📘 সীরাত বিশ্বকোষ > 📄 তাবুক অভিমুখে যাত্রা

📄 তাবুক অভিমুখে যাত্রা


প্রস্তুতি সম্পন্ন হওয়ার পর রাসূলুল্লাহ (স) নবম হিজরীর রজব মাসের বৃহস্পতিবার সকাল বেলা ত্রিশ হাজার মুজাহিদ ও দশ হাজার অশ্ব লইয়া মদীনা হইতে তাবূক অভিমুখে রওয়ানা করেন। যাত্রার প্রাক্কালে রাসূলুল্লাহ (স) তাঁহার অনুপস্থিতিতে প্রশাসনিক কার্যক্রম পারিচালনার জন্য মুহাম্মাদ ইবন মাসলামা (রা)-কে ভারপ্রাপ্ত আমীর, পরিবারিক বিষয়াদি তদারকীর জন্য হযরত আলী ইব্‌ন আবি তালিব (রা)-কে প্রতিনিধি, শান্তি-শৃঙখলা রক্ষার জন্য হযরত সিবা' ইব্‌ন উরফুতা (سباع ابن عرفطة)-কে মদীনার কোতওয়াল ও সালাত পরিচালনার জন্য হযরত আব্দুল্লাহ ইব্‌ন উম্ম মাকতুম (রা)-কে মদীনার মসজিদের ইমাম নিযুক্ত করেন (উয়ূনুল আছার, ২খ., পৃ. ২৫৪; সীরাতুল মুস্তাফা, ২খ., পৃ. ২৪৮-৯)।
মুনাফিকগণ অপপ্রচার করিতে লাগিল যে, রাসূলুল্লাহ (স) আপন চাচাত ভাইকে যুদ্ধযাত্রা হইতে রেহাই দিয়াছেন আর সাধারণ জনগণকে যুদ্ধাভিযানে মৃত্যুর-মুখে ঠেলিয়া দিয়াছেন। এই সব মিথ্যা অপপ্রচার হযরত আলী (রা)-এর কানে আসিলে তিনি তাৎক্ষণিকভাবে অস্ত্র সজ্জিত হইয়া বাহির হইয়া পড়েন এবং আল-জুরুফ (الجرف) নামক স্থানে গিয়া রাসূলুল্লাহ (স)-এর সহিত মিলিত হন। তিনি রাসূলুল্লাহ (স)-কে বলিলেন, আপনি আমাকে শিশু ও নারীদের মাঝে রাখিয়া যাইতেছেন? রাসূলুল্লাহ (স) জবাব দিলেন:
الا ترضى ان تكون منى بمنزلة هارون من موسى الا انه ليس نبي بعدي. ৫৩৩
