📄 খালিদ (রা)-এর 'সায়ফুল্লাহ' খেতাব লাভ
ইমাম বুখারী কর্তৃক বর্ণিত আনাস (রা)-এর হাদীছে আছে:
حَتَّى أَخَذَ الرَّأْيَةَ سَيْفٌ مِّنْ سُيُوفِ اللَّهِ حَتَّى فَتَحَ اللَّهُ عَلَيْهِمْ.
"এমন এক পর্যায়ে পতাকা উত্তোলন করিলেন আল্লাহ্র তরবারিসমূহ হইতে এক তরবারি। ফলে শত্রুদের বিপক্ষে আল্লাহ তাগাদিগকে বিজয় দান করিলেন" (ফাতহুল বারী, ৭খ., ৫১২)।
আবু কাতাদা (রা)-এর হাদীছে আছে:
ثُمَّ أَخَذَ اللَّوَاءَ خَالِدُ بْنُ الْوَلِيدِ وَلَمْ يَكُنْ مِّنَ الْأَمْرَاءِ وَهُوَ أَمِيرٌ نَفْسُهُ.
"অতঃপর খালিদ ইব্দুল ওয়ালীদ পতাকা ধারণ করিলেন, আর তিনি নিয়োগপ্রাপ্ত সেনাপতি ছিলেন না। তিনি নিজস্বভাবে সেনাপতি হইয়াছিলেন"।
অতঃপর রাসূলুল্লাহ (স) বলিলেন,
اللَّهُمَّ إِنَّهُ سَيْفَ مِّنْ سُيُوفِكَ فَأَنْتَ تَنْصُرُهُ.
“হে আল্লাহ! সে তোমারই এক তরবারি। অতএব তুমি তাহাকে সাহায্য কর"। এই দিন হইতে তাঁহার উপাধি "সায়ফুল্লাহ” (আল্লাহ্র তরবারি) হইয়া গেল। 'আবদুল্লাহ ইব্ন জা'ফার (রা)-এর হাদীছে আছে:
ثُمَّ أَخَذَهَا سَيْفٌ مِّنْ سُيُوفِ اللَّهِ خَالِدُ بْنُ الْوَلِيدِ فَفَتَحَ اللَّهُ عَلَيْهِمْ.
"অতঃপর পতাকা ধারণ করিলেন আল্লাহ্র অন্যতম তরবারি খালিদ ইবনুল ওয়ালীদ। ইহার পর আল্লাহ শত্রুদের বিরুদ্ধে তাঁহাদিগকে বিজয় দান করিলেন"। আয়্যুবের রিওয়ায়াতে আছে:
فَأَخَذَهَا خَالِدُ بْنُ الْوَلِيدِ مِنْ غَيْرِ امْرَةٍ.
“পূর্ব নিয়োগপ্রাপ্ত সেনাপতি না হইয়াও খালিদ ইবনুল ওয়ালীদ পতাকা ধারণ করিলেন"। নিয়োগপ্রাপ্ত না হওয়ার অর্থ হইল তাঁহাকে সেনাপতি নিয়োগ করার পক্ষে রাসূলুল্লাহ (স)-এর কোন প্রকাশ্য উক্তি ছিল না। তবে উপস্থিত মুসলিম জনতা তাঁহার নেতৃত্বের উপর ঐকমত্য পোষণ করিয়াছিলেন (ফাতহুল বারী, ৭খ., ৫১৩)।
ইমাম বুখারী কায়স ইব্ন আবী হাযেম সূত্রে বর্ণনা করিয়াছেন:
قَالَ سَمِعْتُ خَالِدَ بْنَ الْوَلِيدِ يَقُولُ لَقَدْ دَقٌ فِي يَدِي يَوْمَ مُوتَةً تِسْعَةُ أَسْيَافٍ فَمَا بَقِيَ فِي يَدِي إِلا سَفْحَةٌ يَمَانِيَّةٌ.
"তিনি বলেন, আমি খালিদ ইবনুল ওয়ালীদকে বলিতে শুনিয়াছি, আমার হাতে মুতা যুদ্ধের দিন নয়টি তরবারি ভাঙ্গিয়া টুকরা টুকরা হইয়া গিয়াছিল। ইয়ামানী তরবারিটি ছাড়া ঐদিন আমার হাতে আর কোন তরবারি বাকী ছিল না"।
ওয়াকিদী বলেন, 'আবদুল্লাহ ইবনুল হারিছ ইবনুল ফুদায়ল তাঁহার পিতা হইতে বর্ণনা করিয়াছেন:
قَالَ لَمَّا أَخَذَ خَالِدُ بْنُ الْوَلِيدِ الرَّايَةَ قَالَ رَسُولُ اللهِ ﷺ الآنَ حَمِيَ الْوَطِيسُ.
"খালিদ ইবনুল ওয়ালীদ (রা) পতাকা ধারণ করিলে রাসূলুল্লাহ (স) বলিলেন, এখন যুদ্ধ উত্তপ্ত হইয়াছে"।
ওয়াকিদী আল-আত্তাফ ইব্ন খালিদ সূত্রে আরও বর্ণনা করিয়াছেন:
لَمَّا قُتِلَ ابْنُ رَوَاحَةَ مَسَاءً بَاتَ خَالِدُ بْنُ الْوَلِيدِ فَلَمَّا أَصْبَحَ غَدًا وَقَدْ جَعَلَ مُقَدِّمَتَهُ سَاقَتَهُ وَسَاقَتَهُ مُقَدِّمَتَهُ وَمَيْمَنَتَهُ مَيْسَرَتَهُ قَالَ فَأَنْكَرُوا مَا كَانُوا يَعْرِفُوْنَ مِنْ رَآيَاتِهِمْ
وَهَيْئَتْهِمْ وَقَالُوا قَدْ جَاءَهُمْ مَدَدٌ فَرُعِبُوا وَانْكَشَفُوا مُنْهَزِمِينَ قَالَ فَقَتَلُوا مَقْتَلَةً لَّمْ يَقْتُلُهَا قَوْمٌ.
"আবদুল্লাহ ইব্ন রাওয়াহা (রা) অপরাহ্নে শহীদ হইলে খালিদ ইবনুল ওয়ালীদ (রা) রাত্রি যাপন করিয়া সকাল বেলা যুদ্ধের ময়দানে অবতীর্ণ হইয়া অগ্রভাগের সৈন্যবাহিনীকে পিছনে, পিছনের সৈন্যবাহিনীকে অগ্রভাগে এবং ডান দিকের সৈন্যবাহিনীকে বাম দিকে পুনর্বিন্যস্ত করেন। বর্ণনাকারী বলেন, ইহার ফলে তাহাদের পতাকা ও আকার-আকৃতি দেখিয়া শত্রু বাহিনীর নিকট নূতন মুখ মনে হইল। তাহারা বলাবলি করিতে লাগিল, বিরাট সাহায্যকারী বাহিনী আসিয়া গিয়াছে। অতঃপর তাহারা ভীত-সন্ত্রস্ত হইয়া পলায়ন করিল। বর্ণনাকারী বলেন, এই সময় মুসলিম বাহিনী এমনভাবে হত্যা করিতে লাগিল যাহা ইতিপূর্বে কোন সম্প্রদায় পারে নাই” (আল-বিদায়া ওয়ান-নিহায়া, ৪খ., ২৪৭)।
সীরাতবিদগণ বলিয়াছেন, এই স্থানে একটি দুর্গ ছিল। মুসলিম বাহিনী মৃতা অভিমুখে অগ্রসর হইবার প্রাক্কালে এই দুর্গবাসীরা একজন মুসলিম সৈনিককে এখানে শহীদ করিয়াছিল। এই দুর্গ বিজয় লাভের পর শত্রুদের একটি দল এখানে আশ্রয় গ্রহণ করিয়াছিল। ইহাদের সকলকে হত্যা করা হইয়াছিল (মাদারিজুন-নুবুওয়াত, ২খ., ৪৫৭)।
ইমাম বুখারী কর্তৃক বর্ণিত আনাস (রা)-এর হাদীছে আছে:
حَتَّى أَخَذَ الرَّأْيَةَ سَيْفٌ مِّنْ سُيُوفِ اللَّهِ حَتَّى فَتَحَ اللَّهُ عَلَيْهِمْ.
"এমন এক পর্যায়ে পতাকা উত্তোলন করিলেন আল্লাহ্র তরবারিসমূহ হইতে এক তরবারি। ফলে শত্রুদের বিপক্ষে আল্লাহ তাগাদিগকে বিজয় দান করিলেন" (ফাতহুল বারী, ৭খ., ৫১২)।
আবু কাতাদা (রা)-এর হাদীছে আছে:
ثُمَّ أَخَذَ اللَّوَاءَ خَالِدُ بْنُ الْوَلِيدِ وَلَمْ يَكُنْ مِّنَ الْأَمْرَاءِ وَهُوَ أَمِيرٌ نَفْسُهُ.
"অতঃপর খালিদ ইব্দুল ওয়ালীদ পতাকা ধারণ করিলেন, আর তিনি নিয়োগপ্রাপ্ত সেনাপতি ছিলেন না। তিনি নিজস্বভাবে সেনাপতি হইয়াছিলেন"।
অতঃপর রাসূলুল্লাহ (স) বলিলেন:
اللَّهُمَّ إِنَّهُ سَيْفَ مِّنْ سُيُوفِكَ فَأَنْتَ تَنْصُرُهُ.
“হে আল্লাহ! সে তোমারই এক তরবারি। অতএব তুমি তাহাকে সাহায্য কর"। এই দিন হইতে তাঁহার উপাধি "সায়ফুল্লাহ” (আল্লাহ্র তরবারি) হইয়া গেল। 'আবদুল্লাহ ইব্ন জা'ফার (রা)-এর হাদীছে আছে:
ثُمَّ أَخَذَهَا سَيْفٌ مِّنْ سُيُوفِ اللَّهِ خَالِدُ بْنُ الْوَلِيدِ فَفَتَحَ اللَّهُ عَلَيْهِمْ.
"অতঃপর পতাকা ধারণ করিলেন আল্লাহ্র অন্যতম তরবারি খালিদ ইবনুল ওয়ালীদ। ইহার পর আল্লাহ শত্রুদের বিরুদ্ধে তাঁহাদিগকে বিজয় দান করিলেন"। আয়্যুবের রিওয়ায়াতে আছে:
فَأَخَذَهَا خَالِدُ بْنُ الْوَلِيدِ مِنْ غَيْرِ امْرَةٍ.
“পূর্ব নিয়োগপ্রাপ্ত সেনাপতি না হইয়াও খালিদ ইবনুল ওয়ালীদ পতাকা ধারণ করিলেন"। নিয়োগপ্রাপ্ত না হওয়ার অর্থ হইল তাঁহাকে সেনাপতি নিয়োগ করার পক্ষে রাসূলুল্লাহ (স)-এর কোন প্রকাশ্য উক্তি ছিল না। তবে উপস্থিত মুসলিম জনতা তাঁহার নেতৃত্বের উপর ঐকমত্য পোষণ করিয়াছিলেন (ফাতহুল বারী, ৭খ., ৫১৩)।
ইমাম বুখারী কায়স ইব্ন আবী হাযেম সূত্রে বর্ণনা করিয়াছেন:
قَالَ سَمِعْتُ خَالِدَ بْنَ الْوَلِيدِ يَقُولُ لَقَدْ دَقٌ فِي يَدِي يَوْمَ مُوتَةً تِسْعَةُ أَسْيَافٍ فَمَا بَقِيَ فِي يَدِي إِلا سَفْحَةٌ يَمَانِيَّةٌ.
"তিনি বলেন, আমি খালিদ ইবনুল ওয়ালীদকে বলিতে শুনিয়াছি, আমার হাতে মুতা যুদ্ধের দিন নয়টি তরবারি ভাঙ্গিয়া টুকরা টুকরা হইয়া গিয়াছিল। ইয়ামানী তরবারিটি ছাড়া ঐদিন আমার হাতে আর কোন তরবারি বাকী ছিল না"।
ওয়াকিদী বলেন, 'আবদুল্লাহ ইবনুল হারিছ ইবনুল ফুদায়ল তাঁহার পিতা হইতে বর্ণনা করিয়াছেন:
قَالَ لَمَّا أَخَذَ خَالِدُ بْنُ الْوَلِيدِ الرَّايَةَ قَالَ رَسُولُ اللهِ ﷺ الآنَ حَمِيَ الْوَطِيسُ.
"খালিদ ইবনুল ওয়ালীদ (রা) পতাকা ধারণ করিলে রাসূলুল্লাহ (স) বলিলেন, এখন যুদ্ধ উত্তপ্ত হইয়াছে"।
ওয়াকিদী আল-আত্তাফ ইব্ন খালিদ সূত্রে আরও বর্ণনা করিয়াছেন:
لَمَّا قُتِلَ ابْنُ رَوَاحَةَ مَسَاءً بَاتَ خَالِدُ بْنُ الْوَلِيدِ فَلَمَّا أَصْبَحَ غَدًا وَقَدْ جَعَلَ مُقَدِّمَتَهُ سَاقَتَهُ وَسَاقَتَهُ مُقَدِّمَتَهُ وَمَيْمَنَتَهُ مَيْسَرَتَهُ قَالَ فَأَنْكَرُوا مَا كَانُوا يَعْرِفُوْنَ مِنْ رَآيَاتِهِمْ وَهَيْئَتْهِمْ وَقَالُوا قَدْ جَاءَهُمْ مَدَدٌ فَرُعِبُوا وَانْكَشَفُوا مُنْهَزِمِينَ قَالَ فَقَتَلُوا مَقْتَلَةً لَّمْ يَقْتُلُهَا قَوْمٌ.
"আবদুল্লাহ ইব্ন রাওয়াহা (রা) অপরাহ্নে শহীদ হইলে খালিদ ইবনুল ওয়ালীদ (রা) রাত্রি যাপন করিয়া সকাল বেলা যুদ্ধের ময়দানে অবতীর্ণ হইয়া অগ্রভাগের সৈন্যবাহিনীকে পিছনে, পিছনের সৈন্যবাহিনীকে অগ্রভাগে এবং ডান দিকের সৈন্যবাহিনীকে বাম দিকে পুনর্বিন্যস্ত করেন। বর্ণনাকারী বলেন, ইহার ফলে তাহাদের পতাকা ও আকার-আকৃতি দেখিয়া শত্রু বাহিনীর নিকট নূতন মুখ মনে হইল। তাহারা বলাবলি করিতে লাগিল, বিরাট সাহায্যকারী বাহিনী আসিয়া গিয়াছে। অতঃপর তাহারা ভীত-সন্ত্রস্ত হইয়া পলায়ন করিল। বর্ণনাকারী বলেন, এই সময় মুসলিম বাহিনী এমনভাবে হত্যা করিতে লাগিল যাহা ইতিপূর্বে কোন সম্প্রদায় পারে নাই” (আল-বিদায়া ওয়ান-নিহায়া, ৪খ., ২৪৭)।
সীরাতবিদগণ বলিয়াছেন, এই স্থানে একটি দুর্গ ছিল। মুসলিম বাহিনী মৃতা অভিমুখে অগ্রসর হইবার প্রাক্কালে এই দুর্গবাসীরা একজন মুসলিম সৈনিককে এখানে শহীদ করিয়াছিল। এই দুর্গ বিজয় লাভের পর শত্রুদের একটি দল এখানে আশ্রয় গ্রহণ করিয়াছিল। ইহাদের সকলকে হত্যা করা হইয়াছিল (মাদারিজুন-নুবুওয়াত, ২খ., ৪৫৭)।
ইমাম বুখারী কর্তৃক বর্ণিত আনাস (রা)-এর হাদীছে আছে:
حَتَّى أَخَذَ الرَّأْيَةَ سَيْفٌ مِّنْ سُيُوفِ اللَّهِ حَتَّى فَتَحَ اللَّهُ عَلَيْهِمْ.
"আল্লাহ্র তরবরিসমূহের কোন একটি তরবারি পতাকা ধারণ করিলে আল্লাহ শত্রুদের উপর তাহাদিগকে বিজয় দান করিলেন" (ফাতহুল বারী, ৭খ., ৫১২)।
আবু কাতাদা (রা)-এর হাদীছে আছে:
ثُمَّ أَخَذَ اللَّوَاءَ خَالِدُ بْنُ الْوَلِيدِ وَلَمْ يَكُنْ مِّنَ الْأَمْرَاءِ وَهُوَ أَمِيرٌ نَفْسُهُ.
"অতঃপর খালিদ ইব্দুল ওয়ালীদ পতাকা ধারণ করিলেন, আর তিনি নিয়োগপ্রাপ্ত সেনাপতি ছিলেন না। তিনি নিজস্বভাবে সেনাপতি হইয়াছিলেন"।
অতঃপর রাসূলুল্লাহ (স) বলিলেন,
اللَّهُمَّ إِنَّهُ سَيْفَ مِّنْ سُيُوفِكَ فَأَنْتَ تَنْصُرُهُ.
“হে আল্লাহ! সে তোমারই এক তরবারি। অতএব তুমি তাহাকে সাহায্য কর"। এই দিন হইতে তাঁহার উপাধি "সায়ফুল্লাহ” (আল্লাহ্র তরবারি) হইয়া গেল। 'আবদুল্লাহ ইব্ন জা'ফার (রা)-এর হাদীছে আছে:
ثُمَّ أَخَذَهَا سَيْفٌ مِّنْ سُيُوفِ اللَّهِ خَالِدُ بْنُ الْوَلِيدِ فَفَتَحَ اللَّهُ عَلَيْهِمْ.
"অতঃপর পতাকা ধারণ করিলেন আল্লাহ্র অন্যতম তরবারি খালিদ ইবনুল ওয়ালীদ। ইহার পর আল্লাহ শত্রুদের বিরুদ্ধে তাঁহাদিগকে বিজয় দান করিলেন"। আয়্যুবের রিওয়ায়াতে আছে:
فَأَخَذَهَا خَالِدُ بْنُ الْوَلِيدِ مِنْ غَيْرِ امْرَةٍ.
“পূর্ব নিয়োগপ্রাপ্ত সেনাপতি না হইয়াও খালিদ ইবনুল ওয়ালীদ পতাকা ধারণ করিলেন"। নিয়োগপ্রাপ্ত না হওয়ার অর্থ হইল তাঁহাকে সেনাপতি নিয়োগ করার পক্ষে রাসূলুল্লাহ (স)-এর কোন প্রকাশ্য উক্তি ছিল না। তবে উপস্থিত মুসলিম জনতা তাঁহার নেতৃত্বের উপর ঐকমত্য পোষণ করিয়াছিলেন (ফাতহুল বারী, ৭খ., ৫১৩)।
ইমাম বুখারী কায়স ইব্ন আবী হাযেম সূত্রে বর্ণনা করিয়াছেন:
قَالَ سَمِعْتُ خَالِدَ بْنَ الْوَلِيدِ يَقُولُ لَقَدْ دَقٌ فِي يَدِي يَوْمَ مُوتَةً تِسْعَةُ أَسْيَافٍ فَمَا بَقِيَ فِي يَدِي إِلا سَفْحَةٌ يَمَانِيَّةٌ.
"তিনি বলেন, আমি খালিদ ইবনুল ওয়ালীদকে বলিতে শুনিয়াছি, আমার হাতে মুতা যুদ্ধের দিন নয়টি তরবারি ভাঙ্গিয়া টুকরা টুকরা হইয়া গিয়াছিল। ইয়ামানী তরবারিটি ছাড়া ঐদিন আমার হাতে আর কোন তরবারি বাকী ছিল না"।
ওয়াকিদী বলেন, 'আবদুল্লাহ ইবনুল হারিছ ইবনুল ফুদায়ল তাঁহার পিতা হইতে বর্ণনা করিয়াছেন:
قَالَ لَمَّا أَخَذَ خَالِدُ بْنُ الْوَلِيدِ الرَّايَةَ قَالَ رَسُولُ اللهِ ﷺ الآنَ حَمِيَ الْوَطِيسُ.
"খালিদ ইবনুল ওয়ালীদ (রা) পতাকা ধারণ করিলে রাসূলুল্লাহ (স) বলিলেন, এখন যুদ্ধ উত্তপ্ত হইয়াছে"।
ওয়াকিদী আল-আত্তাফ ইব্ن খালিদ সূত্রে আরও বর্ণনা করিয়াছেন:
لَمَّا قُتِلَ ابْنُ رَوَاحَةَ مَسَاءً بَاتَ خَالِدُ بْنُ الْوَلِيدِ فَلَمَّا أَصْبَحَ غَدًا وَقَدْ جَعَلَ مُقَدِّمَتَهُ سَاقَتَهُ وَسَاقَتَهُ مُقَدِّمَتَهُ وَمَيْمَنَتَهُ مَيْسَرَتَهُ قَالَ فَأَنْكَرُوا مَا كَانُوا يَعْرِفُوْنَ مِنْ رَآيَاتِهِمْ وَهَيْئَتْهِمْ وَقَالُوا قَدْ جَاءَهُمْ مَدَدٌ فَرُعِبُوا وَانْكَشَفُوا مُنْهَزِمِينَ قَالَ فَقَتَلُوا مَقْتَلَةً لَّمْ يَقْتُلُهَا قَوْمٌ.
"আবদুল্লাহ ইব্ন রাওয়াহা (রা) অপরাহ্নে শহীদ হইলে খালিদ ইবনুল ওয়ালীদ (রা) রাত্রি যাপন করিয়া সকাল বেলা যুদ্ধের ময়দানে অবতীর্ণ হইয়া অগ্রভাগের সৈন্যবাহিনীকে পিছনে, পিছনের সৈন্যবাহিনীকে অগ্রভাগে এবং ডান দিকের সৈন্যবাহিনীকে বাম দিকে পুনর্বিন্যস্ত করেন। বর্ণনাকারী বলেন, ইহার ফলে তাহাদের পতাকা ও আকার-আকৃতি দেখিয়া শত্রু বাহিনীর নিকট নূতন মুখ মনে হইল। তাহারা বলাবলি করিতে লাগিল, বিরাট সাহায্যকারী বাহিনী আসিয়া গিয়াছে। অতঃপর তাহারা ভীত-সন্ত্রস্ত হইয়া পলায়ন করিল। বর্ণনাকারী বলেন, এই সময় মুসলিম বাহিনী এমনভাবে হত্যা করিতে লাগিল যাহা ইতিপূর্বে কোন সম্প্রদায় পারে নাই” (আল-বিদায়া ওয়ান-নিহায়া, ৪খ., ২৪৭)।
সীরাতবিদগণ বলিয়াছেন, এই স্থানে একটি দুর্গ ছিল। মুসলিম বাহিনী মৃতা অভিমুখে অগ্রসর হইবার প্রাক্কালে এই দুর্গবাসীরা একজন মুসলিম সৈনিককে এখানে শহীদ করিয়াছিল। এই দুর্গ বিজয় লাভের পর শত্রুদের একটি দল এখানে আশ্রয় গ্রহণ করিয়াছিল। ইহাদের সকলকে হত্যা করা হইয়াছিল (মাদারিজুন-নুবুওয়াত, ২খ., ৪৫৭)।
ইমাম বুখারী কর্তৃক বর্ণিত আনাস (রা)-এর হাদীছে আছে:
حَتَّى أَخَذَ الرَّأْيَةَ سَيْفٌ مِّنْ سُيُوفِ اللَّهِ حَتَّى فَتَحَ اللَّهُ عَلَيْهِمْ.
"আল্লাহ্র তরবরিসমূহের কোন একটি তরবারি পতাকা ধারণ করিলে আল্লাহ শত্রুদের উপর তাহাদিগকে বিজয় দান করিলেন" (ফাতহুল বারী, ৭খ., ৫১২)।
আবু কাতাদা (রা)-এর হাদীছে আছে:
ثُمَّ أَخَذَ اللَّوَاءَ خَالِدُ بْنُ الْوَلِيدِ وَلَمْ يَكُنْ مِّنَ الْأَمْرَاءِ وَهُوَ أَمِيرٌ نَفْسُهُ.
"অতঃপর খালিদ ইব্দুল ওয়ালীদ পতাকা ধারণ করিলেন, আর তিনি নিয়োগপ্রাপ্ত সেনাপতি ছিলেন না। তিনি নিজস্বভাবে সেনাপতি হইয়াছিলেন"।
অতঃপর রাসূলুল্লাহ (স) বলিলেন,
اللَّهُمَّ إِنَّهُ سَيْفَ مِّنْ سُيُوفِكَ فَأَنْتَ تَنْصُرُهُ.
“হে আল্লাহ! সে তোমারই এক তরবারি। অতএব তুমি তাহাকে সাহায্য কর"। এই দিন হইতে তাঁহার উপাধি "সায়ফুল্লাহ” (আল্লাহ্র তরবারি) হইয়া গেল। 'আবদুল্লাহ ইব্ন জা'ফার (রা)-এর হাদীছে আছে:
ثُمَّ أَخَذَهَا سَيْفٌ مِّنْ سُيُوفِ اللَّهِ خَالِدُ بْنُ الْوَلِيدِ فَفَتَحَ اللَّهُ عَلَيْهِمْ.
"অতঃপর পতাকা ধারণ করিলেন আল্লাহ্র অন্যতম তরবারি খালিদ ইবনুল ওয়ালীদ। ইহার পর আল্লাহ শত্রুদের বিরুদ্ধে তাঁহাদিগকে বিজয় দান করিলেন"। আয়্যুবের রিওয়ায়াতে আছে:
فَأَخَذَهَا خَالِدُ بْنُ الْوَلِيدِ مِنْ غَيْرِ امْرَةٍ.
“পূর্ব নিয়োগপ্রাপ্ত সেনাপতি না হইয়াও খালিদ ইবনুল ওয়ালীদ পতাকা ধারণ করিলেন"। নিয়োগপ্রাপ্ত না হওয়ার অর্থ হইল তাঁহাকে সেনাপতি নিয়োগ করার পক্ষে রাসূলুল্লাহ (স)-এর কোন প্রকাশ্য উক্তি ছিল না। তবে উপস্থিত মুসলিম জনতা তাঁহার নেতৃত্বের উপর ঐকমত্য পোষণ করিয়াছিলেন (ফাতহুল বারী, ৭খ., ৫১৩)।
ইমাম বুখারী কায়স ইব্ن আবী হাযেম সূত্রে বর্ণনা করিয়াছেন:
قَالَ سَمِعْتُ خَالِدَ بْنَ الْوَلِيدِ يَقُولُ لَقَدْ دَقٌ فِي يَدِي يَوْمَ مُوتَةً تِسْعَةُ أَسْيَافٍ فَمَا بَقِيَ فِي يَدِي إِلا سَفْحَةٌ يَمَانِيَّةٌ.
"তিনি বলেন, আমি খালিদ ইবনুল ওয়ালীদকে বলিতে শুনিয়াছি, আমার হাতে মুতা যুদ্ধের দিন নয়টি তরবারি ভাঙ্গিয়া টুকরা টুকরা হইয়া গিয়াছিল। ইয়ামানী তরবারিটি ছাড়া ঐদিন আমার হাতে আর কোন তরবারি বাকী ছিল না"।
ওয়াকিদী বলেন, 'আবদুল্লাহ ইবনুল হারিছ ইবনুল ফুদায়ল তাঁহার পিতা হইতে বর্ণনা করিয়াছেন:
قَالَ لَمَّا أَخَذَ خَالِدُ بْنُ الْوَلِيدِ الرَّايَةَ قَالَ رَسُولُ اللهِ ﷺ الآنَ حَمِيَ الْوَطِيسُ.
"খালিদ ইবনুল ওয়ালীদ (রা) পতাকা ধারণ করিলে রাসূলুল্লাহ (স) বলিলেন, এখন যুদ্ধ উত্তপ্ত হইয়াছে"।
ওয়াকিদী আল-আত্তাফ ইব্ন খালিদ সূত্রে আরও বর্ণনা করিয়াছেন:
لَمَّا قُتِلَ ابْنُ رَوَاحَةَ مَسَاءً بَاتَ خَالِدُ بْنُ الْوَلِيدِ فَلَمَّا أَصْبَحَ غَدًا وَقَدْ جَعَلَ مُقَدِّمَتَهُ سَاقَتَهُ وَسَاقَتَهُ مُقَدِّمَتَهُ وَمَيْمَنَتَهُ مَيْسَرَتَهُ قَالَ فَأَنْكَرُوا مَا كَانُوا يَعْرِفُوْنَ مِنْ رَآيَاتِهِمْ وَهَيْئَتْهِمْ وَقَالُوا قَدْ جَاءَهُمْ مَدَدٌ فَرُعِبُوا وَانْكَشَفُوا مُنْهَزِمِينَ قَالَ فَقَتَلُوا مَقْتَلَةً لَّمْ يَقْتُلُهَا قَوْمٌ.
