📄 শোক প্রকাশের জন্য জা'ফার (রা)-এর গৃহে রাসূলুল্লাহ (স)-এর পদার্পণ
আসমা' বিন্ত 'উমায়স (রা) ছিলেন জা'ফার (রা)-এর সহধর্মিনী। তিনি বলেন, যেই দিন জা'ফার ও তাঁহার সঙ্গীগণ শহীদ হইয়াছিলেন সেই দিনিই রাসূলুল্লাহ (স) আমার গৃহে পদার্পণ করিয়াছিলেন (সীরাতে হালাবিয়্যা, উরদূ অনু, ৩/৩খ, ৬১)। ইবন ইসহাক তদীয় সূত্রে আসমা' বিন্ত 'উমায়স (রা) হইতে নিম্নোক্ত রিওয়ায়াতটি বর্ণনা করিয়াছেন: عَنْ أَسْمَاءَ بِنْتِ عُمَيْسٍ قَالَتْ لَمَّا أَصِيبَ جَعْفَرُ وأَصْحَابُهُ دَخَلَ عَلَى رَسُولُ اللهِ ﷺ وَقَدْ دَبَعْتُ أَرْبَعِينَ مَنَاءً وَعَجِنْتُ عَجِيْنِي وَعَسَّلْتُ بَنِي وَدَهَنْتُهُمْ وَنَظَفْتُهُمْ فَقَالَ رَسُولُ الله ﷺ انتنى بِبَنِى جَعْفَرٍ فَآتَيْتُهُ بِهِمْ فَشَمُهُمْ وَزَرَفَتْ عَيْنَاهُ فَقُلْتُ يَا رَسُولُ اللهِ ﷺ
بِأَبِي أَنْتَ وَأُمِّي مَا يُبْكَيْكَ ابْلَغَكَ عَنْ جَعْفَرٍ وَأَصْحَابِهِ شَيْ قَالَ نَعَمْ أَصِيبُوا هَذَا الْيَوْمِ قَالَتْ فَقُمْتُ أَصِيْعُ وَاجْتَمَعَ إِلَى النِّسَاءُ وَخَرَجَ وَرَسُولُ اللهِ ﷺ إِلَى أَهْلِهِ فَقَالَ لَا تَغْفَلُوا عَنْ الجَعْفَرٍ أَنْ تَصْنَعُوا لَهُمْ طَعَامًا فَإِنَّهُمْ قَدْ شَغَلُوا بِأَمْرِ صَاحِبِهِمْ.
"আসমা' বিনত 'উমায়স (রা) বলেন, জা'ফার ও তাহার সঙ্গীগণ নিহত হইবার পর রাসূলুল্লাহ (স) আমার নিকট আগমন করিলেন। আমি এই সময় চল্লিশটি চামড়া পাকা করিয়াছিলাম, আমার আটার খামির করিয়াছিলাম, আমার সন্তানদেরকে গোসল করাইয়াছিলাম এবং তাহাদের গায়ে তৈল মাখাইয়া পরিষ্কার-পরিচ্ছন্ন করিয়াছিলাম। আমার গৃহে রাসূলুল্লাহ (স) তাশরীফ আনিয়া বলিলেন, আমার নিকট জা'ফারের সন্তানদিগকে লইয়া আস। আমি তাহাদিগকে তাঁহার নিকট উপস্থিত করিলাম। তিনি তাহাদিগকে আদর করিলেন। তখন তাঁহার নয়নযুগল হইতে অশ্রু ঝরিতেছিল। আমি জিজ্ঞাসা করিলাম, ইয়া রাসূলাল্লাহ! আমার পিতামাতা আপনার উপর কোরবান হউক! আপনি কেন কাঁদিতেছেন? আপনার নিকট জা'ফার ও তাহার সঙ্গীগণ সম্পর্কে কোন সংবাদ পৌছিয়াছে কি? রাসূলুল্লাহ (স) বলিলেন: হাঁ, তাহারা সকলে আজ শাহাদাত লাভ করিয়াছে। আসমা (রা) বলেন, ইহা শুনিয়া আমি দাঁড়াইয়া চিৎকার করিয়া কাঁদিতে লাগিলাম এবং মহিলারা আসিয়া জড়ো হইল। রাসূলুল্লাহ (স) বাহির হইয়া তাঁহার গৃহে গিয়া বলিলেন: জা'ফারের পরিবার সম্পর্কে উদাসীন হইও না। তাহাদিগের জন্য খাবার তৈরী করিতে ভুলিও না। কারণ ইহারা তাহাদিগের কর্তাকে হারাইয়া শোকাভিভূত হইয়া পড়িয়াছে” (আবূ দাউদ, তিরমিযী, ইবন মাজা ও ইমাম আহমাদ ইবন হাম্বল হইতে বর্ণিত হইয়াছে)।
মুহাম্মাদ ইবন ইসহাক 'আইশা (রা) হইতে এই সম্পর্কিত নিম্নোক্ত হাদীছ বর্ণনা করিয়াছেন:
قَالَتْ لَمَّا أَتَى نَعْتُ جَعْفَرٍ عَرَّفْنَا فِي وَجْهِ رَسُولُ اللهِ ﷺ الْحُزْنَ قَالَتْ فَدَخَلَ عَلَيْهِ رَجُلٌ فَقَالَ يَا رَسُولُ اللهِ ﷺ إِنَّ النِّسَاءَ عَيَيْنَنَا وَفَتَنَّنَا قَالَ ارْجِعْ إِلَيْهِنَّ فَأَسْكَتْهُنَّ قَالَتْ فَذَهَبَ ثُمَّ رَجَعَ فَقَالَ لَهُ مِثْلَ ذالك قَالَتْ يَقُولُ وَرُبَّمَا ضَرَّ التَّكَلُّفُ يَعْنِي أَهْلَهُ قَالَتْ قَالَ فَاذْهَبْ فَأَسْكِتْهُنَّ فَإِنْ آبَيْنَ فَاحْتَوا فِي أَفْوَاهِهِنَّ التَّرَابَ قَالَتْ قُلْتُ فِي نَفْسِي أَبْعَدَكَ اللَّهُ فَوَاللَّهِ مَا تَرَكْتَ يَفْسَكَ وَمَا أَنْتَ بِمُطِيعِ رَسُولَ اللهِ ﷺ قَالَتْ وَعَرَفْتُ أَنَّهُ لَا يَقْدِرُ يُحْيِي فِي أَفْوَاهِهِنَّ التَّرَابَ.
"তিনি বলেন, জা'ফারের মৃত্যুসংবাদ আসিয়া পৌছিলে আমরা রাসূলুল্লাহ (স)-এর চেহারায় মনোকষ্টের ছাপ দেখিতে পাইলাম। 'আইশা (রা) বলেন, এমন সময় রাসূলুল্লাহ (স)-এর নিকট
এক লোক প্রবেশ করিল। সে বলিল, হে আল্লাহ্র রাসূল! মহিলাগণ আমাদিগকে অবসন্ন করিয়া তুলিয়াছে এবং ফিতনায় পতিত করিয়াছে। রাসূলুল্লাহ (স) বলিলেন, যাও, ইহাদিগকে বারণ কর। 'আইশা (রা) বলেন, লোকটি সেখানে গিয়া আবার ফিরিয়া আসিয়া পূর্বের ন্যায় বলিল। সে আরও বলিতেছিল, অনেক সময় ইহাদিগের ক্রন্দনে তাহার (ঐ লোকের) পরিবার-পরিজনের কষ্ট হয়। তিনি বলিলেন, যাও, ইহাদিগকে নিবৃত্ত কর। যদি তাহারা নিবৃত্ত হইতে অস্বীকৃতি জানায় তাহা হইলে ইহাদিগের মুখে মাটি নিক্ষেপ কর। 'আইশা (রা) বলেন, আমি মনে মনে বলিতেছিলাম, আল্লাহ তোমাকে দূরে রাখুক, আল্লাহ্র শপথ! তুমি নিজেকেও বিরত রাখিতেছ না। আর রাসূলুল্লাহ (স)-এর নির্দেশও পালন করিতে পারিতেছ না। তিনি বলেন, আমি জানিতাম যে, সে ঐ মহিলাদিগের মুখে মাটি নিক্ষেপ করিতে সক্ষম হইবে না"।
এই রিওয়ায়াতটি একমাত্র ইবন ইসহাকই বর্ণনা করিয়াছেন। ইমাম আহমাদ বর্ণিত এই সম্পর্কিত দীর্ঘ একটি হাদীছের শেষাংশে রহিয়াছে: ثُمَّ أَمْهَلَ الَ جَعْفَرٍ ثَلَاثًا أَنْ يَأْتِيَهُمْ ثُمَّ آتَاهُمْ فَقَالَ لَا تَبْكُوا عَلَى أَخِي بَعْدَ الْيَوْمِ أدْعُوا لِي ابْنَيْ أَخِي قَالَ فَجَنَى بِنَا كَأَنَّنَا أَفْرَخٌ فَقَالَ أَدْعُوا لِي الْحَلَاقَ فَجِيئَ بِالْحَلاقِ فَخَلَقَ رُءُوسَنَا ثُمَّ قَالَ أَمَّا مُحَمَّدٌ فَشَبِيْهُ عَمَّنَا أَبِي طالب وَأَمَّا عَبْدُ اللَّهِ فَشَبِيْهُ خَلْقِى وَخُلُقَى ثُمَّ أَخَذَ بِيَدِى فَأَشَالَهَا وَقَالَ اللَّهُمَّ اخْلُفْ جَعْفَراً فِي أَهْلِهِ بَارِكَ لِعَبْدِ الله في صَفْقَةِ يَمِينِهِ قَالَهَا ثَلَاثَ مَرَّاتٍ قَالَ فَجَاءَتْ أُمُّنَا فَذَكَرَتْ لَهُ يُتْمَنَا وَجَعَلَتْ تُفْرِحُ لَهُ فَقَالَ الْعَيْلَةَ تَخَافِينَ عَلَيْهِمْ وَأَنَا وَلِيُّهُمْ فِي الدُّنْيَا وَالآخِرَةِ.
"অতঃপর রাসূলুল্লাহ (স) জা'ফার (রা)-এর পরিবার-পরিজনের, আগমন করিবার জন্য তিন দিনের অবকাশ দিলেন। অতঃপর তিনি তাহাদের নিকট তাশরীফ আনিলেন ও বলিলেনঃ আমার ভাইয়ের জন্য-আজিকার পর ক্রন্দন করিও না। আমার ভ্রাতুষ্পুত্রগণকে আমার নিকট লইয়া আস। বর্ণনাকারী বলেন, আমাদিগকে আনা হইল আমরা তখন পক্ষি-শাবকের ন্যায় ছিলাম। রাসূলুল্লাহ (স) বলিলেন: আমার নিকট একজন ক্ষৌরকার উপস্থিত কর। একজন ক্ষৌরকার আনা হইলে সে আমাদের মাথা মুণ্ডন করিল। অতঃপর রাসূলুল্লাহ (স) বলিলেন: মুহাম্মাদ (জা'ফার পুত্র) আমার পিতৃব্য আবূ তালিবের সদৃশ্য। 'আবদুল্লাহ (জা'ফার পুত্র) আমার গঠন ও চরিত্র সদৃশ। অতঃপর রাসূলুল্লাহ (স) আমার হাত উত্তোলন করিয়া বলিলেনঃ হে আল্লাহ! তুমি জা'ফার পরিবারের অভিভাবক হইয়া যাও। 'আবদুল্লাহ্র ব্যবসা-বাণিজ্যে বরকত দাও। তিনি ইহা তিনবার বলিলেন। অতঃপর আমার মাতা আগমন করিয়া আমাদের পিতৃহীনতার কথা উল্লেখ করিতে লাগিলেন এবং তাহার দুঃখ-বেদনার কথা ব্যক্ত করিতে লাগিলেন। রাসূলুল্লাহ (স) বলিলেন: তুমি দারিদ্র্যের চিন্তা করিতেছ? অথচ ইহকাল ও
পরকালে আমি তাহাদের অভিভাবক” (মুসনাদে আহমাদ, ১খ., পৃ. ২০৪, নং ১৭৫০; আবূ দাউদ, তারাজ্জল, বাব ফী হালকির রাস, নং ৪১৯২)।
ইমাম নাসাঈ কিতাবুস সিয়ারে সম্পূর্ণ হাদীছ বর্ণনা করিয়াছেন। উক্ত হাদীছ দ্বারা এই কথা প্রমাণিত হয় যে, রাসূলুল্লাহ (স) জা'ফায় পরিবারকে তিনদিন ক্রন্দন করিবার অর্থাৎ শোক পালনের অনুমতি দান করিয়াছিলেন, তিনদিন পর তাহা নিষিদ্ধ করিয়াছেন। ইমাম আহমাদ আল-হাকাম ইবন 'আবদিল্লাহ ইব্ন শাদ্দাদ সূত্রে আসমা (রা) হইতে বর্ণনা করিয়াছেন: إِنَّ رَسُولَ اللهِ ﷺ قَالَ لَهَا لَمَّا أُصِيْبَ جَعْفَرُ تُسَلِّبِي ثَلَاثًا ثُمَّ اصْنَعِي مَا شِئْتِ.
"জা'ফার (রা) নিহত হইবার পর রাসূলুল্লাহ (স) আসমা (রা)-কে বলিয়াছিলেনঃ তুমি ভিম দিন গভীরভাবে শোক পালন কর, ইহার পর যাহা ইচ্ছা তাহা কর"।
ইহা ইমাম আহমাদ হইতে এককভাবে বর্ণিত। এই হাদীছ দ্বারা এই কথা প্রমাণিত হইবার সম্ভাবনা আছে যে, রাসূলুল্লাহ (স) আসমা' (রা)-কে 'তাসাল্লুব' অর্থাৎ অধিক ক্রন্দন ও কাপড়াদি ফাঁড়িয়া ক্রন্দন করার অনুমতি প্রদান করিয়াছিলেন। ইহা তাহার জন্য বিশেষভাবে অনুমতি ছিল জা'ফারের বিয়োগান্তে তিনি অধিক মাত্রায় ভাঙ্গিয়া পড়ায়। ইহারও সম্ভাবনা আছে যে, 'তাসাল্লুব' অর্থ হইল সাজ-সজ্জা অধিক মাত্রায় তিন দিন পর্যন্ত পরিত্যাগ করা। ইহার পর অন্যান্য 'ইদ্দত পালনকারিনিগণ যেইভাবে সাজ-সজ্জা পরিত্যাগ করিয়া ইদ্দত পালন করিয়া থাকে সেইভাবে যাহা ইচ্ছা তাহা করা। কেহ কেহ تسلبى ثَلَاثًا যাহার আরবী অর্থ تصبری ثَلَاثً )তিন দিন ধৈর্য ধারণ কর)। কিন্তু এইরূপ পাঠ অন্যান্য রিওয়ায়াতের পরিপন্থী।
ইমাম আহমদের এই সম্পর্কিত আরও একটি বর্ণনা পাওয়া যায়, যাহা নিম্নরূপ: عَنْ أَسْمَاءَ بِنْتِ عُمَيْسٍ قَالَتْ دَخَلَ رَسُولُ اللهِ ﷺ الْيَوْمَ الثَّالِثِ مِنْ قَتْلِ جَعْفَرٍ فَقَالَ لا تُحدِّى بَعْدَ يَوْمِك هذا .
"আসমা বিন্ত 'উমায়স (রা) বলেন, রাসূলুল্লাহ (স) জা'ফার নিহত হইবার তৃতীয় দিন (আমার গৃহে) প্রবেশ করিলেন। অতঃপর তিনি বলিলেন: এই দিনের পর তুমি আর শোক প্রকাশ করিও না"।
ইহাও ইমাম আহমাদের একক বর্ণনা। ইহার সনদে কোন আপত্তি নাই। তবে শাব্দিক অর্থে হাদীছ গ্রহণ করিলে একটি প্রশ্ন উত্থাপিত হয়। তাহা হইল, সহীহ বুখারী ও মুসলিমে বর্ণিত আছে, রাসূলুল্লাহ (স) বলিয়াছেনঃ لا يَحِلُّ لَامْرَأَهِ تُؤْمِنُ بِاللَّهِ وَالْيَوْمِ الآخِرِ أَنْ تَحِدَّ عَلَى مَيِّتِهَا أَكْثَرَ مِنْ ثَلَاثَةِ أَيَّامٍ إِلَّا علَى زَوْجِ أَرْبَعَةَ أَشْهُرٍ وَعَشْرًا .
"যেই মহিলা আল্লাহ ও কিয়ামত দিবসের উপর ঈমান রাখে তাহার জন্য মৃত ব্যক্তির উপর তিন দিনের অধিক শোক পালন করা বৈধ নহে। তবে সে তাহার স্বামীর জন্য চার মাস দশ দিন শোক পালন করিবে”।
এই হাদীছে স্বামীর জন্য চার মাস দশ দিন শোক পালন করার কথা বলা হইয়াছে। কিন্তু ইহার বিপরীত উপরোল্লিখিত হাদীছে আসমা (রা)-কে রাসূলুল্লাহ (স) তিন দিনের অধিক শোক পালন করা হইতে নিষেধ করিয়াছেন। সুতরাং এই সম্পর্কে সমাধান এই যে, যদি ইমাম আহমাদ কর্তৃক বর্ণিত রিওয়ায়াতকে সঠিক (محفوظ) গণ্য করা হয় তাহা হইলে ইহা হইবে কেবল এই ঘটনার জন্যই নির্দিষ্ট। অথবা বলা হইবে, এই হাদীছে কেবল এই তিন দিন অধিক মাত্রায় শোক পালনের আদেশ ছিল যাহা ইতোপূর্বে আলোচিত হইয়াছে (আল-বিদায়া ওয়ান-নিহায়া, ৪খ., ২৫০-২৫২)।
আসমা বিন্ত 'উমায়স (রা) তাঁহার স্বামী জা'ফার (রা)-এর মৃত্যুতে নিম্নোক্ত শোক গাহন আবৃত্তি করিয়াছিলেন:
قَالَيْتُ لَا تَنْفَكُ نَفْسِي حَزِينَةً عَلَيْكَ وَلَا يَنْفَكُ جِلْدِي أَغْبَرَ. فَلِلَّهِ عَيْنًا مَنْ رَأَى مِثْلَهُ فَتًى - أَكَرُّوا حُمى فِي الْهَيَاجِ وَأَصْبَرَا.
