📘 সীরাত বিশ্বকোষ > 📄 তাবৃকে রাসূলুল্লাহ (স)

📄 তাবৃকে রাসূলুল্লাহ (স)


রাসূলুল্লাহ (স) তাবুক পৌছিবার এক দিন আগে সাহাবীদিগকে বলিলেন: ইনশাআল্লাহ আগামী কাল তোমরা দুপুরের আগে তাবুক ঝর্ণায় পৌঁছিয়া যাইবে। সুতরাং তোমাদের কেহ ঝর্ণার পানিতে হাত লাগাইবে না। তাবুকে পৌঁছিয়া রাসূলুল্লাহ (স) ঝর্ণার ধারে গেলেন। বিন্দু বিন্দু পানি ধীর গতিতে প্রবাহিত হইতেছিল। ঝর্ণা হইতে অঞ্জলি দিয়া অল্প অল্প পানি একটি পাত্রে জমা করা হইল। অতঃপর রাসূলুল্লাহ (স) সেই পানি দিয়া মুখমণ্ডল ও হস্তদ্বয় ধৌত করিলেন এবং ব্যবহৃত পানি ঝর্ণায় ঢালিয়া দিলেন। তৎক্ষণাৎ ঝর্ণা হইতে কলকল রবে পানি নির্গত হইতে লাগিল। কাফেলার সব সদস্য তৃপ্তির সহিত পানি পান করিলেন। ইহার পর রাসূলুল্লাহ (স) বলিলেন:
يوشك يا معاذ ان طالت بك حياة ان ترى ما هاهنا قد ملى جنانا.
"হে মু'আয! যদি তুমি বাঁচিয়া থাক, তবে শীঘ্রই দেখিবে ইহার পানি অত্র এলাকাকে শ্যামল বাগানে পরিণত করিয়াছে"।
অদ্যাবধি সেই ঝর্ণাধারা হইতে সশব্দে পানি উৎক্ষিপ্ত হইতেছে (সাহীহ মুসলিম, ২খ., পৃ. ২৪৬)।
রাসূলুল্লাহ (স) তাবূক পৌঁছিলে সাহাবায়ে কিরাম (রা) ক্ষুধার যন্ত্রণায় কাতর হইয়া আরয করিলেন, ইয়া রাসূলুল্লাহ! আপনি অনুমতি দিলে আমরা সওয়ারীর উট যবেহ করিয়া গোশত খাইতে ও চর্বি সংগ্রহ করিতে পারি। হযরত উমার (রা) বলিলেন, ইয়া রাসূলাল্লাহ! এইরূপ করিলে সওয়ারীর সংখ্যা হ্রাস পাইবে। আপনি বরং অবশিষ্ট খাদ্যসামগ্রী এক জায়গায় একত্র করিয়া বরকতের দু'আ করুন। আশা করা যায় আল্লাহ তা'আলা বরকত দান করিবেন। রাসূলুল্লাহ (স) বলিলেন: বেশ ভাল কথা। অতঃপর তিনি একটি চামড়ার দস্তরখান বিছাইলেন এবং তাহাতে প্রত্যেকের অবশিষ্ট খাদ্যসামগ্রী একত্র করিবার আদেশ দিলেন। কেহ এক মুষ্টি গম, কেহ এক মুষ্টি খেজুর এবং কেহ এক টুকরা রুটি লইয়া আসিল। এইভাবে দস্তরখান পূর্ণ হইয়া গেল। ইহার পর রাসূলুল্লাহ (স) বরকতের দু'আ করিয়া সাহাবীদেরকে বলিলেন, আপন আপন পাত্র ভরিয়া লও। সাহাবীদের এমন কোন পাত্র রহিল না যাহা খাদ্যসামগ্রীতে ভর্তি হয় নাই। সকলে তৃপ্তির সহিত আহার করিবার পরও খাদ্যসামগ্রী উদ্বৃত্ত রহিয়া গেল। রাসূলুল্লাহ (স) বলিলেন: আমি সাক্ষ্য দিতেছি যে, আল্লাহ ব্যতীত কোন ইলাহ নাই এবং আমি আল্লাহর রাসূল। যেই বান্দা সন্দেহাতীতভাবে এই কলেমায় বিশ্বাস করে, সে আল্লাহ তা'আলার সহিত মিলিত হইবে, তাহাকে জান্নাতে প্রবেশে বাধা দেওয়া হইবে না (আল-খাসাইসুল কুবরা, ১খ., পৃ. ৫৫৬-৭)।
