📄 খুযা'আর প্রতিনিধিবর্গ
রাসূলুল্লাহ (স) মসজিদে নব্বীতে অবস্থান করিতেছিলেন, এমন সময় হঠাৎ শুনিতে পাইলেন, মজলুম খুযা'আ গোত্রের কবি 'আমর ইবন সালিম করুণ কণ্ঠে এই লোকগাঁথা আবৃত্তি করিতেছেন:
ان قريشا اخلفوك الموعدا - ونقضوا ميثاقك المؤكدا. هم بيتونا بالوتير هجدا - وقتلونا ركعا وسجدا.
“হে মুহাম্মাদ! কুরায়শগণ আপনার সহিত বিশ্বাসঘাতকতা করিয়াছে। তাহারা আপনার সুদৃঢ় প্রতিজ্ঞাপত্রখানা বাতিল করিয়া দিয়াছে। তাহারা রাত্রির অন্ধকারে ওয়াতীর জলাশয়ের নিকটবর্তী স্থানে আমাদিগকে অতর্কিতে আক্রমণ করিয়াছে এবং আমাদিগকে রুকু ও সিজদারত অবস্থায় হত্যা করিয়াছে" (ইবনুল কায়্যিম, পৃ. ২৪৯; আল-ওয়াকিদী, আল-মাগাযী, ১৯৬৬ খৃ., ১খ., ৭৮৯; ইব্ন হিশাম, পৃ. ৩৯৪-৩৯৫)। 'আমর ইবন সালিম খুযা'ঈ কুরায়শ ও বানু বাক্সের অত্যাচারের সমস্ত ঘটনা বর্ণনা করিয়া প্রার্থনা করিল, হুযুর! আমরা ইসলাম গ্রহণ করিলাম; অতঃপর তাহারা আমাদের উপর আক্রমণ করিয়া নির্মমভাবে অত্যাচার করিয়াছে। তৎপর বলিল:
فانصر هداك الله نصرا ابدا.
"হে রাসূল! আপনি আমাদিগকে সাহায্য করুন। আল্লাহ তা'আলা সর্বদা আপনাকে পথ প্রদর্শন করিবেন" (ফাতহুল বারী, ৭খ., পৃ. ৬৬৫; Haykal, p. 397)। উপরিউক্ত ঘটনা হইতে মনে হয় যে,
১. কুরায়শ পক্ষ হাওয়াযিন ও ছাকীফ প্রভৃতি গোত্রগুলির সহিত ষড়যন্ত্রে লিপ্ত হইয়া মদীনা আক্রমণের জন্য প্রস্তুত হইতেছিল।
২. এই নিমিত্ত সন্ধি ভঙ্গ করিবার উদ্দেশ্যে তাহারা বানু বাক্সকে উপলক্ষ করিয়া খুযা'আদিগের উপর আক্রমণ করিয়াছিল।
৩. কুরায়শগণের সহিত পরামর্শ ও ষড়যন্ত্র করিয়া এবং তাহাদিগের সাহায্যে ও সাহচর্যে বানু বাক্স এই নির্মম অত্যাচার করিতে সমর্থ হইয়াছিল।
৪. সন্ধির শর্তানুসারে বানু বাক্সকে এই কার্যে কোন প্রকার সাহায্য ও উৎসাহ দান করা কুরায়শের পক্ষে আইনসঙ্গত ছিল না; বরং বানু বাক্স স্বতপ্রবৃত্ত হইয়া খুযা'আদিগকে হত্যা করিতে উদ্যত হইলে তাহাদিগকে বারণ করা অথবা তাহাদিগের সহিত সম্পর্ক ছিন্ন করিয়া মদীনায় সংবাদ প্রদান করা কুরায়শের পক্ষে একান্ত কর্তব্য ছিল। সুতরাং কুরায়শ পক্ষ ইচ্ছা পূর্বক সন্ধিভঙ্গ করিয়াছিল (মোস্তফা চরিত, ৪র্থ সংস্করণ, ১৯৭৫ খৃ., পৃ. ৭৮৬)।
