📄 সুওয়ায়লিম ইয়াহুদীর আস্তানায় অগ্নিসংযোগ
রাসূলুল্লাহ (স)-এর নিকট এই মর্মে সংবাদ পৌছে যে, কতিপয় মুনাফিক সুওয়ায়লিম ইয়াহুদীর বাড়ীতে জমায়েত হইয়া তাবুক অভিযানে রাসূলুল্লাহ (স)-এর সহিত না যাওয়ার জন্য মুসলমানদের প্ররোচিত করিতেছে। তাহার আস্তানাটি ছিল জাসুম নামক এলাকায়। রাসূলুল্লাহ (স) সুওয়ায়লিমের আস্তানাটি জ্বালাইয়া দেওয়ার জন্য হযরত তালহা ইবন উবায়দুল্লাহ (রা)-এর নেতৃত্বে একদল সাহাবীকে জাসুমে প্রেরণ করেন। হযরত তালহা (রা) রাসূলুল্লাহ (স)-এর হুকুম অনুযায়ী আস্তানায় আগুন ধরাইয়া দেন। দাহ্হাক ইব্ন খালীফা ও তাহার সাঙ্গপাঙ্গরা ছাদ হইতে নিচে লাফাইয়া পড়ে। অন্যরা পালাইয়া যাইতে সক্ষম হইলেও দাহ্হাকের পা ভাঙ্গিয়া যায়। ঘটনার স্মৃতিচারণ করিয়া দাহ্হাক বলে :
كادت وبيت الله نار محمد + يشيط بها الضحاك وابن ابيريق وظلت وقد طبقت كبس سويلم + انوء على رجلى كسيرا مرفقى سلام عليك لا اعود لمثلها + اخاف ومن تشمل به النار يحرق
“বায়তুল্লাহ্র কসম! মুহাম্মাদের আগুনে দাহ্হাক ও ইব্ন উবায়রীক পুড়িয়া ভস্ম হইয়া যাইতেছিল প্রায়। আমি সুওয়ায়লিমের ছোট ঘরের ছাদে চড়িলাম। এখন আমার অবস্থা এই যে, ভাঙ্গা পা ও কনুইতে ভর করিয়া চলি। তোমাদের প্রতি সালাম, আমি আর ইহার পুনরাবৃত্তি করিব না। আমার আশংকা হয়, এই আগুন যাহাকে স্পর্শ করিবে সেই পুড়িয়া ছাই হইয়া যাইবে” (ইবন হিশাম, ২খ, পৃ. ৫১৭; ইব্ন খালদুন, তারীখ, ১খ., পৃ. ১৭৬)।
এই মুনাফিকদের ব্যাপারে আল্লাহ তা'আলা রাসূলুল্লাহ (স)-কে নির্দেশ দেন: يَأَيُّهَا النَّبِيُّ جَاهِدِ الْكُفَّارَ وَالْمُنْفِقِينَ وَاغْلُظَ عَلَيْهِمْ وَمَأْوَاهُمْ جَهَنَّمُ وَبِئْسَ الْمَصِيرُ.
"হে নবী! কাফির ও মুনাফিকদের বিরুদ্ধে জিহাদ কর এবং ইহাদের প্রতি কঠোর হও; উহাদের আবাসস্থল জাহান্নাম, উহা কত নিকৃষ্ট প্রত্যাবর্তনস্থল" (৯: ৭৩)।
📄 যুদ্ধে না যাওয়া তিন সাহাবী
তিনজন সাহাবী তাবুক যুদ্ধে অংশগ্রহণ করেন নাই, বিনা ওজরে মদীনায় থাকিয়া গিয়াছিলেন, তবে তাহাদের মনে কোন সন্দেহ ও কপটতা ছিল না। তাঁহারা হইতেছেন কা'ব ইবন মালিক (রা), মুরারা ইবনুর রাবী' (রা) ও হিলাল ইব্ন উমায়্যা (রা)। রাসূলুল্লাহ (স) অপরাপর সাহাবীদের বলেন:
لا تكلمن احدا من هولاء الثلاثة.
