📄 উসামা বাহিনীর অভিযান স্থল
উসামা বাহিনীকে কোন এলাকায় অভিযানে প্রেরণ করা হইয়াছিল, সেই সম্পর্কেও উৎস গ্রন্থগুলির বিবরণে ভিন্নমত পরিলক্ষিত হয়। অধিকাংশ গ্রন্থে বলা হইয়াছে, রাসূলুল্লাহ (স) তাঁহাকে তাঁহার পিতা যায়দ (রা)-র শাহাদত স্থল 'উবনায়' (অভিযান পরিচালনার জন্য) প্রেরণ করিয়াছিলেন। এই উবনা কোথায় অবস্থিত তাহা নির্ধারণেই এই ভিন্নমতের সৃষ্টি হইয়াছে মনে হয়। ওয়াকিদীর মাগাযী গ্রন্থে বলা হইয়াছে, রাসূলুল্লাহ (স) যায়দ ইব্ন হারিছা (রা), জা'ফার (রা) ইব্ন আবী তালিব এবং আবদুল্লাহ ইব্ন্ন রাওয়াহা (রা)-শাহাদাতের কথা ভুলিতে না পারিয়া উসামা (রা)-কে রোম সাম্রাজ্য অভিযানের জন্য নির্দেশ দিয়াছিলেন (কিতাবুল মাগাযী, প্রাগুক্ত)।
আল্লামা হালাবী বলেন, সেই স্থানটি ছিল আস্কালান ও রামলার মধ্যবর্তী স্থান (আস-সীরাতুল হালাবিয়্যা, ৩খ., পৃ. ২০৭)। ইব্ন কাছীর বলেন, রাসূলুল্লাহ (স) উসামা বাহিনীকে সিরিয়ার তাখুম আল-বালকা নামক স্থানের দিকে অভিযানে যাওয়ার নির্দেশ প্রদান করিয়াছিলেন যেখানে যায়দ ইবন হারিছা (রা), জা'ফার (রা) ও আবদুল্লাহ ইব্ন রাওয়াহা (রা) শাহাদত বরণ করিয়াছিলেন (আল-বিদায়া ওয়ান-নিহায়া, ৩/৬খ., পৃ. ২২৭)। আবদুর রউফ দানাপুরী ইবনুল আছীরের 'আন-নিহায়া' গ্রন্থের বরাতে বলেন, উবনা ফিলিস্তীনের আসকালান ও রামলার মধ্যেবর্তী স্থান। হালাবী আল্লামা সুহায়লীর বরাতে বলেন, সেই স্থানটি হইল মৃতা নামক স্থানের নিকটবর্তী একটি জনপদ (আস-সীরাতুল হালাবিয়্যা, প্রাগুক্ত)। সার্বিক মতামতের ভিত্তিতে এই সত্য বাহির হইয়া আসে যে, এই অভিযান ছিল খৃস্টানদের বিরুদ্ধে সুদূর সিরিয়ার মৃতার পার্শ্ববর্তী কোন এক স্থানে। উসামা (রা)-কে সেনাপতি নিযুক্ত করার পর বুধবার দিন হইতে রাসূলুল্লাহ (স)-এর পুনরায় জ্বর ও মাথা ব্যথা শুরু হইল। তিনি বৃহস্পতিবার অসুস্থাবস্থায় নিজ হাতে পতাকা তৈরি করিয়া উসামা (রা)-এর হাতে তুলিয়া দিয়া বলিলেন:
اغز بسم الله وفى سبيل الله وفقاتلوا من كفر بالله اغزوا ولا تقدروا ولا تقتلوا وليدا ولا امرأة ولا تمنوا لقاء العدو فانكم لا تدرون لعلكم تبتلون بهم ولكن قولوا اللهم اكفنا واكفف بأسهم عنا فان لقوكم قد اجلبوا وصيحوا فعليكم بالسكينة والصمت ولا تنازعوا ولا تفشلوا فتذهب ريحكم وقولوا اللهم نحن عبادك وهم عبادك نواصينا ونواصيهم بيدك وانما تغلبهم انت واعلموا ان الجنة تحت البارقة.
"আল্লাহ্র নাম লইয়া আল্লাহ্ পথে জিহাদ শুরু কর। যাহারা আল্লাহকে অস্বীকার করে তাহাদের বিরুদ্ধে লড়াই কর। যুদ্ধ করিতে গিয়া প্রতারণা করিও না, শিশু সন্তান ও নারীদেরকে হত্যা করিও না এবং শত্রুর মুখামুখি হইবার কামনা করিও না। কারণ তোমরা জানিবে না, হয়ত তাহাদের দ্বারা তোমরা বিপদগ্রস্ত হইয়া যাইতে পার। তোমরা এইভাবে প্রার্থনা করিবেঃ 'হে আল্লাহ! তাহাদের বিরুদ্ধে তুমি আমাদের জন্য যথেষ্ট হইয়া যাও। আমাদের প্রতি তাহাদের অনিশ্চয়তা দূর কর'। যদি তোমাদের শত্রু পক্ষ শোরগোল করিয়া তোমাদের মুখামুখি হয়, তাহা হইলে তোমাদের উচিৎ হইবে ধীরস্থিরভাবে ও নীরবে মুকাবিলা করা। তোমরা পরস্পর ঝগড়ায় লিপ্ত হইও না ও কাপুরুষতা প্রদর্শন করিও না। ইহাতে তোমাদের প্রভাব বিনষ্ট হইবে। তোমরা দু'আ করিতে থাকিবে এই বলিয়া, 'হে আল্লাহ! আমরা তোমার বান্দা, উহারাও তোমার বান্দা। আমাদের ভাগ্য ও তাহাদের ভাগ্য তোমারই হাতে। তুমি চাহিলে তাহাদিগকে পরাজিত করিতে পার'। তোমরা এই কথা জানিয়া রাখ যে, জান্নাত তরবারির নিচে" (আল-ওয়াকিদী, কিতাবুল মাগাযী, প্রাগুক্ত)।
অতঃপর উসামা (রা) পতাকাটি লইয়া রাসূলুল্লাহ (স)-এর নিকট হইতে বিদায় হইলেন এবং তাহা বুরায়দা ইবনুল হুসায়ব (রা)-এর নিকট হস্তান্তর করিলেন। তিনি মুসলিম বাহিনীকে আল-জুরুফ নামক স্থানে জমায়েত হইবার নির্দেশ প্রদান করিলেন এবং সেখানে অস্থায়ী শিবির স্থাপন করিলেন (আল-হালাবী, প্রাগুক্ত)
সেনাপতির দায়িত্ব ভার গ্রহণের সময় উসামা ইব্ন যায়দ (রা)-এর বয়স কত ছিল এই সম্পর্কে মতভেদ রহিয়াছে। তবে বয়স যে বিশের অধিক ছিল না তাহা প্রায় নিশ্চিত। ইব্ন সা'দের মতে, উসামা (রা)-এর বয়স তখন বিশ বৎসর ছিল। ইব্ন আবী হায়ছামা (রা)-এর বর্ণনা অনুযায়ী তাঁহার বয়স ছিল তখন আঠার বৎসর (দানাপুরী, প্রাগুক্ত)। কাহারও মতে, তাঁহার বয়স তখন ছিল উনিশ বৎসর। অনেকের মতে তখন তাঁহার বয়স ছিল সতের বৎসর এবং এই অভিমতের সঙ্গে একটি ঐতিহাসিক ঘটনার মিলও পাওয়া যায়। বর্ণিত আছে যে, খলীফা আল-মাহ্দী বসরায় গমন করিয়া আয়ায ইব্ন মু'আবিয়ার সাক্ষাত পাইলেন। আয়ায ছিলেন অসাধারণ প্রতিভাধর ব্যক্তিত্ব। তাঁহার ইমামতিতে তৎকালীন চার শত আলেম নামায পড়িয়াছিলেন। অবস্থাদৃষ্টে খলীফা আক্ষেপ করিয়া বলিলেন, এই লোকগুলির দুর্ভাগ্য! উহারা কি তাহাদের মধ্যে এই যুবক ছেলে ব্যতীত অন্য কোন বয়স্ক লোককে ইমামতির যোগ্য পাইল না? অতঃপর মাহ্দী তাঁহার দিকে তাকাইয়া জিজ্ঞাসা করিলেন, হে যুবক! তোমার বয়স কত? তিনি উত্তরে