"আমি শপথ করিয়া বলিতেছি, আমার হৃদয় তোমার মর্মবেদনা হইতে বিচ্ছিন্ন হইবে না এবং আমার ত্বক ধুলাবালি মুক্ত হইবে না।
"আল্লাহ্র শপথ! এমন কোন চক্ষু দেখা যায় নাই যে তাঁহার মত যুদ্ধে পাল্টা আক্রমণকারী, কঠোর হস্তে দমনকারী ও সহনশীল যুবক দেখিয়াছে"।
অতঃপর আসমা (রা)-এর 'ইদ্দত পূর্ণ হইয়া গেলে আবূ বাক্স (রা) তাঁহার নিকট বিবাহের প্রস্তাব পাঠাইলেন। আবূ বাক্স (রা) তাঁহার সহিত বিবাহে আবদ্ধ হইয়া ওলীমা অনুষ্ঠান করিলেন। উক্ত ওলীমায় অংশগ্রহণকারীগণের মধ্যে 'আলী ইবন আবী তালিব (রা)-ও ছিলেন (আল-বিদায়া ওয়ান-নিহায়া, ৪খ., ২৫৩)।
আসমা' বিন্ত 'উমায়স (রা) ছিলেন জা'ফার (রা)-এর সহধর্মিনী। তিনি বলেন, যেই দিন জা'ফার ও তাঁহার সঙ্গীগণ শহীদ হইয়াছিলেন সেই দিনিই রাসূলুল্লাহ (স) আমার গৃহে পদার্পণ করিয়াছিলেন (সীরাতে হালাবিয়্যা, উরদূ অনু, ৩/৩খ, ৬১)। ইবন ইসহাক তদীয় সূত্রে আসমা' বিন্ত 'উমায়স (রা) হইতে নিম্নোক্ত রিওয়ায়াতটি বর্ণনা করিয়াছেন:
عَنْ أَسْمَاءَ بِنْتِ عُمَيْسٍ قَالَتْ لَمَّا أَصِيبَ جَعْفَرُ وأَصْحَابُهُ دَخَلَ عَلَى رَسُولُ اللهِ ﷺ وَقَدْ دَبَعْتُ أَرْبَعِينَ مَنَاءً وَعَجِنْتُ عَجِيْنِي وَعَسَّلْتُ بَنِي وَدَهَنْتُهُمْ وَنَظَفْتُهُمْ فَقَالَ رَسُولُ الله ﷺ انتنى بِبَنِى جَعْفَرٍ فَآتَيْتُهُ بِهِمْ فَشَمُهُمْ وَزَرَفَتْ عَيْنَاهُ فَقُلْتُ يَا رَسُولُ اللهِ ﷺ بِأَبِي أَنْتَ وَأُمِّي مَا يُبْكَيْكَ ابْلَغَكَ عَنْ جَعْفَرٍ وَأَصْحَابِهِ شَيْ قَالَ نَعَمْ أَصِيبُوا هَذَا الْيَوْمِ قَالَتْ فَقُمْتُ أَصِيْعُ وَاجْتَمَعَ إِلَى النِّسَاءُ وَخَرَجَ وَرَسُولُ اللهِ ﷺ إِلَى أَهْلِهِ فَقَالَ لَا تَغْفَلُوا عَنْ الجَعْفَرٍ أَنْ تَصْنَعُوا لَهُمْ طَعَامًا فَإِنَّهُمْ قَدْ شَغَلُوا بِأَمْرِ صَاحِبِهِمْ.
"আসমা' বিনত 'উমায়স (রা) বলেন, জা'ফার ও তাহার সঙ্গীগণ নিহত হইবার পর রাসূলুল্লাহ (স) আমার নিকট আগমন করিলেন। আমি এই সময় চল্লিশটি চামড়া পাকা করিয়াছিলাম, আমার আটার খামির করিয়াছিলাম, আমার সন্তানদেরকে গোসল করাইয়াছিলাম এবং তাহাদের গায়ে তৈল মাখাইয়া পরিষ্কার-পরিচ্ছন্ন করিয়াছিলাম। আমার গৃহে রাসূলুল্লাহ (স) তাশরীফ আনিয়া বলিলেন, আমার নিকট জা'ফারের সন্তানদিগকে লইয়া আস। আমি তাহাদিগকে তাঁহার নিকট উপস্থিত করিলাম। তিনি তাহাদিগকে আদর করিলেন। তখন তাঁহার নয়নযুগল হইতে অশ্রু ঝরিতেছিল। আমি জিজ্ঞাসা করিলাম, ইয়া রাসূলাল্লাহ! আমার পিতামাতা আপনার উপর কোরবান হউক! আপনি কেন কাঁদিতেছেন? আপনার নিকট জা'ফার ও তাহার সঙ্গীগণ সম্পর্কে কোন সংবাদ পৌছিয়াছে কি? রাসূলুল্লাহ (স) বলিলেন: হাঁ, তাহারা সকলে আজ শাহাদাত লাভ করিয়াছে। আসমা (রা) বলেন, ইহা শুনিয়া আমি দাঁড়াইয়া চিৎকার করিয়া কাঁদিতে লাগিলাম এবং মহিলারা আসিয়া জড়ো হইল। রাসূলুল্লাহ (স) বাহির হইয়া তাঁহার গৃহে গিয়া বলিলেন: জা'ফারের পরিবার সম্পর্কে উদাসীন হইও না। তাহাদিগের জন্য খাবার তৈরী করিতে ভুলিও না। কারণ ইহারা তাহাদিগের কর্তাকে হারাইয়া শোকাভিভূত হইয়া পড়িয়াছে” (আবূ দাউদ, তিরমিযী, ইবন মাজা ও ইমাম আহমাদ ইবন হাম্বল হইতে বর্ণিত হইয়াছে)।
মুহাম্মাদ ইবন ইসহাক 'আইশা (রা) হইতে এই সম্পর্কিত নিম্নোক্ত হাদীছ বর্ণনা করিয়াছেন:
قَالَتْ لَمَّا أَتَى نَعْتُ جَعْفَرٍ عَرَّفْنَا فِي وَجْهِ رَسُولُ اللهِ ﷺ الْحُزْنَ قَالَتْ فَدَخَلَ عَلَيْهِ رَجُلٌ فَقَالَ يَا رَسُولُ اللهِ ﷺ إِنَّ النِّسَاءَ عَيَيْنَنَا وَفَتَنَّنَا قَالَ ارْجِعْ إِلَيْهِنَّ فَأَسْكَتْهُنَّ قَالَتْ فَذَهَبَ ثُمَّ رَجَعَ فَقَالَ لَهُ مِثْلَ ذالك قَالَتْ يَقُولُ وَرُبَّمَا ضَرَّ التَّكَلُّفُ يَعْنِي أَهْلَهُ قَالَتْ قَالَ فَاذْهَبْ فَأَسْكِتْهُنَّ فَإِنْ آبَيْنَ فَاحْتَوا فِي أَفْوَاهِهِنَّ التَّرَابَ قَالَتْ قُلْتُ فِي نَفْسِي أَبْعَدَكَ اللَّهُ فَوَاللَّهِ مَا تَرَكْتَ يَفْسَكَ وَمَا أَنْتَ بِمُطِيعِ رَسُولَ اللهِ ﷺ قَالَتْ وَعَرَفْتُ أَنَّهُ لَا يَقْدِرُ يُحْيِي فِي أَفْوَاهِهِنَّ التَّرَابَ.
"তিনি বলেন, জা'ফারের মৃত্যুসংবাদ আসিয়া পৌছিলে আমরা রাসূলুল্লাহ (স)-এর চেহারায় মনোকষ্টের ছাপ দেখিতে পাইলাম। 'আইশা (রা) বলেন, এমন সময় রাসূলুল্লাহ (স)-এর নিকট এক লোক প্রবেশ করিল। সে বলিল, হে আল্লাহ্র রাসূল! মহিলাগণ আমাদিগকে অবসন্ন করিয়া তুলিয়াছে এবং ফিতনায় পতিত করিয়াছে। রাসূলুল্লাহ (স) বলিলেন, যাও, ইহাদিগকে বারণ কর। 'আইশা (রা) বলেন, লোকটি সেখানে গিয়া আবার ফিরিয়া আসিয়া পূর্বের ন্যায় বলিল। সে আরও বলিতেছিল, অনেক সময় ইহাদিগের ক্রন্দনে তাহার (ঐ লোকের) পরিবার-পরিজনের কষ্ট হয়। তিনি বলিলেন, যাও, ইহাদিগকে নিবৃত্ত কর। যদি তাহারা নিবৃত্ত হইতে অস্বীকৃতি জানায় তাহা হইলে ইহাদিগের মুখে মাটি নিক্ষেপ কর। 'আইশা (রা) বলেন, আমি মনে মনে বলিতেছিলাম, আল্লাহ তোমাকে দূরে রাখুক, আল্লাহ্র শপথ! তুমি নিজেকেও বিরত রাখিতেছ না। আর রাসূলুল্লাহ (স)-এর নির্দেশও পালন করিতে পারিতেছ না। তিনি বলেন, আমি জানিতাম যে, সে ঐ মহিলাদিগের মুখে মাটি নিক্ষেপ করিতে সক্ষম হইবে না"।
এই রিওয়ায়াতটি একমাত্র ইবন ইসহাকই বর্ণনা করিয়াছেন। ইমাম আহমাদ বর্ণিত এই সম্পর্কিত দীর্ঘ একটি হাদীছের শেষাংশে রহিয়াছে: ثُمَّ أَمْهَلَ الَ جَعْفَرٍ ثَلَاثًا أَنْ يَأْتِيَهُمْ ثُمَّ آتَاهُمْ فَقَالَ لَا تَبْكُوا عَلَى أَخِي بَعْدَ الْيَوْمِ أدْعُوا لِي ابْنَيْ أَخِي قَالَ فَجَنَى بِنَا كَأَنَّنَا أَفْرَخٌ فَقَالَ أَدْعُوا لِي الْحَلَاقَ فَجِيئَ بِالْحَلَاقِ فَخَلَقَ رُءُوسَنَا ثُمَّ قَالَ أَمَّا مُحَمَّدٌ فَشَبِيْهُ عَمَّنَا أَبِي طالب وَأَمَّا عَبْدُ اللَّهِ فَشَبِيْهُ خَلْقِى وَخُلُقَى ثُمَّ أَخَذَ بِيَدِى فَأَشَالَهَا وَقَالَ اللَّهُمَّ اخْلُفْ جَعْفَراً فِي أَهْلِهِ بَارِكَ لِعَبْدِ الله في صَفْقَةِ يَمِينِهِ قَالَهَا ثَلَاثَ مَرَّاتٍ قَالَ فَجَاءَتْ أُمُّنَا فَذَكَرَتْ لَهُ يُتْمَنَا وَجَعَلَتْ تُفْرِحُ لَهُ فَقَالَ الْعَيْلَةَ تَخَافِينَ عَلَيْهِمْ وَأَنَا وَلِيُّهُمْ فِي الدُّنْيَا وَالآخِرَةِ.
"অতঃপর রাসূলুল্লাহ (স) জা'ফার (রা)-এর পরিবার-পরিজনের, আগমন করিবার জন্য তিন দিনের অবকাশ দিলেন। অতঃপর তিনি তাহাদের নিকট তাশরীফ আনিলেন ও বলিলেনঃ আমার ভাইয়ের জন্য-আজিকার পর ক্রন্দন করিও না। আমার ভ্রাতুষ্পুত্রগণকে আমার নিকট লইয়া আস। বর্ণনাকারী বলেন, আমাদিগকে আনা হইল আমরা তখন পক্ষি-শাবকের ন্যায় ছিলাম। রাসূলুল্লাহ (স) বলিলেন: আমার নিকট একজন ক্ষৌরকার উপস্থিত কর। একজন ক্ষৌরকার আনা হইলে সে আমাদের মাথা মুণ্ডন করিল। অতঃপর রাসূলুল্লাহ (স) বলিলেন: মুহাম্মাদ (জা'ফার পুত্র) আমার পিতৃব্য আবূ তালিবের সদৃশ্য। 'আবদুল্লাহ (জা'ফার পুত্র) আমার গঠন ও চরিত্র সদৃশ। অতঃপর রাসূলুল্লাহ (স) আমার হাত উত্তোলন করিয়া বলিলেনঃ হে আল্লাহ! তুমি জা'ফার পরিবারের অভিভাবক হইয়া যাও। 'আবদুল্লাহ্র ব্যবসা-বাণিজ্যে বরকত দাও। তিনি ইহা তিনবার বলিলেন। অতঃপর আমার মাতা আগমন করিয়া আমাদের পিতৃহীনতার কথা উল্লেখ করিতে লাগিলেন এবং তাহার দুঃখ-বেদনার কথা ব্যক্ত করিতে লাগিলেন। রাসূলুল্লাহ (স) বলিলেন: তুমি দারিদ্র্যের চিন্তা করিতেছ? অথচ ইহকাল ও পরকালে আমি তাহাদের অভিভাবক" (মুসনাদে আহমাদ, ১খ., পৃ. ২০৪, নং ১৭৫০; আবূ দাউদ, তারাজ্জল, বাব ফী হালকির রাস, নং ৪১৯২)।
ইমাম নাসাঈ কিতাবুস সিয়ারে সম্পূর্ণ হাদীছ বর্ণনা করিয়াছেন। উক্ত হাদীছ দ্বারা এই কথা প্রমাণিত হয় যে, রাসূলুল্লাহ (স) জা'ফায় পরিবারকে তিনদিন ক্রন্দন করিবার অর্থাৎ শোক পালনের অনুমতি দান করিয়াছিলেন, তিনদিন পর তাহা নিষিদ্ধ করিয়াছেন। ইমাম আহমাদ আল-হাকাম ইবন 'আবদিল্লাহ ইব্ন শাদ্দাদ সূত্রে আসমা (রা) হইতে বর্ণনা করিয়াছেন: إِنَّ رَسُولَ اللهِ ﷺ قَالَ لَهَا لَمَّا أُصِيْبَ جَعْفَرُ تُسَلِّبِي ثَلَاثًا ثُمَّ اصْنَعِي مَا شِئْتِ.
"জা'ফার (রা) নিহত হইবার পর রাসূলুল্লাহ (স) আসমা (রা)-কে বলিয়াছিলেনঃ তুমি ভিম দিন গভীরভাবে শোক পালন কর, ইহার পর যাহা ইচ্ছা তাহা কর"।
ইহা ইমাম আহমাদ হইতে এককভাবে বর্ণিত। এই হাদীছ দ্বারা এই কথা প্রমাণিত হইবার সম্ভাবনা আছে যে, রাসূলুল্লাহ্ (স) আসমা' (রা)-কে 'তাসাল্লুব' অর্থাৎ অধিক ক্রন্দন ও কাপড়াদি ফাঁড়িয়া ক্রন্দন করার অনুমতি প্রদান করিয়াছিলেন। ইহা তাহার জন্য বিশেষভাবে অনুমতি ছিল জা'ফারের বিয়োগান্তে তিনি অধিক মাত্রায় ভাঙ্গিয়া পড়ায়। ইহারও সম্ভাবনা আছে যে, 'তাসাল্লুব' অর্থ হইল সাজ-সজ্জা অধিক মাত্রায় তিন দিন পর্যন্ত পরিত্যাগ করা। ইহার পর অন্যান্য 'ইদ্দত পালনকারিনিগণ যেইভাবে সাজ-সজ্জা পরিত্যাগ করিয়া ইদ্দত পালন করিয়া থাকে সেইভাবে যাহা ইচ্ছা তাহা করা। কেহ কেহ تسلبى ثَلَاثًا যাহার আরবী অর্থ تصبری ثَلَاثً )তিন দিন ধৈর্য ধারণ কর)। কিন্তু এইরূপ পাঠ অন্যান্য রিওয়ায়াতের পরিপন্থী।
ইমাম আহমদের এই সম্পর্কিত আরও একটি বর্ণনা পাওয়া যায়, যাহা নিম্নরূপ: عَنْ أَسْمَاءَ بِنْتِ عُمَيْسٍ قَالَتْ دَخَلَ رَسُولُ اللهِ ﷺ الْيَوْمَ الثَّالِثِ مِنْ قَتْلِ جَعْفَرٍ فَقَالَ لا تُحدِّى بَعْدَ يَوْمِك هذا .
"আসমা বিন্ত 'উমায়স (রা) বলেন, রাসূলুল্লাহ (স) জা'ফার নিহত হইবার তৃতীয় দিন (আমার গৃহে) প্রবেশ করিলেন। অতঃপর তিনি বলিলেন: এই দিনের পর তুমি আর শোক প্রকাশ করিও না"।
ইহাও ইমাম আহমাদের একক বর্ণনা। ইহার সনদে কোন আপত্তি নাই। তবে শাব্দিক অর্থে হাদীছ গ্রহণ করিলে একটি প্রশ্ন উত্থাপিত হয়। তাহা হইল, সহীহ বুখারী ও মুসলিমে বর্ণিত আছে, রাসূলুল্লাহ (স) বলিয়াছেনঃ لا يَحِلُّ لَامْرَأَهِ تُؤْمِنُ بِاللَّهِ وَالْيَوْمِ الآخِرِ أَنْ تَحِدَّ عَلَى مَيِّتِهَا أَكْثَرَ مِنْ ثَلَاثَةِ أَيَّامٍ إِلَّا علَى زَوْجِ أَرْبَعَةَ أَشْهُرٍ وَعَشْرًا .
