📘 সীরাত বিশ্বকোষ > 📄 এক: জাহিলিয়্যা

📄 এক: জাহিলিয়্যা


এক: জাহিলিয়্যা
প্রাচ্যতত্ত্ববিদগণ সাধারণত জাহিলিয়্যা কথাটির অনুবাদ করিয়াছেন 'অজ্ঞানতা, বর্বরতা' হিসাবে। তাহারা জাহিলিয়্যা বলিতে ইসলামের আগের কালপরিক্রমাকে নির্দেশ করিয়াছেন। বিশ শতকের গোড়ার দিকের লেখক আর. এ. নিকলসন আরবের ইতিহাসকে তিনটি কালপর্যায়ে ভাগ
করিয়াছেন: সাবায়ী ও হিময়ারী আমল (৮০০ খৃ. পূর্বাব্দ-৫০০ খৃষ্টাব্দ), প্রাক-ইসলামী আমল (৫০০-৬২২ খৃ.) এবং মুহাম্মাদী আমল। এক টীকাভাষ্যে তিনি উল্লেখ করেন, "কড়াকড়িভাবে বলিতে গেলে আদম (আ) হইতে মুহাম্মাদ পর্যন্ত সময়কে জাহিলিয়্যা আমল বুঝায়। আর সংকীর্ণ অর্থে ইহা প্রাক-ইসলামী আমল”। তাঁহার লেখার পরের এক পর্যায়ে অবিশ্বাসী (কাফের) আরবদের ইতিহাস ও কিংবদন্তী ইত্যাদি সম্পর্কে আলোচনা প্রসঙ্গে তিনি আরও উল্লেখ করেন, "মুসলমানগণ জাহিলিয়্যা বলিতে আরব ইতিহাসের একেবারে গোড়ার দিক হইতে ইসলাম প্রতিষ্ঠার সময়কে বুঝাইয়া থাকে”। ইহার পর তিনি উল্লেখ করেন যে, গোল্ডজিহার অবশ্য প্রমাণ করিয়াছেন যে, 'জাহল' এই আরবী শব্দটি ইল্ম বা জ্ঞান-এর অর্থের বিপরীতার্থ বুঝায় না, বরং হিল্ল্ম (প্রজ্ঞা)-এর বিপরীত অর্থ বুঝায়। আর সে কারণে জাহল শব্দটি দ্বারা যত না অজ্ঞানতা হিসাবে বুঝিতে হইবে উহা হইতেও বেশী করিয়া বন্যতা বা বর্বরতা হিসাবে। অর্থাৎ গোত্র অহঙ্কার ও অশেষ গোত্রবিবাদ, প্রতিশোধ গ্রহণের সংস্কৃতি এবং বিধর্মী-অবিশ্বাসীদের অন্যান্য বৈশিষ্ট্য, ইসলাম যাহা দূর করিতে চাহিয়াছে সেগুলিকে বুঝিতে হইবে। এই ব্যাখ্য্যার ভিত্তিতে নিকলসন প্রাক-ইসলামী কাব্য হইতে উদ্ধার করা উপাদান অবলম্বনে বিধর্মী আরবদের ইতিহাস ও কিংবদন্তীর বর্ণনা দিয়াছেন।
নিকলসনের ঘনিষ্ঠ অনুসরণে আনুমানিক আরও ২৫ বৎসর পর লিখিতে গিয়া পি. কে. হিট্টি একইভাবে আরব ইতিহাসকে তিনটি প্রধান কাল পর্যায়ে বিভক্ত করিয়াছেন: (১) সাবায়ী আমল; (২) হিময়ারী আমল ও (৩) ইসলামী আমল। ইহার পর তিনি কার্যত নিকলসনের সঙ্গে গলা মিলাইয়াই বলিয়াছেন, "জাহিলিয়্যা এক ধারণায় আদম ('আ)-এর সৃষ্টি হইতে শুরু করিয়া মুহাম্মাদ -এর মিশন অবধি বিস্তৃত। কিন্তু বাস্তবিকপক্ষে জাহিলিয়্যা বলিতে সেই কাল-পরিক্রমাকে বুঝাইয়া থাকে যখন আরবে কোন প্রকার শৃঙ্খলা, শাসন, কোন নিষ্ঠ নবী, কোন ঐশী গ্রন্থ ছিল না। বস্তুত দক্ষিণ আরবে ঐ সময়ে এক সংস্কৃত ও শিক্ষিত সমাজের অস্তিত্ব ছিল। কাজেই সেখানে অজ্ঞানতা ও বর্বরতা ছিল এমনটি বলা কঠিন।” তিনি আরও বলিয়াছেন যে, "মহানবী ঘোষণা করেন যে, যাহা কিছু পূর্বে ছিল ইসলাম উহার সবকিছু মুছিয়া ফেলিবে, যাহার অর্থ প্রাক-ইসলামী সকল ধ্যান-ধারণা ও আদর্শ নিষিদ্ধ করা হইবে”। তিনি অবশ্য একই সঙ্গে ইহাও বলেন যে, "ধ্যান-ধারণা একেবারে নিশ্চিহ্ন করা খুবই কঠিন; বিশেষ করিয়া কোন একক ব্যক্তির আপত্তিই অতীতকে বাতিল করার জন্য যথেষ্ট নয়”। ৬
এইভাবে নিকলসন ও হিট্টি উভয়েই জাহিলিয়্যাকে প্রধানত একটি কালপর্যায় হিসাবে গ্রহণ করিয়াছেন। হিট্টি এই কালপরিক্রমার একটি নিজস্ব সংজ্ঞাও দিয়াছেন। পরবর্তী কালের লেখকগণ মোটামুটি তাহাদের অনুসরণ করিয়াছেন বলা যায়। তাহারা জাহিলিয়্যা বলিতে তাই আরব ইতিহাসের একটি বিশেষ কালকে বুঝিয়াছেন। উল্লেখ আবশ্যক যে, চিরায়ত ধারণা মুসলিম লেখকগণও কোন কোন সময় জাহিলিয়্যা আমলকে চিহ্নিত করার প্রয়াস পাইয়াছেন। তবে তাঁহারা
হযরত মুহাম্মাদ (স) ৯১
এই জাহিলিয়‍্যার ব্যাপারে আরও কতগুলি বিষয়ের উপর গুরুত্ব আরোপ করিয়াছেন। এইগুলি হইল, অভ্যাস-রীতি-আচার, লক্ষণ ও বৈশিষ্ট্য। আরব ইতিহাসের একটা কালপর্যায়ে এই উপাদানগুলির সম্মিলিত উপস্থাপনাকেই তাঁহারা জাহিলিয়্যা বলিয়াছেন। তবে এই কালপর্যায় কোন সুনির্দিষ্ট কাল সীমায় সীমিত নহে। ৭
বাস্তবিকপক্ষে মহানবী ও তাঁহার আশু উত্তরাধিকারীদের আমলেও জাহিলিয়‍্যাকে ইতিহাসের কোন কাল বুঝাইত না, বরং বিশেষ অভ্যাস এবং রীতি-আচরণের বিষয়গুলিকেই জাহিলিয়্যা বলিয়া বিবেচনা করা হইত। তবে সে যাহাই হউক, মুসলিম ঐতিহাসিকগণও ইতিহাসের কোন এক মেয়াদের আলোচনাতেও জাহিলিয়‍্যাকে কখনও ৫০০ থেকে ৬২২ খৃস্টাব্দের মধ্যবর্তী কাল বলিয়া চিহ্নিত করেন নাই বরং এই মেয়াদ শনাক্ত করিয়াছেন নিকলসন। কেননা তিনি বলিয়াছেন, "দ্বিতীয় মেয়াদ অর্থাৎ প্রাক-ইসলামী আমলকেই (৫০০-৬২২) মুসলিম লেখকগণ 'জাহিলিয়্যা' অর্থাৎ 'অজ্ঞানতা ও বর্বরতার যুগ' বলিয়া অভিহিত করিয়াছেন”। অথচ কোন চিরায়ত মুসলিম ঐতিহাসিক এই সংজ্ঞায় জাহিলিয়‍্যাকে সংজ্ঞায়িত করেন নাই।
এই বিভ্রান্তির জন্ম সম্ভবত "জাহিলিয়্যা' শব্দের অযথার্থ ইংরাজি অনুবাদ হইতে। কেননা জাহিলিয়্যার ইংরাজি অনুবাদ হইল 'অজ্ঞানতা, অজ্ঞতা' (Ignorance) বা বর্বরতা (Barbarism) । ইসলামী টেকনিক্যাল পরিভাষাগুলি এই ধরনের অযথার্থ ইংরাজি বা অন্যান্য ভাষায় অনুবাদে প্রায়ই লক্ষ্য করা যায়। জাহিলিয়্যার ইংরাজি অনুবাদ 'অজ্ঞানতা' বা 'বর্বরতা'। মূল আরবী শব্দগুলির এহেন অনুবাদের কারণেই নিকলসন স্পষ্টত উপলব্ধি করেন যে, ইংরাজি শব্দগুলি সাবায়ী ও হিম্য়ারী সভ্যতার ক্ষেত্রে প্রযোজ্য হইতে পারে না। আর তাই তিনি এই সভ্যতাগুলিকে অজ্ঞানতা ও বর্বরতার যুগের অন্তর্ভুক্ত করেন নাই। কেননা দক্ষিণ আরবের হিম্য়ারী ও সাবায়ীরা এক সংস্কৃতি সমৃদ্ধ সভ্যতা গড়িয়া তুলিয়াছিল। তাহারা ছিল শিক্ষিত ও হরফজ্ঞান সম্পন্ন জনসমষ্টি।