"আবদুল্লাহ ইব্ন রাওয়াহা (রা) অপরাহ্নে শহীদ হইলে খালিদ ইবনুল ওয়ালীদ (রা) রাত্রি যাপন করিয়া সকাল বেলা যুদ্ধের ময়দানে অবতীর্ণ হইয়া অগ্রভাগের সৈন্যবাহিনীকে পিছনে, পিছনের সৈন্যবাহিনীকে অগ্রভাগে এবং ডান দিকের সৈন্যবাহিনীকে বাম দিকে পুনর্বিন্যস্ত করেন। বর্ণনাকারী বলেন, ইহার ফলে তাহাদের পতাকা ও আকার-আকৃতি দেখিয়া শত্রু বাহিনীর নিকট নূতন মুখ মনে হইল। তাহারা বলাবলি করিতে লাগিল, বিরাট সাহায্যকারী বাহিনী আসিয়া গিয়াছে। অতঃপর তাহারা ভীত-সন্ত্রস্ত হইয়া পলায়ন করিল। বর্ণনাকারী বলেন, এই সময় মুসলিম বাহিনী এমনভাবে হত্যা করিতে লাগিল যাহা ইতিপূর্বে কোন সম্প্রদায় পারে নাই” (আল-বিদায়া ওয়ান-নিহায়া, ৪খ., ২৪৭)।
সীরাতবিদগণ বলিয়াছেন, এই স্থানে একটি দুর্গ ছিল। মুসলিম বাহিনী মৃতা অভিমুখে অগ্রসর হইবার প্রাক্কালে এই দুর্গবাসীরা একজন মুসলিম সৈনিককে এখানে শহীদ করিয়াছিল। এই দুর্গ বিজয় লাভের পর শত্রুদের একটি দল এখানে আশ্রয় গ্রহণ করিয়াছিল। ইহাদের সকলকে হত্যা করা হইয়াছিল (মাদারিজুন-নুবুওয়াত, ২খ., ৪৫৭)।
📄 যুদ্ধের ফলাফল
যুদ্ধের ফলাফল কিরূপ হইয়াছিল, মুসলিম বাহিনী বিজয় লাভ করিয়াছিল, না পরাজয় বরণ করিয়াছিল এই সম্পর্কে সীরাতবিদ, ইতিহাসবিদ ও মুহাদ্দিছগণের মধ্যে মতভেদ রহিয়াছে। ইমাম বুখারী আনাস (রা) হইতে যেই হাদীছ বর্ণনা করিয়াছেন (যাহা ইতোপূর্বে আলোচনা করা হইয়াছে) সেই হাদীছের শেষাংশ হইল: حَتَّى أَخَذَ الرَّأْيَةَ سَيْفٌ مِّنْ سُيُوفِ اللَّهِ حَتَّى فَتَحَ اللَّهُ عَلَيْهِمْ.
"আল্লাহ্র তরবরিসমূহের কোন একটি তরবারি পতাকা ধারণ করিলে আল্লাহ শত্রুদের উপর তাহাদিগকে বিজয় দান করিলেন" (বুখারী, ২খ., ৬১১)।
এই হাদীছ দ্বারা স্পষ্টভাবে প্রতীয়মান হয় যে, মৃতা যুদ্ধে মুসলিম বাহিনী বিজয়লাভ করিয়াছিল। ইমাম বুখারী এই মত পোষণ করেন (আল-বিদায়া ওয়ান-নিহায়া, ৪খ., ২৪৫)। ওয়াকিদী আল-আত্তাফ ইন্ন খালিদ সূত্রে যেই রিওয়ায়াতটি উদ্ধৃত করিয়াছেন তাহাতে রহিয়াছে: فَرُعِبُوا وَانْكَشَفُوا مُنْهَزِمِينَ.
"কাফিরদের মধ্যে ভীতি ছড়াইয়া দেওয়া হইয়াছিল, ফলে ইহারা পরাজয় বরণ করিয়া পালাইয়াছিল” (আল-বিদায়া ওয়ান-নিহায়া, ৪খ., পৃ. ২৪৭)।
• মূসা ইব্ন উকবা এই প্রসঙ্গে তাঁহার মাগাযীতে উল্লেখ করিয়াছেন :
فَهَزَمَ اللهُ العَدُوَّ وَأَظْهَرَ الْمُسْلِمِينَ.
"আল্লাহ শত্রুকে পরাজিত ও মুসলিম বাহিনীকে বিজয় দান করিলেন” (আল-বিদায়া ওয়ান-নিহায়া, ৪খ., ২৪৭)।
ইবন সা'দের মতে এই যুদ্ধে মুসলিম বাহিনী পরাজিত হইয়াছিল। তিনি বলেন:
فَلَمَّا سَمِعَ أَهْلُ الْمَدِينَةِ بِجَيْشِ مُوتَةَ قَادِمِينَ تَلَقَّوْهُمْ بِالْجُزْفِ فَجَعَلَ النَّاسِ يَحْشُونَ فِي وُجُوهِهِمُ التَّرَبَ يَقُولُونَ يَا فَرَارُ أَفَرَرْتُمْ فِي سَبِيلِ اللَّهِ فَيَقُولُ رَسُولُ اللَّهِ ﷺ لَيْسُوا بقرارٍ وَلَكِنَّهُمْ كَرَارُ إِنْ شَاءَ اللَّهُ.
"মদীনাবাসী যখন শুনিতে পাইল যে, মৃতা হইতে প্রত্যাবর্তনকারী দল আগমন করিতেছে, তখন তাহারা ইহাদিগের সহিত আল-জুরুফ নামক স্থানে গিয়া সাক্ষাত করিল। তাহারা ইহাদিগের মুখে ধুলাবালি নিক্ষেপ করিয়া বলিতেছিল, হে পলায়নকারী বাহিনী! তোমরা কি আল্লাহ্র রাস্তায় গিয়া পলায়ন করিয়াছ? রাসূলুল্লাহ (স) বলিলেন : পলায়নকারী নয়, ইনশাআল্লাহ আক্রমণকারী" (আত-তাবাকাতুল কুবরা, ২খ., ১২৯)।
আবুল হাসান আলী নদবী বলেন, মুসলিম বাহিনী যখন প্রত্যাবর্তন করিয়া মদীনার সন্নিকটে পৌছিল তখন রাসূলুল্লাহ (স) এবং অন্যান্য মুসলিমগণ অগ্রসর হইয়া তাহাদিগকে অভ্যর্থনা জানাইলেন। শিশুরা তাঁহার পিছনে পিছনে দৌঁড়াইতেছিল। রাসূলুল্লাহ (স) বাহনের উপর উপবিষ্ট ছিলেন। তিনি বলিলেন, শিশুদেরকে নিজেদের সংগে বসাও এবং জা'ফারের ছোট শিশু সন্তানকে আমার নিকট দাও। রাসূলুল্লাহ (স) জা'ফারের পুত্র 'আবদুল্লাহকে তাঁহার কোলে বসাইলেন। মুসলিম বাহিনী সাধারণত যুদ্ধক্ষেত্র হইতে পলায়ন করিত না। ইহা ছিল এই ধরনের পলায়নের প্রথম ঘটনা। এইজন্য সম্বর্ধনা দানকারী দল যোদ্ধা বাহিনীর উপর মাটি নিক্ষেপ করিয়া বলিতেছিল, তোমরা কি আল্লাহ্র পথ হইতে পালাইয়াছ? রাসূলুল্লাহ (স) বলিলেন, পলায়নকারী নয়, ইনশাআল্লাহ আক্রমণকারী" (নবীয়ে রহমত, লাখনৌ ১৩৯৮ হি., ২খ., ৫৪)।
ইবন কাছীর বলেন, ইবন ইসহাকে বর্ণনায় রহিয়াছে :
إِنَّ خَالِدًا إِنَّمَا حَاشَ بِالْقَوْمِ حَتَّى تَخَلَّصُوا مِنَ الرُّومِ وَعَرِبَ النَّصَارِي فَقَدْ.
""খালিদ মুসলিম বাহিনীকে হাঁকাইয়া লইয়া যান। ফলে রোমক ও আরবীয় খৃস্টানদের কবল হইতে মুসলিম বাহিনী মুক্তি লাভ করিয়াছিলেন"।
কিন্তু মূসা ইব্ন উকবা ও ওয়াকিদী স্পষ্টভাবে বলিয়াছেন যে, রোমক বাহিনী ও তাহাদিগের সহযোদ্ধা আরবগণ পরাজয় বরণ করিয়াছিল। ইহা আনাস (রা) কর্তৃক পূর্বে বর্ণিত "মারফ্” হাদীছের সমর্থক। এই মারফু' হাদীছটি ইমাম বুখারী কর্তৃক বর্ণিত যাহা পূর্বে উল্লেখ করা হইয়াছে। ইমাম বায়হাকী এই অভিমতকে প্রাধান্য দিয়াছেন। ইব্ন কাছীর উভয় অভিমত উল্লেখ করিয়া বলেন, ইবন ইসহাক ও অন্যান্যদের পরস্পর বিরোধী মতামতের মধ্যে এইভাবে সমন্বয় সাধন করা সম্ভব যে, খালিদ (রা) যখন পতাকা ধারণ করেন তখন তিনি মুসলিম বাহিনীকে নিরাপদে সরাইয়া নিয়া কাফিরদের কবল হইতে তাহাদিগকে রক্ষা করিয়াছিলেন। কিন্তু রাত পোহাইবার পর যখন তিনি মুসলিম বাহিনীকে নূতনভাবে বিন্যস্ত করিলেন (ওয়াকিদীর রিওয়ায়াত দ্র.) তখন রোমক বাহিনী ভাবিল যে, এক বিশাল বাহিনী মুসলমানদের সাহায্যে আসিয়াছে। অতঃপর খালিদ (রা) শত্রুদের উপর আক্রমণ চালাইয়া তাহাদিগকে পরাজিত করেন।
ইবন ইসহাক মুহাম্মাদ ইব্ন জা'ফার সূত্রে 'উরওয়া হইতে মৃতা থেকে প্রত্যাবর্তনকারী দলের প্রতি মদীনাবাসীদের মাটি নিক্ষেপ ও তিরস্কার করার নিম্নের রিওয়ায়াতটি উদ্ধৃত করেন : فَجَعَلُوا يَحْثُونَ عَلَيْهِمْ بِالتَّرَابِ وَيَقُولُونَ يَا فَرَّارُ فَرَرْتُمْ فِي سَبِيلِ اللَّهِ.
ইব্ন কাছীর বলেন, আমার মতে ইব্ন ইসহাক এই স্থলে অনুমান নির্ভর কথা বলিয়াছেন। তিনি মনে করিয়াছেন, এই আচরণ সমস্ত মুসলিম বাহিনীর প্রতি করা হইয়াছিল। প্রকৃতপক্ষে এইরূপ করা হইয়াছিল স্বল্প সংখ্যক লোকের জন্য যাহারা শত্রু পক্ষের সহিত মুকাবিলার সময় পশ্চাদপসরণ করিয়াছিল। অবশিষ্ট মুসলিম যোদ্ধাগণ কিন্তু পলায়ন করেন নাই, বরং তাহদিগকে সাহায্য করা হইয়াছিল। যেমনিভাবে রাসূলুল্লাহ (স) এই সম্পর্কে মদীনায় তাঁহার সম্মুখে উপস্থিত মুসলমানগণকে সংবাদ দিতেছিলেন এই কথা বলিয়া : ثُمَّ أَخَذَ الرَّايَةَ سَيْفٌ مِّنْ سُيُوفِ اللَّهِ فَفَتَحَ اللَّهُ عَلَيْهِمْ.
সুতরাং অভ্যর্থনাকারী মুসলমানগণ তাহাদিগকে পলায়নকারী হিসাবে সম্বোধন করিতে পারেন না, বরং তাহাদিগের সহিত সম্মানের সহিত মিলিত হইয়াছিলেন। আর যাহারা পশ্চাদপসরণ করিয়াছিল এবং মুসলিম বাহিনীকে তথায় রাখিয়া চলিয়া আসিয়াছিল তাহাদিগকে মৃত্তিকা নিক্ষেপ ও তিরস্কার করা হইয়াছিল। এই পশ্চাদপসরণকারীদের মধ্যে ছিলেন 'আবদুল্লাহ ইবন 'উমার (রা)। ইমাম আহমাদ তদীয় সূত্রে 'আবদুল্লাহ ইবন 'উমার (রা) হইতে বর্ণনা করিয়াছেন : عَنْ عَبْدِ اللَّهِ بْنِ عُمَرَ قَالَ كُنْتُ فِي سَرِيَّةٍ مِّنْ سَرَايَا رَسُولِ اللَّهِ ﷺ فَحَاصَ النَّاسِ حَيْصَةً وَكُنْتُ فِيمَنْ حَاصَ فَقَلْنَا كَيْفَ تَصْنَعُ وَقَدْ قَرَرْنَا مِنَ الزَّحْفِ وَيُؤْنَا بِالْغَضَبِ ثُمَّ قُلْنَا لَوْ دَخَلْنَا الْمَدِينَةَ قُتِلْنَا ثُمَّ قُلْنَا لَوْ عَرَضْنَا أَنْفُسَنَا عَلَى رَسُولِ اللَّهِ ﷺ فَإِنْ كَانَتْ
لَنَا تَوبَةٌ وَإِلا ذَهَبْنَا فَآتَيْنَاهُ قَبْلَ صَلوةِ الْغَدَاةِ فَخَرَجَ فَقَالَ مَنِ الْقَوْمُ قَالَ قُلْنَا نَحْنُ فَرَّارُونَ فَقَالَ لَا بَلْ أَنْتُمُ الْكَرَارُونَ أَنَا فَتَتُكُمْ وَأَنَا فِئَةُ الْمُسْلِمِينَ قَالَ فَأَتَيْنَاهُ حَتَّى قَبَّلْنَا يده
"আবদুল্লাহ ইবন 'উমার (রা) বলেন, আমরা রাসূলুল্লাহ (স) কর্তৃক প্রেরিত কোন এক যুদ্ধাভিযানে অংশগ্রহণ করিয়াছিলাম। এই যুদ্ধে কিছু সংখ্যক লোক পশ্চাদপসরণ করিয়াছিল। আমি ছিলাম তাহাদের অন্তর্ভুক্ত। আমরা বলিলাম, আমরা এখন কি করি? আমরা তো যুদ্ধ হইতে পলায়ন করিলাম এবং অভিসম্পাতের উপযুক্ত হইলাম। অতঃপর আমরা বলিলাম, যদি আমরা মদীনায় প্রবেশ করি তাহা হইলে আমাদিগকে হত্যা করা হইবে। ইহার পর আমরা বলিলাম, যদি আমরা নিজেদেরকে রাসূলুল্লাহ (স)-এর নিকট পেশ করি এবং আমাদিগের তওবা কবুল হয় তাহা হইলে তো ভাল। অন্যথায় আমরা ধ্বংস হইয়া যাইব। সুতরাং আমরা রাসূলুল্লাহ (স)-এর নিকট ফজরের সালাতের পূর্বে আগমন করিলাম। রাসূলুল্লাহ (স) গৃহ হইতে বাহির হইয়া বলিলেন, কোন দলের লোক? আমরা বলিলাম, আমরা পলায়নকারী দল। রাসূলুল্লাহ (স) বলিলেন, বরং তোমরা আক্রমণকারী দল। আমি তোমাদিগের দলভুক্ত এবং আমি মুসলমানদের দলভুক্ত। তিনি বলেন, অতঃপর আমরা রাসূলুল্লাহ (স)-এর নিকট আসিয়া তাহার হস্ত চুম্বন করিলাম"।
উপরিউক্ত হাদীছ ইমাম আহমাদ হাসান সূত্রে, তিনি যুহায়র সূত্রে বর্ণনা করিয়াছেন। অপরদিকে গুনদার বর্ণিত ইবন 'উমার (রা)-এর হাদীছে کَرَّارُونَ শব্দের পরিবর্তে সমার্থক عَكَّارُونَ শব্দ আসিয়াছে।
এই হাদীছ ইমাম তিরমিযী ও ইন্ন মাজা ইয়াযীদ ইবন আবী যিয়াদ সূত্রে বর্ণনা করিয়াছেন। হাদীছটি সম্পর্কে তিরমিযীর অভিমত-হইল, হাদীছটি হাসান পর্যায়ের। আমি তাহাকে (বর্ণনাকারী) একমাত্র এই হাদীছটি ব্যতীত অন্য কোন সূত্রে চিনি না। ইমাম আহমাদ ইসহাক ইব্ন 'ঈসা ও আসওয়াদ ইবন 'আমের সূত্রে ইবন 'উমার (রা) হইতে বর্ণিত হাদীছের শেষাংশে আরও আছে, "আমি তোমাদিগের দলভুক্ত"। আসওয়াদ বলেন, "আমি প্রতিটি মুসলিম দলের সঙ্গী।"
উল্লেখ্য যে, উপরিউক্ত তিনিটি বর্ণনাই ইয়াযীদ ইব্ন আবী যিয়াদ 'আবদুর রাহমান ইবন আবী লায়লা সূত্রে, তিনি ইবন উমার (রা) হইতে বর্ণনা করিয়াছেন, যদিও অধস্তন বর্ণনাকারী হিসাবে বিভিন্ন ব্যক্তি রহিয়াছেন।
ইবন ইসহাক 'আবদুল্লাহ্ ইব্ন আবী বাক্স, তিনি 'আমের ইবন 'আবদুল্লাহ ইন্সুয যুবায়র (রা) সূত্রে বর্ণনা করিয়াছেন, রাসূলুল্লাহ (স)-এর সহধর্মিনী উম্মু সালামা (রা) সালামা ইব্ন হিশাম ইবনুল মুগীরা-র স্ত্রীকে বলিলেন, কি হইল সালামাকে রাসূলুল্লাহ (স) ও মুসলিমগণের সহিত জামা'আতে উপস্থিত হইতে দেখি না যে? তিনি বলিলেন, তাহার জন্য বাহির হওয়া সম্ভব
নয়, ঘর হইতে বাহির হইলেই লোকজন এই বলিয়া চিৎকার করে: يَا فَرَّارُ فَرَرْتُمْ فِي سَبِيلِ اللَّهِ (হে পলায়নকারী দল! তোমরা আল্লাহ্র পথ হইতে পলায়ন করিয়াছ)। এই কারণে তিনি গৃহবন্দী, বাহির হইতেছেন না। এই ঘটনা ছিল মু'তা যুদ্ধ সম্পর্কিত। ইব্ন কাছীর বলেন, সম্ভবত একটি দল পলায়ন করিয়াছিল যখন তাহারা শত্রুদিগের বিরাট বাহিনী প্রত্যক্ষ করিয়াছিল।
ইহাদের সংখ্যা দুই লক্ষ বলিয়া উল্লেখ করা হইয়াছে। পশ্চাদপসরণকারী দলটি ছাড়া অবশিষ্ট বাহিনী অটল ছিল। ইহাদেরকে আল্লাহ তা'আলা বিজয় দান করিয়াছিলেন এবং তাহারা শত্রুদিগের কবল হইতে মুক্তি লাভ করিয়াছিলেন। ইহাই ওয়াকিদী ও মূসা ইব্ন 'উক্বা পূর্বে উল্লেখ করিয়াছেন। এই অভিমতের সমর্থনে ইমাম আহমাদ কর্তৃক 'আওফ ইব্ন মালিক আল-আশজা'ঈ (রা) হইতে নিম্নের হাদীছটি বর্ণিত আছে:
قَالَ خَرَجْتُ مَعَ مَنْ خَرَجَ مَعَ زَيْدِ بْنِ حَارِثَةَ مِنَ الْمُسْلِمِينَ فِي غَزْوَةِ مُؤْتَةً وَرَافَقَنِي مَدَدِيٌّ مِنَ الْيَمَنِ لَيْسَ مَعَهُ غَيْرُ سَيْفِهِ فَنَحَرَ رَجُلٌ مِنَ الْمُسْلِمِينَ جَزُورًا فَسَأَلَهُ الْمَدَدِيُّ طَائِفَةً مِنْ جِلْدِهِ فَأَعْطَاهُ إِيَّاهُ فَاتَّخَذَهُ كَهَيْئَةِ الدَّرَقِ وَمَضَيْنَا فَلَقِينَا جُمُوعَ الرُّوْمِ وَفِيهِمْ رَجُلٌ عَلَى فَرْسٌ لَهُ أَشْقَرَ عَلَيْهِ سَرْجٌ مُذهَبٌ وَسَلَاحٌ مُذَهَبٌ فَجَعَلَ الرُّؤْمِيُّ يُغْزِى بِالْمُسْلِمِينَ وَقَعَدَ لَهُ الْمَدَدِى خَلْفَ صَخْرَةٍ فَمَرَّ بِهِ الرُّوْمِيُّ فَعَرْقَبَ فَرَسَهُ فَخَرَّ وَعَلَاهُ فَقَتْلَهُ وَحَازَ فَرَسَهُ وَسَلاحَهُ فَلَمَّا فَتَحَ اللهُ لِلْمُسْلِمِينَ بَعْثَ إِلَيْهِ خَالِدُ بْنُ الْوَلِيدِ فَأَخَذَ مِنْهُ السَّلَبَ قَالَ عَوْفٌ فَآتَيْتُهُ فَقُلْتُ يَا خَالِدُ أَمَا عَلِمْتَ أَنَّ رَسُولَ اللَّهِ ﷺ قَضَى بِالسَّلْبِ للقاتل قَالَ بَلى ولكنى اسْتَكْثَرْتُهُ فَقُلْتُ لَتَرُدُّنَّهُ إِلَيْهِ أَوَلَا عَرَفَنَّكَهَا عِنْدَ رَسُول الله ﷺ وابي أَنْ يَرُدَّ عَلَيْهِ قَالَ عَوْفٌ فَاجْتَمَعَا عِنْدَ رَسُول الله ﷺ وَقَصَصْتُ عَلَيْهِ قِصَّة الْمَدَدِى وَمَا فَعَلَهُ خَالِدٌ فَقَالُ رَسُولُ اللهِ ﷺ يَا خَالِدُ مَا حَمَلَكَ عَلَى مَا صَنَعْتَ قَالَ يَا رَسُولَ اللهُ اسْتَكْثَرْتُهُ فَقَالَ رَسُولُ الله ﷺ يَا خَالِدُ رُدَّ عَلَيْهِ مَا أَخَذْتَ مِنْهُ قَالَ عَوْفٌ فَقُلْتُ دُونَكَ يَا خَالِدُ آلَم أَن لَكَ فَقَالَ رَسُولُ الله ﷺ وَمَا ذَاكَ فَأَخْبَرْتُهُ فَغَضِبَ رَسُولُ اللهِ ﷺ وَقَالَ يَا خَالِدٌ لَا تَرُدَّهُ عَلَيْهِ هَلْ أَنْتُمْ تَارِكُولَى أَمَرَائِي لَكُمْ صَفْوَةٌ أَمْرِهِمْ وَعَلَيْهِمْ گذره.
'আওফ ইব্ন মালিক আল-আশজা'ঈ (রা) বলেন, যায়দ ইব্ন হারিছা (রা)-এর সহিত মুসলমানদের যেই বাহিনী মু'তা অভিযানে রওয়ানা করিয়াছিল তাহাদিগের সহিত আমিও বাহির হইয়াছিলাম। সঙ্গে একজন য়ামানী ছুরি নির্মাতা (cutter) লোকও ছিল। তাহার সংগে তাহার
তরবারি ব্যতীত আর কিছুই ছিল না। মুসলিম বাহিনীর জনৈক ব্যক্তি কতিপয় উট যবেহ করিয়াছিল। ইয়ামানী লোকটি তাহার নিকট ইহার আংশিক চামড়া চাহিল। সে তাহাকে তাহা প্রদান করিলে য়ামানী ইহা দ্বারা ঢাল সদৃশ একটা কিছু তৈয়ার করিল। অতঃপর আমরা রওয়ানা করিয়া রোমক বাহিনীর মুখামুখী হইলাম। ইহাদের মধ্যে একজন লোক লাল-হলুদ বর্ণযুক্ত একটি ঘোড়ার উপর সওয়ার ছিল। তাহার সোনালী গদী ও সোনালী অস্ত্রাদি ছিল। রোমক এই লোকটি মুসলমানদের বিরুদ্ধে যুদ্ধরত ছিল, অপর দিকে একটি পাথরের আড়ালে বসিয়া ঐ ইয়ামানী লোকটি তাহাকে অনুসরণ করিতেছিল। রোমক লোকটি অগ্রসর হইতেই সে তাহার ঘোড়ার পা কাটিয়া ফেলিলে সে পড়িয়া গেল এবং ইয়ামানী লোকটি তাহাকে হত্যা করিল। তাহার ঘোড়া ও হাতিয়ার সে গ্রহণ করিল। আল্লাহ যখন মুসলিম বাহিনীকে বিজয় দান করিলেন তখন খালিদ ইবনুল ওয়ালীদ তাহার নিকট হইতে যুদ্ধলব্ধ মাল গ্রহণ করিবার উদ্দেশে লোক পাঠাইলেন। 'আওফ বলেন, আমি খালিদ (রা)-এর নিকট আসিয়া বলিলাম, হে খালিদ! আপনি কি জানেন না, রাসূলুল্লাহ (স) হত্যাকারীর জন্য নিহত ব্যক্তির মাল গ্রহণের অনুমতি দিয়াছেন? তিনি বলিলেন, হাঁ জানি, তবে আমি ইহাকে অধিক মনে করিতেছি। তিনি বলেন, আমি বলিলাম, হয়ত আপনি তাহাকে ইহা ফিরাইয়া দিন নতুবা আমি আপনার এই ব্যাপারটি রাসূলুল্লাহ (স)-কে অবহিত করিব। তবুও তিনি তাহাকে উহা ফিরাইয়া দিতে অস্বীকৃতি জানাইলেন। 'আওফ (রা) বলেন, অতঃপর আমরা রাসূলুল্লাহ (স)-এর নিকট একত্র হইয়া ইয়ামানী লোকটির ঘটনা এবং তাহার সহিত খালিদ (রা)-এর আচরণের বিবরণ দিলাম। রাসূলুল্লাহ (স) বলিলেন, "হে খালিদ! তুমি তাহার নিকট হইতে যাহা গ্রহণ করিয়াছ তাহা ফিরাইয়া দাও।" আওফ বলেন, আমি বলিলাম, কী খালিদ! আমি কি আপনাকে আগেই বলি নাই? রাসূলুল্লাহ (স) বলিলেন, ঘটনাটি কি? আমি তাঁহাকে তাহা অবগত করাইলাম। ইহাতে রাসূলুল্লাহ (স) অসন্তুষ্ট হইয়া বলিলেন, "হে খালিদ! ইহা তাহাকে ফেরৎ দিও না। তোমরা কি আমার নিয়োজিত শাসকগণকে তাহাদের অবস্থায় ছাড়িয়া দিবে? তাহাদের ভাল কাজের ফল তোমরা পাইবে এবং তাহাদের ভুলভ্রান্তির দায়িত্ব তাহাদের" (মুসনাদে আহমাদ, ১খ., পৃ. ২০৪, নং ১৭৫০; ৬খ., পৃ. ২৭-২৮, নং ২৪৪৯৭)।
এই হাদীছ দ্বারা স্পষ্টভাবে প্রমাণিত হয় যে, মুসলিম বাহিনী শত্রুদের নিকট হইতে গনীমত ও তাহাদের অভিজাতদের নিকট হইতে সালাব (سلب) গ্রহণ করিয়াছিল, দুশমনদের কতিপয় নেতাকে হত্যাও করিয়াছিলেন। ইতিপূর্বে উক্ত বুখারীর রিওয়ায়াতে খালিদ (রা) বলেন: انْدَقَّتْ فِي يَدِي يَوْمَ مُؤْتَةَ تِسْعَةُ أَسْبَافٍ وَمَا ثَبَتَ فِي يَدِ لِي إِلَّا صَفَحَةً يَمَانِيَّةً. "আমার হাতে মুতা যুদ্ধের দিন নয়টি তরবারি চূর্ণবিচূর্ণ হইয়াছিল। একমাত্র ইয়ামানী তরবারি ছাড়া আমার হাতে আর কোন তরবারি অবশিষ্ট ছিল না"।
উক্ত হাদীছও প্রমাণ করে যে, ঐ দিন মুসলিম বাহিনী ব্যাপকভাবে শত্রু নিধন করিয়াছিল। এইরূপ না হইলে শত্রুদের কবল হইতে মুক্তি পাওয়া সম্ভব হইত না। এই ঘটনা মুসলমানদের বিজয়ের একটি সুনির্দিষ্ট প্রমাণ। মূসা ইবন 'উকবা, ওয়াকিদী ও বায়হাকীও এই অভিমত গ্রহণ করিয়াছেন। ইবন হিশাম যুহরী হইতেও অনুরূপ অভিমত বর্ণনা করিয়াছেন। বায়হাকী বলেন, ইসলামী যুদ্ধসমূহ সম্পর্কে পারদর্শী ব্যক্তিবর্গ মুসলমানদের জয় ও পরাজয় সম্পর্কে দ্বিধাবিভক্ত। কেহ মনে করেন, মুসলিমগণ পরাজয় বরণ করিয়াছিলেন। আবার কেহ মনে করেন মুশরিকগণ পরাজয় বরণ করিয়াছিল। তিনি বলেন, আনাস (রা) কর্তৃক রাসূলুল্লাহ (স)-এর হাদীছ اَخَذَهَا خَالِدٌ فَفَتَحَ اللَّهُ عَلَيْهِ প্রমাণ করে যে, মুসলিম বাহিনী বিজয় লাভ করিয়াছিল (আল- বিদায়া ওয়ান-নিহায়া, ৪খ., ২৪৮-২৫০)।
সীরাতুন নবী গ্রন্থে বলা হইয়াছে, এক লক্ষ সৈন্যের মোকাবিলায় তিন হাজার মুসলিম বাহিনী কীভাবে যুদ্ধ করিবে? বড় বিজয় ইহাই ছিল যে, নিজ সৈন্যবাহিনীকে বিরাট শত্রু বাহিনীর কবল হইতে রক্ষা করা। যখন এই পরাজয় বরণকারী বাহিনী মদীনার নিকটবর্তী হইয়াছিল এবং শহরবাসীরা তাহাদিগকে সংবর্ধনা জানাইতে বাহির হইয়াছিল তখন তাহারা সমবেদনা জানানোর বিপরীত তাহাদের চেহারায় মাটি ছুড়িয়াছিল। তাহাদের মুখের ধ্বনি ছিল, “হে পলায়নকারীগণ! তোমরা আল্লাহ্র পথ হইতে পলায়ন করিলে" (সীরাতুন নবী, ১খ., ২৯২-২৯৩)!
