📄 আনসারগণ কর্তৃক সেনাপতি বদলের আবেদন
হযরত আবূ বাক্স (রা)-এর নির্দেশমত বাহিনীর সকল সদস্য রওয়ানা হইয়া যান। কেহ কেহ মনে করেন, তাহারা তখন খন্দক নামক স্থানে গিয়া অবস্থান গ্রহণ করেন। সেনাপতি উসামা (রা) তখন হযরত উমার (রা)-কে খলীফা আবূ বাক্স (রা)-এর নিকট এই বলিয়া পাঠান যে, আল্লাহর রাসূলের খলীফা ও মদীনার মুসলমানদের ব্যাপারে আমার আশংকা হইতেছে যে, মুশরিকরা তাহাদের উপর ঝাঁপাইয়া পড়িবে। তাহারা খলীফা ও মুসলমানদের মূলোৎপাটনের পায়তারা করিবে। সুতরাং যদি তিনি অনুমতি প্রদান করেন তাহা হইলে এই স্থান হইতে আমি আমার বাহিনীকে লইয়া মদীনায় ফিরিয়া আসিব। কারণ এই বাহিনীতে রহিয়াছেন অনেক বীর সাহাবী। ইসলামের শত্রুরা তাহাদের অনুপস্থিতির সুযোগ গ্রহণ করিবে।
হযরত উমার (রা) যখন এই বার্তা লইয়া রওয়ানা হইতে চাহিলেন তখন আনসারদের কিছু সাহাবী তাঁহাকে বলিলেন, খলীফা যদি ইহাতে অসম্মতি প্রকাশ করেন তাহা হইলে আমাদের সালাম তাঁহার নিকট পৌছাইয়া দিয়া বলিবেন, উসামা (রা) হইতে বয়স্ক একজন লোককে যেন তিনি আমাদের সেনাপতি নিযুক্ত করিয়া দেন। হযরত উমার (রা) যখন উসামা (রা)-এর বার্তা লইয়া তাঁহার নিকট আসিলেন তখন তিনি বলিলেন, আল্লাহ্র শপথ! হিংস্র চিতা ও কুকুররা যদি আমাকে নির্মূল করিয়া ফেলিতে চায় তবুও রাসূলুল্লাহ (স) যেই বিষয়ে সিদ্ধান্ত দিয়া গিয়াছেন তাহা আমি কখনও পরিবর্তন করিব না।
অতঃপর হযতর উমার (রা) আনসারদের অভিমত তাঁহাকে অবহিত করিলেন। উসামা হইতে বয়স্ক লোককে সেনাপতি নিযুক্ত করিবার মতামত শুনিয়া হযরত আবূ বাক্স (রা) ক্রোধান্বিত হইলেন। তিনি উপবিষ্ট অবস্থা হইতে দাঁড়াইয়া গেলেন এবং হযরত উমার (রা)-এর দাড়ি ধরিয়া বলিলেন, হে খাত্তাবের পুত্র! রাসূলুল্লাহ (স) যাহাকে সেনাপতি নিযুক্ত করিয়া গিয়াছেন তাঁহাকে অপসারণ করিবার অনুরোধ লইয়া তুমি আমার নিকট আসিয়াছ? অতঃপর হযরত উমার (রা) সৈন্যবাহিনীর লোকদের নিকট ফিরিয়া গেলেন এবং তাহাদেরকে রওয়ানা করিবার পরামর্শ দিয়া বলিলেন, তোমাদের কারণে আজ আমি রাসূলুল্লাহ (স)-এর খলীফার ক্ষোভের শিকার হইলাম।
এখানে একটি প্রশ্ন দেখা দেয় যে, পূর্বেই তো স্বয়ং রাসূলুল্লাহ (স) হযরত উসামার স্থলে অন্য কোন লোককে সেনাপতি নিযুক্তির আবেদনকে নাকচ করিয়া দিয়াছিলেন, ইহার পর আবার আনসার সাহাবীগণ কি করিয়া সেই অভিযোগ উত্থাপন করিলেন? উহার উত্তরে বলা হয়, সম্ভবত আনসারগণ সেই সম্পর্কে অবহিত ছিলেন না অথবা বলা যায় যে, আনসারগণ মনে করিয়াছিলেন যে, ইহাতে মুসলিম উম্মাহর জন্য কল্যাণ নিহিত রহিয়াছে। তাহাদের সহিত খলীফাও একমত হইবেন। বিশেষ করিয়া হযরত উমার (রা) তাহাই মনে করিয়াছিলেন। তাই তিনি এই বার্তা বহন করিতে কোন আপত্তি করেন নাই।
