📘 সীরাত বিশ্বকোষ > 📄 খায়বারের শহীদগণ

📄 খায়বারের শহীদগণ


ইবন ইসহাকের মতে কুরায়শ, বানু উমাইয়্যা, ইব্‌ন আব্দ শাম্স ও তাহাদের মিত্রদের মধ্য হইতে রাবী'আ ইব্‌ন আকছাম, ইব্‌ন সাখবারা, ছাকীফ ইব্‌ন আমর ও রিফা'আ ইন্ন মাসরূহ; বানু আসাদ ইব্‌ন আবদুল উযযা হইতে আবদুল্লাহ ইবনুল-হুবায়ব, ইব্‌ন হিশাম বলেন, ইন্ন উহায়ব ইন্ন সুহায়ম ইব্‌ন গায়বা, বানু সা'দ ইব্‌ন লায়ছ গোত্রের লোক, বানু আসাদ গোত্রের মিত্র এবং তাহাদের ভাগিনা। আনসার গোত্রের বানূ সালামা হইতে : বিশ্ব ইবনুল বারাআ ইন্ন মা'রূর। রাসূলুল্লাহ (স)-কে প্রদত্ত বিষযুক্ত বকরীর গোশত ভক্ষণ করিয়া তিনি ইন্তিকাল করিয়াছিলেন এবং ফুদায়ল ইব্‌ নু'মান।
বানু যুরায়ক হইতে মাস'উদ ইবন সা'দ ইব্‌ন কায়স ইন্ন খালদা ইব্‌ন আমির ইন্ন যুরায়ক। আওস গোত্রের বানু আবদিল আশহাল হইতে মাহমূদ ইবন মাসলামা ইন্ন খালিদ ইব্‌ন আদী। বানু আমর ইব্‌ন আওফ হইতে আবূ সিয়াহ ইব্‌ন ছাবিত ইবনুন নুমান ইব্‌ উমায়্যা, আল-হারিছ ইবন হাতিব, উরওয়া ইন্ন মুররা ইব্‌ন সুরাকা, আওস ইবনুল কাইদ, আনীফ ইব্‌ন হাবীব, ছাবিত ইব্‌ন আছিলা ও তালহা ইব্‌ন ইয়াহয়া ইন্ন সুলায়ল ইন্ন দামরা।
বানূ গিফার হইতে উমরা ইন্ন উকবা; তাঁহাকে তীর নিক্ষেপে শহীদ করা হয়। আসলাম গোত্র হইতে 'আমের ইবনুল আকওয়া' ও আল-আসওয়াদ আর-রাঈ; তাহার নাম ছিল আসলাম। ইব্‌ন হিশামের মতে আসওয়াদ রাঈ খায়বারের অধিবাসী ছিলেন। ইন্ন শিহাব যুহরী খায়বারের আরও যেই সকল শহীদের নাম উল্লেখ করিয়াছেন তাঁহাদের মধ্যে রহিয়াছেন বানু যুহরা হইতে মাসউদ ইবন রাবীআ; তিনি প্রকৃতপক্ষে আল-কারা গোত্রের মিত্র ছিলেন। আনসারদের বানূ আমর ইব্‌ন আওফ গোত্র হইতে আওস ইন্ন কাতাদা (ইব্‌ন হিশাম, আস-সীরাতুন নাবাবিয়্যা, ৩খ., পৃ. ২৩৭-২৩৮)।

ইবন ইসহাকের মতে কুরায়শ, বানু উমাইয়্যা, ইব্‌ন আব্দ শাম্স ও তাহাদের মিত্রদের মধ্য হইতে রাবী'আ ইব্‌ন আকছাম, ইব্‌ন সাখবারা, ছাকীফ ইব্‌ন আমর ও রিফা'আ ইন্ন মাসরূহ; বানু আসাদ ইব্‌ন আবদুল উযযা হইতে আবদুল্লাহ ইবনুল-হুবায়ব, ইব্‌ন হিশাম বলেন, ইন্ন উহায়ব ইন্ন সুহায়ম ইব্‌ন গায়বা, বানু সা'দ ইব্‌ন লায়ছ গোত্রের লোক, বানু আসাদ গোত্রের মিত্র এবং তাহাদের ভাগিনা। আনসার গোত্রের বানূ সালামা হইতে : বিশ্ব ইবনুল বারাআ ইন্ন মা'রূর। রাসূলুল্লাহ (স)-কে প্রদত্ত বিষযুক্ত বকরীর গোশত ভক্ষণ করিয়া তিনি ইন্তিকাল করিয়াছিলেন এবং ফুদায়ল ইব্‌ নু'মান।
বানু যুরায়ক হইতে মাস'উদ ইবন সা'দ ইব্‌ন কায়স ইন্ন খালদা ইব্‌ন আমির ইন্ন যুরায়ক। আওস গোত্রের বানু আবদিল আশহাল হইতে মাহমূদ ইবন মাসলামা ইন্ন খালিদ ইব্‌ন আদী। বানু আমর ইব্‌ন আওফ হইতে আবূ সিয়াহ ইব্‌ন ছাবিত ইবনুন নুমান ইব্‌ উমায়্যা, আল-হারিছ ইবন হাতিব, উরওয়া ইন্ন মুররা ইব্‌ন সুরাকা, আওস ইবনুল কাইদ, আনীফ ইব্‌ন হাবীব, ছাবিত ইব্‌ন আছিলা ও তালহা ইব্‌ন ইয়াহয়া ইন্ন সুলায়ল ইন্ন দামরা।
বানূ গিফার হইতে উমরা ইন্ন উকবা; তাঁহাকে তীর নিক্ষেপে শহীদ করা হয়। আসলাম গোত্র হইতে 'আমের ইবনুল আকওয়া' ও আল-আসওয়াদ আর-রাঈ; তাহার নাম ছিল আসলাম। ইব্‌ন হিশামের মতে আসওয়াদ রাঈ খায়বারের অধিবাসী ছিলেন। ইন্ন শিহাব যুহরী খায়বারের আরও যেই সকল শহীদের নাম উল্লেখ করিয়াছেন তাঁহাদের মধ্যে রহিয়াছেন বানু যুহরা হইতে মাসউদ ইবন রাবীআ; তিনি প্রকৃতপক্ষে আল-কারা গোত্রের মিত্র ছিলেন। আনসারদের বানূ আমর ইব্‌ন আওফ গোত্র হইতে আওস ইন্ন কাতাদা (ইব্‌ন হিশাম, আস-সীরাতুন নাবাবিয়্যা, ৩খ., পৃ. ২৩৭-২৩৮)।

ইবন ইসহাকের মতে কুরায়শ, বানু উমাইয়্যা, ইব্‌ন আব্দ শাম্স ও তাহাদের মিত্রদের মধ্য হইতে রাবী'আ ইব্‌ন আকছাম, ইব্‌ন সাখবারা, ছাকীফ ইব্‌ন আমর ও রিফা'আ ইন্ন মাসরূহ; বানু আসাদ ইব্‌ন আবদুল উযযা হইতে আবদুল্লাহ ইবনুল-হুবায়ব, ইব্‌ন হিশাম বলেন, ইন্ন উহায়ব ইন্ন সুহায়ম ইব্‌ন গায়বা, বানু সা'দ ইব্‌ন লায়ছ গোত্রের লোক, বানু আসাদ গোত্রের মিত্র এবং তাহাদের ভাগিনা। আনসার গোত্রের বানূ সালামা হইতে : বিশ্ব ইবনুল বারাআ ইন্ন মা'রূর। রাসূলুল্লাহ (স)-কে প্রদত্ত বিষযুক্ত বকরীর গোশত ভক্ষণ করিয়া তিনি ইন্তিকাল করিয়াছিলেন এবং ফুদায়ল ইব্‌ নু'মান।
বানু যুরায়ক হইতে মাস'উদ ইবন সা'দ ইব্‌ন কায়স ইন্ন খালদা ইব্‌ন আমির ইন্ন যুরায়ক। আওস গোত্রের বানু আবদিল আশহাল হইতে মাহমূদ ইবন মাসলামা ইন্ন খালিদ ইব্‌ন আদী। বানু আমর ইব্‌ন আওফ হইতে আবূ সিয়াহ ইব্‌ন ছাবিত ইবনুন নুমান ইব্‌ উমায়্যা, আল-হারিছ ইবন হাতিব, উরওয়া ইন্ন মুররা ইব্‌ন সুরাকা, আওস ইবনুল কাইদ, আনীফ ইব্‌ন হাবীব, ছাবিত ইব্‌ন আছিলা ও তালহা ইব্‌ন ইয়াহয়া ইন্ন সুলায়ল ইন্ন দামরা।
বানূ গিফার হইতে উমরা ইন্ন উকবা; তাঁহাকে তীর নিক্ষেপে শহীদ করা হয়। আসলাম গোত্র হইতে 'আমের ইবনুল আকওয়া' ও আল-আসওয়াদ আর-রাঈ; তাহার নাম ছিল আসলাম। ইব্‌ন হিশামের মতে আসওয়াদ রাঈ খায়বারের অধিবাসী ছিলেন। ইন্ন শিহাব যুহরী খায়বারের আরও যেই সকল শহীদের নাম উল্লেখ করিয়াছেন তাঁহাদের মধ্যে রহিয়াছেন বানু যুহরা হইতে মাসউদ ইবন রাবীআ; তিনি প্রকৃতপক্ষে আল-কারা গোত্রের মিত্র ছিলেন। আনসারদের বানূ আমর ইব্‌ন আওফ গোত্র হইতে আওস ইন্ন কাতাদা (ইব্‌ন হিশাম, আস-সীরাতুন নাবabিয়্যা, ৩খ., ২৩৭-২৩৮)।

ইবন ইসহাকের মতে কুরায়শ, বানু উমাইয়্যা, ইব্‌ন আব্দ শাম্স ও তাহাদের মিত্রদের মধ্য হইতে রাবী'আ ইব্‌ن আকছাম, ইব্‌ন সাখবারা, ছাকীফ ইব্‌ن আমর ও রিফা'আ ইন্ন মাসরূহ; বানু আসাদ ইব্‌ن ابدل উযযা হইতে আবদুল্লাহ ইবনুল-হুবায়ب, ইب্‌ن হিশাম বলেন, ইন্ন উহায়ب ইন্ন সুহায়م ইب্‌ن গায়বা, বানু সা'দ ইব্‌ن লায়ছ গোত্রের লোক, বানু আসাদ গোত্রের মিত্র এবং তাহাদের ভাগিনা। আনসার গোত্রের বানূ সালামা হইতে : বিশ্ব ইবনুল بারাআ ইন্ন মা'রূর। রাসূলুল্লাহ (س)-কে প্রদত্ত বিষযুক্ত بকরীর গোশত ভক্ষণ করিয়া তিনি ইন্তিকাল করিয়াছিলেন এবং ফুদায়ل ইব্‌ন নু'মান।
বানু যুরায়ক হইতে মাস'উদ ইবন সা'দ ইব্‌ن কায়س ইন্ন খালদা ইب্‌ن আমির ইন্ন যুরায়ক। আওস গোত্রের বানু ابدل আশহাল হইতে মাহমূদ ইবন মাসলামা ইন্ন খালিদ ইব্‌ن আদী। বানু আমর ইب্‌ن আওف হইতে আবূ সিয়াহ ইب্‌ن ছাবিত ইবনুন নুমান ইব্‌ن উমায়্যা, আল-হারিছ ইব্‌ن হাতিম, উরওয়া ইন্ন মুররা ইব্‌ن সুরাকা, আওس ইবনুল কাইদ, আনীف ইب্‌ن হাবীব, ছابিত ইব্‌ن আছিলা ও তালহা ইব্‌ن ইয়াহয়া ইন্ন সুলায়ل ইب্‌ن দামরা।
বানূ গিফার হইতে উমরা ইন্ন উকবা; তাঁহাকে তীর নিক্ষেপে শহীদ করা হয়। আসলাম গোত্র হইতে 'আমের ইবনুল আকওয়া' ও আল-আসওয়াদ আর-রাঈ; তাহার নাম ছিল আসলাম। ইব্‌ন হিশামের মতে আসওয়াদ راঈ খায়বারের অধিবাসী ছিলেন। ইন্ন শিহাব যুহরী খায়বারের আরও যেই সকল শহীদের নাম উল্লেখ করিয়াছেন তাঁহাদের মধ্যে রহিয়াছেন বানু যুহরা হইতে মাসউদ ইবন রাবীআ; তিনি প্রকৃতপক্ষে আল-কারা গোত্রের মিত্র ছিলেন। আনসারদের বানূ আমর ইব্‌ن আওف গোত্র হইতে আওس ইন্ন কাতাদা (ইব্‌ن হিশাম, আস-সীরাতুন নাবabিয়্যা, ৩খ., ২৩৭-২৩৮)।

ইবন ইসহাকের মতে কুরায়শ, বানু উমাইয়্যা, ইব্‌ন আব্দ শাম্স ও তাহাদের মিত্রদের মধ্য হইতে রাবী'আ ইব্‌ন আকছাম, ইব্‌ন সাখবারা, ছাকীফ ইব্‌ন আমর ও রিফা'আ ইন্ন মাসরূহ; বানু আসাদ ইব্‌ন আবদুল উযযা হইতে আবদুল্লাহ ইবনুল-হুবায়ব, ইব্‌ন হিশাম বলেন, ইন্ন উহায়ব ইন্ন সুহায়ম ইব্‌ন গায়বা, বানু সা'দ ইব্‌ন লায়ছ গোত্রের লোক, বানু আসাদ গোত্রের মিত্র এবং তাহাদের ভাগিনা। আনসার গোত্রের বানূ সালামা হইতে : বিশ্ব ইবনুল বারাআ ইন্ন মা'রূর। রাসূলুল্লাহ (স)-কে প্রদত্ত বিষযুক্ত বকরীর গোশত ভক্ষণ করিয়া তিনি ইন্তিকাল করিয়াছিলেন এবং ফুদায়ল ইব্‌ নু'মান।
বানু যুরায়ক হইতে মাস'উদ ইবন সা'দ ইব্‌ন কায়স ইন্ন খালদা ইব্‌ন আমির ইন্ন যুরায়ক। আওস গোত্রের বানু আবদিল আশহাল হইতে মাহমূদ ইবন মাসলামা ইন্ন খালিদ ইব্‌ন আদী। বানু আমর ইব্‌ন আওফ হইতে আবূ সিয়াহ ইব্‌ন ছাবিত ইবনুন নুমান ইব্‌ উমায়্যা, আল-হারিছ ইবন হাতিব, উরওয়া ইন্ন মুররা ইব্‌ন সুরাকা, আওস ইবনুল কাইদ, আনীফ ইব্‌ন হাবীব, ছাবিত ইব্‌ন আছিলা ও তালহা ইব্‌ন ইয়াহয়া ইন্ন সুলায়ল ইন্ন দামরা।
বানূ গিফার হইতে উমরা ইন্ন উকবা; তাঁহাকে তীর নিক্ষেপে শহীদ করা হয়। আসলাম গোত্র হইতে 'আমের ইবনুল আকওয়া' ও আল-আসওয়াদ আর-রাঈ; তাহার নাম ছিল আসলাম। ইব্‌ন হিশামের মতে আসওয়াদ রাঈ খায়বারের অধিবাসী ছিলেন। ইন্ন শিহাব যুহরী খায়বারের আরও যেই সকল শহীদের নাম উল্লেখ করিয়াছেন তাঁহাদের মধ্যে রহিয়াছেন বানু যুহরা হইতে মাসউদ ইবন রাবীআ; তিনি প্রকৃতপক্ষে আল-কারা গোত্রের মিত্র ছিলেন। আনসারদের বানূ আমর ইব্‌ন আওফ গোত্র হইতে আওস ইন্ন কাতাদা (ইব্‌ন হিশাম, আস-সীরাতুন নাবabিয়্যা, ৩খ., পৃ. ২৩৭-২৩৮)।

📘 সীরাত বিশ্বকোষ > 📄 খায়বার হইতে প্রত্যাবর্তন ও লায়লাতুত তা'রীস

📄 খায়বার হইতে প্রত্যাবর্তন ও লায়লাতুত তা'রীস


খায়বার হইতে প্রত্যাবর্তন করিবার পথে রাসূলুল্লাহ (স) ওয়াদিল কুরায় চার দিন অবস্থান করেন, অতঃপর মদীনার উদ্দেশে রওয়ানা হইলেন। পথিমধ্যে শেষ রাত্রিতে এক স্থানে তিনি যাত্রাবিরতি করিলেন এবং বিলাল (রা)-কে বলিলেন, হে বিলাল! তুমি আমাদিগকে জাগ্রত করিবে। বিলাল (রা) একটি বাহনের হাওদায় হেলান দিয়া ঘুমাইয়া পড়িলেন। তিনি রাসূলুল্লাহ (স)-কে জাগ্রত করিতে পারেন নাই। তিনি স্বয়ং জাগ্রত ছিলেন না। অন্য কোন সাহাবীও জাগ্রত হন নাই। এমন কি সূর্যোদয়ের পর পর্যন্ত তাঁহারা এইরূপ নিদ্রাচ্ছন্ন রহিলেন। সূর্যের উত্তাপে সর্বপ্রথম রাসূলুল্লাহ (স)-এর নিদ্রা ভঙ্গ হইল। রাসূলুল্লাহ (স) বিলাল (রা)-কে বলিলেন, হে বিলাল। তুমি ইহা কি করিলে? বিলাল (রা) বলিলেন, আমার পিতা-মাতা আপনার জন্য উৎসর্গিত হউক, হে আল্লাহ্র রাসুল! আপনাকে যেই জিনিস আচ্ছন্ন করিয়াছে, আমিও তাহাতে আচ্ছন্ন হইয়াছি। অতঃপর সকলে পদব্রজে ঐ উপত্যকা ত্যাগ করিলেন। রাসূলুল্লাহ্ (স) বলিলেন, "ইহা শয়তানের উপত্যকা"। এই স্থান অতিক্রম করিবার পর সকলে থামিয়া উযু করিলেন, অতঃপর ফজরের সুন্নাত আদায় করিলেন, অতঃপর রাসূলুল্লাহ্ (স) বিলাল (রা)-কে ইকামত দানের আদেশ দিলেন এবং সঙ্গী-সাথী সবাইকে লইয়া সালাত আদায় করিলেন। সালাতশেষে লোকদের প্রতি ফিরিয়া বলিলেন, হে লোকসকল! আল্লাহ আমাদের আত্মাসমূহ নিয়ন্ত্রণ করিয়াছিলেন। যদি তিনি চাহিতেন তাহা হইলে এই সময়ের পূর্বেই তাহা ফিরাইয়া দিতে পারিতেন।
فَإِذَا نَامَ أَحَدُكُمْ عَنِ الصَّلاةِ أَوْ نَسِيَهَا فَلْيُصَلَّهَا كَمَا كَانَ يُصَلِّيْهَا فِي وَقْتِهَا . "তোমাদের কোন ব্যক্তি যদি সালাতের সময় নিদ্রাচ্ছন্ন থাকে কিংবা সালাতের কথা ভুলিয়া যায় তাহা হইলে সে তেমনিভাবে এই সালাত আদায় করিবে যেমনটি সে সালাতের ওয়াক্তে স্বাভাবিকভাবে আদায় করিয়া থাকে।"
অতঃপর রাসূলুল্লাহ্ (স) আবু বাক্র (রা)-কে উদ্দেশ্য করিয়া বলিলেন: إِنَّ الشَّيْطَانَ أَتَى بِلاَلاً وَهُوَ قَائِمٌ يُصَلَّى فَأَضْجَعَهُ فَلَمْ يَزَلْ يُهْدِثُهُ كَمَا يُهْدَأُ الصَّبِيُّ حَتَّى نَامَ.
"বিলালের নিকট শয়তানের আগমন ঘটিয়াছিল। সে দাঁড়াইয়া সালাত আদায় করিতেছিল কিন্তু শয়তান তাহাকে শোয়াইয়া দিয়া শিশুকে যেইভাবে ঘুম পাড়ানো হয় সেইভাবে ঘুম পাড়াইয়াছিল। ইহার ফলে সে ঘুমাইয়া গিয়াছিল।"
তাহার পর বিলাল (রা)-কে ডাকিয়া তাহাকে অনুরূপ বলিলেন, যেমনটি আবূ বাক্র (রা)-কে বলিলেন। কোন কোন বর্ণনায় এই ঘটনাটি হুদায়বিয়া হইতে প্রত্যাবর্তনকালে সংঘটিত হইয়াছিল বলিয়া উল্লিখিত হইয়াছে। আবার কোন কোন বর্ণনায় তাবুক হইতে প্রত্যাবর্তনের সময় ঘটনাটি ঘটিয়াছিল বলিয়া উল্লেখ পাওয়া যায়।
ফজরের সালাত হইতে ঘুমাইয়া যাওয়া সংক্রান্ত হাদীছটি 'ইমরান ইবন হুসায়ন (রা) কর্তৃক বর্ণিত হইয়াছে। কিন্তু তিনি ইহা কোন সময় ও কোন যুদ্ধে সংঘটিত হইয়াছিল ইহার উল্লেখ করেন নাই। ইমাম মালিক (র) যায়দ ইব্‌ন আসলাম সূত্রে বর্ণনা করিয়াছেন যে, ঘটনাটি মক্কার পথে ঘটিয়াছিল। তবে এই রিওয়ায়াতটি মুরসাল।
আব্দুল্লাহ ইবন মাস'উদ (রা) বলেন, আমরা হুদায়বিয়ায় সন্ধিকালে রাসূলুল্লাহ (স)-এর সহিত আগমন করিতেছিলাম। এই সময় রাসূলুল্লাহ্ (স) বলিয়াছিলেন, "আমাদিগকে জাগ্রত করিবার দায়িত্ব কে নিবে? বিলাল (রা) বলেন, "আমি"। অতঃপর ঘটনাটি তিনি বিবৃত করিলেন: এই হাদীছের সনদে বিভিন্নতা (إضطراب) পরিলক্ষিত হয়। 'আবদুর রাহমান ইব্‌ন মাহদী শু'বা সূত্রে, তিনি জামে' ইব্‌ন শাদ্দাদ সূত্রে বর্ণনা করেন যে, ঐ রাত্রে পাহারাদার ছিলেন 'আবদুল্লাহ্ ইবন মাস'উদ (রা)। কিন্তু গুনদার শু'বা থেকে বর্ণনা করেন যে, পাহারাদার ছিলেন বিলাল (রা) (যাদুল মা'আদ, ২খ., পৃ. ১৪৬, ১৪৭; মাদারিজুন নুবুওয়াত, ২খ., পৃ. ৪৩১)।

খায়বার হইতে প্রত্যাবর্তন করিবার পথে রাসূলুল্লাহ (স) ওয়াদিল কুরায় চার দিন অবস্থান করেন, অতঃপর মদীনার উদ্দেশে রওয়ানা হইলেন। পথিমধ্যে শেষ রাত্রিতে এক স্থানে তিনি যাত্রাবিরতি করিলেন এবং বিলাল (রা)-কে বলিলেন, হে বিলাল! তুমি আমাদিগকে জাগ্রত করিবে। বিলাল (রা) একটি বাহনের হাওদায় হেলান দিয়া ঘুমাইয়া পড়িলেন। তিনি রাসূলুল্লাহ (স)-কে জাগ্রত করিতে পারেন নাই। তিনি স্বয়ং জাগ্রত ছিলেন না। অন্য কোন সাহাবীও জাগ্রত হন নাই। এমন কি সূর্যোদয়ের পর পর্যন্ত তাঁহারা এইরূপ নিদ্রাচ্ছন্ন রহিলেন। সূর্যের উত্তাপে সর্বপ্রথম রাসূলুল্লাহ (স)-এর নিদ্রা ভঙ্গ হইল। রাসূলুল্লাহ (স) বিলাল (রা)-কে বলিলেন, হে বিলাল। তুমি ইহা কি করিলে? বিলাল (রা) বলিলেন, আমার পিতা-মাতা আপনার জন্য উৎসর্গিত হউক, হে আল্লাহ্র রাসুল! আপনাকে যেই জিনিস আচ্ছন্ন করিয়াছে, আমিও তাহাতে আচ্ছন্ন হইয়াছি। অতঃপর সকলে পদব্রজে ঐ উপত্যকা ত্যাগ করিলেন। রাসূলুল্লাহ্ (স) বলিলেন, "ইহা শয়তানের উপত্যকা"। এই স্থান অতিক্রম করিবার পর সকলে থামিয়া উযু করিলেন, অতঃপর ফজরের সুন্নাত আদায় করিলেন, অতঃপর রাসূলুল্লাহ্ (স) বিলাল (রা)-কে ইকামত দানের আদেশ দিলেন এবং সঙ্গী-সাথী সবাইকে লইয়া সালাত আদায় করিলেন। সালাতশেষে লোকদের প্রতি ফিরিয়া বলিলেন, হে লোকসকল! আল্লাহ আমাদের আত্মাসমূহ নিয়ন্ত্রণ করিয়াছিলেন। যদি তিনি চাহিতেন তাহা হইলে এই সময়ের পূর্বেই তাহা ফিরাইয়া দিতে পারিতেন।
ফَإِذَا نَامَ أَحَدُكُمْ عَنِ الصَّلاةِ أَوْ نَسِيَهَا فَلْيُصَلَّهَا كَمَا كَانَ يُصَلِّيْهَا فِي وَقْتِهَا . "তোমাদের কোন ব্যক্তি যদি সালাতের সময় নিদ্রাচ্ছন্ন থাকে কিংবা সালাতের কথা ভুলিয়া যায় তাহা হইলে সে তেমনিভাবে এই সালাত আদায় করিবে যেমনটি সে সালাতের ওয়াক্তে স্বাভাবিকভাবে আদায় করিয়া থাকে।"
অতঃপর রাসূলুল্লাহ্ (স) আবু বাক্র (রা)-কে উদ্দেশ্য করিয়া বলিলেন: إِنَّ الشَّيْطَانَ أَتَى بِلاَلاً وَهُوَ قَائِمٌ يُصَلَّى فَأَضْجَعَهُ فَلَمْ يَزَلْ يُهْدِثُهُ كَمَا يُهْدَأُ الصَّبِيُّ حَتَّى نَامَ.
"বিলালের নিকট শয়তানের আগমন ঘটিয়াছিল। সে দাঁড়াইয়া সালাত আদায় করিতেছিল কিন্তু শয়তান তাহাকে শোয়াইয়া দিয়া শিশুকে যেইভাবে ঘুম পাড়ানো হয় সেইভাবে ঘুম পাড়াইয়াছিল। ইহার ফলে সে ঘুমাইয়া গিয়াছিল।"
তাহার পর বিলাল (রা)-কে ডাকিয়া তাহাকে অনুরূপ বলিলেন, যেমনটি আবূ বাক্র (রা)-কে বলিলেন। কোন কোন বর্ণনায় এই ঘটনাটি হুদায়বিয়া হইতে প্রত্যাবর্তনকালে সংঘটিত হইয়াছিল বলিয়া উল্লিখিত হইয়াছে। আবার কোন কোন বর্ণনায় তাবুক হইতে প্রত্যাবর্তনের সময় ঘটনাটি ঘটিয়াছিল বলিয়া উল্লেখ পাওয়া যায়।
ফজরের সালাত হইতে ঘুমাইয়া যাওয়া সংক্রান্ত হাদীছটি 'ইমরান ইবন হুসায়ন (রা) কর্তৃক বর্ণিত হইয়াছে। কিন্তু তিনি ইহা কোন সময় ও কোন যুদ্ধে সংঘটিত হইয়াছিল ইহার উল্লেখ করেন নাই। ইমাম মালিক (র) যায়দ ইব্‌ন আসলাম সূত্রে বর্ণনা করিয়াছেন যে, ঘটনাটি মক্কার পথে ঘটিয়াছিল। তবে এই রিওয়ায়াতটি মুরসাল।
আব্দুল্লাহ ইবন মাস'উদ (রা) বলেন, আমরা হুদায়বিয়ায় সন্ধিকালে রাসূলুল্লাহ (স)-এর সহিত আগমন করিতেছিলাম। এই সময় রাসূলুল্লাহ্ (স) বলিয়াছিলেন, "আমাদিগকে জাগ্রত করিবার দায়িত্ব কে নিবে? বিলাল (রা) বলেন, "আমি"। অতঃপর ঘটনাটি তিনি বিবৃত করিলেন: এই হাদীছের সনদে বিভিন্নতা (إضطراب) পরিলক্ষিত হয়। 'আবদুর রাহমান ইব্‌ن মাহদী শু'বা সূত্রে, তিনি জামে' ইব্‌ন শাদ্দাদ সূত্রে বর্ণনা করেন যে, ঐ রাত্রে পাহারাদার ছিলেন 'আবদুল্লাহ্ ইবন মাস'উদ (রা)। কিন্তু গুনদার শু'বা থেকে বর্ণনা করেন যে, পাহারাদার ছিলেন বিলাল (রা) (যাদুল মা'আদ, ২খ., পৃ. ১৪৬, ১৪৭; মাদারিজুন নুবুওয়াত, ২খ., পৃ. ৪৩১)।

