📘 সীরাত বিশ্বকোষ > 📄 যুদ্ধের পটভূমি

📄 যুদ্ধের পটভূমি


এই যুদ্ধের পটভূমি হিসাবে উল্লেখ করা যায় যে, মক্কা বিজয়ের পর মুসলমানগণ কয়েক দিন সেখানে অবস্থান করিতে থাকেন। বিনা রক্তপাতে এই বিরাট বিজয় ও অনন্য সাফল্য অর্জিত হইয়াছিল। এই পবিত্র নগরী বিজয় এবং সেখানে ইসলাম ও মুসলমানদের কর্তৃত্ব প্রতিষ্ঠিত হওয়ায় বহিরাগত ও স্থানীয় মুসলমান নির্বিশেষে সকলে আনন্দ প্রকাশ ও আল্লাহ্ শুকরিয়া জ্ঞাপন করিতেছিলেন। এই সুন্দর ও আনন্দঘন পরিবেশে মুসলমানদের পনর দিন অতিবাহিত হয়।
আরবের গোত্রসমূহ এতদিন যাবৎ কুরায়শদিগের প্রতীক্ষায় ছিল। কারণ তাহারা সিদ্ধান্ত করিয়া রাখিয়াছিল যে, কুরায়শগণ যদি মুহাম্মাদ (স)-এর বশ্যতা স্বীকার করিয়া লয়, তবে তিনি যে সত্য নবী, ইহা ধ্রুব সত্য বলিয়া স্বীকার্য হইবে। আকস্মিক অভিযানের মাধ্যমে মুসলমানদের মক্কা বিজয়, তাই কুরায়শসহ আরব গোত্রসমূহের মাঝে ব্যাপক প্রতিক্রিয়া সৃষ্টি করে। কিংকর্তব্যবিমূঢ় আরব গোত্রসমূহ উপায়ান্তর না দেখিয়া দলে দলে ইসলাম গ্রহণ করিতে থাকে। কিন্তু হুনায়ন উপত্যকার সন্নিকটে বসবাসরত হাওয়াযিন ও ছাকীফ গোত্রদ্বয়ের উপর ইহার বিপরীত প্রতিক্রিয়া দেখা দেয়। ইসলামের বিরুদ্ধে তাহাদের গাত্রদাহ চরমে পৌঁছে। তাহারা ছিল সংখ্যাবহুল, ক্ষমতাধর, সুনিপুণ যুদ্ধবাজ ও অপ্রতিদ্বন্দ্বী তীরন্দাজ। তাহাদের অপ্রতিরুদ্ধ প্রভাব-প্রতিপত্তি ও স্বাধিকার ব্যাহত হওয়ার আশংকায় মক্কা বিজয়ের সংবাদে তাহারা বিচলিত হইয়া উঠে। তাহারা ভাবিল যে, মুসলমানগণ তাহাদিগকেও রেহাই দিবে না। কারণ মুসলমানগণ আরবের সকল গোত্রকে ইসলামের পতাকাতলে ঐক্যবদ্ধ করিতে দৃঢ়সংকল্পবদ্ধ। এই আশংকায় হাওয়াযিন ও ছাকীফ গোত্রদ্বয় তাহাদের বন্ধু গোত্রগুলিকে লইয়া মুসলমানদের বিরুদ্ধে আক্রমণের পরিকল্পনা গ্রহণ করে (শিবলী নু'মানী, সীরাতুন নবী, খ., পৃ. ৫৩০; হযরত মুহাম্মদ (স) জীবনী বিশ্বকোষ, ১খ., পৃ. ৩৫)।
হাওয়াযিন ও ছাকীফ গোত্রের লোকেরা পরামর্শ করিয়া মক্কায় সমবেত মুসলমানদিগকে আক্রমণ করিবার সিদ্ধান্ত গ্রহণ করে। হাওয়াযিন গোত্রের সমস্ত উপ-গোত্রই অতি উৎসাহ ও আনন্দের সহিত এই যুদ্ধে যোগদান করে। তাহাদের সহিত নসর ও জুসাম গোত্রের লোকজন, সা'দ ইব্‌ন বাক্স গোত্র এবং বানু হিলালের কিছু সংখ্যক লোক আসিয়াও যোগ দিল। এইসব গোত্রের সম্পর্ক ছিল কায়স আয়লানের সঙ্গে। পরাজয় স্বীকারপূর্বক মুসলমানদের নিকট আত্মসমর্পণ করাকে তাহারা নিতান্ত অপমানজনক বলিয়া মনে করিয়াছিল। হাওয়াযিন গোত্রের বানু কা'ব ও বানু কিলাব শাখা গোত্রের নামী-দামী কেহ এই যুদ্ধাভিযানে অংশগ্রহণ করে নাই। ছাকীফ গোত্রের নেতা ছিল দুইজন। আহলাফের নেতা ছিল কারিব ইবনুল আসওয়াদ ইব্‌ন মাসউদ ইব্‌ন মুআত্তিব আর বানু মালিকের নেতা ছিল যুলখিমার সুবায় ইবনুল হারিছ ইবন মালিক এবং তাহার ভাই আহমার ইবন হারিছ। আর সামগ্রিকভাবে সকলের নেতৃত্বে ছিল বানু হাওয়াযিনের ত্রিশ বৎসর বয়সের দুর্ধর্ষ তরুণ নেতা মালিক ইব্‌ন আওফ নাসরী (ইবন হিশাম, সীরাতুন নবী, ৪খ., পৃ. ৮৭; আল-ওয়াকিদী, কিতাবুল মাগাযী, ৩খ, পৃ. ৮৮৫; তাবারী, তারীখুল উমাম ওয়াল-মুলুক, ২খ., পৃ. ৩৪৫; আর-রাহীকুল মাখতুম, পৃ. ৪১৩)। এই যুদ্ধ পরিচালনার দায়িত্ব তাহার উপরই অর্পিত হয়।

📘 সীরাত বিশ্বকোষ > 📄 যুদ্ধযাত্রা

📄 যুদ্ধযাত্রা


মালিক ইবন আওফের বাহিনী যুদ্ধের সর্বাত্মক প্রস্তুতি নিয়া যাত্রা শুরু করিল। সেনাপতির নির্দেশ মুতাবিক ধন-সম্পদ, পরিবার-পরিজন ও গবাদি পশুপাল সঙ্গে লওয়া হইল। সম্মুখভাগে অগ্রসর হইয়া তাহারা 'আওতাস' নামক উপত্যকায় শিবির স্থাপন করিল। ইহা হুনায়নের সন্নিকটে বানু হাওয়াযিন গোত্রের অঞ্চলভুক্ত একটি উপত্যকা (আর-রাহীকুল মাখতুম, পৃ. ৪১৩)। কাযী 'ইয়ায বলেন, আওতাস দার হাওয়াযিন-এর একটি উপত্যকা যাহা হুনায়ন যুদ্ধের স্থান। কতক ঐতিহাসিক এই মত সমর্থন করিয়াছেন। কিন্তু ইবন ইসহাকের বর্ণনামতে হুনায়ন ও আওতাস পৃথক দুইটি উপত্যকা। ইমাম বুখারী (র) আওতাস হুনায়নের বর্ণনা পৃথক দুইটি পরিচ্ছেদে উল্লেখ করিয়াছেন (মুহাম্মদ রশীদ রিদা, তাফসীরুল মানার, ১০খ., পৃ. ২৪৬)।
আওতাসে অবতরণের পর লোকজন তাহাদের নেতাদের নিকট একত্র হইল। দুরায়দ ইন্সুস সিম্মা জিজ্ঞাসা করিল, আমরা এখন কোথায় অবস্থান করিতেছি? লোকজন উত্তর দিল, আওতাস উপত্যকায়। দুরায়দ বলিল, ইহাই যুদ্ধের উপযুক্ত স্থান। ইহা এত উচু কংকরময় নয় যে, অশ্বের চলিতে কষ্ট হইবে। আবার এত নিচু ও কর্দমাক্তও নয় যে, অশ্বের পা দাবিয়া যাইবে। কিন্তু ব্যাপার কি যে, আমি উটের হনহনানী, গাধার চিৎকার, শিশুদের ক্রন্দন এবং ছাগলের ভ্যাঁ ভ্যাঁ শব্দ শুনিতে পাইতেছি (আল-বিদায়া ওয়ান-নিহায়া, ২খ., পৃ. ৩২১; তারীখুত তাবারী, ২খ., পৃ. ৩৪৫)? লোকজন উত্তরে বলিল, সেনাপতি মালিক ইব্‌ন আওফ-এর নির্দেশক্রমে সৈন্যগণ তাহাদের স্ত্রী, পরিবার-পরিজন, সম্পদরাজি ও গবাদি পশু সঙ্গে লইয়া আসিয়াছে। দুরায়দ মালিক ইব্‌ন আওফকে ডাকিয়া বলিল, তুমি কেন এমন কাজ করিয়াছ? উত্তরে সে বলিল, আমি ভাবিয়াছি যে, প্রত্যেক সৈন্যের সঙ্গে তাহার পরিবার-পরিজন ও সম্পদরাজি থাকিলে ঐ সব বস্তুর রক্ষণাবেক্ষণের নিমিত্ত প্রবল উত্তেজনাসহ তাহারা লড়াই করিবে।
এই কথা শুনিয়া দুরায়দ তাহাকে ধমক দিয়া বলিল, আরে ভেড়ার রাখাল কোথাকার! যুদ্ধে যদি পরাজিত হও তাহা হইলে কোন বস্তু কি তোমাকে রক্ষা করিতে পারিবে? যুদ্ধ যদি তোমার অনুকূলে যায় তাহা হইলে তরবারি ও বর্শা-বল্লমধারী লোকই তোমার উপকারে আসিবে। আর যদি যুদ্ধ তোমার বিপক্ষে যায় তাহা হইলে তোমার স্ত্রী-পুত্র, পরিবার-পরিজন এবং ধন-সম্পদ তোমার অতিরিক্ত ভোগান্তির কারণ হইয়া দাঁড়াইবে (আল-বিদায়া ওয়ান-নিহায়া, ২খ., পৃ. ৩২১-৩২২; তারীখুত তাবারী, ২খ., পৃ. ৩৪৫; আর-রাহীকুল মাখতুম, পৃ. ৪১৪)।
অতঃপর দুরায়দ জানিতে পারিল যে, কা'ব ও কিলাব গোত্রের লোকজন এই অভিযানে যোগদান করে নাই। তাই সে বলিল, ক্ষিপ্রতা ও বীরত্ব এই যুদ্ধে অনুপস্থিত। এই যুদ্ধটা যদি প্রাধান্য ও মর্যাদাপ্রাপ্ত হইত এবং বিজয় অর্জনের সমূহ সম্ভাবনা থাকিত তাহ হইলে কা'ব ও কিলাব গোত্র অবশ্যই অনুপস্থিত থাকিত না। হায়! তোমরাও যদি কা'ব ও কিলাব গোত্রদ্বয়ের ন্যায় যুদ্ধে অনুপস্থিত থাকিতে তাহা হইলে উত্তম হইত। তবে তোমরা কাহারা যুদ্ধে অংশগ্রহণ করিয়াছ? উত্তরে লোকজন বলিল, 'আমর ইবন 'আমের এবং 'আওফ ইব্‌ন 'আমের গোত্রদ্বয়। সে বলিল, ইহারা তো বানু 'আমের গোত্রের অনভিজ্ঞ দুই আনাড়ী কিশোর শাখা গোত্র। ইহারা না পারিবে কোন উপকার করিতে এবং না পারিবে কোন অপকার করিতে (ইবন হিশাম, সীরাতুন নবী, ৪খ., পৃ. ৮৮; তাবারী, তারীখুল উমাম ওয়াল-মুলুক, ২খ., পৃ. ৩৪৫)।
অতঃপর দুরায়দ সেনাপতি মালিককে ডাকিয়া বলিল, শুন হে মালিক! তুমি হাওয়াযিন গোত্রকে ধ্বংসের মুখে ঠেলিয়া দিও না। আমার পরামর্শ শোন, এখনও সময় আছে।নিজ গোত্র ও দেশ রক্ষার নিমিত্ত মহিলা ও শিশুদেরকে কোন সুরক্ষিত স্থানে রাখিয়া শুধু অশ্বারোহী সৈন্যদের লইয়া যুদ্ধ পরিচালনা কর। যদি তোমরা যুদ্ধে বিজয়ী হও তাহা হইলে পিছনের লোকজন তোমাদের সঙ্গে মিলিত হইবে। আর যদি পরাজিত হও তাহা হইলে তোমাদের পরিবারবর্গ, ধন-সম্পদ ও গবাদি পশুপাল অন্তত সুরক্ষিত থাকিবে (তারীখুল উমাম ওয়াল-মুলুক, ২খ., পৃ. ৩৪৫; আর-রাহীকুল মাখতুম, পৃ. ৪১৪)।
কিন্তু তরুণ সেনাপতি মালিক ইবন আওফ তাহার এই বিজ্ঞজনোচিত পরামর্শ অগ্রাহ্য করিয়া বলিল, আল্লাহ্র কসম! তাহা আমি করিব না। বার্ধক্যের করাঘাতে তোমার দেহ যেমন দুর্বল হইয়া পড়িয়াছে, তদ্রূপ তোমার জ্ঞান-বুদ্ধিও ক্ষীণ হইয়া পড়িয়াছে (তারীখুত তাবারী, ২খ., পৃ. ৩৪৫)। হে হাওয়াযিন গোত্রের লোকসকল! আল্লাহ্র শপথ, হয় তোমরা আমার আনুগত্য করিবে, নতুবা আমি এই তলোয়ারের উপর নির্ভর করিব এবং তাহা আমার পিঠের এক দিক হইতে অপর দিকে বাহির হইয়া যাইবে। প্রকৃতপক্ষে মালিক ইব্‌ন আওফ ইহা এই কারণে সহ্য করিতে পারিল না যে, ইহাতে দুরায়দের সুনাম হইবে এবং তাহার পরামর্শ মোতাবেক কাজ করিতে হইবে। হাওয়াযিন গোত্রীয়রা সমস্বরে বলিয়া উঠিল, আমরা তোমার আনুগত্য করিতেছি এবং তোমার সাথেই আছি। তখন দুরায়দ ইবনুস সিম্মা বলিয়া উঠিল:
هذا يوم لا اشهد ولا يفتني "ইহা এমন একটা যুদ্ধ যাহাতে না পারিলাম আমি অংশগ্রহণ করিতে, আর না পারিলাম ইহা হইতে দূরে থাকিতে” (ইবন হিশাম, সীরাতুন নবী, ৪খ., পৃ. ৮৮-৮৯; আর-রাহীকুল মাখতুম, পৃ. ৪১৪)। দুরায়দ আফসোস করিয়া আরও বলিল- יא ליתני בהא גזע + אכב בהא ודעה אקוד וטפה הזמה + כאנה שהא סדעה "হায়। যদি আজ আমি যুবক হইতাম, তবে লড়িতাম খুব কোমর কষে কেশর সম লম্বা লোমের ছাগের মত ঘোড়ায় বসে" (আল-বিদায়া ওয়ান-নিহায়া, ২খ., পৃ. ৩২২; ইবন হিশাম, সীরাতুন নবী, ৪খ., পৃ. ৮৯; তারীখুত তাবারী, ২খ., পৃ. ৩৪৫)।

📘 সীরাত বিশ্বকোষ > 📄 যুদ্ধক্ষেত্রে

📄 যুদ্ধক্ষেত্রে


অতঃপর সেনাপতি মালিক ইব্‌ন আওফ মুসলমানদের অবস্থা সম্পর্কে খোঁজ-খবর লওয়ার জন্য কয়েকজন গুপ্তচর প্রেরণ করিল। তাহারা মুসলমানদের অবস্থা পর্যবেক্ষণ করিয়া ভীত-সন্ত্রস্ত হইয়া কাঁপিতে কাঁপিতে সেনাপতির নিকট ফিরিয়া আসিল। সে তাহাদের বিপর্যস্ত অবস্থা দেখিয়া জিজ্ঞাসা করিল, তোমাদের সর্বনাশ হউক, তোমাদের এহেন দুরবস্থা কেন? তাহারা জবাবে বলিল, চিত্র-বিচিত্র ঘোড়ার পিঠে সওয়ার কিছু সংখ্যক সাদা-শুভ্র লোক দেখিয়া আমরা ভীত-বিহবল হইয়া পড়িয়াছি। সৌভাগ্য যে, তাহারা আমাদিগকে চিনিতে পারে নাই; নতুবা একজনও অক্ষত অবস্থায় ফিরিয়া আসিতে পারিতাম না। আল্লাহ্র কসম! তারপর আমাদের যে অবস্থা দেখিতে পাইতেছেন উহা প্রতিহত করার ক্ষমতা আমাদের ছিল না (ইব্‌ন হিশাম, সীরাতুন নবী, ৪খ., পৃ. ৮৯; আসাহহুস সিয়ার, পৃ. ২৭৯-২৮০; তারীখুত তাবারী, ২খ., পৃ. ৩৪৬)। এমন একটি অলৌকিক ঘটনা সম্পর্কে অবহিত হওয়ার পরও মালিক ইব্‌ন আওফ তাহার পূর্ব পরিকল্পনা হইতে এক বিন্দুও সরিয়া আসিল না, বরং সে তাহার পূর্ব সিদ্ধান্ত মোতাবিক যুদ্ধ করিতে অগ্রসর হইতে লাগিল (ইব্‌ন হিশাম, সীরাতুন নবী, ৪খ., পৃ. ৮৯)।
এইদিকে রাসূলুল্লাহ্ (স) শত্রুদের অবস্থানের সংবাদ প্রাপ্ত হইয়া 'আবদুল্লাহ্ ইব্‌ন আবী হাদরাদ আসলামী (রা)-কে নির্দেশ দিলেন, তুমি জনতার মধ্যে ঢুকিয়া পড়িবে এবং তাহাদের মাঝে অবস্থান করিয়া মুসলমানদের বিরুদ্ধে তাহাদের যুদ্ধ প্রস্তুতি সম্পর্কে তথ্য সংগ্রহ করিবে। নির্দেশমত তিনি মালিক ইব্‌ন আওফ এবং বানু হাওয়াযিনের সমস্ত পরিকল্পনা সম্পর্কে তথ্য সংগ্রহ করিয়া নবী করীম (স)-কে অবহিত করিলেন। রাসূলুল্লাহ্ (স) তখন 'উমার ইবনুল খাত্তাব (রা)-কে ডাকিয়া তাঁহাকেও সেই সংবাদ জানাইলেন। সকল বর্ণনা শুনিয়া 'উমার (রা) বলিলেন, ইব্‌ন আবূ হাদরাদের বক্তব্য আমার কাছে সত্য বলিয়া মনে হইতেছে না। ইব্‌ন আবূ হাদরাদ বলিলেন, আজ যদি আপনি আমাকে মিথ্যাবাদী প্রতিপন্ন করেন (তবে অবাক হওয়ার কিছু নাই)। হে উমার! একদিন আপনি সত্য ধর্ম ইসলামকে এবং আল্লাহ্র রাসূল মুহাম্মাদ (স)-কেও মিথ্যা প্রতিপন্ন করিয়াছিলেন। তখন 'উমার (রা) মহানবী (স)-কে লক্ষ্য করিয়া বলিলেন, হে আল্লাহ্র রাসূল! ইব্‌ন আবূ হাদরাদ-এর কথা কি আপনি শুনিতেছেন না? রাসূলুল্লাহ্ (স) মুচকি হাসিয়া বলিলেন:
قد كنت ضالا فهداك الله يا عمر.
