📄 দরিদ্র সাহাবীদের প্রাণান্তকর প্রয়াস
মদীনার কতিপয় দরিদ্র মুসলমান তাবুক যুদ্ধে অংশগ্রহণের ইচ্ছায় রাসূলুল্লাহ (স)-এর নিকট হাজির হইলেন। কিন্তু কোন ভারবাহী পশু ও সফরের ব্যয়ভার নির্বাহ করার মত কোন অর্থ-সম্পদ তাঁহাদের ছিল না। রাসূলুল্লাহ (স) জানাইয়া দিলেন যে, তাহাদের দেওয়ার মত কোন বাহন ও সাজ-সরঞ্জাম তাঁহার নিকট এই মুহূর্তে নাই। এই কথা শুনিয়া তাঁহারা কাঁদিতে লাগিলেন। ইতিহাসে এই নিষ্ঠাবান মুসলমানদের 'ক্রন্দনকারী' (البکاؤن) বলা হয়। ক্রন্দনকারিগণ সংখ্যায় ছিলেন নয়জন। তাঁহারা কাঁদিতে কাঁদিতে নিজ নিজ বাড়ী প্রত্যাবর্তন করেন। তাঁহারা হইলেন: (১) সালিম ইবন উমায়র (রা), (২) উল্বা ইন্ন যায়দ (রা), (৩) আবু লায়লা আল-মুযানী (রা), (৪) আমর ইব্ন গানমাহ্ (রা), (৫) সালামা ইব্ন সা (রা); (৬) ইরবাদ ইবন সারিয়া (রা), (৭) আবদুল্লাহ ইব্ন মুগাফ্ফাল (রা), (৮) মা'কিল ইন ইয়াসার (রা) ও (৯) উমার ইবন হুমাম আল-জামূহ্ (আত-তাবাকাতুল কুবরা, ২খ., পৃ. ১৬৫)। উক্ত ক্রন্দনকারীদের সম্পর্কে আল্লাহ তা'আলা পবিত্র কুরআনে নাযিল করেন:
وَلَا عَلَى الَّذِينَ إِذَا مَا أَتَوكَ لِتَحْمِلَهُمْ قُلْتَ لَا أَجِدُ مَا أَحْمِلُكُمْ عَلَيْهِ تَوَلَّوْا وَأَعْيُنُهُمْ تَفِيضُ مِنَ الدَّمْعِ حَزَنًا أَلَا يَجِدُوا مَا يُنْفِقُونَ.
"উহাদেরও কোন অপরাধ নাই যাহারা তোমার নিকট বাহনের জন্য আসিলে তুমি বলিয়াছিলে, তোমাদের জন্য কোন বাহন আমি পাইতেছি না। উহারা অর্থব্যয়ে অসামর্থ্যজনিত দুঃখে অশ্রু বিগলিত নেত্রে ফিরিয়া গেল" (৯:৯২)।
ইরন হযরত আবদুল্লাহ মুগাফ্ফাল (রা) ও হযরত আবূ লায়লা (রা) যখন রাসূলুল্লাহ (স)-এর দরবার হইতে কাঁদিতে কাঁদিতে গৃহে প্রত্যাবর্তন করিতেছিলেন তখন পথিমধ্যে হযরত ইয়ামিন ইবন আমর নাদারী (রা)-র সহিত তাঁহাদের সাক্ষাত হয়। তিনি তাঁহাদের কান্নার কারণ জিজ্ঞাসা করিলে তাঁহারা বলিলেন, যুদ্ধে যাওয়ার জন্য রাসূলুল্লাহ (স)-এর নিকট কোন বাহন নাই। আর আমাদেরও যুদ্ধে যাওয়ার মত সামর্থ্য নাই। আল্লাহ্র রাসূলের সহিত যুদ্ধে যাইতে পারিতেছি না, এইজন্য আমাদের আফসোস। হযরত ইয়ামিন তাৎক্ষণিকভাবে একটি উট এবং আট সের খেজুরসহ প্রয়োজনীয় সরঞ্জাম তাঁহাদের সরবরাহ করিলেন (তাফসীর মাযহারী, ৫খ., পৃ. ৩৮৪-৫)।
হযরত আবূ বাক্স (রা), হযরত উমার (রা), হযরত উছমান (রা), হযরত আব্বাস (রা), হযরত আবদুর রহমান ইবন 'আওফ (রা), হযরত সা'দ ইবন উবাদা (রা) ও হযরত মুহাম্মাদ ইন্ন মাস্লামা (রা)-এর মত অবস্থাসম্পন্ন সাহাবায়ে কিরাম যেইভাবে স্বতস্ফূর্ত উদ্দীপনা লইয়া যুদ্ধ তহবিলে দান করিয়াছেন, তেমনি অভাবগ্রস্থ ও দরিদ্র সাহাবায়ে কিরামের দানও উপেক্ষা করার মত