একই ধারণা গোল্ডজিহারকেও সম্ভবত অনুপ্রাণিত করিয়াছে এই উল্লেখে যে, জাহিলিয়‍্যাকে 'ইলম শব্দের বিপরীতার্থক শব্দ হিসাবে গ্রহণ করা যাইবে না, বরং হিলম শব্দের বিপরীতার্থক ধরিতে হইবে। তাহার বক্তব্য হিল্ম শব্দের অর্থ 'সভ্য মানুষের নৈতিক যৌক্তিকতা'। এখানে উল্লেখ করা যায় যে, গোল্ডজিহারের এই সংজ্ঞাও কড়াকড়ি ধারণায় গোটা প্রাক-ইসলামী আরবের বেলায় প্রযোজ্য হইতে পারে না। আরবদের অনেকেই হিল্ম-এর অধিকারী না থাকিলেও তাহাদের অধিকাংশই আদর্শ হিসাবে হিল্মকে যথেষ্ট মর্যাদা দিত, অনেকে এই গুণ বা উৎকর্ষের অধিকারীও ছিল।
ইহা ছাড়াও এই সংজ্ঞার প্রবণতা হইল জাহিলিয়্যার কয়েকটি সবিশেষ মৌলিক উপাদানকে পাশ কাটাইয়া যাওয়া। এইগুলি হইল: বহু ঈশ্বরবাদ, মূর্তিপূজা, ব্যভিচার এবং অন্যায়ভাবে অন্যদেরকে তাহাদের অধিকার হইতে বঞ্চিত করা। এই বৈশিষ্ট্যগুলি একান্তভাবেই জাহিলিয়্যার সংজ্ঞাভুক্ত, যদিও সর্বদাই 'শিক্ষিত' ও 'সংস্কৃতিবান' সমাজ বহির্ভূত নাও হইতে পারে।
হিট্টি জাহিলিয়্যার একটি সংশোধিত সংজ্ঞা দিয়াছেন। তাহার এই সংজ্ঞা অনুযায়ী, জাহিলিয়্যা হইল "ইতিহাসের একটি কালের মেয়াদ, যে মেয়াদে আরবে কোন সুশাসন ছিল না, কোন ঐশী প্রেরণাপ্রাপ্ত নবী ছিলেন না, কোন প্রত্যাদিষ্ট গ্রন্থও ছিল না”।
এই সংজ্ঞাও কার্যত জাহিলিয়্যার কয়েকটি একান্ত মৌলিক বিষয়কে অন্তর্ভুক্ত করে নাই। তাই বড়জোর এই সংজ্ঞাকে একটা উদ্ভাবন বলা যায়। আদিতে জাহিলিয়্যার অর্থ লইয়া যে বিভ্রান্তি ছিল সেই একই বিভ্রান্তির ফল হিসাবে এই সংজ্ঞা উদ্ভূত। অর্থাৎ জাহিলিয়‍্যার অর্থ অজ্ঞানতা বা বর্বরতা। তাই ইহা যেমন ভ্রান্ত, তেমনি হিট্টির পরবর্তী মন্তব্যও তেমনই বিভ্রান্তিকর। তিনি তাহার এই মন্তব্যে বলিয়াছেন যে, মহানবী ঘোষণা করেন, "তাঁহার প্রচারিত নূতন ধর্ম ইতোপূর্বে যাহা কিছু ঘটিয়াছে তাহার সব কিছুরই অবসান ঘটাইবে”। প্রকৃত প্রস্তাবে পূর্বে যাহা কিছু ঘটিয়াছে মহানবী উহার সকল কিছুই মুছিয়া ফেলেন নাই বরং উহার উল্টা মহানবীও ইসলামে বহু প্রাক-ইসলামী (জাহিলিয়্যা নয়) ব্যবস্থা ও রীতির অনুমোদন দিয়াছেন ও বহাল রাখিয়াছেন এবং পূর্ববর্তী নবীগণ যে মিশন ও বার্তা লইয়া আসিয়াছিলেন সেগুলি বহাল রখিবার সহিত সেগুলি পরিপূর্ণ করিতেও প্রয়াসী হইয়াছেন। হিট্টির উল্লিখিত সর্বশেষ মন্তব্যটি যেহেতু স্পষ্টতই ভ্রান্ত, সেহেতু এই মন্তব্য ভিত্তিক তাহার অন্যান্য মন্তব্য, যেমন 'কোন এক ব্যক্তির ভেটোই অতীতকে বাতিল করার জন্য যথেষ্ট শক্তি ধরে না' এই মন্তব্যও অযথার্থ ও অনাহুত।
যদি 'জাহিলিয়্যা' এই টেকনিক্যাল পারিভাষিক শব্দটির অনুবাদ করিতেই হয় তাহা হইলে উহার প্রতিশব্দ হইবে: 'ভুল' বা 'বিপথে চালনা'। এগুলিই সম্ভবত জাহিলিয়্যার প্রকৃত অর্থের অধিকতর কাছাকাছি হইবে। তবে এইরূপ অনুবাদ করার খুব একটা অনিবার্য প্রয়োজনীয়তাও নাই, বরং এই শব্দের ব্যবহার রীতি, কুরআন ও মহানবীকে এবং প্রথম দিকের মুসলমানগণ কোন কোন বিশেষ বিশ্বাস, অভ্যাস ও রীতি তথা এই সবের পরিস্থিতিকে বুঝাইবার জন্য যেভাবে শব্দটির ব্যবহার ও প্রয়োগ করিতেন সেইসব অনুসরণ করিয়াই জাহিলিয়্যার ধারণাটির যথার্থ উপলব্ধি সম্ভব, কোন ঐতিহাসিক মেয়াদের বিচারে নহে। এই বিষয়ে অত্যন্ত চমৎকার ব্যাখ্যামূলক দৃষ্টান্ত পাওয়া যায় আবিসিনিয়ার শাসকের দরবারে জাফর ইবন আবী তালিব (রা) কর্তৃক সেখানে হিজরতকারী মুসলমানদের পক্ষে প্রদত্ত বক্তব্যে। তিনি তাঁহার বক্তব্যের শুরুতে বলেন, "আমরা জাহিলিয়্যার লোক। আমরা মূর্তিপূজা করিতাম, মৃত প্রাণী আহার করিতাম, ব্যভিচার ও বিবাহিত-অবিবাহিতে যৌনাচারে (ফাওয়াহিশ) লিপ্ত ছিলাম, আত্মীয়তা সম্পর্ক ছেদ করিতাম (কা’ রাহম), নিরাপত্তার জন্য স্বীকৃত নিয়মবিধি আমরা বিস্তৃত হইয়াছিলাম, সবল দুর্বলকে গ্রাস করিতাম।” এই যেসব বিষয়ের উল্লেখ করা হইল সেগুলি জাহিলিয়্যারই বৈশিষ্ট। ৮
অনুরূপভাবে আল-কুরআনের ব্যাখ্যা-বিশ্লেষণ প্রশ্নে অন্যতম আদি ব্যাখ্যাকার ও মুফাসসিরকুল শিরোমণি 'আবদুল্লাহ ইব্‌ন্ 'আব্বাস (রা) বলিয়াছেন, "যদি কেহ 'জাহাল' শব্দের
হযরত মুহাম্মাদ (স) ৯৩
অর্থ বুঝিতে চাহে তাহা হইলে তাহার উচিত হইবে কুরআনের ৬ নম্বর সূরা আল-আন'আমের ১৩০ নং আয়াত পাঠ করা। এই আয়াত, বিশেষ করিয়া ১৩৬ হইতে ১৩৯ আয়াতে আরবদের বহু ঈশ্বরবাদী আচার-রীতি, কোন প্রাণীর ব্যাপারে বিধিনিষেধ আরোপ করা, কন্যা সন্তান হত্যা করা ইত্যাদি সম্পর্কে বর্ণনা রহিয়াছে। ইহা ছাড়াও হাদীছে ব্যবহৃত বিভিন্ন টেকনিক্যাল শব্দ সম্পর্কে অন্যতম প্রামাণ্য বিশেষজ্ঞ ইবনুল আছীর অত্যন্ত স্পষ্ট করিয়া বলিয়াছেন যে, জাহিলিয়্যার অর্থ 'এক রকমের হাল-অবস্থা বা বিরাজমান পরিস্থিতি যে পরিস্থিতির মধ্যে আরবরা ইসলামের আবির্ভাবের পূর্বে ছিল'। ১০
জাহিলিয়্যা বলিতে বিশ্বাস, অভ্যাস ও আচার-রীতি সম্পর্কিত বিরাজমান পরিস্থিতিকে বুঝায়। আর এই কারণেই জাহিলিয়্যা বলিতে কোন সুনির্দিষ্ট যুগ বা কোন নির্দিষ্ট জনসমষ্টিকে বুঝায় না। অতীতে আরবদের মাঝে জাহিলিয়্যা ছিল। এই জাহিলিয়্যা অনুরূপভাবে, তাহাদের সমসাময়িক অন্যান্য অনেক জনসমষ্টির মধ্যেও বিদ্যমান ছিল। এমনকি ইসলামের আবির্ভাবের পরেও কোন কোন অঞ্চল ও জনসমাজে জাহিলিয়্যা অব্যাহত থাকে। ১১

