📘 সীরাত বিশ্বকোষ > 📄 তিন: ইসলামের অভ্যুদয়ের আগে মক্কা ও আরব

📄 তিন: ইসলামের অভ্যুদয়ের আগে মক্কা ও আরব


নবী ইসমাঈল ('আ)-এর ইন্তিকালের পর তাঁহার বংশধররা কিছু কালের জন্য মক্কায় শাসন পরিচালনার নিয়ন্ত্রক থাকে। পরবর্তী কালে তাহাদের মাতুল কুলের গোত্র বনূ জুরহুম তাহাদের নিকট হইতে সেই ক্ষমতা কাড়িয়া নেয়। আর উহার পর হইতে বনূ জুরহুম কয়েক শত বৎসর মক্কা শাসন করিতে থাকে। বনূ বাক্ ইব্‌ন আব্দ মানাত ইব্‌ন কিনানা-র সাথে জোট বাঁধিয়া বনূ খুযা'আ বনূ জুরহুম গোত্রের লোজনকে মক্কা হইতে বিতাড়িত করে। মক্কা হইতে চলিয়া যাইবার সময় বনূ জুরহুম মাটিতে ঢাকিয়া দিয়া ও সেখানে কিছু অস্ত্রশস্ত্র ও বর্মসহ দুটিই স্বর্ণমৃগ মাটি চাপা দিয়া যমযম কূপটি ধ্বংস করিয়া যায়। এইভাবে কূপটি ও উহার অবস্থান দীর্ঘকাল মানুষের দৃষ্টির অগোচরে চলিয়া যায়।
বনূ খুযা'আ ইহার পর দীর্ঘ কয়েক শতাব্দী মক্কার সমাজযন্ত্র নিয়ন্ত্রণ করে। পরিশেষে কুরায়শ গোত্রের কুসায়্যি ইব্‌ন কিলাব বনূ কিনানা গোত্রের সহায়তায় বনু খুযা'আ গোত্রকে মক্কা হইতে উৎখাত করে। এই কুসায়্যি ছিলেন ইসমাঈলের বংশধরের প্রধান শাখাভুক্ত গোত্রের সদস্য। এই ঘটনা ঘটে মহানবী -এর জন্মের আনুমানিক দুই শত বৎসর আগে। কুসায়্যি তাহার পতাকাতলে কুরায়শ বংশের সকলকে সমবেত করিয়া মক্কা ও আশপাশ এলাকায় তাহাদিগকে অভিবাসিত করেন। তিনি মক্কা ও কা'বার প্রশাসন সম্পর্কিত সকল ঐতিহ্যগত কার্যকলাপের নিয়ন্ত্রণ গ্রহণ করেন। এই কার্যকলাপ প্রধানত ছিল নিম্নরূপ:
(১) আল-হিজাবাহ অর্থাৎ পবিত্র কা'বাগৃহের চাবি সংরক্ষণ ও কা'বার রক্ষণাবেক্ষণের দায়িত্ব গ্রহণ;
(২) আস-সিকায়াহ অর্থাৎ হজ্জের সময় হজ্জযাত্রীদের জন্য পানি সরবরাহের দায়িত্ব ও সেই সাথে যমযম কূপ নিয়ন্ত্রণের দায়িত্ব গ্রহণ ও পরিচালনা;
(৩) আর-রিফাদাহ অর্থাৎ হজ্জ মৌসুমে হাজ্জীদিগকে প্রয়োজনীয় সামগ্রী সরবরাহ ও তাহাদের আহারের ব্যবস্থার দায়িত্বাবলী;
(৪) আন-নাদওয়াহ অর্থাৎ নাগরিক জীবনের বিষয়াবলীর আলোচনা, নিষ্পত্তি ও সিদ্ধান্তের জন্য গোত্রসমূহের সলাপরামর্শ সভা ডাকার অধিকার;
(৫) আল-লিওয়া অর্থাৎ যুদ্ধে নেতৃত্বদান এবং গোত্র-পতাকা বহনের অধিকার।
কুসায়্যি তাহার চার পুত্রের সহায়তায় উল্লিখিত সকল কার্যকলাপ পালন করিতেন। তিনি কা'বার নিকটে গোত্রসমূহের পরামর্শ সভার জন্য ইহার দরজাগুলি কা'বামুখী করিয়া একটি ভবনও নির্মাণ করান। এই ভবনের নাম দেওয়া হয় 'দারুন নাদওয়াহ'। যুদ্ধ ও শান্তিকালীন সকল বিষয় সেই সাথে মক্কার বেসামরিক প্রশাসন সম্পর্কিত সকল বিষয় 'দারুন নাদওয়া'তে আলোচিত ও এইসব বিষয়ে সিদ্ধান্ত গৃহীত হইত। প্রত্যেক গোত্রপ্রধান তাহার গোত্রের পক্ষ হইতে এই পরামর্শ সভায় বক্তব্য পেশ করিতেন। এই পরামর্শ পরিষদে সিদ্ধান্ত গৃহীত হইত সর্বসম্মতিক্রমে। হজ্জ মৌসুমে কুসায়্যি তাহার কুরায়শ গোত্রের সদস্যদের প্রতি আগত হাজ্জীদের জন্য খাদ্য, পানীয় ও আহারের ব্যবস্থা করিতে, বিশেষত হাজ্জীগণ যখন মীনায় অবস্থান করেন সেই সময়ের জন্য একই খাতে চাঁদা প্রদানের আহবান জানাইতেন এই বলিয়া যে, তাঁহারা এখানে সবাই আল্লাহর মেহমান। বস্তুত কুসায়্যি এই রীতির প্রবর্তক এবং এই ব্যবস্থা দীন ইসলাম প্রতিষ্ঠার পরও অব্যাহত থাকে।
আগেই বলা হইয়াছে যে, কুসায়্যির চার পুত্র ছিল : 'আবদুদ দার, 'আব্দ মানাফ, 'আবদুল 'উয্যা ও 'আব্দ। এই চার পুত্রের মধ্যে দ্বিতীয় পুত্র 'আব্দ মানাফ ছিলেন কুরায়শদের স্বাভাবিক নেতৃত্বদানের গুণের অধিকারী। তিনি বিশেষ পরিচিতি লাভ করেন এবং তাঁহার পিতা কুসায়্যির জীবদ্দশাতেও তিনি জনসাধারণের বিশেষ শ্রদ্ধাভাজন হইয়া উঠেন। অবশ্য কুসায়্যি তাঁহার জ্যেষ্ঠ পুত্র 'আবদুদ দারকে তাহার নেতৃত্বের উত্তরাধিকারী মনোনীত করেন। স্থির হয় যে, অতঃপর তিনি কুসায়্যির উল্লিখিত সকল কার্যকলাপ ও মক্কা প্রশাসনের দায়িত্ব পালন করিবেন। কুসায়্যির চার পুত্রের সকলেই এই সিদ্ধান্ত মানিয়া নেন। কুসায়্যির মৃত্যুর পর আবদুদ দার উল্লিখিত সকল কার্য পালন করেন। 'আবদুদ দারের মৃত্যুর পর অবশ্য তাহার পুত্র (বনূ আবদুদ দার) ও 'আব্দ মানাফের পুত্রদের (বনূ 'আব্দ মানাফ) মধ্যে বিরোধ দেখা দেয়। এই বিষয়ে কুরায়শ গোত্র বিভক্ত হইয়া পড়ে। ইহাদের একটি দল বনূ 'আব্দ মানাফের দাবি সমর্থন করে। অন্যরা বনূ 'আবদুদ দারের দাবির প্রতি সমর্থন জানায়। বনূ 'আব্দ মানাফের পক্ষে সমর্থন জানায় বনূ আসাদ ইবন 'আবদুল উয্যা ইন্ন কুসায়্যি, বনূ যুহ্রা ইন্ন কিলাব, বনূ তায়ম ইন্ন মুররা ইন কিলাব ও বনুল হারিছ ইব্‌ন ফিহর ইবন মালিক ইবনুন নাদর। অন্যদিকে বনু 'আবদুদ দারের প্রতি সমর্থন জানায় বনূ মাখযূম ইব্‌ন ইয়াকজা ইন্ন মুররা, বনূ সাহম ইবন 'আমর ইবন হুসায়স ইব্‌ন কা'ব, বনূ জুমাহ ইব্‌ন আমর ইবন হুসায়স ইন্ন কা'ব ও বনূ আদিয়্যি ইন্ন কা'ব। এই দুই পক্ষীয় গোত্রগুলি পরস্পর বিরোধী জোট গড়িয়া তোলে।
'আব্দ মানাফের জোট আল-মুতায়্যাবৃন নামে অভিহিত হয়। কারণ, কথিত বিবরণ অনুযায়ী এই জোটের সদস্যরা তাহাদের হাত পেয়ালাপূর্ণ সুগন্ধিতে ডুবাইয়া বনূ 'আব্দ মানাফকে সমর্থনের শপথ নেয়। আর প্রতিপক্ষ আবদুদ দারের জোট পরিচিত হয় আল-আহলাফ বা মৈত্রী নামে। কেননা তাহারা বনূ আবদুদ দারকে সমর্থনের জন্য এই ব্যাপারে আনুষ্ঠানিক পর্যায়ে জোট (হিলফ) গঠন করে। দুই প্রতিপক্ষ যখন নেতৃত্বের প্রশ্ন লইয়া সশস্ত্র সংঘাতে উদ্যত, এমনি সময়ে তাহাদের মাঝে সুবিবেচনাবোধ প্রবল হইয়া উঠিলে উভয় পক্ষে একটি শান্তিপূর্ণ আপসরফা হয়। এই নিষ্পত্তি অনুযায়ী বনূ 'আব্দ মানাফকে আস-সিকায়াহ ও আর-রিফাদাহ এই দুই কার্য পালনের কর্তৃত্ব অর্পণ করা হয়। অন্য তিন কার্য, যেমন আল-হিজাবাহ, আন্-নাদওয়াহ ও আল-লিওয়া-র দায়িত্ব বনূ 'আবদুদ দারের হাতে রহিয়া যায়। ইসলাম কায়েম হওয়ার আগে অবধি এই ব্যবস্থা চলিতে থাকে।
আস-সিকায়াহ ও আর-রিফাদাহর দায়িত্ব দেওয়া হয় বনূ 'আব্দ মানাফের হাতে এবং এই ক্ষমতা পরিচালনা করেন 'আব্দ মানাফের দ্বিতীয় পুত্র হাশিম। কেননা হাশিমের জ্যেষ্ঠ ভ্রাতা 'আব্দ শাম্স-এর আর্থিক দুর্গতির কারণে তাহাকে বাণিজ্য উপলক্ষ্যে প্রায় সর্বদাই বিদেশ ভ্রমণে থাকিতে হইত। হাশিম তাঁহার পিতার মতো অনেক গুণের অধিকারী ছিলেন। তিনি বৈদেশিক সম্পর্কের ক্ষেত্রে কুরায়শদের স্বাভাবিক মুখপাত্রের ভূমিকা পালন করিতেন। তিনি বায়যান্টীয় ও আবিসিনীয় কর্তৃপক্ষের সঙ্গে পরপর কয়েকটি চুক্তি সম্পাদন করেন। ফলে কুরায়শদের বাণিজ্যিক তৎপরতা আরবের উত্তর ও দক্ষিণে, বিশেষত সিরিয়া ও আবিসিনিয়ায় (ইথিওপিয়া) ব্যাপক বিস্তৃতি লাভ করে। হাশিম বৎসরে দুইবার বিদেশে প্রধান বাণিজ্য যাত্রার প্রথা প্রবর্তন করেন, একবার শীতে ও আরেকবার গ্রীষ্মকালে। হাশিম এই ধরনের বাণিজ্য সফরে থাকার সময়ে গাযায় ইন্তিকাল করেন।
আস-সিকায়াহ ও আর-রিফাদার দায়িত্ব অতঃপর হাশিমের কনিষ্ঠ ভ্রাতা আল-মুত্তালিব ইবন 'আব্দ মানাফের উপর বর্তায়। ভাইয়ের মত আল-মুত্তালিব মেধা ও মননে সমান গুণের অধিকারী ছিলেন। কুরায়শ গোত্রের লোকেরা তাঁহাকে আল-ফায়েদ বলে সম্বোধন করিত। কারণ তিনি ছিলেন মহানুভব ও দানশীল এবং একজন বিশিষ্ট ব্যক্তিত্বও। তাহার ইন্তিকালের পর আস-সিকায়াহ ও আর-রিফাদার দায়িত্ব বর্তায় হাশিমের পুত্র আবদুল মুত্তালিবের উপর যিনি ছিলেন মহানবী-এর পিতামহ।
'আবদুল মুত্তালিব দীর্ঘায়ু লাভ করেন এবং তাঁহার উপর ন্যস্ত উল্লিখিত দুই দায়িত্ব অর্ধ শতকেরও বেশি কাল পালন করেন। তাঁহার সর্বাপেক্ষা বড় কৃতিত্ব ছিল যমযম কূপের পুনর্খনন ও কূপটিকে পুনর্বহাল করা। বনূ জুরহুম যমযম কূপ ধ্বংস করার ও উহার উপরে মাটিচাপা দেওয়ার পর হইতে উহা আর ব্যবহৃত হয় নাই, জনসাধারণের কাছেও ইহার অস্তিত্ব হারাইয়া গিয়াছিল। বাস্তবিকপক্ষে কুরায়শগণের পূর্ববর্তীগণ তাহাদের দুই দেবদেবী ইসাফ ও না'ইলার মূর্তি কা'বার যেখানটায় তাহারা ও তাহাদের পূর্ববর্তীরা তাহাদের দেবদেবীদের উদ্দেশ্যে পশু বলি দিত সেখানে স্থাপন করে। এই মর্মে বিবরণ পাওয়া যায় যে, পরপর তিন রাত্রি আবদুল মুত্তালিবকে স্বপ্নযোগে যমযম কূপ পুনর্খননের নির্দেশ দেওয়া হয় এবং উহার অবস্থান সম্পর্কেও তাহাকে জানানো হয়। সেই অনুসারে মুত্তালিব ঐ স্থানটির খনন পরিচালনা করেন। এই কাজে তাঁহাকে সে সময় তাঁহার একমাত্র পুত্র আল-হারিছ সাহায্য করেন। তিনি কিছু দূর খননের পর মাটিতে জুরহুম গোত্রের লোকদের মাটিচাপা দিয়া রাখা অস্ত্রশস্ত্র, বর্ম এবং সোনার নির্মিত দুইটি মৃগমূর্তির সন্ধান পান। আরও গভীরে খননের পর যে মূল পাথরটি দিয়া যমযম কূপের পানি প্রবাহের মুখটি আটকানো ছিল সেটির সন্ধান পাইয়া আনন্দে চীৎকার করিয়া উঠেন এবং তাঁহার এই সাফল্যের জন্য আল্লাহ্ প্রশংসা করেন।
কুরায়শরা অবশ্য গোড়ার দিকে তাহাদের পশু বলি দেওয়ার স্থানটি এইভাবে বিঘ্নিত করার জন্য আপত্তি জানাইয়াছিল। কিন্তু যখন তাহারা দেখিতে পাইল যে, 'আবদুল মুত্তালিব সঠিকভাবেই কূপটির সন্ধান পাইয়াছেন তখন তাহারা এই কূপের পানিতে তাহাদের একটা অংশীদারিত্ব এই বলিয়া দাবি করে যে, কূপটির মালিক তো প্রকৃতপক্ষে তাহাদের একই পূর্বপুরুষ ইসমাঈল ('আ)। তবে 'আবদুল মুত্তালিব তাহাদের এই প্রস্তাবে সায় দিলেন না এই যুক্তিতে যে, আল্লাহ কর্তৃক তাহাকে মনোনীত করা হইয়াছে কূপটিকে পুনর্বহাল ও নিয়ন্ত্রণ করার জন্য। বিষয়টির শেষপর্যন্ত নিষ্পত্তি হয়, তীর নিক্ষেপ বা লটারির মত দৈবাৎ পন্থায়। আর এই প্রক্রিয়াতেও ভাগ্য সুপ্রসন্ন ছিল আবদুল মুত্তালিবের প্রতি। অতঃপর কুরায়শগণ শান্তিপূর্ণভাবে যমযমের মালিকানা ও প্রশাসনের কর্তৃত্ব 'আবদুল মুত্তালিবকে ছাড়িয়া দেয়। তিনি কা'বাগৃহের দরজার পাশে সোনার মৃগমূর্তি দুইটি স্থাপন করেন। ইহা ছিল কা'বাগৃহের দ্বারকে স্বর্ণ দ্বারা অলংকৃত করার প্রথম ঘটনা।
যমযম কূপের পুনর্খননের ঘটনায় 'আবদুল মুত্তালিবের মর্যাদা ও প্রভাব বিপুলভাবে বৃদ্ধি পায়। পানির এই স্থায়ী উৎসের উপর এই মালিকানার ফলে আস-সিকায়াহ ও আর-রিফাদার দায়িত্ব পালনেও তাঁহার বিশেষ সুবিধা হয়। আসলেও 'আবদুল মুত্তালিবের আমলে এই দুই কার্যক্রম মক্কার নগর জীবনের সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হইয়া উঠে। ইহা ছাড়াও অর্ধ শতকেরও বেশি কাল ধরিয়া এই দুই কার্যক্রম পালন করার ফলে আবদুল মুত্তালিব গোটা আরবজাহানে সুপরিচিত হইয়া উঠেন। ইহা ছাড়া তাঁহার বয়স, প্রজ্ঞা ও বিত্তের কারণেও তিনি অভ্যন্তরীণ ও বহির্বিষয় উভয় ক্ষেত্রেই কুরায়শ গোত্রের কার্যত প্রধান হইয়া ওঠেন।
যমযম কূপ পুনর্খনন ছাড়াও 'আবদুল মুত্তালিবের আমলের অন্যান্য উল্লেখযোগ্য ঘটনার মধ্যে রহিয়াছে ইয়ামানের আবিসিনীয় গভর্নর আবরাহার মক্কা আক্রমণ। আবরাহা সানায় (صنعاء) এক সুবিশাল গির্জা নির্মাণ করিয়াছিল। ঐ গির্জার নাম দেওয়া হয় আল-কুল্লায়স। আবরাহা দৃঢ় সংকল্প লইয়াছিল যে, অধিকাংশ ধর্মকর্ম ও ব্যবসায় উপলক্ষ্যে বেশিরভাগ যাত্রীই যেন আরবদের তীর্থস্থান ও বাণিজ্যপথ ছাড়িয়া সেদিকে যায়। তাহার এই গির্জা একজন আরব অপবিত্র করিয়াছে এই অজুহাতে সে মক্কার কা'বাগৃহ ধ্বংসের জন্য হাতি ও ঘোড়াসহ এক বিরাট সশস্ত্র বাহিনী গঠন করে। সে মক্কার পথে তাহার বাহিনীসহ রওয়ানা হইলে কোন কোন আরব গোত্র তাহাকে বাধা দেওয়ার চেষ্টা করে। তবে তাহাদের সকলেই পরাজিত হয়। তায়েফ হইয়া আবরাহা শেষাবধি তাহার বাহিনী ও হস্তীযুথসহ মক্কার কাছাকাছি এলাকায় পৌঁছিয়া মক্কা নগরীর উপকণ্ঠ এলাকায় যাহা পাইল তাহা লুণ্ঠন ও যাহাকে পাওয়া গেল তাহাকে বন্দী করে। আবদুল মুত্তালিবের দুই শত উটও এই সময় লুণ্ঠিত হয়। অতঃপর আবরাহা নগরে দূত পাঠায় নগর প্রধানকে এই বার্তা জানাইতে যে, যুদ্ধ করার কিংবা মক্কার নগরবাসীকে হত্যা করার কোন ইচ্ছা তাহার (আবরাহার) নাই। সে শুধু আসিয়াছে কা'বাঘর ধ্বংস করার জন্য। তাই নগরবাসীরা যদি শান্তিপূর্ণভাবে আত্মসমর্পণ করে তাহা হইলে তাহাদিগকে অব্যাহতি দেওয়া হইবে।
'আবদুল মুত্তালিব ইতোমধ্যে মক্কার বিভিন্ন গোত্রপ্রধানদের সহিত পরামর্শ করিয়াছিলেন এবং ঐ পরামর্শ সভায় এই সিদ্ধান্ত গৃহীত হয় যে, আবরাহার অপ্রতিরোধ্য বাহিনীকে বাধা দেওয়া নিষ্ফল। তাই আবরাহার দূত নগরে আসিলে মক্কার প্রধান হিসাবে কথা বলার জন্য 'আবদুল মুত্তালিবকে দেখাইয়া দেওয়া হয়। আবরাহার দূত 'আবদুল মুত্তালিবের সঙ্গে সাক্ষাত করিলে তিনি দূতকে জানাইয়া দিলেন যে, আবরাহার সহিত যুদ্ধ করার কোন ইচ্ছা কুরায়শদের নাই, বরং তিনি একটা শান্তিপূর্ণ নিষ্পত্তিই চান।
এই পরিপ্রেক্ষিতে 'আবদুল মুত্তালিবকে আবরাহার শিবিরে আলোচনার জন্য আমন্ত্রণ জানানো হইল। এই সম্পর্কে প্রদত্ত বিবরণে বলা হইয়াছে যে, নিজের কয়েক পুত্র ও অন্যকতক নেতাদের সংগে লইয়া তিনি দূতের সহিত আবরাহার শিবিরে গেলে আবরাহা আবদুল মুত্তালিবের ব্যক্তিত্ব ও মেযাজে এতই চমৎকৃত হইল যে, সে নিজে তাহার শাসকের আসন হইতে নামিয়া আসিয়া মেঝেতে পাতা একটি আসনে দুইজনে একত্রে আলোচনায় বসে। আবরাহা 'আবদুল মুত্তালিবের নিকট তাহার বক্তব্য জানিতে চাহিলে তিনি বলিলেন, তাঁহার যে দুই শত উট লুণ্ঠন করা হইয়াছে তাহা তাঁহাকে যেন ফেরত দেওয়া হয়। ইহাতে আবরাহা রীতিমত বিস্মিত ও হতাশ হইয়া বলিল, সে তো বরং আশা করিয়াছিল কুরায়শ নেতা কা'বার কি হইবে সেই বিষয়ে বলিবেন ও অনুনয় করিবেন কা'বাঘর যেন ধ্বংস না করা হয়।
'আবদুল মুত্তালিব শান্তভাবে জবাব দিলেন, তিনি পশুগুলির মালিক, কা'বাঘরের নহেন। কা'বার প্রভু ও তাহার রক্ষাকর্তা রহিয়াছেন। তাঁহার ইচ্ছা হইলে তিনিই কা'বার নিরাপত্তা ও হেফাজতের বিষয়টি দেখিবেন। নিজ বাহিনীর শ্রেষ্ঠত্বে গর্বিত ও আহলাদিত আবরাহা উদ্ধতভাবে জানাইয়া দিল, কা'বার প্রভু তাঁহার বাহিনীর কাছে কিছুই নয়। 'আবদুল মুত্তালিব শুধু মৃদু সংক্ষিপ্ত জবাব দিলেন, বিষয়টি লইয়া মাথাব্যথা আবরাহার এবং নিরাপত্তা দেখার কাজ হইল কা'বার প্রভুর। আবরাহার সহিত এইভাবে আলোচনাশেষে 'আবদুল মুত্তালিব মক্কা নগরে ফিরিয়া আসিয়া কুরায়শ জনসাধারণকে তাহাদের বাড়িঘর ছাড়িয়া পাহাড় চূড়ায় ও বিভিন্ন উপত্যকায় আশ্রয় গ্রহণ করার ও আবরাহা কা'বাগৃহের কি করে তাহা প্রত্যক্ষ করার পরামর্শ দিলেন। 'আবদুল মুত্তালিব নিজে তাঁহার ঘর ছাড়ার আগে কা'বাগৃহে যাইয়া কা'বার দরজা স্পর্শ করিয়া মুনাজাত করিলেন এবং প্রভু যাহাতে তাঁহার উপাসনাগৃহ নিজেই রক্ষা করেন সেই প্রার্থনা জানাইলেন।
আসলেই আল্লাহ কা'বাগৃহ রক্ষায় হস্তক্ষেপ করিলেন এবং তাঁহার উপাসনাগৃহ হেফাজত করিলেন। আবরাহা যখন গোটা নগরে তীব্রগতিতে আক্রমণ চালাইতে উদ্যত তখন দেখা গেল এক ঝাঁক পাখী (আবাবীল) আকাশে আবির্ভূত হইয়াছে। তাহাদের প্রত্যেকের ঠোঁটে ও পায়ের নখরে আঁকড়ানো দুইটি করিয়া সিজ্জীল (কৃষ্ণ পাথর)। এই পাথর বর্ষণ করিয়া চলিল পাখিরা আবরাহার বাহিনীর উপর। যে-ই এই পাথরের আঘাত পাইয়াছে তাহাকেই প্রাণ হারাইতে হইয়াছে। আর তাহার লাশ দ্রুত পচিয়া উঠিয়াছে। এইভাবে হামলাকারী বাহিনীর প্রায় সবটাই ধ্বংস হইয়া যায়। আবরাহা নিজে কোনমতে হাতিতে করিয়া নিজ রাজধানীতে ফিরিতে সমর্থ হইলেও অল্পকাল পরেই সিজ্জীল পাথরের আঘাতজনিত কারণে প্রাণ হারায়। এই অলৌকিক ও স্মরণীয় ঘটনাটি ঘটে যেই বৎসর মহানবী জন্মগ্রহণ করেন সেই বৎসর (৫৭০-৭১ খৃ.)। এই ঘটনার চিত্রবৎ বর্ণনা রহিয়াছে আল-কুরআনের সূরা ১০৫-এ (আল-ফীল)।
উল্লিখিত সংক্ষিপ্ত বিবরণ হইতে পরিষ্কার যে, মক্কা কমপক্ষে আড়াই হাজার বৎসরেরও প্রাচীন এক জনবসতি। মহানবী যখন জন্মগ্রহণ করেন তখন মক্কা শহরের নাগরিক জীবন অনেকটাই গ্রীক নগর-রাষ্ট্রের অনুরূপ ছিল। মক্কার পত্তনের পর হইতে ইহার অধিবাসীরা প্রধানত ব্যবসায়-বাণিজ্য করিয়া জীবিকা নির্বাহ করিত। মক্কার আদি বসতি স্থাপনকারী বনূ জুরহুম এবং ইসমাঈল বংশধর, পরবর্তী কালে যাহারা প্রথম মক্কায় বসতি স্থাপন করে, তাহাদের কেহই যাযাবর ছিল না। তাহারা মক্কার কাছাকাছি এলাকায় বসতি স্থাপন করে। কা'বার অবস্থানের ফলে ধর্মীয় তাৎপর্য ও জনপদটি আন্তর্জাতিক বাণিজ্যপথের ধারে অবস্থিত হওয়ায় বাণিজ্যিক তাৎপর্যের কারণেই মক্কাকে লইয়া বিভিন্ন গোত্রের মধ্যে বিরোধ দেখা দেয়। তাহাদের উদ্দেশ্য ছিল মক্কা দখল করিয়া জনপদটি নিয়ন্ত্রণ করা। অন্যথায় মক্কা এক বিরান ও পাহাড়ী এলাকা। এখানে কোন চাষাবাদের সম্ভাবনাও যেমন নাই, তেমনি অন্য কোন অর্থনৈতিক আকর্ষণও নাই। তবে সেজন্য মক্কা ও কুরায়শ গোত্রের উৎপত্তির মূলে যাযাবর জনগোষ্ঠী রহিয়াছে এবং তাহারা পরে ইসলামের অভ্যুদয়ের অল্পকাল আগে বা সূচনায় ওখানে বসতি স্থাপন করিয়াছিল বলিয়া একটি ভ্রান্ত ধারণা রহিয়াছে।