খুযাঈ কবির মদীনা আগমনের কয়েক দিন পর বুদায়ল ইন্ন ওয়ারাকা চল্লিশজন খুযাঈকে সঙ্গে লইয়া রাসূলুল্লাহ (স)-এর খিদমতে হাযির হইল এবং তাঁহাকে সমস্ত ঘটনা শুনাইয়া প্রতিকার প্রার্থনা করিল। মহানবী (স) বিবেচনা করিলেন যে, চুক্তি অনুযায়ী এখন খুযা'আদিগকে সাহায্য করা তাঁহার কর্তব্য। এই নির্মম অত্যাচারের কাহিনী শুনিয়া রাসূলুল্লাহ (স) যারপর নাই দুঃখিত হইলেন। হুদায়বিয়ার সন্ধির শর্তানুসারে কুরায়শগণ কিংবা তাহাদের মিত্র বানু বাক্স মুসলমানদের মিত্র গোত্র খুযা'আদিগকে আক্রমণ করিতে পারে না। রাসূলুল্লাহ (স) বুঝিতে পারিলেন, সন্ধি ভঙ্গ করিবার জন্য ইচ্ছাকৃতভাবেই তাহারা এই আক্রমণ
চালাইয়াছিল। তথাপি তিনি তাহাদের বিরুদ্ধে সামরিক অভিযানে না যাইয়া প্রথমত তাহাদের নিকট দূত পাঠাইলেন। দূতের মারফত যে প্রস্তাব পাঠান হইল তাহা এই:
১. হয় তোমরা বানু খুযা'আ গোত্রকে উপযুক্ত রক্তপণ দিয়া এই অন্যায়ের প্রতিকার কর;
২. অথবা বানু বাক্স গোত্রের সহিত সকল সম্বন্ধ ছিন্ন কর;
৩. অথবা হুদায়বিয়ার সন্ধি বাতিল হইয়াছে বলিয়া ঘোষণা কর।
কুরায়শগণ পূর্ব হইতেই পরামর্শ করিয়া সন্ধি ভঙ্গ করিবার সিদ্ধান্ত করিয়া রাখিয়াছিল। কাজেই কুরায়শদের মুখপাত্র কারাতা ইব্ন উমার রাসূলুল্লাহ (স)-এর প্রেরিত দূতকে পরিষ্কার ভাষায় জানাইয়া দিল, আমরা শেষ শর্তটাই গ্রহণ করিলাম অর্থাৎ হুদায়বিয়ার সন্ধি বাতিল ঘোষণা করিলাম (যুরকানী, পৃ. ৩৪৯)। দূত মদীনায় ফিরিয়া আসিয়া রাসূলুল্লাহ (স)-কে সব কথা জানাইলেন। রাসূলুল্লাহ (স) তখন বুঝিতে পারিলেন, কুরায়শদের প্ররোচনায়ই বানু বাক্স এই সব কাণ্ড করিতে সাহসী হইয়াছে। এখন সামরিক অভিযান ছাড়া আর কোন উপায় নাই (যুরকানী, পৃ. ৩৪৯)। তখন তিনি অতি সন্তর্পণে মক্কা অভিযানের আয়োজন করিতে প্রবৃত্ত হইলেন। হযরত ঈসা (আ)-এর ভবিষ্যদ্বাণী পূর্ণ হওয়ার সময় সক্ষাগত হইল (যিশইয়, ২১ঃ ১১-১৬)।
📄 কুরায়শদের নূতন ফন্দী
এদিকে কুরায়শগণ ভাবিতে লাগিল, আমরা ইতোপূর্বে বহুবার মুসলমানদের সহিত শক্তি পরীক্ষা করিয়া দেখিয়াছি। যখন তাহারা দুর্বল ছিল, তাহাদের সংখ্যা কম ছিল, আর্থিক অনটনে ছিল তখনও যুদ্ধে আমাদের কোন সুফল ফলে নাই। আর আজ তাহাদের কোন অভাব-অনটন নাই, সংখ্যাও পূর্বাপেক্ষা অনেক বেশী। এমতাবস্থায় সন্ধি বাতিল করা ভাল হয় নাই। হয়ত শীঘ্রই মুসলমানগণ মক্কা আক্রমণ করিয়া বসিবে। এই আশঙ্কা তাহাদিগকে বিচলিত করিয়া তুলিল। তাই তাহারা পূর্ব সন্ধি বহাল করিবার জন্য আবূ সুফ্যানকে দূতরূপে মদীনায় প্রেরণ করিবার সিদ্ধান্ত করিল (যাদুল মা'আদ, পৃ. ১৫০)।