“হে উমার! নিশ্চয় তুমি পথভ্রষ্ট ছিলে। আল্লাহ তোমাকে সৎপথ প্রদর্শন করিয়াছেন।” (ইবন হিশাম, সীরাতুন নবী, ৪খ., পৃ. ৯০; তারিখুল উমাম ওয়াল-মুলুক, ২খ., পৃ. ৩৯৬)।
হাওয়াযিনের প্রকৃত অবস্থা সম্পর্কে অবগত হইয়া রাসূলুল্লাহ (স) তাহাদের বিরুদ্ধে যুদ্ধের প্রস্তুতি গ্রহণ করিলেন। মক্কা বিজয়ের পরপর অনেক লোক ইসলাম গ্রহণ করিয়াছিল। তাহাদের মধ্যে কিছু সংখ্যক নওমুসলিম এমন ছিল যে, তাহারা তখনও পূর্ণ মাত্রায় যথার্থভাবে আল্লাহ্‌, তদীয় রাসূল মুহাম্মাদ (স)-এর ইসলামের মাহাত্ম্য উপলব্ধি করিতে পারে নাই। আর কিছু সংখ্যক লোক রাসূলুল্লাহ (স)-এর নিকট হইতে নিরাপত্তা প্রাপ্ত হইয়া নির্বিঘ্নে মক্কায় বসবাস করিতেছিল, কিন্তু তখনও তাহারা ইসলামে দীক্ষিত হয় নাই।
সাফওয়ান ইব্‌ন উমাইয়া ছিলেন তাহাদের অন্যতম। তাঁহার নিজস্ব সংগ্রহে ছিল যথেষ্ট রণসম্ভার ও যুদ্ধাস্ত্র। রাসূলুল্লাহ (স) তাঁহাকে ডাকিয়া বলিলেন, “হে আবু উমাইয়া! তোমার যুদ্ধাস্ত্র হইতে আমাদিগকে কিছু ধার দাও। আমরা আগামী কাল তোমার অস্ত্রসামগ্রী নিয়া শত্রুদের সহিত লড়াই করিব। তিনি বলিলেন, আপনি কি এই সকল যুদ্ধসঞ্জাম জোরপূর্বক লইয়া যাইতে চান? রাসূলুল্লাহ (স) বলিলেন, না, বরং ধারস্বরূপ নিতে চাই। এই নিশ্চয়তাসহই লইব যে, তাহা যুদ্ধশেষে তোমাকে ফেরত দেওয়া হইবে।” সাফওয়ান ইহাতে সম্মত হইয়া রাসূলুল্লাহ (স)-কে এক শত লৌহবর্ম এবং সমপরিমাণ অন্যান্য অস্ত্রশস্ত্র প্রদান করিল (তারিখুল উমাম ওয়াল-মুলুক, ২খ., পৃ. ৩৯৬; ইব্‌ন হিশাম, সীরাতুন নবী, ৪খ., পৃ. ৯০)।
আবু জাহ্‌ল-এর বৈমাত্রেয় ভাই আবদুল্লাহ ছিলেন তৎকালীন সময়ের অন্যতম ধনাঢ্য ব্যক্তি। রাসূলুল্লাহ (স) তাঁহার নিকট হইতে দশ হাজার, মতান্তরে ত্রিশ হাজার দিরহাম ধার হিসাবে গ্রহণ করিলেন। অতঃপর তিনি শত্রুদের বিরুদ্ধে হুনায়নের দিকে যাত্রায় মনোনিবেশ করিলেন (আহমদ ইব্‌ন হাম্বল, আল-মুসনাদ, ৪খ., পৃ. ৩৬)।
৮ম হিজরীর ৬ শাওয়াল তারিখে রাসূলুল্লাহ (স) সেনাবহিনীরসহ মক্কা হইতে যাত্রা করেন। ইহা ছিল রাসূলুল্লাহ (স)-এর মক্কা আগমনের উনিশতম দিবস (আল-ওয়াকিদী, কিতাবুল মাগাযী, ৩খ., পৃ. ৮৮১; আর-রাহীকুল মাখতুম, পৃ. ৪১৪)। অন্য বর্ণনামতে, ৮ম হিজরীর ৬ শাওয়াল সোমবার দিন বার হাজার সৈন্য লইয়া রাসূলুল্লাহ (স) হুনায়ন অভিমুখে যাত্রা করেন (ইদরীস কানদেহলবী, সীরাতুল মুস্তাফা, ৩খ., পৃ. ৫৭)।
মক্কা বিজয়কালে রাসূলুল্লাহ (স) দশ হাজার সৈন্য সঙ্গে আনিয়াছিলেন এবং মক্কার নওমুসলিমদের মধ্য হইতে আরও দুই হাজার সৈন্য সংগ্রহ করেন। এই সেনাবহিনীতে মক্কার আশিজন পৌত্তলিকও যোগদান করিয়াছিল। সাফওয়ান ইব্‌ন উমাইয়া এবং সুহায়ল ইব্‌ন ‘আমর ইহাদের অন্যতম (নুরুল ইয়াকীন ফী সীরাতি সায়্যিদিন মুরসালীন, পৃ. ১৫৭)।
রাসূলুল্লাহ (স) আত্তাব ইব্‌ন আসীদ (রা)-কে মক্কার শাসনকর্তা ও নামাযে ইমামতি করিবার দায়িত্ব এবং মু’আয ইব্‌ন জাবাল (রা)-কে লোকদিগকে দীন শিক্ষাদানের দায়িত্ব অর্পণ করেন (আল-ওয়াকিদী, কিতাবুল মাগাযী, পৃ. ৮৮৯)। তখন 'আত্তাব ইবন আসীদ (রা)-এর বয়স ছিল বিশ বৎসর। মক্কা বিজয়ের দিন তিনি মুসলমান হন। তিনিই মক্কার প্রথম শাসনকর্তা। আবূ বাক্স (রা)-এর খিলাফতকাল (১০-১২ হি.) পর্যন্ত তিনি মক্কার শাসনকর্তা হিসাবে দায়িত্ব পালন করিয়াছিলেন (হযরত মুহাম্মদ মুস্তফা (স): সমকালীন পরিবেশ ও জীবন, পৃ. ৮০২)।
হাওয়াযিন নেতা মালিক ইব্‌ন আওফ তাহার চার সহস্র সৈন্যকে হুনায়ন উপত্যকার পর্বতের চূড়া ও গিরিপথের উচ্চ স্থানগুলিতে দৃঢ় অবস্থান গ্রহণের নির্দেশ দেয়। সে তাহাদিগকে বলিল, মুসলমানগণ এই উপত্যকায় আসা মাত্র তরবারি লইয়া বজ্রপাতের মত তাহাদের উপর আকস্মিক আক্রমণ চালাইবে, ফলে তাহারা ছত্রভঙ্গ হইয়া পড়িবে। তাহারা ভীত-বিহবল হইয়া পশ্চাদ্গমন করিতে বাধ্য হইবে। অপরদিকে সমগ্র আরব উপদ্বীপে আমাদের বীরত্বগাথা ছড়াইয়া পড়িবে। মালিক ইব্‌ন আওফের সৈন্যবাহিনী সেনাপতির এই নির্দেশ পালনে কোন প্রকার দ্বিধা করে নাই। প্রতিটি দল তাহাদের সেনাপতির নির্দেশ মোতাবিক অবস্থান গ্রহণ করে (এইচ. এম. হায়কাল, মহানবীর জীবন-চরিত, পৃ. ৫৬২; আর-রাহীকুল মাখতুম, পৃ. ৪১৫)।
রাসূলুল্লাহ্ (স)-এর হুনায়ন অভিমুখে যাত্রাকালে দুপুরের পর এক অশ্বারোহী আসিয়া সংবাদ দিল, আমি অমুক অমুক পর্বতের উপর আরোহণ পূর্বক প্রত্যক্ষ করিয়াছি যে, বানু হাওয়াযিন গোত্র পূর্ণ প্রস্তুতি নিয়া হুনায়নের রণাঙ্গনে আগমন করিয়াছে। মহিলা, শিশু, গবাদি পশু ইত্যাদি তাহাদের সঙ্গে আছে। রাসূলুল্লাহ্ (স) মুচকি হাসিয়া বলিলেনঃ আল্লাহ্র ইচ্ছায় ইহার সব কিছুই গনীমত হিসাবে আগামী কাল মুসলমানদের হস্তগত হইবে। দিনশেষে রাত্রি বেলায় আনাস ইবন আবী মারছাদ গানামী (রা) স্বেচ্ছাসেবী হিসাবে নৈশ প্রহরীর দায়িত্ব পালন করেন (আওনুল মা'বৃদ শারহি সুনান আবী দাউদ, ২খ., পৃ. ৩১৭)।
ইবন ইসহাক বলেন, ইব্‌ন শিহাব আয-যুহরী আমার নিকট আবূ ওয়াকিদ আল-লায়ছীর সূত্রে বর্ণনা করেন যে, হারিছ ইবন মালিক (রা) বলেন, রাসূলুল্লাহ্ (স)-এর সঙ্গে আমরা হুনায়নের যুদ্ধের উদ্দেশ্যে বাহির হইলাম। আমরা তখন সবেমাত্র ইসলাম গ্রহণ করিয়াছি। তৎকালে কুরায়শ ও আরবের অন্যান্য অমুসলিম সম্প্রদায় একটা বিশাল সবুজ-শ্যামল বৃক্ষের খুব ভক্ত-অনুরক্ত ছিল। সেই গাছটিকে "যাতুল আনাওয়াত” বা “অস্ত্রঝুলানো বৃক্ষ” নামে অভিহিত করা হইত। প্রতি বৎসর একবার তাহারা ঐ বৃক্ষের কাছে যাইত, তাহাদের অস্ত্রপাতি উহার ডালের সহিত লটকাইত, ঐ বৃক্ষের পাশে পশু বলি দিত, মন্দির তৈরী করিত এবং মেলা বসাইত। বর্ণনাকারী বলেন, হুনায়নে যাত্রাকালে পথিমধ্যে বড় আকারের সতেজ একটি কুল গাছ আমাদের নযরে পড়িল। আমরা রাস্তার পার্শ্ব হইতে উচ্চস্বরে বলিলাম, ইয়া রাসূলাল্লাহ! তাহাদের যেমন অস্ত্র ঝুলানোর গাছ আছে, আমাদের জন্যও তেমন ব্যবস্থা করুন। রাসূলুল্লাহ্ (স) বলিলেন, আল্লাহু আকবার। সেই পবিত্র সত্তার কসম যাঁহার হাতে মুহাম্মাদের জীবন! তোমরা এমন কথা বলিলে যাহা মূসা (আ)-এর সম্প্রদায় তাঁহাকে বলিয়াছিল। তাহারা বলিয়াছিল, তাহাদের (কাফিরদের) যেমন অনেক ইলাহ্ বা পূজা-অর্চনার দেবতা রহিয়াছে তেমনি আমাদের জন্যও তদ্রূপ দেবতার ব্যবস্থা করুন। তিনি তাহাদের উত্তরে বলিয়াছিলেন:
انكم قوم تجهلون انها سنن لتركبن سنن من كان قبلكم.
"নিঃসন্দেহে তোমরা একটা অজ্ঞ সম্প্রদায়। ইহা একটি প্রচলিত প্রথা। তোমরা যদি ইহার অনুসরণ কর, তাহা হইলে তোমরাও তোমাদের পূর্ববর্তী সম্প্রদায়ের প্রথার উপর প্রতিষ্ঠিত হইবে” (ইবন হিশাম, সীরাতুন নবী, ৪খ., পৃ. ৯২; কিতাবুল মাগাযী, ৩খ., পৃ. ৮৯০-৯১; আল-বিদায়া ওয়ান-নিহায়া, ২খ., পৃ. ৩২৪)। ইমাম তিরমিযী তাঁহার আল-জামি' গ্রন্থে উক্ত হাদীছ সা'ঈদ ইব্‌ন আবদুর রহমান আল-মাখযূমীর সূত্রে বর্ণনা করিয়াছেন এবং হাদীছটিকে হাসান-সহীহ বলিয়া মন্তব্য করিয়াছেন (জামি' আত-তিরমিযী, ২খ., পৃ. ৪১)। অন্য বর্ণনামতে, রাসূলুল্লাহ্ (স) তখন তিনবার তাকবীর ধ্বনি দিয়া বলিলেন, মূসা (আ)-এর কওম তাঁহার সাথে অনুরূপ আচরণ করিয়াছিল (কিতাবুল মাগাযী, ৩খ, পৃ. ৮৯১)।
হুনায়ন যুদ্ধে অংশগ্রহণকারী বিশিষ্ট সাহাবী আবূ বুরদা ইবন নিয়ার (রা) বলেন, আমরা আওতাস নামক উপত্যকার নিম্নভূমিতে পৌঁছিয়া একটি বৃক্ষের নিচে অবতরণ করিলাম। পাশেই একটি বড় বৃক্ষ আমাদের দৃষ্টিগোচর হইল। রাসূলুল্লাহ্ (স) উহার নিচে যাইয়া স্বীয় তরবারি ও ধনুক গাছে লটকাইয়া বিশ্রাম করিতে লাগিলেন। আমি তাঁহার সন্নিকটে ছিলাম। তাঁহার একটি কথা আমাকে ভীত-সন্ত্রস্ত করিয়া তুলিল। তিনি হে আবূ বুরদা! বলিয়া আমাকে ডাক দিলে আমি লাব্বায়ক বলিয়া দ্রুত তাঁহার নিকটে গেলাম। দেখিলাম, রাসূলুল্লাহ্ (স) উপবিষ্ট এবং তাঁহার পাশে এক লোক বসিয়া আছে। রাসূলুল্লাহ্ (স) বলিলেনঃ আমি ঘুমন্ত থাকা অবস্থায় এই লোকটি আসিয়াছে। অতঃপর আমার তরবারি লইয়া আমার মাথার উপর দাঁড়াইয়াছে। আমি ভয় পাইয়া গিয়াছি। সে বলিল, হে মুহাম্মাদ! আজ আমার হাত হইতে কে তোমাকে রক্ষা করিবে? আমি বলিলাম, আল্লাহ। আবূ বুরদা বলেন, আমি আমার তরবারি কোষমুক্ত করিলাম। রাসূলুল্লাহ্ (স) আমাকে বলিলেন, তোমার তরবারি কোষবদ্ধ কর। আমি বলিলাম, ইয়া রাসূলাল্লাহ! আমাকে অনুমতি দিন, আল্লাহ্র দুশমনের গর্দান কাটিয়া লই। কেননা নিঃসন্দেহে সে মুশরিকদের গুপ্তচর। আল্লাহ্র রাসূল (স) আমাকে থামিতে বলিলেন। ঐ লোকটিকে আল্লাহ্র রাসূল কিছুই বলিলেন না এবং কোনরূপ ভর্ৎসনাও করিলেন না। আমি সেনাবাহিনীর মাঝে চীৎকার করিয়া ঐ লোকটির কথা বলিতে লাগিলাম, যেন সকলে রাসূলের অনুমতি ব্যতীতই তাহাকে দেখিয়া লয় এবং কোন হত্যাকারী তাহাকে হত্যা করে। কেননা আমাকে রাসূলুল্লাহ্ (স) বলিতেছিলেন, হে আবূ বুরদা! লোকদের আক্রমণ হইতে তাহাকে বাঁচাও। অতঃপর আমি রাসূলুল্লাহ্ (স)-এর নিকট ফিরিয়া আসিলে তিনি বলিলেন, হে আবু বুরদা! আল্লাহ্র মনোনীত একমাত্র দীন ইসলামকে অন্যান্য সকল দীনের উপর বিজয়ী না করা পর্যন্ত আল্লাহ্ তা'আলা স্বয়ং আমাকে হিফাযত করিবেন (কিতাবুল মাগাযী, ৩খ., পৃ. ৮৯১-৮৯২)।
বার হাজার সৈন্যের বিশাল বাহিনী লইয়া মুসলমানগণ হুনায়ন অভিমুখে যাত্রাকালে কেহ কেহ মুসলমানদের সংখ্যাধিক্যের কারণে বলিয়াছিলেন:
"সংখ্যাস্বল্পের কারণে আজ আর আমরা পরাজিত হইব না।" لن نغلب اليوم من قلة.
