📄 চার: উৎস ও প্রাচ্যবিদগণ
চার: উৎস ও প্রাচ্যবিদগণ
ইহা সুবিদিত যে, কোন কোন প্রাচ্যবিদ বেশ কিছু মূল আরবী গ্রন্থ ও পাণ্ডুলিপি উদঘাটন, সম্পাদনা ও প্রকাশ করিতে সহায়ক হইয়াছিলেন। এইখানে তাহাদের কাজের ঐ দিকগুলি পুনরাবৃত্তি করার কোন অভিপ্রায় নাই, এই বিষয়ে তাহাদের কাজের মূল্যমান হ্রাস করা তো দূরের কথা। এখানে রাসূলুল্লাহ-এর জীবন-চর্চার উৎস ও এইগুলি প্রয়োগের প্রতি তাহাদের দৃষ্টিভঙ্গির প্রধান দিকগুলি দেখানোর কেবল একটি চেষ্টা করা হইয়াছে।
উল্লেখ না করিলেও চলে, প্রাচ্যবিদগণ আল-কুরআনকে আল্লাহ্ বাণী হিসাবে স্বীকার করেন না। তাহারা যদি বিশ্বাস করিতেন, তাহা হইলে সম্ভবত তাহারা আর প্রাচ্যবিদ থাকিতেন না। অপরপক্ষে তাহারা কোন না কোন কৌশলে ইহা আরোপ করার চেষ্টা করেন যে, রাসূলুল্লাহ আল-কুরআনের রচয়িতা। এই ধারণার বশবর্তী হইয়া তাহারা কতকগুলি দূর কল্পনার অবতারণা করেন, যাহা প্রধানত নিম্নরূপ:
(১) তদানীন্তন আরবে প্রচলিত ইয়াহুদীবাদ ও খৃস্টীয় ধ্যানধারণা হইতে আল-কুরআনের (তথা ইসলামের) উৎপত্তি হইয়াছে। ৫৩
(২) রাসূলুল্লাহ-এর সমাজ-ধর্ম সংস্কারের চিন্তা-ভাবনা রাসূলুল্লাহ-এর সময়, পরিবেশ ও পারিপার্শ্বিকতা হইতে উৎসারিত।
(৩) রাসূলুল্লাহ তাঁহার সাহিত্য-রীতি প্রধানত কয়েকজন প্রাচীন আরব কবির নিস্ট হইতে গ্রহণ করিয়াছেন।
(৪) আল-কুরআনের ভাষা সম্পূর্ণ খাঁটি আরবী নহে, যেমনটি দাবি করা হয়, বরং ইহাতে প্রচুর বিদেশী শব্দ আছে। ৫৪
বস্তুত এই প্রশ্নগুলি মুহাম্মাদ-এর নবুওয়াতের সমগ্র প্রকৃতি ও প্রেক্ষাপট এবং ওহী প্রাপ্তির ধরন সম্পর্কিতও। অতএব এইগুলি এই গ্রন্থের যথোপযুক্ত স্থানে যথাসাধ্য আলোচনা করা হইয়াছে। ৫৫
ঊনবিংশ শতক হইতে প্রাচ্যবিদদের মধ্যে আল-কুরআনের মূল পাঠ কালানুক্রমিকভাবে পুনরায় সাজানোর আর একটি প্রবণতা দেখা দেয় (তাহাদের ধারণামতে) মুহাম্মদ-এর চিন্তা-ভাবনা ও দৃষ্টিভংগীর ক্রমবিকাশের সন্ধানে। থিয়োডর নলডেকে ইহার পথিকৃৎ। ইহার উপর ভিত্তি করিয়া এ. রডওয়েল আল-কুরআনের অনুবাদকার্য করেন। ৫৬ অন্যরা, যথা জি. ওয়েল ৫৭ এবং ডব্লু মুইর৫৮ ইহাতে প্রায় একই সাথে কাজ করেন।
অবশ্য এই ধারাটি চূড়ান্ত পর্যায়ে পৌঁছান রিচার্ড বেল। ৫৯ বেল মূলত দুইটি ভ্রান্ত ধারণায় আচ্ছন্ন ছিলেন। যথাঃ (ক) ওহীর স্বাভাবিক মাত্রা (Unit) সংক্ষিপ্ত স্তবকে ছিল এবং (খ) ঐগুলি
হযরত মুহাম্মাদ (স)