📄 উসামা বাহিনীকে বিদায় দান
রাবী'উছ ছানীর ১ তারিখ। একাদশ হিজরী সনে উসামা (রা) তাঁহার নেতৃত্বাধীন বাহিনী লইয়া রোম (বায়যান্টাইন) সাম্রাজ্যের উদ্দেশে রওয়ানা করেন (হালাবী)। এই বাহিনীর সৈন্যসংখ্যা ছিল মোট তিন হাজার। ইহাতে অশ্বারোহী বাহিনী ছিল এক হাজার। হযরত আবূ বাক্ (রা) তাহাদেরকে বিদায় জানাইতে বাহির হইয়া আসেন এবং উসামা (রা)-এর সঙ্গে কিছুক্ষণ হাঁটেন। অতঃপর বলেন: "আমি তোমার দীন, আমানত ও আমলের শেষ পরিণতি আল্লাহ্র নিকট সোপর্দ করিলাম। আমি তোমাকে আদেশ নিষেধ কিছুই করিব না। আমি কেবল তাহাই কার্যকরকারী যেই নির্দেশ রাসূলুল্লাহ (স) দিয়া গিয়াছিলেন” (ওয়াকিদী)।
বিদায় দেওয়ার সময় হযরত আবূ বাক্স (রা) পায়ে হাঁটিয়া অগ্রসর হইতেছিলেন, আর হযরত উসামা (রা) ছিলেন বাহনের উপর উপবিষ্ট। হযরত আবূ বাক্স (রা)-এর খালি বাহনটিকে তখন আবদুর রহমান ইব্ন আওফ (রা) সম্মুখ হইতে টানিয়া লইয়া যাইতেছিলেন। উসামা (রা) নিবেদন করিলেন, হে আল্লাহ্র রাসূলের খলীফা! হয় আপনি সওয়ার হউন, না হয় আমি অবতরণ করি। হযরত আবূ বাক্স (রা) বলিলেন, তোমার অবতরণের প্রয়োজন নাই। আর আমিও সওয়ার হইব না (আল-বিদায়া ওয়ান-নিহায়া, ৩/৬খ., পৃ. ২২৮)।
হযরত মু'আয (রা)-কে রাসূলুল্লাহ (স) যখন ইয়ামানে প্রেরণ করিয়াছিলেন তখনও এ ধরনের বিদায় দানের দৃশ্য পরিলক্ষিত হইয়াছিল। হযরত মু'আয (রা) ছিলেন বাহনের উপর আর রাসূলুল্লাহ (স) তাহাকে পায়ে হাঁটিয়া বিদায় জানাইতেছিলেন। আকবর খান নজীব আবাদী বলেন, আবূ বাক্স (রা) কর্তৃক এই ধরনের বিদায় দানের দৃশ্য দেখিয়া আনসারগণের মনে তাঁহার নেতৃত্ব সম্পর্কে যেই প্রশ্ন জাগ্রত হইয়াছিল তাহা নিরসন হইয়া যায়।
📄 উসামা (রা)-কে দশটি উপদেশ
মাওলানা আকবর শাহ খান নজীবআবাদী বলেন, হযরত আবূ বাক্স (রা) উসামা (রা)-কে পায়ে হাঁটিয়া বিদায় জানানোর সময় যে দশটি উপদেশ দেন তাহা হইল: (১) খিয়ানত করিবেন না; (২) শিশু, বৃদ্ধ ও মহিলাদিগকে হত্যা করিবেন না; (৩) অন্যায় আচরণ করিবেন না; (৪) মিথ্যা কথা বলিবেন না; (৫) ফলবান বৃক্ষ কর্তন করিবেন না; (৬) খাদ্যের প্রয়োজন ব্যতিরেকে উট, গরু ও বকরী যবেহ করিবেন না; (৭) যখন কোন সম্প্রদায়ের সহিত মিলিত হইবেন তখন নম্রভাবে তাহাদিগকে ইসলামের দাওয়াত দিবেন; (৮) যখন কাহারও সহিত সাক্ষাত ঘটিবে, তখন তাহার মর্যাদার দিকে লক্ষ্য রাখিবেন; (৯) আহার সামনে আসিলে আল্লাহ্ নাম লইয়া তাহা খাওয়া শুরু করিবেন; (১০) ইয়াহুদী খৃস্টানদের যে সকল লোককে নিজ নিজ উপাসনালয়ে উপাসনারত দেখিতে পাইবেন তাহাদিগকে আক্রমণ করিবেন না এবং আল্লাহর পথে আল্লাহর নামে কাফিরদের সাথে লড়াই করিবেন। রাসূলুল্লাহ (স) যেই সকল কাজ করিবার জন্য আপনাদিগকে নির্দেশ দিয়াছেন, তাহার বেশীও করিবেন না আবার কমও করিবেন না।
