📘 সীরাত বিশ্বকোষ 📄 পাঁচ: আরব উপদ্বীপের বাহিরের জগত

📄 পাঁচ: আরব উপদ্বীপের বাহিরের জগত


পাঁচ : আরব উপদ্বীপের বাহিরের জগত
আরব আর যাহাই হউক গোটা বিশ্ব নয়। আর কেবল আরবরাই যে জাহিলিয়া বা আঁধারে আচ্ছন্ন ছিল তাহাও নহে। আরও দেশ, ভূভাগ, জনসমষ্টি ছিল এই উপদ্বীপের বাহিরেও যেখানেও ছিল জাহিলিয়ার পরিবেশ। ঐ সময়কার বিশ্ব আদর্শিক ধারণায় মোটামুটি তিনটি ভাগে বিভক্ত
ছিল। পশ্চিমে ছিল বায়যান্টাইন এবং রোমক সাম্রাজ্য: এই দুই সাম্রাজ্যের বিস্তৃতি ছিল পূর্বে আধুনিক ইরাক হইতে পশ্চিমে আটলান্টিক উপকূল (আফ্রিকা বাদে) অবধি। এই অঞ্চলের পূর্বে ছিল রোমক সাম্রাজ্যের প্রতিদ্বন্দ্বী পারস্য সাম্রাজ্য—ইহা পশ্চিমে ইরাক হইতে পূর্বে সিন্ধুনদ উপত্যকা পর্যন্ত বিস্তৃত ছিল। তৃতীয় অঞ্চলটি অবস্থিত ছিল পারস্য সাম্রাজ্যের পূর্বে চীন ও ভারত, যাহা অবশিষ্ট বিশ্বের কাছে ছিল খুবই কাঙ্খিত। ইহা ছাড়াও দূরপ্রাচ্যে ও দূর পাশ্চাত্যে ছিল আরও নানা জাতি ও নানা দেশ। যতটুকু আমরা এইসব দেশ ও জনসমষ্টি সম্পর্কে জানি তাহাতেই বলা চলে, এইসব দেশ ও জনসমষ্টির অবস্থাও রাজনৈতিক ও সাংস্কৃতিক দিক হইতে খুব একটা ভাল ছিল না।
বিশ্ব দৃশ্যপটের প্রবীণ বিষয় ছিল বায়যান্টাইন ও পারস্যের মধ্যে প্রতিদ্বন্দ্বিতা। ইহারা ছিল সমসাময়িক কালের দুই প্রধান পরাশক্তি। তাহাদের সংঘাতের মূল প্রাচীন। গ্রীস ও পারস্যের মধ্যকার অতীত সংঘাতের (গ্রীক-পারসিক যুদ্ধ) মধ্যে ইহার অভিব্যক্তি রহিয়াছে। রোমক শক্তি গ্রীক সভ্যতার উত্তরাধিকারী হওয়ার পর সংঘাতের ঐতিহ্যের উত্তরাধিকারও রোমের উপর বর্তায়। ৪৬৭ খৃস্টাব্দে পাশ্চাত্যের রোম সাম্রাজ্যের পতনের পর প্রাচ্যে রোমক (বায়যান্টীয় সাম্রাজ্যের) পত্তন হয়। আর ইহার রাজধানী স্থাপিত হয় কনস্ট্যান্টিনোপলে। তখনও এই সাম্রাজ্যের পারসিক সাম্রাজ্যের সহিত সংঘাতের একই উত্তরাধিকার ইহার উপর বর্তায়। পাশ্চাত্যে রোমক সাম্রাজ্যের অবসানের পর ইউরোপের উত্তরাঞ্চলীয় কিছু জাতির লোক সাবেক পাশ্চাত্য রোমক সাম্রাজ্যে দ্রুত তাহাদের স্থলাভিষিক্ত হয়। ইহারা হইল : অস্ট্রো-গথ (পূর্বাঞ্চলীয় গথ), ভিসিগথ (পশ্চিমাঞ্চলীয় গথ), ভাইকিং, ফ্রাঙ্ক, ভ্যাণ্ডল (ইহা হইতে ইংরেজি ভ্যান্ডালিজম শব্দটির উৎপত্তি)। ‘সভ্য’ রোমকরা এসব জাতির লোককে আধুনিক জার্মান, ফরাসী, স্পেনীয় ও ইংরেজ জাতির পূর্বসূরী মনে করিত। বার্বার (বর্বর) ও আধুনিক ইউরোপীয় ঐতিহাসিকগণ এইসব জাতির ৫ম হইতে ১০ম শতাব্দীর ইতিহাসকে ইউরোপের ‘অন্ধকার যুগ’ বলিয়া অভিহিত করিয়াছেন। এখানে উল্লেখ অনাবশ্যক যে, আরবে ইসলামের আবির্ভাব ঘটে ঐ সময়ে যখন ইউরোপ অন্ধকার যুগ অতিক্রম করিতেছিল।
এইসব অঞ্চল অবশ্য লক্ষণীয় বৈষয়িক সভ্যতার অধিকারী ছিল না, তাহা নহে। ভারত ও চীন গ্রীক-রোমক ও পারসিক সভ্যতার সমকক্ষ সভ্যতার অধিকারী ছিল। অনুরূপভাবে আসিরিয়া, ব্যবিলনিয়া, ফিনিসিয়া ছাড়াও উত্তর আরবে পেত্রা পালমীরা এবং দক্ষিণ আরব ও মিসর বৈষয়িক সভ্যতায় পিছাইয়া ছিল না। বাস্তবিকপক্ষে আরবরা ব্যবসায়-বাণিজ্যের আদান-প্রদান ছাড়াও বৈষয়িক সভ্যতার অন্যান্য উপদানেরও অংশীদার ছিল অন্যান্য জাতির সঙ্গে। একইভাবে অন্যান্য জাতির লোকও, আরবরা ইসলামী পরিভাষা অনুযায়ী যে ধরনের জাহিলিয়া পরিবেশে ছিল, সেই ধরনের পরিবেশ, ধর্মবিশ্বাস, আচার-রীতি ও অভ্যাসেরও অংশীদার ছিল।
জাহিলিয়ার সবচেয়ে দুই স্বতন্ত্র বৈশিষ্ট্যময় উপাদান ছিল বহু ঈশ্বরবাদ ও মূর্তিপূজা। আর সেইসাথে ছিল সকল কুসংস্কারমূলক বিশ্বাস ও আচার-রীতি। এইসবই কেবল আরবদেরই একান্ত
বিষয় ছিল না, বরং আরও বৈষয়িকভাবে উন্নততর জাতিসমূহের জনসমাজেও ব্যাপকভাবে তাহা প্রচলিত ছিল। সিন্ধু সভ্যতা দিজলা-ফুরাত সভ্যতার অংশীদার ছিল গিলগামেশ ও অন্যান্য অভিন্ন দেবদেবীর মাধ্যমে। গ্রীক ও ভারতীয় সর্বেশ্বরবাদের আওতাভুক্ত দেবদেবীদের মধ্যে মিল রহিয়াছে। যেমন হিন্দু বরুণ দেবের যথার্থ গ্রীক বিকল্প হইল অ্যাপোলো। গ্রীকরা যেমন তাহাদের মূর্তিপূজার বিষয়টিকে একটা দার্শনিক ভিত্তি দিয়াছে ও আদর্শায়িত করিয়া তুলিয়াছে এক বিস্তৃততর ধর্মতত্ত্ব ও পুরাকাহিনী রচনার মাধ্যমে, তেমনি প্রাচীন ভারতের কথিত হিন্দুরাও তুলনীয় ও জটিল ধর্মতত্ত্ব এবং পুরাকাহিনী গড়িয়া তুলিয়াছে।