সূরা-য় সংযুক্ত করার পূর্বে রাসূলুল্লাহ মূল পাঠ 'সংশোধন' করিয়াছেন। এই ধারণায় প্রভাবান্বিত হইয়া তিনি আল-কুরআনের মূল পাঠকে বিভিন্ন শ্রেণীতে ভাগ করিয়াছেন। এইগুলিকে তিনি 'সংকেত শ্রেণী', 'শ্লোগান শ্রেণী', 'দৈবজ্ঞ শ্রেণী' ইত্যাদি নামে অভিহিত করিয়াছেন। বেল তাহার 'সংশোধন' কল্পনার সমর্থনে কতকগুলি ডাহা মিথ্যা অনুমানের অবতারণা করিয়াছেন। উদাহরণত "তিনি এই মর্মে অমূলক প্রস্তাব খাড়া করিয়াছেন যে, মূল পাঠে 'রিজার্ভেশন' শব্দটি 'ইল্লা' (ব্যতীত) শব্দ দ্বারা পরবর্তীতে যোগ করা হইয়াছে। তিনি অন্যান্য সমজাতীয় স্তবকের ভিতরে (তাহার মতে) দৃশ্যত অপ্রাসংগিক বিষয়ের উপস্থিতির প্রসঙ্গ তোলেন এবং ইহার কারণ হিসাবে ব্যাখ্যা দেন যে, কুরআনের মূল পাঠ এবং সংযোজন একই লেখ্যসামগ্রীর দুই ভিন্ন দিকে লিখিত হওয়ার দরুন সম্পাদনার সময় ইহা মিশ্রিত হইয়া গিয়াছে। ৬০ বেল-এর ধারণাকে সাধারণভাবে সমর্থন করিয়া ওয়াট 'সংশোধন' বিষয়টির প্রতি বিশেষ মনোযোগ দেন এবং বেল-এর কল্পনাপ্রসূত অনুমানের উপর আরও অনুমান স্তূপীকৃত করেন। ৬১
বিষয়টির স্বাধীন অনুশীলন দরকার। এখানে একটি দিকের প্রতি দৃষ্টি আকর্ষণ করিয়া বলা যায় যে, 'প্রাচ্যবিদদের উদ্দেশ্য যতটা না সুস্পষ্ট করা, তাহার চাইতে বেশী হইল বিভ্রান্তি সৃষ্টি করা'। ডঃ এম. হামীদুল্লাহ যেমন বলেন, বেল-এর প্রায় সব অনুমানই এত বেশী শক্ত ও আপত্তি দ্বারা বেষ্টিত, যথা 'সম্ভবত', 'মনে হয়' ও অনুরূপ ধরনের যে, একজন পাঠক প্রায়শই বুঝিতে পারেন না লেখক কি বুঝাইতে চাহেন। দৃষ্টান্তস্বরূপ, বেল-এর Introduction to the Qur'an- এর ৭৫ পৃষ্ঠায় আছে, "এই শ্লোগানগুলির (sic) তারিখ নির্ণয় করা শক্ত এবং ইহা সন্দেহপূর্ণ। কুরআনে অন্তর্ভুক্ত এইগুলির কোন্টি বেশী আগের, যদিও এইগুলির কতকগুলি সেইরূপই হইবে”। ৬২ বেল-এর ধারণার ভ্রান্ত প্রকৃতি স্বীকার করিয়া ওয়াট মন্তব্য করেন, "আমরা যদি এইরূপ সন্দেহ পোষণ করিয়াই থাকি যে, মূল পাঠের বর্তমান রূপ (order) ধারণ করিয়াছে লেখ্য-সামগ্রীর দুই দিক ব্যবহারের দরুন, আমরা নিশ্চয়তার সহিত বলিতে পারি না কোনটার পিছনে কোনটা ছিল”। "কিছু পদ্যের প্রত্যেক অংশের পৃথকভাবে তারিখ নির্ণয়ের বিষয়টি এখন একটি প্রশ্ন হইয়া দাঁড়াইয়াছে। পুনঃ পরীক্ষার ক্ষেত্রে, এমনকি একটিমাত্র শব্দের ভিন্ন তারিখও পদ্যের অবশিষ্ট হইতে পারে”। ৬৩
