📘 সীরাত বিশ্বকোষ > 📄 যুদ্ধ তহবিলে সাহায্য প্রদানের আবেদন

📄 যুদ্ধ তহবিলে সাহায্য প্রদানের আবেদন


তৎকালীন বিশ্বের শ্রেষ্ঠ ক্ষমতাশালী রোমান সম্রাটের সার্থক মুকাবিলার জন্য যাহার যতটুকু সাধ্য ও সামর্থ্য আছে, ততটুকু যুদ্ধ তহবিলে সাহায্য হিসাবে দেওয়ার জন্য রাসূলুল্লাহ (স) আবেদন জানাইলেন এবং ইসলামের বৈরী শক্তির বিরুদ্ধে জিহাদে অংশ গ্রহণের মাহাত্ম্য ও যুদ্ধ তহবিলে সাহায্য প্রদানের তাৎপর্য সাহাবীদের সম্মুখে সবিস্তারে তুলিয়া ধরেন। সাহাবায়ে কিরাম রাসূলুল্লাহ (স)-এর আবেদনে সাড়া দিয়া যেইভাবে জানে-মালে যুদ্ধপ্রস্তুতি গ্রহণ করেন তাহার দৃষ্টান্ত ইতিহাসে বিরল। সাহাবীদের এই স্বতস্ফূর্ত উদ্দীপনা চিরকাল জিহাদে অংশগ্রহণকারীদের প্রেরণার উৎস হইয়া থাকিবে। হযরত উছমান ইব্‌ন আফফান (রা) তিন শত উট, পঞ্চাশটি ঘোড়া, সম পরিমাণ সাজ-সরঞ্জাম, চার হাজার দিরহাম ও এক হাজার দীনার যুদ্ধ তহবিলে দান করেন। এক-তৃতীয়াংশ সৈন্যের ব্যয়ভার হযরত উহুমানের সাহায্য তহবিল হইতে প্রদান করা হয়। হযরত উছমান (রা) যখন রুমালে ভর্তি এক হাজার স্বর্ণমুদ্রা রাসূলুল্লাহ (স)-এর কোলে ঢালিয়া দিলেন, রাসূলুল্লাহ (স) তখন এই সব স্বর্ণমুদ্রা নাড়াচাড়া করিতে করিতে বলিলেন:
ما ضر عثمان ما عمل بعد اليوم اللهم راض عن عثمان فاني عنه راض.
"আজিকার পরে উছমান যদি অন্য কোন নেক আমল নাও করে, তাহা হইলে তাহার কোন ক্ষতি হইবে না। হে আল্লাহ! আমি উছমানের উপর সন্তুষ্ট, তুমিও তাহার উপর সন্তুষ্ট হইয়া যাও” (মিল্কাতুল মাসাবীহ্, পৃ. ৫৬১; ইব্‌ন হিশাম, আস-সীরাতুন নাবাবিয়‍্যা, ২খ., পার্ট ৩-৪, পৃ. ৫১৮)।
হযরত উছমান (রা)-কে উদ্দেশ্য করিয়া রাসূলুল্লাহ্ (স) বলেন, হে উছমান! আল্লাহ তোমাকে ক্ষমা করুন। যেই পাপ তুমি প্রকাশ্যে ও গোপনে করিয়াছ এবং যাহা ভবিষ্যতে তোমার দ্বারা হইয়া যায়, আল্লাহ সব পাপ ক্ষমা করুন (হায়াতুস সাহাবা, ২খ., পৃ. ২২২)।
হযরত উমার (রা) এই যুদ্ধে সংসারের অর্ধেক সাজসরঞ্জাম ও প্রয়োজনীয় দ্রব্যসামগ্রী, হযরত আবদুর রহমান ইব্‌ন আওফ (রা) চার হাজার দীনার, দুই শত উকিয়া রৌপ্য (দুই হাজার এক শত দিরহামের সমান) এবং হযরত আসিম ইব্‌ন আদী (রা) সত্তর ওয়াস্ক (তিন শত পঁয়ষট্টি মণ) খেজুর যুদ্ধ তহবিলে দান করেন (আল-মাওয়াহিব, ৩খ., পৃ. ৬৪; সীরাতুল হালাবিয়া, ৫খ., পৃ. ৫৯৮)।
তাবুক যুদ্ধে হযরত আবূ বাক্স (রা) সংসারের সম্পূর্ণ আসবাবপত্র, যাহার মূল্য প্রায় চার হাজার দিরহামের সমপরিমাণ, যুদ্ধ তহবিলে দান করেন। রাসূলুল্লাহ (স) জিজ্ঞাসা করিলেন, পরিবার-পরিজনের জন্য কী পরিমাণ রাখিয়া আসিয়াছ? আবূ বাক্স (রা) বলিলেন ৪
ابقيت لهم الله ورسوله.
