📘 সীরাত বিশ্বকোষ > 📄 তিন: প্রাথমিক সীরাত/মাগাযী সাহিত্য

📄 তিন: প্রাথমিক সীরাত/মাগাযী সাহিত্য


তিন: প্রাথমিক সীরাত/মাগাযী সাহিত্য
রাসূলুল্লাহ -এর জীবন ও কর্মের বিবরণ পাইবার তৃতীয় উৎস হইতেছে ঘটনাপঞ্জীর প্রাথমিক লেখকদের কিছু রচনাবলী। ২৬ পূর্বেই যেমন উল্লেখ করা হইয়াছে এইগুলিও রিওয়ায়াত বা হাদীছের রূপ ধারণ করিয়া আছে। কিন্তু এইগুলি মোটামুটি কালানুক্রমিকভাবে সন্নিবেশিত। এই ধরনের সর্বাপেক্ষা পুরাতন রচনাবলী হিজরী প্রথম শতকের মাঝামাঝি সময় পাওয়া যায় যখন মদীনার জ্ঞানী-গণ্যমান্য ব্যক্তিবর্গ হাদীছ সংগ্রহ ও সংরক্ষণের কাজে তাঁহাদের মনোযোগ নিবদ্ধ করেন। রাসূলুল্লাহ -এর কর্ম ও বাণী সম্পর্কে তথ্য সংগ্রহ ও সংরক্ষণ এই দুই ধরনের কার্যক্রম অবশ্য একই তাগিদের দুইটি দিক। প্রাথমিক পর্যায়ে মোটামুটি একই মনীষি হাদীছ সংগ্রাহক ও মাগাযী সাহিত্যের সংকলক ছিলেন। মনে রাখিতে হইবে, প্রথম পর্যায়ে 'মাগাযী' শব্দটি বরং শিথিলভাবে ব্যবহার করা হইত যথাযথ সীরাত ও সেই সংগে সামরিক অভিযান বুঝাইবার জন্য। পরবর্তী কালে এই দুইটি শব্দ ভিন্নভাবে ব্যবহৃত হইতে লাগিল।
যিনি সর্বপ্রথম নিজেকে মাগাযীর সহিত সম্পৃক্ত করিয়াছিলেন তিনি ছিলেন আবান ইব্‌ন উছমান (জন্ম ১৫-২০ হি.)। যাঁহার সম্পর্কে আগে উল্লেখ করা হইয়াছে। তিনি মদীনায় (৭৫-৮৩ হি.) খলীফা আবদুল মালিকের গভর্নর ছিলেন। দেখা যায়, তিনি সীরাত সংক্রান্ত বিষয়ে উপকরণ সংগ্রহ করিয়াছিলেন, কিন্তু মাত্র কিছু বিচ্ছিন্ন বিবরণ ব্যতীত আর কিছুই সংরক্ষিত থাকে নাই। অনুরূপভাবে তাঁহার কনিষ্ঠ সমসাময়িক ও মদীনার বিজ্ঞ সম্প্রদায়ের খ্যাতনামা সদস্য
'উরওয়াহ ইব্‌ন আয-যুবায়র ইবন আল-আওয়াম (২৬-৯৪ হি.)-ও এই বিষয়ে নিজেকে নিবেদিত করিয়াছিলেন। তিনি বহু সংখ্যক বিবরণ কেবল সংগ্রহ ও প্রচারই করেন নাই, অধিকন্তু রাসূলুল্লাহ-এর জীবনের বহু সুনির্দিষ্ট ঘটনা সংক্রান্ত তথ্যাবলী একত্র করিয়াছিলেন। খলীফা আবদুল মালিক ও আল-ওয়ালীদের প্রশ্নের উত্তরে উরওয়া অনেক লিখিত বক্তব্য পেশ করেন। ইবন ইসহাক, আল-ওয়াকিদী, ইবন সা'দ ও আত-তাবারী এই সকল বক্তব্যের উদ্ধৃতি দিয়াছেন। এইসব চিঠিপত্রে উরওয়া সাধারণত তাঁহার উৎসের উল্লেখ করিতেন না, যদিও একটি হাদীছ বর্ণনাকালে তিনি স্বাভাবিকভাবে উম্মুল মু'মিনীন আয়েশা (রা)-কে তাঁহার উৎস হিসাবে উল্লেখ করেন। ২৭
তাবি'ঈদের মধ্যে ন্যূনপক্ষে দুইজন যাঁহারা মাগাযী সম্পর্কে চর্চা করিয়াছিলেন, তাহারা হইলেন শুরাবীল ইবন সা'দ (মৃত্যু ১২৩ হি.) এবং ওয়াহ্হ্ব ইন্ন মুনাব্বিহ (৩৪-১১০ হি.)। প্রথমজন যায়দ ইব্‌ন ছাবিত, আবূ হুরায়রা এবং আবূ সা'ঈদ আল-খুদরী (রা) হইতে হাদীছ বর্ণনা করেন। শুরাবীল মদীনার অভিবাসীদের এবং বদর ও উহুদের যুদ্ধে অংশগ্রহণকারীদের তালিকা প্রস্তুত করিয়াছিলেন। কিন্তু তাহাকে বিশ্বাসযোগ্য মনে করা হয় না। ইবন ইসহাক অথবা আল-ওয়াকিদী কেহই তাঁহাকে উদ্ধৃত করেন নাই। কিন্তু ইবন সা'দ রাসূলুল্লাহ-এর কুবা হইতে মদীনায় যাত্রার বিষয়ে তাঁহার বিবরণ উদ্ধৃত করিয়াছেন। ২৮ অন্য মনীষী ওয়াহ্হ্ব ইব্‌ন মুনাব্বিহ ইরানে জন্মগ্রহণকারী দক্ষিণ আরবীয় ছিলেন এবং ইয়াহুদী ও খৃস্টীয় ঐতিহ্যে বিশেষ আগ্রহী ছিলেন। অন্যান্য রচনার মধ্যে তিনি কিতাবুল মুবতাদা ও কিতাবুল মাগাযী সংকলন করিয়াছেন বলিয়া কথিত আছে। ২৯ ইবন ইসহাক, আত-তাবারী, আল-মাসঊদী, ইব্‌ন কুতায়বা প্রমুখ তাহাকে উদ্ধৃত করিয়াছেন। কিন্তু ওয়াত্ব কোথাও তাঁহার বর্ণনার উৎসের উল্লেখ করেন নাই। পরবর্তী পর্যায়ের তাব'উ তাবি'ঈন, অন্ততপক্ষে তিনজন মনীষীর বিশেষ উল্লেখ পাওয়া যায়। তাঁহারা হইতেছেন 'আবদুল্লাহ ইব্‌ন আবূ বাক্স ইন মুহাম্মাদ ইবন আমর ইবন হাম্ম (মৃ. ১৩০/১৩৫ হি.), আসিম ইবন উমার ইব্‌ন্ন কাতাদা (মৃ. ১২০ হি.) এবং মুহাম্মাদ ইন্ন উবায়দুল্লাহ ইব্‌ন আবদুল্লাহ ইব্‌ন শিহাব আয-যুহরী (৫১-১২৪ হি.)।
'আবদুল্লাহ্র পূর্বপুরুষদের, বিশেষ করিয়া তাঁহার পিতা আবু বাক্স ইন মুহাম্মাদ-এর উল্লেখ ইতোমধ্যে করা হইয়াছে। 'আবদুল্লাহ্র পারিবারিক প্রেক্ষাপট মাগাযী সংক্রান্ত উল্লেখযোগ্য পরিমাণ উপাদান সংগ্রহে তাঁহার সহায়ক হয়। ইবন ইসহাক, আল-ওয়াকিদী, ইবন সা'দ ও আত-তাবারী সকলেই তাঁহাকে প্রামাণ্য বিশেষজ্ঞ হিসাবে উল্লেখ করেন এবং প্রায়শ তাঁহাকে উদ্ধৃত করেন। হরোভিজের মতে, ফিহরিস্তে উল্লিখিত কিতাবুল মাগাযী আবদুল্লাহ্ ভাগিনেয়/ভ্রাতুষ্পুত্র (nephew) 'আবদুল মালিকের সংকলন হিসাবে পরিচিত, কিন্তু ইহার কোন চিহ্ন পাওয়া যায় না। সম্ভবত ইহা তাহার পিতৃব্য হইতে সংগৃহীত উপাদানে রচিত। ৩০ 'আবদুল্লাহ্র রচনার বিশেষ দিক এই যে, তিনি রাসূলুল্লাহ-এর অভিযানসমূহের কালানুক্রমিক ধারা প্রতিষ্ঠা করিতে প্রয়াসী হন, যাহা ইবন ইসহাক গ্রহণ করেন। ৩১ আরবের বিভিন্ন রাজন্যবর্গের
হযরত মুহাম্মাদ (স)
নিকট রাসূলুল্লাহ-এর চিঠিপত্র 'আবদুল্লাহ বর্ণনা করিয়াছেন আর গোত্রের প্রতিনিধিবর্গের বিবরণও দিয়াছেন। ৩২ অবশ্যই তিনি তাহার বর্ণনার বেশীর ভাগের উৎস সম্পর্কে কোন উল্লেখ করেন নাই। কখনও কখনও তিনি তাঁহার বিবরণীতে নিজের মতামতও অন্তর্ভুক্ত করিয়াছেন।
