এই বিষয়ে বিবেচ্য ছিল নিঃসংশয়ে যাহা সকল যুগের সকল সমাজের ক্ষেত্রেই সত্য ও বাস্তব। কিন্তু বানু 'আব্দ শাম্স ও তাহাদের মিত্রগোত্রগুলি মালা বা বয়োজ্যেষ্ঠ পরিষদের অধিবেশন বা সমাবেশের ক্ষেত্রে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করিত। ইহা তাহারা করিত কেবলই এইসব গোত্রের সদস্যরা কূটনীতি, বাণিজ্য ও আর্থিক বিচক্ষণতার ক্ষেত্রে বিত্ত ও মেধার অধিকারী বলিয়া নহে, বরং প্রধানত তাহারা ঐ ভূমিকা পালন করিত আহ্হ্বাফ ও মুতায়‍্যাবৃনের মধ্যে সম্পাদিত আপোষ-রফাক্রমে। আর একই ভিত্তিতে আন-নাদওয়া ও আল-লিওয়ার কাজগুলির দায়িত্ব প্রদান করা হয় বানু আবদ শাম্স গোত্রকে। এখানে উল্লেখ যথার্থ যে, সকল গোত্রের সম্মতি ছাড়া কোন সিদ্ধান্ত গ্রহণ ও বাস্তবায়ন করা যাইত না। ওয়াট এই সম্মতির বিধানটির উল্লেখ করিয়াছেন ঠিকই, তবে এই সাথে আরও উল্লেখ করিলে ভালো করিতেন যে, মক্কায় আবরাহার আক্রমণের সময় 'আবদুল মুত্তালিব প্রকাশ্যে আবরাহার সহিত দর কষাকষির যে আলোচনায় অংশগ্রহণ করেন তাহা তিনি নিশ্চয় সকল গোত্রের সম্মতিক্রমেও করিয়াছিলেন। ইহার সহজ-সরল কারণটি হইল, 'আবদুল মুত্তালিব আর যাহাই হউক এককভাবে মক্কার নগর জীবন সংক্রান্ত বিষয়ে কোন বড় সিদ্ধান্ত লইতে পারেন না।
১৩৬ সীরাত বিশ্বকোষ
পরিশেষে ওয়াট স্পষ্টত মক্কার অন্যান্য নেতাকে উপেক্ষা করিয়া আবূ সুফ্যানের মর্যাদা ও অবস্থানকে স্ফীত করিয়াছেন। আবূ সুফ্যান কোনক্রমেই মক্কার পেরিক্লিসের মর্যাদা পাইতে পারেন না তো বটেই, তিনি মহানবী -এর মদীনায় হিজরতের আগে অবধি মক্কার দৃশ্যপটে বিশিষ্ট ব্যক্তি হিসাবে উদিত হইতেই পারেন নাই। মক্কায় মহানবী -এর হিজরতের আগে তাঁহার বিরোধিতায় নেতৃত্বে ছিল আবূ জাল্, উতবা ইবন রাবী'আহ, আল-ওয়ালীদ ইব্‌ন মুগীরা, এমনকি বানু হাশিমের আবু লাহাব; আবূ সুফ্যান মোটেও নহে। এইসব ব্যক্তির ক্ষেত্রে ওয়াটের মক্কার বিষয়াবলী সংক্রান্ত বিবরণ স্পষ্টত পক্ষপাতদুষ্ট ও উদ্দেশ্যপ্রণোদিত।
ওয়াটের অর্থনৈতিক বিশ্লেষণ প্রসঙ্গে আমরা বলিতে পারি, কুরায়শদের নিজেদের মধ্যে আন্ত-গোত্রগত বাণিজ্যিক প্রতিদ্বন্দ্বিতা ছিল বলিয়া যদি ধরিয়াও লওয়া হয় তবুও বলিতেই হইবে যে, সেই কাঠামোর পরিসরে ওয়াট তাহার ধ্যান-ধারণার বিস্তার করিয়াছেন, ধারণা পরিগ্রহণ করিয়াছেন তাঁহারই পূর্ববর্তীদের নিকট হইতে, বিশেষ করিয়া এই ধারণা গ্রহণ করিয়াছেন যে:
