📄 মূর্তি ধ্বংসসাধন
আল্লাহ্র বিধানকে স্বচ্ছ এবং তাওহীদের প্রতিষ্ঠা করাই ছিল মক্কা বিজয়ের প্রধান উদ্দেশ্য। মক্কা বিজয়ের পর রাসূলুল্লাহ (স) ঘোষণা করিয়াছিলেন, যে ব্যক্তি আল্লাহ ও পরকালের প্রতি বিশ্বাস স্থাপন করিয়াছেন সে যেন নিজগৃহের মূর্তিসমূহ ভাঙ্গিয়া ফেলে (যাদুল মা'আদ, ১খ., পৃ. ৪১৭)। মক্কাবাসীগণ এত বড় পরাজয়ের সময়ও তাহাদিগকে সাহায্য করিতে অক্ষম হওয়ায় মূর্তি বিগ্রহের প্রতি বীতশ্রদ্ধ হইয়া পড়িয়াছিল। এতদিন তাহারা মনে করিত যে, ইহারা প্রভু। ইহাদের প্রতি যে বিন্দুমাত্র বেআদরী করিবে তাহার সর্বনাশ হওয়া অনিবার্য। অথচ আজ তাহারা স্বচক্ষে দেখিতে পাইল যে, মুসলমানগণ এই প্রভুদিগকে ভাঙ্গিয়া চূর্ণবিচূর্ণ করিয়া ফেলিলেন, অথচ তাহাদের কোনই ক্ষতি হইল না।
রাসূলুল্লাহ (স)-এর এই ঘোষণার পর যাহারা ইসলাম গ্রহণ করিয়াছিলেন তাহারা সকলেই নিজ নিজ গৃহের মূর্তিসমূহ ভাঙ্গিয়া ফেলিলেন। রাসূলুল্লাহ (স)-এর আদেশক্রমে সাহাবীগণ সাধারণ স্থানে প্রতিষ্ঠিত বৃহৎ মূর্তিগুলিও ভাঙ্গিয়া চূর্ণ-বিচূর্ণ করিয়া দিলেন। হুবল ছিল পৌত্তলিকদিগের সর্বশ্রেষ্ঠ প্রভু। ইহা মানবাকৃতিতে গঠিত ছিল, ইয়াকৃত আহমার নামক অতি মূল্যবান রত্ন দ্বারা প্রস্তুত করা হইয়াছিল। ইহা ছিল কা'বা গৃহের ভিতরে। আদনানের প্রপৌত্র খুযায়মা ইহাকে কা'বা গৃহে স্থাপন করিয়াছিল। হুবল মূর্তির সম্মুখে সাতটি তীর রাখা ছিল। কয়েকটি তীরের উপর 'হাঁ' আর কয়েকটির উপর 'না' লিখা ছিল। 'আরবগণ কোন গুরুত্বপূর্ণ কাজ আরম্ভ করিবার পূর্বে এই তীরগুলি দ্বারা লটারি করিয়া শুভাশুভ নির্ধারণ করিত। উহুদ রণক্ষেত্রে আবু সুফ্যান এই হুবলের জয়ধ্বনিই করিয়াছিলেন। রাসূলুল্লাহ (স) যখন কা'বাগৃহে প্রবেশ করিয়াছিলেন তখন অন্যান্য মূর্তিদের সহিত হুবল মূর্তিকেও ধ্বংস করিয়া দিলেন (মাওলানা শিবলী নুমানী, সীরাতুন্নবী পৃ. ৫২৭-৫২৮)।
মক্কার আশেপাশে বড় বড় আরও অনেক দেবতা-বিগ্রহ ছিল। তম্মধ্যে লাত, উয্যা, মানাত ও সুওয়া ছিল অধিক প্রসিদ্ধ। উয্যা প্রতিষ্ঠিত ছিল নাখলার প্রতিমাগৃহে (হায়কাল, পৃ. ৪১৩)। আরবগণ বিশ্বাস করিত যে, গ্রীষ্মকালে আল্লাহ তা'আলা উয্যা-এর নিকট অবস্থান করেন, আর শীতকালে অবস্থান করেন লাত-এর নিকট। তাহারা উয্যার নিকট ঐ সকল অনুষ্ঠান পালন করিত যাহা কা'বাগৃহে পালন করিত (যুরকানী, পৃ. ৪০০)।
