📄 ফুল্স যুদ্ধবন্দীদের সাথে মুসলিম বাহিনীর আচরণ
ফুল্স অভিযান সমাপ্ত হওয়ার পর বানু নাবহান গোত্রের কালোদাস তায়্যি সম্প্রদায়ের গুপ্তচর আসলাম আলী (রা)-কে অনুরোধ করিল তাহাকে মুক্ত করিবার জন্য। আলী (রা) তাহাকে বলিলেন:
تشهد أن لا إله إلا الله وأن محمدا رسول الله.
"তুমি সাক্ষ্য দাও যে, আল্লাহ ছাড়া অন্য কোন ইলাহ নাই এবং মুহাম্মাদ আল্লাহ্র রাসূল," তাহা হইলে তোমাকে মুক্ত করা হইবে।
তখন কালো দাস বলিল, আমি আমার সম্প্রদায়ের যুদ্ধবন্দীদের দীনের উপর প্রতিষ্ঠিত রহিয়াছি। তাহাদের ভাগ্যে যাহা ঘটিবে আমার ভাগ্যেও তাহাই ঘটিবে। আলী (রা) তাহাকে বলিলেন, তুমি কি তাহাদিগকে বন্দী অবস্থায় দেখিতে পাইতেছ না? তাহাদের মত তোমাকেও বাঁধিয়া রাখা হইবে। দাস বলিল, হাঁ, আমি একাকী মুক্ত হওয়ার চেয়ে উক্ত যুদ্ধবন্দীদের সাথে বন্দী হইয়া থাকা অত্যন্ত পছন্দ করি। তাহাদের উপর যেই সমস্ত বিপদ-আপদ আসিবে আমার উপরও তাহাই আসিবে। মুসলিম বাহিনী উক্ত দাসের কথা শুনিয়া হাসিয়া উঠিল। অতঃপর কালো দাসকে যুদ্ধবন্দীদের সাথে বাধিয়া রাখা হইল। তখন দাস বলিল, আমি যুদ্ধবন্দীদের অভিমতের সাথে একমত পোষণ করি। তখন যুদ্ধবন্দীদের মধ্য হইতে একজন বলিল: তোমাকে এইজন্য ধন্যবাদ দিব না। কেননা তুমি মুসলিম বাহিনীকে আমাদের নিকট পথ দেখাইয়া লইয়া আসিয়াছ। অন্য একজন যুদ্ধবন্দী বলিল, তোমাকে ধন্যবাদ, কারণ তোমার নিকট হইতে ইহার চেয়ে বেশি পাওয়ার কিছু নাই। তোমার যে অবস্থা হইয়াছে আমাদের উপর এমন হইলে আমরা ইহা হইতে বেশি কিছু করিতাম তুমি যাহা করিয়াছ। অতঃপর দাসটি নিরাশ হইয়া পড়িল। তখন সে সৈন্যশিবিরে আসিয়া মুসলিম বাহিনীর হাতে ধৃত বন্দীদের সাথে একত্র হইল। অতঃপর মুসলিম যোদ্ধাগণ যুদ্ধবন্দীদের নিকটবর্তী হইয়া ইসলামের দাওয়াত পেশ করিল। আর ঘোষণা করা হইল : فمن أسلم ترك ومن أبي ضربت عنقه "যুদ্ধবন্দীদের মধ্যে যে ব্যক্তি ইসলাম গ্রহণ করিবে তাহাকে ছাড়িয়া দেওয়া হইবে। আর যেই ব্যক্তি ইসলাম গ্রহণে অস্বীকার করিবে তাহাকে হত্যা করা হইবে"।