(ক) মক্কায় বাণিজ্যিক সমৃদ্ধি ও বিত্তের নবপ্রবাহ পুরাতন যুগের দয়াধর্ম ও দানশীলতার গুণকে ধ্বংস করিয়াছে এবং তৎপরিবর্তে স্বার্থপরতা ও ব্যক্তিকেন্দ্রিকতা স্থান করিয়া লইয়াছে; বর্ধিষ্ণু ব্যক্তিস্বাতন্ত্রবাদ ও সেই সাথে বহির্বিশ্ব এবং ইয়াহুদী ও খৃস্ট ধর্মের সহিত যোগাযোগের কারণে মক্কার পৌত্তলিক ধর্ম ও গোত্রগত সংহতিতে অবক্ষয় দেখা দেয়;
(গ) নব জড়বাদী বিকাশ এবং আদিম আধ্যাত্মিক ও নৈতিক শৃঙ্খলার মাঝে এইভাবে অসঙ্গতি সৃষ্টি হওয়ার কারণে এইগুলির মধ্যে সামঞ্জস্য বিধানের প্রয়োজন দেখা দেয়;
(ঘ) এই ধরনের সামঞ্জস্য বিধানের উদ্দেশ্যে মুহাম্মাদ মূলত আর্থ-সামাজিক সমস্যাবলী সমাধানের জন্য এক ধর্মীয় সমাধান প্রদান করেন;
(ঙ) এই মিশন সম্পন্ন করিতে যাইয়া মুহাম্মাদ ইয়াহুদী ও খৃষ্ট ধর্ম হইতে ধ্যান-ধারণা গ্রহণ করেন।
এইগুলি হইল ওয়াটের পূর্বসূরীদেরই অভিমত। ওয়াট ইসলামের সামাজিক, নৈতিক, বুদ্ধিবৃত্তিক ও ধর্মীয় পটভূমিকার বিশ্লেষণ করিয়াছেন ঐসব অভিমতেরই বিশদায়নের মাধ্যমে। ৪০ তাহা ছাড়া তিনি তাহার বক্তব্যে কুরআনের প্রথম দিকের অবতীর্ণ আয়াতগুলির বক্তব্যের সঙ্গে আলোচ্য কালের পরিস্থিতির সহিত সম্পর্ক খুঁজিবার ব্যর্থ চেষ্টা করিয়াছেন। ৪১ সামাজিক পটভূমির আলোচনায় ওয়াট দেখাইবার চেষ্টা করিয়াছেন যে, ঐ সময়ে গোত্র সংহতিতে একটা অবক্ষয় ঘটে এবং আনুপাতিকভাবে ব্যক্তিবাদ বিকশিত হয়। তিনি বলিয়াছেন যে, গোত্র সংহতির ধারণাটি "সাধারণভাবে মক্কা নগরীর জন্য প্রযোজ্য”, তাহা কখনও সর্বাত্মক ছিল না। গোত্রের সদস্যরা সাধারণত যান্ত্রিকভাবে আত্মকেন্দ্রিক নহে, বরং তাহারা স্বার্থপরতাপ্রবণ মানুষ যাহা ল্যামেনসের ভাষায় "ব্যক্তিবাদ”। তাই যদি কখনও গোত্র সদস্যরা তাহাদের নিজ ও একান্ত স্বার্থকে গোত্র
হযরত মুহাম্মাদ (স) ১৩৭
স্বার্থের উপরে স্থান দিয়া থাকে উহা অস্বাভাবিক নহে। ৪২ ইহা ছাড়াও যদিও মক্কার সেরা ব্যক্তিদের কার্যকলাপে গোত্র সংহতির বিষয়টি নিয়ন্ত্রিত হইত তবুও ইহাও সত্য যে, তাহাদের ধ্যান-ধারণায় কিছু ব্যক্তিবাদী ধারণার উদয় ঘটিয়াছিল। আর এই ব্যক্তি স্বার্থপ্রবণতা লালিত হইয়াছিল মক্কায় তৎকালীন বাণিজ্যিক পরিবেশে। এইজন্য ওয়াট বলিয়াছেন যে, আবু লাহাব তাহার গোত্রের অভিমতের সহিত একমত ছিল না। সে মহানবী এর বিরোধিতা করে, উছমান ইবনুল হুওয়ায়রিছের প্রতি বিরোধিতা তাঁহার নিজ গোত্রের মধ্য হইতেই আসে" এবং তাহাদের গোত্রের অসম্মতি, এমনকি পিতা-মাতার অসম্মতি সত্ত্বেও বহু লোক ইসলাম গ্রহণ করে। ৪৩