'আল্লামা ইবনুল কায়্যিম আল-জাওযিয়্যা বলেন, ইবন সা'দ উল্লেখ করিয়াছেন, এই যুদ্ধে মুসলিম বাহিনী পরাজিত হইয়াছিল। কিন্তু বুখারী শরীফের বর্ণনায় আছে, রোমক বাহিনী পরাজিত হইয়াছিল। এই ব্যাপারে ইবন ইসহাকের অভিমত হইল, উভয় দল অমীমাংসিতভাবে পৃথক হইয়া গিয়াছিল (যাদুল মা'আদ, ১/২খ., ১৫৬)। 'আল্লামা দানাপুরী ইব্ন কায়্যিমের এই অভিমত ব্যক্ত করিয়া অবশেষে ইবন হিশাম কর্তৃক যুহরীর এই অভিমতকে উল্লেখ করিয়াছেন যে, "আমার তো ইহাই মনে হয় যে, যখন খালিদ (রা)-কে সেনাপতি নির্বাচিত করা হয় তখন আল্লাহ তা'আলা মুসলিম বাহিনীকে বিজয় দান করিয়াছিলেন (আসাহহুস সিয়ার, পৃ.২৩৮)।
মাওলানা আবুল কালাম আযাদ বলিয়াছেন, কিছু কিছু রিওয়ায়াত পাওয়া যায় যাহা মুসলিম বাহিনীর পরাজয় প্রমাণ করে। যেমন মুসলিম সৈন্যদল যখন মদীনায় পৌঁছায় তখন অভ্যর্থনাকারী মদীনাবাসীর একটি দল মুসলিম বাহিনীর দিকে মাটি নিক্ষেপ করিয়া বলিয়াছিল, يَا فَرَّارُ أَفَرَرْتُمْ فِي سَبِيلِ الله; কিন্তু স্বয়ং রাসূলুল্লাহ (স) উত্তরে বলিয়াছিলেন, তাহারা পলায়নকারী নয়, বরং পাল্টা আক্রমণকারী। এই সম্পর্কে অধিকতর গ্রহণযোগ্য কথা হইল, মদীনাবাসীর নিকট প্রথমে অসম্পূর্ণ কিংবা ভুল তথ্য পৌছিয়াছিল। তাহারা কোন প্রকার পরীক্ষা-নিরীক্ষা ব্যতিরেকে এই সংবাদের উপর বিশ্বাস স্থাপন করিয়াছিলেন। সেই যুগ তো আর বর্তমান উন্নত যোগাযোগের যুগ ছিল না। সব সময় সংবাদ বাহকের কথার উপরই বিশ্বাস করিতে হইত। ইহারই কারণে কিছু সংখ্যক মদীনাবাসীর মুখ হইতে এইরূপ শব্দাবলী উচ্চারিত
হইয়াছিল। কিন্তু রাসূলুল্লাহ (স)-এর প্রত্যাখ্যানমূলক কথার পর পলায়নের অভিযোগ একেবারেই অসার মনে হয়। মাওলানা আযাদ, মাওলানা 'আবদুর রাউফ দানাপুরী কর্তৃক ইব্ন কায়ি্যমের উদ্ধৃতি সম্পর্কে প্রশ্নাকারে বলেন, ইমাম বুখারী ও ইমাম যুহরীর রিওয়ায়াতসমূহ বিশুদ্ধ, না ইবন ইসহাকের রিওয়ায়াত? তবুও বলিতে হয়, মৃতা যুদ্ধে ইসলামী বাহিনীর পরাজয় মনে করিবার কোন যৌক্তিক কারণ গোচরীভূত হয় না। ইবন ইসহাক অধিকন্তু বলিতে পারেন, যুদ্ধের কোন সুনির্দিষ্ট মীমাংসা হয় নাই। উভয় বাহিনী পিছনে পড়িয়া গিয়াছিল। একান্ত যদি উভয় দলের পিছনে হটিবার তথ্য মানিয়া লওয়া হয় তাহা হইলেও বলিব, লাখ-দেড় লাখ সৈন্যের পিছপা হইবার মধ্যে লাঞ্ছনা, না তিন হাজার সৈন্যের পিছপা হইবার মধ্যে লাঞ্ছনা রহিয়াছে? ইহাও লক্ষণীয় যে, শত্রুদল নিজ দেশে যুদ্ধ করিতেছে আর মুসলিম বাহিনী শত শত মাইল দূরদেশে লড়িতেছে।
প্রকৃত অবস্থা হইল, 'আবদুল্লাহ ইব্ন রাওয়াহা (রা)-এর শাহাদাতের পর মুসলিম বাহিনী বিক্ষিপ্ত হইয়া গিয়াছিল। এই অবস্থা নূতন সেনাপতি নিযুক্ত হইবার পূর্ব পর্যন্ত বিরাজ করিতেছিল। কিন্তু ছাবিত ইব্ন আরকাম আনসারী (রা)-এর তাৎক্ষণিক পরামর্শে খালিদ ইবনুল ওয়ালীদ (রা) সেনাপতির দায়িত্ব গ্রহণ করিয়া বিক্ষিপ্ত বাহিনীকে একত্র করিয়া তাহাদিগকে ঢালিয়া সাজাইলেন, অতঃপর অদম্যভাবে গর্জিয়া উঠিয়া শত্রুদিগকে পিছনে হটিতে বাধ্য করিলেন। ইহাও সম্ভব যে, মুসলিম বাহিনী সম্মুখ হইতে বিচ্ছিন্নভাবে হটিয়া যাইবার পর পুনরায় ঐক্যবদ্ধভাবে আক্রমণে উদ্যত হইলে শত্রুগণ ভাবিয়াছিল ইহারা পরাজয় বরণকারী বাহিনী নয়, বরং নব উদ্যমে উদ্দীপ্ত কোন নূতন দল। সম্ভবত ইহারা ছাড়া আরও বাহিনী আত্মগোপন করিয়া আছে। আল্লাহই জানেন ইহারা কোন সময় আক্রমণ করিয়া বসে। ফলে তাহারা আত্মরক্ষার্থে পিছনে হটিয়া গিয়াছিল। কিন্তু মুসলিম বাহিনী নিজেদের সংখ্যা স্বল্পতার কথা ভাবিয়া ইহাদিগকে অনুসরণ করা হইতে বিরত রহিয়াছিল। শত্রুবাহিনী যদি মুসলমানদের প্রকৃত সংখ্যা সম্পর্কে অবগত হইত তাহা হইল একজনও এই যুদ্ধ হইতে জীবিত ফিরিয়া পারিত না (রাসূলে রাহমাত, পৃ. ৪১৮)।
ইমাম বুখারীর রিওয়ায়াত, ইবন কাছীরের দীর্ঘ আলোচনা ও সর্বশেষ মাওলানা আযাদের তাত্ত্বিক পর্যালোচনার পর এই সিদ্ধান্তে উপনীত হওয়া যায় যে, এই যুদ্ধে মুসলমানগণ পরাজিত হয় নাই।
যুদ্ধের ফলাফল কিরূপ হইয়াছিল, মুসলিম বাহিনী বিজয় লাভ করিয়াছিল, না পরাজয় বরণ করিয়াছিল এই সম্পর্কে সীরাতবিদ, ইতিহাসবিদ ও মুহাদ্দিছগণের মধ্যে মতভেদ রহিয়াছে। ইমাম বুখারী আনাস (রা) হইতে যেই হাদীছ বর্ণনা করিয়াছেন (যাহা ইতোপূর্বে আলোচনা করা হইয়াছে) সেই হাদীছের শেষাংশ হইল:
حَتَّى أَخَذَ الرَّأْيَةَ سَيْفٌ مِّنْ سُيُوفِ اللَّهِ حَتَّى فَتَحَ اللَّهُ عَلَيْهِمْ.
"আল্লাহ্র তরবরিসমূহের কোন একটি তরবারি পতাকা ধারণ করিলে আল্লাহ শত্রুদের উপর তাহাদিগকে বিজয় দান করিলেন" (বুখারী, ২খ., ৬১১)।
এই হাদীছ দ্বারা স্পষ্টভাবে প্রতীয়মান হয় যে, মৃতা যুদ্ধে মুসলিম বাহিনী বিজয়লাভ করিয়াছিল। ইমাম বুখারী এই মত পোষণ করেন (আল-বিদায়া ওয়ান-নিহায়া, ৪খ., ২৪৫)। ওয়াকিদী আল-আত্তাফ ইন্ন খালিদ সূত্রে যেই রিওয়ায়াতটি উদ্ধৃত করিয়াছেন তাহাতে রহিয়াছে:
فَرُعِبُوا وَانْكَشَفُوا مُنْهَزِمِينَ.
"কাফিরদের মধ্যে ভীতি ছড়াইয়া দেওয়া হইয়াছিল, ফলে ইহারা পরাজয় বরণ করিয়া পালাইয়াছিল” (আল-বিদায়া ওয়ান-নিহায়া, ৪খ., পৃ. ২৪৭)।
ইহাও প্রমাণ করে যে, মুসলিম বাহিনী বিজয় লাভ করিয়াছিল।
• মূসা ইব্ন উকবা এই প্রসঙ্গে তাঁহার মাগাযীতে উল্লেখ করিয়াছেন :
فَهَزَمَ اللهُ العَدُوَّ وَأَظْهَرَ الْمُسْلِمِينَ.
"আল্লাহ শত্রুকে পরাজিত ও মুসলিম বাহিনীকে বিজয় দান করিলেন” (আল-বিদায়া ওয়ান-নিহায়া, ৪খ., ২৪৭)।
ইবন সা'দের মতে এই যুদ্ধে মুসলিম বাহিনী পরাজিত হইয়াছিল। তিনি বলেন:
فَلَمَّا سَمِعَ أَهْلُ الْمَدِينَةِ بِجَيْشِ مُوتَةَ قَادِمِينَ تَلَقَّوْهُمْ بِالْجُزْفِ فَجَعَلَ النَّاسِ يَحْشُونَ فِي وُجُوهِهِمُ التَّرَبَ يَقُولُونَ يَا فَرَارُ أَفَرَرْتُمْ فِي سَبِيلِ اللَّهِ فَيَقُولُ رَسُولُ اللَّهِ ﷺ لَيْسُوا بقرارٍ وَلَكِنَّهُمْ كَرَارُ إِنْ شَاءَ اللَّهُ.
"মদীনাবাসী যখন শুনিতে পাইল যে, মৃতা হইতে প্রত্যাবর্তনকারী দল আগমন করিতেছে, তখন তাহারা ইহাদিগের সহিত আল-জুরুফ নামক স্থানে গিয়া সাক্ষাত করিল। তাহারা ইহাদিগের মুখে ধুলাবালি নিক্ষেপ করিয়া বলিতেছিল, হে পলায়নকারী বাহিনী! তোমরা কি আল্লাহ্র রাস্তায় গিয়া পলায়ন করিয়াছ? রাসূলুল্লাহ (স) বলিলেন : পলায়নকারী নয়, ইনশাআল্লাহ আক্রমণকারী" (আত-তাবাকাতুল কুবরা, ২খ., ১২৯)।
আবুল হাসান আলী নদবী বলেন, মুসলিম বাহিনী যখন প্রত্যাবর্তন করিয়া মদীনার সন্নিকটে পৌছিল তখন রাসূলুল্লাহ (স) এবং অন্যান্য মুসলিমগণ অগ্রসর হইয়া তাহাদিগকে অভ্যর্থনা জানাইলেন। শিশুরা তাঁহার পিছনে পিছনে দৌঁড়াইতেছিল। রাসূলুল্লাহ (স) বাহনের উপর উপবিষ্ট ছিলেন। তিনি বলিলেন, শিশুদেরকে নিজেদের সংগে বসাও এবং জা'ফারের ছোট শিশু সন্তানকে আমার নিকট দাও। রাসূলুল্লাহ (স) জা'ফারের পুত্র 'আবদুল্লাহকে তাঁহার কোলে বসাইলেন। মুসলিম বাহিনী সাধারণত যুদ্ধক্ষেত্র হইতে পলায়ন করিত না। ইহা ছিল এই ধরনের পলায়নের প্রথম ঘটনা। এইজন্য সম্বর্ধনা দানকারী দল যোদ্ধা বাহিনীর উপর মাটি নিক্ষেপ করিয়া বলিতেছিল, তোমরা কি আল্লাহ্র পথ হইতে পালাইয়াছ? রাসূলুল্লাহ (স) বলিলেন, পলায়নকারী নয়, ইনশাআল্লাহ আক্রমণকারী" (নবীয়ে রহমত, লাখনৌ ১৩৯৮ হি., ২খ., ৫৪)।
ইবন কাছীর বলেন, ইবন ইসহাকে বর্ণনায় রহিয়াছে :
إِنَّ خَالِدًا إِنَّمَا حَاشَ بِالْقَوْمِ حَتَّى تَخَلَّصُوا مِنَ الرُّومِ وَعَرِبَ النَّصَارِي فَقَدْ.
""খালিদ মুসলিম বাহিনীকে হাঁকাইয়া লইয়া যান। ফলে রোমক ও আরবীয় খৃস্টানদের কবল হইতে মুসলিম বাহিনী মুক্তি লাভ করিয়াছিলেন"।
কিন্তু মূসা ইব্ন উকবা ও ওয়াকিদী স্পষ্টভাবে বলিয়াছেন যে, রোমক বাহিনী ও তাহাদিগের সহযোদ্ধা আরবগণ পরাজয় বরণ করিয়াছিল। ইহা আনাস (রা) কর্তৃক পূর্বে বর্ণিত "মারফ্” হাদীছের সমর্থক। এই মারফু' হাদীছটি ইমাম বুখারী কর্তৃক বর্ণিত যাহা পূর্বে উল্লেখ করা হইয়াছে। ইমাম বায়হাকী এই অভিমতকে প্রাধান্য দিয়াছেন। ইব্ন কাছীর উভয় অভিমত উল্লেখ করিয়া বলেন, ইবন ইসহাক ও অন্যান্যদের পরস্পর বিরোধী মতামতের মধ্যে এইভাবে সমন্বয় সাধন করা সম্ভব যে, খালিদ (রা) যখন পতাকা ধারণ করেন তখন তিনি মুসলিম বাহিনীকে নিরাপদে সরাইয়া নিয়া কাফিরদের কবল হইতে তাহাদিগকে রক্ষা করিয়াছিলেন। কিন্তু রাত পোহাইবার পর যখন তিনি মুসলিম বাহিনীকে নূতনভাবে বিন্যস্ত করিলেন (ওয়াকিদীর রিওয়ায়াত দ্র.) তখন রোমক বাহিনী ভাবিল যে, এক বিশাল বাহিনী মুসলমানদের সাহায্যে আসিয়াছে। অতঃপর খালিদ (রা) শত্রুদের উপর আক্রমণ চালাইয়া তাহাদিগকে পরাজিত করেন।
ইবন ইসহাক মুহাম্মাদ ইব্ন জা'ফার সূত্রে 'উরওয়া হইতে মৃতা থেকে প্রত্যাবর্তনকারী দলের প্রতি মদীনাবাসীদের মাটি নিক্ষেপ ও তিরস্কার করার নিম্নের রিওয়ায়াতটি উদ্ধৃত করেন :
فَجَعَلُوا يَحْثُونَ عَلَيْهِمْ بِالتَّرَابِ وَيَقُولُونَ يَا فَرَّارُ فَرَرْتُمْ فِي سَبِيلِ اللَّهِ.
ইব্ন কাছীর বলেন, আমার মতে ইব্ন ইসহাক এই স্থলে অনুমান নির্ভর কথা বলিয়াছেন। তিনি মনে করিয়াছেন, এই আচরণ সমস্ত মুসলিম বাহিনীর প্রতি করা হইয়াছিল। প্রকৃতপক্ষে এইরূপ করা হইয়াছিল স্বল্প সংখ্যক লোকের জন্য যাহারা শত্রু পক্ষের সহিত মুকাবিলার সময় পশ্চাদপসরণ করিয়াছিল। অবশিষ্ট মুসলিম যোদ্ধাগণ কিন্তু পলায়ন করেন নাই, বরং তাহদিগকে সাহায্য করা হইয়াছিল। যেমনিভাবে রাসূলুল্লাহ (স) এই সম্পর্কে মদীনায় তাঁহার সম্মুখে উপস্থিত মুসলমানগণকে সংবাদ দিতেছিলেন এই কথা বলিয়া : ثُمَّ أَخَذَ الرَّايَةَ سَيْفٌ مِّنْ سُيُوفِ اللَّهِ فَفَتَحَ اللَّهُ عَلَيْهِمْ.
সুতরাং অভ্যর্থনাকারী মুসলমানগণ তাহাদিগকে পলায়নকারী হিসাবে সম্বোধন করিতে পারেন না, বরং তাহাদিগের সহিত সম্মানের সহিত মিলিত হইয়াছিলেন। আর যাহারা পশ্চাদপসরণ করিয়াছিল এবং মুসলিম বাহিনীকে তথায় রাখিয়া চলিয়া আসিয়াছিল তাহাদিগকে মৃত্তিকা নিক্ষেপ ও তিরস্কার করা হইয়াছিল। এই পশ্চাদপসরণকারীদের মধ্যে ছিলেন 'আবদুল্লাহ ইবন 'উমার (রা)। ইমাম আহমাদ তদীয় সূত্রে 'আবদুল্লাহ ইবন 'উমার (রা) হইতে বর্ণনা করিয়াছেন :
عَنْ عَبْدِ اللَّهِ بْنِ عُمَرَ قَالَ كُنْتُ فِي سَرِيَّةٍ مِّنْ سَرَايَا رَسُولِ اللَّهِ ﷺ فَحَاصَ النَّاسِ حَيْصَةً وَكُنْتُ فِيمَنْ حَاصَ فَقَلْنَا كَيْفَ تَصْنَعُ وَقَدْ قَرَرْنَا مِنَ الزَّحْفِ وَيُؤْنَا بِالْغَضَبِ ثُمَّ قُلْنَا لَوْ دَخَلْنَا الْمَدِينَةَ قُتِلْنَا ثُمَّ قُلْنَا لَوْ عَرَضْنَا أَنْفُسَنَا عَلَى رَسُولِ اللَّهِ ﷺ فَإِنْ كَانَتْ لَنَا تَوبَةٌ وَإِلا ذَهَبْنَا فَآتَيْنَاهُ قَبْلَ صَلوةِ الْغَدَاةِ فَخَرَجَ فَقَالَ مَنِ الْقَوْمُ قَالَ قُلْنَا نَحْنُ فَرَّارُونَ فَقَالَ لَا بَلْ أَنْتُمُ الْكَرَارُونَ أَنَا فَتَتُكُمْ وَأَنَا فِئَةُ الْمُسْلِمِينَ قَالَ فَأَتَيْنَاهُ حَتَّى قَبَّلْنَا يده
"আবদুল্লাহ ইবন 'উমার (রা) বলেন, আমরা রাসূলুল্লাহ (স) কর্তৃক প্রেরিত কোন এক যুদ্ধাভিযানে অংশগ্রহণ করিয়াছিলাম। এই যুদ্ধে কিছু সংখ্যক লোক পশ্চাদপসরণ করিয়াছিল। আমি ছিলাম তাহাদের অন্তর্ভুক্ত। আমরা বলিলাম, আমরা এখন কি করি? আমরা তো যুদ্ধ হইতে পলায়ন করিলাম এবং অভিসম্পাতের উপযুক্ত হইলাম। অতঃপর আমরা বলিলাম, যদি আমরা মদীনায় প্রবেশ করি তাহা হইলে আমাদিগকে হত্যা করা হইবে। ইহার পর আমরা বলিলাম, যদি আমরা নিজেদেরকে রাসূলুল্লাহ (স)-এর নিকট পেশ করি এবং আমাদিগের তওবা কবুল হয় তাহা হইলে তো ভাল। অন্যথায় আমরা ধ্বংস হইয়া যাইব। সুতরাং আমরা রাসূলুল্লাহ (স)-এর নিকট ফজরের সালাতের পূর্বে আগমন করিলাম। রাসূলুল্লাহ (স) গৃহ হইতে বাহির হইয়া বলিলেন, কোন দলের লোক? আমরা বলিলাম, আমরা পলায়নকারী দল। রাসূলুল্লাহ (স) বলিলেন, বরং তোমরা আক্রমণকারী দল। আমি তোমাদিগের দলভুক্ত এবং আমি মুসলমানদের দলভুক্ত। তিনি বলেন, অতঃপর আমরা রাসূলুল্লাহ (স)-এর নিকট আসিয়া তাহার হস্ত চুম্বন করিলাম"।
উপরিউক্ত হাদীছ ইমাম আহমাদ হাসান সূত্রে, তিনি যুহায়র সূত্রে বর্ণনা করিয়াছেন। অপরদিকে গুনদার বর্ণিত ইবন 'উমার (রা)-এর হাদীছে কَرَّارُونَ শব্দের পরিবর্তে সমার্থক عَكَّارُونَ শব্দ আসিয়াছে।
এই হাদীছ ইমাম তিরমিযী ও ইন্ন মাজা ইয়াযীদ ইবন আবী যিয়াদ সূত্রে বর্ণনা করিয়াছেন। হাদীছটি সম্পর্কে তিরমিযীর অভিমত-হইল, হাদীছটি হাসান পর্যায়ের। আমি তাহাকে (বর্ণনাকারী) একমাত্র এই হাদীছটি ব্যতীত অন্য কোন সূত্রে চিনি না। ইমাম আহমাদ ইসহাক ইব্ন 'ঈসা ও আসওয়াদ ইবন 'আমের সূত্রে ইবন 'উমার (রা) হইতে বর্ণিত হাদীছের শেষাংশে আরও আছে, "আমি তোমাদিগের দলভুক্ত"। আসওয়াদ বলেন, "আমি প্রতিটি মুসলিম দলের সঙ্গী।"
উল্লেখ্য যে, উপরিউক্ত তিনিটি বর্ণনাই ইয়াযীদ ইব্ন আবী যিয়াদ 'আবদুর রাহমান ইবন আবী লায়লা সূত্রে, তিনি ইবন উমার (রা) হইতে বর্ণনা করিয়াছেন, যদিও অধস্তন বর্ণনাকারী হিসাবে বিভিন্ন ব্যক্তি রহিয়াছেন।
ইবন ইসহাক 'আবদুল্লাহ্ ইব্ন আবী বাক্স, তিনি 'আমের ইবন 'আবদুল্লাহ ইন্সুয যুবায়র (রা) সূত্রে বর্ণনা করিয়াছেন, রাসূলুল্লাহ (স)-এর সহধর্মিনী উম্মু সালামা (রা) সালামা ইব্ন হিশাম ইবনুল মুগীরা-র স্ত্রীকে বলিলেন, কি হইল সালামাকে রাসূলুল্লাহ (স) ও মুসলিমগণের সহিত জামা'আতে উপস্থিত হইতে দেখি না যে? তিনি বলিলেন, তাহার জন্য বাহির হওয়া সম্ভব নয়, ঘর হইতে বাহির হইলেই লোকজন এই বলিয়া চিৎকার করে: يَا فَرَّارُ فَرَرْتُمْ فِي سَبِيلِ اللَّهِ (হে পলায়নকারী দল! তোমরা আল্লাহ্র পথ হইতে পলায়ন করিয়াছ)। এই কারণে তিনি গৃহবন্দী, বাহির হইতেছেন না। এই ঘটনা ছিল মু'তা যুদ্ধ সম্পর্কিত। ইব্ন কাছীর বলেন, সম্ভবত একটি দল পলায়ন করিয়াছিল যখন তাহারা শত্রুদিগের বিরাট বাহিনী প্রত্যক্ষ করিয়াছিল।
ইহাদের সংখ্যা দুই লক্ষ বলিয়া উল্লেখ করা হইয়াছে। পশ্চাদপসরণকারী দলটি ছাড়া অবশিষ্ট বাহিনী অটল ছিল। ইহাদেরকে আল্লাহ তা'আলা বিজয় দান করিয়াছিলেন এবং তাহারা শত্রুদিগের কবল হইতে মুক্তি লাভ করিয়াছিলেন। ইহাই ওয়াকিদী ও মূসা ইব্ন 'উক্বা পূর্বে উল্লেখ করিয়াছেন। এই অভিমতের সমর্থনে ইমাম আহমাদ কর্তৃক 'আওف ইব্ন মালিক আল-আশজা'ঈ (রা) হইতে নিম্নের হাদীছটি বর্ণিত আছে:
قَالَ خَرَجْتُ مَعَ مَنْ خَرَجَ مَعَ زَيْدِ بْنِ حَارِثَةَ مِنَ الْمُسْلِمِينَ فِي غَزْوَةِ مُؤْتَةً وَرَافَقَنِي مَدَدِيٌّ مِنَ الْيَمَنِ لَيْسَ مَعَهُ غَيْرُ سَيْفِهِ فَنَحَرَ رَجُلٌ مِنَ الْمُسْلِمِينَ جَزُورًا فَسَأَلَهُ الْمَدَدِيُّ طَائِفَةً مِنْ جِلْدِهِ فَأَعْطَاهُ إِيَّاهُ فَاتَّخَذَهُ كَهَيْئَةِ الدَّرَقِ وَمَضَيْنَا فَلَقِينَا جُمُوعَ الرُّوْمِ وَفِيهِمْ رَجُلٌ عَلَى فَرْسٌ لَهُ أَشْقَرَ عَلَيْهِ سَرْجٌ مُذهَبٌ وَسَلَاحٌ مُذَهَبٌ فَجَعَلَ الرُّؤْمِيُّ يُغْزِى بِالْمُسْلِمِينَ وَقَعَدَ لَهُ الْمَدَدِى خَلْفَ صَخْرَةٍ فَمَرَّ بِهِ الرُّوْمِيُّ فَعَرْقَبَ فَرَسَهُ فَخَرَّ وَعَلَاهُ فَقَتْلَهُ وَحَازَ فَرَسَهُ وَسَلاحَهُ فَلَمَّا فَتَحَ اللهُ لِلْمُسْلِمِينَ بَعْثَ إِلَيْهِ خَالِدُ بْنُ الْوَلِيدِ فَأَخَذَ مِنْهُ السَّلَبَ قَالَ عَوْفٌ فَآتَيْتُهُ فَقُلْتُ يَا خَالِدُ أَمَا عَلِمْتَ أَنَّ رَسُولَ اللَّهِ ﷺ قَضَى بِالسَّلْبِ للقاتل قَالَ بَلى ولكنى اسْتَكْثَرْتُهُ فَقُلْتُ لَتَرُدُّنَّهُ إِلَيْهِ أَوَلَا عَرَفَنَّكَهَا عِنْدَ رَسُول الله ﷺ وابي أَنْ يَرُدَّ عَلَيْهِ قَالَ عَوْفٌ فَاجْتَمَعَا عِنْدَ رَسُول الله ﷺ وَقَصَصْتُ عَلَيْهِ قِصَّة الْمَدَدِى وَمَا فَعَلَهُ خَالِدٌ فَقَالُ رَسُولُ اللهِ ﷺ يَا خَالِدُ مَا حَمَلَكَ عَلَى مَا صَنَعْتَ قَالَ يَا رَسُولَ اللهُ اسْتَكْثَرْتُهُ فَقَالَ رَسُولُ الله ﷺ يَا خَالِدُ رُدَّ عَلَيْهِ مَا أَخَذْتَ مِنْهُ قَالَ عَوْفٌ فَقُلْتُ دُونَكَ يَا خَالِدُ آلَم أَن لَكَ فَقَالَ رَسُولُ الله ﷺ وَمَا ذَاكَ فَأَخْبَرْتُهُ فَغَضِبَ رَسُولُ اللهِ ﷺ وَقَالَ يَا خَالِدٌ لَا تَرُدَّهُ عَلَيْهِ هَلْ أَنْتُمْ تَارِكُولَى أَمَرَائِي لَكُمْ صَفْوَةٌ أَمْرِهِمْ وَعَلَيْهِمْ گذره.