কোন কোন সীরাত বিশেষজ্ঞ বলেন, রাসূলুল্লাহ্ (স) নিজেই এই উক্তি করিয়াছিলেন। ইমাম ফাখরুদ্দীন রাযী উহা প্রত্যাখ্যান করিয়া বলেন, রাসূলুল্লাহ্ (স) সম্পর্কে এই মন্তব্য সম্পূর্ণ বিবেক বহির্ভূত (غير معقول)। বিভিন্ন বিশুদ্ধ রিওয়ায়াতে ইহার বিপরীত বর্ণনা আসিয়াছে। ইউনুস ইব্‌ন বুকায়র যিয়াদাতুল মাগাযীতে রাবী ইব্‌ন আনাস হইতে বর্ণনা করেন, তিনি বলেন,
قال رجل يوم حنين لن نغلب اليوم من قلة. "জনৈক ব্যক্তি বলিল, সংখ্যা স্বল্পের কারণে আজ আমরা আর পরাজিত হইব না" (তাফসীরুল মানার, ১০খ., পৃ. ২৪৬)।
আল-ওয়াকিদী বলেন, ইসমাঈল ইব্‌ন ইব্রাহীম মূসা ইব্‌ন 'উকবা হইতে, তিনি যুহরী হইতে এবং তিনি সাঈদ ইবনুল মুসায়্যাব হইতে আমাকে হাদীছ বর্ণনা করিয়াছেন, তিনি বলেন:
قال أبو بكر الصديق يا رسول الله لا نغلب اليوم من قلة. "আবূ বাক্স সিদ্দীক (রা) বলিয়াছিলেন, হে আল্লাহ্র রাসূল! আজ আমরা সংখ্যা স্বল্পতার কারণে পরাস্ত হইব না” (কিতাবুল মাগাযী, ৩খ., পৃ. ৮৯০; আত-তাবাকাতুল কুবরা, ২খ., পৃ. ১৫০)।
তবে বিশুদ্ধ মত হইল, জনৈক মুসলমান এই ধরনের উক্তি করিয়াছিল। রাসূলুল্লাহ্ (স) সাহাবীগণের কাহারও নিকট হইতে এই ধরনের কথা শুনিয়া দারুন মনঃক্ষুণ্ণ ও ব্যথিত হইয়াছিলেন (আর-রাহীকুল মাখতুম, পৃ. ৪১৫)।
৮ম হিজরীর ১০ শাওয়াল মধ্যরাত্রে রাসূলুল্লাহ্ (স)-এর নেতৃত্বে মুসলিম সৈন্যবাহিনী হুনায়নে গিয়া পৌঁছিলেন। কিন্তু মালিক ইবন আওফ পূর্বেই তাহার বাহিনী লইয়া সেখানে অবতরণ করে এবং রাত্রির অন্ধকারে অত্যন্ত সংগোপনে তাহার বাহিনীর বিভিন্ন ইউনিটকে পৃথক পৃথক স্থানে মোতায়েন করে। অধিকন্তু তাহাদিগকে এই নির্দেশও দেওয়া হয় যে, মুসলিম বাহিনী উপত্যকায় অবতরণ করা মাত্রই যেন তীব্রভাবে তাহাদের উপর তীর নিক্ষেপ করিয়া তাহাদিগকে বিক্ষিপ্ত ও ভীত-বিহবল করিয়া দেওয়া হয় (আর-রাহীকুল মাখতুম, পৃ. ৪১৫)।
এইদিকে রাসূলুল্লাহ্ (স) সাহরীর সময় সৈন্যদিগকে শ্রেণীবিন্যাস করিলেন। তাহাদিগকে বিভিন্ন দলে- উপদলে বিভক্ত করিয়া প্রত্যেক গোত্র ও কবীলার হাতে গোত্রীয় পতাকা উঠাইয়া দিলেন। মুহাজিরগণের পতাকা আলী ইব্‌ন আবী তালিব (রা) বহন করিয়াছিলেন। আরও দুইটি পতাকা বহন করিয়াছিলেন যথাক্রমে সা'দ ইব্‌ন আবী ওয়াক্কাস এবং উমার ইবনুল খাত্তাব (রা)। খাযরাজ গোত্রের পতাকা বহন করিয়াছিলেন হুবাব ইবনুল মুনযির। মতান্তরে খাযরাজের অপর পতাকা উবাদা (রা)-এর হাতে ছিল। আওস গোত্রের পতাকা ছিল উসায়দ ইব্‌ন হুদায়র (রা)-এর নিকট। আওস এবং খাযরাজ গোত্রের প্রত্যেক উপ-গোত্রের নির্ধারিত লোকদের হাতে তাহাদের স্ব স্ব কবীলার পতাকা ছিল। আরবের অন্যান্য গোত্রের সৈন্যদের মধ্যে নির্দিষ্ট ব্যক্তির হাতে পতাকা ছিল। খালিদ ইবনুল ওয়ালীদের নেতৃত্বে বানু সুলায়ম গোত্রের সৈন্যদিগকে অগ্রবর্তী দল হিসাবে প্রেরণ করা হয় (আত-তাবাকাতুল কুবরা, ২খ., পৃ. ১৫০)।
ইব্‌ন ইসহাক বলেন, আসিম ইব্‌ন 'উমার ইব্‌ন কাতাদা জাবির ইব্‌ন 'আবদিল্লাহ্ (রা) হইতে বর্ণনা করেন যে, তিনি বলেন, আমরা যখন হুনায়ন প্রান্তরের সামনে আসিলাম, তখন আমরা তিহামাগামী প্রান্তরসমূহের একটি প্রান্তরের ঢালু প্রশস্ত এলাকার নিচের দিকে অবতরণ করিতে আরম্ভ করিলাম। ভোরের আঁধার তখনও কাটে নাই। শত্রুপক্ষের পূর্ব অবস্থান সম্পর্কে আমাদের জানা ছিল না। তাহারা প্রতিটি গিরিপথ এবং গোপনীয় ও সংকীর্ণ স্থানে আমাদের জন্য ওঁত পাতিয়া ছিল। তাহারা পূর্ব হইতে রীতিমত পরিকল্পনা লইয়া এইরূপ প্রস্তুতি গ্রহণ করিয়াছিল। আমাদের মধ্যে এই ধারণা ছিল যে, আমাদের সেই প্রান্তরে অবতরণকালে আক্রান্ত হওয়ার আশংকা নাই। এমন সময় শত্রুবাহিনী তাহাদের গোপন অবস্থানসমূহ হইতে অতর্কিতে একযোগে আমাদের উপর প্রচণ্ড হামলা করিয়া বসিল। ফলে আমরা দিশাহারা হইয়া এমনভাবে পশ্চাদ্ধাবন করিতে লাগিলাম যে, কেহ কাহারও দিকে ফিরিয়া তাকাইবার অবকাশ ছিল না। রাসূলুল্লাহ্ (স) ডানদিকে একটু সরিয়া গিয়া ফিরিয়া দাঁড়াইলেন এবং উচ্চস্বরে বলিতে লাগিলেন:
أيها الناس هلموا الى انا رسول الله أنا محمد بن عبد الله.
"হে লোকসকল! তোমরা কোথায় যাইতেছ? আমার দিকে আস। আমি আল্লাহ্র রাসূল, আমি মুহাম্মাদ ইব্‌ন আবদিল্লাহ্।" রাসূলুল্লাহ্ (স) এই কথাটি তিনবার বলিলেন (তারীখুল কামিল, ২খ., পৃ. ১৩৬; ইবন হিশাম, সীরাতুন নবী, ৪খ., পৃ. ৯২-৯৩)।
পশ্চাদ্ধাবনকালে উটগুলি একটির উপর আরেকটি আসিয়া পড়িতে লাগিল। অপ্রস্তুত মুসলিম বাহিনী এই অতর্কিত প্রচণ্ড আক্রমণে কিংকর্তব্যবিমূঢ় হইয়া পড়িল। অগ্রগামী সেনাদল ভীত-শংকিত হইয়া পিছনে ফিরিতে বাধ্য হইল। আতংকিত ও দিশাহারা হইয়া তাহারা একজন অন্যজনের উপর পড়িতে লাগিল। তাহাদের এই দুরবস্থা দেখিয়া পশ্চাদগামী দলও তাহাদের সহিত পলায়নোদ্যত হইয়া পিছনের দিকে ছুটিতে লাগিল। রাসূলুল্লাহ্ (স)-এর সঙ্গে তখন মাত্র কয়েকজন মুহাজির, আনসার এবং আহলে বায়তের লোক অবশিষ্ট ছিলেন। তাঁহারা হইলেন আবূ বাক্স, 'উমার, 'আলী ইব্‌ন আবী তালিব, 'আব্বাস ইব্‌ন 'আবদুল মুত্তালিব, ফাদল ইব্‌ন 'আব্বাস, আবূ সুফ্য়ান ইবনুল হারিছ, রাবীআ ইবনুল হারিছ, আয়মান ইব্‌ন উবায়দ, উসামা ইব্‌ন যায়দ (রা) প্রমুখ সাহাবী (তারীখুল উমাম ওয়াল-মুল্‌ক, ২খ., পৃ ৩৪৭; তারীখুল কামিল, ২খ., পৃ. ১৩৭; ইবন হিশাম, সীরাতুন নবী, ৪খ., পৃ. ৯৩; যাদুল মা'আদ, ৩খ., পৃ. ৬৪; মুনতাকান নুকূল, পৃ. ৩২০)।
হাওয়াযিন গোত্রের জনৈক ব্যক্তি তাহার একটি লাল রঙের উটে আরোহণ পূর্বক হাতে বস্ত্রের উপর কালো রঙের পতাকা ধরিয়া তাহার গোত্রের অগ্রভাগে চলিতেছিল। কোন মুসলমান সৈন্যকে সামনে পাইলেই সে তাহার ঐ বস্ত্র দ্বারা আঘাত করিত। অতঃপর যখন লোকজন তাহার পতাকা নামাইয়া ফেলার কারণে তাহাকে হারাইয়া ফেলিত এবং সে কোথায় আছে তাহা ভীড়ের মধ্যে অনুমান করিতে পারিত না, তখন সে আবার তাহার বস্ত্র উপরে উঠাইয়া ধরিয়া অশ্বার্দিগকে স্বীয় অস্তিত্ব ও অবস্থান সম্পর্কে অবহিত করিত, আর তাহার পশ্চাৎবর্তীরা তাহার পিছনে চলিত। পরিশেষে আলী ইব্‌ন আবী তালিব (রা) এই দুর্ধর্ষ শত্রুসেনার উপর কঠিন আক্রমণ চালাইয়া তাহাকে হত্যা করেন (তারীখুল কামিল, ২খ., পৃ. ১৩৭; তারীখুল উমাম ওয়াল-মুলূক, ২খ., পৃ. ৩৪১)।
হাদীছে বর্ণিত হইয়াছে যে, মুসলিম বাহিনী নির্বিঘ্নে হুয়ায়ন রণাঙ্গণে পৌছিয়া শত্রুদের সহিত লড়াই শুরু করে এবং অল্পক্ষণের মধ্যেই শত্রুদগকে পশ্চাৎপদ হইতে বাধ্য করে। পরাভূত শত্রু বাহিনী মুসলমানদের তীব্র আক্রমণের সামনে টিকিতে না পারিয়া যুদ্ধক্ষেত্র ছাড়িয়া পলয়ান করে। শূন্য ময়দানে শত্রুদের পরিত্যক্ত ধন-সম্পদের প্রতি মুসলিম সৈন্যগণ আকৃষ্ট হইয়া পড়ে এবং গণীমতৈর মাল সংগ্রহ করিতে যাইয়া তাহারা ছত্রভঙ্গ হইয়া পড়ে। আরও বহু শত্রুসৈন্য যে গিরিপথের সংকীর্ণ স্থানে আত্মগোপন করিয়া ছিল তাহা তাহারা মোটেই উপলব্ধি করিতে সক্ষম হয় নাই। মুসলমানদিগকে ছত্রভঙ্গ ও অন্যমনস্ক অবস্থায় দেখিতে পাইয়া আত্মগোপনকারী শত্রুরা গিরিপথ হইতে বাহির হইয়া অকস্মাৎ বৃষ্টির ন্যায় মুসলমানদের উপর তীর বর্ষণ করিতে শুরু করে। মুসলমানগণ এই অতর্কিত আক্রমণ সামলাইতে না পারিয়া যুদ্ধক্ষেত্র পরিত্যাগ করিয়া পশ্চাৎপদ হইতে বাধ্য হইল। বিশিষ্ট সাহাবী বারা’আ ইব্‌ন ‘আযিব (রা) বলেন, আমরা যখন শত্রুদিগকে আক্রমণ করিলাম তখন তাহারা পরাজিত হইয়া যুদ্ধক্ষেত্র ছাড়িয়া দিতে বাধ্য হইল। যখন আমরা গণীমতের মাল সংগ্রহে ব্যস্ত হইয়া পড়িলাম তখন তাহারা আবার সম্মুখে আসিয়া তীর বর্ষণ করিতে শুরু করিল (সহীহ আল-বুখারী, ২খ., পৃ. ৬২৭)।
আনাস (রা) বলেন, ঐ সময় রাসূলুল্লাহ্ (স) (প্রায়) একাকী যুদ্ধক্ষেত্রে দৃঢ়পদ রহিলেন। আর মুসলমানগণ সকলেই যুদ্ধক্ষেত্র ছাড়িয়া পশ্চাৎপদ হইতে লাগিল (সহীহ আল-বুখারী, ২খ., পৃ. ৬২৯)। বারা’আ ইব্‌ন আযিব (রা) বলেন, আবু সুফিয়ান ইব্‌ন হারিস ঐ সময় রাসূলুল্লাহ্ (স)-এর খচ্চরের লাগাম ধরিয়া তাঁহার সাথে ছিলেন (সহীহ আল-বুখারী, ২খ., পৃ. ৬২৭)। ‘আব্বাস (রা) বলেন, আমি ও আবু সুফিয়ান এক মুহূর্তের জন্যও রাসূলুল্লাহ্ (স)-এর সঙ্গ ত্যাগ করি নাই (মুসলিম, ২খ., পৃ. ৯৯)।
‘আবদুল্লাহ ইব্‌ন উমার (রা) বলেন, সেই দিন মাত্র এক শতজন মুসলমান রাসূলুল্লাহ্ (স)-এর সঙ্গে যুদ্ধক্ষেত্রে সুদৃঢ় ও অটল ছিলেন (আবু ‘ঈসা আত-তিরমিযী, আল-জামি‘, ২খ., পৃ. ২৮৮)। আবু নু’আয়ম বলেন, ত্রিশের কিছু বেশী মুহাজির এবং অবশিষ্ট আনসার, মোট এক শতজন লোক রাসূলুল্লাহ্ (স)-এর সহিত যুদ্ধে অটল ছিলেন (ফাতহুল বারী, ৮খ., পৃ. ২২২)।
উপরোল্লিখিত বর্ণনাসমূহ হইতে এই সিদ্ধান্তে উপনীত হওয়া যায় যে, বার হাজার মুসলিম সৈন্যের মধ্যে মাত্র এক শতজন সৈন্য রাসূলুল্লাহ্ (স)-এর সহিত যুদ্ধক্ষেত্রে অটল থাকা অনেকটা না থাকারই শামিল। এইজন্যই আনাস (রা) বলিয়াছেন, শুধু একাকী রাসূলুল্লাহ্ (স) যুদ্ধক্ষেত্রে অটল ছিলেন। দ্বিতীয়ত, শত্রুদের প্রচণ্ড আক্রমণে ছত্রভঙ্গ মুসলিম সৈন্যগণ কোথায় সরিয়া পড়িয়াছিল তাহা বলা মুশকিল। সুতরাং যাহারা যুদ্ধক্ষেত্রে অটল ছিলেন তাহারাও একত্রে রাসূলুল্লাহ্ (স)-এর সঙ্গে ছিলেন না। কোন কোন সময় রাসূলুল্লাহ (স) একাই যুদ্ধের ময়দানে ছিলেন। হাফিয ইব্‌ন হাজার আসকালানী বলেন, যুদ্ধের ময়দানে একা থাকিবার অর্থ এই যে, অবশিষ্ট যাহারা তাঁহার সহিত রণক্ষেত্রে অটল ছিলেন তাহারা ছিলেন তাঁহার পশ্চাতে (ফাতহুল বারী, ৮খ., পৃ. ৪৪)।