আসিম ইব্‌ন 'উমার ইব্‌ন কাতাদা ইব্‌নুন নু'মান মদীনার সম্ভ্রান্ত পরিবারের সন্তান ছিলেন। তাঁহার পিতামহ কাতাদা (রা) রাসূলুল্লাহ-এর ঘনিষ্ঠ সাহাবী ছিলেন। সীরাত ও মাগাযী শাস্ত্রে সুগভীর জ্ঞানের জন্য আসিম খ্যাতি অর্জন করিয়াছিলেন। ৩৩ রাসূলুল্লাহ-এর অভিযানসমূহ ও তাঁহার সাহাবীদের মহৎ কর্ম মানুষের নিকট বর্ণনা করিবার জন্য খলীফা উমার ইব্‌ন আবদুল আযীয তাঁহাকে দামেশকের মসজিদে নিয়োগ করিয়াছিলেন। ৩৪ ইবন ইসহাক ও আল-ওয়াকিদীর মাগাযী শাস্ত্রের অন্যতম প্রধান উৎস ছিলেন তিনি। 'আবদুল্লাহ্ ইব্‌ন আবূ বাক্সের ন্যায় 'আসিম প্রায়ই তাঁহার উৎস সম্পর্কে কোন উল্লেখ করেন নাই। তাঁহার বর্ণনার মধ্যে তিনি নিজের মতামতও মিশাইয়া ফেলিতেন।
মুহাম্মাদ ইব্‌ন মুসলিম ইবন 'উবায়দুল্লাহ ইবন 'আবদুল্লাহ ইব্‌ন শিহাব আয-যুহরী মক্কার বনূ যুরা গোত্রের সদস্য ছিলেন। ৩৫ অন্যান্যরা ছাড়াও উরওয়া ইনুষ যুবায়রের নিকট তিনি শিক্ষালাভ করেন এবং কালক্রমে তাঁহার সময়ের মদীনার সমাজে শ্রেষ্ঠতম বিজ্ঞ ব্যক্তিরূপে পরিগণিত হন। তিনি একাধারে হাদীছ শাস্ত্র, কুলজী শাস্ত্র ও মাগাযী শাস্ত্রে পারদর্শী ছিলেন। অসাধারণ ছিল তাঁহার মেধাশক্তি। সমসাময়িকদের অনেকের ন্যায় তিনিও তাঁহার সংগৃহীত বিবরণ লিখিয়া রাখিতেন ও পরবর্তী বংশধরদের নিকট তাহা পৌছাইয়া দিতেন। তিনি বহু সংখ্যক হাদীছ সংগ্রহ ও লিপিবদ্ধ করেন। তিনি খলীফা 'উমার ইব্‌ন আবদুল আযীয কর্তৃক ইহা সংকলনের জন্য নিয়োগপ্রাপ্ত হন। তাঁহার অন্যান্য রচনাবলীর মধ্যে একটি মাগাযী শিরোনাম গ্রন্থের উল্লেখ পাওয়া যায়, কিন্তু শুধু উদ্ধৃতিস্বরূপ অন্যান্যদের গ্রন্থে ইহা পাওয়া যায়। ৩৬ এইসব উদ্ধৃতিতে, বিশেষ করিয়া ইব্‌ন সা'দের বিবরণে দেখা যায় যে, আয-যুহরী কেবল মাগাযী লইয়াই চর্চা করেন নাই, বরং রাসূলুল্লাহ -এর জীবনের অন্যান্য ঘটনাবলী লইয়াও চর্চা করিয়াছেন। আরও দেখা যায় যে, তিনি সীরাত ও মাগাযী শব্দ দুইটির স্বতন্ত্র সীমারেখা টানিয়া দিয়াছেন। আয-যুহরী সাধারণত তাঁহার বর্ণনায় সূত্রের উল্লেখ করেন, কিন্তু কখনও কখনও তাহা অনুল্লিখিত রাখেন।
সুদীর্ঘ বৈশিষ্ট্যপূর্ণ শিক্ষক জীবনে আয-যুরী বহু ছাত্রকে শিক্ষাদান করেন। ইহাদের মধ্যে তিনজন সীরাত/মাগাযী লেখক হিসাবে খ্যাতি অর্জন করেন। তাহারা হইলেন মূসা ইব্‌ন উকবা (৫৫-১৪১ হি.), মা'মার ইবন রাশেদ (৯৬-১৫৪ হি.) ও মুহাম্মাদ ইবন ইসহাক (৮৫-১৫০ হি.)। প্রধানত আয-যুহরীর শিক্ষাধীনে মূসা ইব্‌ন উকবা মসজিদে নববীতে জ্ঞান অর্জন করেন। তিনি একজন বিশিষ্ট ও নির্ভরযোগ্য লেখক হিসাবে বিবেচিত। তিনি মাগাযী সংক্রান্ত একটি গ্রন্থ সংকলন করেন-যাহা টুকরা টুকরা অংশ ও উদ্ধৃতির আকারে পাওয়া যায়। এই সকল উদ্ধৃতি হইতে ইহা পরিষ্কার যে, তাঁহার প্রধান উৎস ছিলেন আয-যুহরী। আল-ওয়াকিদী, ইবন সা'দ ও আত্-তাবারী বিবিধ বিষয়ে তাঁহার রচনাবলীর সাহায্য গ্রহণ করেন।
মা'মার ইবন রাশেদ বসরায় জন্মগ্রহণ করিলেও ইয়ামানে বসতি স্থাপন করেন। মুহাদ্দিছ হিসাবে সুপরিচিত মা'মার একটি কিতাব আল-মাগাযী সংকলন করেন। পূর্বসূরীদের ন্যায় তাহার রচনাও শুধু উদ্ধৃতি ও অসম্পূর্ণ অংশে টিকিয়া রহিয়াছে। আল-ওয়াকিদী, ইবন সা'দ, আত-তাবারী ও বাল্যয়ুরীর রচনাগুলির মধ্যে তাহা পাওয়া যায়। তাহার বেশীর ভাগ বিবরণ আয-যুহরী সংক্রান্ত। তিনি বাইবেল সংক্রান্ত ইতিহাস ও কিয়দংশে রাসূলুল্লাহ-এর হিজরত-পূর্ব জীবনের প্রতি বেশ মনোযোগ দিয়াছেন। তিনি আল-ওয়াকিদীর প্রধান উৎসের অন্যতম।
আয-যুহরীর ছাত্রদের মধ্যে মুহাম্মাদ ইবন ইসহাক ইন ইয়াসির এই কারণে সুপরিচিত যে, কেবল তাঁহার গ্রন্থ 'কিতাবুল মাগাযী' মোটামুটি পূর্ণ অবয়বে আমরা পাই ইবন হিশাম (মৃ. ২১৮ হি.)-এর সম্পাদনায়। মুহাম্মাদের পিতামহ ইয়াসির আরবদেশীয় খৃস্টান ছিলেন। কিন্তু মুহাম্মাদের পিতা ইসহাক হাদীছের উৎসাহী সংগ্রাহক ছিলেন।
আয-যুহরী ছাড়াও তিনি (ইবন ইসহাক) 'আসিম ইবন 'উমার ইব্‌ন কাতাদা ও 'আবদুল্লাহ ইবন আবূ বাক্সের নিকট জ্ঞান অর্জন করেন এবং মিসর ও ইরাক হইতে প্রাপ্ত অন্যান্য বিবরণ দ্বারা ইহার পরিপূরণ করেন। সরকারীভাবে নিয়োগপ্রাপ্ত না হইলেও তিনি খলীফা আবূ জা'ফর আল-মানসূরের (রাজত্বকাল ১৩৬-১৫৮ হি.) জন্য গ্রন্থ রচনা করেন। ৩৭ ইব্‌ন ইসহাকের একজন প্রত্যক্ষ ছাত্র আল-বাক্বাঈর (মৃ. ১৮৩ হি.) নিকট হইতে প্রাপ্ত একটি গ্রন্থের প্রতিলিপির উপর ভিত্তি করিয়া ইব্‌ন হিশাম তাঁহার সুপরিচিত গ্রন্থ 'আস-সীরাতুন নাবাবিয়্যা' প্রকাশ করেন। ইবন হিশাম অবশ্য উল্লেখ করেন যে, গ্রন্থের আয়তন হ্রাস করার খাতিরে তিনি কিছু পরিবর্তন ও কিছু বর্জন করেন। তবে বিষয়বস্তুর কোন মৌলিক পরিমার্জন তিনি করেন নাই। বদরের যুদ্ধে মক্কাবাসীদের পক্ষে আব্বাস (রা)-এর অবস্থান ও যুদ্ধবন্দী হিসাবে তাঁহার গ্রেপ্তার সংক্রান্ত বিষয়টি (যাহা আত-তাবারী কর্তৃক সংরক্ষিত আছে) তিনি বাদ দেন। 'কিছু লোকের' ভয়ে তিনি এইরূপ করেন। বস্তুত ইব্‌ন হিশাম যাহা বাদ দিয়া যান তাহার অধিকাংশ আত-তাবারী, আল-আযরাকী প্রমুখের গ্রন্থে সংরক্ষণ করা হইয়াছে। ৩৮