টিকাঃ
৪. R.A. Nicholson, A Literary History of the Arabs (1907), 1988, reprint, p.xxiv
৫. প্রাগুক্ত, ৩০; Goldziher, Muammedanische Studien -এর বরাতে, ১খ., পৃ. ২২৫।
৬. P. K. Hitti, History of the Arabs (1937), 10th edition, 1986 reprint, p. 87.
৭. দৃষ্টান্তস্বরূপ দ্র. আত-তাবারী, পৃ.স্থা., ২২:৪।
৮. ইব্‌ন হিশাম, ১খ., ৩৩৬।
৯. বুখারী, নং ৩৫২৪।
১০. ইবনুল আছীর (আবুস সা'আদাত আল-মুবারাক ইব্‌ন মুহাম্মাদ আল-জাযারী, ৫৪৪-৬০৬ হি.)। আন-নিহায়া ফী গারীবিল হাদীছ ওয়াল আছার, সম্পা. তাহির আহমাদ আল-জাওযী ও মাহমূদ মুহাম্মাদ আত-তানাহী, ১ম খণ্ড, পৃ. ৩২৩, তা. বি.।
১১. দ্র. মুহাম্মাদ কুতব, জাহিলিয়াত আল-কারনিল ইশরীন, কায়রো ১৩৮৪ হি.।


