📘 সীরাত বিশ্বকোষ > 📄 মক্কা যাত্রা

📄 মক্কা যাত্রা


১০ রামাদান, ৮ম হি./৬৩০ খৃ. ১ জানুয়ারী মহানবী (স) দশ হাজার মুজাহিদের এক বিশাল বাহিনীসহ মদীনা হইতে তাবূক অভিমুখে রওয়ানা করেন। যাত্রার প্রাক্কালে রাসূলুল্লাহ (স) তাঁহার অনুপস্থিতিতে প্রশাসনিক কার্যক্রম পারিচালনার জন্য মুহাম্মাদ ইবন মাসলামা (রা)-কে ভারপ্রাপ্ত আমীর, পরিবারিক বিষয়াদি তদারকীর জন্য হযরত আলী ইব্‌ন আবি তালিব (রা)-কে প্রতিনিধি, শান্তি-শৃঙখলা রক্ষার জন্য হযরত সিবা' ইব্‌ন উরফুতা (سباع ابن عرفطة)-কে মদীনার কোতওয়াল ও সালাত পরিচালনার জন্য হযরত আব্দুল্লাহ ইব্‌ন উম্ম মাকতুম (রা)-কে মদীনার মসজিদের ইমাম নিযুক্ত করেন (উয়ূনুল আছার, ২খ., পৃ. ২৫৪; সীরাতুল মুস্তাফা, ২খ., পৃ. ২৪৮-৯)।
মুনাফিকগণ অপপ্রচার করিতে লাগিল যে, রাসূলুল্লাহ (স) আপন চাচাত ভাইকে যুদ্ধযাত্রা হইতে রেহাই দিয়াছেন আর সাধারণ জনগণকে যুদ্ধাভিযানে মৃত্যুর-মুখে ঠেলিয়া দিয়াছেন। এই সব মিথ্যা অপপ্রচার হযরত আলী (রা)-এর কানে আসিলে তিনি তাৎক্ষণিকভাবে অস্ত্র সজ্জিত হইয়া বাহির হইয়া পড়েন এবং আল-জুরুফ (الجرف) নামক স্থানে গিয়া রাসূলুল্লাহ (স)-এর সহিত মিলিত হন। তিনি রাসূলুল্লাহ (স)-কে বলিলেন, আপনি আমাকে শিশু ও নারীদের মাঝে রাখিয়া যাইতেছেন? রাসূলুল্লাহ (স) জবাব দিলেন:
الا ترضى ان تكون منى بمنزلة هارون من موسى الا انه ليس نبي بعدي.
"তুমি কি ইহাতে সন্তুষ্ট নও যে, আমার কাছে তোমার মর্যাদা ঠিক তেমন যেমন মূসা (আ)-এর কাছে হারুন (আ)-এর মর্যাদা। তবে আমার পরে আর কোন নবী নাই” (সাহীহ আল-বুখারী, ৩খ., পৃ. ১২৯ কিতাবুল মাগাযী, গাওয়া তাবুক, নং ৪৪১৬; ফাদাইল আসহাবিন নাবিয়্যি (স); ইবন মাজা, মুকাদ্দিমা, বাব ফাদলি আলী (রা), নং ১১৫)।
যাত্রাপথে রাসূলুল্লাহ (স) ছানিয়াতুল বিদা নামক স্থানে শিবির স্থাপন করেন, অতঃপর সৈন্যদেরকে অগ্রবর্তী, পশ্চাদবর্তী, মধ্যবর্তী, ডান, বাম ও পানি সরবরাহকারী ইত্যাদি দলে বিন্যস্ত করেন। ইসলামের পতাকা হযরত আবু বাক্স (রা)-কে ও সেনাবাহিনীর পতাকা হযরত যুবায়র ইব্‌ন আওয়াম (রা)-কে প্রদান করা হয়। রাসূলুল্লাহ (স) আওস গোত্রের পতাকা হযরত উসায়দ ইবন হুদায়র (রা)-কে এবং খাযরাজ গোত্রের পতাকা হুবাব ইবনুল মুনযির (রা)-কে প্রদান করেন। এইভাবে বিভিন্ন গোত্রের মাঝে গোত্রীয় ও সেনাবাহিনীর পতাকা বণ্টন করিয়া দেন (সীরাতুল হালাবিয়া, ৫খ., পৃ. ৪০২)। সহীহ মুসলিমে আবূ হুমায়দ (রা) হইতে বর্ণিত আছে, তিনি বলেন, আমরা রাসূলুল্লাহ (স)-এর সঙ্গে তাবুকের উদ্দেশ্যে রওনা হইলাম, অবশেষে ওয়াদিউল কুরায় এক মহিলার বাগানে পৌছিলাম। রাসূলুল্লাহ (স) বলিলেন: তোমরা অনুমান কর এই বাগানে কি পরিমাণ খেজুর থাকিতে পারে? আমরা অনুমান করিলাম, কিন্তু রাসূলুল্লাহ (স)-এর অনুমান ছিল দশ ওয়াসাক অর্থাৎ তিপ্পান্ন মন দশ সের (২০০০ কে. জি. প্রায়)। তিনি মহিলাকে বলিলেন, আমার এই অনুমানটি মনে রাখিবে। আমরা এই পথেই আবার ফিরিয়া আসিব। তাহার পর আমরা তাবুক হইতে প্রত্যাবর্তনের পথে উপরিউক্ত ওয়াদিল কুরায় পৌঁছিলাম। রাসূলুল্লাহ (স) মহিলাকে কি পরিমাণ ফল পাওয়া গেল জিজ্ঞাসা করিলেন। মহিলা উত্তর দিল, দশ ওয়াসাক (সহীহ মুসলিম, ২খ., পৃ. ২৪৬; আল-খাসাইসুল কুবরা, ১খ., পৃ. ৫৬২)।
আল-হিজরে বাত্রাবিরতি
রাসূলুল্লাহ (স)-এর নেতৃত্বে মুসলিম বাহিনী একের পর এক মনযিল অতিক্রম করিয়া আল-হিজ নামক স্থানে আসিয়া পৌছিল। প্রাগৈতিহাসিক যুগের হযরত সালেহ ('আ)-এর সম্প্রদায় তথা ছামূদ জাতির বাসস্থানের ধ্বংসাবশেষ সেইখানে বিদ্যমান রহিয়াছে। রাসূলুল্লাহ (স)-এর নির্দেশক্রমে এই জায়গায় সেনাছাউনী স্থাপন করা হয়। হিজর নামক স্থানে প্রাচীন যুগে ছামূদ নামে এক পরাক্রমশালী জাতি বাস করিত। প্রস্তরময় পর্বত কাটিয়া সুদৃঢ় বাসস্থান নির্মাণে তাহারা ছিল সমসাময়িক কালে অপ্রতিদ্বন্দ্বী। বিপুল শক্তি ও শৌর্য-বীর্যের অধিকারী হইয়া তাহারা আল্লাহ্ অনুগত না হইয়া বরং নাফরমানিতে লিপ্ত হয়। ফলে আল্লাহর গযবে পতিত হইয়া তাহারা ধ্বংস হইয়া যায়। পবিত্র কুরআনে তাহাদের বিভিন্ন ঘটনা উল্লেখ করা হইয়াছে (দ্র. ৭৪ ৭৩; ১১: ৬৬-৬৮; ৬৯:৪-৫; ৯১৪ ১১-১৪; ২৬৪ ১৪১-১৫৯)।
রাসূলুল্লাহ (স) যখন হিজর অতিক্রম করিতেছিলেন তখন চাদর দিয়া নিজ মুখমণ্ডল ঢাকিয়া দেন এবং সওয়ারীকে দ্রুত হাঁকাইতে থাকেন। তিনি নির্দেশ প্রদান করেন : 'তোমরা অত্যাচারী সম্প্রদায়ের জনপদে ক্রন্দনরত অবস্থায় ছাড়া প্রবেশ করিও না। তাহারা যেই শাস্তিতে পতিত হইয়াছিল সেই শাস্তি তোমাদের উপর আপতিত হইতে পারে। তোমরা এই কূপের পানি পান করিবে না, এই পানি দ্বারা উযু করিবে না, এই পানি দ্বারা আটার যেই খামির তৈয়ার করিয়াছ তাহা উটকে খাওয়াইয়া দাও এবং রাত্রিবেলা সঙ্গী ছাড়া একাকী কেহ বাহির হইবে না'। সাঈদা গোত্রের দুই ব্যক্তি ছাড়া সবাই রাসূলুল্লাহ (স)-এর হুকুম তামিল করিল। তাহাদের একজন প্রাকৃতিক প্রয়োজনে বাহির হইলে সে শ্বাসরোগে আক্রান্ত হয়। আর যেই ব্যক্তি উটের খোঁজে বাহির হয় তাহাকে মরুঝড় উড়াইয়া তাঈ-এর দুই পাহাড়ের মাঝখানে নিক্ষেপ করে। তাহাদের এই সংবাদ রাসূলুল্লাহ (স)-এর নিকট পৌছিলে তিনি বলেন, আমি কি তোমাদেরকে সঙ্গী ছাড়া একাকী বাহির হইতে নিষেধ করি নাই? রাসূলুল্লাহ (স) শ্বাসরোগে আক্রান্ত ব্যক্তির জন্য দু'আ করেন। ফলে সে রোগমুক্তি লাভ করে। আর যেই ব্যক্তি তাঈ পর্বতদ্বয়ের মাঝে নিক্ষিপ্ত হইয়াছিল, তাঈ গোত্রের লোকেরা তাহাকে মদীনায় পৌঁছাইয়া দেয় (সহীহ আল-বুখারী, ৩খ., পৃ. ১৩৫; ইব্‌ন খালদুন, তারিখ, ১খ., পৃ. ১৭৭)।
অতঃপর এই স্থানে কিছু সময় বিশ্রাম করিয়া রাসূলুল্লাহ (স) সম্মুখপানে অগ্রসর হইলেন। প্রচণ্ড দাবদাহে সৈন্যদের প্রাণ ওষ্ঠাগত প্রায়। হযরত আবূ বাক্‌রের (রা) অনুরোধে রাসূলুল্লাহ (স) বৃষ্টির জন্য হাত উঠাইয়া দু'আ করেন। হাত নামাইবার পূর্বেই মুষলধারে বৃষ্টি বর্ষণ শুরু হইয়া যায়। মুজাহিদগণ তৃপ্তি সহকারে পানি পান করিলেন এবং প্রয়োজনীয় পরিমাণ পানি বিভিন্ন পাত্রে ভর্তি করিয়া রাখিলেন। সেনাছাউনী ছাড়া অন্য কোথাও এক ফোটা বৃষ্টিও পড়ে নাই। ইহা ছিল রাসূলুল্লাহ (স)-এর মু'জিযা (Muhammad Husayn Haykal, The Life of Muhammad, p. 448-9)।
