📄 আল-হিজরে যাত্রাবিরতি
রাসূলুল্লাহ (স)-এর নেতৃত্বে মুসলিম বাহিনী একের পর এক মনযিল অতিক্রম করিয়া আল-হিজ নামক স্থানে আসিয়া পৌছিল। প্রাগৈতিহাসিক যুগের হযরত সালেহ ('আ)-এর সম্প্রদায় তথা ছামূদ জাতির বাসস্থানের ধ্বংসাবশেষ সেইখানে বিদ্যমান রহিয়াছে। রাসূলুল্লাহ (স)-এর নির্দেশক্রমে এই জায়গায় সেনাছাউনী স্থাপন করা হয়। হিজর নামক স্থানে প্রাচীন যুগে ছামূদ নামে এক পরাক্রমশালী জাতি বাস করিত। প্রস্তরময় পর্বত কাটিয়া সুদৃঢ় বাসস্থান নির্মাণে তাহারা ছিল সমসাময়িক কালে অপ্রতিদ্বন্দ্বী। বিপুল শক্তি ও শৌর্য-বীর্যের অধিকারী হইয়া তাহারা আল্লাহ্ অনুগত না হইয়া বরং নাফরমানিতে লিপ্ত হয়। ফলে আল্লাহর গযবে পতিত হইয়া তাহারা ধ্বংস হইয়া যায়। পবিত্র কুরআনে তাহাদের বিভিন্ন ঘটনা উল্লেখ করা হইয়াছে (দ্র. ৭৪ ৭৩; ১১: ৬৬-৬৮; ৬৯:৪-৫; ৯১৪ ১১-১৪; ২৬৪ ১৪১-১৫৯)।
রাসূলুল্লাহ (স) যখন হিজর অতিক্রম করিতেছিলেন তখন চাদর দিয়া নিজ মুখমণ্ডল ঢাকিয়া দেন এবং সওয়ারীকে দ্রুত হাঁকাইতে থাকেন। তিনি নির্দেশ প্রদান করেন : 'তোমরা অত্যাচারী সম্প্রদায়ের জনপদে ক্রন্দনরত অবস্থায় ছাড়া প্রবেশ করিও না। তাহারা যেই শাস্তিতে পতিত হইয়াছিল সেই শাস্তি তোমাদের উপর আপতিত হইতে পারে। তোমরা এই কূপের পানি পান করিবে না, এই পানি দ্বারা উযু করিবে না, এই পানি দ্বারা আটার যেই খামির তৈয়ার করিয়াছ তাহা উটকে খাওয়াইয়া দাও এবং রাত্রিবেলা সঙ্গী ছাড়া একাকী কেহ বাহির হইবে না'। সাঈদা গোত্রের দুই ব্যক্তি ছাড়া সবাই রাসূলুল্লাহ (স)-এর হুকুম তামিল করিল। তাহাদের একজন প্রাকৃতিক প্রয়োজনে বাহির হইলে সে শ্বাসরোগে আক্রান্ত হয়। আর যেই ব্যক্তি উটের খোঁজে বাহির হয় তাহাকে মরুঝড় উড়াইয়া তাঈ-এর দুই পাহাড়ের মাঝখানে নিক্ষেপ করে। তাহাদের এই সংবাদ রাসূলুল্লাহ (স)-এর নিকট পৌছিলে তিনি বলেন, আমি কি তোমাদেরকে সঙ্গী ছাড়া একাকী বাহির হইতে নিষেধ করি নাই? রাসূলুল্লাহ (স) শ্বাসরোগে আক্রান্ত ব্যক্তির জন্য দু'আ করেন। ফলে সে রোগমুক্তি লাভ করে। আর যেই ব্যক্তি তাঈ পর্বতদ্বয়ের মাঝে নিক্ষিপ্ত হইয়াছিল, তাঈ গোত্রের লোকেরা তাহাকে মদীনায় পৌঁছাইয়া দেয় (সহীহ আল-বুখারী, ৩খ., পৃ. ১৩৫; ইব্ন খালদুন, তারিখ, ১খ., পৃ. ১৭৭)।
অতঃপর এই স্থানে কিছু সময় বিশ্রাম করিয়া রাসূলুল্লাহ (স) সম্মুখপানে অগ্রসর হইলেন। প্রচণ্ড দাবদাহে সৈন্যদের প্রাণ ওষ্ঠাগত প্রায়। হযরত আবূ বাক্রের (রা) অনুরোধে রাসূলুল্লাহ (স) বৃষ্টির জন্য হাত উঠাইয়া দু'আ করেন। হাত নামাইবার পূর্বেই মুষলধারে বৃষ্টি বর্ষণ শুরু হইয়া যায়। মুজাহিদগণ তৃপ্তি সহকারে পানি পান করিলেন এবং প্রয়োজনীয় পরিমাণ পানি বিভিন্ন পাত্রে ভর্তি করিয়া রাখিলেন। সেনাছাউনী ছাড়া অন্য কোথাও এক ফোটা বৃষ্টিও পড়ে নাই। ইহা ছিল রাসূলুল্লাহ (স)-এর মু'জিযা (Muhammad Husayn Haykal, The Life of Muhammad, p. 448-9)।