আল-কুরআনের অংশগুলির এই ধরনের তারিখ নির্ধারণের উপর ভিত্তি করিয়া, যাহাকে প্রাচ্যবিদগণ রাসূলুল্লাহ -এর চিন্তা ও ধ্যান-ধারণার ক্রমবিকাশ বলিয়া মনে করেন, তাহাই খুঁজিতে চেষ্টা করেন। যেগুলিকে ওয়াট আল-কুরআনের অতি পূর্বের অংশ বলিয়া বিবেচনা করেন, তাহা হইতেই তিনি নিজের বাছাই পর্ব সারেন এবং তাহাকে উপাদান করিয়া এই মর্মে ইঙ্গিত দেন যে, প্রচারের শুরুতে তাওহীদ (একত্ববাদ) সম্পর্কে রাসূলুল্লাহ -এর শুধু অস্পষ্ট ও অসম্পূর্ণ ধারণা ছিল। ৬৪ সীরাত সংক্রান্ত পর্যালোচনায় প্রাচ্যবিদদের আল-কুরআন ব্যবহারের অন্যান্য বৈশিষ্ট্য নিম্নরূপ:
(ক) হাদীছ ও সীরাত সাহিত্যের তথ্যাবলী পরস্পর মিলাইয়া না দেখিয়া ও সম্পূরণ না করিয়া কুরআনের প্রমাণসমূহ বিচ্ছিন্নভাবে বিবেচনা করা। দৃষ্টান্তস্বরূপ তাহারা বলেন, যেহেতু কোন মক্কী
সীরাত বিশ্বকোষ ৪২ সূরাতে 'মুহাম্মাদ' নামটি নাই, রাসূলুল্লাহ মদীনার জীবনকালে নামটি গ্রহণ করেন। ৬৫ অন্যান্য প্রমাণ হইতে কুরআনের প্রমাণকে একই পদ্ধতিতে বিচ্ছিন্ন করিয়া ইহা দেখাইবার চেষ্টা করা হইয়াছে যে, মক্কায় মুসলমানদের উপর অত্যাচার-নিপীড়ন যেমন কঠিন ছিল না, তেমনি রাসূলুল্লাহকে হত্যা করারও কোন প্রচেষ্টা ছিল না।
(খ) বিষয়বস্তু হইতে একটি অংশ বাহির করিয়া তাহার স্থলে একটি ভ্রান্ত ব্যাখ্যা বসাইয়া দেওয়া। আল-কুরআনের দলীল-প্রমাণের এই ধরনের ব্যবহার দ্বারা তাহারা এই ইঙ্গিত দেন, আয়াত ৫৩: ১১-১৮ (সূরা আন-নাজম)-এ আল্লাহকে দেখিয়াছেন বলিয়া রাসূলুল্লাহ দাবি করিয়াছেন। ৬৬
(গ) অন্য অংশ বাদ দিয়া আয়াতের শুধু একটি অংশ গ্রহণ বা ইহার উপর জোর দেওয়া এবং এই প্রকার আয়াতের প্রতি এমন একটি অর্থ আরোপ করা যাহা সমগ্র আয়াতের প্রকৃত অর্থের বিপরীত। এই ধরনের কার্যকলাপের একটি উদাহরণ এই যে, তাহারা ইঙ্গিত করেন, আয়াত ১৬: ১০৩ (সূরা আন-নাহল)-এ কুরআন দেখাইয়াছে যে, জনৈক ব্যক্তি নবীকে শিক্ষাদান করিয়াছে। ৬৭
(ঘ) সুনির্দিষ্ট ধারণার প্রতি সমর্থন পাওয়ার লক্ষ্যে, উদাহরণস্বরূপ, আয়াত ১৭: ৭৪ (সূরা আল-ইসরা)-এর এমন ব্যাখ্যা করা হইয়াছে যে, অবিশ্বাসীদের সংগে আপোষ করিবার ইচ্ছা রাসূলুল্লাহ-এর মধ্যে এত প্রবল ছিল যে, তাঁহাকে নিবৃত্ত করিতে আল্লাহকে হস্তক্ষেপ করিতে হইয়াছিল। ৬৮