"তাহাদের জন্য আল্লাহ এবং তাঁহার রাসূলকে রাখিয়া আসিয়াছি" (আল-মাওয়াহিব, ৩খ., পৃ. ৬৪; মিশকাতুল মাসাবীহ, পৃ. ৫৫৬; হায়াতুস সাহাবা, ২খ., পৃ. ২২)।
মহিলাদের নজীরবিহীন কুরবানী
ইসলামের অগ্রযাত্রা ও উন্নয়নে এবং আগ্রাসী শক্তির মুকাবিলায় পুরুষদের পাশাপাশি মুসলিম মহিলারাও জান ও মাল কুরবানী দেওয়ার যেই দৃষ্টান্ত স্থাপন করিয়াছেন তাহা ইতিহাসের পাতায় স্বর্ণাক্ষরে লিপিবদ্ধ থাকিবে। হযরত সিনান আসলামিয়া (রা) বলেন, তাবুকের যুদ্ধ প্রস্তুতির সময় আমি উম্মুল মুমিনীন হযরত আয়েশা (রা)-র ঘরে গেলে দেখিতে পাইলাম যে, ‘রাসূলুল্লাহ (স)-এর সম্মুখে-বিছানো একটি চাদরে মেয়েদের হাতের চুড়ি, ব্রেসলেট, পায়ের নুপুর, কানের দুল, আংটি এবং অন্যান্য মূল্যবান গহনা ও স্বর্ণালংকার ছড়াইয়া রহিয়াছে। এইসব গহনা মহিলাগণ ইসলামী বাহিনীর সহায়তার জন্য সাদাকা করিয়াছেন। এই সব অলংকার দিয়া রাসূলুল্লাহ (স) সেনাসদস্যদের যুদ্ধের ব্যয়ভার বহন করেন। যেহেতু অধিকাংশ সৈন্যকে পদব্রজে তাঁবুকে পৌঁছাইতে হইবে, তাই বেশী করিয়া জুতা সাথে নেওয়ার জন্য রাসূলুল্লাহ (স) সবাইকে নির্দেশ দেন (আর-রাহীকুল মাখতুম, পৃ. ৪৩৩)।
দরিদ্র সাহাবীদের প্রাণান্তকর প্রয়াস
মদীনার কতিপয় দরিদ্র মুসলমান তাবুক যুদ্ধে অংশগ্রহণের ইচ্ছায় রাসূলুল্লাহ (স)-এর নিকট হাজির হইলেন। কিন্তু কোন ভারবাহী পশু ও সফরের ব্যয়ভার নির্বাহ করার মত কোন অর্থ-সম্পদ তাঁহাদের ছিল না। রাসূলুল্লাহ (স) জানাইয়া দিলেন যে, তাহাদের দেওয়ার মত কোন বাহন ও সাজ-সরঞ্জাম তাঁহার নিকট এই মুহূর্তে নাই। এই কথা শুনিয়া তাঁহারা কাঁদিতে লাগিলেন। ইতিহাসে এই নিষ্ঠাবান মুসলমানদের 'ক্রন্দনকারী' (‎البکاؤن‎) বলা হয়। ক্রন্দনকারিগণ সংখ্যায় ছিলেন নয়জন। তাঁহারা কাঁদিতে কাঁদিতে নিজ নিজ বাড়ী প্রত্যাবর্তন করেন। তাঁহারা হইলেন: (১) সালিম ইবন উমায়র (রা), (২) উল্বা ইন্ন যায়দ (রা), (৩) আবু লায়লা আল-মুযানী (রা), (৪) আমর ইব্‌ন গানমাহ্ (রা), (৫) সালামা ইব্‌ন সা (রা); (৬) ইরবাদ ইবন সারিয়া (রা), (৭) আবদুল্লাহ ইব্‌ন মুগাফ্ফাল (রা), (৮) মা'কিল ইন ইয়াসার (রা) ও (৯) উমার ইবন হুমাম আল-জামূহ্ (আত-তাবাকাতুল কুবra, ২খ., পৃ. ১৬৫)। উক্ত ক্রন্দনকারীদের সম্পর্কে আল্লাহ তা'আলা পবিত্র কুরআনে নাযিল করেন:
وَلَا عَلَى الَّذِينَ إِذَا مَا أَتَوكَ لِتَحْمِلَهُمْ قُلْتَ لَا أَجِدُ مَا أَحْمِلُكُمْ عَلَيْهِ تَوَلَّوْا وَأَعْيُنُهُمْ تَفِيضُ مِنَ الدَّمْعِ حَزَنًا أَلَا يَجِدُوا مَا يُنْفِقُونَ.