খায়বার হইতে প্রত্যাবর্তন করিবার পথে রাসূলুল্লাহ (স) ওয়াদিল কুরায় চার দিন অবস্থান করেন, অতঃপর মদীনার উদ্দেশে রওয়ানা হইলেন। পথিমধ্যে শেষ রাত্রিতে এক স্থানে তিনি যাত্রাবিরতি করিলেন এবং বিলাল (রা)-কে বলিলেন, হে বিলাল! তুমি আমাদিগকে জাগ্রত করিবে। বিলাল (রা) একটি বাহনের হাওদায় হেলান দিয়া ঘুমাইয়া পড়িলেন। তিনি রাসূলুল্লাহ (স)-কে জাগ্রত করিতে পারেন নাই। তিনি স্বয়ং জাগ্রত ছিলেন না। অন্য কোন সাহাবীও জাগ্রত হন নাই। এমন কি সূর্যোদয়ের পর পর্যন্ত তাঁহারা এইরূপ নিদ্রাচ্ছন্ন রহিলেন। সূর্যের উত্তাপে সর্বপ্রথম রাসূলুল্লাহ (স)-এর নিদ্রা ভঙ্গ হইল। রাসূলুল্লাহ (স) বিলাল (রা)-কে বলিলেন, হে বিলাল। তুমি ইহা কি করিলে? বিলাল (রা) বলিলেন, আমার পিতা-মাতা আপনার জন্য উৎসর্গিত হউক, হে আল্লাহ্র রাসুল! আপনাকে যেই জিনিস আচ্ছন্ন করিয়াছে, আমিও তাহাতে আচ্ছন্ন হইয়াছি। অতঃপর সকলে পদব্রজে ঐ উপত্যকা ত্যাগ করিলেন। রাসূলুল্লাহ্ (س) বলিলেন, "ইহা শয়তানের উপত্যকা"। এই স্থান অতিক্রম করিবার পর সকলে থামিয়া উযু করিলেন, অতঃপর ফজরের সুন্নাত আদায় করিলেন, অতঃপর রাসূলুল্লাহ্ (س) বিলাল (را)-কে ইকামত দানের আদেশ দিলেন এবং সঙ্গী-সাথী সবাইকে লইয়া সালাত আদায় করিলেন। সালাতশেষে লোকদের প্রতি ফিরিয়া বলিলেন, হে লোকসকল! আল্লাহ আমাদের আত্মাসমূহ নিয়ন্ত্রণ করিয়াছিলেন। যদি তিনি চাহিতেন তাহা হইলে এই সময়ের পূর্বেই তাহা ফিরাইয়া দিতে পারিতেন।
فَإِذَا نَامَ أَحَدُكُمْ عَنِ الصَّلاةِ أَوْ نَسِيَهَا فَلْيُصَلَّهَا كَمَا كَانَ يُصَلِّيْهَا فِي وَقْتِهَا . "তোমাদের কোন ব্যক্তি যদি সালাতের সময় নিদ্রাচ্ছন্ন থাকে কিংবা সালাতের কথা ভুলিয়া যায় তাহা হইলে সে তেমনিভাবে এই সালাত আদায় করিবে যেমনটি সে সালাতের ওয়াক্তে স্বাভাবিকভাবে আদায় করিয়া থাকে।”
অতঃপর রাসূলুল্লাহ্ (স) আবু বাক্র (রা)-কে উদ্দেশ্য করিয়া বলিলেন: إِنَّ الشَّيْطَانَ أَتَى بِلاَلاً وَهُوَ قَائِمٌ يُصَلَّى فَأَضْجَعَهُ فَلَمْ يَزَلْ يُهْدِثُهُ كَمَا يُهْدَأُ الصَّبِيُّ حَتَّى نَامَ.
"বিলালের নিকট শয়তানের আগমন ঘটিয়াছিল। সে দাঁড়াইয়া সালাত আদায় করিতেছিল কিন্তু শয়তান তাহাকে শোয়াইয়া দিয়া শিশুকে যেইভাবে ঘুম পাড়ানো হয় সেইভাবে ঘুম পাড়াইয়াছিল। ইহার ফলে সে ঘুমাইয়া গিয়াছিল।"
তাহার পর বিলাল (রা)-কে ডাকিয়া তাহাকে অনুরূপ বলিলেন, যেমনটি আবূ বাক্র (রা)-কে বলিলেন। কোন কোন বর্ণনায় এই ঘটনাটি হুদায়বিয়া হইতে প্রত্যাবর্তনকালে সংঘটিত হইয়াছিল বলিয়া উল্লিখিত হইয়াছে। আবার কোন কোন বর্ণনায় তাবুক হইতে প্রত্যাবর্তনের সময় ঘটনাটি ঘটিয়াছিল বলিয়া উল্লেখ পাওয়া যায়।
ফজরের সালাত হইতে ঘুমাইয়া যাওয়া সংক্রান্ত হাদীছটি 'ইমরান ইবন হুসায়ন (রা) কর্তৃক বর্ণিত হইয়াছে। কিন্তু তিনি ইহা কোন সময় ও কোন যুদ্ধে সংঘটিত হইয়াছিল ইহার উল্লেখ করেন নাই। ইমাম মালিক (র) যায়দ ইব্‌ন আসলাম সূত্রে বর্ণনা করিয়াছেন যে, ঘটনাটি মক্কার পথে ঘটিয়াছিল। তবে এই রিওয়ায়াতটি মুরসাল।
আব্দুল্লাহ ইবন মাস'উদ (রা) বলেন, আমরা হুদায়বিয়ায় সন্ধিকালে রাসূলুল্লাহ (স)-এর সহিত আগমন করিতেছিলাম। এই সময় রাসূলুল্লাহ্ (س) বলিয়াছিলেন, "আমাদিগকে জাগ্রত করিবার দায়িত্ব কে নিবে? বিলাল (را) বলেন, "আমি"। অতঃপর ঘটনাটি তিনি বিবৃত করিলেন: এই হাদীছের সনদে বিভিন্নতা (إضطراب) পরিলক্ষিত হয়। 'আবদুর রাহমান ইব্‌ন মাহদী শু'বা সূত্রে, তিনি জামে' ইব্‌ন শাদ্দাদ সূত্রে বর্ণনা করেন যে, ঐ রাত্রে পাহারাদার ছিলেন 'আবদুল্লাহ্ ইবন মাস'উদ (রা)। কিন্তু গুনদার শু'বা থেকে বর্ণনা করেন যে, পাহারাদার ছিলেন বিলাল (রা) (যাদুল মা'আদ, ২খ., পৃ. ১৪৬, ১৪৭; মাদারিজুন নুবুওয়াত, ২খ., পৃ. ৪৩১)।

খায়বার হইতে প্রত্যাবর্তন করিবার পথে রাসূলুল্লাহ (স) ওয়াদিল কুরায় চার দিন অবস্থান করেন, অতঃপর মদীনার উদ্দেশে রওয়ানা হইলেন। পথিমধ্যে শেষ রাত্রিতে এক স্থানে তিনি যাত্রাবিরতি করিলেন এবং বিলাল (রা)-কে বলিলেন, হে বিলাল! তুমি আমাদিগকে জাগ্রত করিবে। বিলাল (রা) একটি বাহনের হাওদায় হেলান দিয়া ঘুমাইয়া পড়িলেন। তিনি রাসূলুল্লাহ (স)-কে জাগ্রত করিতে পারেন নাই। তিনি স্বয়ং জাগ্রত ছিলেন না। অন্য কোন সাহাবীও জাগ্রত হন নাই। এমন কি সূর্যোদয়ের পর পর্যন্ত তাঁহারা এইরূপ নিদ্রাচ্ছন্ন রহিলেন। সূর্যের উত্তাপে সর্বপ্রথম রাসূলুল্লাহ (স)-এর নিদ্রা ভঙ্গ হইল। রাসূলুল্লাহ (স) বিলাল (রা)-কে বলিলেন, হে বিলাল। তুমি ইহা কি করিলে? বিলাল (রা) বলিলেন, আমার পিতা-মাতা আপনার জন্য উৎসর্গিত হউক, হে আল্লাহ্র রাসুল! আপনাকে যেই জিনিস আচ্ছন্ন করিয়াছে, আমিও তাহাতে আচ্ছন্ন হইয়াছি। অতঃপর সকলে পদব্রজে ঐ উপত্যকা ত্যাগ করিলেন। রাসূলুল্লাহ্ (س) বলিলেন, "ইহা শয়তানের উপত্যকা"। এই স্থান অতিক্রম করিবার পর সকলে থামিয়া উযু করিলেন, অতঃপর ফজরের সুন্নাত আদায় করিলেন, অতঃপর রাসূলুল্লাহ্ (س) বিলাল (রা)-কে ইকামত দানের আদেশ দিলেন এবং সঙ্গী-সাথী সবাইকে লইয়া সালাত আদায় করিলেন। সালাতশেষে লোকদের প্রতি ফিরিয়া বলিলেন, হে লোকসকল! আল্লাহ আমাদের আত্মাসমূহ নিয়ন্ত্রণ করিয়াছিলেন। যদি তিনি চাহিতেন তাহা হইলে এই সময়ের পূর্বেই তাহা ফিরাইয়া দিতে পারিতেন।
فَإِذَا نَامَ أَحَدُكُمْ عَنِ الصَّلاةِ أَوْ نَسِيَهَا فَلْيُصَلَّهَا كَمَا كَانَ يُصَلِّيْهَا فِي وَقْتِهَا . "তোমাদের কোন ব্যক্তি যদি সালাতের সময় নিদ্রাচ্ছন্ন থাকে কিংবা সালাতের কথা ভুলিয়া যায় তাহা হইলে সে তেমনিভাবে এই সালাত আদায় করিবে যেমনটি সে সালাতের ওয়াক্তে স্বাভাবিকভাবে আদায় করিয়া থাকে।”
অতঃপর রাসূলুল্লাহ্ (س) আবু বাক্র (را)-কে উদ্দেশ্য করিয়া বলিলেন: إِنَّ الشَّيْطَانَ أَتَى بِلاَلاً وَهُوَ قَائِمٌ يُصَلَّى فَأَضْجَعَهُ فَلَمْ يَزَلْ يُهْدِثُهُ كَمَا يُهْدَأُ الصَّبِيُّ حَتَّى نَامَ.
"বিলালের নিকট শয়তানের আগমন ঘটিয়াছিল। সে দাঁড়াইয়া সালাত আদায় করিতেছিল কিন্তু শয়তান তাহাকে শোয়াইয়া দিয়া শিশুকে যেইভাবে ঘুম পাড়ানো হয় সেইভাবে ঘুম পাড়াইয়াছিল। ইহার ফলে সে ঘুমাইয়া গিয়াছিল।"
তাহার পর বিলাল (রা)-কে ডাকিয়া তাহাকে অনুরূপ বলিলেন, যেমনটি আবূ বাক্র (را)-কে বলিলেন। কোন কোন বর্ণনায় এই ঘটনাটি হুদায়বিয়া হইতে প্রত্যাবর্তনকালে সংঘটিত হইয়াছিল বলিয়া উল্লিখিত হইয়াছে। আবার কোন কোন বর্ণনায় তাবুক হইতে প্রত্যাবর্তনের সময় ঘটনাটি ঘটিয়াছিল বলিয়া উল্লেখ পাওয়া যায়।
ফজরের সালাত হইতে ঘুমাইয়া যাওয়া সংক্রান্ত হাদীছটি 'ইমরান ইবন হুসায়ন (রা) কর্তৃক বর্ণিত হইয়াছে। কিন্তু তিনি ইহা কোন সময় ও কোন যুদ্ধে সংঘটিত হইয়াছিল ইহার উল্লেখ করেন নাই। ইমাম মালিক (র) যায়د ইব্‌ن আসলাম সূত্রে বর্ণনা করিয়াছেন যে, ঘটনাটি মক্কার পথে ঘটিয়াছিল। তবে এই রিওয়ায়াতটি মুরসাল।
আব্দুল্লাহ ইبن মাস'উদ (রা) বলেন, আমরা হুদায়বিয়ায় সন্ধিকালে রাসূলুল্লাহ (س)-এর সহিত আগমন করিতেছিলাম। এই সময় রাসূলুল্লাহ্ (س) বলিয়াছিলেন, "আমাদিগকে জাগ্রত করিবার দায়িত্ব কে নিবে? বিলাল (রা) বলেন, "আমি"। অতঃপর ঘটনাটি তিনি বিবৃত করিলেন: এই হাদীছের সনদে বিভিন্নতা (إضطراب) পরিলক্ষিত হয়। 'আবদুর রাহমান ইব্‌ن মাহদী শু'বা সূত্রে, তিনি জামে' ইব্‌ن শাদ্দاد সূত্রে বর্ণনা করেন যে, ঐ রাত্রে পাহারাদার ছিলেন 'আবদুল্লাহ্ ইবন মাস'উদ (রা)। কিন্তু গুনদার শু'বা থেকে বর্ণনা করেন যে, পাহারাদার ছিলেন বিলাল (রা) (যাদুল মা'আদ, ২খ., পৃ. ১৪৬, ১৪৭; মাদারিজুন নুবুওয়াত, ২খ., পৃ. ৪৩১)।

খায়বার হইতে প্রত্যাবর্তন করিবার পথে রাসূলুল্লাহ (স) ওয়াদিল কুরায় চার দিন অবস্থান করেন, অতঃপর মদীনার উদ্দেশে রওয়ানা হইলেন। পথিমধ্যে শেষ রাত্রিতে এক স্থানে তিনি যাত্রাবিরতি করিলেন এবং বিলাল (রা)-কে বলিলেন, হে বিলাল! তুমি আমাদিগকে জাগ্রত করিবে। বিলাল (রা) একটি বাহনের হাওদায় হেলান দিয়া ঘুমাইয়া পড়িলেন। তিনি রাসূলুল্লাহ (স)-কে জাগ্রত করিতে পারেন নাই। তিনি স্বয়ং জাগ্রত ছিলেন না। অন্য কোন সাহাবীও জাগ্রত হন নাই। এমন কি সূর্যোদয়ের পর পর্যন্ত তাঁহারা এইরূপ নিদ্রাচ্ছন্ন রহিলেন। সূর্যের উত্তাপে সর্বপ্রথম রাসূলুল্লাহ (স)-এর নিদ্রা ভঙ্গ হইল। রাসূলুল্লাহ (স) বিলাল (রা)-কে বলিলেন, হে বিলাল। তুমি ইহা কি করিলে? বিলাল (রা) বলিলেন, আমার পিতা-মাতা আপনার জন্য উৎসর্গিত হউক, হে আল্লাহ্র রাসুল! আপনাকে যেই জিনিস আচ্ছন্ন করিয়াছে, আমিও তাহাতে আচ্ছন্ন হইয়াছি। অতঃপর সকলে পদব্রজে ঐ উপত্যকা ত্যাগ করিলেন। রাসূলুল্লাহ্ (স) বলিলেন, "ইহা শয়তানের উপত্যকা"। এই স্থান অতিক্রম করিবার পর সকলে থামিয়া উযু করিলেন, অতঃপর ফজরের সুন্নাত আদায় করিলেন, অতঃপর রাসূলুল্লাহ্ (স) বিলাল (রা)-কে ইকামত দানের আদেশ দিলেন এবং সঙ্গী-সাথী সবাইকে লইয়া সালাত আদায় করিলেন। সালাতশেষে লোকদের প্রতি ফিরিয়া বলিলেন, হে লোকসকল! আল্লাহ আমাদের আত্মাসমূহ নিয়ন্ত্রণ করিয়াছিলেন। যদি তিনি চাহিতেন তাহা হইলে এই সময়ের পূর্বেই তাহা ফিরাইয়া দিতে পারিতেন।
فَإِذَا نَامَ أَحَدُكُمْ عَنِ الصَّلاةِ أَوْ نَسِيَهَا فَلْيُصَلَّهَا كَمَا كَانَ يُصَلِّيْهَا فِي وَقْتِهَا .
"তোমাদের কোন ব্যক্তি যদি সালাতের সময় নিদ্রাচ্ছন্ন থাকে কিংবা সালাতের কথা ভুলিয়া যায় তাহা হইলে সে তেমনিভাবে এই সালাত আদায় করিবে যেমনটি সে সালাতের ওয়াক্তে স্বাভাবিকভাবে আদায় করিয়া থাকে।"
অতঃপর রাসূলুল্লাহ্ (স) আবু বাক্র (রা)-কে উদ্দেশ্য করিয়া বলিলেন: إِنَّ الشَّيْطَانَ أَتَى بِلاَلاً وَهُوَ قَائِمٌ يُصَلَّى فَأَضْجَعَهُ فَلَمْ يَزَلْ يُهْدِثُهُ كَمَا يُهْدَأُ الصَّبِيُّ حَتَّى نَامَ.
"বিলালের নিকট শয়তানের আগমন ঘটিয়াছিল। সে দাঁড়াইয়া সালাত আদায় করিতেছিল কিন্তু শয়তান তাহাকে শোয়াইয়া দিয়া শিশুকে যেইভাবে ঘুম পাড়ানো হয় সেইভাবে ঘুম পাড়াইয়াছিল। ইহার ফলে সে ঘুমাইয়া গিয়াছিল।"
তাহার পর বিলাল (রা)-কে ডাকিয়া তাহাকে অনুরূপ বলিলেন, যেমনটি আবূ বাক্র (রা)-কে বলিলেন। কোন কোন বর্ণনায় এই ঘটনাটি হুদায়বিয়া হইতে প্রত্যাবর্তনকালে সংঘটিত হইয়াছিল বলিয়া উল্লিখিত হইয়াছে। আবার কোন কোন বর্ণনায় তাবুক হইতে প্রত্যাবর্তনের সময় ঘটনাটি ঘটিয়াছিল বলিয়া উল্লেখ পাওয়া যায়।
ফজরের সালাত হইতে ঘুমাইয়া যাওয়া সংক্রান্ত হাদীছটি 'ইমরান ইবন হুসায়ন (রা) কর্তৃক বর্ণিত হইয়াছে। কিন্তু তিনি ইহা কোন সময় ও কোন যুদ্ধে সংঘটিত হইয়াছিল ইহার উল্লেখ করেন নাই। ইমাম মালিক (র) যায়দ ইব্‌ন আসলাম সূত্রে বর্ণনা করিয়াছেন যে, ঘটনাটি মক্কার পথে ঘটিয়াছিল। তবে এই রিওয়ায়াতটি মুরসাল।
আব্দুল্লাহ ইবন মাস'উদ (রা) বলেন, আমরা হুদায়বিয়ায় সন্ধিকালে রাসূলুল্লাহ (স)-এর সহিত আগমন করিতেছিলাম। এই সময় রাসূলুল্লাহ্ (স) বলিয়াছিলেন, "আমাদিগকে জাগ্রত করিবার দায়িত্ব কে নিবে? বিলাল (রা) বলেন, "আমি"। অতঃপর ঘটনাটি তিনি বিবৃত করিলেন: এই হাদীছের সনদে বিভিন্নতা (إضطراب) পরিলক্ষিত হয়। 'আবদুর রাহমান ইব্‌ন মাহদী শু'বা সূত্রে, তিনি জামে' ইব্‌ন শাদ্দাদ সূত্রে বর্ণনা করেন যে, ঐ রাত্রে পাহারাদার ছিলেন 'আবদুল্লাহ্ ইবন মাস'উদ (রা)। কিন্তু গুনদার শু'বা থেকে বর্ণনা করেন যে, পাহারাদার ছিলেন বিলাল (রা) (যাদুল মা'আদ, ২খ., পৃ. ১৪৬, ১৪৭; মাদারিজুন নুবুওয়াত, ২খ., পৃ. ৪৩১)।

📘 সীরাত বিশ্বকোষ > 📄 খায়বারের ব্যবস্থাপনা

📄 খায়বারের ব্যবস্থাপনা


খায়বারের উৎপন্ন দ্রব্যাদির পরিমাণ নির্ধারণ এবং ইহার বিলি-বণ্টনের জন্য প্রথম বৎসর রাসূলুল্লাহ (স) আবদুল্লাহ্ ইব্‌ন রাওয়াহা (রা)-কে নিযুক্ত করিয়াছিলেন। তাঁহার শাহাদতবরণের পর আবদুল্লাহ্ ইব্‌ন সাহল আনসারী (রা)-কে রাসূলুল্লাহ্ (স) এই পদে নিযুক্ত করেন।
রাসূলুল্লাহ (স)-এর জীবদ্দশায়ই ইয়াহুদীরা তাহাকে গোপনে ও সাক্ষ্য-প্রমাণহীনভাবে হত্যা করে। ফলে তাঁহার দুই চাচাত ভাই হুয়ায়্যাসা ইব্‌ন মাস'উদ ও মুহায়্যাসা ইবন মাস'উদ এবং 'আবদুল্লাহ্র এক সহোদর আব্দুর রাহমান ইব্‌ন সাহল তাঁহার রক্তপণের দাবি করিলেন। কিন্তু আততায়ীর কোন সন্ধান না পাওয়ায় রাসূলুল্লাহ্ (স) তাঁহার নিজের পক্ষ হইতে এক শত উট তাহদিগকে রক্তপণ হিসাবে দিয়াছিলেন। পূর্বেই বলা হইয়াছে যে, খায়বারের অর্ধেক এলাকা যাহার মধ্যে আল-ওয়াতীহ ও আস-সুলালিম, বাকী অর্ধেকের ভাগ-বাটোয়ারা সম্পর্কে ইন্ন ইসহাক বলেন যে, আল-কাতীবা আশ-শিক্ক এবং আন-নাতা-এর বণ্টন হইয়াছিল। ইহার মধ্যে আল-কাতীবাকে 'খুমুস' (রাসূলুল্লাহ্ (স)-এর অংশ) নিকটাত্মীয়বর্গ ইয়াতীমকে ও বিধবা এবং মিসকীনদের ভরণ-পোষণ এবং রাসূলুল্লাহ্ (স)-এর সহধর্মিনীগণের জীবিকা নির্বাহ প্রভৃতির জন্য নির্ধারিত করিয়া দেওয়া হইয়াছিল। তন্মধ্যে ত্রিশ ওয়াসাক খেজুর এবং ত্রিশ ওয়াসাক যব মুহায়্যাসা ইবন মাস'উদ (রা)-এর জন্য নির্ধারিত হয়। কারণ ফাদাকের ব্যাপারে তিনি যোগাযোগ করিয়া ইহার নিষ্পত্তি করিয়াছিলেন। আশশিক্ক ও 'আন-নাতাকে রাসূলুল্লাহ্ (স) আঠারটি অংশে বিভক্ত করিয়াছিলেন। প্রতিটি অংশে এক শতটি ভাগ ছিল। এইভাবে উক্ত দুর্গ দুইটি আঠার শত ভাগে বিভক্ত হয়। পাঁচ শত অংশ আন-না'তা দুর্গে আর তের শত অংশ- আশশিক্ক দুর্গে। মর্যাদা ও প্রয়োজনের দিক বিবেচনা করিয়া আল-কাতীবা দুর্গকে নবী সহধর্মিনীগণ ও বানুল মুত্তালিব ও অন্যান্যের মধ্যে বণ্টন করা হয়। বানু মুত্তালিব যেহেতু খুবই অভাবী ছিল তাই তাহাদের জন্য একশত ওয়াসাক এবং আশি ওয়াসাক নির্ধারণ করা হয়। রাসূল তনয়া ফাতিমা (রা)-এর জন্য পঁচাশি ওয়াসাক এবং উসামা ইব্ন যায়দ (রা)-এর জন্য চল্লিশ ওয়াসাক, মিকদাদ ইবনুল আসওয়াদের জন্য পনের ওয়াসাক, উম্মু রুমায়ছা-এর জন্য পাঁচ ওয়াসাক। ইহা ছাড়া রাসূলুল্লাহ্ ওসিয়াত করিয়াছিলেন যে, রাহাবিয়্যীন (ইয়ামানের রাহাওয় গোত্রীয় লোক)-এর জন্য এক শত ওয়াসাক, আদ-দারিয়্যীন গোত্রের জন্য এক শত ওয়াসাক, সাবায়্যীনদের জন্য এক শত ওয়াসাক এবং আশ'আরী গোত্রের জন্য এক শত ওয়াসাক দেওয়া হয়। আবূ দাউদে আবদুল্লাহ্ ইব্ন উমার (রা) হইতে বর্ণিত আছে যে, রাসূলুল্লাহ্ (স) স্বীয় সহধর্মিনীগণের প্রত্যেককে আশি ওয়াসাক করিয়া খেজুর এবং দশ ওয়াসাক করিয়া যব দিতেন। ইব্ন 'উমার (রা) হইতে আবূ দাউদের অপর একটি বর্ণনায় আছে যে, রাসূলুল্লাহ্ (স) খায়বারের খুমুস হিসাব করিয়া পৃথক করিবার পর নির্ধারিত হারে সকলকে অংশ দিতেন এবং “খুমুস” হইতে নবী সহধর্মিনীগণের প্রত্যেককে এক শত ওয়াসাক করিয়া খেজুর এবং বিশ ওয়াসাক করিয়া যব দিতেন (আসাহহুস সিয়ার, পৃ. ২১৩, ২১৪)।

খায়বারের উৎপন্ন দ্রব্যাদির পরিমাণ নির্ধারণ এবং ইহার বিলি-বণ্টনের জন্য প্রথম বৎসর রাসূলুল্লাহ (স) আবদুল্লাহ্ ইব্‌ন রাওয়াহা (রা)-কে নিযুক্ত করিয়াছিলেন। তাঁহার শাহাদতবরণের পর আবদুল্লাহ্ ইব্‌ন সাহল আনসারী (রা)-কে রাসূলুল্লাহ্ (স) এই পদে নিযুক্ত করেন।
রাসূলুল্লাহ (স)-এর জীবদ্দশায়ই ইয়াহুদীরা তাহাকে গোপনে ও সাক্ষ্য-প্রমাণহীনভাবে হত্যা করে। ফলে তাঁহার দুই চাচাত ভাই হুয়ায়্যাসা ইব্‌ন মাস'উদ ও মুহায়্যাসা ইবন মাস'উদ এবং 'আবদুল্লাহ্র এক সহোদর আব্দুর রাহমান ইব্‌ন সাহল তাঁহার রক্তপণের দাবি করিলেন। কিন্তু আততায়ীর কোন সন্ধান না পাওয়ায় রাসূলুল্লাহ্ (স) তাঁহার নিজের পক্ষ হইতে এক শত উট তাহদিগকে রক্তপণ হিসাবে দিয়াছিলেন। পূর্বেই বলা হইয়াছে যে, খায়বারের অর্ধেক এলাকা যাহার মধ্যে আল-ওয়াতীহ ও আস-সুলালিম, বাকী অর্ধেকের ভাগ-বাটোয়ারা সম্পর্কে ইন্ন ইসহাক বলেন যে, আল-কাতীবা আশ-শিক্ক এবং আন-নাতা-এর বণ্টন হইয়াছিল। ইহার মধ্যে আল-কাতীবাকে 'খুমুস' (রাসূলুল্লাহ্ (স)-এর অংশ) নিকটাত্মীয়বর্গ ইয়াতীমকে ও বিধবা এবং মিসকীনদের ভরণ-পোষণ এবং রাসূলুল্লাহ্ (স)-এর সহধর্মিনীগণের জীবিকা নির্বাহ প্রভৃতির জন্য নির্ধারিত করিয়া দেওয়া হইয়াছিল। তন্মধ্যে ত্রিশ ওয়াসাক খেজুর এবং ত্রিশ ওয়াসাক যব মুহায়্যাসা ইবন মাস'উদ (রা)-এর জন্য নির্ধারিত হয়। কারণ ফাদাকের ব্যাপারে তিনি যোগাযোগ করিয়া ইহার নিষ্পত্তি করিয়াছিলেন। আশশিক্ক ও 'আন-নাতাকে রাসূলুল্লাহ্ (স) আঠারটি অংশে বিভক্ত করিয়াছিলেন। প্রতিটি অংশে এক শতটি ভাগ ছিল। এইভাবে উক্ত দুর্গ দুইটি আঠার শত ভাগে বিভক্ত হয়। পাঁচ শত অংশ আন-না'তা দুর্গে আর তের শত অংশ- আশশিক্ক দুর্গে। মর্যাদা ও প্রয়োজনের দিক বিবেচনা করিয়া আল-কাতীবা দুর্গকে নবী সহধর্মিনীগণ ও বানুল মুত্তালিব ও অন্যান্যের মধ্যে বণ্টন করা হয়। বানু মুত্তালিব যেহেতু খুবই অভাবী ছিল তাই তাহাদের জন্য একশত ওয়াসাক এবং আশি ওয়াসাক নির্ধারণ করা হয়। রাসূল তনয়া ফাতিমা (রা)-এর জন্য পঁচাশি ওয়াসাক এবং উসামা ইব্ন যায়দ (রা)-এর জন্য চল্লিশ ওয়াসাক, মিকদাদ ইবনুল আসওয়াদের জন্য পনের ওয়াসাক, উম্মু রুমায়ছা-এর জন্য পাঁচ ওয়াসাক। ইহা ছাড়া রাসূলুল্লাহ্ ওসিয়াত করিয়াছিলেন যে, রাহাবিয়্যীন (ইয়ামানের রাহাওয় গোত্রীয় লোক)-এর জন্য এক শত ওয়াসাক, আদ-দারিয়্যীন গোত্রের জন্য এক শত ওয়াসাক, সাবায়্যীনদের জন্য এক শত ওয়াসাক এবং আশ'আরী গোত্রের জন্য এক শত ওয়াসাক দেওয়া হয়। আবূ দাউদে আবদুল্লাহ্ ইব্ন উমার (রা) হইতে বর্ণিত আছে যে, রাসূলুল্লাহ্ (س) স্বীয় সহধর্মিনীগণের প্রত্যেককে আশি ওয়াসাক করিয়া খেজুর এবং দশ ওয়াসাক করিয়া যব দিতেন। ইব্ন 'উমার (রা) হইতে আবূ দাউদের অপর একটি বর্ণনায় আছে যে, রাসূলুল্লাহ্ (স) খায়বারের খুমুস হিসাব করিয়া পৃথক করিবার পর নির্ধারিত হারে সকলকে অংশ দিতেন এবং “খুমুস” হইতে নবী সহধর্মিনীগণের প্রত্যেককে এক শত ওয়াসাক করিয়া খেজুর এবং বিশ ওয়াসাক করিয়া যব দিতেন (আসাহহুস সিয়ার, পৃ. ২১৩, ২১৪)।

