📄 উসামা বাহিনীর উবনায় উপস্থিতি
উবনা হইল বালকার দিকে সিরিয়ার একটি স্থান। মতান্তরে উহা মৃতার একটি গ্রামের নাম। হযরত আবূ বাক্স (রা)-এর বিদায় দানের পর উসামা (রা) যুদ্ধক্ষেত্রের দিকে দ্রুত রওয়ানা হন। তাহারা জুহায়না, কুদা'আ ইত্যাদি মুসলিম অধ্যুষিত জনপদ অতিক্রম করিয়া ওয়াদিউল কুরা নামক স্থানে অবস্থান করেন। সেখান হইতে বানু উযরা গোত্রের হুরায়ছ নামক এক বক্তিকে লক্ষ্যস্থল 'উবনার' সর্বশেষ পরিস্থিতি সম্পর্কে সংবাদ সংগ্রহের জন্য প্রেরণ করেন। ইহা ছিল 'উবনা' হইতে দুই দিনের দূরত্বে অবস্থিত। হুরায়ছ নির্দেশমত দ্রুত রওয়ানা করেন এবং সার্বিক খবরাখবর অবহিত হইয়া উসামা (রা)-এর নিকট ফিরিয়া আসেন। তিনি এই মর্মে সংবাদ প্রদান করেন যে, সেখানকার লোক যুদ্ধ সম্পর্কে উদাসীন এবং প্রতিরোধের ক্ষেত্রে ঐক্যবদ্ধ নহে। তাহার কথামত উসামা (রা) সেনাবাহিনী লইয়া অগ্রসর হন (ওয়াকিদী, প্রাগুক্ত) এবং ঐক্যবদ্ধভাবে শত্রুপক্ষকে আক্রমণ করিবার নির্দেশ দেন। তিনি ঘোষণা করিলেন, কেহ জোরে কথা বলিবে না, বিচ্ছিন্ন হইবে না, কেহ পলায়ন করিলে তাহাকে ধরিয়া আনিবার জন্য অত্যধিক চেষ্টা করিবে না। অন্তরে সব সময় আল্লাহর যিক্র জারী রাখিবে, তরবারি উন্মুক্ত করিয়া রাখিবে। একমাত্র যাহাদের উপর আক্রমণ করা হইতেছে তাহারা ব্যতীত অন্য কেহ যেন আক্রমণ করিবার কথা বুঝিতে না পারে, সেইদিকে লক্ষ্য রাখিবে। এই অভিযানে একে অপরকে আহ্বান করিবার বিশেষ একটি বাক্য নির্ধারিত ছিল। তাহা হইল: (يا منصور امت )হে বিজয়ী! হত্যা কর)! এই ধ্বনির মাধ্যমেই শত্রুর অবস্থান সম্পর্কে সতর্ক করা হইত। যুদ্ধে বহুলোক হত্যা করা হইল এবং অনেককে বন্দী করা হইল। আগুন জ্বালাইয়া শত্রুদের ঘর-বাড়ী ক্ষেত-খামার ও গাছপালা ভস্মীভূত করিয়া দেওয়া হইল। মুসলিম বাহিনী বিজয় লাভ করিল। একজন মুসলিম সৈন্যও এই যুদ্ধে শাহাদাত বরণ করেন নাই (ওয়াকিদী, প্রাগুক্ত)। ওয়াকিদী বর্ণনা করেন, পতাকা বহনকারী বুরায়দা (রা) উসামা (রা)-কে লক্ষ্য করিয়া তাঁহার পিতা যায়দ (রা)-এর উদ্দেশ্যে রাসূলুল্লাহ (স)-এর নিম্নোক্ত ওসিয়াতটি আক্রমণের পূর্ব মুহূর্তে স্মরণ করাইয়া দিতে বলেন: শত্রুদিগকে ইসলামের দাওয়াত দিবে, যদি তাহারা তোমার দাওয়াত গ্রহণ করে, তাহা হইলে তাহাদিগকে দুইটি বিষয়ে