"তুমি কি ইহাতে সন্তুষ্ট নও যে, আমার কাছে তোমার মর্যাদা ঠিক তেমন যেমন মূসা (আ)-এর কাছে হারুন (আ)-এর মর্যাদা। তবে আমার পরে আর কোন নবী নাই” (সাহীহ আল-বুখারী, ৩খ., পৃ. ১২৯ কিতাবুল মাগাযী, গাওয়া তাবুক, নং ৪৪১৬; ফাদাইল আসহাবিন নাবিয়্যি (স); ইবন মাজা, মুকাদ্দিমা, বাব ফাদলি আলী (রা), নং ১১৫)।
যাত্রাপথে রাসূলুল্লাহ (স) ছানিয়াতুল বিদা নামক স্থানে শিবির স্থাপন করেন, অতঃপর সৈন্যদেরকে অগ্রবর্তী, পশ্চাদবর্তী, মধ্যবর্তী, ডান, বাম ও পানি সরবরাহকারী ইত্যাদি দলে বিন্যস্ত করেন। ইসলামের পতাকা হযরত আবু বাক্স (রা)-কে ও সেনাবাহিনীর পতাকা হযরত যুবায়র ইব্‌ন আওয়াম (রা)-কে প্রদান করা হয়। রাসূলুল্লাহ (স) আওস গোত্রের পতাকা হযরত উসায়দ ইবন হুদায়র (রা)-কে এবং খাযরাজ গোত্রের পতাকা হুবাব ইবনুল মুনযির (রা)-কে প্রদান করেন। এইভাবে বিভিন্ন গোত্রের মাঝে গোত্রীয় ও সেনাবাহিনীর পতাকা বণ্টন করিয়া দেন (সীরাতুল হালাবিয়া, ৫খ., পৃ. ৪০২)। সহীহ মুসলিমে আবূ হুমায়দ (রা) হইতে বর্ণিত আছে, তিনি বলেন, আমরা রাসূলুল্লাহ (স)-এর সঙ্গে তাবুকের উদ্দেশ্যে রওনা হইলাম, অবশেষে ওয়াদিউল কুরায় এক মহিলার বাগানে পৌছিলাম। রাসূলুল্লাহ (স) বলিলেন: তোমরা অনুমান কর এই বাগানে কি পরিমাণ খেজুর থাকিতে পারে? আমরা অনুমান করিলাম, কিন্তু রাসূলুল্লাহ (স)-এর অনুমান ছিল দশ ওয়াসাক অর্থাৎ তিপ্পান্ন মন দশ সের (২০০০ কে. জি. প্রায়)। তিনি মহিলাকে বলিলেন, আমার এই অনুমানটি মনে রাখিবে। আমরা এই পথেই আবার ফিরিয়া আসিব। তাহার পর আমরা তাবুক হইতে প্রত্যাবর্তনের পথে উপরিউক্ত ওয়াদিল কুরায় পৌঁছিলাম। রাসূলুল্লাহ (স) মহিলাকে কি পরিমাণ ফল পাওয়া গেল জিজ্ঞাসা করিলেন। মহিলা উত্তর দিল, দশ ওয়াসাক (সহীহ মুসলিম, ২খ., পৃ. ২৪৬; আল-খাসাইসুল কুবরা, ১খ., পৃ. ৫৬২)।