"তোমরা এই তিনজনের সহিত কিছুতেই কথাবার্তা বলিবে না"।
কা'ব ইবন মালিক (রা) নিজেই তাঁহার তাবুক যুদ্ধে পিছনে থাকিয়া যাওয়ার ঘটনা বর্ণনা করিয়াছেন। তিনি বলেন, "রাসূলুল্লাহ (স) যতগুলি যুদ্ধ করিয়াছেন তাহার মধ্যে তাবুক ও বদর ছাড়া আর কোনটিতে আমি অনুপস্থিত থাকি নাই। তবে বদর যুদ্ধে যাহারা পিছনে রহিয়াছিলেন তাহাদের কাহারও উপর আল্লাহ অসন্তুষ্টি প্রকাশ করেন নাই। বদর যুদ্ধে আসলে রাসূলুল্লাহ (স)-এর উদ্দেশ্য ছিল কুরায়শদের কাফেলার পশ্চাদ্ধাবন করা। হঠাৎ এক সময় আল্লাহ তাঁহাদিগকে শত্রুর মুখোমুখি করিয়া দেন এবং যুদ্ধ সংঘটিত হয়। আল-আকাবার রাত্রিতে আমি রাসূলুল্লাহ (স)-এর নিকট হাযির ছিলাম। তিনি ইসলামের উপর দৃঢ়ভাবে কায়েম থাকিবার জন্য আমাদের নিকট হইতে শপথ গ্রহণ করেন। যদিও বদর যুদ্ধ জনসাধারণের মধ্যে বেশী আলোচিত কিন্তু তাহার চাইতে লায়লাতুল 'আকাবা আমার নিকট বেশী প্রিয়। আর তাবুক যুদ্ধে আমার পিছাইয়া থাকার কারণস্বরূপ বলা যায়, এই যুদ্ধের সময় আমি বেশী শক্তিশালী ও স্বচ্ছল অবস্থায় ছিলাম। আল্লাহ্র কসম! ইতোপূর্বে আমার নিকট কখনও এক সাথে দুইটি সওয়ারী ছিল না। অথচ এই যুদ্ধের সময় আমি দুইটি সওয়ারীর মালিক ছিলাম। রাসূলুল্লাহ (স)-এর নিয়ম ছিল, কোন যুদ্ধের সিদ্ধান্ত গ্রহণের পর তিনি কখনও পরিষ্কারভাবে স্থান, এলাকা বা কোন নিশানা জানাইতেন না, বরং কিছু অস্পষ্ট ও দ্ব্যর্থক শব্দ বলিয়া দিতেন। কিন্তু তাবুক যুদ্ধের সময় ছিল ভীষণ গরম, পথ ছিল দীর্ঘ এবং পানি, গাছ-পালা ও লতাপাতাশূন্য। শত্রুর সংখ্যা ছিল অনেক বেশী। কাজেই রাসূলুল্লাহ (স) মুসলমানদেরকে যুদ্ধের স্থান সম্পর্কে সুস্পষ্টভাবে জানাইয়া দেন যাহাতে তাহারা ভালভাবে প্রস্তুতি গ্রহণ করিতে পারেন। এই সময় রাসূলুল্লাহ (স)-এর সহিত বিপুল সংখ্যক মুসলমান ছিলেন, তবে এমন কোন রেজিষ্ট্রি খাতা ছিল না যাহাতে তাহাদের সকলের নাম লিপিবদ্ধ থাকিত।"
কা'ব (রা) বলেন, "এই যুদ্ধ হইতে অনুপস্থিত থাকিবার ইচ্ছা পোষণ করার মত একজন লোকও ছিল না। তবে ইহাও মনে করা হইত যে, কেহ যদি অনুপস্থিত থাকে তাহা হইলে আল্লাহ্ ওহী না আসা পর্যন্ত রাসূলুল্লাহ (স) জানিতে পারিবেন না। এই যুদ্ধের প্রস্তুতি এমন এক সময় শুরু করা হয় যখন ফল পাকিয়া গিয়াছিল এবং বৃক্ষের ছায়ায় বিশ্রাম লওয়া আরামদায়ক মনে হইতেছিল। রাসূলুল্লাহ (স) এবং তাঁহার সহিত মুসলমানগণ পূর্ণোদ্যমে যুদ্ধের প্রস্তুতি গ্রহণ করিতেছিলেন। আমিও প্রতিদিন সকালে তাহাদের সহিত প্রস্তুতি গ্রহণের চিন্তা করিতাম। সারা দিন চলিয়া যাইত অথচ আমি কিছুই করিতাম না। আমি মনে মনে বলিতাম, আমি তো যে কোন সময় প্রস্তুত হইবার ক্ষমতা রাখি, কাজেই এত তাড়াহুড়া কিসের? এইভাবে দিন অতিবাহিত হইতে থাকে। একদিন সকালে তিনি মুসলিম বাহিনীসহ যাত্রা করিলেন অথচ তখনও আমি কোন প্রকার প্রস্তুতি গ্রহণ করি নাই। আমি বলিলাম, আমি এই তো দুই-এক দিনের মধ্যে প্রস্তুত হইয়া তাহাদের সঙ্গে মিলিত হইব। তাহারা চলিয়া যাওয়ার পরের দিন সকালে আমি প্রস্তুতি লইতে চাহিলাম। কিন্তু দিন অতিবাহিত হইয়া গেল, অথচ আমার প্রস্তুতি শেষ হইল না। তাহার পরের দিন সকালে আবার চাহিলাম, কিন্তু এইবারও লইতে পারিলাম না। আমার এই অবস্থা চলিতে থাকিল। এখন তো সকলে অনেক দূরে চলিয়া গিয়াছে। আমি কয়েকবার ইচ্ছা করিলাম বাহির হইয়া তাহাদের সহিত মিলিত হই। আহা! যদি আমি এইরূপ করিয়া ফেলিতাম। কিন্তু তাহা আমার ভাগ্যে ছিল না। রাসূলুল্লাহ (স)-এর চলিয়া যাইবার পর আমি যখন লোকালয়ে বাহির হইতাম তখন পথে-ঘাটে মুনাফিক, দুর্বল ও অক্ষম ব্যক্তি ছাড়া আর কাহাকেও দেখিতাম না। আমার ভীষণ দুঃখ হইত।"
"রাসূলুল্লাহ (স) পথে কোথাও আমার কথা জিজ্ঞাসা করিলেন না। তবে তাবুকে পৌঁছিয়া যখন তিনি সকলকে লইয়া বসিলেন তখন আমার কথা জিজ্ঞাসা করিলেন:
ما فعل كعب ؟ 'কা'ব কি করিল?'
