📘 সীরাত বিশ্বকোষ > 📄 সমুদ্র হইতে কাফেলার 'আম্বার' (তিমি মাছ) লাভ

📄 সমুদ্র হইতে কাফেলার 'আম্বার' (তিমি মাছ) লাভ


খাদ্যসংকট যখন তীব্র হইতে তীব্রতর হইল, তখন সাহাবায়ে কিরাম (রা) সমুদ্র হইতে আল-আনবার নামক প্রকাণ্ড একটি মাছ লাভ করিলেন। এই সম্পর্কে সহীহ বুখারীর রিওয়ায়াতটি নিম্নরূপ:
عن عمرو بن دينار قال سمعت جابر بن عبد الله يقول بعثنا رسول الله ﷺ ثلث مأة راكب اميرنا ابو عبيدة بن الجرح نرصد عير قريش فاقمنا بالساحل نصف شهر فاصابنا جوع شديد حتى اكلنا الخبط فسمى الجيش جيش الخبط فالقي لنا البحر دابة يقال لها العذبر فاكلنا منه نصف شهر وادَّهَنَّا من ودكه حتى ثابث الينا اجسامنا فاخذ ابو عبيدة ضلعا من اعضائه فنصبه فعمد الى اطوال رجل معه قال سفيان مرة ضلعا من اضلاعه فنصبه واخذ رجلا وبعيرا فمر تحته.
"আমর ইব্‌ন দীনার (র) বলেন, জাবির ইব্‌ন আবদিল্লাহ (রা)-কে আমি বলিতে শুনিয়াছি, রাসূলুল্লাহ (স) আমাদের তিন শত সদস্যের একটি মুজাহিদ দল প্রেরণ করিলেন। আমাদের আমীর ছিলেন আবূ উবায়দা ইবনুল জাররাহ (রা)। আমরা কুরায়শদের একটি কাফেলার অপেক্ষায় ছিলাম। এই উদ্দেশ্যে আমরা অর্ধমাস অপেক্ষমান ছিলাম। যখন আমরা চরম ক্ষুধার সম্মুখীন হইলাম তখন আমরা গাছের পাতা ভক্ষণ করিতে বাধ্য হইলাম। ফলে এই কাফেলার নামকরণ জায়শুল খাবত হইয়া গেল। এই সময় সমুদ্র একটি প্রাণী আমাদের প্রতি নিক্ষেপ করিল যাহাকে আল-'আনবার (তিমি) বলা হইত। আমরা উহা হইতে অর্ধ মাস খাদ্য গ্রহণ করিলাম এবং উহার চর্বি হইতে তৈলের কাজ সম্পাদন করিলাম। ফলে আমাদের শারীরিক দুর্বলতা তখন কাটিয়া উঠিল। আবূ উবায়দা (রা) উহার পাঁজরের একটি হাড় দণ্ডায়মান করিলেন। অতঃপর কাফেলার সর্বাধিক দীর্ঘ দেহের লোকটি তাহার নিচ দিয়া গমন করিলেন। বর্ণনাকারী সুফয়ান (র)-এর বর্ণনায় আছে, 'আনবারটির পাঁজরের হাড়সমূহের একটি হাড় দণ্ডায়মান করাইলেন, অতঃপর হাওদাসহ একটি উট উহার নিচ দিয়া অতিক্রম করিয়া গিয়াছিল' (বুখারী, ২খ., পৃ. ৬১৫: মুসলিম, সায়দ, বাব ১৭-১৮; নাসাঈ সায়দ, বাব ৩৫; মুসনাদ আহমাদ, ৩খ., পৃ. ৩০৯ ও ৩১১)।
সহীহ বুখারীর রিওয়ায়াত হইতে নিশ্চিত হওয়া যায় যে, ইহা সামুদ্রিক প্রকাণ্ড একটি মাছ ছিল। হযরত জাবির ইবন আবদিল্লাহ (রা)-এর একটি রিওয়ায়াতে রহিয়াছে:
فاذا حوت مثل الظريب
"ক্ষুদ্র পাহাড়ের ন্যায় একটি মাছ দেখা গেল" (সহীহ বুখারী, প্রাগুক্ত)। এই প্রকাণ্ড মাছটি মৃত ছিল। যেমন বুখারীর একটি রিওয়ায়াতে রহিয়াছে حوتا میتا لم نر مثله "উহা একটি মৃত মাছ ছিল, ইতোপূর্বে এত প্রকাণ্ড মাছ আমরা দেখি নাই” (বুখারী, প্রাগুক্ত)। সর্বোচ্চ উটের উপর বসিয়া সর্বোচ্চ যেই লোকটি দণ্ডায়মান পাঁজবের নিম্নদেশ দিয়া অতিক্রম করিয়াছিলেন তিনি ছিলেন কায়স ইন্ন সা'দ ইবন উবাদা (রা)। অতিক্রমকালে তাঁহার মাথাটিও নত করিবার প্রয়োজন হয় নাই (হালাবী, প্রাগুক্ত)।
এই মাছটি হইতে কাফেলা মোট কতদিন খাদ্য গ্রহণ করিয়াছিল, সেই সম্পর্কে স্থির কোন অভিমত পাওয়া যায় না। সহীহ বুখারীর রিওয়ায়াতে দুই ধরনের উক্তি রহিয়াছে। একটিতে বলা হইয়াছে, আঠার দিন কাফেলা উহা হইতে খাদ্য গ্রহণ করিয়াছিল। অপর বর্ণনায় রহিয়াছে, আমরা উহা হইতে অর্ধমাস খাদ্য গ্রহণ করিয়াছিলাম। আবূ যুবায়রের বর্ণনায় রহিয়াছে, আমরা উহা খাইয়া একমাস জীবন অতিবাহিত করিয়াছিলাম। উহার সমাধান কল্পে আহমাদ আলী সাহারানপুরী ফাতহুল বারী গ্রন্থের বরাতে বলেন, আঠার দিনের উক্তিটি সর্বাধিক গ্রহণযোগ্য। যাহারা অর্ধমাস বলিয়াছেন তাহারা পনের সংখ্যার উপরের উর্ধ্ব তিনটি সংখ্যা বাদ দিয়া বলিয়াছেন। আর যাহারা এক মাসের কথা বলিয়াছেন তাহারা মাছটি প্রাপ্তির পূর্ব কালীন সময়টুকুও উহার সহিত মিলাইয়া বর্ণনা করিয়াছেন (পাদটীকা, সহীহ বুখারী, প্রাগুক্ত, টীকা নং ১৫)।
আত-তাওশীহ গ্রন্থে বলা হইয়াছে, 'আনবার বড় একটি মাছ যাহার বিষ্ঠা সুগন্ধিযুক্ত। কেহ কেহ বলিয়াছেন, উহার পেটের দৈর্ঘ্য পঞ্চাশ হাত (সহীহ বুখারী, প্রাগুক্ত, ২খ., পৃ. ৬২২, পাদটীকা নং ২)।
সীরাতবিদ হালাবী ইমাম শাফি'ঈ (র)-এর উদ্ধৃতি দিয়া বলেন, তিনি জনৈক লোককে বলিতে শুনিয়াছেন, 'আনবার একটি জলজ উৎপন্ন দ্রব্য। তিনি উহা সমুদ্রে উৎপন্ন হইতে দেখিয়াছেন, যাহা বকরীর ঘাড়ের ন্যায় বর্গাকৃতির। এই উৎপন্নজাত বস্তুটিকে সামুদ্রিক একটি প্রাণী ভক্ষণ করে, যাহা মূলত উহার জন্য বিষ। উহা ভক্ষণ করিবার পর প্রাণীটি মারা যায়। অতঃপর সমুদ্রের তরঙ্গাভিঘাতে তাহা উপকূলবর্তী চরে পতিত হয়। উহার পেট হইতে 'আনবার সুগন্ধি বাহির