(ঙ) অন্যান্য ভাবার্থকে বর্জন করিয়া কেবল একটি ভাব বা শব্দার্থের আবরণের উপর জিদ করিয়া লাগিয়া থাকা। একটি দৃষ্টান্ত: ওহীকে শুধু Suggestions (ইঙ্গিত) অর্থে ব্যাখ্যা করা হইয়াছে, আল্লাহ্র নিকট হইতে প্রাপ্ত বাচনিক যোগাযোগের অর্থে নহে। ৬৯
প্রাচ্যবিদগণ যেমন আল-কুরআনের ক্ষেত্রে, তেমনি হাদীছের ক্ষেত্রেও সীরাত ও ইসলামের উপর সর্বাপেক্ষা গুরুত্বপূর্ণ তথ্যের দ্বিতীয় উৎসকে বিতাড়িত করার প্রয়াস পাইয়াছেন। ৭০ দেখাইবার চেষ্টা করা হইয়াছে যে, হাদীছশাস্ত্র খুব আগে হইলেও ইসলামের দ্বিতীয় শতকে অস্তিত্ব লাভ করে, ইহার সূত্র পদ্ধতি নির্ভরযোগ্য নহে এবং সব না হইলেও ইহার বেশীর ভাগ বিবরণ রাজনীতি, বদ্ধমূল ধারণা, ব্যবহার শাস্ত্র ও আদর্শগত কারণে ইসলামের দ্বিতীয় ও তৃতীয় শতকে জরুরী অবস্থার প্রয়োজনে জালিয়াতি প্রসূত। বলিতে গেলে, জে. সাট্ট (Schacht) ১৯৫০ সালে প্রকাশিত তাহার 'Origins of Muhammedan Jurisprudence গ্রন্থে পূর্ববর্তীদের বিতর্ক ও ধৃষ্টতাকে চরমে লইয়া গেলেন। পূর্বসূরীদের মতবাদকে পরিপূরণ ও সমর্থন করা ছাড়াও সাট্ দুইটি অদ্ভুত ধারণা পেশ করিয়াছেন। যথা:
(ক) ইসলামী আইন ইসলাম ধর্মের আওতার বাহিরে পড়ে, যাহাতে আল-কুরআনকে কার্যত ইচ্ছাকৃতভাবে ইসলামী ব্যবহার শাস্ত্রের (Jurisprudence) উৎস হিসাবে অগ্রাহ্য করা যায়।
(খ) বাহ্যত ঐতিহাসিক হাদীছও সন্দেহমুক্ত নহে। কারণ (তাহার মতে) ইহাও ব্যবহার শাস্ত্রের বিবেচনায় প্রণীত হইয়াছিল।
হযরত মুহাম্মাদ (স) ৪৩ মুসলিম মনীষিগণ এইসব তত্ত্ব ও ধারণাকে মোটেই গ্রহণযোগ্য বলিয়া মনে করেন না। ৭১ এমনকি বহু পাশ্চাত্য পণ্ডিতও সাচটের চূড়ান্ত উপসংহারকে গ্রহণ করা কষ্টকর বলিয়া মনে করেন। উদাহরণস্বরূপ, এন. জে. কাউলসন (Coulson) সাফ্টের রচনাকে অন্যথায় অনুমোদন করিলেও এই মর্মে দৃষ্টি আকর্ষণ করিয়া বলেন যে, তাহার প্রতিপাদ্য 'পদ্ধতিগতভাবে এই ধারণা পর্যন্ত উন্নত যে, 'আইনগত ঐতিহ্যের প্রমাণ আমাদিগকে প্রায় হিজরীর এক শত বৎসর পিছনে লইয়া যায় এবং যখন রাসূলুল্লাহ -এর প্রত্যেক আদেশ-নির্দেশের বিশুদ্ধতাকে অস্বীকার করা হয়, তখন একটি শূন্যতার সৃষ্টি হয় বা সৃষ্টি করা হয়, প্রথমদিকের মুসলমান সমাজে আইনের বিকাশের ক্ষেত্রে। বাস্তব দৃষ্টিভংগীর দিক ও বিদ্যমান অবস্থা বিবেচনা করিলে এই ধরনের শূন্যতার ধারণা গ্রহণ করা দুষ্কর। ৭২
