📘 সীরাত বিশ্বকোষ > 📄 মুসলমানদের যুদ্ধের প্রস্তুতি

📄 মুসলমানদের যুদ্ধের প্রস্তুতি


রাসূলুল্লাহ (স) গোপন সূত্রে রোমান সম্রাটের যুদ্ধাভিযানের সংবাদ পাইয়া বিচলিত হইলেন না, বরং কঠোর হস্তে আগ্রাসী শক্তির মুকাবিলা করিবার দৃঢ় সংকল্প ব্যক্ত করেন। তিনি সাহাবায়ে কিরামকে যুদ্ধ প্রস্তুতির আদেশ দেন যাহাতে দুশমনকে সীমান্তে (তাবৃক) প্রতিরোধ করা যায়। রাসূলুল্লাহ (স) সাধারণত যুদ্ধের প্রস্তুতি গ্রহণের সময়ও গন্তব্যস্থল গোপন রাখিতেন। কিন্তু এইবার তিনি গোপন না করিয়া রোমান সম্রাটের বিরুদ্ধে যুদ্ধের ঘোষণা জারী করিলেন। কারণ তাবুকের পথ দীর্ঘ, তাহা ছাড়া বিশ্বের সর্বাপেক্ষা শক্তিশালী ও সর্ববৃহৎ সাম্রাজ্যের বিরুদ্ধে এইভাবে ব্যাপক রণপ্রস্তুতির সংবাদ যদি রোমানদের নিকট পৌছিয়া যায়, তবে তাহারা ভীত-সন্ত্রস্ত হইয়া পড়িতে পারে। এইজন্য রাসূলুল্লাহ (স) প্রকাশ্যে ব্যাপক প্রস্তুতির আদেশ দেন এবং জান ও মাল দিয়া যুদ্ধে অংশগ্রহণের জন্য সাহাবায়ে কিরামকে আহবান জানাইলেন। ইহা ছাড়া যুদ্ধে সহযোগিতা করিবার জন্য তিনি আরবের বিভিন্ন গোত্রের কাছে দূত পাঠাইলেন। আসলাম গোত্রের নিকট হযরত বুরায়দা ইবনুল হুসায়ব (রা)-কে, সমুদ্র তীরবর্তী জনগণের নিকট আবুল জা'দ আদ-দামারীকে (রা), জুহায়না গোত্রের নিকট হযরত রাফে ও জুন্দুব (রা)-কে, আশজা' গোত্রের নিকট হযরত নু'আয়ম ইব্‌ন মাসউদাকে (রা), কা'ব ও আমর গোত্রের নিকট হযরত বুদায়ল ইবন ওয়রাকাকে (রা), সুলায়ম গোত্রের নিকট হযরত আব্বাস ইব্‌ন মিরদাসকে (রা), হযরত আবূ রুহম গিফারী (রা) ও আবু ওয়াকিদ লায়ছীকে (রা) নিজ নিজ গোত্রের নিকট প্রয়োজনীয় রসদ ও সৈন্য সংগ্রহের জন্য পাঠানো হয়।
মদীনা হইতে তাবূক দীর্ঘ পথ, প্রচণ্ড গরম, খেজুর পাকার মওসুম, খাদ্যাভাব, যুদ্ধাস্ত্র ও সাজ-সরঞ্জামের অপ্রতুলতা প্রভৃতি কারণে কতিপয় মুসলমান যুদ্ধে অংশগ্রহণ করিতে ইতস্তত করিলেন (তারীখ তাবারী, ৩খ., পৃ. ১০১; মাওলানা ফযল মুহাম্মদ যাঈ, গাযওয়া তাবুক, পৃ. ২২-৩)। আল্লাহ তা'আলা রাসূলুল্লাহ (স)-এর ডাকে সাড়া দিয়া যুদ্ধে অবতীর্ণ হওয়ার জন্য মুসলমানদের প্রতি নিম্নোক্ত আহ্বান জানাইলেন:
انْفِرُوا خِفَافًا وَثِقَالاً وَجَاهِدُوا بِأَمْوَالِكُمْ وَأَنْفُسِكُمْ فِي سَبِيلِ اللَّهِ ذَلِكُمْ خَيْرٌ لَكُمْ إِنْ كُنْتُمْ تَعْلَمُونَ
"অভিযানে বাহির হইয়া পড় হাল্কা অবস্থায় হউক অথবা ভারি অবস্থায় এবং সংগ্রাম কর আল্লাহর পথে তোমাদের সম্পদ ও জীবন দ্বারা। উহাই তোমাদের জন্য শ্রেয়, যদি তোমরা জানিতে” (৯:৪১)।
ফলে সর্বস্তরের মুসলমানগণ স্বতস্ফুর্তভাবে সাড়া দিয়া জিহাদে ঝাপাইয়া পড়ে। এইভাবে ত্রিশ হাজার যোদ্ধার একটি কাফেলা তৈয়ার হইয়া যায়।

📘 সীরাত বিশ্বকোষ > 📄 রাসূলুল্লাহ (স)-কে হত্যার ষড়যন্ত্র

📄 রাসূলুল্লাহ (স)-কে হত্যার ষড়যন্ত্র


রাসূলুল্লাহ (স) তাবুকে বিশ দিন অবস্থানের পর যখন প্রত্যাবর্তন করিতেছিলেন তখন তাঁহার সফরসঙ্গীদের মধ্যে কতিপয় মুনাফিক তাঁহাকে হত্যার ষড়যন্ত্র করে। তাহারা পরামর্শ করিয়া সিদ্ধান্ত লইল যে, রাসূলুল্লাহ (স) পার্বত্য গিরিপথ অতিক্রম করার সময় ধাক্কা মারিয়া তাঁহাকে নীচে ফেলিয়া দিবে। আল্লাহ তা'আলা এই ষড়যন্ত্র ও ষড়যন্ত্রকারী মুনাফিকদের নাম রাসূলুল্লাহ (স)-কে অবহিত করেন। হযরত হুযায়ফা (রা) রাসূলুল্লাহ (স)-এর উষ্ট্রীর লাগাম ধরিয়া অগ্রে অগ্রে হাঁটিয়া যাইতেছিলেন এবং হযরত আম্মার (রা) পেছনের দিক হইতে উস্ত্রীকে হাঁকাইতেছিলেন। তাঁহারা যখন রাতের অন্ধকারে পার্বত্য উচ্চ ভূমিতে উপনীত হইলেন তখন সেখানে ১২ জন মুখোশধারী অশ্বারোহী আবির্ভূত হইল। রাসূলুল্লাহ (স) হযরত হুযায়ফাকে আদেশ দিলেন: এই দুষ্কৃতিকারীদের তাড়াইয়া দাও। হুযায়ফা (রা) ঢাল লইয়া তাহাদের উটের মুখে আঘাত করিতে লাগিলেন। আল্লাহ মুনাফিকদের মনে ভীতি সঞ্চার করিয়া দিলেন। তাহারা বুঝিতে পারিল যে, রাসূলুল্লাহ (স) ষড়যন্ত্র সম্পর্কে অবহিত হইয়াছেন। অতঃপর দৃষ্কৃতকারীরা দ্রুত পলায়ন করিয়া কাফেলার সহিত মিলিত হইল। রাসূলুল্লাহ (স) হযরত হুযায়ফাকে বলিলেন: তুমি কি তাহাদের স্বরূপ ও দুরভিসন্ধি আঁচ করিতে পারিয়াছ? তিনি বলিলেন, না।
