📄 উসামা (রা)-কে সেনাপতি নিযুক্ত করায় প্রতিক্রিয়া
মুহাজির ও আনসারদের শীর্ষস্থানীয় সাহাবীগণ যেখানে রহিয়াছেন, সেখানে অল্প বয়সের যুবক উসামাকে সেনাপতি নিযুক্ত করায় কিছুটা মিশ্র প্রতিক্রিয়ার সৃষ্টি হয়। শীর্ষ পর্যায়ের কতিপয় সাহাবীর মনেও এই ব্যাপারে দাগ কাটে বলিয়া ইমাম হালাবী মন্তব্য করেন (আস-সীরাতুল হালাবিয়্যা)। ওয়াকিদী বলেন, মুহাজিরগণের কিছু লোক বলিলেন, প্রাথমিক যুগে যাঁহারা হিজরত করার সৌভাগ্য অর্জন করিয়াছেন তাঁহাদের উপর এই যুবককে সেনাপতি নিযুক্ত করা হইল। এই আপত্তি যাহারা উত্থাপন করিয়াছিলেন তাহাদের অগ্রনায়ক ছিলেন 'আয়্যাশ ইব্ন আবী রাবী'আ (عياش بن ابي ربيعة)। এই আপত্তি যখন উত্থাপিত হইল তখন হযরত উমার ইবনুল খাত্তাব (রা)-এর কানেও তাহা পৌঁছিল। তিনি তাহা প্রত্যাখ্যান করিয়া সমালোচকদের বুঝাইবার চেষ্টা করিলেন। অতঃপর রাসূলুল্লাহ (স)-কে এই প্রতিক্রিয়া • সম্পর্কে অবহিত করিলেন। রাসূলুল্লাহ (স) তাহা শুনিয়া খুব অসন্তুষ্ট হইলেন। দারুণভাবে ক্ষুব্ধ হইয়া তীব্র শিরপীড়া সত্ত্বেও তিনি মাথায় পট্টি বাঁধিয়া মসজিদের দিকে রওয়ানা করিলেন। আল্লাহ্র প্রশংসার পর মিম্বরে উঠিয়া বলিলেন, হে লোকসকল! উসামাকে সেনাপতি নিযুক্ত করা সম্পর্কে আমি তোমাদের আপত্তির কথা শুনিতে পাইয়াছি। এই প্রসঙ্গে সহীহ বুখারীতে আবদুল্লাহ ইবন উমার (রা) হইতে বর্ণিত আছে:
ان رسول الله ﷺ بعث بعثا وامر عليهم اسامة بن زيد فطعن الناس في امارته فقام رسول الله ﷺ فقال ان تطعنوا في امارته فقد كنتم تطعنون في امارة ابيه من قبل وايم الله ان كان لخليقا للامارة وان كان لمن احب الناس الى وان هذا لمن احب الناس الى بعده.
“রাসূলুল্লাহ (স) একটি বাহিনী প্রস্তুত করিয়া উসামা ইব্ন যায়দ (রা)-কে উহার আমীর নিযুক্ত করিলেন। লোকজন তাহার নেতৃত্বের সমালোচনা শুরু করিলে রাসূলুল্লাহ (স) যখন দাঁড়াইয়া বলিলেন : এখন যদি তোমরা তাহার নেতৃত্বের সমালোচনা কর তাহা হইলে উহার পূর্বেও তোমরা তাহার পিতার নেতৃত্বের সমালোচনা করিয়াছিলে। আল্লাহ্ শপথ! সে অবশ্যই নেতৃত্ব দানের উপযুক্ত ছিল। লোকজনের মধ্যে সে আমার সর্বাধিক প্রিয়পাত্র ছিল। তাঁহার পরে লোকজনের মধ্যে উসামাও আমার সর্বাধিক প্রিয়পাত্র” (ইমাম বুখারী, আস-সহীহ, কিতাবুল মাগাযী, ২খ., ৬৪৯)।
কোন কোন বর্ণনায় রাসূলুল্লাহ (স)-এর প্রিয় হওয়ার সহিত তাহার যোগ্য হইবার কথাও উল্লেখ রহিয়াছে। যেমন বলা হইয়াছে:
ان كان للامارة لخليقا وان ابنه من بعده لخليق للامارة وانهما لخليقان لكل خير.