বস্তুতপক্ষে আরব উপদ্বীপ ইতিহাসের আলোকে আসার পর হইতেই ইহার জনসমষ্টিতে একটা দ্বৈতভাবের বৈশিষ্ট্য লক্ষণীয় হইয়া ওঠে। আমরা আরবে নিবাসী ও তুলনামূলকভাবে সভ্য জনসমাজ ও লোকালয়ের (হাদার) পাশাপাশি যাযাবর ও ভ্রাম্যমান (বাদূ) জনগোষ্ঠীকেও লক্ষ্য করি। প্রাচীন ও সুপরিতি রাজ্য, যেমন দক্ষিণে মিনিয়া (১২০০ খৃ. পূর্বাব্দ-৬০০ খৃ. পূর্বাব্দ), সারায়ী (৯৫০ খৃ. পূর্বাব্দ-১১৫ খৃ. পূর্বাব্দ), কাতাবা ও (১০০ খৃ. পূর্বাব্দ-১১৫ খৃ.), হাদরামাওত (১৮০ খৃ. পূর্বাব্দ-৩০০ খৃ.) ও হিয়ারী (১১৫-৫২৫ খৃ.) এবং উত্তরে নাবাতীয় (৪০০ খৃ. পূর্বাব্দ-১০৬ খৃ.) গাসসানী (২৭১-৬৩০ খৃ.) ও লাখমী (২৭১-৬২৮ খৃ.) ছাড়াও বহু গুরুত্বপূর্ণ গোত্র বিভিন্ন অঞ্চলে স্থায়ী বসতি স্থাপন করে এবং তাহারা সুনির্দিষ্ট অঞ্চলসমূহে তাহাদের অধিকার ও নিয়ন্ত্রণ প্রতিষ্ঠা করে। তাহাদের নিজ নিজ রাজধানীসহ দুর্গও ছিল। এইসব গোত্রের মধ্যে উল্লেখযোগ্য কিছু গোত্র হইল : বনূ কুদা'আ (উত্তর-পশ্চিম আরব), বনূ কাল্ব (উত্তর আরব), বনু রবী'আ ও বনূ বাক্স ইব্‌ন ওয়াইল (উত্তর-পূর্ব আরব), বনূ তাঈ (উত্তর-মধ্য আরব), বনূ হানীফা (পূর্ব আরব, আল-ইয়ামামা), বনূ কিনদাহ (মধ্য আরব), বনূ হাওয়াযিন ও বনূ সুলায়ম (মধ্য ও দক্ষিণ-মধ্য আরব), বনু খুযা'আ ও বনূ গিফার (মক্কা ও মদীনার মধ্যবর্তী পশ্চিম আরব)। আগেই উল্লেখ করা হইয়াছে, বনূ কিনদাহ-এর শাসকরা বাদশাহ উপধি ধারণ করিত। বনূ বাকর ইন ওয়াইল শক্তি-সামর্থ্যের সঙ্গে কখনও কখনও পারস্য সাম্রাজ্যের শক্তির সহিত তুলনীয় ছিল। সকলেই জানেন, বনূ হানীফা মহানবী মুহাম্মাদ-এর মৃত্যুর পর ইসলামের বিরুদ্ধে সবচেয়ে প্রবল প্রতিরোধ গড়িয়া তোলে। ইহা ছাড়াও আরও কিছু নিবাসী গোত্র ছিল। এইগুলির মধ্যে রহিয়াছে : মদীনার (ইয়াছরিব) আওস ও খাযরাজ, তায়েফের বনূ ছাকীফ, উত্তর আরবের বনূ আক্স, পশ্চিম আরবের বনূ কিনানা, উত্তর আরবের বনূ গাতাফান ও দক্ষিণ আরবের বন্ আদ-দাওস। মদীনায় হিজরতের আগে মহানবী এই ধরনের স্থায়ী নিবাসী ও সুরক্ষিত দুর্গের মালিক গোত্রগুলির সাহায্য ও সমর্থন চাহিয়াছিলেন। তিনি সত্যিকার অর্থে যাযাবর ও বেদুঈনদের কাছে তেমন সাহায্য-সহযোগিতা চাহেন নাই। আদ-দাওস গোত্রের তুফায়ল ইন্ন 'আমর বাস্তবিকপক্ষে মক্কায় মহানবী -এর অবস্থা সঙ্কটজনক হইয়া পড়ার পর তাঁহাকে মক্কা ছাড়িয়া তাহাদের গোত্রের শক্তিশালী দুর্গে আশ্রয় গ্রহণের প্রস্তাব দিয়াছিলেন। মহানবী অবশ্য সেই প্রস্তাব গ্রহণ করেন নাই। মক্কা, তায়েফ, ইয়াছরিব (মদীনা), খায়বার, তায়মা, তাবূক, ফাদাক, দূমাতুল জানদাল ইত্যাদির মত জনপদগুলি ছিল ইসলামেরও অভ্যুদয়ের বহুকাল আগে হইতেই স্থায়ী জনপদ। প্রাক-ইসলামী আরবের পরিস্থিতি অনেকাংশেই প্রাচীন ভারতবর্ষের মত ছিল। আরব উপদ্বীপে ছিল অনেক ছোট ছোট ও অতি ক্ষুদ্র রাজ্য ও রাজনৈতিক সত্তা। তবে ভারতের পরিস্থিতির সাথে আরবের পার্থক্য শুধু এইটুকু যে, বিভিন্ন গোত্র অধ্যুষিত জনপদ ছাড়া আরবের বিশাল বিশাল অঞ্চল ছিল জনশূন্য। এসব অঞ্চলে বেদুঈন ও যাযাবরেরা তাহাদের পশুচারণ করিত, ডাকাতি-লুণ্ঠনে লিপ্ত ছিল কিংবা এক গোত্র অন্য গোত্রের সহিত ব্যবসা-বাণিজ্যে নিয়োজিত ছিল। সর্বোপরি পশুচারণ, বাণিজ্য বা লুটেরা বৃত্তির সুযোগ সন্ধানে যাযাবর ও বেদুঈন শ্রেণীর লোকেরা এক স্থান হইতে অন্য স্থানে ঘুরিয়া বেড়াইত।
তবে যাযাবরগণ বেদুঈন কিংবা স্থায়ী নিবাসী যাহাই হউক, সকল গোত্রের লোকজনের সামাজিক ব্যবস্থাটি ছিল গোত্রভিত্তিক। একটা বেশ বিপুল সংখ্যক লোক লইয়া গঠিত হইত গোত্র। তাহাদের সকলের আদি ও প্রত্যন্ত পূর্বপুরুষ অভিন্ন ছিল। আর তাই স্বাভাবিকভাবেই এই গোত্র কয়েকটি গোষ্ঠীর সমবায়ে গঠিত হইত। এই ধরনের প্রতিটি গোষ্ঠী গঠিত হইত খুবই ঘনিষ্ঠ সম্পর্কে সম্পর্কিত কিছু পরিবার লইয়া, যাহাদের পূর্বপুরুষ অভিন্ন থাকিত। গোত্র ও গোষ্ঠী স্বাতন্ত্র্য ও পরিচয় কড়াকড়িভাবে আলাদা ও স্পষ্ট করিয়া রক্ষা করা হইত। এই ব্যবস্থার একটি বৈশিষ্ট্য এই যে, গোত্র, গোষ্ঠী ও পারিবারিক বংশতালিকা সংরক্ষণের ব্যাপারে সবিশেষ গুরুত্ব আরোপ করা হইত। এমনকি একজন সাধারণ ব্যক্তিও তাহার ২০ হইতে ২৫তম পূর্বপুরুষের বংশলতিকা মুখস্থ রাখিত, এমন দৃষ্টান্ত দুর্লভ নহে। কোন মর্যাদাবান লোকের কাছে আশা করা হয় যে, তিনি তাহার ৫ হইতে ১০ জন পূর্বপুরুষের নাম, যেমন আবদুল্লাহ-র পুত্র অমুক, অমুকের পুত্র অমুক ইত্যাদি উল্লেখ করিতে পারিবেন। এই বংশলতিকার ব্যাপারে খুবই গুরুত্ব আরোপ করার কারণে এই বিষয়ে একটি বিশেষজ্ঞ বা বিশারদ শ্রেণীর অভ্যুদয় ঘটে। তাহাদেরকে 'নুসসাব' (বংশবৃত্তান্ত বিশারদ) বলিয়া অভিহিত করা হইত। তাহাদের কাজ ছিল বিভিন্ন গোত্র, গোষ্ঠী ও পরিবারের বংশলতিকা সংগ্রহ করিয়া সংরক্ষণ, প্রচার ও প্রকাশ করা। মক্কায় হযরত আবূ বাক্স (রা) ছিলেন এই রকম একজন নুসসাব। বলা প্রয়োজন যে, এইসব গোত্র, গোষ্ঠী বা পরিবার ছিল পিতৃতান্ত্রিক। তাই মাতৃতান্ত্রিক ধারার বংশতালিকার সন্ধান আরবে খুব কচিৎ পাওয়া যায়।
গোত্র ছিল কার্যত আধুনিক কালের একটি রাষ্ট্রের সমমর্যাদা সম্পন্ন। একজন ব্যক্তিবিশেষের পরিচয়, তাহার অধিকার ও কর্তব্য এবং সর্বোপরি তাহার হেফাজত ও নিরাপত্তা সবকিছুই তাহার গোত্রের সঙ্গে সম্পর্কিত ছিল। কোন ব্যক্তিকে যদি কোন গোত্র বা গোষ্ঠী বহিষ্কার করে কিংবা তাহাদের বলিয়া স্বীকার করিতে অস্বীকৃতি জানায় তাহা হইলে ঐ ব্যক্তির দশা রাষ্ট্রহীন ব্যক্তির মত হইত। এই অবস্থায় যে কেহ শান্তির আশংকা ছাড়াও তাহার উপর অন্যায় করিতে পারিত, আটক করিতে পারিত পারিত, এমনকি হত্যাও করিত পারিত। অপরপক্ষে গোত্রের কোন ব্যক্তির উপর কোন অন্যায় করা হইলে অনিবার্যভাবে সে অন্যায় সংশিষ্ট গোটা গোত্র বা গোষ্ঠীর প্রতি অন্যায় হিসাবে গণ্য হইত। আর যদি অন্যায়কারী অন্য আরেকটি গোত্রের বা গোষ্ঠীর সদস্য হইত তাহা হইলে ঐ গোত্র বা গোষ্ঠী সকলে সম্মিলিতভাবে ঐ অপরাধের জন্য দায়ী হইত। সাধারণত এক গোত্রের কোন ব্যক্তি অন্য কোন গোত্রের লোককে হত্যা করিলে তাহার পরিণতি হিসাবে সংশ্লিষ্ট দুই গোত্র ও তাহাদের মিত্রদের মধ্যে দীর্ঘস্থায়ী রক্তের বিরোধ দেখা দিত। ব্যক্তির গুণ-উৎকর্ষ ও কীর্তির বিষয়গুলি তাহার গোত্র বা গোষ্ঠীর জন্য সম্মান ও মর্যাদার বিষয় বলিয়া গণ্য হইত। অন্যদিকে গোত্র ও গোষ্ঠীর অনুরূপ সাফল্য ও গুণের বিষয়গুলিও ব্যক্তির মর্যাদা ও গৌরবে প্রতিফলিত হইত একজন গোত্র ও গোষ্ঠী বহির্ভূত ব্যক্তিও একটি গোত্র বা গোষ্ঠীর মিত্র (হালীফ) অথবা আশ্রিত (মাওলা) হিসাবে অন্তর্ভুক্ত হইতে পারিত। গোত্র অবশ্য কোনভাবেই সর্বাত্মকবাদ বা কিছু শ্রমিব বা জনশক্তির সমষ্টিমাত্র ছিল না। গোষ্ঠী ও তাহার বর্গগুলির মত পরিবারগুলিরও স্বতন্ত্র অস্তিত্ব ছিল আর সেই কারণে ব্যক্তি পর্যায়ের মানুষও বেশ অনেকখানি স্বাধীনতা ও ব্যক্তি সুবিধা ভোগ করিত।
গোত্রের সদস্য অন্যের অধিকার ক্ষুণ্ণ না করার শর্তসাপেক্ষে ব্যক্তি তাহার নিজ পছন্দ অনুযায়ী সম্পত্তির মালিক ও উত্তরাধিকারী হইত, সম্পত্তি কাহাকেও দিয়া দিতে পারিত, বিবাহ করিয়া নিজ পরিবারের পত্তন করিতে পারিত এবং নিজ পছন্দ-অপছন্দ অনুযায়ী কাজ করিতে ও অবাধে তাহার নিজ পেশা বা জীবিকায় নিয়োজিত হইতে পারিত। এক্ষেত্রে আমরা আধুনিক কালের অলিম্পিক ক্রীড়া প্রতিযোগিতায় কোন ব্যক্তি কর্তৃক স্বর্ণপদক জয়ের কথা উল্লেখ করিতে পারি। ঐ ব্যক্তির স্বর্ণপদক জয় শুধু তাহার নিজ ব্যক্তির কৃতিত্বই নয়, বরং সে কৃতিত্বে তাহার দেশ ও জাতিও অংশীদার। ঠিক একইভাবে গোত্রের কোন ব্যক্তির কোন দৈহিক বা বুদ্ধিবৃত্তিক সাফল্য বা কীর্তি কেবল তাহার নিজের প্রশংসা বা সুখ্যাতির বিষয় নহে, বরং একই সঙ্গে তাহা তাহার গোষ্ঠী বা গোত্রের জন্যও সুখ্যাতি ও গৌরবের বিষয়। আজিকার আধুনিক রাষ্ট্রের নাগরিক যেমন তাহার দেশ ও জাতিকে দুশমনের আক্রমণ হইতে রক্ষায় যুদ্ধ করিতে দায়বদ্ধ, ঠিক তেমনি একটি গোত্রের সদস্যও তাহার গোত্র বা গোষ্ঠীর জন্য লড়িতে বাধ্য। অবশ্য ইহার পরেও গোত্রের কোন সদস্য ইচ্ছা করিলে গোত্রের যুদ্ধে শরিক না হওয়ার সিদ্ধান্ত লইতে পারিত। সে ঐ লড়াইয়ে নিরপেক্ষ থাকিতে পারিত এবং যুদ্ধে শরিক হওয়ার বিষয়টি এড়াইয়া যাইতে পারিত। এক্ষেত্রে দৃষ্টান্ত হিসাবে বলিতে পারি যে, আবদুল্লাহ ইবন উবাই মদীনার আওস ও খাযরাজ গোত্রের মধ্যে বু'আছের যুদ্ধে কোন পক্ষে যোগ দেয় নাই।
গোত্রের নেতা নির্বাচিত হইত একজনের বংশমর্যাদা, বয়স, জ্ঞান ও বিচক্ষণতা এবং ব্যক্তিগত গুণাবলী ও উৎকর্ষের ভিত্তিতে। গোত্রপ্রধান অবশ্য স্বৈরাচারী ছিলেন না। সাধারণভাবে গোত্রের বিষয়াবলী, বিশেষত যুদ্ধ ও শান্তির প্রশ্নে সিদ্ধান্ত গৃহীত হইত গোষ্ঠী প্রধানদের সহিত সলাপরামর্শক্রমে। একইভাবে বিভিন্ন পৌর ও প্রশাসনিক কার্যক্রম বিভিন্ন গোষ্ঠীর মধ্যে বণ্টন করিয়া দেওয়া হইত।
গোত্রে ও গোত্রের বাহিরে একজন ব্যক্তির অবস্থান ও মর্যাদা নিরূপিত হইত তাহার মুরূআহ-এর ব্যাপ্তি ও পরিসরের ভিত্তিতে। এই মুরূ'আহ বলিতে যাহা বুঝায় তাহা মধ্যযুগের ইউরোপে শিভালরি (chivalry) বা মহৎ সাহসিকতা বা গুণ বলিতে যাহা বুঝায় সেই একই তাৎপর্য বহন করে। সাধারণত কোন ব্যক্তির মুরূ'আহ-এর অভিব্যক্তি ঘটিত যুদ্ধে সাহসিকতা, এমনকি দারিদ্র্যের মধ্যে আতিথেয়তা এবং জীবন ও বাকপারদর্শিতার ঝুঁকি লইয়া হইলেও বিশ্বস্ততা রক্ষা ইত্যাদির মাঝে। যে ব্যক্তি এইসব গুণে ভূষিত তাহাকে কামিল বা পরিপূর্ণ বা আদর্শ ব্যক্তি বলা হইত। মদীনার বনূ আওফের সুওয়ায়দ ইব্‌ন সামিত ছিলেন অনুরূপ একজন কামিল ব্যক্তি। গোত্র সদস্যদের বাকপারদর্শিতার অভিব্যক্তির অন্যতম প্রধান মাধ্যম ছিল কবিতা। একজন কবি তাহার গোত্রে বিশেষ সম্মানিত ব্যক্তি ছিলেন। আর এক ধারণায় এই কাব্যগুণের অধিকারী এই ব্যক্তিটি ছিলেন তাহার গোত্রের মুখপাত্র। তাহার কবিতার মাধ্যমে কবি সাধারণত তাহার গোত্র ও গোষ্ঠীর আদর্শচিত্র ও গৌরবগাথা তুলিয়া ধরিতেন এবং গোত্রের যুদ্ধ জয়ের প্রশংসাগীতি রচনা করিতেন। কবিতার মধ্য দিয়া গোত্রের আনন্দ ও দুঃখ-বেদনা, অনুভূতি ও বিপর্যয় জনিত মনোবেদনার প্রকাশ ঘটিত। গোত্র কবিরা পরস্পরের সহিত প্রতিযোগিতায় মিলিত হইতেন ও উকাজের মত বিখ্যাত মেলায় সমবেত হইয়া তাহারা তাহাদের সেরা কাব্যগাথা আবৃত্তি করিতেন। আরবরা খুবই কাব্যভক্ত ছিল। কাব্য প্রতিযোগিতায় সেরা কাব্যের জন্য উপযুক্ত পুরস্কার দেওয়া হইত এবং অসাধারণ কাব্য রচিত হইল সে কবিতা সোনার হরফে লিখিয়া কা'বাগৃহের দেওয়ালে টানাইয়া দেওয়া হইত। আর সে কারণেই এই ধরনের কবিতাগুলির নাম হইত মু'আল্লাকাত বা ঝুলন্ত। এইভাবে কা'বাঘর কেবল আরবদের জন্য অভিন্ন ধর্মীয় কেন্দ্রই ছিল না, কা'বা তাহাদের বৃদ্ধিবৃত্তিক ও সাহিত্য গুণের প্রকাশস্থলও ছিল। ইসলামের অভ্যুদয়ের কয়েক শতক আগে মাত্র দশজন কবির রচনা মু'আল্লাকাত শ্রেণীভুক্ত হইতে সক্ষম হয়।
প্রাচীন কালে কোন দেশে কোন ছোটখাটো রাজ্যের বেলায় যেমন তেমনি আরবেও গোত্রগুলি প্রায়ই একে অন্যের সহিত যুদ্ধবিগ্রহে লিপ্ত ছিল। গোত্র অহংকার ও গৌরব, ব্যক্তিগত দ্বন্দু, আরেকটি গোত্রের স্বার্থ বিকাইয়া একটি গোত্রের স্বার্থ চরিতার্থ করার ইচ্ছা, খুনের বদলা জনিত বিরোধ, মরূদ্যান, কূপ, পশুচারণভূমি বা উর্বর জমি কিংবা অনেক সময় পার্শ্ববর্তী বায়যান্টীয় ও পারস্য সাম্রাজ্যের নিজ স্বার্থ চরিতার্থ করার মতলবে প্রদত্ত উস্কানি ও প্ররোচনার কারণেই সাধারণত গোত্রগুলির মধ্যে এই ধরনের অন্তর্কলহ লাগিয়া থাকিত। আরবগণ এই ধরনের অত্যন্ত বড় রকমের সংঘাত বা যুদ্ধের দিবসকে তাহাদের গৌরব-মহিমা ও বীরত্বের স্মৃতি হিসাবে গণ্য করিত। তাহারা এইসব দিবসকে বলিত আয়্যামুল আরাব। এই ধরনের দিবসের দৃষ্টান্ত হিসাবে বনূ তাগলিব ও বনূ বাকরের মধ্যে বাসূস যুদ্ধ, বনূ আক্স ও বনূ যুয়ানের মধ্যে (৫ শতকের শেষের দিকে) দাহিস ও আল-গাবরা যুদ্ধ, কুরায়শ ও বনূ কিনানা এবং বনূ হাওয়াযিন-এর মধ্যে (৬ষ্ঠ শতকের শেষের ৩৭) ফিজার যুদ্ধ, বনূ বাক্স ইব্‌ন ওয়াইল ও পারস্য সাম্রাজ্যের মধ্যে (৬১০ খ্রি.) যুকার যুদ্ধ এবং মদীনার আওস ও খাযরাজ গোত্রের মধ্যে (৬১৭-৬১৮ খৃ.) বুয়াস যুদ্ধের কথা উল্লেখ করা যায়। এ ধরনের যুদ্ধগুলি অনুষ্ঠিত হয় এক পক্ষের শ্রেষ্ঠত্ব প্রতিষ্ঠা ও বীরত্বের প্রর্দশনী হিসাবে, অন্য পক্ষকে সাধারণত খতম করিয়া দেওয়ার উদ্দেশ্যে নয়।
ধরনের বেশিরভাগ যুদ্ধেই খুব একটা রক্তপাত ঘটিত না, যদিও সংঘাত, বিরোধ ও বৈরিতার জের চলিত বৎসরের পর বৎসর ধরিয়া কিংবা বংশ-পরম্পরায়। অনেক সময় বৈরিতার একটি পক্ষ তাহার অপর পক্ষকে হত্যার জন্য আর্থিক ক্ষতিপূরণ দিয়া শান্তিচুক্তি সম্পাদন করিত। আর এই ক্ষতিপূরণ দেওয়া হইত দুই পক্ষের মধ্যে বিরোধ বা যুদ্ধে ক্ষতিগ্রস্ত পক্ষের কত বেশি সংখ্যক লোক ক্ষতিপূরণদানকারী পক্ষের তুলনায় নিহত হইয়াছে সেই হিসাবের ভিত্তিতে।
আরবের জনসমষ্টির দুইটি সাধারণ শ্রেণীতে বিভক্তির কথা আগেই বলা হইয়াছে। ঠিক সেই ধারার অনুসরণে তাহাদের অর্থনৈতিক জীবনও তেমনি দুইটি সুস্পষ্ট ও স্বতন্ত্র ধারায় বিন্যস্ত ছিল। স্থায়ী নিবাসী জনসাধারণ নিয়োজিত ছিল ব্যবসায়-বাণিজ্যে ও সেইসাথে কৃষিকর্মে। বিশেষত তায়েফ ও মদীনার উর্বর এলাকাগুলিতে কৃষিকাজ চলিত। অন্যদিকে যাযাবর ও বেদুঈন গোত্রগুলি প্রধানত নিয়োজিত ছিল পশুচারণে। তাহারা ভেড়া, ছাগল ও উট পালন করিত এবং পশুচারণের জন্য প্রয়োজনীয় তৃণভূমি ও পানির সন্ধানে বিভিন্ন স্থানে চলাচল করিত। অবশ্য এই স্বাতন্ত্র্য একটি পরিসর অবধি সত্য, তাহার বাহিরে নহে। মক্কা ও তায়েফের মত এলাকার স্থায়ী নিবাসীরাও ছাগল-ভেড়া এবং উট পালনে নিয়োজিত ছিল। একইভাবে বেদুঈন গোত্রের লোকেরাও দেশের ভিতরের ও বাহিরের বাণিজ্যে অংশগ্রহণ করিত। বাস্তবিকপক্ষে আরববাসিগণ তাহাদের জীবনযাত্রার নিত্যপ্রয়োজনীয় দ্রব্যাদির জন্য স্থায়ী নিবাসী জনপদের ব্যবসায়ীদের উপর নির্ভর করিত। বেদুঈন গোত্রের লোকেরা ফেরি করিয়া বিভিন্ন স্থানে, বিশেষ করিয়া বিভিন্ন বার্ষিক মেলায় তাহাদের নিজেদের তৈরী নানা দ্রব্যাদিসহ আমদানী পণ্যসামগ্রীর বেচাকেনাও করিত। অন্যদিকে স্থায়ী নিবাসী জনপদগুলির ব্যবসায়িগণ বেদুঈন নিয়ন্ত্রিত এলাকাগুলির মধ্য দিয়া চলিয়া যাওয়া বাণিজ্যপথগুলিতে বাণিজ্য কাফেলার নিরাপদ চলাচলের জন্য বেদুঈনদের সহযোগিতার উপর নির্ভর করিত। হাশিম ইব্‌ন 'আবদ মানাফ বায়যান্টীয় ও আবিসিনীয় কর্তৃপক্ষের সহিত কয়েকটি ধারাবাহিক বাণিজ্য চুক্তি সম্পাদন করেন। তিনি বাণিজ্য কাফেলা চলাচলের নিরাপত্তা বিধানের জন্য বেশ কয়েকটি বেদুঈন গোত্রের সঙ্গেও চুক্তি সম্পাদন করেন। এমনকি কিছু সুদূর ও প্রত্যন্ত এলাকায় উকাযের মত মেলায় বাণিজ্য কাফেলা পাঠানোর জন্য কোন স্থানীয় প্রভাবশালী ব্যক্তির নিশ্চয়তার (যামিন) প্রয়োজন হইত। হেরা হইতে উকায মেলায় যাত্রী বাণিজ্য কাফেলার জামিন হিসাবে দাঁড়ানো দুই স্থানীয় প্রভাবশালী ব্যক্তির প্রতিদ্বন্দ্বিতার কারণেই ফিজার-এর যুদ্ধ সংঘটিত হয়।
মক্কা ধর্মীয় ও সহিংসতামুক্ত স্থান হওয়ায় ইহা ছিল এক ধরনের খোলা ও মুক্ত বাজার। এখানে দূরবর্তী অঞ্চল হইতে আগত ব্যবসায়ীদের জন্য এই ধরনের কোন আনুষ্ঠানিক নিশ্চয়তার প্রয়োজন হইত না। ইহার পরও অবশ্য মক্কার অন্যতম নেতা বনূ সাহমের আল-আস ইব্‌ন ওয়াইল এক ইয়ামানী ব্যবসায়ীর নিকট হইতে অর্থ আদায়ের ঘটনার আলোকে ভবিষ্যতে এই ধরনের ঘটনার পুনরাবৃত্তি রোধে হিলফুল-ফুযূল নামে একটি সংস্থা গঠন করা হয়।
আরবে কৃষিপণ্যের অভাব, ইহার জলবায়ু এবং বহির্বিশ্বে ইহার ভৌগোলিক অবস্থান আরববাসীদিগকে স্বভাব ব্যবসায়ী করিয়া তুলিয়াছিল। বহু প্রাচীন কাল হইতেই আরবের অধিবাসীরা প্রাচ্য ও পাশ্চাত্যের মধ্যে বাণিজ্যে মধ্যবর্তীর ভূমিকা পালন করিয়াছে এবং স্থল ও নৌ উভয় পথেই বাণিজ্য পরিচালনা করিয়াছে এশিয়া, আফ্রিকা ও ইউরোপের দেশগুলির সহিত। এই বিষয় ইতিহাসে সুপরিচিত। খৃস্টীয় প্রথম শতকে রোমানরা ভূমধ্য সাগর ও লোহিত সাগর হইয়া পরিচালিত নৌবাণিজ্য আরবদের নিকট হইতে ছিনাইয়া লয়। তবে এশিয়া ও আফ্রিকার দেশগুলি হইতে বায়যান্টীয় পারসিক সাম্রাজ্যে স্থলবাণিজ্য আরবদের হাতেই থাকিয়া যায়।
মক্কা ছিল আরবদের ধর্মীয় ও বুদ্ধিবৃত্তিক কেন্দ্র। এই মক্কা বাণিজ্যিক কেন্দ্র হিসাবেও উন্নতি লাভ করে। বিভিন্ন সূত্রের বিবরণ হইতে স্পষ্ট ও পর্যাপ্ত প্রমাণ পাওয়া যায় যে, ইসলামের অভ্যুদয়ের আগে মক্কার নেতারা ছিলেন বড় ব্যবসায়ী ও সওদাগর, যাহাদের বাণিজ্য কাফেলা দক্ষিণে ইয়ামান ও আবিসিনিয়া এবং উত্তরে সিরিয়া, হিরা-পারস্য অবধি চলাচল করিত। খোদ মহানবী তাঁহার নবুওয়াত প্রাপ্তির আগে পর্যন্ত ব্যবসায়-বাণিজ্যে নিয়োজিত ছিলেন। সিরিয়ায় খাদীজা (রা)-র বাণিজ্য কাফেলার নেতৃত্ব দেন পঁচিশ বৎসর বয়সী মুহাম্মাদ, বিষয়টি সুপরিজ্ঞাত। মক্কা বিভিন্ন দেশের পণ্য অনুপাতে কয়েকটি বড় বাজারে বিভক্ত ছিল। ঐসব বাজারে ঐসব দেশের পণ্য পাওয়া যাইত। যেমন দৃষ্টান্ত হিসাবে বলা যায়, দার মিসর বা মিসর বাজারে মিসরীয় পণ্যসামগ্রী রাখা হইত এবং সেগুলির বেচাকেনা চলিত।
ইসলাম-পূর্ব আরবে ধর্মীয় অনুষ্ঠানের পাশাপাশি বাণিজ্যও চলিত। মক্কায় বার্ষিক হজ্জের মৌসুমে আরবরা সেখানে তাহাদের পণ্যের পসরা লইয়াও সমবেত হইত। তাহারা এখানে এক ধরনের জাতীয় উৎসবে মিলিত হইত। এই সময়ে যে বাণিজ্যিক লেনদেন অনুষ্ঠিত হইত তাহার পরিমাণ কোন অংশে খাটো করিয়া দেখা যায় না। চারটি পবিত্র মাস জুড়িয়া এই ধরনের বাণিজ্যিক ও বুদ্ধিবৃত্তিক তৎপরতা চলিত। এই সময় উকায, মাজান্না ও জুল-মাজাযে বিরাট বিরাট বার্ষিক মেলা অনুষ্ঠিত হইত। উকায মেলা চলিত ২০ দিন ধরিয়া। এই মেলায় বিরাট সাংস্কৃতিক ও বুদ্ধিবৃক্তিক উৎসব ও প্রদর্শনী অনুষ্ঠিত হইত এবং নানা পণ্যসামগ্রী ও পসরার বিকিকিনি চলিত। এই মেলায় বহু দূরবর্তী অঞ্চল হইতেও বাণিজ্য কাফেলা আসিত। মক্কার কা'বাঘর ছাড়াও আরবরা আশপাশের অন্যান্য অঞ্চলে আরও কয়কেটি অপেক্ষাকৃত গৌণ গুরুত্বসম্পন্ন দেবদেবীর মন্দির তথা ধর্মতীর্থ স্থাপন করে। এইগুলির মধ্যে ছিল তায়েফের আল-লাত, নাখলার আল-'উয্যা এবং কুদায়দ-এ মানাত-এর মন্দির। এইসব স্থানও একাধারে ধর্ম ও বাণিজ্যকেন্দ্র হিসাবে গড়িয়া উঠে। আরবের বিভিন্ন গোত্রের লোকেরা এইসব স্থানে উপযুক্ত মৌসুমে ধর্মকর্ম ও বাণিজ্যের উদ্দেশ্যে আসিতে থাকে। ইয়াহুদীদের মধ্যে তো ছিলই, প্রাক-ইসলামী আরবদের মধ্যেও সূদ প্রথার প্রচলন ছিল। মক্কা ও তায়েফের নেতাগণ সূদের মহাজনী কারবার করিত, তাহার দৃষ্টান্ত পাওয়া যায়। দীন ইসলাম সূদ প্রথার বিলুপ্তি ঘোষণা করে এবং ঐ সময়ের মুসলমানদের প্রতি মূলধনের উপর তাহাদের যে সূদ প্রাপ্য হইয়াছিল তাহা ছাড়িয়া দেওয়ার নির্দেশ দেয়।