নজীবআবাদীর মতে, এই সময়ই উসামা (রা)-এর অনুমতিক্রমে হযরত আবূ বাক্স (রা) হযরত উমার (রা)-কে এই বাহিনী হইতে প্রত্যাহার করিয়া লইয়াছিলেন (তারীখে ইসলাম, ১খ., পৃ. ২৮২)।
📄 উসামা বাহিনীর উবনায় উপস্থিতি
উবনা হইল বালকার দিকে সিরিয়ার একটি স্থান। মতান্তরে উহা মৃতার একটি গ্রামের নাম। হযরত আবূ বাক্স (রা)-এর বিদায় দানের পর উসামা (রা) যুদ্ধক্ষেত্রের দিকে দ্রুত রওয়ানা হন। তাহারা জুহায়না, কুদা'আ ইত্যাদি মুসলিম অধ্যুষিত জনপদ অতিক্রম করিয়া ওয়াদিউল কুরা নামক স্থানে অবস্থান করেন। সেখান হইতে বানু উযরা গোত্রের হুরায়ছ নামক এক বক্তিকে লক্ষ্যস্থল 'উবনার' সর্বশেষ পরিস্থিতি সম্পর্কে সংবাদ সংগ্রহের জন্য প্রেরণ করেন। ইহা ছিল 'উবনা' হইতে দুই দিনের দূরত্বে অবস্থিত। হুরায়ছ নির্দেশমত দ্রুত রওয়ানা করেন এবং সার্বিক খবরাখবর অবহিত হইয়া উসামা (রা)-এর নিকট ফিরিয়া আসেন। তিনি এই মর্মে সংবাদ প্রদান করেন যে, সেখানকার লোক যুদ্ধ সম্পর্কে উদাসীন এবং প্রতিরোধের ক্ষেত্রে ঐক্যবদ্ধ নহে। তাহার কথামত উসামা (রা) সেনাবাহিনী লইয়া অগ্রসর হন (ওয়াকিদী, প্রাগুক্ত) এবং ঐক্যবদ্ধভাবে শত্রুপক্ষকে আক্রমণ করিবার নির্দেশ দেন। তিনি ঘোষণা করিলেন, কেহ জোরে কথা বলিবে না, বিচ্ছিন্ন হইবে না, কেহ পলায়ন করিলে তাহাকে ধরিয়া আনিবার জন্য অত্যধিক চেষ্টা করিবে না। অন্তরে সব সময় আল্লাহর যিক্র জারী রাখিবে, তরবারি উন্মুক্ত করিয়া রাখিবে। একমাত্র যাহাদের উপর আক্রমণ করা হইতেছে তাহারা ব্যতীত অন্য কেহ যেন আক্রমণ করিবার কথা বুঝিতে না পারে, সেইদিকে লক্ষ্য রাখিবে। এই অভিযানে একে অপরকে আহ্বান করিবার বিশেষ একটি বাক্য নির্ধারিত ছিল। তাহা হইল: (يا منصور امت )হে বিজয়ী! হত্যা কর)! এই ধ্বনির মাধ্যমেই শত্রুর অবস্থান সম্পর্কে সতর্ক করা হইত। যুদ্ধে বহুলোক হত্যা করা হইল এবং অনেককে বন্দী করা হইল। আগুন জ্বালাইয়া শত্রুদের ঘর-বাড়ী ক্ষেত-খামার ও গাছপালা ভস্মীভূত করিয়া দেওয়া হইল। মুসলিম বাহিনী বিজয় লাভ করিল। একজন মুসলিম সৈন্যও এই যুদ্ধে শাহাদাত বরণ করেন নাই (ওয়াকিদী, প্রাগুক্ত)। ওয়াকিদী বর্ণনা করেন, পতাকা বহনকারী বুরায়দা (রা) উসামা (রা)-কে লক্ষ্য করিয়া তাঁহার পিতা যায়দ (রা)-এর উদ্দেশ্যে রাসূলুল্লাহ (স)-এর নিম্নোক্ত ওসিয়াতটি আক্রমণের পূর্ব মুহূর্তে স্মরণ করাইয়া দিতে বলেন: শত্রুদিগকে ইসলামের দাওয়াত দিবে, যদি তাহারা তোমার দাওয়াত গ্রহণ করে, তাহা হইলে তাহাদিগকে দুইটি বিষয়ে অধিকার প্রদান করিবে। যদি তাহারা স্ব-স্ব আবাস ভূমিতে বসবাস করিতে চায়, তাহা হইলে তাহারা বেদুঈন মুসলমানদের মত অধিকার ভোগ করিবে। মুসলমানদের সহিত থাকিয়া জিহাদ করা ব্যতীত তাহারা অন্য কোন গনীমত ও ফাইয়ের মালের অংশীদার হইবে না। আর তাহারা যদি দারুল ইসলামে চলিয়া আসে, তাহা হইলে মুহাজিরগণ যেই সকল সুযোগ-সুবিধা ভোগ করিতেছে, তাহারাও তাহা ভোগ করিবে।