বস্তুপক্ষে, বহু ঈশ্বরবাদ, মূর্তিপূজা ও কুসংস্কার ভারতে ব্যাপকভাবে শিকড় গাড়ে। ঋকবেদ হইল হিন্দুদের চার বেদের প্রাচীনতম গ্রন্থ। ৯২ ইহাতে একেশ্বরবাদের আবশ্যিক আভাস থাকিলেও তাহা হিন্দুদের দৃষ্টি পুরাপুরি এড়াইয়া যায়। আর ইহার পরিবর্তে তাহারা যাহা কিছু ধারণাযোগ্য বস্তু তাহার সবকিছুতেই, যেমন পাথর, গাছ, নদী, সূর্য, চন্দ্র, নক্ষত্র, পাহাড়-পর্বত, রাজন্য, পশু, এমনকি জননেন্দ্রিয়তেও তাহারা দেবত্ব আরোপ করিত। তাহারা নানা আকার-আকৃতিতে এই সবের ও অন্যান্য দেবদেবীর মূর্তি প্রতিষ্ঠা করিয়াছে এবং বিস্তৃত আচার-রীতি সহকারে এই সবের পূজা-অর্চনা করে। একটি কালপর্যায়ে পুরাকাহিনী অনুযায়ী দেবদেবীর সংখ্যা দাঁড়ায় তেত্রিশ কোটিতে, যদিও এই দেবদেবীর সংখ্যা সমসাময়িক কালের জনসংখ্যার বেশি। মূর্তির প্রতি তাহাদের নিষ্ঠার কারণে হিন্দুরা প্রাচীন গ্রীক ও রোমকদের মতই চমৎকার ভাস্কর হইয়া উঠিয়াছে নিঃসন্দেহে। হিন্দুরা তাহাদের কিছু বিশিষ্ট পূর্বপুরুষকে আদর্শ ও মূর্তি করিয়াই ক্ষান্ত হয় নাই, বরং তাহারা এইসব মূর্তিকে ঈশ্বরের অবতাররূপে কল্পনা করিয়াছে। বাস্তবিকপক্ষেও হিন্দুরাই সর্বপ্রথম ঈশ্বরের অবতার ও পূনঃঅবতাররূপে আবির্ভাবের তত্ত্ব প্রদান করে। অন্যান্যের মধ্যে রাম ও কৃষ্ণ ঈশ্বরের অবতার। তাহারা মানুষরূপে ধরায় জন্মগ্রহণ করিয়াছিল। আরবদের মত হিন্দুরাও সর্বোচ্চ পরমেশ্বরের অস্তিত্ব স্বীকার করিলেও তাহারা তাহা করিয়াছে তিন বিশিষ্ট ব্যক্তি বা দেবতার, যেমন ব্রহ্মা, বিষ্ণু ও শিবের ত্রিত্বের আকারে। আরবরা কিছু পশুর উপর নিষেধাজ্ঞা আরোপ করিয়াছে। এইসব প্রাণীর কিছু নির্দিষ্ট ভূমিকা পালনের পর তাহাদের ব্যবহার নিষিদ্ধ। হিন্দুরাও কিছু পশুকে দেবতা হিসাবে পূজা করিত। গরু তাহাদের দেবতা। আর তাই হিন্দুরা গোমাংস ভক্ষণ নিষিদ্ধ করে, কিন্তু গবাদির অন্যান্য ব্যবহার নিষিদ্ধ করে নাই, যদিও ঋকবেদের আমলে ব্রাহ্মণদের গোমাংস পরম হরষে তৃপ্তির সঙ্গে ভোজন করা লক্ষ্য করা গিয়াছে। ৯৩ বর্ণাশ্রম ও অস্পৃশ্যতা প্রথার মাধ্যমে হিন্দু ধর্মীয় মতবাদ সাধারণ মানুষকে, বিশেষত একেবারে নিম্নশ্রেণীর শূদ্র মানুষগুলিকে মানবেতর জীবনের গভীরতম তলে অবনমিত করিয়াছে। এই সমাজে বহুবিবাহও প্রচলিত ছিল। নারীর অবস্থাও খুব একটা ভালো ছিল না। পরস্ত্রী গমন ও ব্যভিচার-এর প্রচলন ছিল বহুল। হিন্দুরা তাহাদের কন্যা শিশু সন্তানকে জীবন্ত কবর না দিলেও তাহাদের বিধবাদেরকে, কমবয়সী হউক বা বয়সী হউক, তাহাদের মৃত স্বামীর লাশের সহিত পোড়াইয়া মারিয়াছে। ৯৪
বর্ণপ্রথার বাড়াবাড়ি ও হিন্দুধর্মের অন্যান্য অপব্যবহারের প্রতিবাদ হিসাবে কপিলাবস্তু নগরের (উত্তর ভারত) শাক্য গোত্রের রাজকুমার সিদ্ধার্থ (গৌতম বুদ্ধ হিসাবে সুপরিচিত, ৫৬৫-৪৮৬ খৃ.
হযরত মুহাম্মাদ (স) ৮১
পূর্বাব্দ) বৌদ্ধ মতবাদ প্রচার করেন। তিনি অষ্টাঙ্গিক মার্গঃ সৎ চিন্তা, সৎ কর্ম, সৎ শ্রুতি ইত্যাদির উপদেশ প্রচার করেন। তিনি জটিল ধর্মতত্ত্বের আলোচনা পরিহার করেন। বস্তুতপক্ষে তিনি ঈশ্বর সম্পর্কেও নীরব থাকেন। তাহার মৃত্যুর পর অচিরেই তাহার শিক্ষার বিকৃতি ঘটে। আর হিন্দুধর্মের প্রভাবে খোদ গৌতমকে ঈশ্বরের অবতার হিসাবে গণ্য করা হয়। বুদ্ধরা তাহার মূর্তিপূজা করিতে শুরু করিয়া দেয়। সপ্তম শতাব্দী নাগাদ ব্রাহ্মণ্যবাদী হিন্দু প্রতিক্রিয়ার সুবাদে সাফল্যের সঙ্গে বুদ্ধধর্মকে কার্যত তাহার জন্ম ও লালনভূমি হইতেই বহিষ্কার করা হয়। ভারতের কিছু প্রত্যন্ত অঞ্চলে বৌদ্ধরা তাহাদের অস্তিত্ব কোনরকমে টিকাইয়া রাখিতে পারিলেও তাহাদের অনুসৃত ধর্ম অনেকটা বিকৃত ও মূর্তিপূজা প্রধান হইয়া ওঠে এবং তাহা দূরপ্রাচ্য, দক্ষিণ এশিয়া ও চীনে স্থানান্তরিত হয়।