টিকাঃ
২৭. ইব্‌ন্ হিশাম, ১ম খণ্ড, পৃ. ১২৯-১৩০।
২৮. প্রাগুক্ত, ১৩১-১৩২।
২৯. প্রাগুক্ত, ১৪২-১৪৭।
৩০. প্রাগুক্ত, ৪৮-৫২।
৩১. প্রাগুক্ত, ৪৯-৫২। আল-কুরআনে পাপী জনসম্প্রদায়ের উপর সিজ্জীল প্রস্তর বর্ষণের আরও উল্লেখের জন্য দ্র.: ১১:৮২ ও ১৫:৭৪। শেষোক্ত দুই আয়াতের বর্ণনায় লূত ('আ)-এর জন- সম্প্রদায়ের উপর আপতিত শাস্তি সম্পর্কিত।
৩২. নিম্নে দ্র., অধ্যায় ৩৫।
৩৩. নিম্নে দ্র., অধ্যায় ৩৫, ২য় ভাগ।
৩৪. দীন ইসলাম কায়েম হওয়ার পরেও প্রথাটি অব্যাহত থাকে।
৩৫. ইব্‌ন হিশাম, ১ম খণ্ড, পৃ. ৪২৫-৪২৬।
৩৬. এই কবিদের নাম : (১) তারাফা ইবনুল আব্দ, গোত্র: বাক্স (মৃ. ৫০০ খৃ.); (২) ইমরুল কায়স, বনূ কিনদা গোত্রের রাজা হারিছের পৌত্র (মৃ. ৫৪০ খৃ.); (৩) 'উবায়দ ইবনুল আবরাস (মৃ. ৫৫৫ খৃ.); (৪) আল-হারিছ ইব্‌ন হিললিজা, গোত্র: বনূ বাক্স (মৃ. ৫৮০ খৃ.); (৫) 'আমর ইব্‌ন কুলছুম, গোত্রঃ বনূ তাগলিব (মৃ. ৬০০ খৃ.); (৬) আন-নাবিগা আয-যুবয়ানী, গোত্র: বনূ যুবয়ান (মৃ. ৬০৪ খৃ.); (৭) আনতারা ইবনুশ শাদ্দাদ, গোত্র: বনু 'আক্স (মৃ. ৬১৫ খৃ.); (৮) যুহায়র ইব্‌ন সুলমা, গোত্র: বনু মুযায়না (মৃ.৬১৫ খৃ.); (৯) আল-আ'শা (মায়মূন ইব্‌ন কায়স, মৃ. ৬২৯ খৃ.) ও (১০) লাবীদ ইবন রাবী'আ, গোত্র: বনূ 'আমের ইবন সা'সা'আহ (মৃ. ৬৬২ খৃ.)। সর্বশেষ উল্লিখিত কবি ইসলাম গ্রহণের পর কবিতা রচনা ত্যাগ করেন। এই কবিদের সম্পর্কে সংক্ষিপ্ত আলোচনার জন্য দ্র. R.A. Nicholson, A Literary History of the Arabs, Cambridge 1988 edn., pp. 103-125।
৩৭. নিম্নে দ্র. অধ্যায় ৭, তৃতীয় ভাগ।
৩৮. নিম্নে দ্র., অধ্যায় ৩৫, ৩য় ভাগ। প্রায় সকল আয়‍্যাম সংক্রান্ত সর্বোত্তম, আধুনিক ও সমন্বিত বিবরণের জন্য দ্র. মুহাম্মাদ আহমাদ জাদ মাওলা বেগ ও অন্যান্য বিরচিত “আয়‍্যামুল 'আরাব ফি'ল-জাহিলিয়্যা, কায়রো, তা.বি।
৩৯. ইবন সা'দ, ১ম খণ্ড, ৭৮।
৪০. নিম্নে দ্র., অধ্যায় ৭, ৩য় ভাগ।
৪১. নিম্নে দ্র. অধ্যায় ৭, ৪র্থ ভাগ।
৪২. আল-আযরাকী, ২য় খণ্ড, ২৬৩।
৪৩. কুরআন, ২: ২৭৫-২৭৯; ৩: ১৩০; ৩০: ৩৯।

📘 সীরাত বিশ্বকোষ > 📄 চার: সামাজিক ও ধর্মীয় পরিস্থিতি: জাহিলিয়্যা

📄 চার: সামাজিক ও ধর্মীয় পরিস্থিতি: জাহিলিয়্যা


চার: সামাজিক ও ধর্মীয় পরিস্থিতি: জাহিলিয়া
আরব জনসমষ্টির ও অর্থনীতির (কৃষি ও বাণিজ্য) দ্বৈত বৈশিষ্ট্যের সহিত মিল রাখিয়া ইসলামের অভ্যুদয়ের আগে আরবদের ধর্মবিশ্বাস ও রীতিপ্রথার মধ্যে দ্বৈততা লক্ষ্য করা যায়। তাহাদের ধর্মীয় বিশ্বাস ও রীতির মৌলিক বৈশিষ্ট্য হইল—তাহাতে ইবরাহীম ('আ)-এর ঐতিহ্যের সুনিশ্চিত অস্তিত্ব। ঐ সময়ের বা পরবর্তী কালের অন্য কোন জনসমষ্টিই ইব্রাহীমি ধারাকে এত ভালো ও নিবিড়ভাবে স্মরণ ও ধারণ করিয়া রাখে নাই। তবুও যুগপৎ ইহাও সত্য যে, তাহারা বহু ঈশ্বরবাদ ও মূর্তিপূজায় বিশ্বাসী হইয়া পড়ে এবং ইহার সহিত যত রকম কুপ্রথা ও কুসংস্কার সম্ভব তাহাও তাহাদের মাঝে প্রবেশ করে।
বাস্তবিকপক্ষে ইসমাঈল ('আ)-এর বংশধরগণ তাঁহার পিতা ইব্রাহীম ('আ)-এর প্রবর্তিত ধর্মবিশ্বাস ও ধর্মাচরণ রীতি পালন করিয়া যাইতে থাকে। অবশ্য কয়েক শতাব্দীর কালপরিক্রমায় ক্রমেই তাহারা তাহাদের মূল ধর্মবিশ্বাস হইতে বিচ্যুত হইতে থাকে এবং দুঃখ-দুর্দশার সময়ে বা কোন অন্যায়ের প্রতিকার পাওয়ার জন্য সহজে নাগালে পাওয়া যায় এমন দেবতার সান্নিধ্য লাভ, কোন বীর বা পূর্বপুরুষকে দেবত্ব আরোপ, প্রকৃতির প্রচণ্ড প্রতিকূলতার মুখে অসহায়ত্বে সান্ত্বনা, সর্বোপরি তৎকালে বুদ্ধিবৃত্তিক, দৈহিক ও বৈষয়িক দিক হইতে শ্রেষ্ঠ গণ্যদের রীতি-নীতির প্রভাবে স্থূল মননের স্বাভাবিক প্রবণতার শিকার হয়। অতীতে যেসব 'সভ্য' জনসমষ্টি আরবদের চারিদিক পরিবেষ্টন করিয়া ছিল তাহারা ও সমসাময়িক অন্যান্য জনসমষ্টির সকলেই আচ্ছন্ন ছিল কোন না কোনভাবে একই বহু ঈশ্বরবাদী বিশ্বাস ও আচরণে। ডঃ ইসমাঈল রাযী আল-ফারূকী বলিয়াছেন, "প্রাক-ইসলামী যুগের আরবরা যেখানেই গিয়াছে সেখানেই তাহারা স্রষ্টার উত্তরণের ধারা লঙ্ঘন লক্ষ্য করে। এখন যেসব আরবের মাঝে এই প্রবণতা সুপ্ত ছিল তাহারা প্রতিবেশী দেশ ও জনপদে তাহাদের প্রবণতার সমর্থন পাইয়া আরও বলিষ্ঠ হইয়া উঠে এবং ঐ পড়শীদের দৃষ্টান্তের অনুসরণ করে। এইভাবে তাহাদের বায়যান্টীয় খৃস্টান পড়শীরাই তাহাদের কাছে কা'বাঘরের সংরক্ষণ করার জন্য দেবদেবীতুল্য মানবমূর্তি বিক্রয় করে। ৪৯
বনু খুযা'আ গোত্র মক্কা দখলের পর, বিশেষত তাহাদের নেতা 'আমর ইব্‌ন লুহায়্যি সেখানে বহু ঈশ্বরবাদী ধর্মমত প্রবর্তন করে। ৪৮ ইব্‌ন হিশামের বর্ণনা অনুযায়ী, 'আমর একবার সিরিয়ায় যাইয়া লক্ষ্য করে, সেখানকার লোকজন মূর্তিপূজা করিতেছে। সে তথাকার লোকজনের নিকট ইহার কারণ জানিতে চাহিলে তাহারা জানায়, মূর্তিপূজা করিলে বৃষ্টিপাত ঘটে, ফসলের সুবিধা হয়, যুদ্ধে বিজয় লাভ করা যায়। মূর্তির কাছে এইসব বিষয়ে প্রার্থনা করিলে সুফল লাভ হয়। 'আমর ইহাতে মুগ্ধ হইয়া তাহাকে এই ধরনের একটি মূর্তি দেওয়ার জন্য তাহাদেরকে অনুরোধ জানায় যাহাতে তাহার আরব লোকজন মূর্তিপূজা করিতে পারে। এই অনুরোধে 'আমরকে তাহারা যে মূর্তিটি দেয় তাহার নাম হুবাল। 'আমর এই মূর্তিটি মক্কায় লইয়া আসে। সে মক্কার লোকজনকে এই মূর্তির পূজা করিতে বলে। নেতা ও বিজ্ঞ ব্যক্তি হিসাবে গণ্য আমরের কথায় তাহারা ঐ মূর্তির পূজা শুরু করিয়া দেয়। ৪৯
আরও এক বিবরণ অনুসারে, 'আমর ইব্‌ন লুহায়্যি ওয়াদ্দ, সুওয়া, ইয়াগৃছ, ইয়াউক ও নাসর দেবতারও পূজার প্রবর্তন করে। এইসব দেবমূর্তির একদা পূজা করিত নূহ নবীর অবিশ্বাসী জনসম্প্রদায়। কথিত আছে, এক জিন 'আমরকে এই মর্মে সংবাদ দেয় যে, এই দেবমূর্তির সন্ধান পাওয়া যাইবে জেদ্দার অমুক স্থানে। জিন তাহাকে ঐসব মূর্তি সেখান হইতে আনিয়া সেসবের
পূজা করার জন্য বলে। 'আমর সেই অনুযায়ী জেদ্দায় যাইয়া নির্দিষ্ট স্থানে মূর্তিগুলি দেখিতে পায়। সে সেগুলিকে মক্কায় আনিয়া স্থানীয় লোকজনকে সেগুলির পূজা করার জন্য নির্দেশ দেয়। ৫১ এই দেবমূর্তিগুলির সত্যসত্যই নূহ ('আ)-এর জনসম্প্রদায় পূজা করিত। কেননা কুরআনে পরিষ্কার উল্লেখ রহিয়াছে যে, তাহারা জ্যোতিষ্ক পূজায় বিশ্বাসী এক ধরনের ধর্মমতবাদী সম্প্রদায় কিংবা তাহারা প্রাকৃতিক শক্তি পূজা কিংবা কোন মানবিক গুণ বা উৎকর্ষে দেবত্ব আরোপে বিশ্বাসী। ৫২ এই ধরনের জনসম্প্রদায়ের অস্তিত্ব ছিল নূহ নবীর ('আ) লোকজনের দেশ প্রাচীন আসিরিয়া ও বাবিলোনিয়ায়। ৫৩ ইব্‌ন আব্বাস (রা)-এর বলিয়া কথিত এক বিবরণের বরাতে বলা হইয়াছে, দেবমূর্তির নামগুলি প্রকৃতপক্ষে নূহ ('আ)-এর সম্প্রদায়ের কিছু বিশিষ্ট ব্যক্তির নাম, যাহাদের উপর পরবর্তী কালে দেবত্ব ও মাহাত্ম্য আরোপ করিয়া তাহাদের মূর্তি গড়িয়া পূজা করা হয়। ৫৪ আবারও এসব বিবরণে একদিকে ইসমাঈলের বংশধররা কেমন করিয়া ক্রমে ক্রমে তাহাদের পূর্ববর্তী ও অন্যান্যদের বহু ঈশ্বরবাদে লিপ্ত হয় এবং এই প্রক্রিয়ায় 'আমর ইব্‌ন লুহায়্যির ভূমিকা গুরুত্ব সহকারে উল্লেখ করা হইয়াছে।
বহু ঈশ্বরবাদের একবার সূচনা হওয়ার পর নানা আকার ও প্রকারে আরবদের মধ্যে বহু ঈশ্বরবাদী আচার-রীতি অনুপ্রবেশ করে। ইবন ইসহাক প্রস্তর পূজার এই বিস্তৃতির কারণ ব্যাখ্যা করিয়াছেন। তিনি বলিয়াছেন, ইসমাঈল ('আ)-এর বংশধরগণ যখন নানা কারণে মক্কা হইতে অন্যত্র বাহিরে ছড়াইয়া পড়িতে বাধ্য হয় তখন তাহাদের প্রতিটি জনগোষ্ঠী মক্কা ত্যাগের আগে পবিত্র কা'বাগৃহের এক টুকরা করিয়া পাথরের খণ্ড কা'বার স্মৃতিচিহ্নস্বরূপ তাহাদের সঙ্গে করিয়া লইয়া যায়। ইহার পর তাহারা যেখানে তাহাদের নূতন বসতি স্থাপন করে সেখানে কোন এক উপযুক্ত জায়গায় এই পাথরের খণ্ডগুলি রাখিয়া কা'বাগৃহের মত প্রদক্ষিণ করার একটা রেওয়াজ গড়িয়া তোলে এবং স্থানটি তাহাদের নিকট বিশেষ পবিত্রতার প্রতীক হিসাবে গণ্য হয়। ক্রমে তাহাদের বংশধরগণ এইসব পাথরকে পূজা করাই কেবল শুরু করে নাই, তাহারা যে কোন বিশেষ পাথরেরও পূজা করিতে থাকে। এইভাবে তাহার। ইবরাহীমের আদি ধর্ম বিস্মৃত হয় এবং তাহাদের ধর্মাচরণ পাথর ও মূর্তিপূজায় পর্যবসিত হয়। ৫৫
চূড়ান্ত পর্যায়ে তাহাদের প্রতিটি গোত্র ও গোষ্ঠীর জন্য এবং বাস্তবিকপক্ষে প্রতিটি পরিবারের জন্য বিশেষ দেবদেবীর মূর্তির প্রচলন হয় যাহা তাহারা পূজা করিতে থাকে। মহানবী-এর আবির্ভাবের প্রাক্কালে আনুমানিক ৩৬০টি মূর্তি কা'বাগৃহের মধ্যে ও আশেপাশে স্থাপিত ছিল। এইগুলির মধ্যে সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ মূর্তিটি ছিল হুবালের। মনুষ্যাকৃতির এই বিরাট মূর্তির একটি হাত ভাঙ্গিয়া যাওয়ায় কুরায়শরা উহা স্বর্ণ দিয়া পুনঃনির্মাণ করে। কা'বার আঙিনায় রাখা আরও দুইটি মূর্তির নাম আগেই বলা হইয়াছে: ইসাফ ও নাইলা। এই দুই মূর্তি মূলত যমযম কূপের স্থানটিতে স্থাপিত ছিল। পরে এই দুইটি মূর্তি সাফা ও মারওয়া পাহাড়ের কাছাকাছি কোথায়ও স্থানান্তরিত করা হয়। প্রাক-ইসলামী বিশ্বাস অনুযায়ী, ইসাফ ও নাইলা ছিল আসলে বনূ জুরহুম গোত্রের এক পুরুষ ও এক নারীর প্রতিকৃতি যাহারা কা'বার ঐ স্থানটিতে যৌন সংসর্গে লিপ্ত হইয়া কা'বার পবিত্রতা নষ্ট করায় তাহারা পাথরে পরিণত হয়। ৫৬
হযরত মুহাম্মাদ (স) ৭৩
কা'বাঘরকে তাহাদের অসংখ্য দেবদেবীর মূর্তিনিবাস করিয়া তোলা ছাড়াও আরবরা বলিতে গেলে দেশের বিভিন্ন স্থানে কয়েকটি গৌণ কা'বাও (তাওয়াগীত) গড়িয়া তোলে। আর সেগুলির প্রতিটির জন্য একেকটি অধিষ্ঠাতা বা অধিষ্ঠাত্রী দেবদেবী নির্ধারণ করা হয়। আরবরা বিভিন্ন নির্ধারিত সময়ে এইসব ধর্মীয় স্থলে উপস্থিত হইয়া সেগুলি প্রদক্ষিণপূর্বক সেখানে পশু বলি দিত এবং অন্যান্য বহু ঈশ্বরবাদী আচার-রীতি পালন করিত। এইসব ধর্মীয় স্থলের মধ্যে সর্বাপেক্ষা গুরুত্বপূর্ণ ছিল তায়েফের আল-লাত, নাখলা-এর আল-উয্যা ও কুদায়দের নিকট আল-মানাত মন্দির। এইসব মন্দিরের দেবদেবীর আদি উৎস অনিশ্চিত। ইবনুল কালবী বলেন, আল-লাত মানাত অপেক্ষা পরবর্তী কালের, আল-'উয্যা আল-লাত ও আল-মানাতের পরবর্তী কালের। ৫৭ কিন্তু তিন দেবমূর্তির মধ্যে আল-'উয্যা সর্বকনিষ্ঠ হইলেও কুরায়শদের কাছে আরবের সকল মূর্তির মধ্যে সবচেয়ে মহৎ (আ'যম) ও গুরুত্বপূর্ণ মূর্তি। কুরায়শ ও কিনানা গোত্রও এই দেবমূর্তির সেবায়েত ও রক্ষণাবেক্ষণকারী ছিল। ৫৮ আল-কুরআনে সুনির্দিষ্টভাবে আরবদের এই তিন দেবীর কথা উল্লেখ রহিয়াছে। ৫৯ আরও কিছু আধা বা নিম-কা'বার মত ধর্মস্থল ছিল আরবদের। এইগুলির মধ্যে ছিল তাবালাহের যুল-খালাসা (মক্কা হইতে সাত রজনীর যাত্রাপথ), তাঈ পর্বতের মধ্যে অবস্থিত ফিল্স, ইয়ামান-এর সানায় অবস্থিত রিয়াম, বনূ রবী'আ ইবন কা'ব অঞ্চলে রুজ্জা, বনূ বাক্স ও বনূ তাগলিবের সিনাদাদের কয়েকটি কা'বা (যুল-কা'বাত) এবং নাজরানের বনুল হারিছের কা'বা। ৬০
এইসব গৌণ কা'বা ছাড়াও আরব উপদ্বীপের বিভিন্ন স্থানে আরও বিক্ষিপ্তভাবে কিছু কিছু বিশেষ দেবতার কয়েকটি অধিষ্ঠানস্থল ছিল। এইগুলির মধ্যে উল্লেখযোগ্য: রুহাতে (ইয়ানবু'), সুয়ার মন্দির, দুমাতুল জানদালের ওয়াদ্দ, জুরাশের ইয়াগুছ (বনূ তাঈ অঞ্চলে), ইয়ামানের হামদানের ইয়াউক (সানা হইতে উত্তরে দুই রজনীর পথ), ইয়ামানের হিময়ারী অঞ্চলে (বালখা') নাস্ত্র এবং খাওলানের উমায়নিস বা 'আম আনাস ও তানুফার সা'দ। ৬১
প্রাক-ইসলামী আরবরা এইসব মূর্তির অথবা নানাভাবে বিভিন্ন দেবদেবীর পূজা করিত। তাহারা এইসব দেবদেবীর কাছে ঐকান্তিকও সানুনয় প্রার্থনা নিবেদন করিত, তাহাদের সম্মুখে নতজানু হইত, অর্ঘ্য-নৈবেদ্য দিত, তাহাদের অনুগ্রহ ও আনুকূল্য প্রার্থনা করিত এবং এই বিশ্বাসে তাহাদের প্রীতি ও অনুগ্রহ উৎপাদনে প্রয়াসী হইত যে, তাহারা তাহাদের কল্যাণ ও অকল্যাণ সাধনে সক্ষম। আরবরা এই সব দেবদেবীর উদ্দেশ্যে নিবেদিত বেদীমূলে পশু উৎসর্গ করিত, তাহাদের মন্দিরে দেবতার অধিষ্ঠানস্থল প্রদক্ষিণ করিত এবং ভাগ্য নির্ধারক তীর বাছিয়া লইত। এই কাজটি দেবমন্দিরেও করা হইত। তাহারা এইসব দেবদেবীর নামে নিজেদের নামও রাখিত। যেমন 'আব্দ ইয়াগৃছ, 'আবদুল 'উয্যা ইত্যাদি। তবে এমনি করিয়া বহু ঈশ্বরবাদ ও মূর্তিপূজায় মগ্ন হইলেও প্রাক-ইসলামী আরবরা প্রাচীন গ্রীক বা হিন্দুদের মত কোন জটিল ও সুবিস্তৃত পৌরাণিক কাহিনী কিংবা দেবদেবীকে কেন্দ্র করিয়া কোন ধর্মতত্ত্বও গড়িয়া তুলে নাই। প্রাক-ইসলামী কাব্য
৭৪ সীরাত বিশ্বকোষ
ও জনশ্রুতিমূলক সাহিত্যেও এই ধরনের কোন উপাদানের সন্ধান মিলে না। ইহা হইতে আরও বুঝা যায় যে, বহু ঈশ্বরবাদ ও মূর্তিপূজা ইসমাঈলীয় আরবদের একান্ত স্বকীয় কিছু ছিল না, বরং এইগুলি ইবরাহীম ('আ)-এর ধারার উপর চাপাইয়া দেওয়া হইয়াছে।
বিষয়টির সর্বোত্তম প্রমাণ রহিয়াছে, আরবদের বহু ঈশ্বরবাদী বিশ্বাসের আচার-রীতির জটাজুটের মধ্যেও ইবরাহীম ('আ) প্রবর্তিত বিশ্বাসের ধারার অভ্রান্ত চিহ্নাবশেষ। এইগুলির মধ্যে সবচেয়ে উল্লেখযোগ্য হইল, সর্বশক্তিমান ও সর্বশ্রেষ্ঠ আল্লাহ্র অস্তিত্বে বিশ্বাস। ৬২ আর সেই সহিত আরবরা ফেরেশতা ও জিনের অস্তিত্বেও বিশ্বাসী ছিল। মহাদুর্যোগের সময় প্রাক-ইসলামী আরবরা, এমনকি সরাসরি আল্লাহ্র অপার করুণা এবং সাহায্য প্রার্থনাও করিত। ৬৩ তাহারা কখনও কখনও আল্লাহর নামে শপথও করিত। ৬৪ আর প্রায়ই তাহারা তাহাদের নামে আল্লাহ শব্দটি যুক্ত করিয়া রাখিত। যেমন, দৃষ্টান্তস্বরূপ 'আবদুল্লাহ' এই প্রাক-ইসলামী' নামটির কথা উল্লেখ করা যায়। বিশেষত, সাম্প্রতিক কালে উত্তর আরব অঞ্চলে বেশ কিছু উৎকীর্ণ লিপি উদ্ধার করা হইয়াছে। তাহাতে কিছু আল্লাহ শব্দযুক্ত নাম পরিলক্ষিত হইয়াছে। ৬৫ এই উৎকীর্ণ লিপিগুলির সবই ইবরাহীমের পরবর্তী আমলের। এই উৎকীর্ণ লিপিগুলি আরবদের মাঝে অতি প্রাচীন কাল হইতেই আল্লাহ সম্পর্কিত ধারণার অস্তিত্ব থাকার সন্দেহাতীত প্রমাণ। ৬৬ ইবরাহীমের ধারার অন্যান্য অবশেষ হইল, মক্কার কা'বার প্রতি (প্রাক-ইসলামী) আরবদের সার্বজনীন শ্রদ্ধাবোধ, কা'বা প্রদক্ষিণ (তাওয়াফ), উমরাহ পালন, হজ্জ পালন ও হজ্জের সহিত সম্পর্কিত অন্যান্য ইবরাহিমীয় রীতি-প্রথা পালন। যেমন আরাফাতের ময়দানে দণ্ডায়মান হওয়া, মুজদালিফায় বিরতি, মীনায় অবস্থান, মীনায় থাকাকালে পশু কুরবানী, সাফা ও মারওয়া পাহাড়দ্বয়ের মধ্যে সাতবার দৌড়াইয়া যাওয়া-আসা, মাথা কামানো ইত্যাদি। ইহা ছাড়া খতনা করানো ও 'আশূরার দিনে রোযা রাখা ইবরাহীম ('আ)-এর প্রবর্তিত রীতি। ৬৭ এইগুলি আরবরা সর্বজনীনভাবে পালন করিয়া থাকে।
বহু ঈশ্বরবাদী বিশ্বাস ও রীতি প্রথার সহিত শত শত বৎসরের ইবরাহীমি ধারার সহাবস্থান সত্ত্বেও অবশ্য আরবে শেষ পর্যন্ত কোন মিশ্র ধর্মতত্ত্ব গড়িয়া উঠে নাই। যে চিত্র ইহা হইতে ফুটিয়া উঠে তাহাকে বলা যায়, কতগুলি বিশ্বাসের জগাখিচুড়ি মাত্র। আর তাহার সহিত ঐ অসামাঞ্জস্যপূর্ণ বিশ্বাস সমাবেশজাত কিছু উপজাত উপাদান। এই ধরনেই এক উপজাত প্রাক-ইসলামী আদর্শ হইল: দেবদেবীর পূজার মাধ্যমে তাহারা আল্লাহ্ আরও নৈকট্য লাভ করিতে পারিবে। ৬৬ কারণ এইসব দেবদেবী আল্লাহ ও তাহাদের মধ্যবর্তী ৬৯ আর তাহাদের কোন কোন দেবী, ফেরেশতা, এমনকি জিনেরা আল্লাহ্ কন্যা। ৭০ উল্লিখিত মিশ্রবিশ্বাসের আরও একটি উপজাত ফল হইল, আরবদের তাহাদের ফসল ও গবাদি পশু সম্পদের একাংশ (সাধারণত একটি বড় অংশ) তাহাদের দেবদেবীদের জন্য এবং আল্লাহ্ জন্য আরেকাংশ (সাধারণত সামান্য অংশ) আলাদা রাখিয়া দেওয়ার নির্বোধসুলভ রীতি। ৭১ এই বিষয়ে আরও দৃষ্টান্ত হইল, কা'বা প্রদক্ষিণকালে তালবিয়্যা বা
হযরত মুহাম্মাদ (স) ৭৫ লাব্বায়কা বলার বহু ঈশ্বরবাদী বিধানগুলি গুলাইয়া ফেলা। ৭২ মক্কাবাসীরা ঐ সময় আরাফাত পর্যন্ত যাইত না; তাহারা কেবল মুযদালিফা পর্যন্ত যাইত। তাহাদের এই ধরনের আচরণের ভিত্তি ছিল তাহাদের মাঝে ধর্মের ক্ষেত্রে স্বকীয় শ্রেষ্ঠত্ববোধ ও তাহাদের পবিত্র এলাকার অধিবাসী হওয়ার উন্নাসিক ধারণা, তাহাদের দেওয়া কাপড় ছাড়া কাহাকেও সাধারণত কা'বাঘর প্রদক্ষিণ করিতে না দেওয়া এবং নিজেদের এমনকি বিবস্ত্র অবস্থায় কা'বা তাওয়াফের রীতি। এইভাবে বহু ঈশ্বরবাদী ধ্যান-ধারণার সহিত আল্লাহকে সর্বোচ্চ প্রভু হিসাবে মিশাইয়া ফেলা সম্পর্কে আল-কুরআনে ঘোষণা করা হইয়াছে, "তাহাদেরকে অধিকাংশ আল্লাহে বিশ্বাস করে, কিন্তু তাঁহার শরীক করে।” ৭৩
আরবদের বহু ঈশ্বরবাদ ও মূর্তিপূজা, তাহাদের আল্লাহ সম্পর্কিত ভ্রান্ত ধারণা এইসব মিলিয়া তাহাদের জীবনধারা ও সমাজের দৃষ্টিভঙ্গি গড়িয়া উঠে। তাহাদের ঐ সময়কার ধারণা ছিল ইহকালই মানব জীবনের সবকিছু। আর তাহাদের দেবদেবীর পূজা-অর্চনা ও আল্লাহ্র প্রতি স্বীকৃতি এইসব কিছুরই ভিত্তি ছিল ইহলৌকিকতা, আর কিছুই নহে। তাহারা পুনরুত্থানে বিশ্বাসী ছিল না, মৃত্যুর পর পুরস্কারে ও দণ্ডে বিশ্বসী ছিল না। আল-কুরআনের ভাষায়, তাহাদের বক্তব্য ও ঘোষণা ছিল ৭৪: "একমাত্র পার্থিব জীবনই আমাদের জীবন, আমরা মরি-বাঁচি এইখানেই এবং আমরা পুনরুত্থিত হইব না”।
এই ধারণাগত বিশ্বাসের কারণে চূড়ান্ত জবাবদিহির কোন অস্তিত্ব না থাকায় আরবদের মাঝে সকল উপায়ে, পন্থায় ও অবাধে পার্থিব ভোগ-বাসনা শক্তিশালী হইয়া উঠে। আর সেই কারণেই তাহাদের মাঝে কামুকতা, বেশ্যাবৃত্তি, ব্যভিচার, পরস্ত্রী গমন, অতি পানবিলাস ও জুয়া ব্যাপক বিস্তার লাভ করে। ৭৫ বহুবিবাহ সীমাহীন হইয়া ওঠে ও নারীর বহু স্বামী রাখাও প্রচলিত হয় (এইক্ষেত্রে একজন নারীর স্বামীর সংখ্যা হইত ১০-এর কম)। এরকম সম্পর্ক হইতে কোন শিশুর জন্মের বেলায়, তাহার মাতা যাকে ঐ সন্তানের পিতা বলিয়া ঘোষণা করিত তাহাকে তাহার পিতৃত্ব স্বীকার করিয়া লইতে হইত। ৭৬ কোন কোন ক্ষেত্রে পুত্রসন্তান লাভের জন্য একজন স্বামী তাহার স্ত্রীকে পরপুরুষগামী হওয়ারও অনুমতি প্রদান করিত। ৭৭
আরব সমাজে নারীর মর্যাদা আদৌ ঈর্ষণীয় ছিল না, যদিও আরব নারী বহু আর্থ-সামাজিক কার্যকলাপে অংশগ্রহণ করিত। কোন কোন ক্ষেত্রে আমরা লক্ষ্য করি, প্রাক-ইসলামী কাব্যে প্রেমিকার প্রতি হৃদয়ের অঢেল, উচ্ছ্বসিত অর্ঘ্য নিবেদন করা হইলেও আরব নারীকে সাধারণত অস্থাবর সম্পত্তি হিসাবে গণ্য করা হইত। একজন পুরুষ কতজন স্ত্রী গ্রহণ করিবে তাহার কোন সীমা ছিল না। পুরুষ তাহার পছন্দমত যত খুশি স্ত্রী গ্রহণ করিতে পারিত। একইভাবে পুরুষ তাহার খেয়াল-খুশিমত যখন তখন স্ত্রীকে তালাক দিত। এই ব্যাপারে কোন বিধিনিষেধ ছিল না। তাই একজন পুরুষ রক্তের সম্পর্ক নির্বিশেষে বিবাহ করিতে পারিত এবং করিতও। অনেক সময় দুই সহোদর বোন এক পুরুষকে স্বামী হিসাবে গ্রহণ করিত। পুত্রেরা তাহাদের সাবেক স্ত্রী ও বিধবাকে (মাতা ছাড়া) বিবাহ করিত। নারী তাহার পূর্বপুরুষ বা স্বামীর সম্পত্তির উত্তরাধিকার লাভ
৭৬ সীরাত বিশ্বকোষ
করিবে এমন কোন বিধিবিধান ছিল না। কন্যা সন্তানের জন্মকে অশুভ বিবেচনা করা হইত, কন্যা সন্তানকে পছন্দ করা হইত না। ৭৮ সবচেয়ে অমানবিক বিষয় এই ছিল যে, বহু আরব ইয্যতের তথাকথিত আশঙ্কা ও দারিদ্র্যের ভয়ে তাহাদের কন্যা শিশু সন্তানকে জীবন্ত কবর দিত। ৭৯ ইসলামের অভ্যুদয়ের প্রাক্কালে এই বর্বর প্রথা মক্কা ও তাহার আশপাশ এলাকায় কিছুটা হ্রাস পায় বলিয়াও মনে করা হয়। তবে আরবের অন্যত্র এই প্রথার প্রচলন ছিল। আল-কুরআনে বলা হইয়াছে, অনেক বহু-ঈশ্বরবাদী ৮০ পরিবারে (مِّنَ الْمُشركين الكثير) এই প্রথা প্রচলিত ছিল। বনু তামীমের কায়স ইবন 'আসিম নবম হিজরীতে ইসলাম গ্রহণ করেন। তাঁহার স্বীকারোক্তি অনুযায়ী, তিনি নিজে ইসলাম গ্রহণের আগে তাঁহার ৮ হইতে ১২টি কন্যাকে জীবন্ত কবর দেন। ৮১
জবাবদিহিতা নাই, এই ধারণার কারণে তৎকালীন আরবে একান্ত নির্বিচারে হত্যার এবং অন্যের সম্পত্তি ও সম্পদ লুটপাট ও চুরির ঘটনা ঘটিত। এইসব অনাচারের একমাত্র প্রতিকার হিসাবে ছিল গোত্র পর্যায়ে প্রতিশোধ ও পাল্টা ব্যবস্থা গ্রহণের রীতি। আরবদের মধ্যে কিছু কুসংস্কার ও বিবেকবর্জিত রীতিরও প্রচলন ছিল। তাহারা গণক ও জ্যোতিষীদের কথায় বিশ্বাস করিত এবং কোন কাজ করিতে হইলে, যেমন বিবাহ বা কোন গন্তব্যে যাত্রার ব্যাপারে কোন নির্দিষ্ট দেবদেবীর মূর্তির সামনে তীর ছুঁড়িয়া বা লটারি করিয়া দৈব পর্যায়ে সিদ্ধান্ত লইত। ব্যাপক পর্যায়ে জুয়া ও লটারির প্রচলন ছিল। কোন একটি বিশেষ জিনিসে, যেমন যবেহ করা পশুর গোশতে তাহাদের ভাগ নির্ধারণ করার জন্য আরবরা লটারী করিয়া বা তীর ছুঁড়িয়া তাহা নির্ধারণ করিত। এই পদ্ধতির আওতায় বণ্টনযোগ্য গোশত বিভিন্ন অসম ভাগে ভাগ করার পর তীরের মথায় কোনটি বেশি পরিমাণ, কোনটির মাথায় কম পরিমাণ লিখিয়া লক্ষ্য বস্তুতে ঐ তীরগুলি ছোঁড়া হইত কিংবা আধুনিক লটারির টিকেটের মত তীরগুলির মধ্য হইতে নির্বিচারে তুলিয়া লইয়া গোশতের ভাগ নির্ধারণ করা হইত।
আরও এক অদ্ভুত আরবীয় রীতির নাম হাবালুল হাবালা। ইহার আওতায় একটি গর্ভবতী উট বিক্রয় করা হইত এই শর্তে যে, উটটি যদি কোন মাদি উট শাবকের জন্ম দেয় এবং উষ্ট্রী আবার গর্ভধারণ করে তাহা হইলে মূল উটের দাম পরিশোধ করিতে হইবে। ৮২ আরও এক কুসংস্কার ও বহু ঈশ্বরবাদী আরব প্রথা ছিল: কোন বিশেষ উট, ছাগল বা ষাঁড়কে আস-সাইবাহ, আল-বাহীরাহ, আল-ওয়াসীলাহ ও আল-হাম নামে অভিহিত করা। যদি কোন উস্ত্রী পরপর ১০টি মাদি শাবক প্রসব করিত এবং ইহার মাঝে কোন পুরুষ শাবক না জন্মিত তাহা হইলে ঐ উষ্ট্রীটিকে নিষেধাত্মক আস-সাইবাহ নামে অভিহিত করা হয়ত। এই উষ্ট্রীটিকে অতঃপর কোথাও ভ্রমণের কাজে বাহন হিসাবে কিংবা বোঝা বহনের কাজে ব্যবহার করা যাইত না। তাহার লোম ছাঁটা যাইত না এবং এই উষ্ট্রীর দুধ একমাত্র মেহমান ছাড়া আর কেহ পান করিতে পারিত না। পরে যদি এই উষ্ট্রী আরেকটি মাদি শাবকের জন্ম দিত তাহা হইলে সেই শাবকটির নাম হইত আল-বাহীরাহ। তাহার বেলায়ও উল্লিখিত বিধিনিষেধগুলি প্রযোজ্য হইত।
হযরত মুহাম্মাদ (স) ৭৭ কোন ছাগী একইভাবে পাঁচবারের গর্ভধারণ সূত্রে দশটি ছাগী শাবকের জন্ম দিলে তাহার বেলায়ও একই বিধিনিষেধ প্রযোজ্য হইত ও তাহার নাম দেওয়া হইত আল-ওয়াসীলাহ। কোন ষাঁড় পরপর দশটি বকনা বাছুরের জন্ম দিলে তাহার বেলায়ও একই বিধিনিষেধ প্রযোজ্য হইত ও তাহার নাম দেওয়া হইত আল-হাম। ৮৩ আল-কুরআন এই ধরনের রীতি-প্রথার প্রতি নিন্দা জ্ঞাপন করিয়াছে। ৮৪ আরবদের এইসব রীতি ও বিশ্বাস, বিশেষত তাহাদের বহু ঈশ্বরে বিশ্বাস, কামুকতা, ব্যভিচার, জুয়াসক্তি, চৌর্যবৃত্তি, লুটপাট, তাহাদের কন্যাসন্তানকে জীবন্ত কবর দান, তাহাদের গোত্রচেতনা ও উত্তেজনা এবং রীতিপ্রথাকে আল-কুরআনে জাহিলিয়্যা বলিয়া উল্লেখ করা হইয়াছে।
এই ছিল তৎকালীন আরবের সমাজ-ধর্মীয় পরিস্থিতির সাধারণ চিত্র। খৃস্টান, ইয়াহুদী, মাযদীয় (জরথুষ্ট্র প্রচারিত ধর্মীয় মতবাদ) ও সাবীয় ধর্মমতও ঐ সময়ে সীমিত আকারে এই উপদ্বীপে প্রবেশ করে। প্রধানত বায়যান্টীয় কর্তৃপক্ষের ইশারা ও উদ্যোগে উত্তরাঞ্চলীয় কিছু আরব গোত্র, বিশেষ করিয়া গাস্সানী ও হিরার অধিবাসীরা খৃস্টধর্ম গ্রহণ করে। হিরা রাজ্যের কোন শাসক খৃষ্ট ধর্মমত গ্রহণ করেন। আরবের দক্ষিণে ইয়ামানে খৃষ্টধর্ম প্রবর্তিত হয় প্রধানত ইয়ামানে আবিসিনীয় বিজয় ও দখলের পর (৩৪০-৩৭৮ খৃ.)। ইয়ামানের পার্শ্ববর্তী নাজরান অঞ্চলে একেশ্বরবাদ ভিত্তিক খৃস্টধর্মের প্রবর্তন করেন সিরিয়া হইতে আগত ফায়মিয়্যু নামে এক মিশনারি। ৮৬ এই এলাকার বেশ কিছু লোক খৃস্টধর্ম গ্রহণ করে। মহানবী-এর আবির্ভার কালেও মক্কায় কিছু কিছু খৃস্টান ছিল আর কিছু কিছু লোক নূতন করিয়া খৃস্টধর্মে দীক্ষাও গ্রহণ করিয়াছিল।
আরব উপদ্বীপে তেমন কেহই এই সময়ে ইয়াহুদী ধর্ম গ্রহণ না করিলেও ইয়াহুদীরা অন্যত্র হইতে এই উপদ্বীপে আগমন করে। এই অভিবাসন প্রধানত দুইটি কালপর্যায়ে অনুষ্ঠিত হয়। একটি কালপর্যায় ছিল ৫৮৭ খৃষ্ট-পূর্বাব্দে ব্যবিলনীয় শাসকের ফিলিস্তীন দখলের পর, আরেকটি ৭০ খৃস্টাব্দে রোমান সম্রাট টাইটাসের ফিলিস্তীন জয় ও জেরুসালেম ধ্বংসের পর। কয়েকটি ইয়াহুদী গোত্র আরবে আগমন করিয়া ইয়াছরিব (মদীনা), খায়বার, তায়মা ও ফাদাকে বসতি স্থাপন করে। তাহারা এখানে আসিয়া ধর্মপ্রচার হইতে পুরাপুরি বিরত থাকে নাই। জনশ্রুতি অনুযায়ী তাহারা এক হিময়ারী শাসককে ইয়াহুদী ধর্মে দীক্ষিত করে। তাহার নাম আবূ কারিব আস'আদ কামিল (তুব্বা') (৩৮৫-৪২০ খৃ.)। উত্তরাঞ্চলে অভিযান চালাইতে মদীনায় আসিলে এই হিময়ারী শাসক ইয়াহুদী ধর্ম গ্রহণ করে। দুইজন ইয়াহুদী ধর্মপ্রচারক ইয়ামানে ইয়াহুদী ধর্ম প্রচারের জন্য তাহার সঙ্গে পাঠানো হয়। ৮৭
ইয়ামানে এই দুই ইয়াহুদী ধর্মপ্রচারক কতদূর সাফল্য লাভ করে তাহা স্পষ্টত জানা যায় না। তবে আস'আদ কামিলের এক বংশধর যূ-নুওয়াস ইয়াহুদী ধর্মের এক বলিষ্ঠ প্রবক্তা হিসাবে নিজেকে প্রমাণিত করে। শুধু ইয়ামানের খৃস্টানদের উপরই নিপীড়ন-অত্যাচার চালায় নাই, বরং নাজরানের খৃস্টানদের মাঝেও গণহত্যা চালায়। এই বর্বর গণহত্যাকালে অগ্নিময়৮৮ গভীর খাদে
৭৮ সীরাত বিশ্বকোষ
বিপুল সংখ্যক খৃষ্টানকে নিক্ষেপ করে। যূ-নুওয়াসের এই অসহিষ্ণুতায় ইয়ামানে বায়যান্টীয় ও আবিসিনীয় সাম্রাজ্যের যৌথ হস্তক্ষেপ ঘটে। ফলে ইয়ামানে যূ-নুওয়াসের শাসনের অবসান ঘটে এবং সে দেশে দ্বিতীয় বারের মত আবরাহার নেতৃত্বে আবিসিনীয় দখলদারিত্বের সূচনা ঘটে। আগেই উল্লেখ করা হইয়াছে যে, আবরাহা গোটা ইয়ামানে খৃস্টধর্ম কায়েমের সংকল্প লইয়া সান'আয় এক বিরাট গির্জা নির্মাণ করে এবং কা'বাগৃহ ধ্বংসের জন্য ৫৭০-৭১ খৃস্টাব্দে মক্কায় এক অভিযানে নেতৃত্ব দেয়।
মাযদাঈ বা জরথুস্ট্রের ধর্ম পারস্যে প্রচলিত ছিল। উপদ্বীপের পূর্ব উপকূল অঞ্চল ও বাহরায়নের কিছু লোক এই ধর্ম গ্রহণ করে। ২২৫ খৃস্টাব্দে পারস্যবাসী ইয়ামান পদানত করিলে সেখানকার কিছু লোক জরথুস্ট্রের ধর্ম গ্রহণ করে। সাবা ধর্ম সম্পর্কে কুরআনে কিছু উল্লেখ আছে। ৮৯ এই ধর্মটি সম্ভবত ব্যবিলন কিংবা দক্ষিণ আরবের কোন প্রাচীন ধর্মবিশ্বাস। এই ধর্মবিশ্বাসীরা জ্যোতিষ্ক-নক্ষত্র পূজা করিত। ইসলামের অভ্যুদয়কালে এই ধর্মমতে বিশ্বাসীদের সংখ্যা খুব বেশি ছিল না। যাহা হউক, এই ধর্মটি আরব উপদ্বীপে বিজাতীয় ধর্মবিশ্বাস বলিয়া গণ্য ছিল। ইহার কারণ হিসাবে উল্লেখ করা যায় যে, কোন আরব তাহার পূর্বপুরুষের অনুসৃত ধর্ম পরিত্যাগ করিলেই তাহাকে বলা হইত, সে সাবী ধর্মাবলম্বীতে পরিণত হইয়াছে। ৯০
অবশ্য এইসব ধর্ম সাধারণভাবে আরবদের জীবন ও সমাজে তেমন প্রভাব বিস্তার করিতে সক্ষম হয় নাই। বিশেষত খৃস্টান ও ইয়াহুদীরা তাহাদের মধ্যে হানাহানি, অসহিষ্ণুতা, মতবিরোধ এবং ঈসা ('আ) ও মূসা ('আ)-এর মূল শিক্ষা হইতে বিচ্যুত হইবার কারণে তাহাদের অবস্থান দুর্বল করিয়া ফেলে। প্রজ্ঞার অধিকারী আরব খৃস্টানদের কাছে যীশু ও মেরির মূর্তিপূজা ছাড়া এবং খৃস্টান অবতারবাদ ও ত্রিত্ববাদ কতগুলি মূর্তিকে একত্রে পূজা করা ও আল্লাহকে সর্বোচ্চ প্রভু হিসাবে স্বীকৃতি দেওয়া বৈ কিছুই মনে হয় নাই। ইয়াহুদী ধর্মের বেলায়ও পরিস্থিতি একই রকম ছিল। এই ধর্ম একান্তভাবে বিচ্ছিন্ন। এই ধর্মেও উযায়রকে ঈশ্বরের পুত্র হিসাবে দাবি করা হইয়াছে। আর তাই এই ধর্মও দৃশ্যত সমান বহু ঈশ্বরবাদী। ইসলামের অভ্যুদয়ের ঠিক আগে বেশ কিছু লোক ইবরাহীম ('আ)-এর সত্যিকার ধর্মবিশ্বাসের সন্ধানে বাহির হইয়া আসে এবং তাহারা হানীফ নামে পরিচিত হয়। ৯১ এই লোকগুলির আবির্ভাবকে যদি আমরা ইবরাহীম ('আ)-এর ধর্মবিশ্বাসের ধারার অস্তিত্ব এবং আরবে খৃস্টান ও ইয়াহুদীদের অবস্থানের মধ্যে মিথস্ক্রিয়ার ফল বলিয়াও মনে করি তাহা হইলেও হানীফরা কার্যত সকলেই এই উভয় ধর্মের দিক হইতে তাহাদের মুখ ফিরাইয়া লইলেও তাহাতেই বোঝা যায় যে, তাহারা সমসাময়িক কালের প্রজ্ঞার অধিকারী আরব মানসে তেমন প্রতিক্রিয়ার সৃষ্টি করিতে ব্যর্থ হয়।