ঐ একই সময়ে আরও "একটি কৌতূহলোদ্দীপক নূতন বিষয় মক্কায় পরিলক্ষিত হয়”। উহা হইল অভিন্ন বৈষয়িক স্বার্থের ভিত্তিতে সংহতি ও একতাবোধ। এই কারণেই ব্যবসায়ে অংশীদারির ব্যাপারটি অনেক সময় গোত্র সম্পর্ক জলাঞ্জলি দিয়াও গড়িয়া উঠে। বৈষয়িক স্বার্থের এই অভিন্নতাবোধই আহ্হ্লাফ ও মুতায়্যাবৃন সংগঠনকে তাহাদের বিরোধ নিষ্পত্তিতে অনুপ্রাণিত করে। এই বৈষয়িক স্বার্থের অভিন্নতাবোধই তাহাদের দ্বন্দ্ব ভুলিয়া গিয়া বদর যুদ্ধের পর একটা কোয়ালিশন সরকার গঠনে প্রেরণা জোগায়। এইসব কিছুরই তাৎপর্য এই ছিল যে, এতদিন রক্তের আত্মীয়তা যে বন্ধন হিসাবে কাজ করিতেছিল উহার বাঁধন শিথিল হইয়া যায় এবং কোন এক নূতন ভিত্তিতে এক ব্যাপকতর ঐক্য প্রতিষ্ঠার সুযোগ ও সম্ভাবনা দেখা দেয়। ৪৪ ওয়াট ৪৫ তাহার চূড়ান্ত বক্তব্যে বলিয়াছেন, "আমরা যদি ইসলামের উৎপত্তির সহিত মক্কার অর্থনৈতিক পরিবর্তনের সম্পর্কসূত্র সন্ধানে প্রয়াসী হই"-
"তাহা হইল সেই ক্ষেত্রে আমাদেরকে অবশ্যই উহার কারণ মক্কায় নববিত্ত ও ক্ষমতার প্রবাহের দিকে দৃষ্টি নিবদ্ধ করিতে হইবে। উহা করিলে আমরা দেখিব যে, যাযাবর অর্থনীতি সওদাগরি ও পুঁজিবাদী অর্থনীতির দিকে মোড় নিয়াছে। মুহাম্মাদ -এর সময়ে অবশ্য মক্কার জনসমাজে সামাজিক, নৈতিক, বুদ্ধিবৃত্তিক ও ধর্মীয় মনোভাবে কোন পুনঃসমন্বয় ঘটে নাই, বরং মক্কার জনসমাজের আচরণ তখনও বহুলাংশেই যাযাবর জনসমাজের আচরণের অনুরূপ ছিল। মুহাম্মাদ ও তাঁহার কতিপয় সমসাময়িক ব্যক্তি যে উদ্বেগ অনুভব করেন তাহা নিঃসন্দেহে চূড়ান্ত বিশ্লেষণে মানুষের সচেতন মনোভাব ও তাহাদের জীবনের অর্থনৈতিক ভিত্তির মধ্যকার বৈপরীত্যের কারণে ঘটে”।
প্রাক-ইসলামী 'নৈতিক আদর্শ ৪৬ এবং "ধর্মীয় ও বুদ্ধিবৃত্তিক পটভূমি”৪৭ সম্পর্কে এইসব ধারণাই কমবেশি তাহার লেখায় প্রকাশ পাইয়াছে। ওয়াট উল্লিখিত বিষয়গুলি সম্পর্কে সংক্ষেপে বলিয়াছেন:
(ক) সাধারণভাবে ইহা স্বীকার্য যে, পুরাতন পৌত্তলিক ধর্মকে অবক্ষয় দশায় ধরিয়াছিল; ৪৮ (খ) মরু'আ (ব্যক্তিত্ব)-র নৈতিক আদর্শও অবক্ষয় দশায় পড়িয়াছিল। এই মুরু'আর আদর্শাবলীর অন্তর্ভুক্ত ছিল মহানুভবতা, দানশীলতা, বিশ্বস্ততা ইত্যাদি যাহা গোত্রীয় মানবতাবাদেরই
১৩৮ সীরাত বিশ্বকোষ