চীনে তাও (Taoism) ও কনফুসিয়াসের ধর্মীয় মতবাদের এক অদ্ভুত মিশ্রণ প্রচলিত ছিল। পরে চীনে বিকৃত আকারে বৌদ্ধ মতবাদ তৃতীয় ধর্মীয় প্রবণতা হিসাবে বিস্তার লাভ করে। পরবর্তী কালে অবশ্য বৌদ্ধ ধর্ম আর তেমন শ্রীবৃদ্ধি লাভ করিতে পারে নাই। কনফুসিয়াস ও তাওয়ের মতবাদে বহু মূর্তিপূজামূলক আচার-রীতি ও কুসংস্কার বৈশিষ্ট্য হইয়া উঠে। সর্বোপরি যাদুবিদ্যা ও সম্মোহনের বিষয় ধর্মীয় জীবনে প্রধান হইয়া উঠে। আর এগুলি আয়ত্ত ও প্রয়োগ করার একচেটিয়া নিয়ন্ত্রণ কব্জা করে যাজক শ্রেণী। উদ্দেশ্য ছিল মানুষের কাছে এই যাজক শ্রেণীর লোকদের একটা আধা ঈশ্বর ভাবমূর্তি বজায় রাখা। এই সবের আনুকূল্যেই চীনের সম্রাটগণ তাহাদের নিজ প্রজাসাধারণের ঈশ্বর হিসাবে দাবি করার সুযোগ পায়। আর সাধারণ মানুষ তাহাদের অনুগত থাকিয়া তাহাদের কার্যত পূজা করে।
তখনকার তৃতীয় বিশ্বে যখন এই ধরনের ধর্মীয়-সামাজিক পরিস্থিতি তখন অন্য দুই বিশ্বের অবস্থাও খুব একটা ভালো ছিল না। পারসিক সাম্রাজ্য জরথুষ্ট্রের শিক্ষা প্রধানত বিস্মৃত হইয়াছিল। তাহার রচনা বলিয়া কথিত আবেস্তার কোন মূল আকারের অস্তিত্ব নাই। জেন্দ (তখন অবলুপ্ত) ভাষায় পারসিক যাজক শ্রেণী আবেস্তার একটি সংযোজনী রচনা করিয়া সংকলন আকারে প্রকাশ করে। এই রচনাটিই জেন্দ-আবেস্তা নামে পরিচিত। তবু এই রচনারও মাত্র কয়েকটি কপির অস্তিত্ব ছিল আলেকজান্ডারের পারস্য অভিযানের সময়। আলেকজাণ্ডার যখন পারসিপোলিস দখল করে তাহা পোড়াইয়া ধ্বংস করেন তখন এই কপিগুলিও ধ্বংস হইয়া যায়। এই ঘটনা ৩৩০ খৃস্ট-পূর্বাব্দের। জেন্দ-আবেস্তার একটি বিকল্প রচনা পরবর্তী কালে প্রস্তুত করা হয়। আলেকজাণ্ডারের পারস্য আক্রমণের ফলে ঐ দেশে যে বিভ্রান্তি, গোলযোগ ও অরাজকতা দেখা দেয় তাহাতে একদিকে অগ্নিপূজা ও অন্যদিকে শুভশক্তির দেবতায়ন ব্যাহত হয়। আর এই শুভশক্তির দেবতায়নকে 'আহুরা মাজদা' নামে অভিহিত করা হয় এবং অশুভ শক্তিকে 'আহুরামান' নামে অভিহিত করা হয়। ৯৫ এই আহুরা মাজদা ও আহুরা মানের সঙ্গে আরও যুক্ত হয় বহু
৮২ সীরাত বিশ্বকোষ
মূর্তিপূজামূলক ও কুসংস্কারাচ্ছান্ন রীতিপ্রথা যাহার সহিত হিন্দুদের মূর্তিপূজা ও কুসংস্কারের মিল রহিয়াছে। শুভের দেবতা আহুরা মাজদা ও সেইসঙ্গে অগ্নিপূজাও করা হইত। বিভিন্ন মন্দিরে আগুন প্রজ্জ্বলিত রাখার জন্য কতকগুলি বিশেষ স্থানে ইহা করা হইত আহুরা মাজদা ও আহুরা মানের সম্মানে।
ষষ্ঠ শতাব্দীর শুরুতে মাযদাক নামে এক চিন্তাবিদ কিছুটা সাম্যবাদী সংস্কার প্রবর্তন করার পর সমাজে বিভ্রান্তি ও বিশৃঙ্খলা আরও বৃদ্ধি পায়। মাযদাকের ধারণা ছিল যে, সমাজের সকল সমস্যা ও অশুভের কারণ মানুষের সুন্দরী নারী সম্ভোগের এবং বিত্ত ও বিষয়সম্পত্তি লাভের লালসা। তাই সে বিবাহ প্রথা তুলিয়া দিয়া যে কোন পুরুষের জন্য যে কোন নারী সম্ভোগের ব্যবস্থা করার সপক্ষে মত প্রকাশ করে। একমাত্র শাসক বা রাজা ছাড়া আর সকলের সম্পত্তির অধিকার বিলুপ্ত করার পক্ষে মত প্রকাশ করে। তাহার মতে, কেবল শাসকেরই সম্পদ-সম্পত্তি ও ঐশ্বর্য রাখার অধিকার থাকিবে। তবে ৫৩১ খৃস্টাব্দে পিতা কো'বাদের মৃত্যুর পর সম্রাট আনুশিরওয়ান (নওশেরওয়া) ক্ষমতার উত্তরাধিকার লাভ করিলে তিনি এই প্রক্রিয়া দ্রুত উল্টাইয়া দেন। সম্রাট আনুশিরওয়ানের বিশাল ব্যক্তিত্ব, প্রভাব ও দৃষ্টান্ত তাহার অজেয় সামরিক ক্ষমতা সত্ত্বেও গোটা পারস্য ও পারসিক সাম্রাজ্য জুড়িয়া ব্যাপক সামাজিক বিভ্রান্তি ও নৈতিক বিশৃঙ্খলা চলিতেই থাকে।
গ্রীক-রোমক বা বায়যান্টিয়াম সাম্রাজ্যে খৃষ্ট ধর্মই ছিল প্রধান ধর্ম। তবে এই ধর্মে ঈসা ('আ)-এর মূল শিক্ষা ছিল না বরং তাহার মধ্যে গ্রীক, রোমক বহু ঈশ্বরবাদী ধ্যানধারণা মিশ্রণ ঘটানো হয় যাহার নেপথ্য নায়ক ছিলেন সাধু পল (পৌল)। বায়যান্টাইন খৃস্ট ধর্মে যেসব বৈশিষ্ট্যসূচক নব উদ্ভাবনা যোগ করা হয় তাহা হইল: যীশু খৃস্ট ঈশ্বরের অবতার, তিনি মানুষের আকারে জন্মগ্রহণ করেন, ত্রিত্ববাদ ও পাপ মোচন। বহু আধুনিক পণ্ডিত এখন স্বীকার করেন যে, এই অবতার ও ত্রিত্বতত্ত্ব গ্রীকদের নিকট হইতে পরিগ্রহণ করা হইয়াছে। এখানে