রাসূলুল্লাহ (স) বলেন, তাহারা ছিল অমুক অমুক। তাহারা স্থির করিয়াছিল, আমি যখনই উচু স্থানে আরোহণ করিব, তাহারা তখনই আমাকে ধাক্কা মারিয়া নীচে ফেলিয়া দিবে। তাহারা মুনাফিক, কিয়ামত পর্যন্ত মুনাফিক থাকিবে। আমার উম্মতের মধ্যে এই ১২জন ততক্ষণ পর্যন্ত জান্নাতে প্রবেশ করিবে না যতক্ষণ পর্যন্ত না সুচের ছিদ্র দিয়া উট অতিক্রম করে। আল্লাহ তা'আলা তাহাদেরকে 'দবীলা' দিয়া হত্যা করিবেন। হুযায়ফা (রা) জানিতে চাহিলেন, হুযুর, দবীলা কি? তিনি বলিলেন: ইহা আগুনের একটি শিখা যাহা তাহাদের প্রত্যেকের ধমনীতে পতিত হইবে এবং তাহাদের বধ করিবে (তাফসীর ইন্ন কাছীর, ২খ., পৃ. ৭১-২; খাসাইসুল কুবরা, ১খ., পৃ. ৫৬৮-৯)। পরবর্তীতে রাসূলুল্লাহ (স) তাহাদের প্রত্যেককে আলাদাভাবে ডাকিয়া কথা বলিলেন। পবিত্র কুরআনে তাহাদের ষড়যন্ত্র সম্পর্কে ইঙ্গিত দেওয়া হইয়াছে:
وَهَمُّوا بِمَا لَمْ يَنَالُوا . “উহারা যাহা সংকল্প করিয়াছিল তাহা পায় নাই” (৯: ৭৪)।

📘 সীরাত বিশ্বকোষ > 📄 যুদ্ধ তহবিলে সাহায্য প্রদানের আবেদন

📄 যুদ্ধ তহবিলে সাহায্য প্রদানের আবেদন


তৎকালীন বিশ্বের শ্রেষ্ঠ ক্ষমতাশালী রোমান সম্রাটের সার্থক মুকাবিলার জন্য যাহার যতটুকু সাধ্য ও সামর্থ্য আছে, ততটুকু যুদ্ধ তহবিলে সাহায্য হিসাবে দেওয়ার জন্য রাসূলুল্লাহ (স) আবেদন জানাইলেন এবং ইসলামের বৈরী শক্তির বিরুদ্ধে জিহাদে অংশ গ্রহণের মাহাত্ম্য ও যুদ্ধ তহবিলে সাহায্য প্রদানের তাৎপর্য সাহাবীদের সম্মুখে সবিস্তারে তুলিয়া ধরেন। সাহাবায়ে কিরাম রাসূলুল্লাহ (স)-এর আবেদনে সাড়া দিয়া যেইভাবে জানে-মালে যুদ্ধপ্রস্তুতি গ্রহণ করেন তাহার দৃষ্টান্ত ইতিহাসে বিরল। সাহাবীদের এই স্বতস্ফূর্ত উদ্দীপনা চিরকাল জিহাদে অংশগ্রহণকারীদের প্রেরণার উৎস হইয়া থাকিবে। হযরত উছমান ইব্‌ন আফফান (রা) তিন শত উট, পঞ্চাশটি ঘোড়া, সম পরিমাণ সাজ-সরঞ্জাম, চার হাজার দিরহাম ও এক হাজার দীনার যুদ্ধ তহবিলে দান করেন। এক-তৃতীয়াংশ সৈন্যের ব্যয়ভার হযরত উহুমানের সাহায্য তহবিল হইতে প্রদান করা হয়। হযরত উছমান (রা) যখন রুমালে ভর্তি এক হাজার স্বর্ণমুদ্রা রাসূলুল্লাহ (স)-এর কোলে ঢালিয়া দিলেন, রাসূলুল্লাহ (স) তখন এই সব স্বর্ণমুদ্রা নাড়াচাড়া করিতে করিতে বলিলেন:
ما ضر عثمان ما عمل بعد اليوم اللهم راض عن عثمان فاني عنه راض.