"যেই মহিলা আল্লাহ ও কিয়ামত দিবসের উপর ঈমান রাখে তাহার জন্য মৃত ব্যক্তির উপর তিন দিনের অধিক শোক পালন করা বৈধ নহে। তবে সে তাহার স্বামীর জন্য চার মাস দশ দিন শোক পালন করিবে"।
এই হাদীছে স্বামীর জন্য চার মাস দশ দিন শোক পালন করার কথা বলা হইয়াছে। কিন্তু ইহার বিপরীত উপরোল্লিখিত হাদীছে আসমা (রা)-কে রাসূলুল্লাহ (স) তিন দিনের অধিক শোক পালন করা হইতে নিষেধ করিয়াছেন। সুতরাং এই সম্পর্কে সমাধান এই যে, যদি ইমাম আহমাদ কর্তৃক বর্ণিত রিওয়ায়াতকে সঠিক (محفوظ) গণ্য করা হয় তাহা হইলে ইহা হইবে কেবল এই ঘটনার জন্যই নির্দিষ্ট। অথবা বলা হইবে, এই হাদীছে কেবল এই তিন দিন অধিক মাত্রায় শোক পালনের আদেশ ছিল যাহা ইতোপূর্বে আলোচিত হইয়াছে (আল-বিদায়া ওয়ান-নিহায়া, ৪খ., ২৫০-২৫২)।
আসমা বিন্ত 'উমায়স (রা) তাঁহার স্বামী জা'ফার (রা)-এর মৃত্যুতে নিম্নোক্ত শোক গাহন আবৃত্তি করিয়াছিলেন:
قَالَيْتُ لَا تَنْفَكُ نَفْسِي حَزِينَةً عَلَيْكَ وَلَا يَنْفَكُ جِلْدِي أَغْبَرَ. فَلِلَّهِ عَيْنًا مَنْ رَأَى مِثْلَهُ فَتًى - أَكَرُّوا حُمى فِي الْهَيَاجِ وَأَصْبَرَا.
"আমি শপথ করিয়া বলিতেছি, আমার হৃদয় তোমার মর্মবেদনা হইতে বিচ্ছিন্ন হইবে না এবং আমার ত্বক ধুলাবালি মুক্ত হইবে না।
"আল্লাহ্র শপথ! এমন কোন চক্ষু দেখা যায় নাই যে তাঁহার মত যুদ্ধে পাল্টা আক্রমণকারী, কঠোর হস্তে দমনকারী ও সহনশীল যুবক দেখিয়াছে"।
অতঃপর আসমা (রা)-এর 'ইদ্দত পূর্ণ হইয়া গেলে আবূ বাক্স (রা) তাঁহার নিকট বিবাহের প্রস্তাব পাঠাইলেন। আবূ বাক্স (রা) তাঁহার সহিত বিবাহে আবদ্ধ হইয়া ওলীমা অনুষ্ঠান করিলেন। উক্ত ওলীমায় অংশগ্রহণকারীগণের মধ্যে 'আলী ইবন আবী তালিব (রা)-ও ছিলেন (আল-বিদায়া ওয়ান-নিহায়া, ৪খ., ২৫৩)।
আসমা' বিন্ত 'উমায়স (রা) ছিলেন জা'ফার (রা)-এর সহধর্মিনী। তিনি বলেন, যেই দিন জা'ফার ও তাঁহার সঙ্গীগণ শহীদ হইয়াছিলেন সেই দিনিই রাসূলুল্লাহ (স) আমার গৃহে পদার্পণ করিয়াছিলেন (সীরাতে হালাবিয়্যা, উরদূ অনু, ৩/৩খ, ৬১)। ইবন ইসহাক তদীয় সূত্রে আসমা' বিন্ত 'উমায়স (রা) হইতে নিম্নোক্ত রিওয়ায়াতটি বর্ণনা করিয়াছেন:
عَنْ أَسْمَاءَ بِنْتِ عُمَيْسٍ قَالَتْ لَمَّا أَصِيبَ جَعْفَرُ وأَصْحَابُهُ دَخَلَ عَلَى رَسُولُ اللهِ ﷺ وَقَدْ دَبَعْتُ أَرْبَعِينَ مَنَاءً وَعَجِنْتُ عَجِيْنِي وَعَسَّلْتُ بَنِي وَدَهَنْتُهُمْ وَنَظَفْتُهُمْ فَقَالَ رَسُولُ الله ﷺ انتنى بِبَنِى جَعْفَرٍ فَآتَيْتُهُ بِهِمْ فَشَمُهُمْ وَزَرَفَتْ عَيْنَاهُ فَقُلْتُ يَا رَسُولُ اللهِ ﷺ بِأَبِي أَنْتَ وَأُمِّي مَا يُبْكَيْكَ ابْلَغَكَ عَنْ جَعْفَرٍ وَأَصْحَابِهِ شَيْ قَالَ نَعَمْ أَصِيبُوا هَذَا الْيَوْمِ قَالَتْ فَقُمْتُ أَصِيْعُ وَاجْتَمَعَ إِلَى النِّسَاءُ وَخَرَجَ وَرَسُولُ اللهِ ﷺ إِلَى أَهْلِهِ فَقَالَ لَا تَغْفَلُوا عَنْ الجَعْفَرٍ أَنْ تَصْنَعُوا لَهُمْ طَعَامًا فَإِنَّهُمْ قَدْ شَغَلُوا بِأَمْرِ صَاحِبِهِمْ.
"আসমা' বিনত 'উমায়স (রা) বলেন, জা'ফার ও তাহার সঙ্গীগণ নিহত হইবার পর রাসূলুল্লাহ (স) আমার নিকট আগমন করিলেন। আমি এই সময় চল্লিশটি চামড়া পাকা করিয়াছিলাম, আমার আটার খামির করিয়াছিলাম, আমার সন্তানদেরকে গোসল করাইয়াছিলাম এবং তাহাদের গায়ে তৈল মাখাইয়া পরিষ্কার-পরিচ্ছন্ন করিয়াছিলাম। আমার গৃহে রাসূলুল্লাহ (স) তাশরীফ আনিয়া বলিলেন, আমার নিকট জা'ফারের সন্তানদিগকে লইয়া আস। আমি তাহাদিগকে তাঁহার নিকট উপস্থিত করিলাম। তিনি তাহাদিগকে আদর করিলেন। তখন তাঁহার নয়নযুগল হইতে অশ্রু ঝরিতেছিল। আমি জিজ্ঞাসা করিলাম, ইয়া রাসূলাল্লাহ! আমার পিতামাতা আপনার উপর কোরবান হউক! আপনি কেন কাঁদিতেছেন? আপনার নিকট জা'ফার ও তাহার সঙ্গীগণ সম্পর্কে কোন সংবাদ পৌছিয়াছে কি? রাসূলুল্লাহ (স) বলিলেন: হাঁ, তাহারা সকলে আজ শাহাদাত লাভ করিয়াছে। আসমা (রা) বলেন, ইহা শুনিয়া আমি দাঁড়াইয়া চিৎকার করিয়া কাঁদিতে লাগিলাম এবং মহিলারা আসিয়া জড়ো হইল। রাসূলুল্লাহ (স) বাহির হইয়া তাঁহার গৃহে গিয়া বলিলেন: জা'ফারের পরিবার সম্পর্কে উদাসীন হইও না। তাহাদিগের জন্য খাবার তৈরী করিতে ভুলিও না। কারণ ইহারা তাহাদিগের কর্তাকে হারাইয়া শোকাভিভূত হইয়া পড়িয়াছে” (আবূ দাউদ, তিরমিযী, ইবন মাজা ও ইমাম আহমাদ ইবন হাম্বল হইতে বর্ণিত হইয়াছে)।
মুহাম্মাদ ইবন ইসহাক 'আইশা (রা) হইতে এই সম্পর্কিত নিম্নোক্ত হাদীছ বর্ণনা করিয়াছেন:
قَالَتْ لَمَّا أَتَى نَعْتُ جَعْفَرٍ عَرَّفْنَا فِي وَجْهِ رَسُولُ اللهِ ﷺ الْحُزْنَ قَالَتْ فَدَخَلَ عَلَيْهِ رَجُلٌ فَقَالَ يَا رَسُولُ اللهِ ﷺ إِنَّ النِّسَاءَ عَيَيْنَنَا وَفَتَنَّنَا قَالَ ارْجِعْ إِلَيْهِنَّ فَأَسْكَتْهُنَّ قَالَتْ فَذَهَبَ ثُمَّ رَجَعَ فَقَالَ لَهُ مِثْلَ ذالك قَالَتْ يَقُولُ وَرُبَّمَا ضَرَّ التَّكَلُّفُ يَعْنِي أَهْلَهُ قَالَتْ قَالَ فَاذْهَبْ فَأَسْكِتْهُنَّ فَإِنْ آبَيْنَ فَاحْتَوا فِي أَفْوَاهِهِنَّ التَّرَابَ قَالَتْ قُلْتُ فِي نَفْسِي أَبْعَدَكَ اللَّهُ فَوَاللَّهِ مَا تَرَكْتَ يَفْسَكَ وَمَا أَنْتَ بِمُطِيعِ رَسُولَ اللهِ ﷺ قَالَتْ وَعَرَفْتُ أَنَّهُ لَا يَقْدِرُ يُحْيِي فِي أَفْوَاهِهِنَّ التَّرَابَ.
"তিনি বলেন, জা'ফারের মৃত্যুসংবাদ আসিয়া পৌছিলে আমরা রাসূলুল্লাহ (স)-এর চেহারায় মনোকষ্টের ছাপ দেখিতে পাইলাম। 'আইশা (রা) বলেন, এমন সময় রাসূলুল্লাহ (স)-এর নিকট এক লোক প্রবেশ করিল। সে বলিল, হে আল্লাহ্র রাসূল! মহিলাগণ আমাদিগকে অবসন্ন করিয়া তুলিয়াছে এবং ফিতনায় পতিত করিয়াছে। রাসূলুল্লাহ (স) বলিলেন, যাও, ইহাদিগকে বারণ কর। 'আইশা (রা) বলেন, লোকটি সেখানে গিয়া আবার ফিরিয়া আসিয়া পূর্বের ন্যায় বলিল। সে আরও বলিতেছিল, অনেক সময় ইহাদিগের ক্রন্দনে তাহার (ঐ লোকের) পরিবার-পরিজনের কষ্ট হয়। তিনি বলিলেন, যাও, ইহাদিগকে নিবৃত্ত কর। যদি তাহারা নিবৃত্ত হইতে অস্বীকৃতি জানায় তাহা হইলে ইহাদিগের মুখে মাটি নিক্ষেপ কর। 'আইশা (রা) বলেন, আমি মনে মনে বলিতেছিলাম, আল্লাহ তোমাকে দূরে রাখুক, আল্লাহ্র শপথ! তুমি নিজেকেও বিরত রাখিতেছ না। আর রাসূলুল্লাহ (স)-এর নির্দেশও পালন করিতে পারিতেছ না। তিনি বলেন, আমি জানিতাম যে, সে ঐ মহিলাদিগের মুখে মাটি নিক্ষেপ করিতে সক্ষম হইবে না"।
এই রিওয়ায়াতটি একমাত্র ইবন ইসহাকই বর্ণনা করিয়াছেন। ইমাম আহমাদ বর্ণিত এই সম্পর্কিত দীর্ঘ একটি হাদীছের শেষাংশে রহিয়াছে:
ثُمَّ أَمْهَلَ الَ جَعْفَرٍ ثَلَاثًا أَنْ يَأْتِيَهُمْ ثُمَّ آتَاهُمْ فَقَالَ لَا تَبْكُوا عَلَى أَخِي بَعْدَ الْيَوْمِ أدْعُوا لِي ابْنَيْ أَخِي قَالَ فَجَنَى بِنَا كَأَنَّنَا أَفْرَخٌ فَقَالَ أَدْعُوا لِي الْحَلَاقَ فَجِيئَ بِالْحَلاقِ فَخَلَقَ رُءُوسَنَا ثُمَّ قَالَ أَمَّا مُحَمَّدٌ فَشَبِيْهُ عَمَّنَا أَبِي طالب وَأَمَّا عَبْدُ اللَّهِ فَشَبِيْهُ خَلْقِى وَخُلُقَى ثُمَّ أَخَذَ بِيَدِى فَأَشَالَهَا وَقَالَ اللَّهُمَّ اخْلُفْ جَعْفَراً فِي أَهْلِهِ بَارِكَ لِعَبْدِ الله في صَفْقَةِ يَمِينِهِ قَالَهَا ثَلَاثَ مَرَّاتٍ قَالَ فَجَاءَتْ أُمُّنَا فَذَكَرَتْ لَهُ يُتْمَنَا وَجَعَلَتْ تُفْرِحُ لَهُ فَقَالَ الْعَيْلَةَ تَخَافِينَ عَلَيْهِمْ وَأَنَا وَلِيُّهُمْ فِي الدُّنْيَا وَالآخِرَةِ.
"অতঃপর রাসূলুল্লাহ (স) জা'ফার (রা)-এর পরিবার-পরিজনের, আগমন করিবার জন্য তিন দিনের অবকাশ দিলেন। অতঃপর তিনি তাহাদের নিকট তাশরীফ আনিলেন ও বলিলেনঃ আমার ভাইয়ের জন্য-আজিকার পর ক্রন্দন করিও না। আমার ভ্রাতুষ্পুত্রগণকে আমার নিকট লইয়া আস। বর্ণনাকারী বলেন, আমাদিগকে আনা হইল আমরা তখন পক্ষি-শাবকের ন্যায় ছিলাম। রাসূলুল্লাহ (স) বলিলেন: আমার নিকট একজন ক্ষৌরকার উপস্থিত কর। একজন ক্ষৌরকার আনা হইলে সে আমাদের মাথা মুণ্ডন করিল। অতঃপর রাসূলুল্লাহ (স) বলিলেন: মুহাম্মাদ (জা'ফার পুত্র) আমার পিতৃব্য আবূ তালিবের সদৃশ্য। 'আবদুল্লাহ (জা'ফার পুত্র) আমার গঠন ও চরিত্র সদৃশ। অতঃপর রাসূলুল্লাহ (স) আমার হাত উত্তোলন করিয়া বলিলেনঃ হে আল্লাহ! তুমি জা'ফার পরিবারের অভিভাবক হইয়া যাও। 'আবদুল্লাহ্র ব্যবসা-বাণিজ্যে বরকত দাও। তিনি ইহা তিনবার বলিলেন। অতঃপর আমার মাতা আগমন করিয়া আমাদের পিতৃহীনতার কথা উল্লেখ করিতে লাগিলেন এবং তাহার দুঃখ-বেদনার কথা ব্যক্ত করিতে লাগিলেন। রাসূলুল্লাহ (স) বলিলেন: তুমি দারিদ্র্যের চিন্তা করিতেছ? অথচ ইহকাল ও পরকালে আমি তাহাদের অভিভাবক” (মুসনাদে আহমাদ, ১খ., পৃ. ২০৪, নং ১৭৫০; আবূ দাউদ, তারাজ্জল, বাব ফী হালকির রাস, নং ৪১৯২)।
ইমাম নাসাঈ কিতাবুস সিয়ারে সম্পূর্ণ হাদীছ বর্ণনা করিয়াছেন। উক্ত হাদীছ দ্বারা এই কথা প্রমাণিত হয় যে, রাসূলুল্লাহ (স) জা'ফায় পরিবারকে তিনদিন ক্রন্দন করিবার অর্থাৎ শোক পালনের অনুমতি দান করিয়াছিলেন, তিনদিন পর তাহা নিষিদ্ধ করিয়াছেন। ইমাম আহমাদ আল-হাকাম ইবন 'আবদিল্লাহ ইব্ن শাদ্দাদ সূত্রে আসমা (রা) হইতে বর্ণনা করিয়াছেন: إِنَّ رَسُولَ اللهِ ﷺ قَالَ لَهَا لَمَّا أُصِيْبَ جَعْفَرُ تُسَلِّبِي ثَلَاثًا ثُمَّ اصْنَعِي مَا شِئْتِ.
"জা'ফার (রা) নিহত হইবার পর রাসূলুল্লাহ (স) আসমা (রা)-কে বলিয়াছিলেনঃ তুমি ভিম দিন গভীরভাবে শোক পালন কর, ইহার পর যাহা ইচ্ছা তাহা কর"।
ইহা ইমাম আহমাদ হইতে এককভাবে বর্ণিত। এই হাদীছ দ্বারা এই কথা প্রমাণিত হইবার সম্ভাবনা আছে যে, রাসূলুল্লাহ (স) আসমা' (রা)-কে 'তাসাল্লুব' অর্থাৎ অধিক ক্রন্দন ও কাপড়াদি ফাঁড়িয়া ক্রন্দন করার অনুমতি প্রদান করিয়াছিলেন। ইহা তাহার জন্য বিশেষভাবে অনুমতি ছিল জা'ফারের বিয়োগান্তে তিনি অধিক মাত্রায় ভাঙ্গিয়া পড়ায়। ইহারও সম্ভাবনা আছে যে, 'তাসাল্লুব' অর্থ হইল সাজ-সজ্জা অধিক মাত্রায় তিন দিন পর্যন্ত পরিত্যাগ করা। ইহার পর অন্যান্য 'ইদ্দত পালনকারিনিগণ যেইভাবে সাজ-সজ্জা পরিত্যাগ করিয়া ইদ্দত পালন করিয়া থাকে সেইভাবে যাহা ইচ্ছা তাহা করা। কেহ কেহ تسلبى ثَلَاثًا যাহার আরবী অর্থ تصبری ثَلَاثً (তিন দিন ধৈর্য ধারণ কর)। কিন্তু এইরূপ পাঠ অন্যান্য রিওয়ায়াতের পরিপন্থী।
ইমাম আহমদের এই সম্পর্কিত আরও একটি বর্ণনা পাওয়া যায়, যাহা নিম্নরূপ:
عَنْ أَسْمَاءَ بِنْتِ عُمَيْسٍ قَالَتْ دَخَلَ رَسُولُ اللهِ ﷺ الْيَوْمَ الثَّالِثِ مِنْ قَتْلِ جَعْفَرٍ فَقَالَ لا تُحدِّى بَعْدَ يَوْمِك هذا .