খায়বারের উৎপন্ন দ্রব্যাদির পরিমাণ নির্ধারণ এবং ইহার বিলি-বণ্টনের জন্য প্রথম বৎসর রাসূলুল্লাহ (স) আবদুল্লাহ্ ইব্‌ন রাওয়াহা (রা)-কে নিযুক্ত করিয়াছিলেন। তাঁহার শাহাদতবরণের পর আবদুল্লাহ্ ইব্‌ন সাহল আনসারী (রা)-কে রাসূলুল্লাহ্ (স) এই পদে নিযুক্ত করেন।
রাসূলুল্লাহ (স)-এর জীবদ্দশায়ই ইয়াহুদীরা তাহাকে গোপনে ও সাক্ষ্য-প্রমাণহীনভাবে হত্যা করে। ফলে তাঁহার দুই চাচাত ভাই হুয়ায়্যাসা ইব্‌ন মাস'উদ ও মুহায়্যাসা ইবন মাস'উদ এবং 'আবদুল্লাহ্র এক সহোদর আব্দুর রাহমান ইব্‌ন সাহল তাঁহার রক্তপণের দাবি করিলেন। কিন্তু আততায়ীর কোন সন্ধান না পাওয়ায় রাসূলুল্লাহ্ (স) তাঁহার নিজের পক্ষ হইতে এক শত উট তাহদিগকে রক্তপণ হিসাবে দিয়াছিলেন। পূর্বেই বলা হইয়াছে যে, খায়বারের অর্ধেক এলাকা যাহার মধ্যে আল-ওয়াতীহ ও আস-সুলালিম, বাকী অর্ধেকের ভাগ-বাটোয়ারা সম্পর্কে ইন্ন ইসহাক বলেন যে, আল-কাতীবা আশ-শিক্ক এবং আন-নাতা-এর বণ্টন হইয়াছিল। ইহার মধ্যে আল-কাতীবাকে 'খুমুস' (রাসূলুল্লাহ্ (স)-এর অংশ) নিকটাত্মীয়বর্গ ইয়াতীমকে ও বিধবা এবং মিসকীনদের ভরণ-পোষণ এবং রাসূলুল্লাহ্ (স)-এর সহধর্মিনীগণের জীবিকা নির্বাহ প্রভৃতির জন্য নির্ধারিত করিয়া দেওয়া হইয়াছিল। তন্মধ্যে ত্রিশ ওয়াসাক খেজুর এবং ত্রিশ ওয়াসাক যব মুহায়্যাসা ইবন মাস'উদ (রা)-এর জন্য নির্ধারিত হয়। কারণ ফাদাকের ব্যাপারে তিনি যোগাযোগ করিয়া ইহার নিষ্পত্তি করিয়াছিলেন। আশশিক্ক ও 'আন-নাতাকে রাসূলুল্লাহ্ (س) আঠারটি অংশে বিভক্ত করিয়াছিলেন। প্রতিটি অংশে এক শতটি ভাগ ছিল। এইভাবে উক্ত দুর্গ দুইটি আঠার শত ভাগে বিভক্ত হয়। পাঁচ শত অংশ আন-না'তা দুর্গে আর তের শত অংশ- আশশিক্ক দুর্গে। মর্যাদা ও প্রয়োজনের দিক বিবেচনা করিয়া আল-কাতীবা দুর্গকে নবী সহধর্মিনীগণ ও বানুল মুত্তালিব ও অন্যান্যের মধ্যে বণ্টন করা হয়। বানু মুত্তালিব যেহেতু খুবই অভাবী ছিল তাই তাহাদের জন্য একশত ওয়াসাক এবং আশি ওয়াসাক নির্ধারণ করা হয়। রাসূল তনয়া ফাতিমা (রা)-এর জন্য পঁচাশি ওয়াসাক এবং উসামা ইব্ন যায়দ (রা)-এর জন্য চল্লিশ ওয়াসাক, মিকদাদ ইবনুল আসওয়াদের জন্য পনের ওয়াসাক, উম্মু রুমায়ছা-এর জন্য পাঁচ ওয়াসাক। ইহা ছাড়া রাসূলুল্লাহ্ ওসিয়াত করিয়াছিলেন যে, রাহাবিয়্যীন (ইয়ামানের রাহাওয় গোত্রীয় লোক)-এর জন্য এক শত ওয়াসাক, আদ-দারিয়্যীন গোত্রের জন্য এক শত ওয়াসাক, সাবায়্যীনদের জন্য এক শত ওয়াসাক এবং আশ'আরী গোত্রের জন্য এক শত ওয়াসাক দেওয়া হয়। আবূ দাউদে আবদুল্লাহ্ ইব্ন উমার (রা) হইতে বর্ণিত আছে যে, রাসূলুল্লাহ্ (স) স্বীয় সহধর্মিনীগণের প্রত্যেককে আশি ওয়াসাক করিয়া খেজুর এবং দশ ওয়াসাক করিয়া যব দিতেন। ইব্ন 'উমার (রা) হইতে আবূ দাউদের অপর একটি বর্ণনায় আছে যে, রাসূলুল্লাহ্ (স) খায়বারের খুমুস হিসাব করিয়া পৃথক করিবার পর নির্ধারিত হারে সকলকে অংশ দিতেন এবং “খুমুস” হইতে নবী সহধর্মিনীগণের প্রত্যেককে এক শত ওয়াসাক করিয়া খেজুর এবং বিশ ওয়াসাক করিয়া যব দিতেন (আসাহহুস সিয়ার, পৃ. ২১৩, ২১৪)।

খায়বারের উৎপন্ন দ্রব্যাদির পরিমাণ নির্ধারণ এবং ইহার বিলি-বণ্টনের জন্য প্রথম বৎসর রাসূলুল্লাহ (স) আবদুল্লাহ্ ইব্‌ন রাওয়াহা (রা)-কে নিযুক্ত করিয়াছিলেন। তাঁহার শাহাদতবরণের পর আবদুল্লাহ্ ইব্‌ن সাহল আনসারী (রা)-কে রাসূলুল্লাহ্ (س) এই পদে নিযুক্ত করেন।
রাসূলুল্লাহ (স)-এর জীবদ্দশায়ই ইয়াহুদীরা তাহাকে গোপনে ও সাক্ষ্য-প্রমাণহীনভাবে হত্যা করে। ফলে তাঁহার দুই চাচাত ভাই হুয়ায়্যাসা ইব্‌ন মাস'উদ ও মুহায়্যাসা ইবন মাস'উদ এবং 'আবদুল্লাহ্র এক সহোদর আব্দুর রাহমান ইব্‌ن সাহل তাঁহার রক্তপণের দাবি করিলেন। কিন্তু আততায়ীর কোন সন্ধান না পাওয়ায় রাসূলুল্লাহ্ (স) তাঁহার নিজের পক্ষ হইতে এক শত উট তাহদিগকে রক্তপণ হিসাবে দিয়াছিলেন। পূর্বেই বলা হইয়াছে যে, খায়বারের অর্ধেক এলাকা যাহার মধ্যে আল-ওয়াতীহ ও আস-সুলালিম, بাকী অর্ধেকের ভাগ-باটোয়ারা সম্পর্কে ইন্ন ইসহাক বলেন যে, আল-কাতীবা আশ-শিক্ক এবং আন-নাতা-এর বণ্টন হইয়াছিল। ইহার মধ্যে আল-কাতীবাকে 'খুমুস' (রাসূলুল্লাহ্ (س)-এর অংশ) নিকটাত্মীয়বর্গ ইয়াতীমকে ও বিধবা এবং মিসকীনদের ভরণ-পোষণ এবং রাসূলুল্লাহ্ (س)-এর সহধর্মিনীগণের জীবিকা নির্বাহ প্রভৃতির জন্য নির্ধারিত করিয়া দেওয়া হইয়াছিল। তন্মধ্যে ত্রিশ ওয়াসাক খেজুর এবং ত্রিশ ওয়াসাক যব মুহায়্যাসা ইব্‌ن মাস'উদ (রা)-এর জন্য নির্ধারিত হয়। কারণ ফাদাকের ব্যাপারে তিনি যোগাযোগ করিয়া ইহার নিষ্পত্তি করিয়াছিলেন। আশশিক্ক ও 'আন-নাতাকে রাসূলুল্লাহ্ (س) আঠারটি অংশে বিভক্ত করিয়াছিলেন। প্রতিটি অংশে এক শতটি ভাগ ছিল। এইভাবে উক্ত দুর্গ দুইটি আঠার শত ভাগে বিভক্ত হয়। পাঁচ শত অংশ আন-نا'তা দুর্গে আর তের শত অংশ- আশশিক্ক দুর্গে। মর্যাদা ও প্রয়োজনের দিক বিবেচনা করিয়া আল-কাতীبا দুর্গকে নবী সহধর্মিনীগণ ও بانুল মুত্তালিব ও অন্যান্যের মধ্যে বণ্টন করা হয়। বানু মুত্তালিব যেহেতু খুবই অভাবী ছিল তাই তাহাদের জন্য একশত ওয়াসাক এবং আশি ওয়াসাক নির্ধারণ করা হয়। রাসূল তনয়া ফাতিমা (রা)-এর জন্য পঁচাশি ওয়াসাক এবং উসামা ইب্ন যায়د (را)-এর জন্য চল্লিশ ওয়াসাক, মিকদাদ ইবনুল আসওয়াদের জন্য পনের ওয়াসাক, উম্মু রুমায়ছা-এর জন্য পাঁচ ওয়াসাক। ইহা ছাড়া রাসূলুল্লাহ্ ওসিয়াত করিয়াছিলেন যে, রাহাবিয়্যীন (ইয়ামানের রাহাওয় গোত্রীয় লোক)-এর জন্য এক শত ওয়াসাক, আদ-দারিয়্যীন গোত্রের জন্য এক শত ওয়াসাক, সাবায়্যীনদের জন্য এক শত ওয়াসাক এবং আশ'আরী গোত্রের জন্য এক শত ওয়াসাক দেওয়া হয়। আবূ দাউদে আবদুল্লাহ্ ইبْن উমার (রা) হইতে বর্ণিত আছে যে, রাসূলুল্লাহ্ (س) স্বীয় সহধর্মিনীগণের প্রত্যেককে আশি ওয়াসাক করিয়া খেজুর এবং বিশ ওয়াসাক করিয়া যব দিতেন। ইব্ন 'উমার (রা) হইতে আবূ দাউদের অপর একটি বর্ণনায় আছে যে, রাসূলুল্লাহ্ (س) খায়বারের খুমুস হিসাব করিয়া পৃথক করিবার পর নির্ধারিত হারে সকলকে অংশ দিতেন এবং “খুমুস” হইতে নবী সহধর্মিনীগণের প্রত্যেককে এক শত ওয়াসাক করিয়া খেজুর এবং বিশ ওয়াসাক করিয়া যব দিতেন (আসাহহুস সিয়ার, পৃ. ২১৩, ২১৪)।

খায়বারের উৎপন্ন দ্রব্যাদির পরিমাণ নির্ধারণ এবং ইহার বিলি-বণ্টনের জন্য প্রথম বৎসর রাসূলুল্লাহ (স) আবদুল্লাহ্ ইব্‌ন রাওয়াহা (রা)-কে নিযুক্ত করিয়াছিলেন। তাঁহার শাহাদতবরণের পর আবদুল্লাহ্ ইব্‌ন সাহল আনসারী (রা)-কে রাসূলুল্লাহ্ (স) এই পদে নিযুক্ত করেন।
রাসূলুল্লাহ (স)-এর জীবদ্দশায়ই ইয়াহুদীরা তাহাকে গোপনে ও সাক্ষ্য-প্রমাণহীনভাবে হত্যা করে। ফলে তাঁহার দুই চাচাত ভাই হুয়ায়্যাসা ইব্‌ন মাস'উদ ও মুহায়্যাসা ইবন মাস'উদ এবং 'আবদুল্লাহ্র এক সহোদর আব্দুর রাহমান ইব্‌ন সাহল তাঁহার রক্তপণের দাবি করিলেন। কিন্তু আততায়ীর কোন সন্ধান না পাওয়ায় রাসূলুল্লাহ্ (স) তাঁহার নিজের পক্ষ হইতে এক শত উট তাহদিগকে রক্তপণ হিসাবে দিয়াছিলেন। পূর্বেই বলা হইয়াছে যে, খায়বারের অর্ধেক এলাকা যাহার মধ্যে আল-ওয়াতীহ ও আস-সুলালিম, বাকী অর্ধেকের ভাগ-বাটোয়ারা সম্পর্কে ইন্ন ইসহাক বলেন যে, আল-কাতীবা আশ-শিক্ক এবং আন-নাতা-এর বণ্টন হইয়াছিল। ইহার মধ্যে আল-কাতীবাকে 'খুমুস' (রাসূলুল্লাহ্ (স)-এর অংশ) নিকটাত্মীয়বর্গ ইয়াতীমকে ও বিধবা এবং মিসকীনদের ভরণ-পোষণ এবং রাসূলুল্লাহ্ (স)-এর সহধর্মিনীগণের জীবিকা নির্বাহ প্রভৃতির জন্য নির্ধারিত করিয়া দেওয়া হইয়াছিল। তন্মধ্যে ত্রিশ ওয়াসাক খেজুর এবং ত্রিশ ওয়াসাক যব মুহায়্যাসা ইবন মাস'উদ (রা)-এর জন্য নির্ধারিত হয়। কারণ ফাদাকের ব্যাপারে তিনি যোগাযোগ করিয়া ইহার নিষ্পত্তি করিয়াছিলেন। আশশিক্ক ও 'আন-নাতাকে রাসূলুল্লাহ্ (স) আঠারটি অংশে বিভক্ত করিয়াছিলেন। প্রতিটি অংশে এক শতটি ভাগ ছিল। এইভাবে উক্ত দুর্গ দুইটি আঠার শত ভাগে বিভক্ত হয়। পাঁচ শত অংশ আন-না'তা দুর্গে আর তের শত অংশ- আশশিক্ক দুর্গে। মর্যাদা ও প্রয়োজনের দিক বিবেচনা করিয়া আল-কাতীবা দুর্গকে নবী সহধর্মিনীগণ ও বানুল মুত্তালিব ও অন্যান্যের মধ্যে বণ্টন করা হয়। বানু মুত্তালিব যেহেতু খুবই অভাবী ছিল তাই তাহাদের জন্য একশত ওয়াসাক এবং আশি ওয়াসাক নির্ধারণ করা হয়। রাসূল তনয়া ফাতিমা (রা)-এর জন্য পঁচাশি ওয়াসাক এবং উসামা ইব্ন যায়দ (রা)-এর জন্য চল্লিশ ওয়াসাক, মিকদাদ ইবনুল আসওয়াদের জন্য পনের ওয়াসাক, উম্মু রুমায়ছা-এর জন্য পাঁচ ওয়াসাক। ইহা ছাড়া রাসূলুল্লাহ্ ওসিয়াত করিয়াছিলেন যে, রাহাবিয়্যীন (ইয়ামানের রাহাওয় গোত্রীয় লোক)-এর জন্য এক শত ওয়াসাক, আদ-দারিয়্যীন গোত্রের জন্য এক শত ওয়াসাক, সাবায়্যীনদের জন্য এক শত ওয়াসাক এবং আশ'আরী গোত্রের জন্য এক শত ওয়াসাক দেওয়া হয়। আবূ দাউদে আবদুল্লাহ্ ইব্ন উমার (রা) হইতে বর্ণিত আছে যে, রাসূলুল্লাহ্ (স) স্বীয় সহধর্মিনীগণের প্রত্যেককে আশি ওয়াসাক করিয়া খেজুর এবং দশ ওয়াসাক করিয়া যব দিতেন। ইব্ন 'উমার (রা) হইতে আবূ দাউদের অপর একটি বর্ণনায় আছে যে, রাসূলুল্লাহ্ (স) খায়বারের খুমুস হিসাব করিয়া পৃথক করিবার পর নির্ধারিত হারে সকলকে অংশ দিতেন এবং “খুমুস” হইতে নবী সহধর্মিনীগণের প্রত্যেককে এক শত ওয়াসাক করিয়া খেজুর এবং বিশ ওয়াসাক করিয়া যব দিতেন (আসাহহুস সিয়ার, পৃ. ২১৩, ২১৪)।