মনে রাখা দরকার যে, এইসব ধ্যান-ধারণা হিন্দুদের মধ্যেও প্রচলিত ছিল। ধর্মকে সহজে গ্রহণযোগ্য ও জনসাধারণের কাছে, বিশেষ করিয়া গ্রীক-রোমক জনসাধারণের কাছে উপাদেয় করিয়া তোলার জন্য এই বহু মতবাদী সমন্বয় ঘটানো হয়। ইহার কারণ গ্রীক ও রোমক জনসাধারণের মধ্যে বহু ঈশ্বরবাদের এক দীর্ঘ ইতিহাস ও ঐতিহ্য রহিয়াছে। বায়যান্টাইন কর্তৃপক্ষ সাম্রাজ্য গড়া, টিকাইয়া রাখা এবং বারবার জাতীয় গোষ্ঠী ও অন্যান্য জাতির লোকদের আনুগত্য ধরিয়া রাখার জন্যই এই ধরনের একটি ব্যবস্থার পৃষ্ঠপোষকতা করে। আর তাই তখন হইতে ধর্মের নামে সাধু পৌলের মতবাদের জয়যাত্রা সূচিত হয়। ৩২৫ খৃস্টাব্দে নিসিয়া ধর্মসভায় এই তত্ত্ব ও তত্ত্ব সংক্রান্ত পবিত্র পাঠগুলি আনুষ্ঠানিকভাবে গৃহীত হয়। কিন্তু তাহার পরেও বিভিন্ন সম্প্রদায়ের মধ্যে বিভেদ পুরাপুরি দূর করা সম্ভব হয় নাই। ইহার মধ্যে সর্বাপেক্ষা উল্লেখযোগ্য ছিল নেস্তরীয় খৃষ্ট ধর্ম মতাবলম্বী বিরুদ্ধবাদীরা। তাহাদের বক্তব্য ছিল, খৃস্টের দ্বৈত প্রকৃতি বা বৈশিষ্ট্য যাহারা সমর্থন করে তাহাদের
হযরত মুহাম্মাদ (স) ৮৩
উপর দমন-নীপিড়ন চালানো হইতেছে। অধিকাংশ নেস্তরিয় খৃস্টান তাই বায়যান্টীয় সাম্রাজ্যের প্রতিদ্বন্দ্বী পারস্য সাম্রাজ্যে আশ্রয় গ্রহণ করে। অনুরূপভাবে বায়যান্টীয় খৃস্টান কর্তৃপক্ষ ও তাহাদের সামন্তদের অত্যাচারে নিপীড়িত ইয়াহুদীরা পারস্য, আরব ও অন্যত্র দেশত্যাগ করিয়া চলিয়া যায়। বায়যান্টীয় সাম্রাজ্যের বিরুদ্ধে এই ঘৃণা ও বিতৃষ্ণা এবং যে খৃস্টীয় মতবাদ কনস্টান্টিনোপল সমর্থন করে তাহার প্রতি ঘৃণার বিষয়টি পারস্য সাম্রাজ্যের সঙ্গে বায়জান্টিয়ামের নিরন্তর সংঘাত হইতে প্রমাণিত। ধর্মে অবিশ্বাসী আরব এবং আরবের ইয়াহুদীদের সহানুভূতি তাই সাধারণত পারসিক সাম্রাজ্যের প্রতি বেশি ঝুঁকিয়া ছিল।
বায়যান্টিয়ামের সম্রাট সাম্রাজ্যের সর্বত্র চমৎকার গির্জা নির্মাণ করেন। এইসব গির্জায় যীশু ও মেরীর মূর্তি স্থাপন করা হয় এবং ঈশ্বরের ত্রিত্ববাদী প্রশংসাগীতির মাধ্যমে একত্রে ঐ দুই মূর্তির পূজা করা হয়। ইহা ছাড়া জননী ঈশ্বরীর গির্জাও নির্মাণ করা হয়। বায়যান্টিয়াম সাম্রাজ্যের রাষ্ট্রনীতির মাধ্যমে একত্রে ঐ দুই মূর্তির পূজা করা হয়। বায়যান্টিয়ান সাম্রাজ্যের রাষ্ট্রনীতির মূল স্বপ্ন ছিল বিশ্বব্যাপী এক সাম্রাজ্য ও এক ধর্ম প্রতিষ্ঠা। আর এই রাষ্ট্রনীতির কারণেই খৃস্টান আবিসিনিয়ার মাধ্যমে ইয়ামান তথা দক্ষিণ ইয়ামানে দুইবার হস্তক্ষেপ করা হয়। এই অভিযান কার্যত অনেকটা পারস্য সাম্রাজ্যের সহিত বাণিজ্য যুদ্ধ প্রকৃতিরও বলা চলে। ৫৭০-৭১ খৃস্টাব্দে কা'বাগৃহের বিরুদ্ধে আবরাহার বিপর্যয়কর সামরিক অভিযানের পর আবিসিনীয়-বায়যান্টীয় হস্তক্ষেপের বিরুদ্ধে ইয়ামানে প্রতিরোধ গড়িয়া উঠে। এই প্রতিরোধ যুদ্ধে নেতৃত্ব দেন সায়ফ ইন্ন যী ইয়াযান। তাহার অনুরাধে সাড়া দিয়া পারস্য সম্রাট সমুদ্র পথে ইয়ামানে একটি সেনাদল প্রেরণ করেন। এই সাহায্যপুষ্ট ইয়ামানীরা তাহাদের দেশে আবিসিনীয় শাসনের অবসান ঘটায় ৯৬ ইহার পর বায়যান্টিয় কর্তৃপক্ষ খোদ মক্কায় খৃস্ট ধর্ম প্রতিষ্ঠার শেষ বড় রকমের প্রয়াস হিসাবে উছমান ইবনুল হুওয়ায়রিছের মাধ্যমে মক্কার সরকারে পরিবর্তন আনার চেষ্টা চালায়। কিন্তু উছমানের নিজ গোত্র বনূ আসাদ তাহাকে প্রত্যাখ্যান করে। ৯৭
আরব উপদ্বীপের চারপাশের পৃথিবীর ধর্মীয় ও রাজনৈতিক পরিস্থিতি ছিল এই রকম। এই আলোচনায় স্পষ্ট যে, তখনকার গোটা বিশ্বে কম-বেশী প্রায় সর্বত্র বহু ঈশ্বরবাদ, মূর্তিপূজা, কুসংস্কার ও অমানবিক রীতিনীতি প্রচলিত ছিল, যে পরিবেশের ইসলামী-আরবীয় ভাষ্য বা শিরোনাম হইল 'জাহিলিয়্যা'। তাই ইসলামের অভ্যুদয় ছিল আরবদের নিকট একদিকে যেমন বিপ্লব, তেমনি ইহা সারা বিশ্বে আধিপত্য করার সাসানীয় ও বায়যান্টিয় সম্রাটদের কাছে এক প্রবল বাধা ও হতাশা। তাহাদের বিশ্বজনীন সাম্রাজ্য ও ধর্ম প্রতিষ্ঠার স্বপ্ন ইসলামের অভ্যুদয়ে ধূলিস্যাৎ হইয়া যায়।
অনুবাদ : আফতাব হোসেন