"সালামা গোত্রের এক ব্যক্তি বলিল, হে আল্লাহর রাসূল! নিজের সৌন্দর্যের প্রতি মোহ ও অহংকার তাহাকে আটকাইয়া রাখিয়াছে। মু'আয ইবন জাবাল বলিলেন, "তুমি তো ভাল কথা বলিলে না। আল্লাহ্র কসম! আমরা তাহার ব্যাপারে ভাল ছাড়া কিছুই জানি না"। এই কথা শুনিয়া রাসূলুল্লাহ (স) চুপ করিয়া থাকিলেন।"
কা'ব ইব্ন মালিক বলেন, "যখন আমি জানিতে পারিলাম রাসূলুল্লাহ (স) ফিরিয়া আসিতেছেন, আমি চিন্তা করিতে লাগিলাম এমন কোন মিথ্যা বাহানা করা যায় কিনা যাহার ফলে আমি তাঁহার ক্রোধ হইতে বাঁচিতে পারি। এই উদ্দেশ্যে আমি ঘরের বুদ্ধিমান লোকদের নিকটও পরামর্শ চাহিলাম। কিন্তু যখন শুনিলাম রাসূলুল্লাহ (স) মদীনার একেবারে নিকটে আসিয়া পৌছিয়াছেন তখন আমার মন হইতে মিথ্যা বাহানা করিবার চিন্তা একেবারেই দূর হইয়া গেল এবং আমি বিশ্বাস করিলাম যে, মিথ্যা কথা আমাকে তাঁহার ক্রোধ হইতে বাঁচাইতে পারিবে না। কাজেই আমি সত্য কথা বলিতে দৃঢ়প্রতিজ্ঞ হইলাম। সকালে রাসূলুল্লাহ (স) মদীনা পৌছিয়া গেলেন। আর তাঁহার নিয়ম ছিল যখনই তিনি সফর হইতে ফিরিয়া আসিতেন, প্রথমে মসজিদে গমন করিয়া দুই রাক'আত নামায পড়িতেন। তাহার পর জনগণের সহিত কথা বলিবার জন্য বসিয়া যাইতেন। ঐ দিন যখন তিনি নামায শেষ করিয়া মসজিদে নববীতে বসিয়া গেলেন, তখন তাবুক যুদ্ধ হইতে পিছাইয়া থাকা লোকেরা আসিতে লাগিল। তাহারা কসম করিয়া নিজেদের ওজর পেশ করিতে লাগিল। তাহাদের সংখ্যা ছিল আশির ঊর্ধ্বে। রাসূলুল্লাহ (স) তাহাদের ওজর কবুল করিয়া তাহাদের নিকট হইতে পুনর্বার বায়আত লইলেন, তাহাদের জন্য মাগফিরাতের দু'আ করিলেন এবং তাহাদের মনের গোপন বিষয় আল্লাহ্র নিকট সোপর্দ করিলেন।"
কা'ব বলেন, "আমিও তাঁহার নিকট আসিলাম। আমি সালাম দিতেই তিনি মুচকি হাসিয়া তাহার জওয়াব দিলেন। এমন হাসি যাহাতে ক্রোধের মিশ্রণ ছিল। তিনি বলিলেন: আস, আস। আমি তাঁহার সম্মুখে গিয়া বসিয়া পড়িলাম। তিনি আমাকে বলিলেন:
ما خلفك الم تكن قد ابتعت ظهرك ؟ 'তোমাকে কিসে পিছনে আটকাইয়া রাখিয়াছিল? তুমি না সওয়ারী ক্রয় করিয়াছিলে?'
"আমি বলিলাম, অবশ্য আমি সওয়ারী কিনিয়া লইয়াছিলাম। তবে আল্লাহ্র কসম! আপনি ছাড়া দুনিয়ার আর কোন ব্যক্তির সম্মুখে আমি বসিতাম তাহা হইলে তাহার ক্রোধ হইতে বাঁচিবার জন্য কোন মিথ্যা ওজর পেশ করিয়া বিদায় লইতাম। কারণ কথা বলার ব্যাপারে আমি কম পারদর্শী নই। কিন্তু আল্লাহ্র কসম! আমি জানি, আজ যদি আপনার নিকট মিথ্যা বলিয়া আপনাকে খুশী করি তাহা হইলে হইতে পারে কাল আল্লাহ আপনাকে আমার উপর নাখোশ করিয়া দিবেন। আর যদি আমি আপনার সম্মুখে সত্য কথা বলি তাহাতে আপনি নাখোশ হইলেও আল্লাহ্ পক্ষ হইতে ক্ষমা পাওয়ার আশা রাখি। না, আল্লাহর কসম! আমার কোন ওজর ছিল না। আমি যখন পিছনে থাকিয়া যাই তখনকার মত আর কোন সময় আমি অতটা শক্তি-সামর্থ্যের অধিকারী ছিলাম না। এই কথা শুনিয়া রাসূলুল্লাহ (স) মন্তব্য করিলেন:
اما هذا فقد صدق فقم حتى يقضى الله فيك. "কা'ব সত্য কথাই বলিয়াছে। ঠিক আছে, চলিয়া যাও। দেখ, আল্লাহ তা'আলা তোমার ব্যাপারে কি ফায়সালা দেন"।