টিকাঃ
৪৭. Ismail Razi al-Faruqi and Lois Lamya al-Faruqi, The Cultural Atlas of Islam, New York 1986, p. 83.
৪৮. বুখারী, নং, ৩৫২১, ৪৬২৩-৪৬২৪; মুসলিম, নং ২৮৫৬; মুসনাদ (২য় খণ্ড), ২৭৫-২৭৬; (৩য় খণ্ড), ৩১৮, ৩৫৩, ৩৭৪; (৫ম খণ্ড), ১৩৭।
৪৯. ইবন হিশাম, (১ম খণ্ড), ৭৭। আল-কালবীর বর্ণনা অনুসারে, 'আমর একবার গুরুতর অসুস্থ হওয়ায় কোন এক ব্যক্তি তাহাকে সিরিয়ার একটি প্রস্রবণে গোসল করার পরামর্শ দেয়। ঐ ব্যক্তি জানায়, প্রস্রবণের পানিতে গোসল করিলে আমর নিরাময় লাভ করিবে। পরামর্শ অনুযায়ী আমর সিরিয়ায় গিয়া ঐ প্রস্রবণের পানিতে গোসল করার পর আরোগ্য লাভ করে। ঐ সময় সে লক্ষ্য করে যে, সেখানকার লোকজন মূর্তিপূজা করিতেছে। লোকজনের নিকট সে ইহার কারণ জানিতে চাহে। ইবনুল কালবী, কিতাবুল আসনাম, সম্পা, আহমাদ যাকী পাশা, কায়রো ১৩৪৩/১৯২৪, পৃ. ৮।
৫০. Hitti, History of the Arabs, 1980, reprint, p. 100 and n. 2.
৫১. ইব্‌ন হাজার, ফাতহুল বারী (৬ষ্ঠ খণ্ড), ৬৩৪।
৫২. কুরআন, ৭১: ২৩।
৫৩. আলোচনার জন্য দ্র. First Encyclopaedia of Islam, 1913-1936, I, 379-380; A. Yusuf Ali, The Holy Quran, text, Translation and Commentary, Islamic Foundation, Liecester, 1975, pp. 1619-1623 (Appendix XIII of Surah 71).
৫৪. বুখারী, নং ৪৯২০।
৫৫. ইব্‌ন হিশাম, (১ম খণ্ড), ৭৭।
৫৬. ইব্‌ন হিশাম, ১ম খণ্ড, ৮২; ইবনুল কালবী, প্রাগুক্ত, ৯ম খণ্ড, ২৯।
৫৭. ইবনুল কালবী, প্রাগুক্ত, ১৬, ১৭। First Encyclopaedia of Islam (Vol. I, 380-এর লেখকের মতে, আরবের দেবতা আল-লাত গ্রীক দেবী লেটো, সূর্য দেবতা অ্যাপেলোর মাতার উৎস।
৫৮. ইব্‌ন হিশাম, ১ম খণ্ড, ৮৩; ইবনুল কালবী, প্রাগুক্ত, ১৮।
৫৯. কুরআন, ৫৩: ১৯-২০।
৬০. ইব্‌ন হিশাম, ১ম খণ্ড, ৮৩-৮৯, ইবনুল কালবী, প্রাগুক্ত, ৩০, ৪৪-৪৭।
৬১. ইব্‌ন হিশাম, ১ম খণ্ড, ৭৮-৮৩।
৬২. কুরআন, ২৩: ৮৪-৮৯; ৩১: ২৫।
৬৩. কুরআন, ১০: ২২; ৩১: ৩২।
৬৪. কুরআন, ৬ঃ ১০৯।
৬৫. দৃষ্টান্তস্বরূপ দ্র. F.V. Winnet, Allah before Islam, M.W, XXVIII (1938), 239-248.
৬৬. p. K. Hitti-এ সব উৎকীর্ণ লিপি, কুরআনের কিছু সংশ্লিষ্ট আয়াত এবং কুরায়শদের মাঝে ‘আবদুল্লাহ, এই নামের অস্তিত্ব থাকার বিষয় উল্লেখের পর বলিয়াছেন, “স্পষ্টতই আল্লাহ কুরায়শদের গোত্র দেবতা ছিলেন” (Hitti, op. cit., 101)। তাহার এই মন্তব্য একদিকে বিভ্রান্তিকর ও অন্যদিকে অগ্রহণযোগ্য। কারণ তিনি যেসব উৎকীর্ণ লিপির কথা বলিয়াছেন সেগুলি কুরায়শদের নয়। আবার ‘আবদুল্লাহ নামটিও একান্তভাবে তাহাদের নয়। কুরায়শদের বাহিরেও এই নামের অনেক দৃষ্টান্ত আছে। তাহাদের কথা তো বলা বাহুল্য, মদীনার মুনাফিকদের নেতার নামই ছিল 'আবদুল্লাহ ইবন উবাই!
৬৭. বুখারী, নং ৩৮৩১।
৬৮. مَا نَعْبُدُهُمْ إِلا لِيُقَرِّبُونَا إِلَى اللَّهِ زُلْفَى وَيَقُولُونَ هَؤُلاءِ شُفَعَاؤُنَ عِنْدَ اللَّهِ 1
৭০. ১৬:৫৭ وَيَجْعَلُونَ لِلَّهِ الْبَنَاتِ আরও দ্র. ৩৭: ১৪৯-১৫৪; ৪৩: ১৬; ৫২: ৩৯।
৭১. কুরআন, ৬: ১৩৬।
৭২. ইব্‌ন হিশাম, ১ম খণ্ড, ৭৮।
৭৩. وَمَا يُؤْمِنُ أَكْثَرُهُمْ بِاللَّهِ إِلَّا وَهُمْ مُشْرِكُونَ 200 : 21 90
৭৪. اِنْ هِيَ اِلَّا حَيَاتُنَا الدُّنْيَا نَمُوتُ وَنَحْي وَمَا نَحْنُ بِمَبْعُوثِينَ 09 : 20 Para 98
বাস্তবিকপক্ষে কুরআনে এরকম বহু আয়াত আছে যেগুলি অবিশ্বাসীদের এই ধারণার উল্লেখ করিয়াছে। দৃষ্টান্তস্বরূপ দ্র. ৬: ২৯; ১৭: ৪৯; ১৭: ৯৮; ২৩: ৩৫; ২৩: ৮২; ৩৭: ১৬; ৩৭: ৫৩; ৩৭: ৫৮-৫৯; ৪৪ : ৩৫; ৫০: ৩; ৫৬: ৪৭ ও ৬৪: ৭। অনুরূপভাবে আল-কুরআনে বহু বিশদ আয়াত রহিয়াছে পুনরুত্থান ও আল-হাশরের দিন সম্পর্কে।
৭৫. আল-কুরআন এই প্রথার নিন্দা জ্ঞাপন করিয়া ইহাকে নিষিদ্ধ করিয়াছে (দ্র. ৫: ৩; ৫: ৯০; ১৭ঃ ২৩; ২৪ঃ ২-৩; ২৫ঃ ৬৮ ও ৬০: ১২)।
৭৬. বুখারী, নং ৫১২৭।
৭৭. প্রাগুক্ত।
৭৮. কুরআন, ১৬:৫৮-৫৯।
৭৯. কুরআন, ৬: ১৩৭; ৬: ১৫১।
৮০. কুরআন, ৬: ১৩৭।
৮১. আন-নুমায়রী (আল-বাশ্রী) আবূ যায়দ উমার ইব্‌ন শাববাহ (১৭৩-২৬২ হি.), তারীখুল মাদীনাতিল মুনাওয়ারাহ, সম্পা. এফ. এম. শালতৃত, ২য় ভাগ, ২য় মুদ্রণ, মদীনা, তা.বি., পৃ. ৫৩২; উসদুল গাবা, ৪র্থ খণ্ড, ২২০; আল-ইসাবা, ৩য় খণ্ড, ২৫৩ (নং ৭১৯৪)। আরও দ্র. আদ-দারিমী, ১ম খণ্ড, ভূমিকা, পৃ. ৩-৪।
৮২. বুখারী, নং ৩৮৪৩। মহানবী এই ধরনের লেনদেন নিষিদ্ধ করেন।
৮৩. ইব্‌ন হিশাম, ১ম খণ্ড, ৮৯।
৮৪. কুরআন, ৫: ১০০; ৬: ১৩৯।
৮৫. কুরআন, ৩: ১৫৪; ৫: ৫০; ৩৩: ৩৩; ৪৮: ২৬; এবং বুখারী, নং ৩৫২৪।
৮৬. ইব্‌ন হিশাম, ১ম খণ্ড, ৩১-৩৪।
৮৭. ইব্‌ন হিশাম, ১ম খণ্ড, পৃ. ২৬-২৭।
৮৮. এই ঘটনার উল্লেখের জন্য দ্র. কুরআন, ৮৫ : ৪।
৮৯. কুরআন, ২৪: ৬২; ৫৪: ৬৯; ২২: ১৭।
৯০. বুখারী, নং ৩৫২৩; মুসনাদ, ৩য় খণ্ড, পৃ. ৪৯২; ৪র্থ খণ্ড, পৃ. ৩৪১; ইব্‌ন হিশাম, ১ম খণ্ড, পৃ. ৩৪৪।
৯১. নিম্নে দ্র., অধ্যায় ৮, ১ম ভাগ।


