📘 সীরাত বিশ্বকোষ > 📄 ইন্ন লুসায়তের উক্তি

📄 ইন্ন লুসায়তের উক্তি


হিজরে অবস্থানকালে রাসূলুল্লাহ (স)-এর উষ্ট্রী হারাইয়া গেলে ইব্‌ন লুসায়ত নামক জনৈক মুনাফিক রাসূলুল্লাহ (স) সম্পর্কে বিষোদগার করিতে থাকে। সে মন্তব্য করিল, মুহাম্মাদ নিজেকে আল্লাহ্‌র নবী বলিয়া দাবি করেন। আসমান হইতে অবতীর্ণ সংবাদ তিনি তোমাদের শোনান। অথচ দেখ, তাঁহার উষ্ট্রী কোথায় তাহার খবর তিনি জানেন না। রাসূলুল্লাহ (স) এই উক্তি শোনামাত্র তাঁহার পার্শ্বে উপবিষ্ট উমারা ইব্‌ন হায্‌ম (রা)-কে বলিলেন, ঐ লোকটি যেই উক্তি করিয়াছে সেই সম্পর্কে আমার বক্তব্য এই: আল্লাহ্‌র কসম! আল্লাহ্‌ তা'আলা আমাকে যাহা জানান তাহার বেশী কিছু আমি জানি না। এইমাত্র আল্লাহ্‌ আমাকে উষ্ট্রীর অবস্থানস্থল সম্পর্কে অবহিত করিয়াছেন। সেইটি ঐ উপত্যকার অমুক গিরিপথে গাছের সহিত লাগাম আটক অবস্থায় রহিয়াছে। তোমরা গিয়া উষ্ট্রীটি লইয়া আস। তৎক্ষণাত সাহাবীগণ তথায় গমন করিয়া উষ্ট্রী লইয়া আসেন (ইব্‌ন হিশাম, ২খ., পৃ. ৫২৩)।

📘 সীরাত বিশ্বকোষ > 📄 শুকাক উপত্যকায় রাসূলুল্লাহ (স)

📄 শুকাক উপত্যকায় রাসূলুল্লাহ (স)


তাবুকের পথে যখন রাসূলুল্লাহ (স) শুকাক উপত্যকায় পৌঁছেন একদা রাত্রিবেলা জনৈক উষ্ট্রচালকের সঙ্গীত শুনিতে পান। রাসূলুল্লাহ (স) সাহাবা কিরামকে বলেন: দ্রুত যাও, যাহাতে আমরা তাহাকে পাইতে পারি। রাসূলুল্লাহ (স) জানিতে চাহিলেন, এই ব্যক্তি কি আমাদের সেনাবাহিনীর সদস্য, না অন্য কোন গোত্রের সহিত সম্পর্কিত? সাহাবীগণ জবাব দিলেন, লোকটি আগন্তুক, আমাদের দলভুক্ত নয়। রাসূলুল্লাহ (স) যখন তাহাকে পাইলেন, দেখা গেল তাহার সহিত একটি কাফেলা রহিয়াছে। রাসূলুল্লাহ (স)-এর সহিত তাহাদের কথোপকথন নিম্নে উল্লিখিত হইল: রাসূলুল্লাহ (স): তোমাদের পরিচয় কি? কোন গোত্রের সহিত তোমরা সম্পর্কিত? কাফেলা: মুদার গোত্রের সহিত আমাদের সম্পর্ক। রাসূলুল্লাহ (স): আমার সম্পর্কও মুদার গোত্রের সহিত। তিনি মুদার পর্যন্ত তাহার বংশ তালিকা শোনান। কাফেলা: আমাদের গোত্র মুদারই উষ্ট্র চালকের সঙ্গীতের প্রবক্তা। রাসূলুল্লাহ (স): কিভাবে? কাফেলা: জাহিলী যুগে এক গোত্র অপর গোত্রকে আক্রমণ করিয়া সর্বস্ব লুট করিয়া লইত। একবার এক গোত্রের উপর ডাকাতের হামলা হইল। ভীত সন্ত্রস্ত হইয়া উটগুলি দিকবিদিক ছুটিয়া গেল। গোত্রপতি তাহার ভৃত্যকে বিক্ষিপ্ত উটগুলিকে একত্র করিবার হুকুম দিলেন। ভৃত্য ইহাতে অপারগতা প্রকাশ করিলে তাহার মনিব লাঠি দিয়া সজোরে হাতের উপর আঘাত করিল। আঘাতের ধকল সহ্য করিতে না পারিয়া ভৃত্য কাঁদিতে কাঁদিতে বলিতে লাগিল, আ-ইয়াদাহ, আ-ইয়াদাহ (ایداه ایداه) হায়, আমার হাত! হায়, আমার হাত। এই চীৎকারের ফলে বিক্ষিপ্ত উটগুলি একত্র হইতে লাগিল। মনিব বলিল, শাবাশ! এইভাবে ডাকিতে থাক যাহাতে সব উট একত্র হইয়া যায়। এই কথা শুনিয়া রাসূলুল্লাহ (স) হাসিলেন। তিনি বলিলেন, আমি কি জনগণকে এই সুসংবাদ শুনাইব না? হযরত বিলাল বলিলেন, নিশ্চয় শুনাইবেন, হে আল্লাহ্র রাসূল। রাসুলুল্লাহ (স) বলিলেন:
ان الله اعطاني الكنزين الفارس والروم وامدنى بالملوك ملوك حمير يجاهدون في سبيل الله وياكلون في الله.
"আল্লাহ তা'আলা আমাকে রোমান ও পারস্যের ধনভাণ্ডার দান করিয়াছেন এবং হিম্য়ারের বাদশাহের মাধ্যমে আমাকে সাহায্য করিয়াছেন। যেই ব্যক্তি আল্লাহ্ পথে জিহাদ করিবে সে গনীমতের সম্পদ প্রাপ্ত হইবে" (কিতাবুল মাগাযী, ৩খ., পৃ. ১০১১)।

