📘 সীরাত বিশ্বকোষ > 📄 মহিলাদের নজীরবিহীন কুরবানী

📄 মহিলাদের নজীরবিহীন কুরবানী


ইসলামের অগ্রযাত্রা ও উন্নয়নে এবং আগ্রাসী শক্তির মুকাবিলায় পুরুষদের পাশাপাশি মুসলিম মহিলারাও জান ও মাল কুরবানী দেওয়ার যেই দৃষ্টান্ত স্থাপন করিয়াছেন তাহা ইতিহাসের পাতায় স্বর্ণাক্ষরে লিপিবদ্ধ থাকিবে। হযরত সিনান আসলামিয়া (রা) বলেন, তাবুকের যুদ্ধ প্রস্তুতির সময় আমি উম্মুল মুমিনীন হযরত আয়েশা (রা)-র ঘরে গেলে দেখিতে পাইলাম যে, ‘রাসূলুল্লাহ (স)-এর সম্মুখে-বিছানো একটি চাদরে মেয়েদের হাতের চুড়ি, ব্রেসলেট, পায়ের নুপুর, কানের দুল, আংটি এবং অন্যান্য মূল্যবান গহনা ও স্বর্ণালংকার ছড়াইয়া রহিয়াছে। এইসব গহনা মহিলাগণ ইসলামী বাহিনীর সহায়তার জন্য সাদাকা করিয়াছেন। এই সব অলংকার দিয়া রাসূলুল্লাহ (স) সেনাসদস্যদের যুদ্ধের ব্যয়ভার বহন করেন। যেহেতু অধিকাংশ সৈন্যকে পদব্রজে তাঁবুকে পৌঁছাইতে হইবে, তাই বেশী করিয়া জুতা সাথে নেওয়ার জন্য রাসূলুল্লাহ (স) সবাইকে নির্দেশ দেন (আর-রাহীকুল মাখতুম, পৃ. ৪৩৩)।

📘 সীরাত বিশ্বকোষ > 📄 মসজিদ দিরার-এ অগ্নিসংযোগ

📄 মসজিদ দিরার-এ অগ্নিসংযোগ


তাবুক হইতে প্রত্যাবর্তনের পথে রাসূলুল্লাহ (স)-এর নির্দেশে মুনাফিকদের নির্মিত একটি ষড়যন্ত্র কেন্দ্র, যাহা মসজিদ দিরার নামে পরিচিত, অগ্নিসংযোগ করিয়া ভস্মিভূত করা হয়। এই কেন্দ্রটি নির্মিত হয় মদীনার আবূ 'আমের রাহেব নামক এক ব্যক্তি দ্বারা। তাহার সহযোগী ছিল আরও বারজন। আবূ আমের ছিল বিখ্যাত সাহাবী হযরত হানযালা (রা)-এর পিতা। রাসূলুল্লাহ (স) আবূ আমেরকে ইসলামের দাওয়াত দিলে সে ঈমান আনিতে অস্বীকৃতি জানায়। খৃষ্ট ধর্মে বিশ্বাসী এই ভয়ংকর ব্যক্তি পরবর্তীতে উহুদের যুদ্ধে মুসলমানদের মোকাবিলায় অংশ নেয়। যখন সে বুঝিতে পারিল যে, আরব উপদ্বীপে ইসলাম বিজয়ী শক্তিরূপে প্রতিষ্ঠিত হইয়াছে তখন সিরিয়ায় গিয়া রোমান সম্রাটকে মদীনা আক্রমণে প্ররোচিত করিতে থাকে। এই অশুভ উদ্দেশ্যে সে মদীনার অদূরে একটি মসজিদ নির্মাণ করে, প্রকৃতপক্ষে যাহা ছিল একটি গোয়েন্দা কেন্দ্র যাহাতে মদীনার সব মুনাফিক একত্র হইত।