📘 সীরাত বিশ্বকোষ > 📄 'আলী (রা)-এর বিলম্বে আসরের সালাত আদায়

📄 'আলী (রা)-এর বিলম্বে আসরের সালাত আদায়


কথিত আছে যে, খায়বার যুদ্ধকালে সংঘটিত ঘটনাবলীর একটি এই যে, খায়বার হইতে প্রত্যাবর্তনকালে রাসূলুল্লাহ (স) 'আস-সাহবা' নামক স্থানে পৌঁছিলে এখানে সায়্যিদা সাফিয়্যা (রা)-এর সহিত তাঁহার বাসর হয়। এই স্থানেই তিনি 'আসরের সালাত আদায় করিলেন অতঃপর তাঁহার মাথা 'আলী (রা)-এর উরুর উপর রাখিয়া শুইলেন। এমতাবস্থায় ওহী আসিবার লক্ষণাদি তাঁহার মধ্যে পরিলক্ষিত হইল। 'আলী (রা) আসরের সালাত আদায় করেন নাই। ওহী অবতরণ এতই দীর্ঘায়িত হইল যে, সূর্য অস্তমিত হইয়া গেল। ওহী অবতরণ শেষ হইলে রাসূলুল্লাহ (স) 'আলী (রা)-কে জিজ্ঞাসা করিলেন, "আসরের সালাত আদায় করিয়াছ কি"? 'আলী (রা) নিবেদন করিলেন, হে আল্লাহ্র রাসূল! আমি সালাত আদায় করি নাই। রাসূলুল্লাহ (স) এই সময় দু'আ করিলেন, হে আমার প্রতিপালক! যদি আলী আপনার এবং আপনার রাসূলের আনুগত্যে ব্যস্ত থাকে, তাহা হইলে সূর্যকে আদেশ করুন উহা যেন পুনরায় দৃষ্ট হয়। ইহাতে সে আসরের সালাত আদায় করিতে সক্ষম হইবে। মহান আল্লাহ তাঁহার দু'আ কবুল করিলেন। ফলে সূর্য অস্তমিত হইবার পরও দ্বিতীয়বার উদিত হইল। সূর্যের কিরণ পাহাড় ও টিলায় বিকীরিত হইল। সৃষ্টিজগত ইহা প্রত্যক্ষ করিল। 'আলী (রা) উযু করিলেন এবং সালাত আদায় করিলেন।
'আল্লামা দিহলাবী বলেন, রাসূলুল্লাহ (স)-এর জন্য সূর্যকে ডুবিতে না দেওয়া ও ফিরাইয়া আনা তিনটি স্থানে পাওয়া যায়। (এক) মি'রাজ হইতে ফিরিবার পর যখন কোন এক কাফেলা সম্পর্কে কুরায়শদের দ্বারা জিজ্ঞাসিত হইয়া তিনি বলিয়াছিলেন যে, ইহারা বুধবার দিন এই স্থানে পৌঁছিবে। (দুই) খনদক দিবসে আসরের সালাত কাযা হইয়া গেলে রাসূলুল্লাহ (স) সূর্য ফিরাইয়া দিবার দু'আ করিয়াছিলেন। কিন্তু এই ব্যাপারে স্বতসিদ্ধ কথা হইল, সূর্য অস্তমিত হইবার পর রাসূলূল্লাহ (স) কাযা পড়িয়াছিলেন। (তিন) এখানকার বর্ণিত ঘটনা যে, 'আলী (রা)-এর আসরের সালাত কাযা হইয়া গেলে রাসূলুল্লাহ (স)-এর দু'আর ফলে সূর্যকে ফিরাইয়া দেওয়া হইয়াছিল। এই হাদীছগুলি সম্পর্কে মুহাদ্দিছগণ বিভিন্ন ব্যাখ্যা দিয়াছেন। যূশা' ইব্‌ন নূন (আ) সম্পর্কে একটি বিশুদ্ধ হাদীছ বর্ণিত:
لَمْ يُحْبَسِ الشَّمْسُ عَلَى أَحَدٍ إِلَّا لِيُوشَعَ بْنِ نُونٍ.
"যূশা' ইব্‌ন নূন (আ) ব্যতীত আর কাহারও জন্য সূর্যকে অস্ত যাওয়া হইতে বিরত রাখা হয় নাই।” হাদীছটি মিশকাতে বুখারী ও মুসলিমের উদ্ধৃতিতে আবূ হুরায়রা (রা) হইতে বর্ণিত (মাদারিজুন নুবুওয়াত, প্রাগুক্ত, পৃ. ৪২৬)। হাদীছটি উপরে উল্লিখিত বর্ণনার পরিপন্থী। যেহেতু বিষয়টি অত্যন্ত বিরোধপূর্ণ, তাই এখানে বিস্তারিত আলোচনা তুলিয়া ধরা হইল যাহাতে বিষয়টি আরও স্পষ্ট হয়। এই প্রসংগে তিনি নিম্নোক্ত হাদীছ উল্লেখ করেন:
عَنْ أَسْمَاءَ بِنْتِ عُمَيْسٍ قَالَتْ كَانَ رَسُولُ اللهِ ﷺ يُوحِي إِلَيْهِ وَرَاسُهُ فِي حِجْرٍ عَلَى فَلَمْ يُصَلِّ الْعَصْرَ حَتَّى غَرَبَتِ الشَّمْسُ فَقَالَ رَسُولُ اللهِ ﷺ صَلَّيْتَ الْعَصْرَ وَقَالَ أَبُو أُمَيَّةَ صَلَّيْتَ يَا عَلِيُّ قَالَ لَا قَالَ رَسُولُ اللهِ ﷺ وَقَالَ أَبُو أُمَيَّةَ فَقَالَ النَّبِيُّ ﷺ اللَّهُمَّ إِنَّهُ كَانَ فِي طَاعَتِكَ وَطَاعَةِ نَبِيِّكَ وَقَالَ أَبُو أُمَيَّةَ رَسُولِكَ فَارْدُدْ عَلَيْهِ الشَّمْسَ قَالَتْ أَسْمَاءُ فَرَأَيْتُهَا غَرَبَتْ ثُمَّ رَأَيْتُهَا طَلَعْتُ بَعْدَ مَا غَرَبَتْ.
"আসমা বিন্ত 'উমায়স (রা) বলেন, রাসূলুল্লাহ (স)-এর উপর ওহী অবতীর্ণ হইতেছিল। এমতাবস্থায় তাহার মাথা 'আলী (রা)-এর কোলে ছিল। ফলে তিনি আসরের সালাত আদায় করিবার পূর্বেই সূর্য অস্তমিত হইয়া গেল। রাসূলুল্লাহ (স) অতঃপর জিজ্ঞাসা করিলেন, হে আলী! তুমি কি আসরের সালাত আদায় করিয়াছ? তিনি বলিলেন, না। রাসূলুল্লাহ (স) বলিলেন : হে আল্লাহ! নিশ্চয় 'আলী তোমার আনুগত্যে ও তোমার নবীর আনুগত্যে ছিল। সুতরাং তুমি তাহার জন্য সূর্যকে ফিরাইয়া দাও। আসমা (রা) বলেন, আমি দেখিলাম সূর্য অস্তমিত হইয়া গিয়াছে, অতঃপর তাহা উদিত দেখিলাম।"
আবূ আবদুল্লাহ ইব্‌ন মানদা সূত্রে বর্ণিত এই হাদীছকে শায়খ আবুল ফারাজ ইবনুল জাওযী (র) জাল (موضوع) হাদীছের মধ্যে গণ্য করিয়াছেন। আবূ জা'ফার আল-উকায়লী সূত্রেও একটি হাদীছ বর্ণিত আছে। ইবনুল জাওযী এই হাদীছকেও জাল (موضوع) বলিয়া অভিহিত করিয়াছেন। উক্ত হাদীছের বর্ণনাকারিগণের মধ্যেও বিভিন্নতা রহিয়াছে। হাফিজ ইব্‌ন 'আসাকির এই হাদীছকে মুনকার (منکر) বলিয়া অভিহিত করিয়াছেন। ইহাতে একাধিক অজ্ঞাত পরিচয় বর্ণনাকারী রহিয়াছেন। এই সম্পর্কে ইন্ন কাছীর তাঁহার অভিমত ব্যক্ত করেন যে, এই হাদীছ যত সনদেই বর্ণিত হইয়াছে সবগুলিই দুর্বল ও মুনকার। এমন কোন সনদ নাই যেখানে কোন না কোন এক শী'আ মতবাদী, অপরিচিত কিংবা প্রত্যাখ্যাত ব্যক্তি নাই।
এই প্রকার হাদীছের সনদ মুত্তাসিল হইলেও এইরূপ গুরুত্বপূর্ণ বিষয়ে খবরে ওয়াহিদ পর্যায়ের হাদীছ গ্রহণযোগ্য হয় না, খবরে মুতাওয়াতির কিংবা খবরে মাশহুর হইতে হয়। আমরা আল্লাহ্ কুদরত ও রাসূলুল্লাহ (স)-এর মাধ্যমে তাহার প্রকাশের সম্ভাবনাকে অস্বীকার করি না। সহীহ বুখারীর রিওয়ায়াতে বর্ণিত আছে, সূর্যকে যূশা' ইব্‌ নূন (আ)-এর জন্য ফিরাইয়া আনা হইয়াছিল। ইহা ছিল সেই দিনের ঘটনা যেই দিন তিনি বায়তুল মাকদিস অবরোধ করিয়াছিলেন। ইহা ছিল জুমু'আর দিন। অপরদিকে বনী ইসরাঈল শনিবার দিন যুদ্ধ করিত না। এই সময় যূশা' (আ) সূর্যের দিকে দৃষ্টিপাত করিলেন। সূর্যের তখন অস্ত যাওয়ার অবস্থা। তিনি বলিলেনঃ হে সূর্য! তুমি যেমন আদিষ্ট, আমিও তেমন আদিষ্ট। হে আল্লাহ! সূর্যকে আমার জন্য থামাইয়া রাখ। ফলে আল্লাহ তাঁহার জন্য সূর্যকে থামাইয়া রাখিয়াছিলেন, যতক্ষণ না তাহারা বায়তুল মাকদিস জয় করিয়াছিলেন। যূশা' ইবন নূন (আ), এমনকি সকল নবী হইতে রাসূলুল্লাহ (স)-এর মর্যাদা অনেক ঊর্ধ্বে। তবুও আমরা তাঁহার নিকট হইতে যাহা বিশুদ্ধ সূত্রে বর্ণিত আছে তাহাই বর্ণনা করিব। অন্য যাহা শুদ্ধ নহে তাহা তাঁহার সহিত সম্পৃক্ত করিব না। যদি এইরূপ বর্ণনা শুদ্ধ হইত তাহা হইলে সবার আগে আমরাই ইহা সমর্থন করিতাম (ইব্‌ন কাছীর, শামাইলুর রাসূল, পৃ. ১৪৪-১৪৮)।
অন্য আরও একটি সূত্রে এইরূপ বর্ণিত আছে:
عَنْ أَسْمَاءَ بِنْتِ عُمَيْسٍ قَالَتْ لَمَّا كَانَ يَوْمَ شُغْلِ عَلَى لِمَكَانِهِ مِنْ قَسْمِ الْمَغْنَمِ حَتَّى غربت الشَّمْسُ أَوْ كَادَتْ فَقَالَ رَسُولُ الله ﷺ أَمَا صَلَّيْتَ قَالَ لَا فَدَعَا اللَّهَ فَارْتَفَعَت الشَّمْسُ حَتَّى تَوَسَطَتِ السَّمَاءُ فَصَلَّى عَلِيُّ فَلَمَّا غَرَبَتِ الشَّمْسُ سَمِعْتُ لَهَا صَرِيرًا كَصَرِيرِ الْمِنْشَارِ فِي الْحَدِيدِ.
'আমর ইবন ছাবিত হইতে বর্ণিত আছে:
قَالَ سَأَلْتُ عَبْدَ اللَّهِ بْنَ حَسَنِ بْنِ حُسَيْنِ بْنِ عَلَى بْنِ أَبِي طَالِبٍ عَنْ حَدِيْثِ رَدَّ الشَّمْسِ عَلَى عَلَى بْنِ أَبِي طَالِب هَلْ يُثْبِتُ عِنْدَكُمْ فَقَالَ لِي مَا أَنْزَلَ اللَّهُ فِي كِتَابِهِ أَعْظَمُ مِنْ رَدَّ الشَّمْسِ قُلْتُ صَدَقْتَ جَعَلَنِي اللهُ فِدَاكَ وَلَكِنَّى أَحَبُّ عَنْ أَسْمَعَهُ مِنْكَ فَقَالَ حَدَّثَنِي أَبِي الْحَسَنُ عَنْ أَسْمَاءَ بِنْتِ عُمَيْسٍ أَنَّهَا قَالَتْ أَقَبَلَ عَلِيُّ بْنُ أَبِي طَالِبٍ ذَاتَ يَوْمٍ وَهُوَ يُرِيدُ أَنْ يُصَلَّى العَصْرَ مَعَ رَسُولِ اللهِ ﷺ فَوَافَقَ رَسُولَ اللَّهِ ﷺ قَدْ انْصَرَفَ وَنَزَلَ عَلَيْهِ
الْوَحْيُ فَاسْنَدَهُ إِلَى صَدْرِهِ فَلَمْ يَزَلْ مُسْنِدُهُ إِلَى صَدْرِهِ حَتَّى أَفَاقَ رَسُولُ اللَّهِ ﷺ فَقَالَ أَصَلَّيْتَ الْعَصْرَ يَا عَلِيُّ قَالَ جِئْتُ وَالْوَحْيُ يَنْزِلُ عَلَيْكَ فَلَمْ أَزَلْ مُسْنِدُكَ إِلِى صَدْرِي حَتَّى السَّاعَةَ فَاسْتَقْبَلَ رَسُولَ اللَّهِ ﷺ وَقَدْ غَرَبَتِ الشَّمْسُ وَقَالَ اللَّهُمْ إِنَّ عَلَيْا كَانَ فِي طاعَتِكَ فَارْدُدْهَا عَلَيْهِ قَالَتْ أَسْمَاءُ فَأَقْبَلَتِ الشَّمْسُ وَلَهَا صَرِيرٌ كَصَرِيرِ الرَّحَى حَتَّى كَانَتْ فِي مَوْضِعِهَا وَقْتُ الْعَصْرِ فَقَامَ عَلَى مُتَمَكِّنَا فَصَلَّى فَلَمَّا فَرَغَ رَجَعَتِ الشَّمْسُ وَلَهَا صَرِيرٌ كَصَرِيرِ الرَّحَى فَلَمَّا غَابَتْ اخْتَلَطَ الظَّلامُ وَبَدَتِ النُّجُومُ.
এই রিওয়ায়াতে রহিয়াছে, আবদুল্লাহ ইব্‌ন্ন হাসান ইবন হুসায়ন ইবন 'আলী (রা) বলিয়াছেন, আল্লাহ তা'আলা আল-কুরআনে সূর্য ফিরাইয়া লওয়ার বিষয় হইতে বড় অন্য কোন জিনিস অবতীর্ণ করেন নাই, অথচ কুরআনে ইহার কোন উল্লেখ নাই।
আবূ সা'ঈদ আল-খুদরী (রা) হইতে বর্ণিত আছে:
قَالَ الْحُسَيْنُ بْنُ عَلَى سَمِعْتُ أَبَا سَعِيدٍ الْخُدْرِى يَقُولُ دَخَلْتُ عَلَى رَسُولِ اللَّهِ ﷺ فَإِذَا رَأْسُهُ فِي حَجْرٍ عَلَى وَقَدْ غَابَتِ الشَّمْسُ فَانْتَبَهَ النَّبِيِّ ﷺ وَقَالَ يَا عَلِيُّ أَصَلَّيْتَ الْعَصْرَ قَالَ لَا يَا رَسُولَ اللهِ مَا صَلَّيْتُ كَرِهْتُ أَنْ أَضَعَ رَأْسَكَ مِنْ حَجْرِي وَأَنْتَ وَاجِعٌ فَقَالَ رَسُولُ اللهِ ﷺ يَا عَلِيُّ ادْعُ يَا عَلَى أَدْعُ أَنْ تُرَدُّ عَلَيْكَ الشَّمْسُ فَقَالَ عَلِيُّ يَا رَسُولَ اللَّهِ أَدْعُ أَنْتَ وَأَنَا أُؤَمِّنُ فَقَالَ يَارَبِّ أَنْ عَلِيًّا فِي طَاعَتِكَ وَطَاعَةِ نَبِيِّكَ فَارْدُدْ عَلَيْهِ الشَّمْسُ قَالَ أَبُو سَعِيدٍ فَوَاللَّهِ لَقَدْ سَمِعْتُ لِلشَّمْسِ صَرِيرًا كَصَرِيرِ النَّكْبَرَةِ حَتَّى رَجَعَتْ بَيْضَاءَ نقية.
এই রিওয়ায়াতে আছে যে, রাসূলুল্লাহ (স) অসুস্থ থাকায় 'আলী (রা)-এর কোলে মাথা রাখিয়াছিলেন। রাসূলুল্লাহ (স) প্রথমে 'আলী (রা)-কে সূর্য ফিরাইয়া দিবার জন্য দু'আ করিতে বলিয়াছিলেন। কিন্তু তিনি আরয করিলেন, হে আল্লাহ্র রাসূল! আপনিই দু'আ করুন, আমি আমীন বলিব। 'আলী ইব্‌ন আবী তালিব 'রা)-এর এই সম্পর্কিত রিওয়ায়াতটি হইল:
عَنْ جُوَيْرِيَّةَ بِنْتِ شَهْرٍ قَالَتْ خَرَجْتُ مَعَ عَلَى بْنِ أَبِي طَالِبٍ فَقَالَ يَا جُوَيْرِيَّةُ إِنَّ رَسُولَ اللهِ ﷺ كَانَ يُوحَى إِلَيْهِ وَرَاسُهُ فِي حِجْرِي فَذَكَرَ الْحَدِيثَ.
(শামাইলুর রাসূল, পৃ. ১৪৯-১৫০)।
এই সম্পর্কিত যতগুলি হাদীছ বর্ণিত আছে উহার কোনটিই সমালোচনামুক্ত নয়। এমনকি অনেক রাবী সম্পর্কে কট্টর শী'আ মতাবলম্বী হইবারও অভিযোগ বিদ্যমান। হাদীছবিদগণ এই সকল হাদীছের সমালোচনায় এমনভাবে মুখর যেন মনে হয়, রিওয়ায়াতগুলি শী'আরা আলী (রা)-এর মর্যাদা উচ্চাসনে সমাসীন করিবার লক্ষ্যে তৈরী করিয়াছে।
শামাইলুর রাসূলের গ্রন্থকার বিভিন্ন সূত্রে এই সম্পর্কিত হাদীছগুলি উল্লেখ করিয়া সনদ ও মূল বক্তব্যের খুটিনাটি আলোচনা করিয়াছেন। সূক্ষ্মাতিসূক্ষ্মভাবে সনদে উল্লিখিত রাবীগণের আকীদা ও তাহাদিগের অগ্রহণযোগ্যতা তুলিয়া ধরিয়াছেন, রিওয়ায়াতগুলি পরস্পর অমিল ও মুনকার হইবার কথা স্থানে স্থানে আলোচনা করিয়াছেন। অতঃপর 'আলী (রা) হইতে বর্ণিত রিওয়ায়াতটি সম্পর্কে বলেন, এই রিওয়ায়াত অন্ধকারে ঢাকা। ইহার অধিকাংশ বর্ণনাকারীর কোন পরিচয় নাই। ইহা হইতে প্রতীয়মান হয় যে, শী'আদের কালো হাত দ্বারা ইহা নির্মিত। যাহারা রাসূলুল্লাহ (স)-এর উপর মিথ্যা আরোপ করে আল্লাহ তাহাদিগকে অপদস্থ ও অভিশপ্ত করুন। কারণ রাসূলুল্লাহ (স) বলিয়াছেন :
مَنْ كَذَبَ عَلَيَّ مُتَعَمِّدًا فَلْيَتَبَوَّأْ مَقْعَدَهُ مِنَ النَّارِ. "যেই ব্যক্তি জ্ঞাতসারে আমার উপর মিথ্যা আরোপ করিবে তাহার আবাস জাহান্নাম।"
আগেকার রিওয়ায়াতটিকে খোদ 'আলী (রা)-এর সহিত সম্পর্কিত করা হয়, অথচ ইহাতে তাঁহার বিরাট মর্যাদার কথা বর্ণিত। কোন জ্ঞানবান মানুষের বিবেক 'আলী (রা) কর্তৃক নিজের প্রশংসা সম্বলিত এই রিওয়ায়াতকে তাঁহার সূত্রে বর্ণিত হইবার কথা বিশ্বাস করিতে পারে? 'আলী (রা) হইতে অন্য কোন রিওয়ায়াত এই রাবীগণ বর্ণনা করিয়াছেন বলিয়া কোন প্রমাণ নাই। 'আলী (রা) হইতে নির্ভরযোগ্য বর্ণনাকারী, যেমন উবায়দা আস-সালমানী, শুরায়হ আল-কা'বী, আমের আশ-শা'বী প্রমুখের কোন উল্লেখ নাই। অথচ এক অজানা-অচেনা মহিলার সূত্রে তাহার নিকট হইতে এইরূপ বর্ণনা কেমন করিয়া গ্রহণ করা যায়!
মুওয়াত্তা মালিক, সিহাহ সিত্তা, সুনান ও মুসনাদ গ্রন্থমালার গ্রন্থকারগণ কর্তৃক এই হাদীছ প্রত্যাখ্যাত। এই সম্পর্কিত কোন "সহীহ" ও "হাসান” বর্ণনাও নাই। ইহাই বড় দলীল হইল যে, ইহাদিগের নিকট উক্ত রিওয়ায়াতের কোন ভিত্তি নাই। আবূ আবদুর রাহমান আন-নাসাঈ আলী (রা)-এর একটি চরিত গ্রন্থ রচনা করিয়াছেন। কিন্তু তাহাতে ইহার বর্ণনা নাই। আল-হাকেমও তাঁহার মুসতাদরাকে রিওয়ায়াতটি উল্লেখ করেন নাই। অথচ ইহাদিগকে সামান্য হইলেও 'আলী (রা) প্রীতির প্রতি সম্পর্কিত করা হয়। ইহাকে যাহারা বর্ণনা করিয়াছেন তাহায়া কেবল বিস্ময় বোধ ও অজানা মনে করিয়াই বর্ণনা করিয়াছেন। এই অর্থের অধিকাংশ বর্ণনাই মিথ্যা ও বানোয়াট। এই সকল রিওয়ায়াতের মধ্যে আহমাদ ইব্‌ন সালিহ আল-মিসরী কর্তৃক বর্ণিত রিওয়ায়াত অপেক্ষাকৃত উত্তম। সূত্রটি হইল এইরূপ :
عَنْ أَحْمَدَ بْنِ صَالِحِ الْمِصْرِى عَنِ ابْنِ أَبِي فُدَيْكَ عَنْ مُحَمَّدِ بْنِ مُوسَى الْفِطْرِى عَنْ عَوْنِ بْنِ مُحَمَّدٍ عَنْ أُمِّهِ أُمِّ جَعْفَرٍ عَنْ أَسْمَاءَ.
(একমাত্র এই সূত্রে বর্ণিত রিওয়ায়াতই খায়বারের আস-সাহবা নামক স্থানে ঘটনাটি ঘটিয়াছিল বলিয়া উল্লেখ রহিয়াছে)।
আহমাদ ইব্‌ন সালিহ রিওয়ায়াতটিকে সহীহ বলিয়া ঘটনাটির যথার্থতার পক্ষে অভিমত ব্যক্ত করিয়াছেন বলিয়া বর্ণিত আছে। ইমাম তাহাবী তাঁহার মুশকিলুল আছার গ্রন্থে আলী ইব্‌ন আবদির রাহমানের বরাতে বলিয়াছেন, আহমাদ ইব্‌ন সালিহ আল-মিসরী বলেন:
لا يَنْبَغِي لِمَنْ كَانَ سَبِيلَهُ الْعِلْمُ التَّخَلَّفُ عَنْ حِفْظِ حَدِيْثِ أَسْمَاءَ فِي رَبِّ الشَّمْسِ لأَنَّهُ مِنْ عَلَامَاتِ النُّبُوَّةِ.
"ইলম অন্বেষণকারীর জন্য আসমা (রা)-এর সূর্য ফিরাইয়া আনা সংক্রান্ত হাদীছখানা হইতে বিমুখ হওয়া উচিত নয়। কারণ ইহা নবুওয়াতের অন্যতম আলামত।"
এই অভিমতের পক্ষে আবূ জা'ফার আত-তাহাবীও ঝুঁকিয়া পড়িয়াছেন। আবুল কাসিম আল-হাসকাফীর বর্ণনামতে মু'তাযিলা মতাবলম্বী তর্কবাগিশ আবূ আবদিল্লাহ আল-বাসরী বলেন:
عَوْدُ الشَّمْسِ بَعْدَ مُغِيبِهَا اكَدُ حَالاً فِيمَا يَقْتَضِى نَقْلُهُ لَأَنَّهُ وَإِنْ كَانَ فَضِيلَةً لَأَمِيرِ الْمُؤْمِنِينَ فَإِنَّهُ مِنْ أَعْلَامِ النُّبُوَّةِ.
"সূর্য অস্ত যাওয়ার পর ফিরিয়া আসার প্রেক্ষাপট অত্যন্ত শক্তিশালী যাহা বর্ণনার দাবি রাখে। কারণ ইহাতে আমীরুল মু'মিনীনের ফযীলতের কথা থাকিলেও ইহা নবুওয়াতের অন্যতম আলামত" (প্রাগুক্ত, পৃ. ১৫৮-১৫৯)।
অতঃপর ইব্‌ন কাছীর বলেন, এই বক্তব্যের সারকথা হইল, বিষয়টি মুতাওয়াতির সূত্রে বর্ণিত হইবার বস্তু ছিল। ইহা ঐ সময় পাওয়া যায় যখন হাদীছটি সহীহ হয়। কিন্তু ইহা তো এইরূপ বর্ণিত হয় নাই। সুতরাং প্রমাণিত হয় যে, বিষয়টি প্রকৃতপক্ষে সঠিক (صحیح) নয়। وَاللهُ أَعْلَمُ (প্রাগুক্ত)। সর্বযুগের ইমামগণ এইরূপ হাদীছের সহীহ হওয়াকে অস্বীকার করিতেছেন। তাঁহারা ইহাকে প্রত্যাখ্যান করিয়া ইহার রাবীগণের কঠোর সমালোচনা করিয়া আসিতেছেন। ইহাদিগের অন্যতম হইলেন মুহাম্মাদ ইয়া'লা ইবন 'উবায়দ আত-তানাফিসী, দিমাশকের খতীব ইবরাহীম ইবন ইয়াকৃত আল-জাওযজানী, আবূ বাক্স মুহাম্মাদ ইবন হাতিম আল-বুখারী (যিনি ইব্‌ন যানজাবিয়্যা নামে খ্যাত), হাফিজ আবুল কাসিম ইন্ন আসাকির এবং শায়খ আবুল ফারাজ ইবনুল জাওযী প্রমুখ নবীন ও প্রবীণ হাদীছবেত্তাগণ। হাফিজ আবুল হাজ্জাজ আল মিযযী ও আবুল আব্বাস ইব্‌ن তায়মিয়্যা এইরূপ রিওয়ায়াতকে সুস্পষ্টভাবে বানোয়াট বলিয়া আখ্যায়িত করিয়াছেন। হাকিম আবূ আবদিল্লাহ নিশাপুরী স্বীয় সূত্রে আলী ইবনুল মাদীনী হইতে নিম্নোক্ত উক্তি বর্ণনা করিয়াছেন :
خَمْسَةٌ أَحَادِيثَ يَرْوُونَهَا وَلَا أَصْلَ لَهَا عَنْ رَسُولُ الله ﷺ حَدِيثُ لَوْ دَقَ السَّائِلُ مَا أَفْلَحَ مَنْ رَدَّهُ وَحَدِيْثُ لا وَجْعَ إِلا وَجْعُ العَيْنِ وَلَا غَمُ إِلَّا غَمُ الدِّيْنِ وَحَدِيْثُ أَنَّ الشَّمْسِ رُدَّتْ عَلَى عَلَى بْنِ أَبِي طَالِبٍ وَحَدِيْثِ أَنَا أَكْرَمُ عَلَى اللَّهِ مِنْ أَنْ يَدَعَنَّى تَحْتَ الْأَرْضِ مَأَتَى عَامٍ وَحَدِيثُ أَفْطَرَ الحَاجِمُ وَالْمَحْجُومُ أَنَّهُمَا كَانَا يَعْتَابَانِ.
"পাঁচটি হাদীছ ইহারা বর্ণনা করেন, অথচ ইহা রাসূলুল্লাহ (স) হইতে বর্ণিত হইবার কোন প্রমাণ নাই। ১. ভিক্ষুক যদি সত্যবাদী হয় তাহা হইলে তাহাকে যে ফিরাইয়া দিবে তাহার কল্যাণ হইবে না। ২. চক্ষুর ব্যথা ছাড়া অন্য কোন ব্যথা নাই, দীনের চিন্তা ব্যতীত অন্য কোন চিন্তা নাই। ৩. সূর্য আলী ইব্‌ন আবী তালিব (রা)-এর জন্য ফিরাইয়া দেওয়া হইয়াছিল। ৪. আমি আল্লাহর অধিক করুণা অর্জনকারী হইব যে, আমাকে তিনি দুই শত বৎসর ভূগর্ভে রাখিয়া দিবেন। ৫. রক্তমোক্ষণকর্তা ও কৃতের রোযা ভঙ্গ হইয়া যায়। ইহারা গীবতে লিপ্ত হয়।”
ইমাম তাহাবীর নিকট সূর্য প্রত্যাগত হইবার বিষয়টি অস্পষ্ট থাকিলেও ইমাম আবূ হানীফা (র) হইতে ইহাকে অস্বীকার করা এবং ইহার রাবীগণ সম্পর্কে বিদ্রূপ করিবার কথা বর্ণিত রহিয়াছে। আবু হানীফা (র) একজন অতীব নির্ভরযোগ্য ইমাম। কৃষ্ণার একজন বাসিন্দা ছিলেন। এতদসত্ত্বেও তাঁহার সম্পর্কে আল্লাহ ও রাসূল প্রদত্ত ফযীলত ছাড়া বাড়তি 'আলী (রা) প্রীতির কোন অভিযোগ নাই।
'ইয়ূশা ইব্‌ নূন (আ) সম্পর্কে সূর্য ফিরিয়া আসিবার যেই ঘটনা বর্ণিত হইয়াছে ইহা আসলে সূর্য অস্ত যাইবার পর ফিরিয়া আসা নয়, বরং সূর্য অস্তমিত হইতে কিছু সময়ের জন্য আটকিয়া থাকা (ইব্‌ন কাছীর, শামাইলুর রাসূল, পৃ. ১৬০)। শায়খ ইব্‌ তায়মিয়্যার অভিযোগের জওয়াবে শী'আ গুরু জামালুদ্দীন ইউসুফ ইবনুল-মুতাহ্হার নামে পরিচিত আল-ইমামা নামে একটি গ্রন্থ প্রণয়ন করিয়াছেন। ইহাতে তিনি বলিয়াছেন, সূর্য অস্তমিত হইবার পর দুইবার প্রত্যাগত হইয়াছিল। প্রথমবার এই সম্পর্কে জাবির ও আবূ সাঈদ (রা) হইতে নিম্নোক্ত রিওয়ায়াতটি উল্লেখ করা হইয়াছে।
إِنْ رَسُولَ اللهِ ﷺ نَزَلَ عَلَيْهِ جِبْرِيلُ يَوْمًا يُنَاجِيهِ مِنْ عِنْدِ اللَّهِ فَلَمَّا تَغَشَاهُ الْوَحْى تَوَسَّدَ فَخِذَ أَمِيرِ الْمُؤْمِنِينَ فَلَمْ يَرْفَعْ رَأْسَهُ حَتَّى غَابَتِ الشَّمْسُ فَصَلَّى عَلِيُّ الْعَصْرَ সী.বি.-৭/৩৭ www.pathagar.com
بِالإيْمَاء. فَلَمَّا اسْتَيْقَظَ رَسُولُ اللهِ ﷺ قَالَ لَهُ سَلِ اللهَ أَنْ يُرَدَّ عَلَيْكَ الشَّمْسَ فَتُصَلَّى قَائِمًا فَدَعَا فَرُدَّتِ الشَّمْسُ فَصَلَّى الْعَصْرَ قَائِمًا.
এই বর্ণনায় রহিয়াছে, 'আলী (রা)-এর উরুর উপর রাসূলুল্লাহ (স)-এর মাথা থাকা অবস্থায় 'আলী (রা) ইশারায় সালাত আদায় করিয়াছিলেন। 'আলী (রা)-এর দু'আতেই সূর্যকে ফিরাইয়া দেওয়া হইয়াছিল।
দ্বিতীয়বার যখন 'আলী (রা) ফুরাত নদী পাড়ি দিতে চাহিয়াছিলেন তখন অনেক সাহাবী তাঁহাদিগের বাহনের পরিচর্যায় মশগুল হইয়া পড়িয়াছিলেন। এই সময় তিনি কিছু সংখ্যক সাথী লইয়া আসরের সালাত আদায় করিলেন এবং অন্যদের সালাত কাযা হইয়া গেল। এই ব্যাপারে তাহারা কিছু বলাবলি করিতে লাগিল। 'আলী (রা) সূর্য ফিরাইয়া দিবার দু'আ করিলেন। তখন সূর্যকে ফিরাইয়া দেওয়া হইয়াছিল। ইবনুল মুতাহহার এই ব্যাপারে আল-হিময়ারীর নিম্নোক্ত কবিতার উদ্ধৃতি দিয়াছেন:
ردت عَلَيْهِ الشَّمْسُ لَمَّا فَاتَهُ + وَقْتُ الصَّلَاةِ وَقْتُ دَنَتْ لِلْمَغْرِبِ حَتَّى تَبَلَّجَ نُورُهَا فِي وَقْتِهَا + لِلْعَصْرِ ثُمَّ هَوَتْ هُوِي الْكَوْكَبِ وَعَلَيْهِ قَدْ رُدَّتْ بِبَابِلَ مَرَّةَ + أُخْرَى وَمَا رُدَّتْ لِخَلْقٍ مُقَرَّب.
এখানে বলা হইয়াছে, 'বাবিল' শহরে দ্বিতীয়বার 'আলী (রা)-এর জন্য সূর্যকে ফিরাইয়া দেওয়া হইয়াছিল। সূর্যকে অন্য কোন প্রিয় সৃষ্টির জন্য ফিরাইয়া দেওয়া হয় নাই।
এই সম্পর্কে ইব্‌ন তায়মিয়‍্যা বলেন, সূর্যকে ফিরাইয়া আনার হাদীছ আবূ জা'ফার তাহাবী ও কাযী আয়াযের মত কিছু লোক উল্লেখ করিয়াছেন। তাহারা ইহাকে রাসূলুল্লাহ (স)-এর অলৌকিক ঘটনাবলীর মধ্যে গণ্য করিয়াছেন। কিন্তু বিজ্ঞ হাদীছবেত্তাগণ ইহাকে মিথ্যা বানোয়াট হাদীছ বলিয়া অভিহিত করিয়াছেন। বাবিলের ঘটনা সম্পর্কে ইব্‌ন কাছীর বলেন, ইহার কোন সনদ নাই। আমার ধারণা ইহা কোন "যিনদীক” শী'আ কর্তৃক আবিষ্কৃত ( والله اعلم)। আল-হিময়ারীর কবিতা সম্পর্কে তিনি বলেন, ইহা কোন অবস্থাতেই দলীল নয়। ইহা ইবনুল মুতাহহারের মত বালখিল্যতা মাত্র। 'আলী (রা) সম্পর্কে বাবিলের ঘটনাটি সম্পর্কে আবূ দাউদ তাঁহার সুনান গ্রন্থে বর্ণনা করিয়াছেন যে, 'আলী (রা) বাবিল স্থানটি অতিক্রম করিবার সময় আসরের সালাতের সময় হইয়া গিয়াছিল। এতদসত্বেও তিনি এই স্থানটি অতিক্রম করিবার পূর্বে সালাত আদায় করেন নাই। এই সম্পর্কে তিনি বলিয়াছিলেন:
نَهَانِي خَلِيْلِي أَنْ أَصَلَّى بِأَرْضِ بَابِلَ فَإِنَّهَا مَلْعُونَةٌ.
"আমার বন্ধু রাসূলুল্লাহ (স) আমাকে নিষেধ করিয়াছিলেন "বাবিল” ভূমিতে সালাত আদায় করিতে। কারণ ইহা অভিশপ্ত স্থান" (শামাইলুর রাসূল, পৃ. ১৬১-১৬৩)।
'আলী (রা)-এর জন্য সূর্য অস্ত যাইবার পর তাহার পুনরুত্থান সম্পর্কিত এই দীর্ঘ আলোচনার পর এই কথার উপর বিশ্বাস স্থাপনের ধারে কাছেও যাওয়া যায় না। যাহারা হাদীছের শুদ্ধাশুদ্ধি লইয়া সূক্ষ্মাতিসূক্ষ্মভাবে গবেষণা করেন তাহাদিগের নিকট দিবালোকের মত প্রস্ফুটিত হইয়া উঠিবে যে, ইহা আবিষ্কৃত মনগড়া হাদীছ। তবে যাহারা ইহার সত্যতা সম্পর্কে নীরব ছিলেন, যেমন কাযী আয়ায ও ইমাম তাহাবী, তাহাদিগের নিকট হয়ত হাদীছগুলির সার্বিক বিষয় উত্থাপিত হয় নাই। তাহারা ভাবিয়াছেন, আল্লাহ তাঁহার বান্দা সৃষ্টিকুলের সেরা মানবের জন্য কি না করিতে পারেন। তাই কেহ ইহাকে আলামতে নবুওয়াত, কেহ মু'জিযা মনে করিয়া উল্লেখ করিয়াছেন। হাদীছ ও তাহার সনদের মধ্যে যে ব্যাপক অমিল রহিয়াছে ইহাকে মানিয়া লইবার কোনই পথ নাই। বিষয়টিকে যাহারা মানিয়া লইয়াছেন তাহারা যদি আহলে হক্কের অনুসারী হইয়া থাকেন তাহা হইলে তাহারা সনদ ও বর্ণনার প্রতি ভ্রুক্ষেপ না করিয়া কেবল কুদরতে ইলাহীর প্রতি লক্ষ্য করিয়াছেন। আর শী'আগণ তো ইহাকে স্বীয় স্বার্থসিদ্ধির লক্ষ্যে অবমূল্যায়ন করিয়াছে। কারণ আহলে হকের যাহারা ইহাকে সম্পূর্ণভাবে প্রত্যাখ্যান করেন নাই তাহারা ইহাকে রাসূলুল্লাহ (স)-এর মর্যাদার অন্তর্ভুক্ত ভাবিয়াছেন ( واللهُ اَعْلَمُ )।
খায়বার বিজয় সম্পর্কে হাসসান (রা)-এর কবিতা
ইব্‌ন হিশাম ইব্‌ন ইসহাকের বরাতে বলেন, খায়বার দিবসে হাসসান ইব্‌ন ছাবিত (রা) নিম্নোক্ত কবিতা আবৃত্তি করিয়াছিলেন:
(১) بِئْسَمَا قَاتَلَتْ خَيَابِرُ عَمَّا + جَمَعُوا مِنْ مَزَارِعَ وَنَخِيلٍ
(২) كَرِهُوا الْمَوْتَ فَاسْتَبِيحَ حِمَاهُمْ + وَأَقَرُّوا فِعْلَ اللَّهِيمِ الدَّلِيلِ
(৩) أَمِنَ الْمَوْتِ يَهْرِبُوا فَإِنَّ الْمَوْتَ + مَوْتَ الْهَزَالِ غَيْرُ جَمِيل
(১) “খায়বারবাসীরা যে কৃষিজমি ও খেজুর বাগানের মালিক ছিল, তাহার প্রতিরক্ষায় যুদ্ধ ছিল অত্যন্ত নিকৃষ্ট।
(২) তাহারা মৃত্যুকে অপসন্দ করিয়াছিল, ফলে তাহাদের সংরক্ষিত স্থান বৈধ করিয়া লওয়া হয়। তাহারা একান্ত ইতর শ্রেণীর আচরণ করিয়াছে।
(৩) তাহারা কি মৃত্যু হইতে পলায়ন করিতে পারিবে? কাপুরুষদের মৃত্যু নিশ্চয়ই উত্তম ও কাংক্ষিত নহে।”

