📄 অভিযানের কারণ
বানু তায়্যি গোত্রের সর্দার বিখ্যাত দাতা হাতিম তাঈ-এর সুষ্ঠু নেতৃত্ব ও প্রচেষ্টায় বানু তায়্যি সম্প্রদায় তৎকালীন আরব জাহানে বিশেষ খ্যাতি অর্জন করিয়াছিল। কবি-সাহিত্যিকদের রচিত অসংখ্য বিস্ময়কর চিত্তাকর্ষক কিংবদন্তী অদ্যাবধি দাতা হাতিম তাঈয়ের নামে প্রচলিত আছে। তিনি মানবসেবা, অনাথ-অসহায়দের আশ্রয়দান ও সার্বজনীন কল্যাণে নিজেকে আজীবন নিয়োজিত রাখিয়াছিলেন। তিনি জন্মগতভাবে খৃস্টান হইলেও দীনে হানীফের অনুসরণ করিতেন। তাহার কার্যকলাপ, চালচলন, আকীদা-বিশ্বাস ইসলামের প্রায় অনুকূল ছিল। তিনি রাসূলুল্লাহ (স)-এর সমকালীন ছিলেন। কিন্তু তাহার জীবদ্দশায় ইসলামের দাওয়াত তাহার নিকট পৌছে নাই। কিন্তু হাতিমের সন্তান 'আদী ইব্ন হাতিম পিতার মত যোগ্যতাসম্পন্ন হইতে পারেন নাই।
হাতিমের মৃত্যুর পর তায়্যি গোত্রের অনেকে তাহাদের দেবালয়ে পূজা-অর্চনা করিত। রাসূলুল্লাহ (স) তায়্যি সম্প্রদায়ের দেবালয় ফুল্স ধ্বংস করিয়া তাহাদিগকে ইসলামের দাওয়াত দিয়া মুসলমান করার জন্য হযরত আলী ইব্ন আবূ তালিব (রা)-কে এক শত পঞ্চাশজন আনসার সাহাবীর সমন্বয়ে সৈন্যদলের সেনাধ্যক্ষ করিয়া পাঠাইলেন (আল-মাওয়াহিবুল লাদুন্নিয়্যা, ১খ., পৃ. ৬২০)। ইহা ছাড়াও ইতোপূর্বে তায়্যি গোত্রের প্রতিনিধি দল রাসূলুল্লাহ (স)-এর নিকট উপস্থিত হইয়া তাঁহার সঙ্গে কথাবার্তা বলিয়াছিল। তিনি তাহাদিগকে ইসলামের দাওয়াত দিলেন। তাহারা সকলেই ইসলাম গ্রহণ করিল। উক্ত প্রতিনিধি দলের প্রধান ছিলেন যায়দ আল-খায়ল। তিনি রাসূলুল্লাহ (স)-এর নিকট থেকে বিদায় নিয়া নজদের কাছাকাছি ফারদা নামক একটি জলাশয়ের নিকট পৌছান। তিনি জ্বরে আক্রান্ত হন এবং সেখানেই ইস্তিকাল করেন। যায়দ আল-খায়লের নাম রাসূলুল্লাহ (স) পরিবর্তন করিয়া যায়দ আল-খায়র (উৎকৃষ্ট যায়দ) রাখেন। তায়্যি গোত্রে ইসলামের পরিপূর্ণ দাওয়াত প্রেরণের পূর্বে যায়দ আল-খায়রের মৃত্যুতে সেখানে ইসলামের দায়াত দিতে এবং সেখানে অবস্থিত মূর্তি মন্দির ধ্বংস করিতে সারিয়্যা প্রেরণ অপরিহার্য ছিল। সেইজন্য রাসূলুল্লাহ্ (স) এক সারিয়্যা হযরত আলী ইবন আবি তালিব (রা)-এর নেতৃত্বে প্রেরণ করিলেন (ইবন হিশাম, সীরাতুন্নবী, ৪খ., পৃ. ২৪২-২৪৩)।
📄 মূল ঘটনা
রসূলুল্লাহ (স) হযরত আলী (রা)-কে সেনাপতি নিয়োগ করিয়া আওস ও খাযরাজ গোত্রের এক শত পঞ্চাশ জন অশ্বারোহী ও উষ্ট্রারোহী দলকে পর্যাপ্ত সমরাস্ত্র ও রসদপত্রসহ প্রেরণ করিয়াছিলেন। সৈন্যবাহিনীর একশ জন ছিল উষ্ট্রারোহী এবং পঞ্চাশ জন ছিল অশ্বারোহী। তাহারা দুইটি দলে বিভক্ত হইয়া রওয়ানা হইয়াছিল। তাহারা কালো ও সাদা পতাকা লইয়া অভিযানে বাহির হইয়াছিল। হযরত সাহল ইবন হুনায়ফ (রা) ছিলেন কালো পতাকা বহনকারী এবং হযরত জাব্বার ইবন সাখর আস-সুলামী (রা) ছিলেন সাদা পতাকা বহনকারী।