আবূ আমের তাহার সহযোগীদের বলিল, তোমরা প্রয়োজনীয় অস্ত্রশস্ত্র সংগ্রহ করিয়া রাখ। আমি রোমান সম্রাটের নিকট যাইতেছি। তাহার নিকট হইতে বেশ কিছু সৈন্য লইয়া মদীনায় ফিরিয়া আসিব এবং মুকাবিলা করিয়া মুহাম্মাদ ও তাঁহার সৈন্যদের মদীনা হইতে বহিষ্কার করিয়া দিব (তাফসীর মাযহারী, ৫খ., পৃ. ৪০৮)। রাসূলুল্লাহ (স) যখন তাবুক যাত্রার প্রস্তুতি লইতেছিলেন তখন মসজিদ দিরারের উদ্যোক্তারা তাঁহার নিকট আসিয়া আরয করিল, ইয়া রাসূলুল্লাহ। আমরা অসুস্থ, অভাবগ্রস্থ। যাহারা বর্ষা ও শীতের রাত্রিতে কুবায় গিয়া সালাত আদায় করিতে পারে না আমরা তাহাদের জন্য নূতন একটি মসজিদ নির্মাণ করিয়াছি। আমাদের ইচ্ছা আপনি নামায পড়িয়া মসজিদটি উদ্বোধন করিলে ইহাতে বরকত নাযিল হইবে। রাসূলুল্লাহ (স) বলিলেন:
انى على جناح سفر وحال شغل ولو قدمنا انشاء الله لاتيناكم فصلينا لكم فيه. "আমি এখন একটি সফরের প্রস্তুতি নিতেছি এবং অত্যন্ত ব্যস্ত। অভিযানশেষে যদি আমি ফিরিয়া আসি তাহা হইলে ইনশাআল্লাহ সেইখানে যাইব এবং সেই মসজিদে তোমাদের লইয়া সালাত আদায় করিব"।
রাসূলুল্লাহ (স) তাবূক হইতে মদীনায় প্রত্যাবর্তনের পথে যখন যু-আওয়ান নামক স্থানে পৌছিলেন তখন ওহী মারফত আল্লাহ তা'আলা তাঁহাকে উক্ত মসজিদ নির্মাণের উদ্দেশ্য ও নির্মাতাদের চক্রান্ত সম্পর্কে অবহিত করিলেন। তিনি তৎক্ষণাত মালিক ইব্‌ন দুখশুম (রা) ও মা'ন ইব্‌ন আদী (রা)-কে হুকুম দিলেন: যাও জালিমদের ঐ মসজিদ জ্বালাইয়া দাও। অতএব অতি সত্বর তাহারা অগ্নিসংযোগে মসজিদটি জ্বালাইয়া দিলেন। মসজিদের অভ্যন্তরে যাহারা ছিল তাহারা পালাইয়া গেল (ইবন হিশাম, আস-সীরাতুন নাবাবিয়্যা, ২খ., পৃ. ৫২৯-৩০; যাদুল মা'আদ, ৩খ., পৃ. ৫৪৯)। এই মসজিদের ব্যাপারে আল্লাহ তা'আলা নিম্নলিখিত আয়াত নাযিল করেন:
وَالَّذِينَ اتَّخَذُوا مَسْجِداً ضراراً وكُفْراً وتَفْرِيقًا بَيْنَ المُؤْمِنِينَ وَارْصَادًا لِّمَنْ حَارَبَ اللَّهَ وَرَسُولَهُ مِنْ قَبْلُ طَ وَلَيَحْلِفُنَّ إِنْ أَرَدْنَا إِلا الْحُسْنَى ط وَاللهُ يَشْهَدُ أَنَّهُمْ لَكَذِبُونَ. لَا تَقُمْ فِيهِ أَبَدًا ، لَمَسْجِدٌ أَسِّسَ عَلَى التَّقْوَى مِنْ أَوَّلِ يَوْمٍ أَحَقُّ أَنْ تَقُومَ فِيهِ وَ فِيْهِ رِجَالٌ يُحِبُّونَ أنْ يَتَطَهَّرُوا طَ وَاللَّهُ يُحِبُّ الْمُطَهِّرِينَ.