উল্লিখিত সংকটাপন্ন সময়ে রাসূলুল্লাহ্ (স) যে তেজোদীপ্ততা, সাহসিকতা ও বীরত্ব প্রদর্শন করিয়াছিলেন পৃথিবীর ইতিহাসে তাহার নযির সত্যিই বিরল। মুসলিম বাহিনীর ইতস্তত বিক্ষিপ্ততা ও দৌঁড়-ঝাপের মুখে হযরত মুহাম্মাদ (স) যুদ্ধেক্ষেত্রে ছিলেন সম্পূর্ণ অটল ও সুদৃঢ়। তিনি নির্ভীক চিত্তে স্বীয় খচ্চরকে আগে বাড়াইয়া শত্রুদের দিকে অগ্রসর হইতে লাগিলেন। আবূ সুফয়ান ইবনুল হারিছ তাঁহার খচ্চরের লাগাম ধরিয়া তাঁহাকে ফিরাইয়া রাখিতে চেষ্টা করিলেন। তখন রাসূলুল্লাহ্ (স) বজ্রগম্ভীর স্বরে বলিতে লাগিলেন:
انا النبي لا كذب + انا ابن عبد المطلب. "আমি সত্যই নবী, মিথ্যা নয়, আমি আবদুল মুত্তালিবের পৌত্র" (সহীহ আল-বুখারী, ১খ, পৃ. ৪০১; যাদুল মাআদ, ৩খ., পৃ. ১৬৪)।
ইমাম মুসলিম যাকারিয়া ইবন আবী যাইদা-এর সূত্রে, তিনি আবূ ইসহাক হইতে এবং তিনি বারাআ ইবন 'আযিব (রা) হইতে বর্ণনা করেন, তিনি বলেন, অতঃপর রাসূলুল্লাহ্ (স) নিচে নামিয়া আসিলেন এবং আল্লাহর সাহায্য প্রার্থনা করিয়া বলিলেন:
"আমি সত্য নবী মিথ্যা নয়, আমি আবদুল মুত্তালিবের পুত্র। হে আল্লাহ! আপনার সাহায্য অবতীর্ণ করুন" (সহীহ্ মুসলিম, ২খ., পৃ. ১০১; আল-বিদায়া ওয়ান-নিহায়া, ২খ., পৃ. ৩২৭)।
আবূ কাতাদা (রা) বলেন, যখন মুসলমানগণ যুদ্ধক্ষেত্র হইতে পশ্চাদপদ হইতে লাগিল, তখন আমি দেখিতে পাইলাম এক কাফির একজন মুসলমানের বুকের উপর চড়িয়া বসিয়া আছে। আমি পশ্চাদ্দিক হইতে আসিয়া কাফির লোকটির কাঁধের উপর তরবারি দ্বারা আঘাত করিলাম। লৌহ বর্ম ছিন্ন করিয়া তরবারি তাহার দেহাভ্যন্তরে প্রবেশ করিল। সে ফিরিয়া আমাকে এমনভাবে আকড়াইয়া ধরিল যে, আমার প্রাণবায়ু বাহির হওয়ার উপক্রম হইল। কিন্তু একটু পরে সে ভূপাতিত হইল। এমন সময় আমি 'উমার ইবনুল খাত্তাব (রা)-কে দেখিতে পাইয়া মুসলমানগণের অবস্থা সম্পর্কে তাঁহাকে জিজ্ঞাসা করিলাম। তিনি উত্তরে বলিলেন, আল্লাহ্র হুকুম যাহা ছিল তাহাই হইয়াছে (সহীহ আল-বুখারী, ২খ., পৃ. ৬১৮)। আল্লাহ্র উপর পরিপূর্ণ ভরসা না করিয়া সংখ্যাধিক্যের জন্য মুসলমানদের গর্ব ও অহংকার এই সাময়িক পরাজয়ের অন্যতম কারণ ছিল। ইহা ছাড়া আরও কিছু কারণ এই পরাজয়ের পশ্চাতে ক্রিয়াশীল ছিল। যদিও সকল কার্য আল্লাহ্ তা'আলার ইচ্ছায় এবং তাঁহার নির্দেশেই সংঘটিত হয়, তথাপি প্রত্যেক কাজের জন্য আল্লাহ্ তা'আলা কোন না কোন বাহ্যিক কারণ অবশ্যই সৃষ্টি করিয়া দেন। সুতরাং সংখ্যাধিক্যের কারণে মুসলমান সৈন্যদের গর্ব-অহংকার ছাড়াও আরও যেই সকল কারণে এই পরাজয় হইয়াছিল মোটামুটিভাবে তাহা হইল:
মক্কা হইতে যেই দুই হাজার নওমুসলিম এই যুদ্ধে যোগদান করিয়াছিল তাহাদের অন্তরে তখনও ইসলামের মূল শিক্ষা, চেতনা এবং দীনের প্রতি পূর্ণ আনুগত্যবোধ সুদৃঢ় হয় নাই। ধর্মের চেয়ে জীবনই ছিল তাহাদের নিকট অধিক প্রিয়। তাহাদের মধ্যে অধিকাংশ লোকই গনীমতের সম্পদ প্রাপ্তির লোভেই এই যুদ্ধে যোগদান করিয়াছিল। আবার কিছু সংখ্যক লোক অমুসলমানও ছিল। মহিলা সাহাবী উম্মু সুলায়ম (রা) এই যুদ্ধে অংশগ্রহণ করিয়াছিলেন। তিনি রাসূলুল্লাহ্ (স)-এর খিদমতে এই বলিয়া নিবেদন করিয়াছিলেন, হে আল্লাহ্র রাসূল! মক্কা বিজয়ের দিন আপনি যাহাদিগকে মুক্তি প্রদান করিয়াছিলেন, আমাদিগকে বাদ দিয়া শুধু তাহাদিগকে হত্যা করুন। কারণ ইহারাই আপনাকে পরাজিত করাইয়াছে (সহীহ্ মুসলিম, ২খ., পৃ. ১১৬)।
ইমাম নববী (র) এই হাদীছের ব্যাখ্যায় উল্লেখ করিয়াছেন যে, হুনায়ন প্রান্তর হইতে সকল মুসলমান পলায়ন করে নাই। মক্কার কপট নও-মুসলিমগণ এবং যেই সমস্ত পৌত্তলিক যুদ্ধে যোগদান করিয়াছিল তাহারাই প্রথমে পলায়ন করিতে শুরু করে। আর আকস্মিক পরাজয়ের কারণ এই ছিল যে, মক্কাবাসী নওমুসলিমগণের অনেকের অন্তরেই তখন ঈমান সুদৃঢ়ভাবে স্থানে লাভ করে নাই। তাহারা গোপনে মুসলমানদের পরাজয়ই কামনা করিত। আবার গনীমতের মাল পাওয়ার লোভে তাহাদের সঙ্গে অনেক মহিলা এবং বালকও যুদ্ধে অংশগ্রহণ করিয়াছিল। শত্রুগণও চতুর্দিক হইতে বৃষ্টির ন্যায় তীর নিক্ষেপ করিয়াছিল (ইমাম নববী, শারহু সহীহ মুসলিম, ২খ., পৃ. ১০০; হযরত মুহাম্মদ মুস্তফা (স): সমকালীন পরিবেশ ও জীবন, পৃ. ৮০৮)।
সীরাত ইন্ন হিশামে বর্ণিত হইয়াছে যে, রাসূলুল্লাহ্ (স) যুদ্ধক্ষেত্রের দিকে তাকাইয়া দেখিলেন, উম্মু সুলায়ম বিন্ত মিলহান (রা) তাঁহার স্বামী আবূ তালহা (রা)-এর সহিত রণাঙ্গনে আসিয়াছেন। তিনি স্বীয় কোমরে একটি চাদর জড়াইয়া রাখিয়াছিলেন। তখন আবূ তালহার সন্তান "আবদুল্লাহ্” তাঁহার গর্ভে। আবূ তালহার উট তিনি সামলাইয়া নিয়া যাইতেছিলেন। তাঁহার আশংকা হইতেছিল যে, সম্ভবত তাহার উট তাহার অনুগত থাকিবে না। এইজন্য উটের মাথা নিকটে টানিয়া ধরিয়া তাঁহার হাত নাকে বাঁধা রশির সাথে উটের নাকের ছিদ্রের মধ্যে ঢুকাইয়া রাখিয়াছিলেন। রাসূলুল্লাহ্ (স) তাঁহাকে উদ্দেশ্য করিয়া বলিলেন, উম্মু সুলায়ম নাকি? তিনি জবাব দিলেন, হাঁ। আমার পিতা-মাতা আপনার জন্য কুরবান হউক। ইয়া রাসূলাল্লাহ্! আপনাকে ছাড়িয়া যাহারা পলায়ন করিবে আমি তাহাদিগকে হত্যা করিব যেমনিভাবে আপনি হত্যা করিবেন আপনার বিরুদ্ধে যুদ্ধরত শত্রুদিগকে। কেননা তাহারা ইহারই যোগ্য পাত্র। প্রত্যুত্তরে রাসূলুল্লাহ্ (স) বলিলেন, হে উম্মু সুলায়ম! আল্লাহ তা'আলাই কি তাহাদের জন্য যথেষ্ট নহেন (ইবন হিশাম, সীরাতুন নবী, ৪খ., পৃ. ৯৬; তারীখুল উমাম ওয়াল-মুলুক, ২খ., পৃ. ৩৪৯; ইবন হিশাম, সীরাতুন নবী (উর্দু), পৃ. ৫৩২)।
উম্মু সুলায়ম (রা)-এর সহিত একটি খঞ্জর ছিল। স্বামী আবু তালহা (রা) তাঁহাকে লক্ষ্য করিয়া বলিলেন, হে উম্মু সুলায়ম! এই খঞ্জর কিজন্য আনিয়াছ? উত্তরে তিনি বলিলেন, কোন পৌত্তলিক যদি আমার পাশ দিয়া অতিক্রম করে তাহা হইলে এই খঞ্জরের দ্বারা আঘাত করিয়া তাহার নাড়ি-ভুঁড়ি বাহির করিয়া ফেলিব (সীরাতে ইবন হিশাম, ৪খ., পৃ. ৯৬-৯৭; তারীখুল উমাম ওয়াল-মুলুক, ২খ., পৃ. ৩৪৯)। আবু তালহা (রা) বলিয়া উঠিলেন, হে আল্লাহ্র রাসূল! আপনি কি শুনিতে পাইতেছেন, রাগান্বিত উম্মু সুলায়ম কী বলিতেছে (ইব্‌ন হিশাম, সীরাতুন নবী, ৪খ., পৃ. ৯৭)?
আবূ তালহা (রা) একাই এই যুদ্ধে বিশজন শত্রু সৈন্যকে হত্যা করেন এবং তাহাদের নিকট হইতে অস্ত্র-সামগ্রী ছিনাইয়া লন (আল-বিদায়া ওয়ান-নিহায়া, ২খ., পৃ. ৩২৬; তারীখুল উমাম ওয়াল-মুলুক, ২খ., পৃ. ৩৪৯)। তাফসীরে রূহুল মা'আনীতে উক্ত হইয়াছে: كان اول من انهزم الطلقاء مكرا منهم وكان ذلك سببا لوقوع الخلل. “সর্বপ্রথম মক্কাবাসী নওমুসলিম ও পৌত্তলিকগণ চক্রান্ত করিয়া পরাজিত ও পশ্চাদপদ হয়। এই কারণেই মুসলমানদের মধ্যে বিশৃংখলা ও পরাজয় দেখা দেয়” (রূহুল মা'আনী, ১০খ., পৃ. ৬৬)।
মুসলিম বাহিনীর অনেকেই যখন রাসূলুল্লাহ্ (স)-কে পরিত্যাগ করিয়া পশ্চাৎপদ হইতে উদ্যত হইল তখন মক্কার নও-মুসলিম ও পৌত্তলিকগণ মুসলমানদিগকে নানাভাবে ব্যঙ্গ-বিদ্রূপ করিতে লাগিল। আবু সুফয়ান ইব্‌ন হারব বলিলেন, ইহারা পলাতকের দল, সমুদ্রোপকূলে না পৌঁছা পর্যন্ত তাহাদের এই পশ্চাৎপদতা ও দৌড়াদৌড়ি আর থামিবে না (আসাহ্হুস সিয়ার, পৃ. ২৮১; আর-রাহীকুল মাখতুম, পৃ. ৪১৫; তারীখুল উমাম ওয়াল-মুলুক, ২খ., পৃ. ৩৪৭)। তাহার এই কথা শুনিয়া আবূ মাকীত নামে একজন সাহাবী বলিলেন, আল্লাহ্র কসম! তোমাকে হত্যার ব্যাপারে যদি আমি রাসূলুল্লাহ্ (স)-এর নিষেধাজ্ঞা না শুনিতাম তবে অবশ্যই তোমাকে আমি হত্যা করিতাম (কিতাবুল মাগাযী, ৩খ., পৃ. ৯১০)।
কালাদা ইবনুল হাম্বল নামে জনৈক মক্কাবাসী বলিল: الا بطل السحر اليوم "আজ জাদু বাতিল হইয়া গিয়াছে"। কালাদার এই কথা শুনিয়া তাহার ভাই সাফওয়ান ইবন উমায়্যা তাহাকে শাসাইয়া বলিলেন, "চুপ কর, তোমার মুখে ছাই পড়ুক! আল্লাহ্ শপথ! হাওয়াযিনদের শাসন কর্তৃত্ব অপেক্ষা যে কোন কুরায়শ ব্যক্তির শাসন আমার নিকট অধিক শ্রেয়” (ইব্‌ন হিশাম, সীরাতুন নবী, ৪খ., পৃ. ৯৪; তারীখুল উমাম ওয়াল-মুলুক, ২খ., পৃ. ৩৪৭; আল-বিদায়া ওয়ান-নিহায়া, ২খ., পৃ. ৩২৬)। লোকজন যখন পরাস্ত হইয়া পশ্চাৎপদ হইতেছিল তখন মালিক ইবন আওফ নিজ অশ্বকে লক্ষ্য করিয়া তাঁহার উদ্দীপক কবিতায় বলিল:
اقدم محاح انه يوم نكر + مثلى على ملاك يحمى دكر.
হে আমার অশ্ব মু'আজ! তুই আগাইয়া চল। আজ ভীতিপ্রদ যুদ্ধের দিন। আমার মত লোক তোমার মত ঘোড়ার পিঠে চড়িয়াই এমন দিনে আত্মরক্ষা করে এবং আক্রমণের উপর আক্রমণ চালাইয়া যায়।
إذا اضيع الصف يوما والدبر + ثم احزالت زمر بعد زمر.
যুদ্ধের দিনে যখন সারিসমূহ ভাঙ্গিয়া যায়, অতঃপর দলের পর দল, বাহিনীর পর বাহিনী ধ্বংসপ্রাপ্ত হইয়া যায়।
كتاب يكل فيهن البصر + قد اطعن الطعنة تغذى بالسمر.
সেই বিশাল বাহিনীসমূহ যাহা দেখিয়া চক্ষু রীতিমত ক্লান্ত-শ্রান্ত হইয়া পড়ে। আমি তাহাদেরকে বর্শম নিক্ষেপে এমনভাবে গভীর ক্ষত করিতে আহত করি যে, তাহা (ক্ষত) দেখিবার জন্য এবং ক্ষত সারাইবার জন্য প্রয়োজন দেখা দেয়।
حين يذم المستكين المنجز + واطعن النجلاء تعوى وقر.
যখন পালাইয়া ঘরের কোণায় আশ্রয় গ্রহণকারী পরাভূতদের নিন্দাবাদ করা হইয়া থাকে, এমন সময় আমি এমন গভীর ক্ষত সৃষ্টিকারী আঘাত হানি, যাহা হইতে রীতিমত আওয়াজ বাহির হইতে থাকে।
لها من الجوف رشاش منهمر + تعهق تارف وحيتا تنفجر.
সেইসব ক্ষত হইতে প্রবহমান রক্তের ফোয়ারা বাহির হয়। কখনও বা সেইসব ক্ষত ফাটিয়া যায়, আবার কখনও তাহা প্রবাহিত হয় অর্থাৎ উহা হইতে রক্ত-পূঁজ প্রভৃতি গড়াগড়ি যায়।
وتلعب العامل فيها منكر + يا زيد يا بن همهم ابن تفر.
বর্শমের ফলা সেইসব ক্ষতের মধ্যে রহিয়া যায়। আর তখন আমরা ডাকিয়া ডাকিয়া এইরূপ বলি, “হে যায়েদ! হে ইবন হাম্মাম! তোমরা কোথায় পালাইয়া যাইতেছ?”
قد نفد الفرس وقد طال العمر + قد علم ابيض الطولات الخمر.