টিকাঃ
৯২. অন্য তিন বেদ হইল : সাম, যজু ও অথর্ব।
৯৩. Rajendralal Mitra, Beef in Ancient Indai, J.A.S.B., 1872, pp 174-196.
৯৪. সতীদাহ নামের এই অমানবিক প্রথা ভারতে ইস্ট ইন্ডিয়া কোম্পানির সরকারের ১৮২৯ সনের আইনে নিষিদ্ধ করা হয়।
৯৫. আহুরা, এই পারসিক শব্দটি অসুর-এর নমনীয় রূপ। হিন্দুরা অসুর বলিতে দানব/ রাক্ষসকে বুঝাইয়া থাকে। এই দুই ভিনদেশী শব্দের মধ্যে মৌলিক কারণ, উভয় ভাষাই ইন্দো-আর্যভাষা পরিবারের সদস্যের অন্তর্ভুক্ত। হিন্দুদের দেবতা বা দেওতা শব্দটির অর্থ ঈশ্বর যাহা মূল লাতিন শব্দ ডেইটির অনুরূপ অর্থবাহক।
৯৬. ইব্‌ন হিশাম, ১ম খণ্ড, ৬৩-৬৮।
৯৭. নিম্নে দ্র., পৃ. ৩৩০-৩৩৪।

আরব আর যাহাই হউক গোটা বিশ্ব নয়। আর কেবল আরবরাই যে জাহিলিয়া বা আঁধারে আচ্ছন্ন ছিল তাহাও নহে। আরও দেশ, ভূভাগ, জনসমষ্টি ছিল এই উপদ্বীপের বাহিরেও যেখানেও ছিল জাহিলিয়ার পরিবেশ। ঐ সময়কার বিশ্ব আদর্শিক ধারণায় মোটামুটি তিনটি ভাগে বিভক্ত ছিল। পশ্চিমে ছিল বায়যান্টাইন এবং রোমক সাম্রাজ্য: এই দুই সাম্রাজ্যের বিস্তৃতি ছিল পূর্বে আধুনিক ইরাক হইতে পশ্চিমে আটলান্টিক উপকূল (আফ্রিকা বাদে) অবধি। এই অঞ্চলের পূর্বে ছিল রোমক সাম্রাজ্যের প্রতিদ্বন্দ্বী পারস্য সাম্রাজ্য—ইহা পশ্চিমে ইরাক হইতে পূর্বে সিন্ধুনদ উপত্যকা পর্যন্ত বিস্তৃত ছিল। তৃতীয় অঞ্চলটি অবস্থিত ছিল পারস্য সাম্রাজ্যের পূর্বে চীন ও ভারত, যাহা অবশিষ্ট বিশ্বের কাছে ছিল খুবই কাঙ্খিত। ইহা ছাড়াও দূরপ্রাচ্যে ও দূর পাশ্চাত্যে ছিল আরও নানা জাতি ও নানা দেশ। যতটুকু আমরা এইসব দেশ ও জনসমষ্টি সম্পর্কে জানি তাহাতেই বলা চলে, এইসব দেশ ও জনসমষ্টির অবস্থাও রাজনৈতিক ও সাংস্কৃতিক দিক হইতে খুব একটা ভাল ছিল না।
বিশ্ব দৃশ্যপটের প্রবীণ বিষয় ছিল বায়যান্টাইন ও পারস্যের মধ্যে প্রতিদ্বন্দ্বিতা। ইহারা ছিল সমসাময়িক কালের দুই প্রধান পরাশক্তি। তাহাদের সংঘাতের মূল প্রাচীন। গ্রীস ও পারস্যের মধ্যকার অতীত সংঘাতের (গ্রীক-পারসিক যুদ্ধ) মধ্যে ইহার অভিব্যক্তি রহিয়াছে। রোমক শক্তি গ্রীক সভ্যতার উত্তরাধিকারী হওয়ার পর সংঘাতের ঐতিহ্যের উত্তরাধিকারও রোমের উপর বর্তায়। ৪৬৭ খৃস্টাব্দে পাশ্চাত্যের রোম সাম্রাজ্যের পতনের পর প্রাচ্যে রোমক (বায়যান্টীয় সাম্রাজ্যের) পত্তন হয়। আর ইহার রাজধানী স্থাপিত হয় কনস্ট্যান্টিনোপলে। তখনও এই সাম্রাজ্যের পারসিক সাম্রাজ্যের সহিত সংঘাতের একই উত্তরাধিকার ইহার উপর বর্তায়। পাশ্চাত্যে রোমক সাম্রাজ্যের অবসানের পর ইউরোপের উত্তরাঞ্চলীয় কিছু জাতির লোক সাবেক পাশ্চাত্য রোমক সাম্রাজ্যে দ্রুত তাহাদের স্থলাভিষিক্ত হয়। ইহারা হইল : অস্ট্রো-গথ (পূর্বাঞ্চলীয় গথ), ভিসিগথ (পশ্চিমাঞ্চলীয় গথ), ভাইকিং, ফ্রাঙ্ক, ভ্যাণ্ডল (ইহা হইতে ইংরেজি ভ্যান্ডালিজম শব্দটির উৎপত্তি)। ‘সভ্য’ রোমকরা এসব জাতির লোককে আধুনিক জার্মান, ফরাসী, স্পেনীয় ও ইংরেজ জাতির পূর্বসূরী মনে করিত। বার্বার (বর্বর) ও আধুনিক ইউরোপীয় ঐতিহাসিকগণ এইসব জাতির ৫ম হইতে ১০ম শতাব্দীর ইতিহাসকে ইউরোপের ‘অন্ধকার যুগ’ বলিয়া অভিহিত করিয়াছেন। এখানে উল্লেখ অনাবশ্যক যে, আরবে ইসলামের আবির্ভাব ঘটে ঐ সময়ে যখন ইউরোপ অন্ধকার যুগ অতিক্রম করিতেছিল।
এইসব অঞ্চল অবশ্য লক্ষণীয় বৈষয়িক সভ্যতার অধিকারী ছিল না, তাহা নহে। ভারত ও চীন গ্রীক-রোমক ও পারসিক সভ্যতার সমকক্ষ সভ্যতার অধিকারী ছিল। অনুরূপভাবে আসিরিয়া, ব্যবিলনিয়া, ফিনিসিয়া ছাড়াও উত্তর আরবে পেত্রা পালমীরা এবং দক্ষিণ আরব ও মিসর বৈষয়িক সভ্যতায় পিছাইয়া ছিল না। বাস্তবিকপক্ষে আরবরা ব্যবসায়-বাণিজ্যের আদান-প্রদান ছাড়াও বৈষয়িক সভ্যতার অন্যান্য উপদানেরও অংশীদার ছিল অন্যান্য জাতির সঙ্গে। একইভাবে অন্যান্য জাতির লোকও, আরবরা ইসলামী পরিভাষা অনুযায়ী যে ধরনের জাহিলিয়া পরিবেশে ছিল, সেই ধরনের পরিবেশ, ধর্মবিশ্বাস, আচার-রীতি ও অভ্যাসেরও অংশীদার ছিল।