হুরায়ছ নামে বানু আসাদ গোত্রের একজন পথ-প্রদর্শককে সঙ্গে লইয়া পাহাড়ের পথ ধরিয়া সৈন্যগণ রওয়ানা হইল। তাহারা তাহাদের গন্তব্যের শেষ সীমায় পৌঁছাইলে পথপ্রদর্শক বলিল, আজ গোত্রের বাহিনীর সঙ্গে আপনাদের চূড়ান্ত বোঝাপড়া হইবে।
মুসলিম সৈন্যগণ অত্যন্ত সতর্কতার সহিত দিনের বেলা পথ অতিক্রম না করিয়া রাত্রিবেলা রওয়ানা হইয়া সম্প্রদায়ের খুব কাছে পৌছিয়া গেলেন। ইতোপূর্বে মুসলিম সৈন্যবাহিনীর মধ্য হইতে ছোট একটি দল তায়্যি সম্প্রদায়ের অবস্থান স্থল, দেবালয়, সৈন্যসামন্ত ও সার্বিক অবস্থা পর্যবেক্ষণ করার জন্য প্রেরিত হইল। উক্ত দলের সদস্যগণ হইলেন- (১) হযরত আবূ কাতাদা (রা), (২) হযরত হুবাব ইবনুল মুনযির (রা) ও (৩) হযরত আবূ নায়িলাহ (রা)। তাঁহারা সঙ্গোপণে তায়্যি সম্প্রদায়ের সৈন্যশিবিরের চতুর্দিকে তদারকি করিতে করিতে হঠাৎ তায়্যি সম্প্রদায়ের বানু নাবহান বংশের আসলাম নামের এক কালো গোলামকে পাইলেন। সে তাহার সম্প্রদায় কর্তৃক মুহাম্মাদ (স) প্রেরিত বাহিনীর তথ্য অনুসন্ধানের জন্য গুপ্তচর হিসাবে কর্তব্যরত ছিল। সে তাহার অপর গুপ্তচর ভাই-এর অপেক্ষায় ছিল। সে মুসলিম বাহিনীর অগ্রবর্তী দল দেখিয়া দ্রুত না পালাইয়া তাহার সাথীর অপেক্ষায় থাকিয়া মুসলিম বাহিনীর হাতে ধৃত হইল এবং হযরত আলী ইব্ন আবু তালিব (রা)-এর নিকট আনীত হইল। তাহার অপর গুপ্তচর সাথী মুসলিম বাহিনীর সৈন্যসংখ্যা, সওয়ারী সংখ্যা ও রসদপত্র ইত্যাদি ভালো করিয়া অনুসন্ধান করিতে যাইয়া নিরুদ্দেশ হইয়া গেল। অর্থাৎ সে মদীনা গিয়াছিল। সম্ভবত সে আদী ইব্ন হাতিম তায়্যিকে সংবাদ দিয়া দেশ হইতে পালাইতে সাহায্য করিয়াছিল। কেননা আদী ইবন হাতিম তায়্যি (রা) ইসলাম গ্রহণের পর বলিয়াছেন, রাসূলুল্লাহ (স)-এর কথা শুনিবার পর আমি তাঁহাকে যতটুকু ঘৃণা করিয়াছি, আরবের আর কোন লোক তাহাকে এতটুকু ঘৃণা করে নাই। আমি ছিলাম এক অভিজাত বংশের লোক এবং ধর্মবিশ্বাসে ছিলাম খৃস্টান। আমার সম্প্রদায়ের যুদ্ধলব্ধ সম্পদের এক-চতুর্থাংশ আমি লাভ করিতাম। কারণ আমি ছিলাম তাহাদের নেতা। আমি মনে মনে একটি ধর্মবিশ্বাস পোষণ করিতাম। আবার আমার প্রতি আমার সম্প্রদায়ের আচার-ব্যবহার দৃষ্টে আমি ছিলাম তাহাদের রাজা সদৃশ। রাসূলুল্লাহ (স) সম্পর্কে যখন আমি শুনিতে পাইলাম, তখন তাঁহার প্রতি আমার প্রচণ্ড ঘৃণা হইল। আমার উটের রাখাল, এক আরব গোলামকে আমি বলিলাম, তুমি বাপহারা হও। কিছু বেগবান ও হৃষ্টপুষ্ট উট সকল সময় আমার কাছাকাছি প্রস্তুত রাখিবে। আর যখন শুনিবে মুহাম্মাদের সৈন্য আমাদের এই অঞ্চলে পদার্পণ করিয়াছে তখন আমাকে জানাইবে যাহাতে আমি সপরিবারে পালাইতে পারি (ইবন হিশাম, সীরাতুন্নবী, ৪খ., পৃ. ২৪৩-২৪৪)।