"উহাদেরও কোন অপরাধ নাই যাহারা তোমার নিকট বাহনের জন্য আসিলে তুমি বলিয়াছিলে, তোমাদের জন্য কোন বাহন আমি পাইতেছি না। উহারা অর্থব্যয়ে অসামর্থ্যজনিত দুঃখে অশ্রু বিগলিত নেত্রে ফিরিয়া গেল" (৯:৯২)।
ইরন হযরত আবদুল্লাহ মুগাফ্ফাল (রা) ও হযরত আবূ লায়লা (রা) যখন রাসূলুল্লাহ (স)-এর দরবার হইতে কাঁদিতে কাঁদিতে গৃহে প্রত্যাবর্তন করিতেছিলেন তখন পথিমধ্যে হযরত ইয়ামিন ইবন আমর নাদারী (রা)-র সহিত তাঁহাদের সাক্ষাত হয়। তিনি তাঁহাদের কান্নার কারণ জিজ্ঞাসা করিলে তাঁহারা বলিলেন, যুদ্ধে যাওয়ার জন্য রাসূলুল্লাহ (স)-এর নিকট কোন বাহন নাই। আর আমাদেরও যুদ্ধে যাওয়ার মত সামর্থ্য নাই। আল্লাহ্র রাসূলের সহিত যুদ্ধে যাইতে পারিতেছি না, এইজন্য আমাদের আফসোস। হযরত ইয়ামিন তাৎক্ষণিকভাবে একটি উট এবং আট সের খেজুরসহ প্রয়োজনীয় সরঞ্জাম তাঁহাদের সরবরাহ করিলেন (তাফসীর মাযহারী, ৫খ., পৃ. ৩৮৪-৫)।
হযরত আবূ বাক্স (রা), হযরত উমার (রা), হযরত উছমান (রা), হযরত আব্বাস (রা), হযরত আবদুর রহমান ইবন 'আওফ (রা), হযরত সা'দ ইবন উবাদা (রা) ও হযরত মুহাম্মাদ ইন্ন মাস্লামা (রা)-এর মত অবস্থাসম্পন্ন সাহাবায়ে কিরাম যেইভাবে স্বতস্ফূর্ত উদ্দীপনা লইয়া যুদ্ধ তহবিলে দান করিয়াছেন, তেমনি অভাবগ্রস্থ ও দরিদ্র সাহাবায়ে কিরামের দানও উপেক্ষা করার মত নয়। তাঁহাদের ত্যাগ ও কুরবানী ইতিহাসে উজ্জ্বল হইয়া থাকিবে। হযরত আবূ 'আকীল (রা) ছিলেন একজন শ্রমিক। সারা রাত কাজ করিয়া মজুরী হিসাবে তিনি প্রায় আট কেজি খেজুর পান। তিনি উহার অর্ধেক সন্তান ও পরিবারের জন্য রাখিয়া বাকী অর্ধেক তাবুকের যুদ্ধ তহবিলে দান করিবার উদ্দেশ্যে রাসূলুল্লাহ (স)-এর হাতে দেন। ইহাতে মুনাফিকগণ ঠাট্টা করিয়া বলিতে লাগিল, সামান্য খেজুর দান করিয়া শহীদের তালিকায় নাম অন্তর্ভুক্ত করিতে চায়। এক দরিদ্র আনসারী সাহাবী সাড়ে সাত কেজি শস্য দান করিলে মুনাফিকরা ঠাট্টা করিয়া বলিতে থাকে, আল্লাহ্ কী প্রয়োজন তাহার এই দানের? আসলে যাহারা বেশী দান করিয়াছেন তাহারা যেমন মুনাফিকদের বিরূপ সমালোচনা হইতে বাঁচিতে পারেন নাই, তেমনি দরিদ্র সাহাবীদের মধ্যে যাঁহারা সাধ্যানুযায়ী সামান্য দান করিয়াছেন, তাঁহারাও মুনাফিকদের ঠাট্টা বিদ্রূপের শিকার হন (তাফসীর ইব্‌ন কাছীর, ২খ., পৃ. ৮৫-৬; তাফসীর উছমানী, পৃ. ২৬৪)। রাসূলুল্লাহ (স) দরিদ্র সাহাবীদের প্রদত্ত খেজুর সদাকার ভাণ্ডারে ছড়াইয়া দেন। আল্লাহ তা'আলা এই সম্পর্কে পবিত্র কুরআনে বলেন:
الَّذِينَ يَلْمِزُونَ الْمُطَّوَّعِينَ مِنَ الْمُؤْمِنِينَ فِي الصَّدَقَاتِ وَالَّذِينَ لَا يَجِدُونَ إِلَّا جُهْدَهُمْ فَيَسْخَرُونَ مِنْهُمْ سَخْرَ اللَّهُ مِنْهُمْ وَلَهُمْ عَذَابٌ عَلِيمٌ.
"মু'মিনদের মধ্যে যাহারা স্বতস্ফূর্তভাবে সাদাকা দেয় এবং যাহারা নিজ শ্রম ব্যতিরেকে 'কিছুই পায় না, তাহাদের যাহারা দোষারোপ করে ও বিদ্রূপ করে আল্লাহ উহাদিগকে বিদ্রূপ করেন; উহাদের জন্য রহিয়াছে মর্মন্তুদ শাস্তি” (৯ঃ ৭৯)।
হযরত আবূ মূসা আশ'আরী (রা) সাথীদের পরামর্শক্রমে রাসূলুল্লাহ (স)-এর নিকট গিয়া যুদ্ধের বাহন সরবরাহের আবেদন জানাইলেন। রাসূলুল্লাহ (স) রাগত স্বরে বলিলেন: আল্লাহ্ কসম! আমি তোমাকে কোন বাহন দিব না, দেওয়ার মত কোন বাহন আমার নিকট নাই। হযরত আবূ মূসা আশআরী (রা) ফিরিয়া আসিয়া সাথীদেরকে ঘটনা অবহিত করিলেন। ইত্যবসরে রাসূলুল্লাহ (স)-এর নিকট গনীমতের বেশ কিছু উট আসিলে তিনি হযরত বিলাল হাবশী (রা)-র মাধ্যমে হযরত আবূ মূসা আশ'আরী (রা)-কে ডাকিয়া ছয়টি উট প্রদান করেন (সাহীহ্ আল-বুখারী, ২খ., পৃ. ১২৮-৯)। তিনি বিনয় সহকারে রাসূলুল্লাহ (স)-কে বলিলেন, আপনি আমাকে বাহন না দেওয়ার ব্যাপারে আল্লাহ্র কসম করিয়াছেন। এখন এই সব বাহন আমার জন্য অমঙ্গলকর হইতে পারে। রাসূলুল্লাহ (স) জবাবে বলেন:

📘 সীরাত বিশ্বকোষ > 📄 পানি সংকট দূরীকরণ

📄 পানি সংকট দূরীকরণ


তাবুক হইতে মদীনায় প্রত্যাবর্তনের পথে মুসলিম সৈন্যবাহিনী তীব্র উত্তাপের কারণে প্রচণ্ড পিপাসার শিকার হন। কাহারও নিকট পানি ছিল না। রাসূলুল্লাহ (স) উসায়দ ইবন হুদায়র (রা)-কে পানির খোঁজে প্রেরণ করিলেন। তিনি তাবূক ও হিজরের মধ্যবর্তী স্থানে গিয়া চতুর্দিকে পানির খোঁজে ছোটাছুটি করিলেন। অবশেষে এক মহিলার নিকট পানি ভর্তি একটি পুরাতন মশক পাইলেন। উসায়দ (রা) মহিলার সহিত কথাবার্তা বলিয়া মশকটি রাসূলুল্লাহ (স)-এর নিকট লইয়া আসিলে তিনি মশকের পানিতে বরকতের জন্য দু'আ করিয়া বলিলেন: তোমরা আপন আপন মশক লইয়া আস। অতঃপর যত মশক ছিল সবগুলি ভরিয়া লওয়া হইল। ইহার পর তিনি সেনাদলের উট ও ঘোড়া জমায়েত করিয়া সেইগুলিকে পানি পান করাইলেন। রাসূলুল্লাহ (স) উসায়দের আনীত পানি একটি বড় পাত্রে ঢালিলেন এবং তাহাতে হাত রাখিয়া আপন মুখমণ্ডল ও উভয় পা ধৌত করিলেন। অতঃপর তিনি দুই রাক'আত নামায পড়িলেন। নামাযশেষে দেখা গেল পাত্র হইতে উপচাইয়া পানি পড়িতেছে (আল খাসাইসুল কুবরা, ১খ., পৃ. ৫৬০)।