হযরত আনাস (রা) বর্ণনা করেন, আমরা রাসূলুল্লাহ (স)-এর সহিত জিহাদের উদ্দেশ্যে হিজর নামক স্থানে পৌছিলে একটি আওয়াজ শুনিতে পাইলাম। কে যেন বলিতেছিল, 'হে আল্লাহ! আমাকে মুহাম্মাদ (স)-এর উম্মতের অন্তর্ভুক্ত কর যাহাদের মাগফিরাত করা হইবে এবং যাহাদের দু'আ কবুল করা হইবে'। রাসূলুল্লাহ (স) বলিলেন : হে আনাস! দেখ তো কিসের আওয়াজ? আমি পাহাড়ে গেলাম, তথায় শুভ্র পোশাকধারী এক ব্যক্তিকে দেখিলাম। তাহার চুল ও দাড়ি সাদা এবং তিনি দৈর্ঘ্যে প্রায় তিন শত হাত। তিনি আমাকে দেখিয়া বলিলেন, আপনি কি রাসূলুল্লাহ (স) কর্তৃক প্রেরিত? আমি বলিলাম, হাঁ। তিনি বলিলেন, তাঁহার কাছে গিয়া আমার সালাম পেশ করুন এবং বলুন, আপনার ভাই ইলয়াস (আ) আপনার সহিত দেখা করিতে চান। হযরত আনাস (রা) বলেন, আমি রাসূলুল্লাহ (স)-এর কাছে আসিয়া এই সংবাদ জানাইলাম। তিনি আমাকে সঙ্গে লইয়া রওয়ানা হইলেন। নিকটে পৌঁছিবার পর তিনি আমার অগ্রে চলিয়া গেলেন এবং আমি পশ্চাতে রহিয়া গেলাম। তাঁহারা দীর্ঘ সময় আলাপ-আলোচনা করিলেন। তাহার পর তাঁহাদের জন্য আকাশ হইতে খাদ্য অবতীর্ণ হইল। রাসূলুল্লাহ (স) আমাকে ডাকিয়া লইলেন। আমি তাঁহাদের সহিত রকমারী খাদ্য গ্রহণের পর এক প্রান্তে চলিয়া গেলাম। অতঃপর একখণ্ড মেঘ আসিয়া মহৎ ব্যক্তিটিকে তুলিয়া লইল। আমি তাহাতে তাঁহার পোশাকের শুভ্রতা প্রত্যক্ষ করিলাম। মেঘখণ্ড তাঁহাকে ঊর্ধ্বাকাশে লইয়া যায় (আল-খাসাইসুল কুবরা, বাংলা অনু. ১খ., পৃ. ৫১৬-৭)।
📄 তাবুক যুদ্ধের ফলাফল
গাযওয়া তাবুক মুসলমানদের প্রভাব বিস্তার ও শক্তি বৃদ্ধিতে তাৎপর্যপূর্ণ ভূমিকা রাখিয়াছিল। মুসলমানদের মনে এই আত্মবিশ্বাস দৃঢ় হইয়াছিল যে, এখন হইতে জাযীরাতুল আরাবে ইসলামের শক্তি অপ্রতিদ্বন্দ্বী ও অপ্রতিরোধ্য। মুসলমানগণ এই যুদ্ধে দৃঢ় মনোবল, প্রচণ্ড সাহসিকতা ও নজীরবিহীন কুরবানীর যেই ইতিহাস রচনা করিয়াছেন তাহাতে রোমানরা হতচকিত ও ভীত-সন্ত্রস্ত হইয়া পড়ে। তাহারা কোন পাল্টা আক্রমণ, অগ্রাভিযান, সামরিক মহড়া ও তৎপরতা দেখাইতে সক্ষম হয় নাই। মুসলমানদের প্রকাশ্য তৎপরতার মুকাবিলায় তাহারা এক ধরনের পশ্চাদপসরণ ও নীরবতা অবলম্বন করে। নবোত্থিত ইসলামের শক্তি সম্পর্কে তাহাদের যতটা ধারণা ও পরিমাপ ছিল, তাবুক যুদ্ধের প্রস্তুতি তাহাদের সেই পরিমাপের ধারণাকে মিথ্যা প্রতিপন্ন করিয়াছিল। মৃতার যুদ্ধের দুঃসহ স্মৃতি তখনও তাহাদের মনে জাগ্রত ছিল।