"এবং যাহারা মসজিদ নির্মাণ করিয়াছে ক্ষতিসাধন, কুফরী ও মুমিনদের মধ্যে বিভেদ সৃষ্টির উদ্দেশ্যে এবং ইতোপূর্বে আল্লাহ ও তাঁহার রাসূলের বিরুদ্ধে সে ব্যক্তি যুদ্ধ করিয়াছে তাহার গোপন ঘাঁটিস্বরূপ ব্যবহারের উদ্দেশ্যে, তাহারা অবশ্যই শপথ করিবে, 'আমরা সদুদ্দেশ্যেই উহা করিয়াছি'। আল্লাহ সাক্ষী, তাহারা তো মিথ্যাবাদী। তুমি ইহাতে কখনও দাঁড়াইও না। যে মসজিদের ভিত্তি প্রথম দিন হইতেই স্থাপিত হইয়াছে তাওয়ার উপর, উহাই তোমার সালাতের জন্য অধিক যোগ্য। তথায় এমন লোক আছে যাহারা পবিত্রতা অর্জন ভালবাসে এবং পবিত্রতা অর্জনকারীদের আল্লাহ পসন্দ করেন" (৯: ১০৭-৮)।
রাসূলুল্লাহ (স) বিধ্বস্ত মসজিদে দিরারের খালি জায়গায় হযরত 'আসেম ইব্‌ন আদীকে গৃহ নির্মাণের অনুমতি দিলে তিনি বলিলেন, ইয়া রাসূলাল্লাহ! এই মসজিদের ব্যাপারে আল্লাহ হুকুম নাযিল করিয়াছেন। অভিশপ্ত স্থানে গৃহ নির্মাণ করা আমার পসন্দ নয়। অপরদিকে ছাবিত ইব্‌ আকরামের কোন ভিটা-বাড়ি না থাকায় তিনি রাসূলুল্লাহ (স)-এর নির্দেশে সেই জায়গায় ঘর তৈয়ার করেন। যত দিন হযরত ছাবিত এই ঘরে ছিলেন তাঁহার কোন সন্তান হয় নাই অথবা জীবিত থাকে নাই। এমনকি মুরগী ও কবুতরের ডিম হইতে বাচ্চা ফুটে নাই। বর্তমানে ঐ জায়গা কুবার মসজিদের অনতিদূরে পরিত্যক্ত অবস্থায় পড়িয়া রহিয়াছে (মুফতী মুহাম্মদ শফী, মা'আরিফুল কুরআন, ৫খ., পৃ. ৪১১)।
রাসূলুল্লাহ (স) যখন মদীনার উপকণ্ঠে উপনীত হইলেন তখন মদীনার শিশু-কিশোর নারী-পুরষ নির্বিশেষে দলে দলে বাহির হইয়া তাঁহাকে সংবর্ধনা জানাইল ও প্রশংসাসূচক কবিতা আবৃত্তি করিল:
"ছানিয়াতুল বিদা হইতে আমাদের উপর পূর্ণিমার চাঁদ উদিত হইয়াছে; যতক্ষণ পর্যন্ত আহ্বানকারী আল্লাহর দিকে ডাকিতে থাকিবে; আল্লাহ্র শোকরিয়া আদায় করা ততক্ষণ পর্যন্ত আমাদের উপর ওয়াজিব। আমাদের প্রতি প্রেরিত হে রাসূল! আপনি এমন বিষয় লইয়া আসিয়াছেন যাহার আনুগত্য করা জরুরী"।

📘 সীরাত বিশ্বকোষ > 📄 দরিদ্র সাহাবীদের প্রাণান্তকর প্রয়াস

