📄 কা'বা গৃহে প্রবেশ
যে স্থানে রাসূলুল্লাহ (স)-এর পতাকা উত্তোলিত হইয়াছিল সেই স্থালেই মসজিদে ফাতহ প্রতিষ্ঠিত হইয়াছে (মাজদুদ্দীন, পৃ. ৭২৫)। বিশ্রামের পর তিনি 'হাজুন'-এর শিবির হইতে বাহির হইয়া ভক্তবৃন্দ পরিবেষ্টিত অবস্থায় সূরা ফাতহ .إِنَّا فَتَحْنَا لَكَ فَتْحًا مُبِينًا
"নিশ্চয় আমি তোমাকে দিয়াছি সুস্পষ্ট বিজয়” (৪৮: ১) পাঠ ও "আল্লাহু আকবার” বলিতে বলিতে ধীরে ধীরে পবিত্র কা'বা গৃহের দিকে অগ্রসর হইতে লাগিলেন। কা'বা প্রাঙ্গণে উপস্থিত হইয়া তিনি সর্বপ্রথম হাজরে আসওয়াদকে চুম্বন করিলেন। অতঃপর তিনি ভক্তিভরে কা'বা শরীফের চতুর্দিকে সাতবার তাওয়াফ করিলেন। পবিত্র কা'বাগৃহের চতুষ্পার্শ্বে স্তরে স্তরে তিন শত ষাটটি মূর্তি প্রতিষ্ঠিত ছিল। রাসূলুল্লাহ (স) এই সকল মূর্তির সম্মুখে দণ্ডায়মান হইয়া হস্তস্থিত যষ্টি উত্তোলনপূর্বক বলিলেন:
جَاءَ الْحَقُّ وَزَهَقَ الْبَاطِلُ. "সত্য আসিয়াছে এবং মিথ্যা বিলুপ্ত হইয়াছে” (১৭:৮১)।
جَاءَ الْحَقُّ وَمَا يُبْدِئُ الْبَاطِلُ وَمَا يُعِيدُ. "সত্য আসিয়াছে এবং অসত্য না পারে নূতন কিছু সৃজন করিতে আর না পারে পুনরাবৃত্তি করিতে" (৩৪: ৪৯)।
এক রিওয়ায়াতে আছে যে, মক্কার অন্যান্য মূর্তিগুলিও সেদিনই ভাঙ্গিয়া ফেলা হইয়াছিল। সাফা ও মারওয়া পাহাড়দ্বয়ের উপর দুইটি প্রাচীন প্রস্তর মূর্তি ছিল। সাফায় অবস্থিত মূর্তিটির নাম ছিল ইসাফ, আর মারওয়াস্থিত মূর্তিটির নাম ছিল নায়িলা। কুরায়শদের বিশ্বাস ছিল যে, কোন এক সময়ে ইসাফ ছিল পুরুষ, আর নায়িলা ছিল নারী। ইহারা কা'বা গৃহের ভিতরে ব্যভিচার করার কারণে আল্লাহ্ তা'আলা তাহাদিগকে পাথরে পরিণত করেন। এতদসত্ত্বেও কুরায়শগণ ইহাদিগকে দেবতা বলিয়া ভক্তি করিত। সেদিন এই দুইটি পাপচিহ্নকেও চূর্ণ-বিচূর্ণ করিয়া দেওয়া হয় (আসাহ্হুস সিয়ার, পৃ. ২৫৯)।
📄 মহানবী (স)-এর অভিভাষণ
মক্কার অধিবাসীগণ ভয়ে, অভিমানে ও অনুতাপে একেবারে মুহ্যমান হইয়া পড়িল। তাহাদের ব্যাকুলতা ও চাঞ্চল্য চরমে পৌঁছিয়াছিল। তাহারা দলে দলে কা'বা প্রাঙ্গণে সমবেত হইল। রাসূলুল্লাহ (স) কি করেন বা কি বলেন তাহা জানিবার জন্য সকলেই ব্যাকুল চিত্তে কা'বা গৃহের দিকে তাকাইয়া আছে। এমন সময় সমবেত জনমণ্ডলীকে সম্বোধন করিয়া মহানবী (স) দরজার উভয় পার্শ্বের চৌকাঠে হাত রাখিয়া একটি নাতিদীর্ঘ ভাষণ দিলেন:
الْحَمْدُ لِلَّهِ الَّذِي أَنْجَزَ وَعْدَهُ. "আল্লাহর শোকর যিনি নিজের ওয়াদা পূর্ণ করিয়াছেন" (মোস্তফা চরিত, পৃ. ৭৮৯)।
لا إِلهَ إِلَّا اللهُ وَحْدَهُ لا شَرِيكَ لَهُ صَدَقَ وَعْدَهُ وَنَصَرَ عَبْدَهُ وَهَزَمَ الْأَحْزَابَ وَحدَهُ.