নয়। তাঁহাদের ত্যাগ ও কুরবানী ইতিহাসে উজ্জ্বল হইয়া থাকিবে। হযরত আবূ 'আকীল (রা) ছিলেন একজন শ্রমিক। সারা রাত কাজ করিয়া মজুরী হিসাবে তিনি প্রায় আট কেজি খেজুর পান। তিনি উহার অর্ধেক সন্তান ও পরিবারের জন্য রাখিয়া বাকী অর্ধেক তাবুকের যুদ্ধ তহবিলে দান করিবার উদ্দেশ্যে রাসূলুল্লাহ (স)-এর হাতে দেন। ইহাতে মুনাফিকগণ ঠাট্টা করিয়া বলিতে লাগিল, সামান্য খেজুর দান করিয়া শহীদের তালিকায় নাম অন্তর্ভুক্ত করিতে চায়। এক দরিদ্র আনসারী সাহাবী সাড়ে সাত কেজি শস্য দান করিলে মুনাফিকরা ঠাট্টা করিয়া বলিতে থাকে, আল্লাহ্ কী প্রয়োজন তাহার এই দানের? আসলে যাহারা বেশী দান করিয়াছেন তাহারা যেমন মুনাফিকদের বিরূপ সমালোচনা হইতে বাঁচিতে পারেন নাই, তেমনি দরিদ্র সাহাবীদের মধ্যে যাঁহারা সাধ্যানুযায়ী সামান্য দান করিয়াছেন, তাঁহারাও মুনাফিকদের ঠাট্টা বিদ্রূপের শিকার হন (তাফসীর ইব্ন কাছীর, ২খ., পৃ. ৮৫-৬; তাফসীর উছমানী, পৃ. ২৬৪)। রাসূলুল্লাহ (স) দরিদ্র সাহাবীদের প্রদত্ত খেজুর সদাকার ভাণ্ডারে ছড়াইয়া দেন। আল্লাহ তা'আলা এই সম্পর্কে পবিত্র কুরআনে বলেন:
الَّذِينَ يَلْمِزُونَ الْمُطَّوَّعِينَ مِنَ الْمُؤْمِنِينَ فِي الصَّدَقَاتِ وَالَّذِينَ لَا يَجِدُونَ إِلَّا جُهْدَهُمْ فَيَسْخَرُونَ مِنْهُمْ سَخْرَ اللَّهُ مِنْهُمْ وَلَهُمْ عَذَابٌ عَلِيمٌ.
"মু'মিনদের মধ্যে যাহারা স্বতস্ফূর্তভাবে সাদাকা দেয় এবং যাহারা নিজ শ্রম ব্যতিরেকে 'কিছুই পায় না, তাহাদের যাহারা দোষারোপ করে ও বিদ্রূপ করে আল্লাহ উহাদিগকে বিদ্রূপ করেন; উহাদের জন্য রহিয়াছে মর্মন্তুদ শাস্তি" (৯ঃ ৭৯)।
হযরত আবূ মূসা আশ'আরী (রা) সাথীদের পরামর্শক্রমে রাসূলুল্লাহ (স)-এর নিকট গিয়া যুদ্ধের বাহন সরবরাহের আবেদন জানাইলেন। রাসূলুল্লাহ (স) রাগত স্বরে বলিলেন: আল্লাহ্ কসম! আমি তোমাকে কোন বাহন দিব না, দেওয়ার মত কোন বাহন আমার নিকট নাই। হযরত আবূ মূসা আশআরী (রা) ফিরিয়া আসিয়া সাথীদেরকে ঘটনা অবহিত করিলেন। ইত্যবসরে রাসূলুল্লাহ (স)-এর নিকট গনীমতের বেশ কিছু উট আসিলে তিনি হযরত বিলাল হাবশী (রা)-র মাধ্যমে হযরত আবূ মূসা আশ'আরী (রা)-কে ডাকিয়া ছয়টি উট প্রদান করেন (সাহীহ্ আল-বুখারী, ২খ., পৃ. ১২৮-৯)। তিনি বিনয় সহকারে রাসূলুল্লাহ (স)-কে বলিলেন, আপনি আমাকে বাহন না দেওয়ার ব্যাপারে আল্লাহ্র কসম করিয়াছেন। এখন এই সব বাহন আমার জন্য অমঙ্গলকর হইতে পারে। রাসূলুল্লাহ (স) জবাবে বলেন:
مَا أَنَا حَمَلْتُكُمْ وَلَكِنَّ اللَّهَ حَمَّلَكُمْ وَانِّى وَاللَّهِ لَا أَحْلِفُ عَلَى يَمِيْنِ فَارَى غَيْرَهَا مِنْهَا إِلَّا كَفَرْتُ عَنْ يَمِينِى وَأَتَيْتُ الَّذِي هُوَ خَيْر.