বলিলেন, আল্লাহ আমীরুল মু'মিনীনকে দীর্ঘায়ু দান করুন। উসামা ইব্ন যায়দ (রা) কে রাসূলুল্লাহ (স) যখন মুসলিম বাহিনীর সেনাপতি নিযুক্ত করিয়াছিলেন তখন তাঁহার বয়স যত বৎসর ছিল, আমার বয়সও তাই। সেই বাহিনীর অন্তর্ভুক্ত ছিলেন আবূ বাক্স (রা) ও উমার (রা)। তাঁহার জবাব শুনিয়া খলীফা মাহ্দী তাঁহাকে পূর্বপদে বহাল রাখিলেন এবং তাঁহার কল্যাণের জন্য দু'আ করিলেন। আয়ায ইব্ন মু'আবিয়ার বয়স তখন ছিল সতের বৎসর। এই ঐতিহাসিক ঘটনা হইতে এই কথা প্রমাণিত হয় যে, নেতৃত্ব গ্রহণের সময় উসামা (রা)-এর বয়স ছিল সতের বৎসর (আস-সীরাতুল হালাবিয়্যা, ৩খ., পৃ. ২০৭)।
📄 সারিয়্যা উসামায় অংশগ্রহণকারিগণ
সীরাতের অধিকাংশ গ্রন্থে বলা হইয়াছে যে, প্রাথমিক যুগের মুহাজিরদের সকলেই উহাতে অংশগ্রহণ করিয়াছিলেন। উমার ইবনুল খাত্তাব (রা), আবূ উবায়দা ইবনুল জাররাহ (রা), সা'দ ইব্ন আবী ওয়াক্কাস্ (রা) প্রমুখ নেতৃস্থানীয় মুহাজির সাহাবী যে এই সারিয়্যায় শরীক ছিলেন, উহাতে কাহারও দ্বিমত নাই। আনসার সাহাবীদের অনেক নেতৃস্থানীয় ব্যক্তিও তাহাতে অংশ গ্রহণ করিয়াছিলেন। তাঁহারা হইলেন কাতাদা ইবনুন নু'মান ও সালামা ইব্ন আসলাম ইবন হারীশ। তবে আবূ বাক্স (রা) এই সারিয়্যায় অংশগ্রহণ করিবার জন্য আদিষ্ট হইয়াছিলেন কিনা এই ব্যাপারটি পরিষ্কার নয়। এই সম্পর্কে তিন ধরনের মত পাওয়া যায়। (এক) আবূ বাক্স (রা) ও এই সারিয়্যায় অংশগ্রহণ করিয়াছিলেন। (দুই) এই ব্যাপারে নীরবতা অবলম্বন করা হইয়াছে। তাঁহার অংশগ্রহণের অভিমতকে পরিষ্কারভাবে অস্বীকার করা হইয়াছে। এই মতানৈকের কারণ হইল রাসূলুল্লাহ (স)-এর অসুস্থাবস্থায় তাঁহার ইমামতি করা ও রাসূলুল্লাহ (স)-এর ইনতিকালের পর প্রথম খলীফা নির্ধারিত হওয়া। অধিকাংশ সীরাতবিদের অভিমত হইল, আবূ বাক্স (রা) এই সারিয়্যার অন্তর্ভুক্ত ছিলেন। সীরাতে হালাবিয়্যাতে বলা হইয়াছে : তাঁহাদের মধ্যে ছিলেন আবূ বাক্স (রা) ও উমার (রা) প্রমুখ। দানাপুরী বলেন, ইন্ন আসাকির ও ইবন সা'দ এই অভিমতই পোষণ করিতেন (আসাহহুস সিয়ার)। যাহারা এই সম্পর্কে নীরবতা অবলম্বন করিয়াছেন তাহাদের অন্যতম ছিলেন ঐতিহাসিক ওয়াকিদী। তিনি তাঁহার মাগাযী গ্রন্থে প্রাথমিক যুগের মুহাজিরদের অংশগ্রহণের কথা উল্লেখ করিয়া স্বতন্ত্রভাবে উমার (রা) ও আবু উবায়দা (রা) প্রমুখের কথা ব্যক্ত করিয়াছেন, আবূ বাক্স (রা) সম্পর্কে কিছুই বলেন নাই (কিতাবুল মাগাযী, ৩খ., পৃ. ১১১৮)।