"আজিকার পরে উছমান যদি অন্য কোন নেক আমল নাও করে, তাহা হইলে তাহার কোন ক্ষতি হইবে না। হে আল্লাহ! আমি উছমানের উপর সন্তুষ্ট, তুমিও তাহার উপর সন্তুষ্ট হইয়া যাও” (মিল্কাতুল মাসাবীহ্, পৃ. ৫৬১; ইব্‌ন হিশাম, আস-সীরাতুন নাবাবিয়‍্যা, ২খ., পার্ট ৩-৪, পৃ. ৫১৮)।
হযরত উছমান (রা)-কে উদ্দেশ্য করিয়া রাসূলুল্লাহ্ (স) বলেন, হে উছমান! আল্লাহ তোমাকে ক্ষমা করুন। যেই পাপ তুমি প্রকাশ্যে ও গোপনে করিয়াছ এবং যাহা ভবিষ্যতে তোমার দ্বারা হইয়া যায়, আল্লাহ সব পাপ ক্ষমা করুন (হায়াতুস সাহাবা, ২খ., পৃ. ২২২)।
হযরত উমার (রা) এই যুদ্ধে সংসারের অর্ধেক সাজসরঞ্জাম ও প্রয়োজনীয় দ্রব্যসামগ্রী, হযরত আবদুর রহমান ইব্‌ন আওফ (রা) চার হাজার দীনার, দুই শত উকিয়া রৌপ্য (দুই হাজার এক শত দিরহামের সমান) এবং হযরত আসিম ইব্‌ন আদী (রা) সত্তর ওয়াস্ক (তিন শত পঁয়ষট্টি মণ) খেজুর যুদ্ধ তহবিলে দান করেন (আল-মাওয়াহিব, ৩খ., পৃ. ৬৪; সীরাতুল হালাবিয়া, ৫খ., পৃ. ৫৯৮)।
তাবুক যুদ্ধে হযরত আবূ বাক্স (রা) সংসারের সম্পূর্ণ আসবাবপত্র, যাহার মূল্য প্রায় চার হাজার দিরহামের সমপরিমাণ, যুদ্ধ তহবিলে দান করেন। রাসূলুল্লাহ (স) জিজ্ঞাসা করিলেন, পরিবার-পরিজনের জন্য কী পরিমাণ রাখিয়া আসিয়াছ? আবূ বাক্স (রা) বলিলেন ৪
ابقيت لهم الله ورسوله.
"তাহাদের জন্য আল্লাহ এবং তাঁহার রাসূলকে রাখিয়া আসিয়াছি" (আল-মাওয়াহিব, ৩খ., পৃ. ৬৪; মিশকাতুল মাসাবীহ, পৃ. ৫৫৬; হায়াতুস সাহাবা, ২খ., পৃ. ২২)।
মহিলাদের নজীরবিহীন কুরবানী
ইসলামের অগ্রযাত্রা ও উন্নয়নে এবং আগ্রাসী শক্তির মুকাবিলায় পুরুষদের পাশাপাশি মুসলিম মহিলারাও জান ও মাল কুরবানী দেওয়ার যেই দৃষ্টান্ত স্থাপন করিয়াছেন তাহা ইতিহাসের পাতায় স্বর্ণাক্ষরে লিপিবদ্ধ থাকিবে। হযরত সিনান আসলামিয়া (রা) বলেন, তাবুকের যুদ্ধ প্রস্তুতির সময় আমি উম্মুল মুমিনীন হযরত আয়েশা (রা)-র ঘরে গেলে দেখিতে পাইলাম যে, ‘রাসূলুল্লাহ (স)-এর সম্মুখে-বিছানো একটি চাদরে মেয়েদের হাতের চুড়ি, ব্রেসলেট, পায়ের নুপুর, কানের দুল, আংটি এবং অন্যান্য মূল্যবান গহনা ও স্বর্ণালংকার ছড়াইয়া রহিয়াছে। এইসব গহনা মহিলাগণ ইসলামী বাহিনীর সহায়তার জন্য সাদাকা করিয়াছেন। এই সব অলংকার দিয়া রাসূলুল্লাহ (স) সেনাসদস্যদের যুদ্ধের ব্যয়ভার বহন করেন। যেহেতু অধিকাংশ সৈন্যকে পদব্রজে তাঁবুকে পৌঁছাইতে হইবে, তাই বেশী করিয়া জুতা সাথে নেওয়ার জন্য রাসূলুল্লাহ (স) সবাইকে নির্দেশ দেন (আর-রাহীকুল মাখতুম, পৃ. ৪৩৩)।
