📘 সীরাত বিশ্বকোষ > 📄 (ক) মুইর (Muir) -এর অভিমত পর্যালোচনা

📄 (ক) মুইর (Muir) -এর অভিমত পর্যালোচনা


(ক) মুইর (Muir)-এর অভিমত পর্যালোচনা
ওল্ড টেস্টামেন্টে (বাইবেলের পুরাতন নিয়ম) সন্নিবেশিত তথ্যের ভিত্তিতে মুইর বলেন, ইবরাহীম ('আ) যখন হাজেরাকে ফেলিয়া আসেন তখন হাজেরা ও তাঁহার পুত্র আরবের উত্তরে পারান নামে এক নির্জন এলাকায় বাস করিতেন। ১৬ তিনি আরও বলেন যে, “ইসমাঈলের প্রতি পার্থিব সমৃদ্ধির যে ঐশী ওয়াদা করা হইয়াছিল তাহা পূর্ণ হয়। তাঁহার ১২ পুত্র ১২ জন রাজ্যশাসক তথা রাজা হন। আর তাঁহার বংশধরগণ অসংখ্য গোত্রের প্রতিষ্ঠা করে। ইসমাঈলের বংশের এইসব গোত্র, ইবরাহীম ('আ)-এর অন্যান্য গোত্র ও সমান্তরাল গোত্রসমূহ, মুইরের বর্ণনামতে, লোহিত সাগরের শেষ প্রান্ত হইতে ফোরাত নদীর মোহনা অবধি বিস্তৃত উত্তর আরবে বাস করিত”। ১৭ তিনি অবশ্য স্বীকার করিয়াছেন যে, ইবরাহীম ('আ)-এর ঐতিহ্য এবং তাহার কা'বাঘর নির্মাণের সহিত জড়িত কাহিনী ইসলামের অভ্যুদয়ের অনেক আগেই আরবদের মাঝে ব্যাপকভাবে গৃহীত হইয়াছিল। ১৮ তবে তাহার অভিমত এই যে, ইবরাহীম ('আ)-এর ঐতিহ্য ইসলামের আবির্ভাবের আগে প্রচলিত থাকিলেও তাহা প্রকৃত প্রস্তাবে, তাহার মতে, ইবরাহীম ('আ)-এর অনেক পরে প্রচলন লাভ করে। এই প্রসঙ্গে মুইর উল্লেখ করিয়াছেন যে, উত্তর ও মধ্য আরবের গোত্রগুলির একটা বড় অংশের উৎপত্তি ইবরাহীম বা তৎসংশ্লিষ্ট বংশ হইতে হইলেও তাহাদের ইতিহাস নির্ণয়ের জন্য ইবরাহীম ('আ)-এর সময় হইতে ২০০০ বছরের সময়ের কোন প্রামাণ্য উপকরণের অস্তিত্ব নাই। ১৯ আর তাই উহার পর তিনি তাহার নিজস্ব অনুমানমূলক বিবরণ প্রদানে মনোনিবেশ করিয়াছেন। ২০
তাঁহার অনুমান-কল্পনামূলক 'বাস্তব তথ্যাদি' নিম্নরূপ: তিনি বলেন, মক্কায় অনেক আগেকার বসতকারী ছিল। তাহাদের অনেকে ইয়ামানের লোক। তাহারা সাবীয় ধর্মবিশ্বাস সঙ্গে লইয়া আসে। তাহারা পাথর ও মূর্তিপূজা করিত। আর এগুলিকে যমযম কূপের সহিত সম্পর্কিত করা হয়। কেননা এই যমযমই ছিল তাহাদের সমৃদ্ধি ও শ্রীবৃদ্ধির উৎস। এই যমযমের নিকট তাহারা তাহাদের উপাসনালয় কা'বাঘর প্রতিষ্ঠা করে। সাবীয় মতবাদের প্রতীক হিসাবে কা'বাঘরের সহিত রহস্যঘেরা কৃষ্ণপ্রস্তর বা হাজারে আসওয়াদকে সম্পর্কিত করা হয়। ইহার সহিত উপর হইতে স্থানীয় আচার-রীতিগুলি আরোপিত হয়। কিন্তু এই ব্যবস্থার স্বাভাবিক উপাদানগুলি আসে আরব সভ্যতার লালনভূমি ইয়ামান হইতে। ২১ পরে উত্তরাঞ্চল হইতে নাবাতীয় বা ইসমাঈলী কোন সমান্তরাল গোত্র যমযম কূপ ও বাণিজ্য কাফেলার অবস্থানের অনুকূল হওয়ার কারণে আকৃষ্ট হইয়া মক্কায় বসতি স্থাপন করে। এই গোত্রটি তাহাদের কাফেলায় ইবরাহীম ('আ)-এর কিংবদন্তী লইয়া
হযরত মুহাম্মাদ (স) ৯৫
আসিয়া তাহা স্থানীয় পর্যায়ে প্রচলিত সংস্কার ও প্রথার সহিত জুড়িয়া দেয়। "আর ইহা হইতেই উৎপত্তি হয় কা'বায় মিশ্র ধরনের নানা দেবদেবীর পূজার এবং উহার সহিত ইসমাঈলী নানা কিংবদন্তী ও রীতিরও মিশ্রণ ঘটে। ইহারই বিরাট সুযোগ গ্রহণ করেন মুহাম্মাদ (ম্যাহোমেট)। ২২
এই 'কল্পিত ধারণার' সমর্থনে মুইর আরও বেশ কিছু অনুমান যোগ করিয়াছেন। তিনি বলেন যে, আরবে ইবরাহীম ('আ)-এর ঐতিহ্য ব্যাপক পর্যায়ে ও সর্বজনীনভাবে অস্তিত্বশীল ছিল। তবে ইবরাহীম ('আ)-এর সেই সুপ্রাচীন আদর্শ আরবদের কাছে হস্তান্তরিত হওয়ার কোন স্বতন্ত্র ও অনাপেক্ষ প্রমাণাদি কোন বিশেষ গোত্র বা কোন গোত্রের সহিত সম্পর্কিত গোত্রসমূহের মধ্যেও পাওয়া যায় না। তাই ইবরাহীমের ঐতিহ্য আরবদের হাতে আসার কোন 'সম্ভাবনা দেখা যায় না'। তাহার মতে, বরং এরকম হওয়ার সম্ভাবনাই বেশি যে, ইবরাহীম ('আ)-এর ঐতিহ্য ইয়াহূদীদের নিকট হইতে পরিগ্রহণ করা হয় এবং তাহাদের সঙ্গে মাঝে মাঝে যোগাযোগ রক্ষার মাধ্যমে এই ঐতিহ্যকে সঞ্জীবিত রাখা হয়। ২৩
তিনি এরকম মত প্রকাশ করার পরপরই বলেন যে, কা'বার প্রতি এত ব্যাপক ধর্মীয় শ্রদ্ধা প্রদর্শনের বিষয়টি হইতে মনে হয়, নিশ্চয় ইহার সূচনা হইয়াছিল অতি প্রাচীন যুগে। তাই ইহাও বলিতে হয় যে, মক্কার ধর্মীয় উপাসনার সহিত সম্পর্কিত অন্যান্য রীতি-ঐতিহ্যও, যেমন কা'বা, উহার কৃষ্ণ প্রস্তর, কা'বাগৃহের একান্ত পবিত্র এলাকার সীমা (হারাম) ও পবিত্র মাস অনুরূপভাবে প্রাচীন। ২৪
ইহার পর তিনি কা'বার ও কা'বা সম্পর্কিত আচার-রীতির সুপ্রাচীনত্ব প্রমাণের প্রয়াসে গ্রীক ঐতিহাসিক হেরোডোটাসের বরাত দিয়াছেন। হেরোডোটাস (৫ম খৃ. পূর্বাব্দ) আরবদের দেবীদের মধ্যে প্রধান দেবীর নাম আলিলাত বা আল-লাত বলিয়া উল্লেখ করিয়াছেন। অর্থাৎ সেই সুপ্রাচীন যুগেও আরবে উহা পূজা-উপাসনার এক জোরদার প্রমাণ। আলীলাত ছিল মক্কার দেবী। ২৫ অতঃপর মুইর গ্রীক লেখক ডিওডোরাস সিসিলাসের বরাত দিয়াছেন। তিনি ১ম খৃস্ট পূর্বাব্দে লেখেন যে, আরবে 'একটি মন্দির ছিল যে মন্দিরের প্রতি সকল আরব বিশেষ শ্রদ্ধাবান'। মুইর এই বিষয়ে বলেন, এই মন্দির অনিবার্যভাবেই কা'বাগৃহ। কেননা "আমাদের এমন আর কোন মন্দিরের কথা জানা নাই যাহার বিষয়ে সকল আরব সর্বজনীনভাবে শ্রদ্ধা পোষণ করে। ২৬ পরিশেষে মুইর বলিতে চাহিয়াছেন যে, মূর্তিপূজা আরবে ছিল সুপ্রাচীন ও ব্যাপক পরিসরে বিস্তৃত বিষয়। তিনি ইব্‌ন্ হিশামের (ইবন ইসহাকের) বরাত দিয়া উল্লেখ করিয়াছেন যে, ইয়ামান হইতে দূমা (দূমাতুল জানদাল) অবধি আরবের বিভিন্ন স্থানে, এমনকি হীরা অবধি বিক্ষিপ্তভাবে মূর্তিপূজার জন্য নিবেদিত মন্দিরের অস্তিত্ব ছিল। এই মন্দিরের কতকগুলি ছিল কা'বার অধস্তন মন্দির এবং এইসব মন্দিরের ধর্মীয় আচার-রীতিও ছিল মক্কার অনুরূপ। ২৭
মুইর এইসব বাস্তব তথ্য ও যুক্তির ভিত্তিতে বলেন, "আরবদের সংস্কার-সংস্কৃতির মৌলিক উপাদানগুলিতে ইবরাহীম ('আ)-এর ঐতিহ্যের চিহ্ন পাওয়া যায় না। কৃষ্ণ প্রস্তরে চুম্বন, কা'বাঘর
৯৬ সীরাত বিশ্বকোষ
প্রদক্ষিণ এবং মক্কা, আরাফাতের ময়দান ও মিনায় পালনীয় অন্যান্য আচার-অনুষ্ঠান, পরিত্র এলাকা বা হারাম শরীফের মাহাত্ম্য ইত্যাদির সহিত ইবরাহীম ('আ)-এর ঐতিহ্যের কোন কল্পনাযোগ্য যোগসূত্র পাওয়া যায় না কিংবা তাঁহার বংশধরদের তাঁহার নিকট হইতে উত্তরাধিকার সূত্রে যাহা কিছু পাওয়ার সম্ভাবনা উহার সহিতও মক্কার উল্লিখিত আচার-রীতির সম্পর্ক লক্ষ্য করা যায় না। তাহার মতে, এইগুলি স্থানীয় রীতি-আচার কিংবা আরব উপদ্বীপের দক্ষিণাঞ্চলে বিদ্যমান মূর্তিপূজার পদ্ধতির সহিত সম্পর্কিত। এইগুলি বনূ জুরহুম বা অন্যরা তাহাদের সঙ্গে করিয়া মক্কায় লইয়া আসে, আর সেই সময়ে ইবরাহীম ('আ)-এর ঐতিহ্য দেশজ উপাসনার সহিত জুড়িয়া দেওয়া হয় এবং সেই সময় হইতে প্রথমবারের মত মক্কায় কুরবানীর আচার-রীতি ও অন্যান্য অনুষ্ঠান প্রবর্তিত হয়। কিংবা বলা যায়, এইভাবেই ইবরাহীম ('আ)-এর স্মৃতি বিজড়িত বিষয়াদি কোন না কোনভাবে মক্কাবাসীদের ধর্মাচরণের সহিত সম্পর্কিত হয়। ২৯ এইভাবে মক্কায় এই ধারাটি কায়েমি হইয়া যাওয়ার পর মক্কার বাণিজ্যিক গুরুত্বের কারণে মধ্য আরবের বেদুইনগণ মক্কা অঞ্চলের প্রতি আকৃষ্ট হয়। আর ক্রমে ক্রমে এই ঐতিহ্যগুলি ও স্থানীয় সংস্কারগুলিও জাতীয় বৈশিষ্ট্য হিসাবে গণ্য হয়। অবশেষে এই ধারা আরবের ধর্মে পরিণত হয়। ৩০ পরিশেষে মুইর এই মত প্রকাশ করেন যে, মহানবী কেবল এই 'অভিন্ন ক্ষেত্রে' অবস্থান লইয়া আরবদের ব্যাপক উপাসনার সাথে ইসরাঈলের বিশুদ্ধ আস্তিক্যবাদের মধ্যে একটি সংযোগসূত্র রচনা করেন। আর এই প্রক্রিয়ায় কা'বার ধর্মীয় আচার-রীতি বহাল রাখিয়া তাহা হইতে মূর্তি উপাসনার সকল প্রবণতা বিচ্ছিন্ন করিয়া দেওয়া হয়। ৩১
স্পষ্টত মুইরের এই তত্ত্ব চারটি অনুমানের ভিত্তিতে প্রতিষ্ঠিত। যেমন (ক) বহু ঈশ্বরবাদ ও বহু ঈশ্বরবাদী ধর্মীয় আচার-রীতি ইসমাঈলী গোত্রগুলি মক্কায় আসার বহু আগে হইতেই সেখানে অস্তিত্বশীল ছিল; (খ) কা'বাঘরও ইহার সহিত সম্পর্কিত ধর্মীয় আচার-রীতিগুলি বহু ঈশ্বরবাদী ও সেগুলি মূলত দক্ষিণ আরব হইতে আসিয়াছে যেগুলির কোন সম্পর্ক ইবরাহীম ('আ)-এর ঐতিহ্যের সহিত আছে বলিয়া কল্পনা করা যায় না; (গ) একটি ইসমাঈলী অভিবাসী গোত্রই ইবরাহীম ('আ)-এর ঐতিহ্য কা'বার রীতির উপর আরোপ করিয়াছে এবং (ঘ) ইহার পর এই সংমিশ্রিত ধর্মীয় প্রথাকে আরবরা তাহাদের জাতীয় ধর্ম হিসাবে গ্রহণ করিয়াছিল।
মুইর যেসব বাস্তব তথ্য ও যুক্তি-তর্কের সমাবেশ করিয়াছেন সেগুলি অবশ্য তাহার তত্ত্বের এই চারটি অনুমানের সমর্থক নয়। প্রথম অনুমানটির ব্যাপারে মুইর তিনটি বাস্তব তথ্যের উল্লেখ করিয়াছেন। প্রথমত তিনি বলিয়াছেন, ৫ম খৃস্ট-পূর্বাব্দের গ্রীক ঐতিহাসিক হেরোডোটাস বর্ণিত আরবীয় দেবী আল-ইলাত (Alilat)-এর উল্লেখ কবিয়াছেন। মুইর বলিয়াছেন, হেরোডোটাস সুনির্দিষ্টভাবে মক্কার কথা বলেন নাই। তাহার মতে, আল-ইলাত দেবী এবং মক্কার (প্রকৃতপক্ষে তায়েফের) সুপরিচিত দেবী আল-লাত মূলত একই দেবী। এখানে বিশেষ মনোযোগ আকর্ষণের দাবি রাখে এই মর্মে যে, হেরোডোটাস প্রকৃতপক্ষে উত্তর আরব প্রসঙ্গে ঐসব উক্তি করিয়াছেন।
হযরত মুহাম্মাদ (স) ৯৭
আর যদি তাহার ঐ বিবরণকে মোটামুটি গোটা আরব উপদ্বীপ সম্পর্কিত বলিয়া ধরিয়াও লওয়া হয় এবং আল-লাত একই দেবী বলিয়া গ্রহণও করা হয় তাহা হইলেও সেই ক্ষেত্রে আমাদেরকে খৃস্ট-পূর্ব পঞ্চম শতকে ফিরিয়া যাইতে হয়। ইহার অর্থ মুইরের স্বীকারোক্তি অনুযায়ী এই সময়টি ইবরাহীম ('আ)-এর ১৫০০ বৎসর পরের।
মুইরের দ্বিতীয় বাস্তব তথ্য অনুযায়ী, খৃস্টপূর্ব প্রথম শতাব্দীর লেখক ডিওডোরাস সিসিলাস আরবদের সর্বজনীনভাবে পূজনীয় এক "মন্দিরের" কথা বলিয়াছেন। মুইর সঠিকভাবেই এই মন্দিরটিকে কা'বাঘর বলিয়াছেন। কিন্তু সিসিলাসের এই সাক্ষ্য কালের বিচারে আমাদিগকে আরও পিছনে লইয়া গিয়াছে অর্থাৎ আমরা খৃস্টপূর্ব প্রথম শতকে উপনীত হইয়াছি।
মুইরের তৃতীয় বাস্তব তথ্য এই যে, বহু ঈশ্বরবাদ ও বহু ঈশ্বরবাদী মন্দিরগুলি গোটা আরবের বিভিন্ন স্থানে ছড়াইয়া ছিল। তাহার এই বাস্তবতা উল্লেখের সূত্র হইল ইবন হিশাম (প্রকৃতপক্ষে ইবন ইসহাক)। এখানে উল্লেখ আবশ্যক যে, ইবন হিশাম তথা ইবন ইসহাক মহানবী -এর আবির্ভাবের আগেকার আমলের বিরাজমান অবস্থার বর্ণনা দিয়াছেন। ইবন ইসহাক বা অন্য কোন প্রামাণ্য সূত্র প্রচ্ছন্ন অর্থেও ইহা বলিতে চাহেন নাই যে, জাহিলিয়্যা পরিস্থিতি স্মরণাতীত কাল হইতে বিরাজমান ছিল। তাই মুইরের উল্লিখিত কোন বাস্তব তথ্যই আমাদেরকে পঞ্চম শতাব্দীর পূর্বে লইয়া যাইতে পারে না। এই কথাও বলা যায় না যে, মক্কায় ইসমাঈলী গোত্রসমূহের অভিবাসী হওয়ার যে কথা উল্লেখ করা হয় তাহা এত পরে অর্থাৎ পঞ্চম খৃষ্ট-পূর্বাব্দের মত সময়কালে বা উহার আরও পরে ঘটে। মুইর নিজে স্বীকার করিয়াছেন যে, ইসমাঈল ('আ)-এর অন্যতম পুত্র কেদারের বংশধররা উত্তর ও মধ্য আরবে সংখ্যায় এতই বিপুল হইয়া উঠে যে, ওল্ড টেস্টামেন্টে কথিত ইয়াহুদীরা ঐসব অঞ্চলের আরব গোত্রগুলিকে সাধারণত কেদারীয় বলিয়া উল্লেখ করিত। ৩২
আধুনিক সমালোচকদের মতে, খৃষ্টপূর্ব পঞ্চম শতকের পরে লেখা নয়, এমন অস্তিত্বশীল ও ওল্ড টেস্টামেন্টে বলা হইয়াছে, জাহিলিয়্যা পরিস্থিতি মক্কাসহ মধ্য ও উত্তর আরবে পূর্ব হইতেই বহু কাল ধরিয়াই বিরাজমান ছিল। তাহাদের মতে, ঐসব অঞ্চলে অপেক্ষাকৃত সাম্প্রতিক কালে ইসমাঈলী গোত্রগুলির ছড়াইয়া পড়ার সময় হইতে এই পরিস্থিতি দেখা দেয় নাই। ইসমাঈলী গোত্রগুলি তাই বলা যায় যে, অবশ্যই তাহারা খৃস্টপূর্ব পঞ্চম শতাব্দীর আগেই মক্কায় বসতি স্থাপন করিয়াছিল।
মুইরের দ্বিতীয় অনুমান ছিল, 'কা'বাঘর ও কা'বার ধর্মীয় আচার-রীতিগুলি বহু ঈশ্বরবাদী। মক্কার অধিবাসীরা মূলত দক্ষিণ আরব বা ইয়ামানের লোক। ইবরাহীম ('আ)-এর সহিত তাহাদের কোন যোগসূত্র নাই'। বিষয়টি কল্পনাও করা যায় না। কিন্তু তাহার এইসব ধারণা সঠিক তো নয়ই, বরং বিভ্রান্তিকরও বটে। কা'বা ও ইহার ধর্মীয় রীতি-আচরণ মুইরের মত অনুযায়ী অবশ্যই সুপ্রাচীন। ইহা সন্দেহাতীত। তিনি এই বিষয়টির প্রতি গুরুত্ব আরোপ করিয়াছেন। কিন্তু তাই
৯৮ সীরাত বিশ্বকোষ
বলিয়া উহাতে ইহা প্রমাণিত হয় না যে, কালের দিক হইতে কা'বাঘর ও উহার ঐতিহ্য ইবরাহীম ('আ)-এর পূর্বের কিংবা এগুলির আদি উৎপত্তি দক্ষিণ আরবে। কা'বার আদি উৎস দক্ষিণ আরবে ইহা প্রমাণের জন্য তিনি কোন সাক্ষ্য-প্রমাণও পেশ করেন নাই। যদি ইয়ামানে অস্তিত্বশীল কোন কিছুর অনুকরণে কা'বা ও উহার রীতিসমূহের প্রতিষ্ঠা ঘটিয়াই থাকিত, তাহা হইলে সেক্ষেত্রে মূল মন্দিরের অন্তত কিছু নিদর্শন দৃষ্টিগোচর হইত কিংবা প্রাচীন বিবরণে উহার উল্লেখ থাকিত। আর উহা সত্য হইয়া থাকিলে গোড়ার দিকে মন্দিরটির গুরুত্ব ও মর্যাদা মক্কার কথিত অনুকরণমূলক কা'বাঘর অপেক্ষা অনেক বেশি হওয়ার কথা। কিন্তু এরকম প্রাচীন ও মাহাত্ম্যসম্পন্ন কোন মন্দিরের অস্তিত্ব ইয়ামান কিংবা আরবের অন্যত্র কোথাও ছিল বলিয়া কোন সূত্রে, এমনকি প্রাচীন গ্রীক লেখকদের লেখা হইতেও জানা যায় না।
ডিওডোরাসের লেখায় যেসব সাক্ষ্য-প্রমাণ রহিয়াছে সেগুলিতে ফিরিয়া আসি। তিনি আরবে সর্বজনীন পর্যায়ে মান্য ও শ্রদ্ধাভাজন একটিমাত্র মন্দিরের কথাই বলিয়াছেন। ইহার মত বা ইহা অপেক্ষা মর্যাদাবান ও শ্রেষ্ঠতর মন্দিরের কথা তিনি বলেন নাই। ইসলামের অভ্যুদয়ের প্রাক্কালে গোটা আরব জুড়িয়া বিভিন্ন স্থানে মূর্তিপূজা ভিত্তিক কয়েকটি মন্দিরের অস্তিত্ব ছিল। ইবন ইসহাক এইসব মন্দিরের বর্ণনা দিয়াছেন। মুইরও এইসব মন্দিরের কথাই বলিয়াছেন। এইগুলির মধ্যে আব্রাহার ইয়ামানী 'কা'বা'ও রহিয়াছে। তবে এইসব মন্দিরের সবগুলিই মক্কার কা'বাঘরের পরবর্তী কালে ও মক্কার কা'বার অনুকরণেই প্রতিষ্ঠিত হয় ইহার পরে, পূর্বে নহে। মুইর তাই স্পষ্টত ঘোড়ার আগে গাড়ি জুড়িয়া দিয়াছেন এই মর্মে মনোযোগ আকর্ষণ করিয়া যে, মক্কার কা'বা মূলত ঐসব মন্দিরেরই অন্যতম মন্দির। কিন্তু এত কিছুর পরও তিনি স্বীকার করিতে বাধ্য হইয়াছেন যে, ঐসব মন্দির ছিল কা'বার অধস্তন প্রতিষ্ঠান। আর উহাদের "ধর্মীয় আচার-অনুষ্ঠানের রীতিও মক্কার আচার-অনুষ্ঠানের অনুরূপ”।
বাস্তবিকপক্ষে এইসব মন্দিরের কোনটিই কা'বা ঘরের তুলনায় প্রাচীন নহে। আর আরবরাও মনে করে না যে, এইসব মন্দিরের কোনটি কা'বার সমান প্রাচীনত্ব এবং মর্যাদা ও মাহাত্ম্যের দাবিদার। এই বাস্তবতাই এই বিষয়টি প্রমাণ করে যে, মন্দিরগুলি আসলে কা'বার অনুকরণে স্থাপন করা হইয়াছিল, মন্দিরগুলি দেবদেবীর অধিষ্ঠাস্থল হিসাবে স্থাপন করা হইয়াছিল এবং মন্দিরগুলির দেবদেবীও স্বাভাবিক কারণেই মক্কার কা'বায় ইতোমধ্যে প্রতিষ্ঠিত দেবদেবীরই অনুরূপ ছিল। এই মন্দিরগুলির অনুকরণ করিয়া কা'বায় দেবমূর্তি স্থাপন করা হয় নাই। ইবন ইসহাক ও অন্যান্য লেখকের এই বিষয়ের বিবরণেও এরূপ পরিষ্কার উল্লেখ রহিয়াছে।
বহুকাল আগে হইতেই আরবের চতুর্দিকের দেশগুলিতে মূর্তিপূজা প্রচলিত ছিল, সে বিষয়ে কোন সন্দেহ নাই। কিন্তু তাই বলিয়া কা'বাঘর মূলত মূর্তিপূজামূলক একটি মন্দির ছিল বলিয়া মূইর যে দাবি করিয়াছেন উহা প্রমাণ করিতে হইলে আরও যে কিছু আনুষঙ্গিক সাক্ষ্যপ্রমাণ দরকার—মুইর তাহা উপস্থাপন করেন নাই। তিনি যাহা করিয়াছেন তাহা কেবল আমাদেরকে
হযরত মুহাম্মাদ (স) ৯৯
পুনরায় সেই খৃষ্টপূর্ব পঞ্চম শতাব্দীতে লইয়া গিয়াছে যাহা নূতন কিছু নহে। ইহা করিয়াই তিনি প্রচ্ছন্ন অর্থে বলিতে পারেন না যে, কা'বাঘর পঞ্চম খৃস্ট-পূর্বাব্দ বা এরকম সময়ে নির্মিত হইয়াছিল।
মুইর স্বীকার করিয়াছেন যে, আরবের ইসমাঈলী গোত্রগুলি আগে হইতেই "আল্লাহ সম্পর্কে অবগত” ছিল। আসলেও এইসব জ্ঞান তাহাদের ছিল। আগেই উল্লেখ করা হইয়াছে যে, ইসমাঈলী গোত্রগুলি ব্যাপকভাবে মূর্তিপূজায় লিপ্ত হইলেও তাহারা বিশ্বের সর্বোচ্চ প্রভু হিসাবে আল্লাহকে ভুলিয়া যায় নাই। ইহাও লক্ষ্য করিবার মতো বিষয় যে, যুগ-যুগান্তর ধরিয়া আরবরা কা'বা ঘরকে বায়তুল্লাহ বা আল্লাহ্র ঘর বলিয়াই সম্বোধন করিয়াছে। অন্য সব ধর্মস্থল বা মন্দির একেক নির্দিষ্ট দেবদেবীর নামে উৎসর্গীকৃত হইলেও, যেমন আল-লাত, আল-উয্যা, আল-ওয়াদ্দ-এর মন্দির বলিয়া অভিহিত করিলেও, কা'বাগৃহ কখনও কোন দেবতা বা দেবীর নামে সম্বোধিত হয় নাই। এমনকি কুরায়শদের গোত্র-দেবতা হুবালের নামেও কা'বাকে কখনও সম্বোধন করা হয় নাই। কা'বা যদি আদিতে সত্যই কোন দেব-দেবীর নামে নির্মিত হইত তাহা হইলে কা'বা শরীফের সহিত ঐ দেব বা দেবীর নাম জড়িত থাকিত। ইহা ধরিয়া লওয়া যায় না যে, ইসমাঈলী গোত্রগুলি পরবর্তী কালে যে সময়ে কা'বা 'মন্দির' ও কা'বার রীতি-বিশ্বাসের উপর ইবরাহীম ('আ)-এর রীতি-বিশ্বাস ও ঐতিহ্যকে চাপাইয়া দিয়াছে তখন সেই দেব বা দেবীর নাম মুছিয়া ফেলা হইয়াছে। যখন ইবরাহীম ('আ)-এর ঐতিহ্যের সহিত কা'বার কথিত সমন্বয় করা হয় তখনই কা'বা সম্পর্কিত মূর্তির নামও জুড়িয়া দেওয়াই হইত বরং যুক্তির দিক হইতে অধিকতর সামঞ্জস্যপূর্ণ।
কা'বার মূর্তিপূজার সহিত সম্পর্কিত কথিত আদি পরিচয় প্রমাণ করার প্রয়াসে মুইর বলিয়াছেন যে, 'আরবের স্থানীয় বিশ্বাস ও সংস্কার ছিল সাবায়ী। তাহারা মূর্তি ও জোতিষ্ক বা নক্ষত্র পূজা করিত। আর এইসবই মক্কার ধর্মের সহিত সম্পর্কিত'। ৩৩ ইহা অত্যন্ত বিভ্রান্তিকর বক্তব্য। মুইর আরবের যে ধর্মীয় পদ্ধতির কথা বলিয়াছেন তাহা অবশ্যই আরবের বিভিন্ন সময়ে ও বিভিন্ন স্থানে প্রচলিত ছিল। তবে সেগুলি যুগপৎ একই সময়ে ও সর্বত্র সমানভাবে প্রচলিত ছিল না। সাবায়ী ধর্মমত ও এই ধর্মের আওতায় নক্ষত্র ও জ্যোতিষ্ক পূজা প্রচলিত ছিল দক্ষিণ আরবে। তবে এই ধর্ম কিভাবে বা কেমন করিয়া মক্কার ধর্মের সহিত সম্পর্কিত ছিল মুইর তাহা দেখান নাই। তিনি শুধু বলিয়াছেন, ৪র্থ শতাব্দীর শেষভাগের দিকে সূর্য, চন্দ্র ও নক্ষত্রের উদ্দেশ্যে ইয়ামানে পশু বলি দেওয়া হইত। আর সাতবার কা'বা প্রদক্ষিণের বিষয়টি সম্ভবত সৌরমণ্ডলের বিভিন্ন গ্রহের কক্ষপথ আবর্তনের প্রতীকী কল্পনায় করা হইয়া থাকিবে। ৩৪
ইয়ামানে সূর্য, চন্দ্র ও নক্ষত্রের উদ্দেশ্যে পশু বলিদানের বিষয়টিকে কিভাবে মক্কার ধর্মের সহিত সম্পর্কিত করা যায় উহা বোধগম্য নহে। মক্কার কাফিরগণ অবশ্য তাহাদের দেব-দেবীর
১০০ সীরাত বিশ্বকোষ
উদ্দেশ্যে পশু বলি দিত। কিন্তু তাই বলিয়া তাহারা কোন প্রকারেই কখনও সূর্য, চন্দ্র বা নক্ষত্র পূজার অঙ্গ হিসাবে সেই বলি দিত না। দেবদেবীর উদ্দেশ্যে পশু, এমনকি নরবলি দেওয়ার প্রথাটি এমনকি ইবরাহীম ('আ) তাঁহার সন্তানকে আল্লাহর উদ্দেশ্যে কুরবানী দিতে মনস্থ করার ঘটনার আগেও বহু প্রাচীন জাতির লোকজনের মধ্যে প্রচলিত ছিল। কিন্তু তাই বলিয়া নিশ্চয় কেহ এমন কথা বলিবে না যে, ঐ প্রাচীন লোকদের কিংবা ইবরাহীম ('আ)-এর কুরবানী সাবায়ী রীতির প্রতীক মাত্র। বাস্তবিকপক্ষে সাবায়ী মতবাদ কথাগুলির উদ্ভব ঘটিয়াছে সাবীয়দের মধ্য হইতে। ইতিহাসে যাহাদের আবির্ভাব ঘটিয়াছে সাধারণত কা'বাঘর প্রতিষ্ঠার ঐতিহাসিক যে কাল সাধারণত নির্দেশ করা হইয়া থাকে উহারও বহু কাল পরে। আরও সুনির্দিষ্টভাবে বলা যায়, জ্যোতিষ্ক পূজা প্রাচীন গ্রীকদের মধ্যেও প্রচলিত ছিল। সেই পরিপ্রেক্ষিতে সাবীয় মতবাদ বলিতে গেলে কার্যত হেলেনীয় মতবাদেরই দক্ষিণ আরবীয় বহিঃপ্রকাশ বৈ কিছু নহে।
মুইরের এই বক্তব্য আরও বিস্ময়কর যে, 'কা'বাঘর সাতবার প্রদক্ষিণের বিষয়টি সম্ভবত সৌরমণ্ডলীয় গ্রহের কক্ষপথ আবর্তনের প্রতীকী তাৎপর্যমণ্ডিত'। কেননা এমন কোন আভাস কোথাও পাওয়া যায় না যে, সাবীয় বা অন্য কোন জ্যোতিষ্ক পূজক প্রাচীন জাতি তাহাদের জ্যোতিষ্ক পূজার অংশ হিসাবে কোন বস্তুকে সাতবার প্রদক্ষিণ করিত। আর প্রাচীন মক্কাবাসী বা অন্যরা 'গ্রহের কক্ষ আবর্তনের বিষয় সম্পর্কে জানিত' এই ধারণাও একান্ত অমূলক। যদি উহাই হইয়া থাকে, যদি মক্কাবাসীর আধুনিক জ্যোতির্বিদ্যার জ্ঞানই থাকিত, তাহা হইলে তাহারা আদৌ জ্যোতিষ্ক পূজা করিত না।
আরবে মূর্তিপূজা কেন্দ্রিক মন্দিরের অস্তিত্বের বর্ণনা দিয়াছেন ইবন ইসহাক। তাহার বর্ণনামতে, মক্কা হইতে চারিদিকে ছড়াইয়া পড়ার সময় ইসমাঈলী গোত্রগুলি কা'বা ঘরের কিছু পাথর তাহাদের সঙ্গে করিয়া লইয়া যায়। উহার উল্লেখ করিয়া মূর্তিপূজা ও পাথর পূজা সম্পর্কে মুইর বলেন, পাথর পূজার এই ব্যাপক প্রবণতা হইতে সম্ভবত কা'বাগৃহে কৃষ্ণ প্রস্তর সম্পর্কিত সংস্কারের উদ্ভব ঘটিয়া থাকিবে। ৩৫ ইতোপূর্বে বর্ণিত মুইরের সাক্ষ্য কোনভাবেই ইহা প্রমাণ করে না যে, আরবের মূর্তিপূজামূলক মন্দির এবং উহার সহিত সম্পর্কিত পাথর বা পাথরের তৈরী মূর্তিপূজার প্রচলন কা'বার আগে নির্মিত ও প্রচলিত হইয়াছিল। মুইর আরও নিদারুণ ভুল করিয়াছেন এমন ধারণা দেওয়ার চেষ্টা করিয়া যে, কা'বার কৃষ্ণ প্রস্তর পাথর পূজারই প্রতীক। কৃষ্ণ প্রস্তরের উৎপত্তি যেখানেই হউক কিংবা আরবে পাথর পূজার আদি উৎপত্তি যাহাই হউক, প্রাক-ইসলামী আরবে মক্কা বা আরবের আর কোথায়ও কৃষ্ণ প্রস্তরটিকে পূজা করিতে দেখা যায় নাই।
কৃষ্ণ প্রস্তরে চুম্বনের বিষয়টিকে প্রস্তর পূজা বলা যায় না। ইহা কার্যত কা'বাগৃহ বা ইহার আশপাশ প্রদক্ষিণ করার সূচনা মাত্র। আর এই তাওয়াফ বা প্রদক্ষিণের কাজটি কা'বা গৃহের বা ইহার আশেপাশে অধিষ্ঠিত কোন সুনির্দিষ্ট দেবতার জন্য করা হয় না। আল্লাহ্র ঘর প্রদক্ষিণের
হযরত মুহাম্মাদ (স) ১০১
জন্যই কেবল ইহা একান্ত ও সর্বতোভাবে করা হইয়া থাকে। আর ইহাই হইল ইসলামের আবির্ভাবের আগে ইবরাহীম ('আ)-এর ঐতিহ্য ও মূর্তিপূজামূলক রীতি-আচারের অদ্ভুত সহাবস্থানের একমাত্র নজীর। ইসলামের আবির্ভাবের প্রাক্কালে ধর্মীয় পরিস্থিতি ঠিক অনুরূপ ছিল।
এখানে মনে রাখা দরকার যে, ইবরাহীম ('আ) এক দেশ হইতে অন্য দেশ সফরকালে তাঁহার রীতিই ছিল যেখানেই তিনি যাত্রাবিরতি করিতেন সেখানেই আল্লাহর উপাসনার উদ্দেশ্যে একটি স্থান চিহ্নিত করিতেন (ওল্ড টেস্টামেন্টের ইংরেজি ভাষ্য অনুযায়ী an altar unto God বা আল্লাহ্র উপাসনার জন্য উদ্দিষ্ট চত্বর)। ৩৬ এই উপাসনার স্থানগুলি প্রস্তরের প্রতীকে চিহ্নিত। এই ক্ষেত্রে পাথরগুলি যে স্তম্ভের আকারে নির্মাণ করা হইত তাহা বাইবেলের আদিপুস্তক ২৮: ১০ ও ১৮-২২-এর বর্ণনায় স্পষ্ট। ইহা হইতে আমরা জানিতে পারি যে, ইয়াকূব ('আ) যখন বিরশেবা হইতে হানান সফরে যান তখন তিনি রাত্রে একটি জায়গায় যাত্রাবিরতিমূলক অবস্থানকালে একটি পাথরখণ্ড বালিশ হিসাবে মাথার নিচে রাখিয়া শয়ন করিতেন। পরদিন সকালে উঠিয়া তিনি উহা দিয়া একটি স্তম্ভ প্রতিষ্ঠা করিয়া উহার উপর তৈল ঢালিয়া দিতেন। আর ঐ স্তম্ভের স্থানটিকে তিনি Beth-El (আল্লাহ্ ঘর) নামে অভিহিত করিতেন। তিনি আরও ঘোষণা করিতেন, "এই যে প্রস্তর আমি স্তম্ভ হিসাবে প্রতিষ্ঠা করিয়াছি যে জায়গায় উহা হইবে 'ঈশ্বরের গৃহ'। ৩৭
প্রকৃতপক্ষে এই পাথর ছিল কার্যত অনেকটাই ভিত্তিপ্রস্তর। এই ধরনের পাথর বিভিন্ন স্থানে স্থাপন করা হয়। ইহার উদ্দেশ্য ছিল ঐসব স্থানে ঈশ্বরের উদ্দেশ্যে উপাসনালয় স্থাপন। কা'বা গৃহের কৃষ্ণ প্রস্তরও এই ধরনেরই একটি প্রস্তরখণ্ড যাহা দিয়া ইবরাহীম ('আ) আল্লাহ্র গৃহের ভিত্তি স্থাপন করিয়াছিলেন। ৩৮ কা'বার কৃষ্ণ প্রস্তর পাথর পূজার প্রতীক যেমন নহে, তেমনি ইবরাহীম, ইসহাক ও ইয়াকূব ('আ) আল্লাহ্র উপাসনার জন্য প্রস্তর স্থাপনের কারণে পাথর পূজারী হইয়া গিয়াছেন—কোনভাবেই ইহা কল্পনা করা যায় না।
কা'বা ঘরের সহিত সম্পর্কিত আচার-রীতিগুলির সহিত ইবরাহীম ('আ)-এর ঐতিহ্য কিংবা তাঁহার বংশধরদের যেসব নীতি তাঁহার নিকট হইতে পাইবার কথা সেগুলির সহিত কা'বার আচার-রীতির কোন অনুমানযোগ্য সম্পর্ক নাই, এই গোঁড়া ও অন্ধ বক্তব্য একান্তই ভ্রান্ত। কৃষ্ণ প্রস্তর, ইহার সহিত ইবরাহীম ('আ) এবং সেসব ধ্যান-ধারণা, আচার-রীতি ও নীতি যাহা কিছু ইবরাহীম ('আ)-এর বংশধরদের তাঁহার নিকট হইতে উত্তরাধিকার সূত্রে পাইবার কথা সেগুলির সম্পর্ক ওল্ড টেস্টামেন্টে উল্লিখিত সাক্ষ্যে সন্দেহাতীতভাবে প্রমাণিত হইয়াছে। আর পশু কুরবানীর প্রথাটিও ইবরাহীম ('আ)-এর ঐতিহ্যের সহিত একান্ত সামঞ্জস্যপূর্ণ। পুত্রকে কুরবানী দেওয়ার ব্যাপারে ইবরাহীম ('আ)-এর অভিপ্রায়ের বিষয়টি ওল্ড টেস্টামেন্ট ও কুরআনে অত্যন্ত পরিষ্কার ভাষায় বর্ণিত আছে।
এখানেও ইবরাহীম ('আ)-এর ধর্মীয় আচার-রীতি ও মূর্তিপূজকদের আচার-রীতির সহাবস্থান লক্ষণীয়। অবিশ্বাসী তথা আরব কাফিরগণ বিভিন্ন স্থানে দেব-দেবীর বেদীতে পশুবলি দিত ঠিকই,
১০২ সীরাত বিশ্বকোষ
কিন্তু তাহারা হজ্জের সময় মিনায় যে পশু উৎসর্গ করিত উহা একান্তভাবেই ইরাহীম ('আ)-এর ঐতিহ্যে। ইহা সাধারণভাবে কোন বিশেষ বা সকল দেব-দেবীর উদ্দেশ্যে বলিদান নহে। আর মিনা বা আরাফাতে এমন কোন দেব-দেবীর বেদীও ছিল না এইসব বলির জন্য। বাস্তবিকপক্ষে হজ্জের সময় মিনায় অবস্থান বা আরাফাতে অবস্থান এবং সেই সময়ে কুরবানী দেওয়ার কাজটি কোন বিশেষ দেবদেবী বা একাধিক দেবদেবীর জন্য করা হইত না। এখানকার আচার-অনুষ্ঠান পরিচালিত হইত একান্ত বিশুদ্ধভাবে ইবরাহীম ('আ)-এরই ঐতিহ্যে।
কুরবানীর বিষয়ে মুইরের মন্তব্য কিছুটা বিভ্রান্তিকর। আগেই উল্লেখ করা হইয়াছে যে, তিনি সাবীয় ধর্মমত ও মক্কার ধর্মমতের সঙ্গে কল্পিত সম্পর্ক দেখানোর প্রয়াসে উল্লেখ করিয়াছেন যে, 'অনেক পরে অর্থাৎ খৃস্টীয় চতুর্থ শতাব্দীর দিকে ইয়ামানের অধিবাসীরা সূর্য, চন্দ্র ও নক্ষত্রের উদ্দেশ্যে বলি দিত।' কিন্তু যখন তিনি ইঙ্গিত দিতেছেন যে, ইবরাহীম ('আ)-এর ঐতিহ্য ইসমাঈলী বংশধর গোত্রগুলি কা'বা ও কা'বায় প্রচলিত কথিত ধর্মীয় আচার-রীতির সহিত জুড়িয়া দিয়াছে, তখন এই কথাও বলিয়াছেন যে, কুরবানী ও অন্যান্য প্রথা এই প্রথমবারের মত প্রবর্তিত হইল কিংবা অন্তত এইসব রীতি-প্রথার সহিত ইবরাহীম ('আ)-এর স্মৃতি বিজড়িত। ৩৯ মুইরের এই মন্তব্য বাস্তবিকপক্ষেই তাঁহার তত্ত্ব বা মতবাদের দুর্বলতার স্বীকারোক্তি বিশেষ। তিনি এই বক্তেব্যে ইহাও স্বীকার করিয়া নিয়াছেন যে, "কুরবানী ও অন্যান্য ধর্মীয় আচার-রীতিও ইবরাহীম ('আ)-এর ঐতিহ্যের সহিত একান্তই সম্পর্কিত”।
মুইরের তৃতীয় ও চতুর্থ বক্তব্য, যেমন "ইবরাহীমের ঐতিহ্য আগে হইতে মক্কায় প্রচলিত মূর্তিপূজামূলক আচার-রীতি কা'বার রীতির সহিত জুড়িয়া দেওয়া হইয়াছে। মক্কায় পরবর্তী কালে বসতি স্থাপনকারী ইসমাঈলী একটি গোত্র এই কাজটি করে। আর এই ঐতিহ্য আরও পরবর্তী কালে 'ক্রমান্বয়ে' আরব গোত্রগুলি গ্রহণ করে। কারণ মক্কার বাণিজ্যিক প্রাধান্য ও প্রতিপত্তির কারণে এইসব আরব গোত্রের লোক মক্কায় আসিয়া বসতি স্থাপন করে”।
মুইরের উপরিউক্ত যুক্তি আরও অধিক যুক্তিবিবর্জিত ও উদ্ভট। কেননা এই দুই অনুমানই তাহার অন্য একটি বক্তব্যের বিরোধী। মুইরের সেই বক্তব্যটি এই যে, "কা'বার প্রতি ভক্তি-শ্রদ্ধা প্রদর্শনের বিষয়টি এতই ব্যাপক ছিল যে, উহা দৃষ্টে ধরিয়া লওয়া যায়, কা'বার রীতি-প্রথাগুলির সূচনা নিশ্চয়ই অতি প্রাচীন কালে হইয়া থাকিবে। "৪০
আর ইহাও উল্লেখ করিবার বিষয় যে, মুইর যেমন একদিকে আগে হইতে কা'বা ঘরের অস্তিত্বের কথা ও তথায় ব্যাপক ভক্তি-শ্রদ্ধা নিবেদনের কথা বলিয়াছেন, তেমনি অন্যদিকে ইবরাহীম ('আ)-এর ঐতিহ্যের অস্তিত্বের কথাও বলিয়াছেন। তাহার বক্তব্য অনুযায়ী, ইবরাহীম ('আ)-এর ঐতিহ্য ও ধর্মীয় আচার-রীতি পরবর্তী কালে কা'বার মৃতিপূজা ভিত্তিক রীতি-প্রথার উপর চাপাইয়া দেওয়া হয়। কিন্তু তিনি যাহা বলিতে চাহিয়াছেন তাহাতেও উহার অসঙ্গতি ও
হযরত মুহাম্মাদ (স) ১০৩
সমস্যা দূর হয় না। আরব গোত্রগুলি যদি সুপ্রাচীন কাল হইতেই কা'বা ও কা'বার রীতি-প্রথাগুলি ব্যাপক ভাবে মানিয়া ও শ্রদ্ধা করিয়াই থাকে, তাহা হইলে তাহারা ইবরাহীম ('আ)-এর ঐতিহ্যমূলক আচার-রীতিগুলি কেবল ইবরাহীমের নামেই এত সহজে তাহাদের সনাতন রীতির সহিত যোগ করিয়া লইবে ইহা আর যাহা হউক স্বাভাবিক নয়। অথচ ঠিক ইহাই হইল মূলত মুইরের প্রতিপাদ্য। ইসমাঈলী গোত্রের লোকজন মক্কায় বসবাসের জন্য আসিয়া সেখানকার ধর্মীয় ব্যবস্থায় ইবরাহীম ('আ)-এর নাম বসাইয়া দিল বলিয়া ইবরাহীম ('আ)-এর ঐতিহ্য মক্কায় চালু হইয়া গেল, মুইর ইহা বলিতে চাহিয়াছেন; বরং এই সম্ভাবনাই প্রবলতর যে, ইসমাঈলী গোত্রের এই ধরনের অসঙ্গত প্রয়াসে মক্কায় সর্বজনীন পর্যায়ে আপত্তি উঠিবারই কথা। এই আপত্তি ও বাধা আসার কথা মক্কার মূর্তিপূজক জনসম্প্রদায় ও আরব গোত্রগুলির তরফ হইতে।
মুইর এই সমস্যাটি অনুমান করিতে পারিয়াছিলেন বলিয়াই মনে হয়। আর সেই কারণেই তিনি একদিকে এই বাস্তবতা ভিত্তিক তথ্য মানিয়া লইয়াছেন যে, উত্তর ও মধ্য আরবের গোত্রগুলি উৎপত্তির দিক হইতে সাধারণভাবে ইবরাহীম ('আ)-এর বংশোদ্ভূত। কারণ ইয়াহুদী ও ওল্ড টেস্টামেন্ট তাহাদেরকে ইবরাহীম ('আ)-এর পুত্র ইসমাঈলের পুত্র কায়দার বা কেদারের বংশধর হিসাবে উল্লেখ করিয়া থাকে। অন্যদিকে তিনি তাহার মতবাদকে এই পরিস্থিতিতে একটি ভিত্তি দিতে প্রয়াস পাইয়াছেন এই বক্তব্য দিয়া যে, "ইবরাহীম ('আ)-এর সহিত রক্তের সম্পর্কের স্মৃতি তাঁহার সেই অতি পুরাতন যুগ হইতে স্বতন্ত্র ও স্বাধীন কিছু সাক্ষ্য-প্রমাণের ধারায় কোন বিশেষ গোত্র বা 'গোত্র সমবায়ে' উত্তরিত হইয়াছে, এমনটি 'সম্ভব' নহে”। আগেই উল্লেখ করা হইয়াছে, মুইর বলিয়াছেন, "বরং এই সম্ভাবনাই অধিক যে, ইবরাহীম ('আ)-এর ঐতিহ্যগত ধারণা ইয়াহুদীদের নিকট হইতে গ্রহণ করিয়াছে এবং তাহাদের সহিত মাঝে মাঝে যোগাযোগ রক্ষা করিয়া ধারণাটিকে উজ্জীবিত রাখা হইয়াছে”। ৪১
বস্তুত সেমিটিক আরবদের মত স্বীকৃত এক রক্ষণশীল জনসমাজ অন্য সকল জনসমাজের তুলনায় বেশী করিয়াই তাহাদের প্রাচীন ঐতিহ্যের প্রতি আকৃষ্ট থাকিবে না, এমন সম্ভাবনা খুবই ক্ষীণ। কেননা তাহারা তাহাদের পূর্বপুরুষদের বংশলতিকা পিছনে বহু কাল অবধি স্মৃতিতে সযত্নে ধারণ করিয়া রাখে। সেই তাহারাই কা'বা ঘরের প্রতি তাহাদের শ্রদ্ধা-ভক্তি প্রদর্শনে ও উহার আচার-রীতিগুলি পালনে অবিচল থাকিবে এবং একই সাথে ইবরাহীম ('আ) হইতে তাহাদের উৎপত্তির সত্যিকারের বাস্তবতা ভুলিয়া যাইবে, ইহা সম্ভব নহে। কোন সঞ্জীবিত ঐতিহ্যের ইহা স্বভাব নহে যে, ইহা কোন বিশেষ গোত্র সমবায়ের কোন স্বতন্ত্র সাক্ষ্য-প্রমাণের ধারা হিসাবে উত্তরিত হইবে। বরং এই ধরনের ঐতিহ্যের উত্তরণ বা হস্তান্তর ঘটিয়া থাকে বংশ হইতে বংশানুক্রমে "জনস্মৃতি ও শ্রুতি দ্বারা, কোন বিশেষ গোত্র বা গোত্র সমবায়ের স্মৃতি বা সাক্ষ্য দ্বারা নহে”।
মুইরের মত কাল্পনিকভাবে ইহাও বলা ঠিক নহে যে, আরবরা ইবরাহীম ('আ) থেকে তাহাদের উৎপত্তির কথা ভুলিয়া গিয়া তাঁহার স্মৃতি 'ইয়াহুদীদের' নিকট হইতে ধার গ্রহণ করিয়াছে
১০৪ সীরাত বিশ্বকোষ
এবং তাহাদের সহিত মাঝে মাঝে যোগাযোগ রক্ষা করিয়া সেই স্মৃতিকে 'উজ্জীবিত' রাখিয়াছে।
কোন জাতি বা জনগোষ্ঠী তাহাদের পূর্বপুরুষকে ভুলিয়া গেলে তাহারা অন্তত আরেক জনসমাজের পূর্বপুরুষকে মানিয়া লইতে পারে না। বলা বাহুল্য সেই কারণটি মুইর নিজেই বলিয়াছেন, এই মানিয়া লওয়ার কাজটি কোন স্বতন্ত্র ও আরও সাক্ষ্য-প্রমাণের ধারা-ছাড়া সম্ভব নহে। প্রকৃতপক্ষে ইয়াহুদীদের সহিত মধ্য ও উত্তর আরবের আরব উপজাতিগুলির যোগাযোগ কেবল 'কখনও কখনও যোগাযোগের' বিষয় ছিল না। খৃস্টীয় যুগ শুরুর আগের গোটা সময় বরাবর উত্তর ও মধ্য আরবের ইয়াহুদী ও কেদারীয় গোত্রগুলির লোকদের একে অন্যের মধ্যে নিরন্তর যোগাযোগ ছিল। আর তাহারা তাহাদের সাধারণ পূর্বপুরুষ ইবরাহীম ('আ) সম্পর্কে সচেতন ছিল এবং সেই স্মৃতি রক্ষা করিয়া চলিত। তবে সে যাহা হউক, এইসব প্রশ্ন ছাড়িয়া দিয়াও আমরা যদি মুইরের বক্তব্য আগাগোড়া অনুসরণ করি, তাহা হইলেও ইহা ধরিয়া লওয়া একান্ত যুক্তিসঙ্গত হইবে যে, ইয়াহুদীরা যদি কোন সময়ে হইলেও আরব উপজাতির লোকজনকে সাধারণ পূর্বপুরুষ ও মহাপিতা ইবরাহীম ('আ) হইতে তাহাদেরকে উৎপত্তির কথা স্মরণ করাইয়া দিয়া থাকে, তাহা হইলে ইহাও নিশ্চয় তাহারা তাহাদের বলিয়া থাকিবে যে, ইবরাহীম ('আ) বহু ঈশ্বরে বিশ্বাসী ছিলেন না এবং আগে হইতে (কল্পিত), অস্তিত্বশীল কা'বা ও তাহার রীতি-প্রথার সহিত ইবরাহীম ('আ)-এর কোন সম্পর্ক নাই। তাহা হইলে তেমন আরবজাতির লোকেরা ইবরাহীমকে কা'বা ও ইহার রীতি-প্রথার সহিত সম্পর্কিত করিত না, ইবরাহীম যে তাহাদেরই পূর্বপুরুষ এমনকি ইহা মনে করাইয়া দিলেও।
কিন্তু মুইরের বিবরণ ও অন্যান্য সকল সাক্ষ্য-প্রমাণ অনুযায়ী যেহেতু আরব উপজাতিগুলি ইসলামের আবির্ভাবের আগে বহু কালই কা'বার রীতি-আচারের সহিত ইবরাহীম ('আ)-কে সম্পর্কিত রাখিয়াছে সেহেতু মুইরের বক্তব্যের সাধারণ অনুসিদ্ধান্ত হিসাবে বলা যায়, ইয়াহুদীরা যখন আরবদেরকে ইবরাহীম ('আ)-এর সহিত তাহাদের সম্পর্কিত কথা মনে করাইয়া দিয়াছে তখন ইহাও নিশ্চয় বলিয়া থাকিবে যে, কা'বাঘর ও ইহার সহিত সম্পর্কিত ধর্মীয় রীতি-আচার ইবরাহীম ('আ) হইতেই উদ্ভূত।
মুইরের প্রস্তাব বা বক্তব্যের অযৌক্তিকতার এখানেই শেষ নহে। তিনি বলেন যে, "ইসমাঈলী গোত্র যখন মক্কায় বসতি স্থাপন করিতে আসে তখন তাহাদের কাফেলায় তাহারা ইবরাহীম ('আ) সম্পর্কিত জনশ্রুতিমূলক ঐতিহ্যও সঙ্গে করিয়া লইয়া আসে। তারপর তাহারা সেই জনশ্রুতি স্থানীয় সংস্কার ও বিশ্বাসে আরোপ করে”। এমনি করিয়া মুইরের নিজের বক্তব্য অনুযায়ী, ইসমাঈলী গোত্রগুলি যখন মক্কায় বসতি স্থাপন করিতে আসে তখনও কিন্তু উহারা ভুলিয়া যায় নাই যে, তাহারা ইবরাহীম ('আ)-এর বংশ হইতে উদ্ভূত। তাই সঙ্গতভাবেই ইহার সহিত আরও যোগ করা যায় যে, তাহারা নিশ্চয়ই এই বাস্তবতাও বিস্মৃত হয় নাই যে, ইবরাহীম ('আ) বহু ঈশ্বরবাদী ছিলেন না। কাজেই নিশ্চয় এমন অবস্থায় তাহারা তাহাদের পূর্বপুরুষদের স্মৃতিকে পূর্ব হইতে অস্তিত্বশীল (মনে করা হয়) বহু ঈশ্বরবাদী কা'বা ও ইহার রীতি-আচারের সহিত সম্পর্কিত।
হযরত মুহাম্মাদ (স) ১০৫
করিয়া অপবিত্র করিবে না। ইহা আরও বিশেষ করিয়া এইজন্য যে, কা'বা ও ইহার প্রাতিষ্ঠানিক রীতি-প্রথার প্রতি আরবরা বহু কাল হইতেই সম্মান প্রদর্শন করিয়া আসিতেছিল। এই অবস্থায় আরব উপজাতিগুলির সহিত যদি তাহাদের মিশিয়া যাইবার উদ্দেশ্যই থাকিত কিংবা উদ্দেশ্য উহার বিপরীত হইত তাহা হইলে তাহারা সেই ক্ষেত্রে স্বভাবতই ইবরাহীম ('আ)-এর স্মৃতিকে নেপথ্যে ফেলিয়া রাখিয়া বরং কা'বার রীতি-আচার যে রকম রহিয়াছে ঠিক হুবহু সেইভাবেই গ্রহণ করিত। কারণ এরকম কিছু করায় তাহাদের হারাইবার কিছুই ছিল না। ইহাতে যেমন তাহারা তাহাদের বসতিচ্যুত হইত না, তেমন মক্কার লাভজনক ব্যবসায়ের সুবিধাও হারাইত না। কিন্তু যেহেতু তাহারা উহা করে নাই, বরং তাহারা ইবরাহীম (আ) হইতে উদ্ভূত কা'বাঘর ও কা'বার রীতিপ্রথা যেমন প্রচলিত মানিয়া লয় তাহারা তাহাদের উদ্ভব ইবরাহীম হইতে এই সত্য স্মৃতিতে ধরিয়া রাখুক বা না রাখুক আরও যেহেতু আরব গোত্রগুলিও ইবরাহীম হইতে উদ্ভূত কা'বা ও কা'বার রীতি-প্রথাগুলি গ্রহণ করে ইবরাহীমের শাখা তথা ইয়াহুদীদের সঙ্গে তাহাদের বরাবরের যোগাযোগ রক্ষা করে, সেহেতু স্বাভাবিক সিদ্ধান্ত কেবল ইহাই হইতে পারে যে, তাহারা উহা করে এই কারণে যে, তাহারা জানিত কা'বা ও কা'বার রীতি-আচারগুলি ইবরাহীম হইতে উদ্ভূত। কাজেই একটি ইসমাঈলী গোত্রের পরবর্তী কালে মক্কায় যাইয়া বসতি স্থাপন সম্পর্কিত মুইরের তত্ত্বের এই যৌক্তিক বিশ্লেষণ, তাহার অন্যান্য ধারণা ও অনুমান এবং যেসব বাস্তবতার কথা তিনি স্বীকার করিয়া লইয়াছেন সেগুলির আলোকে যে সিদ্ধান্ত অনিবার্য তাহা হইল, কা'বা ও উহার রীতি-আচারগুলি ইবরাহীম (আ) হইতে উদ্ভূত।