📘 সীরাত বিশ্বকোষ > 📄 তাবৃকে রাসূলুল্লাহ (স)

📄 তাবৃকে রাসূলুল্লাহ (স)


রাসূলুল্লাহ (স) তাবুক পৌছিবার এক দিন আগে সাহাবীদিগকে বলিলেন: ইনশাআল্লাহ আগামী কাল তোমরা দুপুরের আগে তাবুক ঝর্ণায় পৌঁছিয়া যাইবে। সুতরাং তোমাদের কেহ ঝর্ণার পানিতে হাত লাগাইবে না। তাবুকে পৌঁছিয়া রাসূলুল্লাহ (স) ঝর্ণার ধারে গেলেন। বিন্দু বিন্দু পানি ধীর গতিতে প্রবাহিত হইতেছিল। ঝর্ণা হইতে অঞ্জলি দিয়া অল্প অল্প পানি একটি পাত্রে জমা করা হইল। অতঃপর রাসূলুল্লাহ (স) সেই পানি দিয়া মুখমণ্ডল ও হস্তদ্বয় ধৌত করিলেন এবং ব্যবহৃত পানি ঝর্ণায় ঢালিয়া দিলেন। তৎক্ষণাৎ ঝর্ণা হইতে কলকল রবে পানি নির্গত হইতে লাগিল। কাফেলার সব সদস্য তৃপ্তির সহিত পানি পান করিলেন। ইহার পর রাসূলুল্লাহ (স) বলিলেন:
يوشك يا معاذ ان طالت بك حياة ان ترى ما هاهنا قد ملى جنانا.
"হে মু'আয! যদি তুমি বাঁচিয়া থাক, তবে শীঘ্রই দেখিবে ইহার পানি অত্র এলাকাকে শ্যামল বাগানে পরিণত করিয়াছে"।
অদ্যাবধি সেই ঝর্ণাধারা হইতে সশব্দে পানি উৎক্ষিপ্ত হইতেছে (সাহীহ মুসলিম, ২খ., পৃ. ২৪৬)।
রাসূলুল্লাহ (স) তাবূক পৌঁছিলে সাহাবায়ে কিরাম (রা) ক্ষুধার যন্ত্রণায় কাতর হইয়া আরয করিলেন, ইয়া রাসূলুল্লাহ! আপনি অনুমতি দিলে আমরা সওয়ারীর উট যবেহ করিয়া গোশত খাইতে ও চর্বি সংগ্রহ করিতে পারি। হযরত উমার (রা) বলিলেন, ইয়া রাসূলাল্লাহ! এইরূপ করিলে সওয়ারীর সংখ্যা হ্রাস পাইবে। আপনি বরং অবশিষ্ট খাদ্যসামগ্রী এক জায়গায় একত্র করিয়া বরকতের দু'আ করুন। আশা করা যায় আল্লাহ তা'আলা বরকত দান করিবেন। রাসূলুল্লাহ (স) বলিলেন: বেশ ভাল কথা। অতঃপর তিনি একটি চামড়ার দস্তরখান বিছাইলেন এবং তাহাতে প্রত্যেকের অবশিষ্ট খাদ্যসামগ্রী একত্র করিবার আদেশ দিলেন। কেহ এক মুষ্টি গম, কেহ এক মুষ্টি খেজুর এবং কেহ এক টুকরা রুটি লইয়া আসিল। এইভাবে দস্তরখান পূর্ণ হইয়া গেল। ইহার পর রাসূলুল্লাহ (স) বরকতের দু'আ করিয়া সাহাবীদেরকে বলিলেন, আপন আপন পাত্র ভরিয়া লও। সাহাবীদের এমন কোন পাত্র রহিল না যাহা খাদ্যসামগ্রীতে ভর্তি হয় নাই। সকলে তৃপ্তির সহিত আহার করিবার পরও খাদ্যসামগ্রী উদ্বৃত্ত রহিয়া গেল। রাসূলুল্লাহ (স) বলিলেন: আমি সাক্ষ্য দিতেছি যে, আল্লাহ ব্যতীত কোন ইলাহ নাই এবং আমি আল্লাহর রাসূল। যেই বান্দা সন্দেহাতীতভাবে এই কলেমায় বিশ্বাস করে, সে আল্লাহ তা'আলার সহিত মিলিত হইবে, তাহাকে জান্নাতে প্রবেশে বাধা দেওয়া হইবে না (আল-খাসাইসুল কুবরা, ১খ., পৃ. ৫৫৬-৭)।
