📘 সীরাত বিশ্বকোষ > 📄 নগরে প্রবেশ

📄 নগরে প্রবেশ


মুসলিম বাহিনী চারিটি দলে বিভক্ত হইয়া চতুর্দিক হইতে মক্কা অধিকারের জন্য অগ্রসর হয়। মহানবী (স)-এর কঠোর নির্দেশ ছিল, সংঘর্ষের উপক্রম না হইলে তলোয়ার কোষমুক্ত করা যাইবে না। হযরত যুবায়র (রা)-কে উত্তরদিক হইতে, কায়েস ইবন সা'দ ইবন উবাদা আনসারীকে পশ্চিম দিক হইতে, হযরত খালিদ (রা)-কে দক্ষিণ দিক হইতে এবং হযরত আবু উবায়দা(রা)-কে মুহাজিরীনের সঙ্গে পূর্ব দিক হইতে মক্কা মুকাররমায় প্রবেশের নির্দেশ প্রদান করা হয়।
মক্কা নগর দুইটি পর্বত শ্রেণীর মধ্যস্থলে প্রস্তরময় স্থানে অবস্থিত। এই শহরের একদিকে উঁচু এবং অপর দিক ঢালু। 'কাদা' নামক পাহাড়ের দিকটি উঁচু। এই দিকেই মক্কার প্রসিদ্ধ কবরস্থান জান্নাতুল মু'আল্লা অবস্থিত। আর 'কুদা' নামক পাহাড়ের দিকটি নিচু। এই দিকেই পবিত্র কা'বাগৃহ অবস্থিত। উত্তরদিকে পর্বতশ্রেণী বিদ্যমান থাকার দরুন প্রাকৃতিকভাবেই মক্কা হইতে বহিরায়াতের দুইটি পথ আছে। আর একটি পথ উচ্চ মক্কা হইতে আরাফাতের দিকে, আর একটি পথ নিম্ন মক্কা হইতে কিয়দ্দুর অগ্রসর হইয়া একটি শাখা জিদ্দার দিকে এবং অপর একটি শাখা মদীনার দিকে চলিয়া গিয়াছে।
রাসূলুল্লাহ (স) উভয় পথেই সেনাবাহিনীকে নগরে প্রবেশ করা সমীচীন বলিয়া মনে করিলেন। তাই তিনি হযরত খালিদ ইবন ওয়ালীদ-এর নেতৃত্বাধীন আসলাম, গিফার, জুহায়না প্রভৃতি গোত্রীয় সেনবাহিনীকে 'কুদা' নামক পাহাড়ের দিক দিয়া নিম্ন মক্কার পথে নগরে প্রবেশ করিতে নির্দেশ দিলেন। স্বয়ং তিনি মক্কার উচ্চ এলাকা আযাখির-এ অবস্থান করিয়া সমগ্র মুসলিম বাহিনীকে পরিচালনা করিতেছিলেন। মক্কায় প্রবেশের জন্য বাহিনীর বিন্যাস এমনভাবে করা হইয়াছিল যেন চারিটি দলই একে অপরকে প্রয়োজনে সাহায্য করিতে পারে (ইসলামী বিশ্বকোষ, ২০শ, পৃ. ৯৬, ৯০৫)।
বস্তুত খালিদ (রা) ছিলেন মুসলিম বাহিনীর ডান বাহুর অধিনায়ক। রাসূলুল্লাহ (স) তাহাকে বলিয়া দিলেন, যদি কুরায়শগণ তোমাদের বিরুদ্ধে অস্ত্রধারণ করে তবে তাহাদিগকে তোমরা হত্যা করিও এবং সাফা পাহাড়ে আসিয়া আমার সহিত সাক্ষাৎ করিও। অন্যথায় কাহারও উপর তরবারি উঠাইও না (যাদুল মা'আদ, পৃ. ১৬৪; ইব্‌ন হিশাম, পৃ. ৪৩২)। রাসূলুল্লাহ (স)-এর সঙ্গী সেনাদল কাতারে কাতারে বীরপদভরে চলিতে লগিল। মক্কার রাস্তাঘাট আজ সম্পূর্ণ পরিষ্কার। কুরায়শগণ আজ ভীত-সন্ত্রস্ত হৃদয়ে নিরাপত্তা লাভের জন্য কা'বা গৃহে এবং আবু সুফিয়ানের বাড়ীতে সমবেত। আর অবশিষ্ট কুরায়শগণ দরজা বন্ধ করিয়া আপন আপন গৃহে অবস্থানরত। তাহাদের সমস্ত দর্প চূর্ণ-বিচূর্ণ হইয়া গিয়াছে। ইহা আল্লাহ্র কত বড় কৃপা। এই মহাদানের কৃতজ্ঞতায় রাসূলুল্লাহ (স)-এর মস্তক অবনত হইয়া পড়িল। তাই তিনি সকলের পশ্চাতে হযরত উসামা ইব্‌ন যায়দের সহিত একই উটের পৃষ্ঠে বসিয়া নীরবে অগ্রসর হইতে লাগিলেন। কী উদার নীতি