জাহিলিয়ার সবচেয়ে দুই স্বতন্ত্র বৈশিষ্ট্যময় উপাদান ছিল বহু ঈশ্বরবাদ ও মূর্তিপূজা। আর সেইসাথে ছিল সকল কুসংস্কারমূলক বিশ্বাস ও আচার-রীতি। এইসবই কেবল আরবদেরই একান্ত বিষয় ছিল না, বরং আরও বৈষয়িকভাবে উন্নততর জাতিসমূহের জনসমাজেও ব্যাপকভাবে তাহা প্রচলিত ছিল। সিন্ধু সভ্যতা দিজলা-ফুরাত সভ্যতার অংশীদার ছিল গিলগামেশ ও অন্যান্য অভিন্ন দেবদেবীর মাধ্যমে। গ্রীক ও ভারতীয় সর্বেশ্বরবাদের আওতাভুক্ত দেবদেবীদের মধ্যে মিল রহিয়াছে। যেমন হিন্দু বরুণ দেবের যথার্থ গ্রীক বিকল্প হইল অ্যাপোলো। গ্রীকরা যেমন তাহাদের মূর্তিপূজার বিষয়টিকে একটা দার্শনিক ভিত্তি দিয়াছে ও আদর্শায়িত করিয়া তুলিয়াছে এক বিস্তৃততর ধর্মতত্ত্ব ও পুরাকাহিনী রচনার মাধ্যমে, তেমনি প্রাচীন ভারতের কথিত হিন্দুরাও তুলনীয় ও জটিল ধর্মতত্ত্ব এবং পুরাকাহিনী গড়িয়া তুলিয়াছে।
বস্তুপক্ষে, বহু ঈশ্বরবাদ, মূর্তিপূজা ও কুসংস্কার ভারতে ব্যাপকভাবে শিকড় গাড়ে। ঋকবেদ হইল হিন্দুদের চার বেদের প্রাচীনতম গ্রন্থ। ইহাতে একেশ্বরবাদের আবশ্যিক আভাস থাকিলেও তাহা হিন্দুদের দৃষ্টি পুরাপুরি এড়াইয়া যায়। আর ইহার পরিবর্তে তাহারা যাহা কিছু ধারণাযোগ্য বস্তু তাহার সবকিছুতেই, যেমন পাথর, গাছ, নদী, সূর্য, চন্দ্র, নক্ষত্র, পাহাড়-পর্বত, রাজন্য, পশু, এমনকি জননেন্দ্রিয়তেও তাহারা দেবত্ব আরোপ করিত। তাহারা নানা আকার-আকৃতিতে এই সবের ও অন্যান্য দেবদেবীর মূর্তি প্রতিষ্ঠা করিয়াছে এবং বিস্তৃত আচার-রীতি সহকারে এই সবের পূজা-অর্চনা করে। একটি কালপর্যায়ে পুরাকাহিনী অনুযায়ী দেবদেবীর সংখ্যা দাঁড়ায় তেত্রিশ কোটিতে, যদিও এই দেবদেবীর সংখ্যা সমসাময়িক কালের জনসংখ্যার বেশি। মূর্তির প্রতি তাহাদের নিষ্ঠার কারণে হিন্দুরা প্রাচীন গ্রীক ও রোমকদের মতই চমৎকার ভাস্কর হইয়া উঠিয়াছে নিঃসন্দেহে। হিন্দুরা তাহাদের কিছু বিশিষ্ট পূর্বপুরুষকে আদর্শ ও মূর্তি করিয়াই ক্ষান্ত হয় নাই, বরং তাহারা এইসব মূর্তিকে ঈশ্বরের অবতাররূপে কল্পনা করিয়াছে। বাস্তবিকপক্ষেও হিন্দুরাই সর্বপ্রথম ঈশ্বরের অবতার ও পূনঃঅবতাররূপে আবির্ভাবের তত্ত্ব প্রদান করে। অন্যান্যের মধ্যে রাম ও কৃষ্ণ ঈশ্বরের অবতার। তাহারা মানুষরূপে ধরায় জন্মগ্রহণ করিয়াছিল। আরবদের মত হিন্দুরাও সর্বোচ্চ পরমেশ্বরের অস্তিত্ব স্বীকার করিলেও তাহারা তাহা করিয়াছে তিন বিশিষ্ট ব্যক্তি বা দেবতার, যেমন ব্রহ্মা, বিষ্ণু ও শিবের ত্রিত্বের আকারে। আরবরা কিছু পশুর উপর নিষেধাজ্ঞা আরোপ করিয়াছে। এইসব প্রাণীর কিছু নির্দিষ্ট ভূমিকা পালনের পর তাহাদের ব্যবহার নিষিদ্ধ। হিন্দুরাও কিছু পশুকে দেবতা হিসাবে পূজা করিত। গরু তাহাদের দেবতা। আর তাই হিন্দুরা গোমাংস ভক্ষণ নিষিদ্ধ করে, কিন্তু গবাদির অন্যান্য ব্যবহার নিষিদ্ধ করে নাই, যদিও ঋকবেদের আমলে ব্রাহ্মণদের গোমাংস পরম হরষে তৃপ্তির সঙ্গে ভোজন করা লক্ষ্য করা গিয়াছে। বর্ণাশ্রম ও অস্পৃশ্যতা প্রথার মাধ্যমে হিন্দু ধর্মীয় মতবাদ সাধারণ মানুষকে, বিশেষত একেবারে নিম্নশ্রেণীর শূদ্র মানুষগুলিকে মানবেতর জীবনের গভীরতম তলে অবনমিত করিয়াছে। এই সমাজে বহুবিবাহও প্রচলিত ছিল। নারীর অবস্থাও খুব একটা ভালো ছিল না। পরস্ত্রী গমন ও ব্যভিচার-এর প্রচলন ছিল বহুল। হিন্দুরা তাহাদের কন্যা শিশু সন্তানকে জীবন্ত কবর না দিলেও তাহাদের বিধবাদেরকে, কমবয়সী হউক বা বয়সী হউক, তাহাদের মৃত স্বামীর লাশের সহিত পোড়াইয়া মারিয়াছে।
বর্ণপ্রথার বাড়াবাড়ি ও হিন্দুধর্মের অন্যান্য অপব্যবহারের প্রতিবাদ হিসাবে কপিলাবস্তু নগরের (উত্তর ভারত) শাক্য গোত্রের রাজকুমার সিদ্ধার্থ (গৌতম বুদ্ধ হিসাবে সুপরিচিত, ৫৬৫-৪৮৬ খৃ. পূর্বাব্দ) বৌদ্ধ মতবাদ প্রচার করেন। তিনি অষ্টাঙ্গিক মার্গঃ সৎ চিন্তা, সৎ কর্ম, সৎ শ্রুতি ইত্যাদির উপদেশ প্রচার করেন। তিনি জটিল ধর্মতত্ত্বের আলোচনা পরিহার করেন। বস্তুতপক্ষে তিনি ঈশ্বর সম্পর্কেও নীরব থাকেন। তাহার মৃত্যুর পর অচিরেই তাহার শিক্ষার বিকৃতি ঘটে। আর হিন্দুধর্মের প্রভাবে খোদ গৌতমকে ঈশ্বরের অবতার হিসাবে গণ্য করা হয়। বুদ্ধরা তাহার মূর্তিপূজা করিতে শুরু করিয়া দেয়। সপ্তম শতাব্দী নাগাদ ব্রাহ্মণ্যবাদী হিন্দু প্রতিক্রিয়ার সুবাদে সাফল্যের সঙ্গে বুদ্ধধর্মকে কার্যত তাহার জন্ম ও লালনভূমি হইতেই বহিষ্কার করা হয়। ভারতের কিছু প্রত্যন্ত অঞ্চলে বৌদ্ধরা তাহাদের অস্তিত্ব কোনরকমে টিকাইয়া রাখিতে পারিলেও তাহাদের অনুসৃত ধর্ম অনেকটা বিকৃত ও মূর্তিপূজা প্রধান হইয়া ওঠে এবং তাহা দূরপ্রাচ্য, দক্ষিণ এশিয়া ও চীনে স্থানান্তরিত হয়।
