📄 আদী ইবন হাতিমের ইসলাম গ্রহণ
'আদী ইব্ন হাতিমের ধনভাণ্ডারে অথবা ফুলস-এর ভাণ্ডারে তিনটি ইয়ামানী তলোয়ার ও তিনটি বর্ম পাওয়া গিয়াছিল। আলী (রা) যুদ্ধবন্দী দাসীদের তত্ত্বাধানের দায়িত্ব অর্পণ করিলেন হযরত কাতাদা (রা)-এর নিকট, রসদ ভাণ্ডার দেখাশুনার দায়িত্বভার ন্যস্ত করিলেন আবদুল্লাহ ইব্ন আতীক আস-সুলামী (রা)-এর নিকট।
আলী (রা) তায়্যি-এর একটি পাহাড়ের পাদদেশে উপস্থিত হইয়া দাসী ও বকরী তথা গনীমতের মাল বণ্টন করিলেন এবং রাসূলুল্লাহ (স)-এর জন্য সেনাধ্যক্ষের নির্ধারিত অংশ-তলোয়ার, বর্ম, এক-পঞ্চমাংশ ও সাফ্ফানা বিন্ত হাতিমকে গনীমতের মাল হইতে পৃথক করিলেন।
'আদী ইব্ন হাতিম-এর সহোদরা সাফফানাকে বণ্টন না করিয়া রামলা বিন্ত আল-হারিছ (রা)-এর ঘরে অবস্থান করিতে দেওয়া হইল। এদিকে 'আদী ইব্ন হাতিম যখন জানিতে পারিলেন আলী (রা) তায়্যি অভিযানে আসিতেছেন তখন তিনি অত্যন্ত সতর্কতার সাথে সিরিয়া (শাম) পলায়ন করিলেন। কেননা তাহার একজন গুপ্তচর মদীনায় ইতোপূর্বে তথ্য সংগ্রহের জন্য নিয়োজিত ছিল (আল-ওয়াকিদী, কিতাবুল মাগাযী, ৩খ., পৃ. ৯৮৪-৯৮৯)।
আদী ইব্ন হাতিমের ইসলাম গ্রহণ
'আদী ইব্ন হাতিম বলেন, আমার নিয়েজিত গুপ্তচর একদিন সকালবেলা আমার নিকট আসিয়া বলিল, হে আদী! মুহাম্মাদের সেনাবাহিনী আপনার উপর হামলা চালাইলে আপনি যাহা করিতে চাহিয়াছিলেন তাহাই করিয়া ফেলুন, কারণ আমি বই পতাকা দেখিতে পাইয়াছি। সেই সম্পর্কে জিজ্ঞাসা করিলে লোকেরা বলিয়াছে যে, ইহা মুহাম্মাদের পতাকা। অতঃপর আদী বলেন : আমার উটগুলি আমার নিকট লইয়া আস। সে তাহা আমার নিকট লইয়া আসিল। আমি আমার পরিবারবর্গ ও সন্তানদের সাথে নিলাম এবং বলিলাম, আমি সিরিয়ায় আমার স্বধর্মীয় খৃস্টানদের কাছে চলিয়া যাইব। এই বলিয়া আমি জাওশিয়া মতান্তরে হাওশিয়া (নজদের একটি পাহাড়ের নাম)-এর পথ ধরিয়া অগ্রসর হইলাম এবং আমার সহোদর সাফ্ফানাকে বানু তায়্যি-এর এলাকায় রাখিয়া গেলাম।
অতঃপর রাসূলুল্লাহ (স)-এর বাহিনী আমার পশ্চাদ্ধাবন করিল। বানু তায়্যির অনেকে বন্দী হইল যাহাদের মধ্যে সাফ্ফানাও ছিল। বানু তায়্যি-এর বন্দীদের সঙ্গে তাহাকেও রাসূলুল্লাহ (স)-এর নিকট উপস্থিত করা হইল। আমার সিরিয়ায় পলায়নের কথাও তাহার কানে পৌছিল।
সাফ্ফানাকে মসজিদের সামনে খোঁয়াড়ের মত একটি স্থানে রাখা হইল। বন্দীদিগকে তাহার মধ্যে আটকাইয়া রাখা হইত। রাসূলুল্লাহ (স) সেখান দিয়া যাইতেছিলেন। অন্য বর্ণনামতে হযরত রামলা বিন্ত আল-হারিছ (রা)-এর গৃহে বন্দী ছিল যেখান দিয়া রাসূলুল্লাহ (স) যাইতেছিলেন। সাফ্ফানা রাসূলুল্লাহ (স)-এর মুখামুখি হইলেন। তিনি ছিলেন বুদ্ধিমতী ও স্পষ্টভাষিণী। তিনি বলিলেন:
يا رسول الله هلك الوالد وغاب الوافد فأمنن علينا من الله عليك كل ذلك يسألها رسول الله ﷺ من وافدك فتقول عدي بن حاتم فيقول الفار من الله ورسوله حتى یئست.