"আসমা বিন্ত 'উমায়স (রা) বলেন, রাসূলুল্লাহ (স) জা'ফার নিহত হইবার তৃতীয় দিন (আমার গৃহে) প্রবেশ করিলেন। অতঃপর তিনি বলিলেন: এই দিনের পর তুমি আর শোক প্রকাশ করিও না"।
ইহাও ইমাম আহমাদের একক বর্ণনা। ইহার সনদে কোন আপত্তি নাই। তবে শাব্দিক অর্থে হাদীছ গ্রহণ করিলে একটি প্রশ্ন উত্থাপিত হয়। তাহা হইল, সহীহ বুখারী ও মুসলিমে বর্ণিত আছে, রাসূলুল্লাহ (স) বলিয়াছেনঃ لا يَحِلُّ لَامْرَأَهِ تُؤْمِنُ بِاللَّهِ وَالْيَوْمِ الآخِرِ أَنْ تَحِدَّ عَلَى مَيِّتِهَا أَكْثَرَ مِنْ ثَلَاثَةِ أَيَّامٍ إِلَّا علَى زَوْجِ أَرْبَعَةَ أَشْهُرٍ وَعَشْرًا .
"যেই মহিলা আল্লাহ ও কিয়ামত দিবসের উপর ঈমান রাখে তাহার জন্য মৃত ব্যক্তির উপর তিন দিনের অধিক শোক পালন করা বৈধ নহে। তবে সে তাহার স্বামীর জন্য চার মাস দশ দিন শোক পালন করিবে"।
এই হাদীছে স্বামীর জন্য চার মাস দশ দিন শোক পালন করার কথা বলা হইয়াছে। কিন্তু ইহার বিপরীত উপরোল্লিখিত হাদীছে আসমা (রা)-কে রাসূলুল্লাহ (স) তিন দিনের অধিক শোক পালন করা হইতে নিষেধ করিয়াছেন। সুতরাং এই সম্পর্কে সমাধান এই যে, যদি ইমাম আহমাদ কর্তৃক বর্ণিত রিওয়ায়াতকে সঠিক (محفوظ) গণ্য করা হয় তাহা হইলে ইহা হইবে কেবল এই ঘটনার জন্যই নির্দিষ্ট। অথবা বলা হইবে, এই হাদীছে কেবল এই তিন দিন অধিক মাত্রায় শোক পালনের আদেশ ছিল যাহা ইতোপূর্বে আলোচিত হইয়াছে (আল-বিদায়া ওয়ান-নিহায়া, ৪খ., ২৫০-২৫২)।
আসমা বিন্ত 'উমায়স (রা) তাঁহার স্বামী জা'ফার (রা)-এর মৃত্যুতে নিম্নোক্ত শোক গাহন আবৃত্তি করিয়াছিলেন:
قَالَيْتُ لَا تَنْفَكُ نَفْسِي حَزِينَةً عَلَيْكَ وَلَا يَنْفَكُ جِلْدِي أَغْبَرَ. فَلِلَّهِ عَيْنًا مَنْ رَأَى مِثْلَهُ فَتًى - أَكَرُّوا حُمى فِي الْهَيَاجِ وَأَصْبَرَا.
"আমি শপথ করিয়া বলিতেছি, আমার হৃদয় তোমার মর্মবেদনা হইতে বিচ্ছিন্ন হইবে না এবং আমার ত্বক ধুলাবালি মুক্ত হইবে না।
"আল্লাহ্র শপথ! এমন কোন চক্ষু দেখা যায় নাই যে তাঁহার মত যুদ্ধে পাল্টা আক্রমণকারী, কঠোর হস্তে দমনকারী ও সহনশীল যুবক দেখিয়াছে"।
অতঃপর আসমা (রা)-এর 'ইদ্দত পূর্ণ হইয়া গেলে আবূ বাক্স (রা) তাঁহার নিকট বিবাহের প্রস্তাব পাঠাইলেন। আবূ বাক্স (রা) তাঁহার সহিত বিবাহে আবদ্ধ হইয়া ওলীমা অনুষ্ঠান করিলেন। উক্ত ওলীমায় অংশগ্রহণকারীগণের মধ্যে 'আলী ইবন আবী তালিব (রা)-ও ছিলেন (আল-বিদায়া ওয়ান-নিহায়া, ৪খ., ২৫৩)।
আসমা' বিন্ত 'উমায়স (রা) ছিলেন জা'ফার (রা)-এর সহধর্মিনী। তিনি বলেন, যেই দিন জা'ফার ও তাঁহার সঙ্গীগণ শহীদ হইয়াছিলেন সেই দিনিই রাসূলুল্লাহ (স) আমার গৃহে পদার্পণ করিয়াছিলেন (সীরাতে হালাবিয়্যা, উরদূ অনু, ৩/৩খ, ৬১)। ইবন ইসহাক তদীয় সূত্রে আসমা' বিন্ত 'উমায়স (রা) হইতে নিম্নোক্ত রিওয়ায়াতটি বর্ণনা করিয়াছেন:
عَنْ أَسْمَاءَ بِنْتِ عُمَيْسٍ قَالَتْ لَمَّا أَصِيبَ جَعْفَرُ وأَصْحَابُهُ دَخَلَ عَلَى رَسُولُ اللهِ ﷺ وَقَدْ دَبَعْتُ أَرْبَعِينَ مَنَاءً وَعَجِنْتُ عَجِيْنِي وَعَسَّلْتُ بَنِي وَدَهَنْتُهُمْ وَنَظَفْتُهُمْ فَقَالَ رَسُولُ الله ﷺ انتنى بِبَنِى جَعْفَرٍ فَآتَيْتُهُ بِهِمْ فَشَمُهُمْ وَزَرَفَتْ عَيْنَاهُ فَقُلْتُ يَا رَسُولُ اللهِ ﷺ بِأَبِي أَنْتَ وَأُمِّي مَا يُبْكَيْكَ ابْلَغَكَ عَنْ جَعْفَرٍ وَأَصْحَابِهِ شَيْ قَالَ نَعَمْ أَصِيبُوا هَذَا الْيَوْمِ قَالَتْ فَقُمْتُ أَصِيْعُ وَاجْتَمَعَ إِلَى النِّسَاءُ وَخَرَجَ وَرَسُولُ اللهِ ﷺ إِلَى أَهْلِهِ فَقَالَ لَا تَغْفَلُوا عَنْ الجَعْفَرٍ أَنْ تَصْنَعُوا لَهُمْ طَعَامًا فَإِنَّهُمْ قَدْ شَغَلُوا بِأَمْرِ صَاحِبِهِمْ.
"আসমা' বিনত 'উমায়স (রা) বলেন, জা'ফার ও তাহার সঙ্গীগণ নিহত হইবার পর রাসূলুল্লাহ (স) আমার নিকট আগমন করিলেন। আমি এই সময় চল্লিশটি চামড়া পাকা করিয়াছিলাম, আমার আটার খামির করিয়াছিলাম, আমার সন্তানদেরকে গোসল করাইয়াছিলাম এবং তাহাদের গায়ে তৈল মাখাইয়া পরিষ্কার-পরিচ্ছন্ন করিয়াছিলাম। আমার গৃহে রাসূলুল্লাহ (স) তাশরীফ আনিয়া বলিলেন, আমার নিকট জা'ফারের সন্তানদিগকে লইয়া আস। আমি তাহাদিগকে তাঁহার নিকট উপস্থিত করিলাম। তিনি তাহাদিগকে আদর করিলেন। তখন তাঁহার নয়নযুগল হইতে অশ্রু ঝরিতেছিল। আমি জিজ্ঞাসা করিলাম, ইয়া রাসূলাল্লাহ! আমার পিতামাতা আপনার উপর কোরবান হউক! আপনি কেন কাঁদিতেছেন? আপনার নিকট জা'ফার ও তাহার সঙ্গীগণ সম্পর্কে কোন সংবাদ পৌছিয়াছে কি? রাসূলুল্লাহ (স) বলিলেন: হাঁ, তাহারা সকলে আজ শাহাদাত লাভ করিয়াছে। আসমা (রা) বলেন, ইহা শুনিয়া আমি দাঁড়াইয়া চিৎকার করিয়া কাঁদিতে লাগিলাম এবং মহিলারা আসিয়া জড়ো হইল। রাসূলুল্লাহ (স) বাহির হইয়া তাঁহার গৃহে গিয়া বলিলেন: জা'ফারের পরিবার সম্পর্কে উদাসীন হইও না। তাহাদিগের জন্য খাবার তৈরী করিতে ভুলিও না। কারণ ইহারা তাহাদিগের কর্তাকে হারাইয়া শোকাভিভূত হইয়া পড়িয়াছে” (আবূ দাউদ, তিরমিযী, ইবন মাজা ও ইমাম আহমাদ ইবন হাম্বল হইতে বর্ণিত হইয়াছে)।
মুহাম্মাদ ইবন ইসহাক 'আইশা (রা) হইতে এই সম্পর্কিত নিম্নোক্ত হাদীছ বর্ণনা করিয়াছেন:
قَالَتْ لَمَّا أَتَى نَعْتُ جَعْفَرٍ عَرَّفْنَا فِي وَجْهِ رَسُولُ اللهِ ﷺ الْحُزْنَ قَالَتْ فَدَخَلَ عَلَيْهِ رَجُلٌ فَقَالَ يَا رَسُولُ اللهِ ﷺ إِنَّ النِّسَاءَ عَيَيْنَنَا وَفَتَنَّنَا قَالَ ارْجِعْ إِلَيْهِنَّ فَأَسْكَتْهُنَّ قَالَتْ فَذَهَبَ ثُمَّ رَجَعَ فَقَالَ لَهُ مِثْلَ ذالك قَالَتْ يَقُولُ وَرُبَّمَا ضَرَّ التَّكَلُّفُ يَعْنِي أَهْلَهُ قَالَتْ قَالَ فَاذْهَبْ فَأَسْكِتْهُنَّ فَإِنْ آبَيْنَ فَاحْتَوا فِي أَفْوَاهِهِنَّ التَّرَابَ قَالَتْ قُلْتُ فِي نَفْسِي أَبْعَدَكَ اللَّهُ فَوَاللَّهِ مَا تَرَكْتَ يَفْسَكَ وَمَا أَنْتَ بِمُطِيعِ رَسُولَ اللهِ ﷺ قَالَتْ وَعَرَفْتُ أَنَّهُ لَا يَقْدِرُ يُحْيِي فِي أَفْوَاهِهِنَّ التَّرَابَ.
"তিনি বলেন, জা'ফারের মৃত্যুসংবাদ আসিয়া পৌছিলে আমরা রাসূলুল্লাহ (স)-এর চেহারায় মনোকষ্টের ছাপ দেখিতে পাইলাম। 'আইশা (রা) বলেন, এমন সময় রাসূলুল্লাহ (স)-এর নিকট এক লোক প্রবেশ করিল। সে বলিল, হে আল্লাহ্র রাসূল! মহিলাগণ আমাদিগকে অবসন্ন করিয়া তুলিয়াছে এবং ফিতনায় পতিত করিয়াছে। রাসূলুল্লাহ (স) বলিলেন, যাও, ইহাদিগকে বারণ কর। 'আইশা (রা) বলেন, লোকটি সেখানে গিয়া আবার ফিরিয়া আসিয়া পূর্বের ন্যায় বলিল। সে আরও বলিতেছিল, অনেক সময় ইহাদিগের ক্রন্দনে তাহার (ঐ লোকের) পরিবার-পরিজনের কষ্ট হয়। তিনি বলিলেন, যাও, ইহাদিগকে নিবৃত্ত কর। যদি তাহারা নিবৃত্ত হইতে অস্বীকৃতি জানায় তাহা হইলে ইহাদিগের মুখে মাটি নিক্ষেপ কর। 'আইশা (রা) বলেন, আমি মনে মনে বলিতেছিলাম, আল্লাহ তোমাকে দূরে রাখুক, আল্লাহ্র শপথ! তুমি নিজেকেও বিরত রাখিতেছ না। আর রাসূলুল্লাহ (স)-এর নির্দেশও পালন করিতে পারিতেছ না। তিনি বলেন, আমি জানিতাম যে, সে ঐ মহিলাদিগের মুখে মাটি নিক্ষেপ করিতে সক্ষম হইবে না"।
এই রিওয়ায়াতটি একমাত্র ইবন ইসহাকই বর্ণনা করিয়াছেন। ইমাম আহমাদ বর্ণিত এই সম্পর্কিত দীর্ঘ একটি হাদীছের শেষাংশে রহিয়াছে:
ثُمَّ أَمْهَلَ الَ جَعْفَرٍ ثَلَاثًا أَنْ يَأْتِيَهُمْ ثُمَّ آتَاهُمْ فَقَالَ لَا تَبْكُوا عَلَى أَخِي بَعْدَ الْيَوْمِ أدْعُوا لِي ابْنَيْ أَخِي قَالَ فَجَنَى بِنَا كَأَنَّنَا أَفْرَخٌ فَقَالَ أَدْعُوا لِي الْحَلَاقَ فَجِيئَ بِالْحَلاقِ فَخَلَقَ رُءُوسَنَا ثُمَّ قَالَ أَمَّا مُحَمَّدٌ فَشَبِيْهُ عَمَّنَا أَبِي طالب وَأَمَّا عَبْدُ اللَّهِ فَشَبِيْهُ خَلْقِى وَخُلُقَى ثُمَّ أَخَذَ بِيَدِى فَأَشَالَهَا وَقَالَ اللَّهُمَّ اخْلُفْ جَعْفَراً فِي أَهْلِهِ بَارِكَ لِعَبْدِ الله في صَفْقَةِ يَمِينِهِ قَالَهَا ثَلَاثَ مَرَّاتٍ قَالَ فَجَاءَتْ أُمُّنَا فَذَكَرَتْ لَهُ يُتْمَنَا وَجَعَلَتْ تُفْرِحُ لَهُ فَقَالَ الْعَيْلَةَ تَخَافِينَ عَلَيْهِمْ وَأَنَا وَلِيُّهُمْ فِي الدُّنْيَا وَالآخِرَةِ.
"অতঃপর রাসূলুল্লাহ (স) জা'ফার (রা)-এর পরিবার-পরিজনের, আগমন করিবার জন্য তিন দিনের অবকাশ দিলেন। অতঃপর তিনি তাহাদের নিকট তাশরীফ আনিলেন ও বলিলেনঃ আমার ভাইয়ের জন্য-আজিকার পর ক্রন্দন করিও না। আমার ভ্রাতুষ্পুত্রগণকে আমার নিকট লইয়া আস। বর্ণনাকারী বলেন, আমাদিগকে আনা হইল আমরা তখন পক্ষি-শাবকের ন্যায় ছিলাম। রাসূলুল্লাহ (স) বলিলেন: আমার নিকট একজন ক্ষৌরকার উপস্থিত কর। একজন ক্ষৌরকার আনা হইলে সে আমাদের মাথা মুণ্ডন করিল। অতঃপর রাসূলুল্লাহ (স) বলিলেন: মুহাম্মাদ (জা'ফার পুত্র) আমার পিতৃব্য আবূ তালিবের সদৃশ্য। 'আবদুল্লাহ (জা'ফার পুত্র) আমার গঠন ও চরিত্র সদৃশ। অতঃপর রাসূলুল্লাহ (স) আমার হাত উত্তোলন করিয়া বলিলেনঃ হে আল্লাহ! তুমি জা'ফার পরিবারের অভিভাবক হইয়া যাও। 'আবদুল্লাহ্র ব্যবসা-বাণিজ্যে বরকত দাও। তিনি ইহা তিনবার বলিলেন। অতঃপর আমার মাতা আগমন করিয়া আমাদের পিতৃহীনতার কথা উল্লেখ করিতে লাগিলেন এবং তাহার দুঃখ-বেদনার কথা ব্যক্ত করিতে লাগিলেন। রাসূলুল্লাহ (স) বলিলেন: তুমি দারিদ্র্যের চিন্তা করিতেছ? অথচ ইহকাল ও পরকালে আমি তাহাদের অভিভাবক” (মুসনাদে আহমাদ, ১খ., পৃ. ২০৪, নং ১৭৫০; আবূ দাউদ, তারাজ্জল, বাব ফী হালকির রাস, নং ৪১৯২)।
ইমাম নাসাঈ কিতাবুস সিয়ারে সম্পূর্ণ হাদীছ বর্ণনা করিয়াছেন। উক্ত হাদীছ দ্বারা এই কথা প্রমাণিত হয় যে, রাসূলুল্লাহ (স) জা'ফায় পরিবারকে তিনদিন ক্রন্দন করিবার অর্থাৎ শোক পালনের অনুমতি দান করিয়াছিলেন, তিনদিন পর তাহা নিষিদ্ধ করিয়াছেন। ইমাম আহমাদ আল-হাকাম ইবন 'আবدিল্লাহ ইব্ন শাদ্দাদ সূত্রে আসমা (রা) হইতে বর্ণনা করিয়াছেন: إِنَّ رَسُولَ اللهِ ﷺ قَالَ لَهَا لَمَّا أُصِيْبَ جَعْفَرُ تُسَلِّبِي ثَلَاثًا ثُمَّ اصْنَعِي مَا شِئْتِ.