হযরত আনাস (রা) বর্ণনা করেন, আমরা রাসূলুল্লাহ (স)-এর সহিত জিহাদের উদ্দেশ্যে হিজর নামক স্থানে পৌছিলে একটি আওয়াজ শুনিতে পাইলাম। কে যেন বলিতেছিল, 'হে আল্লাহ! আমাকে মুহাম্মাদ (স)-এর উম্মতের অন্তর্ভুক্ত কর যাহাদের মাগফিরাত করা হইবে এবং যাহাদের দু'আ কবুল করা হইবে'। রাসূলুল্লাহ (স) বলিলেন : হে আনাস! দেখ তো কিসের আওয়াজ? আমি পাহাড়ে গেলাম, তথায় শুভ্র পোশাকধারী এক ব্যক্তিকে দেখিলাম। তাহার চুল ও দাড়ি সাদা এবং তিনি দৈর্ঘ্যে প্রায় তিন শত হাত। তিনি আমাকে দেখিয়া বলিলেন, আপনি কি রাসূলুল্লাহ (স) কর্তৃক প্রেরিত? আমি বলিলাম, হাঁ। তিনি বলিলেন, তাঁহার কাছে গিয়া আমার সালাম পেশ করুন এবং বলুন, আপনার ভাই ইলয়াস (আ) আপনার সহিত দেখা করিতে চান। হযরত আনাস (রা) বলেন, আমি রাসূলুল্লাহ (স)-এর কাছে আসিয়া এই সংবাদ জানাইলাম। তিনি আমাকে সঙ্গে লইয়া রওয়ানা হইলেন। নিকটে পৌঁছিবার পর তিনি আমার অগ্রে চলিয়া গেলেন এবং আমি পশ্চাতে রহিয়া গেলাম। তাঁহারা দীর্ঘ সময় আলাপ-আলোচনা
করিলেন। তাহার পর তাঁহাদের জন্য আকাশ হইতে খাদ্য অবতীর্ণ হইল। রাসূলুল্লাহ (স) আমাকে ডাকিয়া লইলেন। আমি তাঁহাদের সহিত রকমারী খাদ্য গ্রহণের পর এক প্রান্তে চলিয়া গেলাম। অতঃপর একখণ্ড মেঘ আসিয়া মহৎ ব্যক্তিটিকে তুলিয়া লইল। আমি তাহাতে তাঁহার পোশাকের শুভ্রতা প্রত্যক্ষ করিলাম। মেঘখণ্ড তাঁহাকে ঊর্ধ্বাকাশে লইয়া যায় (আল-খাসাইসুল কুবরা, বাংলা অনু. ১খ., পৃ. ৫১৬-৭)।
ইব্‌ন লুসায়তের উক্তি
হিজরে অবস্থানকালে রাসূলুল্লাহ (স)-এর উষ্ট্রী হারাইয়া গেলে ইব্‌ন লুসায়ত নামক জনৈক মুনাফিক রাসূলুল্লাহ (স) সম্পর্কে বিষোদগার করিতে থাকে। সে মন্তব্য করিল, মুহাম্মাদ নিজেকে আল্লাহ্‌র নবী বলিয়া দাবি করেন। আসমান হইতে অবতীর্ণ সংবাদ তিনি তোমাদের শোনান। অথচ দেখ, তাঁহার উষ্ট্রী কোথায় তাহার খবর তিনি জানেন না। রাসূলুল্লাহ (স) এই উক্তি শোনামাত্র তাঁহার পার্শ্বে উপবিষ্ট উমারা ইব্‌ন হায্‌ম (রা)-কে বলিলেন, ঐ লোকটি যেই উক্তি করিয়াছে সেই সম্পর্কে আমার বক্তব্য এই: আল্লাহ্‌র কসম! আল্লাহ্‌ তা'আলা আমাকে যাহা জানান তাহার বেশী কিছু আমি জানি না। এইমাত্র আল্লাহ্‌ আমাকে উষ্ট্রীর অবস্থানস্থল সম্পর্কে অবহিত করিয়াছেন। সেইটি ঐ উপত্যকার অমুক গিরিপথে গাছের সহিত লাগাম আটক অবস্থায় রহিয়াছে। তোমরা গিয়া উষ্ট্রীটি লইয়া আস। তৎক্ষণাত সাহাবীগণ তথায় গমন করিয়া উষ্ট্রী লইয়া আসেন (ইব্‌ন হিশাম, ২খ., পৃ. ৫২৩)।
শুকাক উপত্যকায় রাসূলুল্লাহ (স)
তাবুকের পথে যখন রাসূলুল্লাহ (স) শুকাক উপত্যকায় পৌঁছেন একদা রাত্রিবেলা জনৈক উষ্ট্রচালকের সঙ্গীত শুনিতে পান। রাসূলুল্লাহ (স) সাহাবা কিরামকে বলেন: দ্রুত যাও, যাহাতে আমরা তাহাকে পাইতে পারি। রাসূলুল্লাহ (স) জানিতে চাহিলেন, এই ব্যক্তি কি আমাদের সেনাবাহিনীর সদস্য, না অন্য কোন গোত্রের সহিত সম্পর্কিত? সাহাবীগণ জবাব দিলেন, লোকটি আগন্তুক, আমাদের দলভুক্ত নয়। রাসূলুল্লাহ (স) যখন তাহাকে পাইলেন, দেখা গেল তাহার সহিত একটি কাফেলা রহিয়াছে। রাসূলুল্লাহ (স)-এর সহিত তাহাদের কথোপকথন নিম্নে উল্লিখিত হইল: রাসূলুল্লাহ (স): তোমাদের পরিচয় কি? কোন গোত্রের সহিত তোমরা সম্পর্কিত? কাফেলা: মুদার গোত্রের সহিত আমাদের সম্পর্ক। রাসূলুল্লাহ (স): আমার সম্পর্কও মুদার গোত্রের সহিত। তিনি মুদার পর্যন্ত তাহার বংশ তালিকা শোনান। কাফেলা: আমাদের গোত্র মুদারই উষ্ট্র চালকের সঙ্গীতের প্রবক্তা। রাসূলুল্লাহ (স): কিভাবে? কাফেলা: জাহিলী যুগে এক গোত্র অপর গোত্রকে আক্রমণ করিয়া সর্বস্ব লুট করিয়া লইত। একবার এক গোত্রের উপর ডাকাতের হামলা হইল। ভীত সন্ত্রস্ত হইয়া উটগুলি
দিকবিদিক ছুটিয়া গেল। গোত্রপতি তাহার ভৃত্যকে বিক্ষিপ্ত উটগুলিকে একত্র করিবার হুকুম দিলেন। ভৃত্য ইহাতে অপারগতা প্রকাশ করিলে তাহার মনিব লাঠি দিয়া সজোরে হাতের উপর আঘাত করিল। আঘাতের ধকল সহ্য করিতে না পারিয়া ভৃত্য কাঁদিতে কাঁদিতে বলিতে লাগিল, আ-ইয়াদাহ, আ-ইয়াদাহ (ایداه ایداه) হায়, আমার হাত! হায়, আমার হাত। এই চীৎকারের ফলে বিক্ষিপ্ত উটগুলি একত্র হইতে লাগিল। মনিব বলিল, শাবাশ! এইভাবে ডাকিতে থাক যাহাতে সব উট একত্র হইয়া যায়। এই কথা শুনিয়া রাসূলুল্লাহ (স) হাসিলেন। তিনি বলিলেন, আমি কি জনগণকে এই সুসংবাদ শুনাইব না? হযরত বিলাল বলিলেন, নিশ্চয় শুনাইবেন, হে আল্লাহ্র রাসূল। রাসুলুল্লাহ (স) বলিলেন:
ان الله اعطاني الكنزين الفارس والروم وامدنى بالملوك ملوك حمير يجاهدون في سبيل الله وياكلون في الله.
"আল্লাহ তা'আলা আমাকে রোমান ও পারস্যের ধনভাণ্ডার দান করিয়াছেন এবং হিম্য়ারের বাদশাহের মাধ্যমে আমাকে সাহায্য করিয়াছেন। যেই ব্যক্তি আল্লাহ্ পথে জিহাদ করিবে সে গনীমতের সম্পদ প্রাপ্ত হইবে" (কিতাবুল মাগাযী, ৩খ., পৃ. ১০১১)।
তাবুকে রাসূলুল্লাহ (স)
রাসূলুল্লাহ (স) তাবুক পৌছিবার এক দিন আগে সাহাবীদিগকে বলিলেন: ইনশাআল্লাহ আগামী কাল তোমরা দুপুরের আগে তাবুক ঝর্ণায় পৌঁছিয়া যাইবে। সুতরাং তোমাদের কেহ ঝর্ণার পানিতে হাত লাগাইবে না। তাবুকে পৌঁছিয়া রাসূলুল্লাহ (স) ঝর্ণার ধারে গেলেন। বিন্দু বিন্দু পানি ধীর গতিতে প্রবাহিত হইতেছিল। ঝর্ণা হইতে অঞ্জলি দিয়া অল্প অল্প পানি একটি পাত্রে জমা করা হইল। অতঃপর রাসূলুল্লাহ (স) সেই পানি দিয়া মুখমণ্ডল ও হস্তদ্বয় ধৌত করিলেন এবং ব্যবহৃত পানি ঝর্ণায় ঢালিয়া দিলেন। তৎক্ষণাত ঝর্ণা হইতে কলকল রবে পানি নির্গত হইতে লাগিল। কাফেলার সব সদস্য তৃপ্তির সহিত পানি পান করিলেন। ইহার পর রাসূলুল্লাহ (স) বলিলেন:
يوشك يا معاذ ان طالت بك حياة ان ترى ما هاهنا قد ملى جنانا.