হযরত আলী (রা) তাহাকে জিজ্ঞাসা করিলেন, তুমি কে? সে বলিল, আমি বিদ্রোহী। তখন আলী (রা) তাহাকে খুব শক্ত করিয়া বাঁধিতে বলিলেন। আর তাহাকে তাহার নিজের সম্প্রদায়ের নিকট মুসলিম সেনাবাহনীকে লইয়া যাওয়ার নির্দেশ দিলেন। কালো দাস আসলাম অনন্যাপায় হইয়া তাহাদিগকে নিয়া রওয়ানা হইল বটে কিন্তু ভুল পথে। শেষ রাত্রিতে সে বলিল, আমি ভুল পথে আসিয়াছি। পুনরায় তাহারা পূর্বের স্থানের দিকে রওয়ানা হইল। দাস ভাবিয়াছিল যে, এইভাবে সারা রাত অতিবাহিত করিতে পারিলে তায়্যি সম্প্রদায়ের নিকট পৌঁছাইবার পূর্বেই ভোর হইয়া যাইবে এবং মুসলিম বাহিনী ক্লান্ত হইয়া পড়িবে। তাহা ছাড়া তাহার সম্প্রদায় ইহা জানিতে পারিবে এবং পরিপূর্ণ প্রস্তুতি নিয়া মুসলিম বাহিনীকে আক্রমণ করিবে যাহাতে তায়্যি সম্প্রদায় বিজয় লাভ করিতে পারে।
কিন্তু মুসলিম বাহিনী আসলাম নামের কালো দাসের প্রতারণা বুঝিতে পারিয়া তাহার গর্দানে তলোয়ার ঠেকাইয়া বলিল, তুমি আমাদের সহিত প্রতারণা করিতেছ। অতি সত্বর প্রতারণা ছাড়িয়া আমাদিগকে তায়্যি সম্প্রদায়ের আবাসস্থল ও মন্দিরে লইয়া চল। অন্যথা তুমি এই তলোয়ারের দ্বারা দ্বিখণ্ডিত হইবে। আলী (রা)-এর এই কাঠোর হুঁশিয়ারি শ্রবণ করিয়া দাস ভীত-বিহ্বল হইয়া পড়িল এবং পূর্বের প্রতারণামূলক আচরণ পরিত্যাগ করিয়া সোজা পথে মুসলিম বাহিনীকে তায়্যি সম্প্রদায়ের নিকটে পৌঁছাইয়া দিল। সেখানে মুসলিম বাহিনী তায়্যি সম্প্রদায়ের সৈন্যশিবিরে কুকুর, ঘোড়া, উটের নড়াচড়া ও ডাক শুনিতে পাইল। কিন্তু অন্ধকার রাত্রি বলিয়া তায়্যি সম্প্রদায় মুসলিম বাহিনীর আগমন সংক্রান্ত কোন তথ্যই পায় নাই। ইহা ছাড়া তাহাদিগকে তথ্য দেওয়ার জন্য নিয়োজিত গুপ্তচর আসলাম ধৃত হইয়াছে। সেইজন্য তাহারা আক্রমণ করিবার প্রস্তুতিও গ্রহণ করিতে পারে নাই এবং আক্রান্ত হইলে পলায়ন করিবার মত পর্যাপ্ত বাহনও তাহাদের নিকট ছিল না।
মুসলিম বাহিনী তাহাদের মুখামুখি হইয়া কিছুটা দুর্বল হইয়া পড়িল। তাহারা কোনক্রমেই টের পায় নাই যে, মুসলিম বাহিনী তাহাদিগকে চতুর্দিকে ঘিরিয়া ফেলিয়াছে। অতঃপর মুসলিম বাহিনী ভোরের অপেক্ষায় রহিল। ফজরের সময় হইলে তাহার তায়্যি সম্প্রদায়ের উপর অতর্কিত হামলা করিয়া তাহাদিগকে ছিন্নবিচ্ছিন্ন করিয়া দিল, তাহাদের দেবাল্বয় ধ্বংস করিয়া আগুন