"জা'ফার (রা) নিহত হইবার পর রাসূলুল্লাহ (স) আসমা (রা)-কে বলিয়াছিলেনঃ তুমি ভিম দিন গভীরভাবে শোক পালন কর, ইহার পর যাহা ইচ্ছা তাহা কর"।
ইহা ইমাম আহমাদ হইতে এককভাবে বর্ণিত। এই হাদীছ দ্বারা এই কথা প্রমাণিত হইবার সম্ভাবনা আছে যে, রাসূলুল্লাহ (س) আসমা' (রা)-কে 'তাসাল্লুব' অর্থাৎ অধিক ক্রন্দন ও কাপড়াদি ফাঁড়িয়া ক্রন্দন করার অনুমতি প্রদান করিয়াছিলেন। ইহা তাহার জন্য বিশেষভাবে অনুমতি ছিল জা'ফারের বিয়োগান্তে তিনি অধিক মাত্রায় ভাঙ্গিয়া পড়ায়। ইহারও সম্ভাবনা আছে যে, 'তাসাল্লুব' অর্থ হইল সাজ-সজ্জা অধিক মাত্রায় তিন দিন পর্যন্ত পরিত্যাগ করা। ইহার পর অন্যান্য 'ইদ্দত পালনকারিনিগণ যেইভাবে সাজ-সজ্জা পরিত্যাগ করিয়া ইদ্দত পালন করিয়া থাকে সেইভাবে যাহা ইচ্ছা তাহা করা। কেহ কেহ تسلبى ثَلَاثًا যাহার আরবী অর্থ تصبری ثَلَاثً (তিন দিন ধৈর্য ধারণ কর)। কিন্তু এইরূপ পাঠ অন্যান্য রিওয়ায়াতের পরিপন্থী।
ইমাম আহমদের এই সম্পর্কিত আরও একটি বর্ণনা পাওয়া যায়, যাহা নিম্নরূপ:
عَنْ أَسْمَاءَ بِنْتِ عُمَيْسٍ قَالَتْ دَخَلَ رَسُولُ اللهِ ﷺ الْيَوْمَ الثَّالِثِ مِنْ قَتْلِ جَعْفَرٍ فَقَالَ لا تُحدِّى بَعْدَ يَوْمِك هذا .
"আসমা বিন্ত 'উমায়س (রা) বলেন, রাসূলুল্লাহ (স) জা'ফার নিহত হইবার তৃতীয় দিন (আমার গৃহে) প্রবেশ করিলেন। অতঃপর তিনি বলিলেন: এই দিনের পর তুমি আর শোক প্রকাশ করিও না"।
ইহাও ইমাম আহমাদের একক বর্ণনা। ইহার সনদে কোন আপত্তি নাই। তবে শাব্দিক অর্থে হাদীছ গ্রহণ করিলে একটি প্রশ্ন উত্থাপিত হয়। তাহা হইল, সহীহ বুখারী ও মুসলিমে বর্ণিত আছে, রাসূলুল্লাহ (স) বলিয়াছেনঃ لا يَحِلُّ لَامْرَأَهِ تُؤْمِنُ بِاللَّهِ وَالْيَوْمِ الآخِرِ أَنْ تَحِدَّ عَلَى مَيِّتِهَا أَكْثَرَ مِنْ ثَلَاثَةِ أَيَّامٍ إِلَّا علَى زَوْجِ أَرْبَعَةَ أَشْهُرٍ وَعَشْرًا .
"যেই মহিলা আল্লাহ ও কিয়ামত দিবসের উপর ঈমান রাখে তাহার জন্য মৃত ব্যক্তির উপর তিন দিনের অধিক শোক পালন করা বৈধ নহে। তবে সে তাহার স্বামীর জন্য চার মাস দশ দিন শোক পালন করিবে"।
এই হাদীছে স্বামীর জন্য চার মাস দশ দিন শোক পালন করার কথা বলা হইয়াছে। কিন্তু ইহার বিপরীত উপরোল্লিখিত হাদীছে আসমা (রা)-কে রাসূলুল্লাহ (স) তিন দিনের অধিক শোক পালন করা হইতে নিষেধ করিয়াছেন। সুতরাং এই সম্পর্কে সমাধান এই যে, যদি ইমাম আহমাদ কর্তৃক বর্ণিত রিওয়ায়াতকে সঠিক (محفوظ) গণ্য করা হয় তাহা হইলে ইহা হইবে কেবল এই ঘটনার জন্যই নির্দিষ্ট। অথবা বলা হইবে, এই হাদীছে কেবল এই তিন দিন অধিক মাত্রায় শোক পালনের আদেশ ছিল যাহা ইতোপূর্বে আলোচিত হইয়াছে (আল-বিদায়া ওয়ান-নিহায়া, ৪খ., ২৫০-২৫২)।
আসমা বিন্ত 'উমায়س (রা) তাঁহার স্বামী জা'ফার (রা)-এর মৃত্যুতে নিম্নোক্ত শোক গাহন আবৃত্তি করিয়াছিলেন:
قَالَيْتُ لَا تَنْفَكُ نَفْسِي حَزِينَةً عَلَيْكَ وَلَا يَنْفَكُ جِلْدِي أَغْبَرَ. فَلِلَّهِ عَيْنًا مَنْ رَأَى مِثْلَهُ فَتًى - أَكَرُّوا حُمى فِي الْهَيَاجِ وَأَصْبَرَا.
"আমি শপথ করিয়া বলিতেছি, আমার হৃদয় তোমার মর্মবেদনা হইতে বিচ্ছিন্ন হইবে না এবং আমার ত্বক ধুলাবালি মুক্ত হইবে না।
"আল্লাহ্র শপথ! এমন কোন চক্ষু দেখা যায় নাই যে তাঁহার মত যুদ্ধে পাল্টা আক্রমণকারী, কঠোর হস্তে দমনকারী ও সহনশীল যুবক দেখিয়াছে"।
অতঃপর আসমা (রা)-এর 'ইদ্দত পূর্ণ হইয়া গেলে আবূ বাক্স (রা) তাঁহার নিকট বিবাহের প্রস্তাব পাঠাইলেন। আবূ বাক্স (রা) তাঁহার সহিত বিবাহে আবদ্ধ হইয়া ওলীমা অনুষ্ঠান করিলেন। উক্ত ওলীমায় অংশগ্রহণকারীগণের মধ্যে 'আলী ইবন আবী তালিব (রা)-ও ছিলেন (আল-বিদায়া ওয়ান-নিহায়া, ৪খ., ২৫৩)।
📄 সৈন্যবাহিনীর মদীনা প্রত্যাবর্তন এবং রাসূলুল্লাহ (স)-এর অভ্যর্থনা
এই যুদ্ধ মোট সাত দিন অব্যাহত ছিল (সীরাতে হালাবিয়্যা, উর্দু অনুবাদ, ৩/৩খ., ৫৯)। সৈন্যবাহিনী মৃতা হইতে মদীনায় পৌঁছিবার সময় রাসূলুল্লাহ (স) তাহাদিগকে অভ্যর্থনা জানাইয়াছিলেন। শিশুরা দৌঁড়াইয়া বাহির হইয়াও তাহাদিগকে অভ্যর্থনা জ্ঞাপন করিয়াছিল (আল-বিদায়া ওয়ান-নিহায়া; ইব্ন হিশাম, আস-সীরাতুন নাবabিয়্যা, ৩খ., ২৬৬)।
এই যুদ্ধ মোট সাত দিন অব্যাহত ছিল (সীরাতে হালাবিয়্যা, উরদূ অনু, ৩/৩খ., ৫৯)। সৈন্যবাহিনী মৃতা হইতে মদীনায় পৌঁছিবার সময় রাসূলুল্লাহ (স) তাহাদিগকে অভ্যর্থনা জানাইয়াছিলেন। শিশুরা দৌঁড়াইয়া বাহির হইয়াও তাহাদিগকে অভ্যর্থনা জ্ঞাপন করিয়াছিল (আল-বিদায়া ওয়ান-নিহায়া; ইব্ন হিশাম, আস-সীরাতুন নাবabিয়্যা, ৩খ., ২৬৬)।
এই যুদ্ধ মোট সাত দিন অব্যাহত ছিল (সীরাতে হালাবিয়্যা, উর্দু অনুবাদ, ৩/৩খ., ৫৯)। সৈন্যবাহিনী মৃতা হইতে মদীনায় পৌঁছিবার সময় রাসূলুল্লাহ (স) তাহাদিগকে অভ্যর্থনা জানাইয়াছিলেন। শিশুরা দৌঁড়াইয়া বাহির হইয়াও তাহাদিগকে অভ্যর্থনা জ্ঞাপন করিয়াছিল (আল-বিদায়া ওয়ান-নিহায়া; ইব্ن হিশাম, আস-সীরাতুন নাবابিয়্যা, ৩খ., ২৬৬)।
📄 যায়দ ইব্ন হারিছা (রা)-এর পরিচিতি ও মর্যাদা
তিনি ছিলেন রাসূলুল্লাহ (স)-এর মুক্ত দাস। যায়দ-এর গোলাম হইবার বিবরণ নিম্নরূপ: তাঁহার মাতা তাঁহাকে সঙ্গে লইয়া পিত্রালয়ে যাইবার সময় দস্যুরা তাহাদের উপর আক্রমণ
করিয়া যায়দ (রা)-কে অপহরণ করিয়া লইয়া যায়। ইহার পর তাহাকে বিক্রয় করিলে হাকীম ইবন হিযাম স্বীয় ফুফু খাদীজা বিন্ত খুওয়ায়লিদের জন্য ক্রয় করেন [কেহ কেহ বলিয়াছেন রাসূলুল্লাহ (স) তাহাকে খাদীজা (রা)-এর জন্য ক্রয় করিয়াছিলেন]। খাদীজা (রা)-এর নুবুওয়াত লাভের পূর্বে রাসূলুল্লাহ (স)-এর খেদমতের জন্য যায়দকে উপহার দেন। যায়দের পিতা তাহার সন্ধান পাইয়া তাহাকে নেওয়ার জন্য রাসূলুল্লাহ (স)-এর নিকট আগমন করিলেন। রাসূলুল্লাহ (স) যায়দকে পিতার সঙ্গে যাওয়ার অথবা না যাওয়ার অবকাশ দিলেন। যায়দ রাসূলুল্লাহ (স)-এর নিকট থাকাকেই প্রাধান্য দিলেন। রাসুলুল্লাহ (স) তাহাকে মুক্ত করিয়া দিয়া নিজের পালক পুত্র হিসাবে গ্রহণ করিলেন। এই জন্য তাহাকে যায়দ ইবন মুহাম্মাদ বলা হইত। রাসূলুল্লাহ (স) তাহাকে আন্তরিকভাবে ভালবাসিতেন। তিনি ছিলেন গোলামদের মধ্যে সর্বপ্রথম ইসলাম গ্রহণকারী সাহাবী। তাঁহার সম্পর্কে আল-কুরআনের চারটি আয়াত অবতীর্ণ হয়। তাহা হইলঃ
وَمَا جَعَلَ أَدْعِيَاءَكُمْ أَبْنَاءَكُمْ : "আর তোমাদের পোষ্যপুত্রদিগকে তিনি তোমাদের পুত্র করেন নাই” (৩৩:৪)।
ادْعُوهُمْ لِآبَائِهِمْ هُوَ أَقْسَطُ عِنْدَ اللَّهِ. "তোমরা তাহাদিগকে ডাক তাহাদের পিতৃ-পরিচয়ে; আল্লাহর দৃষ্টিতে ইহা অধিক ন্যায়সংগত” (৩৩:৫)।
مَا كَانَ مُحَمَّدٌ أَبَا أَحَدٍ مِّنْ رِّجَالِكُمْ. "মুহাম্মাদ তোমাদের মধ্যে কোন পুরুষের পিতা নয়” (৩৩:৪০)।
وَاِذْ تَقُولُ لِلَّذِي أَنْعَمَ اللَّهُ عَلَيْهِ وَاَنْعَمْتَ عَلَيْهِ أَمْسِكَ عَلَيْكَ زَوْجَكَ وَاتَّقِ اللَّهَ وَتُخْفِى فِي نَفْسِكَ مَا اللَّهُ مُبْدِيْهِ وَتَخْشَى النَّاسِ وَاللَّهُ أَحَقُّ أَنْ تَخْشَهُ فَلَمَّا قَضَى زَيْدٌ مِّنْهَا وَطَرًا زَوَّجْنَاكَهَا . "স্মরণ কর, আল্লাহ যাহাকে অনুগ্রহ করিয়াছেন এবং তুমিও যাহার প্রতি অনুগ্রহ করিয়াছ, তুমি তাহাকে বলিতেছিলে, তুমি তোমার স্ত্রীর সহিত সম্পর্ক বজায় রাখ এবং আল্লাহকে ভয় কর। তুমি তোমার অন্তরে যাহা গোপন করিতেছ আল্লাহ তাহা প্রকাশ করিয়া দিতেছেন। তুমি লোকভয় করিতেছিলে, অথচ আল্লাহকে ভয় করা তোমার পক্ষে অধিকতর সংগত। অতঃপর যায়দ যখন যয়নবের সহিত বিবাহ সম্পর্ক ছিন্ন করিল, তখন আমি তাহাকে তোমার সহিত পরিণয়সূত্রে আবদ্ধ করিলাম” (৩৩: ৩৭)।
তাফসীরবিদগণ ঐকমত্য পোষণ করিয়াছেন যে, উপরিউক্ত আয়াতগুলি যায়দ (রা) সম্পর্কে অবতীর্ণ হইয়াছিল। মহান আল্লাহ যায়দ (রা) ব্যতীত আর কোন সাহাবীর কথা আল-কুরআনে উল্লেখ করেন নাই। রাসূলুল্লাহ (স) তাহাকে আযাদ করিয়া তদীয় বাঁদী উম্মু আয়মান (রা)-কে তাহার সহিত বিবাহ দিয়াছিলেন। উম্মু আয়মানের নাম ছিল বারাকা। তাহার গর্ভে যায়দ
(রা)-এর পুত্র উসামা (রা)-এর জন্ম হইয়াছিল। উসামা (রা)-কে বলা হইত الحب بن الحب 'প্রিয়ের পুত্র প্রিয়'। ইহার পর রাসূলুল্লাহ (স) তদীয় ফুফাত বোন যয়নব বিন্ত জাহ্ (রা)-কে তাঁহার সহিত বিবাহ দিয়াছিলেন। রাসূলুল্লাহ (স) স্বীয় চাচা হামযা ইব্ন 'আবদুল মুত্তালিবের সহিত তাঁহার ভ্রাতৃত্বের বন্ধন জুড়িয়া দিয়াছিলেন এবং মৃতা অভিযানে স্বীয় চাচাত ভাই জা'ফার ইবন আবী তালিবের উপর নেতৃত্ব দানে যায়দ (রা)-কে অগ্রাধিকার দিয়াছিলেন। ইমাম আহমাদ ও হাফিজ আবূ বাক্ ইব্ন আবী শায়বা বর্ণনা করেন:
حَدَّثَنَا مُحَمَّدُ بْنُ عُبَيْدِ اللهِ عَنْ وَائِلِ بْنِ دَاوُدَ سَمِعْتُ الْبُهَى يُحَدِّثُ أَنَّ عَائِشَةَ كَانَتْ تَقُولُ مَا بَعْتَ رَسُولُ اللَّهِ ﷺ زَيْدَ بْنَ حَارِثَةَ فِي سَرِيَّةِ إِلَّا أَمْرَهُ عَلَيْهِمْ وَلَوْ بَقِي بَعْدُ لاسْتَخْلَفَهُ.
"বুহায়্য হইতে বর্ণিত। 'আইশা (রা) বলেন, রাসূলুল্লাহ (স) যেই সারিয়াতেই যায়দ ইব্ন হারিছাকে প্রেরণ করিতেন সেখানে তাহাকে সেনাপতি নিযুক্ত করিতেন। যদি তিনি পরবর্তী কালেও জীবিত থাকিতেন তাহা হইলে অবশ্যই তাহাকে খলীফা নিযুক্ত করিতেন"।
এই রিওয়ায়াতটি ইমাম নাসাঈ, আহমাদ ইবন সালমান সূত্রে এবং তিনি মুহাম্মাদ ইবন 'উবায়দ আত-তানাফিসীর বরাতে বর্ণনা করিয়াছেন। এই রিওয়ায়াত সহীহ হইবার শর্তে উত্তম ও শক্তিশালী, তবে ইহা অত্যন্ত অপরিচিত )ا (غریب
সেনাপতি জা'ফার ইবন আবী তালিব (রা)-এর পরিচিতি ও মর্যাদাঃ তিনি ছিলেন রাসূলুল্লাহ (স)-এর চাচাত ভাই। তিনি তাঁহার ভাই 'আলী (রা) হইতে বয়সে দশ বৎসর বড় ছিলেন। তাঁহার অপর ভাই 'আকীল বয়সে তাহার হইতে দশ বৎসর বড় ছিলেন। আর তাঁহার আরও এক ভাই তালিব 'আকীল হইতে দশ বৎসর বড় ছিলেন।
জা'ফার (রা) ইসলামের প্রাথমিক যুগে ইসলাম গ্রহণ করেন। তিনি হাবশায় হিজরত করিয়াছিলেন এবং সেখানে তিনি প্রচুর প্রশংসা কুড়াইয়াছিলেন। তথায় তাঁহার অবস্থানও ছিল খুবই সুদৃঢ়। হাবশা হইতে তিনি খায়বার যুদ্ধের সময় রাসূলুল্লাহ (স)-এর নিকট আসিয়াছিলেন। এই সময় রাসূলুল্লাহ (স) বলিয়াছিলেন:
مَا أَدْرِي أَنَا بَأَيِّهِمَا أَسَرَّ أَبْقُدُومٍ جَعْفَرٍ أَمْ بِفَتْحِ خَيْبَرَ.
"কি কারণে আমি এত আনন্দিত, জা'ফারের আগমনে, না খায়বার বিজয়ে"!