টিকাঃ
১৬. W. Muir, The Life of Mahomet, Ist edn., London 1858, p. cxi, citing Gen. xxi: 25, xxv: 18.
১৭. প্রাগুক্ত।
১৮. প্রাগুক্ত, p. cxv; cxxv.
১৯. প্রাগুক্ত, p. cxvi.
২০. মুইর সুনির্দিষ্টভাবে এই শব্দটি দুইবার ব্যবহার করিয়াছেন; একবার p cxxv-তে, আবার p. cxxvi-তে। তিনি তাহার বিবরণকে "মক্কা ও সেখানকার ধর্মের উত্থানের অনুমিত ইতিহাস" বলিয়া উল্লেখ করিয়াছেন। এই বিষয়ে গ্রন্থের ১ম সংস্করণের p. ccxiv ও T.H. Weir (London 1923), সম্পাদিত গ্রন্থের ৩য় সংস্করণের p. civ-র পাদটীকা দ্র.
২১. প্রাগুক্ত, ১ম সংস্করণ, p. ccxv.
২২. প্রাগুক্ত, p. cxxv. cxxvi.
২৩. প্রাগুক্ত, p. cxv, আরও দ্র. cxxiv-cxxv.
২৪. প্রাগুক্ত, p. ccxii.
২৫. প্রাগুক্ত, p. ccx.
২৬. প্রাগুক্ত, p. ccxi.
২৭. প্রাগুক্ত, p. ccxiii.
২৮. প্রাগুক্ত, p. ccx.
২৯. প্রাগুক্ত, p. ccxvi.
৩০. প্রাগুক্ত, p. ccxv.
৩১. প্রাগুক্ত, p. ccxviii.
৩২. প্রাগুক্ত; আরও দ্র. Isaiah 21:16-17.
৩৩. মুইর, পৃ. গ্র., p. ccxii.
৩৪. প্রাগুক্ত,
৩৫. প্রাগুক্ত, pp. ccxiii-ccxiv.
৩৬. Gen. 12: 6-8; 13: 4; 13: 18. আরও দ্র. 25: 25 যাহাতে ইসহাক ('আ) কর্তৃক আল্লাহর উদ্দেশ্যে একটি 'বেদী' নির্মাণের কথা আছে।
৩৭. Gen. 28:10, 18-19.
৩৮. দ্র. মুহাম্মাদ সুলায়মান মানসূরপুরী, রাহমাতুল্লিল আলামীন (উর্দু), দিল্লি ১৯৮০ খৃ., পৃ. ৪৪।
৩৯. মুইর, পূ. গ্র., p. ccxvi, আরও দ্র. পূর্ববর্তী পৃ. ৭২।
৪০. মুইর, পৃ. গ্র., p. ccxii.
৪১. দ্র. পূর্ববর্তী, পৃ. ৭১।


ওল্ড টেস্টামেন্টে (বাইবেলের পুরাতন নিয়ম) সন্নিবেশিত তথ্যের ভিত্তিতে মুইর বলেন, ইবরাহীম ('আ) যখন হাজেরাকে ফেলিয়া আসেন তখন হাজেরা ও তাঁহার পুত্র আরবের উত্তরে পারান নামে এক নির্জন এলাকায় বাস করিতেন। [16] তিনি আরও বলেন যে, “ইসমাঈলের প্রতি পার্থিব সমৃদ্ধির যে ঐশী ওয়াদা করা হইয়াছিল তাহা পূর্ণ হয়। তাঁহার ১২ পুত্র ১২ জন রাজ্যশাসক তথা রাজা হন। আর তাঁহার বংশধরগণ অসংখ্য গোত্রের প্রতিষ্ঠা করে। ইসমাঈলের বংশের এইসব গোত্র, ইবরাহীম ('আ)-এর অন্যান্য গোত্র ও সমান্তরাল গোত্রসমূহ, মুইরের বর্ণনামতে, লোহিত সাগরের শেষ প্রান্ত হইতে ফোরাত নদীর মোহনা অবধি বিস্তৃত উত্তর আরবে বাস করিত”। [17] তিনি অবশ্য স্বীকার করিয়াছেন যে, ইবরাহীম ('আ)-এর ঐতিহ্য এবং তাহার কা'বাঘর নির্মাণের সহিত জড়িত কাহিনী ইসলামের অভ্যুদয়ের অনেক আগেই আরবদের মাঝে ব্যাপকভাবে গৃহীত হইয়াছিল। [18] তবে তাহার অভিমত এই যে, ইবরাহীম ('আ)-এর ঐতিহ্য ইসলামের আবির্ভাবের আগে প্রচলিত থাকিলেও তাহা প্রকৃত প্রস্তাবে, তাহার মতে, ইবরাহীম ('আ)-এর অনেক পরে প্রচলন লাভ করে। এই প্রসঙ্গে মুইর উল্লেখ করিয়াছেন যে, উত্তর ও মধ্য আরবের গোত্রগুলির একটা বড় অংশের উৎপত্তি ইবরাহীম বা তৎসংশ্লিষ্ট বংশ হইতে হইলেও তাহাদের ইতিহাস নির্ণয়ের জন্য ইবরাহীম ('আ)-এর সময় হইতে ২০০০ বছরের সময়ের কোন প্রামাণ্য উপকরণের অস্তিত্ব নাই। [19] আর তাই উহার পর তিনি তাহার নিজস্ব অনুমানমূলক বিবরণ প্রদানে মনোনিবেশ করিয়াছেন। [20]

তাঁহার অনুমান-কল্পনামূলক 'বাস্তব তথ্যাদি' নিম্নরূপ: তিনি বলেন, মক্কায় অনেক আগেকার বসতকারী ছিল। তাহাদের অনেকে ইয়ামানের লোক। তাহারা সাবীয় ধর্মবিশ্বাস সঙ্গে লইয়া আসে। তাহারা পাথর ও মূর্তিপূজা করিত। আর এগুলিকে যমযম কূপের সহিত সম্পর্কিত করা হয়। কেননা এই যমযমই ছিল তাহাদের সমৃদ্ধি ও শ্রীবৃদ্ধির উৎস। এই যমযমের নিকট তাহারা তাহাদের উপাসনালয় কা'বাঘর প্রতিষ্ঠা করে। সাবীয় মতবাদের প্রতীক হিসাবে কা'বাঘরের সহিত রহস্যঘেরা কৃষ্ণপ্রস্তর বা হাজারে আসওয়াদকে সম্পর্কিত করা হয়। ইহার সহিত উপর হইতে স্থানীয় আচার-রীতিগুলি আরোপিত হয়। কিন্তু এই ব্যবস্থার স্বাভাবিক উপাদানগুলি আসে আরব সভ্যতার লালনভূমি ইয়ামান হইতে। [21] পরে উত্তরাঞ্চল হইতে নাবাতীয় বা ইসমাঈলী কোন সমান্তরাল গোত্র যমযম কূপ ও বাণিজ্য কাফেলার অবস্থানের অনুকূল হওয়ার কারণে আকৃষ্ট হইয়া মক্কায় বসতি স্থাপন করে। এই গোত্রটি তাহাদের কাফেলায় ইবরাহীম ('আ)-এর কিংবদন্তী লইয়া আসিয়া তাহা স্থানীয় পর্যায়ে প্রচলিত সংস্কার ও প্রথার সহিত জুড়িয়া দেয়। "আর ইহা হইতেই উৎপত্তি হয় কা'বায় মিশ্র ধরনের নানা দেবদেবীর পূজার এবং উহার সহিত ইসমাঈলী নানা কিংবদন্তী ও রীতিরও মিশ্রণ ঘটে। ইহারই বিরাট সুযোগ গ্রহণ করেন মুহাম্মাদ (ম্যাহোমেট)। [22]