বিবরণসমূহের সাধারণ গ্রহণযোগ্যতা থাকিলেও ইব্‌ন ইসহাকের গ্রন্থের মূল্যমান কিছুটা হ্রাস পায় এই কারণে যে, তাঁহার সমসাময়িকদের মধ্যে মালিক ইব্‌ন আনাস ও হিশাম ইব্‌ন 'উরওয়া (র) তাহার বিশ্বাসযোগ্যতা সম্পর্কে সন্দেহ প্রকাশ করিয়াছিলেন। ৩৯ ইব্‌ন ইসহাক নিজে স্বীকার করিয়াছেন যে, তিনি ইয়াহুদী, খৃস্টান ও পারসিকদের নিকট হইতে তথ্য পান এবং তাহাদের লোককাহিনী ও বিবরণগুলি তাঁহার গ্রন্থে অন্তর্ভুক্ত করেন। তাঁহার দেওয়া তথ্য সম্পর্কে তিনি হঠাৎ সন্দেহ প্রকাশ করেন এই বলিয়া ফীমা ইয়ায'উমুনা' (তাহারা যেইরূপ ধারণা করে)।
ইব্‌ন ইসহাকের বয়োকনিষ্ঠ সমসাময়িকদের মধ্যে আবূ মা'শার (নাজিহ্ ইব্‌ন আবদুর রহমান আস-সিন্দী, মৃ. ১৭০ হি.)-এর উল্লেখ করা যায়। তিনি 'কিতাবুল মাগাযী' নামক একটি গ্রন্থ রচনা করেন। ৪০ কিন্তু ইহাও মুখ্যত আল-ওয়াকিদী ও ইব্‌ন সা'দের গ্রন্থে বিচ্ছিন্নভাবে ও উদ্ধৃতির আকারে পাওয়া যায়।
হযরত মুহাম্মাদ (স) ৩৭
প্রাথমিক যুগের মুসলমান মনীষিগণ আবূ মা'শার সম্পর্কে অত্যন্ত বিরূপ মনোভাব পোষণ করিতেন। ৪১ ইবন ইসহাকের আর একজন কনিষ্ঠ সমসাময়িক ইয়াহইয়া ইবন সা'ঈদ আল-উমাবী (১১১/১১৭-১৯৪ হি.) 'কিতাবুল মাগাযী' নামে গ্রন্থ সংকলন করেন। ৪২ কিন্তু ইহাও শুধুমাত্র বিভিন্ন কিতাবে উদ্ধৃতির আকারে পাওয়া যায়। আবদুল্লাহ ইব্‌ন ওয়াহ্ (১২৫-১৯৭ হি.) ইয়াহ্ইয়ার সমসাময়িক ও ইবন ইসহাকের কনিষ্ঠ সমসাময়িক ছিলেন। তিনি আর একটি 'কিতাবুল মাগাযী' প্রণয়ন করেন। ৪৩ ইবন ইসহাকের বয়োকনিষ্ঠ এবং ইব্‌ন ওয়াহ্ ও ইয়াহ্ইয়ার সমসাময়িক ছিলেন খ্যাতনামা গ্রন্থকার 'আবদুর রায্যাক ইবন হাম্মাম (১২৬-২১১ হি.)। তিনিও একটি 'কিতাবুল মাগাযী' লেখেন। ৪৪ ইহা পুনর্লিখিত হয় তাঁহার আল-মুসান্নাফ গ্রন্থে। ৪৫ ইহা সুস্পষ্ট যে, ইব্‌ন ইসহাকের সময় হইতেই রাসূলুল্লাহ-এর জীবন বৃত্তান্ত রচনার প্রক্রিয়া গতিশীল হয়।
প্রাথমিক যুগের মনীষিগণের মধ্যে যাঁহাদের গ্রন্থ মোটামুটি পূর্ণ আকারে টিকিয়াছিল তাঁহাদের মধ্যে সর্বাপেক্ষা উল্লেখযোগ্য হইতেছেন মুহাম্মাদ ইবন উমার আল-ওয়াকিদী (১৩০-২০৭ হি.)। তিনি খলীফা হারুনুর রশীদ ও আল-মা'মূনের সময়ে খ্যাতি অর্জন করেন। তিনি বিখ্যাত মন্ত্রী ইয়াহইয়া ইব্‌ন খালিদ আল-বারমাকীর বিশেষ অনুগ্রহভাজন ছিলেন। আল-ওয়াকিদী বহুমুখী গুণসম্পন্ন ব্যক্তি ছিলেন এবং তিনি অনেক গ্রন্থ সংকলন করেন। ইহার মধ্যে আমরা কেবল 'কিতাবুল মাগাযী'-র খোঁজ পাই। ৪৬ আল-ওয়াকিদী তাঁহার গ্রন্থের উৎস হিসাবে যেসব নির্ভরযোগ্য বিশারদ ব্যক্তির নাম উল্লেখ করিয়াছেন তাঁহাদের মধ্যে আয-যুহরী, মা'মার ও আবূ মা'শার অন্তর্ভুক্ত এবং মাঝেমধ্যে মূসা ইবন 'উব্বাও রহিয়াছেন। তবে ইবন ইসহাক কখনও ইহাদের অন্তর্ভুক্ত ছিলেন না, যদিও হরোভিজ উল্লেখ করেন, "ওয়াকিদী যে ইবন ইসহাকের গ্রন্থ ব্যবহার করিয়াছেন তাহাতে সন্দেহ নাই”। ৪৭ ওয়াকিদী অবশ্য বলেন যে, তিনি যাঁহাদের নাম উল্লেখ করিয়াছেন তাঁহারা ব্যতীত আরও অনেকের তথ্য তিনি গ্রহণ করিয়াছেন। তিনি রাসূলুল্লাহ-এর মদীনার জীবনের প্রতি দৃষ্টি নিবন্ধ করিয়া রাখিয়াছিলেন। তাঁহার সম্পর্কে মুসলিম মনীষিগণ অত্যন্ত বিরূপ মনোভাব পোষণ করেন। প্রায় সর্বসম্মতভাবে একজন ভ্রান্ত ও অবিশ্বাসযোগ্য লেখক হিসাবে তাঁহাকে বর্জন করা হয় এবং যেহেতু নিজের অভিষ্ট লক্ষ্য সাধনে তিনি অন্যায়ভাবে হাদীছ বিকৃত ও বানোয়াট করিয়াছিলেন। ৪৮ তাহার সচিব ইবন সা'দ অবশ্য তাঁহাকে সীরাত ও মাগাযীর একজন প্রামাণ্য গ্রন্থকার হিসাবে বিবেচনা করেন।
শুরুতে আল-ওয়াকিদীর একজন সচিব ও লেখক হইলেও বাস্তব ক্ষেত্রে মুহাম্মাদ ইবন সা'দ (১৬৮-২৩০ হি.)-এর স্বাধীন ও মূল্যবান রচনার পরিচয় পাওয়া যায় তাঁহার 'আত-তাবাকাত আল-কুবরা' গ্রন্থে। এই বিশ্বকোষধর্মী গ্রন্থের প্রথম দুই খণ্ড রাসূলুল্লাহ-এর জীবন ও কর্ম লইয়া রচিত। অন্যগুলি তাঁহার সাহাবীবৃন্দ ও পরবর্তী পর্যায়ের ব্যক্তিবর্গের জীবন বৃত্তান্ত সম্পর্কিত অভিধান। যদিও ইহা আল-ওয়াকিদীর লেখাগুলির উপর ভিত্তি করিয়া রচিত, ইবন সা'দ তাহার রচনায় বিস্তারিত বিবরণ ও পরিপূর্ণ সূত্রাবলীর সমাবেশ ঘটাইয়া একটি পূর্ণাঙ্গ চিত্র তুলিয়া ধরেন।
৩৮ সীরাত বিশ্বকোষ
রাসূলুল্লাহ -এর ব্যক্তিগত বৈশিষ্ট্যগুলির প্রতি তিনি বিশেষ মনোযোগ দেন। তিনি বহু মৌলিক দলীল-দস্তাবেজ উপস্থাপন করেন। তাহার উপাদানসমূহ অধিক সুবিন্যস্ত। তাহার প্রণীত তাবাকাত বা সাহাবী ও তাবিঈগণের জীবনবৃত্তান্ত অত্যন্ত মূল্যবান, যেহেতু ইহা জীবন চরিত্রের বিভিন্ন দিক সম্পর্কে দুষ্প্রাপ্য তথ্য প্রদান করে। ৪৯ মুসলিম মনীষিগণ ইবন সা'দের অনুকূলে অভিমত পোষণ করেন। তিনি একজন নিখুঁত ও বিশ্বাসযোগ্য বর্ণনাকারী (রাবী) হিসাবে বিবেচিত।
বিষয়বস্তু বর্ণনায় তত ব্যাপকতা না থাকিলেও ইব্‌ন সা'দের পরেই ছিলেন ইব্‌ন আবিদ দুনয়া (আবদুল্লাহ ইব্‌ন মুহাম্মাদ ইবন সুফ্যান, জন্ম ২০৮ হি.)। তিনি একখানা 'কিতাবুল মাগাযী' সংকলন করিয়াছিলেন। ৫০ ইহা অবিকল অবস্থায় পাওয়া যায় নাই। বিখ্যাত মনীষী মুহাম্মাদ ইন জারীর আত-তাবারী (২২৪-৩২০ হি.) ইব্‌ন আবিদ দুনয়ার বয়োকনিষ্ঠ সমসাময়িক ছিলেন; কিন্তু খ্যাতিতে তিনি ইন্ন আবিদ দুনয়াকে ছাড়াইয়া গিয়াছিলেন। তাঁহার 'তারীখুর রুসুল ওয়াল-মুলুক' (অথবা তারীখুল উমাম ওয়াল-মুলুক) একটি বিশ্বকোষ গ্রন্থ। ইহার দ্বিতীয় ও তৃতীয় খণ্ডে ৫১ রহিয়াছে রাসূলুল্লাহ-এর জীবন ও কর্মের বিবরণ। ইহার অনেকটা ইবন ইসহাকের গ্রন্থের উপর ভিত্তি করিয়া রচিত। তিনি আল-কুরআনের বিশদ ভাষ্য 'জামি'উল বায়ান 'আন তা'বীলি কুরআন'-এর রচয়িতা। ইহা এই কারণে অনন্য যে, ইহাই প্রথম কুরআন মাজীদের বিশদ ভাষ্য, যাহা হাদীছসমূহের (আছার) উপর প্রতিষ্ঠিত হইয়া আমাদের নিকট পৌছিয়াছে।