পরিবর্তিত পরিস্থিতিতে রোমানদের ক্রীড়নক গোত্রসমূহ বুঝিতে পারিল যে, রোমানদের গৌরবের ও কর্তৃত্বের দিন শেষ, তাহাদের পায়ের তলায় আর মাটি নাই। তাহারা গভীরভাবে অনুভব করিল যে, ইসলাম কোন বুদবুদ নয় যাহা পানির উপর ভাসিয়া উঠিবার পর মুহূর্তেই বিলীন হইয়া যায়। এই কারণে তাহারা জিয়া প্রদানের শর্তে চুক্তিবদ্ধ হইয়া মিত্রে পরিণত হইল। ফলে ইসলামী রাষ্ট্রের সীমানা সম্প্রসারিত হইয়া রোমান সীমান্তের সহিত মিলিত হইল। মুনাফিকরা মুসলমানদের বিরুদ্ধে অব্যাহত ষড়যন্ত্র চালাইয়া যেই স্বপ্নপ্রাসাদ গড়িয়াছিল তাহাও ভাঙ্গিয়া চূর্ণবিচূর্ণ হইয়া যায়। কারণ তাহাদের আশা-ভরসার মূল কেন্দ্র ছিল রোমান শক্তি। এই অবস্থায় পরাজিত মুনাফিক শক্তির সহিত নমনীয় ব্যবহারের প্রয়োজনীয়তা ফুরাইয়া গেল। এই ব্যাপারে শৈথিল্য প্রদর্শন করিলে তাহারা আবার মাথাচাড়া দিয়া উঠিতে পারে এবং সুযোগ লইয়া ভয়াবহ ক্ষতিসাধন করিতে পারে। তাই আল্লাহ তা'আলা মুনাফিকদের সহিত কঠোর আচরণ করার, তাহাদের জানাযা নামাযে শরীক না হওয়ার, কবর যিয়ারত না করার ও মাগফিরাতের দু'আ না করার নির্দেশ দিয়াছেন। তাহাদের তৈরী তথাকথিত মসজিদ (আসলে চক্রান্ত দুর্গ) ধ্বংস করা হইল। আল্লাহ তা'আলা কুরআনের বিভিন্ন আয়াত নাযিল করিয়া মুনাফিকদের চরিত্রের বিভিন্ন দিক উন্মোচিত করিয়া দেন।
মক্কা বিজয়ের পর যদিও বিভিন্ন দেশের প্রতিনিধিগণ রাসূলুল্লাহ (স)-এর দরবারে আসিতে শুরু করিয়াছিল, তাবুক যুদ্ধের পর ইহার সংখ্যা বহু গুণে বৃদ্ধি পাইল। ইহাতেই তাবুক যুদ্ধের প্রভাব আন্দায করা যায়। পরবর্তীতে হযরত আবূ বাক্স (রা) ও হযরত উমর (রা)-র সময় রোমান সাম্রাজ্যের কর্তৃত্বাধীন সিরিয়া মুসলমানদের অধিকারে আসে। তাবুক যুদ্ধই ছিল পরবর্তীতে সিরিয়া বিজয়ের ভিত্তি। সীরাতে নববী, ইসলামের দাওয়াত ও সমরনীতির ইতিহাসে গাযওয়া তাবুকের একটি বিশেষ গুরুত্ব রহিয়াছে। ইহার দ্বারা সেই সকল লক্ষ্য ও উদ্দেশ্য পূর্ণতা প্রাপ্ত হয়, যাহা মুসলমান ও আরবদের অনুকূলে খুবই সুদূরপ্রসারী ছিল। ইহা ইসলামের ইতিহাসের ধারাবাহিকতা ও ভবিষ্যত সংঘটিত ঘটনাবলীর উপর কার্যকর প্রভাব বিস্তার করে।
📄 ইন্ন লুসায়তের উক্তি
হিজরে অবস্থানকালে রাসূলুল্লাহ (স)-এর উষ্ট্রী হারাইয়া গেলে ইব্ন লুসায়ত নামক জনৈক মুনাফিক রাসূলুল্লাহ (স) সম্পর্কে বিষোদগার করিতে থাকে। সে মন্তব্য করিল, মুহাম্মাদ নিজেকে আল্লাহ্র নবী বলিয়া দাবি করেন। আসমান হইতে অবতীর্ণ সংবাদ তিনি তোমাদের শোনান। অথচ দেখ, তাঁহার উষ্ট্রী কোথায় তাহার খবর তিনি জানেন না। রাসূলুল্লাহ (স) এই উক্তি শোনামাত্র তাঁহার পার্শ্বে উপবিষ্ট উমারা ইব্ন হায্ম (রা)-কে বলিলেন, ঐ লোকটি যেই উক্তি করিয়াছে সেই সম্পর্কে আমার বক্তব্য এই: আল্লাহ্র কসম! আল্লাহ্ তা'আলা আমাকে যাহা জানান তাহার বেশী কিছু আমি জানি না। এইমাত্র আল্লাহ্ আমাকে উষ্ট্রীর অবস্থানস্থল সম্পর্কে অবহিত করিয়াছেন। সেইটি ঐ উপত্যকার অমুক গিরিপথে গাছের সহিত লাগাম আটক অবস্থায় রহিয়াছে। তোমরা গিয়া উষ্ট্রীটি লইয়া আস। তৎক্ষণাত সাহাবীগণ তথায় গমন করিয়া উষ্ট্রী লইয়া আসেন (ইব্ন হিশাম, ২খ., পৃ. ৫২৩)।