ইসলামের! দাস-প্রভুর কোন পার্থক্য নাই! ইসলামে আছে শুধু দীনদারি ও পরহেজগারির মর্যাদা। বিজয় লাভের আমোদ-প্রমোদ নাই, আড়ম্বর নাই, গর্ব-অহংকার কোন কিছুই নাই। বিজয়রূপ মহাদানের কৃতজ্ঞতায় আজ রাসূলুল্লাহ (স) অবনত মস্তক। শত্রু-মিত্র সকলকে যিনি অকপটে ভালবাসেন, অপরাধীর অপরাধকে যিনি আনন্দের সহিত ক্ষমা করিতে পারেন, জয়-পরাজয়, মঙ্গল সব কিছুর মধ্যেই যিনি একমাত্র আল্লাহর করুণা অনুভব করেন, শুধু তাঁহার পক্ষেই এরূপ করা সম্ভব।
মক্কা নগরীতে প্রবেশ করিয়া রাসূলুল্লাহ (স) 'হাজুন' নামক স্থানে তাঁহার বিজয়-পতাকা উত্তোলনের নির্দেশ দিলেন। সেই স্থানেই তিনি শিবির সন্নিবেশ করিয়া কিছুক্ষণের জন্য বিশ্রাম গ্রহণ করিলেন। মহানবীর পতাকা ছিল যুবায়র ইব্‌ন আওয়ামের হাতে। এই অভিযানে রাসূলুল্লাহ (স)-এর সংগে ছিলেন উম্মুল মুমিনীন হযরত মায়মূনা এবং হযরত উম্মে সালামা (রা) (মুল্লা মাজদুদ্দীন, সীরাতে মুস্তাফা, পৃ. ৭২৫)।
হযরত খালিদ ইব্‌ন ওয়ালীদ (রা) নিম্ন মক্কার পথে নিশ্চিন্তে সৈন্যদিগকে লইয়া নগরে প্রবেশ করিতেছেন, রাহমাতুল্লিল আলামীন (স) মক্কাবাসীদিগকে নিরাপত্তা লাভের যে সুযোগ দান করিয়াছেন তাহাতে হযরত খালিদ মনে করিয়াছিলেন যে, আজ তরবারি কোষমুক্ত করিবার প্রয়োজন হইবে না। কিন্তু তাঁহার সেই আশা পূর্ণ হইল না। কারণ আবু জাহলের পুত্র ইকরামা, উমায়্যার পুত্র সাফওয়ান, আমরের পুত্র সুহায়ল প্রভৃতি কয়েকজন দুর্দান্ত কুরায়শ কিছু সংখ্যক দুষ্ট প্রকৃতির লোক সংগ্রহ করিয়া মুসলিম বাহিনীকে নগরে প্রবেশে বাধা প্রদানের জন্য 'খান্দামা' পাহাড়ের নিকট সমবেত হইল। হিমাস ইব্‌ন কায়স নামক এক পাপিষ্ঠ পূর্ব হইতেই অস্ত্রশস্ত্র সংগ্রহ করিয়া যুদ্ধের জন্য প্রস্তুত ছিল। সেও তাহাদের সহিত যোগদান করিল। ঘটনাক্রমে কুরয ইব্‌ন জাবির ফিহরী ও হুবায়স ইব্‌ন খালিদ আশ'আরী নামক দুইজন মুজাহিদ মুসলিম বাহিনী হইতে বিচ্ছিন্ন হইয়া পড়েন। কুরায়শের সেই দল বিচ্ছিন্ন অবস্থায় পাইয়া তাঁহাদিগকে শহীদ করিয়া ফেলিল। এই সংবাদ পাওয়া মাত্র খালিদ (রা) তাহাদিগকে আক্রমণ করেন। বারজন নিহত হওয়ার পর কুরায়শ দুর্বৃত্তগণ পলায়ন করিয়া প্রাণ বাঁচাইতে বাধ্য হয়। এইরূপে খালিদ (রা) বিজয়ী বেশে পবিত্র কা'বা প্রাঙ্গণে উপস্থিত হইলেন। খালিদের হাতে কুরায়শের কতিপয় ব্যক্তি নিহত হওয়ার কথা শুনিয়া রাসূলুল্লাহ (স) তাঁহাকে হত্যা করিবার কারণ জিজ্ঞাসা করিলেন। যখন জানিতে পারিলেন যে, কুরায়শগণই প্রথমে মুসলিম বাহিনীকে আক্রমণ করিয়াছিল তখন তিনি বলিলেন, "ইহাই আল্লাহ্র ইচ্ছা ছিল" (যাদুল মা'আদ, পৃ. ১৬৫; ইব্‌ন হিশাম, পৃ. ৪৩৩)।