কথিত আছে যে, খায়বার যুদ্ধকালে সংঘটিত ঘটনাবলীর একটি এই যে, খায়বার হইতে প্রত্যাবর্তনকালে রাসূলুল্লাহ (স) 'আস-সাহবা' নামক স্থানে পৌঁছিলে এখানে সায়্যিদা সাফিয়্যা (রা)-এর সহিত তাঁহার বাসর হয়। এই স্থানেই তিনি 'আসরের সালাত আদায় করিলেন অতঃপর তাঁহার মাথা 'আলী (রা)-এর উরুর উপর রাখিয়া শুইলেন। এমতাবস্থায় ওহী আসিবার লক্ষণাদি তাঁহার মধ্যে পরিলক্ষিত হইল। 'আলী (রা) আসরের সালাত আদায় করেন নাই। ওহী অবতরণ এতই দীর্ঘায়িত হইল যে, সূর্য অস্তমিত হইয়া গেল। ওহী অবতরণ শেষ হইলে রাসূলুল্লাহ (স) 'আলী (রা)-কে জিজ্ঞাসা করিলেন, "আসরের সালাত আদায় করিয়াছ কি"? 'আলী (রা) নিবেদন করিলেন, হে আল্লাহ্র রাসূল! আমি সালাত আদায় করি নাই। রাসূলুল্লাহ (স) এই সময় দু'আ করিলেন, হে আমার প্রতিপালক! যদি আলী আপনার এবং আপনার রাসূলের আনুগত্যে ব্যস্ত থাকে, তাহা হইলে সূর্যকে আদেশ করুন উহা যেন পুনরায় দৃষ্ট হয়। ইহাতে সে আসরের সালাত আদায় করিতে সক্ষম হইবে। মহান আল্লাহ তাঁহার দু'আ কবুল করিলেন। ফলে সূর্য অস্তমিত হইবার পরও দ্বিতীয়বার উদিত হইল। সূর্যের কিরণ পাহাড় ও টিলায় বিকীরিত হইল। সৃষ্টিজগত ইহা প্রত্যক্ষ করিল। 'আলী (রা) উযু করিলেন এবং সালাত আদায় করিলেন।
'আল্লামা দিহলাবী বলেন, রাসূলুল্লাহ (স)-এর জন্য সূর্যকে ডুবিতে না দেওয়া ও ফিরাইয়া আনা তিনটি স্থানে পাওয়া যায়। (এক) মি'রাজ হইতে ফিরিবার পর যখন কোন এক কাফেলা সম্পর্কে কুরায়শদের দ্বারা জিজ্ঞাসিত হইয়া তিনি বলিয়াছিলেন যে, ইহারা বুধবার দিন এই স্থানে পৌঁছিবে। (দুই) খনদক দিবসে আসরের সালাত কাযা হইয়া গেলে রাসূলুল্লাহ (স) সূর্য ফিরাইয়া দিবার দু'আ করিয়াছিলেন। কিন্তু এই ব্যাপারে স্বতসিদ্ধ কথা হইল, সূর্য অস্তমিত হইবার পর রাসূলূল্লাহ (س) কাযা পড়িয়াছিলেন। (তিন) এখানকার বর্ণিত ঘটনা যে, 'আলী (রা)-এর আসরের সালাত কাযা হইয়া গেলে রাসূলুল্লাহ (স)-এর দু'আর ফলে সূর্যকে ফিরাইয়া দেওয়া হইয়াছিল। এই হাদীছগুলি সম্পর্কে মুহাদ্দিছগণ বিভিন্ন ব্যাখ্যা দিয়াছেন। যূশা' ইব্‌ন নূন (আ) সম্পর্কে একটি বিশুদ্ধ হাদীছ বর্ণিত:
لَمْ يُحْبَسِ الشَّمْسُ عَلَى أَحَدٍ إِلَّا لِيُوشَعَ بْنِ نُونٍ.
"যূশা' ইব্‌ন নূন (আ) ব্যতীত আর কাহারও জন্য সূর্যকে অস্ত যাওয়া হইতে বিরত রাখা হয় নাই।” হাদীছটি মিশকাতে বুখারী ও মুসলিমের উদ্ধৃতিতে আবূ হুরায়রা (রা) হইতে বর্ণিত (মাদারিজুন নুবুওয়াত, প্রাগুক্ত, পৃ. ৪২৬)। হাদীছটি উপরে উল্লিখিত বর্ণনার পরিপন্থী। যেহেতু বিষয়টি অত্যন্ত বিরোধপূর্ণ, তাই এখানে বিস্তারিত আলোচনা তুলিয়া ধরা হইল যাহাতে বিষয়টি আরও স্পষ্ট হয়। এই প্রসংগে তিনি নিম্নোক্ত হাদীছ উল্লেখ করেন:
عَنْ أَسْمَاءَ بِنْتِ عُمَيْسٍ قَالَتْ كَانَ رَسُولُ اللهِ ﷺ يُوحِي إِلَيْهِ وَرَاسُهُ فِي حِجْرٍ عَلَى فَلَمْ يُصَلِّ الْعَصْرَ حَتَّى غَرَبَتِ الشَّمْسُ فَقَالَ رَسُولُ اللهِ ﷺ صَلَّيْتَ الْعَصْرَ وَقَالَ أَبُو أُمَيَّةَ صَلَّيْتَ يَا عَلِيُّ قَالَ لَا قَالَ رَسُولُ اللهِ ﷺ وَقَالَ أَبُو أُمَيَّةَ فَقَالَ النَّبِيُّ ﷺ اللَّهُمَّ إِنَّهُ كَانَ فِي طَاعَتِكَ وَطَاعَةِ نَبِيِّكَ وَقَالَ أَبُو أُمَيَّةَ رَسُولِكَ فَارْدُدْ عَلَيْهِ الشَّمْسَ قَالَتْ أَسْمَاءُ فَرَأَيْتُهَا غَرَبَتْ ثُمَّ رَأَيْتُهَا طَلَعْتُ بَعْدَ مَا غَرَبَتْ.
"আসমা বিন্ত 'উমায়স (রা) বলেন, রাসূলুল্লাহ (স)-এর উপর ওহী অবতীর্ণ হইতেছিল। এমতাবস্থায় তাহার মাথা 'আলী (রা)-এর কোলে ছিল। ফলে তিনি আসরের সালাত আদায় করিবার পূর্বেই সূর্য অস্তমিত হইয়া গেল। রাসূলুল্লাহ (স) অতঃপর জিজ্ঞাসা করিলেন, হে আলী! তুমি কি আসরের সালাত আদায় করিয়াছ? তিনি বলিলেন, না। রাসূলুল্লাহ (স) বলিলেন : হে আল্লাহ! নিশ্চয় 'আলী তোমার আনুগত্যে ও তোমার নবীর আনুগত্যে ছিল। সুতরাং তুমি তাহার জন্য সূর্যকে ফিরাইয়া দাও। আসমা (রা) বলেন, আমি দেখিলাম সূর্য অস্তমিত হইয়া গিয়াছে, অতঃপর তাহা উদিত দেখিলাম।"
আবূ আবদুল্লাহ ইব্‌ন মানদা সূত্রে বর্ণিত এই হাদীছকে শায়খ আবুল ফারাজ ইবনুল জাওযী (র) জাল (موضوع) হাদীছের মধ্যে গণ্য করিয়াছেন। আবূ জা'ফার আল-উকায়লী সূত্রেও একটি হাদীছ বর্ণিত আছে। ইবনুল জাওযী এই হাদীছকেও জাল (موضوع) বলিয়া অভিহিত করিয়াছেন। উক্ত হাদীছের বর্ণনাকারিগণের মধ্যেও বিভিন্নতা রহিয়াছে। হাফিজ ইব্‌ন 'আসাকির এই হাদীছকে মুনকার (منکر) বলিয়া অভিহিত করিয়াছেন। ইহাতে একাধিক অজ্ঞাত পরিচয় বর্ণনাকারী রহিয়াছেন। এই সম্পর্কে ইন্ন কাছীর তাঁহার অভিমত ব্যক্ত করেন যে, এই হাদীছ যত সনদেই বর্ণিত হইয়াছে সবগুলিই দুর্বল ও মুনকার। এমন কোন সনদ নাই যেখানে কোন না কোন এক শী'আ মতবাদী, অপরিচিত কিংবা প্রত্যাখ্যাত ব্যক্তি নাই।
এই প্রকার হাদীছের সনদ মুত্তাসিল হইলেও এইরূপ গুরুত্বপূর্ণ বিষয়ে খবরে ওয়াহিদ পর্যায়ের হাদীছ গ্রহণযোগ্য হয় না, খবরে মুতাওয়াতির কিংবা খবরে মাশহুর হইতে হয়। আমরা আল্লাহ্ কুদরত ও রাসূলুল্লাহ (স)-এর মাধ্যমে তাহার প্রকাশের সম্ভাবনাকে অস্বীকার করি না। সহীহ বুখারীর রিওয়ায়াতে বর্ণিত আছে, সূর্যকে যূশা' ইব্‌ নূন (আ)-এর জন্য ফিরাইয়া আনা হইয়াছিল। ইহা ছিল সেই দিনের ঘটনা যেই দিন তিনি বায়তুল মাকদিস অবরোধ করিয়াছিলেন। ইহা ছিল জুমু'আর দিন। অপরদিকে বনী ইসরাঈল শনিবার দিন যুদ্ধ করিত না। এই সময় যূশা' (আ) সূর্যের দিকে দৃষ্টিপাত করিলেন। সূর্যের তখন অস্ত যাওয়ার অবস্থা। তিনি বলিলেনঃ হে সূর্য! তুমি যেমন আদিষ্ট, আমিও তেমন আদিষ্ট। হে আল্লাহ! সূর্যকে আমার জন্য থামাইয়া রাখ। ফলে আল্লাহ তাঁহার জন্য সূর্যকে থামাইয়া রাখিয়াছিলেন, যতক্ষণ না তাহারা বায়তুল মাকদিস জয় করিয়াছিলেন। যূশা' ইবন নূন (আ), এমনকি সকল নবী হইতে রাসূলুল্লাহ (স)-এর মর্যাদা অনেক ঊর্ধ্বে। তবুও আমরা তাঁহার নিকট হইতে যাহা বিশুদ্ধ সূত্রে বর্ণিত আছে তাহাই বর্ণনা করিব। অন্য যাহা শুদ্ধ নহে তাহা তাঁহার সহিত সম্পৃক্ত করিব না। যদি এইরূপ বর্ণনা শুদ্ধ হইত তাহা হইলে সবার আগে আমরাই ইহা সমর্থন করিতাম (ইব্‌ن কাছীর, শামাইলুর রাসূল, পৃ. ১৪৪-১৪৮)।
অন্য আরও একটি সূত্রে এইরূপ বর্ণিত আছে:
عَنْ أَسْمَاءَ بِنْتِ عُمَيْسٍ قَالَتْ لَمَّا كَانَ يَوْمَ شُغْلِ عَلَى لِمَكَانِهِ مِنْ قَسْمِ الْمَغْنَمِ حَتَّى غربت الشَّمْسُ أَوْ كَادَتْ فَقَالَ رَسُولُ الله ﷺ أَمَا صَلَّيْتَ قَالَ لَا فَدَعَا اللَّهَ فَارْتَفَعَت الشَّمْسُ حَتَّى تَوَسَطَتِ السَّمَاءُ فَصَلَّى عَلِيُّ فَلَمَّا غَرَبَتِ الشَّمْسُ سَمِعْتُ لَهَا صَرِيرًا كَصَرِيرِ الْمِنْشَارِ فِي الْحَدِيدِ.
'আমর ইবন ছাবিত হইতে বর্ণিত আছে:
قَالَ سَأَلْتُ عَبْدَ اللَّهِ بْنَ حَسَنِ بْنِ حُسَيْنِ بْنِ عَلَى بْنِ أَبِي طَالِبٍ عَنْ حَدِيْثِ رَدَّ الشَّمْسِ عَلَى عَلَى بْنِ أَبِي طَالِب هَلْ يُثْبِتُ عِنْدَكُمْ فَقَالَ لِي مَا أَنْزَلَ اللَّهُ فِي كِتَابِهِ أَعْظَمُ مِنْ رَدَّ الشَّمْسِ قُلْتُ صَدَقْتَ جَعَلَنِي اللهُ فِدَاكَ وَلَكِنَّى أَحَبُّ عَنْ أَسْمَعَهُ مِنْكَ فَقَالَ حَدَّثَنِي أَبِي الْحَسَنُ عَنْ أَسْمَاءَ بِنْتِ عُمَيْسٍ أَنَّهَا قَالَتْ أَقَبَلَ عَلِيُّ بْنُ أَبِي طَالِبٍ ذَاتَ يَوْمٍ وَهُوَ يُرِيدُ أَنْ يُصَلَّى العَصْرَ مَعَ رَسُولِ اللهِ ﷺ فَوَافَقَ رَسُولَ اللَّهِ ﷺ قَدْ انْصَرَفَ وَنَزَلَ عَلَيْهِ
الْوَحْيُ فَاسْنَدَهُ إِلَى صَدْرِهِ فَلَمْ يَزَلْ مُسْنِدُهُ إِلَى صَدْرِهِ حَتَّى أَفَاقَ رَسُولُ اللَّهِ ﷺ فَقَالَ أَصَلَّيْتَ الْعَصْرَ يَا عَلِيُّ قَالَ جِئْتُ وَالْوَحْيُ يَنْزِلُ عَلَيْكَ فَلَمْ أَزَلْ مُسْنِدُكَ إِلِى صَدْرِي حَتَّى السَّاعَةَ فَاسْتَقْبَلَ رَسُولَ اللَّهِ ﷺ وَقَدْ غَرَبَتِ الشَّمْسُ وَقَالَ اللَّهُمْ إِنَّ عَلَيْا كَانَ فِي طاعَتِكَ فَارْدُدْهَا عَلَيْهِ قَالَتْ أَسْمَاءُ فَأَقْبَلَتِ الشَّمْسُ وَلَهَا صَرِيرٌ كَصَرِيرِ الرَّحَى حَتَّى كَانَتْ فِي مَوْضِعِهَا وَقْتُ الْعَصْرِ فَقَامَ عَلَى مُتَمَكِّنَا فَصَلَّى فَلَمَّا فَرَغَ رَجَعَتِ الشَّمْسُ وَلَهَا صَرِيرٌ كَصَرِيرِ الرَّحَى فَلَمَّا غَابَتْ اخْتَلَطَ الظَّلامُ وَبَدَتِ النُّجُومُ.
এই রিওয়ায়াতে রহিয়াছে, আবদুল্লাহ ইব্‌ন্ন হাসান ইবন হুসায়ন ইবন 'আলী (রা) বলিয়াছেন, আল্লাহ তা'আলা আল-কুরআনে সূর্য ফিরাইয়া লওয়ার বিষয় হইতে বড় অন্য কোন জিনিস অবতীর্ণ করেন নাই, অথচ কুরআনে ইহার কোন উল্লেখ নাই।
আবূ সা'ঈদ আল-খুদরী (রা) হইতে বর্ণিত আছে:
قَالَ الْحُسَيْنُ بْنُ عَلَى سَمِعْتُ أَبَا سَعِيدٍ الْخُدْرِى يَقُولُ دَخَلْتُ عَلَى رَسُولِ اللَّهِ ﷺ فَإِذَا رَأْسُهُ فِي حَجْرٍ عَلَى وَقَدْ غَابَتِ الشَّمْسُ فَانْتَبَهَ النَّبِيِّ ﷺ وَقَالَ يَا عَلِيُّ أَصَلَّيْتَ الْعَصْرَ قَالَ لَا يَا رَسُولَ اللهِ مَا صَلَّيْتُ كَرِهْتُ أَنْ أَضَعَ رَأْسَكَ مِنْ حَجْرِي وَأَنْتَ وَاجِعٌ فَقَالَ رَسُولَ اللهِ ﷺ يَا عَلِيُّ ادْعُ يَا عَلَى أَدْعُ أَنْ تُرَدُّ عَلَيْكَ الشَّمْسُ فَقَالَ عَلِيُّ يَا رَسُولَ اللَّهِ أَدْعُ أَنْتَ وَأَنَا أُؤَمِّنُ فَقَالَ يَارَبِّ أَنْ عَلِيًّا فِي طَاعَتِكَ وَطَاعَةِ نَبِيِّكَ فَارْدُدْ عَلَيْهِ الشَّمْسُ قَالَ أَبُو سَعِيدٍ فَوَاللَّهِ لَقَدْ سَمِعْتُ لِلشَّمْسِ صَرِيرًا كَصَرِيرِ النَّكْبَرَةِ حَتَّى رَجَعَتْ بَيْضَاءَ نقية.
এই রিওয়ায়াতে আছে যে, রাসূলুল্লাহ (স) অসুস্থ থাকায় 'আলী (রা)-এর কোলে মাথা রাখিয়াছিলেন। রাসূলুল্লাহ (স) প্রথমে 'আলী (রা)-কে সূর্য ফিরাইয়া দিবার জন্য দু'আ করিতে বলিয়াছিলেন। কিন্তু তিনি আরয করিলেন, হে আল্লাহ্র রাসূল! আপনিই দু'আ করুন, আমি আমীন বলিব। 'আলী ইব্‌ن আবী তালিব 'রা)-এর এই সম্পর্কিত রিওয়ায়াতটি হইল:
عَنْ جُوَيْرِيَّةَ بِنْتِ شَهْرٍ قَالَتْ خَرَجْتُ مَعَ عَلَى بْنِ أَبِي طَالِبٍ فَقَالَ يَا جُوَيْرِيَّةُ إِنَّ رَسُولَ اللهِ ﷺ كَانَ يُوحَى إِلَيْهِ وَرَاسُهُ فِي حِجْرِي فَذَكَرَ الْحَدِيثَ.
(শামাইলুর রাসূল, পৃ. ১৪৯-১৫০)।
এই সম্পর্কিত যতগুলি হাদীছ বর্ণিত আছে উহার কোনটিই সমালোচনামুক্ত নয়। এমনকি অনেক রাবী সম্পর্কে কট্টর শী'আ মতাবলম্বী হইবারও অভিযোগ বিদ্যমান। হাদীছবিদগণ এই সকল হাদীছের সমালোচনায় এমনভাবে মুখর যেন মনে হয়, রিওয়ায়াতগুলি শী'আরা আলী (রা)-এর মর্যাদা উচ্চাসনে সমাসীন করিবার লক্ষ্যে তৈরী করিয়াছে।
শামাইলুর রাসূলের গ্রন্থকার বিভিন্ন সূত্রে এই সম্পর্কিত হাদীছগুলি উল্লেখ করিয়া সনদ ও মূল বক্তব্যের খুটিনাটি আলোচনা করিয়াছেন। সূক্ষ্মাতিসূক্ষ্মভাবে সনদে উল্লিখিত রাবীগণের আকীদা ও তাহাদিগের অগ্রহণযোগ্যতা তুলিয়া ধরিয়াছেন, রিওয়ায়াতগুলি পরস্পর অমিল ও মুনকার হইবার কথা স্থানে স্থানে আলোচনা করিয়াছেন। অতঃপর 'আলী (রা) হইতে বর্ণিত রিওয়ায়াতটি সম্পর্কে বলেন, এই রিওয়ায়াত অন্ধকারে ঢাকা। ইহার অধিকাংশ বর্ণনাকারীর কোন পরিচয় নাই। ইহা হইতে প্রতীয়মান হয় যে, শী'আদের কালো হাত দ্বারা ইহা নির্মিত। যাহারা রাসূলুল্লাহ (স)-এর উপর মিথ্যা আরোপ করে আল্লাহ তাহাদিগকে অপদস্থ ও অভিশপ্ত করুন। কারণ রাসূলুল্লাহ (س) বলিয়াছেন :
مَنْ كَذَبَ عَلَيَّ مُتَعَمِّدًا فَلْيَتَبَوَّأْ مَقْعَدَهُ مِنَ النَّارِ. "যেই ব্যক্তি জ্ঞাতসারে আমার উপর মিথ্যা আরোপ করিবে তাহার আবাস জাহান্নাম।"
আগেকার রিওয়ায়াতটিকে খোদ 'আলী (را)-এর সহিত সম্পর্কিত করা হয়, অথচ ইহাতে তাঁহার বিরাট মর্যাদার কথা বর্ণিত। কোন জ্ঞানবান মানুষের বিবেক 'আলী (রা) কর্তৃক নিজের প্রশংসা সম্বলিত এই রিওয়ায়াতকে তাঁহার সূত্রে বর্ণিত হইবার কথা বিশ্বাস করিতে পারে? 'আলী (রা) হইতে অন্য কোন রিওয়ায়াত এই রাবীগণ বর্ণনা করিয়াছেন বলিয়া কোন প্রমাণ নাই। 'আলী (را) হইতে নির্ভরযোগ্য বর্ণনাকারী, যেমন উবায়দা আস-সালমানী, শুরায়হ আল-কা'বী, আমের আশ-শা'বী প্রমুখের কোন উল্লেখ নাই। অথচ এক অজানা-অচেনা মহিলার সূত্রে তাহার নিকট হইতে এইরূপ বর্ণনা কেমন করিয়া গ্রহণ করা যায়!
মুওয়াত্তা মালিক, সিহাহ সিত্তা, সুনান ও মুসনাদ গ্রন্থমালার গ্রন্থকারগণ কর্তৃক এই হাদীছ প্রত্যাখ্যাত। এই সম্পর্কিত কোন "সহীহ" ও "হাসান” বর্ণনাও নাই। ইহাই বড় দলীল হইল যে, ইহাদিগের নিকট উক্ত রিওয়ায়াতের কোন ভিত্তি নাই। আবূ আবদুর রাহমান আন-নাসাঈ আলী (রা)-এর একটি চরিত গ্রন্থ রচনা করিয়াছেন। কিন্তু তাহাতে ইহার বর্ণনা নাই। আল-হাকেমও তাঁহার মুসতাদরাকে রিওয়ায়াতটি উল্লেখ করেন নাই। অথচ ইহাদিগকে সামান্য হইলেও 'আলী (রা) প্রীতির প্রতি সম্পর্কিত করা হয়। ইহাকে যাহারা বর্ণনা করিয়াছেন তাহায়া কেবল বিস্ময় বোধ ও অজানা মনে করিয়াই বর্ণনা করিয়াছেন। এই অর্থের অধিকাংশ বর্ণনাই মিথ্যা ও বানোয়াট। এই সকল রিওয়ায়াতের মধ্যে আহমাদ ইব্‌ن সালিহ আল-মিসরী কর্তৃক বর্ণিত রিওয়ায়াত অপেক্ষাকৃত উত্তম। সূত্রটি হইল এইরূপ :
عَنْ أَحْمَدَ بْنِ صَالِحِ الْمِصْرِى عَنِ ابْنِ أَبِي فُدَيْكَ عَنْ مُحَمَّدِ بْنِ مُوسَى الْفِطْرِى عَنْ عَوْنِ بْنِ مُحَمَّدٍ عَنْ أُمِّهِ أُمِّ جَعْفَرٍ عَنْ أَسْمَاءَ.
(একমাত্র এই সূত্রে বর্ণিত রিওয়ায়াতই খায়বারের আস-সাহবা নামক স্থানে ঘটনাটি ঘটিয়াছিল বলিয়া উল্লেখ রহিয়াছে)।
আহমাদ ইব্‌ন সালিহ রিওয়ায়াতটিকে সহীহ বলিয়া ঘটনাটির যথার্থতার পক্ষে অভিমত ব্যক্ত করিয়াছেন বলিয়া বর্ণিত আছে। ইমাম তাহাবী তাঁহার মুশকিলুল আছার গ্রন্থে আলী ইব্‌ن আবদির রাহমানের বরাতে বলিয়াছেন, আহমাদ ইব্‌ন সালিহ আল-মিসরী বলেন:
لا يَنْبَغِي لِمَنْ كَانَ سَبِيلَهُ الْعِلْمُ التَّخَلَّفُ عَنْ حِفْظِ حَدِيْثِ أَسْمَاءَ فِي رَبِّ الشَّمْسِ لأَنَّهُ مِنْ عَلَامَاتِ النُّبُوَّةِ.
"ইলম অন্বেষণকারীর জন্য আসমা (রা)-এর সূর্য ফিরাইয়া আনা সংক্রান্ত হাদীছখানা হইতে বিমুখ হওয়া উচিত নয়। কারণ ইহা নবুওয়াতের অন্যতম আলামত।"
এই অভিমতের পক্ষে আবূ জা'ফার আত-তাহাবীও ঝুঁকিয়া পড়িয়াছেন। আবুল কাসিম আল-হাসকাফীর বর্ণনামতে মু'তাযিলা মতাবলম্বী তর্কবাগিশ আবূ আবদিল্লাহ আল-বাসরী বলেন:
عَوْدُ الشَّمْسِ بَعْدَ مُغِيبِهَا اكَدُ حَالاً فِيمَا يَقْتَضِى نَقْلُهُ لَأَنَّهُ وَإِنْ كَانَ فَضِيلَةً لَأَمِيرِ الْمُؤْمِنِينَ فَإِنَّهُ مِنْ أَعْلَامِ النُّبُوَّةِ.
"সূর্য অস্ত যাওয়ার পর ফিরিয়া আসার প্রেক্ষাপট অত্যন্ত শক্তিশালী যাহা বর্ণনার দাবি রাখে। কারণ ইহাতে আমীরুল মু'মিনীনের ফযীলতের কথা থাকিলেও ইহা নবুওয়াতের অন্যতম আলামত" (প্রাগুক্ত, পৃ. ১৫৮-১৫৯)।
অতঃপর ইব্‌ন কাছীর বলেন, এই বক্তব্যের সারকথা হইল, বিষয়টি মুতাওয়াতির সূত্রে বর্ণিত হইবার বস্তু ছিল। ইহা ঐ সময় পাওয়া যায় যখন হাদীছটি সহীহ হয়। কিন্তু ইহা তো এইরূপ বর্ণিত হয় নাই। সুতরাং প্রমাণিত হয় যে, বিষয়টি প্রকৃতপক্ষে সঠিক (صحیح) নয়। وَاللهُ أَعْلَمُ (প্রাগুক্ত)। সর্বযুগের ইমামগণ এইরূপ হাদীছের সহীহ হওয়াকে অস্বীকার করিতেছেন। তাঁহারা ইহাকে প্রত্যাখ্যান করিয়া ইহার রাবীগণের কঠোর সমালোচনা করিয়া আসিতেছেন। ইহাদিগের অন্যতম হইলেন মুহাম্মাদ ইয়া'লা ইবন 'উবায়দ আত-তানাফিসী, দিমাশকের খতীব ইবরাহীম ইবন ইয়াকৃত আল-জাওযজানী, আবূ বাক্স মুহাম্মাদ ইবন হাতিম আল-বুখারী (যিনি ইব্‌ن যানজাবিয়্যা নামে খ্যাত), হাফিজ আবুল কাসিম ইন্ন আসাকির এবং শায়খ আবুল ফারাজ ইবনুল জাওযী প্রমুখ নবীন ও প্রবীণ হাদীছবেত্তাগণ। হাফিজ আবুল হাজ্জাজ আল মিযযী ও আবুল আব্বাস ইব্‌ن তায়মিয়্যা এইরূপ রিওয়ায়াতকে সুস্পষ্টভাবে বানোয়াট বলিয়া আখ্যায়িত করিয়াছেন। হাকিম আবূ আবদিল্লাহ নিশাপুরী স্বীয় সূত্রে আলী ইবনুল মাদীনী হইতে নিম্নোক্ত উক্তি বর্ণনা করিয়াছেন :
خَمْسَةٌ أَحَادِيثَ يَرْوُونَهَا وَلَا أَصْلَ لَهَا عَنْ رَسُولُ الله ﷺ حَدِيثُ لَوْ دَقَ السَّائِلُ مَا أَفْلَحَ مَنْ رَدَّهُ وَحَدِيْثُ لا وَجْعَ إِلا وَجْعُ العَيْنِ وَلَا غَمُ إِلَّا غَمُ الدِّيْنِ وَحَدِيْثُ أَنَّ الشَّمْسِ رُدَّتْ عَلَى عَلَى بْنِ أَبِي طَالِبٍ وَحَدِيْثِ أَنَا أَكْرَمُ عَلَى اللَّهِ مِنْ أَنْ يَدَعَنَّى تَحْتَ الْأَرْضِ مَأَتَى عَامٍ وَحَدِيثُ أَفْطَرَ الحَاجِمُ وَالْمَحْجُومُ أَنَّهُمَا كَانَا يَعْتَابَانِ.
"পাঁচটি হাদীছ ইহারা বর্ণনা করেন, অথচ ইহা রাসূলুল্লাহ (স) হইতে বর্ণিত হইবার কোন প্রমাণ নাই। ১. ভিক্ষুক যদি সত্যবাদী হয় তাহা হইলে তাহাকে যে ফিরাইয়া দিবে তাহার কল্যাণ হইবে না। ২. চক্ষুর ব্যথা ছাড়া অন্য কোন ব্যথা নাই, দীনের চিন্তা ব্যতীত অন্য কোন চিন্তা নাই। ৩. সূর্য আলী ইব্‌ন আবী তালিব (রা)-এর জন্য ফিরাইয়া দেওয়া হইয়াছিল। ৪. আমি আল্লাহর অধিক করুণা অর্জনকারী হইব যে, আমাকে তিনি দুই শত বৎসর ভূগর্ভে রাখিয়া দিবেন। ৫. রক্তমোক্ষণকর্তা ও কৃতের রোযা ভঙ্গ হইয়া যায়। ইহারা গীবতে লিপ্ত হয়।”
ইমাম তাহাবীর নিকট সূর্য প্রত্যাগত হইবার বিষয়টি অস্পষ্ট থাকিলেও ইমাম আবূ হানীফা (র) হইতে ইহাকে অস্বীকার করা এবং ইহার রাবীগণ সম্পর্কে বিদ্রূপ করিবার কথা বর্ণিত রহিয়াছে। আবু হানীফা (র) একজন অতীব নির্ভরযোগ্য ইমাম। কৃষ্ণার একজন বাসিন্দা ছিলেন। এতদসত্ত্বেও তাঁহার সম্পর্কে আল্লাহ ও রাসূল প্রদত্ত ফযীলত ছাড়া বাড়তি 'আলী (রা) প্রীতির কোন অভিযোগ নাই।
'ইয়ূশা ইব্‌ নূন (আ) সম্পর্কে সূর্য ফিরিয়া আসিবার যেই ঘটনা বর্ণিত হইয়াছে ইহা আসলে সূর্য অস্ত যাইবার পর ফিরিয়া আসা নয়, বরং সূর্য অস্তমিত হইতে কিছু সময়ের জন্য আটকিয়া থাকা (ইব্‌ن কাছীর, শামাইলুর রাসূল, পৃ. ১৬০)। শায়খ ইব্‌ তায়মিয়্যার অভিযোগের জওয়াবে শী'আ গুরু জামালুদ্দীন ইউসুফ ইবনুল-মুতাহ্হার নামে পরিচিত আল-ইমামা নামে একটি গ্রন্থ প্রণয়ন করিয়াছেন। ইহাতে তিনি বলিয়াছেন, সূর্য অস্তমিত হইবার পর দুইবার প্রত্যাগত হইয়াছিল। প্রথমবার এই সম্পর্কে জাবির ও আবূ সাঈদ (রা) হইতে নিম্নোক্ত রিওয়ায়াতটি উল্লেখ করা হইয়াছে।
إِنْ رَسُولَ اللهِ ﷺ نَزَلَ عَلَيْهِ جِبْرِيلُ يَوْمًا يُنَاجِيهِ مِنْ عِنْدِ اللَّهِ فَلَمَّا تَغَشَاهُ الْوَحْى تَوَسَّدَ فَخِذَ أَمِيرِ الْمُؤْمِنِينَ فَلَمْ يَرْفَعْ رَأْسَهُ حَتَّى غَابَتِ الشَّمْسُ فَصَلَّى عَلِيُّ الْعَصْرَ সী.বি.-৭/৩৭ www.pathagar.com
بِالإيْمَاء. فَلَمَّا اسْتَيْقَظَ رَسُولُ اللهِ ﷺ قَالَ لَهُ سَلِ اللهَ أَنْ يُرَدَّ عَلَيْكَ الشَّمْسَ فَتُصَلَّى قَائِمًا فَدَعَا فَرُدَّتِ الشَّمْسُ فَصَلَّى الْعَصْرَ قَائِمًا.
এই বর্ণনায় রহিয়াছে, 'আলী (রা)-এর উরুর উপর রাসূলুল্লাহ (স)-এর মাথা থাকা অবস্থায় 'আলী (রা) ইশারায় সালাত আদায় করিয়াছিলেন। 'আলী (রা)-এর দু'আতেই সূর্যকে ফিরাইয়া দেওয়া হইয়াছিল।
দ্বিতীয়বার যখন 'আলী (রা) ফুরাত নদী পাড়ি দিতে চাহিয়াছিলেন তখন অনেক সাহাবী তাঁহাদিগের বাহনের পরিচর্যায় মশগুল হইয়া পড়িয়াছিলেন। এই সময় তিনি কিছু সংখ্যক সাথী লইয়া আসরের সালাত আদায় করিলেন এবং অন্যদের সালাত কাযা হইয়া গেল। এই ব্যাপারে তাহারা কিছু বলাবলি করিতে লাগিল। 'আলী (রা) সূর্য ফিরাইয়া দিবার দু'আ করিলেন। তখন সূর্যকে ফিরাইয়া দেওয়া হইয়াছিল। ইবনুল মুতাহহার এই ব্যাপারে আল-হিময়ারীর নিম্নোক্ত কবিতার উদ্ধৃতি দিয়াছেন:
ردت عَلَيْهِ الشَّمْسُ لَمَّا فَاتَهُ + وَقْتُ الصَّلَاةِ وَقْتُ دَنَتْ لِلْمَغْرِبِ حَتَّى تَبَلَّجَ نُورُهَا فِي وَقْتِهَا + لِلْعَصْرِ ثُمَّ هَوَتْ هُوِي الْكَوْكَبِ وَعَلَيْهِ قَدْ رُدَّتْ بِبَابِلَ مَرَّةَ + أُخْرَى وَمَا رُدَّتْ لِخَلْقٍ مُقَرَّب.
এখানে বলা হইয়াছে, 'বাবিল' শহরে দ্বিতীয়বার 'আলী (রা)-এর জন্য সূর্যকে ফিরাইয়া দেওয়া হইয়াছিল। সূর্যকে অন্য কোন প্রিয় সৃষ্টির জন্য ফিরাইয়া দেওয়া হয় নাই।
এই সম্পর্কে ইব্‌ন তায়মিয়‍্যা বলেন, সূর্যকে ফিরাইয়া আনার হাদীছ আবূ জা'ফার তাহাবী ও কাযী আয়াযের মত কিছু লোক উল্লেখ করিয়াছেন। তাহারা ইহাকে রাসূলুল্লাহ (স)-এর অলৌকিক ঘটনাবলীর মধ্যে গণ্য করিয়াছেন। কিন্তু বিজ্ঞ হাদীছবেত্তাগণ ইহাকে মিথ্যা বানোয়াট হাদীছ বলিয়া অভিহিত করিয়াছেন। বাবিলের ঘটনা সম্পর্কে ইব্‌ন কাছীর বলেন, ইহার কোন সনদ নাই। আমার ধারণা ইহা কোন "যিনদীক” শী'আ কর্তৃক আবিষ্কৃত ( والله اعلم)। আল-হিময়ারীর কবিতা সম্পর্কে তিনি বলেন, ইহা কোন অবস্থাতেই দলীল নয়। ইহা ইবনুল মুতাহহারের মত বালখিল্যতা মাত্র। 'আলী (রা) সম্পর্কে বাবিলের ঘটনাটি সম্পর্কে আবূ দাউদ তাঁহার সুনান গ্রন্থে বর্ণনা করিয়াছেন যে, 'আলী (রা) বাবিল স্থানটি অতিক্রম করিবার সময় আসরের সালাতের সময় হইয়া গিয়াছিল। এতদসত্বেও তিনি এই স্থানটি অতিক্রম করিবার পূর্বে সালাত আদায় করেন নাই। এই সম্পর্কে তিনি বলিয়াছিলেন:
নَهَانِي خَلِيْلِي أَنْ أَصَلَّى بِأَرْضِ بَابِلَ فَإِنَّهَا مَلْعُونَةٌ.
"আমার বন্ধু রাসূলুল্লাহ (স) আমাকে নিষেধ করিয়াছিলেন "বাবিল” ভূমিতে সালাত আদায় করিতে। কারণ ইহা অভিশপ্ত স্থান" (শামাইলুর রাসূল, পৃ. ১৬১-১৬৩)।
'আলী (রা)-এর জন্য সূর্য অস্ত যাইবার পর তাহার পুনরুত্থান সম্পর্কিত এই দীর্ঘ আলোচনার পর এই কথার উপর বিশ্বাস স্থাপনের ধারে কাছেও যাওয়া যায় না। যাহারা হাদীছের শুদ্ধাশুদ্ধি লইয়া সূক্ষ্মাতিসূক্ষ্মভাবে গবেষণা করেন তাহাদিগের নিকট দিবালোকের মত প্রস্ফুটিত হইয়া উঠিবে যে, ইহা আবিষ্কৃত মনগড়া হাদীছ। তবে যাহারা ইহার সত্যতা সম্পর্কে নীরব ছিলেন, যেমন কাযী আয়ায ও ইমাম তাহাবী, তাহাদিগের নিকট হয়ত হাদীছগুলির সার্বিক বিষয় উত্থাপিত হয় নাই। তাহারা ভাবিয়াছেন, আল্লাহ তাঁহার বান্দা সৃষ্টিকুলের সেরা মানবের জন্য কি না করিতে পারেন। তাই কেহ ইহাকে আলামতে নবুওয়াত, কেহ মু'জিযা মনে করিয়া উল্লেখ করিয়াছেন। হাদীছ ও তাহার সনদের মধ্যে যে ব্যাপক অমিল রহিয়াছে ইহাকে মানিয়া লইবার কোনই পথ নাই। বিষয়টিকে যাহারা মানিয়া লইয়াছেন তাহারা যদি আহলে হক্কের অনুসারী হইয়া থাকেন তাহা হইলে তাহারা সনদ ও বর্ণনার প্রতি ভ্রুক্ষেপ না করিয়া কেবল কুদরতে ইলাহীর প্রতি লক্ষ্য করিয়াছেন। আর শী'আগণ তো ইহাকে স্বীয় স্বার্থসিদ্ধির লক্ষ্যে অবমূল্যায়ন করিয়াছে। কারণ আহলে হকের যাহারা ইহাকে সম্পূর্ণভাবে প্রত্যাখ্যান করেন নাই তাহারা ইহাকে রাসূলুল্লাহ (স)-এর মর্যাদার অন্তর্ভুক্ত ভাবিয়াছেন ( واللهُ اَعْلَمُ )।
খায়বার বিজয় সম্পর্কে হাসসান (রা)-এর কবিতা
ইব্‌ন হিশাম ইব্‌ন ইসহাকের বরাতে বলেন, খায়বার দিবসে হাসসান ইব্‌ন ছাবিত (রা) নিম্নোক্ত কবিতা আবৃত্তি করিয়াছিলেন:
(১) بِئْسَمَا قَاتَلَتْ خَيَابِرُ عَمَّا + جَمَعُوا مِنْ مَزَارِعَ وَنَخِيلٍ
(২) كَرِهُوا الْمَوْتَ فَاسْتَبِيحَ حِمَاهُمْ + وَأَقَرُّوا فِعْلَ اللَّهِيمِ الدَّلِيلِ
(৩) أَمِنَ الْمَوْتِ يَهْرِبُوا فَإِنَّ الْمَوْتَ + مَوْتَ الْهَزَالِ غَيْرُ جَمِيل
(১) “খায়বারবাসীরা যে কৃষিজমি ও খেজুর বাগানের মালিক ছিল, তাহার প্রতিরক্ষায় যুদ্ধ ছিল অত্যন্ত নিকৃষ্ট।
(২) তাহারা মৃত্যুকে অপসন্দ করিয়াছিল, ফলে তাহাদের সংরক্ষিত স্থান বৈধ করিয়া লওয়া হয়। তাহারা একান্ত ইতর শ্রেণীর আচরণ করিয়াছে।
(৩) তাহারা কি মৃত্যু হইতে পলায়ন করিতে পারিবে? কাপুরুষদের মৃত্যু নিশ্চয়ই উত্তম ও কাংক্ষিত নহে।”