তাবুকে সাহাবায়ে কিরামের সম্মুখে একটি বিশাল সর্প আত্মপ্রকাশ করিল। সকলেই সর্প দেখিয়া ছুটাছুটি করিতে লাগিলেন। সর্পটি সম্মুখে অগ্রসর হইয়া রাসূলুল্লাহ (স)-এর নিকট দীর্ঘক্ষণ দাঁড়াইয়া রহিল। রাসূলুল্লাহ (স) উটের পিঠে সওয়ার ছিলেন। একটু পরে সর্পটি রাস্তা হইতে সরিয়া সটান দাঁড়াইয়া গেল। সাহাবীগণ ফিরিয়া আসিলে রাসূলুল্লাহ (স) জিজ্ঞাসা করিলেন: তোমরা কি জান এই সর্পটি কে? সাহাবীগণ আরয করিলেন: আল্লাহ ও তাঁহার রাসূলই ভাল জানেন। তিনি বলিলেন: আট সদস্য বিশিষ্ট জিনের যেই দলটি আমার নিকট কুরআন শ্রবণ করিতে আসিয়াছিল, সে তাহাদের একজন। আমি তাহাদের বসতিতে আসিয়াছি। সুতরাং সে কর্তব্য মনে করিয়া আমাকে সালাম করিতে আসিয়াছে। সে তোমাদেরকেও সালাম জানাইতেছে। সাহাবীগণ বলিলেন, ওয়া'আলায়কুমুস সালাম ওয়ারাহমাতুল্লাহ (কিতাবুল মাগাযী, ৩খ., পৃ. ১০১৫; খাসাইসুল কুবরা, ১খ., পৃ. ৫৬৪-৫)।
হযরত 'ইরবাদ ইব্‌ন সারিয়া (রা) বলেন, তাবূকে অবস্থানকালে রাসূলুল্লাহ (স) বিলাল (রা)-কে জিজ্ঞাসা করিলেন: খাওয়ার জন্য কিছু আছে কি? হযরত বিলাল (রা) উত্তর দিলেন, সেই সত্তার কসম যিনি আপনাকে সত্যসহ প্রেরণ করিয়াছেন। আমরা আমাদের থলিয়া ঝাড়িয়া ফেলিয়াছি। রাসূলুল্লাহ (স) বলেন: দেখ, হয়ত কিছু পাইতে পার। আরশের মালিকের নিকট অভাব-অনটনের আশংকা করিও না। বিলাল (রা) এক একটি থলিয়া লইয়া ঝাড়িতে শুরু করিলেন। কোন থলিয়া হইতে একটি খেজুর, আবার কোনটি হইতে দুইটি খেজুর মাটিতে পড়িল। অবশেষে আমি বিলালের হাতে সাতটি খেজুর দেখিলাম। রাসূলুল্লাহ (স) অতঃপর খেজুরগুলির উপর স্বীয় পবিত্র হাত রাখিয়া বলিলেন: বিসমিল্লাহ, খাও। আমরা তিনজনেই খেজুর খাইলাম। আমি একটি একটি করিয়া চুয়ান্নটি খেজুর গণনা করিলাম। এইগুলির আটি আমার অপর হাতে ছিল। আমার উভয় সঙ্গীও তাহাই করিল। অবশেষে আমরা তৃপ্ত হইয়া হাত গুটাইয়া লইলাম। আমি অবাক হইয়া দেখিলাম, সেই সাতটি খেজুর তখনও অবশিষ্ট রহিয়াছে। রাসূলুল্লাহ (স) বিলালকে বলিলেন: এই খেজুরগুলি তুলিয়া রাখ। এইগুলি হইতে যেই ব্যক্তি খাইবে সেই পরিতৃপ্ত হইবে।
পরদিন রাসূলুল্লাহ (স) বিলালকে বলিলেন: খেজুরগুলি নিয়া আস। তিনি খেজুরগুলির উপর পবিত্র হাত রাখিয়া বলিলেন: বিসমillah, খাও। আমরা সংখ্যায় ছিলাম দশজন। সকলেই খাইয়া তৃপ্ত হইলাম। ইহার পর যখন হাত গুটাইয়া লইলাম তখন খেজুর তেমনি অবশিষ্ট ছিল। রাসূলুল্লাহ (স) বলিলেন: আল্লাহ তা'আলার কাছে আমার লজ্জা লাগে। নতুবা মদীনা পৌঁছা পর্যন্ত আমরা এই খেজুর খাইতাম। অতঃপর তিনি খেজুরগুলি একটি শিশুকে দিলেন। শিশুটি এইগুলি চর্বন করিতে করিতে চলিয়া গেল (খাসাইসুল কুবরা, ১খ., পৃ. ৬৫৭-৯)।