দীর্ঘ একুশ বৎসর যাবৎ কুরায়শদের এই নিদারুণ নিগ্রহ ভোগ করিবার পরও আজ তাহাদের প্রতি রাসূলুল্লাহ (স) এত সদয় হইলেন কেন? এইজন্য আনসারদিগের মনে নানা প্রকার দুশ্চিন্তা উদয় হইতে লাগিল। তাঁহারা বলাবলি করিতে লাগিলেন, "স্বদেশ ও স্বগোত্রের ভালবাসা রাসূলুল্লাহ (স)-এর অন্তরের উপর প্রভাব বিস্তার করিয়া ফেলিয়াছে।” রাসূলুল্লাহ (স) মদীনা পরিত্যাগ করিয়া মক্কাতেই থাকিয়া যাইবেন এই সন্দেহ করিয়াই আনসারগণ উপরিউক্ত মন্তব্য করিয়াছিলেন। তাঁহাদের এই আলোচনার অব্যবহিত পরই রাসূলুল্লাহ (স)-এর নিকট ওহী অবতীর্ণ হওয়ার লক্ষণ দেখা দিল। ওহী অবতীর্ণ হওয়ার পর তিনি আনসারদিগকে সম্বোধন করিয়া বলিলেন, “হে আনাসার সম্প্রদায়! তোমরা বলিয়াছ, স্বদেশ ও স্বগোত্রের ভালবাসা রাসূলুল্লাহ (স)-এর অন্তরের উপর প্রভাব বিস্তার করিয়া ফেলিয়াছে। আল্লাহ্র কসম! তোমাদের এই ধারণা ঠিক নহে। আমি আল্লাহ্র বান্দা এবং তাঁহার রাসূল। আমি আল্লাহর দিকে এবং তোমাদের দিকে হিজরত করিয়াছি। আমার জীবন-মরণ সব কিছু তোমাদের সঙ্গে হইবে।” এই কথা শুনিয়া আনসারগণ কাঁদিতে কাঁদিতে আরয করিলেন, "ইয়া রাসূলুল্লাহ! আপনার বিচ্ছেদ আশঙ্কায় আমরা একথা বলিয়াছিলাম।” রাসূলুল্লাহ (স) বলিলেন, "আমার বিচ্ছেদ অসহনীয় হওয়ার দরুনই যে তোমরা একথা বলিয়াছ, আল্লাহ তা'আলাও আমাকে তাহা জানাইয়া দিয়াছেন। সুতরাং তোমরা নিরপরাধ" (আসাহ্হুস সিয়ার, পৃ. ১৯৯০, ২৫৮)।
নগরীতে/প্রবেশকালে কোন একজন সাহাবী রাসূলুল্লাহ (স)-কে জিজ্ঞাসা করিলেন, হুযূর! আপনি আপন পুরাতন বাড়ীতেই অবস্থান করিবেন, না অন্য কোন স্থানে? রাসূলুল্লাহ (স) বলিলেন, আকীল কি আমার বাড়ীঘর রাখিয়াছে? সে ত সবই শেষ করিয়া গিয়াছে (মাওলানা আশিক ইলাহী মীরাঠী, ইসলাম, পৃ. ৩২১)। ইন্‌শা আল্লাহ্ আমি খায়ফ নামক স্থানে অবস্থান করিব। এই স্থানে বসিয়া কাফিরগণ রাসূলুল্লাহ (স)-এর বিরুদ্ধে পরস্পর শপথ গ্রহণ করিয়াছিল এবং তাঁহাকে অন্তরীণ করিবার অঙ্গীকারপত্র লিপিবদ্ধ করিয়াছিল। এই স্থানে অবস্থান করিলে অতীতের স্মৃতি জাগরিত হইবে। এই উদ্দেশ্যেই তিনি এই স্থানটি অবস্থানের জন্য মনোনীত করিয়াছিলেন (মাওলানা শিবলী নু'মানী, সীরাতুন্নবী, ১খ., পৃ. ৫১৬)।
যে নগরবাসী একদিন হযরত মুহাম্মাদ (স)-কে অশেষ ভাবে নির্যাতন করিয়া অবশেষে তাঁহাকে দেশান্তরিত করিয়াছিল, যে নগরবাসী তাঁহার প্রাণ সংহার করিতে বদ্ধপরিকর ছিল, যে নগরবাসী একদিন তাঁহার প্রিয় শিষ্যগণকে নৃশংসভাবে উৎপীড়িত করিয়াছিল, সেই নগরবাসী আজ তাঁহার করুণাপ্রার্থী। একটি গৃহও ভূলুণ্ঠিত হইল না, একবিন্দু রক্তপাত হইল না, একটি নারী অপমানিতা বা লাঞ্ছিতা হইল না। ওয়াশিংটন আয়ারভিং সত্যই বলিয়াছেন, "এই জয় ধর্মের জয়, তরবারির জয় নহে” (মোবিনুদ্দিন আহমদ, নবীশ্রেষ্ঠ, তৃতীয় সংস্করণ, ১৯৮১)।
রাসূলুল্লাহ (স) বিনা রক্তপাতে আপন জন্মভূমিতে প্রবেশ করিলেন। রাসূলুল্লাহ (স) মক্কা ত্যাগের সময়ে মুনাজাত করিয়াছিলেন:
رَبِّ أَدْخِلْنِي مُدْخَلَ صِدْقٍ. (١٩٤٥)
অদ্য কি আনন্দের দিন! অদ্য তাঁহার সাধের প্রার্থনা সফল হইল।

