📄 তাবুকের ভৌগোলিক অবস্থান ও নামকরণ
তাবুক মদীনা ও সিরিয়ার মাঝপথে খায়বার ও আল-আলার একই রেখায় অবস্থিত একটি জায়গার নাম। সেইখানে প্রাচীন কাল হইতে সেনা ছাউনী রহিয়াছে। এইখানে ফলের বাগান ও তিনটি কূপ রহিয়াছে যাহার একটি রাসূলুল্লাহ্ (স)-এর স্মৃতি বিজড়িত। বিশেষজ্ঞগণ মনে করেন, আয়কা (الايكة) জাতির আদি নিবাস ছিল তাবুকে। আল্লাহ তা'আলা তাহাদের প্রতি হযরত শু'আয়ব (আ)-কে নবীরূপে প্রেরণ করিয়াছিলেন। তাবুকে অবস্থিত একটি পরিত্যক্ত কূপ হযরত উমার ইবনুল খাত্তাব (রা)-র নির্দেশক্রমে পুনঃখনন করিয়া ব্যবহার উপযোগী করা হয় (মু'জামুল বুলদান, ২খ., পৃ. ১৪; জাযীরাতুল 'আরাব, পৃ. ২৬৫)।
তাবুক মদীনা হইতে প্রায় সাত শত কিলোমিটার উত্তরে অবস্থিত। আবহাওয়া শীতল। মদীনার প্রতিরক্ষার জন্য তাবুক হইতেছে বড় স্পর্শকাতর জনপদ। তাবুকের নামকরণের ব্যাপারে ইতিহাসবিদগণ বলেন যে, রাসূলুল্লাহ (স) তাঁহার সর্বশেষ জিহাদে অংশগ্রহণের উদ্দেশ্যে মদীনা হইতে সাত শত কিলোমিটার উত্তরে এক ঝর্ণাধারার নিকট শিবির স্থাপন করেন। রাসূলুল্লাহ (স) সাহাবায়ে কিরামকে ঐ পানিতে হাত দিতে নিষেধ করেন। কিন্তু কতিপয় লোক ঝর্ণা হইতে নির্গত ক্ষীণ পানি প্রবাহ বেগবান করিবার জন্য তীর দিয়া গুতা দিতে থাকে। রাসূলুল্লাহ (স) ইহাতে অসন্তুষ্ট হইয় বলিলেন:
"তোমরা এই পানিতে তীর গাড়িতেছ।" مَا زِلْتُمْ تَبُوْكُونَها بَوْكًا.
এই বক্তব্য হইতে তাবৃকের নামকরণ। কারণ بوك باك- অর্থ "কোন জিনিসে হাত ঢুকাইয়া নাড়া দেওয়া” (লিসানুল 'আরাব, ১০খ., পৃ. ৪০৪-৫)। গাওয়া তাবূককে জায়গুল 'উসরাত (جيش العسرة) নামেও অভিহিত করা হয়। কারণ এই যুদ্ধে অংশগ্রহণ করিতে গিয়া সাহাবায়ে কিরাম প্রচণ্ড গরম, ব্যাপক দুর্ভিক্ষ ও অশেষ দুর্ভোগ পোহাইয়াছিলেন। এত বিরাট সৈন্যবাহিনীর জন্য মুসলমানদের সর্বাত্মক চেষ্টা সত্ত্বেও পুরা পাথেয় ছিল প্রয়োজনের তুলনায় অপ্রতুল। প্রতি আঠারজন সৈন্যের জন্য ছিল একটি উট। খাদ্য ও পানীয় সামগ্রীর অপ্রতুলতার কারণে অনেক সময় গাছের পাতা ও উট যবেহ করিয়া উহার গলথলিতে সংরক্ষিত পানি পান করিতে হইয়াছিল (আর-রাহীকুল মাখতুম, পৃ. ৪৩৩-৪)। এই যুদ্ধকে 'আল-গাওয়া আল-ফাদিহা’ (الغزوة الفاضحة)-ও বলা হয়। কারণ এই যুদ্ধে মুনাফিকগণ চরমভাবে অপমানিত ও লজ্জিত হইয়াছিল (মুখতাসারু সীরাতির রাসূল, পৃ. ৩৯১)।
📄 খালিদ (রা)-এর দূমাতুল জানদাল অভিযান