📄 দরিদ্র সাহাবীদের প্রাণান্তকর প্রয়াস


মদীনার কতিপয় দরিদ্র মুসলমান তাবুক যুদ্ধে অংশগ্রহণের ইচ্ছায় রাসূলুল্লাহ (স)-এর নিকট হাজির হইলেন। কিন্তু কোন ভারবাহী পশু ও সফরের ব্যয়ভার নির্বাহ করার মত কোন অর্থ-সম্পদ তাঁহাদের ছিল না। রাসূলুল্লাহ (স) জানাইয়া দিলেন যে, তাহাদের দেওয়ার মত কোন বাহন ও সাজ-সরঞ্জাম তাঁহার নিকট এই মুহূর্তে নাই। এই কথা শুনিয়া তাঁহারা কাঁদিতে লাগিলেন। ইতিহাসে এই নিষ্ঠাবান মুসলমানদের 'ক্রন্দনকারী' (‎البکاؤن‎) বলা হয়। ক্রন্দনকারিগণ সংখ্যায় ছিলেন নয়জন। তাঁহারা কাঁদিতে কাঁদিতে নিজ নিজ বাড়ী প্রত্যাবর্তন করেন। তাঁহারা হইলেন: (১) সালিম ইবন উমায়র (রা), (২) উল্বা ইন্ন যায়দ (রা), (৩) আবু লায়লা আল-মুযানী (রা), (৪) আমর ইব্‌ন গানমাহ্ (রা), (৫) সালামা ইব্‌ন সা (রা); (৬) ইরবাদ ইবন সারিয়া (রা), (৭) আবদুল্লাহ ইব্‌ন মুগাফ্ফাল (রা), (৮) মা'কিল ইন ইয়াসার (রা) ও (৯) উমার ইবন হুমাম আল-জামূহ্ (আত-তাবাকাতুল কুবরা, ২খ., পৃ. ১৬৫)। উক্ত ক্রন্দনকারীদের সম্পর্কে আল্লাহ তা'আলা পবিত্র কুরআনে নাযিল করেন:
وَلَا عَلَى الَّذِينَ إِذَا مَا أَتَوكَ لِتَحْمِلَهُمْ قُلْتَ لَا أَجِدُ مَا أَحْمِلُكُمْ عَلَيْهِ تَوَلَّوْا وَأَعْيُنُهُمْ تَفِيضُ مِنَ الدَّمْعِ حَزَنًا أَلَا يَجِدُوا مَا يُنْفِقُونَ.
"উহাদেরও কোন অপরাধ নাই যাহারা তোমার নিকট বাহনের জন্য আসিলে তুমি বলিয়াছিলে, তোমাদের জন্য কোন বাহন আমি পাইতেছি না। উহারা অর্থব্যয়ে অসামর্থ্যজনিত দুঃখে অশ্রু বিগলিত নেত্রে ফিরিয়া গেল" (৯:৯২)।
ইরন হযরত আবদুল্লাহ মুগাফ্ফাল (রা) ও হযরত আবূ লায়লা (রা) যখন রাসূলুল্লাহ (স)-এর দরবার হইতে কাঁদিতে কাঁদিতে গৃহে প্রত্যাবর্তন করিতেছিলেন তখন পথিমধ্যে হযরত ইয়ামিন ইবন আমর নাদারী (রা)-র সহিত তাঁহাদের সাক্ষাত হয়। তিনি তাঁহাদের কান্নার কারণ জিজ্ঞাসা করিলে তাঁহারা বলিলেন, যুদ্ধে যাওয়ার জন্য রাসূলুল্লাহ (স)-এর নিকট কোন বাহন নাই। আর আমাদেরও যুদ্ধে যাওয়ার মত সামর্থ্য নাই। আল্লাহ্র রাসূলের সহিত যুদ্ধে যাইতে পারিতেছি না, এইজন্য আমাদের আফসোস। হযরত ইয়ামিন তাৎক্ষণিকভাবে একটি উট এবং আট সের খেজুরসহ প্রয়োজনীয় সরঞ্জাম তাঁহাদের সরবরাহ করিলেন (তাফসীর মাযহারী, ৫খ., পৃ. ৩৮৪-৫)।