"আমি উঠিয়া পড়িলাম। বানু সালামার লোকেরাও আমার সঙ্গে সঙ্গে চলিতে লাগিল। তাহারা আমাকে বলিল, আল্লাহ্র কসম! আমরা তো এই পর্যন্ত আপনার কোন গুনাহের কথা জানি না। পিছনে থাকিয়া যাওয়া অন্যান্য লোকের মত আপনি রাসূলুল্লাহ (স)-এর নিকট একটি বাহানা পেশ করিতে পারিলেন না? রাসূলুল্লাহ (স)-এর ইসতিগফার আপনার গুনাহ মাফির জন্য যথেষ্ট হইত। উহারা বরাবর আমাকে ভীষণভাবে ভর্ৎসনা করিতে লাগিল। এমনকি এক পর্যায়ে আমি রাসূলুল্লাহ (স)-এর নিকট ফিরিয়া যাইতে এবং আমার প্রথম কথাটি মিথ্যা পতিপন্ন করিতে মনস্থ করিলাম। অতঃপর আমি তাহাদের জিজ্ঞাসা করিলাম, আচ্ছা, আমার মত নিজের ভুল স্বীকার করিয়াছে এমন আর কাহাকেও কি তোমরা সেইখানে দেখিয়াছ? তাহারা জওয়াব দিল, হাঁ, দুইজন লোককে আমরা দেখিয়াছি, তাহারা তোমার মত একই কথা বলিয়াছে। আর তাহাদেরকেও সেই একই কথা বলা হইয়াছে যাহা তোমাকে বলা হইয়াছে। আমি জিজ্ঞাসা করিলাম, তাহাদের পরিচয় কি? তাহারা বলিল, মুরারাহ ইবন রাবী' ও হিলাল ইন্ন উমায়্যা। এই ব্যক্তিদ্বয় ছিলেন সৎ, আদর্শ স্থানীয় ও বদর যুদ্ধে অংশগ্রহণকারী। আমি মনে মনে স্বস্তি বোধ করিয়া চলিতে শুরু করিলাম।"
"এইদিকে রাসূলুল্লাহ (স) আমাদের এই তিনজনের সহিত কথা বলা মুসলমানদের জন্য নিষিদ্ধ ঘোষণা করিয়াছেন। কাজেই জনগণ আমাদের এড়াইয়া চলিতে লাগিল। আমাদেরকে তাঁহারা যেন একেবারেই চিনে না। অবশেষে আমার এমন মনে হইতে লাগিল, যেমন দুনিয়ার পরিচিত সকল কিছু অপরিচিত হইয়া গিয়াছে। দেখিতে দেখিতে এইভাবে পঞ্চাশটি রাত অতিবাহিত হইল। আমার অন্য দুই ভাই নিজ নিজ ঘরে অবস্থান করিয়া কান্নাকাটি করিতে লাগিলেন। তবে আমি ছিলাম যৌবনদীপ্ত ও সাহসী, তাই আমি বাহিরে যাইতে থাকিলাম। মুসলমানদের সহিত নামাযে যোগ দিতাম ও বাজারে ঘুরাফিরা করিতাম, কিন্তু কেহই আমার সহিত কথা বলিত না। আমি রাসূলুল্লাহ (স)-এর নিকট যাইতাম। নামাযের পর মজলিসে বসিলে আমি তাহাকে সালাম জানাইতাম; আমার সালামের জওয়াবে তাঁহার ঠোঁট নড়িল কিনা বুঝিতে পারিতাম না। অতঃপর আমি তাঁহার নিকট দাঁড়াইয়া নামায পড়িতাম এবং বাঁকা দৃষ্টিতে লুকাইয়া লুকাইয়া তাঁহাকে দেখিতাম। আমি যখন নামাযে মশগুল থাকি তখন তিনি আমার দিকে তাকান, আবার আমি যখন তাঁহার দিকে চাইতাম তখন তিনি মুখ ফিরাইয়া লইতেন। এই অবস্থায় দীর্ঘ দিন চলিয়া গেল। জনবিচ্ছিন্নতা আমাকে দিশাহারা করিয়া তুলিল। তাই একদিন আমার চাচাত ভাই আবু কাতাদার বাগানের পাঁচিল টপকাইয়া তাহার নিকট আসিলাম। সে ছিল আমার সর্বাধিক প্রিয় ব্যক্তি। আমি তাহাকে সালাম দিলাম, কিন্তু সে আমার সালামের জওয়াব দিল না। আমি তাহাকে বলিলাম, হে আবু কাতাদা! আল্লাহ্র কসম দিয়া আমি তোমাকে জিজ্ঞাসা করি, তুমি কি জান না আমি আল্লাহ ও তাঁহার রাসূল (স)-কে ভালবাসি? সে নীরব রহিল। আমি আবার আল্লাহর নামের কসম করিয়া তাঁহাকে এই প্রশ্ন করিলাম। এইবারও সে চুপ করিয়া থাকিল। আমি তৃতীয়বার তাহাকে একই প্রশ্ন করিলাম। এইবার সে জওয়াব দিল, আল্লাহ ও তাঁহার রাসূলই ভাল জানেন। আমি আর নিজেকে সামলাইতে পারিলাম না। আমার দুই চোখ হইতে ঝরঝর করিয়া অশ্রু নির্গত হইতে লাগিল। আমি পাঁচিল টপকাইয়া ফিরিয়া আসিলাম।"
"এই সময় একদিন আমি মদীনার বাজারে হাঁটিতেছিলাম। সিরিয়ার এক খৃস্টান কৃষক মদীনার বাজারে শস্য বিক্রয় করিতে আসিয়াছিল। সে আমাকে খোঁজ করিতেছিল। লোকেরা ইশারা করিয়া দেখাইয়া দিলে সে আমার নিকট আসিয়া গাস্সানের খৃস্টান রাজার একটি চিঠি আমাকে হস্তান্তর করিল। চিঠিতে রাজা লিখিয়াছিল:
فانه قد بلغنى ان صاحبك قد جفاك ولم يجعلك الله بدار هوان ولا حضيعة فالحق بنا نواسك.