সাটের মতামত ও ধারণার বিশেষ পর্যালোচনা করিয়াছেন এম.এম. আ'জামী। দেখানো হইয়াছে যে, 'ইসনাদ' (সূত্র) সম্পর্কে সাক্টের অভিমত ভ্রান্ত ৭৩ এবং 'জীবন্ত ঐতিহ্য' (Living Tradition) ও রাসূলুল্লাহ -এর উপর ইহার অভিক্ষেপ সম্পর্কে তাহার ধারণা মোটেও সুপ্রতিষ্ঠিত নহে। ৭৪ রাসূলুল্লাহ -এর সুনির্দিষ্ট বিচার সম্পর্কীয় কর্ম (Juridical activities)-ও সেই সংগে ইসলামের প্রথম শতকের আইন সংশ্লিষ্ট (Legal) সাহিত্যের প্রসংগে দেখানো হইয়াছে যে, ইসলামের প্রথম শতাব্দীতে আইনের ভিত্তি আল-কুরআন ও সুন্নাহ নহে, সাটের এই ধারণা ভ্রান্ত। সাক্টের নিজস্ব যুক্তি এবং তাহার বর্ণিত বিষয়বস্তু ও সূত্রগুলিকে বিশদভাবে উদ্ধৃত করিয়া আ'জামী এই মর্মে দৃঢ় প্রত্যয় সৃষ্টিকারী যুক্তির সহিত প্রমাণ করিয়া দিয়াছেন যে, সাফ্ট প্রতি ক্ষেত্রে তাহার যুক্তি-তর্ককে বিষয়বস্তুর বাহিরে লইয়া গিয়াছেন বা বিষয়বস্তুকে ভুল বুঝিয়াছেন বা ভুল ব্যাখ্যা করিয়াছেন এবং অন্যথায় তাহার ধারণা ও উপসংহারকে এমনভাবে পেশ করিয়াছেন যে, ঐগুলির সমর্থনে তিনি যেসব প্রমাণ উপস্থাপন করেন তাহা পূর্ণভাবে প্রতিষ্ঠিত হয় নাই। আরও দেখা যায় যে, আইনজ্ঞ ব্যক্তিবর্গ, যেমন ইমাম মালিক সম্পর্কে অভিমত গড়িয়া তুলিতে তাঁহাদের নিজস্ব রচনাবলীর উপর সাফ্ট নির্ভর করেন নাই, নির্ভর করিয়াছেন তাঁহাদের সম্পর্কে সমসাময়িক বা নিকট সমসাময়িকগণ যাহা বলিয়াছেন তাহার উপর।
হাদীছ সম্পর্কে গোল্ডজিহার-সাফ্ট-এর এইরূপ ভ্রান্ত ও যুক্তিহীন ধারণার উপর নির্ভর করিয়া এইগুলিকে প্রাচ্যবিদগণ সচরাচর নবীর জীবন-চরিতের সূত্র হিসাবে গ্রহণ করিয়াছেন। হাদীছের প্রতি এই দৃষ্টিভংগী এবং আল-কুরআন সম্পর্কে তাহাদের ধারণা সাধারণত সীরাত সাহিত্যের প্রতি তাহাদের মনোভাবকেই নির্ধারিত করে। এইভাবে এক শ্রেণীর পণ্ডিত এই অবস্থান নেন যে, সীরাত সাহিত্য মূলত জীবনেতিহাসের ধারায় হাদীছের উপাদান হইতে সাজানো হইয়াছে। কিন্তু যেহেতু হাদীছ সাহিত্য নির্ভরযোগ্য নহে এবং তাহা যে কোন ক্ষেত্রে কেবল কুরআনের উপাদানের সম্প্রসারণ মাত্র, সেইহেতু আল-কুরআন রাসূল-জীবনের একমাত্র স্বাধীন উৎস। কিন্তু এতদসত্ত্বেও যেহেতু আল-কুরআন সময়ানুক্রমিক বিস্তারিত বিবরণ দেয় না এবং নিজেকে সীমিত রাখে প্রসংগের পরোক্ষ উল্লেখের মধ্যে মাত্র, সেইহেতু রাসূলুল্লাহ -এর জীবনের সঠিক বৃত্তান্ত
৪৪ সীরাত বিশ্বকোষ
কদাচিৎ জানা যায়। অন্য কথায়, রাসূলুল্লাহ -এর ব্যাপারে একটি প্রায় অনতিক্রম্য ঐতিহাসিক 'সমস্যা' রহিয়া গিয়াছে। ৭৫