“যায়দও নেতৃত্ব দানের যোগ্য ছিল। তাহার পর তাহার ছেলেও নেতৃত্ব দানের যোগ্য। তাহারা সকল কল্যাণকর কাজের উপযুক্ত” (ওয়াকিদী, কিতাবুল মাগাযী)।
রাসূলুল্লাহ (স)-এর বক্তব্যের পর সকাল সাহাবী উসামা (রা)-এর নেতৃত্ব মানিয়া লন।
গরিষ্ঠ সংখ্যক রিওয়ায়াত দ্বারা এই কথা অনুমতি হয় যে, তাঁহার নেতৃত্বের সমালোচনার কারণ হইল বয়সের স্বল্পতা। কিন্তু অনেকগুলি রিওয়ায়াত হইতে বুঝা যায় যে, সমালোচনার কারণ হইল পূর্বে তাঁহার পিতার ক্রীতদাস হওয়া। বুখারী ও মুসলিম শরীফে সমালোচনার জওয়াবে রাসূলুল্লাহ (স) যেই উক্তি করিয়াছিলেন তাহা হইতে বাহ্যত বয়সের স্বল্পতা বুঝা গেলেও আসল বিষয় যে দাসত্ব তাহাই প্রতিফলিত হইয়াছে। এই কারণে রাসূলুল্লাহ (স) সমালোচনার জওয়াবে বলিয়াছিলেন, আজ তোমরা বয়সের স্বল্পতা দেখাইয়া তাহার সমালোচনা করিতেছ অথচ উহার পূর্বেও তোমরা তাহার পিতার নেতৃত্বের সমালোচনা করিয়াছিলে। তাহার পিতার বয়স তো কম ছিল না। সুতরাং বুঝা গেল আসল রহস্য বয়সের স্বল্পতা নয়, অন্য কিছু। এখানে আরও একটি বিষয় লক্ষণীয় যে, তাহাদের সমালোচনা শুনিয়া রাসূলুল্লাহ (স) দারুণভাবে ক্ষুব্ধ হইয়াছিলেন। উহার কারণ হইল, রাসূলুল্লাহ (স) তাহাদের মধ্যে বংশের গৌরব করার বিষয়টি দেখিয়াছিলেন যাহা ইসলামে সম্পূর্ণভাবে নিষিদ্ধ। বংশের গৌরবকে রাসূলুল্লাহ (স) জাহিলিয়্যা যুগের আচরণ বলিয়া অভিহিত করিয়াছেন। উহা কিছু লোকের মাঝে রহিয়াছে দেখিয়া রাসূলুল্লাহ (স) দারুণভাবে ব্যথিত হন। আসল বিষয় হইল যোগ্যতা, কে কোন বংশের তাহা মোটেই ইসলামে ধর্তব্য নয় (দানাপুরী, প্রাগুক্ত)।
📄 যুদ্ধাভিযান
রাসূলুল্লাহ (স) উসামা (রা) সম্পর্কিত সকল আপত্তির জবাবে উপরিউক্ত কথাগুলি বলিয়া মিম্বর হইতে নামিয়া সোজা তাঁহার ঘরে চলিয়া গেলেন। যাহাদের উসামা (রা)-এর বাহিনীতে অংশগ্রহণ করিবার কথা ছিল তাহারা রাসূলুল্লাহ (স)-এর নিকট আসিয়া বিদায় চাহিলেন। তাঁহাদের মধ্যে উমার ইবনুল খাত্তাব (রা)-ও ছিলেন। রাসূলুল্লাহ (স) তাঁহাদেরকে রওয়ানা হইবার অনুমতি দান করিলেন। তাঁহারা বাহির হইয়া মদীনা হইতে এক "ফারসাখ” দূরে অবস্থিত আল-জুরুফ নামক স্থানে গিয়া শিবির স্থাপন করিলেন। এমন