"এইসব বাহন আমি দেই নাই, বরং আল্লাহ তোমাদেরকে দান করিয়াছেন। আর আল্লাহ্র শপথ! আমি কসম করার পর যদি মনে করি ইহার ব্যতিক্রম করা মঙ্গলজনক, তখন কসমের কাফ্ফারা আদায় করি এবং যাহা কল্যাণকর তাহার উপর আমল করি" (সাহীহ মুসলিম, ২খ., পৃ. ৪৮; ইবনুল কায়্যিম, যাদুল মা'আদ, ৩খ., পৃ. ৫২৮)।
হযরত উলবা ইব্ন যায়দ (রা) এক দরিদ্র সাহাবী। রাতে নামায আদায় শেষে বেশী করিয়া কান্নাকাটি করিয়া তিনি মুনাজাত করিলেন, 'হে আল্লাহ! তুমি জিহাদের হুকুম দিয়াছ, জিহাদে অংশগ্রহণে উদ্বুদ্ধ করিয়াছ। কিন্তু আমার নিকট এমন কোন সামর্থ্য নাই যাহার দ্বারা রাসূলুল্লাহ (স)-এর সহিত শরীক হইয়া শক্তি বৃদ্ধি করিতে পারি। অপরদিকে রাসূলুল্লাহ (স)-এর হস্তেও এমন কোন বাহন ও সরঞ্জাম নাই যাহা তিনি আমাকে দিতে পারেন। হে আল্লাহ! আমার কাছে সম্পদ নাই, কিন্তু যে জমিখণ্ড আছে তাহা মুসলমানদের সাদাকা করিয়া দিতেছি"। সকালবেলা রাসূলুল্লাহ (স) জিজ্ঞাসা করিলেন : তোমাদের মধ্যে রাতের বেলা কে সাদাকা করিয়াছ? কেহ কোন উত্তর দিল না। আবারও জিজ্ঞাসা করিলেন : তোমাদের মধ্যে রাতের বেলা কে সাদাকা করিয়াছে? তখন হযরত উলবা (রা) দাঁড়াইয়া সম্পূর্ণ ঘটনা অবহিত করিলেন। অতঃপর রাসূলুল্লাহ (স) বলিলেন:
ابْشِرْ فَوَالَّذِي نَفْسُ مُحَمَّد بِيَدِهِ لَقَدْ كُتِبَتْ فِي الزَّكُوةِ الْمُتَقَبَلَةِ.
"সুসংবাদ গ্রহণ কর! কসম সেই সত্তার যাঁহার হাতে মুহাম্মাদের প্রাণ! তোমার সাদাকা আল্লাহ্র দরবারে কবুল হইয়াছে" (যাদুল মা'আদ, ৩খ., পৃ. ৫২৮-৯)।
📄 হযরত আবূ যার গিফারী (রা)
রাসূলুল্লাহ (স) যখন তাবুক রওনা হন তখন যে কয়েকজন সাহাবী পিছনে থাকিয়া যান তাহাদের মধ্যে হযরত আবূ যার গিফারী (রা) অন্যতম। তাঁহার উটটি ধীরগতিসম্পন্ন হওয়ার কারণে তিনি পিছনে পড়িয়া যান। পরিশেষে তিনি মালপত্র নিজের পিঠে তুলিয়া রাসূলুল্লাহ (স)-এর পথের চিহ্ন অনুসরণ করিয়া পদব্রজে অগ্রসর হইলেন। রাসূলুল্লাহ (স) পথিমধ্যে যখন যাত্রাবিরতি করিলেন তখন এক মুসলিম সৈন্য মরুভূমিতে একজন লোক আসিতে দেখিয়া রাসূলুল্লাহ (স)-কে বলিলেন, ইয়া রাসূলাল্লাহ! একজন লোক একাকী হাঁটিয়া আসিতেছে। রাসূলুল্লাহ (স) বলিলেন: আবূ যারই হইতে পারে। অতঃপর সাহাবীগণ গভীর দৃষ্টিতে দেখিয়া বলিলেন, ইয়া রাসূলাল্লাহ! আল্লাহ্র কসম! আবূ যারই আসিতেছেন। ইহা শুনিয়া রাসূলুল্লাহ (স) মন্তব্য করেন:
رحم الله ابا ذر يمشى وحده ويموت وحده ويبعث وحده.
"আল্লাহ আবূ যারের প্রতি রহম করুন! সে একা পথ চলিবে, একা মারা যাইবে এবং কিয়ামতের দিন একাই পুনরুত্থিত হইবে"।
হযরত 'উছমান (রা)-এর খিলাফতকালে তাঁহার সহিত অর্থনৈতিক বিষয়ে মতবিরোধের কারণে তিনি তাঁহাকে আর-রাবাষা নামক স্থানে নির্বাসিত করেন। তাঁহার সহিত তাঁহার স্ত্রী ও এক গোলাম ছিলেন। সেই অবস্থায় সেইখানে তিনি ইনতিকাল করেন। হযরত আবদুল্লাহ ইব্ন মাসউদ (রা) একদল ইরাকীর সহিত 'উমরা সম্পন্ন করিয়া ফিরিবার পথে হযরত আবূ যার গিফারী (রা)-র জানাযায় শরীক হন। ইব্ন কায়্যিম (রা) বর্ণনা করেন যে, হযরত আবূ যার গিফারী (রা)-র স্ত্রী বলেন, আমার স্বামীর মৃত্যুর সময় যখন ঘনাইয়া আসিল তখন আমি কাঁদিতে লাগিলাম। তিনি বলিলেন, কাঁদিতেছ কেন? আমি বলিলাম, কেন কাঁদিব না? আপনি এই নির্জন ময়দানে মারা যাইতেছেন, অথচ আপনাকে কাফন-দাফন করাইবার মত কোন লোকজন এই ময়দানে নাই। হযরত আবূ যার বলিলেন, সুসংবাদ শোন! কাঁদিও না। একদিন রাসূলুল্লাহ (স) কতিপয় ব্যক্তিকে, যাঁহাদের মধ্যে আমিও ছিলাম, লক্ষ্য করিয়া বলিলেন:
ليموتن رجل منكم بفلاة من الارض يشهده عصابة من المسلمين.