'আওফ ইব্ন মালিক আল-আশজা'ঈ (রা) বলেন, যায়দ ইব্ন হারিছা (রা)-এর সহিত মুসলমানদের যেই বাহিনী মু'তা অভিযানে রওয়ানা করিয়াছিল তাহাদিগের সহিত আমিও বাহির হইয়াছিলাম। সঙ্গে একজন য়ামানী ছুরি নির্মাতা (cutter) লোকও ছিল। তাহার সংগে তাহার তরবারি ব্যতীত আর কিছুই ছিল না। মুসলিম বাহিনীর জনৈক ব্যক্তি কতিপয় উট যবেহ করিয়াছিল। ইয়ামানী লোকটি তাহার নিকট ইহার আংশিক চামড়া চাহিল। সে তাহাকে তাহা প্রদান করিলে য়ামানী ইহা দ্বারা ঢাল সদৃশ একটা কিছু তৈয়ার করিল। অতঃপর আমরা রওয়ানা করিয়া রোমক বাহিনীর মুখামুখী হইলাম। ইহাদের মধ্যে একজন লোক লাল-হলুদ বর্ণযুক্ত একটি ঘোড়ার উপর সওয়ার ছিল। তাহার সোনালী গদী ও সোনালী অস্ত্রাদি ছিল। রোমক এই লোকটি মুসলমানদের বিরুদ্ধে যুদ্ধরত ছিল, অপর দিকে একটি পাথরের আড়ালে বসিয়া ঐ ইয়ামানী লোকটি তাহাকে অনুসরণ করিতেছিল। রোমক লোকটি অগ্রসর হইতেই সে তাহার ঘোড়ার পা কাটিয়া ফেলিলে সে পড়িয়া গেল এবং ইয়ামানী লোকটি তাহাকে হত্যা করিল। তাহার ঘোড়া ও হাতিয়ার সে গ্রহণ করিল। আল্লাহ যখন মুসলিম বাহিনীকে বিজয় দান করিলেন তখন খালিদ ইবনুল ওয়ালীদ তাহার নিকট হইতে যুদ্ধলব্ধ মাল গ্রহণ করিবার উদ্দেশে লোক পাঠাইলেন। 'আওফ বলেন, আমি খালিদ (রা)-এর নিকট আসিয়া বলিলাম, হে খালিদ! আপনি কি জানেন না, রাসূলুল্লাহ (স) হত্যাকারীর জন্য নিহত ব্যক্তির মাল গ্রহণের অনুমতি দিয়াছেন? তিনি বলিলেন, হাঁ জানি, তবে আমি ইহাকে অধিক মনে করিতেছি। তিনি বলেন, আমি বলিলাম, হয়ত আপনি তাহাকে ইহা ফিরাইয়া দিন নতুবা আমি আপনার এই ব্যাপারটি রাসূলুল্লাহ (স)-কে অবহিত করিব। তবুও তিনি তাহাকে উহা ফিরাইয়া দিতে অস্বীকৃতি জানাইলেন। 'আওফ (রা) বলেন, অতঃপর আমরা রাসূলুল্লাহ (স)-এর নিকট একত্র হইয়া ইয়ামানী লোকটির ঘটনা এবং তাহার সহিত খালিদ (রা)-এর আচরণের বিবরণ দিলাম। রাসূলুল্লাহ (স) বলিলেন, "হে খালিদ! তুমি তাহার নিকট হইতে যাহা গ্রহণ করিয়াছ তাহা ফিরাইয়া দাও।" আওফ বলেন, আমি বলিলাম, কী খালিদ! আমি কি আপনাকে আগেই বলি নাই? রাসূলুল্লাহ (স) বলিলেন, ঘটনাটি কি? আমি তাঁহাকে তাহা অবগত করাইলাম। ইহাতে রাসূলুল্লাহ (স) অসন্তুষ্ট হইয়া বলিলেন, "হে খালিদ! ইহা তাহাকে ফেরৎ দিও না। তোমরা কি আমার নিয়োজিত শাসকগণকে তাহাদের অবস্থায় ছাড়িয়া দিবে? তাহাদের ভাল কাজের ফল তোমরা পাইবে এবং তাহাদের ভুলভ্রান্তির দায়িত্ব তাহাদের" (মুসনাদে আহমাদ, ১খ., পৃ. ২০৪, নং ১৭৫০; ৬খ., পৃ. ২৭-২৮, নং ২৪৪৯৭)।
এই হাদীছ দ্বারা স্পষ্টভাবে প্রমাণিত হয় যে, মুসলিম বাহিনী শত্রুদের নিকট হইতে গনীমত ও তাহাদের অভিজাতদের নিকট হইতে সালাব (سلب) গ্রহণ করিয়াছিল, দুশমনদের কতিপয় নেতাকে হত্যাও করিয়াছিলেন। ইতিপূর্বে উক্ত বুখারীর রিওয়ায়াতে খালিদ (রা) বলেন: انْدَقَّتْ فِي يَدِي يَوْمَ مُؤْتَةَ تِسْعَةُ أَسْبَافٍ وَمَا ثَبَتَ فِي يَدِ لِي إِلَّا صَفَحَةً يَمَانِيَّةً. "আমার হাতে মুতা যুদ্ধের দিন নয়টি তরবারি চূর্ণবিচূর্ণ হইয়াছিল। একমাত্র ইয়ামানী তরবারি ছাড়া আমার হাতে আর কোন তরবারি অবশিষ্ট ছিল না"।
উক্ত হাদীছও প্রমাণ করে যে, ঐ দিন মুসলিম বাহিনী ব্যাপকভাবে শত্রু নিধন করিয়াছিল। এইরূপ না হইলে শত্রুদের কবল হইতে মুক্তি পাওয়া সম্ভব হইত না। এই ঘটনা মুসলমানদের বিজয়ের একটি সুনির্দিষ্ট প্রমাণ। মূসা ইবন 'উকবা, ওয়াকিদী ও বায়হাকীও এই অভিমত গ্রহণ করিয়াছেন। ইবন হিশাম যুহরী হইতেও অনুরূপ অভিমত বর্ণনা করিয়াছেন। বায়হাকী বলেন, ইসলামী যুদ্ধসমূহ সম্পর্কে পারদর্শী ব্যক্তিবর্গ মুসলমানদের জয় ও পরাজয় সম্পর্কে দ্বিধাবিভক্ত। কেহ মনে করেন, মুসলিমগণ পরাজয় বরণ করিয়াছিলেন। আবার কেহ মনে করেন মুশরিকগণ পরাজয় বরণ করিয়াছিল। তিনি বলেন, আনাস (রা) কর্তৃক রাসূলুল্লাহ (স)-এর হাদীছ اَخَذَهَا خَالِدٌ فَفَتَحَ اللَّهُ عَلَيْهِ প্রমাণ করে যে, মুসলিম বাহিনী বিজয় লাভ করিয়াছিল (আল- বিদায়া ওয়ান-নিহায়া, ৪খ., ২৪৮-২৫০)।
সীরাতুন নবী গ্রন্থে বলা হইয়াছে, এক লক্ষ সৈন্যের মোকাবিলায় তিন হাজার মুসলিম বাহিনী কীভাবে যুদ্ধ করিবে? বড় বিজয় ইহাই ছিল যে, নিজ সৈন্যবাহিনীকে বিরাট শত্রু বাহিনীর কবল হইতে রক্ষা করা। যখন এই পরাজয় বরণকারী বাহিনী মদীনার নিকটবর্তী হইয়াছিল এবং শহরবাসীরা তাহাদিগকে সংবর্ধনা জানাইতে বাহির হইয়াছিল তখন তাহারা সমবেদনা জানানোর বিপরীত তাহাদের চেহারায় মাটি ছুড়িয়াছিল। তাহাদের মুখের ধ্বনি ছিল, “হে পলায়নকারীগণ! তোমরা আল্লাহ্র পথ হইতে পলায়ন করিলে" (সীরাতুন নবী, ১খ., ২৯২-২৯৩)!
'আল্লামা ইবনুল কায়্যিম আল-জাওযিয়্যা বলেন, ইবন সা'দ উল্লেখ করিয়াছেন, এই যুদ্ধে মুসলিম বাহিনী পরাজিত হইয়াছিল। কিন্তু বুখারী শরীফের বর্ণনায় আছে, রোমক বাহিনী পরাজিত হইয়াছিল। এই ব্যাপারে ইবন ইসহাকের অভিমত হইল, উভয় দল অমীমাংসিতভাবে পৃথক হইয়া গিয়াছিল (যাদুল মা'আদ, ১/২খ., ১৫৬)। 'আল্লামা দানাপুরী ইব্ন কায়্যিমের এই অভিমত ব্যক্ত করিয়া অবশেষে ইবন হিশাম কর্তৃক যুহরীর এই অভিমতকে উল্লেখ করিয়াছেন যে, "আমার তো ইহাই মনে হয় যে, যখন খালিদ (রা)-কে সেনাপতি নির্বাচিত করা হয় তখন আল্লাহ তা'আলা মুসলিম বাহিনীকে বিজয় দান করিয়াছিলেন (আসাহহুস সিয়ার, পৃ.২৩৮)।
মাওলানা আবুল কালাম আযাদ বলিয়াছেন, কিছু কিছু রিওয়ায়াত পাওয়া যায় যাহা মুসলিম বাহিনীর পরাজয় প্রমাণ করে। যেমন মুসলিম সৈন্যদল যখন মদীনায় পৌঁছায় তখন অভ্যর্থনাকারী মদীনাবাসীর একটি দল মুসলিম বাহিনীর দিকে মাটি নিক্ষেপ করিয়া বলিয়াছিল, يَا فَرَّارُ أَفَرَرْتُمْ فِي سَبِيلِ الله; কিন্তু স্বয়ং রাসূলুল্লাহ (স) উত্তরে বলিয়াছিলেন, তাহারা পলায়নকারী নয়, বরং পাল্টা আক্রমণকারী। এই সম্পর্কে অধিকতর গ্রহণযোগ্য কথা হইল, মদীনাবাসীর নিকট প্রথমে অসম্পূর্ণ কিংবা ভুল তথ্য পৌছিয়াছিল। তাহারা কোন প্রকার পরীক্ষা-নিরীক্ষা ব্যতিরেকে এই সংবাদের উপর বিশ্বাস স্থাপন করিয়াছিলেন। সেই যুগ তো আর বর্তমান উন্নত যোগাযোগের যুগ ছিল না। সব সময় সংবাদ বাহকের কথার উপরই বিশ্বাস করিতে হইত। ইহারই কারণে কিছু সংখ্যক মদীনাবাসীর মুখ হইতে এইরূপ শব্দাবলী উচ্চারিত হইয়াছিল। কিন্তু রাসূলুল্লাহ (স)-এর প্রত্যাখ্যানমূলক কথার পর পলায়নের অভিযোগ একেবারেই অসার মনে হয়। মাওলানা আযাদ, মাওলানা 'আবদুর রাউফ দানাপুরী কর্তৃক ইব্ন কায়ি্যমের উদ্ধৃতি সম্পর্কে প্রশ্নাকারে বলেন, ইমাম বুখারী ও ইমাম যুহরীর রিওয়ায়াতসমূহ বিশুদ্ধ, না ইবন ইসহাকের রিওয়ায়াত? তবুও বলিতে হয়, মৃতা যুদ্ধে ইসলামী বাহিনীর পরাজয় মনে করিবার কোন যৌক্তিক কারণ গোচরীভূত হয় না। ইবন ইসহাক অধিকন্তু বলিতে পারেন, যুদ্ধের কোন সুনির্দিষ্ট মীমাংসা হয় নাই। উভয় বাহিনী পিছনে পড়িয়া গিয়াছিল। একান্ত যদি উভয় দলের পিছনে হটিবার তথ্য মানিয়া লওয়া হয় তাহা হইলেও বলিব, লাখ-দেড় লাখ সৈন্যের পিছপা হইবার মধ্যে লাঞ্ছনা, না তিন হাজার সৈন্যের পিছপা হইবার মধ্যে লাঞ্ছনা রহিয়াছে? ইহাও লক্ষণীয় যে, শত্রুদল নিজ দেশে যুদ্ধ করিতেছে আর মুসলিম বাহিনী শত শত মাইল দূরদেশে লড়িতেছে।
প্রকৃত অবস্থা হইল, 'আবদুল্লাহ ইব্ন রাওয়াহা (রা)-এর শাহাদাতের পর মুসলিম বাহিনী বিক্ষিপ্ত হইয়া গিয়াছিল। এই অবস্থা নূতন সেনাপতি নিযুক্ত হইবার পূর্ব পর্যন্ত বিরাজ করিতেছিল। কিন্তু ছাবিত ইব্ন আরকাম আনসারী (রা)-এর তাৎক্ষণিক পরামর্শে খালিদ ইবনুল ওয়ালীদ (রা) সেনাপতির দায়িত্ব গ্রহণ করিয়া বিক্ষিপ্ত বাহিনীকে একত্র করিয়া তাহাদিগকে ঢালিয়া সাজাইলেন, অতঃপর অদম্যভাবে গর্জিয়া উঠিয়া শত্রুদিগকে পিছনে হটিতে বাধ্য করিলেন। ইহাও সম্ভব যে, মুসলিম বাহিনী সম্মুখ হইতে বিচ্ছিন্নভাবে হটিয়া যাইবার পর পুনরায় ঐক্যবদ্ধভাবে আক্রমণে উদ্যত হইলে শত্রুগণ ভাবিয়াছিল ইহারা পরাজয় বরণকারী বাহিনী নয়, বরং নব উদ্যমে উদ্দীপ্ত কোন নূতন দল। সম্ভবত ইহারা ছাড়া আরও বাহিনী আত্মগোপন করিয়া আছে। আল্লাহই জানেন ইহারা কোন সময় আক্রমণ করিয়া বসে। ফলে তাহারা আত্মরক্ষার্থে পিছনে হটিয়া গিয়াছিল। কিন্তু মুসলিম বাহিনী নিজেদের সংখ্যা স্বল্পতার কথা ভাবিয়া ইহাদিগকে অনুসরণ করা হইতে বিরত রহিয়াছিল। শত্রুবাহিনী যদি মুসলমানদের প্রকৃত সংখ্যা সম্পর্কে অবগত হইত তাহা হইল একজনও এই যুদ্ধ হইতে জীবিত ফিরিতে পারিত না (রাসূলে রাহমাত, পৃ. ৪১৮)।
ইমাম বুখারীর রিওয়ায়াত, ইবন কাছীরের দীর্ঘ আলোচনা ও সর্বশেষ মাওলানা আযাদের তাত্ত্বিক পর্যালোচনার পর এই সিদ্ধান্তে উপনীত হওয়া যায় যে, এই যুদ্ধে মুসলমানগণ পরাজিত হয় নাই।
যুদ্ধের ফলাফল কিরূপ হইয়াছিল, মুসলিম বাহিনী বিজয় লাভ করিয়াছিল, না পরাজয় বরণ করিয়াছিল এই সম্পর্কে সীরাতবিদ, ইতিহাসবিদ ও মুহাদ্দিছগণের মধ্যে মতভেদ রহিয়াছে। ইমাম বুখারী আনাস (রা) হইতে যেই হাদীছ বর্ণনা করিয়াছেন (যাহা ইতোপূর্বে আলোচনা করা হইয়াছে) সেই হাদীছের শেষাংশ হইল:
حَتَّى أَخَذَ الرَّأْيَةَ سَيْفٌ مِّنْ سُيُوفِ اللَّهِ حَتَّى فَتَحَ اللَّهُ عَلَيْهِمْ.
"আল্লাহ্র তরবরিসমূহের কোন একটি তরবারি পতাকা ধারণ করিলে আল্লাহ শত্রুদের উপর তাহাদিগকে বিজয় দান করিলেন" (বুখারী, ২খ., ৬১১)।
এই হাদীছ দ্বারা স্পষ্টভাবে প্রতীয়মান হয় যে, মৃতা যুদ্ধে মুসলিম বাহিনী বিজয়লাভ করিয়াছিল। ইমাম বুখারী এই মত পোষণ করেন (আল-বিদায়া ওয়ান-নিহায়া, ৪খ., ২৪৫)। ওয়াকিদী আল-আত্তাফ ইন্ন খালিদ সূত্রে যেই রিওয়ায়াতটি উদ্ধৃত করিয়াছেন তাহাতে রহিয়াছে:
فَرُعِبُوا وَانْكَشَفُوا مُنْهَزِمِينَ.
"কাফিরদের মধ্যে ভীতি ছড়াইয়া দেওয়া হইয়াছিল, ফলে ইহারা পরাজয় বরণ করিয়া পালাইয়াছিল” (আল-বিদায়া ওয়ান-নিহায়া, ৪খ., পৃ. ২৪৭)।
• মূসা ইব্ন উকবা এই প্রসঙ্গে তাঁহার মাগাযীতে উল্লেখ করিয়াছেন :
فَهَزَمَ اللهُ العَدُوَّ وَأَظْهَرَ الْمُسْلِمِينَ.
"আল্লাহ শত্রুকে পরাজিত ও মুসলিম বাহিনীকে বিজয় দান করিলেন” (আল-বিদায়া ওয়ান-নিহায়া, ৪খ., ২৪৭)।
ইবন সা'দের মতে এই যুদ্ধে মুসলিম বাহিনী পরাজিত হইয়াছিল। তিনি বলেন,
فَلَمَّا سَمِعَ أَهْلُ الْمَدِينَةِ بِجَيْشِ مُوتَةَ قَادِمِينَ تَلَقَّوْهُمْ بِالْجُزْفِ فَجَعَلَ النَّاسِ يَحْشُونَ فِي وُجُوهِهِمُ التَّرَبَ يَقُولُونَ يَا فَرَارُ أَفَرَرْتُمْ فِي سَبِيلِ اللَّهِ فَيَقُولُ رَسُولُ اللَّهِ ﷺ لَيْسُوا بقرارٍ وَلَكِنَّهُمْ كَرَارُ إِنْ شَاءَ اللَّهُ.
"মদীনাবাসী যখন শুনিতে পাইল যে, মৃতা হইতে প্রত্যাবর্তনকারী দল আগমন করিতেছে, তখন তাহারা ইহাদিগের সহিত আল-জুরুফ নামক স্থানে গিয়া সাক্ষাত করিল। তাহারা ইহাদিগের মুখে ধুলাবালি নিক্ষেপ করিয়া বলিতেছিল, হে পলায়নকারী বাহিনী! তোমরা কি আল্লাহ্র পথ হইতে পালাইয়াছ? রাসূলুল্লাহ (স) বলিলেন : পলায়নকারী নয়, ইনশাআল্লাহ আক্রমণকারী” (আত-তাবাকাতুল কুবরা, ২খ., ১২৯)।
আবুল হাসান আলী নদবী বলেন, মুসলিম বাহিনী যখন প্রত্যাবর্তন করিয়া মদীনার সন্নিকটে পৌছিল তখন রাসূলুল্লাহ (স) এবং অন্যান্য মুসলিমগণ অগ্রসর হইয়া তাহাদিগকে অভ্যর্থনা জানাইলেন। শিশুরা তাঁহার পিছনে পিছনে দৌঁড়াইতেছিল। রাসূলুল্লাহ (স) বাহনের উপর উপবিষ্ট ছিলেন। তিনি বলিলেন, শিশুদেরকে নিজেদের সংগে বসাও এবং জা'ফারের ছোট শিশু সন্তানকে আমার নিকট দাও। রাসূলুল্লাহ (স) জা'ফারের পুত্র 'আবদুল্লাহকে তাঁহার কোলে বসাইলেন। মুসলিম বাহিনী সাধারণত যুদ্ধক্ষেত্র হইতে পলায়ন করিত না। ইহা ছিল এই ধরনের পলায়নের প্রথম ঘটনা। এইজন্য সম্বর্ধনা দানকারী দল যোদ্ধা বাহিনীর উপর মাটি নিক্ষেপ করিয়া বলিতেছিল, তোমরা কি আল্লাহ্র পথ হইতে পালাইয়াছ? রাসূলুল্লাহ (স) বলিলেন, পলায়নকারী নয়, ইনশাআল্লাহ আক্রমণকারী" (নবীয়ে রহমত, লাখনৌ ১৩৯৮ হি., ২খ., ৫৪)।
ইবন কাছীর বলেন, ইবন ইসহাকে বর্ণনায় রহিয়াছে :
إِنَّ خَالِدًا إِنَّمَا حَاشَ بِالْقَوْمِ حَتَّى تَخَلَّصُوا مِنَ الرُّومِ وَعَرِبَ النَّصَارِي فَقَدْ.
""খালিদ মুসলিম বাহিনীকে হাঁকাইয়া লইয়া যান। ফলে রোমক ও আরবীয় খৃস্টানদের কবল হইতে মুসলিম বাহিনী মুক্তি লাভ করিয়াছিলেন"।
কিন্তু মূসা ইব্ন উকবা ও ওয়াকিদী স্পষ্টভাবে বলিয়াছেন যে, রোমক বাহিনী ও তাহাদিগের সহযোদ্ধা আরবগণ পরাজয় বরণ করিয়াছিল। ইহা আনাস (রা) কর্তৃক পূর্বে বর্ণিত "মারফ্” হাদীছের সমর্থক। এই মারফু' হাদীছটি ইমাম বুখারী কর্তৃক বর্ণিত যাহা পূর্বে উল্লেখ করা হইয়াছে। ইমাম বায়হাকী এই অভিমতকে প্রাধান্য দিয়াছেন। ইব্ন কাছীর উভয় অভিমত উল্লেখ করিয়া বলেন, ইবন ইসহাক ও অন্যান্যদের পরস্পর বিরোধী মতামতের মধ্যে এইভাবে সমন্বয় সাধন করা সম্ভব যে, খালিদ (রা) যখন পতাকা ধারণ করেন তখন তিনি মুসলিম বাহিনীকে নিরাপদে সরাইয়া নিয়া কাফিরদের কবল হইতে তাহাদিগকে রক্ষা করিয়াছিলেন। কিন্তু রাত পোহাইবার পর যখন তিনি মুসলিম বাহিনীকে নূতনভাবে বিন্যস্ত করিলেন (ওয়াকিদীর রিওয়ায়াত দ্র.) তখন রোমক বাহিনী ভাবিল যে, এক বিশাল বাহিনী মুসলমানদের সাহায্যে আসিয়াছে। অতঃপর খালিদ (রা) শত্রুদের উপর আক্রমণ চালাইয়া তাহাদিগকে পরাজিত করেন।
ইবন ইসহাক মুহাম্মাদ ইব্ن জা'ফার সূত্রে 'উরওয়া হইতে মৃতা থেকে প্রত্যাবর্তনকারী দলের প্রতি মদীনাবাসীদের মাটি নিক্ষেপ ও তিরস্কার করার নিম্নের রিওয়ায়াতটি উদ্ধৃত করেন :
فَجَعَلُوا يَحْثُونَ عَلَيْهِمْ بِالتَّرَابِ وَيَقُولُونَ يَا فَرَارُ فَرَرْتُمْ فِي سَبِيلِ اللَّهِ.
ইব্ন কাছীর বলেন, আমার মতে ইব্ন ইসহাক এই স্থলে অনুমান নির্ভর কথা বলিয়াছেন। তিনি মনে করিয়াছেন, এই আচরণ সমস্ত মুসলিম বাহিনীর প্রতি করা হইয়াছিল। প্রকৃতপক্ষে এইরূপ করা হইয়াছিল স্বল্প সংখ্যক লোকের জন্য যাহারা শত্রু পক্ষের সহিত মুকাবিলার সময় পশ্চাদপসরণ করিয়াছিল। অবশিষ্ট মুসলিম যোদ্ধাগণ কিন্তু পলায়ন করেন নাই, বরং তাহদিগকে সাহায্য করা হইয়াছিল। যেমনিভাবে রাসূলুল্লাহ (স) এই সম্পর্কে মদীনায় তাঁহার সম্মুখে উপস্থিত মুসলমানগণকে সংবাদ দিতেছিলেন এই কথা বলিয়া : ثُمَّ أَخَذَ الرَّايَةَ سَيْفٌ مِّنْ سُيُوفِ اللَّهِ فَفَتَحَ اللَّهُ عَلَيْهِمْ.