প্রাচ্যতত্ত্ববিদগণ সাধারণত জাহিলিয়্যা কথাটির অনুবাদ করিয়াছেন 'অজ্ঞানতা, বর্বরতা' হিসাবে। তাহারা জাহিলিয়্যা বলিতে ইসলামের আগের কালপরিক্রমাকে নির্দেশ করিয়াছেন। বিশ শতকের গোড়ার দিকের লেখক আর. এ. নিকলসন আরবের ইতিহাসকে তিনটি কালপর্যায়ে ভাগ করিয়াছেন: সাবায়ী ও হিময়ারী আমল (৮০০ খৃ. পূর্বাব্দ-৫০০ খৃষ্টাব্দ), প্রাক-ইসলামী আমল (৫০০-৬২২ খৃ.) এবং মুহাম্মাদী আমল। এক টীকাভাষ্যে তিনি উল্লেখ করেন, "কড়াকড়িভাবে বলিতে গেলে আদম (আ) হইতে মুহাম্মাদ পর্যন্ত সময়কে জাহিলিয়্যা আমল বুঝায়। আর সংকীর্ণ অর্থে ইহা প্রাক-ইসলামী আমল"। তাঁহার লেখার পরের এক পর্যায়ে অবিশ্বাসী (কাফের) আরবদের ইতিহাস ও কিংবদন্তী ইত্যাদি সম্পর্কে আলোচনা প্রসঙ্গে তিনি আরও উল্লেখ করেন, "মুসলমানগণ জাহিলিয়্যা বলিতে আরব ইতিহাসের একেবারে গোড়ার দিক হইতে ইসলাম প্রতিষ্ঠার সময়কে বুঝাইয়া থাকে"। ইহার পর তিনি উল্লেখ করেন যে, গোল্ডজিহার অবশ্য প্রমাণ করিয়াছেন যে, 'জাহল' এই আরবী শব্দটি ইল্ম বা জ্ঞান-এর অর্থের বিপরীতার্থ বুঝায় না, বরং হিল্ল্ম (প্রজ্ঞা)-এর বিপরীত অর্থ বুঝায়। আর সে কারণে জাহল শব্দটি দ্বারা যত না অজ্ঞানতা হিসাবে বুঝিতে হইবে উহা হইতেও বেশী করিয়া বন্যতা বা বর্বরতা হিসাবে। অর্থাৎ গোত্র অহঙ্কার ও অশেষ গোত্রবিবাদ, প্রতিশোধ গ্রহণের সংস্কৃতি এবং বিধর্মী-অবিশ্বাসীদের অন্যান্য বৈশিষ্ট্য, ইসলাম যাহা দূর করিতে চাহিয়াছে সেগুলিকে বুঝিতে হইবে। এই ব্যাখ্য্যার ভিত্তিতে নিকলসন প্রাক-ইসলামী কাব্য হইতে উদ্ধার করা উপাদান অবলম্বনে বিধর্মী আরবদের ইতিহাস ও কিংবদন্তীর বর্ণনা দিয়াছেন। [4]