📄 শুকাক উপত্যকায় রাসূলুল্লাহ (স)
তাবুকের পথে যখন রাসূলুল্লাহ (স) শুকাক উপত্যকায় পৌঁছেন একদা রাত্রিবেলা জনৈক উষ্ট্রচালকের সঙ্গীত শুনিতে পান। রাসূলুল্লাহ (স) সাহাবা কিরামকে বলেন: দ্রুত যাও, যাহাতে আমরা তাহাকে পাইতে পারি। রাসূলুল্লাহ (স) জানিতে চাহিলেন, এই ব্যক্তি কি আমাদের সেনাবাহিনীর সদস্য, না অন্য কোন গোত্রের সহিত সম্পর্কিত? সাহাবীগণ জবাব দিলেন, লোকটি আগন্তুক, আমাদের দলভুক্ত নয়। রাসূলুল্লাহ (স) যখন তাহাকে পাইলেন, দেখা গেল তাহার সহিত একটি কাফেলা রহিয়াছে। রাসূলুল্লাহ (স)-এর সহিত তাহাদের কথোপকথন নিম্নে উল্লিখিত হইল: রাসূলুল্লাহ (স): তোমাদের পরিচয় কি? কোন গোত্রের সহিত তোমরা সম্পর্কিত? কাফেলা: মুদার গোত্রের সহিত আমাদের সম্পর্ক। রাসূলুল্লাহ (স): আমার সম্পর্কও মুদার গোত্রের সহিত। তিনি মুদার পর্যন্ত তাহার বংশ তালিকা শোনান। কাফেলা: আমাদের গোত্র মুদারই উষ্ট্র চালকের সঙ্গীতের প্রবক্তা। রাসূলুল্লাহ (স): কিভাবে? কাফেলা: জাহিলী যুগে এক গোত্র অপর গোত্রকে আক্রমণ করিয়া সর্বস্ব লুট করিয়া লইত। একবার এক গোত্রের উপর ডাকাতের হামলা হইল। ভীত সন্ত্রস্ত হইয়া উটগুলি দিকবিদিক ছুটিয়া গেল। গোত্রপতি তাহার ভৃত্যকে বিক্ষিপ্ত উটগুলিকে একত্র করিবার হুকুম দিলেন। ভৃত্য ইহাতে অপারগতা প্রকাশ করিলে তাহার মনিব লাঠি দিয়া সজোরে হাতের উপর আঘাত করিল। আঘাতের ধকল সহ্য করিতে না পারিয়া ভৃত্য কাঁদিতে কাঁদিতে বলিতে লাগিল, আ-ইয়াদাহ, আ-ইয়াদাহ (ایداه ایداه) হায়, আমার হাত! হায়, আমার হাত। এই চীৎকারের ফলে বিক্ষিপ্ত উটগুলি একত্র হইতে লাগিল। মনিব বলিল, শাবাশ! এইভাবে ডাকিতে থাক যাহাতে সব উট একত্র হইয়া যায়। এই কথা শুনিয়া রাসূলুল্লাহ (স) হাসিলেন। তিনি বলিলেন, আমি কি জনগণকে এই সুসংবাদ শুনাইব না? হযরত বিলাল বলিলেন, নিশ্চয় শুনাইবেন, হে আল্লাহ্র রাসূল। রাসুলুল্লাহ (স) বলিলেন:
ان الله اعطاني الكنزين الفارس والروم وامدنى بالملوك ملوك حمير يجاهدون في سبيل الله وياكلون في الله.
"আল্লাহ তা'আলা আমাকে রোমান ও পারস্যের ধনভাণ্ডার দান করিয়াছেন এবং হিম্য়ারের বাদশাহের মাধ্যমে আমাকে সাহায্য করিয়াছেন। যেই ব্যক্তি আল্লাহ্ পথে জিহাদ করিবে সে গনীমতের সম্পদ প্রাপ্ত হইবে" (কিতাবুল মাগাযী, ৩খ., পৃ. ১০১১)।