চীনে তাও (Taoism) ও কনফুসিয়াসের ধর্মীয় মতবাদের এক অদ্ভুত মিশ্রণ প্রচলিত ছিল। পরে চীনে বিকৃত আকারে বৌদ্ধ মতবাদ তৃতীয় ধর্মীয় প্রবণতা হিসাবে বিস্তার লাভ করে। পরবর্তী কালে অবশ্য বৌদ্ধ ধর্ম আর তেমন শ্রীবৃদ্ধি লাভ করিতে পারে নাই। কনফুসিয়াস ও তাওয়ের মতবাদে বহু মূর্তিপূজামূলক আচার-রীতি ও কুসংস্কার বৈশিষ্ট্য হইয়া উঠে। সর্বোপরি যাদুবিদ্যা ও সম্মোহনের বিষয় ধর্মীয় জীবনে প্রধান হইয়া উঠে। আর এগুলি আয়ত্ত ও প্রয়োগ করার একচেটিয়া নিয়ন্ত্রণ কব্জা করে যাজক শ্রেণী। উদ্দেশ্য ছিল মানুষের কাছে এই যাজক শ্রেণীর লোকদের একটা আধা ঈশ্বর ভাবমূর্তি বজায় রাখা। এই সবের আনুকূল্যেই চীনের সম্রাটগণ তাহাদের নিজ প্রজাসাধারণের ঈশ্বর হিসাবে দাবি করার সুযোগ পায়। আর সাধারণ মানুষ তাহাদের অনুগত থাকিয়া তাহাদের কার্যত পূজা করে।
তখনকার তৃতীয় বিশ্বে যখন এই ধরনের ধর্মীয়-সামাজিক পরিস্থিতি তখন অন্য দুই বিশ্বের অবস্থাও খুব একটা ভালো ছিল না। পারসিক সাম্রাজ্য জরথুষ্ট্রের শিক্ষা প্রধানত বিস্মৃত হইয়াছিল। তাহার রচনা বলিয়া কথিত আবেস্তার কোন মূল আকারের অস্তিত্ব নাই। জেন্দ (তখন অবলুপ্ত) ভাষায় পারসিক যাজক শ্রেণী আবেস্তার একটি সংযোজনী রচনা করিয়া সংকলন আকারে প্রকাশ করে। এই রচনাটিই জেন্দ-আবেস্তা নামে পরিচিত। তবু এই রচনারও মাত্র কয়েকটি কপির অস্তিত্ব ছিল আলেকজান্ডারের পারস্য অভিযানের সময়। আলেকজাণ্ডার যখন পারসিপোলিস দখল করে তাহা পোড়াইয়া ধ্বংস করেন তখন এই কপিগুলিও ধ্বংস হইয়া যায়। এই ঘটনা ৩৩০ খৃস্ট-পূর্বাব্দের। জেন্দ-আবেস্তার একটি বিকল্প রচনা পরবর্তী কালে প্রস্তুত করা হয়। আলেকজাণ্ডারের পারস্য আক্রমণের ফলে ঐ দেশে যে বিভ্রান্তি, গোলযোগ ও অরাজকতা দেখা দেয় তাহাতে একদিকে অগ্নিপূজা ও অন্যদিকে শুভশক্তির দেবতায়ন ব্যাহত হয়। আর এই শুভশক্তির দেবতায়নকে 'আহুরা মাজদা' নামে অভিহিত করা হয় এবং অশুভ শক্তিকে 'আহুরামান' নামে অভিহিত করা হয়। এই আহুরা মাজদা ও আহুরা মানের সঙ্গে আরও যুক্ত হয় বহু মূর্তিপূজামূলক ও কুসংস্কারাচ্ছান্ন রীতিপ্রথা যাহার সহিত হিন্দুদের মূর্তিপূজা ও কুসংস্কারের মিল রহিয়াছে। শুভের দেবতা আহুরা মাজদা ও সেইসঙ্গে অগ্নিপূজাও করা হইত। বিভিন্ন মন্দিরে আগুন প্রজ্জ্বলিত রাখার জন্য কতকগুলি বিশেষ স্থানে ইহা করা হইত আহুরা মাজদা ও আহুরা মানের সম্মানে।
ষষ্ঠ শতাব্দীর শুরুতে মাযদাক নামে এক চিন্তাবিদ কিছুটা সাম্যবাদী সংস্কার প্রবর্তন করার পর সমাজে বিভ্রান্তি ও বিশৃঙ্খলা আরও বৃদ্ধি পায়। মাযদাকের ধারণা ছিল যে, সমাজের সকল সমস্যা ও অশুভের কারণ মানুষের সুন্দরী নারী সম্ভোগের এবং বিত্ত ও বিষয়সম্পত্তি লাভের লালসা। তাই সে বিবাহ প্রথা তুলিয়া দিয়া যে কোন পুরুষের জন্য যে কোন নারী সম্ভোগের ব্যবস্থা করার সপক্ষে মত প্রকাশ করে। একমাত্র শাসক বা রাজা ছাড়া আর সকলের সম্পত্তির অধিকার বিলুপ্ত করার পক্ষে মত প্রকাশ করে। তাহার মতে, কেবল শাসকেরই সম্পদ-সম্পত্তি ও ঐশ্বর্য রাখার অধিকার থাকিবে। তবে ৫৩১ খৃস্টাব্দে পিতা কো'বাদের মৃত্যুর পর সম্রাট আনুশিরওয়ান (নওশেরওয়া) ক্ষমতার উত্তরাধিকার লাভ করিলে তিনি এই প্রক্রিয়া দ্রুত উল্টাইয়া দেন। সম্রাট আনুশিরওয়ানের বিশাল ব্যক্তিত্ব, প্রভাব ও দৃষ্টান্ত তাহার অজেয় সামরিক ক্ষমতা সত্ত্বেও গোটা পারস্য ও পারসিক সাম্রাজ্য জুড়িয়া ব্যাপক সামাজিক বিভ্রান্তি ও নৈতিক বিশৃঙ্খলা চলিতেই থাকে।
গ্রীক-রোমক বা বায়যান্টিয়াম সাম্রাজ্যে খৃষ্ট ধর্মই ছিল প্রধান ধর্ম। তবে এই ধর্মে ঈসা ('আ)-এর মূল শিক্ষা ছিল না বরং তাহার মধ্যে গ্রীক, রোমক বহু ঈশ্বরবাদী ধ্যানধারণা মিশ্রণ ঘটানো হয় যাহার নেপথ্য নায়ক ছিলেন সাধু পল (পৌল)। বায়যান্টাইন খৃস্ট ধর্মে যেসব বৈশিষ্ট্যসূচক নব উদ্ভাবনা যোগ করা হয় তাহা হইল: যীশু খৃস্ট ঈশ্বরের অবতার, তিনি মানুষের আকারে জন্মগ্রহণ করেন, ত্রিত্ববাদ ও পাপ মোচন। বহু আধুনিক পণ্ডিত এখন স্বীকার করেন যে, এই অবতার ও ত্রিত্বতত্ত্ব গ্রীকদের নিকট হইতে পরিগ্রহণ করা হইয়াছে। এখানে মনে রাখা দরকার যে, এইসব ধ্যান-ধারণা হিন্দুদের মধ্যেও প্রচলিত ছিল। ধর্মকে সহজে গ্রহণযোগ্য ও জনসাধারণের কাছে, বিশেষ করিয়া গ্রীক-রোমক জনসাধারণের কাছে উপাদেয় করিয়া তোলার জন্য এই বহু মতবাদী সমন্বয় ঘটানো হয়। ইহার কারণ গ্রীক ও রোমক জনসাধারণের মধ্যে বহু ঈশ্বরবাদের এক দীর্ঘ ইতিহাস ও ঐতিহ্য রহিয়াছে। বায়যান্টাইন কর্তৃপক্ষ সাম্রাজ্য