📘 সীরাত বিশ্বকোষ > 📄 তাবুক যুদ্ধের শিক্ষা

📄 তাবুক যুদ্ধের শিক্ষা


(এক) তাবুকের যুদ্ধে প্রমাণিত হয় যে, ইমাম অথবা রাষ্ট্রপ্রধান যখন জিহাদের ঘোষণা দেন তখন জিহাদ ফরযে আইন হইয়া যায়, ব্যক্তিগতভাবে প্রত্যেককে এই সংবাদ না জানাইলেও তখন কোন মানুষকে জিহাদে অংশগ্রহণে বাধা দেওয়া জায়েয নাই।
(দুই) রাসূলুল্লাহ (স) তাবৃকের উদ্দেশে রজব মাসে রওয়ানা হইয়াছিলেন এবং রামাদান মাসে প্রত্যাবর্তন করিয়াছিলেন। বিশ দিন তিনি তাবুকে ছিলেন আর ত্রিশ দিন আসা-যাওয়ায় অতিবাহিত হইয়াছিল। এই পঞ্চাশ দিন রাসূলুল্লাহ (স)-এর নামায কসর আদায় করেন। এই সফরের সময় তিনি যুহর ও আসরের নামায একত্রে আদায় করেন। জুম'উত তাব্দীম ও জুম'উত তাখীর দুইটাই করিয়াছিলেন। জুম'উত তাব্দীম অর্থাৎ কখনও যুহর ও আসরের নামায যুহরের সময় আদায় করিতেন এবং মাগরিব ও এশার নামায মাগরিবের সময় আদায় করিতেন। জমউত তাখীর অর্থাৎ কখনও যুহর ও আসরের নামায আসরের সময় এবং মাগরিব ও এশার নামায এশার সময় আদায় করিতেন (যাদুল মা'আদ, ৩খ., পৃ. ৫৪৩-৪)। চার মাযহাবের ইমামগণ এই ব্যাপারে ঐকমত্য পোষণ করেন যে, মুসাফির যতক্ষণ পর্যন্ত গন্তব্যস্থলে অবস্থানে নিয়ত না করিবে ততক্ষণ নামায কসর করিতে হইবে। রাসূলুল্লাহ (স)-এর সাহাবীগণ হরমূষে সাত মাস, আবদুর রহমান ইন্ন সুমরা (রা) কাবুলে দুই বৎসর, মুসলিম সেনাদল সিজিস্তানে দুই বৎসর কসর নামায আদায় করেন (আসাহহুস সিয়ার, পৃ. ৩৪১)।
(তিন) তাবুকে যাহারা পিছাইয়া পড়িয়াছিল, তাহাদের ঘটনা এই কথারই সাক্ষ্য দেয় যে, বিচারের রায় বাহ্যিক বক্তব্যের উপর হইয়া থাকে। মুনাফিকদের কপটতা সর্বজন বিদিত ছিল, কিন্তু বাহ্যিক ওজর পেশ করিবার ফলে তাহাদিগকে রেহাই দেওয়া হয়। সত্যবাদী মুমিনগণ কোন ওজর পেশ না করিবার ফলে তাহাদের সতর্ক করিয়া দেওয়া হয়, অথচ তাহারা যে নিষ্ঠাবান মু'মিন ছিলেন ইহা সকলেরই জানা কথা।
(চার) সুসংবাদ প্রদানের জন্য সাধ্যানুযায়ী সাদাকা করা মুস্তাহাব। যেমন হযরত কা'ব অনেক সম্পত্তি সাদাকা করিয়াছিলেন। রাসূলুল্লাহ (স) ইহাতে সন্তুষ্ট হইয়া বলিয়াছিলেন, নিজের জন্য কিছু রাখ। ইহা ছাড়া তওবা কবুলের সুসংবাদ প্রদানকারীকে তিনি উপহার দিয়াছিলেন। অথচ তাহার নিকট তাহার পরিধেয় ছাড়া আর কোন জামা ছিল না (আসাহহুস সিয়ার, পৃ. ৪৩১; আর-রাহীকুল মাখতুম, পৃ. ৪৩৫-৬)।