আরবদের খাদ্য ছিল উট, ছাগল ও ভেড়ার গোশত ও দুধ। সর্বোপরি তাহাদের প্রধান খাদ্য ছিল খেজুর। বস্তুত খেজুর ও দুধই ছিল আরবদের সাধারণ খাদ্য। আরব উপদ্বীপের বিভিন্ন স্থানে খেজুর প্রচুর পরিমাণে উৎপাদিত হইত (এখনও হইয়া থাকে)। কেবল মদীনা ও তাহার আশপাশ এলাকায় প্রায় এক শত জাতের খেজুরের চাষ হইত। আরবের অন্যান্য কৃষিজাত ফসল ছিল গম, যব ও কোন কোন স্থানে জনার বা জোয়ার। ইয়ামানে সুগন্ধি ধুনা, আসীর অঞ্চলে আরবী গঁদ এবং তায়েফের উর্বর মৃত্তিকা অঞ্চলে আঙুর, বেদানা, আপেল, খোবানি ও তরমুজ উৎপাদিত হইত।
মহানবী তায়েফ হইতে তাঁহার ধর্মপ্রচার মিশন হইতে ফিরিবার পথে মক্কার দুই নেতা রাবী'আর পুত্র উত্তবা ও শায়বার এক দ্রাক্ষাবাগানে বিশ্রাম লইয়াছিলেন। ওমান ও আল-হাসায় কিছু ধানও উৎপাদিত হইত। ইংরেজি রাইস (rice) শব্দটি মূলত আরবী রুয (رز) শব্দ হইতে উদ্ভূত। আল-কুরআনে উল্লেখ পাওয়া যায় যে, প্রাক-ইসলামী আরবরা রীতি অনুযায়ী তাহাদের প্রত্যাশিত ফসল ও গবাদি পশু সম্পদের একাংশ (আল-হারছ ওয়াল-আন'আম) তাহাদের দেবদেবীর জন্য এবং অতি সামান্য অংশ আল্লাহর জন্য রাখিয়া দিত। উট, ছাগল ও ভেড়ার মত গৃহপালিত পশু ছাড়াও ঘোড়ার কথা বিশেষভাবে উল্লেখযোগ্য। বস্তুত আরবী ঘোড়া অত্যন্ত উন্নত জাত ও উৎকর্ষের জন্য এখনও বিখ্যাত। উট আরবের সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ, প্রয়োজনীয় ও উপকারী প্রাণী। উট ছিল আরবদের গোস্ত ও দুধের প্রধান উৎস। ইহা ছাড়াও উটের চামড়ায় তাহাদের তাঁবু ও আশ্রয় তৈরি হইত। ঊষর ও বৈরী মরুপথে উটই ছিল তাহাদের প্রধান বাহন। উট এমনিভাবে সৃষ্ট এক প্রাণী যাহা শীতের দিনে মরুভূমির মধ্য দিয়া একটানা পঁচিশ দিন ও গ্রীষ্মে পাঁচদিন পানি গ্রহণ না করিয়া চলিতে পারে। উটের শরীরও মুরুঝড় সাইমুম ও বালিঝড়ে টিকিয়া থাকার মত করিয়াই সৃষ্ট। আল্লাহ্র অন্যান্য অসাধারণ সৃষ্টিসমূহের মধ্যে এই লক্ষণীয় সৃষ্টির প্রতিও আল-কুরআন মনোযোগ আকর্ষণ করিয়াছে। আরবদের সম্পদের পরিমাণ নিরূপণ করা হইত তাহাদের উটের সংখ্যার মালিকানা অনুসারে। বিবাহের কনের জন্য যৌতুক, রক্তপণ এবং আরও অনেক লেনদেন পরিচালিত হইত উটের সংখ্যার মাধ্যমে, যদিও মুদ্রা, যেমন দীনার ও দিরহাম অপরিচিত ছিল না। বস্তুতপক্ষে মুদ্রা ব্যবহৃত হইত ব্যবসায়-বাণিজ্য ও আর্থিক লেনদেনে। বিভিন্ন জাতের ও বয়সের উটের জন্য আরবী ভাষায় প্রায় এক হাজার শব্দ রহিয়াছে।
আরব জনসমষ্টির ও অর্থনীতির (কৃষি ও বাণিজ্য) দ্বৈত বৈশিষ্ট্যের সহিত মিল রাখিয়া ইসলামের অভ্যুদয়ের আগে আরবদের ধর্মবিশ্বাস ও রীতিপ্রথার মধ্যে দ্বৈততা লক্ষ্য করা যায়। তাহাদের ধর্মীয় বিশ্বাস ও রীতির মৌলিক বৈশিষ্ট্য হইল—তাহাতে ইবরাহীম ('আ)-এর ঐতিহ্যের সুনিশ্চিত অস্তিত্ব। ঐ সময়ের বা পরবর্তী কালের অন্য কোন জনসমষ্টিই ইব্রাহীমি ধারাকে এত ভালো ও নিবিড়ভাবে স্মরণ ও ধারণ করিয়া রাখে নাই। তবুও যুগপৎ ইহাও সত্য যে, তাহারা বহু ঈশ্বরবাদ ও মূর্তিপূজায় বিশ্বাসী হইয়া পড়ে এবং ইহার সহিত যত রকম কুপ্রথা ও কুসংস্কার সম্ভব তাহাও তাহাদের মাঝে প্রবেশ করে।
বাস্তবিকপক্ষে ইসমাঈল ('আ)-এর বংশধরগণ তাঁহার পিতা ইব্রাহীম ('আ)-এর প্রবর্তিত ধর্মবিশ্বাস ও ধর্মাচরণ রীতি পালন করিয়া যাইতে থাকে। অবশ্য কয়েক শতাব্দীর কালপরিক্রমায় ক্রমেই তাহারা তাহাদের মূল ধর্মবিশ্বাস হইতে বিচ্যুত হইতে থাকে এবং দুঃখ-দুর্দশার সময়ে বা কোন অন্যায়ের প্রতিকার পাওয়ার জন্য সহজে নাগালে পাওয়া যায় এমন দেবতার সান্নিধ্য লাভ, কোন বীর বা পূর্বপুরুষকে দেবত্ব আরোপ, প্রকৃতির প্রচণ্ড প্রতিকূলতার মুখে অসহায়ত্বে সান্ত্বনা, সর্বোপরি তৎকালে বুদ্ধিবৃত্তিক, দৈহিক ও বৈষয়িক দিক হইতে শ্রেষ্ঠ গণ্যদের রীতি-নীতির প্রভাবে স্থূল মননের স্বাভাবিক প্রবণতার শিকার হয়। অতীতে যেসব 'সভ্য' জনসমষ্টি আরবদের চারিদিক পরিবেষ্টন করিয়া ছিল তাহারা ও সমসাময়িক অন্যান্য জনসমষ্টির সকলেই আচ্ছন্ন ছিল কোন না কোনভাবে একই বহু ঈশ্বরবাদী বিশ্বাস ও আচরণে। ডঃ ইসমাঈল রাযী আল-ফারূকী বলিয়াছেন, “প্রাক-ইসলামী যুগের আরবরা যেখানেই গিয়াছে সেখানেই তাহারা স্রষ্টার উত্তরণের ধারা লঙ্ঘন লক্ষ্য করে। এখন যেসব আরবের মাঝে এই প্রবণতা সুপ্ত ছিল তাহারা প্রতিবেশী দেশ ও জনপদে তাহাদের প্রবণতার সমর্থন পাইয়া আরও বলিষ্ঠ হইয়া উঠে এবং ঐ পড়শীদের দৃষ্টান্তের অনুসরণ করে। এইভাবে তাহাদের বায়যান্টীয় খৃস্টান পড়শীরাই তাহাদের কাছে কা'বাঘরের সংরক্ষণ করার জন্য দেবদেবীতুল্য মানবমূর্তি বিক্রয় করে। বনু খুযা'আ গোত্র মক্কা দখলের পর, বিশেষত তাহাদের নেতা 'আমর ইব্‌ন লুহায়্যি সেখানে বহু ঈশ্বরবাদী ধর্মমত প্রবর্তন করে। ইব্‌ন হিশামের বর্ণনা অনুযায়ী, 'আমর একবার সিরিয়ায় যাইয়া লক্ষ্য করে, সেখানকার লোকজন মূর্তিপূজা করিতেছে। সে তথাকার লোকজনের নিকট ইহার কারণ জানিতে চাহিলে তাহারা জানায়, মূর্তিপূজা করিলে বৃষ্টিপাত ঘটে, ফসলের সুবিধা হয়, যুদ্ধে বিজয় লাভ করা যায়। মূর্তির কাছে এইসব বিষয়ে প্রার্থনা করিলে সুফল লাভ হয়। 'আমর ইহাতে মুগ্ধ হইয়া তাহাকে এই ধরনের একটি মূর্তি দেওয়ার জন্য তাহাদেরকে অনুরোধ জানায় যাহাতে তাহার আরব লোকজন মূর্তিপূজা করিতে পারে। এই অনুরোধে 'আমরকে তাহারা যে মূর্তিটি দেয় তাহার নাম হুবাল। 'আমর এই মূর্তিটি মক্কায় লইয়া আসে। সে মক্কার লোকজনকে এই মূর্তির পূজা করিতে বলে। নেতা ও বিজ্ঞ ব্যক্তি হিসাবে গণ্য আমরের কথায় তাহারা ঐ মূর্তির পূজা শুরু করিয়া দেয়।
আরও এক বিবরণ অনুসারে, 'আমর ইব্‌ন লুহায়্যি ওয়াদ্দ, সুওয়া, ইয়াগৃছ, ইয়াউক ও নাসর দেবতারও পূজার প্রবর্তন করে। এইসব দেবমূর্তির একদা পূজা করিত নূহ নবীর অবিশ্বাসী জনসম্প্রদায়। কথিত আছে, এক জিন 'আমরকে এই মর্মে সংবাদ দেয় যে, এই দেবমূর্তির সন্ধান পাওয়া যাইবে জেদ্দার অমুক স্থানে। জিন তাহাকে ঐসব মূর্তি সেখান হইতে আনিয়া সেসবের পূজা করার জন্য বলে। 'আমর সেই অনুযায়ী জেদ্দায় যাইয়া নির্দিষ্ট স্থানে মূর্তিগুলি দেখিতে পায়। সে সেগুলিকে মক্কায় আনিয়া স্থানীয় লোকজনকে সেগুলির পূজা করার জন্য নির্দেশ দেয়। এই দেবমূর্তিগুলির সত্যসত্যই নূহ ('আ)-এর জনসম্প্রদায় পূজা করিত। কেননা কুরআনে পরিষ্কার উল্লেখ রহিয়াছে যে, তাহারা জ্যোতিষ্ক পূজায় বিশ্বাসী এক ধরনের ধর্মমতবাদী সম্প্রদায় কিংবা তাহারা প্রাকৃতিক শক্তি পূজা কিংবা কোন মানবিক গুণ বা উৎকর্ষে দেবত্ব আরোপে বিশ্বাসী। এই ধরনের জনসম্প্রদায়ের অস্তিত্ব ছিল নূহ নবীর ('আ) লোকজনের দেশ প্রাচীন আসিরিয়া ও বাবিলোনিয়ায়। ইব্‌ন আব্বাস (রা)-এর বলিয়া কথিত এক বিবরণের বরাতে বলা হইয়াছে, দেবমূর্তির নামগুলি প্রকৃতপক্ষে নূহ ('আ)-এর সম্প্রদায়ের কিছু বিশিষ্ট ব্যক্তির নাম, যাহাদের উপর পরবর্তী কালে দেবত্ব ও মাহাত্ম্য আরোপ করিয়া তাহাদের মূর্তি গড়িয়া পূজা করা হয়। আবারও এসব বিবরণে একদিকে ইসমাঈলের বংশধররা কেমন করিয়া ক্রমে ক্রমে তাহাদের পূর্ববর্তী ও অন্যান্যদের বহু ঈশ্বরবাদে লিপ্ত হয় এবং এই প্রক্রিয়ায় 'আমর ইব্‌ন লুহায়্যির ভূমিকা গুরুত্ব সহকারে উল্লেখ করা হইয়াছে।
বহু ঈশ্বরবাদের একবার সূচনা হওয়ার পর নানা আকার ও প্রকারে আরবদের মধ্যে বহু ঈশ্বরবাদী আচার-রীতি অনুপ্রবেশ করে। ইবন ইসহাক প্রস্তর পূজার এই বিস্তৃতির কারণ ব্যাখ্যা করিয়াছেন। তিনি বলিয়াছেন, ইসমাঈল ('আ)-এর বংশধরগণ যখন নানা কারণে মক্কা হইতে অন্যত্র বাহিরে ছড়াইয়া পড়িতে বাধ্য হয় তখন তাহাদের প্রতিটি জনগোষ্ঠী মক্কা ত্যাগের আগে পবিত্র কা'বাগৃহের এক টুকরা করিয়া পাথরের খণ্ড কা'বার স্মৃতিচিহ্নস্বরূপ তাহাদের সঙ্গে করিয়া লইয়া যায়। ইহার পর তাহারা যেখানে তাহাদের নূতন বসতি স্থাপন করে সেখানে কোন এক উপযুক্ত জায়গায় এই পাথরের খণ্ডগুলি রাখিয়া কা'বাগৃহের মত প্রদক্ষিণ করার একটা রেওয়াজ গড়িয়া তোলে এবং স্থানটি তাহাদের নিকট বিশেষ পবিত্রতার প্রতীক হিসাবে গণ্য হয়। ক্রমে তাহাদের বংশধরগণ এইসব পাথরকে পূজা করাই কেবল শুরু করে নাই, তাহারা যে কোন বিশেষ পাথরেরও পূজা করিতে থাকে। এইভাবে তাহার। ইবরাহীমের আদি ধর্ম বিস্মৃত হয় এবং তাহাদের ধর্মাচরণ পাথর ও মূর্তিপূজায় পর্যবসিত হয়।
চূড়ান্ত পর্যায়ে তাহাদের প্রতিটি গোত্র ও গোষ্ঠীর জন্য এবং বাস্তবিকপক্ষে প্রতিটি পরিবারের জন্য বিশেষ দেবদেবীর মূর্তির প্রচলন হয় যাহা তাহারা পূজা করিতে থাকে। মহানবী-এর আবির্ভাবের প্রাক্কালে আনুমানিক ৩৬০টি মূর্তি কা'বাগৃহের মধ্যে ও আশেপাশে স্থাপিত ছিল। এইগুলির মধ্যে সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ মূর্তিটি ছিল হুবালের। মনুষ্যাকৃতির এই বিরাট মূর্তির একটি হাত ভাঙ্গিয়া যাওয়ায় কুরায়শরা উহা স্বর্ণ দিয়া পুনঃনির্মাণ করে। কা'বার আঙিনায় রাখা আরও দুইটি মূর্তির নাম আগেই বলা হইয়াছে: ইসাফ ও নাইলা। এই দুই মূর্তি মূলত যমযম কূপের স্থানটিতে স্থাপিত ছিল। পরে এই দুইটি মূর্তি সাফা ও মারওয়া পাহাড়ের কাছাকাছি কোথায়ও স্থানান্তরিত করা হয়। প্রাক-ইসলামী বিশ্বাস অনুযায়ী, ইসাফ ও নাইলা ছিল আসলে বনূ জুরহুম গোত্রের এক পুরুষ ও এক নারীর প্রতিকৃতি যাহারা কা'বার ঐ স্থানটিতে যৌন সংসর্গে লিপ্ত হইয়া কা'বার পবিত্রতা নষ্ট করায় তাহারা পাথরে পরিণত হয়।
কা'বাঘরকে তাহাদের অসংখ্য দেবদেবীর মূর্তিনিবাস করিয়া তোলা ছাড়াও আরবরা বলিতে গেলে দেশের বিভিন্ন স্থানে কয়েকটি গৌণ কা'বাও (তাওয়াগীত) গড়িয়া তোলে। আর সেগুলির প্রতিটির জন্য একেকটি অধিষ্ঠাতা বা অধিষ্ঠাত্রী দেবদেবী নির্ধারণ করা হয়। আরবরা বিভিন্ন নির্ধারিত সময়ে এইসব ধর্মীয় স্থলে উপস্থিত হইয়া সেগুলি প্রদক্ষিণপূর্বক সেখানে পশু বলি দিত এবং অন্যান্য বহু ঈশ্বরবাদী আচার-রীতি পালন করিত। এইসব ধর্মীয় স্থলের মধ্যে সর্বাপেক্ষা গুরুত্বপূর্ণ ছিল তায়েফের আল-লাত, নাখলা-এর আল-উয্যা ও কুদায়দের নিকট আল-মানাত মন্দির। এইসব মন্দিরের দেবদেবীর আদি উৎস অনিশ্চিত। ইবনুল কালবী বলেন, আল-লাত মানাত অপেক্ষা পরবর্তী কালের, আল-'উয্যা আল-লাত ও আল-মানাতের পরবর্তী কালের। কিন্তু তিন দেবমূর্তির মধ্যে আল-'উয্যা সর্বকনিষ্ঠ হইলেও কুরায়শদের কাছে আরবের সকল মূর্তির মধ্যে সবচেয়ে মহৎ (আ'যম) ও গুরুত্বপূর্ণ মূর্তি। কুরায়শ ও কিনানা গোত্রও এই দেবমূর্তির সেবায়েত ও রক্ষণাবেক্ষণকারী ছিল। আল-কুরআনে সুনির্দিষ্টভাবে আরবদের এই তিন দেবীর কথা উল্লেখ রহিয়াছে। আরও কিছু আধা বা নিম-কা'বার মত ধর্মস্থল ছিল আরবদের। এইগুলির মধ্যে ছিল তাবালাহের যুল-খালাসা (মক্কা হইতে সাত রজনীর যাত্রাপথ), তাঈ পর্বতের মধ্যে অবস্থিত ফিল্স, ইয়ামান-এর সানায় অবস্থিত রিয়াম, বনূ রবী'আ ইবন কা'ব অঞ্চলে রুজ্জা, বনূ বাক্স ও বনূ তাগলিবের সিনাদাদের কয়েকটি কা'বা (যুল-কা'বাত) এবং নাজরানের বনুল হারিছের কা'বা।
এইসব গৌণ কা'বা ছাড়াও আরব উপদ্বীপের বিভিন্ন স্থানে আরও বিক্ষিপ্তভাবে কিছু কিছু বিশেষ দেবতার কয়েকটি অধিষ্ঠানস্থল ছিল। এইগুলির মধ্যে উল্লেখযোগ্য: রুহাতে (ইয়ানবু'), সুয়ার মন্দির, দুমাতুল জানদালের ওয়াদ্দ, জুরাশের ইয়াগুছ (বনূ তাঈ অঞ্চলে), ইয়ামানের হামদানের ইয়াউক (সানা হইতে উত্তরে দুই রজনীর পথ), ইয়ামানের হিময়ারী অঞ্চলে (বালখা') নাস্ত্র এবং খাওলানের উমায়নিস বা 'আম আনাস ও তানুফার সা'দ।
প্রাক-ইসলামী আরবরা এইসব মূর্তির অথবা নানাভাবে বিভিন্ন দেবদেবীর পূজা করিত। তাহারা এইসব দেবদেবীর কাছে ঐকান্তিকও সানুনয় প্রার্থনা নিবেদন করিত, তাহাদের সম্মুখে নতজানু হইত, অর্ঘ্য-নৈবেদ্য দিত, তাহাদের অনুগ্রহ ও আনুকূল্য প্রার্থনা করিত এবং এই বিশ্বাসে তাহাদের প্রীতি ও অনুগ্রহ উৎপাদনে প্রয়াসী হইত যে, তাহারা তাহাদের কল্যাণ ও অকল্যাণ সাধনে সক্ষম। আরবরা এই সব দেবদেবীর উদ্দেশ্যে নিবেদিত বেদীমূলে পশু উৎসর্গ করিত, তাহাদের মন্দিরে দেবতার অধিষ্ঠানস্থল প্রদক্ষিণ করিত এবং ভাগ্য নির্ধারক তীর বাছিয়া লইত। এই কাজটি দেবমন্দিরেও করা হইত। তাহারা এইসব দেবদেবীর নামে নিজেদের নামও রাখিত। যেমন 'আব্দ ইয়াগৃছ, 'আবদুল 'উয্যা ইত্যাদি। তবে এমনি করিয়া বহু ঈশ্বরবাদ ও মূর্তিপূজায় মগ্ন হইলেও প্রাক-ইসলামী আরবরা প্রাচীন গ্রীক বা হিন্দুদের মত কোন জটিল ও সুবিস্তৃত পৌরাণিক কাহিনী কিংবা দেবদেবীকে কেন্দ্র করিয়া কোন ধর্মতত্ত্বও গড়িয়া তুলে নাই। প্রাক-ইসলামী কাব্য ও জনশ্রুতিমূলক সাহিত্যেও এই ধরনের কোন উপাদানের সন্ধান মিলে না। ইহা হইতে আরও বুঝা যায় যে, বহু ঈশ্বরবাদ ও মূর্তিপূজা ইসমাঈলীয় আরবদের একান্ত স্বকীয় কিছু ছিল না, বরং এইগুলি ইবরাহীম ('আ)-এর ধারার উপর চাপাইয়া দেওয়া হইয়াছে।
বিষয়টির সর্বোত্তম প্রমাণ রহিয়াছে, আরবদের বহু ঈশ্বরবাদী বিশ্বাসের আচার-রীতির জটাজুটের মধ্যেও ইবরাহীম ('আ) প্রবর্তিত বিশ্বাসের ধারার অভ্রান্ত চিহ্নাবশেষ। এইগুলির মধ্যে সবচেয়ে উল্লেখযোগ্য হইল, সর্বশক্তিমান ও সর্বশ্রেষ্ঠ আল্লাহ্র অস্তিত্বে বিশ্বাস। আর সেই সহিত আরবরা ফেরেশতা ও জিনের অস্তিত্বেও বিশ্বাসী ছিল। মহাদুর্যোগের সময় প্রাক-ইসলামী আরবরা, এমনকি সরাসরি আল্লাহ্র অপার করুণা এবং সাহায্য প্রার্থনাও করিত। তাহারা কখনও কখনও আল্লাহর নামে শপথও করিত। আর প্রায়ই তাহারা তাহাদের নামে আল্লাহ শব্দটি যুক্ত করিয়া রাখিত। যেমন, দৃষ্টান্তস্বরূপ 'আবদুল্লাহ' এই প্রাক-ইসলামী' নামটির কথা উল্লেখ করা যায়। বিশেষত, সাম্প্রতিক কালে উত্তর আরব অঞ্চলে বেশ কিছু উৎকীর্ণ লিপি উদ্ধার করা হইয়াছে। তাহাতে কিছু আল্লাহ শব্দযুক্ত নাম পরিলক্ষিত হইয়াছে। এই উৎকীর্ণ লিপিগুলির সবই ইবরাহীমের পরবর্তী আমলের। এই উৎকীর্ণ লিপিগুলি আরবদের মাঝে অতি প্রাচীন কাল হইতেই আল্লাহ সম্পর্কিত ধারণার অস্তিত্ব থাকার সন্দেহাতীত প্রমাণ। ইবরাহীমের ধারার অন্যান্য অবশেষ হইল, মক্কার কা'বার প্রতি (প্রাক-ইসলামী) আরবদের সার্বজনীন শ্রদ্ধাবোধ, কা'বা প্রদক্ষিণ (তাওয়াফ), উমরাহ পালন, হজ্জ পালন ও হজ্জের সহিত সম্পর্কিত অন্যান্য ইবরাহিমীয় রীতি-প্রথা পালন। যেমন আরাফাতের ময়দানে দণ্ডায়মান হওয়া, মুজদালিফায় বিরতি, মীনায় অবস্থান, মীনায় থাকাকালে পশু কুরবানী, সাফা ও মারওয়া পাহাড়দ্বয়ের মধ্যে সাতবার দৌড়াইয়া যাওয়া-আসা, মাথা কামানো ইত্যাদি। ইহা ছাড়া খতনা করানো ও 'আশূরার দিনে রোযা রাখা ইবরাহীম ('আ)-এর প্রবর্তিত রীতি। এইগুলি আরবরা সর্বজনীনভাবে পালন করিয়া থাকে।
বহু ঈশ্বরবাদী বিশ্বাস ও রীতি প্রথার সহিত শত শত বৎসরের ইবরাহীমি ধারার সহাবস্থান সত্ত্বেও অবশ্য আরবে শেষ পর্যন্ত কোন মিশ্র ধর্মতত্ত্ব গড়িয়া উঠে নাই। যে চিত্র ইহা হইতে ফুটিয়া উঠে তাহাকে বলা যায়, কতগুলি বিশ্বাসের জগাখিচুড়ি মাত্র। আর তাহার সহিত ঐ অসামাঞ্জস্যপূর্ণ বিশ্বাস সমাবেশজাত কিছু উপজাত উপাদান। এই ধরনেই এক উপজাত প্রাক-ইসলামী আদর্শ হইল: দেবদেবীর পূজার মাধ্যমে তাহারা আল্লাহ্ আরও নৈকট্য লাভ করিতে পারিবে। কারণ এইসব দেবদেবী আল্লাহ ও তাহাদের মধ্যবর্তী আর তাহাদের কোন কোন দেবী, ফেরেশতা, এমনকি জিনেরা আল্লাহ্ কন্যা। উল্লিখিত মিশ্রবিশ্বাসের আরও একটি উপজাত ফল হইল, আরবদের তাহাদের ফসল ও গবাদি সম্পদের একাংশ (সাধারণত একটি বড় অংশ) তাহাদের দেবদেবীদের জন্য এবং আল্লাহ্ জন্য আরেকাংশ (সাধারণত সামান্য অংশ) আলাদা রাখিয়া দেওয়ার নির্বোধসুলভ রীতি। এই বিষয়ে আরও দৃষ্টান্ত হইল, কা'বা প্রদক্ষিণকালে তালবিয়্যা বা লাব্বায়কা বলার বহু ঈশ্বরবাদী বিধানগুলি গুলাইয়া ফেলা। মক্কাবাসীরা ঐ সময় আরাফাত পর্যন্ত যাইত না; তাহারা কেবল মুযদালিফা পর্যন্ত যাইত। তাহাদের এই ধরনের আচরণের ভিত্তি ছিল তাহাদের মাঝে ধর্মের ক্ষেত্রে স্বকীয় শ্রেষ্ঠত্ববোধ ও তাহাদের পবিত্র এলাকার অধিবাসী হওয়ার উন্নাসিক ধারণা, তাহাদের দেওয়া কাপড় ছাড়া কাহাকেও সাধারণত কা'বাঘর প্রদক্ষিণ করিতে না দেওয়া এবং নিজেদের এমনকি বিবস্ত্র অবস্থায় কা'বা তাওয়াফের রীতি। এইভাবে বহু ঈশ্বরবাদী ধ্যান-ধারণার সহিত আল্লাহকে সর্বোচ্চ প্রভু হিসাবে মিশাইয়া ফেলা সম্পর্কে আল-কুরআনে ঘোষণা করা হইয়াছে, “তাহাদেরকে অধিকাংশ আল্লাহে বিশ্বাস করে, কিন্তু তাঁহার শরীক করে।”
আরবদের বহু ঈশ্বরবাদ ও মূর্তিপূজা, তাহাদের আল্লাহ সম্পর্কিত ভ্রান্ত ধারণা এইসব মিলিয়া তাহাদের জীবনধারা ও সমাজের দৃষ্টিভঙ্গি গড়িয়া উঠে। তাহাদের ঐ সময়কার ধারণা ছিল ইহকালই মানব জীবনের সবকিছু। আর তাহাদের দেবদেবীর পূজা-অর্চনা ও আল্লাহ্র প্রতি স্বীকৃতি এইসব কিছুরই ভিত্তি ছিল ইহলৌকিকতা, আর কিছুই নহে। তাহারা পুনরুত্থানে বিশ্বাসী ছিল না, মৃত্যুর পর পুরস্কারে ও দণ্ডে বিশ্বসী ছিল না। আল-কুরআনের ভাষায়, তাহাদের বক্তব্য ও ঘোষণা ছিল: “একমাত্র পার্থিব জীবনই আমাদের জীবন, আমরা মরি-বাঁচি এইখানেই এবং আমরা পুনরুত্থিত হইব না”।
এই ধারণাগত বিশ্বাসের কারণে চূড়ান্ত জবাবদিহির কোন অস্তিত্ব না থাকায় আরবদের মাঝে সকল উপায়ে, পন্থায় ও অবাধে পার্থিব ভোগ-বাসনা শক্তিশালী হইয়া উঠে। আর সেই কারণেই তাহাদের মাঝে কামুকতা, বেশ্যাবৃত্তি, ব্যভিচার, পরস্ত্রী গমন, অতি পানবিলাস ও জুয়া ব্যাপক বিস্তার লাভ করে। বহুবিবাহ সীমাহীন হইয়া ওঠে ও নারীর বহু স্বামী রাখাও প্রচলিত হয় (এইক্ষেত্রে একজন নারীর স্বামীর সংখ্যা হইত ১০-এর কম)। এরকম সম্পর্ক হইতে কোন শিশুর জন্মের বেলায়, তাহার মাতা যাকে ঐ সন্তানের পিতা বলিয়া ঘোষণা করিত তাহাকে তাহার পিতৃত্ব স্বীকার করিয়া লইতে হইত। কোন কোন ক্ষেত্রে পুত্রসন্তান লাভের জন্য একজন স্বামী তাহার স্ত্রীকে পরপুরুষগামী হওয়ারও অনুমতি প্রদান করিত।
আরব সমাজে নারীর মর্যাদা আদৌ ঈর্ষণীয় ছিল না, যদিও আরব নারী বহু আর্থ-সামাজিক কার্যকলাপে অংশগ্রহণ করিত। কোন কোন ক্ষেত্রে আমরা লক্ষ্য করি, প্রাক-ইসলামী কাব্যে প্রেমিকার প্রতি হৃদয়ের অঢেল, উচ্ছ্বসিত অর্ঘ্য নিবেদন করা হইলেও আরব নারীকে সাধারণত অস্থাবর সম্পত্তি হিসাবে গণ্য করা হইত। একজন পুরুষ কতজন স্ত্রী গ্রহণ করিবে তাহার কোন সীমা ছিল না। পুরুষ তাহার পছন্দমত যত খুশি স্ত্রী গ্রহণ করিতে পারিত। একইভাবে পুরুষ তাহার খেয়াল-খুশিমত যখন তখন স্ত্রীকে তালাক দিত। এই ব্যাপারে কোন বিধিনিষেধ ছিল না। তাই একজন পুরুষ রক্তের সম্পর্ক নির্বিশেষে বিবাহ করিতে পারিত এবং করিতও। অনেক সময় দুই সহোদর বোন এক পুরুষকে স্বামী হিসাবে গ্রহণ করিত। পুত্রেরা তাহাদের সাবেক স্ত্রী ও বিধবাকে (মাতা ছাড়া) বিবাহ করিত। নারী তাহার পূর্বপুরুষ বা স্বামীর সম্পত্তির উত্তরাধিকার লাভ করিবে এমন কোন বিধিবিধান ছিল না। কন্যা সন্তানের জন্মকে অশুভ বিবেচনা করা হইত, কন্যা সন্তানকে পছন্দ করা হইত না। সবচেয়ে অমানবিক বিষয় এই ছিল যে, বহু আরব ইয্যতের তথাকথিত আশঙ্কা ও দারিদ্র্যের ভয়ে তাহাদের কন্যা শিশু সন্তানকে জীবন্ত কবর দিত। ইসলামের অভ্যুদয়ের প্রাক্কালে এই বর্বর প্রথা মক্কা ও তাহার আশপাশ এলাকায় কিছুটা হ্রাস পায় বলিয়াও মনে করা হয়। তবে আরবের অন্যত্র এই প্রথার প্রচলন ছিল। আল-কুরআনে বলা হইয়াছে, অনেক বহু-ঈশ্বরবাদী পরিবারে এই প্রথা প্রচলিত ছিল। বনু তামীমের কায়স ইবন 'আসিম নবম হিজরীতে ইসলাম গ্রহণ করেন। তাঁহার স্বীকারোক্তি অনুযায়ী, তিনি নিজে ইসলাম গ্রহণের আগে তাঁহার ৮ হইতে ১২টি কন্যাকে জীবন্ত কবর দেন।
জবাবদিহিতা নাই, এই ধারণার কারণে তৎকালীন আরবে একান্ত নির্বিচারে হত্যার এবং অন্যের সম্পত্তি ও সম্পদ লুটপাট ও চুরির ঘটনা ঘটিত। এইসব অনাচারের একমাত্র প্রতিকার হিসাবে ছিল গোত্র পর্যায়ে প্রতিশোধ ও পাল্টা ব্যবস্থা গ্রহণের রীতি। আরবদের মধ্যে কিছু কুসংস্কার ও বিবেকবর্জিত রীতিরও প্রচলন ছিল। তাহারা গণক ও জ্যোতিষীদের কথায় বিশ্বাস করিত এবং কোন কাজ করিতে হইলে, যেমন বিবাহ বা কোন গন্তব্যে যাত্রার ব্যাপারে কোন নির্দিষ্ট দেবদেবীর মূর্তির সামনে তীর ছুঁড়িয়া বা লটারি করিয়া দৈব পর্যায়ে সিদ্ধান্ত লইত। ব্যাপক পর্যায়ে জুয়া ও লটারির প্রচলন ছিল। কোন একটি বিশেষ জিনিসে, যেমন যবেহ করা পশুর গোশতে তাহাদের ভাগ নির্ধারণ করার জন্য আরবরা লটারী করিয়া বা তীর ছুঁড়িয়া তাহা নির্ধারণ করিত। এই পদ্ধতির আওতায় বণ্টনযোগ্য গোশত বিভিন্ন অসম ভাগে ভাগ করার পর তীরের মথায় কোনটি বেশি পরিমাণ, কোনটির মাথায় কম পরিমাণ লিখিয়া লক্ষ্য বস্তুতে ঐ তীরগুলি ছোঁড়া হইত কিংবা আধুনিক লটারির টিকেটের মত তীরগুলির মধ্য হইতে নির্বিচারে তুলিয়া লইয়া গোশতের ভাগ নির্ধারণ করা হইত।
আরও এক অদ্ভুত আরবীয় রীতির নাম হাবালুল হাবালা। ইহার আওতায় একটি গর্ভবতী উট বিক্রয় করা হইত এই শর্তে যে, উটটি যদি কোন মাদি উট শাবকের জন্ম দেয় এবং উষ্ট্রী আবার গর্ভধারণ করে তাহা হইলে মূল উটের দাম পরিশোধ করিতে হইবে। আরও এক কুসংস্কার ও বহু ঈশ্বরবাদী আরব প্রথা ছিল: কোন বিশেষ উট, ছাগল বা ষাঁড়কে আস-সাইবাহ, আল-বাহীরাহ, আল-ওয়াসীলাহ ও আল-হাম নামে অভিহিত করা। যদি কোন উস্ত্রী পরপর ১০টি মাদি শাবক প্রসব করিত এবং ইহার মাঝে কোন পুরুষ শাবক না জন্মিত তাহা হইলে ঐ উষ্ট্রীটিকে নিষেধাত্মক আস-সাইবাহ নামে অভিহিত করা হয়ত। এই উষ্ট্রীটিকে অতঃপর কোথাও ভ্রমণের কাজে বাহন হিসাবে কিংবা বোঝা বহনের কাজে ব্যবহার করা যাইত না। তাহার লোম ছাঁটা যাইত না এবং এই উষ্ট্রীর দুধ একমাত্র মেহমান ছাড়া আর কেহ পান করিতে পারিত না। পরে যদি এই উষ্ট্রী আরেকটি মাদি শাবকের জন্ম দিত তাহা হইলে সেই শাবকটির নাম হইত আল-বাহীরাহ। তাহার বেলায়ও উল্লিখিত বিধিনিষেধগুলি প্রযোজ্য হইত। কোন ছাগী একইভাবে পাঁচবারের গর্ভধারণ সূত্রে দশটি ছাগী শাবকের জন্ম দিলে তাহার বেলায়ও একই বিধিনিষেধ প্রযোজ্য হইত ও তাহার নাম দেওয়া হইত আল-ওয়াসীলাহ। কোন ষাঁড় পরপর দশটি বকনা বাছুরের জন্ম দিলে তাহার বেলায়ও একই বিধিনিষেধ প্রযোজ্য হইত ও তাহার নাম দেওয়া হইত আল-হাম। আল-কুরআন এই ধরনের রীতি-প্রথার প্রতি নিন্দা জ্ঞাপন করিয়াছে। আরবদের এইসব রীতি ও বিশ্বাস, বিশেষত তাহাদের বহু ঈশ্বরে বিশ্বাস, কামুকতা, ব্যভিচার, জুয়াসক্তি, চৌর্যবৃত্তি, লুটপাট, তাহাদের কন্যাসন্তানকে জীবন্ত কবর দান, তাহাদের গোত্রচেতনা ও উত্তেজনা এবং রীতিপ্রথাকে আল-কুরআনে জাহিলিয়্যা বলিয়া উল্লেখ করা হইয়াছে।
এই ছিল তৎকালীন আরবের সমাজ-ধর্মীয় পরিস্থিতির সাধারণ চিত্র। খৃস্টান, ইয়াহুদী, মাযদীয় (জরথুষ্ট্র প্রচারিত ধর্মীয় মতবাদ) ও সাবীয় ধর্মমতও ঐ সময়ে সীমিত আকারে এই উপদ্বীপে প্রবেশ করে। প্রধানত বায়যান্টীয় কর্তৃপক্ষের ইশারা ও উদ্যোগে উত্তরাঞ্চলীয় কিছু আরব গোত্র, বিশেষ করিয়া গাস্সানী ও হিরার অধিবাসীরা খৃস্টধর্ম গ্রহণ করে। হিরা রাজ্যের কোন শাসক খৃষ্ট ধর্মমত গ্রহণ করেন। আরবের দক্ষিণে ইয়ামানে খৃষ্টধর্ম প্রবর্তিত হয় প্রধানত ইয়ামানে আবিসিনীয় বিজয় ও দখলের পর (৩৪০-৩৭৮ খৃ.)। ইয়ামানের পার্শ্ববর্তী নাজরান অঞ্চলে একেশ্বরবাদ ভিত্তিক খৃস্টধর্মের প্রবর্তন করেন সিরিয়া হইতে আগত ফায়মিয়্যু নামে এক মিশনারি। এই এলাকার বেশ কিছু লোক খৃস্টধর্ম গ্রহণ করে। মহানবী-এর আবির্ভার কালেও মক্কায় কিছু কিছু খৃস্টান ছিল আর কিছু কিছু লোক নূতন করিয়া খৃস্টধর্মে দীক্ষাও গ্রহণ করিয়াছিল।
আরব উপদ্বীপে তেমন কেহই এই সময়ে ইয়াহুদী ধর্ম গ্রহণ না করিলেও ইয়াহুদীরা অন্যত্র হইতে এই উপদ্বীপে আগমন করে। এই অভিবাসন প্রধানত দুইটি কালপর্যায়ে অনুষ্ঠিত হয়। একটি কালপর্যায় ছিল ৫৮৭ খৃষ্ট-পূর্বাব্দে ব্যবিলনীয় শাসকের ফিলিস্তীন দখলের পর, আরেকটি ৭০ খৃস্টাব্দে রোমান সম্রাট টাইটাসের ফিলিস্তীন জয় ও জেরুসালেম ধ্বংসের পর। কয়েকটি ইয়াহুদী গোত্র আরবে আগমন করিয়া ইয়াছরিব (মদীনা), খায়বার, তায়মা ও ফাদাকে বসতি স্থাপন করে। তাহারা এখানে আসিয়া ধর্মপ্রচার হইতে পুরাপুরি বিরত থাকে নাই। জনশ্রুতি অনুযায়ী তাহারা এক হিময়ারী শাসককে ইয়াহুদী ধর্মে দীক্ষিত করে। তাহার নাম আবূ কারিব আস'আদ কামিল (তুব্বা') (৩৮৫-৪২০ খৃ.)। উত্তরাঞ্চলে অভিযান চালাইতে মদীনায় আসিলে এই হিময়ারী শাসক ইয়াহুদী ধর্ম গ্রহণ করে। দুইজন ইয়াহুদী ধর্মপ্রচারক ইয়ামানে ইয়াহুদী ধর্ম প্রচারের জন্য তাহার সঙ্গে পাঠানো হয়।
ইয়ামানে এই দুই ইয়াহুদী ধর্মপ্রচারক কতদূর সাফল্য লাভ করে তাহা স্পষ্টত জানা যায় না। তবে আস'আদ কামিলের এক বংশধর যূ-নুওয়াস ইয়াহুদী ধর্মের এক বলিষ্ঠ প্রবক্তা হিসাবে নিজেকে প্রমাণিত করে। শুধু ইয়ামানের খৃস্টানদের উপরই নিপীড়ন-অত্যাচার চালায় নাই, বরং নাজরানের খৃস্টানদের মাঝেও গণহত্যা চালায়। এই বর্বর গণহত্যাকালে অগ্নিময় গভীর খাদে বিপুল সংখ্যক খৃষ্টানকে নিক্ষেপ করে। যূ-নুওয়াসের এই অসহিষ্ণুতায় ইয়ামানে বায়যান্টীয় ও আবিসিনীয় সাম্রাজ্যের যৌথ হস্তক্ষেপ ঘটে। ফলে ইয়ামানে যূ-নুওয়াসের শাসনের অবসান ঘটে এবং সে দেশে দ্বিতীয় বারের মত আবরাহার নেতৃত্বে আবিসিনীয় দখলদারিত্বের সূচনা ঘটে। আগেই উল্লেখ করা হইয়াছে যে, আবরাহা গোটা ইয়ামানে খৃস্টধর্ম কায়েমের সংকল্প লইয়া সান'আয় এক বিরাট গির্জা নির্মাণ করে এবং কা'বাগৃহ ধ্বংসের জন্য ৫৭০-৭১ খৃস্টাব্দে মক্কায় এক অভিযানে নেতৃত্ব দেয়।
মাযদাঈ বা জরথুস্ট্রের ধর্ম পারস্যে প্রচলিত ছিল। উপদ্বীপের পূর্ব উপকূল অঞ্চল ও বাহরায়নের কিছু লোক এই ধর্ম গ্রহণ করে। ২২৫ খৃস্টাব্দে পারস্যবাসী ইয়ামান পদানত করিলে সেখানকার কিছু লোক জরথুস্ট্রের ধর্ম গ্রহণ করে। সাবা ধর্ম সম্পর্কে কুরআনে কিছু উল্লেখ আছে। এই ধর্মটি সম্ভবত ব্যবিলন কিংবা দক্ষিণ আরবের কোন প্রাচীন ধর্মবিশ্বাস। এই ধর্মবিশ্বাসীরা জ্যোতিষ্ক-নক্ষত্র পূজা করিত। ইসলামের অভ্যুদয়কালে এই ধর্মমতে বিশ্বাসীদের সংখ্যা খুব বেশি ছিল না। যাহা হউক, এই ধর্মটি আরব উপদ্বীপে বিজাতীয় ধর্মবিশ্বাস বলিয়া গণ্য ছিল। ইহার কারণ হিসাবে উল্লেখ করা যায় যে, কোন আরব তাহার পূর্বপুরুষের অনুসৃত ধর্ম পরিত্যাগ করিলেই তাহাকে বলা হইত, সে সাবী ধর্মাবলম্বীতে পরিণত হইয়াছে।
অবশ্য এইসব ধর্ম সাধারণভাবে আরবদের জীবন ও সমাজে তেমন প্রভাব বিস্তার করিতে সক্ষম হয় নাই। বিশেষত খৃস্টান ও ইয়াহুদীরা তাহাদের মধ্যে হানাহানি, অসহিষ্ণুতা, মতবিরোধ এবং ঈসা ('আ) ও মূসা ('আ)-এর মূল শিক্ষা হইতে বিচ্যুত হইবার কারণে তাহাদের অবস্থান দুর্বল করিয়া ফেলে। প্রজ্ঞার অধিকারী আরব খৃস্টানদের কাছে যীশু ও মেরির মূর্তিপূজা ছাড়া এবং খৃস্টান অবতারবাদ ও ত্রিত্ববাদ কতগুলি মূর্তিকে একত্রে পূজা করা ও আল্লাহকে সর্বোচ্চ প্রভু হিসাবে স্বীকৃতি দেওয়া বৈ কিছুই মনে হয় নাই। ইয়াহুদী ধর্মের বেলায়ও পরিস্থিতি একই রকম ছিল। এই ধর্ম একান্তভাবে বিচ্ছিন্ন। এই ধর্মেও উযায়রকে ঈশ্বরের পুত্র হিসাবে দাবি করা হইয়াছে। আর তাই এই ধর্মও দৃশ্যত সমান বহু ঈশ্বরবাদী। ইসলামের অভ্যুদয়ের ঠিক আগে বেশ কিছু লোক ইবরাহীম ('আ)-এর সত্যিকার ধর্মবিশ্বাসের সন্ধানে বাহির হইয়া আসে এবং তাহারা হানীফ নামে পরিচিত হয়। এই লোকগুলির আবির্ভাবকে যদি আমরা ইবরাহীম ('আ)-এর ধর্মবিশ্বাসের ধারার অস্তিত্ব এবং আরবে খৃস্টান ও ইয়াহুদীদের অবস্থানের মধ্যে মিথস্ক্রিয়ার ফল বলিয়াও মনে করি তাহা হইলেও হানীফরা কার্যত সকলেই এই উভয় ধর্মের দিক হইতে তাহাদের মুখ ফিরাইয়া লইলেও তাহাতেই বোঝা যায় যে, তাহারা সমসাময়িক কালের প্রজ্ঞার অধিকারী আরব মানসে তেমন প্রতিক্রিয়ার সৃষ্টি করিতে ব্যর্থ হয়।