"ইয়া রাসূলুল্লাহ (স)। আমার পিতা মারা গিয়াছেন এবং যিনি আমার দেখাশুনা করিতেন তিনিও আমাকে ফেলিয়া গিয়াছেন। আপনি আমার প্রতি সদয় হউন। আল্লাহ তা'আলা আপনার প্রতি সদয় হইবেন। রাসূলুল্লাহ (স) বলিলেনঃ কে তোমার দেখাশুনা করিত? তিনি বলিলেন, হাতিমের পুত্র আদী। 'রাসূলুল্লাহ (স) বলিলেন: আল্লাহ ও তাঁহার রাসূল হইতে পলায়নকারী? অবশেষে তিনি নিরাশ হইয়া পড়িলেন"।
অতঃপর রাসূলুল্লাহ (স) তাহাকে রাখিয়া চলিয়া গেলেন। পরবর্তী দিন রাসূলুল্লাহ (স) সাফ্ফানার নিকট দিয়া অতিক্রম করিলেন। তিনি রাসূলুল্লাহ (স)-কে গত দিনের মতই বলিলেন। রাসূলুল্লাহ (স)-ও গত দিনের মতই জবাব দিয়াছিলেন। এইভাবে তৃতীয় দিনও একই অবস্থা ঘাটল। অতঃপর সাফ্ফানা রাসূলুল্লাহ (স)-এর পক্ষ হইতে কোন অনুগ্রহ লাভের ব্যাপারে চরম হতাশ হইয়া পড়িলেন। এই সময় তাহার পিছন হইতে আলী (রা) ইশারা করিয়া বলিলেন, দাঁড়াইয়া যাও, রাসূলুল্লাহ (স)-এর সাথে পুনরায় কথা বল। অতএব আমি রাসূলুল্লাহ (স)-এর সামনে দাঁড়াইলাম এবং পুনরায় বলিলাম, ইয়া রাসূলাল্লাহ! আমার পিতা গত হইয়াছেন। যিনি আমার দেখাশুনা করিতেন তিনিও আমাকে একা ফেলিয়া গিয়াছেন। আপনি আমার প্রতি অনুগ্রহ করুন, আল্লাহ তা'আলাও আপনার প্রতি অনুগ্রহ করিবেন। রাসূলুল্লাহ (স) বলিলেন, আমি অনুগ্রহ করিয়াছি। কিন্তু তুমি চলিয়া যাওয়ার জন্য তাড়াহুড়া করিও না যতক্ষণ না তোমার সম্প্রদায়ের নির্ভরযোগ্য কোন লোককে পাও, যে তোমাকে তোমার দেশে পৌছাইয়া দিবে। এমন কোন লোক পাওয়া গেলে আমাকে জানাইও।
আমি অপেক্ষা করিতে থাকিলাম। অবশেষে বানু বালী অথবা বানু কুদা'আ গোত্রের একটি কাফেলার আগমন ঘটিল। আমার ইচ্ছা ছিল সিরিয়ায় আমার ভাই 'আদীর নিকট চলিয়া যাইব। আমি রাসূলুল্লাহ (স)-এর নিকট গিয়া বলিলাম, ইয়া রাসূলাল্লাহ! আমার সম্প্রদায়ের একটি কাফেলা আসিয়াছে। তাহাতে এমন লোকও রহিয়াছে, যে নির্ভরযোগ্য এবং আমাকে জায়গামত পৌছাইয়া দিবে। অতএব রাসূলুল্লাহ (স) আমাকে কাপড়-চোপড়, বাহন ও পথখরচ দিলেন। আমি তাহা লইয়া কাফেলার সঙ্গে বাহির হইয়া পড়িলাম এবং সিরিয়ায় চলিয়া আসিলাম।