📘 সীরাত বিশ্বকোষ > 📄 আল-হিজরে যাত্রাবিরতি

📄 আল-হিজরে যাত্রাবিরতি


রাসূলুল্লাহ (স)-এর নেতৃত্বে মুসলিম বাহিনী একের পর এক মনযিল অতিক্রম করিয়া আল-হিজ নামক স্থানে আসিয়া পৌছিল। প্রাগৈতিহাসিক যুগের হযরত সালেহ ('আ)-এর সম্প্রদায় তথা ছামূদ জাতির বাসস্থানের ধ্বংসাবশেষ সেইখানে বিদ্যমান রহিয়াছে। রাসূলুল্লাহ (স)-এর নির্দেশক্রমে এই জায়গায় সেনাছাউনী স্থাপন করা হয়। হিজর নামক স্থানে প্রাচীন যুগে ছামূদ নামে এক পরাক্রমশালী জাতি বাস করিত। প্রস্তরময় পর্বত কাটিয়া সুদৃঢ় বাসস্থান নির্মাণে তাহারা ছিল সমসাময়িক কালে অপ্রতিদ্বন্দ্বী। বিপুল শক্তি ও শৌর্য-বীর্যের অধিকারী হইয়া তাহারা আল্লাহ্ অনুগত না হইয়া বরং নাফরমানিতে লিপ্ত হয়। ফলে আল্লাহর গযবে পতিত হইয়া তাহারা ধ্বংস হইয়া যায়। পবিত্র কুরআনে তাহাদের বিভিন্ন ঘটনা উল্লেখ করা হইয়াছে (দ্র. ৭৪ ৭৩; ১১: ৬৬-৬৮; ৬৯:৪-৫; ৯১৪ ১১-১৪; ২৬৪ ১৪১-১৫৯)।
রাসূলুল্লাহ (স) যখন হিজর অতিক্রম করিতেছিলেন তখন চাদর দিয়া নিজ মুখমণ্ডল ঢাকিয়া দেন এবং সওয়ারীকে দ্রুত হাঁকাইতে থাকেন। তিনি নির্দেশ প্রদান করেন : 'তোমরা অত্যাচারী সম্প্রদায়ের জনপদে ক্রন্দনরত অবস্থায় ছাড়া প্রবেশ করিও না। তাহারা যেই শাস্তিতে পতিত হইয়াছিল সেই শাস্তি তোমাদের উপর আপতিত হইতে পারে। তোমরা এই কূপের পানি পান করিবে না, এই পানি দ্বারা উযু করিবে না, এই পানি দ্বারা আটার যেই খামির তৈয়ার করিয়াছ তাহা উটকে খাওয়াইয়া দাও এবং রাত্রিবেলা সঙ্গী ছাড়া একাকী কেহ বাহির হইবে না'। সাঈদা গোত্রের দুই ব্যক্তি ছাড়া সবাই রাসূলুল্লাহ (স)-এর হুকুম তামিল করিল। তাহাদের একজন প্রাকৃতিক প্রয়োজনে বাহির হইলে সে শ্বাসরোগে আক্রান্ত হয়। আর যেই ব্যক্তি উটের খোঁজে বাহির হয় তাহাকে মরুঝড় উড়াইয়া তাঈ-এর দুই পাহাড়ের মাঝখানে নিক্ষেপ করে। তাহাদের এই সংবাদ রাসূলুল্লাহ (স)-এর নিকট পৌছিলে তিনি বলেন, আমি কি তোমাদেরকে সঙ্গী ছাড়া একাকী বাহির হইতে নিষেধ করি নাই? রাসূলুল্লাহ (স) শ্বাসরোগে আক্রান্ত ব্যক্তির জন্য দু'আ করেন। ফলে সে রোগমুক্তি লাভ করে। আর যেই ব্যক্তি তাঈ পর্বতদ্বয়ের মাঝে নিক্ষিপ্ত হইয়াছিল, তাঈ গোত্রের লোকেরা তাহাকে মদীনায় পৌঁছাইয়া দেয় (সহীহ আল-বুখারী, ৩খ., পৃ. ১৩৫; ইব্‌ন খালদুন, তারিখ, ১খ., পৃ. ১৭৭)।