হযরত আবূ বাক্স (রা), হযরত উমার (রা), হযরত উছমান (রা), হযরত আব্বাস (রা), হযরত আবদুর রহমান ইবন 'আওফ (রা), হযরত সা'দ ইবন উবাদা (রা) ও হযরত মুহাম্মাদ ইন্ন মাস্লামা (রা)-এর মত অবস্থাসম্পন্ন সাহাবায়ে কিরাম যেইভাবে স্বতস্ফূর্ত উদ্দীপনা লইয়া যুদ্ধ তহবিলে দান করিয়াছেন, তেমনি অভাবগ্রস্থ ও দরিদ্র সাহাবায়ে কিরামের দানও উপেক্ষা করার মত নয়। তাঁহাদের ত্যাগ ও কুরবানী ইতিহাসে উজ্জ্বল হইয়া থাকিবে। হযরত আবূ 'আকীল (রা) ছিলেন একজন শ্রমিক। সারা রাত কাজ করিয়া মজুরী হিসাবে তিনি প্রায় আট কেজি খেজুর পান। তিনি উহার অর্ধেক সন্তান ও পরিবারের জন্য রাখিয়া বাকী অর্ধেক তাবুকের যুদ্ধ তহবিলে দান করিবার উদ্দেশ্যে রাসূলুল্লাহ (স)-এর হাতে দেন। ইহাতে মুনাফিকগণ ঠাট্টা করিয়া বলিতে লাগিল, সামান্য খেজুর দান করিয়া শহীদের তালিকায় নাম অন্তর্ভুক্ত করিতে চায়। এক দরিদ্র আনসারী সাহাবী সাড়ে সাত কেজি শস্য দান করিলে মুনাফিকরা ঠাট্টা করিয়া বলিতে থাকে, আল্লাহ্ কী প্রয়োজন তাহার এই দানের? আসলে যাহারা বেশী দান করিয়াছেন তাহারা যেমন মুনাফিকদের বিরূপ সমালোচনা হইতে বাঁচিতে পারেন নাই, তেমনি দরিদ্র সাহাবীদের মধ্যে যাঁহারা সাধ্যানুযায়ী সামান্য দান করিয়াছেন, তাঁহারাও মুনাফিকদের ঠাট্টা বিদ্রূপের শিকার হন (তাফসীর ইব্‌ন কাছীর, ২খ., পৃ. ৮৫-৬; তাফসীর উছমানী, পৃ. ২৬৪)। রাসূলুল্লাহ (স) দরিদ্র সাহাবীদের প্রদত্ত খেজুর সদাকার ভাণ্ডারে ছড়াইয়া দেন। আল্লাহ তা'আলা এই সম্পর্কে পবিত্র কুরআনে বলেন:
الَّذِينَ يَلْمِزُونَ الْمُطَّوَّعِينَ مِنَ الْمُؤْمِنِينَ فِي الصَّدَقَاتِ وَالَّذِينَ لَا يَجِدُونَ إِلَّا جُهْدَهُمْ فَيَسْخَرُونَ مِنْهُمْ سَخْرَ اللَّهُ مِنْهُمْ وَلَهُمْ عَذَابٌ عَلِيمٌ.