এই 'কল্পিত ধারণার' সমর্থনে মুইর আরও বেশ কিছু অনুমান যোগ করিয়াছেন। তিনি বলেন যে, আরবে ইবরাহীম ('আ)-এর ঐতিহ্য ব্যাপক পর্যায়ে ও সর্বজনীনভাবে অস্তিত্বশীল ছিল। তবে ইবরাহীম ('আ)-এর সেই সুপ্রাচীন আদর্শ আরবদের কাছে হস্তান্তরিত হওয়ার কোন স্বতন্ত্র ও অনাপেক্ষ প্রমাণাদি কোন বিশেষ গোত্র বা কোন গোত্রের সহিত সম্পর্কিত গোত্রসমূহের মধ্যেও পাওয়া যায় না। তাই ইবরাহীমের ঐতিহ্য আরবদের হাতে আসার কোন 'সম্ভাবনা দেখা যায় না'। তাহার মতে, বরং এরকম হওয়ার সম্ভাবনাই বেশি যে, ইবরাহীম ('আ)-এর ঐতিহ্য ইয়াহূদীদের নিকট হইতে পরিগ্রহণ করা হয় এবং তাহাদের সঙ্গে মাঝে মাঝে যোগাযোগ রক্ষার মাধ্যমে এই ঐতিহ্যকে সঞ্জীবিত রাখা হয়। [23]

তিনি এরকম মত প্রকাশ করার পরপরই বলেন যে, কা'বার প্রতি এত ব্যাপক ধর্মীয় শ্রদ্ধা প্রদর্শনের বিষয়টি হইতে মনে হয়, নিশ্চয় ইহার সূচনা হইয়াছিল অতি প্রাচীন যুগে। তাই ইহাও বলিতে হয় যে, মক্কার ধর্মীয় উপাসনার সহিত সম্পর্কিত অন্যান্য রীতি-ঐতিহ্যও, যেমন কা'বা, উহার কৃষ্ণ প্রস্তর, কা'বাগৃহের একান্ত পবিত্র এলাকার সীমা (হারাম) ও পবিত্র মাস অনুরূপভাবে প্রাচীন। [24]

ইহার পর তিনি কা'বার ও কা'বা সম্পর্কিত আচার-রীতির সুপ্রাচীনত্ব প্রমাণের প্রয়াসে গ্রীক ঐতিহাসিক হেরোডোটাসের বরাত দিয়াছেন। হেরোডোটাস (৫ম খৃ. পূর্বাব্দ) আরবদের দেবীদের মধ্যে প্রধান দেবীর নাম আলিলাত বা আল-লাত বলিয়া উল্লেখ করিয়াছেন। অর্থাৎ সেই সুপ্রাচীন যুগেও আরবে উহা পূজা-উপাসনার এক জোরদার প্রমাণ। আলীলাত ছিল মক্কার দেবী। [25] অতঃপর মুইর গ্রীক লেখক ডিওডোরাস সিসিলাসের বরাত দিয়াছেন। তিনি ১ম খৃস্ট পূর্বাব্দে লেখেন যে, আরবে 'একটি মন্দির ছিল যে মন্দিরের প্রতি সকল আরব বিশেষ শ্রদ্ধাবান'। মুইর এই বিষয়ে বলেন, এই মন্দির অনিবার্যভাবেই কা'বাগৃহ। কেননা "আমাদের এমন আর কোন মন্দিরের কথা জানা নাই যাহার বিষয়ে সকল আরব সর্বজনীনভাবে শ্রদ্ধা পোষণ করে। [26] পরিশেষে মুইর বলিতে চাহিয়াছেন যে, মূর্তিপূজা আরবে ছিল সুপ্রাচীন ও ব্যাপক পরিসরে বিস্তৃত বিষয়। তিনি ইব্‌ন্ হিশামের (ইবন ইসহাকের) বরাত দিয়া উল্লেখ করিয়াছেন যে, ইয়ামান হইতে দূমা (দূমাতুল জানদাল) অবধি আরবের বিভিন্ন স্থানে, এমনকি হিরা অবধি বিক্ষিপ্তভাবে মূর্তিপূজার জন্য নিবেদিত মন্দিরের অস্তিত্ব ছিল। এই মন্দিরের কতকগুলি ছিল কা'বার অধস্তন মন্দির এবং এইসব মন্দিরের ধর্মীয় আচার-রীতিও ছিল মক্কার অনুরূপ। [27]

মুইর এইসব বাস্তব তথ্য ও যুক্তির ভিত্তিতে বলেন, "আরবদের সংস্কার-সংস্কৃতির মৌলিক উপাদানগুলিতে ইবরাহীম ('আ)-এর ঐতিহ্যের চিহ্ন পাওয়া যায় না। কৃষ্ণ প্রস্তরে চুম্বন, কা'বাঘর প্রদক্ষিণ এবং মক্কা, আরাফাতের ময়দান ও মিনায় পালনীয় অন্যান্য আচার-অনুষ্ঠান, পরিত্র এলাকা বা হারাম শরীফের মাহাত্ম্য ইত্যাদির সহিত ইবরাহীম ('আ)-এর ঐতিহ্যের কোন কল্পনাযোগ্য যোগসূত্র পাওয়া যায় না কিংবা তাঁহার বংশধরদের তাঁহার নিকট হইতে উত্তরাধিকার সূত্রে যাহা কিছু পাওয়ার সম্ভাবনা উহার সহিতও মক্কার উল্লিখিত আচার-রীতির সম্পর্ক লক্ষ্য করা যায় না। তাহার মতে, এইগুলি স্থানীয় রীতি-আচার কিংবা আরব উপদ্বীপের দক্ষিণাঞ্চলে বিদ্যমান মূর্তিপূজার পদ্ধতির সহিত সম্পর্কিত। এইগুলি বনূ জুরহুম বা অন্যরা তাহাদের সঙ্গে করিয়া মক্কায় লইয়া আসে, আর সেই সময়ে ইবরাহীম ('আ)-এর ঐতিহ্য দেশজ উপাসনার সহিত জুড়িয়া দেওয়া হয় এবং সেই সময় হইতে প্রথমবারের মত মক্কায় কুরবানীর আচার-রীতি ও অন্যান্য অনুষ্ঠান প্রবর্তিত হয়। কিংবা বলা যায়, এইভাবেই ইবরাহীম ('আ)-এর স্মৃতি বিজড়িত বিষয়াদি কোন না কোনভাবে মক্কাবাসীদের ধর্মাচরণের সহিত সম্পর্কিত হয়। [29] এইভাবে মক্কায় এই ধারাটি কায়েমি হইয়া যাওয়ার পর মক্কার বাণিজ্যিক গুরুত্বের কারণে মধ্য আরবের বেদুইনগণ মক্কা অঞ্চলের প্রতি আকৃষ্ট হয়। আর ক্রমে ক্রমে এই ঐতিহ্যগুলি ও স্থানীয় সংস্কারগুলিও জাতীয় বৈশিষ্ট্য হিসাবে গণ্য হয়। অবশেষে এই ধারা আরবের ধর্মে পরিণত হয়। [30] পরিশেষে মুইর এই মত প্রকাশ করেন যে, মহানবী কেবল এই 'অভিন্ন ক্ষেত্রে' অবস্থান লইয়া আরবদের ব্যাপক উপাসনার সাথে ইসরাঈলের বিশুদ্ধ আস্তিক্যবাদের মধ্যে একটি সংযোগসূত্র রচনা করেন। আর এই প্রক্রিয়ায় কা'বার ধর্মীয় আচার-রীতি বহাল রাখিয়া তাহা হইতে মূর্তি উপাসনার সকল প্রবণতা বিচ্ছিন্ন করিয়া দেওয়া হয়। [31]

স্পষ্টত মুইরের এই তত্ত্ব চারটি অনুমানের ভিত্তিতে প্রতিষ্ঠিত। যেমন (ক) বহু ঈশ্বরবাদ ও বহু ঈশ্বরবাদী ধর্মীয় আচার-রীতি ইসমাঈলী গোত্রগুলি মক্কায় আসার বহু আগে হইতেই সেখানে অস্তিত্বশীল ছিল; (খ) কা'বাঘরও ইহার সহিত সম্পর্কিত ধর্মীয় আচার-রীতিগুলি বহু ঈশ্বরবাদী ও সেগুলি মূলত দক্ষিণ আরব হইতে আসিয়াছে যেগুলির কোন সম্পর্ক ইবরাহীম ('আ)-এর ঐতিহ্যের সহিত আছে বলিয়া কল্পনা করা যায় না; (গ) একটি ইসমাঈলী অভিবাসী গোত্রই ইবরাহীম ('আ)-এর ঐতিহ্য কা'বার রীতির উপর আরোপ করিয়াছে এবং (ঘ) ইহার পর এই সংমিশ্রিত ধর্মীয় প্রথাকে আরবরা তাহাদের জাতীয় ধর্ম হিসাবে গ্রহণ করিয়াছিল।

মুইর যেসব বাস্তব তথ্য ও যুক্তি-তর্কের সমাবেশ করিয়াছেন সেগুলি অবশ্য তাহার তত্ত্বের এই চারটি অনুমানের সমর্থক নয়। প্রথম অনুমানটির ব্যাপারে মুইর তিনটি বাস্তব তথ্যের উল্লেখ করিয়াছেন। প্রথমত তিনি বলিয়াছেন, ৫ম খৃস্ট-পূর্বাব্দের গ্রীক ঐতিহাসিক হেরোডোটাস বর্ণিত আরবীয় দেবী আল-ইলাত (Alilat)-এর উল্লেখ কবিয়াছেন। মুইর বলিয়াছেন, হেরোডোটাস সুনির্দিষ্টভাবে মক্কার কথা বলেন নাই। তাহার মতে, আল-ইলাত দেবী এবং মক্কার (প্রকৃতপক্ষে তায়েফের) সুপরিচিত দেবী আল-লাত মূলত একই দেবী। এখানে বিশেষ মনোযোগ আকর্ষণের দাবি রাখে এই মর্মে যে, হেরোডোটাস প্রকৃতপক্ষে উত্তর আরব প্রসঙ্গে ঐসব উক্তি করিয়াছেন। আর যদি তাহার ঐ বিবরণকে মোটামুটি গোটা আরব উপদ্বীপ সম্পর্কিত বলিয়া ধরিয়াও লওয়া হয় এবং আল-লাত একই দেবী বলিয়া গ্রহণও করা হয় তাহা হইলেও সেই ক্ষেত্রে আমাদেরকে খৃস্ট-পূর্ব পঞ্চম শতকে ফিরিয়া যাইতে হয়। ইহার অর্থ মুইরের স্বীকারোক্তি অনুযায়ী এই সময়টি ইবরাহীম ('আ)-এর ১৫০০ বৎসর পরের।

মুইরের দ্বিতীয় বাস্তব তথ্য অনুযায়ী, খৃস্টপূর্ব প্রথম শতাব্দীর লেখক ডিওডোরাস সিসিলাস আরবদের সর্বজনীনভাবে পূজনীয় এক "মন্দিরের" কথা বলিয়াছেন। মুইর সঠিকভাবেই এই মন্দিরটিকে কা'বাঘর বলিয়াছেন। কিন্তু সিসিলাসের এই সাক্ষ্য কালের বিচারে আমাদিগকে আরও পিছনে লইয়া গিয়াছে অর্থাৎ আমরা খৃস্টপূর্ব প্রথম শতকে উপনীত হইয়াছি।

মুইরের তৃতীয় বাস্তব তথ্য এই যে, বহু ঈশ্বরবাদ ও বহু ঈশ্বরবাদী মন্দিরগুলি গোটা আরবের বিভিন্ন স্থানে ছড়াইয়া ছিল। তাহার এই বাস্তবতা উল্লেখের সূত্র হইল ইবন হিশাম (প্রকৃতপক্ষে ইবন ইসহাক)। এখানে উল্লেখ আবশ্যক যে, ইবন হিশাম তথা ইবন ইসহাক মহানবী -এর আবির্ভাবের আগেকার আমলের বিরাজমান অবস্থার বর্ণনা দিয়াছেন। ইবন ইসহাক বা অন্য কোন প্রামাণ্য সূত্র প্রচ্ছন্ন অর্থেও ইহা বলিতে চাহেন নাই যে, জাহিলিয়্যা পরিস্থিতি স্মরণাতীত কাল হইতে বিরাজমান ছিল। তাই মুইরের উল্লিখিত কোন বাস্তব তথ্যই আমাদেরকে পঞ্চম শতাব্দীর পূর্বে লইয়া যাইতে পারে না। এই কথাও বলা যায় না যে, মক্কায় ইসমাঈলী গোত্রসমূহের অভিবাসী হওয়ার যে কথা উল্লেখ করা হয় তাহা এত পরে অর্থাৎ পঞ্চম খৃষ্ট-পূর্বাব্দের মত সময়কালে বা উহার আরও পরে ঘটে। মুইর নিজে স্বীকার করিয়াছেন যে, ইসমাঈল ('আ)-এর অন্যতম পুত্র কেদারের বংশধররা উত্তর ও মধ্য আরবে সংখ্যায় এতই বিপুল হইয়া উঠে যে, ওল্ড টেস্টামেন্টে কথিত ইয়াহুদীরা ঐসব অঞ্চলের আরব গোত্রগুলিকে সাধারণত কেদারীয় বলিয়া উল্লেখ করিত। [32]

আধুনিক সমালোচকদের মতে, খৃষ্টপূর্ব পঞ্চম শতকের পরে লেখা নয়, এমন অস্তিত্বশীল ও ওল্ড টেস্টামেন্টে বলা হইয়াছে, জাহিলিয়্যা পরিস্থিতি মক্কাসহ মধ্য ও উত্তর আরবে পূর্ব হইতেই বহু কাল ধরিয়াই বিরাজমান ছিল। তাহাদের মতে, ঐসব অঞ্চলে অপেক্ষাকৃত সাম্প্রতিক কালে ইসমাঈলী গোত্রগুলির ছড়াইয়া পড়ার সময় হইতে এই পরিস্থিতি দেখা দেয় নাই। ইসমাঈলী গোত্রগুলি তাই বলা যায় যে, অবশ্যই তাহারা খৃস্টপূর্ব পঞ্চম শতাব্দীর আগেই মক্কায় বসতি স্থাপন করিয়াছিল।

মুইরের দ্বিতীয় অনুমান ছিল, 'কা'বাঘর ও কা'বার ধর্মীয় আচার-রীতিগুলি বহু ঈশ্বরবাদী। মক্কার অধিবাসীরা মূলত দক্ষিণ আরব বা ইয়ামানের লোক। ইবরাহীম ('আ)-এর সহিত তাহাদের কোন যোগসূত্র নাই'। বিষয়টি কল্পনাও করা যায় না। কিন্তু তাহার এইসব ধারণা সঠিক তো নয়ই, বরং বিভ্রান্তিকরও বটে। কা'বা ও ইহার ধর্মীয় রীতি-আচরণ মুইরের মত অনুযায়ী অবশ্যই সুপ্রাচীন। ইহা সন্দেহাতীত। তিনি এই বিষয়টির প্রতি গুরুত্ব আরোপ করিয়াছেন। কিন্তু তাই বলিয়া উহাতে ইহা প্রমাণিত হয় না যে, কালের দিক হইতে কা'বাঘর ও উহার ঐতিহ্য ইবরাহীম ('আ)-এর পূর্বের কিংবা এগুলির আদি উৎপত্তি দক্ষিণ আরবে। কা'বার আদি উৎস দক্ষিণ আরবে ইহা প্রমাণের জন্য তিনি কোন সাক্ষ্য-প্রমাণও পেশ করেন নাই। যদি ইয়ামানে অস্তিত্বশীল কোন কিছুর অনুকরণে কা'বা ও উহার রীতিসমূহের প্রতিষ্ঠা ঘটিয়াই থাকিত, তাহা হইলে সেক্ষেত্রে মূল মন্দিরের অন্তত কিছু নিদর্শন দৃষ্টিগোচর হইত কিংবা প্রাচীন বিবরণে উহার উল্লেখ থাকিত। আর উহা সত্য হইয়া থাকিলে গোড়ার দিকে মন্দিরটির গুরুত্ব ও মর্যাদা মক্কার কথিত অনুকরণমূলক কা'বাঘর অপেক্ষা অনেক বেশি হওয়ার কথা। কিন্তু এরকম প্রাচীন ও মাহাত্ম্যসম্পন্ন কোন মন্দিরের অস্তিত্ব ইয়ামান কিংবা আরবের অন্যত্র কোথাও ছিল বলিয়া কোন সূত্রে, এমনকি প্রাচীন গ্রীক লেখকদের লেখা হইতেও জানা যায় না।

ডিওডোরাসের লেখায় যেসব সাক্ষ্য-প্রমাণ রহিয়াছে সেগুলিতে ফিরিয়া আসি। তিনি আরবে সর্বজনীন পর্যায়ে মান্য ও শ্রদ্ধাভাজন একটিমাত্র মন্দিরের কথাই বলিয়াছেন। ইহার মত বা ইহা অপেক্ষা মর্যাদাবান ও শ্রেষ্ঠতর মন্দিরের কথা তিনি বলেন নাই। ইসলামের অভ্যুদয়ের প্রাক্কালে গোটা আরব জুড়িয়া বিভিন্ন স্থানে মূর্তিপূজা ভিত্তিক কয়েকটি মন্দিরের অস্তিত্ব ছিল। ইবন ইসহাক এইসব মন্দিরের বর্ণনা দিয়াছেন। মুইরও এইসব মন্দিরের কথাই বলিয়াছেন। এইগুলির মধ্যে আব্রাহার ইয়ামানী 'কা'বা'ও রহিয়াছে। তবে এইসব মন্দিরের সবগুলিই মক্কার কা'বাঘরের পরবর্তী কালে ও মক্কার কা'বার অনুকরণেই প্রতিষ্ঠিত হয় ইহার পরে, পূর্বে নহে। মুইর তাই স্পষ্টত ঘোড়ার আগে গাড়ি জুড়িয়া দিয়াছেন এই মর্মে মনোযোগ আকর্ষণ করিয়া যে, মক্কার কা'বা মূলত ঐসব মন্দিরেরই অন্যতম মন্দির। কিন্তু এত কিছুর পরও তিনি স্বীকার করিতে বাধ্য হইয়াছেন যে, ঐসব মন্দির ছিল কা'বার অধস্তন প্রতিষ্ঠান। আর উহাদের "ধর্মীয় আচার-অনুষ্ঠানের রীতিও মক্কার আচার-অনুষ্ঠানের অনুরূপ"।

বাস্তবিকপক্ষে এইসব মন্দিরের কোনটিই কা'বা ঘরের তুলনায় প্রাচীন নহে। আর আরবরাও মনে করে না যে, এইসব মন্দিরের কোনটি কা'বার সমান প্রাচীনত্ব এবং মর্যাদা ও মাহাত্ম্যের দাবিদার। এই বাস্তবতাই এই বিষয়টি প্রমাণ করে যে, মন্দিরগুলি আসলে কা'বার অনুকরণে স্থাপন করা হইয়াছিল, মন্দিরগুলি দেবদেবীর অধিষ্ঠাস্থল হিসাবে স্থাপন করা হইয়াছিল এবং মন্দিরগুলির দেবদেবীও স্বাভাবিক কারণেই মক্কার কা'বায় ইতোমধ্যে প্রতিষ্ঠিত দেবদেবীরই অনুরূপ ছিল। এই মন্দিরগুলির অনুকরণ করিয়া কা'বায় দেবমূর্তি স্থাপন করা হয় নাই। ইবন ইসহাক ও অন্যান্য লেখকের এই বিষয়ের বিবরণেও এরূপ পরিষ্কার উল্লেখ রহিয়াছে।

বহুকাল আগে হইতেই আরবের চতুর্দিকের দেশগুলিতে মূর্তিপূজা প্রচলিত ছিল, সে বিষয়ে কোন সন্দেহ নাই। কিন্তু তাই বলিয়া কা'বাঘর মূলত মূর্তিপূজামূলক একটি মন্দির ছিল বলিয়া মূইর যে দাবি করিয়াছেন উহা প্রমাণ করিতে হইলে আরও যে কিছু আনুষঙ্গিক সাক্ষ্যপ্রমাণ দরকার—মুইর তাহা উপস্থাপন করেন নাই। তিনি যাহা করিয়াছেন তাহা কেবল আমাদেরকে পুনরায় সেই খৃষ্টপূর্ব পঞ্চম শতাব্দীতে লইয়া গিয়াছে যাহা নূতন কিছু নহে। ইহা করিয়াই তিনি প্রচ্ছন্ন অর্থে বলিতে পারেন না যে, কা'বাঘর পঞ্চম খৃস্ট-পূর্বাব্দ বা এরকম সময়ে নির্মিত হইয়াছিল।

মুইর স্বীকার করিয়াছেন যে, আরবের ইসমাঈলী গোত্রগুলি আগে হইতেই "আল্লাহ সম্পর্কে অবগত" ছিল। আসলেও এইসব জ্ঞান তাহাদের ছিল। আগেই উল্লেখ করা হইয়াছে যে, ইসমাঈলী গোত্রগুলি ব্যাপকভাবে মূর্তিপূজায় লিপ্ত হইলেও তাহারা বিশ্বের সর্বোচ্চ প্রভু হিসাবে আল্লাহকে ভুলিয়া যায় নাই। ইহাও লক্ষ্য করিবার মতো বিষয় যে, যুগ-যুগান্তর ধরিয়া আরবরা কা'বা ঘরকে বায়তুল্লাহ বা আল্লাহ্র ঘর বলিয়াই সম্বোধন করিয়াছে। অন্য সব ধর্মস্থল বা মন্দির একেক নির্দিষ্ট দেবদেবীর নামে উৎসর্গীকৃত হইলেও, যেমন আল-লাত, আল-উয্যা, আল-ওয়াদ্দ-এর মন্দির বলিয়া অভিহিত করিলেও, কা'বাগৃহ কখনও কোন দেবতা বা দেবীর নামে সম্বোধিত হয় নাই। এমনকি কুরায়শদের গোত্র-দেবতা হুবালের নামেও কা'বাকে কখনও সম্বোধন করা হয় নাই। কা'বা যদি আদিতে সত্যই কোন দেব-দেবীর নামে নির্মিত হইত তাহা হইলে কা'বা শরীফের সহিত ঐ দেব বা দেবীর নাম জড়িত থাকিত। ইহা ধরিয়া লওয়া যায় না যে, ইসমাঈলী গোত্রগুলি পরবর্তী কালে যে সময়ে কা'বা 'মন্দির' ও কা'বার রীতি-বিশ্বাসের উপর ইবরাহীম ('আ)-এর রীতি-বিশ্বাস ও ঐতিহ্যকে চাপাইয়া দিয়াছে তখন সেই দেব বা দেবীর নাম মুছিয়া ফেলা হইয়াছে। যখন ইবরাহীম ('আ)-এর ঐতিহ্যের সহিত কা'বার কথিত সমন্বয় করা হয় তখনই কা'বা সম্পর্কিত মূর্তির নামও জুড়িয়া দেওয়াই হইত বরং যুক্তির দিক হইতে অধিকতর সামঞ্জস্যপূর্ণ।

কা'বার মূর্তিপূজার সহিত সম্পর্কিত কথিত আদি পরিচয় প্রমাণ করার প্রয়াসে মুইর বলিয়াছেন যে, 'আরবের স্থানীয় বিশ্বাস ও সংস্কার ছিল সাবায়ী। তাহারা মূর্তি ও জোতিষ্ক বা নক্ষত্র পূজা করিত। আর এইসবই মক্কার ধর্মের সহিত সম্পর্কিত'। [33] ইহা অত্যন্ত বিভ্রান্তিকর বক্তব্য। মুইর আরবের যে ধর্মীয় পদ্ধতির কথা বলিয়াছেন তাহা অবশ্যই আরবের বিভিন্ন সময়ে ও বিভিন্ন স্থানে প্রচলিত ছিল। তবে সেগুলি যুগপৎ একই সময়ে ও সর্বত্র সমানভাবে প্রচলিত ছিল না। সাবায়ী ধর্মমত ও এই ধর্মের আওতায় নক্ষত্র ও জ্যোতিষ্ক পূজা প্রচলিত ছিল দক্ষিণ আরবে। তবে এই ধর্ম কিভাবে বা কেমন করিয়া মক্কার ধর্মের সহিত সম্পর্কিত ছিল মুইর তাহা দেখান নাই। তিনি শুধু বলিয়াছেন, ৪র্থ শতাব্দীর শেষভাগের দিকে সূর্য, চন্দ্র ও নক্ষত্রের উদ্দেশ্যে ইয়ামানে পশু বলি দেওয়া হইত। আর সাতবার কা'বা প্রদক্ষিণের বিষয়টি সম্ভবত সৌরমণ্ডলের বিভিন্ন গ্রহের কক্ষপথ আবর্তনের প্রতীকী কল্পনায় করা হইয়া থাকিবে। [34]

ইয়ামানে সূর্য, চন্দ্র ও নক্ষত্রের উদ্দেশ্যে পশু বলিদানের বিষয়টিকে কিভাবে মক্কার ধর্মের সহিত সম্পর্কিত করা যায় উহা বোধগম্য নহে। মক্কার কাফিরগণ অবশ্য তাহাদের দেব-দেবীর উদ্দেশ্যে পশু বলি দিত। কিন্তু তাই বলিয়া তাহারা কোন প্রকারেই কখনও সূর্য, চন্দ্র বা নক্ষত্র পূজার অঙ্গ হিসাবে সেই বলি দিত না। দেবদেবীর উদ্দেশ্যে পশু, এমনকি নরবলি দেওয়ার প্রথাটি এমনকি ইবরাহীম ('আ) তাঁহার সন্তানকে আল্লাহর উদ্দেশ্যে কুরবানী দিতে মনস্থ করার ঘটনার আগেও বহু প্রাচীন জাতির লোকজনের মধ্যে প্রচলিত ছিল। কিন্তু তাই বলিয়া নিশ্চয় কেহ এমন কথা বলিবে না যে, ঐ প্রাচীন লোকদের কিংবা ইবরাহীম ('আ)-এর কুরবানী সাবায়ী রীতির প্রতীক মাত্র। বাস্তবিকপক্ষে সাবায়ী মতবাদ কথাগুলির উদ্ভব ঘটিয়াছে সাবীয়দের মধ্য হইতে। ইতিহাসে যাহাদের আবির্ভাব ঘটিয়াছে সাধারণত কা'বাঘর প্রতিষ্ঠার ঐতিহাসিক যে কাল সাধারণত নির্দেশ করা হইয়া থাকে উহারও বহু কাল পরে। আরও সুনির্দিষ্টভাবে বলা যায়, জ্যোতিষ্ক পূজা প্রাচীন গ্রীকদের মধ্যেও প্রচলিত ছিল। সেই পরিপ্রেক্ষিতে সাবীয় মতবাদ বলিতে গেলে কার্যত হেলেনীয় মতবাদেরই দক্ষিণ আরবীয় বহিঃপ্রকাশ বৈ কিছু নহে।

মুইরের এই বক্তব্য আরও বিস্ময়কর যে, 'কা'বাঘর সাতবার প্রদক্ষিণের বিষয়টি সম্ভবত সৌরমণ্ডলীয় গ্রহের কক্ষপথ আবর্তনের প্রতীকী তাৎপর্যমণ্ডিত'। কেননা এমন কোন আভাস কোথাও পাওয়া যায় না যে, সাবীয় বা অন্য কোন জ্যোতিষ্ক পূজক প্রাচীন জাতি তাহাদের জ্যোতিষ্ক পূজার অংশ হিসাবে কোন বস্তুকে সাতবার প্রদক্ষিণ করিত। আর প্রাচীন মক্কাবাসী বা অন্যরা 'গ্রহের কক্ষ আবর্তনের বিষয় সম্পর্কে জানিত' এই ধারণাও একান্ত অমূলক। যদি উহাই হইয়া থাকে, যদি মক্কাবাসীর আধুনিক জ্যোতির্বিদ্যার জ্ঞানই থাকিত, তাহা হইলে তাহারা আদৌ জ্যোতিষ্ক পূজা করিত না।

আরবে মূর্তিপূজা কেন্দ্রিক মন্দিরের অস্তিত্বের বর্ণনা দিয়াছেন ইবন ইসহাক। তাহার বর্ণনামতে, মক্কা হইতে চারিদিকে ছড়াইয়া পড়ার সময় ইসমাঈলী গোত্রগুলি কা'বা ঘরের কিছু পাথর তাহাদের সঙ্গে করিয়া লইয়া যায়। উহার উল্লেখ করিয়া মূর্তিপূজা ও পাথর পূজা সম্পর্কে মুইর বলেন, পাথর পূজার এই ব্যাপক প্রবণতা হইতে সম্ভবত কা'বাগৃহে কৃষ্ণ প্রস্তর সম্পর্কিত সংস্কারের উদ্ভব ঘটিয়া থাকিবে। [35] ইতোপূর্বে বর্ণিত মুইরের সাক্ষ্য কোনভাবেই ইহা প্রমাণ করে না যে, আরবের মূর্তিপূজামূলক মন্দির এবং উহার সহিত সম্পর্কিত পাথর বা পাথরের তৈরী মূর্তিপূজার প্রচলন কা'বার আগে নির্মিত ও প্রচলিত হইয়াছিল। মুইর আরও নিদারুণ ভুল করিয়াছেন এমন ধারণা দেওয়ার চেষ্টা করিয়া যে, কা'বার কৃষ্ণ প্রস্তর পাথর পূজারই প্রতীক। কৃষ্ণ প্রস্তরের উৎপত্তি যেখানেই হউক কিংবা আরবে পাথর পূজার আদি উৎপত্তি যাহাই হউক, প্রাক-ইসলামী আরবে মক্কা বা আরবের আর কোথায়ও কৃষ্ণ প্রস্তরটিকে পূজা করিতে দেখা যায় নাই।

কৃষ্ণ প্রস্তরে চুম্বনের বিষয়টিকে প্রস্তর পূজা বলা যায় না। ইহা কার্যত কা'বাগৃহ বা ইহার আশপাশ প্রদক্ষিণ করার সূচনা মাত্র। আর এই তাওয়াফ বা প্রদক্ষিণের কাজটি কা'বা গৃহের বা ইহার আশেপাশে অধিষ্ঠিত কোন সুনির্দিষ্ট দেবতার জন্য করা হয় না। আল্লাহ্র ঘর প্রদক্ষিণের জন্যই কেবল ইহা একান্ত ও সর্বতোভাবে করা হইয়া থাকে। আর ইহাই হইল ইসলামের আবির্ভাবের আগে ইবরাহীম ('আ)-এর ঐতিহ্য ও মূর্তিপূজামূলক রীতি-আচারের অদ্ভুত সহাবস্থানের একমাত্র নজীর। ইসলামের আবির্ভাবের প্রাক্কালে ধর্মীয় পরিস্থিতি ঠিক অনুরূপ ছিল।

এখানে মনে রাখা দরকার যে, ইবরাহীম ('আ) এক দেশ হইতে অন্য দেশ সফরকালে তাঁহার রীতিই ছিল যেখানেই তিনি যাত্রাবিরতি করিতেন সেখানেই আল্লাহর উপাসনার উদ্দেশ্যে একটি স্থান চিহ্নিত করিতেন (ওল্ড টেস্টামেন্টের ইংরেজি ভাষ্য অনুযায়ী an altar unto God বা আল্লাহ্র উপাসনার জন্য উদ্দিষ্ট চত্বর)। [36] এই উপাসনার স্থানগুলি প্রস্তরের প্রতীকে চিহ্নিত। এই ক্ষেত্রে পাথরগুলি যে স্তম্ভের আকারে নির্মাণ করা হইত তাহা বাইবেলের আদিপুস্তক ২৮: ১০ ও ১৮-২২-এর বর্ণনায় স্পষ্ট। ইহা হইতে আমরা জানিতে পারি যে, ইয়াকূব ('আ) যখন বিরশেবা হইতে হানান সফরে যান তখন তিনি রাত্রে একটি জায়গায় যাত্রাবিরতিমূলক অবস্থানকালে একটি পাথরখণ্ড বালিশ হিসাবে মাথার নিচে রাখিয়া শয়ন করিতেন। পরদিন সকালে উঠিয়া তিনি উহা দিয়া একটি স্তম্ভ প্রতিষ্ঠা করিয়া উহার উপর তৈল ঢালিয়া দিতেন। আর ঐ স্তম্ভের স্থানটিকে তিনি Beth-El (আল্লাহ্ ঘর) নামে অভিহিত করিতেন। তিনি আরও ঘোষণা করিতেন, "এই যে প্রস্তর আমি স্তম্ভ হিসাবে প্রতিষ্ঠা করিয়াছি যে জায়গায় উহা হইবে 'ঈশ্বরের গৃহ'। [37]

প্রকৃতপক্ষে এই পাথর ছিল কার্যত অনেকটাই ভিত্তিপ্রস্তর। এই ধরনের পাথর বিভিন্ন স্থানে স্থাপন করা হয়। ইহার উদ্দেশ্য ছিল ঐসব স্থানে ঈশ্বরের উদ্দেশ্যে উপাসনালয় স্থাপন। কা'বা গৃহের কৃষ্ণ প্রস্তরও এই ধরনেরই একটি প্রস্তরখণ্ড যাহা দিয়া ইবরাহীম ('আ) আল্লাহ্র গৃহের ভিত্তি স্থাপন করিয়াছিলেন। [38] কা'বার কৃষ্ণ প্রস্তর পাথর পূজার প্রতীক যেমন নহে, তেমনি ইবরাহীম, ইসহাক ও ইয়াকূব ('আ) আল্লাহ্র উপাসনার জন্য প্রস্তর স্থাপনের কারণে পাথর পূজারী হইয়া গিয়াছেন—কোনভাবেই ইহা কল্পনা করা যায় না।