সময় উসামা (রা)-এর মাতা উম্মু আয়মান (রা) রাসূলুল্লাহ (স)-এর নিকট আসিয়া বলিলেন, হে আল্লাহর রাসূল! আপনার এই অসুস্থাবস্থায় যদি আপনি উসামা ও তাহার সৈন্যবাহিনীকে স্থগিত রাখিতেন তাহা হইলে ভাল হইত। কারণ এমতাবস্থায় সে বাহির হইলে লাভবান হইতে পারিবে না। রাসূলুল্লাহ (স) তখনও উসামা বাহিনীকে রওয়ানা হওয়ার নির্দেশ কার্যকর করিতে বলিলেন।
শনিবার দিবাগত রাত আল-জুরুফে অবস্থান করিবার পর উসামা (রা) পরদিন রবিবার রাসূলুল্লাহ (স)-এর নিকট আগমন করিলেন। এই দিন তাঁহার রোগ বৃদ্ধি পাইয়া তীব্র আকার ধারণ করিয়াছিল। রাসূলুল্লাহ (স)-কে দেখিবার পর উসামার দুই চোখ দিয়া অশ্রুধারা প্রবাহিত হইল। সেই সময় তাঁহার নিকট হযরত আব্বাস (রা) ও উম্মুল মু'মিনীনগণও উপস্থিত ছিলেন। উসামা (রা) মাথা ঝুকাইলে রাসূলুল্লাহ (স) তাঁহাকে চুম্বন করেন। তখন তাঁহার কথা বলার মত অবস্থা ছিল না। রাসূলুল্লাহ (স) তাঁহার উভয় হাত আকাশের দিকে উত্তোলন করিলেন এবং তাহা উসামার দিকে ঝুঁকাইলেন। উসামা বলেন, উহা দেখিয়া আমি বুঝিতে পারিলাম যে, রাসূলুল্লাহ (স) আমার জন্য দু'আ করিতেছেন। তাই আমি আমার সৈন্যবাহিনীর নিকট চলিয়া গেলাম। পরবর্তী দিন সোমবার সকালে পুনরায় তিনি রাসূলুল্লাহ (স)-কে দেখিতে আসিলেন। তখন তিনি সুস্থ হইয়া গিয়াছিলেন। এইজন্য তাঁহার পবিত্রা স্ত্রীগণও আনন্দ প্রকাশ করিতেছিলেন। এমতাবস্থায় তিনি উসামা (রা)-কে আল্লাহ্র নাম লইয়া রওয়ানা হইবার অনুমতি প্রদান করিলেন। উসামা তাঁহার বাহনে চড়িয়া স্বীয় বাহিনীর নিকট আগমন করিলেন এবং সকলকে একত্র হইয়া সফরে রওয়ানা হইবার নির্দেশ প্রদান করিলেন। সকল প্রস্তুতি সম্পন্ন করিয়া যেইমাত্র জুরুফ হইতে রওয়ানা করিবার জন্য তিনি বাহনে আরোহণ করিবার মনস্থ করিলেন তখনই তাঁহার মাতা উম্মু আয়মানের পক্ষ হইতে একজন সংবাদবাহক আসিয়া তাঁহাকে সংবাদ প্রদান করিল যে, রাসূলুল্লাহ (স)-এর মুমূর্ষু অবস্থা। সুতরাং সংবাদ পাওয়া মাত্র তিনি হযরত উমার (রা) ও হযরত আবূ উবায়দা ইবনুল জাররাহ (রা)-কে সঙ্গে লইয়া মদীনার দিকে রওয়ানা করিলেন। মদীনায় আসিয়া সত্যিই তাঁহারা রাসূলুল্লাহ (স)-কে মুমূর্ষু অবস্থায় দেখিতে পাইলেন। এই দিনই সূর্য যখন খুবই উত্তপ্ত রূপ ধারণ করে তখন রাসূলুল্লাহ (স) ইনতিকাল করেন। তাহা ছিল ১২ রাবী'উল আওয়ালের সোমবার।