ইমাম ইব্ তায়মিয়্যা এই অভিযানে আবূ বাক্স (রা)-এর অংশগ্রহণের মতকে কঠোর ভাষায় প্রত্যাখ্যান করিয়া বলেন, রাসূলুল্লাহ (স) তাঁহাকে অসুস্থাবস্থায় সালাতে ইমামতি করিবার জন্য তাঁহার স্থলাভিষিক্ত করিয়াছিলেন। সুতরাং এই সারিয়্যায় অংশগ্রহণের অবকাশ কোথায় (দানাপুরী, প্রাগুক্ত)? আসলে আবূ বাক্স (রা)-এর অংশগ্রহণ করিবার বিষয়টি সম্পর্কে আরও পূর্ব হইতেই বিতর্ক চলিয়া আসিতেছে। ইব্ন কাছীর (র) বলেন, যাহারা এই বাহিনীতে আবূ বাক্স (রা)-এর অংশগ্রহণের অভিমত প্রকাশ করেন তাহাদের সেইমত সঠিক নহে। কারণ এই বাহিনী জুরুফে অবস্থানকালে রাসূলুল্লাহ (স) যখন তীব্র রোগজ্বালায় কাতর হইয়া পড়েন তখন তিনি তাঁহাকে জনগণের সালাতে ইমামতি করিবার নির্দেশ প্রদান করিয়াছিলেন। সুতরাং তিনি রাসূলুল্লাহ (স)-এর নির্দেশে মুসলমানদের ইমাম ছিলেন (আল-বিদায়া ওয়ান-নিহায়া, ৩/৫ খ., পৃ. ১৯৬)। এই বিতর্কের অবসানে আল্লামা যুরকানী বলেন, আবূ বাক্র (রা)-এর এই বাহিনীর অন্তর্ভুক্ত হওয়া বা না হওয়ার অভিমতের মধ্যে কোন বিরোধ নাই। কারণ হইতে পারে রাসূলুল্লাহ (স) তাঁহাকে প্রথমে এই বাহিনীতে অংশগ্রহণ করিবার নির্দেশ দান করিয়াছিলেন। কিন্তু যখন তিনি অসুস্থ হইয়া পড়িলেন এবং অসুস্থতার মাত্রা যখন তীব্র আকার ধারণ করিল, তখন তিনি তাঁহাকে প্রত্যাহার করিয়া লইলেন এবং সালাতে ইমামতি করিবার নির্দেশ প্রদান করিলেন।
শী'আ ও রাফিযীগণ আবূ বাক্স (রা) সম্পর্কে রাসূলুল্লাহ (স)-এর এই সম্পর্কিত নির্দেশ অমান্য করিবার একটি চরম মিথ্যা অভিযোগ উত্থাপন করিয়া থাকে। কিন্তু তাহাদের অভিযোগ যে উদ্দেশ্যপ্রণোদিত ও বানোয়াট তাহা এই কথা দ্বারা প্রমাণিত হয় যে, আবূ বাক্র (রা) স্বয়ং রাসূলুল্লাহ (স)-এর নির্দেশেই সফর স্থগিত করিয়াছিলেন। খলীফা নির্বাচিত হওয়ার পর হযরত আবূ বাক্র (রা) সেনাপতি উসামার অনুমতিক্রমে নিজেকে প্রত্যাহার করিয়া লইয়াছিলেন। এই সম্পর্কে কাহারও কোন দ্বিমত নাই। হযরত উমার (রা) যখন খিলাফতের দায়িত্বে অধিষ্ঠিত হইয়াছিলেন তখন হযরত উসামা (রা)-কে দেখিয়াই বলিলেনঃ السَّلامُ عَلَيْكَ أَيُّهَا الأميرُ হে নেতা! আপনার উপর শান্তি বর্ষিত হউক। হযরত উসামা (রা) বলিলেন, হে আমীরুল মুমিনীন! আল্লাহ আপনাকে ক্ষমা করুন। আপনি আমাকে এইরূপ বলিতেছেন। হযরত উমার (রা) বলিলেন, আমি যতদিন জীবিত থাকিব এইরূপ বলিব। কারণ রাসূলুল্লাহ (স)-এর ইনতিকালের সময় আপনি আমার আমীর ছিলেন। অতঃপর হযরত উমার (রা) উসামা (রা)-কে السلام عليك ايها الامير বলিয়া সালাম দিতেন। আর উসামা (را) উত্তরে বলিতেন, وعليك السلام امير المؤمنين