📘 সীরাত বিশ্বকোষ > 📄 কা'বা গৃহে প্রবেশ

📄 কা'বা গৃহে প্রবেশ


যে স্থানে রাসূলুল্লাহ (স)-এর পতাকা উত্তোলিত হইয়াছিল সেই স্থালেই মসজিদে ফাতহ প্রতিষ্ঠিত হইয়াছে (মাজদুদ্দীন, পৃ. ৭২৫)। বিশ্রামের পর তিনি 'হাজুন'-এর শিবির হইতে বাহির হইয়া ভক্তবৃন্দ পরিবেষ্টিত অবস্থায় সূরা ফাতহ .إِنَّا فَتَحْنَا لَكَ فَتْحًا مُبِينًا
"নিশ্চয় আমি তোমাকে দিয়াছি সুস্পষ্ট বিজয়” (৪৮: ১) পাঠ ও "আল্লাহু আকবার” বলিতে বলিতে ধীরে ধীরে পবিত্র কা'বা গৃহের দিকে অগ্রসর হইতে লাগিলেন। কা'বা প্রাঙ্গণে উপস্থিত হইয়া তিনি সর্বপ্রথম হাজরে আসওয়াদকে চুম্বন করিলেন। অতঃপর তিনি ভক্তিভরে কা'বা শরীফের চতুর্দিকে সাতবার তাওয়াফ করিলেন। পবিত্র কা'বাগৃহের চতুষ্পার্শ্বে স্তরে স্তরে তিন শত ষাটটি মূর্তি প্রতিষ্ঠিত ছিল। রাসূলুল্লাহ (স) এই সকল মূর্তির সম্মুখে দণ্ডায়মান হইয়া হস্তস্থিত যষ্টি উত্তোলনপূর্বক বলিলেন:
جَاءَ الْحَقُّ وَزَهَقَ الْبَاطِلُ. "সত্য আসিয়াছে এবং মিথ্যা বিলুপ্ত হইয়াছে” (১৭:৮১)।
جَاءَ الْحَقُّ وَمَا يُبْدِئُ الْبَاطِلُ وَمَا يُعِيدُ. "সত্য আসিয়াছে এবং অসত্য না পারে নূতন কিছু সৃজন করিতে আর না পারে পুনরাবৃত্তি করিতে" (৩৪: ৪৯)।
এক রিওয়ায়াতে আছে যে, মক্কার অন্যান্য মূর্তিগুলিও সেদিনই ভাঙ্গিয়া ফেলা হইয়াছিল। সাফা ও মারওয়া পাহাড়দ্বয়ের উপর দুইটি প্রাচীন প্রস্তর মূর্তি ছিল। সাফায় অবস্থিত মূর্তিটির নাম ছিল ইসাফ, আর মারওয়াস্থিত মূর্তিটির নাম ছিল নায়িলা। কুরায়শদের বিশ্বাস ছিল যে, কোন এক সময়ে ইসাফ ছিল পুরুষ, আর নায়িলা ছিল নারী। ইহারা কা'বা গৃহের ভিতরে ব্যভিচার করার কারণে আল্লাহ্ তা'আলা তাহাদিগকে পাথরে পরিণত করেন। এতদসত্ত্বেও কুরায়শগণ ইহাদিগকে দেবতা বলিয়া ভক্তি করিত। সেদিন এই দুইটি পাপচিহ্নকেও চূর্ণ-বিচূর্ণ করিয়া দেওয়া হয় (আসাহ্হুস সিয়ার, পৃ. ২৫৯)।