'আদী ইব্ন হাতিম বলেন, আল্লাহর শপথ! আমি আমার পরিবারবর্গের মাঝে বসা ছিলাম। সহসা দেখিলাম একজন স্ত্রীলোক হাওদার ভিতরে এবং সে আমাদের দিকে আগাইয়া আসিতেছে। আমি বলিয়া উঠিলাম, হাতিম তনয়া (সাফফানা)। ঠিকই দেখা গেল সে হাতিমের কন্যাই অর্থাৎ আমার সহোদর বোন। সে আমার সম্মুখে আসিয়া আমাকে চরম তিরস্কার করিয়া বলিতে লাগিল, সম্পর্কচ্ছেদকারী জালিম! নিজের বউ-ছেলে নিয়া চলিয়া আসিয়াছ, আর বাবার অসহায় কুমারী মেয়েকে ফেলিয়া আসিয়াছ!
আমি বলিলাম, প্রিয় ভগিনী! রাগ করিও না। আল্লাহর কসম! আমার এই অপরাধ অমার্জনীয় ঠিকই- তুমি যাহা বলিয়াছ আমি তাহাই করিয়াছি। 'আদী বলেন, অতঃপর সে নামিয়া আসিল এবং আমার নিকট থাকিতে লাগিল। সে ছিল ভীষণ বুদ্ধিমতী। আমি একদিন তাহাকে জিজ্ঞাসা করিলাম, এই লোকটির বিষয় তুমি কী মনে কর। সে বলিল, আল্লাহ্র কসম! তুমি অতি শীঘ্র তাঁহার নিকট চলিয়া যাও। কারণ তিনি যদি নবী হইয়া থাকেন তাহা হইলে যাহারা আগে তাহার সঙ্গে সাক্ষাত করিবে তিনি তাহাদের প্রতি সদয় হইবেন। আর যদি তিনি রাজা হন তাহা হইলে তাঁহার মহত্ত্বপূর্ণ গৌরবে তুমি ছোট হইবে না। তুমি তুমিই থাকিবে। আমি বলিলাম, হাঁ, ইহাই বিজ্ঞজনোচিত অভিমত।
'আদী ইব্ন হাতিম (রা) বলিলেন, তখন আমি রওয়ানা হইয়া মদীনায় রাসূলুল্লাহ (স)-এর নিকট পৌঁছিলাম। তিনি মসজিদে বসাছিলেন। আমি তাঁহার নিকট প্রবেশ করিয়া তাঁহাকে সালাম দিলাম। তিনি বলিলেন, কে এই লোক? বলিলাম, 'আদী ইব্ন্ন হাতিম। রাসূলুল্লাহ (স) উঠিয়া আমাকে তাঁহার ঘরে নিয়া গেলেন। আল্লাহ্র কসম! তিনি যখন আমাকে তাঁহার ঘরে লইয়া যাইতেছিলেন তখন পথিমধ্যে এক জীর্ণশীর্ণ বৃদ্ধার সাথে তাঁহার সাক্ষাত হয়। বৃদ্ধা তাঁহাকে দাঁড়াইতে বলিলে তিনি দাঁড়াইয়া যান। বৃদ্ধা দীর্ঘক্ষণ তাঁহার প্রয়োজন সম্পর্কে তাঁহার সঙ্গে কথা বলিল। আমি মনে মনে বলিলাম, আল্লাহ্র শপথ। ইনি কিছুতেই রাজা নহেন।