'উমরাতুল কাদার উদ্দেশ্যে সাহাবায়ে কিরাম (রা) রওয়ানা করিলে রাসূলুল্লাহ (স) জা'ফার (রা)-র উদ্দেশ্যে বলিয়াছিলেন:
أَشْبَهْتَ خَلْقِي وَخُلُقِى
তিনি ছিলেন রাসূলুল্লাহ (স)-এর মুক্ত দাস। যায়দ-এর গোলাম হইবার বিবরণ নিম্নরূপ: তাঁহার মাতা তাঁহাকে সঙ্গে লইয়া পিত্রালয়ে যাইবার সময় দস্যুরা তাহাদের উপর আক্রমণ করিয়া যায়দ (রা)-কে অপহরণ করিয়া লইয়া যায়। ইহার পর তাহাকে বিক্রয় করিলে হাকীম ইবন হিযাম স্বীয় ফুফু খাদীজা বিন্ত খুওয়ায়লিদের জন্য ক্রয় করেন [কেহ কেহ বলিয়াছেন রাসূলুল্লাহ (স) তাহাকে খাদীজা (রা)-এর জন্য ক্রয় করিয়াছিলেন]। খাদীজা (রা)-এর নুবুওয়াত লাভের পূর্বে রাসূলুল্লাহ (স)-এর খেদমতের জন্য যায়দকে উপহার দেন। যায়দের পিতা তাহার সন্ধান পাইয়া তাহাকে নেওয়ার জন্য রাসূলুল্লাহ (স)-এর নিকট আগমন করিলেন। রাসূলুল্লাহ (স) যায়দকে পিতার সঙ্গে যাওয়ার অথবা না যাওয়ার অবকাশ দিলেন। যায়দ রাসূলুল্লাহ (স)-এর নিকট থাকাকেই প্রাধান্য দিলেন। রাসুলুল্লাহ (স) তাহাকে মুক্ত করিয়া দিয়া নিজের পালক পুত্র হিসাবে গ্রহণ করিলেন। এই জন্য তাহাকে যায়দ ইবন মুহাম্মাদ বলা হইত। রাসূলুল্লাহ (স) তাহাকে আন্তরিকভাবে ভালবাসিতেন। তিনি ছিলেন গোলামদের মধ্যে সর্বপ্রথম ইসলাম গ্রহণকারী সাহাবী। তাঁহার সম্পর্কে আল-কুরআনের চারটি আয়াত অবতীর্ণ হয়। তাহা হইলঃ
وَمَا جَعَلَ أَدْعِيَاءَكُمْ أَبْنَاءَكُمْ : "আর তোমাদের পোষ্যপুত্রদিগকে তিনি তোমাদের পুত্র করেন নাই” (৩৩:৪)।
ادْعُوهُمْ لِآبَائِهِمْ هُوَ أَقْسَطُ عِنْدَ اللَّهِ. "তোমরা তাহাদিগকে ডাক তাহাদের পিতৃ-পরিচয়ে; আল্লাহর দৃষ্টিতে ইহা অধিক ন্যায়সংগত” (৩৩:৫)।
مَا كَانَ مُحَمَّدٌ أَبَا أَحَدٍ مِّنْ رِّجَالِكُمْ. "মুহাম্মাদ তোমাদের মধ্যে কোন পুরুষের পিতা নয়” (৩৩:৪০)।
وَاِذْ تَقُولُ لِلَّذِي أَنْعَمَ اللَّهُ عَلَيْهِ وَاَنْعَمْتَ عَلَيْهِ أَمْسِكَ عَلَيْكَ زَوْجَكَ وَاتَّقِ اللَّهَ وَتُخْفِى فِي نَفْسِكَ مَا اللَّهُ مُبْدِيْهِ وَتَخْشَى النَّاسِ وَاللَّهُ أَحَقُّ أَنْ تَخْشَهُ فَلَمَّا قَضَى زَيْدٌ مِّنْهَا وَطَرًا زَوَّجْنَاكَهَا . "স্মরণ কর, আল্লাহ যাহাকে অনুগ্রহ করিয়াছেন এবং তুমিও যাহার প্রতি অনুগ্রহ করিয়াছ, তুমি তাহাকে বলিতেছিলে, তুমি তোমার স্ত্রীর সহিত সম্পর্ক বজায় রাখ এবং আল্লাহকে ভয় কর। তুমি তোমার অন্তরে যাহা গোপন করিতেছ আল্লাহ তাহা প্রকাশ করিয়া দিতেছেন। তুমি লোকভয় করিতেছিলে, অথচ আল্লাহকে ভয় করা তোমার পক্ষে অধিকতর সংগত। অতঃপর যায়দ যখন যয়নবের সহিত বিবাহ সম্পর্ক ছিন্ন করিল, তখন আমি তাহাকে তোমার সহিত পরিণয়সূত্রে আবদ্ধ করিলাম” (৩৩: ৩৭)।
তাফসীরবিদগণ ঐকমত্য পোষণ করিয়াছেন যে, উপরিউক্ত আয়াতগুলি যায়দ (রা) সম্পর্কে অবতীর্ণ হইয়াছিল। মহান আল্লাহ যায়দ (রা) ব্যতীত আর কোন সাহাবীর কথা আল-কুরআনে উল্লেখ করেন নাই। রাসূলুল্লাহ (স) তাহাকে আযাদ করিয়া তদীয় বাঁদী উম্মু আয়মান (রা)-কে তাহার সহিত বিবাহ দিয়াছিলেন। উম্মু আয়মানের নাম ছিল বারাকা। তাহার গর্ভে যায়দ (রা)-এর পুত্র উসামা (রা)-এর জন্ম হইয়াছিল। উসামা (রা)-কে বলা হইত الحب بن الحب 'প্রিয়ের পুত্র প্রিয়'। ইহার পর রাসূলুল্লাহ (স) তদীয় ফুফাত বোন যয়নব বিন্ত জাহ্ (রা)-কে তাঁহার সহিত বিবাহ দিয়াছিলেন। রাসূলুল্লাহ (স) স্বীয় চাচা হামযা ইব্ন 'আবদুল মুত্তালিবের সহিত তাঁহার ভ্রাতৃত্বের বন্ধন জুড়িয়া দিয়াছিলেন এবং মৃতা অভিযানে স্বীয় চাচাত ভাই জা'ফার ইবন আবী তালিবের উপর নেতৃত্ব দানে যায়দ (রা)-কে অগ্রাধিকার দিয়াছিলেন। ইমাম আহমাদ ও হাফিজ আবূ বাক্ ইব্ন আবী শায়বা বর্ণনা করেন:
حَدَّثَنَا مُحَمَّدُ بْنُ عُبَيْدِ اللهِ عَنْ وَائِلِ بْنِ دَاوُدَ سَمِعْتُ الْبُهَى يُحَدِّثُ أَنَّ عَائِشَةَ كَانَتْ تَقُولُ مَا بَعْتَ رَسُولُ اللَّهِ ﷺ زَيْدَ بْنَ حَارِثَةَ فِي سَرِيَّةِ إِلَّا أَمْرَهُ عَلَيْهِمْ وَلَوْ بَقِي بَعْدُ لاسْتَخْلَفَهُ.
"বুহায়্য হইতে বর্ণিত। 'আইশা (রা) বলেন, রাসূলুল্লাহ (স) যেই সারিয়াতেই যায়দ ইব্ন হারিছাকে প্রেরণ করিতেন সেখানে তাহাকে সেনাপতি নিযুক্ত করিতেন। যদি তিনি পরবর্তী কালেও জীবিত থাকিতেন তাহা হইলে অবশ্যই তাহাকে খলীফা নিযুক্ত করিতেন"।
এই রিওয়ায়াতটি ইমাম নাসাঈ, আহমাদ ইবন সালমান সূত্রে এবং তিনি মুহাম্মাদ ইবন 'উবায়দ আত-তানাফিসীর বরাতে বর্ণনা করিয়াছেন। এই রিওয়ায়াত সহীহ হইবার শর্তে উত্তম ও শক্তিশালী, তবে ইহা অত্যন্ত অপরিচিত )ا (غریب।
তিনি ছিলেন রাসূলুল্লাহ (স)-এর মুক্ত দাস। যায়দ-এর গোলাম হইবার বিবরণ নিম্নরূপ: তাঁহার মাতা তাঁহাকে সঙ্গে লইয়া পিত্রালয়ে যাইবার সময় দস্যুরা তাহাদের উপর আক্রমণ করিয়া যায়দ (রা)-কে অপহরণ করিয়া লইয়া যায়। ইহার পর তাহাকে বিক্রয় করিলে হাকীম ইবন হিযাম স্বীয় ফুফু খাদীজা বিন্ত খুওয়ায়লিদের জন্য ক্রয় করেন [কেহ কেহ বলিয়াছেন রাসূলুল্লাহ (স) তাহাকে খাদীজা (রা)-এর জন্য ক্রয় করিয়াছিলেন]। খাদীজা (রা)-এর নুবুওয়াত লাভের পূর্বে রাসূলুল্লাহ (স)-এর খেদমতের জন্য যায়দকে উপহার দেন। যায়দের পিতা তাহার সন্ধান পাইয়া তাহাকে নেওয়ার জন্য রাসূলুল্লাহ (স)-এর নিকট আগমন করিলেন। রাসূলুল্লাহ (স) যায়দকে পিতার সঙ্গে যাওয়ার অথবা না যাওয়ার অবকাশ দিলেন। যায়দ রাসূলুল্লাহ (স)-এর নিকট থাকাকেই প্রাধান্য দিলেন। রাসুলুল্লাহ (স) তাহাকে মুক্ত করিয়া দিয়া নিজের পালক পুত্র হিসাবে গ্রহণ করিলেন। এই জন্য তাহাকে যায়দ ইবন মুহাম্মাদ বলা হইত। রাসূলুল্লাহ (স) তাহাকে আন্তরিকভাবে ভালবাসিতেন। তিনি ছিলেন গোলামদের মধ্যে সর্বপ্রথম ইসলাম গ্রহণকারী সাহাবী। তাঁহার সম্পর্কে আল-কুরআনের চারটি আয়াত অবতীর্ণ হয়। তাহা হইলঃ
وَمَا جَعَلَ أَدْعِيَاءَكُمْ أَبْنَاءَكُمْ : "আর তোমাদের পোষ্যপুত্রদিগকে তিনি তোমাদের পুত্র করেন নাই” (৩৩:৪)।
ادْعُوهُمْ لِآبَائِهِمْ هُوَ أَقْسَطُ عِنْدَ اللَّهِ. "তোমরা তাহাদিগকে ডাক তাহাদের পিতৃ-পরিচয়ে; আল্লাহর দৃষ্টিতে ইহা অধিক ন্যায়সংগত” (৩৩:৫)।
مَا كَانَ مُحَمَّدٌ أَبَا أَحَدٍ مِّنْ رِّجَالِكُمْ. "মুহাম্মাদ তোমাদের মধ্যে কোন পুরুষের পিতা নয়” (৩৩:৪০)।
وَاِذْ تَقُولُ لِلَّذِي أَنْعَمَ اللَّهُ عَلَيْهِ وَاَنْعَمْتَ عَلَيْهِ أَمْسِكَ عَلَيْكَ زَوْجَكَ وَاتَّقِ اللَّهَ وَتُخْفِى فِي نَفْسِكَ مَا اللَّهُ مُبْدِيْهِ وَتَخْشَى النَّاسِ وَاللَّهُ أَحَقُّ أَنْ تَخْشَهُ فَلَمَّا قَضَى زَيْدٌ مِّنْهَا وَطَرًا زَوَّجْنَاكَهَا . "স্মরণ কর, আল্লাহ যাহাকে অনুগ্রহ করিয়াছেন এবং তুমিও যাহার প্রতি অনুগ্রহ করিয়াছ, তুমি তাহাকে বলিতেছিলে, তুমি তোমার স্ত্রীর সহিত সম্পর্ক বজায় রাখ এবং আল্লাহকে ভয় কর। তুমি তোমার অন্তরে যাহা গোপন করিতেছ আল্লাহ তাহা প্রকাশ করিয়া দিতেছেন। তুমি লোকভয় করিতেছিলে, অথচ আল্লাহকে ভয় করা তোমার পক্ষে অধিকতর সংগত। অতঃপর যায়দ যখন যয়নবের সহিত বিবাহ সম্পর্ক ছিন্ন করিল, তখন আমি তাহাকে তোমার সহিত পরিণয়সূত্রে আবদ্ধ করিলাম” (৩৩: ৩৭)।
তাফসীরবিদগণ ঐকমত্য পোষণ করিয়াছেন যে, উপরিউক্ত আয়াতগুলি যায়দ (রা) সম্পর্কে অবতীর্ণ হইয়াছিল। মহান আল্লাহ যায়দ (রা) ব্যতীত আর কোন সাহাবীর কথা আল-কুরআনে উল্লেখ করেন নাই। রাসূলুল্লাহ (স) তাহাকে আযাদ করিয়া তদীয় বাঁদী উম্মু আয়মান (রা)-কে তাহার সহিত বিবাহ দিয়াছিলেন। উম্মু আয়মানের নাম ছিল বারাকা। তাহার গর্ভে যায়দ (রা)-এর পুত্র উসামা (রা)-এর জন্ম হইয়াছিল। উসামা (রা)-কে বলা হইত الحب بن الحب 'প্রিয়ের পুত্র প্রিয়'। ইহার পর রাসূলুল্লাহ (স) তদীয় ফুফাত বোন যয়নব বিন্ত জাহ্ (রা)-কে তাঁহার সহিত বিবাহ দিয়াছিলেন। রাসূলুল্লাহ (স) স্বীয় চাচা হামযা ইব্ن 'আবদুল মুত্তালিবের সহিত তাঁহার ভ্রাতৃত্বের বন্ধন জুড়িয়া দিয়াছিলেন এবং মৃতা অভিযানে স্বীয় চাচাত ভাই জা'ফার ইবন আবী তালিবের উপর নেতৃত্ব দানে যায়দ (রা)-কে অগ্রাধিকার দিয়াছিলেন। ইমাম আহমাদ ও হাফিজ আবূ বাক্ ইব্ن আবী শায়বা বর্ণনা করেন:
حَدَّثَنَا مُحَمَّدُ بْنُ عُبَيْدِ اللهِ عَنْ وَائِلِ بْنِ دَاوُدَ سَمِعْتُ الْبُهَى يُحَدِّثُ أَنَّ عَائِشَةَ كَانَتْ تَقُولُ مَا بَعْتَ رَسُولَ اللَّهِ ﷺ زَيْدَ بْنَ حَارِثَةَ فِي سَرِيَّةِ إِلَّا أَمْرَهُ عَلَيْهِمْ وَلَوْ بَقِي بَعْدُ لاسْتَخْلَفَهُ.
"বুহায়্য হইতে বর্ণিত। 'আইশা (রা) বলেন, রাসূলুল্লাহ (স) যেই সারিয়াতেই যায়দ ইব্ن হারিছাকে প্রেরণ করিতেন সেখানে তাহাকে সেনাপতি নিযুক্ত করিতেন। যদি তিনি পরবর্তী কালেও জীবিত থাকিতেন তাহা হইলে অবশ্যই তাহাকে খলীফা নিযুক্ত করিতেন"।
এই রিওয়ায়াতটি ইমাম নাসাঈ, আহমাদ ইবন সালমান সূত্রে এবং তিনি মুহাম্মাদ ইবন 'উবায়দ আত-তানাফিসীর বরাতে বর্ণনা করিয়াছেন। এই রিওয়ায়াত সহীহ হইবার শর্তে উত্তম ও শক্তিশালী, তবে ইহা অত্যন্ত অপরিচিত )ا (غریب
📄 সেনাপতি 'আবদুল্লাহ ইন্ন রাওয়াহা (রা)-এর পরিচিতি ও মর্যাদা
‘আবদুল্লাহ ইবন রাওয়াহা (রা)-র ডাকনাম ছিল আবু মুহাম্মাদ, আবু রাওয়াহাও বলা হইত। তিনি ইসলামের প্রাথমিক যুগে মুসলমান হইয়াছিলেন। আল-আকাবাতে তিনি অংশগ্রহণ করিয়াছিলেন। বানুল হারিছ ইবনুল খায়রাজ যেই রাত্রিতে রাসূলুল্লাহ (স)-এর নিকট বায়‘আত গ্রহণ করিয়াছিলেন সেই রাত্রির নেতাগণের একজন ছিলেন তিনি। উমরাতুল কাযাতেও তিনি শরীফ ছিলেন। তিনি ঐ দিন রাসূলুল্লাহ (স)-এর-উষ্ট্রীর লাগাম আঁকড়াইয়া ধরিয়া প্রবেশ করিয়াছিলেন। এই সময় তাঁহার মুখের বাণী ছিল :
خَلُّوا بَنِي الْكُفَّارِ عَنْ سَبِيلِهِ
মৃতা দিবসে শাহাদাত বরণকারী নেতাগণের তিনি অন্তর্ভুক্ত ছিলেন। রোমানদের সহিত লড়িতে তিনি মুসলিম বাহিনীকে অভয় দিয়াছিলেন। তাঁহার শাহাদাত লাভ সম্পর্কে রাসূলুল্লাহ (স) সাক্ষী দিয়াছেন, তিনি নিশ্চিতভাবে জানাতী। রাসূলুল্লাহ (স) যখন তাঁহাদিগকে বিদায় সম্ভাষণ জানাইতেছিলেন তখন তিনি এই কবিতা আবৃত্তি করিতেছিলেন :
فَثَبَّتَ اللهُ مَا آتَاكَ مِنْ حَسَنٍ - تَثْبِيتَ مُوسَى وَنَصْرًا كَالَّذِي نُصِرُوْ
তাঁহার কবিতা শুনিয়া রাসূলুল্লাহ (স) বলিয়াছিলেন: وَأَنْتَ فَثَبَّتَكَ اللهُ “আল্লাহ তোমake অটল রাখুন”। হিশাম ইবন উরওয়া বলেন, وَدَخَلَ الْجَنَّةَ حَتَّى قُتِلَ شَهِيدًا (আল্লাহ তাঁহাকে অবিচল রাখিবার ফলে তিনি শহীদ হইয়াছেন এবং জান্নাতে প্রবেশ করিয়াছেন)। তাঁহার সম্পর্কে নিম্নোক্ত সনদে বর্ণিত আছে :
رَوَى حَمَّادُ بْنُ زَيْدِ عَنْ ثَابِتٍ عَنْ عَبْدِ الرَّحْمَنِ بْنِ أَبِي لَيْلَى أَنَّ عَبْدَ اللَّهِ بْنَ رَوَاحَةَ أَتَى رَسُولُ اللهِ ﷺ وَهُوَ يَخْطُبُ فَسَمِعَهُ يَقُوْلُ اِجْلِسُوْا فَجَلَسَ مَكَانَهُ خَارِجًا مِنْ
الْمَسْجِدِ حَتَّى فَرَغَ النَّاسُ مِنْ خُطْبَتِهِ فَبَلَغَ ذَلِكَ النَّبِيُّ ﷺ فَقَالَ زَادَكَ اللَّهُ حِرْصًا عَلَى طواعية اللهِ وَطَوَاعِيَةِ رَسُولُه -
"আবদুর রাহমান ইব্ন আবী লায়লা হইতে বর্ণিত। 'আবদুল্লাহ ইব্ন্ন রাওয়াহা রাসূলুল্লাহ (স)-এর নিকট আগমন করিলেন। নবী করীম (স) তখন ভাষণ দিতেছিলেন। তিনি নবী করীম (স)-কে বলিতে শুনিলেন, "বসুন”। ফলে 'আবদুল্লাহ্ মসজিদের বাহিরে নিজ স্থানে বসিয়া পড়িলেন। রাসূলুল্লাহ (স)-এর ভাষণ যখন শেষ হইল তখন তাঁহার নিকট 'আবদুল্লাহর আগমনের খবর পৌছিল। রাসূলুল্লাহ (স) বলিয়াছিলেনঃ 'আল্লাহ ও তাঁহার রাসূলের অনুসরণ করিবার তোমার লোভ আল্লাহ বৃদ্ধি করিয়া দিন"।
ইমাম আহমাদ হইতে বর্ণিত আছে: قَالَ الإِمَامُ أَحْمَدُ حَدَّثَنَا عَبْدُ الصَّمَدِ عَنْ عُمَارَةَ عَنْ زِيَادِ النَّحْوِي عَنْ أَنَسٍ قَالَ كَانَ عَبْدُ اللَّهِ بْنُ رَوَاحَةَ إِذَ لَقِيَ الرَّجُلَ مِنْ أَصْحَابِهِ يَقُولُ تَعَالَ نُؤْمِنُ بِرَبَّنَا سَاعَةً فَقَالَ ذَاتَ يَوْمِ لِرَجُلٍ فَغَضِبَ الرَّجُلَ فَجَاءَ فَقَالَ يَا رَسُولَ اللَّهِ أَلَا تُرَى ابْنَ رَوَاحَةَ يَرْغَبُ عَنْ إِيْمَانِكَ إِلَى إِيْمَانِ سَاعَةٍ فَقَالَ النَّبِيُّ ﷺ رَحِمَ اللهُ ابْنَ رَوَاحَةَ إِنَّهُ يُحِبُّ الْمَجَالِسَ الَّتِي تَبَاهَى بهَا الْمَلائِكَةُ.