📘 সীরাত বিশ্বকোষ > 📄 মহানবী (স)-এর অভিভাষণ

📄 মহানবী (স)-এর অভিভাষণ


মক্কার অধিবাসীগণ ভয়ে, অভিমানে ও অনুতাপে একেবারে মুহ্যমান হইয়া পড়িল। তাহাদের ব্যাকুলতা ও চাঞ্চল্য চরমে পৌঁছিয়াছিল। তাহারা দলে দলে কা'বা প্রাঙ্গণে সমবেত হইল। রাসূলুল্লাহ (স) কি করেন বা কি বলেন তাহা জানিবার জন্য সকলেই ব্যাকুল চিত্তে কা'বা গৃহের দিকে তাকাইয়া আছে। এমন সময় সমবেত জনমণ্ডলীকে সম্বোধন করিয়া মহানবী (স) দরজার উভয় পার্শ্বের চৌকাঠে হাত রাখিয়া একটি নাতিদীর্ঘ ভাষণ দিলেন:
الْحَمْدُ لِلَّهِ الَّذِي أَنْجَزَ وَعْدَهُ. "আল্লাহর শোকর যিনি নিজের ওয়াদা পূর্ণ করিয়াছেন" (মোস্তফা চরিত, পৃ. ৭৮৯)।
لا إِلهَ إِلَّا اللهُ وَحْدَهُ لا شَرِيكَ لَهُ صَدَقَ وَعْدَهُ وَنَصَرَ عَبْدَهُ وَهَزَمَ الْأَحْزَابَ وَحدَهُ.
"এক আল্লাহ ব্যতীত অন্য কোন ইলাহ নাই। তিনি অদ্বিতীয়, তাঁহার কোন শরীক নাই। তিনি তাঁহার অঙ্গীকার পূর্ণ করিয়াছেন এবং তাঁহার দাসকে আনুকূল্য প্রদান করিয়াছেন এবং একা সমস্ত দলকে পরাস্ত করিয়াছেন" (যাদুল মা'আদ, পৃ. ১৬৫)।
রাসূলুল্লাহ (স)-এর অভিভাষণের প্রারম্ভে তাওহীদের কালেমাটি উত্তমরূপে স্মরণ করাইয়া দিলেন। তৎপর তিনি জানাইয়া দিলেন: মানুষের কোন ক্ষমতা নাই এই দুর্ধর্ষ শত্রুদিগকে পরাস্ত করা এবং তাহাদিগকে কা'বা প্রাঙ্গণে আমার সন্মুখে সমবেত করা। ইহা একমাত্র আল্লাহ্র কাজ। ইহাতে আমার কিংবা অন্য কোন মানুষের কোন কৃতিত্ব নাই। তৎপর তিনি বলিলেন:
الا كُلُّ مَّاثَرَةٍ أَوْ دَمٍ أَوْ مَالٍ يُدْعَى فَهُوَ تَحْتَ قَدَمِي هَاتَيْنِ إِلَّا سِدَانَةَ الْبَيْتِ وَسِقَايَةَ الْحَاجِّ .
"অন্ধকার যুগের রক্তপণ কিংবা অর্থ সম্পর্কীয় প্রতিশোধ গ্রহণ জনিত যাবতীয় আত্মগর্ব আমার এই পদযুগলে দলিত মথিত ও চিরতরে রহিত হইয়া গেল। কিন্তু বায়তুল্লাহ শরীফের সেবা এবং হজ্জযাত্রীদের পানি সরবরাহ করার ব্যবস্থা বাতিল করা হইল না" (যাদুল মা'আদ, পৃ. ১৬৫)।
অন্ধকার যুগে নিয়ম ছিল যে, একটি প্রাণের প্রতিশোধ গ্রহণের জন্য এবং একটি শোণিতপণের অর্থের নিমিত্ত তাহারা প্রতিবেশী গোত্রসমূহের সহিত যুগ যুগ ধরিয়া এবং পুরুষানুক্রমে যুদ্ধে নরহত্যা ও লুণ্ঠনকার্যে ব্যাপৃত থাকিত। ব্যক্তিগত অপরাধের জন্য একটি গোত্রের উপর অকথ্য অত্যাচার করা হইত। পক্ষান্তরে সেই গোত্রের কবি ও লেখকগণ সেই সকল অত্যাচারের কথা চিরস্মরণীয় করিয়া রাখিত এবং সুযোগ উপস্থিত হইলে সূদে আসলে তাহার প্রতিশোধ গ্রহণ করা হইত। মোটকথা, প্রতিশোধ গ্রহণই ছিল আরবদের জন্য আত্মগর্বের প্রধান উপকরণ। আর আত্মগর্বই ছিল সমস্ত অশান্তির মূল কারণ। এই সমস্ত অশান্তির মূলে কুঠারাঘাত করিবার উদ্দেশ্যেই মহানবী (স)-এর আবির্ভাব ও ইসলামের প্রবর্তন। তাই তিনি সর্বপ্রথম এই নিকৃষ্টতম কুপ্রথার মূলোৎপাটন করিলেন। সেদিন হইতেই সাব্যস্ত হইল যে, হত্যা করা বংশগত অপরাধ নহে, বরং ব্যক্তিগত অপরাধ। ইসলামী বিধানে এই অপরাধের শাস্তি নির্ধারিত করা হইয়াছে। ইচ্ছাকৃতভাবে হত্যা করিলে হত্যাকারীর প্রাণদণ্ড ( قصاص ) হয়, আর ভুলক্রমে হইয়া পড়িলে ক্ষতিপূরণস্বরূপ এক শত উট অথবা উহার বাজার মূল্য দিতে হয়। ইহাও তাহার ব্যক্তিগত অপরাধ বলিয়া গণ্য হইবে।