আবূ সুফ্যান মনে করিলেন, বানু খুযাআ গোত্রের হত্যাকাণ্ডের সংবাদ হয়ত এখনও মদীনায় পৌঁছে নাই। কাজেই মেয়াদ বাড়াইয়া হুদায়বিয়ার সন্ধিকে নূতনভাবে সুদৃঢ় করিয়া লইতে আর কোন অন্তরায় নাই। তাই আবূ সুফ্যান মুসলমানদিগকে প্রতারিত করিয়া স্বীয় সংকল্পে কৃতকার্য হইবার প্রাণভরা আশা লইয়া অবিলম্বে মদীনাভিমুখে রওয়ানা করিলেন (যাদুল মা'আদ, পৃ. ১৫০)। তিনি মদীনায় পৌছিয়া'সর্বপ্রথম তাহার কন্যা উম্মুল মুমিনীন হযরত উম্মে হাবীবা (রা)-এর গৃহে প্রবেশ করিলেন। হযরত উম্মে হাবীবা (রা) পিতাকে দেখিয়া তড়িঘড়ি করিয়া বিছানা গুটাইয়া রাখিলেন। আবূ সুফ্যান বলিলেন, "তুমি বিছানা গুটাইলে কেন? আমি এই বিছানায় বসিবার উপযুক্ত নহি, না এই বিছানাটি আমার উপযুক্ত নহে”? হযরত উম্মে হাবীবা (রা) বলিলেন, "হে পিতা! আপনি অপবিত্র কাফির, রাসূলুল্লাহ (স)-এর বিছানায়
বসিবার উপযুক্ত নহেন। এইজন্যই আমি বিছানাখানি সরাইয়া রাখিলাম (যাদুল মা'আদ, পৃ. ১৫০)।
এই কথা শুনিয়া আবু সুফ্যান মনক্ষুণ্ণ হইয়া বাহির হইয়া গিয়া মসজিদে নববীতে রাসূলুল্লাহ (স)-এর সহিত সাক্ষাত করিলেন এবং আগমনের উদ্দেশ্য বর্ণনা করিলেন। রাসূলুল্লাহ (স) বলিলেন, কোন নূতন ঘটনা ঘটিয়াছে নাকি? তিনি বলিলেন, না। রাসূলুল্লাহ (স) বলিলেন, "তবে সন্ধি সম্পর্কে আলোচনা করিবার প্রয়োজন কি"? তিনি ইহার কোন সদুত্তর দিতে ব্যর্থ হইয়া যথাক্রমে হযরত আবূ বাক্স (রা), হযরত উমার (রা) ও হযরত আলী (রা)-এর সহিত এই বিষয়ে আলোচনা করিলেন। কিন্তু ইহাতেও কোন ফল হইল না। অতঃপর তিনি হযরত ফাতিমা (রা)-এর নিকট বলিলেন, আপনি আপনার শিশুপুত্র হযরত হাসান (রা)-কে বলিয়া দিন, তিনি যেন নিজের দায়িত্বে কুরায়শদিগকে নিরাপত্তা দান করেন”। হযরত ফাতিমা বলিলেন, "আমার শিশুপুত্র রাসূলুল্লাহ (স)-এর সম্মুখে নিরাপত্তা দানের দায়িত্ব গ্রহণ করিতে পারে না"। তৎপর আবূ সুফ্যান হযরত আলী (রা)-কে বলিলেন, "হুদায়বিয়ার সন্ধি নবায়ন করিবার জন্য আপনি