কথিত আছে যে, খায়বার যুদ্ধকালে সংঘটিত ঘটনাবলীর একটি এই যে, খায়বার হইতে প্রত্যাবর্তনকালে রাসূলুল্লাহ (স) 'আস-সাহবা' নামক স্থানে পৌঁছিলে এখানে সায়্যিদা সাফিয়্যা (রা)-এর সহিত তাঁহার বাসর হয়। এই স্থানেই তিনি 'আসরের সালাত আদায় করিলেন অতঃপর তাঁহার মাথা 'আলী (রা)-এর উরুর উপর রাখিয়া শুইলেন। এমতাবস্থায় ওহী আসিবার লক্ষণাদি তাঁহার মধ্যে পরিলক্ষিত হইল। 'আলী (রা) আসরের সালাত আদায় করেন নাই। ওহী অবতরণ এতই দীর্ঘায়িত হইল যে, সূর্য অস্তমিত হইয়া গেল। ওহী অবতরণ শেষ হইলে রাসূলুল্লাহ (স) 'আলী (রা)-কে জিজ্ঞাসা করিলেন, "আসরের সালাত আদায় করিয়াছ কি"? 'আলী (রা) নিবেদন করিলেন, হে আল্লাহ্র রাসূল! আমি সালাত আদায় করি নাই। রাসূলুল্লাহ (স) এই সময় দু'আ করিলেন, হে আমার প্রতিপালক! যদি আলী আপনার এবং আপনার রাসূলের আনুগত্যে ব্যস্ত থাকে, তাহা হইলে সূর্যকে আদেশ করুন উহা যেন পুনরায় দৃষ্ট হয়। ইহাতে সে আসরের সালাত আদায় করিতে সক্ষম হইবে। মহান আল্লাহ তাঁহার দু'আ কবুল করিলেন। ফলে সূর্য অস্তমিত হইবার পরও দ্বিতীয়বার উদিত হইল। সূর্যের কিরণ পাহাড় ও টিলায় বিকীরিত হইল। সৃষ্টিজগত ইহা প্রত্যক্ষ করিল। 'আলী (রা) উযু করিলেন এবং সালাত আদায় করিলেন।
'আল্লামা দিহলাবী বলেন, রাসূলুল্লাহ (স)-এর জন্য সূর্যকে ডুবিতে না দেওয়া ও ফিরাইয়া আনা তিনটি স্থানে পাওয়া যায়। (এক) মি'রাজ হইতে ফিরিবার পর যখন কোন এক কাফেলা সম্পর্কে কুরায়শদের দ্বারা জিজ্ঞাসিত হইয়া তিনি বলিয়াছিলেন যে, ইহারা বুধবার দিন এই স্থানে পৌঁছিবে। (দুই) খনদক দিবসে আসরের সালাত কাযা হইয়া গেলে রাসূলুল্লাহ (স) সূর্য ফিরাইয়া দিবার দু'আ করিয়াছিলেন। কিন্তু এই ব্যাপারে স্বতসিদ্ধ কথা হইল, সূর্য অস্তমিত হইবার পর রাসূলূল্লাহ (স) কাযা পড়িয়াছিলেন। (তিন) এখানকার বর্ণিত ঘটনা যে, 'আলী (রা)-এর আসরের সালাত কাযা হইয়া গেলে রাসূলুল্লাহ (س)-এর দু'আর ফলে সূর্যকে ফিরাইয়া দেওয়া হইয়াছিল। এই হাদীছগুলি সম্পর্কে মুহাদ্দিছগণ বিভিন্ন ব্যাখ্যা দিয়াছেন। যূশা' ইব্‌ন নূন (আ) সম্পর্কে একটি বিশুদ্ধ হাদীছ বর্ণিত:
لَمْ يُحْبَسِ الشَّمْسُ عَلَى أَحَدٍ إِلَّا لِيُوشَعَ بْنِ نُونٍ.
"যূশা' ইব্‌ন নূন (আ) ব্যতীত আর কাহারও জন্য সূর্যকে অস্ত যাওয়া হইতে বিরত রাখা হয় নাই।” হাদীছটি মিশকাতে বুখারী ও মুসলিমের উদ্ধৃতিতে আবূ হুরায়রা (রা) হইতে বর্ণিত (মাদারিজুন নুবুওয়াত, প্রাগুক্ত, পৃ. ৪২৬)। হাদীছটি উপরে উল্লিখিত বর্ণনার পরিপন্থী। যেহেতু বিষয়টি অত্যন্ত বিরোধপূর্ণ, তাই এখানে বিস্তারিত আলোচনা তুলিয়া ধরা হইল যাহাতে বিষয়টি আরও স্পষ্ট হয়। এই প্রসংগে তিনি নিম্নোক্ত হাদীছ উল্লেখ করেন:
عَنْ أَسْمَاءَ بِنْتِ عُمَيْسٍ قَالَتْ كَانَ رَسُولُ اللهِ ﷺ يُوحِي إِلَيْهِ وَرَاسُهُ فِي حِجْرٍ عَلَى فَلَمْ يُصَلِّ الْعَصْرَ حَتَّى غَرَبَتِ الشَّمْسُ فَقَالَ رَسُولُ اللهِ ﷺ صَلَّيْتَ الْعَصْرَ وَقَالَ أَبُو أُمَيَّةَ صَلَّيْتَ يَا عَلِيُّ قَالَ لَا قَالَ رَسُولُ اللهِ ﷺ وَقَالَ أَبُو أُمَيَّةَ فَقَالَ النَّبِيُّ ﷺ اللَّهُمَّ إِنَّهُ كَانَ فِي طَاعَتِكَ وَطَاعَةِ نَبِيِّكَ وَقَالَ أَبُو أُمَيَّةَ رَسُولِكَ فَارْدُدْ عَلَيْهِ الشَّمْسَ قَالَتْ أَسْمَاءُ فَرَأَيْتُهَا غَرَبَتْ ثُمَّ رَأَيْتُهَا طَلَعْتُ بَعْدَ مَا غَرَبَتْ.
"আসমা বিন্ত 'উমায়س (রা) বলেন, রাসূলুল্লাহ (স)-এর উপর ওহী অবতীর্ণ হইতেছিল। এমতাবস্থায় তাহার মাথা 'আলী (রা)-এর কোলে ছিল। ফলে তিনি আসরের সালাত আদায় করিবার পূর্বেই সূর্য অস্তমিত হইয়া গেল। রাসূলুল্লাহ (স) অতঃপর জিজ্ঞাসা করিলেন, হে আলী! তুমি কি আসরের সালাত আদায় করিয়াছ? তিনি বলিলেন, না। রাসূলুল্লাহ (س) বলিলেন : হে আল্লাহ! নিশ্চয় 'আলী তোমার আনুগত্যে ও তোমার নবীর আনুগত্যে ছিল। সুতরাং তুমি তাহার জন্য সূর্যকে ফিরাইয়া দাও। আসমা (রা) বলেন, আমি দেখিলাম সূর্য অস্তমিত হইয়া গিয়াছে, অতঃপর তাহা উদিত দেখিলাম।"
আবূ আবদুল্লাহ ইব্‌ন মানদা সূত্রে বর্ণিত এই হাদীছকে শায়খ আবুল ফারাজ ইবনুল জাওযী (র) জাল (موضوع) হাদীছের মধ্যে গণ্য করিয়াছেন। আবূ জা'ফার আল-উকায়লী সূত্রেও একটি হাদীছ বর্ণিত আছে। ইবনুল জাওযী এই হাদীছকেও জাল (موضوع) বলিয়া অভিহিত করিয়াছেন। উক্ত হাদীছের বর্ণনাকারিগণের মধ্যেও বিভিন্নতা রহিয়াছে। হাফিজ ইব্‌ন 'আসাকির এই হাদীছকে মুনকার (منکر) বলিয়া অভিহিত করিয়াছেন। ইহাতে একাধিক অজ্ঞাত পরিচয় বর্ণনাকারী রহিয়াছেন। এই সম্পর্কে ইন্ন কাছীর তাঁহার অভিমত ব্যক্ত করেন যে, এই হাদীছ যত সনদেই বর্ণিত হইয়াছে সবগুলিই দুর্বল ও মুনকার। এমন কোন সনদ নাই যেখানে কোন না কোন এক শী'আ মতবাদী, অপরিচিত কিংবা প্রত্যাখ্যাত ব্যক্তি নাই।
এই প্রকার হাদীছের সনদ মুত্তাসিল হইলেও এইরূপ গুরুত্বপূর্ণ বিষয়ে খবরে ওয়াহিদ পর্যায়ের হাদীছ গ্রহণযোগ্য হয় না, খবরে মুতাওয়াতির কিংবা খবরে মাশহুর হইতে হয়। আমরা আল্লাহ্ কুদরত ও রাসূলুল্লাহ (স)-এর মাধ্যমে তাহার প্রকাশের সম্ভাবনাকে অস্বীকার করি না। সহীহ বুখারীর রিওয়ায়াতে বর্ণিত আছে, সূর্যকে যূশা' ইব্‌ নূন (আ)-এর জন্য ফিরাইয়া আনা হইয়াছিল। ইহা ছিল সেই দিনের ঘটনা যেই দিন তিনি বায়তুল মাকদিস অবরোধ করিয়াছিলেন। ইহা ছিল জুমু'আর দিন। অপরদিকে বনী ইসরাঈল শনিবার দিন যুদ্ধ করিত না। এই সময় যূশা' (আ) সূর্যের দিকে দৃষ্টিপাত করিলেন। সূর্যের তখন অস্ত যাওয়ার অবস্থা। তিনি বলিলেনঃ হে সূর্য! তুমি যেমন আদিষ্ট, আমিও তেমন আদিষ্ট। হে আল্লাহ! সূর্যকে আমার জন্য থামাইয়া রাখ। ফলে আল্লাহ তাঁহার জন্য সূর্যকে থামাইয়া রাখিয়াছিলেন, যতক্ষণ না তাহারা বায়তুল মাকদিস জয় করিয়াছিলেন। যূশা' ইবন নূন (আ), এমনকি সকল নবী হইতে রাসূলুল্লাহ (স)-এর মর্যাদা অনেক ঊর্ধ্বে। তবুও আমরা তাঁহার নিকট হইতে যাহা বিশুদ্ধ সূত্রে বর্ণিত আছে তাহাই বর্ণনা করিব। অন্য যাহা শুদ্ধ নহে তাহা তাঁহার সহিত সম্পৃক্ত করিব না। যদি এইরূপ বর্ণনা শুদ্ধ হইত তাহা হইলে সবার আগে আমরাই ইহা সমর্থন করিতাম (ইব্‌ন কাছীর, শামাইলুর রাসূল, পৃ. ১৪৪-১৪৮)।
অন্য আরও একটি সূত্রে এইরূপ বর্ণিত আছে:
عَنْ أَسْمَاءَ بِنْتِ عُمَيْسٍ قَالَتْ لَمَّا كَانَ يَوْمَ شُغْلِ عَلَى لِمَكَانِهِ مِنْ قَسْمِ الْمَغْنَمِ حَتَّى غربت الشَّمْسُ أَوْ كَادَتْ فَقَالَ رَسُولُ الله ﷺ أَمَا صَلَّيْتَ قَالَ لَا فَدَعَا اللَّهَ فَارْتَفَعَت الشَّمْسُ حَتَّى تَوَسَطَتِ السَّمَاءُ فَصَلَّى عَلِيُّ فَلَمَّا غَرَبَتِ الشَّمْسُ سَمِعْتُ لَهَا صَرِيرًا كَصَرِيرِ الْمِنْشَارِ فِي الْحَدِيدِ.
'আমর ইবন ছাবিত হইতে বর্ণিত আছে:
قَالَ سَأَلْتُ عَبْدَ اللَّهِ بْنَ حَسَنِ بْنِ حُسَيْنِ بْنِ عَلَى بْنِ أَبِي طَالِبٍ عَنْ حَدِيْثِ رَدَّ الشَّمْسِ عَلَى عَلَى بْنِ أَبِي طَالِب هَلْ يُثْبِتُ عِنْدَكُمْ فَقَالَ لِي مَا أَنْزَلَ اللَّهُ فِي كِتَابِهِ أَعْظَمُ مِنْ رَدَّ الشَّمْسِ قُلْتُ صَدَقْتَ جَعَلَنِي اللهُ فِدَاكَ وَلَكِنَّى أَحَبُّ عَنْ أَسْمَعَهُ مِنْكَ فَقَالَ حَدَّثَنِي أَبِي الْحَسَنُ عَنْ أَسْمَاءَ بِنْتِ عُمَيْسٍ أَنَّهَا قَالَتْ أَقَبَلَ عَلِيُّ بْنُ أَبِي طَالِبٍ ذَاتَ يَوْمٍ وَهُوَ يُرِيدُ أَنْ يُصَلَّى العَصْرَ مَعَ رَسُولِ اللهِ ﷺ فَوَافَقَ رَسُولَ اللَّهِ ﷺ قَدْ انْصَرَفَ وَنَزَلَ عَلَيْهِ الْوَحْيُ فَاسْنَدَهُ إِلَى صَدْرِهِ فَلَمْ يَزَلْ مُسْنِدُهُ إِلَى صَدْرِهِ حَتَّى أَفَاقَ رَسُولُ اللَّهِ ﷺ فَقَالَ أَصَلَّيْتَ الْعَصْرَ يَا عَلِيُّ قَالَ جِئْتُ وَالْوَحْيُ يَنْزِلُ عَلَيْكَ فَلَمْ أَزَلْ مُسْنِدُكَ إِلِى صَدْرِي حَتَّى السَّاعَةَ فَاسْتَقْبَلَ رَسُولَ اللَّهِ ﷺ وَقَدْ غَرَبَتِ الشَّمْسُ وَقَالَ اللَّهُمْ إِنَّ عَلَيْا كَانَ فِي طاعَتِكَ فَارْدُدْهَا عَلَيْهِ قَالَتْ أَسْمَاءُ فَأَقْبَلَتِ الشَّمْسُ وَلَهَا صَرِيرٌ كَصَرِيرِ الرَّحَى حَتَّى كَانَتْ فِي مَوْضِعِهَا وَقْتُ الْعَصْرِ فَقَامَ عَلَى مُتَمَكِّنَا فَصَلَّى فَلَمَّا فَرَغَ رَجَعَتِ الشَّمْسُ وَلَهَا صَرِيرٌ كَصَرِيرِ الرَّحَى فَلَمَّا غَابَتْ اخْتَلَطَ الظَّلامُ وَبَدَتِ النُّجُومُ.
এই রিওয়ায়াতে রহিয়াছে, আবদুল্লাহ ইব্‌ন্ন হাসান ইবন হুসায়ন ইবন 'আলী (রা) বলিয়াছেন, আল্লাহ তা'আলা আল-কুরআনে সূর্য ফিরাইয়া লওয়ার বিষয় হইতে বড় অন্য কোন জিনিস অবতীর্ণ করেন নাই, অথচ কুরআনে ইহার কোন উল্লেখ নাই।
আবূ সা'ঈদ আল-খুদরী (রা) হইতে বর্ণিত আছে:
قَالَ الْحُسَيْنُ بْنُ عَلَى سَمِعْتُ أَبَا سَعِيدٍ الْخُدْرِى يَقُولُ دَخَلْتُ عَلَى رَسُولِ اللَّهِ ﷺ فَإِذَا رَأْسُهُ فِي حَجْرٍ عَلَى وَقَدْ غَابَتِ الشَّمْسُ فَانْتَبَهَ النَّبِيِّ ﷺ وَقَالَ يَا عَلِيُّ أَصَلَّيْتَ الْعَصْرَ قَالَ لَا يَا رَسُولَ اللهِ مَا صَلَّيْتُ كَرِهْتُ أَنْ أَضَعَ رَأْسَكَ مِنْ حَجْرِي وَأَنْتَ وَاجِعٌ فَقَالَ رَسُولُ اللهِ ﷺ يَا عَلِيُّ ادْعُ يَا عَلَى أَدْعُ أَنْ تُرَدُّ عَلَيْكَ الشَّمْسُ فَقَالَ عَلِيُّ يَا رَسُولَ اللَّهِ أَدْعُ أَنْتَ وَأَنَا أُؤَمِّنُ فَقَالَ يَارَبِّ أَنْ عَلِيًّا فِي طَاعَتِكَ وَطَاعَةِ نَبِيِّكَ فَارْدُدْ عَلَيْهِ الشَّمْسُ قَالَ أَبُو سَعِيدٍ فَوَاللَّهِ لَقَدْ سَمِعْتُ لِلشَّمْسِ صَرِيرًا كَصَرِيرِ النَّكْبَرَةِ حَتَّى رَجَعَتْ بَيْضَاءَ نقية.
এই রিওয়ায়াতে আছে যে, রাসূলুল্লাহ (স) অসুস্থ থাকায় 'আলী (রা)-এর কোলে মাথা রাখিয়াছিলেন। রাসূলুল্লাহ (স) প্রথমে 'আলী (রা)-কে সূর্য ফিরাইয়া দিবার জন্য দু'আ করিতে বলিয়াছিলেন। কিন্তু তিনি আরয করিলেন, হে আল্লাহ্র রাসূল! আপনিই দু'আ করুন, আমি আমীন বলিব। 'আলী ইব্‌ন আবী তালিব 'রা)-এর এই সম্পর্কিত রিওয়ায়াতটি হইল:
عَنْ جُوَيْرِيَّةَ بِنْتِ شَهْرٍ قَالَتْ خَرَجْتُ مَعَ عَلَى بْنِ أَبِي طَالِبٍ فَقَالَ يَا جُوَيْرِيَّةُ إِنَّ رَسُولَ اللهِ ﷺ كَانَ يُوحَى إِلَيْهِ وَرَاسُهُ فِي حَجْرِي فَذَكَرَ الْحَدِيثَ.
(শামাইলুর রাসূল, পৃ. ১৪৯-১৫০)।
এই সম্পর্কিত যতগুলি হাদীছ বর্ণিত আছে উহার কোনটিই সমালোচনামুক্ত নয়। এমনকি অনেক রাবী সম্পর্কে কট্টর শী'আ মতাবলম্বী হইবারও অভিযোগ বিদ্যমান। হাদীছবিদগণ এই সকল হাদীছের সমালোচনায় এমনভাবে মুখর যেন মনে হয়, রিওয়ায়াতগুলি শী'আরা আলী (রা)-এর মর্যাদা উচ্চাসনে সমাসীন করিবার লক্ষ্যে তৈরী করিয়াছে।
শামাইলুর রাসূলের গ্রন্থকার বিভিন্ন সূত্রে এই সম্পর্কিত হাদীছগুলি উল্লেখ করিয়া সনদ ও মূল বক্তব্যের খুটিনাটি আলোচনা করিয়াছেন। সূক্ষ্মাতিসূক্ষ্মভাবে সনদে উল্লিখিত রাবীগণের আকীদা ও তাহাদিগের অগ্রহণযোগ্যতা তুলিয়া ধরিয়াছেন, রিওয়ায়াতগুলি পরস্পর অমিল ও মুনকার হইবার কথা স্থানে স্থানে আলোচনা করিয়াছেন। অতঃপর 'আলী (রা) হইতে বর্ণিত রিওয়ায়াতটি সম্পর্কে বলেন, এই রিওয়ায়াত অন্ধকারে ঢাকা। ইহার অধিকাংশ বর্ণনাকারীর কোন পরিচয় নাই। ইহা হইতে প্রতীয়মান হয় যে, শী'আদের কালো হাত দ্বারা ইহা নির্মিত। যাহারা রাসূলুল্লাহ (س)-এর উপর মিথ্যা আরোপ করে আল্লাহ তাহাদিগকে অপদস্থ ও অভিশপ্ত করুন। কারণ রাসূলুল্লাহ (স) বলিয়াছেন :
مَنْ كَذَبَ عَلَيَّ مُتَعَمِّدًا فَلْيَتَبَوَّأْ مَقْعَدَهُ مِنَ النَّارِ. "যেই ব্যক্তি জ্ঞাতসারে আমার উপর মিথ্যা আরোপ করিবে তাহার আবাস জাহান্নাম।"
আগেকার রিওয়ায়াতটিকে খোদ 'আলী (রা)-এর সহিত সম্পর্কিত করা হয়, অথচ ইহাতে তাঁহার বিরাট মর্যাদার কথা বর্ণিত। কোন জ্ঞানবান মানুষের বিবেক 'আলী (রা) কর্তৃক নিজের প্রশংসা সম্বলিত এই রিওয়ায়াতকে তাঁহার সূত্রে বর্ণিত হইবার কথা বিশ্বাস করিতে পারে? 'আলী (রা) হইতে অন্য কোন রিওয়ায়াত এই রাবীগণ বর্ণনা করিয়াছেন বলিয়া কোন প্রমাণ নাই। 'আলী (রা) হইতে নির্ভরযোগ্য বর্ণনাকারী, যেমন উবায়দা আস-সালমানী, শুরায়হ আল-কা'বী, আমের আশ-শা'বী প্রমুখের কোন উল্লেখ নাই। অথচ এক অজানা-অচেনা মহিলার সূত্রে তাহার নিকট হইতে এইরূপ বর্ণনা কেমন করিয়া গ্রহণ করা যায়!
মুওয়াত্তা মালিক, সিহাহ সিত্তা, সুনান ও মুসনাদ গ্রন্থমালার গ্রন্থকারগণ কর্তৃক এই হাদীছ প্রত্যাখ্যাত। এই সম্পর্কিত কোন "সহীহ" ও "হাসান” বর্ণনাও নাই। ইহাই বড় দলীল হইল যে, ইহাদিগের নিকট উক্ত রিওয়ায়াতের কোন ভিত্তি নাই। আবূ আবদুর রাহমান আন-নাসাঈ আলী (রা)-এর একটি চরিত গ্রন্থ রচনা করিয়াছেন। কিন্তু তাহাতে ইহার বর্ণনা নাই। আল-হাকেমও তাঁহার মুসতাদরাকে রিওয়ায়াতটি উল্লেখ করেন নাই। অথচ ইহাদিগকে সামান্য হইলেও 'আলী (রা) প্রীতির প্রতি সম্পর্কিত করা হয়। ইহাকে যাহারা বর্ণনা করিয়াছেন তাহায়া কেবল বিস্ময় বোধ ও অজানা মনে করিয়াই বর্ণনা করিয়াছেন। এই অর্থের অধিকাংশ বর্ণনাই মিথ্যা ও বানোয়াট। এই সকল রিওয়ায়াতের মধ্যে আহমাদ ইব্‌ন সালিহ আল-মিসরী কর্তৃক বর্ণিত রিওয়ায়াত অপেক্ষাকৃত উত্তম। সূত্রটি হইল এইরূপ :
عَنْ أَحْمَدَ بْنِ صَالِحِ الْمِصْرِى عَنِ ابْنِ أَبِي فُدَيْكَ عَنْ مُحَمَّدِ بْنِ مُوسَى الْفِطْرِى عَنْ عَوْنِ بْنِ مُحَمَّدٍ عَنْ أُمِّهِ أُمِّ جَعْفَرٍ عَنْ أَسْمَاءَ.
(একমাত্র এই সূত্রে বর্ণিত রিওয়ায়াতই খায়বারের আস-সাহবা নামক স্থানে ঘটনাটি ঘটিয়াছিল বলিয়া উল্লেখ রহিয়াছে)।
আহমাদ ইব্‌ন সালিহ রিওয়ায়াতটিকে সহীহ বলিয়া ঘটনাটির যথার্থতার পক্ষে অভিমত ব্যক্ত করিয়াছেন বলিয়া বর্ণিত আছে। ইমাম তাহাবী তাঁহার মুশকিলুল আছার গ্রন্থে আলী ইব্‌ন আবদির রাহমানের বরাতে বলিয়াছেন, আহমাদ ইব্‌ন সালিহ আল-মিসরী বলেন:
لا يَنْبَغِي لِمَنْ كَانَ سَبِيلَهُ الْعِلْمُ التَّخَلَّفُ عَنْ حِفْظِ حَدِيْثِ أَسْمَاءَ فِي رَبِّ الشَّمْسِ لأَنَّهُ مِنْ عَلَامَاتِ النُّبُوَّةِ.
"ইলম অন্বেষণকারীর জন্য আসমা (রা)-এর সূর্য ফিরাইয়া আনা সংক্রান্ত হাদীছখানা হইতে বিমুখ হওয়া উচিত নয়। কারণ ইহা নবুওয়াতের অন্যতম আলামত।"