সুতরাং অভ্যর্থনাকারী মুসলমানগণ তাহাদিগকে পলায়নকারী হিসাবে সম্বোধন করিতে পারেন না, বরং তাহাদিগের সহিত সম্মানের সহিত মিলিত হইয়াছিলেন। আর যাহারা পশ্চাদপসরণ করিয়াছিল এবং মুসলিম বাহিনীকে তথায় রাখিয়া চলিয়া আসিয়াছিল তাহাদিগকে মৃত্তিকা নিক্ষেপ ও তিরস্কার করা হইয়াছিল। এই পশ্চাদপসরণকারীদের মধ্যে ছিলেন 'আবদুল্লাহ ইবন 'উমার (রা)। ইমাম আহমাদ তদীয় সূত্রে 'আবদুল্লাহ ইবন 'উমার (রা) হইতে বর্ণনা করিয়াছেন :
عَنْ عَبْدِ اللَّهِ بْنِ عُمَرَ قَالَ كُنْتُ فِي سَرِيَّةٍ مِّنْ سَرَايَا رَسُولِ اللَّهِ ﷺ فَحَاصَ النَّاسِ حَيْصَةً وَكُنْتُ فِيمَنْ حَاصَ فَقَلْنَا كَيْفَ تَصْنَعُ وَقَدْ قَرَرْنَا مِنَ الزَّحْفِ وَيُؤْنَا بِالْغَضَبِ ثُمَّ قُلْنَا لَوْ دَخَلْنَا الْمَدِينَةَ قُتِلْنَا ثُمَّ قُلْنَا لَوْ عَرَضْنَا أَنْفُسَنَا عَلَى رَسُولِ اللَّهِ ﷺ فَإِنْ كَانَتْ لَنَا تَوبَةٌ وَإِلا ذَهَبْنَا فَآتَيْنَاهُ قَبْلَ صَلوةِ الْغَدَاةِ فَخَرَجَ فَقَالَ مَنِ الْقَوْمُ قَالَ قُلْنَا نَحْنُ فَرَّارُونَ فَقَالَ لَا بَلْ أَنْتُمُ الْكَرَارُونَ أَنَا فَتَتُكُمْ وَأَنَا فِئَةُ الْمُسْلِمِينَ قَالَ فَأَتَيْنَاهُ حَتَّى قَبَّلْنَا يده
"আবদুল্লাহ ইবন 'উমার (রা) বলেন, আমরা রাসূলুল্লাহ (স) কর্তৃক প্রেরিত কোন এক যুদ্ধাভিযানে অংশগ্রহণ করিয়াছিলাম। এই যুদ্ধে কিছু সংখ্যক লোক পশ্চাদপসরণ করিয়াছিল। আমি ছিলাম তাহাদের অন্তর্ভুক্ত। আমরা বলিলাম, আমরা এখন কি করি? আমরা তো যুদ্ধ হইতে পলায়ন করিলাম এবং অভিসম্পাতের উপযুক্ত হইলাম। অতঃপর আমরা বলিলাম, যদি আমরা মদীনায় প্রবেশ করি তাহা হইলে আমাদিগকে হত্যা করা হইবে। ইহার পর আমরা বলিলাম, যদি আমরা নিজেদেরকে রাসূলুল্লাহ (স)-এর নিকট পেশ করি এবং আমাদিগের তওবা কবুল হয় তাহা হইলে তো ভাল। অন্যথায় আমরা ধ্বংস হইয়া যাইব। সুতরাং আমরা রাসূলুল্লাহ (স)-এর নিকট ফজরের সালাতের পূর্বে আগমন করিলাম। রাসূলুল্লাহ (স) গৃহ হইতে বাহির হইয়া বলিলেন, কোন দলের লোক? আমরা বলিলাম, আমরা পলায়নকারী দল। রাসূলুল্লাহ (স) বলিলেন, বরং তোমরা আক্রমণকারী দল। আমি তোমাদিগের দলভুক্ত এবং আমি মুসলমানদের দলভুক্ত। তিনি বলেন, অতঃপর আমরা রাসূলুল্লাহ (স)-এর নিকট আসিয়া তাহার হস্ত চুম্বন করিলাম"।
উপরিউক্ত হাদীছ ইমাম আহমাদ হাসান সূত্রে, তিনি যুহায়র সূত্রে বর্ণনা করিয়াছেন। অপরদিকে গুনদার বর্ণিত ইবন 'উমার (রা)-এর হাদীছে কَرَّارُونَ শব্দের পরিবর্তে সমার্থক عَكَّارُونَ শব্দ আসিয়াছে।
এই হাদীছ ইমাম তিরমিযী ও ইন্ন মাজা ইয়াযীদ ইবন আবী যিয়াদ সূত্রে বর্ণনা করিয়াছেন। হাদীছটি সম্পর্কে তিরমিযীর অভিমত-হইল, হাদীছটি হাসান পর্যায়ের। আমি তাহাকে (বর্ণনাকারী) একমাত্র এই হাদীছটি ব্যতীত অন্য কোন সূত্রে চিনি না। ইমাম আহমাদ ইসহাক ইব্ন 'ঈসা ও আসওয়াদ ইবন 'আমের সূত্রে ইবন 'উমার (রা) হইতে বর্ণিত হাদীছের শেষাংশে আরও আছে, "আমি তোমাদিগের দলভুক্ত"। আসওয়াদ বলেন, "আমি প্রতিটি মুসলিম দলের সঙ্গী।"
উল্লেখ্য যে, উপরিউক্ত তিনিটি বর্ণনাই ইয়াযীদ ইব্ন আবী যিয়াদ 'আবদুর রাহমান ইবন আবী লায়লা সূত্রে, তিনি ইবন উমার (রা) হইতে বর্ণনা করিয়াছেন, যদিও অধস্তন বর্ণনাকারী হিসাবে বিভিন্ন ব্যক্তি রহিয়াছেন।
ইবন ইসহাক 'আবদুল্লাহ্ ইব্ন আবী বাক্স, তিনি 'আমের ইবন 'আবদুল্লাহ ইন্সুয যুবায়র (রা) সূত্রে বর্ণনা করিয়াছেন, রাসূলুল্লাহ (স)-এর সহধর্মিনী উম্মু সালামা (রা) সালামা ইব্ن হিশাম ইবনুল মুগীরা-র স্ত্রীকে বলিলেন, কি হইল সালামাকে রাসূলুল্লাহ (স) ও মুসলিমগণের সহিত জামা'আতে উপস্থিত হইতে দেখি না যে? তিনি বলিলেন, তাহার জন্য বাহির হওয়া সম্ভব নয়, ঘর হইতে বাহির হইলেই লোকজন এই বলিয়া চিৎকার করে: يَا فَرَّارُ فَرَرْتُمْ فِي سَبِيلِ اللَّهِ (হে পলায়নকারী দল! তোমরা আল্লাহ্র পথ হইতে পলায়ন করিয়াছ)। এই কারণে তিনি গৃহবন্দী, বাহির হইতেছেন না। এই ঘটনা ছিল মু'তা যুদ্ধ সম্পর্কিত। ইব্ন কাছীর বলেন, সম্ভবত একটি দল পলায়ন করিয়াছিল যখন তাহারা শত্রুদিগের বিরাট বাহিনী প্রত্যক্ষ করিয়াছিল।
ইহাদের সংখ্যা দুই লক্ষ বলিয়া উল্লেখ করা হইয়াছে। পশ্চাদপসরণকারী দলটি ছাড়া অবশিষ্ট বাহিনী অটল ছিল। ইহাদেরকে আল্লাহ তা'আলা বিজয় দান করিয়াছিলেন এবং তাহারা শত্রুদিগের কবল হইতে মুক্তি লাভ করিয়াছিলেন। ইহাই ওয়াকিদী ও মূসা ইব্ন 'উক্বা পূর্বে উল্লেখ করিয়াছেন। এই অভিমতের সমর্থনে ইমাম আহমাদ কর্তৃক 'আওف ইব্ন মালিক আল-আশজা'ঈ (রা) হইতে নিম্নের হাদীছটি বর্ণিত আছে:
قَالَ خَرَجْتُ مَعَ مَنْ خَرَجَ مَعَ زَيْدِ بْنِ حَارِثَةَ مِنَ الْمُسْلِمِينَ فِي غَزْوَةِ مُؤْتَةً وَرَافَقَنِي مَدَدِيٌّ مِنَ الْيَمَنِ لَيْسَ مَعَهُ غَيْرُ سَيْفِهِ فَنَحَرَ رَجُلٌ مِنَ الْمُسْلِمِينَ جَزُورًا فَسَأَلَهُ الْمَدَدِيُّ طَائِفَةً مِنْ جِلْدِهِ فَأَعْطَاهُ إِيَّاهُ فَاتَّخَذَهُ كَهَيْئَةِ الدَّرَقِ وَمَضَيْنَا فَلَقِينَا جُمُوعَ الرُّوْمِ وَفِيهِمْ رَجُلٌ عَلَى فَرْسٌ لَهُ أَشْقَرَ عَلَيْهِ سَرْجٌ مُذهَبٌ وَسَلَاحٌ مُذَهَبٌ فَجَعَلَ الرُّؤْمِيُّ يُغْزِى بِالْمُسْلِمِينَ وَقَعَدَ لَهُ الْمَدَدِى خَلْفَ صَخْرَةٍ فَمَرَّ بِهِ الرُّوْمِيُّ فَعَرْقَبَ فَرَسَهُ فَخَرَّ وَعَلَاهُ فَقَتْلَهُ وَحَازَ فَرَسَهُ وَسَلاحَهُ فَلَمَّا فَتَحَ اللهُ لِلْمُسْلِمِينَ بَعْثَ إِلَيْهِ خَالِدُ بْنُ الْوَلِيدِ فَأَخَذَ مِنْهُ السَّلَبَ قَالَ عَوْفٌ فَآتَيْتُهُ فَقُلْتُ يَا خَالِدُ أَمَا عَلِمْتَ أَنَّ رَسُولَ اللَّهِ ﷺ قَضَى بِالسَّلْبِ للقاتل قَالَ بَلى ولكنى اسْتَكْثَرْتُهُ فَقُلْتُ لَتَرُدُّنَّهُ إِلَيْهِ أَوَلَا عَرَفَنَّكَهَا عِنْدَ رَسُول الله ﷺ وابي أَنْ يَرُدَّ عَلَيْهِ قَالَ عَوْفٌ فَاجْتَمَعَا عِنْدَ رَسُول الله ﷺ وَقَصَصْتُ عَلَيْهِ قِصَّة الْمَدَدِى وَمَا فَعَلَهُ خَالِدٌ فَقَالُ رَسُولُ اللهِ ﷺ يَا خَالِدُ مَا حَمَلَكَ عَلَى مَا صَنَعْتَ قَالَ يَا رَسُولَ اللهُ اسْتَكْثَرْتُهُ فَقَالَ رَسُولُ الله ﷺ يَا خَالِدٌ لَا تَرُدَّهُ عَلَيْهِ هَلْ أَنْتُمْ تَارِكُولَى أَمَرَائِي لَكُمْ صَفْوَةٌ أَمْرِهِمْ وَعَلَيْهِمْ گذره.
'আওফ ইব্ন মালিক আল-আশজা'ঈ (রা) বলেন, যায়দ ইব্ন হারিছা (রা)-এর সহিত মুসলমানদের যেই বাহিনী মু'তা অভিযানে রওয়ানা করিয়াছিল তাহাদিগের সহিত আমিও বাহির হইয়াছিলাম। সঙ্গে একজন য়ামানী ছুরি নির্মাতা (cutter) লোকও ছিল। তাহার সংগে তাহার তরবারি ব্যতীত আর কিছুই ছিল না। মুসলিম বাহিনীর জনৈক ব্যক্তি কতিপয় উট যবেহ করিয়াছিল। ইয়ামানী লোকটি তাহার নিকট ইহার আংশিক চামড়া চাহিল। সে তাহাকে তাহা প্রদান করিলে য়ামানী ইহা দ্বারা ঢাল সদৃশ একটা কিছু তৈয়ার করিল। অতঃপর আমরা রওয়ানা করিয়া রোমক বাহিনীর মুখামুখী হইলাম। ইহাদের মধ্যে একজন লোক লাল-হলুদ বর্ণযুক্ত একটি ঘোড়ার উপর সওয়ার ছিল। তাহার সোনালী গদী ও সোনালী অস্ত্রাদি ছিল। রোমক এই লোকটি মুসলমানদের বিরুদ্ধে যুদ্ধরত ছিল, অপর দিকে একটি পাথরের আড়ালে বসিয়া ঐ ইয়ামানী লোকটি তাহাকে অনুসরণ করিতেছিল। রোমক লোকটি অগ্রসর হইতেই সে তাহার ঘোড়ার পা কাটিয়া ফেলিলে সে পড়িয়া গেল এবং ইয়ামানী লোকটি তাহাকে হত্যা করিল। তাহার ঘোড়া ও হাতিয়ার সে গ্রহণ করিল। আল্লাহ যখন মুসলিম বাহিনীকে বিজয় দান করিলেন তখন খালিদ ইবনুল ওয়ালীদ তাহার নিকট হইতে যুদ্ধলব্ধ মাল গ্রহণ করিবার উদ্দেশে লোক পাঠাইলেন। 'আওফ বলেন, আমি খালিদ (রা)-এর নিকট আসিয়া বলিলাম, হে খালিদ! আপনি কি জানেন না, রাসূলুল্লাহ (স) হত্যাকারীর জন্য নিহত ব্যক্তির মাল গ্রহণের অনুমতি দিয়াছেন? তিনি বলিলেন, হাঁ জানি, তবে আমি ইহাকে অধিক মনে করিতেছি। তিনি বলেন, আমি বলিলাম, হয়ত আপনি তাহাকে ইহা ফিরাইয়া দিন নতুবা আমি আপনার এই ব্যাপারটি রাসূলুল্লাহ (স)-কে অবহিত করিব। তবুও তিনি তাহাকে উহা ফিরাইয়া দিতে অস্বীকৃতি জানাইলেন। 'আওফ (রা) বলেন, অতঃপর আমরা রাসূলুল্লাহ (স)-এর নিকট একত্র হইয়া ইয়ামানী লোকটির ঘটনা এবং তাহার সহিত খালিদ (রা)-এর আচরণের বিবরণ দিলাম। রাসূলুল্লাহ (স) বলিলেন, "হে খালিদ! তুমি তাহার নিকট হইতে যাহা গ্রহণ করিয়াছ তাহা ফিরাইয়া দাও।" আওফ বলেন, আমি বলিলাম, কী খালিদ! আমি কি আপনাকে আগেই বলি নাই? রাসূলুল্লাহ (স) বলিলেন, ঘটনাটি কি? আমি তাঁহাকে তাহা অবগত করাইলাম। ইহাতে রাসূলুল্লাহ (স) অসন্তুষ্ট হইয়া বলিলেন, "হে খালিদ! ইহা তাহাকে ফেরৎ দিও না। তোমরা কি আমার নিয়োজিত শাসকগণকে তাহাদের অবস্থায় ছাড়িয়া দিবে? তাহাদের ভাল কাজের ফল তোমরা পাইবে এবং তাহাদের ভুলভ্রান্তির দায়িত্ব তাহাদের" (মুসনাদে আহমাদ, ১খ., পৃ. ২০৪, নং ১৭৫০; ৬খ., পৃ. ২৭-২৮, নং ২৪৪৯৭)।
এই হাদীছ দ্বারা স্পষ্টভাবে প্রমাণিত হয় যে, মুসলিম বাহিনী শত্রুদের নিকট হইতে গনীমত ও তাহাদের অভিজাতদের নিকট হইতে সালাব (سلب) গ্রহণ করিয়াছিল, দুশমনদের কতিপয় নেতাকে হত্যাও করিয়াছিলেন। ইতিপূর্বে উক্ত বুখারীর রিওয়ায়াতে খালিদ (রা) বলেন: انْدَقَّتْ فِي يَدِي يَوْمَ مُؤْتَةَ تِسْعَةُ أَسْبَافٍ وَمَا ثَبَتَ فِي يَدِ لِي إِلَّا صَفَحَةً يَمَانِيَّةً. "আমার হাতে মুতা যুদ্ধের দিন নয়টি তরবারি চূর্ণবিচূর্ণ হইয়াছিল। একমাত্র ইয়ামানী তরবারি ছাড়া আমার হাতে আর কোন তরবারি অবশিষ্ট ছিল না"।
উক্ত হাদীছও প্রমাণ করে যে, ঐ দিন মুসলিম বাহিনী ব্যাপকভাবে শত্রু নিধন করিয়াছিল। এইরূপ না হইলে শত্রুদের কবল হইতে মুক্তি পাওয়া সম্ভব হইত না। এই ঘটনা মুসলমানদের বিজয়ের একটি সুনির্দিষ্ট প্রমাণ। মূসা ইবন 'উকবা, ওয়াকিদী ও বায়হাকীও এই অভিমত গ্রহণ করিয়াছেন। ইবন হিশাম যুহরী হইতেও অনুরূপ অভিমত বর্ণনা করিয়াছেন। বায়হাকী বলেন, ইসলামী যুদ্ধসমূহ সম্পর্কে পারদর্শী ব্যক্তিবর্গ মুসলমানদের জয় ও পরাজয় সম্পর্কে দ্বিধাবিভক্ত। কেহ মনে করেন, মুসলিমগণ পরাজয় বরণ করিয়াছিলেন। আবার কেহ মনে করেন মুশরিকগণ পরাজয় বরণ করিয়াছিল। তিনি বলেন, আনাস (রা) কর্তৃক রাসূলুল্লাহ (স)-এর হাদীছ اَخَذَهَا خَالِدٌ فَفَتَحَ اللَّهُ عَلَيْهِ প্রমাণ করে যে, মুসলিম বাহিনী বিজয় লাভ করিয়াছিল (আল- বিদায়া ওয়ান-নিহায়া, ৪খ., ২৪৮-২৫০)।
সীরাতুন নবী গ্রন্থে বলা হইয়াছে, এক লক্ষ সৈন্যের মোকাবিলায় তিন হাজার মুসলিম বাহিনী কীভাবে যুদ্ধ করিবে? বড় বিজয় ইহাই ছিল যে, নিজ সৈন্যবাহিনীকে বিরাট শত্রু বাহিনীর কবল হইতে রক্ষা করা। যখন এই পরাজয় বরণকারী বাহিনী মদীনার নিকটবর্তী হইয়াছিল এবং শহরবাসীরা তাহাদিগকে সংবর্ধনা জানাইতে বাহির হইয়াছিল তখন তাহারা সমবেদনা জানানোর বিপরীত তাহাদের চেহারায় মাটি ছুড়িয়াছিল। তাহাদের মুখের ধ্বনি ছিল, “হে পলায়নকারীগণ! তোমরা আল্লাহ্র পথ হইতে পলায়ন করিলে" (সীরাতুন নবী, ১খ., ২৯২-২৯৩)!
'আল্লামা ইবনুল কায়্যিম আল-জাওযিয়্যা বলেন, ইবন সা'দ উল্লেখ করিয়াছেন, এই যুদ্ধে মুসলিম বাহিনী পরাজিত হইয়াছিল। কিন্তু বুখারী শরীফের বর্ণনায় আছে, রোমক বাহিনী পরাজিত হইয়াছিল। এই ব্যাপারে ইবন ইসহাকের অভিমত হইল, উভয় দল অমীমাংসিতভাবে পৃথক হইয়া গিয়াছিল (যাদুল মা'আদ, ১/২খ., ১৫৬)। 'আল্লামা দানাপুরী ইব্ন কায়্যিমের এই অভিমত ব্যক্ত করিয়া অবশেষে ইবন হিশাম কর্তৃক যুহরীর এই অভিমতকে উল্লেখ করিয়াছেন যে, "আমার তো ইহাই মনে হয় যে, যখন খালিদ (রা)-কে সেনাপতি নির্বাচিত করা হয় তখন আল্লাহ তা'আলা মুসলিম বাহিনীকে বিজয় দান করিয়াছিলেন (আসাহহুস সিয়ার, পৃ.২৩৮)।
মাওলানা আবুল কালাম আযাদ বলিয়াছেন, কিছু কিছু রিওয়ায়াত পাওয়া যায় যাহা মুসলিম বাহিনীর পরাজয় প্রমাণ করে। যেমন মুসলিম সৈন্যদল যখন মদীনায় পৌঁছায় তখন অভ্যর্থনাকারী মদীনাবাসীর একটি দল মুসলিম বাহিনীর দিকে মাটি নিক্ষেপ করিয়া বলিয়াছিল, يَا فَرَّارُ أَفَرَرْتُمْ فِي سَبِيلِ الله; কিন্তু স্বয়ং রাসূলুল্লাহ (স) উত্তরে বলিয়াছিলেন, তাহারা পলায়নকারী নয়, বরং পাল্টা আক্রমণকারী। এই সম্পর্কে অধিকতর গ্রহণযোগ্য কথা হইল, মদীনাবাসীর নিকট প্রথমে অসম্পূর্ণ কিংবা ভুল তথ্য পৌছিয়াছিল। তাহারা কোন প্রকার পরীক্ষা-নিরীক্ষা ব্যতিরেকে এই সংবাদের উপর বিশ্বাস স্থাপন করিয়াছিলেন। সেই যুগ তো আর বর্তমান উন্নত যোগাযোগের যুগ ছিল না। সব সময় সংবাদ বাহকের কথার উপরই বিশ্বাস করিতে হইত। ইহারই কারণে কিছু সংখ্যক মদীনাবাসীর মুখ হইতে এইরূপ শব্দাবলী উচ্চারিত হইয়াছিল। কিন্তু রাসূলুল্লাহ (স)-এর প্রত্যাখ্যানমূলক কথার পর পলায়নের অভিযোগ একেবারেই অসার মনে হয়। মাওলানা আযাদ, মাওলানা 'আবদুর রাউফ দানাপুরী কর্তৃক ইব্ন কায়ি্যমের উদ্ধৃতি সম্পর্কে প্রশ্নাকারে বলেন, ইমাম বুখারী ও ইমাম যুহরীর রিওয়ায়াতসমূহ বিশুদ্ধ, না ইবন ইসহাকের রিওয়ায়াত? তবুও বলিতে হয়, মৃতা যুদ্ধে ইসলামী বাহিনীর পরাজয় মনে করিবার কোন যৌক্তিক কারণ গোচরীভূত হয় না। ইবন ইসহাক অধিকন্তু বলিতে পারেন, যুদ্ধের কোন সুনির্দিষ্ট মীমাংসা হয় নাই। উভয় বাহিনী পিছনে পড়িয়া গিয়াছিল। একান্ত যদি উভয় দলের পিছনে হটিবার তথ্য মানিয়া লওয়া হয় তাহা হইলেও বলিব, লাখ-দেড় লাখ সৈন্যের পিছপা হইবার মধ্যে লাঞ্ছনা, না তিন হাজার সৈন্যের পিছপা হইবার মধ্যে লাঞ্ছনা রহিয়াছে? ইহাও লক্ষণীয় যে, শত্রুদল নিজ দেশে যুদ্ধ করিতেছে আর মুসলিম বাহিনী শত শত মাইল দূরদেশে লড়িতেছে।
প্রকৃত অবস্থা হইল, 'আবদুল্লাহ ইব্ন রাওয়াহা (রা)-এর শাহাদাতের পর মুসলিম বাহিনী বিক্ষিপ্ত হইয়া গিয়াছিল। এই অবস্থা নূতন সেনাপতি নিযুক্ত হইবার পূর্ব পর্যন্ত বিরাজ করিতেছিল। কিন্তু ছাবিত ইব্ن আরকাম আনসারী (রা)-এর তাৎক্ষণিক পরামর্শে খালিদ ইবনুল ওয়ালীদ (রা) সেনাপতির দায়িত্ব গ্রহণ করিয়া বিক্ষিপ্ত বাহিনীকে একত্র করিয়া তাহাদিগকে ঢালিয়া সাজাইলেন, অতঃপর অদম্যভাবে গর্জিয়া উঠিয়া শত্রুদিগকে পিছনে হটিতে বাধ্য করিলেন। ইহাও সম্ভব যে, মুসলিম বাহিনী সম্মুখ হইতে বিচ্ছিন্নভাবে হটিয়া যাইবার পর পুনরায় ঐক্যবদ্ধভাবে আক্রমণে উদ্যত হইলে শত্রুগণ ভাবিয়াছিল ইহারা পরাজয় বরণকারী বাহিনী নয়, বরং নব উদ্যমে উদ্দীপ্ত কোন নূতন দল। সম্ভবত ইহারা ছাড়া আরও বাহিনী আত্মগোপন করিয়া আছে। আল্লাহই জানেন ইহারা কোন সময় আক্রমণ করিয়া বসে। ফলে তাহারা আত্মরক্ষার্থে পিছনে হটিয়া গিয়াছিল। কিন্তু মুসলিম বাহিনী নিজেদের সংখ্যা স্বল্পতার কথা ভাবিয়া ইহাদিগকে অনুসরণ করা হইতে বিরত রহিয়াছিল। শত্রুবাহিনী যদি মুসলমানদের প্রকৃত সংখ্যা সম্পর্কে অবগত হইত তাহা হইল একজনও এই যুদ্ধ হইতে জীবিত ফিরিতে পারিত না (রাসূলে রাহমাত, পৃ. ৪১৮)।
ইমাম বুখারীর রিওয়ায়াত, ইবন কাছীরের দীর্ঘ আলোচনা ও সর্বশেষ মাওলানা আযাদের তাত্ত্বিক পর্যালোচনার পর এই সিদ্ধান্তে উপনীত হওয়া যায় যে, এই যুদ্ধে মুসলমানগণ পরাজিত হয় নাই।
যুদ্ধের ফলাফল কিরূপ হইয়াছিল, মুসলিম বাহিনী বিজয় লাভ করিয়াছিল, না পরাজয় বরণ করিয়াছিল এই সম্পর্কে সীরাতবিদ, ইতিহাসবিদ ও মুহাদ্দিছগণের মধ্যে মতভেদ রহিয়াছে। ইমাম বুখারী আনাস (রা) হইতে যেই হাদীছ বর্ণনা করিয়াছেন (যাহা ইতোপূর্বে আলোচনা করা হইয়াছে) সেই হাদীছের শেষাংশ হইল:
حَتَّى أَخَذَ الرَّأْيَةَ سَيْفٌ مِّنْ سُيُوفِ اللَّهِ حَتَّى فَتَحَ اللَّهُ عَلَيْهِمْ.
"আল্লাহ্র তরবরিসমূহের কোন একটি তরবারি পতাকা ধারণ করিলে আল্লাহ শত্রুদের উপর তাহাদিগকে বিজয় দান করিলেন" (বুখারী, ২খ., ৬১১)।
এই হাদীছ দ্বারা স্পষ্টভাবে প্রতীয়মান হয় যে, মৃতা যুদ্ধে মুসলিম বাহিনী বিজয়লাভ করিয়াছিল। ইমাম বুখারী এই মত পোষণ করেন (আল-বিদায়া ওয়ান-নিহায়া, ৪খ., ২৪৫)। ওয়াকিদী আল-আত্তাফ ইন্ন খালিদ সূত্রে যেই রিওয়ায়াতটি উদ্ধৃত করিয়াছেন তাহাতে রহিয়াছে:
فَرُعِبُوا وَانْكَشَفُوا مُنْهَزِمِينَ.
"কাফিরদের মধ্যে ভীতি ছড়াইয়া দেওয়া হইয়াছিল, ফলে ইহারা পরাজয় বরণ করিয়া পালাইয়াছিল” (আল-বিদায়া ওয়ান-নিহায়া, ৪খ., পৃ. ২৪৭)।
• মূসা ইব্ন উকবা এই প্রসঙ্গে তাঁহার মাগাযীতে উল্লেখ করিয়াছেন :
فَهَزَمَ اللهُ العَدُوَّ وَأَظْهَرَ الْمُسْلِمِينَ.
"আল্লাহ শত্রুকে পরাজিত ও মুসলিম বাহিনীকে বিজয় দান করিলেন” (আল-বিদায়া ওয়ান-নিহায়া, ৪খ., ২৪৭)।
ইবন সা'দের মতে এই যুদ্ধে মুসলিম বাহিনী পরাজিত হইয়াছিল। তিনি বলেন,
فَلَمَّا سَمِعَ أَهْلُ الْمَدِينَةِ بِجَيْشِ مُوتَةَ قَادِمِينَ تَلَقَّوْهُمْ بِالْجُزْفِ فَجَعَلَ النَّاسِ يَحْشُونَ فِي وُجُوهِهِمُ التَّرَبَ يَقُولُونَ يَا فَرَارُ أَفَرَرْتُمْ فِي سَبِيلِ اللَّهِ فَيَقُولُ رَسُولُ اللَّهِ ﷺ لَيْسُوا بقرارٍ وَلَكِنَّهُمْ كَرَارُ إِنْ شَاءَ اللَّهُ.
"মদীনাবাসী যখন শুনিতে পাইল যে, মৃতা হইতে প্রত্যাবর্তনকারী দল আগমন করিতেছে, তখন তাহারা ইহাদিগের সহিত আল-জুরুফ নামক স্থানে গিয়া সাক্ষাত করিল। তাহারা ইহাদিগের মুখে ধুলাবালি নিক্ষেপ করিয়া বলিতেছিল, হে পলায়নকারী বাহিনী! তোমরা কি আল্লাহ্র পথ হইতে পালাইয়াছ? রাসূলুল্লাহ (স) বলিলেন : পলায়নকারী নয়, ইনশাআল্লাহ আক্রমণকারী” (আত-তাবাকাতুল কুবরা, ২খ., ১২৯)।
আবুল হাসান আলী নদবী বলেন, মুসলিম বাহিনী যখন প্রত্যাবর্তন করিয়া মদীনার সন্নিকটে পৌছিল তখন রাসূলুল্লাহ (স) এবং অন্যান্য মুসলিমগণ অগ্রসর হইয়া তাহাদিগকে অভ্যর্থনা জানাইলেন। শিশুরা তাঁহার পিছনে পিছনে দৌঁড়াইতেছিল। রাসূলুল্লাহ (স) বাহনের উপর উপবিষ্ট ছিলেন। তিনি বলিলেন, শিশুদেরকে নিজেদের সংগে বসাও এবং জা'ফারের ছোট শিশু সন্তানকে আমার নিকট দাও। রাসূলুল্লাহ (স) জা'ফারের পুত্র 'আবদুল্লাহকে তাঁহার কোলে বসাইলেন। মুসলিম বাহিনী সাধারণত যুদ্ধক্ষেত্র হইতে পলায়ন করিত না। ইহা ছিল এই ধরনের পলায়নের প্রথম ঘটনা। এইজন্য সম্বর্ধনা দানকারী দল যোদ্ধা বাহিনীর উপর মাটি নিক্ষেপ করিয়া বলিতেছিল, তোমরা কি আল্লাহ্র পথ হইতে পালাইয়াছ? রাসূলুল্লাহ (স) বলিলেন, পলায়নকারী নয়, ইনশাআল্লাহ আক্রমণকারী" (নবীয়ে রহমত, লাখনৌ ১৩৯৮ হি., ২খ., ৫৪)।
ইবন কাছীর বলেন, ইবন ইসহাকে বর্ণনায় রহিয়াছে :
إِنَّ خَالِدًا إِنَّمَا حَاشَ بِالْقَوْمِ حَتَّى تَخَلَّصُوا مِنَ الرُّومِ وَعَرِبَ النَّصَارِي فَقَدْ.