এই গ্রুপের সহিত ভিন্নমত পোষণ করিয়া, প্রাচ্যবিদগণের অন্য গ্রুপটি, আল-কুরআনের মূল্যকে অস্বীকার না করিলেও, সীরাত-সাহিত্যকে মহানবী -এর জীবনীর প্রধান উৎস বলিয়া গণ্য করেন। ওয়াট এই অবস্থার একটি সারসংক্ষেপ এইভাবে দেন : "বাস্তব ক্ষেত্রে পাশ্চাত্যের জীবনীকারগণ যাহা করিয়াছেন তাহা হইল..... সীরাত প্রদত্ত চিত্রের প্রশস্ত বাহ্যিক সীমারেখার বিশুদ্ধতাকে গ্রহণ ও ইহাকে একটি অবকাঠামো হিসাবে ব্যবহার করা এবং ইহার ভিতরে যতদূর সম্ভব কুরআনের উপকরণ দিয়া পূর্ণ করা। অধিকতর বিচক্ষণ পদ্ধতি হইতেছে কুরআন ও প্রথমদিকের চিরাচরিত বিবরণকে পরিপূরক উৎস হিসাবে সম্মান প্রদর্শন...”। ৭৬
উপরে ব্যবহৃত 'প্রথম দিকের চিরাচরিত বিবরণ' (The early traditional accounts) কথাটি সীরাত সাহিত্য প্রসংগে বলা হইয়াছে, হাদীছ প্রসংগে নহে, যাহার জন্য ওয়াট অন্য একটি শব্দ 'anecdotes' (ক্ষুদ্র সত্য কাহিনী) ব্যবহার করিয়াছেন। ৭৭ সীরাত সাহিত্যের বিবরণের সমর্থনে ওয়াট, মনে হয়, তাহাকে রক্ষা করিয়াছে যাহাকে পারিবারিক 'ইসনাদ' (সূত্র) রীতি বলা হয়, ৭৮ যদিও সাধারণত অন্যান্য প্রাচ্যবিদদের ন্যায় তিনিও হাদীছশাস্ত্রের ইসনাদ রীতিকে অতি অল্প মূল্যের বলিয়া মনে করেন।
প্রথম গ্রুপের পণ্ডিতগণ তাহাদের এই চিন্তাধারায় সত্যের কাছাকাছি পৌছান যে, সীরাতশাস্ত্র কমবেশি হাদীছ শাস্ত্রের আর একটি ভাষ্য। কিন্তু তাহারা খুব ভুল করেন যখন তাহারা মনে করেন যে, স্বাধীন ঐতিহাসিক উপাদানের কিছুই সীরাত শাস্ত্রে নাই। বিশেষ উল্লেখ্য, তাহারা ভুল করেন যখন তাহারা ধরিয়া লন, যেমন তাহাদের মুখপাত্র বলেন, "যে খৃস্টীয় ঐতিহাসিক সূত্র যাহা আলৌকিক ব্যক্তিত্ব ও যিশুর ঈশ্বরত্বকে সত্যায়িত করে", ইসলামের প্রতিষ্ঠাতার জন্য ঠিক তাহাই করার প্রয়োজনীয়তা দেখা দেয় এবং "ইতোপূর্বে বিদ্যমান ধর্মমত ও বিচার সংক্রান্ত হাদীছ সংগৃহীত ও কালানুক্রমিকভাবে সাজানো হয়”। ৭৯ আলাদাভাবে, অনুমানের বিশুদ্ধতার প্রশ্নে সুনির্দিষ্টভাবে বলা যায় যে, রাসূলুল্লাহ -এর প্রতি একই রকম অলৌকিকত্ব আরোপ করার উদ্দেশ্যে ভবিষ্যতে ব্যবহারের জন্য অভিসন্ধিমূলকভাবে পূর্বেই প্রস্তুত উপাদান লইয়া সীরাত শাস্ত্র রচিত হয় নাই।