অতঃপর এই স্থানে কিছু সময় বিশ্রাম করিয়া রাসূলুল্লাহ (স) সম্মুখপানে অগ্রসর হইলেন। প্রচণ্ড দাবদাহে সৈন্যদের প্রাণ ওষ্ঠাগত প্রায়। হযরত আবূ বাক্‌রের (রা) অনুরোধে রাসূলুল্লাহ (স) বৃষ্টির জন্য হাত উঠাইয়া দু'আ করেন। হাত নামাইবার পূর্বেই মুষলধারে বৃষ্টি বর্ষণ শুরু হইয়া যায়। মুজাহিদগণ তৃপ্তি সহকারে পানি পান করিলেন এবং প্রয়োজনীয় পরিমাণ পানি বিভিন্ন পাত্রে ভর্তি করিয়া রাখিলেন। সেনাছাউনী ছাড়া অন্য কোথাও এক ফোটা বৃষ্টিও পড়ে নাই। ইহা ছিল রাসূলুল্লাহ (স)-এর মু'জিযা (Muhammad Husayn Haykal, The Life of Muhammad, p. 448-9)।
হযরত আনাস (রা) বর্ণনা করেন, আমরা রাসূলুল্লাহ (স)-এর সহিত জিহাদের উদ্দেশ্যে হিজর নামক স্থানে পৌছিলে একটি আওয়াজ শুনিতে পাইলাম। কে যেন বলিতেছিল, 'হে আল্লাহ! আমাকে মুহাম্মাদ (স)-এর উম্মতের অন্তর্ভুক্ত কর যাহাদের মাগফিরাত করা হইবে এবং যাহাদের দু'আ কবুল করা হইবে'। রাসূলুল্লাহ (স) বলিলেন : হে আনাস! দেখ তো কিসের আওয়াজ? আমি পাহাড়ে গেলাম, তথায় শুভ্র পোশাকধারী এক ব্যক্তিকে দেখিলাম। তাহার চুল ও দাড়ি সাদা এবং তিনি দৈর্ঘ্যে প্রায় তিন শত হাত। তিনি আমাকে দেখিয়া বলিলেন, আপনি কি রাসূলুল্লাহ (স) কর্তৃক প্রেরিত? আমি বলিলাম, হাঁ। তিনি বলিলেন, তাঁহার কাছে গিয়া আমার সালাম পেশ করুন এবং বলুন, আপনার ভাই ইলয়াস (আ) আপনার সহিত দেখা করিতে চান। হযরত আনাস (রা) বলেন, আমি রাসূলুল্লাহ (স)-এর কাছে আসিয়া এই সংবাদ জানাইলাম। তিনি আমাকে সঙ্গে লইয়া রওয়ানা হইলেন। নিকটে পৌঁছিবার পর তিনি আমার অগ্রে চলিয়া গেলেন এবং আমি পশ্চাতে রহিয়া গেলাম। তাঁহারা দীর্ঘ সময় আলাপ-আলোচনা করিলেন। তাহার পর তাঁহাদের জন্য আকাশ হইতে খাদ্য অবতীর্ণ হইল। রাসূলুল্লাহ (স) আমাকে ডাকিয়া লইলেন। আমি তাঁহাদের সহিত রকমারী খাদ্য গ্রহণের পর এক প্রান্তে চলিয়া গেলাম। অতঃপর একখণ্ড মেঘ আসিয়া মহৎ ব্যক্তিটিকে তুলিয়া লইল। আমি তাহাতে তাঁহার পোশাকের শুভ্রতা প্রত্যক্ষ করিলাম। মেঘখণ্ড তাঁহাকে ঊর্ধ্বাকাশে লইয়া যায় (আল-খাসাইসুল কুবরা, বাংলা অনু. ১খ., পৃ. ৫১৬-৭)।