"মু'মিনদের মধ্যে যাহারা স্বতস্ফূর্তভাবে সাদাকা দেয় এবং যাহারা নিজ শ্রম ব্যতিরেকে 'কিছুই পায় না, তাহাদের যাহারা দোষারোপ করে ও বিদ্রূপ করে আল্লাহ উহাদিগকে বিদ্রূপ করেন; উহাদের জন্য রহিয়াছে মর্মন্তুদ শাস্তি" (৯ঃ ৭৯)।
হযরত আবূ মূসা আশ'আরী (রা) সাথীদের পরামর্শক্রমে রাসূলুল্লাহ (স)-এর নিকট গিয়া যুদ্ধের বাহন সরবরাহের আবেদন জানাইলেন। রাসূলুল্লাহ (স) রাগত স্বরে বলিলেন: আল্লাহ্ কসম! আমি তোমাকে কোন বাহন দিব না, দেওয়ার মত কোন বাহন আমার নিকট নাই। হযরত আবূ মূসা আশআরী (রা) ফিরিয়া আসিয়া সাথীদেরকে ঘটনা অবহিত করিলেন। ইত্যবসরে রাসূলুল্লাহ (স)-এর নিকট গনীমতের বেশ কিছু উট আসিলে তিনি হযরত বিলাল হাবশী (রা)-র মাধ্যমে হযরত আবূ মূসা আশ'আরী (রা)-কে ডাকিয়া ছয়টি উট প্রদান করেন (সাহীহ্ আল-বুখারী, ২খ., পৃ. ১২৮-৯)। তিনি বিনয় সহকারে রাসূলুল্লাহ (স)-কে বলিলেন, আপনি আমাকে বাহন না দেওয়ার ব্যাপারে আল্লাহ্র কসম করিয়াছেন। এখন এই সব বাহন আমার জন্য অমঙ্গলকর হইতে পারে। রাসূলুল্লাহ (স) জবাবে বলেন:
مَا أَنَا حَمَلْتُكُمْ وَلَكِنَّ اللَّهَ حَمَّلَكُمْ وَانِّى وَاللَّهِ لَا أَحْلِفُ عَلَى يَمِيْنِ فَارَى غَيْرَهَا مِنْهَا إِلَّا كَفَرْتُ عَنْ يَمِينِى وَأَتَيْتُ الَّذِي هُوَ خَيْر.
"এইসব বাহন আমি দেই নাই, বরং আল্লাহ তোমাদেরকে দান করিয়াছেন। আর আল্লাহ্র শপথ! আমি কসম করার পর যদি মনে করি ইহার ব্যতিক্রম করা মঙ্গলজনক, তখন কসমের কাফ্ফারা আদায় করি এবং যাহা কল্যাণকর তাহার উপর আমল করি" (সাহীহ মুসলিম, ২খ., পৃ. ৪৮; ইবনুল কায়্যিম, যাদুল মা'আদ, ৩খ., পৃ. ৫২৮)।
হযরত উলবা ইব্‌ন যায়দ (রা) এক দরিদ্র সাহাবী। রাতে নামায আদায় শেষে বেশী করিয়া কান্নাকাটি করিয়া তিনি মুনাজাত করিলেন, 'হে আল্লাহ! তুমি জিহাদের হুকুম দিয়াছ, জিহাদে অংশগ্রহণে উদ্বুদ্ধ করিয়াছ। কিন্তু আমার নিকট এমন কোন সামর্থ্য নাই যাহার দ্বারা রাসূলুল্লাহ (স)-এর সহিত শরীক হইয়া শক্তি বৃদ্ধি করিতে পারি। অপরদিকে রাসূলুল্লাহ (স)-এর হস্তেও এমন কোন বাহন ও সরঞ্জাম নাই যাহা তিনি আমাকে দিতে পারেন। হে আল্লাহ! আমার কাছে সম্পদ নাই, কিন্তু যে জমিখণ্ড আছে তাহা মুসলমানদের সাদাকা করিয়া দিতেছি"। সকালবেলা রাসূলুল্লাহ (স) জিজ্ঞাসা করিলেন : তোমাদের মধ্যে রাতের বেলা কে সাদাকা করিয়াছ? কেহ কোন উত্তর দিল না। আবারও জিজ্ঞাসা করিলেন : তোমাদের মধ্যে রাতের বেলা কে সাদাকা করিয়াছে? তখন হযরত উলবা (রা) দাঁড়াইয়া সম্পূর্ণ ঘটনা অবহিত করিলেন। অতঃপর রাসূলুল্লাহ (স) বলিলেন:
ابْشِرْ فَوَالَّذِي نَفْسُ مُحَمَّد بِيَدِهِ لَقَدْ كُتِبَتْ فِي الزَّكُوةِ الْمُتَقَبَلَةِ.