"হে মু'আয! যদি তুমি বাঁচিয়া থাক, তবে শীঘ্রই দেখিবে ইহার পানি অত্র এলাকাকে শ্যামল বাগানে পরিণত করিয়াছে"।
অদ্যাবধি সেই ঝর্ণাধারা হইতে সশব্দে পানি উৎক্ষিপ্ত হইতেছে (সাহীহ মুসলিম, ২খ., পৃ. ২৪৬)।
রাসূলুল্লাহ (স) তাবূক পৌঁছিলে সাহাবায়ে কিরাম (রা) ক্ষুধার যন্ত্রণায় কাতর হইয়া আরয করিলেন, ইয়া রাসূলুল্লাহ! আপনি অনুমতি দিলে আমরা সওয়ারীর উট যবেহ করিয়া গোশত খাইতে ও চর্বি সংগ্রহ করিতে পারি। হযরত উমার (রা) বলিলেন, ইয়া রাসূলাল্লাহ! এইরূপ করিলে সওয়ারীর সংখ্যা হ্রাস পাইবে। আপনি বরং অবশিষ্ট খাদ্যসামগ্রী এক জায়গায় একত্র
করিয়া বরকতের দু'আ করুন। আশা করা যায় আল্লাহ তা'আলা বরকত দান করিবেন। রাসূলুল্লাহ (স) বলিলেন: বেশ ভাল কথা। অতঃপর তিনি একটি চামড়ার দস্তরখান বিছাইলেন এবং তাহাতে প্রত্যেকের অবশিষ্ট খাদ্যসামগ্রী একত্র করিবার আদেশ দিলেন। কেহ এক মুষ্টি গম, কেহ এক মুষ্টি খেজুর এবং কেহ এক টুকরা রুটি লইয়া আসিল। এইভাবে দস্তরখান পূর্ণ হইয়া গেল। ইহার পর রাসূলুল্লাহ (স) বরকতের দু'আ করিয়া সাহাবীদেরকে বলিলেন, আপন আপন পাত্র ভরিয়া লও। সাহাবীদের এমন কোন পাত্র রহিল না যাহা খাদ্যসামগ্রীতে ভর্তি হয় নাই। সকলে তৃপ্তির সহিত আহার করিবার পরও খাদ্যসামগ্রী উদ্বৃত্ত রহিয়া গেল। রাসূলুল্লাহ (স) বলিলেন: আমি সাক্ষ্য দিতেছি যে, আল্লাহ ব্যতীত কোন ইলাহ নাই এবং আমি আল্লাহর রাসূল। যেই বান্দা সন্দেহাতীতভাবে এই কলেমায় বিশ্বাস করে, সে আল্লাহ তা'আলার সহিত মিলিত হইবে, তাহাকে জান্নাতে প্রবেশে বাধা দেওয়া হইবে না (আল-খাসাইসুল কুবরা, ১খ., পৃ. ৫৫৬-৭)।
তাবুকে সাহাবায়ে কিরামের সম্মুখে একটি বিশাল সর্প আত্মপ্রকাশ করিল। সকলেই সর্প দেখিয়া ছুটাছুটি করিতে লাগিলেন। সর্পটি সম্মুখে অগ্রসর হইয়া রাসূলুল্লাহ (স)-এর নিকট দীর্ঘক্ষণ দাঁড়াইয়া রহিল। রাসূলুল্লাহ (স) উটের পিঠে সওয়ার ছিলেন। একটু পরে সর্পটি রাস্তা হইতে সরিয়া সটান দাঁড়াইয়া গেল। সাহাবীগণ ফিরিয়া আসিলে রাসূলুল্লাহ (স) জিজ্ঞাসা করিলেন: তোমরা কি জান এই সর্পটি কে? সাহাবীগণ আরয করিলেন: আল্লাহ ও তাঁহার রাসূলই ভাল জানেন। তিনি বলিলেন: আট সদস্য বিশিষ্ট জিনের যেই দলটি আমার নিকট কুরআন শ্রবণ করিতে আসিয়াছিল, সে তাহাদের একজন। আমি তাহাদের বসতিতে আসিয়াছি। সুতরাং সে কর্তব্য মনে করিয়া আমাকে সালাম করিতে আসিয়াছে। সে তোমাদেরকেও সালাম জানাইতেছে। সাহাবীগণ বলিলেন, ওয়া'আলায়কুমুস সালাম ওয়ারাহমাতুল্লাহ (কিতাবুল মাগাযী, ৩খ., পৃ. ১০১৫; খাসাইসুল কুবরা, ১খ., পৃ. ৫৬৪-৫)।
হযরত 'ইরবাদ ইব্‌ন সারিয়া (রা) বলেন, তাবূকে অবস্থানকালে রাসূলুল্লাহ (স) বিলাল (রা)-কে জিজ্ঞাসা করিলেন: খাওয়ার জন্য কিছু আছে কি? হযরত বিলাল (রা) উত্তর দিলেন, সেই সত্তার কসম যিনি আপনাকে সত্যসহ প্রেরণ করিয়াছেন। আমরা আমাদের থলিয়া ঝাড়িয়া ফেলিয়াছি। রাসূলুল্লাহ (স) বলেন: দেখ, হয়ত কিছু পাইতে পার। আরশের মালিকের নিকট অভাব-অনটনের আশংকা করিও না। বিলাল (রা) এক একটি থলিয়া লইয়া ঝাড়িতে শুরু করিলেন। কোন থলিয়া হইতে একটি খেজুর, আবার কোনটি হইতে দুইটি খেজুর মাটিতে পড়িল। অবশেষে আমি বিলালের হাতে সাতটি খেজুর দেখিলাম। রাসূলুল্লাহ (স) অতঃপর খেজুরগুলির উপর স্বীয় পবিত্র হাত রাখিয়া বলিলেন: বিসমিল্লাহ, খাও। আমরা তিনজনেই খেজুর খাইলাম। আমি একটি একটি করিয়া চুয়ান্নটি খেজুর গণনা করিলাম। এইগুলির আটি আমার অপর হাতে ছিল। আমার উভয় সঙ্গীও তাহাই করিল। অবশেষে আমরা তৃপ্ত হইয়া হাত গুটাইয়া লইলাম। আমি অবাক হইয়া দেখিলাম, সেই সাতটি খেজুর তখনও অবশিষ্ট রহিয়াছে।
রাসূলুল্লাহ (স) বিলালকে বলিলেন: এই খেজুরগুলি তুলিয়া রাখ। এইগুলি হইতে যেই ব্যক্তি খাইবে সেই পরিতৃপ্ত হইবে।
পরদিন রাসূলুল্লাহ (স) বিলালকে বলিলেন: খেজুরগুলি নিয়া আস। তিনি খেজুরগুলির উপর পবিত্র হাত রাখিয়া বলিলেন: বিসমিল্লাহ, খাও। আমরা সংখ্যায় ছিলাম দশজন। সকলেই খাইয়া তৃপ্ত হইলাম। ইহার পর যখন হাত গুটাইয়া লইলাম তখন খেজুর তেমনি অবশিষ্ট ছিল। রাসূলুল্লাহ (স) বলিলেন: আল্লাহ তা'আলার কাছে আমার লজ্জা লাগে। নতুবা মদীনা পৌঁছা পর্যন্ত আমরা এই খেজুর খাইতাম। অতঃপর তিনি খেজুরগুলি একটি শিশুকে দিলেন। শিশুটি এইগুলি চর্বন করিতে করিতে চলিয়া গেল (খাসাইসুল কুবরা, ১খ., পৃ. ৬৫৭-৯)।
যুদ্ধের ময়দানে যুল-বিজাদায়নের ইনতিকাল রাসূলুল্লাহ (স) তাবুকে অবস্থানকালীন হযরত আবদুল্লাহ যুল-বিজাদায়ান ইনতিকাল করেন। তিনি আল্লাহর রাসূলের সহিত যুদ্ধে অংশগ্রহণ করার জন্য মদীনা হইতে তাবুক আসিয়াছিলেন। তিনি ছিলেন অত্যন্ত দরিদ্র পরিবারের সন্তান। শৈশবকালে পিতৃহীন হইয়া পিতৃব্যের তত্ত্বাবধানে ও আশ্রয়ে প্রতিপালিত হন। চাচা তাহাকে অনেক ধনসম্পদ দান করেন। তিনি ইসলাম গ্রহণ করার কারণে তাহার চাচা ক্রুদ্ধ হইয়া প্রদত্ত ধন-সম্পদ কাড়িয়া লইলেন। তিনি ভ্রাতুষ্পুত্রকে নানাভাবে নির্যাতন করিয়া অবশেষে একটি বিজাদ পরাইয়া তাড়াইয়া দেন। বিজাদ হইতেছে এক প্রকার মোটা খসখসে কম্বল। তিনি সেই অবস্থায় রাসূলুল্লাহ (স)-এর নিকট চলিয়া আসেন। তিনি মদীনার কাছাকাছি পৌছিয়া জীর্ণ কম্বলখানাকে দুই টুকরা করিয়া একটি পরিধান করেন এবং অপরটি গায়ে জড়ান এবং এই অবস্থায় রাসূলুল্লাহ (স)-এর সামনে হাযির হন। তাঁহার পৈত্রিক নাম ছিল আবদুল উয্যা। রাসূলুল্লাহ (স) তাঁহার নূতন নামকরণ করেন আবদুল্লাহ। তখন হইতে তিনি যুল বিজাদায়ন (দুই কম্বলওয়ালা) হিসাবে খ্যাতি লাভ করেন। তাবুকে যখন তিনি ইনতিকাল করেন তখন রাতেই আগুনের শিখা জ্বালাইয়া কবর খনন করা হয়। রাসূলুল্লাহ (স) স্বয়ং কবরে অবতরণ করেন। হযরত আবূ বাক্স (রা) ও হযরত উমার (রা) লাশ কবরে নামাইয়া দেন। হযরত বিলালের হাতে ছিল জ্বলন্ত চেরাগ। কবরে লাশ রাখিয়া রাসূলুল্লাহ (স) দু'আ করেন:
اللهم اني امسيت راضيا عنه فارض عنه “হে আল্লাহ! আজ সন্ধ্যা পর্যন্ত (ইনতিকালের পূর্ব মুহূর্ত পর্যন্ত) আমি তাহার প্রতি সন্তুষ্ট ছিলাম, অতএব তুমি তাহার প্রতি সন্তুষ্ট হইয়া যাও”।
কবরের পার্শ্বে দাড়ানো হযরত আবদুল্লাহ ইবন মাসউদ (রা) কাঁদিয়া বলিলেন: يا ليتني كنت صاحب الحفرة. "হায়! আমি যদি এই কবরের বাসিন্দা হইতাম'। রাসূলুল্লাহ (স) তাবৃকের ময়দানে ছাউনী স্থাপন করিয়া বিশ দিন অপেক্ষা করিলেন। কিন্তু রোমানরা মুজাহিদদের দৃঢ় মনোবল ও যুদ্ধের
প্রস্তুতি দেখিয়া মুকাবিলা করার সাহস করিল না। গাস্সানী সৈন্যরা ময়দান হইতে পালাইয়া নিরাপদ আশ্রয়ে চলিয়া গেল (আকবার শাহ খান নজীবআবাদী, তারীখে ইসলাম, ১খ., পৃ. ২২০; ইব্‌ন হিশাম, আস-সীরাতুন নাবabিয়্যা, ২খ., পৃ. ৫২৭-৮)।
তাবুকের ময়দানে রাসূলুল্লাহ (স)-এর ভাষণ
একদা তাবুকে ফজরের সালাত আদায়ের পর রাসূলুল্লাহ (স) সমবেত জনগণের উদ্দেশ্যে ভাষণ দেন যাহা উৎকৃষ্ট নৈতিক ও আদর্শিক নীতিমালা হিসাবে স্বীকৃত। আল্লাহ তা'আলার স্তুতি ও প্রশাংসার পর তিনি বলেন:
أيها الناس اما بعد فان اصدق الحديث كتاب الله وأوثق العرى كلمة التقوى وخير الملل ملة ابراهيم وخير السنن سنة محمد ﷺ وأشرف الحديث ذكر الله وأحسن القصص هذا القرآن وخير الامور عوازمها وشر الأمور محدثاتها واحسن الهدي هدى الانبياء وأشرف الموت قتل الشهداء واعمى العمى الضلالة بعد الهدى وخير الاعمال ما نفع وخير الهدى ما تبع وشر العمى عمى القلب واليد العليا خير من اليد السفلى وما قل وكفى خير مما كثر وألهى وشر المعذرة حين يحضر الموت وشر الندامة يوم القيامة ومن الناس من لا يأتى الجمعة إلا دبرا ومن الناس من لا يذكر الله هجرا ومن أعظم الخطايا اللسان الكذوب وخير الغنى غنى النفس وخير الزاد التقوى ورأس الحكمة مخافة الله عز وجل وخير ما وقر في القلوب اليقين والارتياب من الكفر والنياحة من عمل الجاهلية والغلول من جثاء جهنم والسكر كى من النار والشعر من ابليس والخمر جماع الاثم والنساء حبائل الشيطان والشباب شعبة من الجنون وشر المكاسب كسب الربا وشر المآكل أكل مال اليتيم والسعيد من وعظ بغيره والشقى من شقى في بطن أمه وإنما يصير أحدكم إلى موضع أربعة أذرع والأمر إلى الآخرة وملاك العمل خواتمه وشر الورايا روايا الكذب وكل ما هو آت قريب وسباب المؤمن فسوق وقتال المؤمن كفر وأكل لحمه من معصية الله وحرمة ماله كحرمة دمه ومن يتالى على الله يكذبه ومن يستغفره يغفر له ومن يعف يعف الله عنه ومن يعظم يأجره الله ومن يصبر على الرزية يعوضه الله ومن يبتغى السمعة يسمع الله به ومن يصبر يضعف الله له ومن يعص الله يعذبه الله اللهم اغفر لي ولأمتى اللهم اغفر لي ولأمتى اللهم اغفر لي ولأمتى قالها ثلاثا وفيه نكارة وفي اسناده ضعف والله أعلم بالصواب।
“হে জনগণ। সবচেয়ে সত্য কথা হইতেছে আল্লাহ্র কিতাব; সবচেয়ে মজবুত রজ্জু হইতেছে তাক্তয়ার বাক্য; সবচেয়ে শ্রেষ্ঠ মিল্লাত হইতেছে হযরত ইব্রাহীম (আ)-এর মিল্লাত; সবচেয়ে উত্তম সুন্নাত হইতেছে রাসূলুল্লাহ (স)-এর সুন্নাত, সবচেয়ে মর্যাদাপূর্ণ বাক্য হইতেছে আল্লাহর যিকির; সবচেয়ে সুন্দর বর্ণনা হইতেছে আল-কুরআন; সর্বোত্তম কর্ম পরিণাম ফলের উপর নির্ভরশীল; সবচেয়ে মন্দ কর্ম হইতেছে বিদ'আত, সবচেয়ে উন্নত সীরাত হইতেছে নবীদের সীরাত; সবচেয়ে মহিমান্বিত মৃত্যু হইতেছে শহীদের মৃতু; নিকৃষ্টতর গোমরাহী হইতেছে যাহা হিদায়াতের পরে আসে; উৎকৃষ্টতর আমল হইতেছে যাহা উপকারী; সর্বোৎকৃষ্ট হিদায়াত হইতেছে যাহা অনুকরণ করা হয়; সবচেয়ে নিকৃষ্ট অন্ধত্ব হইতেছে অন্তরের অন্ধত্ব; নিচের হাত হইতে উপরের হাত উত্তম (দাতার হাত গ্রহীতার হাত হইতে উত্তম); গোমরাহীতে লিপ্ত করে এমন অধিক সম্পত্তি হইতে স্বল্প সম্পত্তি উত্তম; নিকৃষ্টতম ওযর-আপত্তি হইতেছে যাহা মৃত্যুর সময় উপস্থিত করা হয়; কিয়ামতের দিবসের লজ্জাই হইল বড় লজ্জা, কিছু মানুষ এমন আছে যাহারা জুমু'আর নামাযে বিলম্বে আসে এবং এমন কিছু মানুষ রহিয়াছে যাহারা আল্লাহ্ যিকির করে অমনোযোগী অবস্থায় যাহা সত্যিকার অর্থে যিকির হইতে দূরে থাকারই নামান্তর। সবচেয়ে বড় ভ্রান্তি হইতেছে মিথ্যা কথন; সবচেয়ে উত্তম প্রাচুর্য হইতেছে অন্তরের প্রাচুর্য; সবচেয়ে উৎকৃষ্ট পাথেয় হইতেছে আল্লাহভীতি; প্রজ্ঞার উৎসস্থল হইতেছে মহান আল্লাহ্র ভয়; অন্তরের সবচেয়ে উন্নত বস্তু হইতেছে নিশ্চিত প্রত্যয়; সন্দেহ কুফরীর একটি অংশ; উচ্চ স্বরে বিলাপ করা জাহিলিয়াতের প্রথা; গনীমতের সম্পত্তি আত্মসাত দোযখের ইন্ধন; মাদক গ্রহণ দোযখের আগুন প্রজ্জ্বলিত করার শামিল; অশালীন কবিতা শয়তানের পক্ষ হইতে আসে; মদ্যপান সব পাপের মূল; দুষ্ট নারীরা শয়তানের ফাঁদ; যৌবন উন্মত্ততার একটি শাখা; সূদের উপার্জন নিকৃষ্টতম জীবিকা; নিকষ্ট খাদ্য হইতেছে ইয়াতীমের সম্পদ ভক্ষণ; সৌভাগ্যবান ঐ ব্যক্তি যে অপরের নিকট হইতে উপদেশ গ্রহণ করে; দুর্ভাগা ঐ ব্যক্তি যে মাতৃগর্ভেই হতভাগা; তোমাদের প্রত্যেককে চার হাত জায়গায় (কবরে) যাইতে হইবে; কর্মফল আখিরাতে প্রকাশ পাইবে; সাফল্যের ভিত্তি হইল শেষ পরিণামফল; নিকৃষ্ট বর্ণনাকারী হইতেছে মিথ্যা বর্ণনা; যাহা কিছু ঘটিবার তাহা অচিরেই ঘটিবে; মুমিনদিগকে গালি দেওয়া পাপ; মু'মিনকে হত্যা করা কুফরী কাজ; মুমিনের গোশত খাওয়া (গীবত করা) আল্লাহ্র নাফরমানী; মুসলমানের সম্পত্তির প্রতি এমনভাবে সম্মান দেখাইতে হইবে যেমনভাবে নিজের প্রাণের প্রতি সম্মান দেখানো হয়; যেই ব্যক্তি মিথ্যা কসম খায় আল্লাহ তাহাকে মিথ্যাবাদী বলিয়া আখ্যায়িত করেন; যেই ব্যক্তি গুনাহ মাফ চায় আল্লাহ তাহাকে মার্জনা করেন; যেই ব্যক্তি অন্যকে ক্ষমা করে আল্লাহ তাহাকে ক্ষমা করেন; যেই ব্যক্তি ক্রোধ সংবরণ করে আল্লাহ তা'আলা তাহাকে উত্তম বিনিময় দান করেন; যেই ব্যক্তি বিপদে ধৈর্য ধারণ করে আল্লাহ তাহাকে দ্বিগুণ প্রতিদান দেন; যেই ব্যক্তি লোক দেখানোর জন্য কোন কাজ করে আল্লাহ তাহাকে অপদস্ত করেন। যে ব্যক্তি ধৈর্য ধারণ করে আল্লাহ তাহাকে অধিক প্রতিদান দেন। যেই ব্যক্তি আল্লাহ তা'আলার অবাধ্য আল্লাহ তাহার উপর আযাব প্রদান করেন। হে আল্লাহ! আমাকে এবং আমার উম্মতকে ক্ষমা করুন। তিনি এই
দু'আ তিনবার করেন। হাফিয ইব্‌ন কাছীর হাদীছের ইসনাদে দুর্বলতা আছে বলিয়া মন্তব্য করেন" (যাদুল মা'আদ, ৩খ., পৃ. ৫৪১-৪২; আল-বিদায়া, ৫খ., পৃ. ১৩-১৫)।
হিরাক্লিয়াসের নিকট রাসূলুল্লাহ (স)-এর পত্র
তাবৃক হইতে রাসূলুল্লাহ (স) রোমান সম্রাট হেরাক্লিয়াসের নিকট হযরত দিহ্ইয়া আল-কালবী (রা) মারফত একটি পত্র প্রেরণ করেন। পত্রখানা সম্রাটের নিকট হস্তান্তরিত হওয়ার পরপরই তিনি দেশের সর্বোচ্চ প্রশাসনিক কর্মকর্তা, অমাত্যবর্গ ও সেনাপতিদের রাজদরবারে ডাকিয়া পাঠান। রুদ্ধদ্বার কক্ষে তিনি তাহাদের সহিত বৈঠকে মিলিত হন। সম্রাট তাহাদের উদ্দেশ্যে বলেন, এই ব্যক্তি [মুহাম্মাদ (স)] যেই জায়গায় আসিয়া অবস্থান করিতেছে, তাহা তো আপনাদের সবারই জানা। তিনি আমার নিকট পত্র প্রেরণ করিয়া তিনটি বিকল্প বিষয়ের যে কোনটি গ্রহণের দাওয়াত দিয়াছেন। তিনি লিখিয়াছেন, ইসলাম কবুল করুন অথবা জিয়া (কর) প্রদান করুন অথবা লড়াইয়ের জন্য ময়দানে আসুন।
হে রোমান জাতি! আল্লাহর শপথ! আপনারা নিশ্চয় প্রাচীন ঐশী গ্রন্থসমূহ অধ্যয়ন করিয়া জানিতে পারিয়াছেন যে, মুসলমানদের হাতে আপনারা পরাজিত হইবেন। সুতরাং পরাজিত হওয়ার আগেই তাহাদের আনুগত্য স্বীকার করুন অথবা জিযয়া প্রদান করুন। পারিষদবর্গ ও সেনাপতিগণ এই বক্তব্য শুনিয়া অবজ্ঞাসূচক আচরণ করিতে লাগিল এবং নিজ নিজ শরীরের বিশেষ জামা (Uniform) খুলিয়া অগ্নি বৎ হইয়া বলিল, তাই বলিয়া কি আমরা খৃস্ট ধর্ম ছাড়িয়া দিব? হেজায হইতে আগত এক ব্যক্তির গোলাম হইয়া যাইব? হেরাক্লিয়াস যখন চারি দিকে শোরগোল ও হৈ চৈ লক্ষ্য করিলেন, তখন সকলকে শান্ত করিবার উদ্দেশ্যে বলিলেন, আসলে আমি আপনাদের নৈতিক সাহস ও ধর্মীয় চেতনা যাচাই করিতে চাহিয়াছিলাম। অতঃপর হিরাক্লিয়াস একজন দোভাষী ডাকিয়া উত্তর প্রদান করিলেন। আত-তানূখী নামক জনৈক দূতের হস্তে পত্রটি দিয়া বলিলেন, পত্রটি তাবুকে অবস্থানরত ঐ ব্যক্তির নিকট দিয়া আস; তবে তাঁহার কথোপকথনে তিনটি বিষয় লক্ষ্য করিবে এবং তাহা আমাকে জানাইবে। (এক) আমার নিকট তিনি যেই পত্র প্রেরণ করিয়াছেন তাহার কোন আলোচনা তিনি করিতেছেন কিনা; (দুই) আল-লায়ল (রজনী) শব্দটি উচ্চারণ করেন কিনা; (তিন) তাঁহার পিঠ দেখিয়া অনুধাবন করিবে সেখানে কিছু দৃষ্টিগোচর হয় কিনা।
দূত বলেন, আমি যখন হেরাক্লিয়াসের পত্র লইয়া সোজা তাবুকে পৌঁছিলাম, তখন রাসূলুল্লাহ (স) সাহাবীদিগকে লইয়া ঝর্ণাধারার নিকটে বসিয়া আলাপ করিতেছেন। আমি সাহাবীদিগকে জিজ্ঞাসা করিলাম, আপনাদের নবী কে? তাঁহারা দেখাইয়া দিলে আমি তাঁহার সম্মুখে গিয়া পত্রখানি হস্তান্তর করিলাম। রাসূলুল্লাহ (স) পত্রখানি থলিয়ার মধ্যে রাখিয়া প্রশ্ন করিলেন, আপনি কে? আমি বলিলাম, আত-তানূখী।
রাসূলুল্লাহ (স): আপনি কি আপন পিতা ইব্রাহীম (আ)-এর বিশুদ্ধ তাওহীদ ভিত্তিক দীন কবুল করিবেন?