অনুরূপ। এইসব আদর্শ ও ব্যক্তিবাদের (স্বার্থপরতা, হীনতা ও কার্পণ্য) ৪৯ বিকাশের কারণে গোত্রীয় মানবধর্ম ক্ষয়িষ্ণু হইতে থাকে;
(গ) আরবদের মাঝে একত্ববাদী প্রাক-প্রবণতা আবশ্যিকভাবে প্রধানত ইয়াহুদী ও খৃস্ট ধর্মের প্রভাবে আসিয়াছিল”। ৫০
এখানে বলা অনাবশ্যক যে, ওয়াটের উল্লিখিত বক্তব্যগুলি তাহার পূর্ববতী, বিশেষত মার্গোলিয়থ ও বেলের অত্যন্ত অনুরূপ। খৃষ্টান ও ইয়াহুদী প্রভাবের বিষয়টি সম্পর্কে স্বতন্ত্রভাবে আলোচিত হইয়াছে। ৫১ এখানে এই মূল অনুমান, যেমন মক্কার বাণিজ্যিক উন্নতি ও সমৃদ্ধির কারণে ব্যক্তিবাদের প্রসার ঘটে, গ্রহণযোগ্য নহে। আবার ব্যক্তিবাদের জন্য মক্কার গোত্র সংহতিতে ফাটল ধরে এবং মুরু'আর (ব্যক্তিত্বের) পুরাতন আদর্শ অবক্ষয়ের মুখে পড়ে, এই দাবিও উল্লিখিত কারণেই গ্রাহ্য নহে।
প্রথমত, বৈষয়িক স্বার্থের অভিন্ন কারণ জনিত ঐক্যবোধের ফলে আহলাফ ও মুতায়্যাবূনকে দুই তরফে তাহাদের বিরোধ মিটাইয়া সমঝোতা করিতে হইয়াছে বলিয়া ওয়াট সঠিকভাবেই উল্লেখ করিয়াছেন। যদি একই ধরনের উপলব্ধি কুরায়শ গোত্রগুলিকে বদরের যুদ্ধে পরাজয় বরণের পর "কোয়ালিশন সরকার" গঠনে বাধ্য করিয়া থাকে তাহা হইলে "নূতন বিষয়" অবশ্য কোনভাবেই ওয়াটের ধারণার মত "কৌতূহলোদ্দীপক" হইতে পারে না। প্রায় এক শতকের কালপরিক্রমায় দুইটি ঘটনা ঘটে। ইহার একটি হইল মহানবী -এর ৫২ বৎসর বয়সে বদরের যুদ্ধ। তিনি যখন জন্মগ্রহণ করেন তখন তাঁহার পিতা আবদুল্লাহ্র বয়স ছিল আনুমানিক ২৫ বৎসর। আবদুল্লাহ যখন জন্মগ্রহণ করেন তখন তাঁহার পিতা আবদুল মুত্তালিব ইন্ন হাশিমের বয়সও অনুরূপভাবে ২৫ বৎসরের মত। হাশিমের যৌবনকালে আহলাফ ও মুতায়্যাবৃনের মধ্যে আপোষ নিষ্পত্তি হয়। এই বিষয়টিও উপেক্ষার নহে যে, কুরায়শদের বাণিজ্য প্রয়াসের সম্প্রসারণ ঐ সমঝোতা বা নিষ্পত্তির ঘটনার পরও প্রধানত হাশিমের বিচক্ষণ নীতি ও নেতৃত্বের সুবাদে ঘটে। অভিন্ন বৈষয়িক স্বার্থভিত্তিক ঐক্যবোধ কিংবা বলা যায়, ওয়াট যে সাধারণ কাণ্ডজ্ঞানের কথা বলিয়াছেন উহা মহানবী -এর আমলের কোন নূতন ঘটনা নহে কিংবা উহার উৎপত্তি বাণিজ্যিক বিকাশ হইতেও ঘটে নাই। এই ধরনের সাধারণ জ্ঞান কিংবা বাস্তবতাবোধ সাধারণত আরবজাতি, বিশেষত কুরায়শদের মত কঠিন ও মরু পরিবেশে বসবাসকারী লোকজনের বৈশিষ্ট্য।