ইহার পর তিনি আমাকে লইয়া অগ্রসর হইলেন এবং গৃহের ভিতর প্রবেশ করিয়া একটি বালিশ আমার দিকে বাড়াইয়া দিলেন। তাহার উপরে ছিল চামড়া, ভিতরে খেজুরের বাকল। তিনি বলিলেন, ইহার উপর বস। আমি বলিলাম, বরং আপনিই ইহাতে বসুন। তিনি বলিলেন, না, তুমিই বস। সুতরাং আমি উহার উপর বসিয়া পড়িলাম। রাসূলুল্লাহ (স) বসিলেন মাটিতে। আমি মনে মনে বলিলাম, আল্লাহ্র কসম! ইহা রাজকীয় আচরণ নয়।
ইহার পর রাসূলুল্লাহ (স) আমাকে বলিলেনঃ বলতো হে 'আদী! তুমি কি 'রাক্সী' (খৃস্টান ও সাবিঈ ধর্মের মাঝামাঝি একটা ধর্মের অনুসারী) নও? আমি বলিলাম, তাই বটে। তিনি বলিলেন, তুমি কি তোমার সম্প্রদায়ের যুদ্ধলব্ধ সম্পদের এক-চতুর্থাংশ লাভ করিতে না? আমি বলিলাম, হাঁ। তিনি বলিলেন: তোমার ধর্ম অনুযায়ী তো উহা তোমার জন্য বৈধ ছিল না। আমি বলিলাম, আল্লাহ্র কসম! যথার্থ বলিয়াছেন।
অতঃপর 'আদী ইবন হাতিম (রা) বলিলেন, এতক্ষণে আমার বুঝিতে বাকী থাকিল না যে, তিনি আল্লাহ্র রাসূল। যা বলা হয় নাই তাহাও তিনি জানেন। অতঃপর তিনি বলিলেন, হে 'আদী! এই দীন গ্রহণে হয়তবা তোমাকে এই জিনিস বাধা দিয়া থাকিবে যে, তুমি তাহাদিগকে অভাব-অভিযোগে জর্জরিত দেখিয়াছ। কিন্তু আল্লাহ্র কসম! সেই দিন বেশী দূরে নয় যখন তুমি শুনিতে পাইবে, একজন স্ত্রীলোক সুদূর কাদিসিয়া হইতে উটের পিঠে সওয়ার হইয়া বায়তুল্লাহতে পৌছিয়া যিয়ারত করিবে। রাস্তা-ঘাটে সে কোন কিছুর ভয় করিবে না। হয়ত-বা এই জিনিস তোমাকে বাধা দিয়া থাকিবে যে, তুমি অন্যদের মধ্যে দেখিয়াছ রাজত্ব ও বাদশাহী। কিন্তু আল্লাহর শপথ! সেই দিন বেশী দূরে নয় যখন শুনিতে পাইবে বাবিলের শ্বেত প্রাসাদগুলি মুসলিমদের হাতে বিজিত হইয়া গিয়াছে। 'আদী (রা) বলিলেন, এই কথার পর আমি ইসলাম গ্রহণ করিলাম (ইবন হিশাম, সীরাতুন নবী, পৃ. ৩০৯; ৪খ., পৃ. ২৪৩-২৪৬; ইবন ইসহাক, সীরাতে রাসূলুল্লাহ (স), ৩খ., পৃ. ৬২৮-৬৩০; আসাহ্হুস সিয়ার, পৃ. ৩১৩-৩১৫)।
📄 ফুল্স যুদ্ধবন্দীদের সাথে মুসলিম বাহিনীর আচরণ
ফুল্স অভিযান সমাপ্ত হওয়ার পর বানু নাবহান গোত্রের কালোদাস তায়্যি সম্প্রদায়ের গুপ্তচর আসলাম আলী (রা)-কে অনুরোধ করিল তাহাকে মুক্ত করিবার জন্য। আলী (রা) তাহাকে বলিলেন:
تشهد أن لا إله إلا الله وأن محمدا رسول الله.