এই কৃত্রিম প্রভুদের ধ্বংস করার জন্য রাসূলুল্লাহ (স) ত্রিশজন অশ্বারোহীসহ হযরত খালিদকে প্রেরণ করেন। তাঁহারা অবিলম্বে উষ্যাকে ধ্বংস করিয়া মক্কায় প্রত্যাবর্তন করেন। এক রিওয়ায়াতে আছে, প্রত্যাবর্তনের পর রাসূলুল্লাহ (স) হযরত খালিদকে জিজ্ঞাসা করিলেন, তুমি উয্যাকে ধ্বংস করিবার সময় কি দেখিলে? তিনি বলেন, আমি কিছুই দেখি নাই। রাসূলুল্লাহ (স) বলিলেন, তবে তুমি উয্যাকে ধ্বংস করিতে পার নাই। ইহা শুনিয়া খালিদ (রা) ক্রোধান্বিত হইয়া পুনরায় তথায় গিয়া দেখিতে পাইলেন, কৃষ্ণকায় উলঙ্গ একটি স্ত্রীলোক এলোকেশে উক্ত প্রতিমার ঘর হইতে বাহির হইতেছে। খালিদ (রা) তরবারির আঘাতে ঐ শয়তানীকে হত্যা করিলেন। মক্কায় ফিরিয়া এই সংবাদ জানাইলে রাসূলুল্লাহ (স) বলিলেন, এটাই ছিল উয্যা। এবার তুমি তাহাকে ধ্বংস করিতে পারিয়াছ (আত্-তাবাকাতুল কুবরা, ১খ., পৃ. ১৪৫-১৪৬; যাদুল মা'আদ, পৃ. ১৬৬; আসাহ্হুস সিয়ার, পৃ. ২৬৯)।
সুওয়া ছিল হুযায়ল গোত্রের শ্রেষ্ঠ দেবতা। ইহাকে ধ্বংস করিবার জন্য রাসূলুল্লাহ (স) হযরত আমর ইবনুল আস (রা)-কে প্রেরণ করেন। তিনি তথায় পৌছিলে তাঁহার অভিপ্রায় জানিতে পারিয়া দেবালয়ের সেবায়েত বলিল, আপনি আমাদের প্রভুকে ধ্বংস করিতে পারিবেন না। আপনি নিজেই তাহার কোপে পতিত হইয়া ধ্বংস হইয়া যাইবেন। আমর (রা) বলিলেন, ওরে বোকা! তুমি এখনও এই ভুল ধারাণায় আছ। ইহা একটি জড় পদার্থ মাত্র, ইহার কোন শক্তি নাই। এই বলিয়া তিনি মূর্তি ভাঙ্গিয়া চূর্ণবিচূর্ণ করিয়া বলিলেন, কোথায় তোমার প্রভু। আত্মরক্ষাও করিতে সক্ষম হইল না। তখন সেবায়েত লা ইলাহা ইল্লাল্লাহু মুহাম্মাদুর রাসূলুল্লাহ বলিয়া মুসলমান হইয়া গেল (তাবাকাত ইবন সা'দ, পৃ. ১৪৬; যাদুল মা'আদ, পৃ. ১৬৭)।
'মানাত' ছিল আওস, খাযরাজ ও গাস্সান গোত্রসমূহের বড় দেবতা। মদীনা হইতে মক্কার দিকে সাত মাইল দূরে কাদীদ-এর নিকট মুশাল্লাল নামক স্থানে ছিল মানাতের দেবালয়। বর্ণিত গোত্রসমূহের লোকেরা এই দেবতার হজ্জ করিত। মানাতের প্রভুত্বের অবসান ঘটাইবার জন্য রাসূলুল্লাহ (স) আবদুল আশহাল গোত্রের হযরত সা'দ ইব্ন যায়দকে প্রেরণ করেন। তিনি তথায় পৌছিয়া মানাত নামক পাথরটি ভাঙ্গিয়া ফেলেন।
