📄 হিরাক্লিয়াসের নিকট রাসূলুল্লাহ (স)-এর পত্র
তাবৃক হইতে রাসূলুল্লাহ (স) রোমান সম্রাট হেরাক্লিয়াসের নিকট হযরত দিহ্ইয়া আল-কালবী (রা) মারফত একটি পত্র প্রেরণ করেন। পত্রখানা সম্রাটের নিকট হস্তান্তরিত হওয়ার পরপরই তিনি দেশের সর্বোচ্চ প্রশাসনিক কর্মকর্তা, অমাত্যবর্গ ও সেনাপতিদের রাজদরবারে ডাকিয়া পাঠান। রুদ্ধদ্বার কক্ষে তিনি তাহাদের সহিত বৈঠকে মিলিত হন। সম্রাট তাহাদের উদ্দেশ্যে বলেন, এই ব্যক্তি [মুহাম্মাদ (স)] যেই জায়গায় আসিয়া অবস্থান করিতেছে, তাহা তো আপনাদের সবারই জানা। তিনি আমার নিকট পত্র প্রেরণ করিয়া তিনটি বিকল্প বিষয়ের যে কোনটি গ্রহণের দাওয়াত দিয়াছেন। তিনি লিখিয়াছেন, ইসলাম কবুল করুন অথবা জিয়া (কর) প্রদান করুন অথবা লড়াইয়ের জন্য ময়দানে আসুন।
হে রোমান জাতি! আল্লাহর শপথ! আপনারা নিশ্চয় প্রাচীন ঐশী গ্রন্থসমূহ অধ্যয়ন করিয়া জানিতে পারিয়াছেন যে, মুসলমানদের হাতে আপনারা পরাজিত হইবেন। সুতরাং পরাজিত হওয়ার আগেই তাহাদের আনুগত্য স্বীকার করুন অথবা জিযয়া প্রদান করুন। পারিষদবর্গ ও সেনাপতিগণ এই বক্তব্য শুনিয়া অবজ্ঞাসূচক আচরণ করিতে লাগিল এবং নিজ নিজ শরীরের বিশেষ জামা (Uniform) খুলিয়া অগ্নি বৎ হইয়া বলিল, তাই বলিয়া কি আমরা খৃস্ট ধর্ম ছাড়িয়া দিব? হেজায হইতে আগত এক ব্যক্তির গোলাম হইয়া যাইব? হেরাক্লিয়াস যখন চারি দিকে শোরগোল ও হৈ চৈ লক্ষ্য করিলেন, তখন সকলকে শান্ত করিবার উদ্দেশ্যে বলিলেন, আসলে আমি আপনাদের নৈতিক সাহস ও ধর্মীয় চেতনা যাচাই করিতে চাহিয়াছিলাম। অতঃপর হিরাক্লিয়াস একজন দোভাষী ডাকিয়া উত্তর প্রদান করিলেন। আত-তানূখী নামক জনৈক দূতের হস্তে পত্রটি দিয়া বলিলেন, পত্রটি তাবুকে অবস্থানরত ঐ ব্যক্তির নিকট দিয়া আস; তবে তাঁহার কথোপকথনে তিনটি বিষয় লক্ষ্য করিবে এবং তাহা আমাকে জানাইবে। (এক) আমার নিকট তিনি যেই পত্র প্রেরণ করিয়াছেন তাহার কোন আলোচনা তিনি করিতেছেন কিনা; (দুই) আল-লায়ল (রজনী) শব্দটি উচ্চারণ করেন কিনা; (তিন) তাঁহার পিঠ দেখিয়া অনুধাবন করিবে সেখানে কিছু দৃষ্টিগোচর হয় কিনা।
দূত বলেন, আমি যখন হেরাক্লিয়াসের পত্র লইয়া সোজা তাবুকে পৌঁছিলাম, তখন রাসূলুল্লাহ (স) সাহাবীদিগকে লইয়া ঝর্ণাধারার নিকটে বসিয়া আলাপ করিতেছেন। আমি সাহাবীদিগকে জিজ্ঞাসা করিলাম, আপনাদের নবী কে? তাঁহারা দেখাইয়া দিলে আমি তাঁহার সম্মুখে গিয়া পত্রখানি হস্তান্তর করিলাম। রাসূলুল্লাহ (স) পত্রখানি থলিয়ার মধ্যে রাখিয়া প্রশ্ন করিলেন, আপনি কে? আমি বলিলাম, আত-তানূখী।
রাসূলুল্লাহ (স): আপনি কি আপন পিতা ইব্রাহীম (আ)-এর বিশুদ্ধ তাওহীদ ভিত্তিক দীন কবুল করিবেন?