"সুসংবাদ গ্রহণ কর! কসম সেই সত্তার যাঁহার হাতে মুহাম্মাদের প্রাণ! তোমার সাদাকা আল্লাহ্র দরবারে কবুল হইয়াছে" (যাদুল মা'আদ, ৩খ., পৃ. ৫২৮-৯)।

📘 সীরাত বিশ্বকোষ > 📄 হযরত আবূ যার গিফারী (রা)

📄 হযরত আবূ যার গিফারী (রা)


রাসূলুল্লাহ (স) যখন তাবুক রওনা হন তখন যে কয়েকজন সাহাবী পিছনে থাকিয়া যান তাহাদের মধ্যে হযরত আবূ যার গিফারী (রা) অন্যতম। তাঁহার উটটি ধীরগতিসম্পন্ন হওয়ার কারণে তিনি পিছনে পড়িয়া যান। পরিশেষে তিনি মালপত্র নিজের পিঠে তুলিয়া রাসূলুল্লাহ (স)-এর পথের চিহ্ন অনুসরণ করিয়া পদব্রজে অগ্রসর হইলেন। রাসূলুল্লাহ (স) পথিমধ্যে যখন যাত্রাবিরতি করিলেন তখন এক মুসলিম সৈন্য মরুভূমিতে একজন লোক আসিতে দেখিয়া রাসূলুল্লাহ (স)-কে বলিলেন, ইয়া রাসূলাল্লাহ! একজন লোক একাকী হাঁটিয়া আসিতেছে। রাসূলুল্লাহ (স) বলিলেন: আবূ যারই হইতে পারে। অতঃপর সাহাবীগণ গভীর দৃষ্টিতে দেখিয়া বলিলেন, ইয়া রাসূলাল্লাহ! আল্লাহ্র কসম! আবূ যারই আসিতেছেন। ইহা শুনিয়া রাসূলুল্লাহ (স) মন্তব্য করেন:
رحم الله ابا ذر يمشى وحده ويموت وحده ويبعث وحده.
"আল্লাহ আবূ যারের প্রতি রহম করুন! সে একা পথ চলিবে, একা মারা যাইবে এবং কিয়ামতের দিন একাই পুনরুত্থিত হইবে"।
হযরত 'উছমান (রা)-এর খিলাফতকালে তাঁহার সহিত অর্থনৈতিক বিষয়ে মতবিরোধের কারণে তিনি তাঁহাকে আর-রাবাষা নামক স্থানে নির্বাসিত করেন। তাঁহার সহিত তাঁহার স্ত্রী ও এক গোলাম ছিলেন। সেই অবস্থায় সেইখানে তিনি ইনতিকাল করেন। হযরত আবদুল্লাহ ইব্‌ন মাসউদ (রা) একদল ইরাকীর সহিত 'উমরা সম্পন্ন করিয়া ফিরিবার পথে হযরত আবূ যার গিফারী (রা)-র জানাযায় শরীক হন। ইব্‌ন কায়্যিম (রা) বর্ণনা করেন যে, হযরত আবূ যার গিফারী (রা)-র স্ত্রী বলেন, আমার স্বামীর মৃত্যুর সময় যখন ঘনাইয়া আসিল তখন আমি কাঁদিতে লাগিলাম। তিনি বলিলেন, কাঁদিতেছ কেন? আমি বলিলাম, কেন কাঁদিব না? আপনি এই নির্জন ময়দানে মারা যাইতেছেন, অথচ আপনাকে কাফন-দাফন করাইবার মত কোন লোকজন এই ময়দানে নাই। হযরত আবূ যার বলিলেন, সুসংবাদ শোন! কাঁদিও না। একদিন রাসূলুল্লাহ (স) কতিপয় ব্যক্তিকে, যাঁহাদের মধ্যে আমিও ছিলাম, লক্ষ্য করিয়া বলিলেন:
ليموتن رجل منكم بفلاة من الارض يشهده عصابة من المسلمين.