দরিদ্র সাহাবীদের প্রাণান্তকর প্রয়াস
মদীনার কতিপয় দরিদ্র মুসলমান তাবুক যুদ্ধে অংশগ্রহণের ইচ্ছায় রাসূলুল্লাহ (স)-এর নিকট হাজির হইলেন। কিন্তু কোন ভারবাহী পশু ও সফরের ব্যয়ভার নির্বাহ করার মত কোন অর্থ-সম্পদ তাঁহাদের ছিল না। রাসূলুল্লাহ (স) জানাইয়া দিলেন যে, তাহাদের দেওয়ার মত কোন বাহন ও সাজ-সরঞ্জাম তাঁহার নিকট এই মুহূর্তে নাই। এই কথা শুনিয়া তাঁহারা কাঁদিতে লাগিলেন। ইতিহাসে এই নিষ্ঠাবান মুসলমানদের 'ক্রন্দনকারী' (‎البکاؤن‎) বলা হয়। ক্রন্দনকারিগণ সংখ্যায় ছিলেন নয়জন। তাঁহারা কাঁদিতে কাঁদিতে নিজ নিজ বাড়ী প্রত্যাবর্তন করেন। তাঁহারা হইলেন: (১) সালিম ইবন উমায়র (রা), (২) উল্বা ইন্ন যায়দ (রা), (৩) আবু লায়লা আল-মুযানী (রা), (৪) আমর ইব্‌ন গানমাহ্ (রা), (৫) সালামা ইব্‌ন সা (রা); (৬) ইরবাদ ইবন সারিয়া (রা), (৭) আবদুল্লাহ ইব্‌ন মুগাফ্ফাল (রা), (৮) মা'কিল ইন ইয়াসার (রা) ও (৯) উমার ইবন হুমাম আল-জামূহ্ (আত-তাবাকাতুল কুবra, ২খ., পৃ. ১৬৫)। উক্ত ক্রন্দনকারীদের সম্পর্কে আল্লাহ তা'আলা পবিত্র কুরআনে নাযিল করেন:
وَلَا عَلَى الَّذِينَ إِذَا مَا أَتَوكَ لِتَحْمِلَهُمْ قُلْتَ لَا أَجِدُ مَا أَحْمِلُكُمْ عَلَيْهِ تَوَلَّوْا وَأَعْيُنُهُمْ تَفِيضُ مِنَ الدَّمْعِ حَزَنًا أَلَا يَجِدُوا مَا يُنْفِقُونَ.
"উহাদেরও কোন অপরাধ নাই যাহারা তোমার নিকট বাহনের জন্য আসিলে তুমি বলিয়াছিলে, তোমাদের জন্য কোন বাহন আমি পাইতেছি না। উহারা অর্থব্যয়ে অসামর্থ্যজনিত দুঃখে অশ্রু বিগলিত নেত্রে ফিরিয়া গেল" (৯:৯২)।