আত-তানূষী: যেহেতু আমি একজন দূত, তাই মনিবের পরামর্শ ছাড়া মুসলমান হইতে পারি না।
রাসূলুল্লাহ (স) মুচকি হাসিয়া কুরআনের আয়াত পাঠ করিলেন: إِنَّكَ لَا تَهْدِي مَنْ أَحْبَبْتَ وَلَكِنَّ اللَّهَ يَهْدِي مَنْ يَشَاءَ وَهُوَ أَعْلَمُ بِالْمُهْتَدِينَ.
"তুমি যাহাকে ভালবাস, ইচ্ছা করিলেই তাহাকে সৎপথে আনিতে পারিবে না। তবে আল্লাহ যাহাকে চাহেন সৎপথে আনয়ন করেন এবং তিনিই ভাল জানেন সৎপথ অনুসারীদেরকে" (২৮:৫৬)।
হে আত-তানূখী ভাই! আমি পারস্য সম্রাট খসরূ পারভেজের নিকট একটি পত্র প্রেরণ করিয়াছিলাম। সে উহা ছিড়িয়া ফেলিয়াছে। আল্লাহ তা'আলা তাহার দেশকে অনুরূপ টুকরা টুকরা করিয়া ফেলিবেন। আমি আপনাদের সম্রাট হিরাক্লিয়াসের নিকট পত্র লিখিয়াছি। তিনি তাহা সংরক্ষণ করিয়াছেন। অতএব এক নির্দিষ্ট মেয়াদ পর্যন্ত জনগণ তাহাকে ভয় করিয়া চলিবে।
আত-তানূখী: আমি মনে মনে ভাবিলাম, হেরাক্লিয়াসের হুকুম অনুযায়ী তিনটি কথার মধ্যে পত্রের প্রসঙ্গ তো আসিয়া গেল। আমি ইহা নোট করিয়া লইলাম। অতএব পত্রটি পাঠ করিবার জন্য রাসূলুল্লাহ (স) হযরত মু'আবিয়া (রা)-কে দিলেন। পত্রে লেখা ছিল, 'আপনি আমাকে এমন এক জান্নাতের প্রতি দাওয়াত দিতেছেন যাহার দৈর্ঘ্য-প্রস্ত আসমান-যমিন হইতেও বড়। ইহার পর বলুন, দোযখ কোথায় গেল'?
রাসূলুল্লাহ (স): সুবহানাল্লাহ! দিন আসিবার পর 'আল-লায়ল' (রাত) কোথায় যায়?
আত-তানূখী : আমি বুঝিতে পারিলাম যে, এইবার হেরাক্লিয়াসের দ্বিতীয় কথাটি পাওয়া গেল। আমি তাহা নোট করিয়া লইলাম।
রাসুলুল্লাহ (স) সাহাবীদের উদ্দেশ্যে বলিলেন, কাহারও নিকট যদি কোন উপঢৌকন থাকে তবে তাহা আত-তানূখীকে দাও।
আত-তানূখী: উপঢৌকন দেওয়ার পর আমি যখন ফিরিয়া আসিতে উদ্যত হইলাম তখন রাসূলুল্লাহ (স) নিজের শরীরের জামা খুলিয়া আমাকে ডাকিলেন।
রাসূলুল্লাহ (স): অন্তরে যেই বাসনা লুকাইয়া রাখিয়াছ তাহা পূর্ণ কর। আস, দেখ।
আত-তানূখী: আমি রাসূলের চারিপার্শ্ব ঘুরিয়া তাঁহার বাম কাঁধের নীচে উৎকীর্ণ খতমে নবুওয়াতের মোহর প্রত্যক্ষ করিলাম। আমার আর বুঝিতে বাকী রহিল না যে, হেরাক্লিয়াসের তৃতীয় কথাটিও প্রমাণিত হইয়া গেল। এইসব তথ্য লিপিবদ্ধ করিয়া আমি হেরাক্লিয়াসের দরবারে ফিরিয়া আসিলাম (আল-বিদায়া ওয়ান-নিহায়া, ৫খ., পৃ. ১৫-১৬)।
সীমান্ত গোত্রপতিদের সহিত সন্ধি
তাবুকে পৌছিয়া রাসূলুল্লাহ (স) বিশ দিন অবস্থান করেন কিন্তু কোন সশস্ত্র যুদ্ধ হয় নাই। অবশ্য শত্রু ভীত-শংকিত হইয়া পড়ে। আশেপাশের গোত্রপতিগণ, বিশেষত আয়লা, জারবা,
আযরুহ ও মাক্কাবাসীরা রাসূলুল্লাহ (স)-এর সাথে সাক্ষাত করিয়া সন্ধি স্থাপন করে এবং জিযয়া কর দিতে সম্মত হয়। আয়লা অধিপতি ইউহান্না ইব্‌ন রূবাকে রাসূলুল্লাহ (স) যেই নিরাপত্তানামা লিখিয়া দেন তাহা ছিল নিম্নরূপ:
بسم الله الرحمن الرحيم هذه امنة من الله ومحمد النبى رسول الله ليحنة بن رؤية واهل ايلة سفنهم وسيارتهم فى البر والبحر لهم ذمة الله وذمة محمد النبى ومن كان معهم من اهل الشام واهل اليمن واهل البحر فمن أحدث منهم حدثا فانه لا يحول ماله دون نفسه وانه طيب لمن اخذه من الناس وانه لا يحل أن يمنعوا ماء يردونه ولا طريقا يريدونه من بر او بحر.
“দয়াময় পরম দয়ালু আল্লাহর নামে—ইহা আল্লাহ ও আল্লাহ্র রাসূল মুহাম্মদের পক্ষ হইতে ইউহান্না ইব্‌ন রূবা ও আয়লাবাসীকে প্রদত্ত নিরাপত্তারপত্র। তাহাদের জল ও স্থলের জাহাজ ও যানবাহনের ব্যাপারে এই নিশ্চয়তা প্রযোজ্য। তাহাদের জন্য আল্লাহ ও মুহাম্মাদের যিম্মাদারি সাব্যস্ত হইল। সিরিয়া, ইয়ামান ও সমুদ্র দ্বীপের বাসিন্দাদের মধ্যে যাহারা তাহাদের সহিত থাকিবে তাহারাও ইহার অন্তর্ভুক্ত। তাহাদের মধ্যে কেহ কোন অঘটন ঘটাইলে তাহার অর্থ-সম্পদ তাহাকে রক্ষা করিতে পারিবে না। যেই ব্যক্তি ইহা গ্রহণ করিবে তাহার জন্য ইহা মূল্যবান বটে। তাহারা যে কোন পানি ব্যবহার করিতে পারিবে এবং জল স্থলের যে কোন পথে যাতায়াতও করিতে পারিবে, তাহাতে তাহাদের বাধা প্রদান করিবার অবকাশ থাকিবে না” (ইব্‌ন হিশাম, ২খ., পৃ. ৫২৫-৬; যাদুল মা'আদ, ৩খ., পৃ. ৫৩৭)।
জাবরা ও আহবাসীদের সহিত রাসূলুল্লাহ (স)-এর যেই নিরাপত্তা দলীল সম্পাদিত হয় তাহার ভাষা ছিল নিম্নরূপ:
بسم الله الرحمن الرحيم هذا كتاب من محمد النبى رسول الله لاهل جرباً وأذرح انهم امنون بامان الله وامan محمد الله وان عليهم مأة دينار في كل رجب ومأة اوقية طيبة وان الله عليهم كفيل بالنصح والاحسان الى المسلمين ومن لجأ اليهم من المسلمين.
"দয়াময় পরম দয়ালু আল্লাহর নামে— আল্লাহ্র রাসূল নবী মুহাম্মদের (স) পক্ষ হইতে জারবা ও আহবাসীদের জন্য এই চুক্তিনামা। এইসব মানুষ আল্লাহ ও রাসূলের নিরাপত্তা হেফাযতের অধীনে নিরাপদ থাকিবে। তাহারা প্রতি বৎসর রজব মাসে এক শত দীনার এবং এক শত পরিচ্ছন্ন উকিয়া (এক হাজার পঞ্চাশ মণ) খেজুর প্রদান করিবে। নিশ্চয় আল্লাহ তা'আলা তাহাদের যিম্মাদার। তাহারা মুসলমানদের সহিত কল্যাণপূর্ণ ও সদয় আচরণ করিবে। যাহারা মুসলমানদের আশ্রয় গ্রহণ করিবে তাহারাও এই সুবিধা ভোগ করিবে” (কিতাবুল মাগাযী, ৩খ., পৃ. ১০৩২)।

📘 সীরাত বিশ্বকোষ > 📄 আবূ সুফ্যানের ইসলাম গ্রহণ

📄 আবূ সুফ্যানের ইসলাম গ্রহণ


উমার ফারূক (রা) আবূ সুফয়ানকে লইয়া মহানবী (স)-এর খিদমতে উপস্থিত হইয়া বলিতে লাগিলেন, সত্যের শত্রুদিগকে সমূলে উৎপাটিত করিবার শুভ মুহূর্ত সমাগত। আবূ সুফিয়ান আজ বন্দী। বস্তুত প্রতিশোধ গ্রহণ ও প্রতিফল দানের সময় উপস্থিত। উমার (রা) মহানবী (স)-এর খিদমতে আরয করিলেন, ইয়া রাসূলাল্লাহ! আল্লাহর শত্রুকে হত্যা করিবার অনুমতি দিন। হযরত আব্বাস (রা) বলিলেন, ইয়া রাসূলাল্লাহ! আমি আবূ সুফিয়ানকে নিরাপত্তা প্রদান করিলাম। হযরত উমার (রা) উগ্রকণ্ঠে বলিলেন, "হে আব্বাস! আল্লাহ্র বৈরী, আল্লাহ্র রাসূলের বৈরী, ইসলামের বৈরী এই আবূ সুফিয়ান। সুদীর্ঘ একুশ বৎসর ধরিয়া সে রাসূলুল্লাহ (স)-এর উপর এবং নিরপরাধ মুসলমনদের উপর কি নিদারুণ নিগ্রহই না করিয়াছে। এহেন শত্রুকে আপনি নিরাপত্তা প্রদান করিবেন কেন?” হযরত আব্বাস (রা) বলিলেন, হে উমার! বানু 'আদী ইব্‌ন কা'ব বংশের কোন লোক হইলে বোধ হয় আপনি এত উত্তেজিত হইতেন না। হযরত উমার (রা) বলিলেন, আপনি বলেন কি? আপনি মুসলমান হওয়াতে আমি যতটুকু আনন্দিত হইয়াছি আমার পিতা খাত্তাব মুসলমান হইলেও এতটুকু আনন্দিত হইতাম না। কারণ আমি জানি যে, আপনার ইসলাম গ্রহণে রাসূলুল্লাহ (স) সর্বাধিক আনন্দিত। রাসূলুল্লাহ (স) বলিলেন, আচ্ছা! এখন তোমরা আবূ সুফিয়ানকে লইয়া যাও। প্রাতকালে তাহাকে আমার নিকট হাযির করিও।
প্রাণের বৈরী ইসলামের দুশমন আবু সুফিয়ানকে প্রাতকালে মহানবী (স)-এর খিদমতে হাযির করা হইল। এহেন মহাপাতকীকে হাতে পাইয়া রাহমাতুল্লিল আলামীন কি করিলেন?