রোমানদের পৃষ্ঠ প্রদর্শন এবং সীমান্তবর্তী খৃস্টান শাসকদের সহিত সন্ধিচুক্তি সম্পাদনের পর এই এলাকায় রাসূলুল্লাহ (স)-এর আর যুদ্ধের প্রয়োজন রহিল না। তিনি অনেকটা নিশ্চিন্ত ছিলেন যে, রোমানবাসী পুনরায় মুসলমানদের সহিত মুকাবিলার সাহস করিবে না। ইহার পরও একটা আশংকা ছিল যে, রোমানরা দূমাতুল জানদালের দিক হইতে আক্রমণ করিতে পারে। এইরূপ অবস্থায় দূমাতুল জানদালের খৃস্টান গভর্নর উকায়দির ইব্ন আবদুল মালিক, যিনি হেরাক্লিয়াসের প্রতিনিধি, রোমানদের সাহায্যে আগাইয়া আসিবে (Muhammad Husayn Haykal, The Life of Muhammad, pp. 458-9)। এইদিক বিবেচনা করিয়া রাসূলুল্লাহ (স) চার শত বিশজন অশ্বারোহীসহ হযরত খালিদ ইব্ন ওয়ালীদ (রা)-কে দূমাতুল জানদাল অভিযানে প্রেরণ করেন। খালিদ (রা) আরয করিলেন, ইয়া রাসূলুল্লাহ! আমরা দূমাতুল জানদালে গিয়া কী করিতে পারি, যেইখানে উকায়দিরের মত শক্তিশালী শাসক রহিয়াছে? তাহার শক্তির তুলনায় আমাদের বাহিনী ক্ষুদ্র। রাসূলুল্লাহ (স) খালিদকে বলিলেন, 'তুমি তাহাকে বুনো গাভী শিকার রত অবস্থায় দেখিতে পাইবে। তাহাকে হত্যা না করিয়া গ্রেফতার করিয়া আমার নিকট পাঠাইয়া দিবে। সে যদি অস্বীকার করে তবে হত্যা করিবে।'
খালিদ ইব্ন ওয়ালীদ (রা) রওয়ানা হইয়া গেলেন। তিনি এক জোৎস্না রজনীতে উকায়দিরের দুর্গের নিকট উপনীত হইলেন। উকায়দির তখন সস্ত্রীক প্রাসাদের ছাদে বসিয়া সঙ্গীত শ্রবণ ও মদ্যপানে রত ছিল। এমন সময় দেখা গেল, একটি বন্যগাভী প্রাসাদের ফটকে শিং দিয়া গুঁতা দিতেছে। উকায়দিরের পত্নী তাহাকে বলিল, এমন দৃশ্য আগে কখনও দেখিয়াছ কি? সে বলিল, কসম খোদার! কখনও নয়। তাহার স্ত্রী বলিল, ইহাকে কে ছাড়িয়াছে? সে বলিল, ইহা কাহারও ছাড়া নয়। স্ত্রী বলিল, অদ্য রাতে মাংস খাইতে পারি নাই। ইহা শুনিয়া উকায়দির ছাদ হইতে নামিয়া আসিল। তাহার নির্দেশে ঘোড়ায় জিন বাঁধা হইল এবং সে তাহাতে চাপিয়া বসিল। তাহার চাকর ও পরিবারের কতিপয় সদস্যও তাহার সহিত অশ্বারোহণ করিল। তাহার অনুজ হাসান ও অপরাপর সদস্যগণ ছোট ছোট বর্শা হস্তে গাভী শিকারে বাহির হইয়া পড়িল। গাভীকে ধাওয়া করিবার সময় তাহারা হযরত খালিদ ও তাঁহার সঙ্গীদের কাছাকাছি আসিয়া পড়িল। অমনি মুসলমানগণ উকায়দিরকে পাকড়াও করিল, কিন্তু তাহার ভাই হাসান মুসলমানদের সহিত মুকাবিলা করিতে গিয়া নিহত হইল। উকায়দিরের গায়ে ছিল স্বর্ণ খচিত রেশমী জুব্বা। খালিদ (রা) তাহা খুলিয়া রাসূলুল্লাহ (স)-এর নিকট পাঠাইয়া দিলেন।