ধরাইয়া দিল এবং যাহাদিগকে সম্মুখে পাইল তাহাদিগকে হত্যা করিল। তায়্যি সম্প্রদায়ের মধ্যভাগে হাতিমের বংশধর ছিল। হাতিম বংশের এক সদস্য ছিলেন সাফ্ফানা বিন্ত হাতিম, আদী ইব্ন হাতিমের বোন। সাফ্ফানা ছিলেন অতিশয় সুন্দরী রমণী। তাহার সহিত অন্যান্য তায়্যি সম্প্রদায়ের মহিলা, সন্তান-সন্তুতি, গৃহপালিত পশু, রসদপত্র সবই মুসলিম বাহিনীর হস্তগত হইল। যুদ্ধলব্ধ মাল বণ্টনের পূর্বেই সাফফানাকে সেনাপতির জন্য পৃথক করা হইল। আলী (রা) সাফফানাকে রসূলুল্লাহ (স)-এর জন্য সসম্মানে যুদ্ধবন্দী হিসাবে প্রেরণ করিলেন। তাহার সাথে অন্যান্য যুদ্ধবন্দী মহিলারাও ছিল।
'আদী ইব্ন হাতিমের ধনভাণ্ডারে অথবা ফুলস-এর ভাণ্ডারে তিনটি ইয়ামানী তলোয়ার ও তিনটি বর্ম পাওয়া গিয়াছিল। আলী (রা) যুদ্ধবন্দী দাসীদের তত্ত্বাধানের দায়িত্ব অর্পণ করিলেন হযরত কাতাদা (রা)-এর নিকট, রসদ ভাণ্ডার দেখাশুনার দায়িত্বভার ন্যস্ত করিলেন আবদুল্লাহ ইব্ন আতীক আস-সুলামী (রা)-এর নিকট।
আলী (রা) তায়্যি-এর একটি পাহাড়ের পাদদেশে উপস্থিত হইয়া দাসী ও বকরী তথা গনীমতের মাল বণ্টন করিলেন এবং রাসূলুল্লাহ (স)-এর জন্য সেনাধ্যক্ষের নির্ধারিত অংশ-তলোয়ার, বর্ম, এক-পঞ্চমাংশ ও সাফ্ফানা বিন্ত হাতিমকে গনীমতের মাল হইতে পৃথক করিলেন।
📄 আদী ইবন হাতিমের ইসলাম গ্রহণ
'আদী ইব্ন হাতিমের ধনভাণ্ডারে অথবা ফুলস-এর ভাণ্ডারে তিনটি ইয়ামানী তলোয়ার ও তিনটি বর্ম পাওয়া গিয়াছিল। আলী (রা) যুদ্ধবন্দী দাসীদের তত্ত্বাধানের দায়িত্ব অর্পণ করিলেন হযরত কাতাদা (রা)-এর নিকট, রসদ ভাণ্ডার দেখাশুনার দায়িত্বভার ন্যস্ত করিলেন আবদুল্লাহ ইব্ন আতীক আস-সুলামী (রা)-এর নিকট।
আলী (রা) তায়্যি-এর একটি পাহাড়ের পাদদেশে উপস্থিত হইয়া দাসী ও বকরী তথা গনীমতের মাল বণ্টন করিলেন এবং রাসূলুল্লাহ (স)-এর জন্য সেনাধ্যক্ষের নির্ধারিত অংশ-তলোয়ার, বর্ম, এক-পঞ্চমাংশ ও সাফ্ফানা বিন্ত হাতিমকে গনীমতের মাল হইতে পৃথক করিলেন।
'আদী ইব্ন হাতিম-এর সহোদরা সাফফানাকে বণ্টন না করিয়া রামলা বিন্ত আল-হারিছ (রা)-এর ঘরে অবস্থান করিতে দেওয়া হইল। এদিকে 'আদী ইব্ন হাতিম যখন জানিতে পারিলেন আলী (রা) তায়্যি অভিযানে আসিতেছেন তখন তিনি অত্যন্ত সতর্কতার সাথে সিরিয়া (শাম) পলায়ন করিলেন। কেননা তাহার একজন গুপ্তচর মদীনায় ইতোপূর্বে তথ্য সংগ্রহের জন্য নিয়োজিত ছিল (আল-ওয়াকিদী, কিতাবুল মাগাযী, ৩খ., পৃ. ৯৮৪-৯৮৯)।
আদী ইব্ন হাতিমের ইসলাম গ্রহণ