"এক আল্লাহ ব্যতীত অন্য কোন ইলাহ নাই। তিনি অদ্বিতীয়, তাঁহার কোন শরীক নাই। তিনি তাঁহার অঙ্গীকার পূর্ণ করিয়াছেন এবং তাঁহার দাসকে আনুকূল্য প্রদান করিয়াছেন এবং একা সমস্ত দলকে পরাস্ত করিয়াছেন" (যাদুল মা'আদ, পৃ. ১৬৫)।
রাসূলুল্লাহ (স)-এর অভিভাষণের প্রারম্ভে তাওহীদের কালেমাটি উত্তমরূপে স্মরণ করাইয়া দিলেন। তৎপর তিনি জানাইয়া দিলেন: মানুষের কোন ক্ষমতা নাই এই দুর্ধর্ষ শত্রুদিগকে পরাস্ত করা এবং তাহাদিগকে কা'বা প্রাঙ্গণে আমার সন্মুখে সমবেত করা। ইহা একমাত্র আল্লাহ্র কাজ। ইহাতে আমার কিংবা অন্য কোন মানুষের কোন কৃতিত্ব নাই। তৎপর তিনি বলিলেন:
الا كُلُّ مَّاثَرَةٍ أَوْ دَمٍ أَوْ مَالٍ يُدْعَى فَهُوَ تَحْتَ قَدَمِي هَاتَيْنِ إِلَّا سِدَانَةَ الْبَيْتِ وَسِقَايَةَ الْحَاجِّ .
"অন্ধকার যুগের রক্তপণ কিংবা অর্থ সম্পর্কীয় প্রতিশোধ গ্রহণ জনিত যাবতীয় আত্মগর্ব আমার এই পদযুগলে দলিত মথিত ও চিরতরে রহিত হইয়া গেল। কিন্তু বায়তুল্লাহ শরীফের সেবা এবং হজ্জযাত্রীদের পানি সরবরাহ করার ব্যবস্থা বাতিল করা হইল না" (যাদুল মা'আদ, পৃ. ১৬৫)।
অন্ধকার যুগে নিয়ম ছিল যে, একটি প্রাণের প্রতিশোধ গ্রহণের জন্য এবং একটি শোণিতপণের অর্থের নিমিত্ত তাহারা প্রতিবেশী গোত্রসমূহের সহিত যুগ যুগ ধরিয়া এবং পুরুষানুক্রমে যুদ্ধে নরহত্যা ও লুণ্ঠনকার্যে ব্যাপৃত থাকিত। ব্যক্তিগত অপরাধের জন্য একটি গোত্রের উপর অকথ্য অত্যাচার করা হইত। পক্ষান্তরে সেই গোত্রের কবি ও লেখকগণ সেই সকল অত্যাচারের কথা চিরস্মরণীয় করিয়া রাখিত এবং সুযোগ উপস্থিত হইলে সূদে আসলে তাহার প্রতিশোধ গ্রহণ করা হইত। মোটকথা, প্রতিশোধ গ্রহণই ছিল আরবদের জন্য আত্মগর্বের প্রধান উপকরণ। আর আত্মগর্বই ছিল সমস্ত অশান্তির মূল কারণ। এই সমস্ত অশান্তির মূলে কুঠারাঘাত করিবার উদ্দেশ্যেই মহানবী (স)-এর আবির্ভাব ও ইসলামের প্রবর্তন। তাই তিনি সর্বপ্রথম এই নিকৃষ্টতম কুপ্রথার মূলোৎপাটন করিলেন। সেদিন হইতেই সাব্যস্ত হইল যে, হত্যা করা বংশগত অপরাধ নহে, বরং ব্যক্তিগত অপরাধ। ইসলামী বিধানে এই অপরাধের শাস্তি নির্ধারিত করা হইয়াছে। ইচ্ছাকৃতভাবে হত্যা করিলে হত্যাকারীর প্রাণদণ্ড ( قصاص ) হয়, আর ভুলক্রমে হইয়া পড়িলে ক্ষতিপূরণস্বরূপ এক শত উট অথবা উহার বাজার মূল্য দিতে হয়। ইহাও তাহার ব্যক্তিগত অপরাধ বলিয়া গণ্য হইবে।