দ্বিতীয়ত, অভিন্ন বৈষয়িক স্বার্থজনিত ঐক্যবোধ হাশিমের আমলে ও বদরের যুদ্ধের পরেও কুরায়শদের মধ্যে বিরাজমান ছিল। এই কারণে ইহা আদৌ যুক্তিসঙ্গত নহে যে, একই কুরায়শ গোত্রগুলি আন্তর্জাতিক ব্যবসায়-বাণিজ্যের ছোটখাটো বিষয় লইয়া মক্কায় তাহাদের পারস্পরিক দ্বন্দ্ব-কলহ অব্যাহত রাখিবে ও এই বিরোধ বিদেশী রাষ্ট্রের দরবারে ও বেদুঈন গোত্রগুলির সমীপে উত্থাপন করিবে। অভিন্ন বৈষয়িক স্বার্থের অভিন্ন চেতনা নিশ্চয়ই তাহাদের এই ধরনের বিবাদ-বিরোধে লিপ্ত হইবার অপরিণামদর্শিতা সম্পর্কে হুঁশিয়ার করিয়া দিবে। ইতিমধ্যেই উল্লেখ
হযরত মুহাম্মাদ (স) ১৩৯ করা হইয়াছে যে, নিজেদের গোত্রস্বার্থের বিরুদ্ধে যাইয়া কোন কুরায়শ গোত্র কখনও কোন বিদেশী শক্তি বা কোন বেদুঈন গোত্রের সহিত কোনরূপ বাণিজ্যিক বা সামরিক চুক্তি করিয়াছে এমন কোন নজির নাই।
তৃতীয়ত, ব্যবসায়ে অংশীদারির বেলায় অনেক সময় গোত্র সম্পর্ক উপেক্ষিত হইয়াছে, এমন কথা বলা এবং ব্যক্তিবাদের বিকাশের বেলায় ইহার দৃষ্টান্ত দিয়া ওয়াট একটি মৌলিক ভুলের ধাঁধাঁয় বৃথাই শ্রম ও সময় অপচয় করিয়াছেন বলিয়া মনে হয়। মনে হয় তিনি বলিতে চাহেন যে, এই ঘটনার আগে কুরায়শদের ব্যবসায়িক কার্যকলাপ গোত্র সম্পর্ক-পরস্পরা ভিত্তিতে অনুষ্ঠিত হইত। কিন্তু উহা বাস্তবিকপক্ষে কখনও ঘটে নাই। কুরায়শ উপজাতি বা গোত্র কখনও এমনভাবে ব্যবসায় কার্য পরিচালনা করিয়াছে বলিয়া দেখা যায় না। তাহারা ব্যবসায় করিয়াছে গোত্রের সদস্য ও ব্যক্তি হিসাবে, তাহাদের গোত্রের নামে বা পক্ষে নহে। আন্তর্জাতিক ও অভ্যন্তরীণ উভয় প্রকার বাণিজ্যের ক্ষেত্রেই ইহা প্রযোজ্য। বিদেশগামী একটি বাণিজ্য কাফেলায় কয়েকজন ব্যবসায়ী অন্তর্ভুক্ত থাকিত। আর তাহারা বলিতে গেলে প্রায় সকল ক্ষেত্রেই হইত বিভিন্ন গোত্রের লোক, যাহাদের সঙ্গে থাকিত পরিবারবর্গ ও অন্যান্য সাজ-সরঞ্জাম। এই কাফেলাকে কেবল এই ধারণাতেই কোম্পানি বলা যায় যে, ইহা ছিল ব্যবসায়ীদের একটা সাহচর্যবিশেষ, যাহা আর যাহাই হউক তাহাদের নিজ নিজ ব্যক্তিগত মূলধনের মিলিত পুঁজির ধারণা ভিত্তিক কোন যৌথ মূলধনী সংস্থা নহে, বরং এই কাফেলাকে একত্রে ভ্রমণের যৌথ উদ্যোগ বলা চলে, যাহাতে নিরাপত্তা পাওয়া যায় ও অন্যান্য সুবিধাও পাওয়া যায়। বাস্তবিকপক্ষে প্রতিটি ব্যবসায়ী ব্যক্তি তাহার নিজ মূলধন দিয়া ব্যবসায় করিত এবং সেইসাথে তাহাদের ব্যবসায়ে অনুপস্থিত অংশীদারের মূলধন লইয়াও তাহারা ব্যবসায় করিত। যেমন বিভিন্ন গোত্রের ব্যক্তিবিশেষে বিবাহের ভিত্তিতে মৈত্রী বা আঁতাত গড়িয়া উঠিতে পারে, তেমনি একইভাবে তাহারা অংশীদারি ব্যবসায়েও চুক্তিবদ্ধ হইতে পারে, হইয়াও থাকে। আর তাহা গোত্রগত মৈত্রী ক্ষুণ্ণ না করিয়াও সম্ভব। বিষয়টি নূতন কোন কিছু নহে এবং তাহাতে গোত্রসম্পর্ক ক্ষুণ্ণ না হইবারও কোন প্রশ্ন উঠিতে পারে না।