বলা হয়, আত্-তাবারীর সহিত সীরাত/মাগাযী রচনার প্রাথমিক যুগের ক্লাসিক্যাল রীতির অবসান ঘটে। তবে লেখালেখির ধারা অব্যাহত থাকে এবং পরবর্তী শতকগুলিতে আরও অনেক সংকলন প্রকাশিত হয়। ৫২ যুগপৎভাবে রাসূলুল্লাহ-এর ব্যক্তিত্ব ও মহৎ কর্মের (شمائل ودلائل) এবং সাহাবী ও তাবিউনের জীবনী সংক্রান্ত রচনাবলী, সেই সংগে আল-কুরআনের ভাষ্য ও হাদীছের আরও সংকলন প্রকাশ পায়।
উপরিউক্ত সংক্ষিপ্ত পর্যালোচনা হইতে ইহা পরিষ্কার যে, পদ্ধতিগতভাবে হাদীছ সংগ্রহ ও সংরক্ষণ এবং সীরাত/মাগাযী রচনা কমপক্ষে প্রথম হিজরী শতকের মধ্যবর্তী সময়ে যুগপৎভাবে শুরু হয়। উভয় কার্যক্রমই রাসূলুল্লাহ ও সাহাবীদের কথা, কর্ম ও অভ্যাস সংক্রান্ত বিবরণ সংগ্রহ ও সংরক্ষণের একই স্পৃহা হইতে শুরু হয়। বস্তুত একই শ্রেণীর মনীষিগণ প্রায় অপরিবর্তনীয়ভাবে এই উভয় ধরনের কর্মে নিমগ্ন হইয়াছিলেন। কিন্তু যেহেতু ঐ সকল হাদীছ যেগুলির সহিত মতাদর্শগত (doctrinal) বা আইনগত (legal) সম্পৃক্ততা ছিল, উহা সংগ্রহ ও রেকর্ডভুক্ত করিতে উহার সূত্র পরস্পর পরীক্ষা ও বিশুদ্ধতা যাচাইয়ে অন্যান্য পদ্ধতি প্রয়োগ করিতে বেশী সতর্ক ছিলেন। ঐতিহাসিক ধরনের বর্ণনার বিষয়ে তাঁহারা ততটা কড়াকড়ি আরোপ করিতেন না।
পবিত্র কুরআন, হাদীছ এবং ক্লাসিক্যাল সীরাত ও অধীনস্থ রচনাবলী পরস্পরের সম্পূরক ও পরিপূরক। রাসূলুল্লাহ-এর জীবন ও কর্মের মোটামুটি পূর্ণাঙ্গ চিত্র পাইবার লক্ষ্যে
হযরত মুহাম্মাদ (স)
আমাদেরকে এই তিনটি উৎসের সবগুলির উপর নির্ভর করিতে হয়। বস্তুত ইবন ইসহাক/ইবন হিশামের রচনাবলী হইতে শুরু করিয়া পবিত্র কুরআন ও হাদীছসমূহ উভয়ই ব্যবহৃত হইয়াছে সীরাত সংক্রান্ত পরবর্তী সকল রচনায়।
যদিও কুরআন মজীদে রাসূলুল্লাহ-এর জীবন ও কর্মের পূর্ণ ঐতিহাসিক বিবরণ পাওয়া যায় না, তথাপি ইহা বিশুদ্ধতা ও সমকালীনতা সংক্রান্ত একটি অসামান্য মহাগ্রন্থ। যে কোন সূত্র, এমনকি সহীহ্ হাদীছে প্রাপ্ত তথ্য বা মতামত অবশ্যই যতদূর সম্ভব আল-কুরআনের আলোকে পরীক্ষা ও যাচাই করিয়া লইতে হইবে। ইহার পরিপন্থী কোন কিছু অথবা কুরআনের ঘটনা, তাৎপর্য ও অন্তর্নিহিত অর্থের সহিত সামঞ্জস্যহীন সবকিছু অবশ্যই অশুদ্ধ ও অগ্রহণযোগ্য বলিয়া প্রত্যাখ্যান করিতে হইবে।
যদিও হাদীছ ও সীরাত/মাগাযী সাহিত্য উভয়ই বিবরণীর সংকলন, তথাপি সহীহ হাদীছের বিবরণকেই প্রাধান্য দিতে হইবে। কারণ বিশুদ্ধতা নিরূপণের নীতির উপর অত্যধিক সতর্কতা অবলম্বন করিয়া এইগুলি স্বীকৃতভাবে সংকলিত হইয়াছে। যদি হাদীছ সংকলনের কোন বর্ণনাসূত্র ও অন্য পরীক্ষার প্রেক্ষিতে সীরাত শাস্ত্রের একই বিষয়ের বর্ণনা অপেক্ষা দুর্বলতর হয়, তাহা হইলে সীরাতের বর্ণনাকে প্রাধান্য দিতে হইবে। শুধু ঐতিহাসিক নহে, অন্যান্য ধরনের অনুসন্ধানেও এই সাধারণ নীতি অনুসৃত হয় : 'দুর্বল প্রমাণকে সবল প্রমাণের নিকট জায়গা ছাড়িয়া দেওয়া' (A weaker evidence must yield place to the stronger)। সীরাত শাস্ত্র চর্চার ক্ষেত্রে এই নীতির নিম্নরূপে ব্যাখ্যা দেওয়া যায় :
(১) যেখানে কোন বিষয়ে বা ব্যাখ্যায় বিশুদ্ধ হাদীছ পাওয়া যায় সেখানে উহার সহিত সঙ্গতিপূর্ণ এমন বিবরণের তুলনায় ইহাকেই প্রাধান্য দিতে হইবে।
(২) যেখানে একই বিষয়ে দুই বা ততোধিক বিশুদ্ধ বর্ণনার বিভিন্ন মত পাওয়া যায়, তবে সেই এক বা একাধিক মতকে, যাহার অনুকূলে কুরআনের সমর্থন পাওয়া যায়, অপেক্ষাকৃত কম প্রামাণ্য বর্ণনা হইতে প্রাধান্য দিতে হইবে।
(৩) উপরিউক্ত ২নং নীতি একই বিষয়ে দুই বা ততোধিক সমান দুর্বল বিবরণীর এইরূপ ভিন্নতার ক্ষেত্রেও প্রযোজ্য।
(৪) যেখানে আল-কুরআন বা কোন সহীহ হাদীছ কোন পয়েন্ট বা বিষয়ে তথ্য প্রদান করে না, সেখানে সীরাত শাস্ত্রে প্রাপ্ত বিবরণ বা তথ্যের উপর নির্ভর করিতে হইবে, যদিও তাহা বিশুদ্ধতার সমস্ত শর্ত পূরণ করে না।
সীরাত/মাগাযী রচনাবলী বর্ণনার সংকলন হইলেও ইহাদের দুইটি গুরুত্বপূর্ণ পরিণতি রহিয়াছে। (এক) এই রচনাগুলি মোটামুটি একই উপাদান সমৃদ্ধ; পরবর্তী প্রত্যেকটি রচনা বেশীরভাগ পূর্ববর্তী রচনার পুনরাবৃত্তি। ইহাতে নূতন বিষয় ও তথ্য সামান্য মাত্র। এই কারণে ইবন ইসহাক/ইন হিশামের গ্রন্থাদি পূর্বসূরীদের রচনার উপর ভিত্তি করিয়া প্রণীত হওয়াতে পরবর্তী গ্রন্থাদি এইগুলিকে অতিক্রম বা রহিত করিতে সক্ষম হয় নাই। সুস্পষ্ট সীমাবদ্ধতা সত্ত্বেও ইহা অদ্যাবধি রাসূলুল্লাহ এর জীবন চরিতের প্রশস্ত খসড়া চিত্রের মূল হিসাবে রহিয়াছে গিয়াছে।
৪০ সীরাত বিশ্বকোষ
(দুই) বিভিন্ন গ্রন্থাদিতে তথ্য ও উপকরণের অভিন্নতা এই ইঙ্গিত দেয় যে, সীরাত ও মাগাযী শাস্ত্রের রচনাগুলির বহু গ্রন্থ আমাদের হস্তগত না হইলেও সম্ভবত সেই কারণে কোন গুরুত্বপূর্ণ বা তাৎপর্যপূর্ণ বিষয় লুপ্ত হয় নাই।

টিকাঃ
২৬. বিস্তারিত বিবরণের জন্য দেখুন J. Horovitz, "The Earliest biographies of the Prophet and their authors" (tr. from German by Marmaduke Pickthal), in Islamic Culture. I, 1927, pp 535-559; II, 1928. pp 22-50, 164-182 and 495-523.