হত্যা করিবার নির্দেশ দিলেন, না বন্দী করিলেন, না বেত্রাঘাত করিবার হুকুম দিলেন? তাহাও না, মহানবী (স) তাহার প্রতি কোন প্রকার রূঢ় ব্যবহার করিলেন না; বরং করুণ স্বরে আবূ সুফিয়ানকে জিজ্ঞাসা করিলেন, এখনও কি তোমার ভুল ভাঙ্গে নাই? আল্লাহ তা'আলা ছাড়া অন্য কেহ বন্দেগীর যোগ্য নাই, একথা কি তুমি এখনও বুঝিতে পার নাই? আবূ সুফিয়ান অবনত মস্তকে আরয করিলেন, মহাত্মন! আপনি কত ধৈর্যশীল? কত মহানুভব! আত্মীয়তা বন্ধনের মর্যাদার প্রতি আপনার কত লক্ষ্য! বাস্তবিক আল্লাহ তা'আলা ব্যতীত অন্য কোন প্রভু যে নাই তাহা আমি নিঃসন্দেহরূপে বুঝিতে পারিয়াছি। কারণ অন্য কোন প্রভু থাকিলে আমাদের এই মহাবিপদে নিশ্চয়ই সাহায্য করিত। তৎপর রাসূলুল্লাহ (স) জিজ্ঞাসা করিলেন, আমার নুওয়াত সম্বন্ধে কি তোমার সন্দেহ আছে? আবূ সুফিয়ান নির্ভীক চিত্তে উত্তর করিলেন, এখনও আমি পূর্ণভাবে সন্দেহমুক্ত হইতে পারি নাই (ফাতহুল বারী, তাবারী, হালাবী প্রভৃতি)। হযরত আব্বাস (রা) বলিলেন, আর বিলম্ব কর কেন, আবূ সুফিয়ান? ইসলাম গ্রহণ কর। আলো-আধার মাঝখানে দোল খাইতে খাইতে আবূ সুফিয়ান ঘোষণা করিলেন, লা ইলাহা ইল্লাল্লাহু মুহাম্মাদুর রাসূলুল্লাহ। আবূ সুফিয়ানের মনের অবস্থা বুঝিয়া ইহাতেই রাসূলুল্লাহ (স) সন্তুষ্ট হইলেন। সত্য যে একদিন তাহার হৃদয়ে আপন আসন পূর্ণভাবেই অধিকার করিয়া লইবে একথা তিনি নিঃসন্দেহরূপেই জানিতেন। কলেমা তায়্যিবা পাঠে করিয়া কুরায়শ নেতা আবূ সুফিয়ান আজ আমাদের শ্রদ্ধার আসন গ্রহণ করিলেন। ঐতিহাসিকগণ বলেন, অল্প দিনের মধ্যেই তিনি খাঁটি মুসলমানে পরিণত হইলেন। কয়েক দিন পরেই তিনি আল্লাহর জন্য তাঁহার রাসূলের জন্য ইসলামের জন্য যুদ্ধ করিয়া নিজের একটি চক্ষু আল্লাহর রাস্তায় দান করিতে বিন্দুমাত্রও দ্বিধাবোধ করেন নাই। তায়েফ যুদ্ধে তাহার চক্ষুটি আহত হয় এবং ইয়ারমুক যুদ্ধে চক্ষুটি সম্পূর্ণ নিষ্প্রভ হইয়া যায়। চির জীবনের বৈরী আজ রাসূলুল্লাহ (স)-এর নিকট আত্মসমর্পণ করিলেন, তাঁহার জন্য নিজের চক্ষু দান করিতেও কুণ্ঠিত হইলেন না। ইহা কত বড় বিজয়। সব বিজয় অপেক্ষা এই বিজয় যে শ্রেষ্ঠ, তাহা বলাই বাহুল্য।
ইসলাম গ্রহণের পর রাসূলুল্লাহ (স) হযরত আব্বাস (রা)-কে বলিলেন, তাওহীদী ফৌজের শান-শওকত দর্শন করাইবার জন্য আপনি আবু সুফিয়ানকে সংকীর্ণ পথের পার্শ্বস্থ কোন পাহাড়ের উপর দাঁড় করাইয়া দিন। তিনি তাহাই করিলেন। অতঃপর রাসূলুল্লাহ (স) সৈন্যদিগকে নগরে প্রবেশের নির্দেশ দিলেন। বিভিন্ন গোত্রের বীরগণ বিভিন্ন দলে বিভক্ত হইয়া মক্কার দিকে যাত্রা করিলেন। পতাকার পর পতাকা ফৌজের পর ফৌজ আবূ সুফিয়ানের সম্মুখ দিয়া অতিক্রম করিতে লাগিল, আর তিনি স্তম্ভিত হইয়া বিস্ফারিত নেত্রে তাহা দর্শন করিতে লাগিলেন। ইসলামী ফৌজের শান-শওকত দর্শন করিয়া ভয়ে আবূ সুফিয়ানের অন্তরাত্মা শুকাইয়া গেল। ফৌজের পর ফৌজ যাইতে থাকে আর তিনি ভয়ে জড়সড় হইতে থাকেন। অবশেষে অপূর্ব সমারোহের সহিত আসিল আনসার বাহিনী। এই বাহিনীর অস্ত্রশস্ত্রের চাকচিক্যে তাহার নয়ন যুগল ঝলসিয়া যাইতে লাগিল। তিনি বিস্ময়াভিভূত হইয়া হযরত আব্বাস (রা)-কে জিজ্ঞাসা করিলেন, এই বাহিনী কাহাদের? তিনি বলিলেন, এই বাহিনী আনসারদিগের। এমন সময় পতাকাধারী আনসার নেতা হযরত সা'দ ইবন উবাদা (রা) আবূ সুফিয়ানকে দেখিতে পাইয়া বলিলেন :
اليوم يوم الملحمة اليوم تستحل الكعبة اليوم اذل الله قريشا. "আজ ভীষণ সংঘর্ষের দিন। আজ কা'বা প্রাঙ্গণে হত্যাকাণ্ড বৈধ বলিয়া বিবেচিত হইবে, আজ আল্লাহ কুরায়শদিগকে লাঞ্ছিত করিবেন"।
সর্বশেষে আগমন করিল মুহাজির বাহিনী। এই বাহিনীর পতাকা ছিল হযরত যুবায়র ইবনুল আওয়াম-এর হাতে। স্বয়ং রাসূলুল্লাহ (স)-ও এই দলেই অবস্থান করিতেছিলেন। তাঁহাকে দেখা মাত্র আবূ সুফিয়ান আর্তনাদ করিয়া উঠিলেন, ইয়া রাসূলাল্লাহ! আজ আপনি কি কুরায়শদিগকে ধ্বংস করিয়া ফেলিবেন? পবিত্র কা'বার মর্যাদা কি আজ বজায় থাকিবে না? সা'দ ইবন উবাদা কি বলিতেছে শুনুন। রাসূলুল্লাহ (স) বলিলেন, সা'দের কথা সঠিক নহে।
اليوم يوم المرحمة اليوم يعز الله قريشا ويعظم الله الكعبة. "আজ তো দয়া ও ক্ষমা প্রদর্শনের দিন। আজ আল্লাহ তা'আলা কুরায়শদেরকে সম্মানিত করিবেন এবং কা'বার মর্যাদা বৃদ্ধি করিবেন।"
অতঃপর তিনি সা'দ (রা)-কে ডাকিয়া পাঠাইলেন এবং তাঁহার হাত হইতে পতাকা নিয়া তৎপুত্র কায়স ইবন সা'দ (রা)-কে সোপর্দ করিলেন। তিনি এই ধারণায় ইহা করিলেন যে, ইসলামের পতাকা তৎপুত্র কায়স (রা)-কে প্রদানের অর্থ হইবে ইহাই যে, যেন পতাকা তাঁহার হাত হইতে ফেরত লওয়া হয় নাই (সহীহুল বুখারী, ২খ., পৃ. ৬৩১; ইব্‌ন হিশাম, পৃ. ৪০৩; যাদুল মা'আদ, ১খ., পৃ. ৪২৩)। আর এভাবেই একটি হরফের পরিবর্তন (الملحمة)-র পরিবর্তে (المرحمة) এবং এক হাতকে অপর হাত দ্বারা পরিবর্তন পূর্বক (যাহার একটি হাত পিতার এবং অপর হাতটি পুত্রের) তিনি সা'দ ইবন উবাদার (যাঁহার ঈমানী ও মুজাহিদ সুলভ কৃতিত্ব ও অবদান সূর্যের মত ভাস্বর) মনে এতটুকু আঘাত না দিয়া আবূ সুফিয়ানের (যাঁহার অন্তরকে প্রবোধ ও সান্ত্বনা প্রদানের দরকার ছিল) মন জয়ের উপকরণ এত বিজ্ঞোচিত পন্থায়, বরং বলা যায়, মু'জিযাসুলভ পন্থায় আঞ্জাম দিলেন যাহা হইতে উত্তম কোন পন্থার কথা কল্পনাও করা যাইত না। পিতার পরিবর্তে পুত্রকে এই পদ দান করিয়া আবু সুফিয়ানের অন্তরকে প্রবোধ দিলেন। অপর দিকে সা'দ ইবন উবাদা (রা)-কেও তিনি বিষণ্ণ ও মনঃক্ষন্ন দেখিতে চাহিতেছিলেন না, ইসলামের জন্য যিনি বিরাট খেদমত আঞ্জাম দিয়াছেন (নবীয়ে রহমত, বাংলা অনু., পৃ. ৩৪৯-৫০)।
রাসূলুল্লাহ (স) আবূ সুফিয়ানকে বলিয়া দিলেন, নিশ্চিন্ত থাক, ভয়ের কোন কারণ নাই। তুমি আমার পক্ষ হইতে মক্কাময় ঘোষণা করিয়া দাও :
১. যে কেহ অস্ত্র পরিত্যাগ পূর্বক মুসলমানদের নিকট আত্মসমর্পণ করিবে তাহাকে অভয় দেওয়া হইল।
২. যাহারা নিজেদের গৃহদ্বার বন্ধ করিয়া রাখিবে তাহাদেরও কোন ভয় নাই।'
৩. যে ব্যক্তি কা'বা প্রবেশ করিবে, সেও অভয়প্রাপ্ত।