চতুর্থত, ওয়াট ল্যামেন্স-এর অনুসরণে স্বার্থপরতা বা কারও নিজ স্বার্থকে অগ্রাধিকার দেওয়ার বিষয়টিকে স্বাতন্ত্রবাদ বলিয়া সবকিছু গুলাইয়া ফেলিয়াছেন। এই ব্যক্তিস্বাতন্ত্রবাদের ব্যাখ্যায় ওয়াট আবূ লাহাবের দৃষ্টান্ত দিয়াছেন। আবু লাহাব তাহার গোত্রের বিরুদ্ধে মহানবী-এর বিরোধিতা করে। উছমান ইবনুল হুওয়ায়রিছ তাহার গোত্রের তুলনায় ভিন্ন অবস্থান গ্রহণ করে এবং প্রথম যাহারা মুসলমান হইয়াছিলেন তাহারা তাহাদের গোত্র বা পরিবারের অসম্মতি সত্ত্বেও তাঁহারা তাঁহাদের ঐ নূতন ধর্মবিশ্বাস গ্রহণ করিয়াছিলেন।
এই ধরনের দৃষ্টান্তগুলি অন্তত একটি বিষয়ে হইলেও গলদপূর্ণ। একদিকে আবু লাহাবের ইসলাম বিরোধিতায় এত বিভ্রান্তিকর ও স্ববিরোধী আচরণ এবং অন্যদিকে প্রথমদিকে যাহারা ইসলাম গ্রহণ করিয়াছিলেন তাহাদের এতখানি নিষ্ঠায় ইসলাম গ্রহণ অভিন্ন কোন বিষয়ের বা একই
১৪০ সীরাত বিশ্বকোষ
ধরনের ব্যক্তিস্বতন্ত্রবাদের কারণে হইতে পারে না। আবু লাহাব ও উছমান ইবনুল হুওয়ায়রিছ যাহা করিয়াছিল নিঃসন্দেহে তাহা আত্মস্বার্থ প্রণোদিত, কিন্তু ইসলাম প্রচারের গোড়ার দিকে যাহারা ইসলাম গ্রহণ করিয়াছিলেন তাহাদের বিচার-বিবেচনা যাহাই হউক না কেন নিশ্চয়ই স্বার্থপরতা বা নিজ বৈষয়িক স্বার্থ দেখার জন্য তাহারা তাহা করেন নাই। এমনকি তাহাদের কাজকে যদি ব্যক্তিবাদের লক্ষণ বলিয়াও ধরা হয় তাহা হইলেও ল্যামেন্স ও ওয়াট যে সংজ্ঞা দিয়াছেন তাহা এই ক্ষেত্রে প্রযোজ্য হইতে পারে না। ইহার উৎস ও প্রেরণা আবশ্যিকভাবে নিশ্চয়ই এমন কিছু যাহা বাণিজ্য বা নূতন অর্থাগমের সহিত সম্পর্কিত ছিল না। অন্য কথায়, তাঁহারা উভয়ে যে ব্যক্তিস্বাতন্ত্রবাদের কথা বলিয়াছেন তাহা স্মরণাতীত কাল হইতে আরবদের মাঝে যে ব্যক্তি স্বাতন্ত্রবাদ অস্তিত্বশীল ছিল উহার সহিত অভিন্ন।