হয়।” যেহেতু এই প্রাণীটি 'আনবার ভক্ষণ করে, ফলে উহার নাম 'আনবার হিসাবে খ্যাতি লাভ করিয়াছে (হালাবী, প্রাগুক্ত)। আবু উবায়দা (রা) হইতে বর্ণিত আছে, আমরা মদীনায় ফিরিয়া আসিবার পর রাসূলুল্লাহ (স)-এর নিকট 'আনবারের বিষয়টি আলোচিত হইলে তিনি বলিয়াছিলেন, উহা ছিল আল্লাহর পক্ষ হইতে দেওয়া তোমাদের জন্য রিযিক। অতঃপর তিনি উহা হইতে কিছু ভক্ষণ করেন। এই সম্পর্কে সহীহ বুখারীর রিওয়ায়াত হইল:
فلما قدمنا المدينة ذكرنا ذلك للنبي ﷺ فقال كلوا رزقا اخرجه الله اطعمونا ان كان معكم فاتاه بعضهم فاكله.
“রাসূলুল্লাহ (স)-এর নিকট আমরা এই বিষয়টি আলোচনা করিলে তিনি বলিলেন, আল্লাহ্র দেওয়া রিযিক, তোমরা ভক্ষণ কর এবং থাকিলে আমাকেও ভক্ষণ করিতে দাও। অতঃপর কোন একলোক তাঁহাকে কিছু অংশ প্রদান করিলে তিনি তাহা ভক্ষণ করেন” (বুখারী, প্রাগুক্ত)।
আল্লাহ প্রদত্ত এই খাবার সম্পর্কে আল্লামা ইদরীস কান্ধলবীর একটি সুন্দর অভিব্যক্তি হইল, যেই খাদ্য সরাসরি আল্লাহর পক্ষ হইতে আগত হয় এবং বান্দার তাহাতে কোন হাত থাকে না, তাহা অত্যন্ত বরকতময় ও পূত-পবিত্র। এই বরকত হাতছাড়া না করিবার লক্ষ্যেই রাসূলুল্লাহ (স) তাহা ভক্ষণ করিবার নির্দেশ দিয়াছিলেন এবং তিনি নিজেও তাহা হইতে খাইয়াছিলেন (সীরাতুল মুস্তাফা, ২খ., পৃ. ৪৬৯)। বুখারীর রিওয়ায়াত হইতে এই কথা প্রতিভাত হইয়াছে যে, সাহাবায়ে কিরাম (রা) যতদিন তাহা হইতে খাদ্য গ্রহণ করিয়াছিলেন ততদিন উহার তৈলও ব্যবহার করিয়াছিলেন। ফলে অনাহারজনিত তাহাদের শারীরিক দুর্বলতা বিদূরিত হইয়া গিয়াছিল। আস-সীরাতুল হালাবিয়্যাতে বলা হইয়াছে যে, মাছটির চোখে, গর্ত হইতে কয়েক মটকা তৈল নিঃসারিত হইয়াছিল (হালাবী, প্রাগুক্ত)।
সামুদ্রিক মাছ মৃত হইলেও তাহা খাওয়া বৈধ। কারণ রাসূলুল্লাহ (স) তাহা স্বেচ্ছায় ভক্ষণ করিয়াছিলেন। অথচ তিনি কোন ধরনের খাদ্যসংকটের সম্মুখীন হন নাই। যদিও সাহাবায়ে কিরামের তাহা হইতে খাদ্য গ্রহণ ছিল বাধ্যবাধক্কার ফলে।
এই অভিযানে কোন ধরনের যুদ্ধ সংঘটিত হয় নাই, এমনকি লড়াইয়ে অবতীর্ণ হইবার কোন সুযোগও আসে নাই। ইসলামী কাফেলা বিনাযুদ্ধে মদীনায় প্রত্যাবর্তন করেন (আল-বিদায়া ওয়ান-নিহায়া, ৪খ., পৃ. ২৭৬)।

লিঙ্ক শেয়ার করুন
close

লিঙ্ক কপি করুন

0:00
0:00