'আদী ইব্ন হাতিম বলেন, আমার নিয়েজিত গুপ্তচর একদিন সকালবেলা আমার নিকট আসিয়া বলিল, হে আদী! মুহাম্মাদের সেনাবাহিনী আপনার উপর হামলা চালাইলে আপনি যাহা করিতে চাহিয়াছিলেন তাহাই করিয়া ফেলুন, কারণ আমি বই পতাকা দেখিতে পাইয়াছি। সেই সম্পর্কে জিজ্ঞাসা করিলে লোকেরা বলিয়াছে যে, ইহা মুহাম্মাদের পতাকা। অতঃপর আদী বলেন : আমার উটগুলি আমার নিকট লইয়া আস। সে তাহা আমার নিকট লইয়া আসিল। আমি আমার পরিবারবর্গ ও সন্তানদের সাথে নিলাম এবং বলিলাম, আমি সিরিয়ায় আমার স্বধর্মীয় খৃস্টানদের কাছে চলিয়া যাইব। এই বলিয়া আমি জাওশিয়া মতান্তরে হাওশিয়া (নজদের একটি পাহাড়ের নাম)-এর পথ ধরিয়া অগ্রসর হইলাম এবং আমার সহোদর সাফ্ফানাকে বানু তায়্যি-এর এলাকায় রাখিয়া গেলাম।
অতঃপর রাসূলুল্লাহ (স)-এর বাহিনী আমার পশ্চাদ্ধাবন করিল। বানু তায়্যির অনেকে বন্দী হইল যাহাদের মধ্যে সাফ্ফানাও ছিল। বানু তায়্যি-এর বন্দীদের সঙ্গে তাহাকেও রাসূলুল্লাহ (স)-এর নিকট উপস্থিত করা হইল। আমার সিরিয়ায় পলায়নের কথাও তাহার কানে পৌছিল।
সাফ্ফানাকে মসজিদের সামনে খোঁয়াড়ের মত একটি স্থানে রাখা হইল। বন্দীদিগকে তাহার মধ্যে আটকাইয়া রাখা হইত। রাসূলুল্লাহ (স) সেখান দিয়া যাইতেছিলেন। অন্য বর্ণনামতে হযরত রামলা বিন্ত আল-হারিছ (রা)-এর গৃহে বন্দী ছিল যেখান দিয়া রাসূলুল্লাহ (স) যাইতেছিলেন। সাফ্ফানা রাসূলুল্লাহ (স)-এর মুখামুখি হইলেন। তিনি ছিলেন বুদ্ধিমতী ও স্পষ্টভাষিণী। তিনি বলিলেন:
يا رسول الله هلك الوالد وغاب الوافد فأمنن علينا من الله عليك كل ذلك يسألها رسول الله ﷺ من وافدك فتقول عدي بن حاتم فيقول الفار من الله ورسوله حتى یئست.
"ইয়া রাসূলুল্লাহ (স)। আমার পিতা মারা গিয়াছেন এবং যিনি আমার দেখাশুনা করিতেন তিনিও আমাকে ফেলিয়া গিয়াছেন। আপনি আমার প্রতি সদয় হউন। আল্লাহ তা'আলা আপনার প্রতি সদয় হইবেন। রাসূলুল্লাহ (স) বলিলেনঃ কে তোমার দেখাশুনা করিত? তিনি বলিলেন, হাতিমের পুত্র আদী। 'রাসূলুল্লাহ (স) বলিলেন: আল্লাহ ও তাঁহার রাসূল হইতে পলায়নকারী? অবশেষে তিনি নিরাশ হইয়া পড়িলেন"।
অতঃপর রাসূলুল্লাহ (স) তাহাকে রাখিয়া চলিয়া গেলেন। পরবর্তী দিন রাসূলুল্লাহ (স) সাফ্ফানার নিকট দিয়া অতিক্রম করিলেন। তিনি রাসূলুল্লাহ (স)-কে গত দিনের মতই বলিলেন। রাসূলুল্লাহ (স)-ও গত দিনের মতই জবাব দিয়াছিলেন। এইভাবে তৃতীয় দিনও একই অবস্থা ঘাটল। অতঃপর সাফ্ফানা রাসূলুল্লাহ (স)-এর পক্ষ হইতে কোন অনুগ্রহ লাভের ব্যাপারে চরম হতাশ হইয়া পড়িলেন। এই সময় তাহার পিছন হইতে আলী (রা) ইশারা করিয়া বলিলেন, দাঁড়াইয়া যাও, রাসূলুল্লাহ (স)-এর সাথে পুনরায় কথা বল। অতএব আমি রাসূলুল্লাহ (স)-এর সামনে দাঁড়াইলাম এবং পুনরায় বলিলাম, ইয়া