"তোমাদের মধ্যে এক ব্যক্তি নির্জন প্রান্তরে একাকী ইনতিকাল করিবে, কিন্তু তথায় হঠাৎ একদল মুসলমান তাহার নিকট উপস্থিত হইবে"।
আমার সহিত যাহারা তথায় উপস্থিত ছিল সকলেই লোকালয়ে ইনতিকাল করিয়াছেন, কেবল আমিই অবশিষ্ট আছি। আল্লাহ্র কসম! আমি মিথ্যা বলি নাই এবং কেহ আমাকে মিথ্যুক বলে নাই। বাহিরে গিয়া দেখ, কেহ আসিতেছে কিনা? আমি বলিলাম, হাজ্জীগণ ইতোমধ্যে চলিয়া গিয়াছেন, রাস্তা ফাঁকা হইয়, গিয়াছে। তিনি বলিলেন, যাও, গিয়া দেখ। আমি বাহির হইয়া একটি টিলার উপর দাঁড়াইয়া এইদিক সেইদিক তাকাইলাম। অতঃপর ফিরিয়া আসিয়া তাঁহার শুশ্রূষা করিতে লাগিলাম। ইতোমধ্যে লক্ষ্য করিলাম একদল উষ্ট্রারোহী আসিতেছে।
আমি তাহাদেরকে হাতের ইশারায় ডাকিলাম। তাহারা সত্বর আমার নিকট আসিয়া জানিতে চাহিলেন, কি হইয়াছে, হে আল্লাহর বান্দী! আমি বলিলাম, একজন মুসলমান মারা যাইতেছেন। তাঁহার দাফনে সহায়তা করুন। তাহারা জানিতে চাহিলেন, কে সেই ব্যক্তি? আমি বলিলাম, আবূ যার। তাহারা বলিলেন, রাসূলুল্লাহ (স)-এর সাহাবী? আমি বলিলাম, হাঁ। তাহারা সবাই বিচলিত হইয়া পড়িলেন এবং তাঁহার নামের উপর তাহাদের মা-বাবাদের উৎসর্গ করিতে লাগিলেন। তাহারা দ্রুত তাঁহার শয্যাপার্শ্বে সমবেত হইলেন। হযরত আবূ যার (রা) তাহাদের উদ্দেশ্যে রাসূলুল্লাহ (স)-এর ভবিষদ্বাণীটির পুনরাবৃত্তি করিয়া বলিলেন, যদি আমার অথবা আমার স্ত্রীর নিকট প্রয়োজনীয় কাফনের কাপড় থাকিত তবে আপনাদের বলিতাম না। আমি আল্লাহ্র শপথ লইয়া বলিতেছি, যদি আপনাদের মধ্যে কেহ দূত, সেনাপতি, গোত্রপতি ও নেতা হইয়া থাকেন তবে তিনি যেন আমার কাফন না দেন। ঘটনাচক্রে কাফেলার মধ্যে একজন আনসারী ছাড়া প্রত্যেকেই কোন না কোন পদের অধিকারী। আনসারী যুবক হযরত আবূ যার (রা)-কে লক্ষ্য করিয়া বলিলেন, হে চাচা! আমার এই চাদর দিয়া আপনাকে কাফন দিতে চাই। আমার পরিধানের চাদর দুইখানা আমার মায়ের হাতের কাটা সূতা দ্বারা তৈরী। তিনি বলিলেন, আপনি আমার কাফন দিবেন। অতঃপর হযরত আবূ যার (রা) ইন্তিকাল করিলেন। আনসারী যুবক তাঁহাকে কাফন পরাইলেন, সকলে জানাযা নামাযে শরীক হইলেন এবং লাশ দাফন করিলেন (যাদুল মা'আদ, ৩খ., পৃ. ৫৩৫-৬; আত-তাবারী, তারীখ, ৩খ., পৃ. ১০৭)।
📄 মুনাফিকদের ষড়যন্ত্র
রাসূলুল্লাহ (স)-এর পক্ষ হইতে যুদ্ধে যাওয়ার নির্দেশের প্রেক্ষিতে প্রায় বিরাশি জন বেদুঈন ও মুনাফিক যুদ্ধে অংশগ্রহণে অপারগতা প্রকাশ করিল। বিভিন্ন অজুহাত দেখাইয়া তাহারা রাসূলুল্লাহ (স)-এর নিকট গিয়া যুদ্ধে অংশগ্রহণ হইতে অব্যাহতি চাহিল। কিন্তু আল্লাহ্র রাসূল তাহদিগকে অব্যাহতি দেন নাই। মুনাফিকরা পরিষ্কার বলাবলি শুরু করিল, এইরূপ প্রচণ্ড গরমে বাহির হওয়া উচিৎ হইবে না (ইব্ন খালদুন, তারীখ, ১খ., পৃ. ১৭৬)। আল্লাহ তা'আলা এইসব মুনাফিকের মুখোশ উন্মোচন করিয়া বলেন:
وَقَالُوا لَا تَنْفِرُوا فِي الْحَرِّ قُلْ نَارُ جَهَنَّمَ أَشَدُّ حَرَّاً لَوْ كَانُوا يَفْقَهُونَ. فَلْيَضْحَكُوا قَلِيلًا وَلِيَبْكُوا كَثِيرًا جَزَاءً بِمَا كَانُوا يَكْسِبُونَ.