মুহাম্মাদ (স)-এর নিকট সুপারিশ করুন”। তিনি আবূ সুফ্যানকে উপহাস করিয়া বলিলেন, "তুমিই ত বানু কিনানার সরদার। আবার অন্যের সুপারিশের প্রয়োজন কি? তুমি নিজেই সন্ধি নবায়ন করিবার ঘোষণা করিয়া দাও"। আবূ সুফ্যান বলিলেন, ইহাতে কোন কাজ হইবে কি? হযরত আলী (রা) বলিলেন, কাজ না হইলেই বা কি করিবে। ইহা ছাড়া আর কোন উপায়ও দেখি না। তৎপর আবু সুফয়ান মসজিদ প্রাঙ্গণে দাঁড়াইয়া ঘোষণা করিলেন, মদীনা বাসীগণ, শোন! আমি হুদায়বিয়ার সন্ধিকে পুনঃবলবৎ ও সুদৃঢ় করিয়া গেলাম। অতঃপর তিনি মদীনা হইতে মক্কার দিকে প্রস্থান করিলেন (ইব্ন হিশাম, আস-সীরাহ, ২খ., পৃ. ৩৯৬-৩৯৭)।
আবু সুফ্য়ান মক্কা পৌছিলে কুরায়শগণ সমবেত হইয়া তাহাকে জিজ্ঞাসা করিল, আপনি কি করিয়া আসিয়াছেন? তিনি সমস্ত ঘটনা খুলিয়া বলিলেন। কুরায়শগণ বলিল, মুহাম্মাদ (স) আপনার কথা মঞ্জুর করিয়াছেন কি? তিনি বলিল, না। তখন তাহারা বলিল, হযরত আলী (রা) যে আপনার সহিত উপহাস করিয়াছেন তাহাও আপনি বুঝিতে পারিলেন না? তিনি কসম করিয়া বলিলেন, উপহাস হউক বা যথার্থ হউক, কিন্তু আমি যাহা করিয়া আসিয়াছি তাহা ছাড়া আর কিছু করিবার কোন উপায়ই ছিল না। তখন কুরায়শগণ বলিল, আবু সুফ্য়ান সন্ধি বলবৎ হওয়ার সংবাদ লইয়া আসিলে আমরা নিশ্চিন্ত হইতে পারিতাম। আর যুদ্ধের সংবাদ আনিলেও আমরা প্রস্তুত হইতে পারিতাম্। কিন্তু তিনি অযথা মদীনায় গমন করিয়াছেন, কোন সংবাদই আনিতে সক্ষম হন নাই (মাওলানা শিবলী নু'মানী; সীরাতুন্নবী, ১খ., পৃ. ৫১১)। আবূ সুফ্য়ানের কোন উদ্দেশ্যই সফল হয় নাই (ইসলামী বিশ্বকোষ, ২০ খ., পৃ. ৭০৫)।
কুরায়শগণ তখন অন্তসারশূন্য অবস্থায় উপনীত। মুখে দন্ত-দর্প এবং অভিমান ও আত্মম্ভরিতা যথেষ্ট থাকিলেও নিজেদের মনে করিবার মত শক্তি তখন আর তাহাদের ছিল না।
সর্বাপেক্ষা গুরুতর কথা এই যে, মক্কার অধিবাসীদের মধ্যে অনেকে কুরায়শের অগোচরেই মুস্তফা চরিত্বের প্রতি আকৃষ্ট হইয় গিয়াছিল। মক্কার নিকটবর্তী দুর্ধর্ষ আরবগণ হুদায়বিয়ার সন্ধি ও তাহার পরের বৎসরের উমরা উপলক্ষে মহানবী (স)-এর যেটুকু পরিচয় পাইয়াছিল তাহাতেই তাহারা কুরায়শের প্রবঞ্চনা ও স্বার্থপরতার বিষয় কিছু পরিমাণে অবগত হয়। কাজেই কুরায়শদের অঙ্গুলি সংকেত মাত্র বেদুঈন আরবের হাজার হাজার ফৌজ প্রস্তুত হইয়া যাওয়া এখন আর সম্ভবপর ছিল না। উল্লেখ্য যে, হাওয়াযিন ও ছাকীফের লোকেরা নিজেদের দেশ ছাড়িয়া মক্কাবাসীদের সাহায্যার্থে অগ্রসর হইতে প্রস্তুত নহে। এই সংবাদ জানিবার পরই আবু সুফ্যান মদীনায় গমন করিয়াছিলেন (মোস্তফা চরিত, পৃ. ৭৯০)।