"আনাস (রা) বলেন, 'আবদুল্লাহ ইব্ন রাওয়াহা তাহার সাথীগণের কোন লোকের সহিত যখন মিলিত হইতেন তখন বলিতেন, আস! আমরা আমাদের রব্ব-এর উপর কিয়ামত সম্পর্কে ঈমান আনি। এইরূপ তিনি একদা এক লোককে বলিলেনঃ লোকটি তাহা শুনিয়া রাগান্বিত হইয়া রাসূলুল্লাহ (স)-এর নিকট আসিয়া বলিল, হে আল্লাহ্র রাসূল! আপনি কি অবগত আছেন, রাওয়াহার পুত্র আপনার ঈমান আনয়ন করা হইতে বিমুখ হইয়া কিয়ামতের প্রতি ঈমান আনিতেছে। উত্তরে রাসূলুল্লাহ (স) বলিলেনঃ আল্লাহ্ রাওয়াহা পুত্রের উপর করুণা করুন। সে এই সকল মাজলিসকে ভালবাসে যেইগুলি লইয়া ফেরেস্তাগণ গৌরববোধ করেন।"
এই হাদীছটি অত্যন্ত অখ্যাত )غریب(। বায়হাকী অনুরূপ একটি হাদীছ বর্ণনা করিয়াছেন: قَالَ الْبَيْهَقِيُّ حَدَّثَنَا الْحَاكِمُ حَدَّثَنَا أَبُو بَكْرٍ حَدَّثَنَا مُحَمَّدُ بْنُ أَيُّوبَ حَدَّثَنَا أَحْمَدُ بْنُ يُونُسَ حَدَّثَنَا شَيْخٌ مِنْ أَهْلِ الْمَدِينَةِ عَنْ صَفْوَانِ بْنِ سُلَيْمٍ عَنْ عَطَاءِ بْنِ يَسَارٍ أَنَّ عَبْدَ اللَّهِ بْنَ رَوَاحَةَ قَالَ لِصَاحِبِ لَهُ تَعَالَ حَتَّى نُؤْمِنُ سَاعَةً قَالَ أَوَلَسْنَا بِمُؤْمِنِينَ قَالَ بَلَى وَلَكِنَّا تَذْكُرُ اللَّهَ فَتَزْدَادُ ايْمَانًا .
"আতা ইব্ন ইয়াসার (র) হইতে বর্ণিত। 'আবদুল্লাহ্ ইব্ন রাওয়াহা তাহার এক সাথীকে বলিলেন, আস! আমরা কিয়ামতের উপর ঈমান আনি। লোকটি বুলিল আমরা কি বিশ্বাসী নই? তিনি বলিলেন, হাঁ, তবে আমরা আল্লাহ্র যিকির করিয়া ঈমান বৃদ্ধি করিব"।
হাফিজ আবুল কাসিম আল-লাকাই বা আল-আলকাই তদীয় সূত্রে শুরায়হ ইবন 'উবায়দ হইতে অনুরূপ একটি হাদীছ বর্ণনা করিয়াছেন। উভয় সূত্রেই হাদীছটি মুরসাল। ইমাম বুখারী তাঁহার সহীহ গ্রন্থে বলিয়াছেন:
وَقَالَ ابْنَ مُعَاذِ اجْلِسَ بِنَا نُؤْمِنُ سَاعَةً. "ইবন মু'আয বলিলেন, আমাদিগের সহিত বসুন! আমরা কিয়ামতের উপর ঈমান আনি"।
সাহীহ বুখারীতে আবুদ দারদা (রা) হইতে বর্ণিত আছে: قَالَ كُنَّا مَعَ رَسُولِ اللهِ ﷺ فِي سَفَرٍ فِي حَرِّ شَدِيدٍ وَمَا فِيْنَا صَائِمٌ إِلَّا رَسُولُ اللَّهِ وَعَبْدُ اللَّهِ بْنُ رَوَاحَةَ رَضِيَ اللَّهُ عَنْهُ. "আমরা রাসূলুল্লাহ (স)-এর সহিত তীব্র গ্রীষ্মে এক সফরে ছিলাম। তখন রাসূলুল্লাহ (স) ও 'আবদুল্লাহ ইব্ন রাওয়াহা ব্যতীত আমাদের মধ্যে অন্য কেহ রোযাদার ছিল না"। রাসূলুল্লাহ (স)-এর শানে তাহার নিম্নোক্ত কবিতা ইমাম বুখারী উল্লেখ করিয়াছেন:
وَفِينَا رَسُولُ اللهِ نَتْلُوا كِتَابَهُ - إِذَا انْشَقَّ مَعْرُوفٌ مِنَ الْفَجْرِ سَاطِعُ يَبِيْتُ يُجَافِي جَنَّبَهُ عَنْ فِرَاشِهِ - إِذَا اسْتُثْقِلَتْ بِالْمُشْرِكِينَ الْمَضَاجِعِ آتَى بِالْهُدى بَعْدَ الْعَمَى فَقُلُوبُنَا بِهِ مُوقِنَاتٌ أَنَّ مَا قَالَ وَاقِعُ.
"আমাদের মধ্যে আবির্ভূত হইয়াছেন আল্লাহ্র রাসূল, আমরা তাঁহার প্রতি নাযিলকৃত কিতাব তিলাওয়াত করি। ভোর হইতে অধিক আলোকিত হইয়া যখন তাহার সৎ গুণাবলী ছড়াইয়া পড়িল"।
"বিছানা হইতে তিনি তাঁহার শরীর পৃথক রাখিয়া নিশি যাপন করিতেন, মুশরিকগণের নিদ্রাবিভোরে যখন বিছানাসমূহ ভারী হইয়া যাইত”।
"গোমরাহীর পর যখন তিনি হিদায়াত লইয়া আসিলেন, আমাদের অন্তরসমূহ তখন তাহা বিশ্বাস করিল যে, তিনি যাহা বলিয়াছেন তাহা অবশ্য প্রতিফলিত হইবে"।
ইমাম বুখারী বর্ণনা করিয়াছেন: قَالَ الْبُخَارِيُّ حَدَّثَنَا عِمْرَانَ بْنِ مَيْسَرَةَ حَدَّثَنَا مُحَمَّدُ بْنُ فُضَيْلٍ عَنْ حُصَيْنِ عَنْ عَامِرٍ عَنِ النُّعْمَانِ بْنِ بَشِيرٍ قَالَ أَعْمِيَ عَلَى عَبْدِ اللهِ بْنِ رَوَاحَةً فَجَعَلَتْ أَخْتُهُ عَمْرَةٌ تَبْكِي وَاجبَلاهُ وكذا وكذا تُعَدِّدُ عَلَيْهِ فَقَالَ حِيْنَ افَاقَ مَا قُلْتِ شَيْئًا إِلَّا قِبْلَ لِي أَنْتَ كَذَلِكَ.
"আন-নু'মান ইব্ন বাশীর (রা) বলেন, 'আবদুল্লাহ ইব্ন রাওয়াহা বেহুঁশ হইয়া পড়িলে তাহার বোন 'আমরা ইহা বলিয়া কাঁদিতে লাগিলেনঃ হে পাহাড়সম, হে এইরূপ, এইরূপ, ইহা বারবার বলিতেছিলেন। তাহার জ্ঞান ফিরিয়া আসিলে তিনি তাহাকে বলিলেন, তুমি আমার সম্পর্কে যেসব কথা বলিতেছিলে সঙ্গে সঙ্গে আমাকে বলা হইতেছিল, তুমি কি এইরূপ এইরূপ ছিলে (আল-বিদায়া ওয়ান-নিহায়া, ৪খ., ২৫৭-২৫৮)?"
'আবদুল্লাহ ইবন রাওয়াহা (রা)-র ডাকনাম ছিল আবু মুহাম্মাদ, আবু রাওয়াহাও বলা হইত। তিনি ইসলামের প্রাথমিক যুগে মুসলমান হইয়াছিলেন। আল-আকাবাতে তিনি অংশগ্রহণ করিয়াছিলেন। বানুল হারিছ ইবনুল খায়রাজ যেই রাত্রিতে রাসূলুল্লাহ (স)-এর নিকট বায়‘আত গ্রহণ করিয়াছিলেন সেই রাত্রির নেতাগণের একজন ছিলেন তিনি। উমরাতুল কাযাতেও তিনি শরীফ ছিলেন। তিনি ঐ দিন রাসূলুল্লাহ (স)-এর-উষ্ট্রীর লাগাম আঁকড়াইয়া ধরিয়া প্রবেশ করিয়াছিলেন। এই সময় তাঁহার মুখের বাণী ছিল :
خَلُّوا بَنِي الْكُفَّارِ عَنْ سَبِيلِهِ
মৃতা দিবসে শাহাদাত বরণকারী নেতাগণের তিনি অন্তর্ভুক্ত ছিলেন। রোমানদের সহিত লড়িতে তিনি মুসলিম বাহিনীকে অভয় দিয়াছিলেন। তাঁহার শাহাদাত লাভ সম্পর্কে রাসূলুল্লাহ (স) সাক্ষী দিয়াছেন, তিনি নিশ্চিতভাবে জানাতী। রাসূলুল্লাহ (স) যখন তাঁহাদিগকে বিদায় সম্ভাষণ জানাইতেছিলেন তখন তিনি এই কবিতা আবৃত্তি করিতেছিলেন :
فَثَبَّتَ اللهُ مَا آتَاكَ مِنْ حَسَنٍ - تَثْبِيتَ مُوسَى وَنَصْرًا كَالَّذِي نُصِرُوْ
তাঁহার কবিতা শুনিয়া রাসূলুল্লাহ (স) বলিয়াছিলেন: وَأَنْتَ فَثَبَّتَكَ اللهُ “আল্লাহ তোমake অটল রাখুন”। হিশাম ইবন উরওয়া বলেন: وَدَخَلَ الْجَنَّةَ حَتَّى قُتِلَ شَهِيدًا (আল্লাহ তাঁহাকে অবিচল রাখিবার ফলে তিনি শহীদ হইয়াছেন এবং জান্নাতে প্রবেশ করিয়াছেন)। তাঁহার সম্পর্কে নিম্নোক্ত সনদে বর্ণিত আছে:
رَوَى حَمَّادُ بْنُ زَيْدِ عَنْ ثَابِتٍ عَنْ عَبْدِ الرَّحْمَنِ بْنِ أَبِي لَيْلَى أَنَّ عَبْدَ اللَّهِ بْنَ رَوَاحَةَ أَتَى رَسُولُ اللهِ ﷺ وَهُوَ يَخْطُبُ فَسَمِعَهُ يَقُوْلُ اِجْلِسُوْا فَجَلَسَ مَكَانَهُ خَارِجًا مِنْ الْمَسْجِدِ حَتَّى فَرَغَ النَّاسُ مِنْ خُطْبَتِهِ فَبَلَغَ ذَلِكَ النَّبِيُّ ﷺ فَقَالَ زَادَكَ اللَّهُ حِرْصًا عَلَى طواعية اللهِ وَطَوَاعِيَةِ رَسُولُه -
"আবদুর রাহমান ইব্ন আবী লায়লা হইতে বর্ণিত। 'আবদুল্লাহ ইব্ন্ন রাওয়াহা রাসূলুল্লাহ (স)-এর নিকট আগমন করিলেন। নবী করীম (স) তখন ভাষণ দিতেছিলেন। তিনি নবী করীম (স)-কে বলিতে শুনিলেন, "বসুন”। ফলে 'আবদুল্লাহ্ মসজিদের বাহিরে নিজ স্থানে বসিয়া পড়িলেন। রাসূলুল্লাহ (স)-এর ভাষণ যখন শেষ হইল তখন তাঁহার নিকট 'আবদুল্লাহর আগমনের খবর পৌছিল। রাসূলুল্লাহ (স) বলিয়াছিলেনঃ 'আল্লাহ ও তাঁহার রাসূলের অনুসরণ করিবার তোমার লোভ আল্লাহ বৃদ্ধি করিয়া দিন"।
ইমাম আহমাদ হইতে বর্ণিত আছে: قَالَ الإِمَامُ أَحْمَدُ حَدَّثَنَا عَبْدُ الصَّمَدِ عَنْ عُمَارَةَ عَنْ زِيَادِ النَّحْوِي عَنْ أَنَسٍ قَالَ كَانَ عَبْدُ اللَّهِ بْنُ رَوَاحَةَ إِذَ لَقِيَ الرَّجُلَ مِنْ أَصْحَابِهِ يَقُولُ تَعَالَ نُؤْمِنُ بِرَبَّنَا سَاعَةً فَقَالَ ذَاتَ يَوْمِ لِرَجُلٍ فَغَضِبَ الرَّجُلَ فَجَاءَ فَقَالَ يَا رَسُولَ اللَّهِ أَلَا تُرَى ابْنَ رَوَاحَةَ يَرْغَبُ عَنْ إِيْمَانِكَ إِلَى إِيْمَانِ سَاعَةٍ فَقَالَ النَّبِيُّ ﷺ رَحِمَ اللهُ ابْنَ رَوَاحَةَ إِنَّهُ يُحِبُّ الْمَجَالِسَ الَّتِي تَبَاهَى بهَا الْمَلائِكَةُ.
"আনাস (রা) বলেন, 'আবদুল্লাহ ইব্ন রাওয়াহা তাহার সাথীগণের কোন লোকের সহিত যখন মিলিত হইতেন তখন বলিতেন, আস! আমরা আমাদের রব্ব-এর উপর কিয়ামত সম্পর্কে ঈমান আনি। এইরূপ তিনি একদা এক লোককে বলিলেনঃ লোকটি তাহা শুনিয়া রাগান্বিত হইয়া রাসূলুল্লাহ (স)-এর নিকট আসিয়া বলিল, হে আল্লাহ্র রাসূল! আপনি কি অবগত আছেন, রাওয়াহার পুত্র আপনার ঈমান আনয়ন করা হইতে বিমুখ হইয়া কিয়ামতের প্রতি ঈমান আনিতেছে। উত্তরে রাসূলুল্লাহ (স) বলিলেনঃ আল্লাহ্ রাওয়াহা পুত্রের উপর করুণা করুন। সে এই সকল মাজলিসকে ভালবাসে যেইগুলি লইয়া ফেরেস্তাগণ গৌরববোধ করেন।"
এই হাদীছটি অত্যন্ত অখ্যাত )غریب(। বায়হাকী অনুরূপ একটি হাদীছ বর্ণনা করিয়াছেন: قَالَ الْبَيْهَقِيُّ حَدَّثَنَا الْحَاكِمُ حَدَّثَنَا أَبُو بَكْرٍ حَدَّثَنَا مُحَمَّدُ بْنُ أَيُّوبَ حَدَّثَنَا أَحْمَدُ بْنُ يُونُسَ حَدَّثَنَا شَيْخٌ مِنْ أَهْلِ الْمَدِينَةِ عَنْ صَفْوَانِ بْنِ سُلَيْمٍ عَنْ عَطَاءِ بْنِ يَسَارٍ أَنَّ عَبْدَ اللَّهِ بْنَ رَوَاحَةَ قَالَ لِصَاحِبِ لَهُ تَعَالَ حَتَّى نُؤْمِنُ سَاعَةً قَالَ أَوَلَسْنَا بِمُؤْمِنِينَ قَالَ بَلَى وَلَكِنَّا تَذْكُرُ اللَّهَ فَتَزْدَادُ ايْمَانًا .