"এবং তাহারা বলিল, 'গরমের মধ্যে অভিযানে বাহির হইও না'। বল, 'উত্তাপে জাহান্নামের আগুন প্রচণ্ডতম, যদি তাহারা বুঝিত'! অতএব তাহারা কিঞ্চিত হাসিয়া লউক, তাহারা প্রচুর কাঁদিবে তাহাদের কৃতকর্মের ফলস্বরূপ" (৯ : ৮১-৮২)।
জাদ্দ ইন্ন কায়েস নামক এক নির্লজ্জ মুনাফিক রাসূলুল্লাহ (স)-এর নিকট আসিয়া বলিল, হে আল্লাহ্র রাসূল! আমাকে যুদ্ধ হইতে অব্যাহতি দান করুন। আমাকে বিপদে ফেলিবেন না। কারণ আমার গোত্রের লোকেরা জানে, নারীর প্রতি আমার প্রচণ্ড দুর্বলতা রহিয়াছে। আমি জানি, গৌরবর্ণের রোমান মহিলারা (বনু আস্ফার) অতীব সুন্দরী। আমার ভয় হইতেছে, এইসব সুন্দরী মহিলা দেখিলে আমি নিজেকে নিয়ন্ত্রণে রাখিতে পারিব না। আমি স্বয়ং অভিযানে অংশ না লইলেও আর্থিক সাহায্য করিব (আল-কামিল, ২খ., পৃ. ২৯৯; তাফসীরে উছমানী, পৃ. ২৫৮)। রাসূলুল্লাহ (স) এই কথা শুনিয়া তাহার দিক হইতে মুখ ফিরাইয়া লইলেন। এই প্রসঙ্গে পবিত্র কুরআনের নিম্নোক্ত আয়াত নাযিল হয়:
وَمِنْهُمْ مِّنْ يَّقُوْلُ ائْذَنْ لَّى وَلَا تَفْتِنِّىْ أَلَا فِى الْفِتْنَةِ سَقَطُوْا وَإِنَّ جَهَنَّمَ لَمُحِيْطَةٌ بِالْكَافِرِيْنَ.
"এবং উহাদের মধ্যে এমন লোক আছে যে বলে, আমাকে অব্যাহতি দাও এবং আমাকে ফিতনায় ফেলিও না। সাবধান! উহারাই ফিতনাতে পড়িয়া আছে। জাহান্নাম তো কাফিরদিগকে বেষ্টন করিয়াই আছে" (৯:৪৯)।
قُلْ أَنْفِقُوْا طَوْعًا أَوْ كَرْهًا لَّنْ يُتَقَبَّلَ مِنْكُمْ إِنَّكُمْ كُنْتُمْ قَوْمًا فَاسِقِيْنَ.
"বল, তোমরা ইচ্ছাকৃত ব্যয় কর অথবা অনিচ্ছাকৃত, তোমাদের নিকট হইতে তাহা কিছুতেই গৃহীত হইবে না; তোমরা তো সত্যত্যাগী সম্প্রদায়" (৯:৫৩)।
মুনাফিক নেতা আবদুল্লাহ ইবন উবাইর ষড়যন্ত্র সর্বজন বিদিত। সকল জিহাদে তাহার রহস্যময় বৈরী আচরণ সাহাবাদের নজর এড়ায় নাই। তাবুক অভিযানে মুনাফিক ও ইয়াহুদীদের সমন্বয়ে গঠিত পৃথক এক বিরাট বাহিনী লইয়া সে ছানিয়াতুল বিদা ঘাটির পার্শ্বে যুবার নামক পার্বত্য এলাকায় পৃথক শিবির স্থাপন করে। রাসূলুল্লাহ (স) ও সাহাবায়ে কিরাম যখন ছানিয়াতুল বিদা হইতে তাবুক অভিমুখে যাত্রা করিলেন তখন আবদুল্লাহ ইবন উবাই তাহার বাহিনী লইয়া মদীনা প্রত্যাবর্তন করে। ফিরিবার পথে সে মন্তব্য করিল, এই প্রচণ্ড রৌদ্রতাপে দূরবর্তী এলাকায় স্বল্প সরঞ্জাম লইয়া আরবরা রোমানদের মুকাবিলা করিয়া বিজয়ী হইতে পারিবে না। আল্লাহ্র শপথ! আমার তো মনে হইতেছে আগামী কাল যুদ্ধের ময়দানে মুহাম্মাদের অনুসারীরা রশিতে বাঁধা পড়িবে (তাফসীরে মাযহারী, ৫খ., পৃ. ২৯৭)। আবদুল্লাহ ইবন উবাই মুসলমানদের মধ্যে বিশৃঙ্খলা সৃষ্টির উদ্দেশ্যে এইসব মন্তব্য করিয়াছিল। আল্লাহ তা'আলা এই সম্পর্কে বলেন:
لَوْ خَرَجُوْا فِيكُمْ مَّا زَادُوْكُمْ إِلَّا خَبَالًا وَلَا أَوْضَعُوْا خِلْلَكُمْ يَبْغُونَكُمُ الْفِتْنَةَ وَفِيكُمْ سَمَّعُوْنَ لَهُمْ وَاللَّهُ عَلِيْمٌ بِالظَّلِمِينَ. لَقَدِ ابْتَغُوا الْفِتْنَةَ مِنْ قَبْلُ وَقَلَّبُوْا لَكَ الْأُمُوْرَ حَتَّى جَاءَ الْحَقُّ وَظَهَرَ أَمْرُ اللَّهِ وَهُمْ كَرِهُونَ.