পেছন দাঁত ভাঙ্গিয়া গিয়াছে। বয়স অনেক বাড়িয়া গিয়াছে। দীর্ঘ দোপাট্টা পরিধানকারিণী মনোহারিণী নারীরা সম্যক অবগত। बिस्मिल्लाहिर रहमानिर रहीम आनी फी इमसालिहा गैर घिर + अ'ज ताखरूज अलहसिन मिन तहतास सितर जब सती साध्वी नारियों को पर्दा त्याग कर घर से बाहर जाने के लिए मजबूर होना पड़ता है, तब भी मैं इस तरह की शर्म से खुद को अज्ञानी या अज्ञानी साबित नहीं करता (इब्न हिशाम, सिरतुल नबी, 4 खंड, पृ. 96-97)।
इबन ইসহাক বলেন, শায়বা ইবন উছমান ইবন আবী তালহা আমার নিকট বর্ণনা করেন, আর তিনি ছিলেন আবদুদ্‌-দার গোত্রের সদস্য, আমি মনে মনে বলিলাম, আজই আমার মুহাম্মাদ-এর নিকট হইতে রক্তের প্রতিশোধ গ্রহণ করিবার সুবর্ণ সুযোগ।
উল্লেখ যে, তাঁহার পিতা ওহুদের যুদ্ধে মুসলমান সৈন্যদের হাতে নিহত হইয়াছিল। সে বলিল, আমি মুহাম্মাদকে হত্যা করিব। অতঃপর আমি মুহাম্মাদ (স)-কে হত্যার উদ্দেশ্যে তাঁহার চারিপাশে ঘুরিতে লাগিলাম। ইহার পর কী যেন আসিয়া আমার সামনে অন্তরায় সৃষ্টি করিল। এমন কি তাহা আমার হৃদয়কে আচ্ছন্ন করিয়া ফেলিল। শেষ পর্যন্ত আমার পক্ষে আর মুহাম্মাদকে হত্যা করা সম্ভব হইল না। আমি উপলব্ধি করিতে পারিলাম যে, আমাকে এই কাজ হইতে নিবৃত্ত করা হইয়াছে (ইবন হিশাম, সীরাতুন নবী, ৪ খ., পৃ. ৯৪; তারীখুল উমাম ওয়াল-মুলুক, ২খ., পৃ. ৩৪৬)।
ইবনুল কায়্যিম আল-জাওয়াযিয়া-এর বর্ণনামতে, শায়বা ইবন উছমান বলেন, আমি মুহাম্মাদ-কে হত্যা করিয়া কুরায়শদের প্রতিশোধ গ্রহণের সুযোগ লাভ করিবার উদ্দেশ্যে মুসলিম বাহিনীতে যোগদান করিয়াছিলাম। আমি মনে মনে প্রতিজ্ঞা করিয়াছিলাম যে, নিখিল বিশ্বের সমস্ত লোকও যদি তাঁহার আনুগত্য স্বীকার করিয়া লয় তথাপি আমি কখনও ও তাঁহার অনুসরণ করিব না। যখন মুসলিম বাহিনীতে বিশৃঙ্খলা দেখা দিল তখনই মনোবাঞ্ছা পূর্ণ করিবার সুবর্ণ সুযোগ মনে করিলাম। সুতরাং রাসূলুল্লাহ (স)-কে হত্যা করিবার অভিলাষে কোষমুক্ত তরবারি উঠাইয়া আমি তাঁহার দিকে অগ্রসর হইবার সংকল্প করিলাম। এমন সময় হঠাৎ ভীষণ এক অগ্নি বিদ্যুং আমার দৃষ্টিগোচর হইল। আমি ভীত-সন্ত্রস্ত হইয়া কাঁপিতে কাঁপিতে তরবারি ছাড়িয়া দিয়া উভয় হাতে স্বীয় চক্ষুদ্বয় চাপিয়া ধরিলাম। তখন রাসূলুল্লাহ (স) আমাকে ডাকিয়া বলিলেন: শায়বা! তুমি আমার কাছে আস। আমি তাঁহার কাছে গেলে তিনি আমার বক্ষে তাঁহার মুবারক হাত রাখিয়া বলিলেন : শায়বা! তুমি শত্রুদের বিরুদ্ধে অগ্রসর হইয়া যুদ্ধ কর। সেই সময় আমার মানসিক অবস্থা সম্পূর্ণ পরিবর্তিত হইয়া গেল। রাসূলুল্লাহ (স)-কে রক্ষা করিবার জন্য আমার প্রাণ পর্যন্ত উৎসর্গ করিয়া দিতে ইচ্ছা হইতে লাগিল। এমনকি ঐ সময় আমার পিতাও যদি সম্মুখে আসিত তবে রাসূলুল্লাহ (স)-কে রক্ষা করিবার নিমিত্ত তাঁহার মাথায় তরবারির আঘাত হানিতেও আমি দ্বিধাবোধ করিতাম না (যা’দুল মা‘আদ, ৩খ., পৃ. ১৮৫)।
যুদ্ধশেষে যখন আমি তাঁবুতে প্রত্যাবর্তন করিলাম তখন রাসূলুল্লাহ (স)-এর সহিত সাক্ষাত করিবার জন্য আমার মন-প্রাণ ব্যাকুল হইয়া উঠিল। তাই আমি তাঁহার তাঁবুতে গেলাম। তিনি একাই তাঁবুতে অবস্থান করিতেছিলেন। তিনি আমাকে বলিলেন: শায়বা! তুমি যে প্রতিজ্ঞা করিয়াছিলে তাহা অপেক্ষা ইহাই উত্তম যাহা আল্লাহ্ তোমার জন্য পছন্দ করিয়াছেন। অর্থাৎ তুমি আমাকে হত্যা করিতে চাও আর আল্লাহ্ চাহেন তুমি মুসলমান হও। সুতরাং মুসলমান হওয়াই তোমার জন্য মঙ্গলজনক। অতঃপর আমি যে পণ করিয়াছিলাম তিনি তাহা সবিস্তৃত খুলিয়া বলিয়া দিলেন। তখন আমি মুসলমান হইয়া গেলাম। অতঃপর রাসূলুল্লাহ্ (স) সমীপে এই বলিয়া প্রার্থনা করিলাম, হে আল্লাহ্র রাসূল! আপনি আমার জন্য আল্লাহ্ তা'আলার নিকট ক্ষমা প্রার্থনা করুন। তিনি বলিলেন: আল্লাহ তোমাকে ক্ষমা করিয়া দিয়াছেন (যাদুল মা‘আদ, ৩খ., পৃ. ১৬৫; হযরত মুহাম্মদ মুস্তফা (স): সমকালীন পরিবেশ ও জীবন, পৃ. ৮১০)।
যখন মুসলিম বাহিনীর অনেকেই রণক্ষেত্র পরিত্যাগ করিয়া পশ্চাদাপসরণ করিতে লাগিল, তখন রাসূলুল্লাহ্ (স) এই পরিস্থিতি অবলোকন করিয়া সৈন্যদের উদ্দেশ্যে বলিতে লাগিলেনঃ "হে লোকসকল! তোমরা কোথায় যাইতেছ? কিন্তু রাসূলুল্লাহ্ (স)-এর এই আহবান তাঁহারা স্পষ্টভাবে শুনিতে পাইতেছিল না (ইবন হিশাম, সীরাতুন নবী, ৪খ., পৃ. ৯৫)।
সেই সময় আবু সুফয়ান ইব্‌ন হারিছ রাসূলুল্লাহ (স)-এর সাদা খচ্চরের লাগাম ধরিয়া টানিয়া রাখিয়াছিলেন। ঐ খচ্চরটি ফারওয়া ইন্ন নুফাছা আল-জুযামী রাসূলুল্লাহ্ (স)-কে উপহারস্বরূপ দিয়াছিলেন (আল-বিদায়া ওয়ান-নিহায়া, ২খ., পৃ. ৩২৯)। হযরত আব্বাস (রা) রাসূলুল্লাহ্ (স)-এর- খচ্চরের রেকাব ধরিয়া উহাকে থামাইয়া রাখিয়াছিলেন। তাঁহারা উভয়ে এই কারণে খচ্চরকে থামাইয়া রাখিয়াছিলেন যে, উহা যেন দ্রুত গতিতে আগাইয়া না যায়।
অতঃপর রাসূলুল্লাহ্ (স) তাঁহার চাচা আব্বাস (রা)-কে বলিলেন, তিনি যেন মুসলিম সৈন্যদিগকে উচ্চস্বরে আহ্বান জানান। 'আব্বাস (রা) ছিলেন যেমনি বলিষ্ঠ দেহের অধিকারী, তেমনি তাঁহার কণ্ঠস্বরও ছিল অত্যন্ত সুউচ্চ। তিনি রাসূলুল্লাহ্ (স)-এর কথামত অতি উচ্চকণ্ঠে মুসলিম সৈন্যদিগকে আহ্বান জানাইয়া বলিলেন, ওহে বৃক্ষ সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিবর্গ অর্থাৎ বায়'আতে রিদওয়ানে অংশগ্রহণকারী সাহাবীগণ! তোমরা কোথায় আছ? আব্বাস (রা) বলেন, আমার উচ্চ কণ্ঠ শ্রবণ করামাত্র তাঁহারা এমনভাবে ফিরিয়া আসিলেন, বাচ্চার ডাক শুনিয়া গাভী যেমন ফিরিয়া আসে এবং আহবানের প্রত্যুত্তরে তাঁহারা বলিলেন, লাব্বায়ক, লাব্বায়ক (আমরা হাযির, আমরা হাযির)।
ইহার পর শুরু হইল আনসারদের প্রতি আহ্বান। আব্বাস (রা) উচ্চ কণ্ঠে ঘোষণা দিলেন, হে আনসারগণ! তোমরা কোথায়, দ্রুত আগাইয়া আস। আনসারদের উদ্দেশ্যে উচ্চকিত এই আহ্বান বানু হারিছ ইব্‌ন খাযরাজের মধ্যে সীমাবদ্ধ হইয়া গেল। এইদিকে মুসলিম সৈন্যগণ যেই গতিতে যুদ্ধক্ষেত্র পরিত্যাগ করিয়া গিয়াছিলেন, ঠিক একই গতিতে পুনরায় যুদ্ধক্ষেত্রে প্রত্যাবর্তন করিতে লাগিলেন (আর-রাহীকুল মাখতুম, পৃ. ৪১৬)।
তাঁহাদের তেজস্ক্রিয় তরবারির আঘাতে দ্বিখণ্ডিত হইয়া বহু শত্রুসেনা প্রাণ হারাইতে লাগিল। মুসলিম বীর সৈন্যগণ তাঁহাদের অসাধারণ বীরত্বের পরাকাষ্ঠা প্রদর্শন করিতেছিলেন। মুসলিম বাহিনীর এই প্রচণ্ড আক্রমণ দর্শন করিয়া রাসূলুল্লাহ্ (স) চরম উৎসাহ-উদ্দীপনার সহিত বলিলেন : الان حمى الوطيس "এতক্ষণে যুদ্ধ সরগরম হইয়া উঠিয়াছে” (আল-বিদায়া ওয়ান-নিহায়া, ২খ., পৃ. ২৩১; আর-রাহীকুল মাখতুম, পৃ. ৪১৬; হযরত মুহাম্মদ মুস্তফা (স) : সককালীন পরিবেশ ও জীবন, পৃ. ৮১১)।
যুদ্ধ চরম আকার ধারণ করিলে রাসূলুল্লাহ্ (স) স্বীয় খচ্চর হইতে অবতরণ করিয়া যমিন হইতে এক মুষ্টি ধুলা মাটি লইয়া شاهت الوجوه "মুখমণ্ডলগুলি বিকৃত হউক" বলিয়া কাফিরদের প্রতি নিক্ষপ করিলেন। আল্লাহ্র অসীম কুদরতে শত্রুবাহিনীর প্রত্যেক সৈন্যের চক্ষে সেই ধুলা পতিত হইল। ইহার পর হইতে তাহাদের যুদ্ধোন্মাদনা ক্রমে ক্রমে স্তিমিত হইতে থাকে এবং তাহাদের অবস্থার পরিবর্তন হইয়া যায়। ফলে তাহারা যুদ্ধক্ষেত্র হইতে পশ্চাদগমন করিতে বাধ্য হয় (আর-রাহীকুল মাখতুম, পৃ. ৪১৬; আল-বিদায়া ওয়ান-নিহায়া, ২খ., পৃ. ৩৩০; হাদ্দুল আনওয়ার ওয়া মাতালিউল আসরার ফী সীরাতিন নাবীয়্যিল মুখতার, ২খ., পৃ. ৬৮২)।
ইবনুল আছীর-এর বর্ণনামতে, রাসূলুল্লাহ্ (স) 'দুলদুল' নামক খচ্চরের উপর আরোহিত ছিলেন। তিনি তাঁহার খচ্চরকে মাটিতে বসিতে ইঙ্গিত করিলেন। খচ্চর তাহার পেট মাটির সাথ লাগাইলে তিনি এক মুষ্টি ধুলা মাটি লইয়া কাফিরদের প্রতি নিক্ষেপ করিলেন (তারীখুল কামিল, ২খ., পৃ. ২৬৪)।
আল্লামা তাবারী আর একটু বর্দ্ধিত করিয়া বর্ণনা করিয়াছেন যে, ধুলা মাটি নিক্ষেপকালে রাসূলুল্লাহ (স) বলিয়াছিলেন : حم لا ينصرون "হা-মীম, তাহারা সাহায্যপ্রাপ্ত হইবে না।” অতঃপর মুশরিকগণ পশ্চাদগমন করিল। অথচ তাহাদের প্রতি তীর, তরবারি, বল্লমের দ্বারা তেমন আঘাত করিতে হইল না (তারীখুল উমাম ওয়াল-মুলুক, ২খ., পৃ. ৩৫০)।
হাওয়াযিনদের সেই পতাকাবাহী লোকটি যখন মুসলিম সৈন্যদের বিরুদ্ধে অত্যন্ত সাহসিকতার সঙ্গে তাহার ধ্বংসযজ্ঞ চালাইয়া যাইতেছিল তখন আলী ইব্‌ন আবী তালিব (রা) এবং একজন আনসার সাহাবী তাহাকে হত্যা করিতে দৃঢ় সংকল্পবদ্ধ হইলেন। পরিকল্পনা মুতাবিক আলী (রা) লোকটির পশ্চাত দিক হইতে আসিয়া তাহার উটের পিছনের দুইটি পা কাটিয়া ফেলিলেন। ফলে উটটি উহার নিতম্বের উপর পড়িয়া গেল। সাথে সাথে আনসার সাহাবী লোকটির উপর ঝাঁপাইয়া পড়িলেন। তিনি তাহার পায়ের উপর তরবারি দ্বারা সজোরে আঘাত করিতেই লোকটির পায়ের গোছা ঠিক মাঝামাঝি জায়গায় দ্বিখণ্ডিত হইয়া গেল। অতঃপর সে তাহার বাহন হইতে নিচে পড়িয়া গিয়া নিহত হইল (ইবন হিশাম, সীরাতুন নবী, ৪খ., পৃ. ৯৫-৯৬)।
জাবির ইবন 'আবদিল্লাহ্ (রা) বলেন, এই যুদ্ধে লোকজন সাহস ও বীরত্বের পরাকাষ্ঠা প্রদর্শন করে। মুসলমানদের তুমুল আক্রমণে শত্রুবাহিনী বিপর্যস্ত হইয়া পড়ে। আল্লাহ্র শপথ! শত্রুপক্ষীয় যেই লোক একবার পরাজিত হইয়া পালাইয়াছে সে পুনরায় যুদ্ধের ময়দানে ফিরিয়া আসিবার সাহস হারাইয়া ফেলিয়াছে। এমনকি শেষ পর্যন্ত শত্রুপক্ষের এক বিরাট সংখ্যক সৈন্য মুসলমানদের নিকট ধৃত হয়।
রাসূলুল্লাহ (স) একবার আবূ সুফয়ান ইবন হারিছ ইব্‌ন আবদুল মুত্তালিবের প্রতি দৃষ্টি নিক্ষেপ করিলেন। যুদ্ধের বিভীষিকাময় মুহূর্তে যাঁহারা রাসূলুল্লাহ (স)-এর নিকটে থাকিয়া চরম ধৈর্য, স্থৈর্য ও সহিষ্ণুতার পরিচয় দিয়াছিলেন, তিনি ছিলেন তাঁহাদের একজন। তিনি ইসলাম গ্রহণ করিবার পর হইতে একজন পূর্ণ নিষ্ঠাবান মুসলমানরূপে পরিগণিত হন। যুদ্ধের সেই কঠিন মুহূর্তে তিনি রাসূলুল্লাহ (স)-এর খচ্চরের জিনের পিছনের অংশ ধরিয়া রাখিয়া ছিলেন। তখন রাসূলুল্লাহ (স) জিজ্ঞাসা করিলেন, কে হে? উত্তরে তিনি বলিলেন, আমি আপনার মায়েরই সন্তান ইয়া রাসূলাল্লাহ (ইবন হিশাম, সীরাতুন নবী, ৪খ., পৃ. ৯৬)। আসলে ইনি ছিলেন রাসূলুল্লাহ্ (স)-এর চাচাতো ভাই এবং তাঁহার দাদীর পৌত্র। আরবী বাক্কারায় এইরূপ লোককে নিজের মায়ের সন্তান বলিবার প্রচলন ছিল বিধায় তিনি এইরূপ বলিয়াছেন।
ইবন ইসহাক বলেন, আবদুল্লাহ্ ইব্‌ন আবী বাক্স আমার নিকট আবু কাতাদা আনসারীর সূত্রে বর্ণনা করেন, তিনি বলেন, আমার এমন কতক বন্ধু আমার নিকট এই ঘটনা বর্ণনা করিয়াছেন যাহাদিগকে অসত্য বক্তব্যের জন্য আমি অভিযুক্ত করিতে পারি না। তাহারা বানু গিফারের আদ্বাদকৃত গোলাম নাফে'-এর সূত্রে বলেন যে, আবু কাতাদা (রা) বলিয়াছেন, হুনায়নের যুদ্ধের দিন আমি দুই ব্যক্তিকে যুদ্ধরত অবস্থায় দেখিতে পাইলাম। ব্যক্তিদ্বয়ের একজন ছিলেন মুসলমান এবং অপরজন মুশরিক। এমন সময় আমি লক্ষ্য করিলাম যে, অপর এক মুশরিক আসিয়া তাহার অপর মুশরিক ভাইকে মুসলমান যোদ্ধার বিরুদ্ধে সাহায্য করিতে লাগিল। তখন আমি অগ্রসর হইয়া তাহার হাত কাটিয়া দিলাম। সে তাহার অপর হাত দিয়া আমার গলা চাপিয়া ধরিল। আল্লাহ্র কসম! সে আমাকে কোন মতেই ছাড়িতেছিল না, এমনকি আমার নিঃশ্বাস বন্ধ হইয়া যাওয়ার উপক্রম হইল। সে আমাকে প্রাণে মারিয়া ফেলিবার মত অবস্থার সৃষ্টি করিল। রক্তক্ষরণ যদি তাহাকে নিঃশেষিত না করিয়া ফেলিত তাহা হইলে অবশ্যই আমাকে হত্যা করিয়া ফেলিত। এমন সময় সে হঠাৎ মাটিতে পড়িয়া গেল। অতঃপর আমি তাহাকে আরেকটি আঘাত করিয়া হত্যা করিলাম। ইহার পর আমার অবস্থা এতই দুর্বল হইয়া পড়িল যে, আর যুদ্ধ করিতে সক্ষম হইলাম না। ঠিক এমন সময় জনৈক মক্কাবাসী আমাদের নিকট দিয়া অতিক্রম করিতে গিয়া নিহত সৈন্যটির দ্রব্য-সম্ভার হস্তগত করিল। যুদ্ধ শেষ হইলে আমরা শত্রুদের দিক হইতে সম্পূর্ণরূপে নিশ্চিত হইলাম, তখন রাসুলুল্লাহ্ (স) ঘোষণা করিলেন ارقام من قتل قتيلا فله سلبه :
করিয়াছে সেই হইবে তাহার নিকট হইতে লব্ধ দ্রব্য সামগ্রীর অধিকারী।" অতঃপর আমি বলিলাম, হে আল্লাহ্র রাসূল! আল্লাহর শপথ! আমি যুদ্ধে প্রতিপক্ষ এক ব্যক্তিকে হত্যা করিয়াছি। নিহত ব্যক্তির নিকট যথেষ্ট দ্রব্য সামগ্রী ছিল। কিন্তু তখন আমি নিতান্তই ক্লান্ত হইয়া পড়িয়াছিলাম। কে তাহা উঠাইয়া নিয়া গিয়াছে তাহা আমার জানা নাই। তখন মক্কাবাসী এক ব্যক্তি বলিল, হে আল্লাহর রাসূল! সে সত্যই বলিয়াছে। ঐ নিহত শত্রু সৈন্যের দ্রব্য-সামগ্রী আমার নিকট আছে। আপনি এই দ্রব্যগুলি আমার নিকট থাকিবার ব্যাপারে তাহাকে সম্মত করাইয়া দিন।
তখন আবূ বাক্স সিদ্দীক (রা) বলিলেন, আল্লাহর শপথ! তাহা কখনও হইতে পারে না। এই ব্যাপারে রাসূলুল্লাহ্ (স) তাহাকে সম্মত করিবেন না। আল্লাহ্র সিংহদের মধ্যকার একজন সিংহ যে তাঁহারই দীনের হিফাযতের জন্য যুদ্ধ করে, তুমি তাহার প্রাপ্যে ভাগ বসাইতে চাহিতেছ? তাহার হাতে নিহত শত্রুর দ্রব্যসামগ্রী তাঁহাকে ফিরাইয়া দাও। তখন রাসূলল্লাহ্ (স) বলিলেন, আবূ বাক্স ঠিকই বলিয়াছেন। তুমি তাহার প্রাপ্য তাহাকে ফিরাইয়া দাও। আবু কাতাদা (রা) বলেন, সঙ্গে সঙ্গে আমি তাহা তাহার নিকট হইতে গ্রহণ করিলাম। অতঃপর উহা বিক্রয় করিয়া একটা খেজুর বাগান খরিদ করিলাম। ইহাই ছিল আমার ইসলাম গ্রহণের পর প্রথম সম্পদ (ইবন হিশাম, সীরাতুন নবী, ৪খ., পৃ. ৯৮-৯৯; আল-বিদায়া ওয়ান-নিহায়া, ২খ., পৃ. ৩২৮; সীরাতু মুহাম্মাদিয়্যা, তরজমা মাওয়াহিবুল লাদুন্নিয়্যা, ১খ., পৃ. ৫৫২)।
ইবন ইসহাক বলেন, আবূ ইসহাক ইব্‌ন্ন ইয়াসার আমার নিকট বলেন যে, জুবায়র ইন্ন মুত'ইম (রা)-এর সূত্রে তাঁহার নিকট বর্ণনা করা হইয়াছে যে, তিনি বলিয়াছেন, শত্রু সম্প্রদায়ের পরাজয়ের প্রাক্কালে মুসলিম বাহিনী যখন প্রতিপক্ষের সাথে যুদ্ধরত, তখন দেখিলাম আসমান হইতে কাল চাদরের ন্যায় কী যেন নামিয়া আসিতেছে। শেষ পর্যন্ত উহা আমাদের এবং শত্রুবাহিনীর মধ্যবর্তী স্থানে পতিত হইল। আমি তাকাইয়া দেখিলাম অসংখ্য কাল রং-এর পিপঁড়া সমস্ত প্রান্তর ছড়াইয়া পড়িয়াছে। তখন আমার মনে আর কোন সংশয় থাকিল না যে, ইহারা আল্লাহ্র ফেরেস্তা। অতঃপর শত্রুসৈন্যদের পরাজয় না হওয়া পর্যন্ত তাহারা আমাদের সঙ্গেই ছিলেন, প্রান্তর ছাড়িয়া চলিয়া যান নাই (ইবন হিশাম, সীরাতুন নবী, ৪খ., পৃ. ৯৯; তারীখুল উমাম ওয়াল-মুলুক, ২খ., পৃ. ৩৪)।
ইবন ইসহাক বলেন, হুনায়নের মুশরিক বাহিনী যখন পরাজিত হইল এবং রাসূলুল্লাহ্ (স) কে আল্লাহ্ তা'আলা তাহাদের উপর বিজয় দান করিলেন, তখন জনৈকা মুসলিম মহিলা নিম্নের কবিতা আবৃত্তি করিলেন:
قد غلبت خيل الله خيل اللات + الله احق بالثبات.