রাসূলাল্লাহ! আমার পিতা গত হইয়াছেন। যিনি আমার দেখাশুনা করিতেন তিনিও আমাকে একা ফেলিয়া গিয়াছেন। আপনি আমার প্রতি অনুগ্রহ করুন, আল্লাহ তা'আলাও আপনার প্রতি অনুগ্রহ করিবেন। রাসূলুল্লাহ (স) বলিলেন, আমি অনুগ্রহ করিয়াছি। কিন্তু তুমি চলিয়া যাওয়ার জন্য তাড়াহুড়া করিও না যতক্ষণ না তোমার সম্প্রদায়ের নির্ভরযোগ্য কোন লোককে পাও, যে তোমাকে তোমার দেশে পৌছাইয়া দিবে। এমন কোন লোক পাওয়া গেলে আমাকে জানাইও।
আমি অপেক্ষা করিতে থাকিলাম। অবশেষে বানু বালী অথবা বানু কুদা'আ গোত্রের একটি কাফেলার আগমন ঘটিল। আমার ইচ্ছা ছিল সিরিয়ায় আমার ভাই 'আদীর নিকট চলিয়া যাইব। আমি রাসূলুল্লাহ (স)-এর নিকট গিয়া বলিলাম, ইয়া রাসূলাল্লাহ! আমার সম্প্রদায়ের একটি কাফেলা আসিয়াছে। তাহাতে এমন লোকও রহিয়াছে, যে নির্ভরযোগ্য এবং আমাকে জায়গামত পৌছাইয়া দিবে। অতএব রাসূলুল্লাহ (স) আমাকে কাপড়-চোপড়, বাহন ও পথখরচ দিলেন। আমি তাহা লইয়া কাফেলার সঙ্গে বাহির হইয়া পড়িলাম এবং সিরিয়ায় চলিয়া আসিলাম।
'আদী ইব্ন হাতিম বলেন, আল্লাহর শপথ! আমি আমার পরিবারবর্গের মাঝে বসা ছিলাম। সহসা দেখিলাম একজন স্ত্রীলোক হাওদার ভিতরে এবং সে আমাদের দিকে আগাইয়া আসিতেছে। আমি বলিয়া উঠিলাম, হাতিম তনয়া (সাফফানা)। ঠিকই দেখা গেল সে হাতিমের কন্যাই অর্থাৎ আমার সহোদর বোন। সে আমার সম্মুখে আসিয়া আমাকে চরম তিরস্কার করিয়া বলিতে লাগিল, সম্পর্কচ্ছেদকারী জালিম! নিজের বউ-ছেলে নিয়া চলিয়া আসিয়াছ, আর বাবার অসহায় কুমারী মেয়েকে ফেলিয়া আসিয়াছ!
আমি বলিলাম, প্রিয় ভগিনী! রাগ করিও না। আল্লাহর কসম! আমার এই অপরাধ অমার্জনীয় ঠিকই- তুমি যাহা বলিয়াছ আমি তাহাই করিয়াছি। 'আদী বলেন, অতঃপর সে নামিয়া আসিল এবং আমার নিকট থাকিতে লাগিল। সে ছিল ভীষণ বুদ্ধিমতী। আমি একদিন তাহাকে জিজ্ঞাসা করিলাম, এই লোকটির বিষয় তুমি কী মনে কর। সে বলিল, আল্লাহ্র কসম! তুমি অতি শীঘ্র তাঁহার নিকট চলিয়া যাও। কারণ তিনি যদি নবী হইয়া থাকেন তাহা হইলে যাহারা আগে তাহার সঙ্গে সাক্ষাত করিবে তিনি তাহাদের প্রতি সদয় হইবেন। আর যদি তিনি রাজা হন তাহা হইলে তাঁহার মহত্ত্বপূর্ণ গৌরবে তুমি ছোট হইবে না। তুমি তুমিই থাকিবে। আমি বলিলাম, হাঁ, ইহাই বিজ্ঞজনোচিত অভিমত।