📄 সমরায়োজন
রাসূলুল্লাহ (স) মুসলমানদিগকে যুদ্ধ প্রস্তুতির নির্দেশ দিলেন। অতি সতর্কতার সহিত যুদ্ধের আয়োজন চলিতে লাগিল। সমস্ত পরিকল্পনা গোপন রাখিয়া তিনি সৈন্য সংগ্রহে মনোনিবেশ করিলেন। এমনকি প্রথমে হযরত আবূ বাক্সও কিছুই জানিতে পারেন নাই। এই অভিযানের সংবাদ যাহাতে বাহিরে পৌঁছিতে না পারে সেজন্য কয়েক দিনের জন্য বিদেশী লোকদিগের বর্হিগমন নিষিদ্ধ ঘোষিত হইল (মোস্তফা চরিত, পৃ. ৭৮৭)। তিনি মুসলমান গোত্রসমূহের মধ্যে ঘোষণা করিয়া দিলেন:
مَنْ كَانَ يُؤْمِنُ بِاللَّهِ وَالْيَوْمِ الْآخِرِ فَيُحْضِرْ رَمَضَانَ بِالْمَدِينَةِ. “যে ব্যক্তি আল্লাহ এবং পরকালের প্রতি ঈমান আন'য়ন করিয়াছে সে যেন রমযান মাসে মদীনায় উপস্থিত থাকে” (মৌলভী মুহাম্মাদ আহসান, তাফরীহুল আযকিয়া ফী আহওয়ালিল আম্বিয়া, ২খ., পৃ. ২৬৬)।
এই ঘোষণার ফলে আসলাম, গিফার, মুযায়না, আশজা, জুহায়না প্রভৃতি গোত্রের বহুসংখ্যক সৈন্য আসিয়া মদীনায় সমবেত হইল। অভিযানের সংবাদ যাহাতে মক্কায় পৌঁছিতে না পারে তজ্জন্য তিনি পূর্ণ ব্যবস্থা অবলম্বন করিলেন। হযরত আবূ বাক্স (রা) একদিন আসিয়া দেখিতে পাইলেন যে, উম্মুল মুমিনীন হযরত আইশা (র) রাসূলুল্লাহ (স)-এর যুদ্ধাস্ত্রসমূহ বাহির করিতেছেন। তিনি তাঁহাকে জিজ্ঞাসা করিলেন, রাসূলুল্লাহ (স) কাহার বিরুদ্ধে যুদ্ধযাত্রা করিবেন তাহা তুমি বলিতে পার কি? তিনি বলিলেন, আমি তাহা জানি না (ইন্ন হিশাম, পৃ. ৩৮৯)। এত কঠোরভাবে যুদ্ধের আয়োজন গোপন রাখার কারণ আর কিছুই নহে, মক্কাবাসিগণ অভিযানের সংবাদ জানিতে পারিলে তাহারাও বিপুলভাবে সমরায়োজন করিবে, ফলে পবিত্র কা'বা গৃহের প্রাঙ্গণে একটা ভীষণ রক্তারক্তি কাণ্ড ঘটিবে। অথচ আল্লাহ্ ঘরের মর্যাদাহানি রাসূলুল্লাহ (স)-এর অভিপ্রেত ছিল না। তিনি চাহিয়াছিলেন, শত্রুদের প্রাণ রক্ষা করিতে এবং পবিত্র স্থানের মর্যাদা অক্ষুণ্ণ রাখিতে। এজন্যই তিনি মক্কাবাসীকে প্রস্তুত হওয়ার সুযোগ দেন নাই। তিনি শুধু সতর্কতা অবলম্বন করিয়াই ক্ষান্ত হন নই, বরং আল্লাহ্র দরবারেও মুনাজাত করিলেন:
اللَّهُمَّ خُذِ الْعُيُونَ وَالأَخْبَارَ عَنْ قُرَيْشٍ حَتَّى نَبْغَتُهَا فِي بِلادِهَا . “হে আল্লাহ! যে পর্যন্ত না আমরা কুরায়শদের দেশে গিয়া হঠাৎ তাহাদের সম্মুখে উপস্থিত হই সে পর্যন্ত তাহাদের নিকট যুদ্ধবার্তা এবং গুপ্তচর পৌঁছিতে দিও না" (ইবন হিশাম, পৃ. ৩৮৯)।
📄 হাতিবের পত্র প্রেরণ
মক্কার কাফিররা হুদায়বিয়ার সন্ধি চুক্তি ভঙ্গ করায় রাসূলুল্লাহ (স) কাফিরদের বিরুদ্ধে অভিযান পরিচালনার প্রস্তুতি নিতেছিলেন। তাঁহার আন্তরিক আকাঙ্ক্ষা ছিল যে, এই তথ্য পূর্বাহ্নে মক্কাবাসীদের কাছে ফাঁস না হউক। সর্বপ্রথম হিজরতকারীদের অন্যতম সাহাবী ছিলেন হাতিব ইব্ন আবী বাল্তা'আ (রা)। তিনি ছিলেন ইয়ামানী বংশোদ্ভূত এবং মক্কায় আসিয়া বসবাস করিতেছিলেন। মক্কায় তাহার স্বগোত্র বলিতে কেহই ছিল না। মক্কায় বসবাস কালেই তিনি মুসলমান হইয়া মদীনায় হিজরত করিয়াছিলেন। তাহার স্ত্রী ও সন্তানগণ তখনও মক্কায় ছিল। রাসূলুল্লাহ (স) ও অনেক সাহাবীর হিজরতের পর মক্কায় বসবাসকারী মুসলমানদের উপর কুরায়শরা অমানুষিক নির্যাতন চালাইত। যেই সকল মুহাজিরের আত্মীয় স্বজন মক্কায় ছিল তাহাদের সন্তান-সন্ততিগণ কোন রকম নিরাপদে ছিল। হাতিব (রা) চিন্তা করিলেন যে, তাঁহার সন্তানদিগকে শত্রুর নির্যাতন হইতে রক্ষা করিবার কেহই নাই। অতএব মক্কাবাসীদের প্রতি কিছু অনুগ্রহ প্রদর্শন করিলে তাহারা হয়ত তাহার সন্তানদের উপর জুলুম করিবে না। তাই উম্মে সারা নাম্নী গায়িকার মক্কা গমনকে তিনি একটি সুবর্ণ সুযোগ হিসাবে গ্রহণ করিলেন (কানযুল উম্মাল, ৫খ, পৃ. ২৯৯)। উম্মে সারা বদরের যুদ্ধের পরে মক্কা বিজয়ের পূর্বে প্রথমে মদীনায় আগমন করে। রাসূলুল্লাহ (স) তাহাকে জিজ্ঞাসা করিলেনঃ তুমি কি মদীনায় হিজরত করিয়া আসিয়াছ? সে বলিল, না। আবার জিজ্ঞাসা করা হইলঃ তবে কি তুমি মুসলমান হইয়া আসিয়াছ? সে ইহারও নেতিবাচক উত্তর দিল। রাসূলুল্লাহ (স) বলিলেনঃ তাহা হইলে কি উদ্দেশ্যে আগমন করিয়াছ? সে বলিল, আপনারা মক্কার সম্ভ্রান্ত পরিবারের লোক ছিলেন। আপনাদের নিকট হইতে জীবিকা নির্বাহ করিতাম। এখন মক্কার বড় বড় সরদাররা বদর যুদ্ধে নিহত হইয়াছে এবং আপনারা এখানে চলিয়া আসিয়াছেন। ফলে আমার জীবিকা নির্বাহ কঠিন হইয়া গিয়াছে। আমি ঘোর বিপদে পড়িয়া ও অভাবগ্রস্ত হইয়া আপনাদের নিকট হইতে সাহায্য লাভের উদ্দেশ্যে মদীনায় আগমন করিয়াছি (তাফরীহুল আযকিয়া ফী আহওয়ালিল আম্বিয়া, ২খ., পৃ. ২৬৬)।