📄 উসামা (রা)-কে সেনাপতি নিযুক্ত করায় প্রতিক্রিয়া
মুহাজির ও আনসারদের শীর্ষস্থানীয় সাহাবীগণ যেখানে রহিয়াছেন, সেখানে অল্প বয়সের যুবক উসামাকে সেনাপতি নিযুক্ত করায় কিছুটা মিশ্র প্রতিক্রিয়ার সৃষ্টি হয়। শীর্ষ পর্যায়ের কতিপয় সাহাবীর মনেও এই ব্যাপারে দাগ কাটে বলিয়া ইমাম হালাবী মন্তব্য করেন (আস-সীরাতুল হালাবিয়্যা)। ওয়াকিদী বলেন, মুহাজিরগণের কিছু লোক বলিলেন, প্রাথমিক যুগে যাঁহারা হিজরত করার সৌভাগ্য অর্জন করিয়াছেন তাঁহাদের উপর এই যুবককে সেনাপতি নিযুক্ত করা হইল। এই আপত্তি যাহারা উত্থাপন করিয়াছিলেন তাহাদের অগ্রনায়ক ছিলেন 'আয়্যাশ ইব্ন আবী রাবী'আ (عياش بن ابي ربيعة)। এই আপত্তি যখন উত্থাপিত হইল তখন হযরত উমার ইবনুল খাত্তাব (রা)-এর কানেও তাহা পৌঁছিল। তিনি তাহা প্রত্যাখ্যান করিয়া সমালোচকদের বুঝাইবার চেষ্টা করিলেন। অতঃপর রাসূলুল্লাহ (স)-কে এই প্রতিক্রিয়া • সম্পর্কে অবহিত করিলেন। রাসূলুল্লাহ (স) তাহা শুনিয়া খুব অসন্তুষ্ট হইলেন। দারুণভাবে ক্ষুব্ধ হইয়া তীব্র শিরপীড়া সত্ত্বেও তিনি মাথায় পট্টি বাঁধিয়া মসজিদের দিকে রওয়ানা করিলেন। আল্লাহ্র প্রশংসার পর মিম্বরে উঠিয়া বলিলেন, হে লোকসকল! উসামাকে সেনাপতি নিযুক্ত করা সম্পর্কে আমি তোমাদের আপত্তির কথা শুনিতে পাইয়াছি। এই প্রসঙ্গে সহীহ বুখারীতে আবদুল্লাহ ইবন উমার (রা) হইতে বর্ণিত আছে:
ان رسول الله ﷺ بعث بعثا وامر عليهم اسامة بن زيد فطعن الناس في امارته فقام رسول الله ﷺ فقال ان تطعنوا في امارته فقد كنتم تطعنون في امارة ابيه من قبل وايم الله ان كان لخليقا للامارة وان كان لمن احب الناس الى وان هذا لمن احب الناس الى بعده.
“রাসূলুল্লাহ (স) একটি বাহিনী প্রস্তুত করিয়া উসামা ইব্ন যায়দ (রা)-কে উহার আমীর নিযুক্ত করিলেন। লোকজন তাহার নেতৃত্বের সমালোচনা শুরু করিলে রাসূলুল্লাহ (স) যখন দাঁড়াইয়া বলিলেন : এখন যদি তোমরা তাহার নেতৃত্বের সমালোচনা কর তাহা হইলে উহার পূর্বেও তোমরা তাহার পিতার নেতৃত্বের সমালোচনা করিয়াছিলে। আল্লাহ্ শপথ! সে অবশ্যই নেতৃত্ব দানের উপযুক্ত ছিল। লোকজনের মধ্যে সে আমার সর্বাধিক প্রিয়পাত্র ছিল। তাঁহার পরে লোকজনের মধ্যে উসামাও আমার সর্বাধিক প্রিয়পাত্র” (ইমাম বুখারী, আস-সহীহ, কিতাবুল মাগাযী, ২খ., ৬৪৯)।
কোন কোন বর্ণনায় রাসূলুল্লাহ (স)-এর প্রিয় হওয়ার সহিত তাহার যোগ্য হইবার কথাও উল্লেখ রহিয়াছে। যেমন বলা হইয়াছে:
ان كان للامارة لخليقا وان ابنه من بعده لخليق للامارة وانهما لخليقان لكل خير.