📄 কা'বা গৃহের চাবি
উছমান ইব্ন তাল্হা (عثمان ابن طلحة) ছিলেন কা'বা গৃহের চাবি রক্ষক। তিনি সোমবার ও বৃহস্পতিবার দিন কা'বা গৃহের দরজা খুলিতেন। একবার রাসূলুল্লাহ (স) হিজরতের পূর্বে কোন একদিন প্রয়োজনবশত উছমানকে দরজা খুলিতে বলিলে তিনি অতি কর্কশ ভাষায় অসম্মতি জ্ঞাপন করিয়াছিলেন। তখন রাসূলুল্লাহ (স) বলিয়াছিলেন, "হে উছমান! একদিন এই চাবি আমার হাতে আসিবে, তখন আমি যাহাকে ইচ্ছা তাহাকেই দান করিব"। তখন উছমান বলিয়াছিলেন, যদি তাহাই হয় তবে সেই দিনটি হইবে কুরায়শদের জন্য বড়ই অবমাননাকর ও ধ্বংসের। উত্তরে রাসূলুল্লাহ (স) বলিলেন, "না, বরং সেই দিনই হইবে কুরায়শদিগের প্রতিষ্ঠা ও প্রকৃত মর্যাদার দিন” (যাদুল মা'আদ, পৃ. ১৬৮)। উছমান ইব্ন তালহা (রা) আমৃত্যু এই চাবির হেফাজত করেন। তাঁহার কোন সন্তান না থাকায় ইনতিকালের সময় তিনি ইহা তদীয় ভ্রাতা শায়বা ইব্ন তালহা (রা)-কে সোপর্দ করিয়া যান। অদ্যাবধি তাঁহার বংশধরগণের কাছেই ইহা রক্ষিত আছে। কা'বার কুঞ্জি রক্ষক এই খান্দান তাঁহাদের পূর্বপুরুষ শায়বা ইব্ন তালাহা (রা)-র নামে শায়বী খান্দান হিসাবে পরিচিত।
📄 কা'বা গৃহে আযান
অতঃপর যুহরের নামাযের সময় উপস্থিত হইল। রাসূলুল্লাহ (স) হযরত বিলাল (রা)-কে আযান দিতে বলিলেন। হযরত বিলাল (রা) উচ্ছসিত কন্ঠে প্রাণ ভরিয়া আযান দিলেন। তখন কুরায়শ সরদার আত্তাব, হারিছ ও আবূ সুফয়ান সভা হইতে কিছু দূরে উপবিষ্ট ছিলেন (হায়কাল, পৃ. ৪১০)। তাহারা রাসূলুল্লাহ (স)-এর বশ্যতা স্বীকার করিয়া ছিলেন বটে; কিন্তু এখনও তাহাদের অন্তরে অহঙ্কার, পরাজয়ের গ্লানি বিদ্যমান ছিল। আত্তাব বলিলেন, আমার পিতার অদৃষ্ট অতি সুপ্রসন্ন, তাই এই আযান ধ্বনি শুনিবার পূর্বেই আল্লাহ তা'আলা তাহাকে সসম্মানে দুনিয়া হইতে উঠাইয়া লইয়া গিয়াছেন। হারিছ বলিলেন, যদি ইসলামের সত্যতা উপলব্ধি করিতে পারিতাম তবে ইহা শিরোধার্য করিয়া লইতে আমার কোনই আপত্তি ছিল না। আবু সুফয়ান বলিলেন, "আমি কিছুই বলিব না। যদি কিছু বলি তবে আমাদের নিকটস্থ কাঁকরসমূহ যাইয়া রাসূলুল্লাহ (স)-কে তাহা জানাইয়া দিবে" (সীরাত ইব্ন হিশাম, ২খ., পৃ. ৪১৬; যাদুল মা'আদ, পৃ. ১৬৯)।