৪. যাহারা আবু সুফিয়ানের গৃহে প্রবেশ করিবে তাহাদেরকেও নিরাপত্তা দেওয়া হইল। আবু সুফিয়ান এক মুহূর্তও বিলম্ব না করিয়া তীব্রবেগে দৌড়াইয়া মক্কায় প্রবেশ করিলেন এবং উচ্চস্বরে চীৎকার করিয়া বলিলেন, হে কুরায়শগণ! মুহাম্মাদ (স) সসৈন্যে আগমন করিয়াছেন। আজ তাঁহার সম্মুখীন হওয়ার ক্ষমতা কাহারও নাই। এই কথা শুনিবামাত্রই তাঁহার স্ত্রী হিন্দ দৌড়িয়া আসিয়া তাঁহার গোঁফ ধরিয়া টানিতে টানিতে বলিল, হে বানু কিনানা! তোমরা এই হতভাগা লোকটিকে হত্যা করিয়া ফেল। সে কি প্রলাপ বকিতেছে শুন। বহু লোক সমবেত হইয়া আবু সুফিয়ানকে বেষ্টন করিয়া দাঁড়াইল। তিনি বলিলেন, তোমরা শুনিয়া রাখ, আজ কোন শক্তিই মুহাম্মাদ (স)-এর সম্মুখীন হইতে সক্ষম হইবে না। যে ব্যক্তি আমার গৃহে প্রবেশ করিবে তাহাকে নিরাপত্তা দেওয়া হইবে। লোকেরা উত্তেজিত হইয়া বলিল, ওহে নির্বোধ! তোর ঘরে কয়টা লোকের সঙ্কুলান হইবে। তিনি বলিলেন, যে ব্যক্তি আপন গৃহের দরজা বন্ধ করিবে কিংবা কা'বা ঘরে প্রবেশ করিবে অথবা অস্ত্র পরিত্যাগ পূর্বক আত্মসমর্পণ করিবে সে অভয়প্রাপ্ত হইবে (ইবন হিশাম, পৃ. ৪০০; যাদুল মা'আদ, পৃ. ১৬৬)।
টিকাঃ
১. বুখারী শরিফে আবূ সুফিয়ান ইবন হারব এর ইসলাম গ্রহণের ঘটনাটি সংক্ষেপে উল্লিখিত হয়েছে। এখানে তার বিস্তারিত বিবরণ দেওয়া হলো।

📘 সীরাত বিশ্বকোষ > 📄 নগরে প্রবেশ

📄 নগরে প্রবেশ


মুসলিম বাহিনী চারিটি দলে বিভক্ত হইয়া চতুর্দিক হইতে মক্কা অধিকারের জন্য অগ্রসর হয়। মহানবী (স)-এর কঠোর নির্দেশ ছিল, সংঘর্ষের উপক্রম না হইলে তলোয়ার কোষমুক্ত করা যাইবে না। হযরত যুবায়র (রা)-কে উত্তরদিক হইতে, কায়েস ইবন সা'দ ইবন উবাদা আনসারীকে পশ্চিম দিক হইতে, হযরত খালিদ (রা)-কে দক্ষিণ দিক হইতে এবং হযরত আবু উবায়দা(রা)-কে মুহাজিরীনের সঙ্গে পূর্ব দিক হইতে মক্কা মুকাররমায় প্রবেশের নির্দেশ প্রদান করা হয়।
মক্কা নগর দুইটি পর্বত শ্রেণীর মধ্যস্থলে প্রস্তরময় স্থানে অবস্থিত। এই শহরের একদিকে উঁচু এবং অপর দিক ঢালু। 'কাদা' নামক পাহাড়ের দিকটি উঁচু। এই দিকেই মক্কার প্রসিদ্ধ কবরস্থান জান্নাতুল মু'আল্লা অবস্থিত। আর 'কুদা' নামক পাহাড়ের দিকটি নিচু। এই দিকেই পবিত্র কা'বাগৃহ অবস্থিত। উত্তরদিকে পর্বতশ্রেণী বিদ্যমান থাকার দরুন প্রাকৃতিকভাবেই মক্কা হইতে বহিরায়াতের দুইটি পথ আছে। আর একটি পথ উচ্চ মক্কা হইতে আরাফাতের দিকে, আর একটি পথ নিম্ন মক্কা হইতে কিয়দ্দুর অগ্রসর হইয়া একটি শাখা জিদ্দার দিকে এবং অপর একটি শাখা মদীনার দিকে চলিয়া গিয়াছে।
রাসূলুল্লাহ (স) উভয় পথেই সেনাবাহিনীকে নগরে প্রবেশ করা সমীচীন বলিয়া মনে করিলেন। তাই তিনি হযরত খালিদ ইবন ওয়ালীদ-এর নেতৃত্বাধীন আসলাম, গিফার, জুহায়না প্রভৃতি গোত্রীয় সেনবাহিনীকে 'কুদা' নামক পাহাড়ের দিক দিয়া নিম্ন মক্কার পথে নগরে প্রবেশ করিতে নির্দেশ দিলেন। স্বয়ং তিনি মক্কার উচ্চ এলাকা আযাখির-এ অবস্থান করিয়া সমগ্র মুসলিম বাহিনীকে পরিচালনা করিতেছিলেন। মক্কায় প্রবেশের জন্য বাহিনীর বিন্যাস এমনভাবে করা হইয়াছিল যেন চারিটি দলই একে অপরকে প্রয়োজনে সাহায্য করিতে পারে (ইসলামী বিশ্বকোষ, ২০শ, পৃ. ৯৬, ৯০৫)।
বস্তুত খালিদ (রা) ছিলেন মুসলিম বাহিনীর ডান বাহুর অধিনায়ক। রাসূলুল্লাহ (স) তাহাকে বলিয়া দিলেন, যদি কুরায়শগণ তোমাদের বিরুদ্ধে অস্ত্রধারণ করে তবে তাহাদিগকে তোমরা হত্যা করিও এবং সাফা পাহাড়ে আসিয়া আমার সহিত সাক্ষাৎ করিও। অন্যথায় কাহারও উপর তরবারি উঠাইও না (যাদুল মা'আদ, পৃ. ১৬৪; ইব্‌ন হিশাম, পৃ. ৪৩২)। রাসূলুল্লাহ (স)-এর সঙ্গী সেনাদল কাতারে কাতারে বীরপদভরে চলিতে লগিল। মক্কার রাস্তাঘাট আজ সম্পূর্ণ পরিষ্কার। কুরায়শগণ আজ ভীত-সন্ত্রস্ত হৃদয়ে নিরাপত্তা লাভের জন্য কা'বা গৃহে এবং আবু সুফিয়ানের বাড়ীতে সমবেত। আর অবশিষ্ট কুরায়শগণ দরজা বন্ধ করিয়া আপন আপন গৃহে অবস্থানরত। তাহাদের সমস্ত দর্প চূর্ণ-বিচূর্ণ হইয়া গিয়াছে। ইহা আল্লাহ্র কত বড় কৃপা। এই মহাদানের কৃতজ্ঞতায় রাসূলুল্লাহ (স)-এর মস্তক অবনত হইয়া পড়িল। তাই তিনি সকলের পশ্চাতে হযরত উসামা ইব্‌ন যায়দের সহিত একই উটের পৃষ্ঠে বসিয়া নীরবে অগ্রসর হইতে লাগিলেন। কী উদার নীতি ইসলামের! দাস-প্রভুর কোন পার্থক্য নাই! ইসলামে আছে শুধু দীনদারি ও পরহেজগারির মর্যাদা। বিজয় লাভের আমোদ-প্রমোদ নাই, আড়ম্বর নাই, গর্ব-অহংকার কোন কিছুই নাই। বিজয়রূপ মহাদানের কৃতজ্ঞতায় আজ রাসূলুল্লাহ (স) অবনত মস্তক। শত্রু-মিত্র সকলকে যিনি অকপটে ভালবাসেন, অপরাধীর অপরাধকে যিনি আনন্দের সহিত ক্ষমা করিতে পারেন, জয়-পরাজয়, মঙ্গল সব কিছুর মধ্যেই যিনি একমাত্র আল্লাহর করুণা অনুভব করেন, শুধু তাঁহার পক্ষেই এরূপ করা সম্ভব।
মক্কা নগরীতে প্রবেশ করিয়া রাসূলুল্লাহ (স) 'হাজুন' নামক স্থানে তাঁহার বিজয়-পতাকা উত্তোলনের নির্দেশ দিলেন। সেই স্থানেই তিনি শিবির সন্নিবেশ করিয়া কিছুক্ষণের জন্য বিশ্রাম গ্রহণ করিলেন। মহানবীর পতাকা ছিল যুবায়র ইব্‌ন আওয়ামের হাতে। এই অভিযানে রাসূলুল্লাহ (স)-এর সংগে ছিলেন উম্মুল মুমিনীন হযরত মায়মূনা এবং হযরত উম্মে সালামা (রা) (মুল্লা মাজদুদ্দীন, সীরাতে মুস্তাফা, পৃ. ৭২৫)।