📘 সীরাত বিশ্বকোষ > 📄 যুদ্ধের ময়দানে যুল-বিজাদায়নের ইনতিকাল

📄 যুদ্ধের ময়দানে যুল-বিজাদায়নের ইনতিকাল


রাসূলুল্লাহ (স) তাবুকে অবস্থানকালীন হযরত আবদুল্লাহ যুল-বিজাদায়ান ইনতিকাল করেন। তিনি আল্লাহর রাসূলের সহিত যুদ্ধে অংশগ্রহণ করার জন্য মদীনা হইতে তাবুক আসিয়াছিলেন। তিনি ছিলেন অত্যন্ত দরিদ্র পরিবারের সন্তান। শৈশবকালে পিতৃহীন হইয়া পিতৃব্যের তত্ত্বাবধানে ও আশ্রয়ে প্রতিপালিত হন। চাচা তাহাকে অনেক ধনসম্পদ দান করেন। তিনি ইসলাম গ্রহণ করার কারণে তাহার চাচা ক্রুদ্ধ হইয়া প্রদত্ত ধন-সম্পদ কাড়িয়া লইলেন। তিনি ভ্রাতুষ্পুত্রকে নানাভাবে নির্যাতন করিয়া অবশেষে একটি বিজাদ পরাইয়া তাড়াইয়া দেন। বিজাদ হইতেছে এক প্রকার মোটা খসখসে কম্বল। তিনি সেই অবস্থায় রাসূলুল্লাহ (স)-এর নিকট চলিয়া আসেন। তিনি মদীনার কাছাকাছি পৌছিয়া জীর্ণ কম্বলখানাকে দুই টুকরা করিয়া একটি পরিধান করেন এবং অপরটি গায়ে জড়ান এবং এই অবস্থায় রাসূলুল্লাহ (স)-এর সামনে হাযির হন। তাঁহার পৈত্রিক নাম ছিল আবদুল উয্যা। রাসূলুল্লাহ (স) তাঁহার নূতন নামকরণ করেন আবদুল্লাহ। তখন হইতে তিনি যুল বিজাদায়ন (দুই কম্বলওয়ালা) হিসাবে খ্যাতি লাভ করেন। তাবুকে যখন তিনি ইনতিকাল করেন তখন রাতেই আগুনের শিখা জ্বালাইয়া কবর খনন করা হয়। রাসূলুল্লাহ (স) স্বয়ং কবরে অবতরণ করেন। হযরত আবূ বাক্স (রা) ও হযরত উমার (রা) লাশ কবরে নামাইয়া দেন। হযরত বিলালের হাতে ছিল জ্বলন্ত চেরাগ। কবরে লাশ রাখিয়া রাসূলুল্লাহ (স) দু'আ করেন:
اللهم اني امسيت راضيا عنه فارض عنه “হে আল্লাহ! আজ সন্ধ্যা পর্যন্ত (ইনতিকালের পূর্ব মুহূর্ত পর্যন্ত) আমি তাহার প্রতি সন্তুষ্ট ছিলাম, অতএব তুমি তাহার প্রতি সন্তুষ্ট হইয়া যাও”।

লিঙ্ক শেয়ার করুন
close

লিঙ্ক কপি করুন

0:00
0:00