'আদী ইব্ন হাতিম (রা) বলিলেন, তখন আমি রওয়ানা হইয়া মদীনায় রাসূলুল্লাহ (স)-এর নিকট পৌঁছিলাম। তিনি মসজিদে বসাছিলেন। আমি তাঁহার নিকট প্রবেশ করিয়া তাঁহাকে সালাম দিলাম। তিনি বলিলেন, কে এই লোক? বলিলাম, 'আদী ইব্ন্ন হাতিম। রাসূলুল্লাহ (স) উঠিয়া আমাকে তাঁহার ঘরে নিয়া গেলেন। আল্লাহ্র কসম! তিনি যখন আমাকে তাঁহার ঘরে লইয়া যাইতেছিলেন তখন পথিমধ্যে এক জীর্ণশীর্ণ বৃদ্ধার সাথে তাঁহার সাক্ষাত হয়। বৃদ্ধা তাঁহাকে দাঁড়াইতে বলিলে তিনি দাঁড়াইয়া যান। বৃদ্ধা দীর্ঘক্ষণ তাঁহার প্রয়োজন সম্পর্কে তাঁহার সঙ্গে কথা বলিল। আমি মনে মনে বলিলাম, আল্লাহ্র শপথ। ইনি কিছুতেই রাজা নহেন।
ইহার পর তিনি আমাকে লইয়া অগ্রসর হইলেন এবং গৃহের ভিতর প্রবেশ করিয়া একটি বালিশ আমার দিকে বাড়াইয়া দিলেন। তাহার উপরে ছিল চামড়া, ভিতরে খেজুরের বাকল। তিনি বলিলেন, ইহার উপর বস। আমি বলিলাম, বরং আপনিই ইহাতে বসুন। তিনি বলিলেন, না, তুমিই বস। সুতরাং আমি উহার উপর বসিয়া পড়িলাম। রাসূলুল্লাহ (স) বসিলেন মাটিতে। আমি মনে মনে বলিলাম, আল্লাহ্র কসম! ইহা রাজকীয় আচরণ নয়।
ইহার পর রাসূলুল্লাহ (স) আমাকে বলিলেনঃ বলতো হে 'আদী! তুমি কি 'রাক্সী' (খৃস্টান ও সাবিঈ ধর্মের মাঝামাঝি একটা ধর্মের অনুসারী) নও? আমি বলিলাম, তাই বটে। তিনি বলিলেন, তুমি কি তোমার সম্প্রদায়ের যুদ্ধলব্ধ সম্পদের এক-চতুর্থাংশ লাভ করিতে না? আমি বলিলাম, হাঁ। তিনি বলিলেন: তোমার ধর্ম অনুযায়ী তো উহা তোমার জন্য বৈধ ছিল না। আমি বলিলাম, আল্লাহ্র কসম! যথার্থ বলিয়াছেন।
অতঃপর 'আদী ইবন হাতিম (রা) বলিলেন, এতক্ষণে আমার বুঝিতে বাকী থাকিল না যে, তিনি আল্লাহ্র রাসূল। যা বলা হয় নাই তাহাও তিনি জানেন। অতঃপর তিনি বলিলেন, হে 'আদী! এই দীন গ্রহণে হয়তবা তোমাকে এই জিনিস বাধা দিয়া থাকিবে যে, তুমি তাহাদিগকে অভাব-অভিযোগে জর্জরিত দেখিয়াছ। কিন্তু আল্লাহ্র কসম! সেই দিন বেশী দূরে নয় যখন তুমি শুনিতে পাইবে, একজন স্ত্রীলোক সুদূর কাদিসিয়া হইতে উটের পিঠে সওয়ার হইয়া বায়তুল্লাহতে পৌছিয়া যিয়ারত করিবে। রাস্তা-ঘাটে সে কোন কিছুর ভয় করিবে না। হয়ত-বা এই জিনিস তোমাকে বাধা দিয়া থাকিবে যে, তুমি অন্যদের মধ্যে দেখিয়াছ রাজত্ব ও বাদশাহী। কিন্তু আল্লাহর শপথ! সেই দিন বেশী দূরে নয় যখন শুনিতে পাইবে বাবিলের শ্বেত প্রাসাদগুলি মুসলিমদের হাতে বিজিত হইয়া গিয়াছে। 'আদী (রা) বলিলেন, এই কথার পর আমি ইসলাম গ্রহণ করিলাম (ইবন হিশাম, সীরাতুন নবী, পৃ. ৩০৯; ৪খ., পৃ. ২৪৩-২৪৬; ইবন ইসহাক, সীরাতে রাসূলুল্লাহ (স), ৩খ., পৃ. ৬২৮-৬৩০; আসাহ্হুস সিয়ার, পৃ. ৩১৩-৩১৫)।
📄 ফুল্স যুদ্ধবন্দীদের সাথে মুসলিম বাহিনীর আচরণ
ফুল্স অভিযান সমাপ্ত হওয়ার পর বানু নাবহান গোত্রের কালোদাস তায়্যি সম্প্রদায়ের গুপ্তচর আসলাম আলী (রা)-কে অনুরোধ করিল তাহাকে মুক্ত করিবার জন্য। আলী (রা) তাহাকে বলিলেন:
تشهد أن لا إله إلا الله وأن محمدا رسول الله.