ইরন হযরত আবদুল্লাহ মুগাফ্ফাল (রা) ও হযরত আবূ লায়লা (রা) যখন রাসূলুল্লাহ (স)-এর দরবার হইতে কাঁদিতে কাঁদিতে গৃহে প্রত্যাবর্তন করিতেছিলেন তখন পথিমধ্যে হযরত ইয়ামিন ইবন আমর নাদারী (রা)-র সহিত তাঁহাদের সাক্ষাত হয়। তিনি তাঁহাদের কান্নার কারণ জিজ্ঞাসা করিলে তাঁহারা বলিলেন, যুদ্ধে যাওয়ার জন্য রাসূলুল্লাহ (স)-এর নিকট কোন বাহন নাই। আর আমাদেরও যুদ্ধে যাওয়ার মত সামর্থ্য নাই। আল্লাহ্র রাসূলের সহিত যুদ্ধে যাইতে পারিতেছি না, এইজন্য আমাদের আফসোস। হযরত ইয়ামিন তাৎক্ষণিকভাবে একটি উট এবং আট সের খেজুরসহ প্রয়োজনীয় সরঞ্জাম তাঁহাদের সরবরাহ করিলেন (তাফসীর মাযহারী, ৫খ., পৃ. ৩৮৪-৫)।
হযরত আবূ বাক্স (রা), হযরত উমার (রা), হযরত উছমান (রা), হযরত আব্বাস (রা), হযরত আবদুর রহমান ইবন 'আওফ (রা), হযরত সা'দ ইবন উবাদা (রা) ও হযরত মুহাম্মাদ ইন্ন মাস্লামা (রা)-এর মত অবস্থাসম্পন্ন সাহাবায়ে কিরাম যেইভাবে স্বতস্ফূর্ত উদ্দীপনা লইয়া যুদ্ধ তহবিলে দান করিয়াছেন, তেমনি অভাবগ্রস্থ ও দরিদ্র সাহাবায়ে কিরামের দানও উপেক্ষা করার মত নয়। তাঁহাদের ত্যাগ ও কুরবানী ইতিহাসে উজ্জ্বল হইয়া থাকিবে। হযরত আবূ 'আকীল (রা) ছিলেন একজন শ্রমিক। সারা রাত কাজ করিয়া মজুরী হিসাবে তিনি প্রায় আট কেজি খেজুর পান। তিনি উহার অর্ধেক সন্তান ও পরিবারের জন্য রাখিয়া বাকী অর্ধেক তাবুকের যুদ্ধ তহবিলে দান করিবার উদ্দেশ্যে রাসূলুল্লাহ (স)-এর হাতে দেন। ইহাতে মুনাফিকগণ ঠাট্টা করিয়া বলিতে লাগিল, সামান্য খেজুর দান করিয়া শহীদের তালিকায় নাম অন্তর্ভুক্ত করিতে চায়। এক দরিদ্র আনসারী সাহাবী সাড়ে সাত কেজি শস্য দান করিলে মুনাফিকরা ঠাট্টা করিয়া বলিতে থাকে, আল্লাহ্ কী প্রয়োজন তাহার এই দানের? আসলে যাহারা বেশী দান করিয়াছেন তাহারা যেমন মুনাফিকদের বিরূপ সমালোচনা হইতে বাঁচিতে পারেন নাই, তেমনি দরিদ্র সাহাবীদের মধ্যে যাঁহারা সাধ্যানুযায়ী সামান্য দান করিয়াছেন, তাঁহারাও মুনাফিকদের ঠাট্টা বিদ্রূপের শিকার হন (তাফসীর ইব্‌ন কাছীর, ২খ., পৃ. ৮৫-৬; তাফসীর উছমানী, পৃ. ২৬৪)। রাসূলুল্লাহ (স) দরিদ্র সাহাবীদের প্রদত্ত খেজুর সদাকার ভাণ্ডারে ছড়াইয়া দেন। আল্লাহ তা'আলা এই সম্পর্কে পবিত্র কুরআনে বলেন:
الَّذِينَ يَلْمِزُونَ الْمُطَّوَّعِينَ مِنَ الْمُؤْمِنِينَ فِي الصَّدَقَاتِ وَالَّذِينَ لَا يَجِدُونَ إِلَّا جُهْدَهُمْ فَيَسْخَرُونَ مِنْهُمْ سَخْرَ اللَّهُ مِنْهُمْ وَلَهُمْ عَذَابٌ عَلِيمٌ.