"লাত প্রতিমার অশ্বারোহী দলের উপর আল্লাহ্ অশ্বারোহী দল বিজয় লাভ করিয়াছে। আর আল্লাহই চিরঞ্জীব চিরস্থায়ী সত্তা হইবার অধিকতর যোগ্য "(আল-বিদায়া ওয়ান-নিহায়া ২খ., পৃ. ৩৩৩)।
ইন্ন হিশাম বলেন, কোন কোন বর্ণনাকারী আমার নিকট উক্ত পংক্তিটি এইভাবে আবৃত্তি করিয়া শুনাইয়াছেন:
قد غلبت خيل الله خيل اللات + وخيله احق بالثبات.
"লাত দেবতার অশ্বারোহীর উপর আল্লাহর অশ্বারোহী দল বিজয় লাভ করিয়াছে। আর আল্লাহ্ বাহিনী সুদৃঢ় থাকিবার অধিকতর যোগ্য" (ইবন হিশাম, সীরাতুন নবী, ৪খ., পৃ. ১০০)।
হুনায়নের যুদ্ধে জিবরাঈল (আ)-এর উপস্থিতি সম্পর্কে আল-ওয়াকিদী মা'মার ইব্‌ন রাশেদ-এর সূত্রে, তিনি যুহরী হইতে, তিনি উরওয়া হইতে এবং তিনি উম্মুল মুমিনীন 'আয়েশা (রা) হইতে বর্ণনা করেন, 'আয়েশা (রা) বলেন, হারিছা ইব্‌ন নু'মান (রা) রাসূলুল্লাহ্ (স)-এর নিকট দিয়া যাইতেছিলেন। তিনি জিবরাঈল (আ)-এর সঙ্গে দাঁড়াইয়া কানে কানে কথা বলিতেছিলেন। হারিছা (রা) তাঁহাদের উভয়কে সালাম দিলেন। ইহার কিছু সময় পর রাসূলুল্লাহ্ (স) তাহাকে বলিলেন, তুমি কি ঐ লোকটিকে দেখিয়াছ? হারিছা (রা) বলিলেন, হাঁ, আমি তাহাকে দেখিয়াছি, কিন্তু তিনি কে তাহা আমি চিনিতে পারি নাই। রাসূলুল্লাহ্ (স) বলিলেন, তিনি জিবরাঈল (আ)। তিনি তোমার সালামের জবাব দিয়াছেন (কিতাবুল মাগাযী, ৩খ., পৃ. ৯০১)।
ইব্‌ন আব্বাস (রা) বর্ণনা করেন, জিবরাঈল (আ) যুদ্ধের ময়দানে বিচরণ করিতেছিলেন। হারিছা ইব্‌ন নু'মান (রা) রাসূলুল্লাহ্ (স)-এর সঙ্গে অবস্থান করিতেছিলেন। জিবরাঈল (আ) বলিলেন, হে মুহাম্মাদ! তিনি কে? রাসূলুল্লাহ্ (স) বলিলেন: হারিছা ইব্‌ন নু'মান। অতঃপর জিবরাঈল (আ) বলিলেন, তিনি হুনায়নের ময়দানে ধৈর্য ধারণকারী আশিজন মুসলিম সৈন্যের একজন। আল্লাহ্ তা'আলা তাহাদিগকে এবং তাহাদের সন্তান-সন্ততিদিগকে জান্নাতে রিযিক দানের দায়িত্ব গ্রহণ করিয়াছেন। ইব্‌ন আব্বাস (রা) আরও বলেন, যাহাদিগকে এবং যাহাদের পরিজনদিগকে আল্লাহ্ তা'আলা জান্নাতে রিযিকদানের যিম্মাদারি গ্রহণ করিয়াছেন, আবূ সুফয়ান ইব্‌নুল হারিছ (রা) তাহাদের একজন (কিতাবুল মাগাযী, ৩খ., পৃ. ৯০১-৯০২)।
পশ্চাদগামী মুসলিম সৈন্যগণ যখন ফিরিয়া আসিলেন এবং তুমুল যুদ্ধ আরম্ভ হইল, মুসলমানগণ মুশরিকদের সন্তান-সন্ততিদিগকেও হত্যা করিবার ব্যাপারে তৎপর হইয়া উঠিলেন। এই সংবাদ রাসূলুল্লাহ্ (স)-এর নিকট পৌছিলে তিনি বলিলেন, জাতির এই কি অবস্থা যে, তাহারা শিশুদিগকে পর্যন্ত হত্যার আওতাভুক্ত করিয়াছে? সাবধান! তোমরা শিশুদিগকে হত্যা করিও না। এই কথাটি তিনি তিনবার বলিলেন। উসায়দ ইবন হুদায়র (রা) বলিলেন, হে আল্লাহর রাসূল! তাহারা কি মুশরিকদের সন্তান-সন্ততি নয়? রাসূলুল্লাহ্ (স) উত্তরে বলিলেন, মুশরিকদের সন্তান-সন্ততি কি তোমাদের উৎকৃষ্টজনদের অর্ন্তভুক্ত নয়? প্রত্যেক শিশুই ফিতরাতের (সত্য ধর্মের) উপর বহাল থাকে। অতঃপর তাহার পিতা-মাতা তাহাকে ইয়াহুদী বানায় কিংবা নাসারা বানায় (কিতাবুল মাগাযী, পৃ. ৯০৪-৯০৫; আরও দ্র. তাবাকাত, ২খ., পৃ. ১৫০)।
ইবন ইসহাকের বর্ণনামতে, যখন হাওয়াযিন গোত্রীয়দের পরাজয় হইল তখন তাহাদের বাবূ মালিকের শাখাগোত্র ছাকীফ কবীলার হত্যাযজ্ঞ চলিল। তাহাদের মধ্য হইতে সত্তর ব্যক্তি তাহাদের পতাকাতলে নিহত হয়। 'উছমান ইব্‌ন আবদুল্লাহ্ ইব্‌ন রবী'আ ইব্‌ন হারিছ ইব্‌ন হাবীব ছিল নিহতদের একজন। তাহাদের পতাকা ছিল যুল-খিমার তথা আওফ ইব্‌ন রাবী'-এর হাতে। সে যুদ্ধে নিহত হইলে উছমান ইব্‌ন আবদুল্লাহ্ পতাকা ধারণ করে। এই পতাকাবাহী অবস্থায় সেও যুদ্ধ করিতে করিতে নিহত হয়। রাসূলুল্লাহ (স) তাহার নিহত হওয়ার সংবাদ শুনিয়া বলিলেন:
أبعده الله فانه كان يبغض قريشا .
"তাহার প্রতি আল্লাহ্র অভিসম্পাত। কেননা সে কুরায়শদের প্রতি অত্যন্ত বিদ্বেষ ভাবাপন্ন ছিল" (ইব্‌ন হিশাম, সীরাতুন নবী, ৪খ., পৃ. ১০০; তারীখুল উমাম ওয়াল-মুলুক, ২খ., পৃ. ৩৪৯-৩৫০)।
আল-ওয়াকিদী বলেন, আবদুল্লাহ্ ইব্‌ন ইয়াযীদ ইয়া'কূব ইবন 'উতবার সূত্রে আমার নিকট বর্ণনা করিয়াছেন, তিনি বলেন, ছাকীফ গোত্রীয় উছমান ইব্‌ন আবদুল্লাহ্ কিছু সংখ্যক অশ্ব, ক্রীতদাস এবং কতিপয় মিত্র লোকসহ হুনায়ন যুদ্ধে অংশগ্রহণ করে। মিত্র এবং কতিপয় ক্রীতদাস তাহার সহিত যুদ্ধে নিহত হয়। সেই সাথে তাহার এক খৎনাবিহীন খৃস্টান ক্রীতদাস যুদ্ধে নিহত হয়। হযরত তালহা (রা) ছাকীফ গোত্রের নিহতদের পোশাক-পরিচ্ছদ তাহাদের দেহ হইতে খুলিয়া ফেলিতেছিলেন। ঐ ক্রীতদাসটির পোশাক খুলিতে গিয়া তিনি দেখিতে পান যে, সে খৎনাবিহীন। তখন তালহা (রা) চীৎকার করিয়া বলিলেন, হে আনসার সম্প্রদায়! আমি আল্লাহ্র শপথ করিয়া বলিতেছি, ছাকীফ গোত্রের লোকজন খৎনা করে না। মুগীরা ইন্ন শু'বা বলেনঃ আমি তাঁহার কথা শুনিয়া অত্যন্ত লজ্জিত হইলাম। আমার আশংকা হইল যে, এই ব্যক্তি আরবদের মধ্যে আমাদিগকে অপমানিত করিয়া ছাড়িবে। তখন আমি বলিলাম, দোহাই তোমার! আমার পিতা-মাতা তোমার জন্য কুরবান হউক, এমন কথা বলিও না। খৎনা বিহীন এই লোকটি আমাদের এক খৃস্টান ক্রীতদাস। অতঃপর আমি ছাকীফ গোত্রীয় অন্যান্য নিহতদের কাপড় খুলিয়া তাহাকে দেখাইতে লাগিলাম এবং বলিলাম, দেখ, ইহাদের প্রত্যেকেই খৎনা করা লোক। বলা হইয়া থাকে যে, নিহত সেই খৃস্টান ক্রীতদাসটি ছিল যুল-খিমারের। সে তাহার মনিবের সাথেই ঐ দিন যুদ্ধে নিহত হইয়াছিল (কিতাবুল মাগাযী, ৩খ., পৃ. ৯১১; তারীখুল উমাম ওয়াল-মুলুক, ২খ., পৃ. ৩৫০)।
ইবন ইসহাক বলেন, আহলাফ তথা মিত্র বাহিনীর পতাকা ছিল কুরায়ব ইব্‌ন আসওয়াদের হাতে। তাহারা পরাস্ত হইলে সে তাহার হাতের পতাকাটি একটি বৃক্ষের সহিত ঠেস দিয়া রাখিয়া পালাইয়া যায়। সেইসঙ্গে তাহার চাচাত ভ্রাতাগণ এবং গোষ্ঠীর অন্যান্য লোকজনও পালাইয়া যায়। ফলে আহলাফ তথা মিত্রদলসমূহের মধ্যকার দুই ব্যক্তি ছাড়া আর কেহই মারা যায় নাই। নিহত ব্যক্তিদ্বয় হইল গায়রাহ্, গোত্রের ওয়াহ্হাব এবং বান্ কুবাহ্ গোত্রীয় জাল্লাহ্। রাসূলুল্লাহ্ (স) জাল্লাহ্-এর নিহত হওয়ার সংবাদ শুনিয়া বলিলেন, অদ্য বানু ছাকীফের যুবককুল শিরোমণি নিহত হইল। তবে ইব্‌ন্ন হানীফা মতন্তরে ইবন হুনায়দার পুত্রটি অবশিষ্ট থাকিল। ইহার দ্বারা হারিছ ইব্‌ন উয়ায়সকে বুঝানো হইয়াছে (ইবন হিশাম, সীরাতুন নবী, ৪খ., পৃ. ১০১; তারীখুল উমাম ওয়াল-মুলুক, ২খ., পৃ. ৩৫০)।
কুরায়ব ইব্‌ন আসওয়াদের ভ্রাতৃদিগকে রাখিয়া পলায়ন এবং যুল-খিমার কর্তৃক তাহার গোত্রীয় জনগণকে মৃত্যুর মুখে ঠেলিয়া দেওয়ার কথা উল্লেখ করিয়া আব্বাস ইব্‌ন মিরদাস নিম্নের কবিতাগুলি আবৃত্তি করেন:
الا من مبلغ غيلان عنى + وسوف أخال يأتيه الخبير.
এরুপ কোন ব্যক্তি আছে কি যে গায়লানকে আমার বার্তা পৌঁছাইয়া দিবে? আমার ধারণা শীঘ্রই অবহিত ব্যক্তি তাহার নিকট পয়গাম পৌঁছাইবে।
وعروة إنما أهدى جوابا + وقولا غير قولكما يسير.
তৎসঙ্গে উরওয়াকেও। আর তোমাদিগকে আমি এমন একটি জওয়াব উপহার দিব, যাহা হইবে চিরন্তন এবং তোমাদের উভয়ের বক্তব্য হইতে স্বতন্ত্র।
بان محمدا عبد رسول + لرب لا يضل ولا يجور.
আর তাহা হইতেছে মুহাম্মাদ (স) বিশ্বপ্রভুর বার্তাবাহক গোলাম, তিনি সঠিক পথ হইতে বিভ্রান্ত হন না এবং কাহারও প্রতি যুলুমও করেন না।
وجدناه نبيا مثل موسى + فكل فتى يخابره محير.
আমরা তাঁহাকে মূসা (আ)-এর ন্যায় নবীরূপে পাইয়াছি। যে কেহ তাঁহার সহিত শ্রেষ্ঠত্বের মুকাবিলায় অবতীর্ণ হইবে সে পরাজিত হইবে।
وبئس الامر امر بنى قسى + يوج اذ تقسمت الامور.
ইয়ুজ উপত্যকায় বানু কাসসশী গোত্রের অবস্থা যখন শতধা বিভক্ত তখন তাহাদের অবস্থা অত্যন্ত শোচনীয় পর্যায়ে পৌছিল।
اضاعوا أمرهم ولكل قوم + امير والدوائر قد تدور.
তাহাদের বিষয় তাহারা নস্যাত করিয়া দিল। প্রত্যেক সম্প্রদায়ের একজন নেতা থাকে এবং চারিদিক হইতে তাহাদিগকে বিপদ ঘিরিয়া ফেলিল।
فجئنا أسد غابات اليهم + جنود الله ضاحية تسير.