কা'বা ঘরের সহিত সম্পর্কিত আচার-রীতিগুলির সহিত ইবরাহীম ('আ)-এর ঐতিহ্য কিংবা তাঁহার বংশধরদের যেসব নীতি তাঁহার নিকট হইতে পাইবার কথা সেগুলির সহিত কা'বার আচার-রীতির কোন অনুমানযোগ্য সম্পর্ক নাই, এই গোঁড়া ও অন্ধ বক্তব্য একান্তই ভ্রান্ত। কৃষ্ণ প্রস্তর, ইহার সহিত ইবরাহীম ('আ) এবং সেসব ধ্যান-ধারণা, আচার-রীতি ও নীতি যাহা কিছু ইবরাহীম ('আ)-এর বংশধরদের তাঁহার নিকট হইতে উত্তরাধিকার সূত্রে পাইবার কথা সেগুলির সম্পর্ক ওল্ড টেস্টামেন্টে উল্লিখিত সাক্ষ্যে সন্দেহাতীতভাবে প্রমাণিত হইয়াছে। আর পশু কুরবানীর প্রথাটিও ইবরাহীম ('আ)-এর ঐতিহ্যের সহিত একান্ত সামঞ্জস্যপূর্ণ। পুত্রকে কুরবানী দেওয়ার ব্যাপারে ইবরাহীম ('আ)-এর অভিপ্রায়ের বিষয়টি ওল্ড টেস্টামেন্ট ও কুরআনে অত্যন্ত পরিষ্কার ভাষায় বর্ণিত আছে।

এখানেও ইবরাহীম ('আ)-এর ধর্মীয় আচার-রীতি ও মূর্তিপূজকদের আচার-রীতির সহাবস্থান লক্ষণীয়। অবিশ্বাসী তথা আরব কাফিরগণ বিভিন্ন স্থানে দেব-দেবীর বেদীতে পশুবলি দিত ঠিকই, কিন্তু তাহারা হজ্জের সময় মিনায় যে পশু উৎসর্গ করিত উহা একান্তভাবেই ইরাহীম ('আ)-এর ঐতিহ্যে। ইহা সাধারণভাবে কোন বিশেষ বা সকল দেব-দেবীর উদ্দেশ্যে বলিদান নহে। আর মিনা বা আরাফাতে এমন কোন দেব-দেবীর বেদীও ছিল না এইসব বলির জন্য। বাস্তবিকপক্ষে হজ্জের সময় মিনায় অবস্থান বা আরাফাতে অবস্থান এবং সেই সময়ে কুরবানী দেওয়ার কাজটি কোন বিশেষ দেবদেবী বা একাধিক দেবদেবীর জন্য করা হইত না। এখানকার আচার-অনুষ্ঠান পরিচালিত হইত একান্ত বিশুদ্ধভাবে ইবরাহীম ('আ)-এরই ঐতিহ্যে।

কুরবানীর বিষয়ে মুইরের মন্তব্য কিছুটা বিভ্রান্তিকর। আগেই উল্লেখ করা হইয়াছে যে, তিনি সাবীয় ধর্মমত ও মক্কার ধর্মমতের সঙ্গে কল্পিত সম্পর্ক দেখানোর প্রয়াসে উল্লেখ করিয়াছেন যে, 'অনেক পরে অর্থাৎ খৃস্টীয় চতুর্থ শতাব্দীর দিকে ইয়ামানের অধিবাসীরা সূর্য, চন্দ্র ও নক্ষত্রের উদ্দেশ্যে বলি দিত।' কিন্তু যখন তিনি ইঙ্গিত দিতেছেন যে, ইবরাহীম ('আ)-এর ঐতিহ্য ইসমাঈলী বংশধর গোত্রগুলি কা'বা ও কা'বায় প্রচলিত কথিত ধর্মীয় আচার-রীতির সহিত জুড়িয়া দিয়াছে, তখন এই কথাও বলিয়াছেন যে, কুরবানী ও অন্যান্য প্রথা এই প্রথমবারের মত প্রবর্তিত হইল কিংবা অন্তত এইসব রীতি-প্রথার সহিত ইবরাহীম ('আ)-এর স্মৃতি বিজড়িত। [39] মুইরের এই মন্তব্য বাস্তবিকপক্ষেই তাঁহার তত্ত্ব বা মতবাদের দুর্বলতার স্বীকারোক্তি বিশেষ। তিনি এই বক্তেব্যে ইহাও স্বীকার করিয়া নিয়াছেন যে, "কুরবানী ও অন্যান্য ধর্মীয় আচার-রীতিও ইবরাহীম ('আ)-এর ঐতিহ্যের সহিত একান্তই সম্পর্কিত"।

মুইরের তৃতীয় ও চতুর্থ বক্তব্য, যেমন "ইবরাহীমের ঐতিহ্য আগে হইতে মক্কায় প্রচলিত মূর্তিপূজামূলক আচার-রীতি কা'বার রীতির সহিত জুড়িয়া দেওয়া হইয়াছে। মক্কায় পরবর্তী কালে বসতি স্থাপনকারী ইসমাঈলী একটি গোত্র এই কাজটি করে। আর এই ঐতিহ্য আরও পরবর্তী কালে 'ক্রমান্বয়ে' আরব গোত্রগুলি গ্রহণ করে। কারণ মক্কার বাণিজ্যিক প্রাধান্য ও প্রতিপত্তির কারণে এইসব আরব গোত্রের লোক মক্কায় আসিয়া বসতি স্থাপন করে"।

মুইরের উপরিউক্ত যুক্তি আরও অধিক যুক্তিবিবর্জিত ও উদ্ভট। কেননা এই দুই অনুমানই তাহার অন্য একটি বক্তব্যের বিরোধী। মুইরের সেই বক্তব্যটি এই যে, "কা'বার প্রতি ভক্তি-শ্রদ্ধা প্রদর্শনের বিষয়টি এতই ব্যাপক ছিল যে, উহা দৃষ্টে ধরিয়া লওয়া যায়, কা'বার রীতি-প্রথাগুলির সূচনা নিশ্চয়ই অতি প্রাচীন কালে হইয়া থাকিবে। " [40]

আর ইহাও উল্লেখ করিবার বিষয় যে, মুইর যেমন একদিকে আগে হইতে কা'বা ঘরের অস্তিত্বের কথা ও তথায় ব্যাপক ভক্তি-শ্রদ্ধা নিবেদনের কথা বলিয়াছেন, তেমনি অন্যদিকে ইবরাহীম ('আ)-এর ঐতিহ্যের অস্তিত্বের কথাও বলিয়াছেন। তাহার বক্তব্য অনুযায়ী, ইবরাহীম ('আ)-এর ঐতিহ্য ও ধর্মীয় আচার-রীতি পরবর্তী কালে কা'বার মৃতিপূজা ভিত্তিক রীতি-প্রথার উপর চাপাইয়া দেওয়া হয়। কিন্তু তিনি যাহা বলিতে চাহিয়াছেন তাহাতেও উহার অসঙ্গতি ও সমস্যা দূর হয় না। আরব গোত্রগুলি যদি সুপ্রাচীন কাল হইতেই কা'বা ও কা'বার রীতি-প্রথাগুলি ব্যাপক ভাবে মানিয়া ও শ্রদ্ধা করিয়াই থাকে, তাহা হইলে তাহারা ইবরাহীম ('আ)-এর ঐতিহ্যমূলক আচার-রীতিগুলি কেবল ইবরাহীমের নামেই এত সহজে তাহাদের সনাতন রীতির সহিত যোগ করিয়া লইবে ইহা আর যাহা হউক স্বাভাবিক নয়। অথচ ঠিক ইহাই হইল মূলত মুইরের প্রতিপাদ্য। ইসমাঈলী গোত্রের লোকজন মক্কায় বসবাসের জন্য আসিয়া সেখানকার ধর্মীয় ব্যবস্থায় ইবরাহীম ('আ)-এর নাম বসাইয়া দিল বলিয়া ইবরাহীম ('আ)-এর ঐতিহ্য মক্কায় চালু হইয়া গেল, মুইর ইহা বলিতে চাহিয়াছেন; বরং এই সম্ভাবনাই প্রবলতর যে, ইসমাঈলী গোত্রের এই ধরনের অসঙ্গত প্রয়াসে মক্কায় সর্বজনীন পর্যায়ে আপত্তি উঠিবারই কথা। এই আপত্তি ও বাধা আসার কথা মক্কার মূর্তিপূজক জনসম্প্রদায় ও আরব গোত্রগুলির তরফ হইতে।

মুইর এই সমস্যাটি অনুমান করিতে পারিয়াছিলেন বলিয়াই মনে হয়। আর সেই কারণেই তিনি একদিকে এই বাস্তবতা ভিত্তিক তথ্য মানিয়া লইয়াছেন যে, উত্তর ও মধ্য আরবের গোত্রগুলি উৎপত্তির দিক হইতে সাধারণভাবে ইবরাহীম ('আ)-এর বংশোদ্ভূত। কারণ ইয়াহুদী ও ওল্ড টেস্টামেন্ট তাহাদেরকে ইবরাহীম ('আ)-এর পুত্র ইসমাঈলের পুত্র কায়দার বা কেদারের বংশধর হিসাবে উল্লেখ করিয়া থাকে। অন্যদিকে তিনি তাহার মতবাদকে এই পরিস্থিতিতে একটি ভিত্তি দিতে প্রয়াস পাইয়াছেন এই বক্তব্য দিয়া যে, "ইবরাহীম ('আ)-এর সহিত রক্তের সম্পর্কের স্মৃতি তাঁহার সেই অতি পুরাতন যুগ হইতে স্বতন্ত্র ও স্বাধীন কিছু সাক্ষ্য-প্রমাণের ধারায় কোন বিশেষ গোত্র বা 'গোত্র সমবায়ে' উত্তরিত হইয়াছে, এমনটি 'সম্ভব' নহে” । আগেই উল্লেখ করা হইয়াছে, মুইর বলিয়াছেন, "বরং এই সম্ভাবনাই অধিক যে, ইবরাহীম ('আ)-এর ঐতিহ্যগত ধারণা ইয়াহুদীদের নিকট হইতে গ্রহণ করিয়াছে এবং তাহাদের সহিত মাঝে মাঝে যোগাযোগ রক্ষা করিয়া ধারণাটিকে উজ্জীবিত রাখা হইয়াছে"। [41]

বস্তুত সেমিটিক আরবদের মত স্বীকৃত এক রক্ষণশীল জনসমাজ অন্য সকল জনসমাজের তুলনায় বেশী করিয়াই তাহাদের প্রাচীন ঐতিহ্যের প্রতি আকৃষ্ট থাকিবে না, এমন সম্ভাবনা খুবই ক্ষীণ। কেননা তাহারা তাহাদের পূর্বপুরুষদের বংশলতিকা পিছনে বহু কাল অবধি স্মৃতিতে সযত্নে ধারণ করিয়া রাখে। সেই তাহারাই কা'বা ঘরের প্রতি তাহাদের শ্রদ্ধা-ভক্তি প্রদর্শনে ও উহার আচার-রীতিগুলি পালনে অবিচল থাকিবে এবং একই সাথে ইবরাহীম ('আ) হইতে তাহাদের উৎপত্তির সত্যিকারের বাস্তবতা ভুলিয়া যাইবে, ইহা সম্ভব নহে। কোন সঞ্জীবিত ঐতিহ্যের ইহা স্বভাব নহে যে, ইহা কোন বিশেষ গোত্র সমবায়ের কোন স্বতন্ত্র সাক্ষ্য-প্রমাণের ধারা হিসাবে উত্তরিত হইবে। বরং এই ধরনের ঐতিহ্যের উত্তরণ বা হস্তান্তর ঘটিয়া থাকে বংশ হইতে বংশানুক্রমে "জনস্মৃতি ও শ্রুতি দ্বারা, কোন বিশেষ গোত্র বা গোত্র সমবায়ের স্মৃতি বা সাক্ষ্য দ্বারা নহে” ।

মুইরের মত কাল্পনিকভাবে ইহাও বলা ঠিক নহে যে, আরবরা ইবরাহীম ('আ) থেকে তাহাদের উৎপত্তির কথা ভুলিয়া গিয়া তাঁহার স্মৃতি 'ইয়াহুদীদের' নিকট হইতে ধার গ্রহণ করিয়াছে এবং তাহাদের সহিত মাঝে মাঝে যোগাযোগ রক্ষা করিয়া সেই স্মৃতিকে 'উজ্জীবিত' রাখিয়াছে।

কোন জাতি বা জনগোষ্ঠী তাহাদের পূর্বপুরুষকে ভুলিয়া গেলে তাহারা অন্তত আরেক জনসমাজের পূর্বপুরুষকে মানিয়া লইতে পারে না। বলা বাহুল্য সেই কারণটি মুইর নিজেই বলিয়াছেন, এই মানিয়া লওয়ার কাজটি কোন স্বতন্ত্র ও আরও সাক্ষ্য-প্রমাণের ধারা-ছাড়া সম্ভব নহে। প্রকৃতপক্ষে ইয়াহুদীদের সহিত মধ্য ও উত্তর আরবের আরব উপজাতিগুলির যোগাযোগ কেবল 'কখনও কখনও যোগাযোগের' বিষয় ছিল না। খৃস্টীয় যুগ শুরুর আগের গোটা সময় বরাবর উত্তর ও মধ্য আরবের ইয়াহুদী ও কেদারীয় গোত্রগুলির লোকদের একে অন্যের মধ্যে নিরন্তর যোগাযোগ ছিল। আর তাহারা তাহাদের সাধারণ পূর্বপুরুষ ইবরাহীম ('আ) সম্পর্কে সচেতন ছিল এবং সেই স্মৃতি রক্ষা করিয়া চলিত। তবে সে যাহা হউক, এইসব প্রশ্ন ছাড়িয়া দিয়াও আমরা যদি মুইরের বক্তব্য আগাগোড়া অনুসরণ করি, তাহা হইলেও ইহা ধরিয়া লওয়া একান্ত যুক্তিসঙ্গত হইবে যে, ইয়াহুদীরা যদি কোন সময়ে হইলেও আরব উপজাতির লোকজনকে সাধারণ পূর্বপুরুষ ও মহাপিতা ইবরাহীম ('আ) হইতে তাহাদেরকে উৎপত্তির কথা স্মরণ করাইয়া দিয়া থাকে, তাহা হইলে ইহাও নিশ্চয় তাহারা তাহাদের বলিয়া থাকিবে যে, ইবরাহীম ('আ) বহু ঈশ্বরে বিশ্বাসী ছিলেন না এবং আগে হইতে (কল্পিত), অস্তিত্বশীল কা'বা ও তাহার রীতি-প্রথার সহিত ইবরাহীম ('আ)-এর কোন সম্পর্ক নাই। তাহা হইলে তেমন আরবজাতির লোকেরা ইবরাহীমকে কা'বা ও ইহার রীতি-প্রথার সহিত সম্পর্কিত করিত না, ইবরাহীম যে তাহাদেরই পূর্বপুরুষ এমনকি ইহা মনে করাইয়া দিলেও।

কিন্তু মুইরের বিবরণ ও অন্যান্য সকল সাক্ষ্য-প্রমাণ অনুযায়ী যেহেতু আরব উপজাতিগুলি ইসলামের আবির্ভাবের আগে বহু কালই কা'বার রীতি-আচারের সহিত ইবরাহীম ('আ)-কে সম্পর্কিত রাখিয়াছে সেহেতু মুইরের বক্তব্যের সাধারণ অনুসিদ্ধান্ত হিসাবে বলা যায়, ইয়াহুদীরা যখন আরবদেরকে ইবরাহীম ('আ)-এর সহিত তাহাদের সম্পর্কিত কথা মনে করাইয়া দিয়াছে তখন ইহাও নিশ্চয় বলিয়া থাকিবে যে, কা'বাঘর ও ইহার সহিত সম্পর্কিত ধর্মীয় রীতি-আচার ইবরাহীম ('আ) হইতেই উদ্ভূত।

মুইরের প্রস্তাব বা বক্তব্যের অযৌক্তিকতার এখানেই শেষ নহে। তিনি বলেন যে, "ইসমাঈলী গোত্র যখন মক্কায় বসতি স্থাপন করিতে আসে তখন তাহাদের কাফেলায় তাহারা ইবরাহীম ('আ) সম্পর্কিত জনশ্রুতিমূলক ঐতিহ্যও সঙ্গে করিয়া লইয়া আসে। তারপর তাহারা সেই জনশ্রুতি স্থানীয় সংস্কার ও বিশ্বাসে আরোপ করে"। এমনি করিয়া মুইরের নিজের বক্তব্য অনুযায়ী, ইসমাঈলী গোত্রগুলি যখন মক্কায় বসতি স্থাপন করিতে আসে তখনও কিন্তু উহারা ভুলিয়া যায় নাই যে, তাহারা ইবরাহীম ('আ)-এর বংশ হইতে উদ্ভূত। তাই সঙ্গতভাবেই ইহার সহিত আরও যোগ করা যায় যে, তাহারা নিশ্চয়ই এই বাস্তবতাও বিস্মৃত হয় নাই যে, ইবরাহীম ('আ) বহু ঈশ্বরবাদী ছিলেন না। কাজেই নিশ্চয় এমন অবস্থায় তাহারা তাহাদের পূর্বপুরুষদের স্মৃতিকে পূর্ব হইতে অস্তিত্বশীল (মনে করা হয়) বহু ঈশ্বরবাদী কা'বা ও ইহার রীতি-আচারের সহিত সম্পর্কিত।

📘 সীরাত বিশ্বকোষ > 📄 (খ) ওল্ড টেস্টামেন্টের সাক্ষ্য-প্রমাণ

📄 (খ) ওল্ড টেস্টামেন্টের সাক্ষ্য-প্রমাণ


(খ) ওল্ড টেস্টামেন্টের সাক্ষ্য-প্রমাণ
মুইরের আলোচিত উল্লিখিত তত্ত্ব ও অনুমানগুলির ভিত্তি হইল জেনিসিস (আদিপুস্তক) ২১: ২১ সন্নিবেশিত তথ্যাদি। মুইর বলিয়াছেন, 'আবরাহাম যখন হ্যাগারকে আরবের উত্তরে, পারানের নির্জন প্রদেশে তাহার পুত্রসহ ছাড়িয়া আসিলেন'। ৪২ জেনেসিস-এর উল্লিখিত অনুচ্ছেদটিতে কেবলমাত্র বলা হইয়াছে, 'ইসমাঈল ও তাহার মাতা পারানের নির্জন ভূমিতে বাস করেন'। 'আরবের উত্তরে' কথাগুলি মুইরের নিজের। তিনি এই কথাগুলি বলিয়াছেন অন্যান্য খৃস্টান লেখক ও বাইবেলের ব্যাখ্যাকারগণ পারান বলিয়া যে অঞ্চলকে নির্দেশ করিয়াছেন বোধগম্য কারণেই তাহাদের ঐ বর্ণনার ভিত্তিতে। ওল্ড টেস্টামেন্টের তিন জায়গায় অন্যান্য ঘটনা প্রসঙ্গে পারানের উল্লেখ রহিয়াছে। ৪১ কিন্তু এই তিন জায়গায় কোথাও পারান নামটি বলিতে উহা ঠিক কোথায় অবস্থিত ছিল তাহা স্পষ্ট নহে। তাই জেনেসিস-এর ২১: ২১-এ উল্লিখিত পারান, যেখানে হাজেরা (রা) ও ইসমাঈল (আ) বসতি স্থাপন করিয়াছিলেন, উহার সঠিক অবস্থান নির্দেশের উপর 'তাঁহারা কোথায় বসতি স্থাপন করিয়াছিলেন' সেই প্রশ্নের উত্তর নির্ভরশীল।
মুইরের এই রচনা প্রকাশের অল্পকাল পরেই এই বিষয়টি লইয়া বাস্তবিকপক্ষে বিশদ আলোচনা করিয়াছেন সায়্যিদ আহমাদ খান বাহাদুর। ৪৪ তবে যেহেতু সে সময়ের পর হইতে যুক্তিতর্ক এই যাবত আর তেমন বেশি অগ্রসর হয় নাই সেহেতু সায়্যিদ আহমাদ খান এই ব্যাপারে
১০৬ সীরাত বিশ্বকোষ
যে প্রধান বিষয়গুলির উপর আলোকপাত করিয়াছেন সেগুলির একটি পর্যালোচনা এবং উহাতে প্রসঙ্গের সহিত সম্পর্কিত অন্যান্য কিছু বাস্তব তথ্য ও বিষয় যোগ করা তাৎপর্যবহ বিবেচিত হইতে পারে। তিনি এই বাস্তবতার প্রতি মনোযোগ আকর্ষণ করিয়াছেন যে, প্রারম্ভিক যুগের মুসলিম ভূগোলবিদগণ পারান নামের তিনটি স্থানের কথা বলিয়াছেন। প্রথম নির্জন স্থান হইল, মক্কা আজ যেখানে অবস্থিত ও উহার সন্নিহিত কিছু পার্বত্য এলাকা। দ্বিতীয়টি হইল, মিসরের পূর্বাঞ্চলের একটি গ্রাম বা আরব পেত্রা। তৃতীয়টি হইল সমরকন্দের একটি জেলা। ৪৫
তিনি আরও উল্লেখ করিয়াছেন যে, খৃস্টান ও বাইবেলের ব্যাখ্যাকারগণ পারানের তিনটি ভিন্ন পরিচয় নির্দেশ করিয়াছেন। এগুলির মধ্যে একটি অভিমত অনুযায়ী, "বিরশেবার উত্তর সীমা হইতে মাউন্ট সিনাই পর্বত পর্যন্ত বিস্তৃত" এক বিশাল অঞ্চল। দ্বিতীয় অভিমত অনুযায়ী, বিরশেবা ও পারান অভিন্ন, ইহার আরেক নাম ছিল কাদেশ। তৃতীয় অভিমত ছিল, 'সিনাই পর্বতের পশ্চিম ঢালে অবস্থিত নির্জন অঞ্চল। ৪৬
প্রথম দুইটি স্থান নির্দেশ স্পষ্ট ভ্রান্ত। কারণ ওল্ড টেস্টামেন্টের খোদ বিবরণ হইতে পরিষ্কার দেখা যায়, পারান একটি স্পষ্টত ভিন্ন এলাকা যাহা খুব বিশাল কোন নির্জন অঞ্চল নহে, যাহা প্রথম স্থানটির বেলায় বলা হইয়াছে। আবার বিরশেবা বা কাদেশ ৪৭ হইতে এই বর্ণনা ভিন্ন। পারানের তৃতীয় স্থাননির্দেশ যাহার আওতায় পারান সিনাই পর্বতের পশ্চিম ঢাল এলাকায় পড়ে, এই স্থান নির্দেশের সাথে এক মুসলিম ভৌগোলিকের বর্ণনার মিল পাওয়া যায়। মুসলিম ভৌগোলিকদের বর্ণনা অনুযায়ী এই পারান ছিল তাঁহাদের উল্লিখিত তিন পারানের অন্যতম। কিন্তু যতদূর সম্ভব এই এলাকাটি অন্তত ঐ সময়ে পারান বলিয়া পরিচিত ছিল না। কেননা মূসা (আ) যখন ইসরাঈলীদের লইয়া মিসর হইতে সিনাই গিয়াছিলেন তখনও এই যাত্রার বর্ণনায় পারান নামের কোন স্থানের উল্লেখ তিনি করেন নাই, যদিও তিনি ঐ একই এলাকার মধ্য দিয়াই অতিক্রম করেন। খুব সম্ভব এলাকাটি মূসা (আ)-এর ঐ অভিযাত্রার পরবর্তী কালে পারান নাম ধারণ করে। আর তাহার কারণ, তখন সেখানে বানু ফারান নামে এক কাহানী গোত্র বসতি স্থাপন করে। ৪৮
এই তিন স্থানের কোনটিই অবশ্য হাজেরা ও ইসমাঈলের বসতিস্থল হইতে পারে না। কেননা প্রথমত, ঐ অঞ্চল বা এলাকাগুলির কোনটিতেই এমন কোন জনশ্রুতি বা ঐতিহ্য নাই যাহাতে বলা হইয়াছে ঐ জায়গার কোন একটাতে হাজেরা ও ইসমাঈল বসতি স্থাপন করিয়াছিলেন। দ্বিতীয়ত, মূসা ('আ) ও তাঁহার অনুসারীরা সিনাই হইতে আরও অধিক দূর অগ্রসর হইয়াছিলেন এবং তাঁহারা 'তাবেরাহ', 'কিবরোথথাত্তাওয়া' ও 'হাযেরোখ" অতিক্রম করার পর পারানের নির্জন প্রদেশে যাত্রাবিরতি করিয়াছিলেন। ৪৯ কিন্তু ঠিক কোন পথ ধরিয়া তাহারা অগ্রসর হইয়াছিলেন উহা স্পষ্ট নহে। খোদ খৃস্টান পণ্ডিতগণ কমপক্ষে পাঁচটি ভিন্ন দিকে তাহাদের যাত্রার কথা বলিয়াছেন। অধিকন্তু তাহারা ইসমাঈলের বংশধরেরা "শুর হইতে হবিলা অবধি বা আরব উপদ্বীপ-মিসর সীমান্ত হইতে ফোরাত নদীর মোহনা" পর্যন্ত ছড়াইয়া পড়ে বলিয়া উল্লেখ করিয়াছেন। কিন্তু
হযরত মুহাম্মাদ (স) ১০৭
তাহারা ঐ সিদ্ধান্ত দিয়াছেন ভুলবশত। কেননা জেনেসিস ২৫: ১৮-তে যাহার পরিচয় 'হবিলা' নামে উল্লেখ আছে উহা আসলে ধ্বনিগত কিছুটা মিলের ভিত্তিতে বাহরায়েন দ্বীপপুঞ্জের আভাল বা আউওয়ালকে হবিলা বলিয়া উল্লেখ করা হইয়াছে। প্রকৃতপক্ষে সায়্যিদ আহমাদ উল্লেখ করিয়াছেন যে, হবিলা আসলে ইয়ামানের কাছাকাছি ১৭° ৩০ উত্তর অক্ষাংশ ও ৪২° ৩৬ পূর্ব দ্রাঘিমাংশের মধ্যে অবস্থিত একটি স্থানের নাম। ইহার নামকরণ হয় যোকতান (কাহতান) ৫০-এর হাভলা নামক এক পুত্রের নামে। ইহাতে প্রমাণিত হয় যে, “ইসমাঈলীরা ইয়ামানের উত্তর সীমান্ত হইতে সিরিয়ার দক্ষিণ সীমান্ত অবধি বিস্তীর্ণ অঞ্চলে বসতি স্থাপন করে। বর্তমানে এই অঞ্চলটির নাম হেজায। আর ইহাই কথিত পারানের সহিত অভিন্ন যাহার কথা মুসলিম ভৌগোলিকগণ উল্লেখ করিয়াছেন। ৫১ ইহা আরও উল্লেখযোগ্য যে, আর, কিউয়েনেন সম্পাদিত ও লুগদুনি বাটাভোরাম-এ ১৮৫১ সালে প্রকাশিত সামারিটান পেন্টাটিউক-এর আরবী ভাষ্যের এক টীকায় বলা হইয়াছে যে, ফারান ও হিজায এক ও অভিন্ন অঞ্চল। ৫২
তৃতীয়ত, জেনেসিস ২১: ১৪-১৫-এর প্রতি তীক্ষ্ণ দৃষ্টিপাত করিলে বুঝিতে পারা যায় যে, পরপর দুইটি অনুচ্ছেদ এক ও অভিন্ন উপলক্ষের কথা প্রকৃতপক্ষেই বর্ণনা করিতেছে না। জেনেসিস ২১: ১৪-র বর্ণনায় বলা হইয়াছে যে, হাজার (হাজেরা) বিরশেবার নির্জন প্রান্তরে ছুটাছুটি করিয়াছিলেন। ইহার অর্থ এই নয় যে, হাজেরা বিরশেবাতেই ছুটাছুটি করিয়াছিলেন, তাহার বেশি দূর আর অগ্রসর হন নাই। জেনেসিস ২১: ১৫-তে বলা হইয়াছে, “পাত্রের পানি শেষ হইয়া গিয়াছিল আর তিনি তাঁহার পুত্রকে একটি ঝোপের নিচে রাখিয়া দেন।” এই বিবৃতি দ্বারাও ইহা বুঝায় না যে, পাত্রে যে পানি লইয়া তিনি গৃহ পরিত্যাগ করিয়াছিলেন সেই 'পানিই' এইভাবে নিঃশেষিত হইয়া গেল যাহার জন্য তিনি তাহার 'পুত্রকে একটি ঝোপের নিচে শয়ন করাইয়া রাখিয়া যাইতে' বাধ্য হন। বিরশেবা এমনই এক স্থান যাহা তাঁহার সুপরিচিত। কেননা ইবরাহীম ('আ) তাঁহাকে লইয়া সেখানে দীর্ঘকাল বসবাস করেন। এই বিরশেবা অঞ্চলে বেশ কিছু পানির কূপও ছড়াইয়া ছিটাইয়া ছিল। ওল্ড টেস্টামেন্টের স্পষ্ট বর্ণনা অনুযায়ী বিভিন্ন জায়গায় বিভিন্ন ব্যক্তি এই কূপগুলি খনন করিয়াছিল। বিরশেবার কূপটি স্বয়ং ইবরাহীম ('আ) খনন করেন। কাজেই সব কূপের কথা হাজেরার না জানা থাকিবার কথা নহে। তাই অল্প সন্ধান করিলেই এলাকার অনেকগুলি কূপের যে কোন কূপ হইতে তিনি আরও পানি পাইতেই পারিতেন। বাস্তবিকপক্ষে ওল্ড টেস্টামেন্টের লেখকরা এখানে দুইটি অত্যন্ত সংক্ষিপ্ত একের পর এক অনুচ্ছেদে হাজেরার দীর্ঘ ও কষ্টসাধ্য ঘোরাঘুরির কথা লিখিয়াছেন। তাঁহার এই ঘোরাঘুরি শুরু হইয়াছিল বিরশেবায় ও ইহার শেষ পর্যায়টি ছিল এমন এক স্থানে যেখানে কোন পানি ছিল না কিংবা তাঁহার পাত্রে পানি পূরণের ব্যবস্থাও কোনভাবে করা যাইতেছিল না। তাই এমন চরম দুর্দশা ও হতাশার মধ্যে পড়িয়া তিনি তাঁহার শিশু ইসমাঈলকে একটি ঝোপের কাছে ফেলিয়া রাখেন। বস্তুত তাঁহার স্থান হইতে স্থানান্তর গমনের কাল ও স্থানের দিক হইতে দুইটি ভিন্ন ঘটনা বর্ণিত হইয়াছে পর পর ঘন সন্নিবিষ্ট দুইটি অনুচ্ছেদে।
১০৮ সীরাত বিশ্বকোষ
চতুর্থত, যে কারণ ও পরিস্থিতিতে হাজেরা ও ইসমাঈলকে তাহাদের গৃহ হইতে নির্বাসনে পাঠানো হয় এবং যাহার বিবরণ ওল্ড টেস্টামেন্টে রহিয়াছে তাহাতে বুঝা যায় যে, সারাহ ও ইবরাহীম ('আ) যেখানে বাস করিতে থাকেন সেখান হইতে তাহারা বেশ অনেক দূরবর্তী স্থানে চলিয়া যান। জেনেসিস-এর বর্ণনা অনুযায়ী, সারার ইচ্ছা ছিল, ইসমাঈল যেন তাহার নিজ পুত্র ইসহাকের সহিত অংশীদার হিসাবে ইবরাহীমের উত্তরাধিকারী না হন। তাই জেনেসিসের বিবরণ অনুযায়ী ইহা ছিল ঈশ্বরের পরিকল্পনা যে, ইসমাঈল ('আ) ও তাঁহার বংশধরগণ আরেক বসতি স্থাপন ও তাহাদের বংশ বিস্তার করিবে। জেনেসিসে অত্যন্ত প্রাণবন্ত চিত্রবৎ বর্ণনা রহিয়াছে এই বিষয়টির এইভাবেঃ
১১. "এই কথায় অব্রাহাম আপন পুত্রের বিষয়ে অতি অসন্তুষ্ট হইলেন”।
১২. "আর ঈশ্বর অব্রাহামকে কহিলেন, ঐ বালকের বিষয়ে ও তোমার ঐ দাসীর বিষয়ে অসন্তুষ্ট হইও না; সারা তোমাকে যাহা বলিতেছে, তাহার সেই কথা শুন; কেননা ইসহাকেই তোমার বংশ আখ্যাত হইবে”।
১৩. "আর ঐ দাসীপুত্র হইতেও আমি এক জাতি উৎপন্ন করিব, কারণ সে তোমার বংশীয়”।
১৪. "পরে অব্রাহাম প্রত্যুষে উঠিয়া রুটি ও জলপূর্ণ কুপা লইয়া হাগারের স্কন্ধে দিয়া বালকটীকে সমর্পণ করিয়া তাহাকে বিদায় করিলেন” ইত্যাদি। ৫৩
কাজেই জেনেসিসের বর্ণনা হইতে ইহা অত্যন্ত স্পষ্ট যে, বস্তুতপক্ষে সারার ইচ্ছাক্রমে নহে, বরং সুনিশ্চিতভাবে ইহা ছিল মহান আল্লাহ্র পরিকল্পনা। তিনিই ইসমাঈলের সমৃদ্ধ ভবিষ্যতের আশ্বাস দিয়াছিলেন ইবরাহীমকে। তিনিই ইবরাহীমকে নির্দেশ দিয়াছিলেন হাজেরা ও ইসমাঈলকে ভিন্ন দেশে নির্বাসনে পাঠাইতে। ইবরাহীমকে ঈশ্বর বলিয়াছিলেন, "কেননা ইসহাকেই তোমার বংশ আখ্যাত হইবে”। ইহা ছিল একাধারে ঈশ্বরের তরফ হইতে ইবরাহীমের জন্য সান্ত্বনা, সেইসাথে এই আশ্বাসও যে, ইসমাঈলের নির্বাসনের অর্থ ইবরাহীমের বংশধারার অবসান-কিংবা সঙ্কোচন নহে। জেনেসিস-এর এই বর্ণনা, "ইসহাকেই তোমার বংশ আখ্যাত হইবে” বলিতে ইহা বুঝাইয়াছে যে, ইবরাহীম ('আ) ঐ সময়ে 'যেখানে ছিলেন সেখানে' ইসহাকের মাধ্যমে তাঁহার বংশবৃদ্ধি চলিতে থাকিবে। অন্যদিকে জেনেসিসের অন্য বর্ণনায় এই বাস্তব বিষয়ের উপর জোর দেওয়া হইয়াছে যে, "ইসমাঈল ইবরাহীমের রক্তের ধারক, তবে তাঁহার সংখ্যাবৃদ্ধি ঘটিবে ও উহা একটি জাতিতে পরিণত হইবে, তবে তাহা এখানে নহে, অন্য একটি অঞ্চলে”। ঈশ্বরের এই পরিকল্পনার একান্ত প্রাকৃতিক কারণে (আর ইসমাঈলকে তাঁহার পিতার সম্পত্তি হইতে আলাদা রাখিবার সারার ইচ্ছাটিও ছিল ঈশ্বরের পরিকল্পনার একটি অংশ) হাজেরা ও ইসমাঈল তাই বিরশেবা ও সিনাইয়ের কোন এক অঞ্চলে বসতি করিবেন তাহা হইতে পারে না। কেননা বিরশেবা ও সিনাই ছিল একান্তভাবেই ইবরাহীম ও সারার কর্মতৎপরতার অঞ্চলগত আওতার মধ্যে। আর তাই হাজেরা ও ইসমাঈলকে অনেক দূরে ও নির্জন বসতিহীন স্থানে পাঠানোই বিধির
হযরত মুহাম্মাদ (স) ১০৯
পূর্বনির্ধারিত বিধান। জেনেসিস-এ পারান/ফারানের উল্লেখ আছে হাজেরা ও ইসমাঈলের বসতিস্থল হিসাবে। কিন্তু উল্লিখিত কারণেই পারান আর যাহাই হউক খৃস্টান পণ্ডিতদের কল্পনা-অনুমান অনুযায়ী বিরশেবা ও সিনাইয়ের আশপাশে কোথাও হইতে পারে না।
পঞ্চমত, হাজেরা ও ইসমাঈলের বসতির সঠিক অবস্থান সম্পর্কে জেনেসিস ২১-এ একটি ইঙ্গিত রহিয়াছে। উহাতে বলা হইয়াছে যে, হাজেরা যখন একান্ত নিরুপায় ও দুর্দশাগ্রস্ত হইয়া ঈশ্বরের নিকট প্রার্থনা করিলেন এবং ইসমাঈল ক্ষুধা-তৃষ্ণায় কাঁদিয়া উঠিলেন, তখন ঈশ্বর তাঁহাদের আকুতিতে সাড়া দিলেন। এই প্রসঙ্গে জেনেসিসে বলা হইয়াছে:
১৭. "তখন ঈশ্বর বালকটীর রব শুনিলেন; আর ঈশ্বরের দূত আকাশ হইতে ডাকিয়া হাগারকে কহিলেন, হাগার তোমার কি হইল? ভয় করিও না, বালকটা যেখানে আছে, ঈশ্বর তথা হইতে উহার রব শুনিলেন”।
১৮. "তুমি উঠিয়া বালকটাকে তুলিয়া তোমার হাতে ধর; কারণ আমি উহাকে এক মহাজাতি করিব”।
১৯. "তখন ঈশ্বর তাহার চক্ষু খুলিয়া দিলেন, তাহাতে সে এক সজল কূপ দেখিতে পাইল, আর তথায় গিয়া কুপাতে জল পুরিয়া বালকটিকে পান করাইল”। ৫৪
এমনি করিয়া আল্লাহ হাজেরা ও ইসমাঈলের জন্য তাঁহারা যেখানে ছিলেন সেখানে একটি পানির কূপের ব্যবস্থা করিলেন (ঈশ্বর শিশুটির রব শুনিলেন যেখানে সে ছিল)। হাজেরাকে কূপটি বাহির করার জন্য আশেপাশে দৃষ্টি ফেলিতে কিংবা দূরে হাঁটিয়া গিয়া সন্ধানও করিতে হয় নাই। "ঈশ্বর তাঁহার চক্ষু খুলিয়া দিলেন” অর্থাৎ ঈশ্বর তাঁহার চক্ষু উন্মিলিত করিয়া দিলে তিনি (হাজেরা) পানির একটি কূপ দেখিতে পাইলেন। ইহা কোন সাময়িক স্বস্তির বিষয় ছিল না। ইহা ছিল ঈশ্বরের পক্ষ হইতে মাতা ও শিশুর জন্য বিশেষ উপহার যাহা হইবে তাঁহাদের বাঁচিয়া থাকার ও বসতি করার অবলম্বন। ইহা ঈশ্বরের পরিকল্পনা ও ইসমাঈলকে দিয়া একটি জাতি গড়ার জন্য তাঁহার অঙ্গীকার। ঈশ্বর প্রদত্ত পানির কূপটি বিরশেবা বা তৎসন্নিহিত অঞ্চলের কোন কূপ হইতে পারে না কেবল এই কারণে যে, এইসব কূপের কথা ওল্ড টেস্টামেন্টে উল্লেখ নাই, বরং উল্টা ওল্ড টেস্টামেন্টের অত্যন্ত স্পষ্ট বর্ণনায় বলা আছে যে, এই কূপগুলি মানুষের হাতে তৈরী। ইহা ছাড়াও স্থানীয় এমন কোন জনশ্রুতির অস্তিত্ব নাই যাহাতে বলা হইয়াছে, এখন বা অতীতে কোন সময়ে ওখানে ঐশ্বরিক কারণে সৃষ্ট কোন কূপের অস্তিত্ব ছিল। বিরশেবা অঞ্চলের কোন কূপের সহিত হাজেরা ও ইসমাঈলকে প্রদত্ত ঐশ্বরিক কূপটিকে অভিন্ন করিয়া শনাক্ত করার যে কোন প্রয়াস তাই জেনেসিসে স্পষ্ট করিয়া উক্ত কথা ও অনুচ্ছেদগুলির বক্তব্যের সরাসরি পরিপন্থী। তাই নিশ্চিতভাবে কূপটি কা'বা ঘরের পাশে অবস্থিত যমযম কূপ ছাড়া আর অন্য কোন কূপই হইতে পারে না। হাজেরা ও ইসমাঈলের আমল হইতেই এই কূপ ইসমাঈলের বংশধর ও যাহারা তথায় বসতি স্থাপন করিয়াছে উহাদের জন্য পানির স্থায়ী উৎস হিসাবে বিদ্যমান ছিল। ইহাতে
১১০ সীরাত বিশ্বকোষ
কেবল একবার স্বল্পকালের জন্য ব্যতিক্রম ঘটিয়াছে যখন কিছু লোক যমযম কূপটিকে কৃত্রিম উপায়ে বন্ধ করিয়া দেয়।
সর্বশেষে মক্কার নামকরণ প্রসঙ্গ। কুরআনে মক্কাকে বাক্কা বলিয়াও উল্লেখ করা হইয়াছে।৫৬ এই বাক্কার উল্লেখ বাইবেলের দাউদের গীতসংহিতা (Psalm of David)-এও রহিয়াছে, আর সেই সাথে কূপেরও উল্লেখ রহিয়াছে। ৮৪: ৬ চরণে বলা হইয়াছে: "Who passing through the velly of Baca make it a well; the rain also filleth the pools".
"তাহারা বাকা উপত্যকা দিয়া গমন করিয়া তাহা পানির কূপে পরিণত করে; বৃষ্টির পানিতেও নানা জলাধার পূর্ণ হইয়া যায়”।
উল্লিখিত অনুচ্ছেদে 'বাকা' শব্দটি স্পষ্টত কুরআনে উল্লিখিত 'বাক্কা', আর যে কূপের কথা বলা হইয়াছে তাহা যমযম কূপ বৈ আর কিছুই নহে। ইহাও উল্লেখযোগ্য যে, ভূগোল ও ইতিহাস সংক্রান্ত প্রাচীন লেখাগুলিতে মক্কায় প্রবল বৃষ্টিপাতের কারণে বন্যা হইবার উল্লেখ রহিয়াছে। এই বৈশিষ্ট্যটি আধুনিক কালেও যে একেবারে অপরিচিত তাহা নহে। ফলে বাইবেলে যে জায়গাটি এইভাবে চিহ্নিত করা হইয়াছে, তাহা নিটোলভাবেই মক্কা ছাড়া আর কোন স্থানই হইতে পারে না। বলা হইয়াছে-"বৃষ্টির বারিধারাও জলাধারসমূহ পূর্ণ করিয়া থাকে”।
তাই জেনেসিসের বর্ণনায় কতিপয় বিভ্রাট সত্ত্বেও কুরআনে যেসব মূল বৈশিষ্ট্যের উল্লেখ রহিয়াছে উহা ও অন্যান্য ইসলামী বর্ণনার সহিত জেনেসিসের বর্ণনার সামঞ্জস্য রহিয়াছে। ৫৭ এইসব বর্ণনা সম্মিলিতভাবে প্রমাণ করে যে, ঐশ্বরিক পরিকল্পনা ও ব্যবস্থার আওতায়ই হাজেরা ও ইসমাঈল ('আ) মক্কায় বসতি স্থাপন করিয়াছিলেন।