তাই বাণিজ্যিক উন্নতি ও প্রগতি ব্যক্তিবাদের অভ্যুদয় ঘটায় এবং যাহার কারণে গোত্র সংহতি ও মুরু'আর আদর্শ ক্ষুণ্ণ হইয়াছে এবং সেই অবকাশে নূতন ভিত্তিতে জনসমাজের পুনর্গঠনের সুযোগ হইয়াছে বলিয়া যে বক্তব্য দেওয়া হইয়াছে তাহা ভ্রমাত্মক। ঐ ঐতিহাসিক কালপরিক্রমায় যে ব্যক্তিস্বাতন্ত্রবাদ বোধগম্য তাহা আরব উপজাতীয় সমাজের সহজাত প্রকৃতি। ইহা অতি প্রাচীন কাল হইতেই অস্তিত্বশীল। স্বার্থপরতা, কার্পণ্য, ক্রুরতা, অভাবী ও অশক্ত মানুষের ব্যাপারে ঔদাসীন্যের মত দোষ, দানশীলতা, মহানুভবতা, আতিথেয়তা ও বিশ্বস্ততার মত মানবীয় মহৎ গুণাবলী তৎকালের আরব সমাজে পাশাপাশি সহাবস্থান করিয়াছে। তাই গোত্র সংহতির কোন অবক্ষয় যেমন ঘটে নাই, তেমনি সমাজ সংহতি ব্যবস্থার কোন বিকল্প সংস্থান কোন আশু ও বোধগম্য আবশ্যকতাও দেখা দেয় নাই। ইহা ছাড়া "মক্কার অভ্যুদয়ে সেখানে যাযাবর অর্থনীতি হইতে সওদাগরি ও পুঁজিবাদী অর্থনীতির উত্তরণ ঘটিয়াছে" বলিয়া যে বক্তব্য দেওয়া হইয়াছে উহা কার্যত এক জটিল পরিস্থিতির সরলায়ন ও ভ্রমাত্মক উপস্থাপনাবিশেষ। যাযাবর জনসমাজের পাশাপাশি ব্যবসায় কার্যকলাপ ও বাণিজ্যবাদী ব্যবস্থা স্মরণাতীত কাল হইতেই আরবে অস্তিত্বশীল ছিল বলিয়াই দেখা যায়। ৫২ মহানবী-এর শত বৎসর আগে তাঁহার প্রপিতামহের পিতা হাশিম পার্শ্ববর্তী কয়েকটি দেশ ও কিছু বেদুঈন গোত্রের সহিত কয়েক দফায় কয়েকটি বাণিজ্য চুক্তি সম্পাদন করিয়াছিলেন যাহা বাস্তবিকপক্ষেই ছিল উত্তম বাণিজ্যিক ঐতিহ্য ও অভিজ্ঞতার পরিচায়ক। আর ইহাকে যাযাবর জনসামাজিক বৈশিষ্ট্য হইতে কোনক্রমে নূতন বাণিজ্য সমাজে রূপান্তর বুঝায় না।
বাস্তবিকপক্ষে ওয়াট মার্গোলিয়থ ও বেল-এর এই তত্ত্বকে যৌক্তিক প্রতিষ্ঠা দিতে প্রয়াস পাইয়াছেন যে, মক্কার নূতন পরিস্থিতির কারণে সেখানকার পুরাতন সামাজিক ও ধর্মীয় মনোভাব পুনর্বিন্যাসের প্রয়োজন দেখা দিয়াছিল। শুধু ইহাই নহে, গ্রিমে (Grimme) মক্কায় ইসলামের আবির্ভাবের যে সমাজতাত্ত্বিক ব্যাখ্যা দেওয়ার চেষ্টা করিয়াছেন তাহার কিছু উপাদানও ওয়াট তাঁহার বক্তব্যে আত্মস্থ করিবার প্রয়াস পাইয়াছেন। আর এইভাবে ওয়াট প্রয়াস পাইয়াছেন প্রথমদিকে
হযরত মুহাম্মাদ (স) ১৪১
অবতীর্ণ হওয়া কুরআনের আয়াতগুলির সহিত সমসাময়িক পরিস্থিতির ৫৩ একটা সম্পর্ক প্রদর্শন অথবা তিনি যে আর্থ-সামাজিক বিশ্লেষণ দিয়াছেন উহার যৌক্তিকতা প্রদান করিতে।