"আমি জানিতে পারিয়াছি, আপনার নেতা আপনার উপর নির্যাতন চালাইতেছেন, অথচ আল্লাহ আপনাকে লাঞ্ছনা ও অবমাননাকর অবস্থায় রাখেন নাই। কাজেই আপনি আমাদের দেশে চলিয়া আসুন। আমরা আপনাকে সাহায্য করিব"।
"চিঠিটি পড়িয়া আমি বলিলাম, ইহাও আরেকটি পরীক্ষা। কাজেই চিঠিটি তন্দুরের আগুনে নিক্ষেপ করিলাম। এইভাবে পঞ্চাশ দিনের মধ্যে চল্লিশ দিন অতিবাহিত হইয়া গেল। এমন সময় খুযায়মা ইব্ন ছাবিত (রা) আমার নিকট আসিয়া বলিলেন, রাসূলুল্লাহ (স) তোমাকে তোমার স্ত্রী হইতে পৃথক থাকিবার হুকুম দিয়াছেন। আমি বলিলাম, আমি কি তাহাকে তালাক দিব, না কি আর কিছু করিব? তিনি বলিলেন না, তালাক দিবে না। তবে তাহা হইতে পৃথক থাকিবে এবং তাহার সান্নিধ্যে যাইবে না। আমার অন্য দুইজন সাথীর নিকটও এই মর্মে দূত পাঠানো হইল। আমি আমার স্ত্রীকে বলিলাম, তুমি নিজের আত্মীয়দের নিকট চলিয়া যাও এবং আমার ব্যাপারে আল্লাহ কোন ফায়সালা না দেওয়া পর্যন্ত তাহাদের সহিত অবস্থান কর।"
কা'ব (রা) বলেন, "হিলাল ইবন উমায়্যার স্ত্রী রাসূলুল্লাহ (স)-এর নিকট আসিয়া বলিলেন, হে আল্লাহ্র রাসূল! আমার স্বামী বৃদ্ধ হইয়া গিয়াছে, তাহার কোন খাদেম নাই। যদি আমি তাহার খেদমত করি, তাহার কাজকর্ম করিয়া দেই, তাহা হইলে কি কোন ক্ষতি আছে? রাসূলুল্লাহ (স) জবাব দিলেন: না, কোন ক্ষতি নাই। তবে সে যেন তোমার কাছে না আসে। হিলালের স্ত্রী বলিলেন, আল্লাহর কসম! তাহার মধ্যে এই ব্যাপারে কোন আকর্ষণ বা আকাংক্ষা নাই। যেই দিন এই ঘটনা ঘটিয়াছে সেই দিন হইতে সে কেবল কাঁদিয়াই চলিয়াছে। কা'ব বলেন, আমাকেও আমার পরিবারের কেহ কেহ বলিল, তুমিও রাসূলুল্লাহ (স)-এর দরবারে যাও। তোমার স্ত্রীর ব্যাপারে একটা অনুমতি লইয়া আস, যাহাতে সে তোমার খেদমত করিতে পারে। আমি বলিলাম, না। যখন এই ব্যাপারে অনুমতি চাইব তখন রাসূলুল্লাহ (স) কি বলিবেন? কারণ আমি তো যুবক।"
"এইভাবে দুঃসহ যন্ত্রণার ভেতরে পঞ্চাশটি রাত অতিক্রান্ত হইয়া গেল। আমার মনের অবস্থা ছিল অত্যন্ত করুণ। জীবন যেমন আমার নিকট দুঃসাধ্য, পৃথিবী যেন তাহার সব বিস্তীর্ণতা সত্ত্বেও আমার জন্য সংকীর্ণ হইয়া পড়িয়াছে। একদিন ফজরের নামাযের পর ঘরের আঙিনায় বসিয়া আছি। সেই মুহূর্তে সা'আ পাহাড়ের দিক হইতে একটি আওয়াজ শুনিতে পাইলাম। কে যেন চিৎকার করিয়া বলিতেছে:
"হে কা'ব ইবন মালিক! সুসংবাদ গ্রহণ কর"।
يا كعب بن مالك ابشر.
কা'ব বলেন, "আমি আল্লাহর দরবারে সিজদায় অবনত হইলাম। আমার আর বুঝিতে বাকী রহিল না যে, এইবার আমার সংকট কাটিয়া গিয়াছে। রাসূলুল্লাহ (স) ফজরের নামাযের পর ঘোষণা দিয়াছেন যে, আল্লাহ আমাদের তওবা কবুল করিয়াছেন। কাজেই লোকেরা আমার ও আমার সাথীদের সুসংবাদ ও মুবারকবাদ জানাইবার জন্য আসা-যাওয়া করিতে লাগিল। হামযা ইবন 'আমর আল-আসলামী আমার নিকট আসিয়া যখন সুসংবাদ জানাইল তখন আমি এতই খুশী হইয়াছিলাম যে, আমার পোশাক খুলিয়া তাহাকে পরাইয়া দিলাম। আল্লাহ্র কসম! তখন আমার নিকট ঐ পোশাক ছাড়া আর কোন কাপড় ছিল না। অতঃপর আমি একজোড়া পোশাক ধার করিয়া পরিধান করিলাম এবং রাসূলুল্লাহ (স)-এর সহিত সাক্ষাতের উদ্দেশ্যে বাহির হইয়া পড়িলাম। পথে দলে দলে লোকেরা আমার সহিত মোলাকাত করিতেছিল এবং তওবা কবুল হওয়ার জন্য মুবারকবাদ জানাইতেছিল। তাহার বলিতেছিল:
لتهنك توبة الله عليك "আল্লাহ তোমার তওবা কবুল করার জন্য তোমাকে মুবারকবাদ।"