টিকাঃ
৪২. মুইর, পৃ. গ্র., p. cxi. মুইর ভুলক্রমে তাঁহার পাদটীকায় Gen. 21: 25, বরাত দিয়াছেন। প্রকৃতপক্ষে উহা হওয়া উচিত 21: 21.
৪৩. দ্র. Gen. 14: 6; Num., 10: 12, Num. (গণনাপুস্তক), 12: 16.
৪৪. Syed Ahmad Khan Bahadur, Essay on the Historical Geography of Arabia, London, Trubner & Co., London 1869.
৪৫. প্রাগুক্ত, পৃ. ৭৪। আরও দ্র. ইয়াকূত, মু'জামুল বুলদান, শিরো, 'ফারান'।
৪৬. সায়্যিদ আহমাদ, পৃ. গ্র., পৃ. ৭৬, বরাত Kitto's Cyclopaedia of the Bible and The Peoples' Bible Dictionary.
৪৭. সায়্যিদ আহমাদ, পৃ. গ্র., পৃ. ৭৭-৭৯। আরও দ্র. Gen. 14: 5-7; Deut. 33-2; Hab. 33: 2, Num. 10-12, 11: 1-3, 6.
৪৮. সায়্যিদ আহমাদ, পৃ. গ্র., পৃ. ৮৫।
৪৯. See Exod. 15:32; 17: 8; 18:5; 19:2 and Num. 10:12; 11:34; 12:16; 13:26 and 14:25.
৫০. সায়্যিদ আহমাদ, পূ.গ্র., পৃ. ৮০। আরও দ্র. Gen. 10:29.
৫১. সায়্যিদ আহমাদ, পৃ. গ্র., পৃ. ৮০।
৫২. প্রাগুক্ত, পৃ. ৭৫-৭৬।
৫৩. Gen. 21:11-14.
৫৪. Gen. 21:17-19.
৫৫. স্পষ্টতই হাজেরা (রা) নিমীলিত চোখে আল্লাহ্র কাছে প্রার্থনায় সুগভীরভাবে মগ্ন ছিলেন।
৫৬. আল-কুরআন, 3:96.
৫৭. এই ধরনের স্পষ্ট প্রমাদ ঘটিয়াছে ইসমাঈলকে যখন নির্বাসনে পাঠানো হয় তাঁহার মায়ের সঙ্গে তখন তাঁহার বয়স প্রশ্নে। Gen. 21:5-9 অনুযায়ী ঐ সময়ে ইসমাঈলের বয়স আনুমানিক ১৬ বৎসর, অথচ Gen. 21:16, 19, 20-তে দেখা যায়, ইসমাঈল ঐ সময়ে 'শিশু' (বালক) মাত্র। পরের এই অভিমত সঠিক।


করিয়া অপবিত্র করিবে না। ইহা আরও বিশেষ করিয়া এইজন্য যে, কা'বা ও ইহার প্রাতিষ্ঠানিক রীতি-প্রথার প্রতি আরবরা বহু কাল হইতেই সম্মান প্রদর্শন করিয়া আসিতেছিল। এই অবস্থায় আরব উপজাতিগুলির সহিত যদি তাহাদের মিশিয়া যাইবার উদ্দেশ্যই থাকিত কিংবা উদ্দেশ্য উহার বিপরীত হইত তাহা হইলে তাহারা সেই ক্ষেত্রে স্বভাবতই ইবরাহীম ('আ)-এর স্মৃতিকে নেপথ্যে ফেলিয়া রাখিয়া বরং কা'বার রীতি-আচার যে রকম রহিয়াছে ঠিক হুবহু সেইভাবেই গ্রহণ করিত। কারণ এরকম কিছু করায় তাহাদের হারাইবার কিছুই ছিল না। ইহাতে যেমন তাহারা তাহাদের বসতিচ্যুত হইত না, তেমন মক্কার লাভজনক ব্যবসায়ের সুবিধাও হারাইত না। কিন্তু যেহেতু তাহারা উহা করে নাই, বরং তাহারা ইবরাহীম (আ) হইতে উদ্ভূত কা'বাঘর ও কা'বার রীতিপ্রথা যেমন প্রচলিত মানিয়া লয় তাহারা তাহাদের উদ্ভব ইবরাহীম হইতে এই সত্য স্মৃতিতে ধরিয়া রাখুক বা না রাখুক আরও যেহেতু আরব গোত্রগুলিও ইবরাহীম হইতে উদ্ভূত কা'বা ও কা'বার রীতি-প্রথাগুলি গ্রহণ করে ইবরাহীমের শাখা তথা ইয়াহুদীদের সঙ্গে তাহাদের বরাবরের যোগাযোগ রক্ষা করে, সেহেতু স্বাভাবিক সিদ্ধান্ত কেবল ইহাই হইতে পারে যে, তাহারা উহা করে এই কারণে যে, তাহারা জানিত কা'বা ও কা'বার রীতি-আচারগুলি ইবরাহীম হইতে উদ্ভূত। কাজেই একটি ইসমাঈলী গোত্রের পরবর্তী কালে মক্কায় যাইয়া বসতি স্থাপন সম্পর্কিত মুইরের তত্ত্বের এই যৌক্তিক বিশ্লেষণ, তাহার অন্যান্য ধারণা ও অনুমান এবং যেসব বাস্তবতার কথা তিনি স্বীকার করিয়া লইয়াছেন সেগুলির আলোকে যে সিদ্ধান্ত অনিবার্য তাহা হইল, কা'বা ও উহার রীতি-আচারগুলি ইবরাহীম (আ) হইতে উদ্ভূত।

মুইরের আলোচিত উল্লিখিত তত্ত্ব ও অনুমানগুলির ভিত্তি হইল জেনিসিস (আদিপুস্তক) ২১: ২১ সন্নিবেশিত তথ্যাদি। মুইর বলিয়াছেন, 'আবরাহাম যখন হ্যাগারকে আরবের উত্তরে, পারানের নির্জন প্রদেশে তাহার পুত্রসহ ছাড়িয়া আসিলেন'। [42] জেনেসিস-এর উল্লিখিত অনুচ্ছেদটিতে কেবলমাত্র বলা হইয়াছে, 'ইসমাঈল ও তাহার মাতা পারানের নির্জন ভূমিতে বাস করেন'। 'আরবের উত্তরে' কথাগুলি মুইরের নিজের। তিনি এই কথাগুলি বলিয়াছেন অন্যান্য খৃস্টান লেখক ও বাইবেলের ব্যাখ্যাকারগণ পারান বলিয়া যে অঞ্চলকে নির্দেশ করিয়াছেন বোধগম্য কারণেই তাহাদের ঐ বর্ণনার ভিত্তিতে। ওল্ড টেস্টামেন্টের তিন জায়গায় অন্যান্য ঘটনা প্রসঙ্গে পারানের উল্লেখ রহিয়াছে। [43] কিন্তু এই তিন জায়গায় কোথাও পারান নামটি বলিতে উহা ঠিক কোথায় অবস্থিত ছিল তাহা স্পষ্ট নহে। তাই জেনেসিস-এর ২১: ২১-এ উল্লিখিত পারান, যেখানে হাজেরা (রা) ও ইসমাঈল (আ) বসতি স্থাপন করিয়াছিলেন, উহার সঠিক অবস্থান নির্দেশের উপর 'তাঁহারা কোথায় বসতি স্থাপন করিয়াছিলেন' সেই প্রশ্নের উত্তর নির্ভরশীল।

মুইরের এই রচনা প্রকাশের অল্পকাল পরেই এই বিষয়টি লইয়া বাস্তবিকপক্ষে বিশদ আলোচনা করিয়াছেন সায়্যিদ আহমাদ খান বাহাদুর। [44] তবে যেহেতু সে সময়ের পর হইতে যুক্তিতর্ক এই যাবত আর তেমন বেশি অগ্রসর হয় নাই সেহেতু সায়্যিদ আহমাদ খান এই ব্যাপারে যে প্রধান বিষয়গুলির উপর আলোকপাত করিয়াছেন সেগুলির একটি পর্যালোচনা এবং উহাতে প্রসঙ্গের সহিত সম্পর্কিত অন্যান্য কিছু বাস্তব তথ্য ও বিষয় যোগ করা তাৎপর্যবহ বিবেচিত হইতে পারে। তিনি এই বাস্তবতার প্রতি মনোযোগ আকর্ষণ করিয়াছেন যে, প্রারম্ভিক যুগের মুসলিম ভূগোলবিদগণ পারান নামের তিনটি স্থানের কথা বলিয়াছেন। প্রথম নির্জন স্থান হইল, মক্কা আজ যেখানে অবস্থিত ও উহার সন্নিহিত কিছু পার্বত্য এলাকা। দ্বিতীয়টি হইল, মিসরের পূর্বাঞ্চলের একটি গ্রাম বা আরব পেত্রা। তৃতীয়টি হইল সমরকন্দের একটি জেলা। [45]

তিনি আরও উল্লেখ করিয়াছেন যে, খৃস্টান ও বাইবেলের ব্যাখ্যাকারগণ পারানের তিনটি ভিন্ন পরিচয় নির্দেশ করিয়াছেন। এগুলির মধ্যে একটি অভিমত অনুযায়ী, "বিরশেবার উত্তর সীমা হইতে মাউন্ট সিনাই পর্বত পর্যন্ত বিস্তৃত" এক বিশাল অঞ্চল। দ্বিতীয় অভিমত অনুযায়ী, বিরশেবা ও পারান অভিন্ন, ইহার আরেক নাম ছিল কাদেশ। তৃতীয় অভিমত ছিল, 'সিনাই পর্বতের পশ্চিম ঢালে অবস্থিত নির্জন অঞ্চল। [46]

প্রথম দুইটি স্থান নির্দেশ স্পষ্ট ভ্রান্ত। কারণ ওল্ড টেস্টামেন্টের খোদ বিবরণ হইতে পরিষ্কার দেখা যায়, পারান একটি স্পষ্টত ভিন্ন এলাকা যাহা খুব বিশাল কোন নির্জন অঞ্চল নহে, যাহা প্রথম স্থানটির বেলায় বলা হইয়াছে। আবার বিরশেবা বা কাদেশ [47] হইতে এই বর্ণনা ভিন্ন। পারানের তৃতীয় স্থাননির্দেশ যাহার আওতায় পারান সিনাই পর্বতের পশ্চিম ঢাল এলাকায় পড়ে, এই স্থান নির্দেশের সাথে এক মুসলিম ভৌগোলিকের বর্ণনার মিল পাওয়া যায়। মুসলিম ভৌগোলিকদের বর্ণনা অনুযায়ী এই পারান ছিল তাঁহাদের উল্লিখিত তিন পারানের অন্যতম। কিন্তু যতদূর সম্ভব এই এলাকাটি অন্তত ঐ সময়ে পারান বলিয়া পরিচিত ছিল না। কেননা মূসা (আ) যখন ইসরাঈলীদের লইয়া মিসর হইতে সিনাই গিয়াছিলেন তখনও এই যাত্রার বর্ণনায় পারান নামের কোন স্থানের উল্লেখ তিনি করেন নাই, যদিও তিনি ঐ একই এলাকার মধ্য দিয়াই অতিক্রম করেন। খুব সম্ভব এলাকাটি মূসা (আ)-এর ঐ অভিযাত্রার পরবর্তী কালে পারান নাম ধারণ করে। আর তাহার কারণ, তখন সেখানে বানু ফারান নামে এক কাহানী গোত্র বসতি স্থাপন করে। [48]

এই তিন স্থানের কোনটিই অবশ্য হাজেরা ও ইসমাঈলের বসতিস্থল হইতে পারে না। কেননা প্রথমত, ঐ অঞ্চল বা এলাকাগুলির কোনটিতেই এমন কোন জনশ্রুতি বা ঐতিহ্য নাই যাহাতে বলা হইয়াছে ঐ জায়গার কোন একটাতে হাজেরা ও ইসমাঈল বসতি স্থাপন করিয়াছিলেন। দ্বিতীয়ত, মূসা ('আ) ও তাঁহার অনুসারীরা সিনাই হইতে আরও অধিক দূর অগ্রসর হইয়াছিলেন এবং তাঁহারা 'তাবেরাহ', 'কিবরোথথাত্তাওয়া' ও 'হাযেরোখ" অতিক্রম করার পর পারানের নির্জন প্রদেশে যাত্রাবিরতি করিয়াছিলেন। [49] কিন্তু ঠিক কোন পথ ধরিয়া তাহারা অগ্রসর হইয়াছিলেন উহা স্পষ্ট নহে। খোদ খৃস্টান পণ্ডিতগণ কমপক্ষে পাঁচটি ভিন্ন দিকে তাহাদের যাত্রার কথা বলিয়াছেন। অধিকন্তু তাহারা ইসমাঈলের বংশধরেরা "শুর হইতে হবিলা অবধি বা আরব উপদ্বীপ-মিসর সীমান্ত হইতে ফোরাত নদীর মোহনা" পর্যন্ত ছড়াইয়া পড়ে বলিয়া উল্লেখ করিয়াছেন। কিন্তু তাহারা ঐ সিদ্ধান্ত দিয়াছেন ভুলবশত। কেননা জেনেসিস ২৫: ১৮-তে যাহার পরিচয় 'হবিলা' নামে উল্লেখ আছে উহা আসলে ধ্বনিগত কিছুটা মিলের ভিত্তিতে বাহরায়েন দ্বীপপুঞ্জের আভাল বা আউওয়ালকে হবিলা বলিয়া উল্লেখ করা হইয়াছে। প্রকৃতপক্ষে সায়্যিদ আহমাদ উল্লেখ করিয়াছেন যে, হবিলা আসলে ইয়ামানের কাছাকাছি ১৭° ৩০ উত্তর অক্ষাংশ ও ৪২° ৩৬ পূর্ব দ্রাঘিমাংশের মধ্যে অবস্থিত একটি স্থানের নাম। ইহার নামকরণ হয় যোকতান (কাহতান) [50]-এর হাভলা নামক এক পুত্রের নামে। ইহাতে প্রমাণিত হয় যে, “ইসমাঈলীরা ইয়ামানের উত্তর সীমান্ত হইতে সিরিয়ার দক্ষিণ সীমান্ত অবধি বিস্তীর্ণ অঞ্চলে বসতি স্থাপন করে। বর্তমানে এই অঞ্চলটির নাম হেজায। আর ইহাই কথিত পারানের সহিত অভিন্ন যাহার কথা মুসলিম ভৌগোলিকগণ উল্লেখ করিয়াছেন। [51] ইহা আরও উল্লেখযোগ্য যে, আর, কিউয়েনেন সম্পাদিত ও লুগদুনি বাটাভোরাম-এ ১৮৫১ সালে প্রকাশিত সামারিটান পেন্টাটিউক-এর আরবী ভাষ্যের এক টীকায় বলা হইয়াছে যে, ফারান ও হিজায এক ও অভিন্ন অঞ্চল। [52]

তৃতীয়ত, জেনেসিস ২১: ১৪-১৫-এর প্রতি তীক্ষ্ণ দৃষ্টিপাত করিলে বুঝিতে পারা যায় যে, পরপর দুইটি অনুচ্ছেদ এক ও অভিন্ন উপলক্ষের কথা প্রকৃতপক্ষেই বর্ণনা করিতেছে না। জেনেসিস ২১: ১৪-র বর্ণনায় বলা হইয়াছে যে, হাজার (হাজেরা) বিরশেবার নির্জন প্রান্তরে ছুটাছুটি করিয়াছিলেন। ইহার অর্থ এই নয় যে, হাজেরা বিরশেবাতেই ছুটাছুটি করিয়াছিলেন, তাহার বেশি দূর আর অগ্রসর হন নাই। জেনেসিস ২১: ১৫-তে বলা হইয়াছে, “পাত্রের পানি শেষ হইয়া গিয়াছিল আর তিনি তাঁহার পুত্রকে একটি ঝোপের নিচে রাখিয়া দেন।" এই বিবৃতি দ্বারাও ইহা বুঝায় না যে, পাত্রে যে পানি লইয়া তিনি গৃহ পরিত্যাগ করিয়াছিলেন সেই 'পানিই' এইভাবে নিঃশেষিত হইয়া গেল যাহার জন্য তিনি তাহার 'পুত্রকে একটি ঝোপের নিচে শয়ন করাইয়া রাখিয়া যাইতে' বাধ্য হন। বিরশেবা এমনই এক স্থান যাহা তাঁহার সুপরিচিত। কেননা ইবরাহীম ('আ) তাঁহাকে লইয়া সেখানে দীর্ঘকাল বসবাস করেন। এই বিরশেবা অঞ্চলে বেশ কিছু পানির কূপও ছড়াইয়া ছিটাইয়া ছিল। ওল্ড টেস্টামেন্টের স্পষ্ট বর্ণনা অনুযায়ী বিভিন্ন জায়গায় বিভিন্ন ব্যক্তি এই কূপগুলি খনন করিয়াছিল। বিরশেবার কূপটি স্বয়ং ইবরাহীম ('আ) খনন করেন। কাজেই সব কূপের কথা হাজেরার না জানা থাকিবার কথা নহে। তাই অল্প সন্ধান করিলেই এলাকার অনেকগুলি কূপের যে কোন কূপ হইতে তিনি আরও পানি পাইতেই পারিতেন। বাস্তবিকপক্ষে ওল্ড টেস্টামেন্টের লেখকরা এখানে দুইটি অত্যন্ত সংক্ষিপ্ত একের পর এক অনুচ্ছেদে হাজেরার দীর্ঘ ও কষ্টসাধ্য ঘোরাঘুরির কথা লিখিয়াছেন। তাঁহার এই ঘোরাঘুরি শুরু হইয়াছিল বিরশেবায় ও ইহার শেষ পর্যায়টি ছিল এমন এক স্থানে যেখানে কোন পানি ছিল না কিংবা তাঁহার পাত্রে পানি পূরণের ব্যবস্থাও কোনভাবে করা যাইতেছিল না। তাই এমন চরম দুর্দশা ও হতাশার মধ্যে পড়িয়া তিনি তাঁহার শিশু ইসমাঈলকে একটি ঝোপের কাছে ফেলিয়া রাখেন। বস্তুত তাঁহার স্থান হইতে স্থানান্তর গমনের কাল ও স্থানের দিক হইতে দুইটি ভিন্ন ঘটনা বর্ণিত হইয়াছে পর পর ঘন সন্নিবিষ্ট দুইটি অনুচ্ছেদে।

চতুর্থত, যে কারণ ও পরিস্থিতিতে হাজেরা ও ইসমাঈলকে তাহাদের গৃহ হইতে নির্বাসনে পাঠানো হয় এবং যাহার বিবরণ ওল্ড টেস্টামেন্টে রহিয়াছে তাহাতে বুঝা যায় যে, সারাহ ও ইবরাহীম ('আ) যেখানে বাস করিতে থাকেন সেখান হইতে তাহারা বেশ অনেক দূরবর্তী স্থানে চলিয়া যান। জেনেসিস-এর বর্ণনা অনুযায়ী, সারার ইচ্ছা ছিল, ইসমাঈল যেন তাহার নিজ পুত্র ইসহাকের সহিত অংশীদার হিসাবে ইবরাহীমের উত্তরাধিকারী না হন। তাই জেনেসিসের বিবরণ অনুযায়ী ইহা ছিল ঈশ্বরের পরিকল্পনা যে, ইসমাঈল ('আ) ও তাঁহার বংশধরগণ আরেক বসতি স্থাপন ও তাহাদের বংশ বিস্তার করিবে। জেনেসিসে অত্যন্ত প্রাণবন্ত চিত্রবৎ বর্ণনা রহিয়াছে এই বিষয়টির এইভাবেঃ

১১. "এই কথায় অব্রাহাম আপন পুত্রের বিষয়ে অতি অসন্তুষ্ট হইলেন"।

১২. "আর ঈশ্বর অব্রাহামকে কহিলেন, ঐ বালকের বিষয়ে ও তোমার ঐ দাসীর বিষয়ে অসন্তুষ্ট হইও না; সারা তোমাকে যাহা বলিতেছে, তাহার সেই কথা শুন; কেননা ইসহাকেই তোমার বংশ আখ্যাত হইবে"।

১৩. "আর ঐ দাসীপুত্র হইতেও আমি এক জাতি উৎপন্ন করিব, কারণ সে তোমার বংশীয়"।

১৪. "পরে অব্রাহাম প্রত্যুষে উঠিয়া রুটি ও জলপূর্ণ কুপা লইয়া হাগারের স্কন্ধে দিয়া বালকটীকে সমর্পণ করিয়া তাহাকে বিদায় করিলেন" ইত্যাদি। [53]

কাজেই জেনেসিসের বর্ণনা হইতে ইহা অত্যন্ত স্পষ্ট যে, বস্তুতপক্ষে সারার ইচ্ছাক্রমে নহে, বরং সুনিশ্চিতভাবে ইহা ছিল মহান আল্লাহ্র পরিকল্পনা। তিনিই ইসমাঈলের সমৃদ্ধ ভবিষ্যতের আশ্বাস দিয়াছিলেন ইবরাহীমকে। তিনিই ইবরাহীমকে নির্দেশ দিয়াছিলেন হাজেরা ও ইসমাঈলকে ভিন্ন দেশে নির্বাসনে পাঠাইতে। ইবরাহীমকে ঈশ্বর বলিয়াছিলেন, "কেননা ইসহাকেই তোমার বংশ আখ্যাত হইবে"। ইহা ছিল একাধারে ঈশ্বরের তরফ হইতে ইবরাহীমের জন্য সান্ত্বনা, সেইসাথে এই আশ্বাসও যে, ইসমাঈলের নির্বাসনের অর্থ ইবরাহীমের বংশধারার অবসান-কিংবা সঙ্কোচন নহে। জেনেসিস-এর এই বর্ণনা, "ইসহাকেই তোমার বংশ আখ্যাত হইবে" বলিতে ইহা বুঝাইয়াছে যে, ইবরাহীম ('আ) ঐ সময়ে 'যেখানে ছিলেন সেখানে' ইসহাকের মাধ্যমে তাঁহার বংশবৃদ্ধি চলিতে থাকিবে। অন্যদিকে জেনেসিসের অন্য বর্ণনায় এই বাস্তব বিষয়ের উপর জোর দেওয়া হইয়াছে যে, "ইসমাঈল ইবরাহীমের রক্তের ধারক, তবে তাঁহার সংখ্যাবৃদ্ধি ঘটিবে ও উহা একটি জাতিতে পরিণত হইবে, তবে তাহা এখানে নহে, অন্য একটি অঞ্চলে"। ঈশ্বরের এই পরিকল্পনার একান্ত প্রাকৃতিক কারণে (আর ইসমাঈলকে তাঁহার পিতার সম্পত্তি হইতে আলাদা রাখিবার সারার ইচ্ছাটিও ছিল ঈশ্বরের পরিকল্পনার একটি অংশ) হাজেরা ও ইসমাঈল তাই বিরশেবা ও সিনাইয়ের কোন এক অঞ্চলে বসতি করিবেন তাহা হইতে পারে না। কেননা বিরশেবা ও সিনাই ছিল একান্তভাবেই ইবরাহীম ও সারার কর্মতৎপরতার অঞ্চলগত আওতার মধ্যে। আর তাই হাজেরা ও ইসমাঈলকে অনেক দূরে ও নির্জন বসতিহীন স্থানে পাঠানোই বিধির পূর্বনির্ধারিত বিধান। জেনেসিস-এ পারান/ফারানের উল্লেখ আছে হাজেরা ও ইসমাঈলের বসতিস্থল হিসাবে। কিন্তু উল্লিখিত কারণেই পারান আর যাহাই হউক খৃস্টান পণ্ডিতদের কল্পনা-অনুমান অনুযায়ী বিরশেবা ও সিনাইয়ের আশপাশে কোথাও হইতে পারে না।

পঞ্চমত, হাজেরা ও ইসমাঈলের বসতির সঠিক অবস্থান সম্পর্কে জেনেসিস ২১-এ একটি ইঙ্গিত রহিয়াছে। উহাতে বলা হইয়াছে যে, হাজেরা যখন একান্ত নিরুপায় ও দুর্দশাগ্রস্ত হইয়া ঈশ্বরের নিকট প্রার্থনা করিলেন এবং ইসমাঈল ক্ষুধা-তৃষ্ণায় কাঁদিয়া উঠিলেন, তখন ঈশ্বর তাঁহাদের আকুতিতে সাড়া দিলেন। এই প্রসঙ্গে জেনেসিসে বলা হইয়াছে:

১৭. "তখন ঈশ্বর বালকটীর রব শুনিলেন; আর ঈশ্বরের দূত আকাশ হইতে ডাকিয়া হাগারকে কহিলেন, হাগার তোমার কি হইল? ভয় করিও না, বালকটা যেখানে আছে, ঈশ্বর তথা হইতে উহার রব শুনিলেন"।

১৮. "তুমি উঠিয়া বালকটাকে তুলিয়া তোমার হাতে ধর; কারণ আমি উহাকে এক মহাজাতি করিব"।

১৯. "তখন ঈশ্বর তাহার চক্ষু খুলিয়া দিলেন, তাহাতে সে এক সজল কূপ দেখিতে পাইল, আর তথায় গিয়া কুপাতে জল পুরিয়া বালকটিকে পান করাইল"। [54]

এমনি করিয়া আল্লাহ হাজেরা ও ইসমাঈলের জন্য তাঁহারা যেখানে ছিলেন সেখানে একটি পানির কূপের ব্যবস্থা করিলেন (ঈশ্বর শিশুটির রব শুনিলেন যেখানে সে ছিল)। [55] হাজেরাকে কূপটি বাহির করার জন্য আশেপাশে দৃষ্টি ফেলিতে কিংবা দূরে হাঁটিয়া গিয়া সন্ধানও করিতে হয় নাই। "ঈশ্বর তাঁহার চক্ষু খুলিয়া দিলেন" অর্থাৎ ঈশ্বর তাঁহার চক্ষু উন্মিলিত করিয়া দিলে তিনি (হাজেরা) পানির একটি কূপ দেখিতে পাইলেন। ইহা কোন সাময়িক স্বস্তির বিষয় ছিল না। ইহা ছিল ঈশ্বরের পক্ষ হইতে মাতা ও শিশুর জন্য বিশেষ উপহার যাহা হইবে তাঁহাদের বাঁচিয়া থাকার ও বসতি করার অবলম্বন। ইহা ঈশ্বরের পরিকল্পনা ও ইসমাঈলকে দিয়া একটি জাতি গড়ার জন্য তাঁহার অঙ্গীকার। ঈশ্বর প্রদত্ত পানির কূপটি বিরশেবা বা তৎসন্নিহিত অঞ্চলের কোন কূপ হইতে পারে না কেবল এই কারণে যে, এইসব কূপের কথা ওল্ড টেস্টামেন্টে উল্লেখ নাই, বরং উল্টা ওল্ড টেস্টামেন্টের অত্যন্ত স্পষ্ট বর্ণনায় বলা আছে যে, এই কূপগুলি মানুষের হাতে তৈরী। ইহা ছাড়াও স্থানীয় এমন কোন জনশ্রুতির অস্তিত্ব নাই যাহাতে বলা হইয়াছে, এখন বা অতীতে কোন সময়ে ওখানে ঐশ্বরিক কারণে সৃষ্ট কোন কূপের অস্তিত্ব ছিল। বিরশেবা অঞ্চলের কোন কূপের সহিত হাজেরা ও ইসমাঈলকে প্রদত্ত ঐশ্বরিক কূপটিকে অভিন্ন করিয়া শনাক্ত করার যে কোন প্রয়াস তাই জেনেসিসে স্পষ্ট করিয়া উক্ত কথা ও অনুচ্ছেদগুলির বক্তব্যের সরাসরি পরিপন্থী। তাই নিশ্চিতভাবে কূপটি কা'বা ঘরের পাশে অবস্থিত যমযম কূপ ছাড়া আর অন্য কোন কূপই হইতে পারে না। হাজেরা ও ইসমাঈলের আমল হইতেই এই কূপ ইসমাঈলের বংশধর ও যাহারা তথায় বসতি স্থাপন করিয়াছে উহাদের জন্য পানির স্থায়ী উৎস হিসাবে বিদ্যমান ছিল। ইহাতে কেবল একবার স্বল্পকালের জন্য ব্যতিক্রম ঘটিয়াছে যখন কিছু লোক যমযম কূপটিকে কৃত্রিম উপায়ে বন্ধ করিয়া দেয়।

সর্বশেষে মক্কার নামকরণ প্রসঙ্গ। কুরআনে মক্কাকে বাক্কা বলিয়াও উল্লেখ করা হইয়াছে। [56] এই বাক্কার উল্লেখ বাইবেলের দাউদের গীতসংহিতা (Psalm of David)-এও রহিয়াছে, আর সেই সাথে কূপেরও উল্লেখ রহিয়াছে। ৮৪: ৬ চরণে বলা হইয়াছে: "Who passing through the velly of Baca make it a well; the rain also filleth the pools".