"তুমি সাক্ষ্য দাও যে, আল্লাহ ছাড়া অন্য কোন ইলাহ নাই এবং মুহাম্মাদ আল্লাহ্র রাসূল," তাহা হইলে তোমাকে মুক্ত করা হইবে।
তখন কালো দাস বলিল, আমি আমার সম্প্রদায়ের যুদ্ধবন্দীদের দীনের উপর প্রতিষ্ঠিত রহিয়াছি। তাহাদের ভাগ্যে যাহা ঘটিবে আমার ভাগ্যেও তাহাই ঘটিবে। আলী (রা) তাহাকে বলিলেন, তুমি কি তাহাদিগকে বন্দী অবস্থায় দেখিতে পাইতেছ না? তাহাদের মত তোমাকেও বাঁধিয়া রাখা হইবে। দাস বলিল, হাঁ, আমি একাকী মুক্ত হওয়ার চেয়ে উক্ত যুদ্ধবন্দীদের সাথে বন্দী হইয়া থাকা অত্যন্ত পছন্দ করি। তাহাদের উপর যেই সমস্ত বিপদ-আপদ আসিবে আমার উপরও তাহাই আসিবে। মুসলিম বাহিনী উক্ত দাসের কথা শুনিয়া হাসিয়া উঠিল। অতঃপর কালো দাসকে যুদ্ধবন্দীদের সাথে বাধিয়া রাখা হইল। তখন দাস বলিল, আমি যুদ্ধবন্দীদের অভিমতের সাথে একমত পোষণ করি। তখন যুদ্ধবন্দীদের মধ্য হইতে একজন বলিল: তোমাকে এইজন্য ধন্যবাদ দিব না। কেননা তুমি মুসলিম বাহিনীকে আমাদের নিকট পথ দেখাইয়া লইয়া আসিয়াছ। অন্য একজন যুদ্ধবন্দী বলিল, তোমাকে ধন্যবাদ, কারণ তোমার নিকট হইতে ইহার চেয়ে বেশি পাওয়ার কিছু নাই। তোমার যে অবস্থা হইয়াছে আমাদের উপর এমন হইলে আমরা ইহা হইতে বেশি কিছু করিতাম তুমি যাহা করিয়াছ। অতঃপর দাসটি নিরাশ হইয়া পড়িল। তখন সে সৈন্যশিবিরে আসিয়া মুসলিম বাহিনীর হাতে ধৃত বন্দীদের সাথে একত্র হইল। অতঃপর মুসলিম যোদ্ধাগণ যুদ্ধবন্দীদের নিকটবর্তী হইয়া ইসলামের দাওয়াত পেশ করিল। আর ঘোষণা করা হইল : فمن أسلم ترك ومن أبي ضربت عنقه "যুদ্ধবন্দীদের মধ্যে যে ব্যক্তি ইসলাম গ্রহণ করিবে তাহাকে ছাড়িয়া দেওয়া হইবে। আর যেই ব্যক্তি ইসলাম গ্রহণে অস্বীকার করিবে তাহাকে হত্যা করা হইবে"।
অতঃপর যুদ্ধবন্দীদের মধ্য হইতে যাহারা ইসলাম গ্রহণে আগ্রহী ছিল তাহারা আগাইয়া আসিয়া এবং ইসলাম গ্রহণ করিয়া মুক্ত হইল। আর যাহারা ইসলাম গ্রহণ করিতে অস্বীকার করিল তাহাদিগকে হত্যা করা হইল (আল-ওয়াকিদী, কিতাবুল মাগাযী, ৩খ., পৃ. ৯৮৭-৯৮৮)।