সীরাত গবেষক আলী ইব্‌ন বুরহানুদ্দীন হালাবী অনুরূপ একটি বিস্ময়কর ঘটনার বর্ণনা দিয়াছেন যাহা নিম্নরূপঃ তাবুক অভিযানে মুসলিম সেনাদলে পানিসংকট দেখা দিলে রাসূলুল্লাহ (স) দুইজন সাহাবীকে হুকুম দিলেন, অমুক জায়গায় যাও। সেইখানে উষ্ট্রীতে আরোহী এক বৃদ্ধার দেখা পাইবে যাহার নিকট পানি ভর্তি একটি পাত্র রহিয়াছে। কম বেশী যত দামই হউক বৃদ্ধার নিকট হইতে পানি কিনিয়া লইবে এবং বৃদ্ধাকেও লইয়া আসিবে।
কথামত নির্দিষ্ট জায়গায় গিয়া বৃদ্ধার দেখা পাইলে তাহারা পানি চাহিলেন। বৃদ্ধা বলিলেন, তোমাদের তুলনায় আমার ও আমার পরিবারের জন্য পানি অধিক প্রয়োজন। সাহাবীগণ বলিলেন, পানি লইয়া আমাদের সহিত রাসূলুল্লাহ (স)-এর নিকট আপনাকে যাইতে হইবে। বৃদ্ধা বলিল, কোন্ রাসূলুল্লাহ (স)? সম্ভবত ঐ জাদুকর যিনি বিধর্মী। তাহার নিকট না যাওয়াই ভাল। ইহা শুনিয়া সাহাবীগণ তাহাকে জোর করিয়া রাসূলুল্লাহ (স)-এর নিকট লইয়া আসেন। রাসূলুল্লাহ (স) বলিলেন: তাহাকে ছাড়িয়া দাও।
রাসূলুল্লাহ (স) বৃদ্ধাকে বলিলেন: 'আপনি কি আপনার পানি আমাদেরকে ব্যবহারের অনুমতি দিবেন? আপনার পানি যেই পরিমাণ ছিল ঠিক সেই পরিমাণই থাকিবে।' বৃদ্ধা জবাব দিলেন: আপনার ইচ্ছা। অতঃপর রাসূলুল্লাহ (স) আবু কাতাদা (রা)-কে বলিলেন, পাত্র লইয়া আস। আবু কাতাদা (রা) পাত্র লইয়া আসিলে রাসূলুল্লাহ (স) বৃদ্ধার পাত্রের মুখ খুলিয়া একটু থুথু দিলেন এবং সামান্য পানি পাত্রে ঢালিলেন। তিনি পাত্রের ভিতরে হাত দিয়া সাহাবীদের ডাকিয়া বলিলেন: আস, পানি লইয়া যাও। সাহাবীগণ দলে দলে আসিয়া স্ব স্ব পাত্রে পানি ভরিয়া লইলেন এবং সেনাবাহিনীর উটগুলিকে পানি পান করাইলেন। ইহার পরও দুই-তৃতীয়াংশ পানি পাত্রের মধ্যে অবশিষ্ট ছিল। রাসূলুল্লাহ (স) বৃদ্ধাকে বলিলেন: 'আপনি তো দেখিয়াছেন যে, আমি আপনার পানি লই নাই। আল্লাহ তা'আলা আমাকে প্রচুর পানি দিয়া তৃপ্ত করিয়াছেন।'
বৃদ্ধা এই দৃশ্য দেখিয়া অভিভূত হইয়া গেলেন। কলসি লইয়া যখন বাড়ী ফিরিলেন, তখন পরিবারের অপরাপর সদস্যগণ বলিলেন: এত দেরী হইল কেন? বৃদ্ধ বলিলেন, শোন! আমি এক বিস্ময়কর দৃশ্য দেখিয়াছি। আল্লাহ্র কসম! আমার এই পাত্রে যত পানি রহিয়াছে তাহা হইতে প্রায় সত্তরটি উট পানি পান করিয়াছে এবং অসংখ্য মানুষ বিভিন্ন পানপাত্রে পানি ভর্তি করিয়া রাখিয়াছে, অথচ আমার পাত্রের পানি কমে নাই। গ্রামবাসী বৃদ্ধার কথা শুনিয়া অবাক হইয়া গেল। অতঃপর বৃদ্ধা এবং গ্রামবাসী ত্রিশটি উটের উপর সওয়ার হইয়া রাসূলুল্লাহ (স)-এর নিকট আসিলেন এবং তাহার পবিত্র হাতে হাত রাখিয়া ঈমান আনিয়া ধন্য হইলেন (সীরাতু হালাবিয়া, ৫খ., পৃ. ৪২৯-৪৩১)।