আত-তানূষী: যেহেতু আমি একজন দূত, তাই মনিবের পরামর্শ ছাড়া মুসলমান হইতে পারি না।
রাসূলুল্লাহ (স) মুচকি হাসিয়া কুরআনের আয়াত পাঠ করিলেন: إِنَّكَ لَا تَهْدِي مَنْ أَحْبَبْتَ وَلَكِنَّ اللَّهَ يَهْدِي مَنْ يَشَاءَ وَهُوَ أَعْلَمُ بِالْمُهْتَدِينَ.
"তুমি যাহাকে ভালবাস, ইচ্ছা করিলেই তাহাকে সৎপথে আনিতে পারিবে না। তবে আল্লাহ যাহাকে চাহেন সৎপথে আনয়ন করেন এবং তিনিই ভাল জানেন সৎপথ অনুসারীদেরকে" (২৮:৫৬)।
হে আত-তানূখী ভাই! আমি পারস্য সম্রাট খসরূ পারভেজের নিকট একটি পত্র প্রেরণ করিয়াছিলাম। সে উহা ছিড়িয়া ফেলিয়াছে। আল্লাহ তা'আলা তাহার দেশকে অনুরূপ টুকরা টুকরা করিয়া ফেলিবেন। আমি আপনাদের সম্রাট হিরাক্লিয়াসের নিকট পত্র লিখিয়াছি। তিনি তাহা সংরক্ষণ করিয়াছেন। অতএব এক নির্দিষ্ট মেয়াদ পর্যন্ত জনগণ তাহাকে ভয় করিয়া চলিবে।
আত-তানূখী: আমি মনে মনে ভাবিলাম, হেরাক্লিয়াসের হুকুম অনুযায়ী তিনটি কথার মধ্যে পত্রের প্রসঙ্গ তো আসিয়া গেল। আমি ইহা নোট করিয়া লইলাম। অতএব পত্রটি পাঠ করিবার জন্য রাসূলুল্লাহ (স) হযরত মু'আবিয়া (রা)-কে দিলেন। পত্রে লেখা ছিল, 'আপনি আমাকে এমন এক জান্নাতের প্রতি দাওয়াত দিতেছেন যাহার দৈর্ঘ্য-প্রস্ত আসমান-যমিন হইতেও বড়। ইহার পর বলুন, দোযখ কোথায় গেল'?
রাসূলুল্লাহ (স): সুবহানাল্লাহ! দিন আসিবার পর 'আল-লায়ল' (রাত) কোথায় যায়?
আত-তানূখী : আমি বুঝিতে পারিলাম যে, এইবার হেরাক্লিয়াসের দ্বিতীয় কথাটি পাওয়া গেল। আমি তাহা নোট করিয়া লইলাম।
রাসূলুল্লাহ (স) সাহাবীদের উদ্দেশ্যে বলিলেন, কাহারও নিকট যদি কোন উপঢৌকন থাকে তবে তাহা আত-তানূখীকে দাও।
আত-তানূখী: উপঢৌকন দেওয়ার পর আমি যখন ফিরিয়া আসিতে উদ্যত হইলাম তখন রাসূলুল্লাহ (স) নিজের শরীরের জামা খুলিয়া আমাকে ডাকিলেন।
রাসূলুল্লাহ (স): অন্তরে যেই বাসনা লুকাইয়া রাখিয়াছ তাহা পূর্ণ কর। আস, দেখ।
আত-তানূখী: আমি রাসূলের চারিপার্শ্ব ঘুরিয়া তাঁহার বাম কাঁধের নীচে উৎকীর্ণ খতমে নবুওয়াতের মোহর প্রত্যক্ষ করিলাম। আমার আর বুঝিতে বাকী রহিল না যে, হেরাক্লিয়াসের তৃতীয় কথাটিও প্রমাণিত হইয়া গেল। এইসব তথ্য লিপিবদ্ধ করিয়া আমি হেরাক্লিয়াসের দরবারে ফিরিয়া আসিলাম (আল-বিদায়া ওয়ান-নিহায়া, ৫খ., পৃ. ১৫-১৬)।
📄 সীমান্ত গোত্রপতিদের সহিত সন্ধি
তাবৃক হইতে রাসূলুল্লাহ (স) বিশ দিন অবস্থান করেন কিন্তু কোন সশস্ত্র যুদ্ধ হয় নাই। অবশ্য শত্রু ভীত-শংকিত হইয়া পড়ে। আশেপাশের গোত্রপতিগণ, বিশেষত আয়লা, জারবা, আযরুহ ও মাক্কাবাসীরা রাসূলুল্লাহ (স)-এর সাথে সাক্ষাত করিয়া সন্ধি স্থাপন করে এবং জিযয়া কর দিতে সম্মত হয়। আয়লা অধিপতি ইউহান্না ইব্ন রূবাকে রাসূলুল্লাহ (স) যেই নিরাপত্তানামা লিখিয়া দেন তাহা ছিল নিম্নরূপ:
بسم الله الرحمن الرحيم هذه امنة من الله ومحمد النبى رسول الله ليحنة بن رؤية واهل ايلة سفنهم وسيارتهم فى البر والبحر لهم ذمة الله وذمة محمد النبى ومن كان معهم من اهل الشام واهل اليمن واهل البحر فمن أحدث منهم حدثا فانه لا يحول ماله دون نفسه وانه طيب لمن اخذه من الناس وانه لا يحل أن يمنعوا ماء يردونه ولا طريقا يريدونه من بر او بحر.