নিকলসনের ঘনিষ্ঠ অনুসরণে আনুমানিক আরও ২৫ বৎসর পর লিখিতে গিয়া পি. কে. হিট্টি একইভাবে আরব ইতিহাসকে তিনটি প্রধান কাল পর্যায়ে বিভক্ত করিয়াছেন: (১) সাবায়ী আমল; (২) হিময়ারী আমল ও (৩) ইসলামী আমল। ইহার পর তিনি কার্যত নিকলসনের সঙ্গে গলা মিলাইয়াই বলিয়াছেন, "জাহিলিয়্যা এক ধারণায় আদম ('আ)-এর সৃষ্টি হইতে শুরু করিয়া মুহাম্মাদ -এর মিশন অবধি বিস্তৃত। কিন্তু বাস্তবিকপক্ষে জাহিলিয়্যা বলিতে সেই কাল-পরিক্রমাকে বুঝাইয়া থাকে যখন আরবে কোন প্রকার শৃঙ্খলা, শাসন, কোন নিষ্ঠ নবী, কোন ঐশী গ্রন্থ ছিল না। বস্তুত দক্ষিণ আরবে ঐ সময়ে এক সংস্কৃত ও শিক্ষিত সমাজের অস্তিত্ব ছিল। কাজেই সেখানে অজ্ঞানতা ও বর্বরতা ছিল এমনটি বলা কঠিন।” তিনি আরও বলিয়াছেন যে, "মহানবী ঘোষণা করেন যে, যাহা কিছু পূর্বে ছিল ইসলাম উহার সবকিছু মুছিয়া ফেলিবে, যাহার অর্থ প্রাক-ইসলামী সকল ধ্যান-ধারণা ও আদর্শ নিষিদ্ধ করা হইবে"। তিনি অবশ্য একই সঙ্গে ইহাও বলেন যে, "ধ্যান-ধারণা একেবারে নিশ্চিহ্ন করা খুবই কঠিন; বিশেষ করিয়া কোন একক ব্যক্তির আপত্তিই অতীতকে বাতিল করার জন্য যথেষ্ট নয়"। [6]

এইভাবে নিকলসন ও হিট্টি উভয়েই জাহিলিয়্যাকে প্রধানত একটি কালপর্যায় হিসাবে গ্রহণ করিয়াছেন। হিট্টি এই কালপরিক্রমার একটি নিজস্ব সংজ্ঞাও দিয়াছেন। পরবর্তী কালের লেখকগণ মোটামুটি তাহাদের অনুসরণ করিয়াছেন বলা যায়। তাহারা জাহিলিয়্যা বলিতে তাই আরব ইতিহাসের একটি বিশেষ কালকে বুঝিয়াছেন। উল্লেখ আবশ্যক যে, চিরায়ত ধারণা মুসলিম লেখকগণও কোন কোন সময় জাহিলিয়্যা আমলকে চিহ্নিত করার প্রয়াস পাইয়াছেন। তবে তাঁহারা এই জাহিলিয়্যার ব্যাপারে আরও কতগুলি বিষয়ের উপর গুরুত্ব আরোপ করিয়াছেন। এইগুলি হইল, অভ্যাস-রীতি-আচার, লক্ষণ ও বৈশিষ্ট্য। আরব ইতিহাসের একটা কালপর্যায়ে এই উপাদানগুলির সম্মিলিত উপস্থাপনাকেই তাঁহারা জাহিলিয়্যা বলিয়াছেন। তবে এই কালপর্যায় কোন সুনির্দিষ্ট কাল সীমায় সীমিত নহে। [7]

বাস্তবিকপক্ষে মহানবী ও তাঁহার আশু উত্তরাধিকারীদের আমলেও জাহিলিয়‍্যাকে ইতিহাসের কোন কাল বুঝাইত না, বরং বিশেষ অভ্যাস এবং রীতি-আচরণের বিষয়গুলিকেই জাহিলিয়্যা বলিয়া বিবেচনা করা হইত। তবে সে যাহাই হউক, মুসলিম ঐতিহাসিকগণও ইতিহাসের কোন এক মেয়াদের আলোচনাতেও জাহিলিয়‍্যাকে কখনও ৫০০ থেকে ৬২২ খৃস্টাব্দের মধ্যবর্তী কাল বলিয়া চিহ্নিত করেন নাই বরং এই মেয়াদ শনাক্ত করিয়াছেন নিকলসন। কেননা তিনি বলিয়াছেন, "দ্বিতীয় মেয়াদ অর্থাৎ প্রাক-ইসলামী আমলকেই (৫০০-৬২২) মুসলিম লেখকগণ 'জাহিলিয়্যা' অর্থাৎ 'অজ্ঞানতা ও বর্বরতার যুগ' বলিয়া অভিহিত করিয়াছেন"। অথচ কোন চিরায়ত মুসলিম ঐতিহাসিক এই সংজ্ঞায় জাহিলিয়‍্যাকে সংজ্ঞায়িত করেন নাই।

এই বিভ্রান্তির জন্ম সম্ভবত "জাহিলিয়্যা' শব্দের অযথার্থ ইংরাজি অনুবাদ হইতে। কেননা জাহিলিয়্যার ইংরাজি অনুবাদ হইল 'অজ্ঞানতা, অজ্ঞতা' (Ignorance) বা বর্বরতা (Barbarism) । ইসলামী টেকনিক্যাল পরিভাষাগুলি এই ধরনের অযথার্থ ইংরাজি বা অন্যান্য ভাষায় অনুবাদে প্রায়ই লক্ষ্য করা যায়। জাহিলিয়্যার ইংরাজি অনুবাদ 'অজ্ঞানতা' বা 'বর্বরতা'। মূল আরবী শব্দগুলির এহেন অনুবাদের কারণেই নিকলসন স্পষ্টত উপলব্ধি করেন যে, ইংরাজি শব্দগুলি সাবায়ী ও হিম্য়ারী সভ্যতার ক্ষেত্রে প্রযোজ্য হইতে পারে না। আর তাই তিনি এই সভ্যতাগুলিকে অজ্ঞানতা ও বর্বরতার যুগের অন্তর্ভুক্ত করেন নাই। কেননা দক্ষিণ আরবের হিম্য়ারী ও সাবায়ীরা এক সংস্কৃতি সমৃদ্ধ সভ্যতা গড়িয়া তুলিয়াছিল। তাহারা ছিল শিক্ষিত ও হরফজ্ঞান সম্পন্ন জনসমষ্টি।