অতঃপর যুদ্ধবন্দীদের মধ্য হইতে যাহারা ইসলাম গ্রহণে আগ্রহী ছিল তাহারা আগাইয়া আসিয়া এবং ইসলাম গ্রহণ করিয়া মুক্ত হইল। আর যাহারা ইসলাম গ্রহণ করিতে অস্বীকার করিল তাহাদিগকে হত্যা করা হইল (আল-ওয়াকিদী, কিতাবুল মাগাযী, ৩খ., পৃ. ৯৮৭-৯৮৮)।
উল্লেখ্য যে, সাফফানা বিন্ত হাতিম উক্ত শর্তে যুদ্ধবন্দীদের অন্তর্ভুক্ত ছিলেন না। কেননা তাহাকে রাসূলুল্লাহ (স)-এর দাসী হিসাবে উক্ত ঘটনার পূর্বেই পৃথক করা হইয়াছিল।
আর রাসূলুল্লাহ (স)-এর নিকট পৌঁছানোর নিমিত্ত তাহাকে হযরত রামলাহ্ বিন্দুল হারিছ (রা)-এর গৃহে রাখা হইয়াছিল। তিনি বন্দী হওয়ার পর কোন সাহাবীর মুখ দর্শন করেন নাই এবং তাহার মুখও কোন সাহাবী দর্শন করেন নাই। এমতাবস্থায় রাসূলুল্লাহ (স) তাহাকে স-সম্মানে বাহন, উপঢৌকন ও পাথেয় দিয়া মুক্ত করিয়া দিলেন (আল-ওয়াকিদী, কিতাবুল মাগাযী, ৩খ., পৃ. ৯৮৮-৯৮৯)।
📄 ফুল্স অভিযানের ফলাফল
হযরত আলী (রা)-এর সেনাপতিত্বে পরিচালিত ফুল্স অভিযানের ফলাফল ছিল গুরুত্বপূর্ণ। ইহা মুসলমানদের জন্য চতুর্দিক হইতে কল্যাণ বহিয়া আনিয়াছিল। উক্ত অভিযানের ফলাফল নিম্নে তুলিয়া ধরা হইল:
১. ফুল্স দেবালয় ধ্বংস হইয়া আগুনে জ্বলিয়া ভস্মীভূত হইল এবং বানু তায়্যি-এর বসতি পরিপূর্ণ মূর্তিমুক্ত পবিত্র ভূমিতে পরিণত হইল।
২. তায়্যি বসতিতে এবং তায়্যি সম্প্রদায়ে অমুসলিম কোন ব্যক্তি আর বাকী থাকিল না অর্থাৎ সকলেই মুসলমান হইয়া গেল।
৩. উট, গরু, ছাগল, যুদ্ধাস্ত্র, রসদপত্র যাহা তায়্যিদের হস্তগত ছিল ইহা সবই মুসলিম বাহিনীর মাঝে গনীমত হিসাবে পরিগণিত হইল।
৪ হযরত 'আদী ইব্ন্ন হাতিম (রা) রাসূলুল্লাহ (স)-এর উপর ঈর্ষাপরায়ণ ছিলেন এবং ভয়ে সিরিয়ায় পলায়ন করিয়াছিলেন ইসলাম হইতে দূরে থাকার জন্য। আর আল্লাহর রাসূল (স) তাহার জন্য দু'আ করিলেন এই বলিয়া:
إني لأرجوا الله أن يجعل يده في يدي.
"নিশ্চয় আমি আল্লাহর সমীপে এই কামনা করি যে, 'আদী ইব্ন হাতিমের হাত যেন আল্লাহ তা'আলা আমার হাতের মধ্যে নত করিয়া দেন"। উহা বাস্তবে পরিণত হইল।
(৫) সাফ্ফানা বিন্ত হাতিম রাসূলুল্লাহ (স)-এর আচার-ব্যবহারে তুষ্ট হইয়া তাঁহার প্রতি অনুগত হইয়া যান এবং সিরিয়া গনন করিয়া 'আদী ইব্ন হাতিম (রা)-কে রাসূলুল্লাহ (স)-এর নিকট ইসলাম গ্রহণ করার জন্য প্রেরণ করিলেন।