📘 সীরাত বিশ্বকোষ > 📄 কা'বা গৃহের চাবি

📄 কা'বা গৃহের চাবি


উছমান ইব্‌ন তাল্‌হা (عثمان ابن طلحة) ছিলেন কা'বা গৃহের চাবি রক্ষক। তিনি সোমবার ও বৃহস্পতিবার দিন কা'বা গৃহের দরজা খুলিতেন। একবার রাসূলুল্লাহ (স) হিজরতের পূর্বে কোন একদিন প্রয়োজনবশত উছমানকে দরজা খুলিতে বলিলে তিনি অতি কর্কশ ভাষায় অসম্মতি জ্ঞাপন করিয়াছিলেন। তখন রাসূলুল্লাহ (স) বলিয়াছিলেন, "হে উছমান! একদিন এই চাবি আমার হাতে আসিবে, তখন আমি যাহাকে ইচ্ছা তাহাকেই দান করিব"। তখন উছমান বলিয়াছিলেন, যদি তাহাই হয় তবে সেই দিনটি হইবে কুরায়শদের জন্য বড়ই অবমাননাকর ও ধ্বংসের। উত্তরে রাসূলুল্লাহ (স) বলিলেন, "না, বরং সেই দিনই হইবে কুরায়শদিগের প্রতিষ্ঠা ও প্রকৃত মর্যাদার দিন” (যাদুল মা'আদ, পৃ. ১৬৮)। উছমান ইব্‌ন তালহা (রা) আমৃত্যু এই চাবির হেফাজত করেন। তাঁহার কোন সন্তান না থাকায় ইনতিকালের সময় তিনি ইহা তদীয় ভ্রাতা শায়বা ইব্‌ন তালহা (রা)-কে সোপর্দ করিয়া যান। অদ্যাবধি তাঁহার বংশধরগণের কাছেই ইহা রক্ষিত আছে। কা'বার কুঞ্জি রক্ষক এই খান্দান তাঁহাদের পূর্বপুরুষ শায়বা ইব্‌ন তালাহা (রা)-র নামে শায়বী খান্দান হিসাবে পরিচিত।

লিঙ্ক শেয়ার করুন
close

লিঙ্ক কপি করুন

0:00
0:00