“দয়াময় পরম দয়ালু আল্লাহর নামে—ইহা আল্লাহ ও আল্লাহ্র রাসূল মুহাম্মদের পক্ষ হইতে ইউহান্না ইব্ন রূবা ও আয়লাবাসীকে প্রদত্ত নিরাপত্তারপত্র। তাহাদের জল ও স্থলের জাহাজ ও যানবাহনের ব্যাপারে এই নিশ্চয়তা প্রযোজ্য। তাহাদের জন্য আল্লাহ ও মুহাম্মাদের যিম্মাদারি সাব্যস্ত হইল। সিরিয়া, ইয়ামান ও সমুদ্র দ্বীপের বাসিন্দাদের মধ্যে যাহারা তাহাদের সহিত থাকিবে তাহারাও ইহার অন্তর্ভুক্ত। তাহাদের মধ্যে কেহ কোন অঘটন ঘটাইলে তাহার অর্থ-সম্পদ তাহাকে রক্ষা করিতে পারিবে না। যেই ব্যক্তি ইহা গ্রহণ করিবে তাহার জন্য ইহা মূল্যবান বটে। তাহারা যে কোন পানি ব্যবহার করিতে পারিবে এবং জল স্থলের যে কোন পথে যাতায়াতও করিতে পারিবে, তাহাতে তাহাদের বাধা প্রদান করিবার অবকাশ থাকিবে না” (ইব্ন হিশাম, ২খ., পৃ. ৫২৫-৬; যাদুল মা'আদ, ৩খ., পৃ. ৫৩৭)।
জাবরা ও আহবাসীদের সহিত রাসূলুল্লাহ (স)-এর যেই নিরাপত্তা দলীল সম্পাদিত হয় তাহার ভাষা ছিল নিম্নরূপ:
بسم الله الرحمن الرحيم هذا كتاب من محمد النبى رسول الله لاهل جرباً وأذرح انهم امنون بامان الله وامان محمد الله وان عليهم مأة دينار في كل رجب ومأة اوقية طيبة وان الله عليهم كفيل بالنصح والاحسان الى المسلمين ومن لجأ اليهم من المسلمين.
"দয়াময় পরম দয়ালু আল্লাহর নামে— আল্লাহ্র রাসূল নবী মুহাম্মদের (স) পক্ষ হইতে জারবা ও আহবাসীদের জন্য এই চুক্তিনামা। এইসব মানুষ আল্লাহ ও রাসূলের নিরাপত্তা হেফাযতের অধীনে নিরাপদ থাকিবে। তাহারা প্রতি বৎসর রজব মাসে এক শত দীনার এবং এক শত পরিচ্ছন্ন উকিয়া (এক হাজার পঞ্চাশ মণ) খেজুর প্রদান করিবে। নিশ্চয় আল্লাহ তা'আলা তাহাদের যিম্মাদার। তাহারা মুসলমানদের সহিত কল্যাণপূর্ণ ও সদয় আচরণ করিবে। যাহারা মুসলমানদের আশ্রয় গ্রহণ করিবে তাহারাও এই সুবিধা ভোগ করিবে” (কিতাবুল মাগাযী, ৩খ., পৃ. ১০৩২)।