২৭. Recently the available fragments of Urwah's Writings have been collected by M.M. A'zami and published under the title : Maghazi Rasulullah Sallallahu alayhi wa sallama. Riyadh 1401.
২৮. Ibn Sa'd, 1, 237.
২৯. A fragment of the latter work was discovered by C.H. Becker which is preserved in Heidelberg, দেখুন Islamic Culture, I, p 558.
৩০. Ibid, II, 1928. p.26, citing Fihrist, 226.
৩১. Al-Tabari, Tarikh, III, 152-153 (1/1756).
৩২. Ibid, 120-121 (1/1717-1718).
৩৩. Ibn Qutaybah, al-Ma'arif, 466; al-Dhahabi, Siyar, V, 240.
৩৪. Ibn Hajar, Tahdhib, V, 54.
৩৫. আয-যুহরীর পূর্বপুরুষের ধারা রাসূলুল্লাহ -এর পূর্বপুরুষ কিলাব ইবন মুররাহ-এর সহিত মিলিয়া যায়। রাসূলুল্লাহ-এর মাতা আমিনা ও প্রসিদ্ধ সাহাবী সা'দ ইব্‌ন আবী ওয়াক্কাস (রা) যুহরা গোত্রভুক্ত ছিলেন। যুহরা ছিলেন মক্কায় কুরায়শের প্রতিষ্ঠাতা কুসাই ইব্‌ন কিলাবের ভাই।
৩৬. সম্প্রতি মাগাযীর উপর আয-যুহরীর লেখার কিছু অংশ সংগৃহীত হয় এবং ডঃ সুহায়ল যাক্কার কর্তৃক মাগাযী আন্-নাবাবিয়্যাহ শিরোনামে সম্পাদিত হয় (দামেশক ১৪০১/১৯৮১)।
৩৭. Ibn Qutaybah, Al-Ma'arif, p 492. See for a detailed study on Ibn Ishaq, J. Fuck, Muhammad Ibn Ishaq, Frunkfurt-am-Main 1925.
৩৮. A. Guillaume, in him Life of Muhammad : A Translation of Ibn Ishaq's Sirat Rasul Allah (London 1955), has attempted to compile Ibn Ishaq's work from different sources including that of Ibn Hisham but excluding his editions and explanations. Recently Dr. Suhayl Zakkar has edited a version of Ibn Ishaq's work, as reported by Yunus Ibn Bukayr, under caption Kitab al-Siayr Wa al-Maghazi of Ibn Ishaq, Damascus 1398/1978.
৩৯. Ibn Qutaybah, al-Ma'arif, 492; Ibn Hajar, Tahdhib, IX, 42-43.
৪০. Al-Dhahabi, Siyar, VII, 435-436; XII, 609.
৪১. Ibn Hajar, Tahdhib, X, 420-422; Al-Dahabi, Siyar, VII, 437.
৪২. al-Dhahabi, Siyar, 344 : IX, 139, XX, 195; XXIII, 88.
৪৩. Ibid, IX, 225.
৪৪. Ibid, XIX, 306; XXII, 357.
৪৫. al-Musannaf, V, 313-492.
৪৬. The first third of the work was edited and published by Von Kremer in the Bibliotheca Indica series under caption; Waqidi's History of Muhammad's Campaigns, Calcutta 1850. An abridged German version was published by Julius Wellhausen under title : Muhammad in Madinah (Berlin 1882). Recently the complete work has been edited in three volumes by Marsden Jones.
৪৭. Islamic Culture, II, 518.
৪৮. Ibn Hajar, Tahdhib, IX, 363-368; al-Dhahabi, Mizan II, 425-426.
৪৯. Edited by Sachu and others, Lieden 1924-28. A good reprint is that of Dar Sadir, Beirut 1405/1985 in 9 volumes.
৫০. Al-Dhahabi, Siyar, A'lam al-Nubala; XIII, 403.
৫১. Of the Dar al-M"arif Cairo 1978 edition, II volumes.
৫২. See for a list of the more important of these works, Bibliography to the present work।

📘 সীরাত বিশ্বকোষ > 📄 চার: উৎস ও প্রাচ্যবিদগণ

📄 চার: উৎস ও প্রাচ্যবিদগণ


চার: উৎস ও প্রাচ্যবিদগণ
ইহা সুবিদিত যে, কোন কোন প্রাচ্যবিদ বেশ কিছু মূল আরবী গ্রন্থ ও পাণ্ডুলিপি উদঘাটন, সম্পাদনা ও প্রকাশ করিতে সহায়ক হইয়াছিলেন। এইখানে তাহাদের কাজের ঐ দিকগুলি পুনরাবৃত্তি করার কোন অভিপ্রায় নাই, এই বিষয়ে তাহাদের কাজের মূল্যমান হ্রাস করা তো দূরের কথা। এখানে রাসূলুল্লাহ-এর জীবন-চর্চার উৎস ও এইগুলি প্রয়োগের প্রতি তাহাদের দৃষ্টিভঙ্গির প্রধান দিকগুলি দেখানোর কেবল একটি চেষ্টা করা হইয়াছে।
উল্লেখ না করিলেও চলে, প্রাচ্যবিদগণ আল-কুরআনকে আল্লাহ্ বাণী হিসাবে স্বীকার করেন না। তাহারা যদি বিশ্বাস করিতেন, তাহা হইলে সম্ভবত তাহারা আর প্রাচ্যবিদ থাকিতেন না। অপরপক্ষে তাহারা কোন না কোন কৌশলে ইহা আরোপ করার চেষ্টা করেন যে, রাসূলুল্লাহ আল-কুরআনের রচয়িতা। এই ধারণার বশবর্তী হইয়া তাহারা কতকগুলি দূর কল্পনার অবতারণা করেন, যাহা প্রধানত নিম্নরূপ:
(১) তদানীন্তন আরবে প্রচলিত ইয়াহুদীবাদ ও খৃস্টীয় ধ্যানধারণা হইতে আল-কুরআনের (তথা ইসলামের) উৎপত্তি হইয়াছে। ৫৩
(২) রাসূলুল্লাহ-এর সমাজ-ধর্ম সংস্কারের চিন্তা-ভাবনা রাসূলুল্লাহ-এর সময়, পরিবেশ ও পারিপার্শ্বিকতা হইতে উৎসারিত।
(৩) রাসূলুল্লাহ তাঁহার সাহিত্য-রীতি প্রধানত কয়েকজন প্রাচীন আরব কবির নিস্ট হইতে গ্রহণ করিয়াছেন।
(৪) আল-কুরআনের ভাষা সম্পূর্ণ খাঁটি আরবী নহে, যেমনটি দাবি করা হয়, বরং ইহাতে প্রচুর বিদেশী শব্দ আছে। ৫৪
বস্তুত এই প্রশ্নগুলি মুহাম্মাদ-এর নবুওয়াতের সমগ্র প্রকৃতি ও প্রেক্ষাপট এবং ওহী প্রাপ্তির ধরন সম্পর্কিতও। অতএব এইগুলি এই গ্রন্থের যথোপযুক্ত স্থানে যথাসাধ্য আলোচনা করা হইয়াছে। ৫৫
ঊনবিংশ শতক হইতে প্রাচ্যবিদদের মধ্যে আল-কুরআনের মূল পাঠ কালানুক্রমিকভাবে পুনরায় সাজানোর আর একটি প্রবণতা দেখা দেয় (তাহাদের ধারণামতে) মুহাম্মদ-এর চিন্তা-ভাবনা ও দৃষ্টিভংগীর ক্রমবিকাশের সন্ধানে। থিয়োডর নলডেকে ইহার পথিকৃৎ। ইহার উপর ভিত্তি করিয়া এ. রডওয়েল আল-কুরআনের অনুবাদকার্য করেন। ৫৬ অন্যরা, যথা জি. ওয়েল ৫৭ এবং ডব্লু মুইর৫৮ ইহাতে প্রায় একই সাথে কাজ করেন।
অবশ্য এই ধারাটি চূড়ান্ত পর্যায়ে পৌঁছান রিচার্ড বেল। ৫৯ বেল মূলত দুইটি ভ্রান্ত ধারণায় আচ্ছন্ন ছিলেন। যথাঃ (ক) ওহীর স্বাভাবিক মাত্রা (Unit) সংক্ষিপ্ত স্তবকে ছিল এবং (খ) ঐগুলি
হযরত মুহাম্মাদ (স)