এই অভিমতের পক্ষে আবূ জা'ফার আত-তাহাবীও ঝুঁকিয়া পড়িয়াছেন। আবুল কাসিম আল-হাসকাফীর বর্ণনামতে মু'তাযিলা মতাবলম্বী তর্কবাগিশ আবূ আবদিল্লাহ আল-বাসরী বলেন:
عَوْدُ الشَّمْسِ بَعْدَ مُغِيبِهَا اكَدُ حَالاً فِيمَا يَقْتَضِى نَقْلُهُ لَأَنَّهُ وَإِنْ كَانَ فَضِيلَةً لَأَمِيرِ الْمُؤْمِنِينَ فَإِنَّهُ مِنْ أَعْلَامِ النُّبُوَّةِ.
"সূর্য অস্ত যাওয়ার পর ফিরিয়া আসার প্রেক্ষাপট অত্যন্ত শক্তিশালী যাহা বর্ণনার দাবি রাখে। কারণ ইহাতে আমীরুল মু'মিনীনের ফযীলতের কথা থাকিলেও ইহা নবুওয়াতের অন্যতম আলামত" (প্রাগুক্ত, পৃ. ১৫৮-১৫৯)।
অতঃপর ইব্‌ন কাছীর বলেন, এই বক্তব্যের সারকথা হইল, বিষয়টি মুতাওয়াতির সূত্রে বর্ণিত হইবার বস্তু ছিল। ইহা ঐ সময় পাওয়া যায় যখন হাদীছটি সহীহ হয়। কিন্তু ইহা তো এইরূপ বর্ণিত হয় নাই। সুতরাং প্রমাণিত হয় যে, বিষয়টি প্রকৃতপক্ষে সঠিক (صحیح) নয়। وَاللهُ أَعْلَمُ (প্রাগুক্ত)। সর্বযুগের ইমামগণ এইরূপ হাদীছের সহীহ হওয়াকে অস্বীকার করিতেছেন। তাঁহারা ইহাকে প্রত্যাখ্যান করিয়া ইহার রাবীগণের কঠোর সমালোচনা করিয়া আসিতেছেন। ইহাদিগের অন্যতম হইলেন মুহাম্মাদ ইয়া'লা ইবন 'উবায়দ আত-তানাফিসী, দিমাশকের খতীব ইবরাহীম ইবন ইয়াকৃত আল-জাওযজানী, আবূ বাক্স মুহাম্মাদ ইবন হাতিম আল-বুখারী (যিনি ইব্‌ন যানজাবিয়্যা নামে খ্যাত), হাফিজ আবুল কাসিম ইন্ন আসাকির এবং শায়খ আবুল ফারাজ ইবনুল জাওযী প্রমুখ নবীন ও প্রবীণ হাদীছবেত্তাগণ। হাফিজ আবুল হাজ্জাজ আল মিযযী ও আবুল আব্বাস ইব্‌ন তায়মিয়্যা এইরূপ রিওয়ায়াতকে সুস্পষ্টভাবে বানোয়াট বলিয়া আখ্যায়িত করিয়াছেন। হাকিম আবূ আবদিল্লাহ নিশাপুরী স্বীয় সূত্রে আলী ইবনুল মাদীনী হইতে নিম্নোক্ত উক্তি বর্ণনা করিয়াছেন :
خَمْسَةٌ أَحَادِيثَ يَرْوُونَهَا وَلَا أَصْلَ لَهَا عَنْ رَسُولُ الله ﷺ حَدِيثُ لَوْ دَقَ السَّائِلُ مَا أَفْلَحَ مَنْ رَدَّهُ وَحَدِيْثُ لا وَجْعَ إِلا وَجْعُ العَيْنِ وَلَا غَمُ إِلَّا غَمُ الدِّيْنِ وَحَدِيْثُ أَنَّ الشَّمْسِ رُدَّتْ عَلَى عَلَى بْنِ أَبِي طَالِبٍ وَحَدِيْثُ أَنَّى أَكْرَمُ عَلَى اللَّهِ مِنْ أَنْ يَدَعَنَّى تَحْتَ الْأَرْضِ مَأَتَى عَامٍ وَحَدِيثُ أَفْطَرَ الحَاجِمُ وَالْمَحْجُومُ أَنَّهُمَا كَانَا يَعْتَابَانِ.
"পাঁচটি হাদীছ ইহারা বর্ণনা করেন, অথচ ইহা রাসূলুল্লাহ (س) হইতে বর্ণিত হইবার কোন প্রমাণ নাই। ১. ভিক্ষুক যদি সত্যবাদী হয় তাহা হইলে তাহাকে যে ফিরাইয়া দিবে তাহার কল্যাণ হইবে না। ২. চক্ষুর ব্যথা ছাড়া অন্য কোন ব্যথা নাই, দীনের চিন্তা ব্যতীত অন্য কোন চিন্তা নাই। ৩. সূর্য আলী ইব্‌ন আবী তালিব (রা)-এর জন্য ফিরাইয়া দেওয়া হইয়াছিল। ৪. আমি আল্লাহর অধিক করুণা অর্জনকারী হইব যে, আমাকে তিনি দুই শত বৎসর ভূগর্ভে রাখিয়া দিবেন। ৫. রক্তমোক্ষণকর্তা ও কৃতের রোযা ভঙ্গ হইয়া যায়। ইহারা গীবতে লিপ্ত হয়।"
ইমাম তাহাবীর নিকট সূর্য প্রত্যাগত হইবার বিষয়টি অস্পষ্ট থাকিলেও ইমাম আবূ হানীফা (র) হইতে ইহাকে অস্বীকার করা এবং ইহার রাবীগণ সম্পর্কে বিদ্রূপ করিবার কথা বর্ণিত রহিয়াছে। আবু হানীফা (র) একজন অতীব নির্ভরযোগ্য ইমাম। কৃষ্ণার একজন বাসিন্দা ছিলেন। এতদসত্ত্বেও তাঁহার সম্পর্কে আল্লাহ ও রাসূল প্রদত্ত ফযীলত ছাড়া বাড়তি 'আলী (রা) প্রীতির কোন অভিযোগ নাই।
'ইয়ূশা ইব্‌ নূন (আ) সম্পর্কে সূর্য ফিরিয়া আসিবার যেই ঘটনা বর্ণিত হইয়াছে ইহা আসলে সূর্য অস্ত যাইবার পর ফিরিয়া আসা নয়, বরং সূর্য অস্তমিত হইতে কিছু সময়ের জন্য আটকিয়া থাকা (ইব্‌ন কাছীর, শামাইলুর রাসূল, পৃ. ১৬০)। শায়খ ইব্‌ তায়মিয়্যার অভিযোগের জওয়াবে শী'আ গুরু জামালুদ্দীন ইউসুফ ইবনুল-মুতাহ্হার নামে পরিচিত আল-ইমামা নামে একটি গ্রন্থ প্রণয়ন করিয়াছেন। ইহাতে তিনি বলিয়াছেন, সূর্য অস্তমিত হইবার পর দুইবার প্রত্যাগত হইয়াছিল। প্রথমবার এই সম্পর্কে জাবির ও আবূ সাঈদ (রা) হইতে নিম্নোক্ত রিওয়ায়াতটি উল্লেখ করা হইয়াছে:
إِنْ رَسُولَ اللهِ ﷺ نَزَلَ عَلَيْهِ جِبْرِيلُ يَوْمًا يُنَاجِيهِ مِنْ عِنْدِ اللَّهِ فَلَمَّا تَغَشَاهُ الْوَحْى تَوَسَّدَ فَخِذَ أَمِيرِ الْمُؤْمِنِينَ فَلَمْ يَرْفَعْ رَأْسَهُ حَتَّى غَابَتِ الشَّمْسُ فَصَلَّى عَلِيُّ الْعَصْرَ بِالإيْمَاء. فَلَمَّا اسْتَيْقَظَ رَسُولُ اللهِ ﷺ قَالَ لَهُ سَلِ اللهَ أَنْ يُرَدَّ عَلَيْكَ الشَّمْسَ فَتُصَلَّى قَائِمًا فَدَعَا فَرُدَّتِ الشَّمْسُ فَصَلَّى الْعَصْرَ قَائِمًا.
এই বর্ণনায় রহিয়াছে, 'আলী (রা)-এর উরুর উপর রাসূলুল্লাহ (স)-এর মাথা থাকা অবস্থায় 'আলী (রা) ইশারায় সালাত আদায় করিয়াছিলেন। 'আলী (রা)-এর দু'আতেই সূর্যকে ফিরাইয়া দেওয়া হইয়াছিল।
দ্বিতীয়বার যখন 'আলী (রা) ফুরাত নদী পাড়ি দিতে চাহিয়াছিলেন তখন অনেক সাহাবী তাঁহাদিগের বাহনের পরিচর্যায় মশগুল হইয়া পড়িয়াছিলেন। এই সময় তিনি কিছু সংখ্যক সাথী লইয়া আসরের সালাত আদায় করিলেন এবং অন্যদের সালাত কাযা হইয়া গেল। এই ব্যাপারে তাহারা কিছু বলাবলি করিতে লাগিল। 'আলী (রা) সূর্য ফিরাইয়া দিবার দু'আ করিলেন। তখন সূর্যকে ফিরাইয়া দেওয়া হইয়াছিল। ইবনুল মুতাহহার এই ব্যাপারে আল-হিময়ারীর নিম্নোক্ত কবিতার উদ্ধৃতি দিয়াছেন:
ردت عَلَيْهِ الشَّمْسُ لَمَّا فَاتَهُ + وَقْتُ الصَّلَاةِ وَقْتُ دَنَتْ لِلْمَغْرِبِ حَتَّى تَبَلَّجَ نُورُهَا فِي وَقْتِهَا + لِلْعَصْرِ ثُمَّ هَوَتْ هُوِي الْكَوْكَبِ وَعَلَيْهِ قَدْ رُدَّتْ بِبَابِلَ مَرَّةَ + أُخْرَى وَمَا رُدَّتْ لِخَلْقٍ مُقَرَّب.
এখানে বলা হইয়াছে, 'বাবিল' শহরে দ্বিতীয়বার 'আলী (রা)-এর জন্য সূর্যকে ফিরাইয়া দেওয়া হইয়াছিল। সূর্যকে অন্য কোন প্রিয় সৃষ্টির জন্য ফিরাইয়া দেওয়া হয় নাই।
এই সম্পর্কে ইব্‌ন তায়মিয়‍্যা বলেন, সূর্যকে ফিরাইয়া আনার হাদীছ আবূ জা'ফার তাহাবী ও কাযী আয়াযের মত কিছু লোক উল্লেখ করিয়াছেন। তাহারা ইহাকে রাসূলুল্লাহ (স)-এর অলৌকিক ঘটনাবলীর মধ্যে গণ্য করিয়াছেন। কিন্তু বিজ্ঞ হাদীছবেত্তাগণ ইহাকে মিথ্যা বানোয়াট হাদীছ বলিয়া অভিহিত করিয়াছেন। বাবিলের ঘটনা সম্পর্কে ইব্‌ন কাছীর বলেন, ইহার কোন সনদ নাই। আমার ধারণা ইহা কোন "যিনদীক” শী'আ কর্তৃক আবিষ্কৃত ( والله اعلم)। আল-হিময়ারীর কবিতা সম্পর্কে তিনি বলেন, ইহা কোন অবস্থাতেই দলীল নয়। ইহা ইবনুল মুতাহহারের মত বালখিল্যতা মাত্র। 'আলী (রা) সম্পর্কে বাবিলের ঘটনাটি সম্পর্কে আবূ দাউদ তাঁহার সুনান গ্রন্থে বর্ণনা করিয়াছেন যে, 'আলী (রা) বাবিল স্থানটি অতিক্রম করিবার সময় আসরের সালাতের সময় হইয়া গিয়াছিল। এতদসত্বেও তিনি এই স্থানটি অতিক্রম করিবার পূর্বে সালাত আদায় করেন নাই। এই সম্পর্কে তিনি বলিয়াছিলেন:
نَهَانِي خَلِيْلِي أَنْ أَصَلَّى بِأَرْضِ بَابِلَ فَإِنَّهَا مَلْعُونَةٌ.
"আমার বন্ধু রাসূলুল্লাহ (স) আমাকে নিষেধ করিয়াছিলেন "বাবিল” ভূমিতে সালাত আদায় করিতে। কারণ ইহা অভিশপ্ত স্থান" (শামাইলুর রাসূল, পৃ. ১৬১-১৬৩)।
'আলী (রা)-এর জন্য সূর্য অস্ত যাইবার পর তাহার পুনরুত্থান সম্পর্কিত এই দীর্ঘ আলোচনার পর এই কথার উপর বিশ্বাস স্থাপনের ধারে কাছেও যাওয়া যায় না। যাহারা হাদীছের শুদ্ধাশুদ্ধি লইয়া সূক্ষ্মাতিসূক্ষ্মভাবে গবেষণা করেন তাহাদিগের নিকট দিবালোকের মত প্রস্ফুটিত হইয়া উঠিবে যে, ইহা আবিষ্কৃত মনগড়া হাদীছ। তবে যাহারা ইহার সত্যতা সম্পর্কে নীরব ছিলেন, যেমন কাযী আয়ায ও ইমাম তাহাবী, তাহাদিগের নিকট হয়ত হাদীছগুলির সার্বিক বিষয় উত্থাপিত হয় নাই। তাহারা ভাবিয়াছেন, আল্লাহ তাঁহার বান্দা সৃষ্টিকুলের সেরা মানবের জন্য কি না করিতে পারেন। তাই কেহ ইহাকে আলামতে নবুওয়াত, কেহ মু'জিযা মনে করিয়া উল্লেখ করিয়াছেন। হাদীছ ও তাহার সনদের মধ্যে যে ব্যাপক অমিল রহিয়াছে ইহাকে মানিয়া লইবার কোনই পথ নাই। বিষয়টিকে যাহারা মানিয়া লইয়াছেন তাহারা যদি আহলে হক্কের অনুসারী হইয়া থাকেন তাহা হইলে তাহারা সনদ ও বর্ণনার প্রতি ভ্রুক্ষেপ না করিয়া কেবল কুদরতে ইলাহীর প্রতি লক্ষ্য করিয়াছেন। আর শী'আগণ তো ইহাকে স্বীয় স্বার্থসিদ্ধির লক্ষ্যে অবমূল্যায়ন করিয়াছে। কারণ আহলে হকের যাহারা ইহাকে সম্পূর্ণভাবে প্রত্যাখ্যান করেন নাই তাহারা ইহাকে রাসূলুল্লাহ (স)-এর মর্যাদার অন্তর্ভুক্ত ভাবিয়াছেন ( واللهُ اَعْلَمُ )।
খায়বার বিজয় সম্পর্কে হাসসান (রা)-এর কবিতা: ইব্‌ন হিশাম ইব্‌ন ইসহাকের বরাতে বলেন, খায়বার দিবসে হাসসান ইব্‌ন ছাবিত (রা) নিম্নোক্ত কবিতা আবৃত্তি করিয়াছিলেন:
(১) بِئْسَمَا قَاتَلَتْ خَيَابِرُ عَمَّا + جَمَعُوا مِنْ مَزَارِعَ وَنَخِيلٍ (২) كَرِهُوا الْمَوْتَ فَاسْتَبِيحَ حِمَاهُمْ + وَأَقَرُّوا فِعْلَ اللَّهِيمِ الدَّلِيلِ (৩) أَمِنَ الْمَوْتِ يَهْرِبُوا فَإِنَّ الْمَوْتَ + مَوْتَ الْهَزَالِ غَيْرُ جَمِيل
(১) “খায়বারবাসীরা যে কৃষিজমি ও খেজুর বাগানের মালিক ছিল, তাহার প্রতিরক্ষায় যুদ্ধ ছিল অত্যন্ত নিকৃষ্ট। (২) তাহারা মৃত্যুকে অপসন্দ করিয়াছিল, ফলে তাহাদের সংরক্ষিত স্থান বৈধ করিয়া লওয়া হয়। তাহারা একান্ত ইতর শ্রেণীর আচরণ করিয়াছে। (৩) তাহারা কি মৃত্যু হইতে পলায়ন করিতে পারিবে? কাপুরুষদের মৃত্যু নিশ্চয়ই উত্তম ও কাংক্ষিত নহে।”
আয়মানের পক্ষ হইতে কৈফিয়ত: হাসসান ইব্‌ন ছাবিত (রা) আয়মান ইব্‌ন উম্মু আয়মান উবায়দের পক্ষ হইতে কৈফিয়ত দিয়াও কবিতা রচনা করেন। আয়মান খায়বার যুদ্ধে অংশগ্রহণ করেন নাই। তিনি ছিলেন বানু আওফ ইব্‌ন খাযরাজ গোত্রের লোক। তাহার মাতা উম্মু আয়মান ছিলেন রাসূলুল্লাহ (স)-এর মুক্ত দাসী। তিনি উসামা ইব্‌ন যায়দ (রা)-এর বৈপিত্রেয় ভাই। হাসসান (রা) তাঁহার সেই কবিতায় বলেন:
سیرۃ وبشکوش (۱) عَلَى حِينٍ أَنْ قَالَتْ لأَيْمَنَ أُمُّهُ - جَبَنْتَ وَلَمْ تَشْهَدُ فَوَارِسَ خَيْبَرَ (۲) وَأَيْمَنُ لَمْ يُجِبْنَ ولكن مَهْرَهُ - أَضْرَبَهُ شُرْبُ الْمَدِيدَ الْمُخَمِّرِ (۳) ولولا الَّذِي قَدْ كَانَ مِنْ شَأْنِ مَهْرِهِ - لَقَاتَلَ فِيْهِمْ فَارِسًا غَيْرُ عُسْرٍ (٤) وَلَكِنَّهُ قَدْ صَدَّهُ فِعْلُ مَهْره - وَمَا كَانَ مِنْهُ عِنْدَهُ غَيْرُ أَيْسَرَ.
(১) “আয়মানের মাতা যখন তাহাকে তিরস্কার করিয়া বলিয়াছিলেন, খায়বার যুদ্ধের অশ্বারোহীদের সঙ্গে যোগ না দিয়া হে আয়মান! তুমি কাপুরুষের মত কাজ করিলে। (২) আসলে সেই দিন আয়মান কোন কাপুরুষতা প্রদর্শন করে নাই, বরং তাহার ঘোড়াটি আটা মিশ্রিত নেশাযুক্ত পানি পানে পীড়িত হইয়া পড়িয়াছিল। (৩) যদি সেই দিন তাহার ঘোড়াটির অবস্থা এমন না হইত তাহা হইলে সে অবশ্যই অশ্বারোহী দক্ষতার সহিত যুদ্ধ করিত। (৪) কিন্তু তাহাকে বাধা প্রদান করিয়াছে তাহার ঘোড়ার ক্রিয়া, অন্যথায় সে দক্ষতার সহিতই যুদ্ধ করিত।"
ইবন হিশাম বলেন, আবূ যায়দ-এর মতে এই কবিতাগুচ্ছ কা'ব ইব্‌ন মালিক রচিত, তবে উহাতে নিম্নরূপ পরিবর্তন রহিয়াছে:
وَلَكِنْ قَدْ صَدَّهُ شَأْنُ مَهْرِهِ - وَمَا كَانَ لَوْلا ذَاكُمْ بِمُقْصِرٍ.
"বরং তাহাকে আটকাইয়াছে তাহার ঘোড়ার অবস্থা। যদি তাহা না হইত তাহা হইলে সে কোন ত্রুটি করিত না।"
ইবন ইসহাক বলেন, নাজিয়া ইন্ন জুনদুব আসলামী নিম্নোক্ত কবিতা রচনা করেন:
بالعباد الله فيمَ يَرْغَبُ - مَا هُوَ الأَ مَأْكَلُ وَمَشْرَبُ وَجَنَّةً فِيهَا نَعِيمٌ مُعْجَبٌ.
"আক্ষেপ আল্লাহব বান্দাদের জন্য! কিসের আসক্তিতে আচ্ছন্ন? ইহা তো কেবল পানাহারের স্থান, অথচ জান্নাতে রহিয়াছে আকর্ষণীয় নি'মত।"
নাজিয়া ইন্ন জুনদুব আরও বলিয়াছেন:
أَنَا لِمَنْ أَنْكَرَنِي ابْنَ جُنْدُبٍ يَارُبُ + قَرْنٍ فِي مَكْرِي أَنْكَبُ طَاحَ بِمَغْدَى أَنَسْرُ وَتَعْلَبُ.
"যে আমার পরিচয় জানে না আমি তাহার উদ্দেশ্যে বলিতেছি, আমি হইলাম জুনদুবের পুত্র। কত প্রতিপক্ষ আছে যাহারা যুদ্ধকালে আমার কৌশলের কাছে অধোমুখী হয় এবং তাহাদের মৃতদেহ হয় শকুন বা শিয়ালের সকালের খাবার।"
কা'বের কবিতা ইব্‌ن হিশাম আবূ যায়দ আল-আনসারী হইতে বর্ণনা করিয়াছেন যে, কা'ব ইবন মালিক (রা) খায়বার দিবসে নিম্নোক্ত কবিতা আবৃত্তি করিয়াছিলেন:
(১) وَنَحْنُ وَرَدْنَا خَيْبَراً وَفُرُوضَهُ - بِكُلِّ فَتَى عَارِيُّ الأَشَاجِعِ مَدُودٌ (২) جواد لَدَى الْغَايَاتِ لا وَاهِنِ الْقَوِيُّ - جَرِى عَلَى الْأَعْدَاءِ فِي كُلِّ مَشْهَدِ (৩) عَظِيمُ رَمَادِ القدر في كُلِّ شَتْوَة - ضَرُوبٌ بنصلِ الْمَشْرِفِي الْمُهَنَّدِ (٤) يَرَى الْقَتْلَ مَدْحًا إِنْ أَصَابَ شَهَادَةً - مِنَ اللَّهِ يَرْجُوهَا وَفَوْذَا بِأَحْمَدِ (٥) يَدُودُ وَيُحمى عن ذِمَارٍ مُحَمَّدٍ - وَيَدْفَعُ عَنْهُ بِالنِّسَانِ وَبِالْيَد. (৬) وَنَيْصُرُهُ مِنْ كُلِّ أَمْرٍ يُرِيبُهُ - يَجُودُ لِنَفْسٍ دُونَ نَفْسٍ مُحَمَّدٍ (۷) يَصْدَقُ بِالأَنْبَاءِ بِالْغَيْبِ مُخْلِصًا - يُرِيدُ بِذَاكَ الْفَوْزُ وَالْعِزَّ فِي غَد.
(১) "আমরা খায়বারে আর ইহার ঘাটিগুলিতে অবতরণ করিযাছি যুবা-কিশোরদের লইয়া, যাহাদের হাতের শিরাসমূহ স্পষ্ট হইয়া উঠে নাই;
(২) লক্ষ্য অর্জনে যাহারা দুর্বল নয়। প্রতিটি ময়দানে শত্রুদের মুকাবিলায় তাহারা সাহসী।
(৩) শীত মৌসুম তাহাদের চুলায় থাকে ছাইয়ের বিরাট স্তূপ।
(৪) নিহত হওয়াকে তাহারা প্রশংসনীয় কাজ মনে করে ও রাসূলুল্লাহ (স)-এর সন্তুষ্টির লাভের উপায় আল্লাহর পথে কাঙ্খিত শাহাদত অর্জন করিতে পারে।
(৫) মুহাম্মাদ (স)-এর অধিকারসমূহ সংরক্ষণে তাহারা সদা প্রস্তুত থাকে, মুখ ও হাত দ্বারা সর্বদা তাহারা তাহার বিরুদ্ধবাদীদেরকে প্রতিহত করে।
(৬) যে কোন আশংকাজনক কাজে তাঁহার সাহায্যে তাহারা আগাইয়া আসে। মুহাম্মাদ (স)-এর প্রাণ রক্ষার্থে তাহারা নিজেদের জীবন বিসর্জন দেয়।
(৭) গায়বের খবরাদিকে তাহারা নিষ্ঠার সহিত বিশ্বাস করে, ইহার দ্বারা তাহারা কাল কিয়ামতের সম্মান ও সফলতা কামনা করে" (ইব্‌ন হিশাম, আস-সীরাতুন নাবabিয়্যা, ৩খ., ২৪০; আল-বিদায়া ওয়ান-নিহায়া, ২/৪খ, পৃ. ২১৮)।