টিকাঃ
৪৪. নিম্নে দ্র., অধ্যায় ৩৫, ১ম ভাগ।
৪৫. কুরআন, ৬: ১৩৬।
৪৬. কুরআন, ৮৮: ১৭।
৪৭. Ismail Razi al-Faruqi and Lois Lamya al-Faruqi, The Cultural Atlas of Islam, New York 1986, p. 83।
৪৮. বুখারী, নং, ৩৫২১, ৪৬২৩-৪৬২৪; মুসলিম, নং ২৮৫৬; মুসনাদ (২য় খণ্ড), ২৭৫-২৭৬; (৩য় খণ্ড), ৩১৮, ৩৫৩, ৩৭৪; (৫ম খণ্ড), ১৩৭।
৪৯. ইবন হিশাম, (১ম খণ্ড), ৭৭। আল-কালবীর বর্ণনা অনুসারে, 'আমর একবার গুরুতর অসুস্থ হওয়ায় কোন এক ব্যক্তি তাহাকে সিরিয়ার একটি প্রস্রবণে গোসল করার পরামর্শ দেয়। ঐ ব্যক্তি জানায়, প্রস্রবণের পানিতে গোসল করিলে আমর নিরাময় লাভ করিবে। পরামর্শ অনুযায়ী আমর সিরিয়ায় গিয়া ঐ প্রস্রবণের পানিতে গোসল করার পর আরোগ্য লাভ করে। ঐ সময় সে লক্ষ্য করে যে, সেখানকার লোকজন মূর্তিপূজা করিতেছে। লোকজনের নিকট সে ইহার কারণ জানিতে চাহে। ইবনুল কালবী, কিতাবুল আসনাম, সম্পা, আহমাদ যাকী পাশা, কায়রো ১৩৪৩/১৯২৪, পৃ. ৮।
৫০. Hitti, History of the Arabs, 1980, reprint, p. 100 and n. 2।
৫১. ইব্‌ন হাজার, ফাতহুল বারী (৬ষ্ঠ খণ্ড), ৬৩৪।
৫২. কুরআন, ৭১: ২৩।
৫৩. আলোচনার জন্য দ্র. First Encyclopaedia of Islam, 1913-1936, I, 379-380; A. Yusuf Ali, The Holy Quran, text, Translation and Commentary, Islamic Foundation, Liecester, 1975, pp. 1619-1623 (Appendix XIII of Surah 71)।
৫৪. বুখারী, নং ৪৯২০।
৫৫. ইব্‌ন হিশাম, (১ম খণ্ড), ৭৭।
৫৬. ইব্‌ন হিশাম, ১ম খণ্ড, ৮২; ইবনুল কালবী, প্রাগুক্ত, ৯ম খণ্ড, ২৯।
৫৭. ইবনুল কালবী, প্রাগুক্ত, ১৬, ১৭। First Encyclopaedia of Islam (Vol. I, 380-এর লেখকের মতে, আরবের দেবতা আল-লাত গ্রীক দেবী লেটো, সূর্য দেবতা অ্যাপেলোর মাতার উৎস।
৫৮. ইব্‌ন হিশাম, ১ম খণ্ড, ৮৩; ইবনুল কালবী, প্রাগুক্ত, ১৮।
৫৯. কুরআন, ৫৩: ১৯-২০।
৬০. ইব্‌ন হিশাম, ১ম খণ্ড, ৮৩-৮৯, ইবনুল কালবী, প্রাগুক্ত, ৩০, ৪৪-৪৭।
৬১. ইব্‌ন হিশাম, ১ম খণ্ড, ৭৮-৮৩।
৬২. কুরআন, ২৩: ৮৪-৮৯; ৩১: ২৫।
৬৩. কুরআন, ১০: ২২; ৩১: ৩২।
৬৪. কুরআন, ৬ঃ ১০৯।
৬৫. দৃষ্টান্তস্বরূপ দ্র. F.V. Winnet, Allah before Islam, M.W, XXVIII (1938), 239-248।
৬৬. p. K. Hitti-এ সব উৎকীর্ণ লিপি, কুরআনের কিছু সংশ্লিষ্ট আয়াত এবং কুরায়শদের মাঝে ‘আবদুল্লাহ, এই নামের অস্তিত্ব থাকার বিষয় উল্লেখের পর বলিয়াছেন, “স্পষ্টতই আল্লাহ কুরায়শদের গোত্র দেবতা ছিলেন” (Hitti, op. cit., 101)। তাহার এই মন্তব্য একদিকে বিভ্রান্তিকর ও অন্যদিকে অগ্রহণযোগ্য। কারণ তিনি যেসব উৎকীর্ণ লিপির কথা বলিয়াছেন সেগুলি কুরায়শদের নয়। আবার ‘আবদুল্লাহ নামটিও একান্তভাবে তাহাদের নয়। কুরায়শদের বাহিরেও এই নামের অনেক দৃষ্টান্ত আছে। তাহাদের কথা তো বলা বাহুল্য, মদীনার মুনাফিকদের নেতার নামই ছিল 'আবদুল্লাহ ইবন উবাই!
৬৭. বুখারী, নং ৩৮৩১।
৬৮. مَا نَعْبُدُهُمْ إِلا لِيُقَرِّبُونَا إِلَى اللَّهِ زُلْفَى وَيَقُولُونَ هَؤُلاءِ شُفَعَاؤُنَ عِنْدَ اللَّهِ ।
৬৯. ১৬:৫৭ وَيَجْعَلُونَ لِلَّهِ الْبَنَاتِ আরও দ্র. ৩৭: ১৪৯-১৫৪; ৪৩: ১৬; ৫২: ৩৯।
৭০. কুরআন, ৬: ১৩৬।
৭১. ইব্‌ন হিশাম, ১ম খণ্ড, ৭৮।
৭২. وَمَا يُؤْمِنُ أَكْثَرُهُمْ بِاللَّهِ إِلَّا وَهُمْ مُشْرِكُونَ 200 : 21 90
৭৩. اِنْ هِيَ اِلَّا حَيَاتُنَا الدُّنْيَا نَمُوتُ وَنَحْي وَمَا نَحْنُ بِمَبْعُوثِينَ 09 : 20 Para 98
বাস্তবিকপক্ষে কুরআনে এরকম বহু আয়াত আছে যেগুলি অবিশ্বাসীদের এই ধারণার উল্লেখ করিয়াছে। দৃষ্টান্তস্বরূপ দ্র. ৬: ২৯; ১৭: ৪৯; ১৭: ৯৮; ২৩: ৩৫; ২৩: ৮২; ৩৭: ১৬; ৩৭: ৫৩; ৩৭: ৫৮-৫৯; ৪৪ : ৩৫; ৫০: ৩; ৫৬: ৪৭ ও ৬৪: ৭। অনুরূপভাবে আল-কুরআনে বহু বিশদ আয়াত রহিয়াছে পুনরুত্থান ও আল-হাশরের দিন সম্পর্কে।
৭৪. আল-কুরআন এই প্রথার নিন্দা জ্ঞাপন করিয়া ইহাকে নিষিদ্ধ করিয়াছে (দ্র. ৫: ৩; ৫: ৯০; ১৭ঃ ২৩; ২৪ঃ ২-৩; ২৫ঃ ৬৮ ও ৬০: ১২)।
৭৫. বুখারী, নং ৫১২৭।
৭৬. প্রাগুক্ত।
৭৭. কুরআন, ১৬:৫৮-৫৯।
৭৮. কুরআন, ৬: ১৩৭; ৬: ১৫১।
৭৯. কুরআন, ৬: ১৩৭।
৮০. আন-নুমায়রী (আল-বাশ্রী) আবূ যায়দ উমার ইব্‌ন শাববাহ (১৭৩-২৬২ হি.), তারীখুল মাদীনাতিল মুনাওয়ারাহ, সম্পা. এফ. এম. শালতৃত, ২য় ভাগ, ২য় মুদ্রণ, মদীনা, তা.বি., পৃ. ৫৩২; উসদুল গাবা, ৪র্থ খণ্ড, ২২০; আল-ইসাবা, ৩য় খণ্ড, ২৫৩ (নং ৭১৯৪)। আরও দ্র. আদ-দারিমী, ১ম খণ্ড, ভূমিকা, পৃ. ৩-৪।
৮১. বুখারী, নং ৩৮৪৩। মহানবী এই ধরনের লেনদেন নিষিদ্ধ করেন।
৮২. ইব্‌ন হিশাম, ১ম খণ্ড, ৮৯।
৮৩. কুরআন, ৫: ১০০; ৬: ১৩৯।
৮৪. কুরআন, ৩: ১৫৪; ৫: ৫০; ৩৩: ৩৩; ৪৮: ২৬; এবং বুখারী, নং ৩৫২৪।
৮৫. ইব্‌ন হিশাম, ১ম খণ্ড, ৩১-৩৪।
৮৬. ইব্‌ন হিশাম, ১ম খণ্ড, পৃ. ২৬-২৭।
৮৭. এই ঘটনার উল্লেখের জন্য দ্র. কুরআন, ৮৫ : ৪।
৮৮. এই ধর্মটি সম্ভবত ব্যবিলন কিংবা দক্ষিণ আরবের কোন প্রাচীন ধর্মবিশ্বাস। এই ধর্মবিশ্বাসীরা জ্যোতিষ্ক-নক্ষত্র পূজা করিত। ইসলামের অভ্যুদয়কালে এই ধর্মমতে বিশ্বাসীদের সংখ্যা খুব বেশি ছিল না। যাহা হউক, এই ধর্মটি আরব উপদ্বীপে বিজাতীয় ধর্মবিশ্বাস বলিয়া গণ্য ছিল। ইহার কারণ হিসাবে উল্লেখ করা যায় যে, কোন আরব তাহার পূর্বপুরুষের অনুসৃত ধর্ম পরিত্যাগ করিলেই তাহাকে বলা হইত, সে সাবী ধর্মাবলম্বীতে পরিণত হইয়াছে।
৮৯. বুখারী, নং ৩৫২৩; মুসনাদ, ৩য় খণ্ড, পৃ. ৪৯২; ৪র্থ খণ্ড, পৃ. ৩৪১; ইব্‌ন হিশাম, ১ম খণ্ড, পৃ. ৩৪৪।
৯০. নিম্নে দ্র., অধ্যায় ৮, ১ম ভাগ।