"তাহারা বাকা উপত্যকা দিয়া গমন করিয়া তাহা পানির কূপে পরিণত করে; বৃষ্টির পানিতেও নানা জলাধার পূর্ণ হইয়া যায়"।

উল্লিখিত অনুচ্ছেদে 'বাকা' শব্দটি স্পষ্টত কুরআনে উল্লিখিত 'বাক্কা', আর যে কূপের কথা বলা হইয়াছে তাহা যমযম কূপ বৈ আর কিছুই নহে। ইহাও উল্লেখযোগ্য যে, ভূগোল ও ইতিহাস সংক্রান্ত প্রাচীন লেখাগুলিতে মক্কায় প্রবল বৃষ্টিপাতের কারণে বন্যা হইবার উল্লেখ রহিয়াছে। এই বৈশিষ্ট্যটি আধুনিক কালেও যে একেবারে অপরিচিত তাহা নহে। ফলে বাইবেলে যে জায়গাটি এইভাবে চিহ্নিত করা হইয়াছে, তাহা নিটোলভাবেই মক্কা ছাড়া আর কোন স্থানই হইতে পারে না। বলা হইয়াছে-"বৃষ্টির বারিধারাও জলাধারসমূহ পূর্ণ করিয়া থাকে"।

তাই জেনেসিসের বর্ণনায় কতিপয় বিভ্রাট সত্ত্বেও কুরআনে যেসব মূল বৈশিষ্ট্যের উল্লেখ রহিয়াছে উহা ও অন্যান্য ইসলামী বর্ণনার সহিত জেনেসিসের বর্ণনার সামঞ্জস্য রহিয়াছে। [57] এইসব বর্ণনা সম্মিলিতভাবে প্রমাণ করে যে, ঐশ্বরিক পরিকল্পনা ও ব্যবস্থার আওতায়ই হাজেরা ও ইসmaঈল ('আ) মক্কায় বসতি স্থাপন করিয়াছিলেন।

📘 সীরাত বিশ্বকোষ > 📄 (গ) ইসমাঈল বা ইসহাক ('আ)?

📄 (গ) ইসমাঈল বা ইসহাক ('আ)?


(গ) ইসমাঈল বা ইসহাক ('আ)?
ইবরাহীম ('আ)-এর সহিত কা'বাঘর ও ইহার আচার-অনুষ্ঠানের কোন সম্পর্ক নাই, প্রাচ্যবিদ্যাবিশারদগণ ইহা (তাহাদের উক্ত মনগড়া বিশ্বাস) প্রমাণিত করার জন্য হাজেরা ও ইসমাঈল ('আ)-এর মক্কায় বসতি স্থাপনের বাস্তব ঘটনাকে অস্বীকার করেন। তাহারা ইহাও অস্বীকার করেন যে, ইবরাহীম ('আ) ইসমাঈলকে কুরবানী দিতে মনস্থ করেন নাই। তাহারা ইহাও বলিতে চাহিয়াছেন এই বক্তব্যকে পোক্ত করার জন্য যে, ইসহাকই হইতেছেন ঈশ্বরের প্রতিশ্রুত শিশু ও ইসহাকই কেবল ঐশ্বরিক আনুকূল্যের পাত্র। কিন্তু ইসমাঈলীরা ইসলামের বহু কাল আগেই যে মক্কা ও সাধারণভাবে গোটা আরবে বসতি স্থাপন করিয়াছিল, এই অনস্বীকার্য সত্য ও বাস্তবতার সম্মুখীন হইয়া প্রাচ্যতত্ত্ববিদগণের মক্কা ও তৎসন্নিহিত অঞ্চলে ইসমাঈলীদের পরবর্তী কালে তথায় গমনপূর্বক বসতি স্থাপনের তত্ত্ব হাজির করিয়াছেন।
অনুরূপভাবে সমান অবিসংবাদিত বাস্তবতা যে, ইসমাঈলের বংশধরগণ সত্যই ঈশ্বরের অঙ্গীকার অনুযায়ী ব্যাপক বংশবিস্তার করিয়া এক বিরাট জাতি হিসাবে আত্মপ্রকাশ করিয়াছিল—ইহার মুকাবিলায় প্রাচ্যবিদগণ আশ্রয় লইয়াছেন পার্থিব ও আধ্যাত্মিক আশীর্বাদ।
হযরত মুহাম্মাদ (স) ১১১
তত্ত্বের। আর এই অবকাশে বাইবেলের ব্যাখ্যাকারগণ ও সেই সাথে প্রাচ্যতত্ত্ববিদগণও বলিতে চাহিয়াছেন যে, ঈশ্বর ইসমাঈলের অনুকূলে যে পার্থিব সমৃদ্ধির অঙ্গীকার করিয়াছিলেন তাহা ইসমাঈলের ১২ পুত্র ও তাহাদের অসংখ্য বংশধরদের মাধ্যমে পূরণ হইয়াছে। কিন্তু ইসহাকই কেবল ছিলেন ঈশ্বরের পার্থিব ও আধ্যাত্মিক উভয় আশীর্বাদের উদ্দিষ্ট। প্রাচ্যতত্ত্ববিদদের এই বক্তব্য ছাড়াও তাহারা যে ইসমাঈলকে ইবরাহীমের উদ্দিষ্ট কুরবানীর বস্তু করার বিরোধিতা করিয়াছেন উহার প্রধান অবলম্বন হইতেছে জেনেসিস ২২, বিশেষ করিয়া ২২ : ২-এর বক্তব্য।
'পার্থিব' ও 'আধ্যাত্মিক বিষয়'এই দুইয়ের মধ্যকার পার্থক্য আসিয়াছে মূলত 'সাম্রাজ্য' ও প্যাপাসির (পোপতন্ত্র, যাজকতন্ত্র) মধ্যে সম্পর্ক সংক্রান্ত মধ্যযুগীয় ইউরোপের ধ্যান-ধারণা হইতে। এই তত্ত্ব বা ধারণা অনুযায়ী, পার্থিব বা জড়জাগতিক বিষয় সম্রাটের এখতিয়ারাধীন, আর আধ্যাত্মিক বিষয়সমূহের এখতিয়ার হইতেছে ঈশ্বর বা পোপের রাজ্য। 'সাম্রাজ্য ও প্যাপাসির এই দ্বৈততা, ইহাই ধর্ম ও রাষ্ট্রের মধ্যে পার্থক্যের আধুনিক পাশ্চাত্য চিন্তাধারার মূলে সক্রিয়। এই ধারণার ভাল দিক যাহাই থাকুক না কেন, ইহার কট্টর অনুসরণ ও ইতিহাসের ঘটনাবলীর বাস্তবতার নিরিখে ইবরাহীমের পুত্রদের সহিত সেই অস্পষ্ট আদিম অতীতে ঈশ্বর কী নির্ধারণ করিয়াছিলেন তাহার প্রয়োগ ঘটা সম্ভব ছিল না।
প্রাচ্যতত্ত্ববিদগণ যাহা বলিতে চাহিয়াছেন তাহার সবকিছু ওল্ড টেস্টামেন্টের বিবরণ অনুযায়ী প্রমাণিত হয় নাই। সংশ্লিষ্ট অনুচ্ছেদগুলিতে ভাসা ভাসা দৃষ্টিপাত করিলেও স্পষ্ট হইয়া উঠে যে, ইসমাঈল ও ইসহাক উভয়কেই আল্লাহ একই অঙ্গীকার প্রদান করিয়াছিলেন। সেখানে এমন কিছুই নাই যাহাতে বলা হইয়াছে, আল্লাহ ইসহাকের ব্যাপারে এমন অঙ্গীকার করেন যাহা তাঁহার পূর্ববর্তী ইসমাঈলের ব্যাপারে করেন নাই; বরং ওল্ড টেস্টামেন্টের সংশ্লিষ্ট অনুচ্ছেদগুলি সতর্কতার সহিত পাঠ করিলে দেখা যাইবে, ইসমাঈলের প্রতি আল্লাহ যে অঙ্গীকার করিয়াছিলেন তিনি তাঁহার সেই অঙ্গীকারের কয়েকবার পুনরুক্তি করিয়াছেন, এমনকি ইসহাকের জন্মের পরেও। ইহা তাই বোধগম্য নহে যে, বাইবেলের ব্যাখ্যাকারগণ ও প্রাচ্যতত্ত্ববিদগণ কোথা হইতে এমন ধারণা পাইলেন যে, ইসমাঈলকে কেবল পার্থিব উন্নতির অঙ্গীকার করা হইয়াছিল, আর ইসহাক পার্থিব ও আধ্যাত্মিক উভয় অঙ্গীকার পাইয়াছিলেন।
এখানে দুই-একটি মাত্র দৃষ্টান্ত দেওয়া যাইতে পারে। ইসমাঈল ও ইসহাকের জন্মের বহু কাল আগে ইবরাহীম ('আ) তাঁহার বংশধরদের বিষয়ে আল্লাহ্র রহমত করিয়াছিলেন। জেনেসিস, ১২ অধ্যায়ে এই সম্পর্কে বলা হইয়াছে:
১. "সদাপ্রভু অব্রামকে কহিলেন, তুমি আপন দেশ, জ্ঞাতিকুটুম্ব ও পৈত্রিক বাটী পরিত্যাগ করিয়া, আমি যে দেশ তোমাকে দেখাই, সেই দেশে চল”।
২. "আমি তোমা হইতে এক মহাজাতি উৎপন্ন করিব, এবং তোমাকে আশীর্ব্বাদ করিয়া তোমার নাম মহৎ করিব, তাহাতে তুমি আশীর্ব্বাদের আকর হইবে”।
১১২ সীরাত বিশ্বকোষ
৩. "যাহারা তোমাকে আশীর্ব্বাদ করিবে, তাহাদিগকে আমি আশীর্ব্বাদ করিব, যে কেহ তোমাকে অভিশাপ দিবে, তাহাকে আমি অভিশাপ দিব; এবং তোমাতে ভূমণ্ডলের যাবতীয় গোষ্ঠী আশীর্ব্বাদ প্রাপ্ত হইবে”।
৪. "পরে অব্রাম সদাপ্রভুর সেই বাক্যানুসারে যাত্রা করিলেন; এবং লোটও তাহার সঙ্গে গেলেন। হারণ হইতে প্রস্থান কালে অব্রামের পঁচাত্তর বৎসর বয়স ছিল" ।৫৮
হাজেরা যখন ইসমাঈল ('আ)-কে গর্ভে ধারণ করেন তখনও প্রভুর সেই অঙ্গীকার আরও সুনির্দিষ্ট ভাষায় কয়েকবার পুনরাবৃত্ত করা হয়। স্বয়ং আল্লাহ ইসমাঈলের নাম রাখেন। এই সম্পর্কিত অত্যন্ত তাৎপর্যপূর্ণ অনুচ্ছেদটির (১৬ঃ ১০-১১) পাঠ নিম্নরূপঃ
১০. "সদাপ্রভুর দূত তাহাকে আরও বলিলেন, আমি তোমার বংশের এমন বৃদ্ধি করিব যে, বাহুল্য প্রযুক্ত অগণ্য হইবে”।
১১. "সদাপ্রভুর দূত তাহাকে আরও কহিলেন, দেখ, তোমার গর্ভ হইয়াছে, তুমি পুত্র প্রসব করিবে ও তাহার নাম ইম্মায়েল (ঈশ্বর শুনেন) রাখিবে, কেননা সদাপ্রভু তোমার দুঃখ শ্রবণ করিলেন”। ৫৯
তৃতীয়ত, আল্লাহ্র এই অঙ্গীকারটি হইয়াছিল রহমত প্রদর্শনের অঙ্গীকারের পুনরাবৃত্তি করিয়া। এই রহমত প্রদান করা হইয়াছিল ইবরাহীম ও ইসমাঈলকে, ইসহাকের জন্মের বহু পূর্বে। ঐ সময় ইবরাহীমের বয়স ছিল ৯৯ বৎসর ও ইসমাঈলের ১৩ বৎসর। এই অঙ্গীকারটি সম্পাদিত ও চূড়ান্ত হয় প্রতীকী খৎনার মাধ্যমে। ইবরাহীম ও ইসমাঈল ('আ) এই আনুষ্ঠানিকতাও পালন করেন ইসহাকের জন্মের আগে। আর সেই উপলক্ষে ও সময়ে আল্লাহ পিতা অবরামের নাম আব্রাহামে (ইবরাহীম) পরিবর্তিত করেন। এই বিষয়ে ওল্ড টেস্টামেন্টের পাঠ (আদিপুস্তক, অধ্যায় ১৭) নিম্নরূপ:
১. অব্রামের নিরানব্বই বৎসর বয়সে সদাপ্রভু তাঁহাকে দর্শন দিলেন ও কহিলেন, আমি সর্ব্বশক্তিমান ঈশ্বর, তুমি আমার সাক্ষাতে গমনাগমন করিয়া সিদ্ধ হও। ২. আর আমি তোমার সহিত আপন নিয়ম স্থির করিব, ও তোমার অতিশয় বংশবৃদ্ধি করিব। ৩. তখন অব্রাম উবুড় হইয়া পড়িলেন, এবং ঈশ্বর তাঁহার সহিত আলাপ করিয়া কহিলেন, দেখ, আমিই তোমার সহিত আপন নিয়ম স্থির করিতেছি, তুমি বহুজাতির আদিপিতা হইবে। ৫. তোমার নাম অব্রাম (মহাপিতা) আর থাকিবে না, কিন্তু তোমার নাম অব্রাহাম (বহু লোকের পিতা) হইব; কেননা আমি তোমাকে বহু জাতির পিতা করিলাম। ৭. আমি তোমার সহিত ও পুরুষানুক্রমে তোমার ভাবী বংশের সহিত যে নিয়ম স্থাপন করিব, তাহা চিরকালের নিয়ম হইবে; ফলতঃ আমি তোমার ঈশ্বর ও তোমার ভাবী বংশের ঈশ্বর হইব। ৯. ঈশ্বর অব্রাহামকে আরও কহিলেন, তুমিও আমার নিয়ম পালন করিবে, তুমি ও তোমার ভাবী বংশ পুরুষানুক্রমে তাহা পালন করিবে। ১০. তোমাদের সহিত ও তোমার ভাবী বংশের সহিত কৃত আমার যে নিয়ম তোমরা পালন করিবে, তাহা এই, তোমাদের প্রত্যেক
হযরত মুহাম্মাদ (স) ১১৩
পুরুষের ত্বকচ্ছেদ হইবে। ২৪. অব্রাহামের লিঙ্গাগ্রের ত্বকচ্ছেদন কালে তাঁহার বয়স নিরানব্বই বৎসর। ২৫. তাঁহার পুত্র ইম্মায়েলের লিঙ্গাগ্রের ত্বকচ্ছেদন কালে তাহার বয়স তের বৎসর। ২৬. সেই দিনেই অব্রাহাম ও তাঁহার পুত্র ইম্মায়েল, উভয়ের ত্বকচ্ছেদ হইল। ২৭. আর তাঁহার গৃহজাত এবং পরজাতীয়দের নিকটে মূল্য দ্বারা ক্রীত তাঁহার গৃহের সকল পুরুষেরও ত্বকচ্ছেদ সেই সময়ে হইল”। ৬০
এইভাবে ইবরাহীম ও তাঁহার বীজ ইসমাঈলের সহিত আল্লাহ্র অঙ্গীকার সম্পাদিত হয়। আর ঐ অঙ্গীকার মোহরাঙ্কিত করা হয় ইসহাকের জন্মের আগে প্রতীকী খৎনার মাধ্যমে। বাস্তবিকপক্ষে, ঐ উপলক্ষে আল্লাহ ইবরাহীম ('আ)-কে সারার গর্ভে তাঁহার আরও এক পুত্র সন্তানের সুসংবাদ দেন এবং বলেন যে, তাহার সহিতও অঙ্গীকার করা হইবে। এখন এই সম্পর্কিত জেনেসিস-এর মূল পাঠটি লক্ষ্য করুন: ৬১
১৫. আর ঈশ্বর অব্রাহামকে কহিলেন, তুমি তোমার স্ত্রী সারীকে আর সারী বলিয়া ডাকিও না; তাহার নাম সারা (রাণী) হইল। ১৬. আর আমি তাহাকে আশীর্ব্বাদ করিব, এবং তাহা হইতে এক পুত্রও তোমাকে দিব; আমি তাহাকে আশীর্ব্বাদ করিব, তাহাতে সে জাতিগণের (আদিমাতা) হইবে, তাহা হইতে লোকবৃন্দের রাজগণ উৎপন্ন হইবে। ১৯. তখন ঈশ্বর কহিলেন, তোমার স্ত্রী সারা অবশ্য তোমার নিমিত্তে পুত্র প্রসব করিবে, এবং তুমি তাহার নাম ইসহাক (হাস্য) রাখিবে, আর আমি তাহার সহিত আমার নিয়ম স্থাপন করিব, তাহা তাহার ভাবী বংশের পক্ষে চিরস্থায়ী নিয়ম হইবে। ২১. কিন্তু আগামী বৎসরের এই ঋতুতে সারা তোমার নিমিত্তে যাহাকে প্রসব করিবে সেই ইসহাকের সহিত আমি আপন নিয়ম স্থাপন করিব (আদিপুস্তক, ১৭ অধ্যায়)।
এখানে উল্লেখ করা দরকার যে, উল্লিখিত অনুচ্ছেদে ঈশ্বরের বাণীগুলিতে বলা হইয়াছে, "আর আমি তাহার সহিত আমার নিয়ম স্থাপন করিব" (অর্থাৎ ইসহাক, জেনেসিস ১৭: ১৯) এবং "সারা তোমার নিমিত্তে যাহাকে প্রসব করিবে, সেই ইসহাকের সহিত আমি আপন নিয়ম স্থাপন করিব” (জেনেসিস ১৭: ২১)। এই বাণীগুলি ঈশ্বর ইবরাহীম ও তাঁহার বংশধরের সঙ্গে যে চুক্তি আগেই করিয়াছেন উহারই পুনরুক্তি প্রকৃতির। কেননা আরও বলা হইয়াছে: "তাঁহার পরে বংশপরম্পরায় এক চিরস্থায়ী অঙ্গীকারের জন্য" যাহা উল্লিখিত অনুচ্ছেদের পূর্ববর্তী শ্লোকে উল্লেখ করা হইয়াছে (অর্থাৎ জেনেসিস ১৭: ৭, ৯-১১)। জেনেসিস ১৭: ১৯ ও ২১-এর বর্ণনাগুলিতে আল্লাহ কর্তৃক ইবরাহীম ('আ)-কে প্রদত্ত এই মর্মে আশ্বাস দেন যে, ইসহাক ভূমিষ্ঠ হইবার পর তাহাকেও ঐ অঙ্গীকারের অন্তর্ভুক্ত করা হইবে যে অঙ্গীকার ইতোমধ্যে ইবরাহীম ও তাঁহার পুত্র ইসমাঈলের সহিত চূড়ান্ত হইয়াছিল তাঁহাদের উভয়েরই একই দিনে খৎনার মাধ্যমে। তাই এই বিবৃতিগুলিকে কোনভাবেই এই অর্থে গ্রহণ করা যাইতে পারে না যে, আল্লাহ ইবরাহীম ও ইসমাঈলের সহিত অঙ্গীকার বাতিল করিয়া দিয়াছেন অথবা তিনি ইবরাহীমের সহিত আগে সম্পাদিত অঙ্গীকার বাতিল বা সংশোধন করিয়া ইসহাকের সহিত নূতন করিয়া অঙ্গীকার
১১৪ সীরাত বিশ্বকোষ
করিতেছেন। ইহা ছাড়া আরও তিনটি বিষয় হইতে ইহা পরিষ্কার যে, উল্লিখিত বিবৃতিগুলির অর্থ ইসহাকের সহিত সম্পদিত অঙ্গীকারের প্রশ্নে ধারাবাহিকতা ও সম্পত্যয় মাত্র। বিষয় তিনটি হইল:
(ক) ইসমাঈল ('আ) ও তাঁহার বংশধরদের বেলায় যে অঙ্গীকার করা হইয়াছে তাহারই পুনরাবৃত্তি হইয়াছে ইসহাকের জন্মের পর; ৬২
(খ) ইসহাক ('আ)-এর জন্মের পর ইবরাহীম ('আ) তাঁহার জন্মের ৮ম দিবসে আল্লাহ্র নির্দেশ অনুযায়ী তাঁহার খৎনা করিয়া কেবল তাহাকে ঐ অঙ্গীকারের আনুষ্ঠানিকভাবে অন্তর্ভুক্ত করেন; ৬৩
(গ) আর ইহার পর এমন কোন ঘটনা ঘটে নাই যাহা হইতে বুঝা যায় যে, আল্লাহ্র অঙ্গীকার অতঃপর একান্তভাবে ইসহাক ও তাঁহার বংশধরদের ক্ষেত্রেই বুঝিতে হইবে। ইসহাকের জন্ম ও অঙ্গীকারে তাঁহার অন্তর্ভুক্তি অনুষ্ঠান সম্পর্কিত পাঠ নিম্নরূপ:
১. "পরে সদাপ্রভু আপন বাক্যানুসারে সারার তত্ত্বাবধান করিলেন; সদাপ্রভু যাহা বলিয়াছিলেন, সারার প্রতি তাহা করিলেন। ২. আর সারা গর্ভবতী হইয়া ঈশ্বরের উক্ত নিরূপিত সময়ে অব্রাহামের বৃদ্ধকালে তাঁহার নিমিত্ত পুত্র প্রসব করিলেন। ৩. তখন অব্রাহাম সারার গর্ভজাত নিজ পুত্রের নাম ইসহাক, হাস্য, রাখিলেন। ৪. পরে ঐ পুত্র ইসহাকের আট দিন বয়সে অব্রাহাম ঈশ্বরের আজ্ঞানুসারে তাহার ত্বকচ্ছেদ করিলেন। ৫. অব্রাহামের এক শত বৎসর বয়সে তাঁহার পুত্র ইসহাকের জন্ম হয়" (আদিপুস্তক, ২১ অধ্যায়)। ৬৪
এইভাবে ইসহাককে আল্লাহ্র নির্দেশে তাঁহার জন্মের ৮ম দিবসে খৎনা সম্পন্ন করার মাধ্যমে ইবরাহীমের সহিত ইতোমধ্যে যে অঙ্গীকার সম্পন্ন হইয়াছিল সেই 'অঙ্গীকার'-এর আওতায় আনার আনুষ্ঠানিকতা সম্পন্ন হয়। জেনেসিস বা অন্য কোথাও এমন কিছুই নাই যাহাতে বুঝা যায় যে, আল্লাহ ইসহাকের সহিত পৃথক ও একান্ত কোন অঙ্গীকার করিয়াছিলেন বা তাঁহার পিতার সহিত ইতোপূর্বে যে অঙ্গীকার করা হইয়াছিল উহা বাতিল বা সংশোধন করা হইয়াছিল। বাস্তবিকপক্ষে ইহাই একমাত্র অঙ্গীকার যাহা আল্লাহ ইবরাহীমের সহিত সম্পাদন করিয়াছিলেন এবং এই অঙ্গীকারের আওতায় ইবরাহীম ও তাঁহার প্রথম পুত্র ইসমাঈলের অঙ্গীকারের আনুষ্ঠানিকতা হিসাবে তাঁহাদের পিতা-পুত্রের একই সাথে একই দিনে খৎনা সম্পন্ন হইয়াছিল। অন্যদিকে ইসহাকের খৎনা হইয়াছিল এক বৎসর পরে, তাঁহার জন্মের পর। ইসমাঈল ও ইসহাকের জন্য যে সমান ও একই ঐশী প্রতিশ্রুতি ও আশিস ছিল তাহা নিম্নে উল্লিখিত বর্ণনাগুলি হইতেও পরিষ্কার হইবে:
(১) ইবরাহীমের কোন পুত্রসন্তান জন্মিবার আগেই তাঁহাকে পুত্রসন্তানের ঐশী প্রতিশ্রুতি দেওয়া হয়;
(ক) "আমি তোমা হইতে এক মহাজাতি উৎপন্ন করিব......এবং তোমাতে ভূমণ্ডলের যাবতীয় গোষ্ঠী আশীর্ব্বাদ প্রাপ্ত হইবে" (জেনেসিস, ১২: ২-৩)।
হযরত মুহাম্মাদ (স) ১১৫
(খ) "আমি তোমার বংশকে এই দেশ (কন্নান) দিব" (জেনেসিস, ১২:৭)।
(গ) "আর তাঁহার বংশধরগণ হইবে আকাশের তারকারাজির মতই অসংখ্য" (দ্র. জেনেসিস, ১৫:৫)।
(ঘ) ঈশ্বর ইবরাহীমকে বলিলেন : "মিসরের নদী অবধি মহানদী, ফরাত নদী পর্যন্ত এই দেশ তোমার বংশকে দিলাম" (জেনেসিস, ১৫:১৮)।
(২) ইসমাঈলের জন্মের পর ও অঙ্গীকার প্রদানের সময় যখন আল্লাহ ইবরাহীমকে প্রতিশ্রুতি দান করেন :
"আর তুমি এই যে কনানদেশে প্রবাস করিতেছ, ইহার সমুদয় আমি তোমাকে ও তোমার ভাবী বংশকে চিরস্থায়ী অধিকারার্থে দিব" (জেনেসিস, ১৭:৮)।
(৩) ইসমাঈল ও ইসহাকের জন্মের পর, উভয়ের কোন সুনির্দিষ্ট উল্লেখ ছাড়াই আল্লাহ ইবরাহীম ('আ)-কে প্রতিশ্রুতি দেন :
"...আমি অবশ্য তোমাকে আশীর্ব্বাদ করিব এবং তোমার অতিশয় বংশবৃদ্ধি করিব..... আর তোমার বংশে পৃথিবীর সকল জাতি আশীর্ব্বাদ প্রাপ্ত হইবে...." (জেনেসিস, ২২:১৭-১৮)।
(৪) ঈশ্বর আশীস দিলেন : হাজারকে (জেনেসিস, ১৬:১০-১১); সারাহকে (জেনেসিস, ১৭:১৫-১৬);
(৫) ঈশ্বর একটি পুত্র সন্তানের শুভ সংবাদ দিলেন--- হাজারকে (জেনেসিস, ১৬:১০-১১); সারাহকে (জেনেসিস, ১৭:১৬-১৯);
(৬) ঈশ্বর নাম দিলেন : ইসমায়েল (জেনেসিস, ১৬:১১); ইসহাক (জেনেসিস, ১৭:১৯);
(৭) ঈশ্বর বংশবৃদ্ধির প্রতিশ্রুতি দিলেন... হাজারকে (জেনেসিস, ১৬:১০); সারাহকে (জেনেসিস, ১৭:১৬);
(৮) ঈশ্বরের প্রতিশ্রুতি--- ইসমাঈলকে : "আমি তাহাকে ফলবান করিয়া, তাহার অতিশয় বংশবৃদ্ধি করিব; তাহা হইতে দ্বাদশ রাজা উৎপন্ন হইবে, ও আমি তাহাকে বড় জাতি করিব” (জেনেসিস, ১৭:২১)।
১১৬ সীরাত বিশ্বকোষ
"আমি উহাকে এক মহাজাতি করিব” (জেনেসিস, ২১: ১৮; আরও দ্র. জেনেসিস, ২১: ১৩)।
ইসহাককে: এমন ধরনের কোন প্রতিশ্রুতি নাই।
উল্লিখিত বর্ণনা হইতে ইহা পরিষ্কার যে, উল্লিখিত সদৃশ প্রতিশ্রুতিগুলি করা হইয়াছিল ইসমাঈল ও ইসহাক উভয়কেই। আর উভয়কেই ইবরাহীমের সহিত আল্লাহ্ প্রতিশ্রুতিতে সমানভাবেই অন্তর্ভুক্ত করা হইয়াছে। এইসব বর্ণনায় এমন কিছুই নাই যাহা দ্বারা প্রমাণিত হইতে পারে যে, ইবরাহীমের কেবল জ্যেষ্ঠ ও প্রথম পুত্রকে সাময়িকভাবে আশিসপুষ্ট করা হইয়াছে এবং তাঁহাকে প্রতিশ্রুতি দেওয়া হইয়াছে। আর কনিষ্ঠ পুত্র ইসহাককে পার্থিব ও পারলৌকিক বা আধ্যাত্মিক উভয় প্রকার রহমতের প্রতিশ্রুতি দেওয়া হইয়াছে। ওল্ড টেস্টামেন্টে যেসব ঘটনার বর্ণনা যে বিন্যাসে দেওয়া হইয়াছে তাহাতে দুইটি গুরুত্বপূর্ণ বিষয় প্রতিভাত হইয়াছে:
প্রথমত, আল্লাহ ইবরাহীমের সহিত যখন অঙ্গীকার করেন তখন ইবরাহীমের বয়স ছিল ৯৯ ও তাঁহার পুত্র ইসমাঈলের বয়স ১৩। দ্বিতীয়ত, এই অঙ্গীকার সম্পাদনের পরেই আল্লাহ ইবরাহীমকে সারার গর্ভে তাঁহার আরও এক পুত্রের সুসংবাদ দিলেন।
এই দুইটি বিষয় কুরআনে বর্ণিত বিষয়ের সঙ্গে অত্যন্ত সঙ্গতিপূর্ণ, যেখানে বলা হইয়াছে, আল্লাহ তা'আলা ইব্রাহীম ('আ)-এর প্রতি রহমত বর্ষণ করেন এবং তাঁহার সহিত অঙ্গীকার করেন যখন তিনি পরীক্ষায় উত্তীর্ণ হইয়াছিলেন। সেই পরীক্ষার অন্যতম ছিল তাঁহার পুত্রের কুরবানী এবং এই ঘটনার পর আল্লাহ তাআলা তাঁহাকে সারার মাধ্যমে আর এক পুত্রের সুসংবাদ দেন (দ্র. ৩৭: ১০২-১১৩)।
অবশ্য উল্লিখিত ঐ দুই ঘটনার মধ্যে এক আপাত বিরোধ দেখা যায়, জেনেসিসে ইবরাহীম ('আ)-এর পুত্র কুরবানী দানের অভিপ্রায় সংক্রান্ত বর্ণনায়। জেনেসিসে ইবরাহীমের সহিত আল্লাহ্ সম্পাদিত প্রতিশ্রুতি, ঐ একই দিন ইবরাহীম ও তাঁহার পুত্র ইসমাঈলের খৎনা এবং ইসহাকের জন্ম ও তাঁহার খৎনা সম্পর্কে বিবরণ দেওয়ার পর কুরবানীর বিবরণ দেওয়া হইয়াছে। জেনেসিসে এই বর্ণনা নিম্নরূপ:
১. "এই সকল ঘটনার পরে ঈশ্বর অব্রাহামের পরীক্ষা করিলেন।... ২. তখন তিনি কহিলেন, তুমি আপন পুত্রকে, তোমার অদ্বিতীয় পুত্রকে, যাহাকে তুমি ভালবাস, সেই ইসহাককে লইয়া, মোরিয়া দেশে যাও এবং তথাকার যে এক পর্ব্বতের কথা আমি তোমাকে বলিব, তাহার উপরে তাহাকে হোমার্থে বলিদান কর” (আদিপুস্তক, অধ্যায় ২২)।
জেনেসিসের এই অনুচ্ছেদের ভিত্তিতে প্রাচ্যতত্ত্ববিদগণ ইসমাঈল আল্লাহর নিমিত্ত কুরবানীর জন্য মনোনীত হইয়াছিলেন তাহা অস্বীকার করেন, বরং তাহাদের বক্তব্য হইতেছে ইসহাককেই কুরবানীর জন্য লইয়া যাওয়া হইয়াছিল। কিন্তু জেনেসিস-এর ২২: ২ বিশেষ অনুচ্ছেদটি স্পষ্টত
হযরত মুহাম্মাদ (স) ১১৭
স্ববিরোধী। ইহাতে বলা হইয়াছে, 'তোমার একমাত্র পুত্র ইসহাক'। এখন কথা হইতেছে ইবরাহীমের জীবনের কোন পর্যায়েই ইসহাক ইবরাহীমের একমাত্র পুত্র ছিলেন না। কেননা ইসহাকের জন্ম হইয়াছে তখন যখন ইসমাঈলের বয়স ১৪ বৎসর। আর ইবরাহীম যখন ১৭৫ বৎসর বয়সে ইনতিকাল করেন তখন ইসমাঈল ও ইসহাক উভয় ভ্রাতাই জীবিত।
স্পষ্টতই দেখা যাইতেছে যে, জেনেসিসের উক্ত বর্ণনায় প্রমাদ ঘটিয়াছে। হয় এই বর্ণনায় 'একমাত্র' শব্দটি থাকা উচিত ছিল না অথবা পুত্রের নাম ইসহাকের পরিবর্তে 'ইসমাঈল' থাকা উচিত ছিল। কিন্তু 'একমাত্র পুত্র' শব্দটি জেনেসিসের ঐ অধ্যায়ে আরও দুইবার (জেনেসিস ২২: ১২, ২২: ১৬) উল্লিখিত হইয়াছে। আর এই দুই ক্ষেত্রেই আল্লাহ্ ইবরাহীমের প্রতি তাঁহার সন্তুষ্টি প্রকাশ করিয়াছেন তাঁহার একমাত্র পুত্র সন্তানকে তাঁহার (আল্লাহ্) উদ্দেশ্যে কুরবানী দেওয়ার ব্যাপারে তাঁহার (ইবরাহীমের) মনোভাবে কোন পরিবর্তন না হওয়ার জন্য। আর ঠিক এই কারণেই আল্লাহ ইবরাহীমকে বিশেষ করিয়া তাঁহার আশিসধন্য করিয়াছেন। আল্লাহ তাঁহাকে একই উপলক্ষ্যে বলেন, "আকাশের তারকাগণের ও সমুদ্রতীরস্থ বালুকার ন্যায় তোমার অতিশয় বংশবৃদ্ধি করিব... আর তোমার বংশে পৃথিবীর সকল জাতি আশীর্ব্বাদ প্রাপ্ত হইবে; কারণ তুমি আমার বাক্যে অবধান করিয়াছ”। ৬৫
তাই ইহার মধ্যে আর কোনই সংশয় থাকিতে পারে না যে, ইবরাহীমের কেবল একমাত্র পুত্রকেই কুরবানী দেওয়ার জন্য বলা হইয়াছিল। এখানে আরও লক্ষণীয় যে, জেনেসিসের ঐ অধ্যায়ের পরবর্তী দুই উল্লেখে ইবরাহীমের পুত্রের নামোল্লেখ নাই। স্পষ্টতই জেনেসিসের এই বিবরণের লেখায় লিপিকরের ভুল হইয়াছে। প্রকৃতপক্ষে নামটি হওয়া উচিত ছিল ইসহাকের পরিবর্তে ইসমাঈল। কারণ ইসমাঈলই ১৪ বৎসর ধরিয়া ইবরাহীমের একমাত্র পুত্র ছিলেন। জেনেসিসের ২২: ২ অনুচ্ছেদের লেখায় এই ভুলটি সম্ভবত বাইবেলের মূল লেখকের হাতে ঘটে নাই, উহা সম্ভবত ঘটিয়াছে পরবর্তী লিপিকর বা গ্রন্থনাকারী/সঙ্কলকের হাতে যিনি লেখার মূল পাঠ ইসহাকের অনুকূলে বদলাইয়া দিয়াছেন।
এখন এই ভুলটি যদি ইসহাকের নামের পরিবর্তে ইসমাঈল লিখিয়া শুধরাইয়া দেওয়া যায় তাহা হইলে জেনেসিসের গোটা ঐ অধ্যায়টি অসঙ্গতিমুক্ত হয় এবং জেনেসিসের ১৬: ১০ অনুচ্ছেদের বিবরণ অনুযায়ী ইসমাঈলের ব্যাপারে "আমি তোমার অতিশয় বংশবিস্তার করিব” এবং আবার ১৭: ২০ অনুচ্ছেদে একটু সামান্য সংশোধিত আকারে "আমি তাহার অত্যধিক বংশবিস্তার করিব” ইত্যাদি অঙ্গীকারের প্রকৃতির সহিত অধ্যায়টির গোটা বিবরণ খাপ খাইয়া যায়। আল্লাহ্র এই অনুগ্রহের সহিত জেনেসিসের ২২: ১৭ অনুচ্ছেদে বর্ণিত অনুগ্রহের যে মিল, যেমন "আমি তোমার অতিশয় বংশ বৃদ্ধি করিব” যাহা ইবরাহীমের উদ্দেশ্যে বলা হইয়াছে তাহা অত্যন্ত লক্ষণীয়। ইসমাঈলের প্রতি এই বিশেষ আশিসের যথোপযুক্ততা বাস্তবে যাহা ঘটিয়াছে তাহার আরও সুপ্রকাশ ঘটিয়াছে। যদিও ইসহাকের বংশে আরও নবী ও শাসকের আগমন ঘটিয়াছে যাহা
১১৮ সীরাত বিশ্বকোষ
আল্লাহ বিবি সারাহকে অঙ্গীকার করিয়াছিলেন। তবু ইহা সত্য যে, ইসমাঈলের বর্ধিত সন্তান-সন্ততিদের মাঝে তাঁহার বংশধরদের বিপুল সংখ্যাবৃদ্ধির ঐশ্বরিক অঙ্গীকার অত্যন্ত প্রশংসনীয়ভাবে পূর্ণতা লাভ করিয়াছে। ইসমাঈলের বংশধরগণই ইসহাকের বংশধরদের তুলনায় অনেক অনেক বেশি করিয়া ও আরও অধিকতর বিস্তৃত অঞ্চলে প্রসার লাভ করিয়াছে।
জেনেসিসের ২২ অনুচ্ছেদে একমাত্র পুত্র বলিতে যে ইসমাঈলকে বুঝানো উচিত তাহা খোদ জেনেসিসে বর্ণিত ঘটনাবলীর প্রসঙ্গ ও ধারাবিন্যাস হইতেই স্পষ্ট। প্রথমত, ইবরাহীমের সহিত আল্লাহ তাঁহার অঙ্গীকার সম্পাদনের পর তিনি তাঁহার (ইবরাহীমের) বিশ্বাসের গভীরতা যাচাই করিতে অগ্রসর হইবেন, তাঁহার অনুগ্রহ বর্ষণের কথা বলিবেন, ইসমাঈল ও ইসহাক নামে দুই পুত্র দানের সুসংবাদ প্রদান করিবেন এবং পুত্রদ্বয়কে তাঁহার অশেষ আশিসে স্নাত করিবেন তাহা নিরর্থক। আল্লাহ ইবরাহীমকে তাঁহার উপর তাঁহার সকল অনুগ্রহ ও আশিস বর্ষণের আগেই ও সর্বপরি, তাঁহার সহিত এক চিরস্থায়ী অঙ্গীকারে উপনীত হইবার আগেই ইবরাহীমের ঈমান ও বিশ্বাসের প্রমাণ লইবেন, তাহার পূর্বে নহে—ইহাই বরং যুক্তিসঙ্গত ও বাস্তব সম্মত।
দ্বিতীয়ত, তাঁহার প্রথম নবজাত সন্তানকে এক দূরদেশে নির্বাসনে পাঠাইবার জন্য পিতা ইবরাহীমকে নির্দেশ দানের পর আবার আল্লাহ্র পক্ষ হইতে সেই ইবরাহীমকে তাঁহার অপর পুত্র ইসহাককেও কুরবানী দিতে আদেশ করা নিতান্তই নির্দয় ও অসঙ্গতিপূর্ণ। আর ইহাও উল্লেখযোগ্য যে, আল্লাহ হাজেরা ও ইসমাঈলকে নির্বাসনে প্রেরণের সময় ইবরাহীমের দুঃখে সান্ত্বনা দিয়াছিলেন। কেবল তাহাই নহে, 'ইসহাকের বংশ তোমার বংশ হিসাবে পরিচিত হইবে' অর্থাৎ তাহারা যেথায় রহিয়াছে সেখানেই তাহারা থাকিবে ও বংশবৃদ্ধি করিবে বলিয়া তিনি ইবরাহীমকে আশ্বাস দেওয়ার পর তিনি ইসহাককে কুরবানী দিতে আদেশ দিবেন ইহা উল্লিখিত উক্তির সহিত সঙ্গতিপূর্ণ নয়।
এভাবে জেনেসিস-এর ২২ অনুচ্ছেদের মধ্যেই যেসব সাক্ষ্য-প্রমাণ পাওয়া যাইতেছে এবং ঘটনাবলীর সার্বিক ধারাবিন্যাস ও যুক্তি মিলাইয়া যাহা বুঝা যাইতেছে তাহাতে প্রতীয়মান হয় যে, যাহাকে কুরবানী দিতে আল্লাহ নির্দেশ দিয়াছিলেন সে ইবরাহীমের প্রথম ও একমাত্র পুত্র সন্তান, আর তিনি ইসমাঈল ভিন্ন অন্য কেহ নহেন, যাহাকে কুরবানী দিতে বলা হইয়াছে এবং কুরবানী দেওয়ার জন্য ইবরাহীম প্রস্তুত করিয়া লইয়া গিয়াছিলেন।
প্রাচ্যতত্ত্ববিদগণ অবশ্য তাহাদের নানা তত্ত্ব দিয়াছেন জেনেসিস-এ উল্লিখিত "একমাত্র পুত্র” বক্তব্যের ব্যাখ্যা করিবার জন্য। এই বিষয়ে সবচেয়ে বেশি করিয়া যে যুক্তির অবতারণা তাহারা করিয়া থাকেন তাহার প্রত্যক্ষ বা পরোক্ষ ভিত্তি হইল নিউ টেস্টামেন্টের নিম্নোক্ত বর্ণনা : ৬৬
"লিখিত আছে যে, অব্রাহামের দুই পুত্র ছিল, একটি দাসীর পুত্র, একটি স্বাধীনার পুত্র। কিন্তু ঐ দাসীর পুত্র মাংস অনুসারে, স্বাধীনার পুত্র প্রতিজ্ঞার গুণে জন্মিয়াছিল” (গালাতীয়, ৪ : ২২-২৩)।
আগে ইহা উল্লেখ করা হইয়াছে যে, "ক্রীতদাসী" বলিয়া যে শব্দটি রহিয়াছে তাহা বাইবেলে ইবরাহীমের স্ত্রীর প্রতি আরোপের ব্যাপারে ঠিক নহে। ইহা ইসমাঈলের প্রতি বিদ্বেষপ্রসূত। ৬৭
হযরত মুহাম্মাদ (স) ১১৯
বিশেষ করিয়া ইবরাহীমের সহিত হাজেরার বিবাহের পর, খোদ বাইবেলই সাক্ষ্য দিতেছে যে, "সারী....হাগারকে লইয়া আপন স্বামী অব্রামের সহিত বিবাহ দিলেন” (আদিপুস্তক, ১৬:৩)। ৬৮
হাজেরা একজন নবীর বিবাহিত স্ত্রীর মর্যাদায় উন্নীত হইলেন। আর তাই ইসমাঈল ছিলেন বিবাহ বন্ধনে আবদ্ধ দম্পতির বৈধ পুত্রসন্তান। অতএব কোনভাবে ইসমাঈলকে ইবরাহীমের জারজ সন্তান (নাউযু বিল্লাহ) বলা ও সেই একই কারণে ইসমাঈলকে ইবরাহীমের পুত্র হিসাবে স্বীকার করা যাইবে না, ইহা হইবে একান্ত উদ্ভট, একাধিক নবীর জনক ইবরাহীমের স্মৃতির জন্য অবমাননাকর এবং ওল্ড টেস্টামেন্টে 'ইসমাঈল ইবরাহীমের' 'বীজ' ও 'পুত্র' বলিয়া বারংবার যে উল্লেখ রহিয়াছে উহার সরাসরি বিরোধী। বাইবেলে ইহা সেই "পুত্র” যাহাকে আল্লাহ বারংবার আশিসধন্য করিয়াছেন, বারবার তাঁহাকে 'জাতি'তে পরিণত করিবেন বলিয়া অঙ্গীকার করিয়াছেন, অঙ্গীকার করিয়াছেন তাঁহার নিরতিশয় বংশবৃদ্ধির, তাঁহার বংশ হইতে ১২ জন শাসক সৃষ্টির। এই অবস্থায় ইসমাঈল গোত্র পরিচয়হীন থাকিবেন, কেবল বাইবেলে কোন বিশ্বাস নাই বা আল্লাহ্ বাণীতে আস্থা নাই এমন ব্যক্তি ছাড়া অপর কেহ ইহা আর যাহাই হউক মানিয়া নিতে পারে না। অধিকন্তু বাইবেলের বর্ণনা অনুযায়ী, প্রথম সন্তানের অধিকার ইসমাঈলে বর্তাইয়াছে। কেননা ওল্ড টেস্টামেন্টে বলা হইয়াছে, যদি কোন ব্যক্তির দুই স্ত্রী থাকে এবং তাহাদের একজন 'ঘৃণিত' ও আরেকজন 'প্রিয়পাত্রী' হইয়া থাকে এবং দুই স্ত্রীর গর্ভে যদি দুই বা ততোধিক পুত্র সন্তান থাকে এবং প্রথম পুত্রসন্তানটি 'ঘৃণিত স্ত্রীর' গর্ভজাত হয় তাহা হইলে ঐ পুত্রসন্তানটি উত্তরাধিকারী হিসাবে অন্যান্য সন্তানদের তুলনায় দ্বিগুণ উত্তরাধিকারের স্বত্ববান হইবে। ৬৯ এখানে আবারও গুরুত্ব আরোপ করিয়া বলিতে হয় যে, ইসহাক আল্লাহ্ আধ্যাত্মিক রহমত বা আশিসের একান্ত অধিকারী এমন দাবি একান্তই ভ্রান্ত ও বালসুলভ।
নিউ টেস্টামেন্টের উল্লিখিত উদ্ধৃত বর্ণনায় যে প্রচ্ছন্ন তারতম্যই থাকুক না কেন, ইসমাঈল যেমন কেবল বিবাহ বহির্ভূত সংসর্গজনিত উপায়ে জন্ম নেন নাই, তেমনি ইসহাকও কেবল অঙ্গীকারধন্য হইয়া ভূমিষ্ঠ হন নাই। তাঁহারা উভয়েই তাহাদের পিতা-মাতার একান্ত বৈধ সন্তান। তাঁহাদের উভয়ের মাতা হাজার ও সারাহ আল্লাহ্ আশিসধন্য। তাঁহাদের উভয়কে প্রতিশ্রুতি দেওয়া হইয়াছিল এবং আল্লাহ তাঁহাদের উভয়কেই তাহাদের স্বস্ব গর্ভে নিজ পুত্র সন্তান আসিবার সুসংবাদ প্রদান করিয়াছিলেন। উভয় সন্তানের নাম নির্বাচন করিয়াছিলেন আল্লাহ এবং তিনিই দুই মাতাকে তাহাদের নিজ নিজ পুত্রের নামকরণের কথাও জানাইয়াছিলেন। আর এইভাবেই ইসমাঈল ও ইসহাক ভূমিষ্ঠ হইয়াছিলেন 'অঙ্গীকারে' ও 'দেহজ সংসর্গের' যুগপৎ উভয় কারণে।
যদি ইসহাক বেশি করিয়াই অঙ্গীকারের ফলে এই ধরায় আসিয়া থাকেন এবং আল্লাহ তাঁহার প্রতিশ্রুতি ইবরাহীমকে দিয়া থাকেন, ইবরাহীমের প্রমাণিত ধর্মবিশ্বাসের বা ঈমানের কারণে, যাহা ওল্ড টেস্টামেন্ট ও কুরআন উভয়ই বলিতেছে, তাহা হইলে ইহা আরও অধিকতর যুক্তিসঙ্গত যে, আল্লাহ সেক্ষেত্রে ইবরাহীমকে বলিবেন ইসহাককেই কুরবানী দিতে। কেননা ইসহাককে পুত্র হিসাবে ইবরাহীম পাইয়াছিলেন পুরস্কার ও অনুগ্রহ হিসাবে।
পরিশেষে ইহা উল্লেখযোগ্য যে, ইসহাকের অনুসারীদের বংশধরদের মধ্যে তাহাদের ধর্মীয় কোন আচার-অনুষ্ঠানে কোনও রকম কুরবানী দেওয়ার মত কিছু করা হয় না। পক্ষান্তরে
১২০ সীরাত বিশ্বকোষ
ইসমাঈলের বংশধর ও তাহাদের অনুসারিগণ সারা বিশ্বে প্রতি বৎসর কুরবানীর ঘটনাটি আরবী পঞ্জিকার শেষ মাসের দশম তারিখে স্মৃতি হিসাবে পালন করিয়া থাকেন। তাহারাই অন্যদের বিপরীতে তাহাদের বাধ্যতামূলক ও স্বেচ্ছামূলক নামায-ইবাদতে ইবরাহীম ও তাঁহার বংশধরদের (ইসহাকসহ) প্রতি আশিসবাণী পাঠ করিয়া থাকেন এবং এইভাবে তাহারা ইবরাহীমকে আল্লাহ যাহা বলিয়াছিলেন "এইভাবে তাহাদের বিশ্বাস প্রমাণ করে”। ৭০
অনুবাদ: আফতাব হোসেন