অতঃপর রাসূলুল্লাহ (স) তাহাদের নিকট গিয়া বলিলেন, তোমরা কে কি বলিয়াছ তাহা সবই আমি জানিতে পারিয়াছি। তৎপর তিনি তাহাদিগকে তাহাদের উক্তিসমূহ হুবহু শুনাইয়া দিলেন। আত্তাব ও হারিছ তৎক্ষণাৎ কলেমা পাঠ করিয়া মুসলমান হইয়া গেলেন। তাহারা বলিলেন, আমাদের কথাগুলি কেহই শুনিতে পায় নাই। আল্লাহ তা'আলাই এই সংবাদ আপনাকে জানাইয়া দিয়াছেন। আপনি যে আল্লাহর নবী ইহাতে আমাদের কোন সন্দেহ নাই (তাফরীহুল আযাকিয়া, ২খ., পৃ. ২৭৪)। তৎপর রাসূলুল্লাহ (স) উম্মে হাবীবা (রা)-র গৃহে যাইয়া গোসল করিলেন এবং আট রাক'আত নামায পড়িলেন। কেহ মনে করেন, বিজয় লাভের শুকরিয়া স্বরূপ তিনি এই নামায পড়িয়াছেন। আবার কেহ মনে করেন, তিনি সালাতুদ দুহা (চাশতের নামায) পড়িয়াছেন (আসাহহুস সিয়ার, পৃ. ২৬২-২৬৩; সীরাত ইব্ন হিশাম, পৃ. ৪১৬; যাদুল মা'আদ, পৃ. ১৬৯)।
রাসূলুল্লাহ (স)-এর প্রতি আনুগত্য স্বীকারের জন্য জনগণ আস-সাফা পাহাড়ে একত্র হইল। তাহাদের জন্য তিনি আস-সাফায় আসন গ্রহণ করেন। উহার নিচে বসিয়া উমার (রা) রাসূলুল্লাহ (স)-এর কাছে আনুগত্য স্বীকার করিতে আসা মানুষের উপর শর্ত আরোপ করিতেছিলেন এবং তাহারা সাধ্যমত আল্লাহ ও রাসূল (স)-কে মান্য করিবে ও তাহাদের কথা শুনিবে- এই প্রতিশ্রুতি আদায় করিতেছিলেন (ইবন ইসহাক, শহীদ আখন্দ অনূদিত সীরাতে রাসূলুল্লাহ (স), ইসলামিক ফাউণ্ডেশন বাংলাদেশ, ৩খ., পৃ. ৫০৩)। এইভাবে স্বেচ্ছায় ইসলাম ধর্মে দীক্ষিত হওয়ার প্রয়াসী পুরুষগণের বায়'আতের পালা শেষ হইল। ইহার পর মহিলাগণও দলে দলে আসিতে আরম্ভ করিলেন। রাসূলুল্লাহ (স) মহিলাদের নিকট হইতে ইসলামের বিধানাবলী মানিয়া চলিবার প্রতিশ্রুতি গ্রহণ করিতেন। তৎপর তিনি পানিতে পরিপূর্ণ একটি পেয়ালার মধ্য হাত ডুবাইতেন। তাঁহার মুবারক হাত পানি হইতে বাহির করিবার পর উক্ত পেয়ালাতে মহিলাগণ হাত ডুবাইয়া বায়আতের প্রতিজ্ঞাসমূহ সুদৃঢ় করিতেন (ইন জারীর তাবারী, ২খ., পৃ. ১৬৪৪; মাওলানা শিবলী নুমানী, সীরাতুন্নবী, ২খ., পৃ. ৫২১; সায়্যিদ আবুল হাসান আলী নাদবী, আস-সীরাতুন নাবাবিয়্যা, পৃ. ২৯৬)। রাসূলুল্লাহ (স) বায়আত গ্রহণকালে কোন নারীর হাত স্পর্শ করেন নাই।