কা'ব (রা) বলিলেন, “হে আল্লাহর রাসূল! এই ক্ষমা আপনার পক্ষা হইতে না আল্লাহর পক্ষ হইতে। তিনি বলেন: না, ইহা স্বয়ং আল্লাহ্ পক্ষ হইতে। অতঃপর আমি তাঁহার সম্মুখে উপবেশন করিয়া আরয করিলাম, ইয়া রাসূলাল্লাহ! আমার তওবা কবুলের শুকরিয়া স্বরূপ আমি আমার সমস্ত ধন-সম্পদ আল্লাহ ও রাসূলের পথে সদাকা করিয়া দিতে চাই। রাসূলুল্লাহ (স) বলিলেন, সম্পদের কিছু অংশ নিজের জন্য রাখিয়া দাও, তাহাতে তোমার মঙ্গল হইবে। আমি নিবেদন করিলাম, তাহা হইলে আমি শুধু খায়বারের অংশটুকু নিজের জন্য রাখিয়া বাকি সব আল্লাহ ও রাসূলের পথে দান করিয়া দিলাম। ইয়া রাসূলাল্লাহ! সত্য কথা বলিবার কারণে আল্লাহ তা'আলা আমাকে মুক্তি দিয়াছেন। আমার তওবার অংশ হিসাবে আমি ওয়াদা করিলাম, যতদিন জীবিত থাকিব সত্য কথাই বলিব। এই ব্যাপারে আল্লাহ তা'আলা রাসূলুল্লাহ (স)-এর উপর নিম্নোক্ত আয়াত নাযিল করেন:
لَقَدْ تَابَ اللهُ عَلَى النَّبِيِّ وَالْمُهْجِرِينَ وَالْأَنْصَارِ الَّذِينَ اتَّبَعُوهُ فِي سَاعَةِ الْعُسْرَةِ مِنْ بَعْدِ مَا كَادَ يَزِيعُ قُلُوبُ فَرِيقٌ مِّنْهُمْ ثُمَّ تَابَ عَلَيْهِمْ ط إِنَّهُ بِهِمْ رَءُوفٌ رَّحِيمٌ. وَعَلَى الثَّلْثَةِ بِمَا رَحُبَتْ وَضَاقَتْ عَلَيْهِمْ أَنْفُسُهُمْ وَظَنُّوا أَنْ الَّذِينَ خُلَفُوا حَتَّى إِذَا ضَاقَتْ عَلَيْهِمُ الْأَرْضُ بِمَا لَا مَلْجَأَ مِنَ اللهِ إِلَّا إِلَيْهِ ثُمَّ تَابَ عَلَيْهِمْ لِيَتُوبُوا ط إِنَّ اللهَ هُوَ التَّوَّابُ الرَّحِيمُ. يَأَيُّهَا الَّذِينَ آمَنُوا اتَّقُوا اللهَ وَكُونُوا مَعَ الصَّادِقِينَ.
"আল্লাহ অবশ্যই অনুগ্রহপরায়ণ হইলেন নবীর প্রতি এবং মুহাজির ও আনসারদের প্রতি যাহারা তাহার অনুসরণ করিয়াছিল সংকটকালে (তাবুক যুদ্ধের সময়), এমনকি যখন তাহাদের এক দলের চিত্ত-বৈকল্যের উপক্রম হইয়াছিল। পরে আল্লাহ উহাদিগকে ক্ষমা করিলেন; তিনি তো উহাদের প্রতি দয়ার্দ্র, পরম দয়ালু। এবং তিনি ক্ষমা করিলেন অপর তিনজনকেও যাহাদের সম্পর্কে সিদ্ধান্ত স্থগিত রাখা হইয়াছিল, যে পর্যন্ত না পৃথিবী বিস্তৃত হওয়া সত্ত্বেও তাহাদের জন্য উহা সংকুচিত হইয়াছিল এবং তাহাদের জীবন তাহাদের জন্য দুর্বিষহ হইয়াছিল এবং তাহারা উপলব্ধি করিয়াছিল যে, আল্লাহ ব্যতীত কোন আশ্রয়স্থল নাই, তাঁহার দিকে প্রত্যাবর্তন ব্যতীত; পরে তিনি উহাদের তওবা কবুল করিলেন যাহাতে উহারা তওবায় স্থির থাকে। নিশ্চয় আল্লাহ ক্ষমাশীল ও পরম দয়ালু। হে মু'মিনগণ! তোমরা আল্লাহকে ভয় কর এবং সত্যবাদীদের অন্তর্ভুক্ত হও" (৯:১১৭-৮)।
কা'ব বলেন, "আল্লাহ্র কসম! আল্লাহ তা'আলা আমাকে ইসলামের প্রতি পথনির্দেশ করিবার পর এমন কোন অনুগ্রহ আমার উপর করেন নাই, যাহা আমার নিকট রাসূলুল্লাহ (স)-এর নিকট সত্য কথা অপেক্ষা শ্রেষ্ঠতর। আল্লাহ্ মেহেরবানী যে, আমি তাঁহার নিকট মিথ্যা বলি নাই। তাহা হইলে মিথ্যাবাদীরা যেইভারে ধ্বংস হইয়া গিয়াছে, তেমনি আমিও ধ্বংস হইয়া যাইতাম। কেননা মিথ্যাবাদীদের সম্পর্কে ওহী নাযিল করিয়া আল্লাহ যে মন্তব্য করিয়াছেন তাহা অত্যন্ত কঠোর ও মারাত্মক। আল্লাহ তা'আলা বলেন:
سَيَحْلِفُونَ بِاللَّهِ لَكُمْ إِذَا انْقَلَبْتُمْ إِلَيْهِمْ لِتُعْرِضُوا عَنْهُمْ طَ فَاعْرِضُوا عَنْهُمْ طَ إِنَّهُ رِجْسٌ وَمَا وَهُمْ جَهَنَّمُ جَزَاءً بِمَا كَانُوا يَكْسِبُونَ يَحْلِفُونَ لَكُمْ لِتَرْضَوْا عَنْهُمْ فَإِنْ تَرْضَوا عَنْهُمْ فَإِنْ اللَّهَ لَا يَرْضَى عَنِ الْقَوْمِ الْفَسِقِينَ.