"আতা ইব্ন ইয়াসার (র) হইতে বর্ণিত। 'আবদুল্লাহ্ ইব্ন রাওয়াহা তাহার এক সাথীকে বলিলেন, আস! আমরা কিয়ামতের উপর ঈমান আনি। লোকটি বুলিল আমরা কি বিশ্বাসী নই? তিনি বলিলেন, হাঁ, তবে আমরা আল্লাহ্র যিকির করিয়া ঈমান বৃদ্ধি করিব"।
হাফিজ আবুল কাসিম আল-লাকাই বা আল-আলকাই তদীয় সূত্রে শুরায়হ ইবন 'উবায়দ হইতে অনুরূপ একটি হাদীছ বর্ণনা করিয়াছেন। উভয় সূত্রেই হাদীছটি মুরসাল। ইমাম বুখারী তাঁহার সহীহ গ্রন্থে বলিয়াছেন:
وَقَالَ ابْنَ مُعَاذِ اجْلِسَ بِنَا نُؤْمِنُ سَاعَةً. "ইবন মু'আয বলিলেন, আমাদিগের সহিত বসুন! আমরা কিয়ামতের উপর ঈমান আনি"।
সাহীহ বুখারীতে আবুদ দারদা (রা) হইতে বর্ণিত আছে: قَالَ كُنَّا مَعَ رَسُولِ اللهِ ﷺ فِي سَفَرٍ فِي حَرِّ شَدِيدٍ وَمَا فِيْنَا صَائِمٌ إِلَّا رَسُولُ اللَّهِ وَعَبْدُ اللَّهِ بْنُ رَوَاحَةَ رَضِيَ اللَّهُ عَنْهُ. "আমরা রাসূলুল্লাহ (স)-এর সহিত তীব্র গ্রীষ্মে এক সফরে ছিলাম। তখন রাসূলুল্লাহ (স) ও 'আবদুল্লাহ ইব্ন রাওয়াহা ব্যতীত আমাদের মধ্যে অন্য কেহ রোযাদার ছিল না"। রাসূলুল্লাহ (স)-এর শানে তাহার নিম্নোক্ত কবিতা ইমাম বুখারী উল্লেখ করিয়াছেন:
وَفِينَا رَسُولُ اللهِ نَتْلُوا كِتَابَهُ - إِذَا انْشَقَّ مَعْرُوفٌ مِنَ الْفَجْرِ سَاطِعُ يَبِيْتُ يُجَافِي جَنَّبَهُ عَنْ فِرَاشِهِ - إِذَا اسْتُثْقِلَتْ بِالْمُشْرِكِينَ الْمَضَاجِعِ آتَى بِالْهُدى بَعْدَ الْعَمَى فَقُلُوبُنَا بِهِ مُوقِنَاتٌ أَنَّ مَا قَالَ وَاقِعُ.
"আমাদের মধ্যে আবির্ভূত হইয়াছেন আল্লাহ্র রাসূল, আমরা তাঁহার প্রতি নাযিলকৃত কিতাব তিলাওয়াত করি। ভোর হইতে অধিক আলোকিত হইয়া যখন তাহার সৎ গুণাবলী ছড়াইয়া পড়িল"।
"বিছানা হইতে তিনি তাঁহার শরীর পৃথক রাখিয়া নিশি যাপন করিতেন, মুশরিকগণের নিদ্রাবিভোরে যখন বিছানাসমূহ ভারী হইয়া যাইত”
"গোমরাহীর পর যখন তিনি হিদায়াত লইয়া আসিলেন, আমাদের অন্তরসমূহ তখন তাহা বিশ্বাস করিল যে, তিনি যাহা বলিয়াছেন তাহা অবশ্য প্রতিফলিত হইবে"।
ইমাম বুখারী বর্ণনা করিয়াছেন: قَالَ الْبُخَارِيُّ حَدَّثَنَا عِمْرَانَ بْنِ مَيْسَرَةَ حَدَّثَنَا مُحَمَّدُ بْنُ فُضَيْلٍ عَنْ حُصَيْنِ عَنْ عَامِرٍ عَنِ النُّعْمَانِ بْنِ بَشِيرٍ قَالَ أَعْمِيَ عَلَى عَبْدِ اللهِ بْنِ رَوَاحَةً فَجَعَلَتْ أَخْتُهُ عَمْرَةٌ تَبْكِي وَاجبَلاهُ وكذا وكذا تُعَدِّدُ عَلَيْهِ فَقَالَ حِيْنَ افَاقَ مَا قُلْتِ شَيْئًا إِلَّا قِبْلَ لِي أَنْتَ كَذَلِكَ.
"আন-নু'মান ইব্ন বাশীর (রা) বলেন, 'আবদুল্লাহ ইব্ন রাওয়াহা বেহুঁশ হইয়া পড়িলে তাহার বোন 'আমরা ইহা বলিয়া কাঁদিতে লাগিলেনঃ হে পাহাড়সম, হে এইরূপ, এইরূপ, ইহা বারবার বলিতেছিলেন। তাহার জ্ঞান ফিরিয়া আসিলে তিনি তাহাকে বলিলেন, তুমি আমার সম্পর্কে যেসব কথা বলিতেছিলে সঙ্গে সঙ্গে আমাকে বলা হইতেছিল, তুমি কি এইরূপ এইরূপ ছিলে (আল-বিদায়া ওয়ান-নিহায়া, ৪খ., ২৫৭-২৫৮)?"
'আবদুল্লাহ ইবন রাওয়াহা (রা)-র ডাকনাম ছিল আবু মুহাম্মাদ, আবু রাওয়াহাও বলা হইত। তিনি ইসলামের প্রাথমিক যুগে মুসলমান হইয়াছিলেন। আল-আকাবাতে তিনি অংশগ্রহণ করিয়াছিলেন। বানুল হারিছ ইবনুল খায়রাজ যেই রাত্রিতে রাসূলুল্লাহ (স)-এর নিকট বায়‘আত গ্রহণ করিয়াছিলেন সেই রাত্রির নেতাগণের একজন ছিলেন তিনি। উমরাতুল কাযাতেও তিনি শরীফ ছিলেন। তিনি ঐ দিন রাসূলুল্লাহ (স)-এর-উষ্ট্রীর লাগাম আঁকড়াইয়া ধরিয়া প্রবেশ করিয়াছিলেন। এই সময় তাঁহার মুখের বাণী ছিল :
خَلُّوا بَنِي الْكُفَّارِ عَنْ سَبِيلِهِ
মৃতা দিবসে শাহাদাত বরণকারী নেতাগণের তিনি অন্তর্ভুক্ত ছিলেন। রোমানদের সহিত লড়িতে তিনি মুসলিম বাহিনীকে অভয় দিয়াছিলেন। তাঁহার শাহাদাত লাভ সম্পর্কে রাসূলুল্লাহ (স) সাক্ষী দিয়াছেন, তিনি নিশ্চিতভাবে জানাতী। রাসূলুল্লাহ (স) যখন তাঁহাদিগকে বিদায় সম্ভাষণ জানাইতেছিলেন তখন তিনি এই কবিতা আবৃত্তি করিতেছিলেন :
فَثَبَّتَ اللهُ مَا آتَاكَ مِنْ حَسَنٍ - تَثْبِيْتَ مُوسَى وَنَصْرًا كَالَّذِي نُصِرُوْ
তাঁহার কবিতা শুনিয়া রাসূলুল্লাহ (স) বলিয়াছিলেন: وَأَنْتَ فَثَبَّتَكَ اللهُ “আল্লাহ তোমake অটল রাখুন”। হিশাম ইবন উরওয়া বলেন, وَدَخَلَ الْجَنَّةَ حَتَّى قُتِلَ شَهِيدًا (আল্লাহ তাঁহাকে অবিচল রাখিবার ফলে তিনি শহীদ হইয়াছেন এবং জান্নাতে প্রবেশ করিয়াছেন)। তাঁহার সম্পর্কে নিম্নোক্ত সনদে বর্ণিত আছে :
رَوَى حَمَّادُ بْنُ زَيْدِ عَنْ ثَابِتٍ عَنْ عَبْدِ الرَّحْمَنِ بْنِ أَبِي لَيْلَى أَنَّ عَبْدَ اللَّهِ بْنَ رَوَاحَةَ أَتَى رَسُولَ اللهِ ﷺ وَهُوَ يَخْطُبُ فَسَمِعَهُ يَقُوْلُ اِجْلِسُوْا فَجَلَسَ مَكَانَهُ خَارِجًا مِنْ الْمَسْجِدِ حَتَّى فَرَغَ النَّاسُ مِنْ خُطْبَتِهِ فَبَلَغَ ذَلِكَ النَّبِيُّ ﷺ فَقَالَ زَادَكَ اللَّهُ حِرْصًا عَلَى طواعية اللهِ وَطَوَاعِيَةِ رَسُولُه -
"আবদুর রাহমান ইব্ن আবী লায়লা হইতে বর্ণিত। 'আবদুল্লাহ ইব্ন্ন রাওয়াহা রাসূলুল্লাহ (স)-এর নিকট আগমন করিলেন। নবী করীম (স) তখন ভাষণ দিতেছিলেন। তিনি নবী করীম (স)-কে বলিতে শুনিলেন, "বসুন”। ফলে 'আবদুল্লাহ্ মসজিদের বাহিরে নিজ স্থানে বসিয়া পড়িলেন। রাসূলুল্লাহ (স)-এর ভাষণ যখন শেষ হইল তখন তাঁহার নিকট 'আবদুল্লাহর আগমনের খবর পৌছিল। রাসূলুল্লাহ (স) বলিয়াছিলেনঃ 'আল্লাহ ও তাঁহার রাসূলের অনুসরণ করিবার তোমার লোভ আল্লাহ বৃদ্ধি করিয়া দিন"।
ইমাম আহমাদ হইতে বর্ণিত আছে: قَالَ الإِمَامُ أَحْمَدُ حَدَّثَنَا عَبْدُ الصَّمَدِ عَنْ عُمَارَةَ عَنْ زِيَادِ النَّحْوِي عَنْ أَنَسٍ قَالَ كَانَ عَبْدُ اللَّهِ بْنُ رَوَاحَةَ إِذَ لَقِيَ الرَّجُلَ مِنْ أَصْحَابِهِ يَقُولُ تَعَالَ نُؤْمِنُ بِرَبَّنَا سَاعَةً فَقَالَ ذَاتَ يَوْمِ لِرَجُلٍ فَغَضِبَ الرَّجُلَ فَجَاءَ فَقَالَ يَا رَسُولَ اللَّهِ أَلَا تُرَى ابْنَ رَوَاحَةَ يَرْغَبُ عَنْ إِيْمَانِكَ إِلَى إِيْمَانِ سَاعَةٍ فَقَالَ النَّبِيُّ ﷺ رَحِمَ اللهُ ابْنَ رَوَاحَةَ إِنَّهُ يُحِبُّ الْمَجَالِسَ الَّتِي تَبَاهَى بهَا الْمَلائِكَةُ.
"আনাস (রা) বলেন, 'আবদুল্লাহ ইব্ن রাওয়াহা তাহার সাথীগণের কোন লোকের সহিত যখন মিলিত হইতেন তখন বলিতেন, আস! আমরা আমাদের রব্ব-এর উপর কিয়ামত সম্পর্কে ঈমান আনি। এইরূপ তিনি একদা এক লোককে বলিলেনঃ লোকটি তাহা শুনিয়া রাগান্বিত হইয়া রাসূলুল্লাহ (স)-এর নিকট আসিয়া বলিল, হে আল্লাহ্র রাসূল! আপনি কি অবগত আছেন, রাওয়াহার পুত্র আপনার ঈমান আনয়ন করা হইতে বিমুখ হইয়া কিয়ামতের প্রতি ঈমান আনিতেছে। উত্তরে রাসূলুল্লাহ (স) বলিলেনঃ আল্লাহ্ রাওয়াহা পুত্রের উপর করুণা করুন। সে এই সকল মাজলিসকে ভালবাসে যেইগুলি লইয়া ফেরেস্তাগণ গৌরববোধ করেন।"
এই হাদীছটি অত্যন্ত অখ্যাত )غریب(। বায়হাকী অনুরূপ একটি হাদীছ বর্ণনা করিয়াছেন:
قَالَ الْبَيْهَقِيُّ حَدَّثَنَا الْحَاكِمُ حَدَّثَنَا أَبُو بَكْرٍ حَدَّثَنَا مُحَمَّدُ بْنُ أَيُّوبَ حَدَّثَنَا أَحْمَدُ بْنُ يُونُسَ حَدَّثَنَا شَيْخٌ مِنْ أَهْلِ الْمَدِينَةِ عَنْ صَفْوَانِ بْنِ سُلَيْمٍ عَنْ عَطَاءِ بْنِ يَسَارٍ أَنَّ عَبْدَ اللَّهِ بْنَ رَوَاحَةَ قَالَ لِصَاحِبِ لَهُ تَعَالَ حَتَّى نُؤْمِنُ سَاعَةً قَالَ أَوَلَسْنَا بِمُؤْمِنِينَ قَالَ بَلَى وَلَكِنَّا تَذْكُرُ اللَّهَ فَتَزْدَادُ ايْمَانًا .
"আতা ইব্ن ইয়াসার (র) হইতে বর্ণিত। 'আবদুল্লাহ্ ইব্ن রাওয়াহা তাহার এক সাথীকে বলিলেন, আস! আমরা কিয়ামতের উপর ঈমান আনি। লোকটি বুলিল আমরা কি বিশ্বাসী নই? তিনি বলিলেন, হাঁ, তবে আমরা আল্লাহ্র যিকির করিয়া ঈমান বৃদ্ধি করিব"।
হাফিজ আবুল কাসিম আল-লাকাই বা আল-আলকাই তদীয় সূত্রে শুরায়হ ইবন 'উবায়দ হইতে অনুরূপ একটি হাদীছ বর্ণনা করিয়াছেন। উভয় সূত্রেই হাদীছটি মুরসাল। ইমাম বুখারী তাঁহার সহীহ গ্রন্থে বলিয়াছেন:
وَقَالَ ابْنَ مُعَاذِ اجْلِسَ بِنَا نُؤْمِنُ سَاعَةً. "ইবন মু'আয বলিলেন, আমাদিগের সহিত বসুন! আমরা কিয়ামতের উপর ঈমান আনি"।
সাহীহ বুখারীতে আবুদ দারদা (রা) হইতে বর্ণিত আছে: قَالَ كُنَّا مَعَ رَسُولِ اللهِ ﷺ فِي سَفَرٍ فِي حَرِّ شَدِيدٍ وَمَا فِيْنَا صَائِمٌ إِلَّا رَسُولُ اللَّهِ وَعَبْدُ اللَّهِ بْنُ رَوَاحَةَ رَضِيَ اللَّهُ عَنْهُ. "আমরা রাসূলুল্লাহ (স)-এর সহিত তীব্র গ্রীষ্মে এক সফরে ছিলাম। তখন রাসূলুল্লাহ (স) ও 'আবদুল্লাহ ইব্ন রাওয়াহা ব্যতীত আমাদের মধ্যে অন্য কেহ রোযাদার ছিল না"। রাসূলুল্লাহ (স)-এর শানে তাহার নিম্নোক্ত কবিতা ইমাম বুখারী উল্লেখ করিয়াছেন:
وَفِينَا رَسُولُ اللهِ نَتْلُوا كِتَابَهُ - إِذَا انْشَقَّ مَعْرُوفٌ مِنَ الْفَجْرِ سَاطِعُ يَبِيْتُ يُجَافِي جَنَّبَهُ عَنْ فِرَاشِهِ - إِذَا اسْتُثْقِلَتْ بِالْمُشْرِكِينَ الْمَضَاجِعُ آتَى بِالْهُدى بَعْدَ الْعَمَى فَقُلُوبُنَا بِهِ مُوقِنَاتٌ أَنَّ مَا قَالَ وَاقِعُ.
"আমাদের মধ্যে আবির্ভূত হইয়াছেন আল্লাহ্র রাসূল, আমরা তাঁহার প্রতি নাযিলকৃত কিতাব তিলাওয়াত করি। ভোর হইতে অধিক আলোকিত হইয়া যখন তাহার সৎ গুণাবলী ছড়াইয়া পড়িল"।
"বিছানা হইতে তিনি তাঁহার শরীর পৃথক রাখিয়া নিশি যাপন করিতেন, মুশরিকগণের নিদ্রাবিভোরে যখন বিছানাসমূহ ভারী হইয়া যাইত”
"গোমরাহীর পর যখন তিনি হিদায়াত লইয়া আসিলেন, আমাদের অন্তরসমূহ তখন তাহা বিশ্বাস করিল যে, তিনি যাহা বলিয়াছেন তাহা অবশ্য প্রতিফলিত হইবে"।
ইমাম বুখারী বর্ণনা করিয়াছেন: قَالَ الْبُخَارِيُّ حَدَّثَنَا عِمْرَانَ بْنِ مَيْسَرَةَ حَدَّثَنَا مُحَمَّدُ بْنُ فُضَيْلٍ عَنْ حُصَيْنِ عَنْ عَامِرٍ عَنِ النُّعْمَانِ بْنِ بَشِيرٍ قَالَ أَعْمِيَ عَلَى عَبْدِ اللهِ بْنِ رَوَاحَةً فَجَعَلَتْ أَخْتُهُ عَمْرَةٌ تَبْكِي وَاجبَلاهُ وكذا وكذا تُعَدِّدُ عَلَيْهِ فَقَالَ حِيْنَ افَاقَ مَا قُلْتِ شَيْئًا إِلَّا قِبْلَ لِي أَنْتَ كَذَلِكَ.
"আন-নু'মান ইব্ن বাশীর (রা) বলেন, 'আবদুল্লাহ ইব্ন রাওয়াহা বেহুঁশ হইয়া পড়িলে তাহার বোন 'আমরা ইহা বলিয়া কাঁদিতে লাগিলেনঃ হে পাহাড়সম, হে এইরূপ, এইরূপ, ইহা বারবার বলিতেছিলেন। তাহার জ্ঞান ফিরিয়া আসিলে তিনি তাহাকে বলিলেন, তুমি আমার সম্পর্কে যেসব কথা বলিতেছিলে সঙ্গে সঙ্গে আমাকে বলা হইতেছিল, তুমি কি এইরূপ এইরূপ ছিলে (আল-বিদায়া ওয়ান-নিহায়া, ৪খ., ২৫৭-২৫৮)?"