তখন রাসূলুল্লাহ (স) আবদুল মুত্তালিব বংশের লোকদিগকে তাহাকে সাহায্য করিবার জন্য উৎসাহ দিলেন। তাহারা তাহাকে নগদ টাকা-পয়সা, পোশাক-পরিচ্ছদ ইত্যাদি দান করিলেন। উম্মে সারা মক্কায় রওয়ানা করিল (তাফসীর কুরতুবী; তাফসীর মাআরিফুল কুরআন, মুফতী মুহাম্মদ শাফীকৃত, বাংলা অনুবাদ, পৃ. ১৩৫৮)।
হাতিব (রা) নিশ্চিত বিশ্বাসী ছিলেন যে, রাসূলুল্লাহ (স)-কে আল্লাহ তা'আলা বিজয় দান করিবেন। তাই এই অভিযান সম্পর্কিত তথ্য ফাঁস করিয়া দিলে তাঁহার কিংবা ইসলামের কোন ক্ষতি হইবে না। তিনি ভাবিলেন, আমি যদি পত্র লিখিয়া মক্কার কুরায়শদেরকে জানাইয়া দেই যে, রাসূলুল্লাহ (স) তোমাদের বিরুদ্ধে অভিযান পরিচালনা করিবার ইচ্ছা রাখেন, তাহা হইলে আমার সন্তানাদির হিফাযতের একটা ব্যবস্থা হইয়া যাইবে। সুতরাং হাতিব এই ভুলটি করিয়া ফেলিলেন এবং মক্কাবাসীদের নামে একটি পত্র লিখিয়া গায়িকা উম্মে সারার হাতে সোপর্দ করিলেন (কুরতুবী, মাযহারী) এবং ইহার পারিশ্রমিক বাবদ সারাকে দশ দিরহাম দিলেন (তাফরীহুল আযকিয়া, ২খ., পৃ. ২৬৭)। এদিকে রাসূলুল্লাহ (স)-কে আল্লাহ তা'আলা এই সংবাদ জানাইয়া দিলেন। তিনি অবিলম্বে হযরত আলী (রা), হযরত যুবায়র ও হযরত মিকদাদ (রা)-কে ডাকিয়া বলিলেন, তোমরা শীঘ্র যাও! খাখ নামক স্থানে পৌঁছিয়া তোমরা উম্মে সারা নামক এক স্ত্রীলোককে দেখিতে পাইবে। তাহার নিকট একটি পত্র আছে, সেই পত্র উদ্ধার করিয়া লইয়া আসিও। আদেশ শ্রবণ মাত্র তাঁহারা অশ্বারোহণ পূর্বক দ্রুত গতিতে খাখ অভিমুখে রওয়ানা করিলেন। তথায় পৌঁছিয়া সত্য সত্যই তাঁহারা রাসূলুল্লাহ (স)-এর নির্দেশিত স্ত্রীলোকটিকে দেখিতে পাইলেন। কিন্তু স্ত্রীলোকটি পত্রের কথা অস্বীকার করিল। তাঁহারা তাহার উটকে বসাইয়া দিলেন। হযরত আলী (রা) উলঙ্গ তরবারি হাতে লইয়া বলিলেন, "রাসূলুল্লাহ (স)-এর কথা ভুল হইতে পারে না। নিশ্চয় তোমার নিকট পত্র আছে, অতি সত্বর বাহির কর। অন্যথায় এখনই আমি তোমাকে দ্বিখণ্ডিত করিয়া ফেলিব।" স্ত্রীলোকটি ভীত হইয়া কাঁপিতে ঝাঁপিতে তাহার চুলের খোঁপার ভিতর হইতে পত্র বাহির করিয়া দিল। তাহারা পত্রসহ দ্বায়ীকে লইয়া মদীনায় ফিরিয়া আসিলেন এবং তাহা রাসূলুল্লাহ (স)-এর খিদমতে পেশ করিলেন।