রাসূলুল্লাহ (স)-এর মৃত্যুর সংবাদ অবহিত হইয়া জুরুফে যে সকল মুসলিম বাহিনী অবস্থানরত ছিল তাহারা মদীনায় ফিরিয়া আসিল। বুরায়দা ইবনুল হুসায়ব (রা) যিনি পতাকা বহন করিতেছিলেন তিনিও মদীনায় ফিরিয়া আসিলেন এবং পতাকাটিকে রাসূলুল্লাহ (স)-এর গৃহের দরজার সম্মুখে স্থাপন করিলেন (ওয়াকিদী)।
অন্য একটি সূত্রে বর্ণিত আছে যে, উসামা (রা)-এর স্ত্রী ফাতিমা বিন্ত কায়স (রা) তাঁহার নিকট রাসূলুল্লাহ (স)-এর রোগের তীব্রতার সংবাদ পৌঁছাইয়া তাঁহাকে তড়িঘড়ি করিয়া রওয়ানা না করিবার কথা জানাইয়াছিলেন (হালাবী)।
📄 আবূ বাক্স (রা) কর্তৃক উসামা বাহিনীকে প্রেরণের সিদ্ধান্ত
রাসূলুল্লাহ (স)-এর ইনতিকালের কয়েক মাস পূর্ব হইতেই ইয়ামান ও নাজদ এলাকায় আসওয়াদ আনাসী ও মুসায়লামার ফিতনার সূত্রপাত হইয়াছিল। এইসব এলাকার লোকদের ইসলাম সম্পর্কিত জ্ঞান ছিল নূতন। সুতরাং নবৃওয়াতের মিথ্যা দাবিদারদের সম্পর্কে তাহাদের সম্যক জ্ঞান ছিল না। ফলে অনেক সরলপ্রাণ মুসলমান ইহাদের দ্বারা প্রতারিত হয়। রাসূলুল্লাহ (স)-এর ইনতিকালের পূর্বেই আসওয়াদ আনাসীকে হত্যা করা হয়। কিন্তু ইয়ামান হইতে ধর্মদ্রোহিতা সম্পূর্ণরূপে উৎখাত করা যায় নাই। রাসূলুল্লাহ (স)-এর ইনতিকালের সংবাদে সেখানকার অবস্থার আরও অবনতি হয়। নও মুসলিম, যাহারা যথার্থভাবে ইসলামের শিক্ষা গ্রহণ করিতে পারে নাই, রাসূলুল্লাহ (স)-এর তিরোধানে তাহাদের মধ্যেও বিরূপ প্রতিক্রিয়ার সৃষ্টি হয়। মক্কা, মদীনা ও তায়েফ ছাড়া সর্বদিক হইতে ইসলাম ত্যাগ করিবার সংবাদ আসিতে থাকিল। একদল লোক সালাত ও যাকাত আদায় করাকে অস্বীকার করিল। ইয়াহুদী ও খৃস্টান জগত হইতে মদীনা আক্রমণ করিবার সংবাদ পৌছিল। ঠিক এমন অবস্থার মধ্যে খলীফা আবু বাক্ (রা) উসামা ইব্ন যায়দ (রা)-কে বায়যান্টাইন অভিযানের প্রতি নির্দেশ প্রদান করিলেন (আকবার শাহ নাজীবআবাদী, তারীখে ইসলাম, ১খ., পৃ. ২৬২)।