একই ধারণা গোল্ডজিহারকেও সম্ভবত অনুপ্রাণিত করিয়াছে এই উল্লেখে যে, জাহিলিয়‍্যাকে 'ইলম শব্দের বিপরীতার্থক শব্দ হিসাবে গ্রহণ করা যাইবে না, বরং হিলম শব্দের বিপরীতার্থক ধরিতে হইবে। তাহার বক্তব্য হিল্ম শব্দের অর্থ 'সভ্য মানুষের নৈতিক যৌক্তিকতা'। এখানে উল্লেখ করা যায় যে, গোল্ডজিহারের এই সংজ্ঞাও কড়াকড়ি ধারণায় গোটা প্রাক-ইসলামী আরবের বেলায় প্রযোজ্য হইতে পারে না। আরবদের অনেকেই হিল্ম-এর অধিকারী না থাকিলেও তাহাদের অধিকাংশই আদর্শ হিসাবে হিল্মকে যথেষ্ট মর্যাদা দিত, অনেকে এই গুণ বা উৎকর্ষের অধিকারীও ছিল।

ইহা ছাড়াও এই সংজ্ঞার প্রবণতা হইল জাহিলিয়্যার কয়েকটি সবিশেষ মৌলিক উপাদানকে পাশ কাটাইয়া যাওয়া। এইগুলি হইল: বহু ঈশ্বরবাদ, মূর্তিপূজা, ব্যভিচার এবং অন্যায়ভাবে অন্যদেরকে তাহাদের অধিকার হইতে বঞ্চিত করা। এই বৈশিষ্ট্যগুলি একান্তভাবেই জাহিলিয়্যার সংজ্ঞাভুক্ত, যদিও সর্বদাই 'শিক্ষিত' ও 'সংস্কৃতিবান' সমাজ বহির্ভূত নাও হইতে পারে।

হিট্টি জাহিলিয়্যার একটি সংশোধিত সংজ্ঞা দিয়াছেন। তাহার এই সংজ্ঞা অনুযায়ী, জাহিলিয়্যা হইল "ইতিহাসের একটি কালের মেয়াদ, যে মেয়াদে আরবে কোন সুশাসন ছিল না, কোন ঐশী প্রেরণাপ্রাপ্ত নবী ছিলেন না, কোন প্রত্যাদিষ্ট গ্রন্থও ছিল না"।

এই সংজ্ঞাও কার্যত জাহিলিয়্যার কয়েকটি একান্ত মৌলিক বিষয়কে অন্তর্ভুক্ত করে নাই। তাই বড়জোর এই সংজ্ঞাকে একটা উদ্ভাবন বলা যায়। আদিতে জাহিলিয়্যার অর্থ লইয়া যে বিভ্রান্তি ছিল সেই একই বিভ্রান্তির ফল হিসাবে এই সংজ্ঞা উদ্ভূত। অর্থাৎ জাহিলিয়‍্যার অর্থ অজ্ঞানতা বা বর্বরতা। তাই ইহা যেমন ভ্রান্ত, তেমনি হিট্টির পরবর্তী মন্তব্যও তেমনই বিভ্রান্তিকর। তিনি তাহার এই মন্তব্যে বলিয়াছেন যে, মহানবী ঘোষণা করেন, "তাঁহার প্রচারিত নূতন ধর্ম ইতোপূর্বে যাহা কিছু ঘটিয়াছে তাহার সব কিছুরই অবসান ঘটাইবে"। প্রকৃত প্রস্তাবে পূর্বে যাহা কিছু ঘটিয়াছে মহানবী উহার সকল কিছুই মুছিয়া ফেলেন নাই বরং উহার উল্টা মহানবীও ইসলামে বহু প্রাক-ইসলামী (জাহিলিয়্যা নয়) ব্যবস্থা ও রীতির অনুমোদন দিয়াছেন ও বহাল রাখিয়াছেন এবং পূর্ববর্তী নবীগণ যে মিশন ও বার্তা লইয়া আসিয়াছিলেন সেগুলি বহাল রখিবার সহিত সেগুলি পরিপূর্ণ করিতেও প্রয়াসী হইয়াছেন। হিট্টির উল্লিখিত সর্বশেষ মন্তব্যটি যেহেতু স্পষ্টতই ভ্রান্ত, সেহেতু এই মন্তব্য ভিত্তিক তাহার অন্যান্য মন্তব্য, যেমন 'কোন এক ব্যক্তির ভেটোই অতীতকে বাতিল করার জন্য যথেষ্ট শক্তি ধরে না' এই মন্তব্যও অযথার্থ ও অনাহুত।

যদি 'জাহিলিয়্যা' এই টেকনিক্যাল পারিভাষিক শব্দটির অনুবাদ করিতেই হয় তাহা হইলে উহার প্রতিশব্দ হইবে: 'ভুল' বা 'বিপথে চালনা'। এগুলিই সম্ভবত জাহিলিয়্যার প্রকৃত অর্থের অধিকতর কাছাকাছি হইবে। তবে এইরূপ অনুবাদ করার খুব একটা অনিবার্য প্রয়োজনীয়তাও নাই, বরং এই শব্দের ব্যবহার রীতি, কুরআন ও মহানবীকে এবং প্রথম দিকের মুসলমানগণ কোন কোন বিশেষ বিশ্বাস, অভ্যাস ও রীতি তথা এই সবের পরিস্থিতিকে বুঝাইবার জন্য যেভাবে শব্দটির ব্যবহার ও প্রয়োগ করিতেন সেইসব অনুসরণ করিয়াই জাহিলিয়্যার ধারণাটির যথার্থ উপলব্ধি সম্ভব, কোন ঐতিহাসিক মেয়াদের বিচারে নহে। এই বিষয়ে অত্যন্ত চমৎকার ব্যাখ্যামূলক দৃষ্টান্ত পাওয়া যায় আবিসিনিয়ার শাসকের দরবারে জাফর ইবন আবী তালিব (রা) কর্তৃক সেখানে হিজরতকারী মুসলমানদের পক্ষে প্রদত্ত বক্তব্যে। তিনি তাঁহার বক্তব্যের শুরুতে বলেন, "আমরা জাহিলিয়্যার লোক। আমরা মূর্তিপূজা করিতাম, মৃত প্রাণী আহার করিতাম, ব্যভিচার ও বিবাহিত-অবিবাহিতে যৌনাচারে (ফাওয়াহিশ) লিপ্ত ছিলাম, আত্মীয়তা সম্পর্ক ছেদ করিতাম (কা’ রাহম), নিরাপত্তার জন্য স্বীকৃত নিয়মবিধি আমরা বিস্তৃত হইয়াছিলাম, সবল দুর্বলকে গ্রাস করিতাম।" এই যেসব বিষয়ের উল্লেখ করা হইল সেগুলি জাহিলিয়্যারই বৈশিষ্ট। [8]