📘 সীরাত বিশ্বকোষ > 📄 মহিলাদের নজীরবিহীন কুরবানী

📄 মহিলাদের নজীরবিহীন কুরবানী


ইসলামের অগ্রযাত্রা ও উন্নয়নে এবং আগ্রাসী শক্তির মুকাবিলায় পুরুষদের পাশাপাশি মুসলিম মহিলারাও জান ও মাল কুরবানী দেওয়ার যেই দৃষ্টান্ত স্থাপন করিয়াছেন তাহা ইতিহাসের পাতায় স্বর্ণাক্ষরে লিপিবদ্ধ থাকিবে। হযরত সিনান আসলামিয়া (রা) বলেন, তাবুকের যুদ্ধ প্রস্তুতির সময় আমি উম্মুল মুমিনীন হযরত আয়েশা (রা)-র ঘরে গেলে দেখিতে পাইলাম যে, ‘রাসূলুল্লাহ (স)-এর সম্মুখে-বিছানো একটি চাদরে মেয়েদের হাতের চুড়ি, ব্রেসলেট, পায়ের নুপুর, কানের দুল, আংটি এবং অন্যান্য মূল্যবান গহনা ও স্বর্ণালংকার ছড়াইয়া রহিয়াছে। এইসব গহনা মহিলাগণ ইসলামী বাহিনীর সহায়তার জন্য সাদাকা করিয়াছেন। এই সব অলংকার দিয়া রাসূলুল্লাহ (স) সেনাসদস্যদের যুদ্ধের ব্যয়ভার বহন করেন। যেহেতু অধিকাংশ সৈন্যকে পদব্রজে তাঁবুকে পৌঁছাইতে হইবে, তাই বেশী করিয়া জুতা সাথে নেওয়ার জন্য রাসূলুল্লাহ (স) সবাইকে নির্দেশ দেন (আর-রাহীকুল মাখতুম, পৃ. ৪৩৩)।

📘 সীরাত বিশ্বকোষ > 📄 মসজিদ দিরার-এ অগ্নিসংযোগ

📄 মসজিদ দিরার-এ অগ্নিসংযোগ


তাবুক হইতে প্রত্যাবর্তনের পথে রাসূলুল্লাহ (স)-এর নির্দেশে মুনাফিকদের নির্মিত একটি ষড়যন্ত্র কেন্দ্র, যাহা মসজিদ দিরার নামে পরিচিত, অগ্নিসংযোগ করিয়া ভস্মিভূত করা হয়। এই কেন্দ্রটি নির্মিত হয় মদীনার আবূ 'আমের রাহেব নামক এক ব্যক্তি দ্বারা। তাহার সহযোগী ছিল আরও বারজন। আবূ আমের ছিল বিখ্যাত সাহাবী হযরত হানযালা (রা)-এর পিতা। রাসূলুল্লাহ (স) আবূ আমেরকে ইসলামের দাওয়াত দিলে সে ঈমান আনিতে অস্বীকৃতি জানায়। খৃষ্ট ধর্মে বিশ্বাসী এই ভয়ংকর ব্যক্তি পরবর্তীতে উহুদের যুদ্ধে মুসলমানদের মোকাবিলায় অংশ নেয়। যখন সে বুঝিতে পারিল যে, আরব উপদ্বীপে ইসলাম বিজয়ী শক্তিরূপে প্রতিষ্ঠিত হইয়াছে তখন সিরিয়ায় গিয়া রোমান সম্রাটকে মদীনা আক্রমণে প্ররোচিত করিতে থাকে। এই অশুভ উদ্দেশ্যে সে মদীনার অদূরে একটি মসজিদ নির্মাণ করে, প্রকৃতপক্ষে যাহা ছিল একটি গোয়েন্দা কেন্দ্র যাহাতে মদীনার সব মুনাফিক একত্র হইত।