অন্য এক রিওয়ায়াতে আছে যে, হযরত সা'দ (রা) তথায় পৌছিলে দেবালয়ের সেবায়েত তাঁহাকে আগমনের কারণ জিজ্ঞাসা করিল। তিনি বলিলেন, মানাতকে ধ্বংস করিবার উদ্দেশ্যে আসিয়াছি। সে বলিল, এই সম্পর্কে আমার বলিবার কিছু নাই। আপনি জানেন আর প্রভু মানাত জানেন। হযরত সা'দ মানাতকে ধ্বংস করিবার উদ্দেশ্যে অগ্রসর হইয়া দেখিতে পাইলেন, এলোকেশে একটি উলঙ্গ স্ত্রীলোক মুখে হাত মারিতে মারিতে বাহির হইতেছে। সেবায়েত স্ত্রীলোকটিকে লক্ষ্য করিয়া বলিল, হে প্রভু মানাত! এই ব্যক্তি তোমার অবাধ্য বান্দা। হযরত সা'দ (রা) নির্ভয়ে অগ্রসর হইয়া তরবারির আঘাতে স্ত্রীলোকটিকে হত্যা করিলেন। অতঃপর দেবলেয়ের ভিতরে প্রতিষ্ঠিত দেবতাসমূহকে ভাঙ্গিয়া চুরমার করিয়া দিলেন (আত-তাবাকাতুল কুবরা, ১খ., পৃ. ১৪৬-১৪৭; যাদুল মা'আদ, পৃ. ১৬৭-১৬৮)।
মক্কা বিজয়ের পর তিনি পনের দিন পর্যন্ত মক্কায় অবস্থান করিলেন (নু'মানী, সীরাতুন্নবী, পৃ. ৫২৭; হায়কাল, পৃ. ৪১৩)। এই সময় তিনি সাহাবীদিগকে কয়েকটি ক্ষুদ্র দলে বিভক্ত করিয়া বিশিষ্ট সাহাবীগণের নেতৃত্বে ইসলাম প্রচারের জন্য মক্কার পার্শ্ববর্তী অঞ্চলসমূহে প্রেরণ করেন। এই সময় ইসলাম প্রচারের জন্য হযরত খালিদ ইব্ন ওয়ালীদের নেতৃত্বে সাড়ে তিন শত সাহাবীকে বানু জাযীমা গোত্রের নিকট প্রেরণ করেন (সীরাত ইবন ইসহাক, ৩খ., পৃ. ৫১৫; বিস্তারিত দ্র. শিরো, সারিয়্যা খালিদ ইবনুল ওয়ালীদ)।
📄 বিচারক্ষেত্রে দৃঢ়তা
মক্কা বিজয়ের অব্যবহিত পর কুরায়শ গোত্রের মাখযূম বংশের এক (সম্ভ্রান্ত) মহিলা চুরি করিয়াছিল। রাসূলুল্লাহ (স) ইসলামী বিধান অনুসারে তাহার হাত কাটিতে নির্দেশ দিলেন। এই নির্দেশ শুনিয়া উক্ত বংশের সম্ভ্রান্ত ব্যক্তিবর্গ অত্যন্ত বিচলিত হইয়া পড়িল। হাত কাটার দণ্ড হইতে অব্যাহতি দেওয়ার সুপারিশ করিবার জন্য তাহারা হযরত উসামা (রা)-কে রাসূলুল্লাহ (স)-এর নিকট প্রেরণ করিল। উসামা (রা) এই বিষয়ে রাসূলুল্লাহ (স)-এর নিকট সুপরিশ করিলে তিনি অত্যন্ত ক্রোধান্বিত হইলেন এবং বলিলেন, উসামা! তুমি আল্লাহর নির্ধারিত দণ্ডবিধান হদ্দ-এর বিরুদ্ধে সুপারিশ করিতে আসিয়াছ? উসামা (রা) ক্ষমা চাহিলেন এবং আরয করিলেন, আপনি আমার এই ত্রুটির জন্য আল্লাহর দরবারে ক্ষমা প্রার্থনা করুন।