"তুমি সাক্ষ্য দাও যে, আল্লাহ ছাড়া অন্য কোন ইলাহ নাই এবং মুহাম্মাদ আল্লাহ্র রাসূল," তাহা হইলে তোমাকে মুক্ত করা হইবে।
তখন কালো দাস বলিল, আমি আমার সম্প্রদায়ের যুদ্ধবন্দীদের দীনের উপর প্রতিষ্ঠিত রহিয়াছি। তাহাদের ভাগ্যে যাহা ঘটিবে আমার ভাগ্যেও তাহাই ঘটিবে। আলী (রা) তাহাকে বলিলেন, তুমি কি তাহাদিগকে বন্দী অবস্থায় দেখিতে পাইতেছ না? তাহাদের মত তোমাকেও বাঁধিয়া রাখা হইবে। দাস বলিল, হাঁ, আমি একাকী মুক্ত হওয়ার চেয়ে উক্ত যুদ্ধবন্দীদের সাথে বন্দী হইয়া থাকা অত্যন্ত পছন্দ করি। তাহাদের উপর যেই সমস্ত বিপদ-আপদ আসিবে আমার উপরও তাহাই আসিবে। মুসলিম বাহিনী উক্ত দাসের কথা শুনিয়া হাসিয়া উঠিল। অতঃপর কালো দাসকে যুদ্ধবন্দীদের সাথে বাধিয়া রাখা হইল। তখন দাস বলিল, আমি যুদ্ধবন্দীদের অভিমতের সাথে একমত পোষণ করি। তখন যুদ্ধবন্দীদের মধ্য হইতে একজন বলিল: তোমাকে এইজন্য ধন্যবাদ দিব না। কেননা তুমি মুসলিম বাহিনীকে আমাদের নিকট পথ দেখাইয়া লইয়া আসিয়াছ। অন্য একজন যুদ্ধবন্দী বলিল, তোমাকে ধন্যবাদ, কারণ তোমার নিকট হইতে ইহার চেয়ে বেশি পাওয়ার কিছু নাই। তোমার যে অবস্থা হইয়াছে আমাদের উপর এমন হইলে আমরা ইহা হইতে বেশি কিছু করিতাম তুমি যাহা করিয়াছ। অতঃপর দাসটি নিরাশ হইয়া পড়িল। তখন সে সৈন্যশিবিরে আসিয়া মুসলিম বাহিনীর হাতে ধৃত বন্দীদের সাথে একত্র হইল। অতঃপর মুসলিম যোদ্ধাগণ যুদ্ধবন্দীদের নিকটবর্তী হইয়া ইসলামের দাওয়াত পেশ করিল। আর ঘোষণা করা হইল : فمن أسلم ترك ومن أبي ضربت عنقه "যুদ্ধবন্দীদের মধ্যে যে ব্যক্তি ইসলাম গ্রহণ করিবে তাহাকে ছাড়িয়া দেওয়া হইবে। আর যেই ব্যক্তি ইসলাম গ্রহণে অস্বীকার করিবে তাহাকে হত্যা করা হইবে"।
অতঃপর যুদ্ধবন্দীদের মধ্য হইতে যাহারা ইসলাম গ্রহণে আগ্রহী ছিল তাহারা আগাইয়া আসিয়া এবং ইসলাম গ্রহণ করিয়া মুক্ত হইল। আর যাহারা ইসলাম গ্রহণ করিতে অস্বীকার করিল তাহাদিগকে হত্যা করা হইল (আল-ওয়াকিদী, কিতাবুল মাগাযী, ৩খ., পৃ. ৯৮৭-৯৮৮)।
উল্লেখ্য যে, সাফফানা বিন্ত হাতিম উক্ত শর্তে যুদ্ধবন্দীদের অন্তর্ভুক্ত ছিলেন না। কেননা তাহাকে রাসূলুল্লাহ (স)-এর দাসী হিসাবে উক্ত ঘটনার পূর্বেই পৃথক করা হইয়াছিল।
আর রাসূলুল্লাহ (স)-এর নিকট পৌঁছানোর নিমিত্ত তাহাকে হযরত রামলাহ্ বিন্দুল হারিছ (রা)-এর গৃহে রাখা হইয়াছিল। তিনি বন্দী হওয়ার পর কোন সাহাবীর মুখ দর্শন করেন নাই এবং তাহার মুখও কোন সাহাবী দর্শন করেন নাই। এমতাবস্থায় রাসূলুল্লাহ (স) তাহাকে স-সম্মানে বাহন, উপঢৌকন ও পাথেয় দিয়া মুক্ত করিয়া দিলেন (আল-ওয়াকিদী, কিতাবুল মাগাযী, ৩খ., পৃ. ৯৮৮-৯৮৯)।