তাবুকে সাহাবায়ে কিরামের সম্মুখে একটি বিশাল সর্প আত্মপ্রকাশ করিল। সকলেই সর্প দেখিয়া ছুটাছুটি করিতে লাগিলেন। সর্পটি সম্মুখে অগ্রসর হইয়া রাসূলুল্লাহ (স)-এর নিকট দীর্ঘক্ষণ দাঁড়াইয়া রহিল। রাসূলুল্লাহ (স) উটের পিঠে সওয়ার ছিলেন। একটু পরে সর্পটি রাস্তা হইতে সরিয়া সটান দাঁড়াইয়া গেল। সাহাবীগণ ফিরিয়া আসিলে রাসূলুল্লাহ (স) জিজ্ঞাসা করিলেন: তোমরা কি জান এই সর্পটি কে? সাহাবীগণ আরয করিলেন: আল্লাহ ও তাঁহার রাসূলই ভাল জানেন। তিনি বলিলেন: আট সদস্য বিশিষ্ট জিনের যেই দলটি আমার নিকট কুরআন শ্রবণ করিতে আসিয়াছিল, সে তাহাদের একজন। আমি তাহাদের বসতিতে আসিয়াছি। সুতরাং সে কর্তব্য মনে করিয়া আমাকে সালাম করিতে আসিয়াছে। সে তোমাদেরকেও সালাম জানাইতেছে। সাহাবীগণ বলিলেন, ওয়া'আলায়কুমুস সালাম ওয়ারাহমাতুল্লাহ (কিতাবুল মাগাযী, ৩খ., পৃ. ১০১৫; খাসাইসুল কুবরা, ১খ., পৃ. ৫৬৪-৫)।
হযরত 'ইরবাদ ইব্‌ন সারিয়া (রা) বলেন, তাবূকে অবস্থানকালে রাসূলুল্লাহ (স) বিলাল (রা)-কে জিজ্ঞাসা করিলেন: খাওয়ার জন্য কিছু আছে কি? হযরত বিলাল (রা) উত্তর দিলেন, সেই সত্তার কসম যিনি আপনাকে সত্যসহ প্রেরণ করিয়াছেন। আমরা আমাদের থলিয়া ঝাড়িয়া ফেলিয়াছি। রাসূলুল্লাহ (স) বলেন: দেখ, হয়ত কিছু পাইতে পার। আরশের মালিকের নিকট অভাব-অনটনের আশংকা করিও না। বিলাল (রা) এক একটি থলিয়া লইয়া ঝাড়িতে শুরু করিলেন। কোন থলিয়া হইতে একটি খেজুর, আবার কোনটি হইতে দুইটি খেজুর মাটিতে পড়িল। অবশেষে আমি বিলালের হাতে সাতটি খেজুর দেখিলাম। রাসূলুল্লাহ (স) অতঃপর খেজুরগুলির উপর স্বীয় পবিত্র হাত রাখিয়া বলিলেন: বিসমিল্লাহ, খাও। আমরা তিনজনেই খেজুর খাইলাম। আমি একটি একটি করিয়া চুয়ান্নটি খেজুর গণনা করিলাম। এইগুলির আটি আমার অপর হাতে ছিল। আমার উভয় সঙ্গীও তাহাই করিল। অবশেষে আমরা তৃপ্ত হইয়া হাত গুটাইয়া লইলাম। আমি অবাক হইয়া দেখিলাম, সেই সাতটি খেজুর তখনও অবশিষ্ট রহিয়াছে। রাসূলুল্লাহ (স) বিলালকে বলিলেন: এই খেজুরগুলি তুলিয়া রাখ। এইগুলি হইতে যেই ব্যক্তি খাইবে সেই পরিতৃপ্ত হইবে।
পরদিন রাসূলুল্লাহ (স) বিলালকে বলিলেন: খেজুরগুলি নিয়া আস। তিনি খেজুরগুলির উপর পবিত্র হাত রাখিয়া বলিলেন: বিসমillah, খাও। আমরা সংখ্যায় ছিলাম দশজন। সকলেই খাইয়া তৃপ্ত হইলাম। ইহার পর যখন হাত গুটাইয়া লইলাম তখন খেজুর তেমনি অবশিষ্ট ছিল। রাসূলুল্লাহ (স) বলিলেন: আল্লাহ তা'আলার কাছে আমার লজ্জা লাগে। নতুবা মদীনা পৌঁছা পর্যন্ত আমরা এই খেজুর খাইতাম। অতঃপর তিনি খেজুরগুলি একটি শিশুকে দিলেন। শিশুটি এইগুলি চর্বন করিতে করিতে চলিয়া গেল (খাসাইসুল কুবরা, ১খ., পৃ. ৬৫৭-৯)।