""খালিদ মুসলিম বাহিনীকে হাঁকাইয়া লইয়া যান। ফলে রোমক ও আরবীয় খৃস্টানদের কবল হইতে মুসলিম বাহিনী মুক্তি লাভ করিয়াছিলেন"।
কিন্তু মূসা ইব্ن উকবা ও ওয়াকিদী স্পষ্টভাবে বলিয়াছেন যে, রোমক বাহিনী ও তাহাদিগের সহযোদ্ধা আরবগণ পরাজয় বরণ করিয়াছিল। ইহা আনাস (রা) কর্তৃক পূর্বে বর্ণিত "মারফ্” হাদীছের সমর্থক। এই মারফু' হাদীছটি ইমাম বুখারী কর্তৃক বর্ণিত যাহা পূর্বে উল্লেখ করা হইয়াছে। ইমাম বায়হাকী এই অভিমতকে প্রাধান্য দিয়াছেন। ইব্ن কাছীর উভয় অভিমত উল্লেখ করিয়া বলেন, ইবন ইসহাক ও অন্যান্যদের পরস্পর বিরোধী মতামতের মধ্যে এইভাবে সমন্বয় সাধন করা সম্ভব যে, খালিদ (রা) যখন পতাকা ধারণ করেন তখন তিনি মুসলিম বাহিনীকে নিরাপদে সরাইয়া নিয়া কাফিরদের কবল হইতে তাহাদিগকে রক্ষা করিয়াছিলেন। কিন্তু রাত পোহাইবার পর যখন তিনি মুসলিম বাহিনীকে নূতনভাবে বিন্যস্ত করিলেন (ওয়াকিদীর রিওয়ায়াত দ্র.) তখন রোমক বাহিনী ভাবিল যে, এক বিশাল বাহিনী মুসলমানদের সাহায্যে আসিয়াছে। অতঃপর খালিদ (রা) শত্রুদের উপর আক্রমণ চালাইয়া তাহাদিগকে পরাজিত করেন।
ইবন ইসহাক মুহাম্মাদ ইব্ن জা'ফার সূত্রে 'উরওয়া হইতে মৃতা থেকে প্রত্যাবর্তনকারী দলের প্রতি মদীনাবাসীদের মাটি নিক্ষেপ ও তিরস্কার করার নিম্নের রিওয়ায়াতটি উদ্ধৃত করেন :
فَجَعَلُوا يَحْثُونَ عَلَيْهِمْ بِالتَّرَابِ وَيَقُولُونَ يَا فَرَّارُ فَرَرْتُمْ فِي سَبِيلِ اللَّهِ.
ইব্ন কাছীর বলেন, আমার মতে ইব্ن ইসহাক এই স্থলে অনুমান নির্ভর কথা বলিয়াছেন। তিনি মনে করিয়াছেন, এই আচরণ সমস্ত মুসলিম বাহিনীর প্রতি করা হইয়াছিল। প্রকৃতপক্ষে এইরূপ করা হইয়াছিল স্বল্প সংখ্যক লোকের জন্য যাহারা শত্রু পক্ষের সহিত মুকাবিলার সময় পশ্চাদপসরণ করিয়াছিল। অবশিষ্ট মুসলিম যোদ্ধাগণ কিন্তু পলায়ন করেন নাই, বরং তাহদিগকে সাহায্য করা হইয়াছিল। যেমনিভাবে রাসূলুল্লাহ (স) এই সম্পর্কে মদীনায় তাঁহার সম্মুখে উপস্থিত মুসলমানগণকে সংবাদ দিতেছিলেন এই কথা বলিয়া : ثُمَّ أَخَذَ الرَّايَةَ سَيْفٌ مِّنْ سُيُوفِ اللَّهِ فَفَتَحَ اللَّهُ عَلَيْهِمْ.
সুতরাং অভ্যর্থনাকারী মুসলমানগণ তাহাদিগকে পলায়নকারী হিসাবে সম্বোধন করিতে পারেন না, বরং তাহাদিগের সহিত সম্মানের সহিত মিলিত হইয়াছিলেন। আর যাহারা পশ্চাদপসরণ করিয়াছিল এবং মুসলিম বাহিনীকে তথায় রাখিয়া চলিয়া আসিয়াছিল তাহাদিগকে মৃত্তিকা নিক্ষেপ ও তিরস্কার করা হইয়াছিল। এই পশ্চাদপسরণকারীদের মধ্যে ছিলেন 'আবদুল্লাহ ইবন 'উমার (রা)। ইমাম আহমাদ তদীয় সূত্রে 'আবদুল্লাহ ইবন 'উমার (রা) হইতে বর্ণনা করিয়াছেন :
عَنْ عَبْدِ اللَّهِ بْنِ عُمَرَ قَالَ كُنْتُ فِي سَرِيَّةٍ مِّنْ سَرَايَا رَسُولِ اللَّهِ ﷺ فَحَاصَ النَّاسِ حَيْصَةً وَكُنْتُ فِيمَنْ حَاصَ فَقَلْنَا كَيْفَ تَصْنَعُ وَقَدْ قَرَرْنَا مِنَ الزَّحْفِ وَيُؤْنَا بِالْغَضَبِ ثُمَّ قُلْنَا لَوْ دَخَلْنَا الْمَدِينَةَ قُتِلْنَا ثُمَّ قُلْنَا لَوْ عَرَضْنَا أَنْفُسَنَا عَلَى رَسُولِ اللَّهِ ﷺ فَإِنْ كَانَتْ لَنَا تَوبَةٌ وَإِلا ذَهَبْنَا فَآتَيْنَاهُ قَبْلَ صَلوةِ الْغَدَاةِ فَخَرَجَ فَقَالَ مَنِ الْقَوْمُ قَالَ قُلْنَا نَحْنُ فَرَّارُونَ فَقَالَ لَا بَلْ أَنْتُمُ الْكَرَارُونَ أَنَا فَتَتُكُمْ وَأَنَا فِئَةُ الْمُسْلِمِينَ قَالَ فَأَتَيْنَاهُ حَتَّى قَبَّلْنَا يده
"আবদুল্লাহ ইবন 'উমার (রা) বলেন, আমরা রাসূলুল্লাহ (স) কর্তৃক প্রেরিত কোন এক যুদ্ধাভিযানে অংশগ্রহণ করিয়াছিলাম। এই যুদ্ধে কিছু সংখ্যক লোক পশ্চাদপসরণ করিয়াছিল। আমি ছিলাম তাহাদের অন্তর্ভুক্ত। আমরা বলিলাম, আমরা এখন কি করি? আমরা তো যুদ্ধ হইতে পলায়ন করিলাম এবং অভিসম্পাতের উপযুক্ত হইলাম। অতঃপর আমরা বলিলাম, যদি আমরা মদীনায় প্রবেশ করি তাহা হইলে আমাদিগকে হত্যা করা হইবে। ইহার পর আমরা বলিলাম, যদি আমরা নিজেদেরকে রাসূলুল্লাহ (স)-এর নিকট পেশ করি এবং আমাদিগের তওবা কবুল হয় তাহা হইলে তো ভাল। অন্যথায় আমরা ধ্বংস হইয়া যাইব। সুতরাং আমরা রাসূলুল্লাহ (স)-এর নিকট ফজরের সালাতের পূর্বে আগমন করিলাম। রাসূলুল্লাহ (স) গৃহ হইতে বাহির হইয়া বলিলেন, কোন দলের লোক? আমরা বলিলাম, আমরা পলায়নকারী দল। রাসূলুল্লাহ (স) বলিলেন, বরং তোমরা আক্রমণকারী দল। আমি তোমাদিগের দলভুক্ত এবং আমি মুসলমানদের দলভুক্ত। তিনি বলেন, অতঃপর আমরা রাসূলুল্লাহ (স)-এর নিকট আসিয়া তাহার হস্ত চুম্বন করিলাম"।
উপরিউক্ত হাদীছ ইমাম আহমাদ হাসান সূত্রে, তিনি যুহায়র সূত্রে বর্ণনা করিয়াছেন। অপরদিকে গুনদার বর্ণিত ইবন 'উমার (রা)-এর হাদীছে কَرَّارُونَ শব্দের পরিবর্তে সমার্থক عَكَّارُونَ শব্দ আসিয়াছে।
এই হাদীছ ইমাম তিরমিযী ও ইন্ন মাজা ইয়াযীদ ইবন আবী যিয়াদ সূত্রে বর্ণনা করিয়াছেন। হাদীছটি সম্পর্কে তিরমিযীর অভিমত-হইল, হাদীছটি হাসান পর্যায়ের। আমি তাহাকে (বর্ণনাকারী) একমাত্র এই হাদীছটি ব্যতীত অন্য কোন সূত্রে চিনি না। ইমাম আহমাদ ইসহাক ইব্ন 'ঈসা ও আসওয়াদ ইবন 'আমের সূত্রে ইবন 'উমার (রা) হইতে বর্ণিত হাদীছের শেষাংশে আরও আছে, "আমি তোমাদিগের দলভুক্ত"। আসওয়াদ বলেন, "আমি প্রতিটি মুসলিম দলের সঙ্গী।"
উল্লেখ্য যে, উপরিউক্ত তিনিটি বর্ণনাই ইয়াযীদ ইব্ন আবী যিয়াদ 'আবদুর রাহমান ইবন আবী লায়লা সূত্রে, তিনি ইবন উমার (রা) হইতে বর্ণনা করিয়াছেন, যদিও অধস্তন বর্ণনাকারী হিসাবে বিভিন্ন ব্যক্তি রহিয়াছেন।
ইবন ইসহাক 'আবদুল্লাহ্ ইব্ن আবী বাক্স, তিনি 'আমের ইবন 'আবদুল্লাহ ইন্সুয যুবায়র (রা) সূত্রে বর্ণনা করিয়াছেন, রাসূলুল্লাহ (স)-এর সহধর্মিনী উম্মু সালামা (রা) সালামা ইব্ن হিশام ইবনুল মুগীরা-র স্ত্রীকে বলিলেন, কি হইল সালামাকে রাসূলুল্লাহ (স) ও মুসলিমগণের সহিত জামা'আতে উপস্থিত হইতে দেখি না যে? তিনি বলিলেন, তাহার জন্য বাহির হওয়া সম্ভব নয়, ঘর হইতে বাহির হইলেই লোকজন এই বলিয়া চিৎকার করে: يَا فَرَّارُ فَرَرْتُمْ فِي سَبِيلِ اللَّهِ (হে পলায়নকারী দল! তোমরা আল্লাহ্র পথ হইতে পলায়ন করিয়াছ)। এই কারণে তিনি গৃহবন্দী, বাহির হইতেছেন না। এই ঘটনা ছিল মু'তা যুদ্ধ সম্পর্কিত। ইব্ن কাছীর বলেন, সম্ভবত একটি দল পলায়ন করিয়াছিল যখন তাহারা শত্রুদিগের বিরাট বাহিনী প্রত্যক্ষ করিয়াছিল।
ইহাদের সংখ্যা দুই লক্ষ বলিয়া উল্লেখ করা হইয়াছে। পশ্চাদপসরণকারী দলটি ছাড়া অবশিষ্ট বাহিনী অটল ছিল। ইহাদেরকে আল্লাহ তা'আলা বিজয় দান করিয়াছিলেন এবং তাহারা শত্রুদিগের কবল হইতে মুক্তি লাভ করিয়াছিলেন। ইহাই ওয়াকিদী ও মূসা ইব্ن 'উক্বা পূর্বে উল্লেখ করিয়াছেন। এই অভিমতের সমর্থনে ইমাম আহমাদ কর্তৃক 'আওف ইব্ن মালিক আল-আশজা'ঈ (রা) হইতে নিম্নের হাদীছটি বর্ণিত আছে:
قَالَ خَرَجْتُ مَعَ مَنْ خَرَجَ مَعَ زَيْدِ بْنِ حَارِثَةَ مِنَ الْمُسْلِمِينَ فِي غَزْوَةِ مُؤْتَةً وَرَافَقَنِي مَدَدِيٌّ مِنَ الْيَمَنِ لَيْسَ مَعَهُ غَيْرُ سَيْفِهِ فَنَحَرَ رَجُلٌ مِنَ الْمُسْلِمِينَ جَزُورًا فَسَأَلَهُ الْمَدَدِيُّ طَائِفَةً مِنْ جِلْدِهِ فَأَعْطَاهُ إِيَّاهُ فَاتَّخَذَهُ كَهَيْئَةِ الدَّرَقِ وَمَضَيْنَا فَلَقِينَا جُمُوعَ الرُّوْمِ وَفِيهِمْ رَجُلٌ عَلَى فَرْسٌ لَهُ أَشْقَرَ عَلَيْهِ سَرْجٌ مُذهَبٌ وَسَلَاحٌ مُذَهَبٌ فَجَعَلَ الرُّؤْمِيُّ يُغْزِى بِالْمُسْلِمِينَ وَقَعَدَ لَهُ الْمَدَدِى خَلْفَ صَخْرَةٍ فَمَرَّ بِهِ الرُّوْمِيُّ فَعَرْقَبَ فَرَسَهُ فَخَرَّ وَعَلَاهُ فَقَتْلَهُ وَحَازَ فَرَسَهُ وَسَلاحَهُ فَلَمَّا فَتَحَ اللهُ لِلْمُسْلِمِينَ بَعْثَ إِلَيْهِ خَالِدُ بْنُ الْوَلِيدِ فَأَخَذَ مِنْهُ السَّلَبَ قَالَ عَوْفٌ فَآتَيْتُهُ فَقُلْتُ يَا خَالِدُ أَمَا عَلِمْتَ أَنَّ رَسُولَ اللَّهِ ﷺ قَضَى بِالسَّلْبِ للقاتل قَالَ بَلى ولكنى اسْتَكْثَرْتُهُ فَقُلْتُ لَتَرُدُّنَّهُ إِلَيْهِ أَوَلَا عَرَفَنَّكَهَا عِنْدَ رَسُول الله ﷺ وابي أَنْ يَرُدَّ عَلَيْهِ قَالَ عَوْفٌ فَاجْتَمَعَا عِنْدَ رَسُول الله ﷺ وَقَصَصْتُ عَلَيْهِ قِصَّة الْمَدَدِى وَمَا فَعَلَهُ خَالِدٌ فَقَالُ رَسُولُ اللهِ ﷺ يَا خَالِدُ مَا حَمَلَكَ عَلَى مَا صَنَعْتَ قَالَ يَا رَسُولَ اللهُ اسْتَكْثَرْتُهُ فَقَالَ رَسُولُ الله ﷺ يَا خَالِدُ رُدَّ عَلَيْهِ مَا أَخَذْتَ مِنْهُ قَالَ عَوْفٌ فَقُلْتُ دُونَكَ يَا خَالِدُ آلَم أَن لَكَ فَقَالَ رَسُولُ الله ﷺ وَمَا ذَاكَ فَأَخْبَرْتُهُ فَغَضِبَ رَسُولُ اللهِ ﷺ وَقَالَ يَا خَالِدٌ لَا تَرُدَّهُ عَلَيْهِ هَلْ أَنْتُمْ تَارِكُولَى أَمَرَائِي لَكُمْ صَفْوَةٌ أَمْرِهِمْ وَعَلَيْهِمْ گذره.
'আওফ ইব্ن মালিক আল-আশজা'ঈ (রা) বলেন, যায়দ ইব্ন হারিছা (রা)-এর সহিত মুসলমানদের যেই বাহিনী মু'তা অভিযানে রওয়ানা করিয়াছিল তাহাদিগের সহিত আমিও বাহির হইয়াছিলাম। সঙ্গে একজন য়ামানী ছুরি নির্মাতা (cutter) লোকও ছিল। তাহার সংগে তাহার তরবারি ব্যতীত আর কিছুই ছিল না। মুসলিম বাহিনীর জনৈক ব্যক্তি কতিপয় উট যবেহ করিয়াছিল। ইয়ামানী লোকটি তাহার নিকট ইহার আংশিক চামড়া চাহিল। সে তাহাকে তাহা প্রদান করিলে য়ামানী ইহা দ্বারা ঢাল সদৃশ একটা কিছু তৈয়ার করিল। অতঃপর আমরা রওয়ানা করিয়া রোমক বাহিনীর মুখামুখী হইলাম। ইহাদের মধ্যে একজন লোক লাল-হলুদ বর্ণযুক্ত একটি ঘোড়ার উপর সওয়ার ছিল। তাহার সোনালী গদী ও সোনালী অস্ত্রাদি ছিল। রোমক এই লোকটি মুসলমানদের বিরুদ্ধে যুদ্ধরত ছিল, অপর দিকে একটি পাথরের আড়ালে বসিয়া ঐ ইয়ামানী লোকটি তাহাকে অনুসরণ করিতেছিল। রোমক লোকটি অগ্রসর হইতেই সে তাহার ঘোড়ার পা কাটিয়া ফেলিলে সে পড়িয়া গেল এবং ইয়ামানী লোকটি তাহাকে হত্যা করিল। তাহার ঘোড়া ও হাতিয়ার সে গ্রহণ করিল। আল্লাহ যখন মুসলিম বাহিনীকে বিজয় দান করিলেন তখন খালিদ ইবনুল ওয়ালীদ তাহার নিকট হইতে যুদ্ধলব্ধ মাল গ্রহণ করিবার উদ্দেশে লোক পাঠাইলেন। 'আওফ বলেন, আমি খালিদ (রা)-এর নিকট আসিয়া বলিলাম, হে খালিদ! আপনি কি জানেন না, রাসূলুল্লাহ (স) হত্যাকারীর জন্য নিহত ব্যক্তির মাল গ্রহণের অনুমতি দিয়াছেন? তিনি বলিলেন, হাঁ জানি, তবে আমি ইহাকে অধিক মনে করিতেছি। তিনি বলেন, আমি বলিলাম, হয়ত আপনি তাহাকে ইহা ফিরাইয়া দিন নতুবা আমি আপনার এই ব্যাপারটি রাসূলুল্লাহ (স)-কে অবহিত করিব। তবুও তিনি তাহাকে উহা ফিরাইয়া দিতে অস্বীকৃতি জানাইলেন। 'আওফ (রা) বলেন, অতঃপর আমরা রাসূলুল্লাহ (স)-এর নিকট একত্র হইয়া ইয়ামানী লোকটির ঘটনা এবং তাহার সহিত খালিদ (রা)-এর আচরণের বিবরণ দিলাম। রাসূলুল্লাহ (স) বলিলেন, "হে খালিদ! তুমি তাহার নিকট হইতে যাহা গ্রহণ করিয়াছ তাহা ফিরাইয়া দাও।" আওف বলেন, আমি বলিলাম, কী খালিদ! আমি কি আপনাকে আগেই বলি নাই? রাসূলুল্লাহ (স) বলিলেন, ঘটনাটি কি? আমি তাঁহাকে তাহা অবগত করাইলাম। ইহাতে রাসূলুল্লাহ (স) অসন্তুষ্ট হইয়া বলিলেন, "হে খালিদ! ইহা তাহাকে ফেরৎ দিও না। তোমরা কি আমার নিয়োজিত শাসকগণকে তাহাদের অবস্থায় ছাড়িয়া দিবে? তাহাদের ভাল কাজের ফল তোমরা পাইবে এবং তাহাদের ভুলভ্রান্তির দায়িত্ব তাহাদের" (মুসনাদে আহমাদ, ১খ., পৃ. ২০৪, নং ১৭৫০; ৬খ., পৃ. ২৭-২৮, নং ২৪৪৯৭)।
এই হাদীছ দ্বারা স্পষ্টভাবে প্রমাণিত হয় যে, মুসলিম বাহিনী শত্রুদের নিকট হইতে গনীমত ও তাহাদের অভিজাতদের নিকট হইতে সালাব (سلب) গ্রহণ করিয়াছিল, দুশমনদের কতিপয় নেতাকে হত্যাও করিয়াছিলেন। ইতিপূর্বে উক্ত বুখারীর রিওয়ায়াতে খালিদ (রা) বলেন: انْدَقَّتْ فِي يَدِي يَوْمَ مُؤْتَةَ تِسْعَةُ أَسْبَافٍ وَمَا ثَبَتَ فِي يَدِ لِي إِلَّا صَفْحَةً يَمَانِيَّةً. "আমার হাতে মুতা যুদ্ধের দিন নয়টি তরবারি চূর্ণবিচূর্ণ হইয়াছিল। একমাত্র ইয়ামানী তরবারি ছাড়া আমার হাতে আর কোন তরবারি অবশিষ্ট ছিল না"।
উক্ত হাদীছও প্রমাণ করে যে, ঐ দিন মুসলিম বাহিনী ব্যাপকভাবে শত্রু নিধন করিয়াছিল। এইরূপ না হইলে শত্রুদের কবল হইতে মুক্তি পাওয়া সম্ভব হইত না। এই ঘটনা মুসলমানদের বিজয়ের একটি সুনির্দিষ্ট প্রমাণ। মূসা ইবন 'উকবা, ওয়াকিদী ও বায়হাকীও এই অভিমত গ্রহণ করিয়াছেন। ইবন হিশাম যুহরী হইতেও অনুরূপ অভিমত বর্ণনা করিয়াছেন। বায়হাকী বলেন, ইসলামী যুদ্ধসমূহ সম্পর্কে পারদর্শী ব্যক্তিবর্গ মুসলমানদের জয় ও পরাজয় সম্পর্কে দ্বিধাবিভক্ত। কেহ মনে করেন, মুসলিমগণ পরাজয় বরণ করিয়াছিলেন। আবার কেহ মনে করেন মুশরিকগণ পরাজয় বরণ করিয়াছিল। তিনি বলেন, আনাস (রা) কর্তৃক রাসূলুল্লাহ (স)-এর হাদীছ اَخَذَهَا خَالِدٌ فَفَتَحَ اللَّهُ عَلَيْهِ প্রমাণ করে যে, মুসলিম বাহিনী বিজয় লাভ করিয়াছিল (আল- বিদায়া ওয়ান-নিহায়া, ৪খ., ২৪৮-২৫০)।
সীরাতুন নবী গ্রন্থে বলা হইয়াছে, এক লক্ষ সৈন্যের মোকাবিলায় তিন হাজার মুসলিম বাহিনী কীভাবে যুদ্ধ করিবে? বড় বিজয় ইহাই ছিল যে, নিজ সৈন্যবাহিনীকে বিরাট শত্রু বাহিনীর কবল হইতে রক্ষা করা। যখন এই পরাজয় বরণকারী বাহিনী মদীনার নিকটবর্তী হইয়াছিল এবং শহরবাসীরা তাহাদিগকে সংবর্ধনা জানাইতে বাহির হইয়াছিল তখন তাহারা সমবেদনা জানানোর বিপরীত তাহাদের চেহারায় মাটি ছুড়িয়াছিল। তাহাদের মুখের ধ্বনি ছিল, “হে পলায়নকারীগণ! তোমরা আল্লাহ্র পথ হইতে পলায়ন করিলে" (সীরাতুন নবী, ১খ., ২৯২-২৯৩)!
'আল্লামা ইবনুল কায়্যিম আল-জাওযিয়্যা বলেন, ইবন সা'দ উল্লেখ করিয়াছেন, এই যুদ্ধে মুসলিম বাহিনী পরাজিত হইয়াছিল। কিন্তু বুখারী শরীফের বর্ণনায় আছে, রোমক বাহিনী পরাজিত হইয়াছিল। এই ব্যাপারে ইবন ইসহাকের অভিমত হইল, উভয় দল অমীমাংসিতভাবে পৃথক হইয়া গিয়াছিল (যাদুল মা'আদ, ১/২খ., ১৫৬)। 'আল্লামা দানাপুরী ইব্ন কায়্যিমের এই অভিমত ব্যক্ত করিয়া অবশেষে ইবন হিশাম কর্তৃক যুহরীর এই অভিমতকে উল্লেখ করিয়াছেন যে, "আমার তো ইহাই মনে হয় যে, যখন খালিদ (রা)-কে সেনাপতি নির্বাচিত করা হয় তখন আল্লাহ তা'আলা মুসলিম বাহিনীকে বিজয় দান করিয়াছিলেন (আসাহহুস সিয়ার, পৃ.২৩৮)।
মাওলানা আবুল কালাম আযাদ বলিয়াছেন, কিছু কিছু রিওয়ায়াত পাওয়া যায় যাহা মুসলিম বাহিনীর পরাজয় প্রমাণ করে। যেমন মুসলিম সৈন্যদল যখন মদীনায় পৌঁছায় তখন অভ্যর্থনাকারী মদীনাবাসীর একটি দল মুসলিম বাহিনীর দিকে মাটি নিক্ষেপ করিয়া বলিয়াছিল, يَا فَرَّارُ أَفَرَرْتُمْ فِي سَبِيلِ الله; কিন্তু স্বয়ং রাসূলুল্লাহ (স) উত্তরে বলিয়াছিলেন, তাহারা পলায়নকারী নয়, বরং পাল্টা আক্রমণকারী। এই সম্পর্কে অধিকতর গ্রহণযোগ্য কথা হইল, মদীনাবাসীর নিকট প্রথমে অসম্পূর্ণ কিংবা ভুল তথ্য পৌছিয়াছিল। তাহারা কোন প্রকার পরীক্ষা-নিরীক্ষা ব্যতিরেকে এই সংবাদের উপর বিশ্বাস স্থাপন করিয়াছিলেন। সেই যুগ তো আর বর্তমান উন্নত যোগাযোগের যুগ ছিল না। সব সময় সংবাদ বাহকের কথার উপরই বিশ্বাস করিতে হইত। ইহারই কারণে কিছু সংখ্যক মদীনাবাসীর মুখ হইতে এইরূপ শব্দাবলী উচ্চারিত হইয়াছিল। কিন্তু রাসূলুল্লাহ (স)-এর প্রত্যাখ্যানমূলক কথার পর পলায়নের অভিযোগ একেবারেই অসার মনে হয়। মাওলানা আযাদ, মাওলানা 'আবদুর রাউফ দানাপুরী কর্তৃক ইব্ن কায়ি্যমের উদ্ধৃতি সম্পর্কে প্রশ্নাকারে বলেন, ইমাম বুখারী ও ইমাম যুহরীর রিওয়ায়াতসমূহ বিশুদ্ধ, না ইবন ইসহাকের রিওয়ায়াত? তবুও বলিতে হয়, মৃতা যুদ্ধে ইসলামী বাহিনীর পরাজয় মনে করিবার কোন যৌক্তিক কারণ গোচরীভূত হয় না। ইবন ইসহাক অধিকন্তু বলিতে পারেন, যুদ্ধের কোন সুনির্দিষ্ট মীমাংসা হয় নাই। উভয় বাহিনী পিছনে পড়িয়া গিয়াছিল। একান্ত যদি উভয় দলের পিছনে হটিবার তথ্য মানিয়া লওয়া হয় তাহা হইলেও বলিব, লাখ-দেড় লাখ সৈন্যের পিছপা হইবার মধ্যে লাঞ্ছনা, না তিন হাজার সৈন্যের পিছপা হইবার মধ্যে লাঞ্ছনা রহিয়াছে? ইহাও লক্ষণীয় যে, শত্রুদল নিজ দেশে যুদ্ধ করিতেছে আর মুসলিম বাহিনী শত শত মাইল দূরদেশে লড়িতেছে।
প্রকৃত অবস্থা হইল, 'আবদুল্লাহ ইব্ন রাওয়াহা (را)-এর শাহাদাতের পর মুসলিম বাহিনী বিক্ষিপ্ত হইয়া গিয়াছিল। এই অবস্থা নূতন সেনাপতি নিযুক্ত হইবার পূর্ব পর্যন্ত বিরাজ করিতেছিল। কিন্তু ছাবিত ইব্ন আরকাম আনসারী (রা)-এর তাৎক্ষণিক পরামর্শে খালিদ ইবনুল ওয়ালীদ (রা) সেনাপতির দায়িত্ব গ্রহণ করিয়া বিক্ষিপ্ত বাহিনীকে একত্র করিয়া তাহাদিগকে ঢালিয়া সাজাইলেন, অতঃপর অদম্যভাবে গর্জিয়া উঠিয়া শত্রুদিগকে পিছনে হটিতে বাধ্য করিলেন। ইহাও সম্ভব যে, মুসলিম বাহিনী সম্মুখ হইতে বিচ্ছিন্নভাবে হটিয়া যাইবার পর পুনরায় ঐক্যবদ্ধভাবে আক্রমণে উদ্যত হইলে শত্রুগণ ভাবিয়াছিল ইহারা পরাজয় বরণকারী বাহিনী নয়, বরং নব উদ্যমে উদ্দীপ্ত কোন নূতন দল। সম্ভবত ইহারা ছাড়া আরও বাহিনী আত্মগোপন করিয়া আছে। আল্লাহই জানেন ইহারা কোন সময় আক্রমণ করিয়া বসে। ফলে তাহারা আত্মরক্ষার্থে পিছনে হটিয়া গিয়াছিল। কিন্তু মুসলিম বাহিনী নিজেদের সংখ্যা স্বল্পতার কথা ভাবিয়া ইহাদিগকে অনুসরণ করা হইতে বিরত রহিয়াছিল। শত্রুবাহিনী যদি মুসলমানদের প্রকৃত সংখ্যা সম্পর্কে অবগত হইত তাহা হইল একজনও এই যুদ্ধ হইতে জীবিত ফিরিতে পারিত না (রাসূলে রাহমাত, পৃ. ৪১৮)।
ইমাম বুখারীর রিওয়ায়াত, ইবন কাছীরের দীর্ঘ আলোচনা ও সর্বশেষ মাওলানা আযাদের তাত্ত্বিক পর্যালোচনার পর এই সিদ্ধান্তে উপনীত হওয়া যায় যে, এই যুদ্ধে মুসলমানগণ পরাজিত হয় নাই।
📄 মালিক ইবন যাফিলা-র হত্যা
ইবন ইসহাক উল্লেখ করিয়াছেন, কুতবা ইবন কাতাদা আল-আযরী (রা) মুসলিম সেনাবাহিনীর দক্ষিণাংশের দায়িত্বে নিয়োজিত ছিলেন। তিনি মালিক ইবন যাফিলার উপর আক্রমণ চালাইয়া তাহাকে হত্যা করিয়াছিলেন। যাফিলা শব্দের স্থলে কেহ কেহ রাফিলা উল্লেখ করিয়াছেন। মালিক ইবন যাফিলা ছিল বেদুঈন নাসারাদের নেতা। তাহাকে হত্যার পর কুতবা ইন্ন কাতাদা (রা) নিম্নোক্ত কবিতা আবৃত্তি করেন:
طَعَنْتُ ابْنَ رَافِلَةَ بْنِ الآراش - بِرُمْحِ مَضَى فِيْهِ ثُمَّ انْحَطَمَ ضَرَبْتُ عَلى جيده ضَرْبَةً فَمَالَ كَمَا مَالَ عُصْنُ السَّلَم وَسُقْنَا نِسَاءَ بَنِي عَمْهِ - غَدَاةَ وَقُوقِينَ سَوْقَ النَّعَمِ.