যথাসময়ে অপরাধীরূপে হযরত হাতিব ইব্ন আবী বালতা'আকে রাসূলুল্লাহ্ (স)-এর দরবারে হাজির করা হইল। রাসূলুল্লাহ (স) তাহাকে জিজ্ঞাসা করিলেন, "হাতিব! মুসলমান হইয়া তোমার কাফিরদের সহিত গুপ্ত ষড়যন্ত্রে লিপ্ত হওয়ার কারণ কি?" হাতিব অকপটে সকল কথা ব্যক্ত করিলেন। নিজ পরিবারের নিরাপত্তার জন্যই যে তিনি এই কাজ করিতে বাধ্য হইয়াছেন, ইহা ছাড়া তাহার অন্তরে যে অন্য কোন দুরভিসন্ধি নাই, তিনি অতি সরলভাবে এই কথা রাসূলুল্লাহ (স)-এর নিকট প্রকাশ করিলেন। হাতিবের অকপট যবানবন্দি শুনিয়া রাসূলুল্লাহ (স) বলিলেন, "হাতিব সত্য কথা বলিয়াছে"। হযরত উমার (রা) এ ব্যাপারে হাতিবের উপর অত্যন্ত ক্রুদ্ধ হইয়া পড়িয়াছিলেন। তিনি রাসূলুল্লাহ (স)-কে বলিলেন, ইয়া রাসূলাল্লাহ! আপনি অনুমতি দিন, আমি তাহার শিরশ্ছেদ করি। রাসূলুল্লাহ (স) বলিলেন, "উমার! হাতিব বদর যুদ্ধে অংশ গ্রহণ করিয়াছে। আল্লাহ্র দরবারে বদরের মুজাহিদগণের কত বড় মর্যাদা তাহা কি তুমি জান? হয়ত আল্লাহ তা'আলা তাহাদের অন্তরের কথা অবগত হইয়া তাহাদিগকে বলিয়া দিয়াছেন, "যাহা ইচ্ছা কর। আল্লাহ তা'আলা তোমাদিগকে ক্ষমা করিয়া দিয়াছেন"। এই কথা শুনিয়া হযরত উমার (রা)-এর প্রাণ বিগলিত হইয়া উঠিল। তাঁহার নয়ন যুগল হইতে দরদর করিয়া অশ্রুধারা প্রবাহিত হইতে লাগিল। তিনি বলিলেন, আল্লাহ ও তাঁহার রাসূল বেশি জানেন (যাদুল মা'আদ, ১খ., পৃ. ৪২০ ও সিহাহ সিত্তা)। মোটকথা, রাসূলুল্লাহ (স) হাতিবের বর্ণনা
সত্য বলিয়া বিশ্বাস করিলেন এবং তাহাকে ক্ষমা করিয়া দিলেন (সীরাত ইব্ن হিশাম, পৃ. ৩৯৮-৯৯)। আল্লাহ পাক পবিত্র কুরআনে ইরশাদ করেন: يَاأَيُّهَا الَّذِينَ آمَنُوا لَا تَتَّخِذُوا عَدُوِّى وَعَدُوكُمْ أَوْلِيَاءَ تُلْقُونَ إِلَيْهِمْ بِالْمَوَدَّةِ. "হে মুমিনগণ! আমার শত্রু ও তোমাদিগের শত্রুকে বন্ধুরূপে গ্রহণ করিও না। তোমরা কি উহাদিগের প্রতি বন্ধুত্বের বার্তা প্রেরণ করিতেছ” (৬০: ১)।
উক্ত আয়াতে এই ধরনের ঘটনার জন্য হুঁশিয়ারি প্রদান করা হয়।