📘 সীরাত বিশ্বকোষ > 📄 তাবুক যুদ্ধের ফলাফল

📄 তাবুক যুদ্ধের ফলাফল


গাযওয়া তাবুক মুসলমানদের প্রভাব বিস্তার ও শক্তি বৃদ্ধিতে তাৎপর্যপূর্ণ ভূমিকা রাখিয়াছিল। মুসলমানদের মনে এই আত্মবিশ্বাস দৃঢ় হইয়াছিল যে, এখন হইতে জাযীরাতুল আরাবে ইসলামের শক্তি অপ্রতিদ্বন্দ্বী ও অপ্রতিরোধ্য। মুসলমানগণ এই যুদ্ধে দৃঢ় মনোবল, প্রচণ্ড সাহসিকতা ও নজীরবিহীন কুরবানীর যেই ইতিহাস রচনা করিয়াছেন তাহাতে রোমানরা হতচকিত ও ভীত-সন্ত্রস্ত হইয়া পড়ে। তাহারা কোন পাল্টা আক্রমণ, অগ্রাভিযান, সামরিক মহড়া ও তৎপরতা দেখাইতে সক্ষম হয় নাই। মুসলমানদের প্রকাশ্য তৎপরতার মুকাবিলায় তাহারা এক ধরনের পশ্চাদপসরণ ও নীরবতা অবলম্বন করে। নবোত্থিত ইসলামের শক্তি সম্পর্কে তাহাদের যতটা ধারণা ও পরিমাপ ছিল, তাবুক যুদ্ধের প্রস্তুতি তাহাদের সেই পরিমাপের ধারণাকে মিথ্যা প্রতিপন্ন করিয়াছিল। মৃতার যুদ্ধের দুঃসহ স্মৃতি তখনও তাহাদের মনে জাগ্রত ছিল।
পরিবর্তিত পরিস্থিতিতে রোমানদের ক্রীড়নক গোত্রসমূহ বুঝিতে পারিল যে, রোমানদের গৌরবের ও কর্তৃত্বের দিন শেষ, তাহাদের পায়ের তলায় আর মাটি নাই। তাহারা গভীরভাবে অনুভব করিল যে, ইসলাম কোন বুদবুদ নয় যাহা পানির উপর ভাসিয়া উঠিবার পর মুহূর্তেই বিলীন হইয়া যায়। এই কারণে তাহারা জিয়া প্রদানের শর্তে চুক্তিবদ্ধ হইয়া মিত্রে পরিণত হইল। ফলে ইসলামী রাষ্ট্রের সীমানা সম্প্রসারিত হইয়া রোমান সীমান্তের সহিত মিলিত হইল। মুনাফিকরা মুসলমানদের বিরুদ্ধে অব্যাহত ষড়যন্ত্র চালাইয়া যেই স্বপ্নপ্রাসাদ গড়িয়াছিল তাহাও ভাঙ্গিয়া চূর্ণবিচূর্ণ হইয়া যায়। কারণ তাহাদের আশা-ভরসার মূল কেন্দ্র ছিল রোমান শক্তি। এই অবস্থায় পরাজিত মুনাফিক শক্তির সহিত নমনীয় ব্যবহারের প্রয়োজনীয়তা ফুরাইয়া গেল। এই ব্যাপারে শৈথিল্য প্রদর্শন করিলে তাহারা আবার মাথাচাড়া দিয়া উঠিতে পারে এবং সুযোগ লইয়া ভয়াবহ ক্ষতিসাধন করিতে পারে। তাই আল্লাহ তা'আলা মুনাফিকদের সহিত কঠোর আচরণ করার, তাহাদের জানাযা নামাযে শরীক না হওয়ার, কবর যিয়ারত না করার ও মাগফিরাতের দু'আ না করার নির্দেশ দিয়াছেন। তাহাদের তৈরী তথাকথিত মসজিদ (আসলে চক্রান্ত দুর্গ) ধ্বংস করা হইল। আল্লাহ তা'আলা কুরআনের বিভিন্ন আয়াত নাযিল করিয়া মুনাফিকদের চরিত্রের বিভিন্ন দিক উন্মোচিত করিয়া দেন।
মক্কা বিজয়ের পর যদিও বিভিন্ন দেশের প্রতিনিধিগণ রাসূলুল্লাহ (স)-এর দরবারে আসিতে শুরু করিয়াছিল, তাবুক যুদ্ধের পর ইহার সংখ্যা বহু গুণে বৃদ্ধি পাইল। ইহাতেই তাবুক যুদ্ধের প্রভাব আন্দায করা যায়। পরবর্তীতে হযরত আবূ বাক্স (রা) ও হযরত উমর (রা)-র সময় রোমান সাম্রাজ্যের কর্তৃত্বাধীন সিরিয়া মুসলমানদের অধিকারে আসে। তাবুক যুদ্ধই ছিল পরবর্তীতে সিরিয়া বিজয়ের ভিত্তি। সীরাতে নববী, ইসলামের দাওয়াত ও সমরনীতির ইতিহাসে গাযওয়া তাবুকের একটি বিশেষ গুরুত্ব রহিয়াছে। ইহার দ্বারা সেই সকল লক্ষ্য ও উদ্দেশ্য পূর্ণতা প্রাপ্ত হয়, যাহা মুসলমান ও আরবদের অনুকূলে খুবই সুদূরপ্রসারী ছিল। ইহা ইসলামের ইতিহাসের ধারাবাহিকতা ও ভবিষ্যত সংঘটিত ঘটনাবলীর উপর কার্যকর প্রভাব বিস্তার করে।

লিঙ্ক শেয়ার করুন
close

লিঙ্ক কপি করুন

0:00
0:00