টিকাঃ
৫৮. Gen. 12:1-4.
৫৯. Gen. 16:10-11.
৬০. Gen. 17:1-5, 9-11, 24-27.
৬১. Gen. 17:15-16, 19-21.
৬২. Gen. 17:20; 21:13; 21:18.
৬৩. দ্র. Gen. 15:12.
৬৪. Gen. 21:1-5.
৬৫. Gen. 22:17-18.
৬৬. Galatians 4:22-23.
৬৭. উপরে দ্র., পৃ. ৩৩।
৬৮. Gen. 16:3.
৬৯. Deut. 21:15-17.
৭০. Gen. 12:3.


ইবরাহীম ('আ)-এর সহিত কা'বাঘর ও ইহার আচার-অনুষ্ঠানের কোন সম্পর্ক নাই, প্রাচ্যবিদ্যাবিশারদগণ ইহা (তাহাদের উক্ত মনগড়া বিশ্বাস) প্রমাণিত করার জন্য হাজেরা ও ইসমাঈল ('আ)-এর মক্কায় বসতি স্থাপনের বাস্তব ঘটনাকে অস্বীকার করেন। তাহারা ইহাও অস্বীকার করেন যে, ইবরাহীম ('আ) ইসমাঈলকে কুরবানী দিতে মনস্থ করেন নাই। তাহারা ইহাও বলিতে চাহিয়াছেন এই বক্তব্যকে পোক্ত করার জন্য যে, ইসহাকই হইতেছেন ঈশ্বরের প্রতিশ্রুত শিশু ও ইসহাকই কেবল ঐশ্বরিক আনুকূল্যের পাত্র। কিন্তু ইসমাঈলীরা ইসলামের বহু কাল আগেই যে মক্কা ও সাধারণভাবে গোটা আরবে বসতি স্থাপন করিয়াছিল, এই অনস্বীকার্য সত্য ও বাস্তবতার সম্মুখীন হইয়া প্রাচ্যতত্ত্ববিদগণের মক্কা ও তৎসন্নিহিত অঞ্চলে ইসমাঈলীদের পরবর্তী কালে তথায় গমনপূর্বক বসতি স্থাপনের তত্ত্ব হাজির করিয়াছেন।

অনুরূপভাবে সমান অবিসংবাদিত বাস্তবতা যে, ইসমাঈলের বংশধরগণ সত্যই ঈশ্বরের অঙ্গীকার অনুযায়ী ব্যাপক বংশবিস্তার করিয়া এক বিরাট জাতি হিসাবে আত্মপ্রকাশ করিয়াছিল—ইহার মুকাবিলায় প্রাচ্যবিদগণ আশ্রয় লইয়াছেন পার্থিব ও আধ্যাত্মিক আশীর্বাদ। তত্ত্বের। আর এই অবকাশে বাইবেলের ব্যাখ্যাকারগণ ও সেই সাথে প্রাচ্যতত্ত্ববিদগণও বলিতে চাহিয়াছেন যে, ঈশ্বর ইসমাঈলের অনুকূলে যে পার্থিব সমৃদ্ধির অঙ্গীকার করিয়াছিলেন তাহা ইসমাঈলের ১২ পুত্র ও তাহাদের অসংখ্য বংশধরদের মাধ্যমে পূরণ হইয়াছে। কিন্তু ইসহাকই কেবল ছিলেন ঈশ্বরের পার্থিব ও আধ্যাত্মিক উভয় আশীর্বাদের উদ্দিষ্ট। প্রাচ্যতত্ত্ববিদদের এই বক্তব্য ছাড়াও তাহারা যে ইসমাঈলকে ইবরাহীমের উদ্দিষ্ট কুরবানীর বস্তু করার বিরোধিতা করিয়াছেন উহার প্রধান অবলম্বন হইতেছে জেনেসিস ২২, বিশেষ করিয়া ২২ : ২-এর বক্তব্য।

'পার্থিব' ও 'আধ্যাত্মিক বিষয়'এই দুইয়ের মধ্যকার পার্থক্য আসিয়াছে মূলত 'সাম্রাজ্য' ও প্যাপাসির (পোপতন্ত্র, যাজকতন্ত্র) মধ্যে সম্পর্ক সংক্রান্ত মধ্যযুগীয় ইউরোপের ধ্যান-ধারণা হইতে। এই তত্ত্ব বা ধারণা অনুযায়ী, পার্থিব বা জড়জাগতিক বিষয় সম্রাটের এখতিয়ারাধীন, আর আধ্যাত্মিক বিষয়সমূহের এখতিয়ার হইতেছে ঈশ্বর বা পোপের রাজ্য। 'সাম্রাজ্য ও প্যাপাসির এই দ্বৈততা, ইহাই ধর্ম ও রাষ্ট্রের মধ্যে পার্থক্যের আধুনিক পাশ্চাত্য চিন্তাধারার মূলে সক্রিয়। এই ধারণার ভাল দিক যাহাই থাকুক না কেন, ইহার কট্টর অনুসরণ ও ইতিহাসের ঘটনাবলীর বাস্তবতার নিরিখে ইবরাহীমের পুত্রদের সহিত সেই অস্পষ্ট আদিম অতীতে ঈশ্বর কী নির্ধারণ করিয়াছিলেন তাহার প্রয়োগ ঘটা সম্ভব ছিল না।

প্রাচ্যতত্ত্ববিদগণ যাহা বলিতে চাহিয়াছেন তাহার সবকিছু ওল্ড টেস্টামেন্টের বিবরণ অনুযায়ী প্রমাণিত হয় নাই। সংশ্লিষ্ট অনুচ্ছেদগুলিতে ভাসা ভাসা দৃষ্টিপাত করিলেও স্পষ্ট হইয়া উঠে যে, ইসমাঈল ও ইসহাক উভয়কেই আল্লাহ একই অঙ্গীকার প্রদান করিয়াছিলেন। সেখানে এমন কিছুই নাই যাহাতে বলা হইয়াছে, আল্লাহ ইসহাকের ব্যাপারে এমন অঙ্গীকার করেন যাহা তাঁহার পূর্ববর্তী ইসমাঈলের ব্যাপারে করেন নাই; বরং ওল্ড টেস্টামেন্টের সংশ্লিষ্ট অনুচ্ছেদগুলি সতর্কতার সহিত পাঠ করিলে দেখা যাইবে, ইসমাঈলের প্রতি আল্লাহ যে অঙ্গীকার করিয়াছিলেন তিনি তাঁহার সেই অঙ্গীকারের কয়েকবার পুনরুক্তি করিয়াছেন, এমনকি ইসহাকের জন্মের পরেও। ইহা তাই বোধগম্য নহে যে, বাইবেলের ব্যাখ্যাকারগণ ও প্রাচ্যতত্ত্ববিদগণ কোথা হইতে এমন ধারণা পাইলেন যে, ইসমাঈলকে কেবল পার্থিব উন্নতির অঙ্গীকার করা হইয়াছিল, আর ইসহাক পার্থিব ও আধ্যাত্মিক উভয় অঙ্গীকার পাইয়াছিলেন।

এখানে দুই-একটি মাত্র দৃষ্টান্ত দেওয়া যাইতে পারে। ইসমাঈল ও ইসহাকের জন্মের বহু কাল আগে ইবরাহীম ('আ) তাঁহার বংশধরদের বিষয়ে আল্লাহ্র রহমত করিয়াছিলেন। জেনেসিস, ১২ অধ্যায়ে এই সম্পর্কে বলা হইয়াছে:

১. "সদাপ্রভু অব্রামকে কহিলেন, তুমি আপন দেশ, জ্ঞাতিকুটুম্ব ও পৈত্রিক বাটী পরিত্যাগ করিয়া, আমি যে দেশ তোমাকে দেখাই, সেই দেশে চল"।

২. "আমি তোমা হইতে এক মহাজাতি উৎপন্ন করিব, এবং তোমাকে আশীর্ব্বাদ করিয়া তোমার নাম মহৎ করিব, তাহাতে তুমি আশীর্ব্বাদের আকর হইবে"। [58]

৩. "যাহারা তোমাকে আশীর্ব্বাদ করিবে, তাহাদিগকে আমি আশীর্ব্বাদ করিব, যে কেহ তোমাকে অভিশাপ দিবে, তাহাকে আমি অভিশাপ দিব; এবং তোমাতে ভূমণ্ডলের যাবতীয় গোষ্ঠী আশীর্ব্বাদ প্রাপ্ত হইবে"।

৪. "পরে অব্রাম সদাপ্রভুর সেই বাক্যানুসারে যাত্রা করিলেন; এবং লোটও তাহার সঙ্গে গেলেন। হারণ হইতে প্রস্থান কালে অব্রামের পঁচাত্তর বৎসর বয়স ছিল" ।

হাজেরা যখন ইসমাঈল ('আ)-কে গর্ভে ধারণ করেন তখনও প্রভুর সেই অঙ্গীকার আরও সুনির্দিষ্ট ভাষায় কয়েকবার পুনরাবৃত্ত করা হয়। স্বয়ং আল্লাহ ইসমাঈলের নাম রাখেন। এই সম্পর্কিত অত্যন্ত তাৎপর্যপূর্ণ অনুচ্ছেদটির (১৬ঃ ১০-১১) পাঠ নিম্নরূপঃ

১০. "সদাপ্রভুর দূত তাহাকে আরও বলিলেন, আমি তোমার বংশের এমন বৃদ্ধি করিব যে, বাহুল্য প্রযুক্ত অগণ্য হইবে"।

১১. "সদাপ্রভুর দূত তাহাকে আরও কহিলেন, দেখ, তোমার গর্ভ হইয়াছে, তুমি পুত্র প্রসব করিবে ও তাহার নাম ইম্মায়েল (ঈশ্বর শুনেন) রাখিবে, কেননা সদাপ্রভু তোমার দুঃখ শ্রবণ করিলেন"। [59]

তৃতীয়ত, আল্লাহ্র এই অঙ্গীকারটি হইয়াছিল রহমত প্রদর্শনের অঙ্গীকারের পুনরাবৃত্তি করিয়া। এই রহমত প্রদান করা হইয়াছিল ইবরাহীম ও ইসমাঈলকে, ইসহাকের জন্মের বহু পূর্বে। ঐ সময় ইবরাহীমের বয়স ছিল ৯৯ বৎসর ও ইসমাঈলের ১৩ বৎসর। এই অঙ্গীকারটি সম্পাদিত ও চূড়ান্ত হয় প্রতীকী খৎনার মাধ্যমে। ইবরাহীম ও ইসমাঈল ('আ) এই আনুষ্ঠানিকতাও পালন করেন ইসহাকের জন্মের আগে। আর সেই উপলক্ষে ও সময়ে আল্লাহ পিতা অবরামের নাম আব্রাহামে (ইবরাহীম) পরিবর্তিত করেন। এই বিষয়ে ওল্ড টেস্টামেন্টের পাঠ (আদিপুস্তক, অধ্যায় ১৭) নিম্নরূপ:

১. অব্রামের নিরানব্বই বৎসর বয়সে সদাপ্রভু তাঁহাকে দর্শন দিলেন ও কহিলেন, আমি সর্ব্বশক্তিমান ঈশ্বর, তুমি আমার সাক্ষাতে গমনাগমন করিয়া সিদ্ধ হও। ২. আর আমি তোমার সহিত আপন নিয়ম স্থির করিব, ও তোমার অতিশয় বংশবৃদ্ধি করিব। ৩. তখন অব্রাম উবুড় হইয়া পড়িলেন, এবং ঈশ্বর তাঁহার সহিত আলাপ করিয়া কহিলেন, দেখ, আমিই তোমার সহিত আপন নিয়ম স্থির করিতেছি, তুমি বহুজাতির আদিপিতা হইবে। ৫. তোমার নাম অব্রাম (মহাপিতা) আর থাকিবে না, কিন্তু তোমার নাম অব্রাহাম (বহু লোকের পিতা) হইব; কেননা আমি তোমাকে বহু জাতির পিতা করিলাম। ৭. আমি তোমার সহিত ও পুরুষানুক্রমে তোমার ভাবী বংশের সহিত যে নিয়ম স্থাপন করিব, তাহা চিরকালের নিয়ম হইবে; ফলতঃ আমি তোমার ঈশ্বর ও তোমার ভাবী বংশের ঈশ্বর হইব। ৯. ঈশ্বর অব্রাহামকে আরও কহিলেন, তুমিও আমার নিয়ম পালন করিবে, তুমি ও তোমার ভাবী বংশ পুরুষানুক্রমে তাহা পালন করিবে। ১০. তোমাদের সহিত ও তোমার ভাবী বংশের সহিত কৃত আমার যে নিয়ম তোমরা পালন করিবে, তাহা এই, তোমাদের প্রত্যেক পুরুষের ত্বকচ্ছেদ হইবে। ২৪. অব্রাহামের লিঙ্গাগ্রের ত্বকচ্ছেদন কালে তাঁহার বয়স নিরানব্বই বৎসর। ২৫. তাঁহার পুত্র ইম্মায়েলের লিঙ্গাগ্রের ত্বকচ্ছেদন কালে তাহার বয়স তের বৎসর। ২৬. সেই দিনেই অব্রাহাম ও তাঁহার পুত্র ইম্মায়েল, উভয়ের ত্বকচ্ছেদ হইল। ২৭. আর তাঁহার গৃহজাত এবং পরজাতীয়দের নিকটে মূল্য দ্বারা ক্রীত তাঁহার গৃহের সকল পুরুষেরও ত্বকচ্ছেদ সেই সময়ে হইল"। [60]