"মু'মিনদের মধ্যে যাহারা স্বতস্ফূর্তভাবে সাদাকা দেয় এবং যাহারা নিজ শ্রম ব্যতিরেকে 'কিছুই পায় না, তাহাদের যাহারা দোষারোপ করে ও বিদ্রূপ করে আল্লাহ উহাদিগকে বিদ্রূপ করেন; উহাদের জন্য রহিয়াছে মর্মন্তুদ শাস্তি” (৯ঃ ৭৯)।
হযরত আবূ মূসা আশ'আরী (রা) সাথীদের পরামর্শক্রমে রাসূলুল্লাহ (স)-এর নিকট গিয়া যুদ্ধের বাহন সরবরাহের আবেদন জানাইলেন। রাসূলুল্লাহ (স) রাগত স্বরে বলিলেন: আল্লাহ্ কসম! আমি তোমাকে কোন বাহন দিব না, দেওয়ার মত কোন বাহন আমার নিকট নাই। হযরত আবূ মূসা আশআরী (রা) ফিরিয়া আসিয়া সাথীদেরকে ঘটনা অবহিত করিলেন। ইত্যবসরে রাসূলুল্লাহ (স)-এর নিকট গনীমতের বেশ কিছু উট আসিলে তিনি হযরত বিলাল হাবশী (রা)-র মাধ্যমে হযরত আবূ মূসা আশ'আরী (রা)-কে ডাকিয়া ছয়টি উট প্রদান করেন (সাহীহ্ আল-বুখারী, ২খ., পৃ. ১২৮-৯)। তিনি বিনয় সহকারে রাসূলুল্লাহ (স)-কে বলিলেন, আপনি আমাকে বাহন না দেওয়ার ব্যাপারে আল্লাহ্র কসম করিয়াছেন। এখন এই সব বাহন আমার জন্য অমঙ্গলকর হইতে পারে। রাসূলুল্লাহ (স) জবাবে বলেন:

📘 সীরাত বিশ্বকোষ > 📄 পানি সংকট দূরীকরণ

📄 পানি সংকট দূরীকরণ


তাবুক হইতে মদীনায় প্রত্যাবর্তনের পথে মুসলিম সৈন্যবাহিনী তীব্র উত্তাপের কারণে প্রচণ্ড পিপাসার শিকার হন। কাহারও নিকট পানি ছিল না। রাসূলুল্লাহ (স) উসায়দ ইবন হুদায়র (রা)-কে পানির খোঁজে প্রেরণ করিলেন। তিনি তাবূক ও হিজরের মধ্যবর্তী স্থানে গিয়া চতুর্দিকে পানির খোঁজে ছোটাছুটি করিলেন। অবশেষে এক মহিলার নিকট পানি ভর্তি একটি পুরাতন মশক পাইলেন। উসায়দ (রা) মহিলার সহিত কথাবার্তা বলিয়া মশকটি রাসূলুল্লাহ (স)-এর নিকট লইয়া আসিলে তিনি মশকের পানিতে বরকতের জন্য দু'আ করিয়া বলিলেন: তোমরা আপন আপন মশক লইয়া আস। অতঃপর যত মশক ছিল সবগুলি ভরিয়া লওয়া হইল। ইহার পর তিনি সেনাদলের উট ও ঘোড়া জমায়েত করিয়া সেইগুলিকে পানি পান করাইলেন। রাসূলুল্লাহ (স) উসায়দের আনীত পানি একটি বড় পাত্রে ঢালিলেন এবং তাহাতে হাত রাখিয়া আপন মুখমণ্ডল ও উভয় পা ধৌত করিলেন। অতঃপর তিনি দুই রাক'আত নামায পড়িলেন। নামাযশেষে দেখা গেল পাত্র হইতে উপচাইয়া পানি পড়িতেছে (আল খাসাইসুল কুবরা, ১খ., পৃ. ৫৬০)।
সীরাত গবেষক আলী ইব্‌ন বুরহানুদ্দীন হালাবী অনুরূপ একটি বিস্ময়কর ঘটনার বর্ণনা দিয়াছেন যাহা নিম্নরূপঃ তাবুক অভিযানে মুসলিম সেনাদলে পানিসংকট দেখা দিলে রাসূলুল্লাহ (স) দুইজন সাহাবীকে হুকুম দিলেন, অমুক জায়গায় যাও। সেইখানে উষ্ট্রীতে আরোহী এক বৃদ্ধার দেখা পাইবে যাহার নিকট পানি ভর্তি একটি পাত্র রহিয়াছে। কম বেশী যত দামই হউক বৃদ্ধার নিকট হইতে পানি কিনিয়া লইবে এবং বৃদ্ধাকেও লইয়া আসিবে।