"যাফিলা ইবনুল-আরাশের পুত্রের উপর আমি বল্লম দ্বারা এমনি আঘাত হানিলাম-যাহা তাহার দেহাভ্যন্তরে প্রবেশ করিয়া ভাঙ্গিয়া গেল।
"আমি তাহার ঘাড়ে এমনি আঘাত হানিলাম যাহার ফলে সে কাঁটাযুক্ত গাছের শাখার ন্যায় ঝুঁকিয়া পড়িল।
"অতঃপর তাহার চাচাত ভগ্নিগণকে সকালবেলা "রাক্কীন" নামক স্থান পর্যন্ত হাঁকাইয়া দিলাম যেইভাবে পশুপালকে হাঁকাইয়া দেওয়া হয়"।
ইব্ন হিশাম এই কবিতা সম্পর্কে বলেন, এইখানে ইবনুল আরাশ শব্দটি বর্ণনাকারী ইবন ইসহাক ছাড়া অন্য কেহ সংযোজন করিয়াছেন। তিনি আরও বলিয়াছেন, তৃতীয় পংক্তিটি খল্লাদ ইব্ন কুররার।
এই কবিতামালার উল্লেখ করিয়া ইবন কাছীর বলেন, আমরা যে মৃতা যুদ্ধে মুসলিম বাহিনীর বিজয়ের মত পোষণ করি ইহা তাহার সমর্থন করে। কারণ সাধারণত দলপতি নিহত হইলে তাহার অধীনস্থ বাহিনী পলায়ন করে। ইহা ব্যতীত কবিতায় ইহাও স্পষ্ট যে, তাহাদের মহিলাদেরকে বন্দী করা হইয়াছিল (আল-বিদায়া ওয়ান-নিহায়া, ২৫০; ইব্ন হিশাম, আস-সীরাতুন নাবabিয়্যা, ৩খ., ২৬৫)।
ইবন ইসহাক উল্লেখ করিয়াছেন, কুতবা ইবন কাতাদা আল-আযরী (রা) মুসলিম সেনাবাহিনীর দক্ষিণাংশের দায়িত্বে নিয়োজিত ছিলেন। তিনি মালিক ইবন যাফিলার উপর আক্রমণ চালাইয়া তাহাকে হত্যা করিয়াছিলেন। যাফিলা শব্দের স্থলে কেহ কেহ রাফিলা উল্লেখ করিয়াছেন। মালিক ইবন যাফিলা ছিল বেদুঈন নাসারাদের নেতা। তাহাকে হত্যার পর কুতবা ইন্ন কাতাদা (রা) নিম্নোক্ত কবিতা আবৃত্তি করেন:
طَعَنْتُ ابْنَ رَافِلَةَ بْنِ الآراش - بِرُمْحِ مَضَى فِيْهِ ثُمَّ انْحَطَمَ ضَرَبْتُ عَلى جيده ضَرْبَةً فَمَالَ كَمَا مَالَ عُصْنُ السَّلَم وَسُقْنَا نِسَاءَ بَنِي عَمْهِ - غَدَاةَ وَقُوقِينَ سَوْقَ النَّعَمِ.
"যাফিলা ইবনুল-আরাশের পুত্রের উপর আমি বল্লম দ্বারা এমনি আঘাত হানিলাম-যাহা তাহার দেহাভ্যন্তরে প্রবেশ করিয়া ভাঙ্গিয়া গেল।
"আমি তাহার ঘাড়ে এমনি আঘাত হানিলাম যাহার ফলে সে কাঁটাযুক্ত গাছের শাখার ন্যায় ঝুঁকিয়া পড়িল।
"অতঃপর তাহার চাচাত ভগ্নিগণকে সকালবেলা "রাক্কীন" নামক স্থান পর্যন্ত হাঁকাইয়া দিলাম যেইভাবে পশুপালকে হাঁকাইয়া দেওয়া হয়"।
ইব্ন হিশাম এই কবিতা সম্পর্কে বলেন, এইখানে ইবনুল আরাশ শব্দটি বর্ণনাকারী ইবন ইসহাক ছাড়া অন্য কেহ সংযোজন করিয়াছেন। তিনি আরও বলিয়াছেন, তৃতীয় পংক্তিটি খল্লাদ ইব্ন কুররার।
এই কবিতামালার উল্লেখ করিয়া ইবন কাছীর বলেন, আমরা যে মৃতা যুদ্ধে মুসলিম বাহিনীর বিজয়ের মত পোষণ করি ইহা তাহার সমর্থন করে। কারণ সাধারণত দলপতি নিহত হইলে তাহার অধীনস্থ বাহিনী পলায়ন করে। ইহা ব্যতীত কবিতায় ইহাও স্পষ্ট যে, তাহাদের মহিলাদেরকে বন্দী করা হইয়াছিল (আল-বিদায়া ওয়ান-নিহায়া, ২৫০; ইব্ন হিশাম, আস-সীরাতুন নাবাবিয়্যা, ৩খ., ২৬৫)।
ইবন ইসহাক উল্লেখ করিয়াছেন, কুতবা ইবন কাতাদা আল-আযরী (রা) মুসলিম সেনাবাহিনীর দক্ষিণাংশের দায়িত্বে নিয়োজিত ছিলেন। তিনি মালিক ইবন যাফিলার উপর আক্রমণ চালাইয়া তাহাকে হত্যা করিয়াছিলেন। যাফিলা শব্দের স্থলে কেহ কেহ রাফিলা উল্লেখ করিয়াছেন। মালিক ইবন যাফিলা ছিল বেদুঈন নাসারাদের নেতা। তাহাকে হত্যার পর কুতবা ইন্ন কাতাদা (রা) নিম্নোক্ত কবিতা আবৃত্তি করেন:
طَعَنْتُ ابْنَ رَافِلَةَ بْنِ الآراش - بِرُمْحِ مَضَى فِيْهِ ثُمَّ انْحَطَمَ ضَرَبْتُ عَلى جيده ضَرْبَةً فَمَالَ كَمَا مَالَ عُصْنُ السَّلَم وَسُقْنَا نِسَاءَ بَنِي عَمْهِ - غَدَاةَ وَقُوقِينَ سَوْقَ النَّعَمِ.
"যাফিলা ইবনুল-আরাশের পুত্রের উপর আমি বল্লম দ্বারা এমনি আঘাত হানিলাম-যাহা তাহার দেহাভ্যন্তরে প্রবেশ করিয়া ভাঙ্গিয়া গেল।
"আমি তাহার ঘাড়ে এমনি আঘাত হানিলাম যাহার ফলে সে কাঁটাযুক্ত গাছের শাখার ন্যায় ঝুঁকিয়া পড়িল।
"অতঃপর তাহার চাচাত ভগ্নিগণকে সকালবেলা "রাক্কীন" নামক স্থান পর্যন্ত হাঁকাইয়া দিলাম যেইভাবে পশুপালকে হাঁকাইয়া দেওয়া হয়"।
ইব্ন হিশাম এই কবিতা সম্পর্কে বলেন, এইখানে ইবনুল আরাশ শব্দটি বর্ণনাকারী ইবন ইসহাক ছাড়া অন্য কেহ সংযোজন করিয়াছেন। তিনি আরও বলিয়াছেন, তৃতীয় পংক্তিটি খল্লাদ ইব্ন কুররার।
এই কবিতামালার উল্লেখ করিয়া ইবন কাছীর বলেন, আমরা যে মৃতা যুদ্ধে মুসলিম বাহিনীর বিজয়ের মত পোষণ করি ইহা তাহার সমর্থন করে। কারণ সাধারণত দলপতি নিহত হইলে তাহার অধীনস্থ বাহিনী পলায়ন করে। ইহা ব্যতীত কবিতায় ইহাও স্পষ্ট যে, তাহাদের মহিলাদেরকে বন্দী করা হইয়াছিল (আল-বিদায়া ওয়ান-নিহায়া, ২৫০; ইব্ن হিশام, আস-সীরাতুন নাবাবিয়্যা, ৩খ., ২৬৫)।
ইবন ইসহাক উল্লেখ করিয়াছেন, কুতবা ইবন কাতাদা আল-আযরী (রা) মুসলিম সেনাবাহিনীর দক্ষিণাংশের দায়িত্বে নিয়োজিত ছিলেন। তিনি মালিক ইবন যাফিলার উপর আক্রমণ চালাইয়া তাহাকে হত্যা করিয়াছিলেন। যাফিলা শব্দের স্থলে কেহ কেহ রাফিলা উল্লেখ করিয়াছেন। মালিক ইবন যাফিলা ছিল বেদুঈন নাসারাদের নেতা। তাহাকে হত্যার পর কুতবা ইন্ন কাতাদা (রা) নিম্নোক্ত কবিতা আবৃত্তি করেন:
طَعَنْتُ ابْنَ رَافِلَةَ بْنِ الآراش - بِرُمْحِ مَضَى فِيْهِ ثُمَّ انْحَطَمَ ضَرَبْتُ عَلى جيده ضَرْبَةً فَمَالَ كَمَا مَالَ عُصْنُ السَّلَم وَسُقْنَا نِسَاءَ بَنِي عَمْهِ - غَدَاةَ وَقُوقِينَ سَوْقَ النَّعَمِ.
"যাফিলা ইবনুল-আরাশের পুত্রের উপর আমি বল্লম দ্বারা এমনি আঘাত হানিলাম-যাহা তাহার দেহাভ্যন্তরে প্রবেশ করিয়া ভাঙ্গিয়া গেল।
"আমি তাহার ঘাড়ে এমনি আঘাত হানিলাম যাহার ফলে সে কাঁটাযুক্ত গাছের শাখার ন্যায় ঝুঁকিয়া পড়িল।
"অতঃপর তাহার চাচাত ভগ্নিগণকে সকালবেলা "রাক্কীন" নামক স্থান পর্যন্ত হাঁকাইয়া দিলাম যেইভাবে পশুপালকে হাঁকাইয়া দেওয়া হয়"।
ইব্ن হিশাম এই কবিতা সম্পর্কে বলেন, এইখানে ইবনুল আরাশ শব্দটি বর্ণনাকারী ইবন ইসহাক ছাড়া অন্য কেহ সংযোজন করিয়াছেন। তিনি আরও বলিয়াছেন, তৃতীয় পংক্তিটি খল্লাদ ইব্ن কুররার।
এই কবিতামালার উল্লেখ করিয়া ইবন কাছীর বলেন, আমরা যে মৃতা যুদ্ধে মুসলিম বাহিনীর বিজয়ের মত পোষণ করি ইহা তাহার সমর্থন করে। কারণ সাধারণত দলপতি নিহত হইলে তাহার অধীনস্থ বাহিনী পলায়ন করে। ইহা ব্যতীত কবিতায় ইহাও স্পষ্ট যে, তাহাদের মহিলাদেরকে বন্দী করা হইয়াছিল (আল-বিদায়া ওয়ান-নিহায়া, ২৫০; ইব্ن হিশাম, আস-সীরাতুন নাবabিয়্যা, ৩খ., ২৬৫)।
📄 হাদাছ গোত্রের মহিলা জ্যোতিষীর সতর্কবাণী
ইব্ন ইসহাক বলেন, হাদাছ গোত্রীয় জনৈক মহিলা জ্যোতিষী রাসূলুল্লাহ (স)-এর বাহিনীর আগমন সংবাদ শুনিয়া তাহার স্বগোত্র হাদাছ ও উহার শাখাগোত্র বানু গামের লোকজনকে সতর্ক করিয়া দিয়া বলে:
أَنْذِرُكُمْ قَوْمًا خَزْرا يَنْظُرُونَ شَدْرًا وَيَقُودُونَ الْخَيْلَ تَتْرَى وَيُهْرِيقُوْنَ دَمَّا عَكْرًا.
"আমি তোমাদিগকে এমন এক জাতি সম্পর্কে সতর্ক করিতেছি যাহারা সদন্তে তাকায় এবং ক্রুদ্ধ দৃষ্টিতে সারি সারি অশ্ব হাঁকাইয়া চলে, তাহারা রক্তপাত ঘটায় বিভিন্নভাবে”।
তাহার গোত্র এই কথা গ্রহণ করিয়া সতর্ক হয়। তাহারা বানূ লাখম গোত্রের সংশ্রব হইতে সরিয়া দাঁড়ায়। ফলে হাদাছ গোত্রের মধ্যে বানু গানন্ম সর্বাধিক সমৃদ্ধিশালী হইয়া উঠে। অপরদিকে হাদাছ গোত্রের যাহারা যুদ্ধে ইন্ধন যোগাইয়াছিল তাহারা হইল বানু ছা'লাবা। ইহারা বেশী দিন তাহাদিগের অস্তিত্ব রক্ষা করিতে সক্ষম হয় নাই। ক্রমান্বয়ে ইহাদিগের জনবল হ্রাস
পাইতে থাকে। যাহা হউক, খালিদ (রা) যখন লোকদিগকে লইয়া প্রত্যাবর্তন করিধার ইচ্ছা করেন তখন তিনি কাফেলাসহ প্রত্যাবর্তন করিলেন (ইবন হিশাম, আস-সীরাতুন নাবabিয়্যা, ৩খ, ২৬৫, ২৬৬)।
মৃতা-র শহীদগণ সম্পর্কে রাসূলুল্লাহ (স)-এর স্বপ্ন: ইবন সা'দ তদীয় সূত্রে এই সম্পর্কে নিম্নোক্ত হাদীছ বর্ণনা করিয়াছেন:
وَقَالَ فَأَتَيْتُ رَسُولَ اللهِ ﷺ فَأَخْبَرْتُهُ فَشَقٌ ذَلِكَ عَلَيْهِ فَصَلَّى الظُّهْرَ قَامَ فَرَكَعَ رَكْعَتَيْنِ ثُمَّ أَقْبَلَ بِوَجْهِهِ عَلَى الْقَوْمِ فَشَقَّ ذَلِكَ عَلَى النَّاسُ ثُمَّ صَلَّى الْعَصْرَ فَفَعَلَ مِثْلَ ذلكَ ثُمَّ صَلَّى الْمَغْرِبَ فَفَعَلَ مِثْلَ ذلِكَ ثُمَّ صَلَّى العَتَمَةَ فَفَعَلَ مِثْلَ ذَلِكَ حَتَّى إِذَا كَانَ صَلَاةُ الصَّبْحِ دَخَلَ الْمَسْجِدَ ثُمَّ تَبَسَّمَ وَكَانَ تِلْكَ السَّاعَهُ لَا يَقُومُ إِلَيْهِ إِنَّاسَ مِّنْ نَاحِيَةِ الْمَسْجِدِ حَتَّى يُصَلَّى الْغَدَاةَ فَقَالَ لَهُ الْقَوْمُ حِينَ تَبَسَّمَ يَا نَبِيُّ اللَّهِ بِأَنْفُسِنَا أَنْتَ مَا يَعْلَمُ الا اللهُ مَا كَانَ بِنَا مِنَ الْوُجد مُنْذُ رَأَيْنَا مِنْكَ الَّذى رَأَيْنَا قَالَ رَسُولُ اللهِ ﷺ كَانَ الَّذِي رَأَيْتُمْ مِنِّي أَنَّهُ أَحْزَنَنِي قَتْلَ أَصْحَابِي حَتَّى رَأَيْتُهُمْ فِي الْجَنَّةِ اخْوَانًا عَلَى سُرُرٍ مُتَقَابِلِينَ وَرَأَيْتُ فِي بَعْضِهِمْ إِعْرَاضًا كَأَنَّهُ كَرِهَ السَّيْفَ وَرَأَيْتُ جَعْفَرًا مَلَكًا ذَا جَنَاحَيْنِ مُضَرَّجًا بِالدِّمَاءِ مَصْبُونَ الْقَوَادِمِ.
"বর্ণনাকারী বলেন, ইহার পর আমি রাসূলুল্লাহ (স)-এর নিকট আসিয়া তাহাকে মুসলিম বাহিনীর বিপর্যয় সম্পর্কে অবহিত করিলাম। তিনি তাহা শুনিয়া এতই মর্মাহত হইলেন যে, যুহরের সালাত আদায় করিয়াই গৃহে প্রবেশ করিলেন। অথচ তাঁহার অভ্যাস ছিল, যুহরের সালাত আদায় করিবার পর দাঁড়াইয়া দুই রাক'আত সুন্নাত আদায় করিতেন, অতঃপর লোকদিগের দিকে মুখ করিয়া বসিতেন। রাসূলুল্লাহ (স)-এর মর্মবেদনা দেখিয়া লোকজনও আতংকিত হইল। ইহার পর আসরের সালাত আদায় করিয়া রাসূলুল্লাহ (স) পূর্বের মত আচরণ করিলেন। তিনি মাগরিব ও 'ইশার সালাতের পরও তাহাই করিলেন। ফজরের সালাতের সময় হইলে রাসূলুল্লাহ (স) মসজিদে প্রবেশ করিয়া মুচকি হাসিলেন। এই সময় কোন লোক মসজিদের কোন প্রান্ত হইতে তাঁহার নিকট আসিত না, যতক্ষণ পর্যন্ত তিনি ফজরের সালাত আদায় না করিতেন। তাঁহার মুচকি হাসি দেখিয়া লোকজন বলিল, হে আল্লাহ্ নবী! আমাদের প্রাণ আপনার জন্য উৎসর্গিত হউক! আপনার এই অবস্থা দেখিবার পর আমাদের যেই হতাশাব্যঞ্জক অবস্থা হইয়াছিল তাহা একমাত্র আল্লাহ ব্যতীত আর কেহ জানে না। রাসূলুল্লাহ (স) বলিলেন: তোমরা আমাকে এই অবস্থায় দেখিয়াছ এই কারণে যে, আমার সাহাবীদিগের নিহত হওয়ায় আমি বিষণ্ণ হইয়াছিলাম। এমতাবস্থায় আমি স্বপ্নে দেখিলাম, তাহারা জান্নাতে ভাই ভাই হিসাবে সামনা সামনি আসনে উপবিষ্ট। তাহাদের কোন একজনের আসন কিছুটা বক্র
দেখিলাম যেন সে তরবারি গ্রহণে দ্বিধাগ্রস্ত ছিল। আমি জা'ফারকে দেখিলাম দুইটি বাহুবিশিষ্ট ফেরেশতারূপে রক্তে রঞ্জিত পদযুগলসহ” (আত-তাবাকাতুল কুবরা, ২খ., ১২৯-১৩০)।
এই রিওয়ায়াত ইবন সা'দ নিজস্ব সনদে বর্ণনা করিয়াছেন। ইহার গ্রহণযোগ্যতা সম্পর্কে তিনি কোন কথা বলেন নাই। তবে ইহাতে প্রসিদ্ধ বর্ণনাসমূহ হইতে কিছুটা বৈপরীত্য পরিলক্ষিত হয়। যেমন বুখারীসহ বিখ্যাত হাদীছ গ্রন্থরাজিতে রহিয়াছে, সর্বপ্রথম অস্ত্রধারণ করিয়া যায়দ ইব্ন হারিছা (রা) শহীদ হইয়াছিলেন। কিন্তু উক্ত রিওয়ায়াতে দেখা যায়, জা'ফার ইবন আবী তালিব (রা) সর্বপ্রথম অস্ত্রধারণ করিয়া শাহাদাত লাভ করিয়াছিলেন। রিওয়ায়াতটি দ্বারা স্পষ্টভাবে প্রতীয়মান হয় যে, খালিদ ইবনুল ওয়ালীদ (রা) নেতৃত্ব গ্রহণ করিবার পর মুসলিম বাহিনী বিজয় লাভ করিয়াছিল। যাহা বুখারীর রিওয়ায়াত-
ثُمَّ أَخَذَ الرَّايَةَ سَيْفٌ مِنْ سُيُوفَ اللَّهِ فَفَتَحَ اللَّه عَلَيْهِ.
এর পক্ষে জোরালো সমর্থন ব্যক্ত করে। এই বর্ণনাটি ছাড়াও শুধু রাসূলুল্লাহ (স) কর্তৃক মনোনীত পর্যায়ক্রমে তিনজন সেনাপতির জান্নাতে উচ্চাসন লাভ সম্পর্কিত নিম্নোক্ত বর্ণনাটিও এখানে দেওয়া হইল। ইহাও রাসূলুল্লাহ (স)-এর স্বপ্ন ছিল।
হাফিজ আবু ষুর'আর দালাইলুন নুবুওয়াত গ্রন্থে একটি হাদীছের শেষ অংশে আছে: ثُمَّ أَشْرَفًا بِي شَرَفًا فَإِذَا نَفُرُ ثَلَاثَةُ يَشْرَبُونَ مِنْ خَمْرٍ لَّهُمْ فَقُلْتُ مَنْ هَؤُلَاءِ قَالَا هذا جَعْفَرُ بْنُ أَبِي طَالِبٍ وَزَيْدُ بْنُ حَارِثَةَ وَعَبْدُ اللَّهِ بْنُ رَوَاحَةَ.
"তাহারা দুইজনে আমাকে একটি উচু স্থানে লইয়া গেল। আমি সেখানে তিন ব্যক্তিকে দেখিলাম, তাহারা শরাব পান করিতেছে। আমি জিজ্ঞাসা করিলাম, ইহারা কাহারা? তাহারা উত্তর দিল, ইহারা হইলেন জা'ফার ইব্ন আবূ তালিব, যায়দ ইবন হারিছা এবং 'আবদুল্লাহ ইব্ রাওয়াহা (আল-বিদায়া ওয়ান-নিহায়া, ৪খ., ২৫৯-২৬০)।
ইব্ন ইসহাক বলেন, হাদাছ গোত্রীয় জনৈক মহিলা জ্যোতিষী রাসূলুল্লাহ (স)-এর বাহিনীর আগমন সংবাদ শুনিয়া তাহার স্বগোত্র হাদাছ ও উহার শাখাগোত্র বানু গামের লোকজনকে সতর্ক করিয়া দিয়া বলে:
أَنْذِرُكُمْ قَوْمًا خَزْرا يَنْظُرُونَ شَدْرًا وَيَقُودُونَ الْخَيْلَ تَتْرَى وَيُهْرِيقُوْنَ دَمَّا عَكْرًا.
"আমি তোমাদিগকে এমন এক জাতি সম্পর্কে সতর্ক করিতেছি যাহারা সদন্তে তাকায় এবং ক্রুদ্ধ দৃষ্টিতে সারি সারি অশ্ব হাঁকাইয়া চলে, তাহারা রক্তপাত ঘটায় বিভিন্নভাবে”।
তাহার গোত্র এই কথা গ্রহণ করিয়া সতর্ক হয়। তাহারা বানূ লাখম গোত্রের সংশ্রব হইতে সরিয়া দাঁড়ায়। ফলে হাদাছ গোত্রের মধ্যে বানু গানন্ম সর্বাধিক সমৃদ্ধিশালী হইয়া উঠে। অপরদিকে হাদাছ গোত্রের যাহারা যুদ্ধে ইন্ধন যোগাইয়াছিল তাহারা হইল বানু ছা'লাবা। ইহারা বেশী দিন তাহাদিগের অস্তিত্ব রক্ষা করিতে সক্ষম হয় নাই। ক্রমান্বয়ে ইহাদিগের জনবল হ্রাস পাইতে থাকে। যাহা হউক, খালিদ (রা) যখন লোকদিগকে লইয়া প্রত্যাবর্তন করিধার ইচ্ছা করেন তখন তিনি কাফেলাসহ প্রত্যাবর্তন করিলেন (ইবন হিশাম, আস-সীরাতুন নাবabিয়্যা, ৩খ, ২৬৫, ২৬৬)।
মৃতা-র শহীদগণ সম্পর্কে রাসূলুল্লাহ (স)-এর স্বপ্ন: ইবন সা'দ তদীয় সূত্রে এই সম্পর্কে নিম্নোক্ত হাদীছ বর্ণনা করিয়াছেন:
وَقَالَ فَأَتَيْتُ رَسُولَ اللهِ ﷺ فَأَخْبَرْتُهُ فَشَقٌ ذَلِكَ عَلَيْهِ فَصَلَّى الظُّهْرَ قَامَ فَرَكَعَ رَكْعَتَيْنِ ثُمَّ أَقْبَلَ بِوَجْهِهِ عَلَى الْقَوْمِ فَشَقَّ ذَلِكَ عَلَى النَّاسُ ثُمَّ صَلَّى الْعَصْرَ فَفَعَلَ مِثْلَ ذلكَ ثُمَّ صَلَّى الْمَغْرِبَ فَفَعَلَ مِثْلَ ذلِكَ ثُمَّ صَلَّى العَتَمَةَ فَفَعَلَ مِثْلَ ذَلِكَ حَتَّى إِذَا كَانَ صَلَاةُ الصَّبْحِ دَخَلَ الْمَسْجِدَ ثُمَّ تَبَسَّمَ وَكَانَ تِلْكَ السَّاعَهُ لَا يَقُومُ إِلَيْهِ إِنَّاسَ مِّنْ نَاحِيَةِ الْمَسْجِدِ حَتَّى يُصَلَّى الْغَدَاةَ فَقَالَ لَهُ الْقَوْمُ حِينَ تَبَسَّمَ يَا نَبِيُّ اللَّهِ بِأَنْفُسِنَا أَنْتَ مَا يَعْلَمُ الا اللهُ مَا كَانَ بِنَا مِنَ الْوُجد مُنْذُ رَأَيْنَا مِنْكَ الَّذى رَأَيْنَا قَالَ رَسُولُ اللهِ ﷺ كَانَ الَّذِي رَأَيْتُمْ مِنِّي أَنَّهُ أَحْزَنَنِي قَتْلَ أَصْحَابِي حَتَّى رَأَيْتُهُمْ فِي الْجَنَّةِ اخْوَانًا عَلَى سُرُرٍ مُتَقَابِلِينَ وَرَأَيْتُ فِي بَعْضِهِمْ إِعْرَاضًا كَأَنَّهُ كَرِهَ السَّيْفَ وَرَأَيْتُ جَعْفَرًا مَلَكًا ذَا جَنَاحَيْنِ مُضَرَّجًا بِالدِّمَاءِ مَصْبُونَ الْقَوَادِمِ.