বনের সিংহের ন্যায় আমরা তাহাদের পানে অগ্রসর হইলাম। আল্লাহর সেনাদল প্রকাশ্যে অগ্রসর হইতেছিল।
نوم الجمع جمع بنى قسى + على حنق نكاد له نطير.
আমরা আমাদের সৈন্যদলসমূহ বানু কাসসীর (হাওয়াযিন) বিভিন্ন বাহিনীর উদ্দেশ্যে অগ্রসর হইতেছিলাম রাগান্বিত অবস্থায়, যেন আমরা পাখির ন্যায় উড়িয়া চলিতেছিলাম।
واقسم لوهم مكتوا لسرنا + إليهم بالجنود ولم يغوروا.
আমি কসম করিয়া বলিতেছি! যদি তাহারা থাকিয়া যাইত তবে আমরা এমন সৈন্যবাহিনী লইয়া তাহাদের উদ্দেশ্যে যাত্রা করিতাম যাহারা তাহাদিগকে পরাস্ত না করিয়া প্রত্যাবর্তন করিত না।
فكنا اسبدا لية ثم حتى + اجناها وأسلمت النصور.
অতঃপর আমরা লিয়‍্যাতে পৌছিয়া সেখানকার সিংহবনে গমন করি এবং তাহা জয় করি, আর সেখানে রক্তপাতকে নিজেদের জন্য বৈধ করিয়া লই। ইহার পর নুসূর গোত্র আমাদের নিকট আত্মসমর্পণ করিল।
ويوم كان قبل لدى حنين + فأقلع والدماء به تمور.
ইতোপূর্বে হুনায়ন যুদ্ধের এমন একটি দিন অতিবাহিত হইয়াছে যাহাতে তাহাদের মূলোৎপাটন করা হইয়াছে এবং তাহাদের রক্ত প্রবাহিত করা হইয়াছে।
من الايام لم تسمع كيوم + ولم يسمع به قوم ذكور.
উহা ছিল যুদ্ধের দিবসসমূহের মধ্যে এমন একটি দিবস, যাহার কথা তোমরা কোন দিন শুনিতে পাও নাই কিংবা কোন বীর জাতিও ইতোপূর্বে এমন দিনের কথা শোনে নাই।
قتلنا في الغبار بنى حطيط + على راياتها والخيل زور.
আমরা বানু হুতায়তকে তাহাদের পতাকার কাছে গিয়া হত্যা করি যখন খুবই ধূলাবালি উড়িতেছিল, আর তাহাদের অশ্বগুলিকে পলায়ন করিতে দেখা যাইতেছিল।
ولم يك ذو الخمار رئيس قوم + لهم عقل يعاقب أو نكير.
সেই সময়ে যুল-খিমার তাহার সম্প্রদায়ের সর্দার ছিল না। তাহাদের বুদ্ধি-বিবেচনা ও প্রচেষ্টার তদবিরের শাস্তি তাহাদিগকে দেওয়া হইতেছিল।
أقام بهم على سنن المنايا + وقد بانت لمبصرها الأمور.
সে তাহার গোত্রীয় লোকদেরকে মৃত্যুর পথে দাঁড় করাইয়া দিয়াছে। অথচ সেই ব্যাপারসমূহ অবগতদের কাছে সুস্পষ্ট হইয়া উঠিয়াছে।
فافلت من نجا منهم جريضا + وقتل منهم بشر كثير.
তাহাদের মধ্যে যাহারা প্রাণে রক্ষা পাইয়াছিল তাহারা মৃত্যুর কাছাকাছি এবং তাহাদের অনেক লোককে হত্যা করা হইয়াছে।
ولا يغنى الأمور أخو التوافي + ولا الغلق الصريرة الحصور.
অকর্মণ্য অলস লোকেরা কোন গুরুত্বপূর্ণ কাজেই সিদ্ধহস্ত হয় না বা করিৎকর্মা প্রতিপন্ন হয় না। দুর্বলচেতারা, যাহারা না করে বিবাহ-শাদী, না মিশে নারীদের সাথে।
أحانهم وحان وملكوه + أمورهم وأفلتت الصقور.
সে তাহাদের সকলকে হত্যা করিল এবং নিজেও নিহত হইল। আর তাহাকে লোকজন এমন সংকটময় মুহূর্তে আমীররূপে গ্রহণ করিল যখন বীর যোদ্ধারা প্রাণভয়ে পলায়ন করিতেছিল।
بنو عوف تموح بهم جياد + أهين له الفصافص والشعير.
আওফ গোত্র, তাহাদের সহিত গর্বিত ভঙ্গিমায় চলে তাহাদের অভিজাত শ্রেণীর অশ্বরাজি, যেইগুলির জন্য তাজা শ্যামল ঘাস ও যবের প্রচুর যোগান রহিয়াছে।
فلولا قارب وبنو أبيه + تقسمت المزارع والقضور.
যদি কারিব ও তাঁহার অন্যান্য ভ্রাতৃ গোত্রের লোকজন না থাকিত, তাহা হইলে তাহাদের জমিজমা ও প্রাসাদসমূহ ভাগ-বাটোয়ারা হইয়া যাইত।
ولكن الرياسة عمموها + على يمن أشار به المسير.
বরং সমস্ত রাজত্ব তাহাদের হাতেই বরকতের জন্য অর্পণ করা হয়, যাহাদের হাতে অর্পণের জন্য ইঙ্গিতকারী অর্থাৎ রাসূলুল্লাহ্ (স) ইঙ্গিত করিয়াছেন।
أطاعوا قاربا ولهم جدود + وأحلام إلى عز تصير.
তাহারা কারিবের আনুগত্য করে অথচ সম্মানজনক অবস্থানে পৌছাইয়া দেয়ার জন্য তাহাদের পূর্বপুরুষ ও জ্ঞানবান লোকজন রহিয়াছে।
فإن يهدوا الى الاسلام يلفوا + أنوف الناس ما سمر السمير.
যদি তাহারা ইসলাম গ্রহণ করে তাহা হইলে যতদিন পর্যন্ত নৈশকালীন গল্পকারীর গল্প বলিবার ধারা অব্যাহত থাকিবে, ততদিন তাহারা জনগণের নাকস্বরূপ অর্থাৎ মর্যাদার পাত্র হইয়া থাকিবে।
وان لم يسلموا فهم أذان + بحرب الله ليس لهم نصير.
আর যদি তাহারা ইসলাম কবুল না করে তাহা হইলে ইহা হইবে তাহাদের আল্লাহর বিরুদ্ধে যুদ্ধের ঘোষণা এবং এই অবস্থায় তাহাদের কোন সাহায্যকারীও থাকিবে না।
كما حكت بني سعد وحرب + برهط بني غزية عنقفير.
ভयानक যুদ্ধ যেমনটি বিপর্যস্ত করিয়াছে সা'দ গোত্রকে, তেমনি গাষিয়্যা গোত্রকেও যুদ্ধে বিপর্যস্ত করা হইয়াছে।
كأن بنى معاوية من بكر + الى الإسلام ضائنة تخور.
বানু মু'আবিয়া ইব্‌ন বাক্‌র যেমন ইসলামের সামনে গাভীর বাছুর যেইগুলি হাম্বা হাম্বা রবে ডাকিতেছে।
فقلنا أسلموا إنا أخوكم + وقد برأت من الامن الصدور.
এইজন্য আমরা তাহাদিগকে উদ্দেশ্য করিয়া বলিলাম, ওহে তোমরা ইসলাম কবুল কর, তাহা হইলে আমরা তোমাদের ভাই, আর আমাদের হৃদয় হিংসা-দ্বেষমুক্ত।
كأن القوم اذا جاءوا إلينا + من البغضاء بعد السلم عور.
যখন তাহারা আমাদের নিকট আসিল, তখন সন্ধি হইয়া যাওয়া সত্ত্বেও তাহাদের অন্তরসমূহ বিদ্বেষে অন্ধ ছিল (ইব্‌ন হিশাম, সীরাতুন নবী, ৪খ., পৃ. ১০০-১০৪; আল-বিদায়া ওয়ান-নিহায়া, ২খ., পৃ. ৩৩৪-৩৩৫)।
মুসলমান এবং কাফির সৈন্যবাহিনীর মধ্যে যুদ্ধ যখন তুমুল আকার ধারণ করে আল্লাহ্র অবারিত সাহায্য, ফেরেস্তাদের অংশগ্রহণ এবং রাসূলুল্লাহ্ (স) কর্তৃক কাফিরদের প্রতি লক্ষ্য করিয়া এক মুষ্টি মাটি নিক্ষেপের ফলে কাফিরদের যুদ্ধোন্মাদনা ক্রমান্বয়ে স্তিমিত হইতে থাকে এবং তাহাদের অবস্থার পরিবর্তন হয়। বানু হাওয়াযিন এবং বানু ছাকীফ দেখিল যে, যুদ্ধ করিয়া কোন লাভ হইবে না, এই পরিস্থিতিতে যুদ্ধ অব্যাহত রাখিলে সকলকে মরিতে হইবে তখন শত্রুদের পরাজয়ের ধারা সূচিত হইয়া গেল। অল্প সময়ের ব্যবধানেই তাহারা শোচনীয়ভাবে পরাজিত হইয়া দ্রুত রণাঙ্গন ছাড়িয়া পালাইতে লাগিল। তাহারা এইরূপ ক্ষিপ্র গতিতে পলায়ন করিতেছিল যে, পিছনের দিকে ফিরিয়াও তাকাইল না। তাহারা নিজেদের স্ত্রী-পুত্র, পরিবার-পরিজন ও বিষয়-সম্পদ রাখিয়াই পলায়ন করিল। বানু ছাকীফের সত্তরজন লোক নিহত হইল এবং তাহাদের সঙ্গে যাহাকিছু সম্পদ, অস্ত্রশস্ত্র, মহিলা, শিশু ও গবাদি পশুপাল ছিল সবই গনীমত হিসাবে মুসলিম সৈন্যদের হস্তগত হইল। ইহাই হইতেছে সেই পরিবর্তন যে সম্পর্কে আল্লাহ তা'আলা পবিত্র কুরআনে ইরশাদ করিয়াছেন:
وَلَقَدْ نَصَرَكُمُ اللهُ فِي مَوَاطِنَ كَثِيرَةٍ وَيَوْمَ حُنَيْنِ إِذْ أَعْجَبَتْكُمْ كَثْرَتُكُمْ فَلَمْ تُغْنِ عَنْكُمْ شَيْئًا وَضَاقَتْ عَلَيْكُمُ الْأَرْضُ بِمَا رَحُبَتْ ثُمَّ وَلَيْتُمْ مُدْبِرِينَ . ثُمَّ أَنْزَلَ اللَّهُ سَكَيْنَتَهُ عَلَى رَسُولِهِ وَعَلَى الْمُؤْمِنِينَ وَأَنْزَلَ جُنُودًا لَّمْ تَرَوْهَا وَعَذَبَ الَّذِينَ كَفَرُوا وَذَلِكَ جَزَاءُ الْكَافِرِينَ.
"আল্লাহ তোমাদিগকে তো সাহায্য করিয়াছেন বহু ক্ষেত্রে এবং হুনায়নের যুদ্ধের দিনে, যখন তোমাদিগকে উৎফুল্ল করিয়াছিল তোমাদের সংখ্যাধিক্য; কিন্তু উহা তোমাদিগের কোন কাজে আসে নাই এবং বিস্তৃত হওয়া সত্ত্বেও পৃথিবী তোমাদিগের জন্য সংকুচিত হইয়াছিল ও পরে তোমরা পৃষ্ঠ প্রদর্শন করিয়া পলায়ন করিয়াছিলে। অতঃপর আল্লাহ্ তাঁহার নিকট হইতে তাঁহার রাসূল ও মু'মিনদিগের উপর প্রশান্তি বর্ষণ করেন এবং এমন এক সৈন্যবাহিনী অবতীর্ণ করেন যাহা তোমরা দেখিতে পাও নাই এবং তিনি কাফিরদিগকে শান্তি প্রদান করেন। ইহাই কাফিরদের কর্মফল” (৯: ২৫-২৬)।
পরাস্ত হইবার পর শত্রুদের একটি দল তায়েফ অভিমুখে চলিয়া যায়। অন্য একটি দল নাখলার দিকে পলায়ন করে। অধিকন্তু অন্য একটি দল আওতাসের পথ ধরে। রাসূলুল্লাহ্ (স) আবূ আমের আশ'আরী (রা)-এর নেতৃত্বে একটি দল আওতাসের দিকে প্রেরণ করেন। উভয় দলের মধ্যে সামান্য সংঘর্ষের পর মুশরিক বাহিনী পলায়নে উদ্যত হয়। দলনেতা আবূ আমের পরাজিতদের একটি দলের নিকট পৌঁছিয়া যান। তীর নিক্ষেপের মাধ্যমে উভয় পক্ষে যুদ্ধ শুরু হয়। ঘটনাক্রমে একটি তীর আসিয়া আবূ আমেরের উপর পতিত হয়। আর উহাতেই তিনি শহীদ হন। অতঃপর তাঁহার চাচাতো ভাই আবূ মূসা আশআরী (রা) পতাকা ধারণ করেন এবং শত্রুবাহিনীর সহিত যুদ্ধে লিপ্ত হন। আল্লাহ্ তা'আলা তাঁহার হাতে বিজয় দান করেন এবং মুশরিকদিগকে পরাজিত করেন। দুরায়দের পুত্র সালামা আবূ আমের আশ'আরী (রা)-কে তীর নিক্ষেপ করিয়াছিল। ঐ তীর তাঁহার হাঁটুতে বিদ্ধ হইয়াছিল এবং তাহাতেই তিনি শাহাদত বরণ করেন (ইবন হিশাম, সীরাতুন নবী, ৪খ., পৃ. ৪০৫; আর-রাহীকুল মাখতুম, পৃ. ৪১৭; আত-তাবাকাত, ২খ., পৃ. ১৫)।
মুসলিম অশ্বারোহীদের একটি দল নাখলার দিকে ধাবমান মুশরিকদের পশ্চাদ্ধাবন করেন এবং দুরায়দ ইব্‌ন সিম্মাহকে পাকড়াও করেন যাহাকে রাবী'আ ইব্‌ন রাফে' হত্যা করেন (আর-রাহীকুল মাখতুম, পৃ. ৪১৭)।
এই প্রসঙ্গে ইবন হিশাম বলেন, নাখলায় ছাকীফ গোত্রের গিয়ারা উপগোত্রীয়রা ব্যতীত আর কেহ যায় নাই। রাসূলুল্লাহ্ (স)-এর অশ্বারোহী বাহিনী নাখলাগামী শত্রুদের পশ্চাদ্ধাবন করে, কিন্তু যাহারা পার্বত্য পথে পালাইয়া গিয়াছিল তাহারা তাহাদের পশ্চাদ্ধাবন করে নাই। রাবী'আ ইব্‌ন রাফি' ইব্‌ন ইমরাউল কায়স যাহাকে তাহার মাতা দাগিনার নামানুসারে ইবনুদ দাগিনা বলা হইত, এই নামেই সে প্রসিদ্ধ ছিল- ইবন হিশামের ভাষ্য অনুসারে যাহাকে ইব্‌ লায়ু'আ বলা হইত-সে দুরায়দ ইবন সিম্মাহকে পাকড়াও করিতে সক্ষম হয়। রবী'আ দুরায়দের উটের লাগাম ধরিয়া ফেলে। উহাতে পালকীর মত একটি হাওদা ছিল। তাহার ধারণা ছিল উটটির আরোহী একজন মহিলা। কিন্তু খোঁজ নিয়া দেখা গেল, সে নারী নয়, বরং একজন পুরুষ এবং লোকটি জরাজীর্ণ বৃদ্ধ। আসলে সে ছিল দুরায়দ ইবন সিম্মাহ্। দুরায়দ রবী'আকে বলিল, তুমি কি চাও? তিনি বলিলেন, আমি তোমাকে হত্যা করিতে চাই। তখন সে জিজ্ঞাসা করিল, তুমি কে? তিনি জবাব দিলেন, আমি রাবী'আ ইব্‌ন রাফে' সুলামী। অতঃপর তিনি স্বীয় তরবারি দ্বারা তাহাকে আঘাত করিলেন। কিন্তু তাহাতে কোন কাজ হইল না। দুরায়দ বলিল, তোমার মা তোমাকে ভাল তরবারি দ্বারা সজ্জিত করে নাই। হাওদার পিছন হইতে আমার তরবারিটি নিয়া আস এবং তাহা দ্বারা আঘাত কর। মস্তিষ্কের নিচে এবং হাড়ের উপরিভাগে আঘাত কর। কেননা আমি এইভাবেই লোকদিগকে হত্যা করিতাম। ইহার পর যখন তোমার মায়ের নিকট যাইবে তাহাকে বলিবে, আমি দুরায়দ ইব্‌ন সিস্‌সাকে হত্যা করিয়াছি।
আল্লাহর শপথ! অনেক যুদ্ধে আমি তোমাদের গোত্রের অনেক মহিলাকে রক্ষা করিয়াছি। অতঃপর রবীয়া তাহাকে হত্যা করিলেন। রবীয়া যুদ্ধের পর বাড়ী ফিরিয়া তাহার মাকে এই ঘটনা বর্ণনা করিয়া শোনান। তাহার মা বর্ণনা শুনিয়া ছেলেকে লক্ষ্য করিয়া বলেন, আল্লাহর কসম! তিনি একই দিন তোমার তিন মা অর্থাৎ আমাকে, তোমার দাদী ও নানীকে মুক্ত করিয়াছিলেন (ইবন হিশাম, সীরাতুন নবী, ৪খ., পৃ. ১০৩-১০৪; এইচ. এম. হায়কাল, মহানবী (স)-এর জীবন চরিত, পৃ. ৫৬৬)।