"তোমরা উহাদের নিকট ফিরিয়া আসিলে অচিরেই উহারা আল্লাহ্র শপথ করিবে যাহাতে তোমরা উহাদের উপেক্ষা কর। সুতরাং তোমরা উহাদিগকে উপেক্ষা করিবে; উহারা অপবিত্র এবং উহাদের কৃতকর্মের ফলস্বরূপ জাহান্নাম উহাদের আবাসস্থল। উহারা তোমাদের নিকট শপথ করিবে যাহাতে তোমরা উহাদের প্রতি তুষ্ট হও। তোমরা তাহাদের প্রতি তুষ্ট হইলেও আল্লাহ তো সত্যত্যাগী সম্প্রদায়ের প্রতি তুষ্ট হইবেন না" (৯৪ ৯৫-৬)।
কা'ব (রা) বলেন, “যেই সকল লোক রাসূলুল্লাহ (স)-এর নিকট শপথ করিয়া অজুহাত প্রদর্শন করিয়াছিল, রাসূলুল্লাহ (স) তাহাদের অজুহাত গ্রহণ করিয়া তাহাদের জন্য আল্লাহ্র নিকট ক্ষমা প্রার্থনা করিয়াছিলেন। আমাদের তিনজনের বিষয়টি স্থগিত রাখা হয়। অবশেষে আল্লাহ তা'আলা আমাদের তওবা কবুল করিয়া মুক্তির ফায়সালা দান করেন" (সহীহ আল-বুখারী, ৩খ., ১৩০-৫; ইন হিশাম, আস-সীরাতুন নাবাবিয়্যা, ২খ., পৃ. ৫৩১-৭; তাফসীর ইব্ন কাছীর, ২খ., পৃ. ২৫-৯)।
📄 তাবুক অভিমুখে যাত্রা
প্রস্তুতি সম্পন্ন হওয়ার পর রাসূলুল্লাহ (স) নবম হিজরীর রজব মাসের বৃহস্পতিবার সকাল বেলা ত্রিশ হাজার মুজাহিদ ও দশ হাজার অশ্ব লইয়া মদীনা হইতে তাবূক অভিমুখে রওয়ানা করেন। যাত্রার প্রাক্কালে রাসূলুল্লাহ (স) তাঁহার অনুপস্থিতিতে প্রশাসনিক কার্যক্রম পারিচালনার জন্য মুহাম্মাদ ইবন মাসলামা (রা)-কে ভারপ্রাপ্ত আমীর, পরিবারিক বিষয়াদি তদারকীর জন্য হযরত আলী ইব্ন আবি তালিব (রা)-কে প্রতিনিধি, শান্তি-শৃঙখলা রক্ষার জন্য হযরত সিবা' ইব্ন উরফুতা (سباع ابن عرفطة)-কে মদীনার কোতওয়াল ও সালাত পরিচালনার জন্য হযরত আব্দুল্লাহ ইব্ন উম্ম মাকতুম (রা)-কে মদীনার মসজিদের ইমাম নিযুক্ত করেন (উয়ূনুল আছার, ২খ., পৃ. ২৫৪; সীরাতুল মুস্তাফা, ২খ., পৃ. ২৪৮-৯)।
মুনাফিকগণ অপপ্রচার করিতে লাগিল যে, রাসূলুল্লাহ (স) আপন চাচাত ভাইকে যুদ্ধযাত্রা হইতে রেহাই দিয়াছেন আর সাধারণ জনগণকে যুদ্ধাভিযানে মৃত্যুর-মুখে ঠেলিয়া দিয়াছেন। এই সব মিথ্যা অপপ্রচার হযরত আলী (রা)-এর কানে আসিলে তিনি তাৎক্ষণিকভাবে অস্ত্র সজ্জিত হইয়া বাহির হইয়া পড়েন এবং আল-জুরুফ (الجرف) নামক স্থানে গিয়া রাসূলুল্লাহ (স)-এর সহিত মিলিত হন। তিনি রাসূলুল্লাহ (স)-কে বলিলেন, আপনি আমাকে শিশু ও নারীদের মাঝে রাখিয়া যাইতেছেন? রাসূলুল্লাহ (স) জবাব দিলেন:
الا ترضى ان تكون منى بمنزلة هارون من موسى الا انه ليس نبي بعدي. ৫৩৩
"তুমি কি ইহাতে সন্তুষ্ট নও যে, আমার কাছে তোমার মর্যাদা ঠিক তেমন যেমন মূসা (আ)-এর কাছে হারুন (আ)-এর মর্যাদা। তবে আমার পরে আর কোন নবী নাই” (সাহীহ আল-বুখারী, ৩খ., পৃ. ১২৯ কিতাবুল মাগাযী, গাওয়া তাবুক, নং ৪৪১৬; ফাদাইল আসহাবিন নাবিয়্যি (স); ইবন মাজা, মুকাদ্দিমা, বাব ফাদলি আলী (রা), নং ১১৫)।
যাত্রাপথে রাসূলুল্লাহ (স) ছানিয়াতুল বিদা নামক স্থানে শিবির স্থাপন করেন, অতঃপর সৈন্যদেরকে অগ্রবর্তী, পশ্চাদবর্তী, মধ্যবর্তী, ডান, বাম ও পানি সরবরাহকারী ইত্যাদি দলে বিন্যস্ত করেন। ইসলামের পতাকা হযরত আবু বাক্স (রা)-কে ও সেনাবাহিনীর পতাকা হযরত যুবায়র ইব্ন আওয়াম (রা)-কে প্রদান করা হয়। রাসূলুল্লাহ (স) আওস গোত্রের পতাকা হযরত উসায়দ ইবন হুদায়র (রা)-কে এবং খাযরাজ গোত্রের পতাকা হুবাব ইবনুল মুনযির (রা)-কে প্রদান