📘 সীরাত বিশ্বকোষ > 📄 যুদ্ধের ময়দানে যুল-বিজাদায়নের ইনতিকাল

📄 যুদ্ধের ময়দানে যুল-বিজাদায়নের ইনতিকাল


রাসূলুল্লাহ (স) তাবুকে অবস্থানকালীন হযরত আবদুল্লাহ যুল-বিজাদায়ান ইনতিকাল করেন। তিনি আল্লাহর রাসূলের সহিত যুদ্ধে অংশগ্রহণ করার জন্য মদীনা হইতে তাবুক আসিয়াছিলেন। তিনি ছিলেন অত্যন্ত দরিদ্র পরিবারের সন্তান। শৈশবকালে পিতৃহীন হইয়া পিতৃব্যের তত্ত্বাবধানে ও আশ্রয়ে প্রতিপালিত হন। চাচা তাহাকে অনেক ধনসম্পদ দান করেন। তিনি ইসলাম গ্রহণ করার কারণে তাহার চাচা ক্রুদ্ধ হইয়া প্রদত্ত ধন-সম্পদ কাড়িয়া লইলেন। তিনি ভ্রাতুষ্পুত্রকে নানাভাবে নির্যাতন করিয়া অবশেষে একটি বিজাদ পরাইয়া তাড়াইয়া দেন। বিজাদ হইতেছে এক প্রকার মোটা খসখসে কম্বল। তিনি সেই অবস্থায় রাসূলুল্লাহ (স)-এর নিকট চলিয়া আসেন। তিনি মদীনার কাছাকাছি পৌছিয়া জীর্ণ কম্বলখানাকে দুই টুকরা করিয়া একটি পরিধান করেন এবং অপরটি গায়ে জড়ান এবং এই অবস্থায় রাসূলুল্লাহ (স)-এর সামনে হাযির হন। তাঁহার পৈত্রিক নাম ছিল আবদুল উয্যা। রাসূলুল্লাহ (স) তাঁহার নূতন নামকরণ করেন আবদুল্লাহ। তখন হইতে তিনি যুল বিজাদায়ন (দুই কম্বলওয়ালা) হিসাবে খ্যাতি লাভ করেন। তাবুকে যখন তিনি ইনতিকাল করেন তখন রাতেই আগুনের শিখা জ্বালাইয়া কবর খনন করা হয়। রাসূলুল্লাহ (স) স্বয়ং কবরে অবতরণ করেন। হযরত আবূ বাক্স (রা) ও হযরত উমার (রা) লাশ কবরে নামাইয়া দেন। হযরত বিলালের হাতে ছিল জ্বলন্ত চেরাগ। কবরে লাশ রাখিয়া রাসূলুল্লাহ (স) দু'আ করেন:
اللهم اني امسيت راضيا عنه فارض عنه “হে আল্লাহ! আজ সন্ধ্যা পর্যন্ত (ইনতিকালের পূর্ব মুহূর্ত পর্যন্ত) আমি তাহার প্রতি সন্তুষ্ট ছিলাম, অতএব তুমি তাহার প্রতি সন্তুষ্ট হইয়া যাও”।