এইভাবে ইবরাহীম ও তাঁহার বীজ ইসমাঈলের সহিত আল্লাহ্র অঙ্গীকার সম্পাদিত হয়। আর ঐ অঙ্গীকার মোহরাঙ্কিত করা হয় ইসহাকের জন্মের আগে প্রতীকী খৎনার মাধ্যমে। বাস্তবিকপক্ষে, ঐ উপলক্ষে আল্লাহ ইবরাহীম ('আ)-কে সারার গর্ভে তাঁহার আরও এক পুত্র সন্তানের সুসংবাদ দেন এবং বলেন যে, তাহার সহিতও অঙ্গীকার করা হইবে। এখন এই সম্পর্কিত জেনেসিস-এর মূল পাঠটি লক্ষ্য করুন: [61]

১৫. আর ঈশ্বর অব্রাহামকে কহিলেন, তুমি তোমার স্ত্রী সারীকে আর সারী বলিয়া ডাকিও না; তাহার নাম সারা (রাণী) হইল। ১৬. আর আমি তাহাকে আশীর্ব্বাদ করিব, এবং তাহা হইতে এক পুত্রও তোমাকে দিব; আমি তাহাকে আশীর্ব্বাদ করিব, তাহাতে সে জাতিগণের (আদিমাতা) হইবে, তাহা হইতে লোকবৃন্দের রাজগণ উৎপন্ন হইবে। ১৯. তখন ঈশ্বর কহিলেন, তোমার স্ত্রী সারা অবশ্য তোমার নিমিত্তে পুত্র প্রসব করিবে, এবং তুমি তাহার নাম ইসহাক (হাস্য) রাখিবে, আর আমি তাহার সহিত আমার নিয়ম স্থাপন করিব, তাহা তাহার ভাবী বংশের পক্ষে চিরস্থায়ী নিয়ম হইবে। ২১. কিন্তু আগামী বৎসরের এই ঋতুতে সারা তোমার নিমিত্তে যাহাকে প্রসব করিবে সেই ইসহাকের সহিত আমি আপন নিয়ম স্থাপন করিব (আদিপুস্তক, ১৭ অধ্যায়)।

এখানে উল্লেখ করা দরকার যে, উল্লিখিত অনুচ্ছেদে ঈশ্বরের বাণীগুলিতে বলা হইয়াছে, "আর আমি তাহার সহিত আমার নিয়ম স্থাপন করিব" (অর্থাৎ ইসহাক, জেনেসিস ১৭: ১৯) এবং "সারা তোমার নিমিত্তে যাহাকে প্রসব করিবে, সেই ইসহাকের সহিত আমি আপন নিয়ম স্থাপন করিব" (জেনেসিস ১৭: ২১)। এই বাণীগুলি ঈশ্বর ইবরাহীম ও তাঁহার বংশধরের সঙ্গে যে চুক্তি আগেই করিয়াছেন উহারই পুনরুক্তি প্রকৃতির। কেননা আরও বলা হইয়াছে: "তাঁহার পরে বংশপরম্পরায় এক চিরস্থায়ী অঙ্গীকারের জন্য" যাহা উল্লিখিত অনুচ্ছেদের পূর্ববর্তী শ্লোকে উল্লেখ করা হইয়াছে (অর্থাৎ জেনেসিস ১৭: ৭, ৯-১১)। জেনেসিস ১৭: ১৯ ও ২১-এর বর্ণনাগুলিতে আল্লাহ কর্তৃক ইবরাহীম ('আ)-কে প্রদত্ত এই মর্মে আশ্বাস দেন যে, ইসহাক ভূমিষ্ঠ হইবার পর তাহাকেও ঐ অঙ্গীকারের অন্তর্ভুক্ত করা হইবে যে অঙ্গীকার ইতোমধ্যে ইবরাহীম ও তাঁহার পুত্র ইসমাঈলের সহিত চূড়ান্ত হইয়াছিল তাঁহাদের উভয়েরই একই দিনে খৎনার মাধ্যমে। তাই এই বিবৃতিগুলিকে কোনভাবেই এই অর্থে গ্রহণ করা যাইতে পারে না যে, আল্লাহ ইবরাহীম ও ইসমাঈলের সহিত অঙ্গীকার বাতিল করিয়া দিয়াছেন অথবা তিনি ইবরাহীমের সহিত আগে সম্পাদিত অঙ্গীকার বাতিল বা সংশোধন করিয়া ইসহাকের সহিত নূতন করিয়া অঙ্গীকার করিতেছেন। ইহা ছাড়া আরও তিনটি বিষয় হইতে ইহা পরিষ্কার যে, উল্লিখিত বিবৃতিগুলির অর্থ ইসহাকের সহিত সম্পদিত অঙ্গীকারের প্রশ্নে ধারাবাহিকতা ও সম্পত্যয় মাত্র। বিষয় তিনটি হইল:

(ক) ইসমাঈল ('আ) ও তাঁহার বংশধরদের বেলায় যে অঙ্গীকার করা হইয়াছে তাহারই পুনরাবৃত্তি হইয়াছে ইসহাকের জন্মের পর; [62]

(খ) ইসহাক ('আ)-এর জন্মের পর ইবরাহীম ('আ) তাঁহার জন্মের ৮ম দিবসে আল্লাহ্র নির্দেশ অনুযায়ী তাঁহার খৎনা করিয়া কেবল তাহাকে ঐ অঙ্গীকারের আনুষ্ঠানিকভাবে অন্তর্ভুক্ত করেন; [63]

(গ) আর ইহার পর এমন কোন ঘটনা ঘটে নাই যাহা হইতে বুঝা যায় যে, আল্লাহ্র অঙ্গীকার অতঃপর একান্তভাবে ইসহাক ও তাঁহার বংশধরদের ক্ষেত্রেই বুঝিতে হইবে। ইসহাকের জন্ম ও অঙ্গীকারে তাঁহার অন্তর্ভুক্তি অনুষ্ঠান সম্পর্কিত পাঠ নিম্নরূপ:

১. "পরে সদাপ্রভু আপন বাক্যানুসারে সারার তত্ত্বাবধান করিলেন; সদাপ্রভু যাহা বলিয়াছিলেন, সারার প্রতি তাহা করিলেন। ২. আর সারা গর্ভবতী হইয়া ঈশ্বরের উক্ত নিরূপিত সময়ে অব্রাহামের বৃদ্ধকালে তাঁহার নিমিত্ত পুত্র প্রসব করিলেন। ৩. তখন অব্রাহাম সারার গর্ভজাত নিজ পুত্রের নাম ইসহাক, হাস্য, রাখিলেন। ৪. পরে ঐ পুত্র ইসহাকের আট দিন বয়সে অব্রাহাম ঈশ্বরের আজ্ঞানুসারে তাহার ত্বকচ্ছেদ করিলেন। ৫. অব্রাহামের এক শত বৎসর বয়সে তাঁহার পুত্র ইসহাকের জন্ম হয়" (আদিপুস্তক, ২১ অধ্যায়)। [64]

এইভাবে ইসহাককে আল্লাহ্র নির্দেশে তাঁহার জন্মের ৮ম দিবসে খৎনা সম্পন্ন করার মাধ্যমে ইবরাহীমের সহিত ইতোমধ্যে যে অঙ্গীকার সম্পন্ন হইয়াছিল সেই 'অঙ্গীকার'-এর আওতায় আনার আনুষ্ঠানিকতা সম্পন্ন হয়। জেনেসিস বা অন্য কোথাও এমন কিছুই নাই যাহাতে বুঝা যায় যে, আল্লাহ ইসহাকের সহিত পৃথক ও একান্ত কোন অঙ্গীকার করিয়াছিলেন বা তাঁহার পিতার সহিত ইতোপূর্বে যে অঙ্গীকার করা হইয়াছিল উহা বাতিল বা সংশোধন করা হইয়াছিল। বাস্তবিকপক্ষে ইহাই একমাত্র অঙ্গীকার যাহা আল্লাহ ইবরাহীমের সহিত সম্পাদন করিয়াছিলেন এবং এই অঙ্গীকারের আওতায় ইবরাহীম ও তাঁহার প্রথম পুত্র ইসমাঈলের অঙ্গীকারের আনুষ্ঠানিকতা হিসাবে তাঁহাদের পিতা-পুত্রের একই সাথে একই দিনে খৎনা সম্পন্ন হইয়াছিল। অন্যদিকে ইসহাকের খৎনা হইয়াছিল এক বৎসর পরে, তাঁহার জন্মের পর। ইসমাঈল ও ইসহাকের জন্য যে সমান ও একই ঐশী প্রতিশ্রুতি ও আশিস ছিল তাহা নিম্নে উল্লিখিত বর্ণনাগুলি হইতেও পরিষ্কার হইবে:

(১) ইবরাহীমের কোন পুত্রসন্তান জন্মিবার আগেই তাঁহাকে পুত্রসন্তানের ঐশী প্রতিশ্রুতি দেওয়া হয়;

(ক) "আমি তোমা হইতে এক মহাজাতি উৎপন্ন করিব......এবং তোমাতে ভূমণ্ডলের যাবতীয় গোষ্ঠী আশীর্ব্বাদ প্রাপ্ত হইবে" (জেনেসিস, ১২: ২-৩)।

(খ) "আমি তোমার বংশকে এই দেশ (কন্নান) দিব" (জেনেসিস, ১২:৭)।

(গ) "আর তাঁহার বংশধরগণ হইবে আকাশের তারকারাজির মতই অসংখ্য" (দ্র. জেনেসিস, ১৫:৫)।

(ঘ) ঈশ্বর ইবরাহীমকে বলিলেন : "মিসরের নদী অবধি মহানদী, ফরাত নদী পর্যন্ত এই দেশ তোমার বংশকে দিলাম" (জেনেসিস, ১৫:১৮)।

(২) ইসমাঈলের জন্মের পর ও অঙ্গীকার প্রদানের সময় যখন আল্লাহ ইবরাহীমকে প্রতিশ্রুতি দান করেন :

"আর তুমি এই যে কনানদেশে প্রবাস করিতেছ, ইহার সমুদয় আমি তোমাকে ও তোমার ভাবী বংশকে চিরস্থায়ী অধিকারার্থে দিব" (জেনেসিস, ১৭:৮)।

(৩) ইসমাঈল ও ইসহাকের জন্মের পর, উভয়ের কোন সুনির্দিষ্ট উল্লেখ ছাড়াই আল্লাহ ইবরাহীম ('আ)-কে প্রতিশ্রুতি দেন :

"...আমি অবশ্য তোমাকে আশীর্ব্বাদ করিব এবং তোমার অতিশয় বংশবৃদ্ধি করিব..... আর তোমার বংশে পৃথিবীর সকল জাতি আশীর্ব্বাদ প্রাপ্ত হইবে...." (জেনেসিস, ২২:১৭-১৮)।

(৪) ঈশ্বর আশীস দিলেন : হাজারকে (জেনেসিস, ১৬:১০-১১); সারাহকে (জেনেসিস, ১৭:১৫-১৬);

(৫) ঈশ্বর একটি পুত্র সন্তানের শুভ সংবাদ দিলেন--- হাজারকে (জেনেসিস, ১৬:১০-১১); সারাহকে (জেনেসিস, ১৭:১৬-১৯);

(৬) ঈশ্বর নাম দিলেন : ইসমায়েল (জেনেসিস, ১৬:১১); ইসহাক (জেনেসিস, ১৭:১৯);

(৭) ঈশ্বর বংশবৃদ্ধির প্রতিশ্রুতি দিলেন... হাজারকে (জেনেসিস, ১৬:১০); সারাহকে (জেনেসিস, ১৭:১৬);

(৮) ঈশ্বরের প্রতিশ্রুতি--- ইসমাঈলকে : "আমি তাহাকে ফলবান করিয়া, তাহার অতিশয় বংশবৃদ্ধি করিব; তাহা হইতে দ্বাদশ রাজা উৎপন্ন হইবে, ও আমি তাহাকে বড় জাতি করিব" (জেনেসিস, ১৭:২১)।

"আমি উহাকে এক মহাজাতি করিব” (জেনেসিস, ২১: ১৮; আরও দ্র. জেনেসিস, ২১: ১৩)।

ইসহাককে: এমন ধরনের কোন প্রতিশ্রুতি নাই।

উল্লিখিত বর্ণনা হইতে ইহা পরিষ্কার যে, উল্লিখিত সদৃশ প্রতিশ্রুতিগুলি করা হইয়াছিল ইসমাঈল ও ইসহাক উভয়কেই। আর উভয়কেই ইবরাহীমের সহিত আল্লাহ্ প্রতিশ্রুতিতে সমানভাবেই অন্তর্ভুক্ত করা হইয়াছে। এইসব বর্ণনায় এমন কিছুই নাই যাহা দ্বারা প্রমাণিত হইতে পারে যে, ইবরাহীমের কেবল জ্যেষ্ঠ ও প্রথম পুত্রকে সাময়িকভাবে আশিসপুষ্ট করা হইয়াছে এবং তাঁহাকে প্রতিশ্রুতি দেওয়া হইয়াছে। আর কনিষ্ঠ পুত্র ইসহাককে পার্থিব ও পারলৌকিক বা আধ্যাত্মিক উভয় প্রকার রহমতের প্রতিশ্রুতি দেওয়া হইয়াছে। ওল্ড টেস্টামেন্টে যেসব ঘটনার বর্ণনা যে বিন্যাসে দেওয়া হইয়াছে তাহাতে দুইটি গুরুত্বপূর্ণ বিষয় প্রতিভাত হইয়াছে:

প্রথমত, আল্লাহ ইবরাহীমের সহিত যখন অঙ্গীকার করেন তখন ইবরাহীমের বয়স ছিল ৯৯ ও তাঁহার পুত্র ইসমাঈলের বয়স ১৩। দ্বিতীয়ত, এই অঙ্গীকার সম্পাদনের পরেই আল্লাহ ইবরাহীমকে সারার গর্ভে তাঁহার আরও এক পুত্রের সুসংবাদ দিলেন।

এই দুইটি বিষয় কুরআনে বর্ণিত বিষয়ের সঙ্গে অত্যন্ত সঙ্গতিপূর্ণ, যেখানে বলা হইয়াছে, আল্লাহ তা'আলা ইব্রাহীম ('আ)-এর প্রতি রহমত বর্ষণ করেন এবং তাঁহার সহিত অঙ্গীকার করেন যখন তিনি পরীক্ষায় উত্তীর্ণ হইয়াছিলেন। সেই পরীক্ষার অন্যতম ছিল তাঁহার পুত্রের কুরবানী এবং এই ঘটনার পর আল্লাহ তাআলা তাঁহাকে সারার মাধ্যমে আর এক পুত্রের সুসংবাদ দেন (দ্র. ৩৭: ১০২-১১৩)।

অবশ্য উল্লিখিত ঐ দুই ঘটনার মধ্যে এক আপাত বিরোধ দেখা যায়, জেনেসিসে ইবরাহীম ('আ)-এর পুত্র কুরবানী দানের অভিপ্রায় সংক্রান্ত বর্ণনায়। জেনেসিসে ইবরাহীমের সহিত আল্লাহ্ সম্পাদিত প্রতিশ্রুতি, ঐ একই দিন ইবরাহীম ও তাঁহার পুত্র ইসমাঈলের খৎনা এবং ইসহাকের জন্ম ও তাঁহার খৎনা সম্পর্কে বিবরণ দেওয়ার পর কুরবানীর বিবরণ দেওয়া হইয়াছে। জেনেসিসে এই বর্ণনা নিম্নরূপ:

১. "এই সকল ঘটনার পরে ঈশ্বর অব্রাহামের পরীক্ষা করিলেন।... ২. তখন তিনি কহিলেন, তুমি আপন পুত্রকে, তোমার অদ্বিতীয় পুত্রকে, যাহাকে তুমি ভালবাস, সেই ইসহাককে লইয়া, মোরিয়া দেশে যাও এবং তথাকার যে এক পর্ব্বতের কথা আমি তোমাকে বলিব, তাহার উপরে তাহাকে হোমার্থে বলিদান কর" (আদিপুস্তক, অধ্যায় ২২)।

জেনেসিসের এই অনুচ্ছেদের ভিত্তিতে প্রাচ্যতত্ত্ববিদগণ ইসমাঈল আল্লাহর নিমিত্ত কুরবানীর জন্য মনোনীত হইয়াছিলেন তাহা অস্বীকার করেন, বরং তাহাদের বক্তব্য হইতেছে ইসহাককেই কুরবানীর জন্য লইয়া যাওয়া হইয়াছিল। কিন্তু জেনেসিস-এর ২২: ২ বিশেষ অনুচ্ছেদটি স্পষ্টত স্ববিরোধী। ইহাতে বলা হইয়াছে, 'তোমার একমাত্র পুত্র ইসহাক'। এখন কথা হইতেছে ইবরাহীমের জীবনের কোন পর্যায়েই ইসহাক ইবরাহীমের একমাত্র পুত্র ছিলেন না। কেননা ইসহাকের জন্ম হইয়াছে তখন যখন ইসমাঈলের বয়স ১৪ বৎসর। আর ইবরাহীম যখন ১৭৫ বৎসর বয়সে ইনতিকাল করেন তখন ইসমাঈল ও ইসহাক উভয় ভ্রাতাই জীবিত।

স্পষ্টতই দেখা যাইতেছে যে, জেনেসিসের উক্ত বর্ণনায় প্রমাদ ঘটিয়াছে। হয় এই বর্ণনায় 'একমাত্র' শব্দটি থাকা উচিত ছিল না অথবা পুত্রের নাম ইসহাকের পরিবর্তে 'ইসমাঈল' থাকা উচিত ছিল। কিন্তু 'একমাত্র পুত্র' শব্দটি জেনেসিসের ঐ অধ্যায়ে আরও দুইবার (জেনেসিস ২২: ১২, ২২: ১৬) উল্লিখিত হইয়াছে। আর এই দুই ক্ষেত্রেই আল্লাহ্ ইবরাহীমের প্রতি তাঁহার সন্তুষ্টি প্রকাশ করিয়াছেন তাঁহার একমাত্র পুত্র সন্তানকে তাঁহার (আল্লাহ্) উদ্দেশ্যে কুরবানী দেওয়ার ব্যাপারে তাঁহার (ইবরাহীমের) মনোভাবে কোন পরিবর্তন না হওয়ার জন্য। আর ঠিক এই কারণেই আল্লাহ ইবরাহীমকে বিশেষ করিয়া তাঁহার আশিসধন্য করিয়াছেন। আল্লাহ তাঁহাকে একই উপলক্ষ্যে বলেন, "আকাশের তারকাগণের ও সমুদ্রতীরস্থ বালুকার ন্যায় তোমার অতিশয় বংশবৃদ্ধি করিব... আর তোমার বংশে পৃথিবীর সকল জাতি আশীর্ব্বাদ প্রাপ্ত হইবে; কারণ তুমি আমার বাক্যে অবধান করিয়াছ"। [65]

তাই ইহার মধ্যে আর কোনই সংশয় থাকিতে পারে না যে, ইবরাহীমের কেবল একমাত্র পুত্রকেই কুরবানী দেওয়ার জন্য বলা হইয়াছিল। এখানে আরও লক্ষণীয় যে, জেনেসিসের ঐ অধ্যায়ের পরবর্তী দুই উল্লেখে ইবরাহীমের পুত্রের নামোল্লেখ নাই। স্পষ্টতই জেনেসিসের এই বিবরণের লেখায় লিপিকরের ভুল হইয়াছে। প্রকৃতপক্ষে নামটি হওয়া উচিত ছিল ইসহাকের পরিবর্তে ইসমাঈল। কারণ ইসমাঈলই ১৪ বৎসর ধরিয়া ইবরাহীমের একমাত্র পুত্র ছিলেন। জেনেসিসের ২২: ২ অনুচ্ছেদের লেখায় এই ভুলটি সম্ভবত বাইবেলের মূল লেখকের হাতে ঘটে নাই, উহা সম্ভবত ঘটিয়াছে পরবর্তী লিপিকর বা গ্রন্থনাকারী/সঙ্কলকের হাতে যিনি লেখার মূল পাঠ ইসহাকের অনুকূলে বদলাইয়া দিয়াছেন।

এখন এই ভুলটি যদি ইসহাকের নামের পরিবর্তে ইসমাঈল লিখিয়া শুধরাইয়া দেওয়া যায় তাহা হইলে জেনেসিসের গোটা ঐ অধ্যায়টি অসঙ্গতিমুক্ত হয় এবং জেনেসিসের ১৬: ১০ অনুচ্ছেদের বিবরণ অনুযায়ী ইসমাঈলের ব্যাপারে "আমি তোমার অতিশয় বংশবিস্তার করিব" এবং আবার ১৭: ২০ অনুচ্ছেদে একটু সামান্য সংশোধিত আকারে "আমি তাহার অত্যধিক বংশবিস্তার করিব" ইত্যাদি অঙ্গীকারের প্রকৃতির সহিত অধ্যায়টির গোটা বিবরণ খাপ খাইয়া যায়। আল্লাহ্র এই অনুগ্রহের সহিত জেনেসিসের ২২: ১৭ অনুচ্ছেদে বর্ণিত অনুগ্রহের যে মিল, যেমন "আমি তোমার অতিশয় বংশ বৃদ্ধি করিব" যাহা ইবরাহীমের উদ্দেশ্যে বলা হইয়াছে তাহা অত্যন্ত লক্ষণীয়। ইসমাঈলের প্রতি এই বিশেষ আশিসের যথোপযুক্ততা বাস্তবে যাহা ঘটিয়াছে তাহার আরও সুপ্রকাশ ঘটিয়াছে। যদিও ইসহাকের বংশে আরও নবী ও শাসকের আগমন ঘটিয়াছে যাহা আল্লাহ বিবি সারাহকে অঙ্গীকার করিয়াছিলেন। তবু ইহা সত্য যে, ইসমাঈলের বর্ধিত সন্তান-সন্ততিদের মাঝে তাঁহার বংশধরদের বিপুল সংখ্যাবৃদ্ধির ঐশ্বরিক অঙ্গীকার অত্যন্ত প্রশংসনীয়ভাবে পূর্ণতা লাভ করিয়াছে। ইসমাঈলের বংশধরগণই ইসহাকের বংশধরদের তুলনায় অনেক অনেক বেশি করিয়া ও আরও অধিকতর বিস্তৃত অঞ্চলে প্রসার লাভ করিয়াছে।

জেনেসিসের ২২ অনুচ্ছেদে একমাত্র পুত্র বলিতে যে ইসমাঈলকে বুঝানো উচিত তাহা খোদ জেনেসিসে বর্ণিত ঘটনাবলীর প্রসঙ্গ ও ধারাবিন্যাস হইতেই স্পষ্ট। প্রথমত, ইবরাহীমের সহিত আল্লাহ তাঁহার অঙ্গীকার সম্পাদনের পর তিনি তাঁহার (ইবরাহীমের) বিশ্বাসের গভীরতা যাচাই করিতে অগ্রসর হইবেন, তাঁহার অনুগ্রহ বর্ষণের কথা বলিবেন, ইসমাঈল ও ইসহাক নামে দুই পুত্র দানের সুসংবাদ প্রদান করিবেন এবং পুত্রদ্বয়কে তাঁহার অশেষ আশিসে স্নাত করিবেন তাহা নিরর্থক। আল্লাহ ইবরাহীমকে তাঁহার উপর তাঁহার সকল অনুগ্রহ ও আশিস বর্ষণের আগেই ও সর্বপরি, তাঁহার সহিত এক চিরস্থায়ী অঙ্গীকারে উপনীত হইবার আগেই ইবরাহীমের ঈমান ও বিশ্বাসের প্রমাণ লইবেন, তাহার পূর্বে নহে—ইহাই বরং যুক্তিসঙ্গত ও বাস্তব সম্মত।

দ্বিতীয়ত, তাঁহার প্রথম নবজাত সন্তানকে এক দূরদেশে নির্বাসনে পাঠাইবার জন্য পিতা ইবরাহীমকে নির্দেশ দানের পর আবার আল্লাহ্র পক্ষ হইতে সেই ইবরাহীমকে তাঁহার অপর পুত্র ইসহাককেও কুরবানী দিতে আদেশ করা নিতান্তই নির্দয় ও অসঙ্গতিপূর্ণ। আর ইহাও উল্লেখযোগ্য যে, আল্লাহ হাজেরা ও ইসমাঈলকে নির্বাসনে প্রেরণের সময় ইবরাহীমের দুঃখে সান্ত্বনা দিয়াছিলেন। কেবল তাহাই নহে, 'ইসহাকের বংশ তোমার বংশ হিসাবে পরিচিত হইবে' অর্থাৎ তাহারা যেথায় রহিয়াছে সেখানেই তাহারা থাকিবে ও বংশবৃদ্ধি করিবে বলিয়া তিনি ইবরাহীমকে আশ্বাস দেওয়ার পর তিনি ইসহাককে কুরবানী দিতে আদেশ দিবেন ইহা উল্লিখিত উক্তির সহিত সঙ্গতিপূর্ণ নয়।

এভাবে জেনেসিস-এর ২২ অনুচ্ছেদের মধ্যেই যেসব সাক্ষ্য-প্রমাণ পাওয়া যাইতেছে এবং ঘটনাবলীর সার্বিক ধারাবিন্যাস ও যুক্তি মিলাইয়া যাহা বুঝা যাইতেছে তাহাতে প্রতীয়মান হয় যে, যাহাকে কুরবানী দিতে আল্লাহ নির্দেশ দিয়াছিলেন সে ইবরাহীমের প্রথম ও একমাত্র পুত্র সন্তান, আর তিনি ইসমাঈল ভিন্ন অন্য কেহ নহেন, যাহাকে কুরবানী দিতে বলা হইয়াছে এবং কুরবানী দেওয়ার জন্য ইবরাহীম প্রস্তুত করিয়া লইয়া গিয়াছিলেন।

প্রাচ্যতত্ত্ববিদগণ অবশ্য তাহাদের নানা তত্ত্ব দিয়াছেন জেনেসিস-এ উল্লিখিত "একমাত্র পুত্র” বক্তব্যের ব্যাখ্যা করিবার জন্য। এই বিষয়ে সবচেয়ে বেশি করিয়া যে যুক্তির অবতারণা তাহারা করিয়া থাকেন তাহার প্রত্যক্ষ বা পরোক্ষ ভিত্তি হইল নিউ টেস্টামেন্টের নিম্নোক্ত বর্ণনা : [66]

"লিখিত আছে যে, অব্রাহামের দুই পুত্র ছিল, একটি দাসীর পুত্র, একটি স্বাধীনার পুত্র। কিন্তু ঐ দাসীর পুত্র মাংস অনুসারে, স্বাধীনার পুত্র প্রতিজ্ঞার গুণে জন্মিয়াছিল" (গালাতীয়, ৪ : ২২-২৩)।

আগে ইহা উল্লেখ করা হইয়াছে যে, "ক্রীতদাসী" বলিয়া যে শব্দটি রহিয়াছে তাহা বাইবেলে ইবরাহীমের স্ত্রীর প্রতি আরোপের ব্যাপারে ঠিক নহে। ইহা ইসমাঈলের প্রতি বিদ্বেষপ্রসূত। [67]

বিশেষ করিয়া ইবরাহীমের সহিত হাজেরার বিবাহের পর, খোদ বাইবেলই সাক্ষ্য দিতেছে যে, "সারী....হাগারকে লইয়া আপন স্বামী অব্রামের সহিত বিবাহ দিলেন" (আদিপুস্তক, ১৬:৩)। [68]

হাজেরা একজন নবীর বিবাহিত স্ত্রীর মর্যাদায় উন্নীত হইলেন। আর তাই ইসমাঈল ছিলেন বিবাহ বন্ধনে আবদ্ধ দম্পতির বৈধ পুত্রসন্তান। অতএব কোনভাবে ইসমাঈলকে ইবরাহীমের জারজ সন্তান (নাউযু বিল্লাহ) বলা ও সেই একই কারণে ইসমাঈলকে ইবরাহীমের পুত্র হিসাবে স্বীকার করা যাইবে না, ইহা হইবে একান্ত উদ্ভট, একাধিক নবীর জনক ইবরাহীমের স্মৃতির জন্য অবমাননাকর এবং ওল্ড টেস্টামেন্টে 'ইসমাঈল ইবরাহীমের' 'বীজ' ও 'পুত্র' বলিয়া বারংবার যে উল্লেখ রহিয়াছে উহার সরাসরি বিরোধী। বাইবেলে ইহা সেই "পুত্র” যাহাকে আল্লাহ বারংবার আশিসধন্য করিয়াছেন, বারবার তাঁহাকে 'জাতি'তে পরিণত করিবেন বলিয়া অঙ্গীকার করিয়াছেন, অঙ্গীকার করিয়াছেন তাঁহার নিরতিশয় বংশবৃদ্ধির, তাঁহার বংশ হইতে ১২ জন শাসক সৃষ্টির। এই অবস্থায় ইসমাঈল গোত্র পরিচয়হীন থাকিবেন, কেবল বাইবেলে কোন বিশ্বাস নাই বা আল্লাহ্ বাণীতে আস্থা নাই এমন ব্যক্তি ছাড়া অপর কেহ ইহা আর যাহাই হউক মানিয়া নিতে পারে না। অধিকন্তু বাইবেলের বর্ণনা অনুযায়ী, প্রথম সন্তানের অধিকার ইসমাঈলে বর্তাইয়াছে। কেননা ওল্ড টেস্টামেন্টে বলা হইয়াছে, যদি কোন ব্যক্তির দুই স্ত্রী থাকে এবং তাহাদের একজন 'ঘৃণিত' ও আরেকজন 'প্রিয়পাত্রী' হইয়া থাকে এবং দুই স্ত্রীর গর্ভে যদি দুই বা ততোধিক পুত্র সন্তান থাকে এবং প্রথম পুত্রসন্তানটি 'ঘৃণিত স্ত্রীর' গর্ভজাত হয় তাহা হইলে ঐ পুত্রসন্তানটি উত্তরাধিকারী হিসাবে অন্যান্য সন্তানদের তুলনায় দ্বিগুণ উত্তরাধিকারের স্বত্ববান হইবে। [69] এখানে আবারও গুরুত্ব আরোপ করিয়া বলিতে হয় যে, ইসহাক আল্লাহ্ আধ্যাত্মিক রহমত বা আশিসের একান্ত অধিকারী এমন দাবি একান্তই ভ্রান্ত ও বালসুলভ।

নিউ টেস্টামেন্টের উল্লিখিত উদ্ধৃত বর্ণনায় যে প্রচ্ছন্ন তারতম্যই থাকুক না কেন, ইসমাঈল যেমন কেবল বিবাহ বহির্ভূত সংসর্গজনিত উপায়ে জন্ম নেন নাই, তেমনি ইসহাকও কেবল অঙ্গীকারধন্য হইয়া ভূমিষ্ঠ হন নাই। তাঁহারা উভয়েই তাহাদের পিতা-মাতার একান্ত বৈধ সন্তান। তাঁহাদের উভয়ের মাতা হাজার ও সারাহ আল্লাহ্ আশিসধন্য। তাঁহাদের উভয়কে প্রতিশ্রুতি দেওয়া হইয়াছিল এবং আল্লাহ তাঁহাদের উভয়কেই তাহাদের স্বস্ব গর্ভে নিজ পুত্র সন্তান আসিবার সুসংবাদ প্রদান করিয়াছিলেন। উভয় সন্তানের নাম নির্বাচন করিয়াছিলেন আল্লাহ এবং তিনিই দুই মাতাকে তাহাদের নিজ নিজ পুত্রের নামকরণের কথাও জানাইয়াছিলেন। আর এইভাবেই ইসমাঈল ও ইসহাক ভূমিষ্ঠ হইয়াছিলেন 'অঙ্গীকারে' ও 'দেহজ সংসর্গের' যুগপৎ উভয় কারণে।

যদি ইসহাক বেশি করিয়াই অঙ্গীকারের ফলে এই ধরায় আসিয়া থাকেন এবং আল্লাহ তাঁহার প্রতিশ্রুতি ইবরাহীমকে দিয়া থাকেন, ইবরাহীমের প্রমাণিত ধর্মবিশ্বাসের বা ঈমানের কারণে, যাহা ওল্ড টেস্টামেন্ট ও কুরআন উভয়ই বলিতেছে, তাহা হইলে ইহা আরও অধিকতর যুক্তিসঙ্গত যে, আল্লাহ সেক্ষেত্রে ইবরাহীমকে বলিবেন ইসহাককেই কুরবানী দিতে। কেননা ইসহাককে পুত্র হিসাবে ইবরাহীম পাইয়াছিলেন পুরস্কার ও অনুগ্রহ হিসাবে।

পরিশেষে ইহা উল্লেখযোগ্য যে, ইসহাকের অনুসারীদের বংশধরদের মধ্যে তাহাদের ধর্মীয় কোন আচার-অনুষ্ঠানে কোনও রকম কুরবানী দেওয়ার মত কিছু করা হয় না। পক্ষান্তরে ইসমাঈলের বংশধর ও তাহাদের অনুসারিগণ সারা বিশ্বে প্রতি বৎসর কুরবানীর ঘটনাটি আরবী পঞ্জিকার শেষ মাসের দশম তারিখে স্মৃতি হিসাবে পালন করিয়া থাকেন। তাহারাই অন্যদের বিপরীতে তাহাদের বাধ্যতামূলক ও স্বেচ্ছামূলক নামায-ইবাদতে ইবরাহীম ও তাঁহার বংশধরদের (ইসহাকসহ) প্রতি আশিসবাণী পাঠ করিয়া থাকেন এবং এইভাবে তাহারা ইবরাহীমকে আল্লাহ যাহা বলিয়াছিলেন "এইভাবে তাহাদের বিশ্বাস প্রমাণ করে"। [70]

লিঙ্ক শেয়ার করুন
close

লিঙ্ক কপি করুন

0:00
0:00