📘 সীরাত বিশ্বকোষ > 📄 পাঁচ: আরব উপদ্বীপের বাহিরের জগত

📄 পাঁচ: আরব উপদ্বীপের বাহিরের জগত


পাঁচ : আরব উপদ্বীপের বাহিরের জগত
আরব আর যাহাই হউক গোটা বিশ্ব নয়। আর কেবল আরবরাই যে জাহিলিয়া বা আঁধারে আচ্ছন্ন ছিল তাহাও নহে। আরও দেশ, ভূভাগ, জনসমষ্টি ছিল এই উপদ্বীপের বাহিরেও যেখানেও ছিল জাহিলিয়ার পরিবেশ। ঐ সময়কার বিশ্ব আদর্শিক ধারণায় মোটামুটি তিনটি ভাগে বিভক্ত
ছিল। পশ্চিমে ছিল বায়যান্টাইন এবং রোমক সাম্রাজ্য: এই দুই সাম্রাজ্যের বিস্তৃতি ছিল পূর্বে আধুনিক ইরাক হইতে পশ্চিমে আটলান্টিক উপকূল (আফ্রিকা বাদে) অবধি। এই অঞ্চলের পূর্বে ছিল রোমক সাম্রাজ্যের প্রতিদ্বন্দ্বী পারস্য সাম্রাজ্য—ইহা পশ্চিমে ইরাক হইতে পূর্বে সিন্ধুনদ উপত্যকা পর্যন্ত বিস্তৃত ছিল। তৃতীয় অঞ্চলটি অবস্থিত ছিল পারস্য সাম্রাজ্যের পূর্বে চীন ও ভারত, যাহা অবশিষ্ট বিশ্বের কাছে ছিল খুবই কাঙ্খিত। ইহা ছাড়াও দূরপ্রাচ্যে ও দূর পাশ্চাত্যে ছিল আরও নানা জাতি ও নানা দেশ। যতটুকু আমরা এইসব দেশ ও জনসমষ্টি সম্পর্কে জানি তাহাতেই বলা চলে, এইসব দেশ ও জনসমষ্টির অবস্থাও রাজনৈতিক ও সাংস্কৃতিক দিক হইতে খুব একটা ভাল ছিল না।
বিশ্ব দৃশ্যপটের প্রবীণ বিষয় ছিল বায়যান্টাইন ও পারস্যের মধ্যে প্রতিদ্বন্দ্বিতা। ইহারা ছিল সমসাময়িক কালের দুই প্রধান পরাশক্তি। তাহাদের সংঘাতের মূল প্রাচীন। গ্রীস ও পারস্যের মধ্যকার অতীত সংঘাতের (গ্রীক-পারসিক যুদ্ধ) মধ্যে ইহার অভিব্যক্তি রহিয়াছে। রোমক শক্তি গ্রীক সভ্যতার উত্তরাধিকারী হওয়ার পর সংঘাতের ঐতিহ্যের উত্তরাধিকারও রোমের উপর বর্তায়। ৪৬৭ খৃস্টাব্দে পাশ্চাত্যের রোম সাম্রাজ্যের পতনের পর প্রাচ্যে রোমক (বায়যান্টীয় সাম্রাজ্যের) পত্তন হয়। আর ইহার রাজধানী স্থাপিত হয় কনস্ট্যান্টিনোপলে। তখনও এই সাম্রাজ্যের পারসিক সাম্রাজ্যের সহিত সংঘাতের একই উত্তরাধিকার ইহার উপর বর্তায়। পাশ্চাত্যে রোমক সাম্রাজ্যের অবসানের পর ইউরোপের উত্তরাঞ্চলীয় কিছু জাতির লোক সাবেক পাশ্চাত্য রোমক সাম্রাজ্যে দ্রুত তাহাদের স্থলাভিষিক্ত হয়। ইহারা হইল : অস্ট্রো-গথ (পূর্বাঞ্চলীয় গথ), ভিসিগথ (পশ্চিমাঞ্চলীয় গথ), ভাইকিং, ফ্রাঙ্ক, ভ্যাণ্ডল (ইহা হইতে ইংরেজি ভ্যান্ডালিজম শব্দটির উৎপত্তি)। ‘সভ্য’ রোমকরা এসব জাতির লোককে আধুনিক জার্মান, ফরাসী, স্পেনীয় ও ইংরেজ জাতির পূর্বসূরী মনে করিত। বার্বার (বর্বর) ও আধুনিক ইউরোপীয় ঐতিহাসিকগণ এইসব জাতির ৫ম হইতে ১০ম শতাব্দীর ইতিহাসকে ইউরোপের ‘অন্ধকার যুগ’ বলিয়া অভিহিত করিয়াছেন। এখানে উল্লেখ অনাবশ্যক যে, আরবে ইসলামের আবির্ভাব ঘটে ঐ সময়ে যখন ইউরোপ অন্ধকার যুগ অতিক্রম করিতেছিল।
এইসব অঞ্চল অবশ্য লক্ষণীয় বৈষয়িক সভ্যতার অধিকারী ছিল না, তাহা নহে। ভারত ও চীন গ্রীক-রোমক ও পারসিক সভ্যতার সমকক্ষ সভ্যতার অধিকারী ছিল। অনুরূপভাবে আসিরিয়া, ব্যবিলনিয়া, ফিনিসিয়া ছাড়াও উত্তর আরবে পেত্রা পালমীরা এবং দক্ষিণ আরব ও মিসর বৈষয়িক সভ্যতায় পিছাইয়া ছিল না। বাস্তবিকপক্ষে আরবরা ব্যবসায়-বাণিজ্যের আদান-প্রদান ছাড়াও বৈষয়িক সভ্যতার অন্যান্য উপদানেরও অংশীদার ছিল অন্যান্য জাতির সঙ্গে। একইভাবে অন্যান্য জাতির লোকও, আরবরা ইসলামী পরিভাষা অনুযায়ী যে ধরনের জাহিলিয়া পরিবেশে ছিল, সেই ধরনের পরিবেশ, ধর্মবিশ্বাস, আচার-রীতি ও অভ্যাসেরও অংশীদার ছিল।
জাহিলিয়ার সবচেয়ে দুই স্বতন্ত্র বৈশিষ্ট্যময় উপাদান ছিল বহু ঈশ্বরবাদ ও মূর্তিপূজা। আর সেইসাথে ছিল সকল কুসংস্কারমূলক বিশ্বাস ও আচার-রীতি। এইসবই কেবল আরবদেরই একান্ত
বিষয় ছিল না, বরং আরও বৈষয়িকভাবে উন্নততর জাতিসমূহের জনসমাজেও ব্যাপকভাবে তাহা প্রচলিত ছিল। সিন্ধু সভ্যতা দিজলা-ফুরাত সভ্যতার অংশীদার ছিল গিলগামেশ ও অন্যান্য অভিন্ন দেবদেবীর মাধ্যমে। গ্রীক ও ভারতীয় সর্বেশ্বরবাদের আওতাভুক্ত দেবদেবীদের মধ্যে মিল রহিয়াছে। যেমন হিন্দু বরুণ দেবের যথার্থ গ্রীক বিকল্প হইল অ্যাপোলো। গ্রীকরা যেমন তাহাদের মূর্তিপূজার বিষয়টিকে একটা দার্শনিক ভিত্তি দিয়াছে ও আদর্শায়িত করিয়া তুলিয়াছে এক বিস্তৃততর ধর্মতত্ত্ব ও পুরাকাহিনী রচনার মাধ্যমে, তেমনি প্রাচীন ভারতের কথিত হিন্দুরাও তুলনীয় ও জটিল ধর্মতত্ত্ব এবং পুরাকাহিনী গড়িয়া তুলিয়াছে।
বস্তুপক্ষে, বহু ঈশ্বরবাদ, মূর্তিপূজা ও কুসংস্কার ভারতে ব্যাপকভাবে শিকড় গাড়ে। ঋকবেদ হইল হিন্দুদের চার বেদের প্রাচীনতম গ্রন্থ। ৯২ ইহাতে একেশ্বরবাদের আবশ্যিক আভাস থাকিলেও তাহা হিন্দুদের দৃষ্টি পুরাপুরি এড়াইয়া যায়। আর ইহার পরিবর্তে তাহারা যাহা কিছু ধারণাযোগ্য বস্তু তাহার সবকিছুতেই, যেমন পাথর, গাছ, নদী, সূর্য, চন্দ্র, নক্ষত্র, পাহাড়-পর্বত, রাজন্য, পশু, এমনকি জননেন্দ্রিয়তেও তাহারা দেবত্ব আরোপ করিত। তাহারা নানা আকার-আকৃতিতে এই সবের ও অন্যান্য দেবদেবীর মূর্তি প্রতিষ্ঠা করিয়াছে এবং বিস্তৃত আচার-রীতি সহকারে এই সবের পূজা-অর্চনা করে। একটি কালপর্যায়ে পুরাকাহিনী অনুযায়ী দেবদেবীর সংখ্যা দাঁড়ায় তেত্রিশ কোটিতে, যদিও এই দেবদেবীর সংখ্যা সমসাময়িক কালের জনসংখ্যার বেশি। মূর্তির প্রতি তাহাদের নিষ্ঠার কারণে হিন্দুরা প্রাচীন গ্রীক ও রোমকদের মতই চমৎকার ভাস্কর হইয়া উঠিয়াছে নিঃসন্দেহে। হিন্দুরা তাহাদের কিছু বিশিষ্ট পূর্বপুরুষকে আদর্শ ও মূর্তি করিয়াই ক্ষান্ত হয় নাই, বরং তাহারা এইসব মূর্তিকে ঈশ্বরের অবতাররূপে কল্পনা করিয়াছে। বাস্তবিকপক্ষেও হিন্দুরাই সর্বপ্রথম ঈশ্বরের অবতার ও পূনঃঅবতাররূপে আবির্ভাবের তত্ত্ব প্রদান করে। অন্যান্যের মধ্যে রাম ও কৃষ্ণ ঈশ্বরের অবতার। তাহারা মানুষরূপে ধরায় জন্মগ্রহণ করিয়াছিল। আরবদের মত হিন্দুরাও সর্বোচ্চ পরমেশ্বরের অস্তিত্ব স্বীকার করিলেও তাহারা তাহা করিয়াছে তিন বিশিষ্ট ব্যক্তি বা দেবতার, যেমন ব্রহ্মা, বিষ্ণু ও শিবের ত্রিত্বের আকারে। আরবরা কিছু পশুর উপর নিষেধাজ্ঞা আরোপ করিয়াছে। এইসব প্রাণীর কিছু নির্দিষ্ট ভূমিকা পালনের পর তাহাদের ব্যবহার নিষিদ্ধ। হিন্দুরাও কিছু পশুকে দেবতা হিসাবে পূজা করিত। গরু তাহাদের দেবতা। আর তাই হিন্দুরা গোমাংস ভক্ষণ নিষিদ্ধ করে, কিন্তু গবাদির অন্যান্য ব্যবহার নিষিদ্ধ করে নাই, যদিও ঋকবেদের আমলে ব্রাহ্মণদের গোমাংস পরম হরষে তৃপ্তির সঙ্গে ভোজন করা লক্ষ্য করা গিয়াছে। ৯৩ বর্ণাশ্রম ও অস্পৃশ্যতা প্রথার মাধ্যমে হিন্দু ধর্মীয় মতবাদ সাধারণ মানুষকে, বিশেষত একেবারে নিম্নশ্রেণীর শূদ্র মানুষগুলিকে মানবেতর জীবনের গভীরতম তলে অবনমিত করিয়াছে। এই সমাজে বহুবিবাহও প্রচলিত ছিল। নারীর অবস্থাও খুব একটা ভালো ছিল না। পরস্ত্রী গমন ও ব্যভিচার-এর প্রচলন ছিল বহুল। হিন্দুরা তাহাদের কন্যা শিশু সন্তানকে জীবন্ত কবর না দিলেও তাহাদের বিধবাদেরকে, কমবয়সী হউক বা বয়সী হউক, তাহাদের মৃত স্বামীর লাশের সহিত পোড়াইয়া মারিয়াছে। ৯৪
বর্ণপ্রথার বাড়াবাড়ি ও হিন্দুধর্মের অন্যান্য অপব্যবহারের প্রতিবাদ হিসাবে কপিলাবস্তু নগরের (উত্তর ভারত) শাক্য গোত্রের রাজকুমার সিদ্ধার্থ (গৌতম বুদ্ধ হিসাবে সুপরিচিত, ৫৬৫-৪৮৬ খৃ.
হযরত মুহাম্মাদ (স) ৮১
পূর্বাব্দ) বৌদ্ধ মতবাদ প্রচার করেন। তিনি অষ্টাঙ্গিক মার্গঃ সৎ চিন্তা, সৎ কর্ম, সৎ শ্রুতি ইত্যাদির উপদেশ প্রচার করেন। তিনি জটিল ধর্মতত্ত্বের আলোচনা পরিহার করেন। বস্তুতপক্ষে তিনি ঈশ্বর সম্পর্কেও নীরব থাকেন। তাহার মৃত্যুর পর অচিরেই তাহার শিক্ষার বিকৃতি ঘটে। আর হিন্দুধর্মের প্রভাবে খোদ গৌতমকে ঈশ্বরের অবতার হিসাবে গণ্য করা হয়। বুদ্ধরা তাহার মূর্তিপূজা করিতে শুরু করিয়া দেয়। সপ্তম শতাব্দী নাগাদ ব্রাহ্মণ্যবাদী হিন্দু প্রতিক্রিয়ার সুবাদে সাফল্যের সঙ্গে বুদ্ধধর্মকে কার্যত তাহার জন্ম ও লালনভূমি হইতেই বহিষ্কার করা হয়। ভারতের কিছু প্রত্যন্ত অঞ্চলে বৌদ্ধরা তাহাদের অস্তিত্ব কোনরকমে টিকাইয়া রাখিতে পারিলেও তাহাদের অনুসৃত ধর্ম অনেকটা বিকৃত ও মূর্তিপূজা প্রধান হইয়া ওঠে এবং তাহা দূরপ্রাচ্য, দক্ষিণ এশিয়া ও চীনে স্থানান্তরিত হয়।
চীনে তাও (Taoism) ও কনফুসিয়াসের ধর্মীয় মতবাদের এক অদ্ভুত মিশ্রণ প্রচলিত ছিল। পরে চীনে বিকৃত আকারে বৌদ্ধ মতবাদ তৃতীয় ধর্মীয় প্রবণতা হিসাবে বিস্তার লাভ করে। পরবর্তী কালে অবশ্য বৌদ্ধ ধর্ম আর তেমন শ্রীবৃদ্ধি লাভ করিতে পারে নাই। কনফুসিয়াস ও তাওয়ের মতবাদে বহু মূর্তিপূজামূলক আচার-রীতি ও কুসংস্কার বৈশিষ্ট্য হইয়া উঠে। সর্বোপরি যাদুবিদ্যা ও সম্মোহনের বিষয় ধর্মীয় জীবনে প্রধান হইয়া উঠে। আর এগুলি আয়ত্ত ও প্রয়োগ করার একচেটিয়া নিয়ন্ত্রণ কব্জা করে যাজক শ্রেণী। উদ্দেশ্য ছিল মানুষের কাছে এই যাজক শ্রেণীর লোকদের একটা আধা ঈশ্বর ভাবমূর্তি বজায় রাখা। এই সবের আনুকূল্যেই চীনের সম্রাটগণ তাহাদের নিজ প্রজাসাধারণের ঈশ্বর হিসাবে দাবি করার সুযোগ পায়। আর সাধারণ মানুষ তাহাদের অনুগত থাকিয়া তাহাদের কার্যত পূজা করে।
তখনকার তৃতীয় বিশ্বে যখন এই ধরনের ধর্মীয়-সামাজিক পরিস্থিতি তখন অন্য দুই বিশ্বের অবস্থাও খুব একটা ভালো ছিল না। পারসিক সাম্রাজ্য জরথুষ্ট্রের শিক্ষা প্রধানত বিস্মৃত হইয়াছিল। তাহার রচনা বলিয়া কথিত আবেস্তার কোন মূল আকারের অস্তিত্ব নাই। জেন্দ (তখন অবলুপ্ত) ভাষায় পারসিক যাজক শ্রেণী আবেস্তার একটি সংযোজনী রচনা করিয়া সংকলন আকারে প্রকাশ করে। এই রচনাটিই জেন্দ-আবেস্তা নামে পরিচিত। তবু এই রচনারও মাত্র কয়েকটি কপির অস্তিত্ব ছিল আলেকজান্ডারের পারস্য অভিযানের সময়। আলেকজাণ্ডার যখন পারসিপোলিস দখল করে তাহা পোড়াইয়া ধ্বংস করেন তখন এই কপিগুলিও ধ্বংস হইয়া যায়। এই ঘটনা ৩৩০ খৃস্ট-পূর্বাব্দের। জেন্দ-আবেস্তার একটি বিকল্প রচনা পরবর্তী কালে প্রস্তুত করা হয়। আলেকজাণ্ডারের পারস্য আক্রমণের ফলে ঐ দেশে যে বিভ্রান্তি, গোলযোগ ও অরাজকতা দেখা দেয় তাহাতে একদিকে অগ্নিপূজা ও অন্যদিকে শুভশক্তির দেবতায়ন ব্যাহত হয়। আর এই শুভশক্তির দেবতায়নকে 'আহুরা মাজদা' নামে অভিহিত করা হয় এবং অশুভ শক্তিকে 'আহুরামান' নামে অভিহিত করা হয়। ৯৫ এই আহুরা মাজদা ও আহুরা মানের সঙ্গে আরও যুক্ত হয় বহু
৮২ সীরাত বিশ্বকোষ
মূর্তিপূজামূলক ও কুসংস্কারাচ্ছান্ন রীতিপ্রথা যাহার সহিত হিন্দুদের মূর্তিপূজা ও কুসংস্কারের মিল রহিয়াছে। শুভের দেবতা আহুরা মাজদা ও সেইসঙ্গে অগ্নিপূজাও করা হইত। বিভিন্ন মন্দিরে আগুন প্রজ্জ্বলিত রাখার জন্য কতকগুলি বিশেষ স্থানে ইহা করা হইত আহুরা মাজদা ও আহুরা মানের সম্মানে।
ষষ্ঠ শতাব্দীর শুরুতে মাযদাক নামে এক চিন্তাবিদ কিছুটা সাম্যবাদী সংস্কার প্রবর্তন করার পর সমাজে বিভ্রান্তি ও বিশৃঙ্খলা আরও বৃদ্ধি পায়। মাযদাকের ধারণা ছিল যে, সমাজের সকল সমস্যা ও অশুভের কারণ মানুষের সুন্দরী নারী সম্ভোগের এবং বিত্ত ও বিষয়সম্পত্তি লাভের লালসা। তাই সে বিবাহ প্রথা তুলিয়া দিয়া যে কোন পুরুষের জন্য যে কোন নারী সম্ভোগের ব্যবস্থা করার সপক্ষে মত প্রকাশ করে। একমাত্র শাসক বা রাজা ছাড়া আর সকলের সম্পত্তির অধিকার বিলুপ্ত করার পক্ষে মত প্রকাশ করে। তাহার মতে, কেবল শাসকেরই সম্পদ-সম্পত্তি ও ঐশ্বর্য রাখার অধিকার থাকিবে। তবে ৫৩১ খৃস্টাব্দে পিতা কো'বাদের মৃত্যুর পর সম্রাট আনুশিরওয়ান (নওশেরওয়া) ক্ষমতার উত্তরাধিকার লাভ করিলে তিনি এই প্রক্রিয়া দ্রুত উল্টাইয়া দেন। সম্রাট আনুশিরওয়ানের বিশাল ব্যক্তিত্ব, প্রভাব ও দৃষ্টান্ত তাহার অজেয় সামরিক ক্ষমতা সত্ত্বেও গোটা পারস্য ও পারসিক সাম্রাজ্য জুড়িয়া ব্যাপক সামাজিক বিভ্রান্তি ও নৈতিক বিশৃঙ্খলা চলিতেই থাকে।
গ্রীক-রোমক বা বায়যান্টিয়াম সাম্রাজ্যে খৃষ্ট ধর্মই ছিল প্রধান ধর্ম। তবে এই ধর্মে ঈসা ('আ)-এর মূল শিক্ষা ছিল না বরং তাহার মধ্যে গ্রীক, রোমক বহু ঈশ্বরবাদী ধ্যানধারণা মিশ্রণ ঘটানো হয় যাহার নেপথ্য নায়ক ছিলেন সাধু পল (পৌল)। বায়যান্টাইন খৃস্ট ধর্মে যেসব বৈশিষ্ট্যসূচক নব উদ্ভাবনা যোগ করা হয় তাহা হইল: যীশু খৃস্ট ঈশ্বরের অবতার, তিনি মানুষের আকারে জন্মগ্রহণ করেন, ত্রিত্ববাদ ও পাপ মোচন। বহু আধুনিক পণ্ডিত এখন স্বীকার করেন যে, এই অবতার ও ত্রিত্বতত্ত্ব গ্রীকদের নিকট হইতে পরিগ্রহণ করা হইয়াছে। এখানে মনে রাখা দরকার যে, এইসব ধ্যান-ধারণা হিন্দুদের মধ্যেও প্রচলিত ছিল। ধর্মকে সহজে গ্রহণযোগ্য ও জনসাধারণের কাছে, বিশেষ করিয়া গ্রীক-রোমক জনসাধারণের কাছে উপাদেয় করিয়া তোলার জন্য এই বহু মতবাদী সমন্বয় ঘটানো হয়। ইহার কারণ গ্রীক ও রোমক জনসাধারণের মধ্যে বহু ঈশ্বরবাদের এক দীর্ঘ ইতিহাস ও ঐতিহ্য রহিয়াছে। বায়যান্টাইন কর্তৃপক্ষ সাম্রাজ্য গড়া, টিকাইয়া রাখা এবং বারবার জাতীয় গোষ্ঠী ও অন্যান্য জাতির লোকদের আনুগত্য ধরিয়া রাখার জন্যই এই ধরনের একটি ব্যবস্থার পৃষ্ঠপোষকতা করে। আর তাই তখন হইতে ধর্মের নামে সাধু পৌলের মতবাদের জয়যাত্রা সূচিত হয়। ৩২৫ খৃস্টাব্দে নিসিয়া ধর্মসভায় এই তত্ত্ব ও তত্ত্ব সংক্রান্ত পবিত্র পাঠগুলি আনুষ্ঠানিকভাবে গৃহীত হয়। কিন্তু তাহার পরেও বিভিন্ন সম্প্রদায়ের মধ্যে বিভেদ পুরাপুরি দূর করা সম্ভব হয় নাই। ইহার মধ্যে সর্বাপেক্ষা উল্লেখযোগ্য ছিল নেস্তরীয় খৃষ্ট ধর্ম মতাবলম্বী বিরুদ্ধবাদীরা। তাহাদের বক্তব্য ছিল, খৃস্টের দ্বৈত প্রকৃতি বা বৈশিষ্ট্য যাহারা সমর্থন করে তাহাদের
হযরত মুহাম্মাদ (স) ৮৩
উপর দমন-নীপিড়ন চালানো হইতেছে। অধিকাংশ নেস্তরিয় খৃস্টান তাই বায়যান্টীয় সাম্রাজ্যের প্রতিদ্বন্দ্বী পারস্য সাম্রাজ্যে আশ্রয় গ্রহণ করে। অনুরূপভাবে বায়যান্টীয় খৃস্টান কর্তৃপক্ষ ও তাহাদের সামন্তদের অত্যাচারে নিপীড়িত ইয়াহুদীরা পারস্য, আরব ও অন্যত্র দেশত্যাগ করিয়া চলিয়া যায়। বায়যান্টীয় সাম্রাজ্যের বিরুদ্ধে এই ঘৃণা ও বিতৃষ্ণা এবং যে খৃস্টীয় মতবাদ কনস্টান্টিনোপল সমর্থন করে তাহার প্রতি ঘৃণার বিষয়টি পারস্য সাম্রাজ্যের সঙ্গে বায়জান্টিয়ামের নিরন্তর সংঘাত হইতে প্রমাণিত। ধর্মে অবিশ্বাসী আরব এবং আরবের ইয়াহুদীদের সহানুভূতি তাই সাধারণত পারসিক সাম্রাজ্যের প্রতি বেশি ঝুঁকিয়া ছিল।
বায়যান্টিয়ামের সম্রাট সাম্রাজ্যের সর্বত্র চমৎকার গির্জা নির্মাণ করেন। এইসব গির্জায় যীশু ও মেরীর মূর্তি স্থাপন করা হয় এবং ঈশ্বরের ত্রিত্ববাদী প্রশংসাগীতির মাধ্যমে একত্রে ঐ দুই মূর্তির পূজা করা হয়। ইহা ছাড়া জননী ঈশ্বরীর গির্জাও নির্মাণ করা হয়। বায়যান্টিয়াম সাম্রাজ্যের রাষ্ট্রনীতির মাধ্যমে একত্রে ঐ দুই মূর্তির পূজা করা হয়। বায়যান্টিয়ান সাম্রাজ্যের রাষ্ট্রনীতির মূল স্বপ্ন ছিল বিশ্বব্যাপী এক সাম্রাজ্য ও এক ধর্ম প্রতিষ্ঠা। আর এই রাষ্ট্রনীতির কারণেই খৃস্টান আবিসিনিয়ার মাধ্যমে ইয়ামান তথা দক্ষিণ ইয়ামানে দুইবার হস্তক্ষেপ করা হয়। এই অভিযান কার্যত অনেকটা পারস্য সাম্রাজ্যের সহিত বাণিজ্য যুদ্ধ প্রকৃতিরও বলা চলে। ৫৭০-৭১ খৃস্টাব্দে কা'বাগৃহের বিরুদ্ধে আবরাহার বিপর্যয়কর সামরিক অভিযানের পর আবিসিনীয়-বায়যান্টীয় হস্তক্ষেপের বিরুদ্ধে ইয়ামানে প্রতিরোধ গড়িয়া উঠে। এই প্রতিরোধ যুদ্ধে নেতৃত্ব দেন সায়ফ ইন্ন যী ইয়াযান। তাহার অনুরাধে সাড়া দিয়া পারস্য সম্রাট সমুদ্র পথে ইয়ামানে একটি সেনাদল প্রেরণ করেন। এই সাহায্যপুষ্ট ইয়ামানীরা তাহাদের দেশে আবিসিনীয় শাসনের অবসান ঘটায় ৯৬ ইহার পর বায়যান্টিয় কর্তৃপক্ষ খোদ মক্কায় খৃস্ট ধর্ম প্রতিষ্ঠার শেষ বড় রকমের প্রয়াস হিসাবে উছমান ইবনুল হুওয়ায়রিছের মাধ্যমে মক্কার সরকারে পরিবর্তন আনার চেষ্টা চালায়। কিন্তু উছমানের নিজ গোত্র বনূ আসাদ তাহাকে প্রত্যাখ্যান করে। ৯৭
আরব উপদ্বীপের চারপাশের পৃথিবীর ধর্মীয় ও রাজনৈতিক পরিস্থিতি ছিল এই রকম। এই আলোচনায় স্পষ্ট যে, তখনকার গোটা বিশ্বে কম-বেশী প্রায় সর্বত্র বহু ঈশ্বরবাদ, মূর্তিপূজা, কুসংস্কার ও অমানবিক রীতিনীতি প্রচলিত ছিল, যে পরিবেশের ইসলামী-আরবীয় ভাষ্য বা শিরোনাম হইল 'জাহিলিয়্যা'। তাই ইসলামের অভ্যুদয় ছিল আরবদের নিকট একদিকে যেমন বিপ্লব, তেমনি ইহা সারা বিশ্বে আধিপত্য করার সাসানীয় ও বায়যান্টিয় সম্রাটদের কাছে এক প্রবল বাধা ও হতাশা। তাহাদের বিশ্বজনীন সাম্রাজ্য ও ধর্ম প্রতিষ্ঠার স্বপ্ন ইসলামের অভ্যুদয়ে ধূলিস্যাৎ হইয়া যায়।
অনুবাদ : আফতাব হোসেন

টিকাঃ
৯২. অন্য তিন বেদ হইল : সাম, যজু ও অথর্ব।
৯৩. Rajendralal Mitra, Beef in Ancient Indai, J.A.S.B., 1872, pp 174-196.
৯৪. সতীদাহ নামের এই অমানবিক প্রথা ভারতে ইস্ট ইন্ডিয়া কোম্পানির সরকারের ১৮২৯ সনের আইনে নিষিদ্ধ করা হয়।
৯৫. আহুরা, এই পারসিক শব্দটি অসুর-এর নমনীয় রূপ। হিন্দুরা অসুর বলিতে দানব/ রাক্ষসকে বুঝাইয়া থাকে। এই দুই ভিনদেশী শব্দের মধ্যে মৌলিক কারণ, উভয় ভাষাই ইন্দো-আর্যভাষা পরিবারের সদস্যের অন্তর্ভুক্ত। হিন্দুদের দেবতা বা দেওতা শব্দটির অর্থ ঈশ্বর যাহা মূল লাতিন শব্দ ডেইটির অনুরূপ অর্থবাহক।
৯৬. ইব্‌ন হিশাম, ১ম খণ্ড, ৬৩-৬৮।
৯৭. নিম্নে দ্র., পৃ. ৩৩০-৩৩৪।