খালিদ তাহাকে বলিলেন, তোমাকে মৃত্যুর হাত হইতে রেহাই দিতে পারি যদি তুমি আমার সহিত রাসূলুল্লাহ (স)-এর কাছে যাইতে রাযী হও। উকায়দির রাযী হইলে খালিদ (রা) তাহাকে সঙ্গে লইয়া রাসূলুল্লাহ (স)-এর দরবারে হাযির হন। উকায়দির দুই হাজার উট, আট শত ঘোড়া, দুই হাজার এক শত পঞ্চাশ মণ গম, চার শত লৌহবর্ম ও চার শত বর্শা প্রদানের শর্তে রাসূলুল্লাহ (স) তাহার প্রাণভিক্ষা দেন এবং সন্ধি স্থাপিত হয় (উয়ূনুল আছার, ২খ., পৃ. ২৫৯-২৬০; The Life of Muhammad, p. 450)। রাসূলুল্লাহ (স) গনীমতের মাল হইতে এক-পঞ্চমাংশ নিজের জন্য রাখিয়া বাকীগুলি সাহাবীদের মধ্যে বণ্টন করিয়া দেন (আত-তাবাকাতুল কুবরা, ২খ., পৃ. ১৬৬)।
'আল্লামা যামাশারী বলেন, রাসূলুল্লাহ (স) মদীনার মসজিদে বসিয়া তাবুকের যুদ্ধলব্ধ গনীমতের মাল বণ্টন করেন এবং প্রত্যেক সাহাবীকে এক নির্দিষ্ট ভাগ প্রদান করেন, কিন্তু হযরত আলী (রা)-কে দেন দুই ভাগ। যাইদা ইবনুল আক্তয়া নামক জনৈক সাহাবী দাঁড়াইয়া নিবেদন করেন, ইয়া রাসূলাল্লাহ। আলীকে দুই ভাগ দেওয়ার ব্যাপারে কি আসমান হইতে ওহী নাযিল হইয়াছে, না আপনি এমনি দিতেছেন? রাসূলুল্লাহ (স) জবাবে বলেন: আমি তোমাদিগকে আল্লাহ্র কসম দিয়া জিজ্ঞাসা করি, তোমরা নিজেদের সেনাবাহিনীর ডানপার্শ্বে কি এমন এক অশ্বারোহীকে দেখ নাই যাহার মাথায় ছিল সবুজ বর্ণের পাগড়ী, পাগড়ীর দুই প্রান্ত তাহার দুই কাঁধে ঝুলন্ত ছিল, তাহার ডান হস্তে ছিল বর্শা, ঘোড়াটির মাথা ও পাগুলি ছিল শ্বেত বর্ণের? উপস্থিত সাহাবীগণ বলিলেন, হাঁ, দেখিয়াছি। রাসূলুল্লাহ (স) বলিলেন: তিনি ছিলেন জিবরাঈল। তিনি আমাকে হুকুম দিয়াছেন যেন তাহার অংশ হযরত আলীকে দেই।
ইহা শুনিয়া যাইদা বলিলেন, ভাগ্যবান ব্যক্তি! এইজন্য তিনি দুই ভাগ পাইয়াছেন। আমি বুঝিতে পারিয়াছি (সীরাতুল হালাবীয়া, ৫খ., পৃ. ৪৩৬)।
দূমাতুল জানদালের গভর্নর উকায়দিরের সহিত রাসূলুল্লাহ (স)-এর যে সন্ধি হয় তাহার লিখিত বর্ণনা নিম্নরূপ:
بسم الله الرحمن الرحيم هذا كتاب من محمد رسول الله لاكيدر حين اجاب الى الاسلام وخلع الانداد والاصنام مع خالد بن الوليد سيف الله فى دومة الجندل واكنافها وان لنا الضاحية من الضحل والبور والمعامى واعفال الارض والخلقه والسلاح والحافر والحض ولكم الضامنة من الخل والمعين من المعمور بعد الخمس لا تعدل سارحتكم ولا تعد فاردتكم ولا يحظر عليكم النات ولا يوخذ منكم عشر البتات تقيمون الصلاة لوقتها وتؤتون الزكاة لحقها عليكم بذلك العهد والميثاق ولكم بذلك الصدق والوفاء شهد الله ومن حضر من المسلمين.
“দয়াময় পরম দয়ালু আল্লাহ্ নামে— এই চুক্তি আল্লাহর রাসূল মুহাম্মদের পক্ষ হইতে উকায়দিরের জন্য, যখন সে দূমাতুল জানদাল ও ইহার পার্শ্ববর্তী এলাকায় আল্লাহর তরবারি খালিদ ইবনুল ওয়ালীদের সহিত মিলিত হওয়ার পর মূর্তি ও প্রতিমা বর্জন করিয়া ইসলামের ডাকে সাড়া দিয়াছে। নিশ্চয় স্বল্প পানিবিশিষ্ট, অনুর্বর অনির্ধারিত সীমানা ও জমিসহ বর্ম, অস্ত্র, অশ্ব ও দুর্গ আমাদের থাকিবে। আর তোমাদের কাছে থাকিবে খেজুর বাগান এবং পানিবিশিষ্ট আবাদী এলাকা। এইসব 'বুম্স' (এক-পঞ্চমাংশ) আদায়ের পর তোমাদের বিচরণরত পশুসমূহ (উট) হিসাবের আওতায় আসিবে না এবং তোমাদের পালিত বিক্ষিপ্ত ছাগল- ভেড়াসমূহ গণনায় ধরা হইবে না। উর্বর ভূমি চাষাবাদ করিতে তোমাদের উপর কোন নিষেধাজ্ঞা নাই। যাকাতবিহীন বস্তুসমূহের 'উশর' (এক-দশমাংশ) তোমাদের নিকট হইতে আদায় করা হইবে না। তোমরা ওয়াক্ত মত নামায আদায় করিবে এবং যথাযথ যাকাত আদায় করিবে। এই চুক্তি ও প্রতিশ্রুতি রক্ষা করা তোমাদের দায়িত্ব। বিনিময়ে তোমরা পাইবে আমাদের পক্ষ হইতে সততা ও বিশ্বস্ততা। আল্লাহ তা'আলা ও উপস্থিত মুসলমানগণ উহার সাক্ষী" (কিতাবুল মাগাযী, ২খ., পৃ. ১০৩০)।
আনাস ইবন মালিক (রা) বলেন, আমি উকায়দিরের জুব্বাটি দেখিয়াছি, যখন উহা রাসূলুল্লাহ (স)-এর সম্মুখে আনয়ন করা হয়। উপস্থিত মুসলমানগণ জুব্বাটি হাত দিয়া বারবার স্পর্শ করিতেছেন এবং কারুকার্য দেখিয়া বিস্মিত হইতেছেন। ইহা লক্ষ্য করিয়া রাসূলুল্লাহ (স) বলেন: তোমরা ইহাতে এত আশ্চর্য হইতেছ?
والله المناديل سعد بن معاذ في الجنة احسن من هذا. "আল্লাহর কসম! জান্নাতে সা'দ ইব্ন মু'আযের রুমাল ইহার তুলনায় অনেক বেশী উৎকৃষ্ট হইবে"।
বন্যগাভী প্রসঙ্গে তাঈ গোত্রের জনৈক কবি নিম্নোক্ত কবিতা রচনা করেন: تبارك سائق البقرات انى + رايت الله يهدى كل هادى فمن يك حائد عن ذى تبوك + فانا قد امرنا بالجهاد.