খিলাফতের দায়িত্ব গ্রহণ করিবার পরপরই হযরত আবূ বাক্র (রা) পতাকা বহনকারী সাহাবী বুরায়দা (রা)-কে পতাকাটি লইয়া উসামা (রা)-এর গৃহ দ্বারে লইয়া যাওয়ার নির্দেশ প্রদান করেন এবং তাঁহাকে সতর্ক করিয়া দেন যে, যত সময় পর্যন্ত উসামা বায়যান্টীয়দের বিরুদ্ধে যুদ্ধে অবতীর্ণ না হইবে সেই পর্যন্ত যেন পতাকাটি খুলিয়া ফেলা না হয়। এই নির্দেশ পালন সম্পর্কে বুরায়দা (রা)-এর নিজস্ব অভিব্যক্তি হইলঃ আমি তাহা লইয়া উসামা (রা)-এর গৃহদ্বারে উপস্থিত হইলাম। অতঃপর সেখান হইতে তাহা বহন করিয়া সিরিয়া (রোম) অভিমুখে যাত্রা করিলাম। অতঃপর আবার তাহা বহন করিয়া উসামার গৃহে প্রত্যাবর্তন করিলাম। সেই হইতে উসামা (রা)-এর ইনতিকাল অবধি পতাকাটি তাঁহার গৃহে বিদ্যমান ছিল। মুসলমানদের অভ্যন্তরীণ গোলযোগ ও পরাশক্তির পক্ষ হইতে মদীনা আক্রান্ত হওয়ার আশংকার মুহূর্তে উসামা (রা)-কে রোম (বায়যান্টাইন) অভিযানের নির্দেশ দানের ব্যাপারে শীর্ষস্থানীয় সাহাবায়ে কিরামের মনে দাগ কাটে। হযরত উমার, হযরত উছমান, হযরত সা'দ ইব্ন আবী ওয়াককাস, হযরত আবূ উবায়দা ইবনুল জাররাহ ও হযরত সাঈদ ইব্ন যায়দ (রা) প্রমুখ নেতৃস্থানীয় সাহাবী হযরত আবূ বাক্স (রা)-এর সহিত সাক্ষাত করিয়া বলিলেন, হে রাসূলুল্লাহ (স)-এর খলীফা! আরবের অভ্যন্তরেই যখন চতুর্মুখী সমস্যার সূত্রপাত হইয়াছে, বহুধা বিভক্ত দল-উপদলকে নিয়ন্ত্রণে আনিতে আপনি হিমশিম খাইতেছেন, এমতাবস্থায় বহিরাক্রমণের এই সিদ্ধান্তকে আপনি স্থগিত করিয়া ধর্মত্যাগী বিদ্রোহীদের বিরুদ্ধে এই বাহিনীকে নিয়োজিত করুন। ইহাতে ফল ভাল হইবে, উহারা ধর্মত্যাগীদের মূলোৎপাটনে সক্ষম হইবে। অপরদিকে মদীনায় যেখানে বহিশত্রুর আক্রমণের আশংকা প্রবলভাবে অনুমিত হইতেছে, এখানে রহিয়াছে আমাদের স্ত্রী ও সন্তান-সন্তুতি; সুতরাং আগে এই সকল চক্রান্ত প্রতিহত করা হউক। উহার পর উসামা (রা)-কে রোম অভিযানে প্রেরণ করিবেন। হযরত আবূ বাক্স (রা) নেতৃবর্গের এই অভিমত শুনিয়া জিজ্ঞাসা করিলেন, এই ব্যাপারে আর কাহারও কোন অভিমত আছে কি? তাঁহারা বলিলেন, এই পর্যন্তই আমাদের কথা। তাঁহাদের এই অভিমতের উত্তরে আবূ বাক্স (রা) বলিলেন:
والذي نفسي بيده لو ظننت ان السباع تأكلني بالمدينة لا نفذت هذا البعث ولا بدأت باول منه ورسول الله ﷺ ينزل عليه الوحى من السماء يقول انفذوا جيش اسامة.