গড়া, টিকাইয়া রাখা এবং বারবার জাতীয় গোষ্ঠী ও অন্যান্য জাতির লোকদের আনুগত্য ধরিয়া রাখার জন্যই এই ধরনের একটি ব্যবস্থার পৃষ্ঠপোষকতা করে। আর তাই তখন হইতে ধর্মের নামে সাধু পৌলের মতবাদের জয়যাত্রা সূচিত হয়। ৩২৫ খৃস্টাব্দে নিসিয়া ধর্মসভায় এই তত্ত্ব ও তত্ত্ব সংক্রান্ত পবিত্র পাঠগুলি আনুষ্ঠানিকভাবে গৃহীত হয়। কিন্তু তাহার পরেও বিভিন্ন সম্প্রদায়ের মধ্যে বিভেদ পুরাপুরি দূর করা সম্ভব হয় নাই। ইহার মধ্যে সর্বাপেক্ষা উল্লেখযোগ্য ছিল নেস্তরীয় খৃস্ট ধর্ম মতাবলম্বী বিরুদ্ধবাদীরা। তাহাদের বক্তব্য ছিল, খৃস্টের দ্বৈত প্রকৃতি বা বৈশিষ্ট্য যাহারা সমর্থন করে তাহাদের উপর দমন-নীপিড়ন চালানো হইতেছে। অধিকাংশ নেস্তরিয় খৃস্টান তাই বায়যান্টীয় সাম্রাজ্যের প্রতিদ্বন্দ্বী পারস্য সাম্রাজ্যে আশ্রয় গ্রহণ করে। অনুরূপভাবে বায়যান্টীয় খৃস্টান কর্তৃপক্ষ ও তাহাদের সামন্তদের অত্যাচারে নিপীড়িত ইয়াহুদীরা পারস্য, আরব ও অন্যত্র দেশত্যাগ করিয়া চলিয়া যায়। বায়যান্টীয় সাম্রাজ্যের বিরুদ্ধে এই ঘৃণা ও বিতৃষ্ণা এবং যে খৃস্টীয় মতবাদ কনস্টান্টিনোপল সমর্থন করে তাহার প্রতি ঘৃণার বিষয়টি পারস্য সাম্রাজ্যের সঙ্গে বায়জান্টিয়ামের নিরন্তর সংঘাত হইতে প্রমাণিত। ধর্মে অবিশ্বাসী আরব এবং আরবের ইয়াহুদীদের সহানুভূতি তাই সাধারণত পারসিক সাম্রাজ্যের প্রতি বেশি ঝুঁকিয়া ছিল।
বায়যান্টিয়ামের সম্রাট সাম্রাজ্যের সর্বত্র চমৎকার গির্জা নির্মাণ করেন। এইসব গির্জায় যীশু ও মেরীর মূর্তি স্থাপন করা হয় এবং ঈশ্বরের ত্রিত্ববাদী প্রশংসাগীতির মাধ্যমে একত্রে ঐ দুই মূর্তির পূজা করা হয়। ইহা ছাড়া জননী ঈশ্বরীর গির্জাও নির্মাণ করা হয়। বায়যান্টিয়াম সাম্রাজ্যের রাষ্ট্রনীতির মাধ্যমে একত্রে ঐ দুই মূর্তির পূজা করা হয়। বায়যান্টিয়ান সাম্রাজ্যের রাষ্ট্রনীতির মূল স্বপ্ন ছিল বিশ্বব্যাপী এক সাম্রাজ্য ও এক ধর্ম প্রতিষ্ঠা। আর এই রাষ্ট্রনীতির কারণেই খৃস্টান আবিসিনিয়ার মাধ্যমে ইয়ামান তথা দক্ষিণ ইয়ামানে দুইবার হস্তক্ষেপ করা হয়। এই অভিযান কার্যত অনেকটা পারস্য সাম্রাজ্যের সহিত বাণিজ্য যুদ্ধ প্রকৃতিরও বলা চলে। ৫৭০-৭১ খৃস্টাব্দে কা'বাগৃহের বিরুদ্ধে আবরাহার বিপর্যয়কর সামরিক অভিযানের পর আবিসিনীয়-বায়যান্টীয় হস্তক্ষেপের বিরুদ্ধে ইয়ামানে প্রতিরোধ গড়িয়া উঠে। এই প্রতিরোধ যুদ্ধে নেতৃত্ব দেন সায়ফ ইন্ন যী ইয়াযান। তাহার অনুরাধে সাড়া দিয়া পারস্য সম্রাট সমুদ্র পথে ইয়ামানে একটি সেনাদল প্রেরণ করেন। এই সাহায্যপুষ্ট ইয়ামানীরা তাহাদের দেশে আবিসিনীয় শাসনের অবসান ঘটায়। ইহার পর বায়যান্টিয় কর্তৃপক্ষ খোদ মক্কায় খৃস্ট ধর্ম প্রতিষ্ঠার শেষ বড় রকমের প্রয়াস হিসাবে উছমান ইবনুল হুওয়ায়রিছের মাধ্যমে মক্কার সরকারে পরিবর্তন আনার চেষ্টা চালায়। কিন্তু উছমানের নিজ গোত্র বনূ আসাদ তাহাকে প্রত্যাখ্যান করে।
আরব উপদ্বীপের চারপাশের পৃথিবীর ধর্মীয় ও রাজনৈতিক পরিস্থিতি ছিল এই রকম। এই আলোচনায় স্পষ্ট যে, তখনকার গোটা বিশ্বে কম-বেশী প্রায় সর্বত্র বহু ঈশ্বরবাদ, মূর্তিপূজা, কুসংস্কার ও অমানবিক রীতিনীতি প্রচলিত ছিল, যে পরিবেশের ইসলামী-আরবীয় ভাষ্য বা শিরোনাম হইল 'জাহিলিয়্যা'। তাই ইসলামের অভ্যুদয় ছিল আরবদের নিকট একদিকে যেমন বিপ্লব, তেমনি ইহা সারা বিশ্বে আধিপত্য করার সাসানীয় ও বায়যান্টিয় সম্রাটদের কাছে এক প্রবল বাধা ও হতাশা। তাহাদের বিশ্বজনীন সাম্রাজ্য ও ধর্ম প্রতিষ্ঠার স্বপ্ন ইসলামের অভ্যুদয়ে ধূলিস্যাৎ হইয়া যায়।

টিকাঃ
৯১. নিম্নে দ্র., অধ্যায় ৮, ১ম ভাগ।
৯২. অন্য তিন বেদ হইল : সাম, যজু ও অথর্ব।
৯৩. Rajendralal Mitra, Beef in Ancient Indai, J.A.S.B., 1872, pp 174-196।
৯৪. সতীদাহ নামের এই অমানবিক প্রথা ভারতে ইস্ট ইন্ডিয়া কোম্পানির সরকারের ১৮২৯ সনের আইনে নিষিদ্ধ করা হয়।
৯৫. আহুরা, এই পারসিক শব্দটি অসুর-এর নমনীয় রূপ। হিন্দুরা অসুর বলিতে দানব/ রাক্ষসকে বুঝাইয়া থাকে। এই দুই ভিনদেশী শব্দের মধ্যে মৌলিক কারণ, উভয় ভাষাই ইন্দো-আর্যভাষা পরিবারের সদস্যের অন্তর্ভুক্ত। হিন্দুদের দেবতা বা দেওতা শব্দটির অর্থ ঈশ্বর যাহা মূল লাতিন শব্দ ডেইটির অনুরূপ অর্থবাহক।
৯৬. ইব্‌ন হিশাম, ১ম খণ্ড, ৬৩-৬৮।
৯৭. নিম্নে দ্র., পৃ. ৩৩০-৩৩৪।

ফন্ট সাইজ
15px
17px