"তোমাদের মধ্যে এক ব্যক্তি নির্জন প্রান্তরে একাকী ইনতিকাল করিবে, কিন্তু তথায় হঠাৎ একদল মুসলমান তাহার নিকট উপস্থিত হইবে"।
আমার সহিত যাহারা তথায় উপস্থিত ছিল সকলেই লোকালয়ে ইনতিকাল করিয়াছেন, কেবল আমিই অবশিষ্ট আছি। আল্লাহ্র কসম! আমি মিথ্যা বলি নাই এবং কেহ আমাকে মিথ্যুক বলে নাই। বাহিরে গিয়া দেখ, কেহ আসিতেছে কিনা? আমি বলিলাম, হাজ্জীগণ ইতোমধ্যে চলিয়া গিয়াছেন, রাস্তা ফাঁকা হইয়, গিয়াছে। তিনি বলিলেন, যাও, গিয়া দেখ। আমি বাহির হইয়া একটি টিলার উপর দাঁড়াইয়া এইদিক সেইদিক তাকাইলাম। অতঃপর ফিরিয়া আসিয়া তাঁহার শুশ্রূষা করিতে লাগিলাম। ইতোমধ্যে লক্ষ্য করিলাম একদল উষ্ট্রারোহী আসিতেছে।
আমি তাহাদেরকে হাতের ইশারায় ডাকিলাম। তাহারা সত্বর আমার নিকট আসিয়া জানিতে চাহিলেন, কি হইয়াছে, হে আল্লাহর বান্দী! আমি বলিলাম, একজন মুসলমান মারা যাইতেছেন। তাঁহার দাফনে সহায়তা করুন। তাহারা জানিতে চাহিলেন, কে সেই ব্যক্তি? আমি বলিলাম, আবূ যার। তাহারা বলিলেন, রাসূলুল্লাহ (স)-এর সাহাবী? আমি বলিলাম, হাঁ। তাহারা সবাই বিচলিত হইয়া পড়িলেন এবং তাঁহার নামের উপর তাহাদের মা-বাবাদের উৎসর্গ করিতে লাগিলেন। তাহারা দ্রুত তাঁহার শয্যাপার্শ্বে সমবেত হইলেন। হযরত আবূ যার (রা) তাহাদের উদ্দেশ্যে রাসূলুল্লাহ (স)-এর ভবিষদ্বাণীটির পুনরাবৃত্তি করিয়া বলিলেন, যদি আমার অথবা আমার স্ত্রীর নিকট প্রয়োজনীয় কাফনের কাপড় থাকিত তবে আপনাদের বলিতাম না। আমি আল্লাহ্র শপথ লইয়া বলিতেছি, যদি আপনাদের মধ্যে কেহ দূত, সেনাপতি, গোত্রপতি ও নেতা হইয়া থাকেন তবে তিনি যেন আমার কাফন না দেন। ঘটনাচক্রে কাফেলার মধ্যে একজন আনসারী ছাড়া প্রত্যেকেই কোন না কোন পদের অধিকারী। আনসারী যুবক হযরত আবূ যার (রা)-কে লক্ষ্য করিয়া বলিলেন, হে চাচা! আমার এই চাদর দিয়া আপনাকে কাফন দিতে চাই। আমার পরিধানের চাদর দুইখানা আমার মায়ের হাতের কাটা সূতা দ্বারা তৈরী। তিনি বলিলেন, আপনি আমার কাফন দিবেন। অতঃপর হযরত আবূ যার (রা) ইন্তিকাল করিলেন। আনসারী যুবক তাঁহাকে কাফন পরাইলেন, সকলে জানাযা নামাযে শরীক হইলেন এবং লাশ দাফন করিলেন (যাদুল মা'আদ, ৩খ., পৃ. ৫৩৫-৬; আত-তাবারী, তারীখ, ৩খ., পৃ. ১০৭)।

লিঙ্ক শেয়ার করুন
close

লিঙ্ক কপি করুন

0:00
0:00