সূরা-য় সংযুক্ত করার পূর্বে রাসূলুল্লাহ মূল পাঠ 'সংশোধন' করিয়াছেন। এই ধারণায় প্রভাবান্বিত হইয়া তিনি আল-কুরআনের মূল পাঠকে বিভিন্ন শ্রেণীতে ভাগ করিয়াছেন। এইগুলিকে তিনি 'সংকেত শ্রেণী', 'শ্লোগান শ্রেণী', 'দৈবজ্ঞ শ্রেণী' ইত্যাদি নামে অভিহিত করিয়াছেন। বেল তাহার 'সংশোধন' কল্পনার সমর্থনে কতকগুলি ডাহা মিথ্যা অনুমানের অবতারণা করিয়াছেন। উদাহরণত "তিনি এই মর্মে অমূলক প্রস্তাব খাড়া করিয়াছেন যে, মূল পাঠে 'রিজার্ভেশন' শব্দটি 'ইল্লা' (ব্যতীত) শব্দ দ্বারা পরবর্তীতে যোগ করা হইয়াছে। তিনি অন্যান্য সমজাতীয় স্তবকের ভিতরে (তাহার মতে) দৃশ্যত অপ্রাসংগিক বিষয়ের উপস্থিতির প্রসঙ্গ তোলেন এবং ইহার কারণ হিসাবে ব্যাখ্যা দেন যে, কুরআনের মূল পাঠ এবং সংযোজন একই লেখ্যসামগ্রীর দুই ভিন্ন দিকে লিখিত হওয়ার দরুন সম্পাদনার সময় ইহা মিশ্রিত হইয়া গিয়াছে। ৬০ বেল-এর ধারণাকে সাধারণভাবে সমর্থন করিয়া ওয়াট 'সংশোধন' বিষয়টির প্রতি বিশেষ মনোযোগ দেন এবং বেল-এর কল্পনাপ্রসূত অনুমানের উপর আরও অনুমান স্তূপীকৃত করেন। ৬১
বিষয়টির স্বাধীন অনুশীলন দরকার। এখানে একটি দিকের প্রতি দৃষ্টি আকর্ষণ করিয়া বলা যায় যে, 'প্রাচ্যবিদদের উদ্দেশ্য যতটা না সুস্পষ্ট করা, তাহার চাইতে বেশী হইল বিভ্রান্তি সৃষ্টি করা'। ডঃ এম. হামীদুল্লাহ যেমন বলেন, বেল-এর প্রায় সব অনুমানই এত বেশী শক্ত ও আপত্তি দ্বারা বেষ্টিত, যথা 'সম্ভবত', 'মনে হয়' ও অনুরূপ ধরনের যে, একজন পাঠক প্রায়শই বুঝিতে পারেন না লেখক কি বুঝাইতে চাহেন। দৃষ্টান্তস্বরূপ, বেল-এর Introduction to the Qur'an- এর ৭৫ পৃষ্ঠায় আছে, "এই শ্লোগানগুলির (sic) তারিখ নির্ণয় করা শক্ত এবং ইহা সন্দেহপূর্ণ। কুরআনে অন্তর্ভুক্ত এইগুলির কোন্টি বেশী আগের, যদিও এইগুলির কতকগুলি সেইরূপই হইবে”। ৬২ বেল-এর ধারণার ভ্রান্ত প্রকৃতি স্বীকার করিয়া ওয়াট মন্তব্য করেন, "আমরা যদি এইরূপ সন্দেহ পোষণ করিয়াই থাকি যে, মূল পাঠের বর্তমান রূপ (order) ধারণ করিয়াছে লেখ্য-সামগ্রীর দুই দিক ব্যবহারের দরুন, আমরা নিশ্চয়তার সহিত বলিতে পারি না কোনটার পিছনে কোনটা ছিল”। "কিছু পদ্যের প্রত্যেক অংশের পৃথকভাবে তারিখ নির্ণয়ের বিষয়টি এখন একটি প্রশ্ন হইয়া দাঁড়াইয়াছে। পুনঃ পরীক্ষার ক্ষেত্রে, এমনকি একটিমাত্র শব্দের ভিন্ন তারিখও পদ্যের অবশিষ্ট হইতে পারে”। ৬৩
আল-কুরআনের অংশগুলির এই ধরনের তারিখ নির্ধারণের উপর ভিত্তি করিয়া, যাহাকে প্রাচ্যবিদগণ রাসূলুল্লাহ -এর চিন্তা ও ধ্যান-ধারণার ক্রমবিকাশ বলিয়া মনে করেন, তাহাই খুঁজিতে চেষ্টা করেন। যেগুলিকে ওয়াট আল-কুরআনের অতি পূর্বের অংশ বলিয়া বিবেচনা করেন, তাহা হইতেই তিনি নিজের বাছাই পর্ব সারেন এবং তাহাকে উপাদান করিয়া এই মর্মে ইঙ্গিত দেন যে, প্রচারের শুরুতে তাওহীদ (একত্ববাদ) সম্পর্কে রাসূলুল্লাহ -এর শুধু অস্পষ্ট ও অসম্পূর্ণ ধারণা ছিল। ৬৪ সীরাত সংক্রান্ত পর্যালোচনায় প্রাচ্যবিদদের আল-কুরআন ব্যবহারের অন্যান্য বৈশিষ্ট্য নিম্নরূপ:
(ক) হাদীছ ও সীরাত সাহিত্যের তথ্যাবলী পরস্পর মিলাইয়া না দেখিয়া ও সম্পূরণ না করিয়া কুরআনের প্রমাণসমূহ বিচ্ছিন্নভাবে বিবেচনা করা। দৃষ্টান্তস্বরূপ তাহারা বলেন, যেহেতু কোন মক্কী
সীরাত বিশ্বকোষ ৪২ সূরাতে 'মুহাম্মাদ' নামটি নাই, রাসূলুল্লাহ মদীনার জীবনকালে নামটি গ্রহণ করেন। ৬৫ অন্যান্য প্রমাণ হইতে কুরআনের প্রমাণকে একই পদ্ধতিতে বিচ্ছিন্ন করিয়া ইহা দেখাইবার চেষ্টা করা হইয়াছে যে, মক্কায় মুসলমানদের উপর অত্যাচার-নিপীড়ন যেমন কঠিন ছিল না, তেমনি রাসূলুল্লাহকে হত্যা করারও কোন প্রচেষ্টা ছিল না।
(খ) বিষয়বস্তু হইতে একটি অংশ বাহির করিয়া তাহার স্থলে একটি ভ্রান্ত ব্যাখ্যা বসাইয়া দেওয়া। আল-কুরআনের দলীল-প্রমাণের এই ধরনের ব্যবহার দ্বারা তাহারা এই ইঙ্গিত দেন, আয়াত ৫৩: ১১-১৮ (সূরা আন-নাজম)-এ আল্লাহকে দেখিয়াছেন বলিয়া রাসূলুল্লাহ দাবি করিয়াছেন। ৬৬
(গ) অন্য অংশ বাদ দিয়া আয়াতের শুধু একটি অংশ গ্রহণ বা ইহার উপর জোর দেওয়া এবং এই প্রকার আয়াতের প্রতি এমন একটি অর্থ আরোপ করা যাহা সমগ্র আয়াতের প্রকৃত অর্থের বিপরীত। এই ধরনের কার্যকলাপের একটি উদাহরণ এই যে, তাহারা ইঙ্গিত করেন, আয়াত ১৬: ১০৩ (সূরা আন-নাহল)-এ কুরআন দেখাইয়াছে যে, জনৈক ব্যক্তি নবীকে শিক্ষাদান করিয়াছে। ৬৭
(ঘ) সুনির্দিষ্ট ধারণার প্রতি সমর্থন পাওয়ার লক্ষ্যে, উদাহরণস্বরূপ, আয়াত ১৭: ৭৪ (সূরা আল-ইসরা)-এর এমন ব্যাখ্যা করা হইয়াছে যে, অবিশ্বাসীদের সংগে আপোষ করিবার ইচ্ছা রাসূলুল্লাহ-এর মধ্যে এত প্রবল ছিল যে, তাঁহাকে নিবৃত্ত করিতে আল্লাহকে হস্তক্ষেপ করিতে হইয়াছিল। ৬৮
(ঙ) অন্যান্য ভাবার্থকে বর্জন করিয়া কেবল একটি ভাব বা শব্দার্থের আবরণের উপর জিদ করিয়া লাগিয়া থাকা। একটি দৃষ্টান্ত: ওহীকে শুধু Suggestions (ইঙ্গিত) অর্থে ব্যাখ্যা করা হইয়াছে, আল্লাহ্র নিকট হইতে প্রাপ্ত বাচনিক যোগাযোগের অর্থে নহে। ৬৯
প্রাচ্যবিদগণ যেমন আল-কুরআনের ক্ষেত্রে, তেমনি হাদীছের ক্ষেত্রেও সীরাত ও ইসলামের উপর সর্বাপেক্ষা গুরুত্বপূর্ণ তথ্যের দ্বিতীয় উৎসকে বিতাড়িত করার প্রয়াস পাইয়াছেন। ৭০ দেখাইবার চেষ্টা করা হইয়াছে যে, হাদীছশাস্ত্র খুব আগে হইলেও ইসলামের দ্বিতীয় শতকে অস্তিত্ব লাভ করে, ইহার সূত্র পদ্ধতি নির্ভরযোগ্য নহে এবং সব না হইলেও ইহার বেশীর ভাগ বিবরণ রাজনীতি, বদ্ধমূল ধারণা, ব্যবহার শাস্ত্র ও আদর্শগত কারণে ইসলামের দ্বিতীয় ও তৃতীয় শতকে জরুরী অবস্থার প্রয়োজনে জালিয়াতি প্রসূত। বলিতে গেলে, জে. সাট্ট (Schacht) ১৯৫০ সালে প্রকাশিত তাহার 'Origins of Muhammedan Jurisprudence গ্রন্থে পূর্ববর্তীদের বিতর্ক ও ধৃষ্টতাকে চরমে লইয়া গেলেন। পূর্বসূরীদের মতবাদকে পরিপূরণ ও সমর্থন করা ছাড়াও সাট্ দুইটি অদ্ভুত ধারণা পেশ করিয়াছেন। যথা:
(ক) ইসলামী আইন ইসলাম ধর্মের আওতার বাহিরে পড়ে, যাহাতে আল-কুরআনকে কার্যত ইচ্ছাকৃতভাবে ইসলামী ব্যবহার শাস্ত্রের (Jurisprudence) উৎস হিসাবে অগ্রাহ্য করা যায়।
(খ) বাহ্যত ঐতিহাসিক হাদীছও সন্দেহমুক্ত নহে। কারণ (তাহার মতে) ইহাও ব্যবহার শাস্ত্রের বিবেচনায় প্রণীত হইয়াছিল।