উল্লেখ্য যে, সাফফানা বিন্ত হাতিম উক্ত শর্তে যুদ্ধবন্দীদের অন্তর্ভুক্ত ছিলেন না। কেননা তাহাকে রাসূলুল্লাহ (স)-এর দাসী হিসাবে উক্ত ঘটনার পূর্বেই পৃথক করা হইয়াছিল।
আর রাসূলুল্লাহ (স)-এর নিকট পৌঁছানোর নিমিত্ত তাহাকে হযরত রামলাহ্ বিন্দুল হারিছ (রা)-এর গৃহে রাখা হইয়াছিল। তিনি বন্দী হওয়ার পর কোন সাহাবীর মুখ দর্শন করেন নাই এবং তাহার মুখও কোন সাহাবী দর্শন করেন নাই। এমতাবস্থায় রাসূলুল্লাহ (স) তাহাকে স-সম্মানে বাহন, উপঢৌকন ও পাথেয় দিয়া মুক্ত করিয়া দিলেন (আল-ওয়াকিদী, কিতাবুল মাগাযী, ৩খ., পৃ. ৯৮৮-৯৮৯)।
📄 ফুল্স অভিযানের ফলাফল
হযরত আলী (রা)-এর সেনাপতিত্বে পরিচালিত ফুল্স অভিযানের ফলাফল ছিল গুরুত্বপূর্ণ। ইহা মুসলমানদের জন্য চতুর্দিক হইতে কল্যাণ বহিয়া আনিয়াছিল। উক্ত অভিযানের ফলাফল নিম্নে তুলিয়া ধরা হইল:
১. ফুল্স দেবালয় ধ্বংস হইয়া আগুনে জ্বলিয়া ভস্মীভূত হইল এবং বানু তায়্যি-এর বসতি পরিপূর্ণ মূর্তিমুক্ত পবিত্র ভূমিতে পরিণত হইল।
২. তায়্যি বসতিতে এবং তায়্যি সম্প্রদায়ে অমুসলিম কোন ব্যক্তি আর বাকী থাকিল না অর্থাৎ সকলেই মুসলমান হইয়া গেল।
৩. উট, গরু, ছাগল, যুদ্ধাস্ত্র, রসদপত্র যাহা তায়্যিদের হস্তগত ছিল ইহা সবই মুসলিম বাহিনীর মাঝে গনীমত হিসাবে পরিগণিত হইল।
৪ হযরত 'আদী ইব্ন্ন হাতিম (রা) রাসূলুল্লাহ (স)-এর উপর ঈর্ষাপরায়ণ ছিলেন এবং ভয়ে সিরিয়ায় পলায়ন করিয়াছিলেন ইসলাম হইতে দূরে থাকার জন্য। আর আল্লাহর রাসূল (স) তাহার জন্য দু'আ করিলেন এই বলিয়া:
إني لأرجوا الله أن يجعل يده في يدي.
"নিশ্চয় আমি আল্লাহর সমীপে এই কামনা করি যে, 'আদী ইব্ন হাতিমের হাত যেন আল্লাহ তা'আলা আমার হাতের মধ্যে নত করিয়া দেন"। উহা বাস্তবে পরিণত হইল।
(৫) সাফ্ফানা বিন্ত হাতিম রাসূলুল্লাহ (স)-এর আচার-ব্যবহারে তুষ্ট হইয়া তাঁহার প্রতি অনুগত হইয়া যান এবং সিরিয়া গনন করিয়া 'আদী ইব্ন হাতিম (রা)-কে রাসূলুল্লাহ (স)-এর নিকট ইসলাম গ্রহণ করার জন্য প্রেরণ করিলেন।