করেন। এইভাবে বিভিন্ন গোত্রের মাঝে গোত্রীয় ও সেনাবাহিনীর পতাকা বণ্টন করিয়া দেন (সীরাতুল হালাবিয়া, ৫খ., পৃ. ৪০২)। সহীহ মুসলিমে আবূ হুমায়দ (রা) হইতে বর্ণিত আছে, তিনি বলেন, আমরা রাসূলুল্লাহ (স)-এর সঙ্গে তাবুকের উদ্দেশ্যে রওনা হইলাম, অবশেষে ওয়াদিউল কুরায় এক মহিলার বাগানে পৌছিলাম। রাসূলুল্লাহ (স) বলিলেন: তোমরা অনুমান কর এই বাগানে কি পরিমাণ খেজুর থাকিতে পারে? আমরা অনুমান করিলাম, কিন্তু রাসূলুল্লাহ (স)-এর অনুমান ছিল দশ ওয়াসাক অর্থাৎ তিপ্পান্ন মন দশ সের (২০০০ কে. জি. প্রায়)। তিনি মহিলাকে বলিলেন, আমার এই অনুমানটি মনে রাখিবে। আমরা এই পথেই আবার ফিরিয়া আসিব। তাহার পর আমরা তাবুক হইতে প্রত্যাবর্তনের পথে উপরিউক্ত ওয়াদিল কুরায় পৌঁছিলাম। রাসূলুল্লাহ (স) মহিলাকে কি পরিমাণ ফল পাওয়া গেল জিজ্ঞাসা করিলেন। মহিলা উত্তর দিল, দশ ওয়াসাক (সহীহ মুসলিম, ২খ., পৃ. ২৪৬; আল-খাসাইসুল কুবরা, ১খ., পৃ. ৫৬২)।
📄 তাবুক যুদ্ধের শিক্ষা
(এক) তাবুকের যুদ্ধে প্রমাণিত হয় যে, ইমাম অথবা রাষ্ট্রপ্রধান যখন জিহাদের ঘোষণা দেন তখন জিহাদ ফরযে আইন হইয়া যায়, ব্যক্তিগতভাবে প্রত্যেককে এই সংবাদ না জানাইলেও তখন কোন মানুষকে জিহাদে অংশগ্রহণে বাধা দেওয়া জায়েয নাই।
(দুই) রাসূলুল্লাহ (স) তাবৃকের উদ্দেশে রজব মাসে রওয়ানা হইয়াছিলেন এবং রামাদান মাসে প্রত্যাবর্তন করিয়াছিলেন। বিশ দিন তিনি তাবুকে ছিলেন আর ত্রিশ দিন আসা-যাওয়ায় অতিবাহিত হইয়াছিল। এই পঞ্চাশ দিন রাসূলুল্লাহ (স)-এর নামায কসর আদায় করেন। এই সফরের সময় তিনি যুহর ও আসরের নামায একত্রে আদায় করেন। জুম'উত তাব্দীম ও জুম'উত তাখীর দুইটাই করিয়াছিলেন। জুম'উত তাব্দীম অর্থাৎ কখনও যুহর ও আসরের নামায যুহরের সময় আদায় করিতেন এবং মাগরিব ও এশার নামায মাগরিবের সময় আদায় করিতেন। জমউত তাখীর অর্থাৎ কখনও যুহর ও আসরের নামায আসরের সময় এবং মাগরিব ও এশার নামায এশার সময় আদায় করিতেন (যাদুল মা'আদ, ৩খ., পৃ. ৫৪৩-৪)। চার মাযহাবের ইমামগণ এই ব্যাপারে ঐকমত্য পোষণ করেন যে, মুসাফির যতক্ষণ পর্যন্ত গন্তব্যস্থলে অবস্থানে নিয়ত না করিবে ততক্ষণ নামায কসর করিতে হইবে। রাসূলুল্লাহ (স)-এর সাহাবীগণ হরমূষে সাত মাস, আবদুর রহমান ইন্ন সুমরা (রা) কাবুলে দুই বৎসর, মুসলিম সেনাদল সিজিস্তানে দুই বৎসর কসর নামায আদায় করেন (আসাহহুস সিয়ার, পৃ. ৩৪১)।
(তিন) তাবুকে যাহারা পিছাইয়া পড়িয়াছিল, তাহাদের ঘটনা এই কথারই সাক্ষ্য দেয় যে, বিচারের রায় বাহ্যিক বক্তব্যের উপর হইয়া থাকে। মুনাফিকদের কপটতা সর্বজন বিদিত ছিল, কিন্তু বাহ্যিক ওজর পেশ করিবার ফলে তাহাদিগকে রেহাই দেওয়া হয়। সত্যবাদী মুমিনগণ কোন ওজর পেশ না করিবার ফলে তাহাদের সতর্ক করিয়া দেওয়া হয়, অথচ তাহারা যে নিষ্ঠাবান মু'মিন ছিলেন ইহা সকলেরই জানা কথা।
(চার) সুসংবাদ প্রদানের জন্য সাধ্যানুযায়ী সাদাকা করা মুস্তাহাব। যেমন হযরত কা'ব অনেক সম্পত্তি সাদাকা করিয়াছিলেন। রাসূলুল্লাহ (স) ইহাতে সন্তুষ্ট হইয়া বলিয়াছিলেন, নিজের জন্য কিছু রাখ। ইহা ছাড়া তওবা কবুলের সুসংবাদ প্রদানকারীকে তিনি উপহার দিয়াছিলেন। অথচ তাহার নিকট তাহার পরিধেয় ছাড়া আর কোন জামা ছিল না (আসাহহুস সিয়ার, পৃ. ৪৩১; আর-রাহীকুল মাখতুম, পৃ. ৪৩৫-৬)।