📘 সীরাত বিশ্বকোষ > 📄 তাবুকের ময়দানে রাসূলুল্লাহ (স)-এর ভাষণ

📄 তাবুকের ময়দানে রাসূলুল্লাহ (স)-এর ভাষণ


একদা তাবুকে ফজরের সালাত আদায়ের পর রাসূলুল্লাহ (স) সমবেত জনগণের উদ্দেশ্যে ভাষণ দেন যাহা উৎকৃষ্ট নৈতিক ও আদর্শিক নীতিমালা হিসাবে স্বীকৃত। আল্লাহ তা'আলার স্তুতি ও প্রশাংসার পর তিনি বলেন,
أيها الناس اما بعد فان اصدق الحديث كتاب الله وأوثق العرى كلمة التقوى وخير الملل ملة ابراهيم وخير السنن سنة محمد ﷺ وأشرف الحديث ذكر الله وأحسن القصص هذا القرآن وخير الامور عوازمها وشر الأمور محدثاتها واحسن الهدي هدى الانبياء وأشرف الموت قتل الشهداء واعمى العمى الضلالة بعد الهدى وخير الاعمال ما نفع وخير الهدي ما تبع وشر العمى عمى القلب واليد العليا خير من اليد السفلى وما قل وكفى خير مما كثر وألهى وشر المعذرة حين يحضر الموت وشر الندامة يوم القيامة ومن الناس من لا يأتى الجمعة إلا دبرا ومن الناس من لا يذكر الله هجرا ومن أعظم الخطايا اللسان الكذوب وخير الغنى غنى النفس وخير الزاد التقوى ورأس الحكمة مخافة الله عز وجل وخير ما وقر في القلوب اليقين والارتياب من الكفر والنياحة من عمل الجاهلية والغلول من جثاء جهنم والسكر كى من النار والشعر من ابليس والخمر جماع الاثم والنساء حبائل الشيطان والشباب شعبة من الجنون وشر المكاسب كسب الربا وشر المآكل أكل مال اليتيم والسعيد من وعظ بغيره والشقى من شقى في بطن أمه وإنما يصير أحدكم إلى موضع أربعة أذرع والأمر إلى الآخرة وملاك العمل خواتمه وشر الورايا روايا الكذب وكل ما هو آت قريب وسباب المؤمن فسوق وقتال المؤمن كفر وأكل لحمه من معصية الله وحرمة ماله كحرمة دمه ومن يتالى على الله يكذبه ومن يستغفره يغفر له ومن يعف يعف الله عنه ومن يعظم يأجره الله ومن يصبر على الرزية يعوضه الله ومن يبتغى السمعة يسمع الله به ومن يصبر يضعف الله له ومن يعص الله يعذبه الله اللهم اغفر لي ولأمتى اللهم اغفر لي ولأمتى اللهم اغفر لي ولأمتى قالها ثلاثا وفيه نكارة وفي اسناده ضعف والله أعلم بالصواب।
“হে জনগণ। সবচেয়ে সত্য কথা হইতেছে আল্লাহ্র কিতাব; সবচেয়ে মজবুত রজ্জু হইতেছে তাক্তয়ার বাক্য; সবচেয়ে শ্রেষ্ঠ মিল্লাত হইতেছে হযরত ইব্রাহীম (আ)-এর মিল্লাত; সবচেয়ে উত্তম সুন্নাত হইতেছে রাসূলুল্লাহ (স)-এর সুন্নাত, সবচেয়ে মর্যাদাপূর্ণ বাক্য হইতেছে আল্লাহর যিকির; সবচেয়ে সুন্দর বর্ণনা হইতেছে আল-কুরআন; সর্বোত্তম কর্ম পরিণাম ফলের উপর নির্ভরশীল; সবচেয়ে মন্দ কর্ম হইতেছে বিদ'আত, সবচেয়ে উন্নত সীরাত হইতেছে নবীদের সীরাত; সবচেয়ে মহিমান্বিত মৃত্যু হইতেছে শহীদের মৃতু; নিকৃষ্টতর গোমরাহী হইতেছে যাহা হিদায়াতের পরে আসে; উৎকৃষ্টতর আমল হইতেছে যাহা উপকারী; সর্বোৎকৃষ্ট হিদায়াত হইতেছে