“যায়দও নেতৃত্ব দানের যোগ্য ছিল। তাহার পর তাহার ছেলেও নেতৃত্ব দানের যোগ্য। তাহারা সকল কল্যাণকর কাজের উপযুক্ত” (ওয়াকিদী, কিতাবুল মাগাযী)।
রাসূলুল্লাহ (স)-এর বক্তব্যের পর সকাল সাহাবী উসামা (রা)-এর নেতৃত্ব মানিয়া লন।
গরিষ্ঠ সংখ্যক রিওয়ায়াত দ্বারা এই কথা অনুমতি হয় যে, তাঁহার নেতৃত্বের সমালোচনার কারণ হইল বয়সের স্বল্পতা। কিন্তু অনেকগুলি রিওয়ায়াত হইতে বুঝা যায় যে, সমালোচনার কারণ হইল পূর্বে তাঁহার পিতার ক্রীতদাস হওয়া। বুখারী ও মুসলিম শরীফে সমালোচনার জওয়াবে রাসূলুল্লাহ (স) যেই উক্তি করিয়াছিলেন তাহা হইতে বাহ্যত বয়সের স্বল্পতা বুঝা গেলেও আসল বিষয় যে দাসত্ব তাহাই প্রতিফলিত হইয়াছে। এই কারণে রাসূলুল্লাহ (স) সমালোচনার জওয়াবে বলিয়াছিলেন, আজ তোমরা বয়সের স্বল্পতা দেখাইয়া তাহার সমালোচনা করিতেছ অথচ উহার পূর্বেও তোমরা তাহার পিতার নেতৃত্বের সমালোচনা করিয়াছিলে। তাহার পিতার বয়স তো কম ছিল না। সুতরাং বুঝা গেল আসল রহস্য বয়সের স্বল্পতা নয়, অন্য কিছু। এখানে আরও একটি বিষয় লক্ষণীয় যে, তাহাদের সমালোচনা শুনিয়া রাসূলুল্লাহ (স) দারুণভাবে ক্ষুব্ধ হইয়াছিলেন। উহার কারণ হইল, রাসূলুল্লাহ (স) তাহাদের মধ্যে বংশের গৌরব করার বিষয়টি দেখিয়াছিলেন যাহা ইসলামে সম্পূর্ণভাবে নিষিদ্ধ। বংশের গৌরবকে রাসূলুল্লাহ (স) জাহিলিয়্যা যুগের আচরণ বলিয়া অভিহিত করিয়াছেন। উহা কিছু লোকের মাঝে রহিয়াছে দেখিয়া রাসূলুল্লাহ (স) দারুণভাবে ব্যথিত হন। আসল বিষয় হইল যোগ্যতা, কে কোন বংশের তাহা মোটেই ইসলামে ধর্তব্য নয় (দানাপুরী, প্রাগুক্ত)।
📄 যুদ্ধাভিযান
রাসূলুল্লাহ (স) উসামা (রা) সম্পর্কিত সকল আপত্তির জবাবে উপরিউক্ত কথাগুলি বলিয়া মিম্বর হইতে নামিয়া সোজা তাঁহার ঘরে চলিয়া গেলেন। যাহাদের উসামা (রা)-এর বাহিনীতে অংশগ্রহণ করিবার কথা ছিল তাহারা রাসূলুল্লাহ (স)-এর নিকট আসিয়া বিদায় চাহিলেন। তাঁহাদের মধ্যে উমার ইবনুল খাত্তাব (রা)-ও ছিলেন। রাসূলুল্লাহ (স) তাঁহাদেরকে রওয়ানা হইবার অনুমতি দান করিলেন। তাঁহারা বাহির হইয়া মদীনা হইতে এক "ফারসাখ” দূরে অবস্থিত আল-জুরুফ নামক স্থানে গিয়া শিবির স্থাপন করিলেন। এমন সময় উসামা (রা)-এর মাতা উম্মু আয়মান (রা) রাসূলুল্লাহ (স)-এর নিকট আসিয়া বলিলেন, হে আল্লাহর রাসূল! আপনার এই অসুস্থাবস্থায় যদি আপনি উসামা ও তাহার সৈন্যবাহিনীকে স্থগিত রাখিতেন তাহা হইলে ভাল হইত। কারণ এমতাবস্থায় সে বাহির হইলে লাভবান হইতে পারিবে না। রাসূলুল্লাহ (স) তখনও উসামা বাহিনীকে রওয়ানা হওয়ার নির্দেশ কার্যকর করিতে বলিলেন।