"গাভীকে যিনি বাহির করিয়া আনিয়াছিলেন, বরকতময় তিনি। আমি তো দেখি আল্লাহ পথ দেখান পথের দিশারীকে। তাবুক অভিযাত্রী হইতে কেহ যদি চাহে সরিয়া যাইতে যাক না; আমরা তো আদিষ্ট হইয়াছি জিহাদের জন্য।” (ইব্ন হিশাম, আস-সীরাতুন নাবাবিয়্যা, ২খ., পৃ. ৫২৬-৭; তারীখে তাবারী, ৩খ., পৃ. ১০৯; উষুনুল আছার, ৩খ., পৃ. ২৫৯; কিতাবুল মাগাযী, ৩খ., পৃ. ১০২৮)।
📄 যুদ্ধের কারণ
প্রথমত, কাফিরদের বিরুদ্ধে আল্লাহ তা’আলা যেই জিহাদ ফরয করিয়াছেন তাবুকের যুদ্ধ ছিল তাহারই ধারাবাহিক অংশ। মক্কা ও মদীনার পার্শ্ববর্তী এলাকার কাফিরগণ ইতোমধ্যে জিযয়া দেওয়ার শর্তে সন্ধিসূত্রে আবদ্ধ হইয়াছে অথবা ইসলাম গ্রহণ করিয়া যাকাত দিতে সম্মত হইয়াছে। নিকট এলাকার অভিযান শেষ করিয়া রাসূলুল্লাহ (স) দূরবর্তী সিরিয়া অভিমুখে জিহাদ পরিচালনা যুক্তিযুক্ত মনে করিলেন। ইতোপূর্বে তিনি সিরিয়ার কাফিরদেরকে পত্রের মাধ্যমে ইসলামের দাওয়াত প্রদান করিয়াছেন। এইবার জিহাদী অভিযানের মাধ্যমে ইসলামের বিজয় সুনিশ্চিত করা ছিল রাসূলুল্লাহ (স)-এর তাবুক যুদ্ধের অন্যতম কারণ।
দ্বিতীয়ত, এই যুদ্ধের অন্যতম কারণ ছিল রোমান শাসিত প্রতিবেশী সরকারগুলিকে ভীত-চকিত করিয়া তোলা যাহাতে ইসলামের কেন্দ্রভূমি ও ইসলামের উঠতি দাওয়াত এবং ক্রমবর্ধমান শক্তি ও সামর্থ্যকে ক্ষতিগ্রস্ত করিতে না পারে। এই যুদ্ধের মাধ্যমে সেইসব হুকুমতকে সতর্ক করিবার দরকার ছিল, তাহারা যেন তাহাদের ভূখণ্ড হইতে মুসলমানদের উপর আক্রমণ পরিচালনার স্পর্ধা ও দুঃসাহস না দেখায় এবং তাহাদিগকে পর্যুদস্ত করা যাইবে এমনটিও যেন না ভাবে (নবীয়ে রহমত, পৃ. ১০১-২)। এই প্রসঙ্গে আল্লাহ তা’আলা বলেন:
يَأَيُّهَا الَّذِينَ آمَنُوا قَاتِلُوا الَّذِينَ يَلُونَكُمْ مِّنَ الكُفَّارِ وَلَيَجِدُوا فِيكُمْ غِلْظَةً وَاعْلَمُوا أَنَّ اللَّهَ مَعَ الْمُتَّقِينَ.