যাহা অনুকরণ করা হয়; সবচেয়ে নিকৃষ্ট অন্ধত্ব হইতেছে অন্তরের অন্ধত্ব; নিচের হাত হইতে উপরের হাত উত্তম (দাতার হাত গ্রহীতার হাত হইতে উত্তম); গোমরাহীতে লিপ্ত করে এমন অধিক সম্পত্তি হইতে স্বল্প সম্পত্তি উত্তম; নিকৃষ্টতম ওযর-আপত্তি হইতেছে যাহা মৃত্যুর সময় উপস্থিত করা হয়; কিয়ামতের দিবসের লজ্জাই হইল বড় লজ্জা, কিছু মানুষ এমন আছে যাহারা জুমু'আর নামাযে বিলম্বে আসে এবং এমন কিছু মানুষ রহিয়াছে যাহারা আল্লাহ্ যিকির করে অমনোযোগী অবস্থায় যাহা সত্যিকার অর্থে যিকির হইতে দূরে থাকারই নামান্তর। সবচেয়ে বড় ভ্রান্তি হইতেছে মিথ্যা কথন; সবচেয়ে উত্তম প্রাচুর্য হইতেছে অন্তরের প্রাচুর্য; সবচেয়ে উৎকৃষ্ট পাথেয় হইতেছে আল্লাহভীতি; প্রজ্ঞার উৎসস্থল হইতেছে মহান আল্লাহ্র ভয়; অন্তরের সবচেয়ে উন্নত বস্তু হইতেছে নিশ্চিত প্রত্যয়; সন্দেহ কুফরীর একটি অংশ; উচ্চ স্বরে বিলাপ করা জাহিলিয়াতের প্রথা; গনীমতের সম্পত্তি আত্মসাত দোযখের ইন্ধন; মাদক গ্রহণ দোযখের আগুন প্রজ্জ্বলিত করার শামিল; অশালীন কবিতা শয়তানের পক্ষ হইতে আসে; মদ্যপান সব পাপের মূল; দুষ্ট নারীরা শয়তানের ফাঁদ; যৌবন উন্মত্ততার একটি শাখা; সূদের উপার্জন নিকৃষ্টতম জীবিকা; নিকষ্ট খাদ্য হইতেছে ইয়াতীমের সম্পদ ভক্ষণ; সৌভাগ্যবান ঐ ব্যক্তি যে অপরের নিকট হইতে উপদেশ গ্রহণ করে; দুর্ভাগা ঐ ব্যক্তি যে মাতৃগর্ভেই হতভাগা; তোমাদের প্রত্যেককে চার হাত জায়গায় (কবরে) যাইতে হইবে; কর্মফল আখিরাতে প্রকাশ পাইবে; সাফল্যের ভিত্তি হইল শেষ পরিণামফল; নিকৃষ্ট বর্ণনাকারী হইতেছে মিথ্যা বর্ণনা; যাহা কিছু ঘটিবার তাহা অচিরেই ঘটিবে; মুমিনদিগকে গালি দেওয়া পাপ; মু'মিনকে হত্যা করা কুফরী কাজ; মুমিনের গোশত খাওয়া (গীবত করা) আল্লাহ্র নাফরমানী; মুসলমানের সম্পত্তির প্রতি এমনভাবে সম্মান দেখাইতে হইবে যেমনভাবে নিজের প্রাণের প্রতি সম্মান দেখানো হয়; যেই ব্যক্তি মিথ্যা কসম খায় আল্লাহ তাহাকে মিথ্যাবাদী বলিয়া আখ্যায়িত করেন; যেই ব্যক্তি গুনাহ মাফ চায় আল্লাহ তাহাকে মার্জনা করেন; যেই ব্যক্তি অন্যকে ক্ষমা করে আল্লাহ তাহাকে ক্ষমা করেন; যেই ব্যক্তি ক্রোধ সংবরণ করে আল্লাহ তা'আলা তাহাকে উত্তম বিনিময় দান করেন; যেই ব্যক্তি বিপদে ধৈর্য ধারণ করে আল্লাহ তাহাকে দ্বিগুণ প্রতিদান দেন; যেই ব্যক্তি লোক দেখানোর জন্য কোন কাজ করে আল্লাহ তাহাকে অপদস্ত করেন। যে ব্যক্তি ধৈর্য ধারণ করে আল্লাহ তাহাকে অধিক প্রতিদান দেন। যেই ব্যক্তি আল্লাহ তা'আলার অবাধ্য আল্লাহ তাহার উপর আযাব প্রদান করেন। হে আল্লাহ! আমাকে এবং আমার উম্মতকে ক্ষমা করুন। তিনি এই দু'আ তিনবার করেন। হাফিয ইব্‌ন কাছীর হাদীছের ইসনাদে দুর্বলতা আছে বলিয়া মন্তব্য করেন" (যাদুল মা'আদ, ৩খ., পৃ. ৫৪১-৪২; আল-বিদায়া, ৫খ., পৃ. ১৩-১৫)।