“যেই সত্তার হাতে আমার প্রাণ তাঁহার শপথ! যদি আমার এমন ধারণা হয় যে, হিংস্র প্রাণীসমূহ আমাকে মদীনায় সাবাড় করিয়া ফেলিবে, তবুও আমি এই বাহিনীকে রওয়ানা করা হইতে পিছপা হইব না। উহাই আমার সর্বপ্রথম কাজ। কারণ রাসূলুল্লাহ (স), যাহার উপর ওহী অবতীর্ণ হইত, তিনি বলিয়াছেন, তোমরা উসামা বাহিনীকে রওয়ানা হইতে দাও"।
"তবে হযরত উমার (রা) সম্পর্কে আমি বাহিনী প্রধান উসামার সহিত কথা বলিব, যাহাতে তাহাকে এখানে থাকিয়া যাওয়ার জন্য উসামা অনুমতি প্রদান করেন। কারণ মদীনায় তাহার অবস্থান বর্তমানে খুবই প্রয়োজন। তবে উসামা তাহা স্বীকার করিবেন কিনা এই সম্পর্কে আমার কোন ধারণা নাই। অবশ্য তিনি সেই অনুমতি প্রদান না করিলে আমি মনোক্ষুণ্ণ হইব না।"
হযরত আবূ বাক্স (রা)-এর এই ভাষণে দ্বিমত পোষণকারিগণ উপলব্ধি করিতে পারিলেন যে, বাহিনী প্রেরণে খলীফা দৃঢ় প্রতিজ্ঞ। অতঃপর হযরত আবূ বাক্স (রা) উসামা (রা)-এর গৃহে আসিলেন এবং হযরত উমার (রা)-কে প্রত্যাহার করিয়া লওয়া সম্পর্কে তাঁহার সহিত কথা বলিলেন। উসামা (রা) উহাতে সম্মতি জ্ঞাপন করিলেন। হযরত আবূ বাক্স (রা) তখন তাঁহার নিকট সবিনয়ে নিবেদন করিলেন, আপনি কি আনন্দ চিত্তে উহাতে সম্মতি দিতেছেন? উসামা (রা) বলিলেন: হাঁ। অতঃপর হযরত আবূ বাক্স (রা) তাঁহার গৃহ হইতে বাহির হইয়া জনৈক ঘোষককে এই মর্মে ঘোষণা দিতে বলিলেন, আমার কঠিন সিদ্ধান্ত হইল, যাহারা রাসূলুল্লাহ (স)-এর জীবিতাবস্থায় এই যুদ্ধের জন্য রওয়ানা করিয়াছেন তাহাদের কেহ যেন এই মুহূর্তে রওয়ানা হইতে পিছপা না হয়। কেহ পিছনে পড়িলে তাহাকে পায়ে হাঁটিয়া এই বাহিনীর সহিত যোগ দিতে বাধ্য করা হইবে (ওয়াকিদী)। কোন কোন সূত্রে পাওয়া যায় যে, দ্বিমত পোষণকারীদের জবাবে হযরত আবূ বাক্স (রা) বলিয়াছিলেন, আল্লাহ্র শপথ! যেই বাহিনীকে রাসূলুল্লাহ (স) প্রেরণ করিয়া গিয়াছেন তাহা কখনও আমি প্রত্যাহার করিয়া লইব না। যদিও কুকুররা রাসূলুল্লাহ (স)-এর সহধর্মিনীগণের পায়ে ঝাঁপাইয়া পড়ে এবং যেই পতাকাটি রাসূলুল্লাহ (স) উড্ডীন করিয়া গিয়াছেন তাহা নমিত করিব না। অন্য সূত্রে বর্ণিত আছে, তিনি বলিয়াছিলেন, রাসূলুল্লাহ (স)-এর নির্দেশ পালনের পূর্বে অন্য কিছু শুরু করা অপেক্ষা আমাকে কোন পাখি ছোঁ মারিয়া লইয়া যাওয়া আমার নিকট অধিক প্রিয় (হালাবী)।
📄 আনসারগণ কর্তৃক সেনাপতি বদলের আবেদন