হযরত মুহাম্মাদ (স) ৪৩ মুসলিম মনীষিগণ এইসব তত্ত্ব ও ধারণাকে মোটেই গ্রহণযোগ্য বলিয়া মনে করেন না। ৭১ এমনকি বহু পাশ্চাত্য পণ্ডিতও সাচটের চূড়ান্ত উপসংহারকে গ্রহণ করা কষ্টকর বলিয়া মনে করেন। উদাহরণস্বরূপ, এন. জে. কাউলসন (Coulson) সাফ্টের রচনাকে অন্যথায় অনুমোদন করিলেও এই মর্মে দৃষ্টি আকর্ষণ করিয়া বলেন যে, তাহার প্রতিপাদ্য 'পদ্ধতিগতভাবে এই ধারণা পর্যন্ত উন্নত যে, 'আইনগত ঐতিহ্যের প্রমাণ আমাদিগকে প্রায় হিজরীর এক শত বৎসর পিছনে লইয়া যায় এবং যখন রাসূলুল্লাহ -এর প্রত্যেক আদেশ-নির্দেশের বিশুদ্ধতাকে অস্বীকার করা হয়, তখন একটি শূন্যতার সৃষ্টি হয় বা সৃষ্টি করা হয়, প্রথমদিকের মুসলমান সমাজে আইনের বিকাশের ক্ষেত্রে। বাস্তব দৃষ্টিভংগীর দিক ও বিদ্যমান অবস্থা বিবেচনা করিলে এই ধরনের শূন্যতার ধারণা গ্রহণ করা দুষ্কর। ৭২
সাটের মতামত ও ধারণার বিশেষ পর্যালোচনা করিয়াছেন এম.এম. আ'জামী। দেখানো হইয়াছে যে, 'ইসনাদ' (সূত্র) সম্পর্কে সাক্টের অভিমত ভ্রান্ত ৭৩ এবং 'জীবন্ত ঐতিহ্য' (Living Tradition) ও রাসূলুল্লাহ -এর উপর ইহার অভিক্ষেপ সম্পর্কে তাহার ধারণা মোটেও সুপ্রতিষ্ঠিত নহে। ৭৪ রাসূলুল্লাহ -এর সুনির্দিষ্ট বিচার সম্পর্কীয় কর্ম (Juridical activities)-ও সেই সংগে ইসলামের প্রথম শতকের আইন সংশ্লিষ্ট (Legal) সাহিত্যের প্রসংগে দেখানো হইয়াছে যে, ইসলামের প্রথম শতাব্দীতে আইনের ভিত্তি আল-কুরআন ও সুন্নাহ নহে, সাটের এই ধারণা ভ্রান্ত। সাক্টের নিজস্ব যুক্তি এবং তাহার বর্ণিত বিষয়বস্তু ও সূত্রগুলিকে বিশদভাবে উদ্ধৃত করিয়া আ'জামী এই মর্মে দৃঢ় প্রত্যয় সৃষ্টিকারী যুক্তির সহিত প্রমাণ করিয়া দিয়াছেন যে, সাফ্ট প্রতি ক্ষেত্রে তাহার যুক্তি-তর্ককে বিষয়বস্তুর বাহিরে লইয়া গিয়াছেন বা বিষয়বস্তুকে ভুল বুঝিয়াছেন বা ভুল ব্যাখ্যা করিয়াছেন এবং অন্যথায় তাহার ধারণা ও উপসংহারকে এমনভাবে পেশ করিয়াছেন যে, ঐগুলির সমর্থনে তিনি যেসব প্রমাণ উপস্থাপন করেন তাহা পূর্ণভাবে প্রতিষ্ঠিত হয় নাই। আরও দেখা যায় যে, আইনজ্ঞ ব্যক্তিবর্গ, যেমন ইমাম মালিক সম্পর্কে অভিমত গড়িয়া তুলিতে তাঁহাদের নিজস্ব রচনাবলীর উপর সাফ্ট নির্ভর করেন নাই, নির্ভর করিয়াছেন তাঁহাদের সম্পর্কে সমসাময়িক বা নিকট সমসাময়িকগণ যাহা বলিয়াছেন তাহার উপর।
হাদীছ সম্পর্কে গোল্ডজিহার-সাফ্ট-এর এইরূপ ভ্রান্ত ও যুক্তিহীন ধারণার উপর নির্ভর করিয়া এইগুলিকে প্রাচ্যবিদগণ সচরাচর নবীর জীবন-চরিতের সূত্র হিসাবে গ্রহণ করিয়াছেন। হাদীছের প্রতি এই দৃষ্টিভংগী এবং আল-কুরআন সম্পর্কে তাহাদের ধারণা সাধারণত সীরাত সাহিত্যের প্রতি তাহাদের মনোভাবকেই নির্ধারিত করে। এইভাবে এক শ্রেণীর পণ্ডিত এই অবস্থান নেন যে, সীরাত সাহিত্য মূলত জীবনেতিহাসের ধারায় হাদীছের উপাদান হইতে সাজানো হইয়াছে। কিন্তু যেহেতু হাদীছ সাহিত্য নির্ভরযোগ্য নহে এবং তাহা যে কোন ক্ষেত্রে কেবল কুরআনের উপাদানের সম্প্রসারণ মাত্র, সেইহেতু আল-কুরআন রাসূল-জীবনের একমাত্র স্বাধীন উৎস। কিন্তু এতদসত্ত্বেও যেহেতু আল-কুরআন সময়ানুক্রমিক বিস্তারিত বিবরণ দেয় না এবং নিজেকে সীমিত রাখে প্রসংগের পরোক্ষ উল্লেখের মধ্যে মাত্র, সেইহেতু রাসূলুল্লাহ -এর জীবনের সঠিক বৃত্তান্ত
৪৪ সীরাত বিশ্বকোষ
কদাচিৎ জানা যায়। অন্য কথায়, রাসূলুল্লাহ -এর ব্যাপারে একটি প্রায় অনতিক্রম্য ঐতিহাসিক 'সমস্যা' রহিয়া গিয়াছে। ৭৫
এই গ্রুপের সহিত ভিন্নমত পোষণ করিয়া, প্রাচ্যবিদগণের অন্য গ্রুপটি, আল-কুরআনের মূল্যকে অস্বীকার না করিলেও, সীরাত-সাহিত্যকে মহানবী -এর জীবনীর প্রধান উৎস বলিয়া গণ্য করেন। ওয়াট এই অবস্থার একটি সারসংক্ষেপ এইভাবে দেন : "বাস্তব ক্ষেত্রে পাশ্চাত্যের জীবনীকারগণ যাহা করিয়াছেন তাহা হইল..... সীরাত প্রদত্ত চিত্রের প্রশস্ত বাহ্যিক সীমারেখার বিশুদ্ধতাকে গ্রহণ ও ইহাকে একটি অবকাঠামো হিসাবে ব্যবহার করা এবং ইহার ভিতরে যতদূর সম্ভব কুরআনের উপকরণ দিয়া পূর্ণ করা। অধিকতর বিচক্ষণ পদ্ধতি হইতেছে কুরআন ও প্রথমদিকের চিরাচরিত বিবরণকে পরিপূরক উৎস হিসাবে সম্মান প্রদর্শন...”। ৭৬
উপরে ব্যবহৃত 'প্রথম দিকের চিরাচরিত বিবরণ' (The early traditional accounts) কথাটি সীরাত সাহিত্য প্রসংগে বলা হইয়াছে, হাদীছ প্রসংগে নহে, যাহার জন্য ওয়াট অন্য একটি শব্দ 'anecdotes' (ক্ষুদ্র সত্য কাহিনী) ব্যবহার করিয়াছেন। ৭৭ সীরাত সাহিত্যের বিবরণের সমর্থনে ওয়াট, মনে হয়, তাহাকে রক্ষা করিয়াছে যাহাকে পারিবারিক 'ইসনাদ' (সূত্র) রীতি বলা হয়, ৭৮ যদিও সাধারণত অন্যান্য প্রাচ্যবিদদের ন্যায় তিনিও হাদীছশাস্ত্রের ইসনাদ রীতিকে অতি অল্প মূল্যের বলিয়া মনে করেন।
প্রথম গ্রুপের পণ্ডিতগণ তাহাদের এই চিন্তাধারায় সত্যের কাছাকাছি পৌছান যে, সীরাতশাস্ত্র কমবেশি হাদীছ শাস্ত্রের আর একটি ভাষ্য। কিন্তু তাহারা খুব ভুল করেন যখন তাহারা মনে করেন যে, স্বাধীন ঐতিহাসিক উপাদানের কিছুই সীরাত শাস্ত্রে নাই। বিশেষ উল্লেখ্য, তাহারা ভুল করেন যখন তাহারা ধরিয়া লন, যেমন তাহাদের মুখপাত্র বলেন, "যে খৃস্টীয় ঐতিহাসিক সূত্র যাহা আলৌকিক ব্যক্তিত্ব ও যিশুর ঈশ্বরত্বকে সত্যায়িত করে", ইসলামের প্রতিষ্ঠাতার জন্য ঠিক তাহাই করার প্রয়োজনীয়তা দেখা দেয় এবং "ইতোপূর্বে বিদ্যমান ধর্মমত ও বিচার সংক্রান্ত হাদীছ সংগৃহীত ও কালানুক্রমিকভাবে সাজানো হয়”। ৭৯ আলাদাভাবে, অনুমানের বিশুদ্ধতার প্রশ্নে সুনির্দিষ্টভাবে বলা যায় যে, রাসূলুল্লাহ -এর প্রতি একই রকম অলৌকিকত্ব আরোপ করার উদ্দেশ্যে ভবিষ্যতে ব্যবহারের জন্য অভিসন্ধিমূলকভাবে পূর্বেই প্রস্তুত উপাদান লইয়া সীরাত শাস্ত্র রচিত হয় নাই।
তদ্রূপ দ্বিতীয় দলের পণ্ডিতগণ সঠিক, যখন তাহারা বলেন যে, সীরাত শাস্ত্র রাসূলুল্লাহ -এর জীবনের বিস্তৃত রূপরেখা প্রদান করে। কিন্তু তাহারা ভ্রান্ত, যখন তাহারা মনে করেন যে, সীরাত শাস্ত্র, যদিও সাহিত্যের অবয়ব হইতে ভিন্ন, মূলত হাদীছ শাস্ত্র হইতে পৃথক অথবা এই দুইটির ক্রমবিকাশ হইয়াছে ভিন্ন দুইটি পৃথক ভাগে (Water light), দুই ভিন্ন সময়ে, প্রথমটি গোড়ার দিকে ও পরেরটি পরবর্তী সময়ে। যেমন পূর্বেই দেখানো হইয়াছে, সীরাতশাস্ত্র সংকলন শুরু হয় নবী -এর হাদীছ সংগ্রহ ও সংরক্ষণের একই তাকিদ হইতে এবং হাদীছ সংগ্রহ ও