তদ্রূপ দ্বিতীয় দলের পণ্ডিতগণ সঠিক, যখন তাহারা বলেন যে, সীরাত শাস্ত্র রাসূলুল্লাহ -এর জীবনের বিস্তৃত রূপরেখা প্রদান করে। কিন্তু তাহারা ভ্রান্ত, যখন তাহারা মনে করেন যে, সীরাত শাস্ত্র, যদিও সাহিত্যের অবয়ব হইতে ভিন্ন, মূলত হাদীছ শাস্ত্র হইতে পৃথক অথবা এই দুইটির ক্রমবিকাশ হইয়াছে ভিন্ন দুইটি পৃথক ভাগে (Water light), দুই ভিন্ন সময়ে, প্রথমটি গোড়ার দিকে ও পরেরটি পরবর্তী সময়ে। যেমন পূর্বেই দেখানো হইয়াছে, সীরাতশাস্ত্র সংকলন শুরু হয় নবী -এর হাদীছ সংগ্রহ ও সংরক্ষণের একই তাকিদ হইতে এবং হাদীছ সংগ্রহ ও
হযরত মুহাম্মাদ (স)
সংরক্ষণের কাজ সাথে সাথে শুরু হয়; অতি বিলম্বে হইলেও ইসলামের প্রথম শতাব্দীর দ্বিতীয়ার্ধে এবং একই দলের মনীষিগণের দ্বারা।
সীরাত শাস্ত্রের প্রতি ভিন্ন দৃষ্টিভংগী থাকিলেও কার্যত উভয় দলের মনীষিগণ রাসূলুল্লাহ -এর জীবনী আলোচনায় তিনটি উৎসের সবগুলিই কমবেশি ব্যবহার করেন। সীরাত শাস্ত্রের (হাদীছ শাস্ত্রেরও) বিবরণ সংক্রান্ত বিষয়ে তাহারা প্রায় একই পদ্ধতি গ্রহণ করেন, যেমন তাঁহারা করেন আল-কুরআনে বর্ণিত প্রমাণ সংক্রান্ত বিষয়ে। তাই তাহারা প্রায়শ (ক) একই বিষয়বস্তুর উপর একটি বিশেষ বিবরণ আলাদা করিয়া লন, ইহাকে পরস্পর না মিলাইয়া অথবা কুরআনের বা অন্য প্রমাণের সম্পূরক না করিয়া; (খ) দৃষ্টিকৌণিক মিল থাকিলে, সংশ্লিষ্ট বিবরণের বিশুদ্ধতার প্রশ্নটি বিবেচনা না করিয়া বা একই বিষয়ে অন্যান্য বিবরণ (যাহার মধ্যে ভিন্নমত প্রদানের প্রবণতা আছে) বিবেচনায় না আনিয়া, দুর্বলতর, এমনকি সকল বিবরণের ব্যবহার করেন; (গ) বিষয়বস্তু বহির্ভূত বিবরণ নেন এবং ইহার ভ্রান্ত ও অসমর্থনযোগ্য ব্যাখ্যা প্রদান করেন; (ঘ) একটি নির্দিষ্ট ভংগীকে সমর্থনের নিমিত্তে বিবরণের মাত্র একটি অংশগ্রহণ করেন, সমগ্র বর্ণনা (যাহা একটি ভিন্ন চিত্র দিত) না লইয়া এবং (ঙ) ইহা করিতে বর্ণনাকারী বা গ্রন্থকারদের উপর মতলব আরোপ করেন, যাহা কোনভাবেই সপ্রমাণিত নহে।
বর্তমান গ্রন্থে আরও অগ্রসর হইলে, কি সীরাত কি হাদীছ সংক্রান্ত প্রাচ্যবিদদের বর্ণনার সব ও প্রত্যেকটি দিক সুস্পষ্ট ফুটিয়া উঠিবে।
অনুবাদ: আজিজুর রহমান
টিকাঃ
৫৩. প্রায় সব প্রাচ্যবিদ এই মত পোষণ করেন। একত্র বিবরণ পাওয়া যায় এইখানে :
(ক) Richard Bell, The Origin of Islam in its Christian Environment, Edinburgh 1926, reprinted, London 1968.
(খ) C.C. Torrey, The Jewish Foundation of Islam, New York 1933; Reprinted with F. Rosenthal's Introduction, 1967.