উসামা (রা) তাহা শুনিয়া বলিলেন, হ্যাঁ, এইরূপ ওসিয়াত ছিল আমার পিতার জন্য। কিন্তু রাসূলুল্লাহ (স) আমাকে নির্দেশ দিয়াছেন, আমি যেন দ্রুত জিহাদে রওয়ানা হই এবং পূর্বেই শত্রুদের সম্পর্কে খবরাখবর সংগ্রহ করি, উহাদিগকে কোন প্রকার দাওয়াত দান ব্যতিরেকে উহাদের উপর আক্রমণ করি এবং ঘর-বাড়ী জ্বালাইয়া ভস্মীভূত করিয়া দেই। ইহাই ছিল আমার প্রতি রাসূলুল্লাহ (স)-এর সর্বশেষ ওসিয়াত। বুরায়দা (রা) ইহা শুনিয়া বলিলেন, রাসূলুল্লাহ (স)-এর নির্দেশ আমি পালন করিব (ওয়াকিদী)।
ইহা হইতে অনুমিত হয় যে, রোমের উবনাস্থিত অভিযানে প্রথমে ইসলামের দাওয়াত দানের কোন কর্মসূচী ছিল না যাহা অন্যান্য অভিযানের প্রথম কর্মসূচী ছিল। কারণ উহা ছিল মুতার যুদ্ধে বীর সাহাবীদের নির্মম শাহাদতের প্রতিশোধস্বরূপ। ইহাতে পর্যায়ক্রমে তিনজন মুসলিম সেনাপতি যায়দ ইবন হারিছা, জা'ফার ও আবদুল্লাহ ইব্ন রাওয়াহা (রা) নির্মমভাবে শাহাদাত বরণ করিয়াছিলেন।
উসামা (রা) যেই বাহনের উপর সওয়ার ছিলেন তাহার নাম সাব্হা (سَبْحَةُ)। ইহা ছিল সেই ঘোড়া যাহার উপর আরোহী অবস্থায় তাহার পিতা যায়দ ইবন হারিছা (রা) মুতার যুদ্ধে শাহাদত লাভ করিয়াছিলেন। এই যুদ্ধেই তিনি তাঁহার পিতার হত্যাকারীকে হত্যা করিতে সক্ষম হইয়াছিলেন। বন্দীদের জনৈক লোক তাহাকে তাহার পিতার হত্যাকারীকে সনাক্ত করিতে সহায়তা করিয়াছিল।
এই অভিযানে মোট ৩৫ দিন সময় লাগিয়াছিল, যাত্রাকালে ২০ দিন এবং প্রত্যাবর্তনকালে ১৫ দিন। তবে এক দিনের অতর্কিত আক্রমণেই অভিযান সফল হয় (হালাবী, প্রাগুক্ত)। আল্লামা ইব্ন কাছীর বলেন, এই অভিযানে মোট চল্লিশ দিন লাগিয়াছিল। তবে কেহ কেহ বলেন, সত্তর দিন ব্যয় হইয়াছিল (আল-বিদায়া ওয়ান-নিহায়া, প্রাগুক্ত)। সেনাপতি উসামা (রা) অপরাহ্নে তাঁহার বাহিনীকে দ্রুত প্রত্যাবর্তনের নির্দেশ প্রদান করেন। পথ প্রদর্শক হুরায়ছ আল-উযারী কাফেলাকে লইয়া যেই রাস্তা দিয়া আগমন করিয়াছিলেন, সেই রাস্তায়ই প্রত্যাবর্তন করেন এবং নবম রাত্রে ওয়াদিউল কুরায় উপস্থিত হন, অতঃপর সেখান হইতে মদীনার দিকে রওয়ানা হন (ওয়াকিদী)। পথিমধ্যে কাছকাছ নামক একটি জনপদের লোকেরা উসামা (রা)-কে প্রতিরোধের চেষ্টা করে। উহারা ইহার পূর্বে তাঁহার পিতাকেও প্রতিরোধের চেষ্টা করিয়াছিল। উসামা (রা) সদলবলে উহাদের মুকাবিলা করেন এবং তাহাদিগকে পরাজিত করিতে সক্ষম হন।