📘 সীরাত বিশ্বকোষ > 📄 হিরাক্লিয়াসের নিকট রাসূলুল্লাহ (স)-এর পত্র

📄 হিরাক্লিয়াসের নিকট রাসূলুল্লাহ (স)-এর পত্র


তাবৃক হইতে রাসূলুল্লাহ (স) রোমান সম্রাট হেরাক্লিয়াসের নিকট হযরত দিহ্ইয়া আল-কালবী (রা) মারফত একটি পত্র প্রেরণ করেন। পত্রখানা সম্রাটের নিকট হস্তান্তরিত হওয়ার পরপরই তিনি দেশের সর্বোচ্চ প্রশাসনিক কর্মকর্তা, অমাত্যবর্গ ও সেনাপতিদের রাজদরবারে ডাকিয়া পাঠান। রুদ্ধদ্বার কক্ষে তিনি তাহাদের সহিত বৈঠকে মিলিত হন। সম্রাট তাহাদের উদ্দেশ্যে বলেন, এই ব্যক্তি [মুহাম্মাদ (স)] যেই জায়গায় আসিয়া অবস্থান করিতেছে, তাহা তো আপনাদের সবারই জানা। তিনি আমার নিকট পত্র প্রেরণ করিয়া তিনটি বিকল্প বিষয়ের যে কোনটি গ্রহণের দাওয়াত দিয়াছেন। তিনি লিখিয়াছেন, ইসলাম কবুল করুন অথবা জিয়া (কর) প্রদান করুন অথবা লড়াইয়ের জন্য ময়দানে আসুন।
হে রোমান জাতি! আল্লাহর শপথ! আপনারা নিশ্চয় প্রাচীন ঐশী গ্রন্থসমূহ অধ্যয়ন করিয়া জানিতে পারিয়াছেন যে, মুসলমানদের হাতে আপনারা পরাজিত হইবেন। সুতরাং পরাজিত হওয়ার আগেই তাহাদের আনুগত্য স্বীকার করুন অথবা জিযয়া প্রদান করুন। পারিষদবর্গ ও সেনাপতিগণ এই বক্তব্য শুনিয়া অবজ্ঞাসূচক আচরণ করিতে লাগিল এবং নিজ নিজ শরীরের বিশেষ জামা (Uniform) খুলিয়া অগ্নি বৎ হইয়া বলিল, তাই বলিয়া কি আমরা খৃস্ট ধর্ম ছাড়িয়া দিব? হেজায হইতে আগত এক ব্যক্তির গোলাম হইয়া যাইব? হেরাক্লিয়াস যখন চারি দিকে শোরগোল ও হৈ চৈ লক্ষ্য করিলেন, তখন সকলকে শান্ত করিবার উদ্দেশ্যে বলিলেন, আসলে আমি আপনাদের নৈতিক সাহস ও ধর্মীয় চেতনা যাচাই করিতে চাহিয়াছিলাম। অতঃপর হিরাক্লিয়াস একজন দোভাষী ডাকিয়া উত্তর প্রদান করিলেন। আত-তানূখী নামক জনৈক দূতের হস্তে পত্রটি দিয়া বলিলেন, পত্রটি তাবুকে অবস্থানরত ঐ ব্যক্তির নিকট দিয়া আস; তবে তাঁহার কথোপকথনে তিনটি বিষয় লক্ষ্য করিবে এবং তাহা আমাকে জানাইবে। (এক) আমার নিকট তিনি যেই পত্র প্রেরণ করিয়াছেন তাহার কোন আলোচনা তিনি করিতেছেন কিনা; (দুই) আল-লায়ল (রজনী) শব্দটি উচ্চারণ করেন কিনা; (তিন) তাঁহার পিঠ দেখিয়া অনুধাবন করিবে সেখানে কিছু দৃষ্টিগোচর হয় কিনা।
দূত বলেন, আমি যখন হেরাক্লিয়াসের পত্র লইয়া সোজা তাবুকে পৌঁছিলাম, তখন রাসূলুল্লাহ (স) সাহাবীদিগকে লইয়া ঝর্ণাধারার নিকটে বসিয়া আলাপ করিতেছেন। আমি সাহাবীদিগকে জিজ্ঞাসা করিলাম, আপনাদের নবী কে? তাঁহারা দেখাইয়া দিলে আমি তাঁহার সম্মুখে গিয়া পত্রখানি হস্তান্তর করিলাম। রাসূলুল্লাহ (স) পত্রখানি থলিয়ার মধ্যে রাখিয়া প্রশ্ন করিলেন, আপনি কে? আমি বলিলাম, আত-তানূখী।