হযরত মুহাম্মাদ (স)
সংরক্ষণের কাজ সাথে সাথে শুরু হয়; অতি বিলম্বে হইলেও ইসলামের প্রথম শতাব্দীর দ্বিতীয়ার্ধে এবং একই দলের মনীষিগণের দ্বারা।
সীরাত শাস্ত্রের প্রতি ভিন্ন দৃষ্টিভংগী থাকিলেও কার্যত উভয় দলের মনীষিগণ রাসূলুল্লাহ -এর জীবনী আলোচনায় তিনটি উৎসের সবগুলিই কমবেশি ব্যবহার করেন। সীরাত শাস্ত্রের (হাদীছ শাস্ত্রেরও) বিবরণ সংক্রান্ত বিষয়ে তাহারা প্রায় একই পদ্ধতি গ্রহণ করেন, যেমন তাঁহারা করেন আল-কুরআনে বর্ণিত প্রমাণ সংক্রান্ত বিষয়ে। তাই তাহারা প্রায়শ (ক) একই বিষয়বস্তুর উপর একটি বিশেষ বিবরণ আলাদা করিয়া লন, ইহাকে পরস্পর না মিলাইয়া অথবা কুরআনের বা অন্য প্রমাণের সম্পূরক না করিয়া; (খ) দৃষ্টিকৌণিক মিল থাকিলে, সংশ্লিষ্ট বিবরণের বিশুদ্ধতার প্রশ্নটি বিবেচনা না করিয়া বা একই বিষয়ে অন্যান্য বিবরণ (যাহার মধ্যে ভিন্নমত প্রদানের প্রবণতা আছে) বিবেচনায় না আনিয়া, দুর্বলতর, এমনকি সকল বিবরণের ব্যবহার করেন; (গ) বিষয়বস্তু বহির্ভূত বিবরণ নেন এবং ইহার ভ্রান্ত ও অসমর্থনযোগ্য ব্যাখ্যা প্রদান করেন; (ঘ) একটি নির্দিষ্ট ভংগীকে সমর্থনের নিমিত্তে বিবরণের মাত্র একটি অংশগ্রহণ করেন, সমগ্র বর্ণনা (যাহা একটি ভিন্ন চিত্র দিত) না লইয়া এবং (ঙ) ইহা করিতে বর্ণনাকারী বা গ্রন্থকারদের উপর মতলব আরোপ করেন, যাহা কোনভাবেই সপ্রমাণিত নহে।
বর্তমান গ্রন্থে আরও অগ্রসর হইলে, কি সীরাত কি হাদীছ সংক্রান্ত প্রাচ্যবিদদের বর্ণনার সব ও প্রত্যেকটি দিক সুস্পষ্ট ফুটিয়া উঠিবে।
অনুবাদ: আজিজুর রহমান

টিকাঃ
৫৩. প্রায় সব প্রাচ্যবিদ এই মত পোষণ করেন। একত্র বিবরণ পাওয়া যায় এইখানে :
(ক) Richard Bell, The Origin of Islam in its Christian Environment, Edinburgh 1926, reprinted, London 1968.
(খ) C.C. Torrey, The Jewish Foundation of Islam, New York 1933; Reprinted with F. Rosenthal's Introduction, 1967.
৫৪. A. Jeffery, Foreign Vocubulary of the Quran, Borado 1937.
৫৫. দেখুন Chapters IV, XI, XII. XIV, XX.
৫৬. A. Rodwell, The Coran, Translation with Suras arranged in Chronological order, London 1876. The first Muslim to follow suit appears to be Mirza Abul Fazl (of Bengal). See his The Quran, Arabic Text and English Translation, arranged chronologically, 1911 (British Museum cat. no. 14512 d15).
৫৭. G. Weil, Historische-kritische Einletung in den Koran, Bielefeld and Leipzig. 1878.
৫৮. W. Muir, The Coran, its Composition and Teaching, Lonod 1878.
৫৯. R. Bell, Introduction to the Qura'n, Edinburg University Press 1953.
৬০. Ibid, 74-78, 83.
৬১. W.M. Watt, "The dating of the Qur'an : A review of Richard Bell's Theories,". J.R.A.S, April 1957, pp 46-56. See also his revised edition of Bell's Introduction to the Qura'n, Edinburg University Press 1970.
৬২. M. Hamidullah's review of Bell's Introduction to the Quran. The Islamic Quarterly, vol. no. 4, Dec. 1954, pp 239-243 (the observation is on p. 240).
৬৩. Watt, "The Dating of the Qura'n etc." op. cit., 53, 55.
৬৪. নীচে দেখুন, চ্যাপটার ২৩, সেকশন ১ ও ২।
৬৫. নীচে দেখুন, চ্যাপটার ৬, সেকশন ২।
৬৬. নীচে দেখুন, চ্যাপটার ৮, সেকশন ৫।
৬৭. নীচে দেখুন, চ্যাপটার ১১, সেকশন ৪।
৬৮. Infra, Chapter XXXI, section III.
৬৯. নীচে দেখুন, Chapter XVIII, section III.
৭০. দৃষ্টান্ত হিসাবে দেখুন Ignaz Goldziher, Mohamedanische Studien (first published 1890), vol II, translated into English by C.R. Barber and S.M. Stern under title Muslim Studies, vol II, London 1971; and A. Guillaume, The Traditions of Islam : An Introduction to the study of the Hadith Literature, Oxford 1924.
৭১. দৃষ্টান্তস্বরূপ দেখুন, Mohsin Abd al-Nazir, Dirasat Goldziher fi al-Sunnah wa makanatuha al-ilmyyah (Arabic text), unpublished ph.D thesis, University of Tunis, 1404/.....; and M. Luqmam Salafi, Naqd al-Hadith, inda al-Muhaddithin sanadan wa matanan wa dahd maza'im al-Mustashriqin, Riyadh 1924.
৭২. N. J. Coulson, A History of Islamic Law, London 1964, pp 64-65. আরও দেখুন তাহার "European Criticism of Hadith Literature" in the Cambridge History of Arabic Literature: Arabic Literature to the end of the Umayyad period, Cambridge 1983, pp 317-321.
৭৩. M.M. A'zamai, Studies in Early Hadith Literature, Beirut 1968, Chaps VI, VII.
৭৪. M.M. A'zami, On Schacht's Origins of Muhammedan Jurisprudence, King Saud University, Riyadh & Jown Willy & Sons, Inc, New York 1985.
৭৫. দেখুন দৃষ্টান্তস্বরূপ Regis Blachere, La Probleme de Mahomet Essai de biographie critique du fondateur de' Islam, Paris 1952.
৭৬. W.M. Watt, Mat. M, XV. আরো দেখুন তাহার "The materials used by Ibn Ishaq" in Bernard Lews & P.M. Holt (eds.), Historians of the Middle-East, London 1962, p. 23-34.
৭৭. Watt, Mat M, XI.
৭৮. Watt, "The reliability of Ibn Ishaq's sources" in La vie Du Prophet Mahomet, Colloque de stransbourg, October 1980 (pp. 31-43). pp. 40-41. Similar support to the isnad system is given also by Maxime Rodinson in "A Critical Survey of Modern Studies on Mohammad" in Marlin Swartz (ed.) Studies In Islam, London 1981 (pp. 23-85), pp. 44.
৭৯. C.H. Becker, Quoted in Historians of the Middle East, op. cit., p. 23.

লিঙ্ক শেয়ার করুন
close

লিঙ্ক কপি করুন

0:00
0:00