“হে মু’মিনগণ! কাফিরদের মধ্যে যাহারা তোমাদের নিকটবর্তী তাহাদের সহিত যুদ্ধ কর এবং উহারা যেন তোমাদের মধ্যে কঠোরতা দেখিতে পায়। জানিয়া রাখ, আল্লাহ তো মুত্তাকীদের সহিত আছেন” (৯:১২৩)।
তৃতীয়ত, সিরিয়ার নাবাতী (نبتی) ব্যবসায়িগণ যায়তুন তৈল ক্রয় করিবার উদ্দেশ্যে প্রায়শ মদীনায় যাতায়াত করিত। তাহাদের মাধ্যমে রাসূলুল্লাহ (স) জানিতে পারিলেন যে, রোমান সম্রাট হিরাক্লিয়াস মুসলমানদের মুকাবিলা করিবার জন্য সিরিয়ার সীমান্তে এক লাখ সেনা সদস্য মোতায়েন করিয়াছে। সৈন্যদের মনোবল অটুট রাখিবার জন্য এক বৎসরের অগ্রিম বেতন ও সাজসরঞ্জাম সরবরাহ করা হইয়াছে। লাখম, জুযাম, আমিলা ও গাসসান গোত্রের লোকেরাও খৃস্টান বাহিনীর সহিত যোগ দিয়াছে। তাহাদের উদ্দেশ্য হইতেছে প্রচণ্ড আক্রমণের মাধ্যমে উদীয়মান মুসলিম শক্তিকে নিশ্চিহ্ন করিয়া দেওয়া এবং আরবের উত্তরাংশ সিরিয়ায় রোমানদের এবং পূর্বাংশ হীরায় ইরানীদের শাসন প্রতিষ্ঠিত করা। ইতোমধ্যে রোমান বাহিনীর অগ্রবর্তী দল ‘বালকা’ নামক স্থানে পৌঁছিয়া গিয়াছিল (তাবাকাতুল কুবরা, ২খ., পৃ. ১৬৫; কিতাবুল মাগাযী, ৩ খ., পৃ. ৯৯০)। হিরাক্লিয়াস স্বয়ং অভিযান পরিচালনার উদ্দেশ্যে হিস্স নামক স্থানে অবস্থান করিতেছিলেন। ইহাকে তাবুক যুদ্ধের অন্যতম প্রধান কারণরূপে বিবেচনা করা হয়।
চতুর্থত, আরবের খৃস্টানগণ রোমান সম্রাট হিরাক্লিয়াসের নিকট লিখিত এক পত্রে জানায় যে, মদীনায় যেই ব্যক্তি নবী দাবি করিয়াছেন তাহার মৃত্যু হইয়াছে। এখন মদীনায় প্রচণ্ড গরম, অভাব-অনটন ও দুর্ভিক্ষ চলিতেছে। এই মুহূর্তে যদি অভিযান পরিচালনা করা যায় তাহা হইলে অনায়াসে মদীনা দখল করা যাইবে। হিরাক্লিয়াস পত্র প্রাপ্তির পর চল্লিশ হাজার সৈন্যের অগ্রবর্তী দল প্রেরণ করেন (মাজমা'উয যাওয়াইদ, ৬খ., পৃ. ১৯১; শিবলী নু'মানী, সীরাতুন্নবী, ১খ., পৃ. ৩২৩)।
পঞ্চমত, মদীনায় ইসলামের শক্তি উত্তরোত্তর বৃদ্ধি পাইতে থাকায় মুনাফিকদের নেতা আবূ 'আমের রাহিব রোমান সম্রাটের সহিত যোগাযোগ করিয়া মদীনা আক্রমণের জন্য প্ররোচিত করে। মুনাফিকগণ রোমানদের যুদ্ধ প্রস্তুতির অতিরঞ্জিত খবর মুসলমানদের মধ্যে প্রচার করিতে লাগিল যাহাতে মুসলমানদের মধ্যে ভীতির সঞ্চার হয়। কিন্তু মুনাফিকরা লক্ষ্য করিল যে, সব ক্ষেত্রেই আল্লাহ্র রাসূল (স) সফল হইতেছেন এবং তিনি বিশ্বের কোন শক্তিকেই ভয় পান না। তাঁহাঁর সম্মুখে যে কোন বাধা আসিলেই তাহা ছিন্নভিন্ন হইয়া