রাসূলুল্লাহ (স): আপনি কি আপন পিতা ইব্রাহীম (আ)-এর বিশুদ্ধ তাওহীদ ভিত্তিক দীন কবুল করিবেন?
আত-তানূষী: যেহেতু আমি একজন দূত, তাই মনিবের পরামর্শ ছাড়া মুসলমান হইতে পারি না।
রাসূলুল্লাহ (স) মুচকি হাসিয়া কুরআনের আয়াত পাঠ করিলেন: إِنَّكَ لَا تَهْدِي مَنْ أَحْبَبْتَ وَلَكِنَّ اللَّهَ يَهْدِي مَنْ يَشَاءَ وَهُوَ أَعْلَمُ بِالْمُهْتَدِينَ.
"তুমি যাহাকে ভালবাস, ইচ্ছা করিলেই তাহাকে সৎপথে আনিতে পারিবে না। তবে আল্লাহ যাহাকে চাহেন সৎপথে আনয়ন করেন এবং তিনিই ভাল জানেন সৎপথ অনুসারীদেরকে" (২৮:৫৬)।
হে আত-তানূখী ভাই! আমি পারস্য সম্রাট খসরূ পারভেজের নিকট একটি পত্র প্রেরণ করিয়াছিলাম। সে উহা ছিড়িয়া ফেলিয়াছে। আল্লাহ তা'আলা তাহার দেশকে অনুরূপ টুকরা টুকরা করিয়া ফেলিবেন। আমি আপনাদের সম্রাট হিরাক্লিয়াসের নিকট পত্র লিখিয়াছি। তিনি তাহা সংরক্ষণ করিয়াছেন। অতএব এক নির্দিষ্ট মেয়াদ পর্যন্ত জনগণ তাহাকে ভয় করিয়া চলিবে।
আত-তানূখী: আমি মনে মনে ভাবিলাম, হেরাক্লিয়াসের হুকুম অনুযায়ী তিনটি কথার মধ্যে পত্রের প্রসঙ্গ তো আসিয়া গেল। আমি ইহা নোট করিয়া লইলাম। অতএব পত্রটি পাঠ করিবার জন্য রাসূলুল্লাহ (স) হযরত মু'আবিয়া (রা)-কে দিলেন। পত্রে লেখা ছিল, 'আপনি আমাকে এমন এক জান্নাতের প্রতি দাওয়াত দিতেছেন যাহার দৈর্ঘ্য-প্রস্ত আসমান-যমিন হইতেও বড়। ইহার পর বলুন, দোযখ কোথায় গেল'?
রাসূলুল্লাহ (স): সুবহানাল্লাহ! দিন আসিবার পর 'আল-লায়ল' (রাত) কোথায় যায়?
আত-তানূখী : আমি বুঝিতে পারিলাম যে, এইবার হেরাক্লিয়াসের দ্বিতীয় কথাটি পাওয়া গেল। আমি তাহা নোট করিয়া লইলাম।
রাসূলুল্লাহ (স) সাহাবীদের উদ্দেশ্যে বলিলেন, কাহারও নিকট যদি কোন উপঢৌকন থাকে তবে তাহা আত-তানূখীকে দাও।
আত-তানূখী: উপঢৌকন দেওয়ার পর আমি যখন ফিরিয়া আসিতে উদ্যত হইলাম তখন রাসূলুল্লাহ (স) নিজের শরীরের জামা খুলিয়া আমাকে ডাকিলেন।
রাসূলুল্লাহ (স): অন্তরে যেই বাসনা লুকাইয়া রাখিয়াছ তাহা পূর্ণ কর। আস, দেখ।
আত-তানূখী: আমি রাসূলের চারিপার্শ্ব ঘুরিয়া তাঁহার বাম কাঁধের নীচে উৎকীর্ণ খতমে নবুওয়াতের মোহর প্রত্যক্ষ করিলাম। আমার আর বুঝিতে বাকী রহিল না যে, হেরাক্লিয়াসের তৃতীয় কথাটিও প্রমাণিত হইয়া গেল। এইসব তথ্য লিপিবদ্ধ করিয়া আমি হেরাক্লিয়াসের দরবারে ফিরিয়া আসিলাম (আল-বিদায়া ওয়ান-নিহায়া, ৫খ., পৃ. ১৫-১৬)।

লিঙ্ক শেয়ার করুন
close

লিঙ্ক কপি করুন

0:00
0:00