আবূ আমের তাহার সহযোগীদের বলিল, তোমরা প্রয়োজনীয় অস্ত্রশস্ত্র সংগ্রহ করিয়া রাখ। আমি রোমান সম্রাটের নিকট যাইতেছি। তাহার নিকট হইতে বেশ কিছু সৈন্য লইয়া মদীনায় ফিরিয়া আসিব এবং মুকাবিলা করিয়া মুহাম্মাদ ও তাঁহার সৈন্যদের মদীনা হইতে বহিষ্কার করিয়া দিব (তাফসীর মাযহারী, ৫খ., পৃ. ৪০৮)। রাসূলুল্লাহ (স) যখন তাবুক যাত্রার প্রস্তুতি লইতেছিলেন তখন মসজিদ দিরারের উদ্যোক্তারা তাঁহার নিকট আসিয়া আরয করিল, ইয়া রাসূলুল্লাহ। আমরা অসুস্থ, অভাবগ্রস্থ। যাহারা বর্ষা ও শীতের রাত্রিতে কুবায় গিয়া সালাত আদায় করিতে পারে না আমরা তাহাদের জন্য নূতন একটি মসজিদ নির্মাণ করিয়াছি। আমাদের ইচ্ছা আপনি নামায পড়িয়া মসজিদটি উদ্বোধন করিলে ইহাতে বরকত নাযিল হইবে। রাসূলুল্লাহ (স) বলিলেন:
انى على جناح سفر وحال شغل ولو قدمنا انشاء الله لاتيناكم فصلينا لكم فيه. "আমি এখন একটি সফরের প্রস্তুতি নিতেছি এবং অত্যন্ত ব্যস্ত। অভিযানশেষে যদি আমি ফিরিয়া আসি তাহা হইলে ইনশাআল্লাহ সেইখানে যাইব এবং সেই মসজিদে তোমাদের লইয়া সালাত আদায় করিব"।
রাসূলুল্লাহ (স) তাবূক হইতে মদীনায় প্রত্যাবর্তনের পথে যখন যু-আওয়ান নামক স্থানে পৌছিলেন তখন ওহী মারফত আল্লাহ তা'আলা তাঁহাকে উক্ত মসজিদ নির্মাণের উদ্দেশ্য ও নির্মাতাদের চক্রান্ত সম্পর্কে অবহিত করিলেন। তিনি তৎক্ষণাত মালিক ইব্‌ন দুখশুম (রা) ও মা'ন ইব্‌ন আদী (রা)-কে হুকুম দিলেন: যাও জালিমদের ঐ মসজিদ জ্বালাইয়া দাও। অতএব অতি সত্বর তাহারা অগ্নিসংযোগে মসজিদটি জ্বালাইয়া দিলেন। মসজিদের অভ্যন্তরে যাহারা ছিল তাহারা পালাইয়া গেল (ইবন হিশাম, আস-সীরাতুন নাবাবিয়্যা, ২খ., পৃ. ৫২৯-৩০; যাদুল মা'আদ, ৩খ., পৃ. ৫৪৯)। এই মসজিদের ব্যাপারে আল্লাহ তা'আলা নিম্নলিখিত আয়াত নাযিল করেন:
وَالَّذِينَ اتَّخَذُوا مَسْجِداً ضراراً وكُفْراً وتَفْرِيقًا بَيْنَ المُؤْمِنِينَ وَارْصَادًا لِّمَنْ حَارَبَ اللَّهَ وَرَسُولَهُ مِنْ قَبْلُ طَ وَلَيَحْلِفُنَّ إِنْ أَرَدْنَا إِلا الْحُسْنَى ط وَاللهُ يَشْهَدُ أَنَّهُمْ لَكَذِبُونَ. لَا تَقُمْ فِيهِ أَبَدًا ، لَمَسْجِدٌ أَسِّسَ عَلَى التَّقْوَى مِنْ أَوَّلِ يَوْمٍ أَحَقُّ أَنْ تَقُومَ فِيهِ وَ فِيْهِ رِجَالٌ يُحِبُّونَ أنْ يَتَطَهَّرُوا طَ وَاللَّهُ يُحِبُّ الْمُطَهِّرِينَ.