অনুরূপভাবে আল-কুরআনের ব্যাখ্যা-বিশ্লেষণ প্রশ্নে অন্যতম আদি ব্যাখ্যাকার ও মুফাসসিরকুল শিরোমণি 'আবদুল্লাহ ইব্‌ন্ 'আব্বাস (রা) বলিয়াছেন, "যদি কেহ 'জাহাল' শব্দের অর্থ বুঝিতে চাহে তাহা হইলে তাহার উচিত হইবে কুরআনের ৬ নম্বর সূরা আল-আন'আমের ১৩০ নং আয়াত পাঠ করা। এই আয়াত, বিশেষ করিয়া ১৩৬ হইতে ১৩৯ আয়াতে আরবদের বহু ঈশ্বরবাদী আচার-রীতি, কোন প্রাণীর ব্যাপারে বিধিনিষেধ আরোপ করা, কন্যা সন্তান হত্যা করা ইত্যাদি সম্পর্কে বর্ণনা রহিয়াছে। [9] ইহা ছাড়াও হাদীছে ব্যবহৃত বিভিন্ন টেকনিক্যাল শব্দ সম্পর্কে অন্যতম প্রামাণ্য বিশেষজ্ঞ ইবনুল আছীর অত্যন্ত স্পষ্ট করিয়া বলিয়াছেন যে, জাহিলিয়্যার অর্থ 'এক রকমের হাল-অবস্থা বা বিরাজমান পরিস্থিতি যে পরিস্থিতির মধ্যে আরবরা ইসলামের আবির্ভাবের পূর্বে ছিল'। [10]

জাহিলিয়্যা বলিতে বিশ্বাস, অভ্যাস ও আচার-রীতি সম্পর্কিত বিরাজমান পরিস্থিতিকে বুঝায়। আর এই কারণেই জাহিলিয়্যা বলিতে কোন সুনির্দিষ্ট যুগ বা কোন নির্দিষ্ট জনসমষ্টিকে বুঝায় না। অতীতে আরবদের মাঝে জাহিলিয়্যা ছিল। এই জাহিলিয়্যা অনুরূপভাবে, তাহাদের সমসাময়িক অন্যান্য অনেক জনসমষ্টির মধ্যেও বিদ্যমান ছিল। এমনকি ইসলামের আবির্ভাবের পরেও কোন কোন অঞ্চল ও জনসমাজে জাহিলিয়্যা অব্যাহত থাকে। [11]

📘 সীরাত বিশ্বকোষ > 📄 দুই: ইবরাহীম ('আ)-এর ঐতিহ্য সম্পর্কিত বিষয়

📄 দুই: ইবরাহীম ('আ)-এর ঐতিহ্য সম্পর্কিত বিষয়


দুই: ইবরাহীম ('আ)-এর ঐতিহ্য সম্পর্কিত বিষয় (ক) মুইর (Muir)-এর অভিমত পর্যালোচনা
অবশ্য অধিকতর গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হইল ইব্রাহীম ('আ)-এর ঐতিহ্য সম্পর্কে প্রাচ্যতত্ত্ববিদদের অভিমত। সাধারণত তাহারা স্বীকার করেন না যে, ইবরাহীম ('আ) মক্কায় আসিয়াছিলেন। তাহারা স্বীকার করেন না যে, বিবি হাজেরা ও তাঁহার পুত্র ইসমাঈল ('আ) আদৌ কখনও মক্কায় আসিয়াছিলেন, ইবরাহীম ('আ) আদৌ তাঁহাদের সেখানে রাখিয়া আসিয়াছিলেন বা তিনি মক্কার কা'বাগৃহ নির্মাণ করিয়াছিলেন। তাহারা আরও দাবি করেন যে, ইসমাঈল নহেন, ইসহাককেই কুরবানী করার জন্য ইবরাহীম ('আ)-কে নির্দেশ দেওয়া হইয়াছিল। এই অভিমতগুলিও অবশ্য প্রাচ্যতত্ত্বের মতই পুরাতন বিষয়। মুইর এই পুরাতন অভিমতগুলিকে উহাদের আধুনিক আঙ্গিক ও আকৃতি প্রদান করিয়াছেন। আর তাহার পরবর্তী লেখকগণ এই বিষয়ে প্রধানত তাহার যুক্তিতর্ক ও অনুমানগুলিরই পুনরাবৃত্তি করিয়াছেন। ১২ মার্গোলিয়থ লিখিয়াছেন, কা'বাঘরের সহিত ইবরাহীম ('আ)-এর সম্পর্কের পুরাকাহিনীটি দৃশ্যত পরবর্তী কালের কল্পনার ফল। আর এই কল্পনার কাজটি করা হইয়াছে কেবল রাজনৈতিক প্রয়োজনে। ১৩ আরও যাহারা এই মতেরই আরও বিশদ ব্যাখ্যা-বিশ্লেষণ করিয়াছেন তাহাদের মধ্যে জে. ডি. বেট ও রিচার্ড বেলের নাম উল্লেখ করা যায়। বেট এই বিষয়ে একটি স্বতন্ত্র রচনাকর্ম প্রস্তুত করেন যাহার শিরোনাম ছিল : Enquiries into the Claims of Ishmael। ১৪ তিনি এই রচনায় সমুদয় প্রাচ্যতত্ত্ববিদ ইবরাহীম ও ইসমাঈল ('আ)-এর কুরবানী সম্পর্কিত ঘটনা প্রসঙ্গে যাহা বলিয়াছেন কার্যত প্রায় সেই সকল কিছুরই সমাবেশ ঘটাইয়াছেন। তবে রিচার্ড বেল আভাসে বলিতে চাহিয়াছেন যে, এই
৯৪ সীরাত বিশ্বকোষ
বিষয়ে কুরআনের আয়াতগুলি মহানবী -এর পরবর্তী জীবনে মদীনায় অবস্থানকালে সংশোধন করা হয়। ১৫
স্পষ্টত এই বিষয় সম্পর্কে স্বতন্ত্র ও বিশদ আলোচনা আবশ্যক। বক্ষ্যমাণ গ্রন্থের উদ্দেশ্যও পরিসর অনুযায়ী এই অংশে মুইরের অভিমত বিবেচনায় সীমিত থাকিবে, যে অভিমত তাহার পরবর্তী কালের লেখকরা মূলত বিশদায়ন ও পুনরাবৃত্তি করিয়াছেন মাত্র।