"বর্ণনাকারী বলেন, ইহার পর আমি রাসূলুল্লাহ (স)-এর নিকট আসিয়া তাহাকে মুসলিম বাহিনীর বিপর্যয় সম্পর্কে অবহিত করিলাম। তিনি তাহা শুনিয়া এতই মর্মাহত হইলেন যে, যুহরের সালাত আদায় করিয়াই গৃহে প্রবেশ করিলেন। অথচ তাঁহার অভ্যাস ছিল, যুহরের সালাত আদায় করিবার পর দাঁড়াইয়া দুই রাক'আত সুন্নাত আদায় করিতেন, অতঃপর লোকদিগের দিকে মুখ করিয়া বসিতেন। রাসূলুল্লাহ (স)-এর মর্মবেদনা দেখিয়া লোকজনও আতংকিত হইল। ইহার পর আসরের সালাত আদায় করিয়া রাসূলুল্লাহ (স) পূর্বের মত আচরণ করিলেন। তিনি মাগরিব ও 'ইশার সালাতের পরও তাহাই করিলেন। ফজরের সালাতের সময় হইলে রাসূলুল্লাহ (স) মসজিদে প্রবেশ করিয়া মুচকি হাসিলেন। এই সময় কোন লোক মসজিদের কোন প্রান্ত হইতে তাঁহার নিকট আসিত না, যতক্ষণ পর্যন্ত তিনি ফজরের সালাত আদায় না করিতেন। তাঁহার মুচকি হাসি দেখিয়া লোকজন বলিল, হে আল্লাহ্ নবী! আমাদের প্রাণ আপনার জন্য উৎসর্গিত হউক! আপনার এই অবস্থা দেখিবার পর আমাদের যেই হতাশাব্যঞ্জক অবস্থা হইয়াছিল তাহা একমাত্র আল্লাহ ব্যতীত আর কেহ জানে না। রাসূলুল্লাহ (স) বলিলেন: তোমরা আমাকে এই অবস্থায় দেখিয়াছ এই কারণে যে, আমার সাহাবীদিগের নিহত হওয়ায় আমি বিষণ্ণ হইয়াছিলাম। এমতাবস্থায় আমি স্বপ্নে দেখিলাম, তাহারা জান্নাতে ভাই ভাই হিসাবে সামনা সামনি আসনে উপবিষ্ট। তাহাদের কোন একজনের আসন কিছুটা বক্র দেখিলাম যেন সে তরবারি গ্রহণে দ্বিধাগ্রস্ত ছিল। আমি জা'ফারকে দেখিলাম দুইটি বাহুবিশিষ্ট ফেরেশতারূপে রক্তে রঞ্জিত পদযুগলসহ” (আত-তাবাকাতুল কুবরা, ২খ., ১২৯-১৩০)।
এই রিওয়ায়াত ইবন সা'দ নিজস্ব সনদে বর্ণনা করিয়াছেন। ইহার গ্রহণযোগ্যতা সম্পর্কে তিনি কোন কথা বলেন নাই। তবে ইহাতে প্রসিদ্ধ বর্ণনাসমূহ হইতে কিছুটা বৈপরীত্য পরিলক্ষিত হয়। যেমন বুখারীসহ বিখ্যাত হাদীছ গ্রন্থরাজিতে রহিয়াছে, সর্বপ্রথম অস্ত্রধারণ করিয়া যায়দ ইব্ন হারিছা (রা) শহীদ হইয়াছিলেন। কিন্তু উক্ত রিওয়ায়াতে দেখা যায়, জা'ফার ইবন আবী তালিব (রা) সর্বপ্রথম অস্ত্রধারণ করিয়া শাহাদাত লাভ করিয়াছিলেন। রিওয়ায়াতটি দ্বারা স্পষ্টভাবে প্রতীয়মান হয় যে, খালিদ ইবনুল ওয়ালীদ (রা) নেতৃত্ব গ্রহণ করিবার পর মুসলিম বাহিনী বিজয় লাভ করিয়াছিল। যাহা বুখারীর রিওয়ায়াত-
ثُمَّ أَخَذَ الرَّايَةَ سَيْفٌ مِنْ سُيُوفَ اللَّهِ فَفَتَحَ اللَّه عَلَيْهِ.
এর পক্ষে জোরালো সমর্থন ব্যক্ত করে। এই বর্ণনাটি ছাড়াও শুধু রাসূলুল্লাহ (স) কর্তৃক মনোনীত পর্যায়ক্রমে তিনজন সেনাপতির জান্নাতে উচ্চাসন লাভ সম্পর্কিত নিম্নোক্ত বর্ণনাটিও এখানে দেওয়া হইল। ইহাও রাসূলুল্লাহ (স)-এর স্বপ্ন ছিল।
হাফিজ আবু ষুর'আর দালাইলুন নুবুওয়াত গ্রন্থে একটি হাদীছের শেষ অংশে আছে:
ثُمَّ أَشْرَفًا بِي شَرَفًا فَإِذَا نَفُرُ ثَلَاثَةُ يَشْرَبُونَ مِنْ خَمْرٍ لَّهُمْ فَقُلْتُ مَنْ هَؤُلَاءِ قَالَا هذا جَعْفَرُ بْنُ أَبِي طَالِبٍ وَزَيْدُ بْنُ حَارِثَةَ وَعَبْدُ اللَّهِ بْنُ رَوَاحَةَ.
"তাহারা দুইজনে আমাকে একটি উচু স্থানে লইয়া গেল। আমি সেখানে তিন ব্যক্তিকে দেখিলাম, তাহারা শরাব পান করিতেছে। আমি জিজ্ঞাসা করিলাম, ইহারা কাহারা? তাহারা উত্তর দিল, ইহারা হইলেন জা'ফার ইব্ন আবূ তালিব, যায়দ ইবন হারিছা এবং 'আবদুল্লাহ ইব্ রাওয়াহা (আল-বিদায়া ওয়ান-নিহায়া, ৪খ., ২৫৯-২৬০)।
ইব্ن ইসহাক বলেন, হাদাছ গোত্রীয় জনৈক মহিলা জ্যোতিষী রাসূলুল্লাহ (স)-এর বাহিনীর আগমন সংবাদ শুনিয়া তাহার স্বগোত্র হাদাছ ও উহার শাখাগোত্র বানু গামের লোকজনকে সতর্ক করিয়া দিয়া বলে:
أَنْذِرُكُمْ قَوْمًا خَزْرا يَنْظُرُونَ شَدْرًا وَيَقُودُونَ الْخَيْلَ تَتْرَى وَيُهْرِيقُوْنَ دَمَّا عَكْرًا.
"আমি তোমাদিগকে এমন এক জাতি সম্পর্কে সতর্ক করিতেছি যাহারা সদন্তে তাকায় এবং ক্রুদ্ধ দৃষ্টিতে সারি সারি অশ্ব হাঁকাইয়া চলে, তাহারা রক্তপাত ঘটায় বিভিন্নভাবে”।
তাহার গোত্র এই কথা গ্রহণ করিয়া সতর্ক হয়। তাহারা বানূ লাখম গোত্রের সংশ্রব হইতে সরিয়া দাঁড়ায়। ফলে হাদাছ গোত্রের মধ্যে বানু গানন্ম সর্বাধিক সমৃদ্ধিশালী হইয়া উঠে। অপরদিকে হাদাছ গোত্রের যাহারা যুদ্ধে ইন্ধন যোগাইয়াছিল তাহারা হইল বানু ছা'লাবা। ইহারা বেশী দিন তাহাদিগের অস্তিত্ব রক্ষা করিতে সক্ষম হয় নাই। ক্রমান্বয়ে ইহাদিগের জনবল হ্রাস পাইতে থাকে। যাহা হউক, খালিদ (রা) যখন লোকদিগকে লইয়া প্রত্যাবর্তন করিধার ইচ্ছা করেন তখন তিনি কাফেলাসহ প্রত্যাবর্তন করিলেন (ইবন হিশام, আস-সীরাতুন নাবابিয়্যা, ৩খ, ২৬৫, ২৬৬)।
মৃতা-র শহীদগণ সম্পর্কে রাসূলুল্লাহ (স)-এর স্বপ্ন: ইবন সা'দ তদীয় সূত্রে এই সম্পর্কে নিম্নোক্ত হাদীছ বর্ণনা করিয়াছেন:
وَقَالَ فَأَتَيْتُ رَسُولَ اللهِ ﷺ فَأَخْبَرْتُهُ فَشَقٌ ذَلِكَ عَلَيْهِ فَصَلَّى الظُّهْرَ قَامَ فَرَكَعَ رَكْعَتَيْنِ ثُمَّ أَقْبَلَ بِوَجْهِهِ عَلَى الْقَوْمِ فَشَقَّ ذَلِكَ عَلَى النَّاسُ ثُمَّ صَلَّى الْعَصْرَ فَفَعَلَ مِثْلَ ذلكَ ثُمَّ صَلَّى الْمَغْرِبَ فَفَعَلَ مِثْلَ ذلِكَ ثُمَّ صَلَّى العَتَمَةَ فَفَعَلَ مِثْلَ ذَلِكَ حَتَّى إِذَا كَانَ صَلَاةُ الصَّبْحِ دَخَلَ الْمَسْجِدَ ثُمَّ تَبَسَّمَ وَكَانَ تِلْكَ السَّاعَهُ لَا يَقُومُ إِلَيْهِ إِنَّاسَ مِّنْ نَاحِيَةِ الْمَسْجِدِ حَتَّى يُصَلَّى الْغَدَاةَ فَقَالَ لَهُ الْقَوْمُ حِينَ تَبَسَّمَ يَا نَبِيُّ اللَّهِ بِأَنْفُسِنَا أَنْتَ مَا يَعْلَمُ الا اللهُ مَا كَانَ بِنَا مِنَ الْوُجد مُنْذُ رَأَيْنَا مِنْكَ الَّذى رَأَيْنَا قَالَ رَسُولُ اللهِ ﷺ كَانَ الَّذِي رَأَيْتُمْ مِنِّي أَنَّهُ أَحْزَنَنِي قَتْلَ أَصْحَابِي حَتَّى رَأَيْتُهُمْ فِي الْجَنَّةِ اخْوَانًا عَلَى سُرُرٍ مُتَقَابِلِينَ وَرَأَيْتُ فِي بَعْضِهِمْ إِعْرَاضًا كَأَنَّهُ كَرِهَ السَّيْفَ وَرَأَيْتُ جَعْفَرًا مَلَكًا ذَا جَنَاحَيْنِ مُضَرَّجًا بِالدِّمَاءِ مَصْبُونَ الْقَوَادِمِ.
"বর্ণনাকারী বলেন, ইহার পর আমি রাসূলুল্লাহ (স)-এর নিকট আসিয়া তাহাকে মুসলিম বাহিনীর বিপর্যয় সম্পর্কে অবহিত করিলাম। তিনি তাহা শুনিয়া এতই মর্মাহত হইলেন যে, যুহরের সালাত আদায় করিয়াই গৃহে প্রবেশ করিলেন। অথচ তাঁহার অভ্যাস ছিল, যুহরের সালাত আদায় করিবার পর দাঁড়াইয়া দুই রাক'আত সুন্নাত আদায় করিতেন, অতঃপর লোকদিগের দিকে মুখ করিয়া বসিতেন। রাসূলুল্লাহ (স)-এর মর্মবেদনা দেখিয়া লোকজনও আতংকিত হইল। ইহার পর আসরের সালাত আদায় করিয়া রাসূলুল্লাহ (স) পূর্বের মত আচরণ করিলেন। তিনি মাগরিব ও 'ইশার সালাতের পরও তাহাই করিলেন। ফজরের সালাতের সময় হইলে রাসূলুল্লাহ (স) মসজিদে প্রবেশ করিয়া মুচকি হাসিলেন। এই সময় কোন লোক মসজিদের কোন প্রান্ত হইতে তাঁহার নিকট আসিত না, যতক্ষণ পর্যন্ত তিনি ফজরের সালাত আদায় না করিতেন। তাঁহার মুচকি হাসি দেখিয়া লোকজন বলিল, হে আল্লাহ্ নবী! আমাদের প্রাণ আপনার জন্য উৎসর্গিত হউক! আপনার এই অবস্থা দেখিবার পর আমাদের যেই হতাশাব্যঞ্জক অবস্থা হইয়াছিল তাহা একমাত্র আল্লাহ ব্যতীত আর কেহ জানে না। রাসূলুল্লাহ (স) বলিলেন: তোমরা আমাকে এই অবস্থায় দেখিয়াছ এই কারণে যে, আমার সাহাবীদিগের নিহত হওয়ায় আমি বিষণ্ণ হইয়াছিলাম। এমতাবস্থায় আমি স্বপ্নে দেখিলাম, তাহারা জান্নাতে ভাই ভাই হিসাবে সামনা সামনি আসনে উপবিষ্ট। তাহাদের কোন একজনের আসন কিছুটা বক্র দেখিলাম যেন সে তরবারি গ্রহণে দ্বিধাগ্রস্ত ছিল। আমি জা'ফারকে দেখিলাম দুইটি বাহুবিশিষ্ট ফেরেশতারূপে রক্তে রঞ্জিত পদযুগলসহ” (আত-তাবাকাতুল কুবরা, ২খ., ১২৯-১৩০)।
এই রিওয়ায়াত ইবন সা'দ নিজস্ব সনদে বর্ণনা করিয়াছেন। ইহার গ্রহণযোগ্যতা সম্পর্কে তিনি কোন কথা বলেন নাই। তবে ইহাতে প্রসিদ্ধ বর্ণনাসমূহ হইতে কিছুটা বৈপরীত্য পরিলক্ষিত হয়। যেমন বুখারীসহ বিখ্যাত হাদীছ গ্রন্থরাজিতে রহিয়াছে, সর্বপ্রথম অস্ত্রধারণ করিয়া যায়দ ইব্ن হারিছা (রা) শহীদ হইয়াছিলেন। কিন্তু উক্ত রিওয়ায়াতে দেখা যায়, জা'ফার ইবন আবী তালিব (রা) সর্বপ্রথম অস্ত্রধারণ করিয়া শাহাদাত লাভ করিয়াছিলেন। রিওয়ায়াতটি দ্বারা স্পষ্টভাবে প্রতীয়মান হয় যে, খালিদ ইবনুল ওয়ালীদ (রা) নেতৃত্ব গ্রহণ করিবার পর মুসলিম বাহিনী বিজয় লাভ করিয়াছিল। যাহা বুখারীর রিওয়ায়াত-
ثُمَّ أَخَذَ الرَّايَةَ سَيْفٌ مِنْ سُيُوفِ اللَّهِ فَفَتَحَ اللَّه عَلَيْهِ.
এর পক্ষে জোরালো সমর্থন ব্যক্ত করে। এই বর্ণনাটি ছাড়াও শুধু রাসূলুল্লাহ (স) কর্তৃক মনোনীত পর্যায়ক্রমে তিনজন সেনাপতির জান্নাতে উচ্চাসন লাভ সম্পর্কিত নিম্নোক্ত বর্ণনাটিও এখানে দেওয়া হইল। ইহাও রাসূলুল্লাহ (স)-এর স্বপ্ন ছিল।
হাফিজ আবু ষুর'আর দালাইলুন নুবুওয়াত গ্রন্থে একটি হাদীছের শেষ অংশে আছে: ثُمَّ أَشْرَفًا بِي شَرَفًا فَإِذَا نَفُرُ ثَلَاثَةُ يَشْرَبُونَ مِنْ خَمْرٍ لَّهُمْ فَقُلْتُ مَنْ هَؤُلَاءِ قَالَا هذا جَعْفَرُ بْنُ أَبِي طَالِبٍ وَزَيْدُ بْنُ حَارِثَةَ وَعَبْدُ اللَّهِ بْنُ رَوَاحَةَ.
"তাহারা দুইজনে আমাকে একটি উচু স্থানে লইয়া গেল। আমি সেখানে তিন ব্যক্তিকে দেখিলাম, তাহারা শরাব পান করিতেছে। আমি জিজ্ঞাসা করিলাম, ইহারা কাহারা? তাহারা উত্তর দিল, ইহারা হইলেন জা'ফার ইব্ن আবূ তালিব, যায়দ ইবন হারিছা এবং 'আবদুল্লাহ ইব্ন রাওয়াহা (আল-বিদায়া ওয়ান-নিহায়া, ৪খ., ২৫৯-২৬০)।
ইব্ন ইসহাক বলেন, হাদাছ গোত্রীয় জনৈক মহিলা জ্যোতিষী রাসূলুল্লাহ (স)-এর বাহিনীর আগমন সংবাদ শুনিয়া তাহার স্বগোত্র হাদাছ ও উহার শাখাগোত্র বানু গামের লোকজনকে সতর্ক করিয়া দিয়া বলে:
أَنْذِرُكُمْ قَوْمًا خَزْرا يَنْظُرُونَ شَدْرًا وَيَقُودُونَ الْخَيْلَ تَتْرَى وَيُهْرِيقُوْنَ دَمَّا عَكْرًا.
"আমি তোমাদিগকে এমন এক জাতি সম্পর্কে সতর্ক করিতেছি যাহারা সদন্তে তাকায় এবং ক্রুদ্ধ দৃষ্টিতে সারি সারি অশ্ব হাঁকাইয়া চলে, তাহারা রক্তপাত ঘটায় বিভিন্নভাবে”।
তাহার গোত্র এই কথা গ্রহণ করিয়া সতর্ক হয়। তাহারা বানূ লাখম গোত্রের সংশ্রব হইতে সরিয়া দাঁড়ায়। ফলে হাদাছ গোত্রের মধ্যে বানু গানন্ম সর্বাধিক সমৃদ্ধিশালী হইয়া উঠে। অপরদিকে হাদাছ গোত্রের যাহারা যুদ্ধে ইন্ধন যোগাইয়াছিল তাহারা হইল বানু ছা'লাবা। ইহারা বেশী দিন তাহাদিগের অস্তিত্ব রক্ষা করিতে সক্ষম হয় নাই। ক্রমান্বয়ে ইহাদিগের জনবল হ্রাস পাইতে থাকে। যাহা হউক, খালিদ (রা) যখন লোকদিগকে লইয়া প্রত্যাবর্তন করিধার ইচ্ছা করেন তখন তিনি কাফেলাসহ প্রত্যাবর্তন করিলেন (ইবন হিশাম, আস-সীরাতুন নাবabিয়্যা, ৩খ, ২৬৫, ২৬৬)।
মৃতা-র শহীদগণ সম্পর্কে রাসূলুল্লাহ (স)-এর স্বপ্ন: ইবন সা'দ তদীয় সূত্রে এই সম্পর্কে নিম্নোক্ত হাদীছ বর্ণনা করিয়াছেন:
وَقَالَ فَأَتَيْتُ رَسُولَ اللهِ ﷺ فَأَخْبَرْتُهُ فَشَقٌ ذَلِكَ عَلَيْهِ فَصَلَّى الظُّهْرَ قَامَ فَرَكَعَ رَكْعَتَيْنِ ثُمَّ أَقْبَلَ بِوَجْهِهِ عَلَى الْقَوْمِ فَشَقَّ ذَلِكَ عَلَى النَّاسُ ثُمَّ صَلَّى الْعَصْرَ فَفَعَلَ مِثْلَ ذلكَ ثُمَّ صَلَّى الْمَغْرِبَ فَفَعَلَ مِثْلَ ذلِكَ ثُمَّ صَلَّى العَتَمَةَ فَفَعَلَ مِثْلَ ذَلِكَ حَتَّى إِذَا كَانَ صَلَاةُ الصَّبْحِ دَخَلَ الْمَسْجِدَ ثُمَّ تَبَسَّمَ وَكَانَ تِلْكَ السَّاعَهُ لَا يَقُومُ إِلَيْهِ إِنَّاسَ مِّنْ نَاحِيَةِ الْمَسْجِدِ حَتَّى يُصَلَّى الْغَدَاةَ فَقَالَ لَهُ الْقَوْمُ حِينَ تَبَسَّمَ يَا نَبِيُّ اللَّهِ بِأَنْفُسِنَا أَنْتَ مَا يَعْلَمُ الا اللهُ مَا كَانَ بِنَا مِنَ الْوُجد مُنْذُ رَأَيْنَا مِنْكَ الَّذى رَأَيْنَا قَالَ رَسُولُ اللهِ ﷺ كَانَ الَّذِي رَأَيْتُمْ مِنِّي أَنَّهُ أَحْزَنَنِي قَتْلَ أَصْحَابِي حَتَّى رَأَيْتُهُمْ فِي الْجَنَّةِ اخْوَانًا عَلَى سُرُرٍ مُتَقَابِلِينَ وَرَأَيْتُ فِي بَعْضِهِمْ إِعْرَاضًا كَأَنَّهُ كَرِهَ السَّيْفَ وَرَأَيْتُ جَعْفَرًا مَلَكًا ذَا جَنَاحَيْنِ مُضَرَّجًا بِالدِّمَاءِ مَصْبُونَ الْقَوَادِمِ.
"বর্ণনাকারী বলেন, ইহার পর আমি রাসূলুল্লাহ (স)-এর নিকট আসিয়া তাহাকে মুসলিম বাহিনীর বিপর্যয় সম্পর্কে অবহিত করিলাম। তিনি তাহা শুনিয়া এতই মর্মাহত হইলেন যে, যুহরের সালাত আদায় করিয়াই গৃহে প্রবেশ করিলেন। অথচ তাঁহার অভ্যাস ছিল, যুহরের সালাত আদায় করিবার পর দাঁড়াইয়া দুই রাক'আত সুন্নাত আদায় করিতেন, অতঃপর লোকদিগের দিকে মুখ করিয়া বসিতেন। রাসূলুল্লাহ (স)-এর মর্মবেদনা দেখিয়া লোকজনও আতংকিত হইল। ইহার পর আসরের সালাত আদায় করিয়া রাসূলুল্লাহ (স) পূর্বের মত আচরণ করিলেন। তিনি মাগরিব ও 'ইশার সালাতের পরও তাহাই করিলেন। ফজরের সালাতের সময় হইলে রাসূলুল্লাহ (স) মসজিদে প্রবেশ করিয়া মুচকি হাসিলেন। এই সময় কোন লোক মসজিদের কোন প্রান্ত হইতে তাঁহার নিকট আসিত না, যতক্ষণ পর্যন্ত তিনি ফজরের সালাত আদায় না করিতেন। তাঁহার মুচকি হাসি দেখিয়া লোকজন বলিল, হে আল্লাহ্ নবী! আমাদের প্রাণ আপনার জন্য উৎসর্গিত হউক! আপনার এই অবস্থা দেখিবার পর আমাদের যেই হতাশাব্যঞ্জক অবস্থা হইয়াছিল তাহা একমাত্র আল্লাহ ব্যতীত আর কেহ জানে না। রাসূলুল্লাহ (স) বলিলেন: তোমরা আমাকে এই অবস্থায় দেখিয়াছ এই কারণে যে, আমার সাহাবীদিগের নিহত হওয়ায় আমি বিষণ্ণ হইয়াছিলাম। এমতাবস্থায় আমি স্বপ্নে দেখিলাম, তাহারা জান্নাতে ভাই ভাই হিসাবে সামনা সামনি আসনে উপবিষ্ট। তাহাদের কোন একজনের আসন কিছুটা বক্র দেখিলাম যেন সে তরবারি গ্রহণে দ্বিধাগ্রস্ত ছিল। আমি জা'ফারকে দেখিলাম দুইটি বাহুবিশিষ্ট ফেরেশতারূপে রক্তে রঞ্জিত পদযুগলসহ” (আত-তাবাকাতুল কুবরা, ২খ., ১২৯-১৩০)।
এই রিওয়ায়াত ইবন সা'দ নিজস্ব সনদে বর্ণনা করিয়াছেন। ইহার গ্রহণযোগ্যতা সম্পর্কে তিনি কোন কথা বলেন নাই। তবে ইহাতে প্রসিদ্ধ বর্ণনাসমূহ হইতে কিছুটা বৈপরীত্য পরিলক্ষিত হয়। যেমন বুখারীসহ বিখ্যাত হাদীছ গ্রন্থরাজিতে রহিয়াছে, সর্বপ্রথম অস্ত্রধারণ করিয়া যায়দ ইব্ন হারিছা (রা) শহীদ হইয়াছিলেন। কিন্তু উক্ত রিওয়ায়াতে দেখা যায়, জা'ফার ইবন আবী তালিব (রা) সর্বপ্রথম অস্ত্রধারণ করিয়া শাহাদাত লাভ করিয়াছিলেন। রিওয়ায়াতটি দ্বারা স্পষ্টভাবে প্রতীয়মান হয় যে, খালিদ ইবনুল ওয়ালীদ (রা) নেতৃত্ব গ্রহণ করিবার পর মুসলিম বাহিনী বিজয় লাভ করিয়াছিল। যাহা বুখারীর রিওয়ায়াত-
ثُمَّ أَخَذَ الرَّايَةَ سَيْفٌ مِنْ سُيُوفِ اللَّهِ فَفَتَحَ اللَّه عَلَيْهِ.
এর পক্ষে জোরালো সমর্থন ব্যক্ত করে। এই বর্ণনাটি ছাড়াও শুধু রাসূলুল্লাহ (স) কর্তৃক মনোনীত পর্যায়ক্রমে তিনজন সেনাপতির জান্নাতে উচ্চাসন লাভ সম্পর্কিত নিম্নোক্ত বর্ণনাটিও এখানে দেওয়া হইল। ইহাও রাসূলুল্লাহ (স)-এর স্বপ্ন ছিল।
হাফিজ আবু ষুর'আর দালাইলুন নুবুওয়াত গ্রন্থে একটি হাদীছের শেষ অংশে আছে: ثُمَّ أَشْرَفًا بِي شَرَفًا فَإِذَا نَفُرُ ثَلَاثَةُ يَشْرَبُونَ مِنْ خَمْرٍ لَّهُمْ فَقُلْتُ مَنْ هَؤُلَاءِ قَالَا هذا جَعْفَرُ بْنُ أَبِي طَالِبٍ وَزَيْدُ بْنُ حَارِثَةَ وَعَبْدُ اللَّهِ بْنُ رَوَاحَةَ.
"তাহারা দুইজনে আমাকে একটি উচু স্থানে লইয়া গেল। আমি সেখানে তিন ব্যক্তিকে দেখিলাম, তাহারা শরাব পান করিতেছে। আমি জিজ্ঞাসা করিলাম, ইহারা কাহারা? তাহারা উত্তর দিল, ইহারা হইলেন জা'ফার ইব্ন আবূ তালিব, যায়দ ইবন হারিছা এবং 'আবদুল্লাহ ইব্ন রাওয়াহা (আল-বিদায়া ওয়ান-নিহায়া, ৪খ., ২৫৯-২৬০)।