যায়। এতদসত্ত্বেও মুনাফিকগণ আশা করিয়াছিল যে, মুসলমানরা এইবার আর রক্ষা পাইবে না। সেই প্রত্যাশিত তামাশা দেখিবার দিন আর বেশী দূরে নয়। মুনাফিকগণ তাহাদের নীলনকশা বাস্তবায়ন করিবার অসৎ উদ্দেশ্যে মদীনার প্রাণকেন্দ্রে একটি মসজিদ নির্মাণ করিল যাহা 'মসজিদ দিরার' (দ্র. ৯: ১০৭) নামে পরিচিত। মসজিদ নাম দিলেও ইহা ছিল মূলত ষড়যন্ত্রের আস্তানা। মুসলমানদের মধ্যে বিভেদ সৃষ্টি, সামাজিক ঐক্যে ফাটল ধরানো ও রোমান সম্রাটের সহিত যোগাযোগসহ নানা রকম চক্রান্ত চূড়ান্ত হইত এই আস্তানায়। মুসলমানদের ধোঁকা দেওয়ার উদ্দেশ্যে তাহারা একদা রাসূলুল্লাহ (স)-কে তাহাদের নির্মিত এই মসজিদে নামায আদায়ের জন্য অনুরোধ করে। কারণ আল্লাহর রাসূল (স) যদি একবার এই ঘরে নামায আদায় করেন তাহা হইলে সাধারণ মুসলমানগণ মুনাফিকদের প্রতিষ্ঠিত মসজিদ নামক এই আখড়ার ঘৃণ্য উদ্দেশ্য সম্পর্কে মোটেই জানিতে পারিবে না, এমনকি ধারণাও করিতে পারিবে না কিরূপ জঘন্য ষড়যন্ত্র এইখানে চলিতেছে। কিন্তু আল্লাহ্র রাসূল (স) সেই মসজিদে তাৎক্ষণিকভাবে নামায আদায় করিতে রাজী হইলেন না। তিনি বলিলেন, ইনশাআল্লাহ যুদ্ধ হইতে প্রত্যাবর্তন করিয়া সেই মসজিদে নামায আদায় করিব। সেই সময় তিনি যুদ্ধের প্রস্তুতিতে ব্যস্ত ছিলেন। কিন্তু মুনাফিকরা তাহাদের উদ্দেশ্য সফল করতে পারে নাই। মহান আল্লাহ তাহাদের ষড়যন্ত্র ফাঁস করিয়া দেন। তাবুক যুদ্ধ হইতে প্রতাবর্তন করিয়া রাসূলুল্লাহ (স) ষড়যন্ত্রের সেই আখড়া অগ্নিসংযোগ করিয়া বিধ্বস্ত করিয়া দেন (আর-রাহীকুল মাখতুম, বাংলা সংস্করণ, পৃ. ৪৮২)।
📄 মসজিদ নির্মাণ
রাসূলুল্লাহ (স) তাবুকে অবস্থানকালে একটি মসজিদের ভিত্তি স্থাপন করেন। মদীনা হইতে তাবুক, তাবুক হইতে মদীনা যাওয়া-আসার পথে রাসূলুল্লাহ (স) সাহাবীদের লইয়া যেইসব স্থানে নামায আদায় করেন পরবর্তীতে সেইসব জায়গায় সতেরটি মসজিদ নির্মিত হয়। মসজিদসমূহ হইতেছেঃ (১) তাবৃকের মসজিদ, (২) ছানিয়াতুল মাদারানের মসজিদ, (৩) যাতুয যিরাবের মসজিদ, (৪) আখদারের মসজিদ, (৫) যাতুল খুতামী মসজিদ, (৬) আলারের মসজিদ, (৭) তারাফুল বাতরা মসজিদ, (৮) শিক্কু তারা মসজিদ, (৯) যুল-জীফা মসজিদ, (১০) সাদর হাউদী মসজিদ, (১১) হিজরের মসজিদ, (১২) আস-সাঈদ মসজিদ, (১৩) ওয়াদিউল কুরা মসজিদ, (১৪) আর-রুক্'আ মসজিদ, (১৫) যুল-মারওয়া মসজিদ, (১৬) আল ফিফা মসজিদ, (১৭) যু'খুশব মসজিদ (ইব্ন হিশাম, আস-সীরাতুন নাবাবিয়্যা, ২খ., পৃ. ৫৩০-১)।