"এবং যাহারা মসজিদ নির্মাণ করিয়াছে ক্ষতিসাধন, কুফরী ও মুমিনদের মধ্যে বিভেদ সৃষ্টির উদ্দেশ্যে এবং ইতোপূর্বে আল্লাহ ও তাঁহার রাসূলের বিরুদ্ধে সে ব্যক্তি যুদ্ধ করিয়াছে তাহার গোপন ঘাঁটিস্বরূপ ব্যবহারের উদ্দেশ্যে, তাহারা অবশ্যই শপথ করিবে, 'আমরা সদুদ্দেশ্যেই উহা করিয়াছি'। আল্লাহ সাক্ষী, তাহারা তো মিথ্যাবাদী। তুমি ইহাতে কখনও দাঁড়াইও না। যে মসজিদের ভিত্তি প্রথম দিন হইতেই স্থাপিত হইয়াছে তাওয়ার উপর, উহাই তোমার সালাতের জন্য অধিক যোগ্য। তথায় এমন লোক আছে যাহারা পবিত্রতা অর্জন ভালবাসে এবং পবিত্রতা অর্জনকারীদের আল্লাহ পসন্দ করেন" (৯: ১০৭-৮)।
রাসূলুল্লাহ (স) বিধ্বস্ত মসজিদে দিরারের খালি জায়গায় হযরত 'আসেম ইব্‌ন আদীকে গৃহ নির্মাণের অনুমতি দিলে তিনি বলিলেন, ইয়া রাসূলাল্লাহ! এই মসজিদের ব্যাপারে আল্লাহ হুকুম নাযিল করিয়াছেন। অভিশপ্ত স্থানে গৃহ নির্মাণ করা আমার পসন্দ নয়। অপরদিকে ছাবিত ইব্‌ আকরামের কোন ভিটা-বাড়ি না থাকায় তিনি রাসূলুল্লাহ (স)-এর নির্দেশে সেই জায়গায় ঘর তৈয়ার করেন। যত দিন হযরত ছাবিত এই ঘরে ছিলেন তাঁহার কোন সন্তান হয় নাই অথবা জীবিত থাকে নাই। এমনকি মুরগী ও কবুতরের ডিম হইতে বাচ্চা ফুটে নাই। বর্তমানে ঐ জায়গা কুবার মসজিদের অনতিদূরে পরিত্যক্ত অবস্থায় পড়িয়া রহিয়াছে (মুফতী মুহাম্মদ শফী, মা'আরিফুল কুরআন, ৫খ., পৃ. ৪১১)।
রাসূলুল্লাহ (স) যখন মদীনার উপকণ্ঠে উপনীত হইলেন তখন মদীনার শিশু-কিশোর নারী-পুরষ নির্বিশেষে দলে দলে বাহির হইয়া তাঁহাকে সংবর্ধনা জানাইল ও প্রশংসাসূচক কবিতা আবৃত্তি করিল:
"ছানিয়াতুল বিদা হইতে আমাদের উপর পূর্ণিমার চাঁদ উদিত হইয়াছে; যতক্ষণ পর্যন্ত আহ্বানকারী আল্লাহর দিকে ডাকিতে থাকিবে; আল্লাহ্র শোকরিয়া আদায় করা ততক্ষণ পর্যন্ত আমাদের উপর ওয়াজিব। আমাদের প্রতি প্রেরিত হে রাসূল! আপনি এমন বিষয় লইয়া আসিয়াছেন যাহার আনুগত্য করা জরুরী"।

লিঙ্ক শেয়ার করুন
close

লিঙ্ক কপি করুন

0:00
0:00