অধিকার প্রদান করিবে। যদি তাহারা স্ব-স্ব আবাস ভূমিতে বসবাস করিতে চায়, তাহা হইলে তাহারা বেদুঈন মুসলমানদের মত অধিকার ভোগ করিবে। মুসলমানদের সহিত থাকিয়া জিহাদ করা ব্যতীত তাহারা অন্য কোন গনীমত ও ফাইয়ের মালের অংশীদার হইবে না। আর তাহারা যদি দারুল ইসলামে চলিয়া আসে, তাহা হইলে মুহাজিরগণ যেই সকল সুযোগ-সুবিধা ভোগ করিতেছে, তাহারাও তাহা ভোগ করিবে।
উসামা (রা) তাহা শুনিয়া বলিলেন, হ্যাঁ, এইরূপ ওসিয়াত ছিল আমার পিতার জন্য। কিন্তু রাসূলুল্লাহ (স) আমাকে নির্দেশ দিয়াছেন, আমি যেন দ্রুত জিহাদে রওয়ানা হই এবং পূর্বেই শত্রুদের সম্পর্কে খবরাখবর সংগ্রহ করি, উহাদিগকে কোন প্রকার দাওয়াত দান ব্যতিরেকে উহাদের উপর আক্রমণ করি এবং ঘর-বাড়ী জ্বালাইয়া ভস্মীভূত করিয়া দেই। ইহাই ছিল আমার প্রতি রাসূলুল্লাহ (স)-এর সর্বশেষ ওসিয়াত। বুরায়দা (রা) ইহা শুনিয়া বলিলেন, রাসূলুল্লাহ (স)-এর নির্দেশ আমি পালন করিব (ওয়াকিদী)।
ইহা হইতে অনুমিত হয় যে, রোমের উবনাস্থিত অভিযানে প্রথমে ইসলামের দাওয়াত দানের কোন কর্মসূচী ছিল না যাহা অন্যান্য অভিযানের প্রথম কর্মসূচী ছিল। কারণ উহা ছিল মুতার যুদ্ধে বীর সাহাবীদের নির্মম শাহাদতের প্রতিশোধস্বরূপ। ইহাতে পর্যায়ক্রমে তিনজন মুসলিম সেনাপতি যায়দ ইবন হারিছা, জা'ফার ও আবদুল্লাহ ইব্ন রাওয়াহা (রা) নির্মমভাবে শাহাদাত বরণ করিয়াছিলেন।
উসামা (রা) যেই বাহনের উপর সওয়ার ছিলেন তাহার নাম সাব্হা (سَبْحَةُ)। ইহা ছিল সেই ঘোড়া যাহার উপর আরোহী অবস্থায় তাহার পিতা যায়দ ইবন হারিছা (রা) মুতার যুদ্ধে শাহাদত লাভ করিয়াছিলেন। এই যুদ্ধেই তিনি তাঁহার পিতার হত্যাকারীকে হত্যা করিতে সক্ষম হইয়াছিলেন। বন্দীদের জনৈক লোক তাহাকে তাহার পিতার হত্যাকারীকে সনাক্ত করিতে সহায়তা করিয়াছিল।
এই অভিযানে মোট ৩৫ দিন সময় লাগিয়াছিল, যাত্রাকালে ২০ দিন এবং প্রত্যাবর্তনকালে ১৫ দিন। তবে এক দিনের অতর্কিত আক্রমণেই অভিযান সফল হয় (হালাবী, প্রাগুক্ত)। আল্লামা ইব্ন কাছীর বলেন, এই অভিযানে মোট চল্লিশ দিন লাগিয়াছিল। তবে কেহ কেহ বলেন, সত্তর দিন ব্যয় হইয়াছিল (আল-বিদায়া ওয়ান-নিহায়া, প্রাগুক্ত)। সেনাপতি উসামা (রা) অপরাহ্নে তাঁহার বাহিনীকে দ্রুত প্রত্যাবর্তনের নির্দেশ প্রদান করেন। পথ প্রদর্শক হুরায়ছ আল-উযারী কাফেলাকে লইয়া যেই রাস্তা দিয়া আগমন করিয়াছিলেন, সেই রাস্তায়ই প্রত্যাবর্তন করেন এবং নবম রাত্রে ওয়াদিউল কুরায় উপস্থিত হন, অতঃপর সেখান হইতে মদীনার দিকে রওয়ানা হন (ওয়াকিদী)। পথিমধ্যে কাছকাছ নামক একটি জনপদের লোকেরা উসামা (রা)-কে প্রতিরোধের চেষ্টা করে। উহারা ইহার পূর্বে তাঁহার পিতাকেও প্রতিরোধের চেষ্টা করিয়াছিল। উসামা (রা) সদলবলে উহাদের মুকাবিলা করেন এবং তাহাদিগকে পরাজিত করিতে সক্ষম হন।
📄 এই অভিযানের সাফল্য ছিল ইসলামের এক মহাবিজয়
আভ্যন্তরীণ ও আন্তর্জাতিকভাবে ইসলামের চরম এক দুর্দিনে খৃস্টান পরাশক্তির বিরুদ্ধে এই অভিযানের সাফল্য ছিল ইসলামের এক মহাবিজয়। তখনকার সময় যাহারা ধর্মান্তরিত হইয়াছিল, সালাত ও যাকাত আদায় করিতে অস্বীকৃতি জানাইয়াছিল, তাহাদের জন্য এই সাফল্য ছিল বিরাট এক হুমকি। এই সাফল্য হইতে বিরুদ্ধবাদীরা এই কথা বুঝিতে সক্ষম হইয়াছিল যে, ইসলামের নবী ইনতিকাল করিলেও তাঁহার আদর্শের সৈনিকরা জীবিত আছেন। রাসূলুল্লাহ (স)-এর উপস্থিতিতে তাহারা যেইভাবে দুর্দমনীয় ছিল, তাঁহার অবর্তমানেও তাহারা একইভাবে রহিয়াছেন। সুতরাং মদীনায় শত্রুদের আক্রমণের পরিকল্পনা সম্পূর্ণরূপে ব্যর্থ হইয়া যায়। অভ্যন্তরীণভাবে যাহারা ধর্মত্যাগে উৎসাহ প্রদানে লিপ্ত ছিল তাহারাও বুঝিতে পারিল যে, মুসলমানগণ আদৌ দুর্বল নয়। সুতরাং তাহাদের বিরুদ্ধে কোন চক্রান্ত করা নিজেদের ধ্বংস ডাকিয়া আনারই নামান্তর।
📄 বিজয়ী কাফেলাকে মদীনায় সংবর্ধনা
মুসলিম জনসাধারণ যখন শুনিতে পাইল যে, কাফেলা মদীনায় ফিরিয়া আসিতেছে তখন তাহারা কাফেলাকে সংবর্ধনা দানের জন্য প্রস্তুতি গ্রহণ করিল। স্বয়ং খলীফা হযরত আবূ বাক্র (রা) মুহাজিরদেরকে সংগে লইয়া পথে বাহির হইয়া আসিলেন। আনসারগণও অভ্যর্থনায় ব্যাপকভাবে অংশ গ্রহণ করিলেন, এমনকি পর্দার অন্তরালের মহিলাগণও উসামা (রা) ও তাঁহার সঙ্গীদের নিরাপদে ফিরিয়া আসায় রাস্তায় বাহির হইয়া পড়েন। উসামা (রা) তাঁহার ঘোড়া সাবহা-এর উপর আরোহণ করিয়া মদীনায় প্রবেশ করেন। তখনও তাঁহার অগ্রভাগে পতাকা লইয়া বুরায়দা (রা) অগ্রসর হইতেছিলেন। মসজিদে নববীতে আসিয়া তিনি অবতরণ করেন এবং দুই রাক্'আত সালাত আদায় করিয়া গৃহে ফিরেন (ওয়াকিদী, প্রাগুক্ত, পৃ. ১১২৫)।