শনিবার দিবাগত রাত আল-জুরুফে অবস্থান করিবার পর উসামা (রা) পরদিন রবিবার রাসূলুল্লাহ (স)-এর নিকট আগমন করিলেন। এই দিন তাঁহার রোগ বৃদ্ধি পাইয়া তীব্র আকার ধারণ করিয়াছিল। রাসূলুল্লাহ (স)-কে দেখিবার পর উসামার দুই চোখ দিয়া অশ্রুধারা প্রবাহিত হইল। সেই সময় তাঁহার নিকট হযরত আব্বাস (রা) ও উম্মুল মু'মিনীনগণও উপস্থিত ছিলেন। উসামা (রা) মাথা ঝুকাইলে রাসূলুল্লাহ (স) তাঁহাকে চুম্বন করেন। তখন তাঁহার কথা বলার মত অবস্থা ছিল না। রাসূলুল্লাহ (স) তাঁহার উভয় হাত আকাশের দিকে উত্তোলন করিলেন এবং তাহা উসামার দিকে ঝুঁকাইলেন। উসামা বলেন, উহা দেখিয়া আমি বুঝিতে পারিলাম যে, রাসূলুল্লাহ (স) আমার জন্য দু'আ করিতেছেন। তাই আমি আমার সৈন্যবাহিনীর নিকট চলিয়া গেলাম। পরবর্তী দিন সোমবার সকালে পুনরায় তিনি রাসূলুল্লাহ (স)-কে দেখিতে আসিলেন। তখন তিনি সুস্থ হইয়া গিয়াছিলেন। এইজন্য তাঁহার পবিত্রা স্ত্রীগণও আনন্দ প্রকাশ করিতেছিলেন। এমতাবস্থায় তিনি উসামা (রা)-কে আল্লাহ্র নাম লইয়া রওয়ানা হইবার অনুমতি প্রদান করিলেন। উসামা তাঁহার বাহনে চড়িয়া স্বীয় বাহিনীর নিকট আগমন করিলেন এবং সকলকে একত্র হইয়া সফরে রওয়ানা হইবার নির্দেশ প্রদান করিলেন। সকল প্রস্তুতি সম্পন্ন করিয়া যেইমাত্র জুরুফ হইতে রওয়ানা করিবার জন্য তিনি বাহনে আরোহণ করিবার মনস্থ করিলেন তখনই তাঁহার মাতা উম্মু আয়মানের পক্ষ হইতে একজন সংবাদবাহক আসিয়া তাঁহাকে সংবাদ প্রদান করিল যে, রাসূলুল্লাহ (স)-এর মুমূর্ষু অবস্থা। সুতরাং সংবাদ পাওয়া মাত্র তিনি হযরত উমার (রা) ও হযরত আবূ উবায়দা ইবনুল জাররাহ (রা)-কে সঙ্গে লইয়া মদীনার দিকে রওয়ানা করিলেন। মদীনায় আসিয়া সত্যিই তাঁহারা রাসূলুল্লাহ (স)-কে মুমূর্ষু অবস্থায় দেখিতে পাইলেন। এই দিনই সূর্য যখন খুবই উত্তপ্ত রূপ ধারণ করে তখন রাসূলুল্লাহ (স) ইনতিকাল করেন। তাহা ছিল ১২ রাবী'উল আওয়ালের সোমবার।
রাসূলুল্লাহ (স)-এর মৃত্যুর সংবাদ অবহিত হইয়া জুরুফে যে সকল মুসলিম বাহিনী অবস্থানরত ছিল তাহারা মদীনায় ফিরিয়া আসিল। বুরায়দা ইবনুল হুসায়ব (রা) যিনি পতাকা বহন করিতেছিলেন তিনিও মদীনায় ফিরিয়া আসিলেন এবং পতাকাটিকে রাসূলুল্লাহ (স)-এর গৃহের দরজার সম্মুখে স্থাপন করিলেন (ওয়াকিদী)।
অন্য একটি সূত্রে বর্ণিত আছে যে, উসামা (রা)-এর স্ত্রী ফাতিমা বিন্ত কায়স (রা) তাঁহার নিকট রাসূলুল্লাহ (স)-এর রোগের তীব্রতার সংবাদ পৌঁছাইয়া তাঁহাকে তড়িঘড়ি করিয়া রওয়ানা না করিবার কথা জানাইয়াছিলেন (হালাবী)।