হুনায়নের এই যুদ্ধে মুসলমানদের মধ্য হইতে উম্মু আয়মান (রা)-এর পুত্র উসামা ইব্‌ন যায়দ (রা)-এর বৈপিত্রেয় ভাই আয়মান ইবন উবায়দ ইবন যায়দ আল-খাযরাজী, সুরাকা ইনুল হারিছ এবং রুকায়ম ইবন ছা'লাবা ইন্ন যায়দ ইবন লাওযান শাহাদাত বরণ করেন। বানু নাসর ইব্‌ন মু'আবিয়া এবং বানু রিবাব-এর অনেক লোকই এই যুদ্ধে প্রাণ হারান। 'আবদুল্লাহ্ ইবন কায়স যিনি বানু ওয়াহব ইন্ন রিবাবের অন্তর্ভুক্ত ছিলেন এবং মুসলমান ছিলেন, যাহাকে ইবনু আওয়া নামে অভিহিত করা হইত, তিনি বলিতে লাগিলেন, বান্ রিবাবের তো ধ্বংস হইয়া গেল। তখন রাসূলুল্লাহ্ (স) তাঁহাদের জন্য দু'আ করিয়া বলিলেন:
اللهم أجبر مصيبتهم. “হে আল্লাহ! তুমি তাহাদের ক্ষতি পোষাইয়া দাও, তাহাদের বিপদের প্রতিবিধান কর" (আত-তাবাকাতুল কুবরা, ২খ., পৃ. ১৫২; ইবন হিশাম, সীরাতুন নবী, ৪খ., পৃ. ১০৬)।
মুসলিম বাহিনীর হাতে পরাজিত হইবার পর মালিক ইবন 'আওফ যুদ্ধক্ষেত্র হইতে বাহির হইয়া একটি গিরিপথে তাহার অশ্বারোহী দলের সম্মুখভাগে গিয়া দাঁড়াইল। সে তাহার অনুগামীদের উদ্দেশ্য করিয়া বলিল, যতক্ষণ না তোমাদের দুর্বল লোকেরা চলিয়া যায় ততক্ষণ পর্যন্ত তোমরা এখানে দাঁড়াও। ততক্ষণে তোমাদের পশ্চাতে যাহারা রহিয়া গিয়াছে তাহারা আসিয়া তোমাদের সহিত একত্র হইবে। সেইমতে সে নিজেও সেখানে দাঁড়াইয়া রহিল। অতঃপর সেই পরাজিত দুর্বলরা তাহার সহিত আসিয়া মিলিত হইয়া তাহারা তাহাকে অতিক্রম করিয়া গেল (আল-বিদায়া ওয়ান-নিহায়া, ৪খ., পৃ. ৩৩৫; ইবন হিশাম, সীরাতুন নবী, ৪খ., পৃ. ১০৬-১১৮)।
ইবন ইসহাক বলেন, আমার নিকট এই বর্ণনা পৌঁছিয়াছে যে, মালিক ইবন 'আওফ এবং তাহার সঙ্গীরা যখন গিরিপথে দণ্ডায়মান ছিল, তখন সেখানে একটি অশ্বারোহী দলের উদয় ঘটে। সে তাহার সাথীদিগকে জিজ্ঞাসা করিল, তোমরা কী দেখিতে পাইতেছ? উত্তরে তাহারা বলিল, আমরা এমন একটি সম্প্রদায়ের জনগণকে প্রত্যক্ষ করিতেছি যাহারা স্বীয় বল্লম তাহাদের অশ্বরাজির কর্ণসমূহের ফাঁকে রাখিয়াছে এবং তাহাদের জানু প্রলম্বিত। তখন মালিক ইব্‌ন আওফ বলিল, তাহারা বনূ সুলায়মের লোকজন। তাহাদের বিষয়ে ভীত হইবার কোন কারণ নাই। তাহারা আসিয়া তাহাদিগকে অতিক্রম করিয়া উপত্যকার নিম্ন ভূমির দিকে নামিয়া গেল। অতঃপর তাহাদের ঠিক পশ্চাতে আরেকটি অশ্বারোহী দলের আবির্ভাব ঘটিল। তখন সে তাহার সঙ্গীদিগকে পূর্বের ন্যায় জিজ্ঞাসা করিল, তোমরা কী দেখিতে পাইতেছ? তাহারা উত্তরে বলিল, ' আমরা দেখিতেছি এমন এক গোত্রের লোকজনকে যাহারা নিজ নিজ বল্লম তাহাদের অশ্বসমূহের উপর এলোপাটারি রাখিয়া দিয়াছে। মালিক ইবন আওফ বলিল, উহারা হইল আওস ও খাযরাজ গোত্রীয় লোকজন। তাহাদের পক্ষ হইতে তোমাদের কোন ক্ষতির আশংকা নাই। তাহারাও গিরিপথের কাছে আসিয়া সুলায়ম গোত্রীয় লোকজনের পথ ধরিয়া নিচের দিকে চলিয়া গেল।
ইহার পর ঐ স্থানে আরেকজন অশ্বারোহীর আগমন ঘটিল। তখনও সে তাহার সঙ্গীদিগকে বলিল, তোমরা কী দেখিতে পাইতেছ? তাহারা উত্তরে বলিল, লম্বা জানুবিশিষ্ট একজন অশ্বারোহীকে দেখিতে পাইতেছি। তাহার বল্লম তাহার কাঁধের উপর লটকানো এবং তাহার মাথায় বাঁধা রহিয়াছে একটি লাল রঙের পট্টি।
সে বলিল, এই লোকটি যুবায়র ইবনুল আওয়াম। সে তখন লাত দেবতার শপথ করিয়া বলিল, এই ব্যক্তি অবশ্যই তোমাদিগকে লণ্ডভণ্ড করিয়া দিবে। তোমরা তাহাকে প্রতিরোধ কর। যুবায়র যখন গিরিপথের নিকটবর্তী হইলেন তখন তাহারা তাঁহার প্রতি দৃষ্টি নিক্ষেপ করিল এবং তাঁহাকে প্রতিরোধ করিতে সচেষ্ট হইল। তিনি তাহাদের উপর বল্লম দ্বারা উপর্যুপরি আঘাত হানিতে লাগিলেন এবং শেষ পর্যন্ত তাহাদিগকে ঐ স্থান হইতে তাড়াইয়া দিলেন (আল-বিদায়া ওয়ান-নিহায়া, ৪খ., পৃ. ৩৩৬-৭)।
আবূ আমের (রা)-এর শাহাদাত ও তাহার ঘাতকদ্বয়ের নিধন সম্পর্কে ইবন হিশাম বর্ণনা করেন যে, আবূ আমের আশ'আরী (রা) আওতাসের যুদ্ধে এমন দশজন মুশরিকের মুকাবিলা করেন যাহারা ছিল পরস্পর ভাই। তাহাদের একজন প্রথমে আবূ আমেরের উপর আক্রমণ করিলে তিনিও তাহার উপর পাল্টা আক্রমণ করেন। তিনি তাহাকে ইসলাম গ্রহণের আহবান জানান। কিন্তু সে দাওয়াতে সাড়া না দেওয়ায় তিনি বলিলেন, হে আল্লাহ! তুমি তাহার ব্যাপারে সাক্ষী থাকিও। অতঃপর তিনি তাহাকে হত্যা করেন। তাহার পর আরেকজন তাহার উপর হামলা চালায়। আবূ আমের (রা) তাহাকেও প্রথমে ইসলাম গ্রহণের দাওয়াত দেন। কিন্তু সে কবুল না করায় তাহার উপর পাল্টা হামলা চালাইয়া বলিলেন, হে প্রভু! তুমি এই লোকটির বিষয়ে সাক্ষী থাকিও। অতঃপর তাহাকেও হত্যা করিলেন। ইহার পর পর্যায়ক্রমে একের পর এক তাহাদের সকলেই তাঁহার উপর আক্রমণ পরিচালনা করে আর আবূ আমের (রা) একই পদ্ধতিতে প্রত্যেকের সময় উপরিউক্ত বাক্য বলিয়া তাহাদের নয়জনকেই হত্যা করেন।
পরিশেষে তাহাদের দশম ভ্রাতা আবু আমের (রা)-এর উপর আক্রমণ চালায়। পূর্ববর্তীদের ন্যায় তাহাকেও তিনি প্রথমে ইসলামের দাওয়াত দেন এবং পরে “হে আল্লাহ্! তুমি এই লোকটির ব্যাপারেও সাক্ষী থাকিও” বলিয়া তাহার উপর পাল্টা আক্রমণ চালাইলেন। এই লোকটি তৎক্ষণাৎ বলিল, হে আল্লাহ্! আমার ব্যাপারে তুমি সাক্ষী থাকিও না। তখন আবু আমের তাহাকে হত্যা করা হইতে বিরত রহিলেন। লোকটি নিশ্চিত মৃত্যু হইতে রক্ষা পাইয়া সাথে সাথে ইসলাম গ্রহণ করিল এবং নিষ্ঠাবান মুসলমান হিসাবে পরিগণিত হইল। ইহার পর যখনই রাসূলুল্লাহ্ (স) ঐ লোকটিকে দেখিতেন তখনই বলিতেন: আবূ আমের -এর তরবারিকে ফিকি দিয়া জীবন রক্ষা পাওয়া লোকটি।
ইহার পরপরই জু'শাম গোত্রের হারিছের দুই পুত্র ‘আলা’ ও আত্ফা ভ্রাতৃদ্বয় একযোগে আবু আমের (রা)-এর উপর তীর নিক্ষেপ করে। একজনের নিক্ষিপ্ত তীর তাঁহার স্কন্ধস্থিত বর্ম বিদীর্ণ করে এবং অপরজনের তীর তাঁহার হাঁটুতে আসিয়া বিদ্ধ হয়। এই আঘাতেই তিনি শাহাদাত বরণ করেন (ইব্‌ন হিশাম, সীরাতুন নবী, ৪র্থ, পৃ. ১০৮; তাজরীদ আসমাইস সাহাবা, ২খ., পৃ. ১৯৬)। রাসূলুল্লাহ্ (স) আবূ আমের (রা)-এর জন্য দু'আ করিয়া বলিলেন:
اللَّهُمَّ اغْفِرْ لِأَبِي عَامِرٍ وَاجْعَلْهُ مِنْ أَعْلَى أُمَّتِي فِي الْجَنَّةِ “হে আল্লাহ্! আবূ আমেরকে তুমি ক্ষমা কর এবং তাহাকে জান্নাতে মর্যাদাশীল শীর্ষস্থানীয় উম্মতের অন্তর্ভুক্ত কর।”
তাঁহার ভাতিজা আবু মুসা আশআরী (রা)-কে তাঁহার স্থলাভিষিক্ত করা হয়। তিনি ঘাতকদ্বয়ের উপর পাল্টা আক্রমণ করিয়া তাহাদের উভয়কে হত্যা করেন। রাসূলুল্লাহ্ (স) আবূ মুসা (রা)-এর জন্য দু'আ করিয়াছিলেন (আত্-তাবাকাতুল কুবরা, ২খ., পৃ. ১৫২; ইব্‌ন হিশাম, সীরাতুন নবী, ৪র্থ, পৃ. ১০৮)। অন্য বর্ণনামতে, সালামা ইব্‌ন দুরায়দ ইব্‌ন সিমা কর্তৃক তীর নিক্ষেপের ফলে আবু আমের (রা) শহীদ হন (আত্-তারীখুল কামিল, ২খ., পৃ. ২৩৫)। জু'শাম ইব্‌ন মু'আবিয়া গোত্রের জনৈক ব্যক্তি আবু আমের (রা)-এর উক্ত ঘাতকদ্বয়ের মৃত্যুতে নিম্নে উল্লিখিত মর্সিয়া রচনা করেন:
ان الرزية قتل العلاء + وأوفى جميعا ولم يسندا هما القاتلان ابا عامر + وقد كان ذاهبة اريدا انا النبي لا كذب انا ابن عبد المطلب اللهم نزل نصرك هما تركاه لدى معرك + كان على عطفه محسدا فلم ترف الناس مثليهما + أقل عثارا وأرمى يدا.
"আলা এবং আওফার হত্যাযজ্ঞ একটা সাংঘাতিক মর্মান্তিক ঘটনা। তাহারা উভয়ে এমনভাবে মৃত্যুবরণ করিল যে, তাহাদের কোন অবলম্বন ছিল না।
তাহারা দুইজনই আবূ আমের-এর হত্যাকারী। আর আবূ আমের ছিলেন এক সুনিপুণ কুশলী অসি চালক যোদ্ধা।
রণক্ষেত্রে তাহারা উভয়ই তাঁহাকে এমন অবস্থায় পরিত্যাগ করিল যে, তাঁহার কানে যেন জাফরান মাখা ছিল।
লোকসমাজে তাহাদের ন্যায় মানুষ তুমি দেখ নাই যাহাদের নিপুণ হস্ত তীর চালনায় এবং লক্ষ্যভেদে খুব কমই ভুল করিয়া থাকে” (ইবন হিশাম, সীরাতুন নবী, ৪খ., পৃ. ১০৮)।

📘 সীরাত বিশ্বকোষ > 📄 মহানবী (স)-এর দুধবোন বন্দিনী শায়মা

📄 মহানবী (স)-এর দুধবোন বন্দিনী শায়মা


আল-ওয়াকিদী বলেন, রাসূলুল্লাহ্ (স) তাঁহার অশ্বরারোহী দলকে বলিলেনঃ তোমরা যদি বানূ সা'দ ইবন বাক্সের বিজাদ (ইবন হিশামের বর্ণনামতে মাজাদ) নামক লোকটিকে পাও তাহা হইলে অবশ্যই তাহাকে গ্রেফতার করিয়া নিয়া আসিবে। সে যেন তোমাদের হাত হইতে পালাইতে না পারে। এই লোকটি একটা মস্তবড় ঘটনা ঘটাইয়াছে। তাহা এই যে, তাহার নিকট একজন মুসলিম ব্যক্তি আসিয়াছিল। সে তাহাকে গ্রেফতার করিয়া তাহার অঙ্গ-প্রতঙ্গ টুকরা টুকরা করিয়া আগুনে জ্বালাইয়া দিয়াছে। মুসলিম অশ্বরোহী দল তাহাকে গ্রেফতার করিল। সঙ্গে তাহার পরিবার-পরিজন এবং রাসূলুল্লাহ্ (স)-এর দুধবোন হালীমা (রা)-র কন্যা শায়মা বিন্ত আল-হারিছ ইব্‌ন আবদুল উযযাকেও ধরিয়া নিয়া আসিল।
মহানবী (স)-এর দুধবোন শayমা বিন্ত হারিছ তখন বলিলেন, হে লোকসকল! জানিয়া রাখ, আমি কিন্তু তোমাদের সঙ্গী মুহাম্মাদ (স)-এর দুধবোন। মুসলিম সৈন্যগণ তাঁহার কথায় আস্থা আনিতে পারিল না। তাই তাহাকে নিয়া রাসূলুল্লাহ্ (স)-এর সমীপে উপস্থিত হইল। শায়মা বলিলেন, হে মুহাম্মাদ! আমি আপনার দুধবোন। নবী করীম (স) বলিলেন, ইহার কী নিদর্শন তোমার কাছে আছে? উত্তরে শায়মা রলিলেন, আপনি যে শিশুকালে আমার পিঠে কামড় দিয়াছিলেন উহার আলামত এখনও আমার পিঠে বিদ্যমান। তখন আমি আপনাকে কোলে লইয়া রাখিয়াছিলাম। সেই সময় আমরা আমাদের পিতা-মাতার তত্ত্বাবধানে ছিলাম। আমি দুধপান বিষয়ে আপনার সহিত ঝগড়া করিয়াছিলাম। হে আল্লাহর রাসূল! আপনি স্মরণ করিয়া দেখুন। রাসূলুল্লাহ্ (স) নিদর্শনটি শনাক্ত করিতে সমর্থ হইলেন এবং তিনি যে তাঁহার দুধবোন এই বিষয়ে নিশ্চিত হইলেন। অতঃপর তিনি তাহার সম্মানার্থে নিজের চাদরটি বিছাইয়া দিলেন এবং উহার উপর তাঁহাকে বসাইয়া অভিনন্দন জ্ঞাপন করিলেন। তাহাকে দেখিয়া রাসূলুল্লাহ (স)-এর নয়নযুগল অশ্রুসিক্ত হইল। তিনি তাঁহার পিতা-মাতা সম্পর্কে জিজ্ঞাসা করিলে শায়মা বলিলেন, তাহারা এই বৎসরই মারা গিয়াছেন। রাসূলুল্লাহ (স) তাহাকে লক্ষ্য করিয়া বলিলেন:
ان أحببت فاقيمى عندنا محبة مكرمة وإن أحببت أن ترجعي الى قومك وصلتك رجعت الى قومك.
"যদি তুমি আমাদের নিকট থাকিতে পছন্দ কর তাহা হইলে আমার পক্ষ হইতে তোমার জন্য রহিয়াছে প্রাণঢালা ভালবাসা ও সম্মান। আর যদি তুমি তোমার সম্প্রদায় ও পরিজনদের নিকট ফিরিয়া যাইতে চাও তবে যাইতে পার, আমার কোন আপত্তি নাই”।
শায়মা বলিলেন, আমি আমার সম্প্রদায়ের নিকটই ফিরিয়া যাইব। অতঃপর তিনি ইসলাম কবুল করিলেন। রাসূলুল্লাহ (স) তাঁহাকে তিনটি গোলাম ও একটি বাঁদী উপহার দেন। গোলামদের একজনের নাম ছিল মাকহুল। শায়মা তাহাকে ঐ বাঁদীর সহিত বিবাহ দেন (কিতাবুল মাগাযী, ৩খ., পৃ. ৯১৩-৯১৪; ইবন ইসহাক, আস-সীরাতুন নাবাবিয়া, ৪খ., পৃ. ১০০)।

লিঙ্ক শেয়ার করুন
close

লিঙ্ক কপি করুন

0:00
0:00