"উহারা তোমাদের সহিত বাহির হইলে তোমাদের বিভ্রান্তিই বৃদ্ধি করিত এবং তোমাদের মধ্যে ফিত্না সৃষ্টির উদ্দেশ্যে তোমাদের মধ্যে ছুটাছুটি করিত। তোমাদের মধ্যে উহাদের জন্য কথা শুনিবার লোক আছে। আল্লাহ যালিমদের সম্বন্ধে সবিশেষ অবহিত। পূর্বেও উহারা ফিত্না সৃষ্টি করিতে চাহিয়াছিল এবং উহারা তোমার বহু কর্মে উলট-পালট করিয়াছিল যতক্ষণ না উহাদের ইচ্ছার বিরুদ্ধে সত্য আসিল এবং আল্লাহ্ আদেশ বিজয়ী হইল" (৯:৪৭-৪৮)।
অপরদিকে কতিপয় মুনাফিক তাবুক অভিযানে রাসূলুল্লাহ (স)-এর সফরসঙ্গী হইয়াছিল, কিন্তু তাহাদের অন্তর পরিচ্ছন্ন ছিল না। নানা অজুহাত ও অভিযোগ তুলিয়া তাহারা ঈমানদারদের বিভ্রান্ত করার প্রয়াস চালাইত। উহাদের মধ্যে ওদইয়া ইব্ন ছাবিত, জুলাস্ ইব্ন সুয়ায়দ, মাশী ইবন হুমায়্যির অন্যতম। এইসব মুনাফিক মুসলমানদের নিরুৎসাহিত করিবার উদ্দেশ্যে বলিতে লাগিল, কালই তোমরা রোমানদের হাতে বন্দী হইবে। মুনাফিক জুলাস ছিল অতি গরীব। তাহার বেশ কিছু অর্থ জনৈক ব্যক্তির নিকট আটকা পড়িয়াছিল। রাসূলুল্লাহ (স)-এর প্রচেষ্টায় সে তাহার অর্থ ফেরৎ পাইয়া ধনী হইয়া যায়। ইহাতে আল্লাহর রাসূলের উপকার করা তো দূরের কথা, বরং সে সারা জীবন এই মহামানবের বিরোধিতাই করিয়া গেল।
সে মন্তব্য করিল, যদি মুহাম্মাদ সত্য হয়, তাহা হইলে আমরা গাধার চাইতেও অধম হইয়া যাইব। এই মন্তব্য শুনিয়া তাহার সৎছেলে জবাব দিল, তুমি এমনিতেই গাধার চাইতে অধম। আর আল্লাহ্র রাসূল (স) প্রকৃত সত্যবাদী। হযরত উমায়র (রা) তাহাকে বলিলেন, হে জুলাস! তুমি আমার নিকট অত্যন্ত সম্মানিত ও প্রিয় ব্যক্তি। কিন্তু তুমি যেই মন্তব্য করিয়াছ তাহা যদি মানুষের কাছে প্রকাশ করিয়া দেই, তাহা হইলে তুমি বেইজ্জত হইবে। আর তোমার মন্তব্যে যদি আমি নিশ্চুপ থাকি, তবে আমি ধ্বংস হইয়া যাইব। ইতোমধ্যে রাসূলুল্লাহ (স)-এর নিকট এই বিতর্কের খবর পৌছিলে জুলাস্ তাহার দরবারে হাজির হইল এবং কসম করিয়া বলিল, 'আমি আপনার সম্পর্কে আপত্তিকর কোন মন্তব্য করি নাই। উমায়র মিথ্যা বলিতেছে'। আল্লাহ তা'আলা কুরআনুল কারীমের মাধ্যমে আসল ঘটনা অবহিত করেন:
يَحْلِفُونَ بِاللَّهِ مَا قَالُوا وَلَقَدْ قَالُوا كَلِمَةَ الْكُفْرِ وَكَفَرُوا بَعْدَ إِسْلَامِهِمْ وَهَمُّوا بِمَا لَمْ يَنَالُوا وَمَا نَقَمُوا إِلَّا أَنْ أَعْنُهُمُ اللَّهُ وَرَسُولَهُ مِنْ فَضْلِهِ فَإِنْ يَتُوبُوا يَكُ خَيْرًا لَّهُمْ وَإِنْ يَتَوَلَّوا يُعَذِّبْهُمُ اللَّهُ عَذَابًا عَلِيمًا فِي الدُّنْيَا وَالْآخِرَةِ وَمَا لَهُمْ فِي الْأَرْضِ مِنْ وَلِيٍّ وَلَا نَصِيرٍ:
"উহারা আল্লাহ্র শপথ করে যে, উহারা কিছু বলে নাই; কিন্তু উহারা তো কুফরীর কথা বলিয়াছে এবং ইসলাম গ্রহণের পর উহারা কাফির হইয়াছে। উহারা যাহা সংকল্প করিয়াছিল তাহা পায় নাই। আল্লাহ ও তাঁহার রাসূল নিজ কৃপায় উহাদিগকে অভাবমুক্ত করিয়াছিলেন বলিয়াই উহারা বিরোধিতা করিয়াছিল। উহারা তওবা করিলে উহাদের জন্য ভাল হইবে, কিন্তু উহারা মুখ ফিরাইয়া লইলে আল্লাহ্ দুনিয়ায় ও আখিরাতে উহাদিগকে মর্মন্তুদ শান্তি দিবেন। পৃথিবীতে উহাদের কোন অভিভাবক নাই এবং কোন সাহায্যকারী নাই" (৯ঃ ৭৪)।
মুনাফিক উদ্য়্যা ইব্ন ছাবিত ঈমানদারগণের মধ্যে ত্রাস সৃষ্টির উদ্দেশ্যে বলিল, আমাদের সঙ্গীরা মিথ্যাবাদী, পেট মোটা ও যুদ্ধের সময় কাপুরুষ। রাসূলুল্লাহ (স) আম্মার ইবন ইয়াসির (রা)-কে হুকুম দিলেন, ঐসব ব্যক্তির নিকট গিয়া দেখ তাহারা হিংসার বশবর্তী হইয়া কি মন্তব্য করিতেছে? যদি তাহারা অস্বীকার করে তবে বলিয়া দাও, তোমরা এই এই মন্তব্য করিয়াছ। হযরত আম্মার তাহাদের সহিত আলাপ করিলেন। উদয়্যা আগাইয়া আসিয়া রাসূলুল্লাহ (স)-এর উষ্ট্রীর হাওদার রশি ধরিয়া মন্তব্য করিল, হযরত! আমরা তো কৌতুক করিতেছিলাম। আল্লাহ তা'আলা ইহার রহস্য উদঘাটন করিয়া বলিলেন:
وَلَئِنْ سَأَلْتَهُمْ لَيَقُولُنَّ إِنَّمَا كُنَّا نَخُوضُ وَنَلْعَبُ ط قُلْ أَبِاللَّهِ وَأَيْتِهِ وَرَسُولِهِ كُنْتُمْ تَسْتَهْزِئُونَ. لَا تَعْتَذِرُوا قَدْ كَفَرْتُمْ بَعْدَ إِيْمَانِكُمْ ط إِنْ نَعْفُ عَنْ طَائِفَةٍ مِّنْكُمْ نُعَذِّبُ طَائِفَةً بِأَنَّهُمْ كَانُوا مُجْرِمِينَ.
"এবং তুমি উহাদিগকে প্রশ্ন করিলে উহারা নিশ্চয় বলিবে, 'আমরা তো আলাপ-আলোচনা ও ক্রীড়া-কৌতুক করিতেছিলাম'। বল, তোমরা কি আল্লাহ, তাঁহার নিদর্শন ও তাঁহার রাসূলকে বিদ্রূপ করিতেছিলে? তোমরা দোষ স্থালনের চেষ্টা করিও না। তোমরা তো ঈমান আনার পর কুফরী করিয়াছ। আমি তোমাদের মধ্যে কোন দলকে ক্ষমা করিলেও অন্যদিকে শাস্তি দিব; কারণ তাহারা অপরাধী" (৯: ৬৫-৬৬)।
তখন মাখশী ইব্ন হুমায়্যির বলিলেন, ইয়া রাসূলুল্লাহ! আপনি আমার এবং আমার পিতার নাম পাল্টাইয়া দিন। উপরিউক্ত আয়াতে যাহাকে ক্ষমা করার কথা বলা হইয়াছে তিনি হইলেন মাখশী ইন, হুমায়্যির। রাসূলুল্লাহ (স) তাহার নাম রাখেন আবদুর রহমান। তিনি আল্লাহ তা'আলার নিকট দু'আ করেন যাহাতে মাখশী এমন স্থানে শাহাদত বরণ করেন যাহা কেহ জানিতে না পারে। পরবর্তীতে তিনি ইয়ামামার যুদ্ধে শহীদ হন। তাহার কোন চিহ্ন খুঁজিয়া পাওয়া যায় নাই (তাফসীর ইব্ন কাছীর, ২খ., পৃ. ৭৪; ইন্ন হিশাম, ২খ., ৫২৫)।
📄 আবূ খায়ছামা ও উমায়রের যুদ্ধযাত্রা
রাসূলুল্লাহ (স) তাবুকের উদ্দেশ্যে বাহির হওয়ার পর হযরত আবূ হায়ছামা (রা) প্রচণ্ড খরতাপের কারণে কয়েক দিনের জন্য পরিবারবর্গের নিকট ফিরিয়া আসেন। ঘরে প্রত্যাবর্তন করিয়া দেখিলেন তাঁহার দুই স্ত্রী নিজ নিজ কক্ষের মেঝেতে ঠাণ্ডা পানি ছিটাইয়া, শীতল পানীয় ও সুস্বাদু আহার্য প্রস্তুত করিয়া রাখিয়াছেন। তিনি গৃহদ্বারের সম্মুখে দাঁড়াইয়া দুই পত্নীর দিকে তাকাইলেন এবং তাহার জন্য প্রস্তুত ব্যবস্থাপনা লক্ষ্য করিয়া বলিলেন, রাসূলুল্লাহ (স) রৌদ্র, লু *হাওয়া ও প্রচণ্ড খরতাপে দগ্ধ, আর আবূ খায়ছামা শীতল ছায়া, তৈরী খাবার, সুন্দরী স্ত্রী ও সম্পদের প্রাচুর্যের মাঝে অবস্থানরত। ইহা কোন্ ধরনের ইনসাফ? আল্লাহর কসম! আমি তোমাদের কাহারও কক্ষে প্রবেশ করিব না যতক্ষণ না রাসূলুল্লাহ (স)-এর সহিত মিলিত হই। আমার জন্য পাথেয় সংগ্রহ করিয়া দাও। পত্নীদ্বয় তাঁহার জন্য বাহন ও সাজ-সরঞ্জাম তৈয়ার করিয়া দিলে তিনি তাবুক অভিমুখে রওনা হইয়া গেলেন। কিন্তু ইতোমধ্যে রাসূলুল্লাহ (স) তাবুকে পৌঁছিয়া গিয়াছেন, সেইখানে তিনি রাসূলুল্লাহ (স)-এর সহিত মিলিত হইলেন: এইদিকে পথিমধ্যে উমায়র ইব্ন ওয়াহ্ আল-জুমাহী (রা)-এর সহিত তাঁহার সাক্ষাত ঘটে। তিনিও রাসূলুল্লাহ (স)-এর খোঁজে বাহির হইয়াছিলেন। তাঁহারা পরস্পরের সঙ্গী হইয়া তাবূকে পৌছিলেন। আবূ খায়ছামা (রা) উমায়র (রা)-কে বলিলেন, আমার তো অপরাধ হইয়া গিয়াছে। যতক্ষণ না রাসূলুল্লাহ (স)-এর সহিত আমার সাক্ষাত হয় ততক্ষণ তুমি আমাকে ছাড়িয়া যাইও না। উমায়র তাই করিলেন। তিনি তাবুকে অবস্থানরত রাসূলুল্লাহ (স)-এর কাছাকাছি যখন পৌছিলেন তখন লোকেরা বলিল, রাস্তায় এক আগন্তুককে দেখা যাইতেছে। রাসূলুল্লাহ (স) বলিলেন: লোকটা আবূ খায়ছামা হইতে পারে। লোকটি কাছে আসিতেই তাঁহারা বলিল: ইয়া রাসূলাল্লাহ! আল্লাহর কসম! এ তো আবূ খায়ছামাই। আবু খায়ছামা (রা) উট বসাইয়া রাসূলুল্লাহ (স)-এর সামনে উপস্থিত হইলেন এবং সালাম পেশ করিলেন। তখন রাসূলুল্লাহ (স) তাহাকে বলিলেন:
اولى لك يا ابا خيثمة. “হে আবূ খায়ছামা! দুর্ভোগ তোমার জন্য"।
হযরত আবূ খায়ছামা (রা) পুরা ঘটনা রাসূলুল্লাহ (স)-কে অবহিত করিলে তিনি তাহার সম্পর্কে ভাল মন্তব্য করেন এবং কল্যাণের জন্য দু'আ করেন। আবূ খায়ছামা (রা) এই সম্পর্কে একটি কবিতা রচনা করিয়াছেন যাহা তাঁহার ঈমানী দৃঢ়তা ও রাসূলুল্লাহ (স)-এর প্রতি অকৃত্রিম ভালবাসার সম্যক পরিচয় বহন করে:
لما رايت الناس فى الدين نافقوا + اتيت التي كانت اعف واكوما وبايعت باليمنى يدى لمحمد + فلم اكتسب اثما ولم اغش محرما ترکت خضيبا في العريش وصرمة + صفايا كراما بسرها قد تحمما وكنت اذا شك المنافق اسمحت + الى الدين نفسي شطره حيث يمما .
"আমি যখন মানুষকে দীনের ব্যাপারে কপটতা অবলম্বন করিতে দেখিলাম, তখন অবলম্বন করিলাম এমন নীতি যাহা অধিকতর সৌজন্যমূলক ও আবিলতামুক্ত।
আমি আমার ডান হাত দ্বারা বায়'আত গ্রহণ করিলাম মুহাম্মাদের নিকট। আমি করি নাই কোন অপরাধ, করি নাই কোন নিষিদ্ধ বস্তু আত্মসাৎ।
আমি সুন্দরী স্ত্রীকে রাখিয়া আসিয়াছি ছায়া নীড়ে; রাখিয়া আসিয়াছি উৎকৃষ্ট ফলন্ত খর্জুর বৃক্ষ যাহার ফল পাকিয়া কাল বর্ণ ধারণ করিয়াছিল।
মুনাফিক যখন সন্দেহ পোষণ করে তখন আমার হৃদয় দীনের প্রতি ঝুঁকিয়া পড়ে; দীন যেদিক চলে আমার হৃদয়ও সেই অভিমুখী" (ইব্ন হিশাম, ২খ., পৃ. ৫২০-১)।