আরব আর যাহাই হউক গোটা বিশ্ব নয়। আর কেবল আরবরাই যে জাহিলিয়া বা আঁধারে আচ্ছন্ন ছিল তাহাও নহে। আরও দেশ, ভূভাগ, জনসমষ্টি ছিল এই উপদ্বীপের বাহিরেও যেখানেও ছিল জাহিলিয়ার পরিবেশ। ঐ সময়কার বিশ্ব আদর্শিক ধারণায় মোটামুটি তিনটি ভাগে বিভক্ত ছিল। পশ্চিমে ছিল বায়যান্টাইন এবং রোমক সাম্রাজ্য: এই দুই সাম্রাজ্যের বিস্তৃতি ছিল পূর্বে আধুনিক ইরাক হইতে পশ্চিমে আটলান্টিক উপকূল (আফ্রিকা বাদে) অবধি। এই অঞ্চলের পূর্বে ছিল রোমক সাম্রাজ্যের প্রতিদ্বন্দ্বী পারস্য সাম্রাজ্য—ইহা পশ্চিমে ইরাক হইতে পূর্বে সিন্ধুনদ উপত্যকা পর্যন্ত বিস্তৃত ছিল। তৃতীয় অঞ্চলটি অবস্থিত ছিল পারস্য সাম্রাজ্যের পূর্বে চীন ও ভারত, যাহা অবশিষ্ট বিশ্বের কাছে ছিল খুবই কাঙ্খিত। ইহা ছাড়াও দূরপ্রাচ্যে ও দূর পাশ্চাত্যে ছিল আরও নানা জাতি ও নানা দেশ। যতটুকু আমরা এইসব দেশ ও জনসমষ্টি সম্পর্কে জানি তাহাতেই বলা চলে, এইসব দেশ ও জনসমষ্টির অবস্থাও রাজনৈতিক ও সাংস্কৃতিক দিক হইতে খুব একটা ভাল ছিল না।
বিশ্ব দৃশ্যপটের প্রবীণ বিষয় ছিল বায়যান্টাইন ও পারস্যের মধ্যে প্রতিদ্বন্দ্বিতা। ইহারা ছিল সমসাময়িক কালের দুই প্রধান পরাশক্তি। তাহাদের সংঘাতের মূল প্রাচীন। গ্রীস ও পারস্যের মধ্যকার অতীত সংঘাতের (গ্রীক-পারসিক যুদ্ধ) মধ্যে ইহার অভিব্যক্তি রহিয়াছে। রোমক শক্তি গ্রীক সভ্যতার উত্তরাধিকারী হওয়ার পর সংঘাতের ঐতিহ্যের উত্তরাধিকারও রোমের উপর বর্তায়। ৪৬৭ খৃস্টাব্দে পাশ্চাত্যের রোম সাম্রাজ্যের পতনের পর প্রাচ্যে রোমক (বায়যান্টীয় সাম্রাজ্যের) পত্তন হয়। আর ইহার রাজধানী স্থাপিত হয় কনস্ট্যান্টিনোপলে। তখনও এই সাম্রাজ্যের পারসিক সাম্রাজ্যের সহিত সংঘাতের একই উত্তরাধিকার ইহার উপর বর্তায়। পাশ্চাত্যে রোমক সাম্রাজ্যের অবসানের পর ইউরোপের উত্তরাঞ্চলীয় কিছু জাতির লোক সাবেক পাশ্চাত্য রোমক সাম্রাজ্যে দ্রুত তাহাদের স্থলাভিষিক্ত হয়। ইহারা হইল : অস্ট্রো-গথ (পূর্বাঞ্চলীয় গথ), ভিসিগথ (পশ্চিমাঞ্চলীয় গথ), ভাইকিং, ফ্রাঙ্ক, ভ্যাণ্ডল (ইহা হইতে ইংরেজি ভ্যান্ডালিজম শব্দটির উৎপত্তি)। ‘সভ্য’ রোমকরা এসব জাতির লোককে আধুনিক জার্মান, ফরাসী, স্পেনীয় ও ইংরেজ জাতির পূর্বসূরী মনে করিত। বার্বার (বর্বর) ও আধুনিক ইউরোপীয় ঐতিহাসিকগণ এইসব জাতির ৫ম হইতে ১০ম শতাব্দীর ইতিহাসকে ইউরোপের ‘অন্ধকার যুগ’ বলিয়া অভিহিত করিয়াছেন। এখানে উল্লেখ অনাবশ্যক যে, আরবে ইসলামের আবির্ভাব ঘটে ঐ সময়ে যখন ইউরোপ অন্ধকার যুগ অতিক্রম করিতেছিল।
এইসব অঞ্চল অবশ্য লক্ষণীয় বৈষয়িক সভ্যতার অধিকারী ছিল না, তাহা নহে। ভারত ও চীন গ্রীক-রোমক ও পারসিক সভ্যতার সমকক্ষ সভ্যতার অধিকারী ছিল। অনুরূপভাবে আসিরিয়া, ব্যবিলনিয়া, ফিনিসিয়া ছাড়াও উত্তর আরবে পেত্রা পালমীরা এবং দক্ষিণ আরব ও মিসর বৈষয়িক সভ্যতায় পিছাইয়া ছিল না। বাস্তবিকপক্ষে আরবরা ব্যবসায়-বাণিজ্যের আদান-প্রদান ছাড়াও বৈষয়িক সভ্যতার অন্যান্য উপদানেরও অংশীদার ছিল অন্যান্য জাতির সঙ্গে। একইভাবে অন্যান্য জাতির লোকও, আরবরা ইসলামী পরিভাষা অনুযায়ী যে ধরনের জাহিলিয়া পরিবেশে ছিল, সেই ধরনের পরিবেশ, ধর্মবিশ্বাস, আচার-রীতি ও অভ্যাসেরও অংশীদার ছিল।
জাহিলিয়ার সবচেয়ে দুই স্বতন্ত্র বৈশিষ্ট্যময় উপাদান ছিল বহু ঈশ্বরবাদ ও মূর্তিপূজা। আর সেইসাথে ছিল সকল কুসংস্কারমূলক বিশ্বাস ও আচার-রীতি। এইসবই কেবল আরবদেরই একান্ত বিষয় ছিল না, বরং আরও বৈষয়িকভাবে উন্নততর জাতিসমূহের জনসমাজেও ব্যাপকভাবে তাহা প্রচলিত ছিল। সিন্ধু সভ্যতা দিজলা-ফুরাত সভ্যতার অংশীদার ছিল গিলগামেশ ও অন্যান্য অভিন্ন দেবদেবীর মাধ্যমে। গ্রীক ও ভারতীয় সর্বেশ্বরবাদের আওতাভুক্ত দেবদেবীদের মধ্যে মিল রহিয়াছে। যেমন হিন্দু বরুণ দেবের যথার্থ গ্রীক বিকল্প হইল অ্যাপোলো। গ্রীকরা যেমন তাহাদের মূর্তিপূজার বিষয়টিকে একটা দার্শনিক ভিত্তি দিয়াছে ও আদর্শায়িত করিয়া তুলিয়াছে এক বিস্তৃততর ধর্মতত্ত্ব ও পুরাকাহিনী রচনার মাধ্যমে, তেমনি প্রাচীন ভারতের কথিত হিন্দুরাও তুলনীয় ও জটিল ধর্মতত্ত্ব এবং পুরাকাহিনী গড়িয়া তুলিয়াছে।
বস্তুপক্ষে, বহু ঈশ্বরবাদ, মূর্তিপূজা ও কুসংস্কার ভারতে ব্যাপকভাবে শিকড় গাড়ে। ঋকবেদ হইল হিন্দুদের চার বেদের প্রাচীনতম গ্রন্থ। ইহাতে একেশ্বরবাদের আবশ্যিক আভাস থাকিলেও তাহা হিন্দুদের দৃষ্টি পুরাপুরি এড়াইয়া যায়। আর ইহার পরিবর্তে তাহারা যাহা কিছু ধারণাযোগ্য বস্তু তাহার সবকিছুতেই, যেমন পাথর, গাছ, নদী, সূর্য, চন্দ্র, নক্ষত্র, পাহাড়-পর্বত, রাজন্য, পশু, এমনকি জননেন্দ্রিয়তেও তাহারা দেবত্ব আরোপ করিত। তাহারা নানা আকার-আকৃতিতে এই সবের ও অন্যান্য দেবদেবীর মূর্তি প্রতিষ্ঠা করিয়াছে এবং বিস্তৃত আচার-রীতি সহকারে এই সবের পূজা-অর্চনা করে। একটি কালপর্যায়ে পুরাকাহিনী অনুযায়ী দেবদেবীর সংখ্যা দাঁড়ায় তেত্রিশ কোটিতে, যদিও এই দেবদেবীর সংখ্যা সমসাময়িক কালের জনসংখ্যার বেশি। মূর্তির প্রতি তাহাদের নিষ্ঠার কারণে হিন্দুরা প্রাচীন গ্রীক ও রোমকদের মতই চমৎকার ভাস্কর হইয়া উঠিয়াছে নিঃসন্দেহে। হিন্দুরা তাহাদের কিছু বিশিষ্ট পূর্বপুরুষকে আদর্শ ও মূর্তি করিয়াই ক্ষান্ত হয় নাই, বরং তাহারা এইসব মূর্তিকে ঈশ্বরের অবতাররূপে কল্পনা করিয়াছে। বাস্তবিকপক্ষেও হিন্দুরাই সর্বপ্রথম ঈশ্বরের অবতার ও পূনঃঅবতাররূপে আবির্ভাবের তত্ত্ব প্রদান করে। অন্যান্যের মধ্যে রাম ও কৃষ্ণ ঈশ্বরের অবতার। তাহারা মানুষরূপে ধরায় জন্মগ্রহণ করিয়াছিল। আরবদের মত হিন্দুরাও সর্বোচ্চ পরমেশ্বরের অস্তিত্ব স্বীকার করিলেও তাহারা তাহা করিয়াছে তিন বিশিষ্ট ব্যক্তি বা দেবতার, যেমন ব্রহ্মা, বিষ্ণু ও শিবের ত্রিত্বের আকারে। আরবরা কিছু পশুর উপর নিষেধাজ্ঞা আরোপ করিয়াছে। এইসব প্রাণীর কিছু নির্দিষ্ট ভূমিকা পালনের পর তাহাদের ব্যবহার নিষিদ্ধ। হিন্দুরাও কিছু পশুকে দেবতা হিসাবে পূজা করিত। গরু তাহাদের দেবতা। আর তাই হিন্দুরা গোমাংস ভক্ষণ নিষিদ্ধ করে, কিন্তু গবাদির অন্যান্য ব্যবহার নিষিদ্ধ করে নাই, যদিও ঋকবেদের আমলে ব্রাহ্মণদের গোমাংস পরম হরষে তৃপ্তির সঙ্গে ভোজন করা লক্ষ্য করা গিয়াছে। বর্ণাশ্রম ও অস্পৃশ্যতা প্রথার মাধ্যমে হিন্দু ধর্মীয় মতবাদ সাধারণ মানুষকে, বিশেষত একেবারে নিম্নশ্রেণীর শূদ্র মানুষগুলিকে মানবেতর জীবনের গভীরতম তলে অবনমিত করিয়াছে। এই সমাজে বহুবিবাহও প্রচলিত ছিল। নারীর অবস্থাও খুব একটা ভালো ছিল না। পরস্ত্রী গমন ও ব্যভিচার-এর প্রচলন ছিল বহুল। হিন্দুরা তাহাদের কন্যা শিশু সন্তানকে জীবন্ত কবর না দিলেও তাহাদের বিধবাদেরকে, কমবয়সী হউক বা বয়সী হউক, তাহাদের মৃত স্বামীর লাশের সহিত পোড়াইয়া মারিয়াছে।
বর্ণপ্রথার বাড়াবাড়ি ও হিন্দুধর্মের অন্যান্য অপব্যবহারের প্রতিবাদ হিসাবে কপিলাবস্তু নগরের (উত্তর ভারত) শাক্য গোত্রের রাজকুমার সিদ্ধার্থ (গৌতম বুদ্ধ হিসাবে সুপরিচিত, ৫৬৫-৪৮৬ খৃ. পূর্বাব্দ) বৌদ্ধ মতবাদ প্রচার করেন। তিনি অষ্টাঙ্গিক মার্গঃ সৎ চিন্তা, সৎ কর্ম, সৎ শ্রুতি ইত্যাদির উপদেশ প্রচার করেন। তিনি জটিল ধর্মতত্ত্বের আলোচনা পরিহার করেন। বস্তুতপক্ষে তিনি ঈশ্বর সম্পর্কেও নীরব থাকেন। তাহার মৃত্যুর পর অচিরেই তাহার শিক্ষার বিকৃতি ঘটে। আর হিন্দুধর্মের প্রভাবে খোদ গৌতমকে ঈশ্বরের অবতার হিসাবে গণ্য করা হয়। বুদ্ধরা তাহার মূর্তিপূজা করিতে শুরু করিয়া দেয়। সপ্তম শতাব্দী নাগাদ ব্রাহ্মণ্যবাদী হিন্দু প্রতিক্রিয়ার সুবাদে সাফল্যের সঙ্গে বুদ্ধধর্মকে কার্যত তাহার জন্ম ও লালনভূমি হইতেই বহিষ্কার করা হয়। ভারতের কিছু প্রত্যন্ত অঞ্চলে বৌদ্ধরা তাহাদের অস্তিত্ব কোনরকমে টিকাইয়া রাখিতে পারিলেও তাহাদের অনুসৃত ধর্ম অনেকটা বিকৃত ও মূর্তিপূজা প্রধান হইয়া ওঠে এবং তাহা দূরপ্রাচ্য, দক্ষিণ এশিয়া ও চীনে স্থানান্তরিত হয়।
চীনে তাও (Taoism) ও কনফুসিয়াসের ধর্মীয় মতবাদের এক অদ্ভুত মিশ্রণ প্রচলিত ছিল। পরে চীনে বিকৃত আকারে বৌদ্ধ মতবাদ তৃতীয় ধর্মীয় প্রবণতা হিসাবে বিস্তার লাভ করে। পরবর্তী কালে অবশ্য বৌদ্ধ ধর্ম আর তেমন শ্রীবৃদ্ধি লাভ করিতে পারে নাই। কনফুসিয়াস ও তাওয়ের মতবাদে বহু মূর্তিপূজামূলক আচার-রীতি ও কুসংস্কার বৈশিষ্ট্য হইয়া উঠে। সর্বোপরি যাদুবিদ্যা ও সম্মোহনের বিষয় ধর্মীয় জীবনে প্রধান হইয়া উঠে। আর এগুলি আয়ত্ত ও প্রয়োগ করার একচেটিয়া নিয়ন্ত্রণ কব্জা করে যাজক শ্রেণী। উদ্দেশ্য ছিল মানুষের কাছে এই যাজক শ্রেণীর লোকদের একটা আধা ঈশ্বর ভাবমূর্তি বজায় রাখা। এই সবের আনুকূল্যেই চীনের সম্রাটগণ তাহাদের নিজ প্রজাসাধারণের ঈশ্বর হিসাবে দাবি করার সুযোগ পায়। আর সাধারণ মানুষ তাহাদের অনুগত থাকিয়া তাহাদের কার্যত পূজা করে।
তখনকার তৃতীয় বিশ্বে যখন এই ধরনের ধর্মীয়-সামাজিক পরিস্থিতি তখন অন্য দুই বিশ্বের অবস্থাও খুব একটা ভালো ছিল না। পারসিক সাম্রাজ্য জরথুষ্ট্রের শিক্ষা প্রধানত বিস্মৃত হইয়াছিল। তাহার রচনা বলিয়া কথিত আবেস্তার কোন মূল আকারের অস্তিত্ব নাই। জেন্দ (তখন অবলুপ্ত) ভাষায় পারসিক যাজক শ্রেণী আবেস্তার একটি সংযোজনী রচনা করিয়া সংকলন আকারে প্রকাশ করে। এই রচনাটিই জেন্দ-আবেস্তা নামে পরিচিত। তবু এই রচনারও মাত্র কয়েকটি কপির অস্তিত্ব ছিল আলেকজান্ডারের পারস্য অভিযানের সময়। আলেকজাণ্ডার যখন পারসিপোলিস দখল করে তাহা পোড়াইয়া ধ্বংস করেন তখন এই কপিগুলিও ধ্বংস হইয়া যায়। এই ঘটনা ৩৩০ খৃস্ট-পূর্বাব্দের। জেন্দ-আবেস্তার একটি বিকল্প রচনা পরবর্তী কালে প্রস্তুত করা হয়। আলেকজাণ্ডারের পারস্য আক্রমণের ফলে ঐ দেশে যে বিভ্রান্তি, গোলযোগ ও অরাজকতা দেখা দেয় তাহাতে একদিকে অগ্নিপূজা ও অন্যদিকে শুভশক্তির দেবতায়ন ব্যাহত হয়। আর এই শুভশক্তির দেবতায়নকে 'আহুরা মাজদা' নামে অভিহিত করা হয় এবং অশুভ শক্তিকে 'আহুরামান' নামে অভিহিত করা হয়। এই আহুরা মাজদা ও আহুরা মানের সঙ্গে আরও যুক্ত হয় বহু মূর্তিপূজামূলক ও কুসংস্কারাচ্ছান্ন রীতিপ্রথা যাহার সহিত হিন্দুদের মূর্তিপূজা ও কুসংস্কারের মিল রহিয়াছে। শুভের দেবতা আহুরা মাজদা ও সেইসঙ্গে অগ্নিপূজাও করা হইত। বিভিন্ন মন্দিরে আগুন প্রজ্জ্বলিত রাখার জন্য কতকগুলি বিশেষ স্থানে ইহা করা হইত আহুরা মাজদা ও আহুরা মানের সম্মানে।
ষষ্ঠ শতাব্দীর শুরুতে মাযদাক নামে এক চিন্তাবিদ কিছুটা সাম্যবাদী সংস্কার প্রবর্তন করার পর সমাজে বিভ্রান্তি ও বিশৃঙ্খলা আরও বৃদ্ধি পায়। মাযদাকের ধারণা ছিল যে, সমাজের সকল সমস্যা ও অশুভের কারণ মানুষের সুন্দরী নারী সম্ভোগের এবং বিত্ত ও বিষয়সম্পত্তি লাভের লালসা। তাই সে বিবাহ প্রথা তুলিয়া দিয়া যে কোন পুরুষের জন্য যে কোন নারী সম্ভোগের ব্যবস্থা করার সপক্ষে মত প্রকাশ করে। একমাত্র শাসক বা রাজা ছাড়া আর সকলের সম্পত্তির অধিকার বিলুপ্ত করার পক্ষে মত প্রকাশ করে। তাহার মতে, কেবল শাসকেরই সম্পদ-সম্পত্তি ও ঐশ্বর্য রাখার অধিকার থাকিবে। তবে ৫৩১ খৃস্টাব্দে পিতা কো'বাদের মৃত্যুর পর সম্রাট আনুশিরওয়ান (নওশেরওয়া) ক্ষমতার উত্তরাধিকার লাভ করিলে তিনি এই প্রক্রিয়া দ্রুত উল্টাইয়া দেন। সম্রাট আনুশিরওয়ানের বিশাল ব্যক্তিত্ব, প্রভাব ও দৃষ্টান্ত তাহার অজেয় সামরিক ক্ষমতা সত্ত্বেও গোটা পারস্য ও পারসিক সাম্রাজ্য জুড়িয়া ব্যাপক সামাজিক বিভ্রান্তি ও নৈতিক বিশৃঙ্খলা চলিতেই থাকে।
গ্রীক-রোমক বা বায়যান্টিয়াম সাম্রাজ্যে খৃষ্ট ধর্মই ছিল প্রধান ধর্ম। তবে এই ধর্মে ঈসা ('আ)-এর মূল শিক্ষা ছিল না বরং তাহার মধ্যে গ্রীক, রোমক বহু ঈশ্বরবাদী ধ্যানধারণা মিশ্রণ ঘটানো হয় যাহার নেপথ্য নায়ক ছিলেন সাধু পল (পৌল)। বায়যান্টাইন খৃস্ট ধর্মে যেসব বৈশিষ্ট্যসূচক নব উদ্ভাবনা যোগ করা হয় তাহা হইল: যীশু খৃস্ট ঈশ্বরের অবতার, তিনি মানুষের আকারে জন্মগ্রহণ করেন, ত্রিত্ববাদ ও পাপ মোচন। বহু আধুনিক পণ্ডিত এখন স্বীকার করেন যে, এই অবতার ও ত্রিত্বতত্ত্ব গ্রীকদের নিকট হইতে পরিগ্রহণ করা হইয়াছে। এখানে মনে রাখা দরকার যে, এইসব ধ্যান-ধারণা হিন্দুদের মধ্যেও প্রচলিত ছিল। ধর্মকে সহজে গ্রহণযোগ্য ও জনসাধারণের কাছে, বিশেষ করিয়া গ্রীক-রোমক জনসাধারণের কাছে উপাদেয় করিয়া তোলার জন্য এই বহু মতবাদী সমন্বয় ঘটানো হয়। ইহার কারণ গ্রীক ও রোমক জনসাধারণের মধ্যে বহু ঈশ্বরবাদের এক দীর্ঘ ইতিহাস ও ঐতিহ্য রহিয়াছে। বায়যান্টাইন কর্তৃপক্ষ সাম্রাজ্য গড়া, টিকাইয়া রাখা এবং বারবার জাতীয় গোষ্ঠী ও অন্যান্য জাতির লোকদের আনুগত্য ধরিয়া রাখার জন্যই এই ধরনের একটি ব্যবস্থার পৃষ্ঠপোষকতা করে। আর তাই তখন হইতে ধর্মের নামে সাধু পৌলের মতবাদের জয়যাত্রা সূচিত হয়। ৩২৫ খৃস্টাব্দে নিসিয়া ধর্মসভায় এই তত্ত্ব ও তত্ত্ব সংক্রান্ত পবিত্র পাঠগুলি আনুষ্ঠানিকভাবে গৃহীত হয়। কিন্তু তাহার পরেও বিভিন্ন সম্প্রদায়ের মধ্যে বিভেদ পুরাপুরি দূর করা সম্ভব হয় নাই। ইহার মধ্যে সর্বাপেক্ষা উল্লেখযোগ্য ছিল নেস্তরীয় খৃস্ট ধর্ম মতাবলম্বী বিরুদ্ধবাদীরা। তাহাদের বক্তব্য ছিল, খৃস্টের দ্বৈত প্রকৃতি বা বৈশিষ্ট্য যাহারা সমর্থন করে তাহাদের উপর দমন-নীপিড়ন চালানো হইতেছে। অধিকাংশ নেস্তরিয় খৃস্টান তাই বায়যান্টীয় সাম্রাজ্যের প্রতিদ্বন্দ্বী পারস্য সাম্রাজ্যে আশ্রয় গ্রহণ করে। অনুরূপভাবে বায়যান্টীয় খৃস্টান কর্তৃপক্ষ ও তাহাদের সামন্তদের অত্যাচারে নিপীড়িত ইয়াহুদীরা পারস্য, আরব ও অন্যত্র দেশত্যাগ করিয়া চলিয়া যায়। বায়যান্টীয় সাম্রাজ্যের বিরুদ্ধে এই ঘৃণা ও বিতৃষ্ণা এবং যে খৃস্টীয় মতবাদ কনস্টান্টিনোপল সমর্থন করে তাহার প্রতি ঘৃণার বিষয়টি পারস্য সাম্রাজ্যের সঙ্গে বায়জান্টিয়ামের নিরন্তর সংঘাত হইতে প্রমাণিত। ধর্মে অবিশ্বাসী আরব এবং আরবের ইয়াহুদীদের সহানুভূতি তাই সাধারণত পারসিক সাম্রাজ্যের প্রতি বেশি ঝুঁকিয়া ছিল।
বায়যান্টিয়ামের সম্রাট সাম্রাজ্যের সর্বত্র চমৎকার গির্জা নির্মাণ করেন। এইসব গির্জায় যীশু ও মেরীর মূর্তি স্থাপন করা হয় এবং ঈশ্বরের ত্রিত্ববাদী প্রশংসাগীতির মাধ্যমে একত্রে ঐ দুই মূর্তির পূজা করা হয়। ইহা ছাড়া জননী ঈশ্বরীর গির্জাও নির্মাণ করা হয়। বায়যান্টিয়াম সাম্রাজ্যের রাষ্ট্রনীতির মাধ্যমে একত্রে ঐ দুই মূর্তির পূজা করা হয়। বায়যান্টিয়ান সাম্রাজ্যের রাষ্ট্রনীতির মূল স্বপ্ন ছিল বিশ্বব্যাপী এক সাম্রাজ্য ও এক ধর্ম প্রতিষ্ঠা। আর এই রাষ্ট্রনীতির কারণেই খৃস্টান আবিসিনিয়ার মাধ্যমে ইয়ামান তথা দক্ষিণ ইয়ামানে দুইবার হস্তক্ষেপ করা হয়। এই অভিযান কার্যত অনেকটা পারস্য সাম্রাজ্যের সহিত বাণিজ্য যুদ্ধ প্রকৃতিরও বলা চলে। ৫৭০-৭১ খৃস্টাব্দে কা'বাগৃহের বিরুদ্ধে আবরাহার বিপর্যয়কর সামরিক অভিযানের পর আবিসিনীয়-বায়যান্টীয় হস্তক্ষেপের বিরুদ্ধে ইয়ামানে প্রতিরোধ গড়িয়া উঠে। এই প্রতিরোধ যুদ্ধে নেতৃত্ব দেন সায়ফ ইন্ন যী ইয়াযান। তাহার অনুরাধে সাড়া দিয়া পারস্য সম্রাট সমুদ্র পথে ইয়ামানে একটি সেনাদল প্রেরণ করেন। এই সাহায্যপুষ্ট ইয়ামানীরা তাহাদের দেশে আবিসিনীয় শাসনের অবসান ঘটায়। ইহার পর বায়যান্টিয় কর্তৃপক্ষ খোদ মক্কায় খৃস্ট ধর্ম প্রতিষ্ঠার শেষ বড় রকমের প্রয়াস হিসাবে উছমান ইবনুল হুওয়ায়রিছের মাধ্যমে মক্কার সরকারে পরিবর্তন আনার চেষ্টা চালায়। কিন্তু উছমানের নিজ গোত্র বনূ আসাদ তাহাকে প্রত্যাখ্যান করে।
আরব উপদ্বীপের চারপাশের পৃথিবীর ধর্মীয় ও রাজনৈতিক পরিস্থিতি ছিল এই রকম। এই আলোচনায় স্পষ্ট যে, তখনকার গোটা বিশ্বে কম-বেশী প্রায় সর্বত্র বহু ঈশ্বরবাদ, মূর্তিপূজা, কুসংস্কার ও অমানবিক রীতিনীতি প্রচলিত ছিল, যে পরিবেশের ইসলামী-আরবীয় ভাষ্য বা শিরোনাম হইল 'জাহিলিয়্যা'। তাই ইসলামের অভ্যুদয় ছিল আরবদের নিকট একদিকে যেমন বিপ্লব, তেমনি ইহা সারা বিশ্বে আধিপত্য করার সাসানীয় ও বায়যান্টিয় সম্রাটদের কাছে এক প্রবল বাধা ও হতাশা। তাহাদের বিশ্বজনীন সাম্রাজ্য ও ধর্ম প্রতিষ্ঠার স্বপ্ন ইসলামের অভ্যুদয়ে ধূলিস্যাৎ হইয়া যায়।

টিকাঃ
৯১. নিম্নে দ্র., অধ্যায় ৮, ১ম ভাগ।
৯২. অন্য তিন বেদ হইল : সাম, যজু ও অথর্ব।
৯৩. Rajendralal Mitra, Beef in Ancient Indai, J.A.S.B., 1872, pp 174-196।
৯৪. সতীদাহ নামের এই অমানবিক প্রথা ভারতে ইস্ট ইন্ডিয়া কোম্পানির সরকারের ১৮২৯ সনের আইনে নিষিদ্ধ করা হয়।
৯৫. আহুরা, এই পারসিক শব্দটি অসুর-এর নমনীয় রূপ। হিন্দুরা অসুর বলিতে দানব/ রাক্ষসকে বুঝাইয়া থাকে। এই দুই ভিনদেশী শব্দের মধ্যে মৌলিক কারণ, উভয় ভাষাই ইন্দো-আর্যভাষা পরিবারের সদস্যের অন্তর্ভুক্ত। হিন্দুদের দেবতা বা দেওতা শব্দটির অর্থ ঈশ্বর যাহা মূল লাতিন শব্দ ডেইটির অনুরূপ অর্থবাহক।
৯৬. ইব্‌ন হিশাম, ১ম খণ্ড, ৬৩-৬৮।
৯৭. নিম্নে দ্র., পৃ. ৩৩০-৩৩৪।

লিঙ্ক শেয়ার করুন
close

লিঙ্ক কপি করুন

0:00
0:00