হযরত আবূ বাক্স (রা)-এর নির্দেশমত বাহিনীর সকল সদস্য রওয়ানা হইয়া যান। কেহ কেহ মনে করেন, তাহারা তখন খন্দক নামক স্থানে গিয়া অবস্থান গ্রহণ করেন। সেনাপতি উসামা (রা) তখন হযরত উমার (রা)-কে খলীফা আবূ বাক্স (রা)-এর নিকট এই বলিয়া পাঠান যে, আল্লাহর রাসূলের খলীফা ও মদীনার মুসলমানদের ব্যাপারে আমার আশংকা হইতেছে যে, মুশরিকরা তাহাদের উপর ঝাঁপাইয়া পড়িবে। তাহারা খলীফা ও মুসলমানদের মূলোৎপাটনের পায়তারা করিবে। সুতরাং যদি তিনি অনুমতি প্রদান করেন তাহা হইলে এই স্থান হইতে আমি আমার বাহিনীকে লইয়া মদীনায় ফিরিয়া আসিব। কারণ এই বাহিনীতে রহিয়াছেন অনেক বীর সাহাবী। ইসলামের শত্রুরা তাহাদের অনুপস্থিতির সুযোগ গ্রহণ করিবে।
হযরত উমার (রা) যখন এই বার্তা লইয়া রওয়ানা হইতে চাহিলেন তখন আনসারদের কিছু সাহাবী তাঁহাকে বলিলেন, খলীফা যদি ইহাতে অসম্মতি প্রকাশ করেন তাহা হইলে আমাদের সালাম তাঁহার নিকট পৌছাইয়া দিয়া বলিবেন, উসামা (রা) হইতে বয়স্ক একজন লোককে যেন তিনি আমাদের সেনাপতি নিযুক্ত করিয়া দেন। হযরত উমার (রা) যখন উসামা (রা)-এর বার্তা লইয়া তাঁহার নিকট আসিলেন তখন তিনি বলিলেন, আল্লাহ্র শপথ! হিংস্র চিতা ও কুকুররা যদি আমাকে নির্মূল করিয়া ফেলিতে চায় তবুও রাসূলুল্লাহ (স) যেই বিষয়ে সিদ্ধান্ত দিয়া গিয়াছেন তাহা আমি কখনও পরিবর্তন করিব না।
অতঃপর হযতর উমার (রা) আনসারদের অভিমত তাঁহাকে অবহিত করিলেন। উসামা হইতে বয়স্ক লোককে সেনাপতি নিযুক্ত করিবার মতামত শুনিয়া হযরত আবূ বাক্স (রা) ক্রোধান্বিত হইলেন। তিনি উপবিষ্ট অবস্থা হইতে দাঁড়াইয়া গেলেন এবং হযরত উমার (রা)-এর দাড়ি ধরিয়া বলিলেন, হে খাত্তাবের পুত্র! রাসূলুল্লাহ (স) যাহাকে সেনাপতি নিযুক্ত করিয়া গিয়াছেন তাঁহাকে অপসারণ করিবার অনুরোধ লইয়া তুমি আমার নিকট আসিয়াছ? অতঃপর হযরত উমার (রা) সৈন্যবাহিনীর লোকদের নিকট ফিরিয়া গেলেন এবং তাহাদেরকে রওয়ানা করিবার পরামর্শ দিয়া বলিলেন, তোমাদের কারণে আজ আমি রাসূলুল্লাহ (স)-এর খলীফার ক্ষোভের শিকার হইলাম।
এখানে একটি প্রশ্ন দেখা দেয় যে, পূর্বেই তো স্বয়ং রাসূলুল্লাহ (স) হযরত উসামার স্থলে অন্য কোন লোককে সেনাপতি নিযুক্তির আবেদনকে নাকচ করিয়া দিয়াছিলেন, ইহার পর আবার আনসার সাহাবীগণ কি করিয়া সেই অভিযোগ উত্থাপন করিলেন? উহার উত্তরে বলা হয়, সম্ভবত আনসারগণ সেই সম্পর্কে অবহিত ছিলেন না অথবা বলা যায় যে, আনসারগণ মনে করিয়াছিলেন যে, ইহাতে মুসলিম উম্মাহর জন্য কল্যাণ নিহিত রহিয়াছে। তাহাদের সহিত খলীফাও একমত হইবেন। বিশেষ করিয়া হযরত উমার (রা) তাহাই মনে করিয়াছিলেন। তাই তিনি এই বার্তা বহন করিতে কোন আপত্তি করেন নাই।