টিকাঃ
১২. দৃষ্টান্তস্বরূপ দ্র. A. Guillaume, Islam, London 1964, pp. 61-62; P. Lammens, L'Islsm, Croyance et Instiutions, Beirut 1926, pp. 28, 33.
১৩. D. S. Margoliouth, Mohammed and Rise of Islsm, 3rd edition, London 1905, p. 104. এই গ্রন্থের পরের দিকের অংশে এই সুনির্দিষ্ট মন্তব্য আলোচিত হইয়াছে। পরে দ্র. অধ্যায় ১৪, ভাগ ১ও ২।
১৪. ১ম প্রকাশ, লণ্ডন ১৯২৬ খৃ.; পুনঃ প্রকাশ ১৯৮৪ খৃ..
১৫. R. Bell, "The Sacrifice of Ishmael", T.G.U.O.S., vol. X, 29-31; and "The Origin of the Id al-Azha", M.W., 1933, pp. 117-120.


অবশ্য অধিকতর গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হইল ইব্রাহীম ('আ)-এর ঐতিহ্য সম্পর্কে প্রাচ্যতত্ত্ববিদদের অভিমত। সাধারণত তাহারা স্বীকার করেন না যে, ইবরাহীম ('আ) মক্কায় আসিয়াছিলেন। তাহারা স্বীকার করেন না যে, বিবি হাজেরা ও তাঁহার পুত্র ইসমাঈল ('আ) আদৌ কখনও মক্কায় আসিয়াছিলেন, ইবরাহীম ('আ) আদৌ তাঁহাদের সেখানে রাখিয়া আসিয়াছিলেন বা তিনি মক্কার কা'বাগৃহ নির্মাণ করিয়াছিলেন। তাহারা আরও দাবি করেন যে, ইসমাঈল নহেন, ইসহাককেই কুরবানী করার জন্য ইবরাহীম ('আ)-কে নির্দেশ দেওয়া হইয়াছিল। এই অভিমতগুলিও অবশ্য প্রাচ্যতত্ত্বের মতই পুরাতন বিষয়। মুইর এই পুরাতন অভিমতগুলিকে উহাদের আধুনিক আঙ্গিক ও আকৃতি প্রদান করিয়াছেন। আর তাহার পরবর্তী লেখকগণ এই বিষয়ে প্রধানত তাহার যুক্তিতর্ক ও অনুমানগুলিরই পুনরাবৃত্তি করিয়াছেন। [12] মার্গোলিয়থ লিখিয়াছেন, কা'বাঘরের সহিত ইবরাহীম ('আ)-এর সম্পর্কের পুরাকাহিনীটি দৃশ্যত পরবর্তী কালের কল্পনার ফল। আর এই কল্পনার কাজটি করা হইয়াছে কেবল রাজনৈতিক প্রয়োজনে। [13] আরও যাহারা এই মতেরই আরও বিশদ ব্যাখ্যা-বিশ্লেষণ করিয়াছেন তাহাদের মধ্যে জে. ডি. বেট ও রিচার্ড বেলের নাম উল্লেখ করা যায়। বেট এই বিষয়ে একটি স্বতন্ত্র রচনাকর্ম প্রস্তুত করেন যাহার শিরোনাম ছিল : Enquiries into the Claims of Ishmael। [14] তিনি এই রচনায় সমুদয় প্রাচ্যতত্ত্ববিদ ইবরাহীম ও ইসমাঈল ('আ)-এর কুরবানী সম্পর্কিত ঘটনা প্রসঙ্গে যাহা বলিয়াছেন কার্যত প্রায় সেই সকল কিছুরই সমাবেশ ঘটাইয়াছেন। তবে রিচার্ড বেল আভাসে বলিতে চাহিয়াছেন যে, এই বিষয়ে কুরআনের আয়াতগুলি মহানবী -এর পরবর্তী জীবনে মদীনায় অবস্থানকালে সংশোধন করা হয়। [15]

স্পষ্টত এই বিষয় সম্পর্কে স্বতন্ত্র ও বিশদ আলোচনা আবশ্যক। বক্ষ্যমাণ গ্রন্থের উদ্দেশ্যও পরিসর অনুযায়ী এই অংশে মুইরের অভিমত বিবেচনায় সীমিত থাকিবে, যে অভিমত তাহার পরবর্তী কালের লেখকরা মূলত বিশদায়ন ও পুনরাবৃত্তি করিয়াছেন মাত্র।

লিঙ্ক শেয়ার করুন
close

লিঙ্ক কপি করুন

0:00
0:00