কথামত নির্দিষ্ট জায়গায় গিয়া বৃদ্ধার দেখা পাইলে তাহারা পানি চাহিলেন। বৃদ্ধা বলিলেন, তোমাদের তুলনায় আমার ও আমার পরিবারের জন্য পানি অধিক প্রয়োজন। সাহাবীগণ বলিলেন, পানি লইয়া আমাদের সহিত রাসূলুল্লাহ (স)-এর নিকট আপনাকে যাইতে হইবে। বৃদ্ধা বলিল, কোন্ রাসূলুল্লাহ (স)? সম্ভবত ঐ জাদুকর যিনি বিধর্মী। তাহার নিকট না যাওয়াই ভাল। ইহা শুনিয়া সাহাবীগণ তাহাকে জোর করিয়া রাসূলুল্লাহ (স)-এর নিকট লইয়া আসেন। রাসূলুল্লাহ (স) বলিলেন: তাহাকে ছাড়িয়া দাও।
রাসূলুল্লাহ (স) বৃদ্ধাকে বলিলেন: 'আপনি কি আপনার পানি আমাদেরকে ব্যবহারের অনুমতি দিবেন? আপনার পানি যেই পরিমাণ ছিল ঠিক সেই পরিমাণই থাকিবে।' বৃদ্ধা জবাব দিলেন: আপনার ইচ্ছা। অতঃপর রাসূলুল্লাহ (স) আবু কাতাদা (রা)-কে বলিলেন, পাত্র লইয়া আস। আবু কাতাদা (রা) পাত্র লইয়া আসিলে রাসূলুল্লাহ (স) বৃদ্ধার পাত্রের মুখ খুলিয়া একটু থুথু দিলেন এবং সামান্য পানি পাত্রে ঢালিলেন। তিনি পাত্রের ভিতরে হাত দিয়া সাহাবীদের ডাকিয়া বলিলেন: আস, পানি লইয়া যাও। সাহাবীগণ দলে দলে আসিয়া স্ব স্ব পাত্রে পানি ভরিয়া লইলেন এবং সেনাবাহিনীর উটগুলিকে পানি পান করাইলেন। ইহার পরও দুই-তৃতীয়াংশ পানি পাত্রের মধ্যে অবশিষ্ট ছিল। রাসূলুল্লাহ (স) বৃদ্ধাকে বলিলেন: 'আপনি তো দেখিয়াছেন যে, আমি আপনার পানি লই নাই। আল্লাহ তা'আলা আমাকে প্রচুর পানি দিয়া তৃপ্ত করিয়াছেন।'
বৃদ্ধা এই দৃশ্য দেখিয়া অভিভূত হইয়া গেলেন। কলসি লইয়া যখন বাড়ী ফিরিলেন, তখন পরিবারের অপরাপর সদস্যগণ বলিলেন: এত দেরী হইল কেন? বৃদ্ধ বলিলেন, শোন! আমি এক বিস্ময়কর দৃশ্য দেখিয়াছি। আল্লাহ্র কসম! আমার এই পাত্রে যত পানি রহিয়াছে তাহা হইতে প্রায় সত্তরটি উট পানি পান করিয়াছে এবং অসংখ্য মানুষ বিভিন্ন পানপাত্রে পানি ভর্তি করিয়া রাখিয়াছে, অথচ আমার পাত্রের পানি কমে নাই। গ্রামবাসী বৃদ্ধার কথা শুনিয়া অবাক হইয়া গেল। অতঃপর বৃদ্ধা এবং গ্রামবাসী ত্রিশটি উটের উপর সওয়ার হইয়া রাসূলুল্লাহ (স)-এর নিকট আসিলেন এবং তাহার পবিত্র হাতে হাত রাখিয়া ঈমান আনিয়া ধন্য হইলেন (সীরাতু হালাবিয়া, ৫খ., পৃ. ৪২৯-৪৩১)।

লিঙ্ক শেয়ার করুন
close

লিঙ্ক কপি করুন

0:00
0:00