ওয়াট কেবল ব্যক্তিবাদের বিষয়েরই পুনরুক্তি করেন নাই কিংবা সংহতির অবক্ষয়সহ উহার বিস্তারিত বিশদায়নই করেন নাই, তিনি বরং আরও অগ্রসর হইয়া মন্তব্য করিয়াছেন যে, বাণিজ্যবাদের বিকাশের কারণে মক্কায় একান্ত বিশুদ্ধ অর্থে দারিদ্র্য বৃদ্ধি পাওয়ার সম্ভাবনা কম থাকিলেও "ধনী ও দরিদ্রদের মধ্যে" এবং ধনীদের মধ্যে বা খুব বেশী ধনী নয় বা খুব বেশি গরীব নয় এমন লোকজনের মধ্যে ব্যবধান বৃদ্ধি পায় ৫৪ এবং এই পরিস্থিতির পটভূমিকায় দীন ইসলাম সমাজের একেবারে তৃণমূল পর্যায় তথা সবচেয়ে গরীবদের মধ্য হইতে নহে, বরং মধ্য স্তরের জনগণের সমর্থন লাভ করে। ইহা তাই 'যাহারা বিত্তবান' ও 'যাহারা নিতান্তই বিত্তহীন' ৫৫ তাহাদের মধ্যকার, বরং 'যাহাদের ছিল' ও 'যাহারা প্রায় সচ্ছল' তাহাদের মধ্যকার সংগ্রামের বিষয়। এই বক্তব্য সন্দেহতীতভাবেই মক্কায় ইসলামের আবির্ভাবের কারণ সম্পর্কে গ্রিমে তাঁহার যে সমাজতাত্ত্বিক ব্যাখ্যা দিয়াছেন উহার কথাই স্মরণ করাইয়া দেয়। তবে ওয়াটের বক্তব্যে ইহার ঈষৎ সংশোধন করা হইয়াছে মাত্র। এইসব অবশ্য মহানবী -এর ইসলাম প্রচার মিশনের প্রথম পর্যায়ের অন্তর্ভুক্ত প্রথমদিকে অবতীর্ণ কুরআনের আয়াতগুলির বিষয়বস্তুও। ওয়াটের এই বক্তব্য ও অন্যান্য বিষয় সম্পর্কিত বক্তব্য উল্লিখিত কারণে এই রচনার শেষদিকে আলোচিত হইয়াছে। ৫৬

টিকাঃ
২৪. Watt, M, at M, 3.
২৫. প্রাগুক্ত, পৃ. ১০-১১।
২৬. উপরে দ্র. পৃ. ৯৬, আরও দ্র. Margoliouth, op. cit.. 30-31.
২৭. Watt, M. at M., 4.
২৮. প্রাগুক্ত, পৃ. ৪-৫।
২৯. প্রাগুক্ত, পৃ. ৬-৮।
৩০. প্রাগুক্ত, পৃ. ৮-৯।
৩১. প্রাগুক্ত, পৃ. ৯।
৩২. প্রাগুক্ত, পৃ. ৪।
৩৩. নিম্নে দ্র. পৃ. ১৩৮-১৩৯।
৩৪. নিম্নে দ্র. অধ্যায় ৮, পৃ. ২।
৩৫. Watt. M. at M., 6-8, 14-16.
৩৬. দ্র. অধ্যায় ৯।
৩৭. নিম্নে দ্র. পৃ. ১৩৯-১৪০।
৩৮. নিম্নে দ্র. পৃ. ১৮৯-১৯০।
৩৯. Watt. M. at M., 15-16.
৪০. Watt, M. at M., 16-24.
৪১. প্রাগুক্ত, পৃ. ৭২-৯৬।
৪২. প্রাগুক্ত, পৃ. ১৮।
৪৩. প্রাগুক্ত, পৃ. ১০।
৪৪. প্রাগুক্ত।
৪৫. প্রাগুক্ত, পৃ. ১৯-২০।
৪৬. প্রাগুক্ত, পৃ. ২০-২৩।
৪৭. প্রাগুক্ত, পৃ. ২৩-২৯।
৪৮। প্রাগুক্ত, পৃ. ২৩।
৪৯. প্রাগুক্ত, পৃ. ২০, ২৪, ২৫।
৫০. প্রাগুক্ত, পৃ. ২৭।
৫১. নিচে দ্র. অধ্যায় ১১।
৫২. আমরা এখানে প্যাট্রিসিয়া ক্রোনির তত্ত্বটির বিষয় আবার স্মরণ করিতে পারি। তিনি উহাতে বলিয়াছেন, আরবের বাণিজ্যিক কার্যকলাপের যে প্রাচীন বিবরণ পাওয়া যায় উহা ইসলামের আবির্ভাবের আনুমানিক ছয় শত বৎসর আগের।
৫৩ Watt. M. at M., 72-96.
৫৪. প্রাগুক্ত, পৃ. ৭২।
৫৫. প্রাগুক্ত, পৃ. ৯৬।
৫৬. দ্র. অধ্যায় ২৪।

লিঙ্ক শেয়ার করুন
close

লিঙ্ক কপি করুন

0:00
0:00