হযরত খালিদ ইব্‌ন ওয়ালীদ (রা) নিম্ন মক্কার পথে নিশ্চিন্তে সৈন্যদিগকে লইয়া নগরে প্রবেশ করিতেছেন, রাহমাতুল্লিল আলামীন (স) মক্কাবাসীদিগকে নিরাপত্তা লাভের যে সুযোগ দান করিয়াছেন তাহাতে হযরত খালিদ মনে করিয়াছিলেন যে, আজ তরবারি কোষমুক্ত করিবার প্রয়োজন হইবে না। কিন্তু তাঁহার সেই আশা পূর্ণ হইল না। কারণ আবু জাহলের পুত্র ইকরামা, উমায়্যার পুত্র সাফওয়ান, আমরের পুত্র সুহায়ল প্রভৃতি কয়েকজন দুর্দান্ত কুরায়শ কিছু সংখ্যক দুষ্ট প্রকৃতির লোক সংগ্রহ করিয়া মুসলিম বাহিনীকে নগরে প্রবেশে বাধা প্রদানের জন্য 'খান্দামা' পাহাড়ের নিকট সমবেত হইল। হিমাস ইব্‌ন কায়স নামক এক পাপিষ্ঠ পূর্ব হইতেই অস্ত্রশস্ত্র সংগ্রহ করিয়া যুদ্ধের জন্য প্রস্তুত ছিল। সেও তাহাদের সহিত যোগদান করিল। ঘটনাক্রমে কুরয ইব্‌ন জাবির ফিহরী ও হুবায়স ইব্‌ন খালিদ আশ'আরী নামক দুইজন মুজাহিদ মুসলিম বাহিনী হইতে বিচ্ছিন্ন হইয়া পড়েন। কুরায়শের সেই দল বিচ্ছিন্ন অবস্থায় পাইয়া তাঁহাদিগকে শহীদ করিয়া ফেলিল। এই সংবাদ পাওয়া মাত্র খালিদ (রা) তাহাদিগকে আক্রমণ করেন। বারজন নিহত হওয়ার পর কুরায়শ দুর্বৃত্তগণ পলায়ন করিয়া প্রাণ বাঁচাইতে বাধ্য হয়। এইরূপে খালিদ (রা) বিজয়ী বেশে পবিত্র কা'বা প্রাঙ্গণে উপস্থিত হইলেন। খালিদের হাতে কুরায়শের কতিপয় ব্যক্তি নিহত হওয়ার কথা শুনিয়া রাসূলুল্লাহ (স) তাঁহাকে হত্যা করিবার কারণ জিজ্ঞাসা করিলেন। যখন জানিতে পারিলেন যে, কুরায়শগণই প্রথমে মুসলিম বাহিনীকে আক্রমণ করিয়াছিল তখন তিনি বলিলেন, "ইহাই আল্লাহ্র ইচ্ছা ছিল" (যাদুল মা'আদ, পৃ. ১৬৫; ইব্‌ন হিশাম, পৃ. ৪৩৩)।
দীর্ঘ একুশ বৎসর যাবৎ কুরায়শদের এই নিদারুণ নিগ্রহ ভোগ করিবার পরও আজ তাহাদের প্রতি রাসূলুল্লাহ (স) এত সদয় হইলেন কেন? এইজন্য আনসারদিগের মনে নানা প্রকার দুশ্চিন্তা উদয় হইতে লাগিল। তাঁহারা বলাবলি করিতে লাগিলেন, "স্বদেশ ও স্বগোত্রের ভালবাসা রাসূলুল্লাহ (স)-এর অন্তরের উপর প্রভাব বিস্তার করিয়া ফেলিয়াছে।” রাসূলুল্লাহ (স) মদীনা পরিত্যাগ করিয়া মক্কাতেই থাকিয়া যাইবেন এই সন্দেহ করিয়াই আনসারগণ উপরিউক্ত মন্তব্য করিয়াছিলেন। তাঁহাদের এই আলোচনার অব্যবহিত পরই রাসূলুল্লাহ (স)-এর নিকট ওহী অবতীর্ণ হওয়ার লক্ষণ দেখা দিল। ওহী অবতীর্ণ হওয়ার পর তিনি আনসারদিগকে সম্বোধন করিয়া বলিলেন, “হে আনাসার সম্প্রদায়! তোমরা বলিয়াছ, স্বদেশ ও স্বগোত্রের ভালবাসা রাসূলুল্লাহ (স)-এর অন্তরের উপর প্রভাব বিস্তার করিয়া ফেলিয়াছে। আল্লাহ্র কসম! তোমাদের এই ধারণা ঠিক নহে। আমি আল্লাহ্র বান্দা এবং তাঁহার রাসূল। আমি আল্লাহর দিকে এবং তোমাদের দিকে হিজরত করিয়াছি। আমার জীবন-মরণ সব কিছু তোমাদের সঙ্গে হইবে।” এই কথা শুনিয়া আনসারগণ কাঁদিতে কাঁদিতে আরয করিলেন, "ইয়া রাসূলুল্লাহ! আপনার বিচ্ছেদ আশঙ্কায় আমরা একথা বলিয়াছিলাম।” রাসূলুল্লাহ (স) বলিলেন, "আমার বিচ্ছেদ অসহনীয় হওয়ার দরুনই যে তোমরা একথা বলিয়াছ, আল্লাহ তা'আলাও আমাকে তাহা জানাইয়া দিয়াছেন। সুতরাং তোমরা নিরপরাধ" (আসাহ্হুস সিয়ার, পৃ. ১৯৯০, ২৫৮)।
নগরীতে/প্রবেশকালে কোন একজন সাহাবী রাসূলুল্লাহ (স)-কে জিজ্ঞাসা করিলেন, হুযূর! আপনি আপন পুরাতন বাড়ীতেই অবস্থান করিবেন, না অন্য কোন স্থানে? রাসূলুল্লাহ (স) বলিলেন, আকীল কি আমার বাড়ীঘর রাখিয়াছে? সে ত সবই শেষ করিয়া গিয়াছে (মাওলানা আশিক ইলাহী মীরাঠী, ইসলাম, পৃ. ৩২১)। ইন্‌শা আল্লাহ্ আমি খায়ফ নামক স্থানে অবস্থান করিব। এই স্থানে বসিয়া কাফিরগণ রাসূলুল্লাহ (স)-এর বিরুদ্ধে পরস্পর শপথ গ্রহণ করিয়াছিল এবং তাঁহাকে অন্তরীণ করিবার অঙ্গীকারপত্র লিপিবদ্ধ করিয়াছিল। এই স্থানে অবস্থান করিলে অতীতের স্মৃতি জাগরিত হইবে। এই উদ্দেশ্যেই তিনি এই স্থানটি অবস্থানের জন্য মনোনীত করিয়াছিলেন (মাওলানা শিবলী নু'মানী, সীরাতুন্নবী, ১খ., পৃ. ৫১৬)।
যে নগরবাসী একদিন হযরত মুহাম্মাদ (স)-কে অশেষ ভাবে নির্যাতন করিয়া অবশেষে তাঁহাকে দেশান্তরিত করিয়াছিল, যে নগরবাসী তাঁহার প্রাণ সংহার করিতে বদ্ধপরিকর ছিল, যে নগরবাসী একদিন তাঁহার প্রিয় শিষ্যগণকে নৃশংসভাবে উৎপীড়িত করিয়াছিল, সেই নগরবাসী আজ তাঁহার করুণাপ্রার্থী। একটি গৃহও ভূলুণ্ঠিত হইল না, একবিন্দু রক্তপাত হইল না, একটি নারী অপমানিতা বা লাঞ্ছিতা হইল না। ওয়াশিংটন আয়ারভিং সত্যই বলিয়াছেন, "এই জয় ধর্মের জয়, তরবারির জয় নহে” (মোবিনুদ্দিন আহমদ, নবীশ্রেষ্ঠ, তৃতীয় সংস্করণ, ১৯৮১)।
রাসূলুল্লাহ (স) বিনা রক্তপাতে আপন জন্মভূমিতে প্রবেশ করিলেন। রাসূলুল্লাহ (স) মক্কা ত্যাগের সময়ে মুনাজাত করিয়াছিলেন:
رَبِّ أَدْخِلْنِي مُدْخَلَ صِدْقٍ. (١٩٤٥)
অদ্য কি আনন্দের দিন! অদ্য তাঁহার সাধের প্রার্থনা সফল হইল।

📘 সীরাত বিশ্বকোষ > 📄 কা'বা গৃহে প্রবেশ

📄 কা'বা গৃহে প্রবেশ


যে স্থানে রাসূলুল্লাহ (স)-এর পতাকা উত্তোলিত হইয়াছিল সেই স্থালেই মসজিদে ফাতহ প্রতিষ্ঠিত হইয়াছে (মাজদুদ্দীন, পৃ. ৭২৫)। বিশ্রামের পর তিনি 'হাজুন'-এর শিবির হইতে বাহির হইয়া ভক্তবৃন্দ পরিবেষ্টিত অবস্থায় সূরা ফাতহ .إِنَّا فَتَحْنَا لَكَ فَتْحًا مُبِينًا
"নিশ্চয় আমি তোমাকে দিয়াছি সুস্পষ্ট বিজয়” (৪৮: ১) পাঠ ও "আল্লাহু আকবার” বলিতে বলিতে ধীরে ধীরে পবিত্র কা'বা গৃহের দিকে অগ্রসর হইতে লাগিলেন। কা'বা প্রাঙ্গণে উপস্থিত হইয়া তিনি সর্বপ্রথম হাজরে আসওয়াদকে চুম্বন করিলেন। অতঃপর তিনি ভক্তিভরে কা'বা শরীফের চতুর্দিকে সাতবার তাওয়াফ করিলেন। পবিত্র কা'বাগৃহের চতুষ্পার্শ্বে স্তরে স্তরে তিন শত ষাটটি মূর্তি প্রতিষ্ঠিত ছিল। রাসূলুল্লাহ (স) এই সকল মূর্তির সম্মুখে দণ্ডায়মান হইয়া হস্তস্থিত যষ্টি উত্তোলনপূর্বক বলিলেন:
جَاءَ الْحَقُّ وَزَهَقَ الْبَاطِلُ. "সত্য আসিয়াছে এবং মিথ্যা বিলুপ্ত হইয়াছে” (১৭:৮১)।
جَاءَ الْحَقُّ وَمَا يُبْدِئُ الْبَاطِلُ وَمَا يُعِيدُ. "সত্য আসিয়াছে এবং অসত্য না পারে নূতন কিছু সৃজন করিতে আর না পারে পুনরাবৃত্তি করিতে" (৩৪: ৪৯)।
এক রিওয়ায়াতে আছে যে, মক্কার অন্যান্য মূর্তিগুলিও সেদিনই ভাঙ্গিয়া ফেলা হইয়াছিল। সাফা ও মারওয়া পাহাড়দ্বয়ের উপর দুইটি প্রাচীন প্রস্তর মূর্তি ছিল। সাফায় অবস্থিত মূর্তিটির নাম ছিল ইসাফ, আর মারওয়াস্থিত মূর্তিটির নাম ছিল নায়িলা। কুরায়শদের বিশ্বাস ছিল যে, কোন এক সময়ে ইসাফ ছিল পুরুষ, আর নায়িলা ছিল নারী। ইহারা কা'বা গৃহের ভিতরে ব্যভিচার করার কারণে আল্লাহ্ তা'আলা তাহাদিগকে পাথরে পরিণত করেন। এতদসত্ত্বেও কুরায়শগণ ইহাদিগকে দেবতা বলিয়া ভক্তি করিত। সেদিন এই দুইটি পাপচিহ্নকেও চূর্ণ-বিচূর্ণ করিয়া দেওয়া হয় (আসাহ্হুস সিয়ার, পৃ. ২৫৯)।

লিঙ্ক শেয়ার করুন
close

লিঙ্ক কপি করুন

0:00
0:00