অতঃপর অপরাহ্নে সমবেত জনমণ্ডলীর মধ্যে দণ্ডায়মান হইয়া মহানবী (স) একটি বক্তৃতা প্রদান করেন। বক্তৃতার প্রারম্ভে যথারীতি আল্লাহর মহিমা বর্ণনা করিবার পর তিনি সকলকে সম্বোধন করিয়া বলিলেন : তোমাদের পূর্ববর্তী জাতিসমূহের মধ্যে কোন সম্ভ্রান্ত ব্যক্তি চুরি করিলে তাহাকে কোন শাস্তি দেওয়া হইত না, পক্ষান্তরে কোন দুর্বল লোক চুরি করিলে যথাবিধি তাহাকে শাস্তি প্রদান করা হইত। এইজন্যই উক্ত জাতিসমূহ ধ্বংসপ্রাপ্ত হইয়াছে। যাঁহার হাতে মুহাম্মাদ (স)-এর প্রাণ সেই আল্লাহর কসম করিয়া বলিতেছি! আজ যদি মুহাম্মাদ (স)-এর কন্যা ফাতিমাও চুরি করিত তবে নিশ্চয়ই আমি তাহার হাত কাটিয়া ফেলিতাম। অতঃপর উক্ত মহিলার হাত কাটিয়া দেওয়া হইল। তাহার নাম ছিল ফাতিমা। হযরত আইশা (রা) বলেন, হাত কাটার পর ঐ মহিলার আচরণ ভাল হইয়া যায়। কোন প্রয়োজনে রাসূলুল্লাহ (স)-এর নিকট আসিলে আমরা তাহার বিষয়টি রাসূলুল্লাহ (স)-এর খিদমতে পেশ করিতাম (সহীহুল বুখারী, ২খ., পৃ. ৬১৫)।
এভাবে মুহাম্মাদ (স) কুরায়শদিগকে সাম্য, মৈত্রী ও একতার বাণী শুনাইলেন। তিনি বলিলেন, হে কুরায়শগণ! অতীত যুগের সমস্ত ভ্রান্ত ধারণা মন হইতে মুছিয়া ফেল। কৌলিন্যের গর্ব ভুলিয়া যাও। সকলে এক হও। সকল মানুষই সমান-একথা বিশ্বাস কর। এইরূপে সকল গ্লানি ও সকল মলিনতা হইতে মুক্ত করিয়া মহানবী (স) কুরায়শ গোত্রের অন্তরে দিলেন এক নূতন প্রেরণা। সকল ভেদজ্ঞান দূর করিয়া প্রাণে প্রাণে দিলেন এক অভিনব প্রেমের বন্ধন, বক্ষে দিলেন নূতন আশা, কণ্ঠে দিলেন নূতন ভাষা, বাহুতে দিলেন নূতন বল। এক নূতন মহাজাতির বীজ আরবের মরুবক্ষে সেদিন প্রোথিত হইল।
ইব্ন শিহাব আয-যুহরী বলিয়াছেন, মক্কা অধিকার করিবার পর রাসূলুল্লাহ (স) সেখানে পনের রাত্রি অবস্থান করেন। মক্কা অধিকৃত হয় ২০ রামাদান, ৮ হিজরী সনে (ইব্ন হিশাম, সীরাতে রাসূলুল্লাহ (স), পৃ. ৫২০; Haykal, The Life of Muhammad, P. 413) ।