৫৪. A. Jeffery, Foreign Vocubulary of the Quran, Borado 1937.
৫৫. দেখুন Chapters IV, XI, XII. XIV, XX.
৫৬. A. Rodwell, The Coran, Translation with Suras arranged in Chronological order, London 1876. The first Muslim to follow suit appears to be Mirza Abul Fazl (of Bengal). See his The Quran, Arabic Text and English Translation, arranged chronologically, 1911 (British Museum cat. no. 14512 d15).
৫৭. G. Weil, Historische-kritische Einletung in den Koran, Bielefeld and Leipzig. 1878.
৫৮. W. Muir, The Coran, its Composition and Teaching, Lonod 1878.
৫৯. R. Bell, Introduction to the Qura'n, Edinburg University Press 1953.
৬০. Ibid, 74-78, 83.
৬১. W.M. Watt, "The dating of the Qur'an : A review of Richard Bell's Theories,". J.R.A.S, April 1957, pp 46-56. See also his revised edition of Bell's Introduction to the Qura'n, Edinburg University Press 1970.
৬২. M. Hamidullah's review of Bell's Introduction to the Quran. The Islamic Quarterly, vol. no. 4, Dec. 1954, pp 239-243 (the observation is on p. 240).
৬৩. Watt, "The Dating of the Qura'n etc." op. cit., 53, 55.
৬৪. নীচে দেখুন, চ্যাপটার ২৩, সেকশন ১ ও ২।
৬৫. নীচে দেখুন, চ্যাপটার ৬, সেকশন ২।
৬৬. নীচে দেখুন, চ্যাপটার ৮, সেকশন ৫।
৬৭. নীচে দেখুন, চ্যাপটার ১১, সেকশন ৪।
৬৮. Infra, Chapter XXXI, section III.
৬৯. নীচে দেখুন, Chapter XVIII, section III.
৭০. দৃষ্টান্ত হিসাবে দেখুন Ignaz Goldziher, Mohamedanische Studien (first published 1890), vol II, translated into English by C.R. Barber and S.M. Stern under title Muslim Studies, vol II, London 1971; and A. Guillaume, The Traditions of Islam : An Introduction to the study of the Hadith Literature, Oxford 1924.
৭১. দৃষ্টান্তস্বরূপ দেখুন, Mohsin Abd al-Nazir, Dirasat Goldziher fi al-Sunnah wa makanatuha al-ilmyyah (Arabic text), unpublished ph.D thesis, University of Tunis, 1404/.....; and M. Luqmam Salafi, Naqd al-Hadith, inda al-Muhaddithin sanadan wa matanan wa dahd maza'im al-Mustashriqin, Riyadh 1924.
৭২. N. J. Coulson, A History of Islamic Law, London 1964, pp 64-65. আরও দেখুন তাহার "European Criticism of Hadith Literature" in the Cambridge History of Arabic Literature: Arabic Literature to the end of the Umayyad period, Cambridge 1983, pp 317-321.
৭৩. M.M. A'zamai, Studies in Early Hadith Literature, Beirut 1968, Chaps VI, VII.
৭৪. M.M. A'zami, On Schacht's Origins of Muhammedan Jurisprudence, King Saud University, Riyadh & Jown Willy & Sons, Inc, New York 1985.
৭৫. দেখুন দৃষ্টান্তস্বরূপ Regis Blachere, La Probleme de Mahomet Essai de biographie critique du fondateur de' Islam, Paris 1952.
৭৬. W.M. Watt, Mat. M, XV. আরো দেখুন তাহার "The materials used by Ibn Ishaq" in Bernard Lews & P.M. Holt (eds.), Historians of the Middle-East, London 1962, p. 23-34.
৭৭. Watt, Mat M, XI.
৭৮. Watt, "The reliability of Ibn Ishaq's sources" in La vie Du Prophet Mahomet, Colloque de stransbourg, October 1980 (pp. 31-43). pp. 40-41. Similar support to the isnad system is given also by Maxime Rodinson in "A Critical Survey of Modern Studies on Mohammad" in Marlin Swartz (ed.) Studies In Islam, London 1981 (pp. 23-85), pp. 44.
৭৯. C.H. Becker, Quoted in Historians of the Middle East, op. cit., p. 23.