কথিত আছে যে, খায়বার যুদ্ধকালে সংঘটিত ঘটনাবলীর একটি এই যে, খায়বার হইতে প্রত্যাবর্তনকালে রাসূলুল্লাহ (س) 'আস-সাহবা' নামক স্থানে পৌঁছিলে এখানে সায়্যিদা সাফিয়্যা (রা)-এর সহিত তাঁহার বাসর হয়। এই স্থানেই তিনি 'আসরের সালাত আদায় করিলেন অতঃপর তাঁহার মাথা 'আলী (রা)-এর উরুর উপর রাখিয়া শুইলেন। এমতাবস্থায় ওহী আসিবার লক্ষণাদি তাঁহার মধ্যে পরিলক্ষিত হইল। 'আলী (রা) আসরের সালাত আদায় করেন নাই। ওহী অবতরণ এতই দীর্ঘায়িত হইল যে, সূর্য অস্তমিত হইয়া গেল। ওহী অবতরণ শেষ হইলে রাসূলুল্লাহ (স) 'আলী (রা)-কে জিজ্ঞাসা করিলেন, "আসরের সালাত আদায় করিয়াছ কি"? 'আলী (রা) নিবেদন করিলেন, হে আল্লাহ্র রাসূল! আমি সালাত আদায় করি নাই। রাসূলুল্লাহ (স) এই সময় দু'আ করিলেন, হে আমার প্রতিপালক! যদি আলী আপনার এবং আপনার রাসূলের আনুগত্যে ব্যস্ত থাকে, তাহা হইলে সূর্যকে আদেশ করুন উহা যেন পুনরায় দৃষ্ট হয়। ইহাতে সে আসরের সালাত আদায় করিতে সক্ষম হইবে। মহান আল্লাহ তাঁহার দু'আ কবুল করিলেন। ফলে সূর্য অস্তমিত হইবার পরও দ্বিতীয়বার উদিত হইল। সূর্যের কিরণ পাহাড় ও টিলায় বিকীরিত হইল। সৃষ্টিজগত ইহা প্রত্যক্ষ করিল। 'আলী (রা) উযু করিলেন এবং সালাত আদায় করিলেন।
'আল্লামা দিহলাবী বলেন, রাসূলুল্লাহ (স)-এর জন্য সূর্যকে ডুবিতে না দেওয়া ও ফিরাইয়া আনা তিনটি স্থানে পাওয়া যায়। (এক) মি'রাজ হইতে ফিরিবার পর যখন কোন এক কাফেলা সম্পর্কে কুরায়শদের দ্বারা জিজ্ঞাসিত হইয়া তিনি বলিয়াছিলেন যে, ইহারা বুধবার দিন এই স্থানে পৌঁছিবে। (দুই) খনদক দিবসে আসরের সালাত কাযা হইয়া গেলে রাসূলুল্লাহ (স) সূর্য ফিরাইয়া দিবার দু'আ করিয়াছিলেন। কিন্তু এই ব্যাপারে স্বতসিদ্ধ কথা হইল, সূর্য অস্তমিত হইবার পর রাসূলূল্লাহ (স) কাযা পড়িয়াছিলেন। (তিন) এখানকার বর্ণিত ঘটনা যে, 'আলী (রা)-এর আসরের সালাত কাযা হইয়া গেলে রাসূলুল্লাহ (س)-এর দু'আর ফলে সূর্যকে ফিরাইয়া দেওয়া হইয়াছিল। এই হাদীছগুলি সম্পর্কে মুহাদ্দিছগণ বিভিন্ন ব্যাখ্যা দিয়াছেন। যূশা' ইব্‌ন নূন (আ) সম্পর্কে একটি বিশুদ্ধ হাদীছ বর্ণিত:
لَمْ يُحْبَسِ الشَّمْسُ عَلَى أَحَدٍ إِلَّا لِيُوشَعَ بْنِ نُونٍ.
"যূশা' ইব্‌ন নূন (আ) ব্যতীত আর কাহারও জন্য সূর্যকে অস্ত যাওয়া হইতে বিরত রাখা হয় নাই।” হাদীছটি মিশকাতে বুখারী ও মুসলিমের উদ্ধৃতিতে আবূ হুরায়রা (রা) হইতে বর্ণিত (মাদারিজুন নুবুওয়াত, প্রাগুক্ত, পৃ. ৪২৬)। হাদীছটি উপরে উল্লিখিত বর্ণনার পরিপন্থী। যেহেতু বিষয়টি অত্যন্ত বিরোধপূর্ণ, তাই এখানে বিস্তারিত আলোচনা তুলিয়া ধরা হইল যাহাতে বিষয়টি আরও স্পষ্ট হয়। এই প্রসংগে তিনি নিম্নোক্ত হাদীছ উল্লেখ করেন:
عَنْ أَسْمَاءَ بِنْتِ عُمَيْسٍ قَالَتْ كَانَ رَسُولُ اللهِ ﷺ يُوحِي إِلَيْهِ وَرَاسُهُ فِي حِجْرٍ عَلَى فَلَمْ يُصَلِّ الْعَصْرَ حَتَّى غَرَبَتِ الشَّمْسُ فَقَالَ رَسُولُ اللهِ ﷺ صَلَّيْتَ الْعَصْرَ وَقَالَ أَبُو أُمَيَّةَ صَلَّيْتَ يَا عَلِيُّ قَالَ لَا قَالَ رَسُولُ اللهِ ﷺ وَقَالَ أَبُو أُمَيَّةَ فَقَالَ النَّبِيُّ ﷺ اللَّهُمَّ إِنَّهُ كَانَ فِي طَاعَتِكَ وَطَاعَةِ نَبِيِّكَ وَقَالَ أَبُو أُمَيَّةَ رَسُولِكَ فَارْدُدْ عَلَيْهِ الشَّمْسَ قَالَتْ أَسْمَاءُ فَرَأَيْتُهَا غَرَبَتْ ثُمَّ رَأَيْتُهَا طَلَعْتُ بَعْدَ مَا غَرَبَتْ.
"আসমা بিন্ত 'উমায়س (রা) বলেন, রাসূলুল্লাহ (স)-এর উপর ওহী অবতীর্ণ হইতেছিল। এমতাবস্থায় তাহার মাথা 'আলী (রা)-এর কোলে ছিল। ফলে তিনি আসরের সালাত আদায় করিবার পূর্বেই সূর্য অস্তমিত হইয়া গেল। রাসূলুল্লাহ (س) অতঃপর জিজ্ঞাসা করিলেন, হে আলী! তুমি কি আসরের সালাত আদায় করিয়াছ? তিনি বলিলেন, না। রাসূলুল্লাহ (স) বলিলেন : হে আল্লাহ! নিশ্চয় 'আলী তোমার আনুগত্যে ও তোমার নবীর আনুগত্যে ছিল। সুতরাং তুমি তাহার জন্য সূর্যকে ফিরাইয়া দাও। আসমা (রা) বলেন, আমি দেখিলাম সূর্য অস্তমিত হইয়া গিয়াছে, অতঃপর তাহা উদিত দেখিলাম।"
আবূ আবদুল্লাহ ইব্‌ন মানদা সূত্রে বর্ণিত এই হাদীছকে শায়খ আবুল ফারাজ ইবনুল জাওযী (র) জাল (موضوع) হাদীছের মধ্যে গণ্য করিয়াছেন। আবূ জা'ফার আল-উকায়লী সূত্রেও একটি হাদীছ বর্ণিত আছে। ইবনুল জাওযী এই হাদীছকেও জাল (موضوع) বলিয়া অভিহিত করিয়াছেন। উক্ত হাদীছের বর্ণনাকারিগণের মধ্যেও বিভিন্নতা রহিয়াছে। হাফিজ ইব্‌ن 'আসাকির এই হাদীছকে মুনকার (منکر) বলিয়া অভিহিত করিয়াছেন। ইহাতে একাধিক অজ্ঞাত পরিচয় বর্ণনাকারী রহিয়াছেন। এই সম্পর্কে ইন্ন কাছীর তাঁহার অভিমত ব্যক্ত করেন যে, এই হাদীছ যত সনদেই বর্ণিত হইয়াছে সবগুলিই দুর্বল ও মুনকার। এমন কোন সনদ নাই যেখানে কোন না কোন এক শী'আ মতবাদী, অপরিচিত কিংবা প্রত্যাখ্যাত ব্যক্তি নাই।
এই প্রকার হাদীছের সনদ মুত্তাসিল হইলেও এইরূপ গুরুত্বপূর্ণ বিষয়ে খবরে ওয়াহিদ পর্যায়ের হাদীছ গ্রহণযোগ্য হয় না, খবরে মুতাওয়াতির কিংবা খবরে মাশহুর হইতে হয়। আমরা আল্লাহ্ কুদরত ও রাসূলুল্লাহ (س)-এর মাধ্যমে তাহার প্রকাশের সম্ভাবনাকে অস্বীকার করি না। সহীহ বুখারীর রিওয়ায়াতে বর্ণিত আছে, সূর্যকে যূশা' ইব্‌ نূন (আ)-এর জন্য ফিরাইয়া আনা হইয়াছিল। ইহা ছিল সেই দিনের ঘটনা যেই দিন তিনি বায়তুল মাকদিস অবরোধ করিয়াছিলেন। ইহা ছিল জুমু'আর দিন। অপরদিকে বনী ইসরাঈل শনিবার দিন যুদ্ধ করিত না। এই সময় যূশা' (আ) সূর্যের দিকে দৃষ্টিপাত করিলেন। সূর্যের তখন অস্ত যাওয়ার অবস্থা। তিনি বলিলেনঃ হে সূর্য! তুমি যেমন আদিষ্ট, আমিও তেমন আদিষ্ট। হে আল্লাহ! সূর্যকে আমার জন্য থামাইয়া রাখ। ফলে আল্লাহ তাঁহার জন্য সূর্যকে থামাইয়া রাখিয়াছিলেন, যতক্ষণ না তাহারা বায়তুল মাকদিস জয় করিয়াছিলেন। যূশা' ইبن نূন (আ), এমনকি সকল নবী হইতে রাসূলুল্লাহ (س)-এর মর্যাদা অনেক ঊর্ধ্বে। তবুও আমরা তাঁহার নিকট হইতে যাহা বিশুদ্ধ সূত্রে বর্ণিত আছে তাহাই বর্ণনা করিব। অন্য যাহা শুদ্ধ নহে তাহা তাঁহার সহিত সম্পৃক্ত করিব না। যদি এইরূপ বর্ণনা শুদ্ধ হইত তাহা হইলে সবার আগে আমরাই ইহা সমর্থন করিতাম (ইব্‌ن কাছীর, শামাইলুর রাসূল, পৃ. ১৪৪-১৪৮)।
অন্য আরও একটি সূত্রে এইরূপ বর্ণিত আছে:
عَنْ أَسْمَاءَ بِنْتِ عُمَيْسٍ قَالَتْ لَمَّا كَانَ يَوْمَ شُغْلِ عَلَى لِمَكَانِهِ مِنْ قَسْمِ الْمَغْنَمِ حَتَّى غربت الشَّمْسُ أَوْ كَادَتْ فَقَالَ رَسُولُ الله ﷺ أَمَا صَلَّيْتَ قَالَ لَا فَدَعَا اللَّهَ فَارْتَفَعَت الشَّمْسُ حَتَّى تَوَسَّطَتِ السَّمَاءُ فَصَلَّى عَلِيُّ فَلَمَّا غَرَبَتِ الشَّمْسُ سَمِعْتُ لَهَا صَرِيرًا كَصَرِيرِ الْمِنْشَارِ فِي الْحَدِيدِ.
'আমর ইবন ছাবিত হইতে বর্ণিত আছে:
قَالَ سَأَلْتُ عَبْدَ اللَّهِ بْنَ حَسَنِ بْنِ حُسَيْنِ بْنِ عَلَى بْنِ أَبِي طَالِبٍ عَنْ حَدِيْثِ رَدَّ الشَّمْسِ عَلَى عَلَى بْنِ أَبِي طَالِب هَلْ يُثْبِتُ عِنْدَكُمْ فَقَالَ لِي مَا أَنْزَلَ اللَّهُ فِي كِتَابِهِ أَعْظَمُ مِنْ رَدَّ الشَّمْسِ قُلْتُ صَدَقْتَ جَعَلَنِي اللهُ فِدَاكَ وَلَكِنَّى أَحَبُّ عَنْ أَسْمَعَهُ مِنْكَ فَقَالَ حَدَّثَنِي أَبِي الْحَسَنُ عَنْ أَسْمَاءَ بِنْتِ عُمَيْسٍ أَنَّهَا قَالَتْ أَقَبَلَ عَلِيُّ بْنُ أَبِي طَالِبٍ ذَاتَ يَوْمٍ وَهُوَ يُرِيدُ أَنْ يُصَلَّى العَصْرَ مَعَ رَسُولِ اللهِ ﷺ فَوَافَقَ رَسُولَ اللَّهِ ﷺ قَدْ انْصَرَفَ وَنَزَلَ عَلَيْهِ الْوَحْيُ فَاسْنَدَهُ إِلَى صَدْرِهِ فَلَمْ يَزَلْ مُسْنِدُهُ إِلَى صَدْرِهِ حَتَّى أَفَاقَ رَسُولَ اللَّهِ ﷺ فَقَالَ أَصَلَّيْتَ الْعَصْرَ يَا عَلِيُّ قَالَ جِئْتُ وَالْوَحْيُ يَنْزِلُ عَلَيْكَ فَلَمْ أَزَلْ مُسْنِدُكَ إِلِى صَدْرِي حَتَّى السَّاعَةَ فَاسْتَقْبَلَ رَسُولَ اللَّهِ ﷺ وَقَدْ غَرَبَتِ الشَّمْسُ وَقَالَ اللَّهُمْ إِنَّ عَلَيْا كَانَ فِي طاعَتِكَ فَارْدُدْهَا عَلَيْهِ قَالَتْ أَسْمَاءُ فَأَقْبَلَتِ الشَّمْسُ وَلَهَا صَرِيرٌ كَصَرِيرِ الرَّحَى حَتَّى كَانَتْ فِي مَوْضِعِهَا وَقْتُ الْعَصْرِ فَقَامَ عَلَى مُتَمَكِّنَا فَصَلَّى فَلَمَّا فَرَغَ رَجَعَتِ الشَّمْسُ وَلَهَا صَرِيرٌ كَصَرِيرِ الرَّحَى فَلَمَّا غَابَتْ اخْتَلَطَ الظَّلامُ وَبَدَتِ النُّجُومُ.
এই রিওয়ায়াতে রহিয়াছে, আবদুল্লাহ ইব্‌ন্ন হাসান ইবন হুসায়ন ইবন 'আলী (রা) বলিয়াছেন, আল্লাহ তা'আলা আল-কুরআনে সূর্য ফিরাইয়া লওয়ার বিষয় হইতে বড় অন্য কোন জিনিস অবতীর্ণ করেন নাই, অথচ কুরআনে ইহার কোন উল্লেখ নাই।
আবূ সা'ঈদ আল-খুদরী (রা) হইতে বর্ণিত আছে:
قَالَ الْحُسَيْنُ بْنُ عَلَى سَمِعْتُ أَبَا سَعِيدٍ الْخُدْرِى يَقُولُ دَخَلْتُ عَلَى رَسُولِ اللَّهِ ﷺ فَإِذَا رَأْسُهُ فِي حَجْرٍ عَلَى وَقَدْ غَابَتِ الشَّمْسُ فَانْتَبَهَ النَّبِيِّ ﷺ وَقَالَ يَا عَلِيُّ أَصَلَّيْتَ الْعَصْرَ قَالَ لَا يَا رَسُولَ اللهِ مَا صَلَّيْتُ كَرِهْتُ أَنْ أَضَعَ رَأْسَكَ مِنْ حَجْرِي وَأَنْتَ وَاجِعٌ فَقَالَ رَسُولَ اللهِ ﷺ يَا عَلِيُّ ادْعُ يَا عَلَى أَدْعُ أَنْ تُرَدُّ عَلَيْكَ الشَّمْسُ فَقَالَ عَلِيُّ يَا رَسُولَ اللَّهِ أَدْعُ أَنْتَ وَأَنَا أُؤَمِّنُ فَقَالَ يَارَبِّ أَنْ عَلِيًّا فِي طَاعَتِكَ وَطَاعَةِ نَبِيِّكَ فَارْدُدْ عَلَيْهِ الشَّمْسُ قَالَ أَبُو سَعِيدٍ فَوَاللَّهِ لَقَدْ سَمِعْتُ لِلشَّمْسِ صَرِيرًا كَصَرِيرِ النَّكْبَرَةِ حَتَّى رَجَعَتْ بَيْضَاءَ نقية.
এই রিওয়ায়াতে আছে যে, রাসূলুল্লাহ (س) অসুস্থ থাকায় 'আলী (রা)-এর কোলে মাথা রাখিয়াছিলেন। রাসূলুল্লাহ (س) প্রথমে 'আলী (রা)-কে সূর্য ফিরাইয়া দিবার জন্য দু'আ করিতে বলিয়াছিলেন। কিন্তু তিনি আরয করিলেন, হে আল্লাহ্র রাসূল! আপনিই দু'আ করুন, আমি আমীন বলিব। 'আলী ইব্‌ন আবী তালিব 'রা)-এর এই সম্পর্কিত রিওয়ায়াতটি হইল:
عَنْ جُوَيْرِيَّةَ بِنْتِ شَهْرٍ قَالَتْ خَرَجْتُ مَعَ عَلَى بْنِ أَبِي طَالِبٍ فَقَالَ يَا جُوَيْرِيَّةُ إِنَّ رَسُولَ اللهِ ﷺ كَانَ يُوحَى إِلَيْهِ وَرَاسُهُ فِي حَجْرِي فَذَكَرَ الْحَدِيثَ.
(শামাইলুর রাসূল, পৃ. ১৪৯-১৫০)।
এই সম্পর্কিত যতগুলি হাদীছ বর্ণিত আছে উহার কোনটিই সমালোচনামুক্ত নয়। এমনকি অনেক রাবী সম্পর্কে কট্টর শী'আ মতাবলম্বী হইবারও অভিযোগ বিদ্যমান। হাদীছবিদগণ এই সকল হাদীছের সমালোচনায় এমনভাবে মুখর যেন মনে হয়, রিওয়ায়াতগুলি শী'আরা আলী (রা)-এর মর্যাদা উচ্চাসনে সমাসীন করিবার লক্ষ্যে তৈরী করিয়াছে।
শামাইলুর রাসূলের গ্রন্থকার বিভিন্ন সূত্রে এই সম্পর্কিত হাদীছগুলি উল্লেখ করিয়া সনদ ও মূল বক্তব্যের খুটিনাটি আলোচনা করিয়াছেন। সূক্ষ্মাতিসূক্ষ্মভাবে সনদে উল্লিখিত রাবীগণের আকীদা ও তাহাদিগের অগ্রহণযোগ্যতা তুলিয়া ধরিয়াছেন, রিওয়ায়াতগুলি পরস্পর অমিল ও মুনকার হইবার কথা স্থানে স্থানে আলোচনা করিয়াছেন। অতঃপর 'আলী (را) হইতে বর্ণিত রিওয়ায়াতটি সম্পর্কে বলেন, এই রিওয়ায়াত অন্ধকারে ঢাকা। ইহার অধিকাংশ বর্ণনাকারীর কোন পরিচয় নাই। ইহা হইতে প্রতীয়মান হয় যে, শী'আদের কালো হাত দ্বারা ইহা নির্মিত। যাহারা রাসূলুল্লাহ (س)-এর উপর মিথ্যা আরোপ করে আল্লাহ তাহাদিগকে অপদস্থ ও অভিশপ্ত করুন। কারণ রাসূলুল্লাহ (س) বলিয়াছেন :
مَنْ كَذَبَ عَلَيَّ مُتَعَمِّدًا فَلْيَتَبَوَّأْ مَقْعَدَهُ مِنَ النَّارِ. "যেই ব্যক্তি জ্ঞাতসারে আমার উপর মিথ্যা আরোপ করিবে তাহার আবাস জাহান্নাম।"
আগেকার রিওয়ায়াতটিকে খোদ 'আলী (রা)-এর সহিত সম্পর্কিত করা হয়, অথচ ইহাতে তাঁহার বিরাট মর্যাদার কথা বর্ণিত। কোন জ্ঞানবান মানুষের বিবেক 'আলী (রা) কর্তৃক নিজের প্রশংসা সম্বলিত এই রিওয়ায়াতকে তাঁহার সূত্রে বর্ণিত হইবার কথা বিশ্বাস করিতে পারে? 'আলী (রা) হইতে অন্য কোন রিওয়ায়াত এই রাবীগণ বর্ণনা করিয়াছেন বলিয়া কোন প্রমাণ নাই। 'আলী (রা) হইতে নির্ভরযোগ্য বর্ণনাকারী, যেমন উবায়د আস-সালমানী, শুরায়ح আল-কা'বী, আমের আশ-শা'বী প্রমুখের কোন উল্লেখ নাই। অথচ এক অজানা-অচেনা মহিলার সূত্রে তাহার নিকট হইতে এইরূপ বর্ণনা কেমন করিয়া গ্রহণ করা যায়!
মুওয়াত্তা মালিক, সিহাহ সিত্তা, সুনান ও মুসনাদ গ্রন্থমালার গ্রন্থকারগণ কর্তৃক এই হাদীছ প্রত্যাখ্যাত। এই সম্পর্কিত কোন "সহীহ" ও "হাসান” বর্ণনাও নাই। ইহাই বড় দলীল হইল যে, ইহাদিগের নিকট উক্ত রিওয়ায়াতের কোন ভিত্তি নাই। আবূ ابدور রাহমান আন-নাসাঈ আলী (রা)-এর একটি চরিত গ্রন্থ রচনা করিয়াছেন। কিন্তু তাহাতে ইহার বর্ণনা নাই। আল-হাকেমও তাঁহার মুসতাদরাকে রিওয়ায়াতটি উল্লেখ করেন নাই। অথচ ইহাদিগকে সামান্য হইলেও 'আলী (را) প্রীতির প্রতি সম্পর্কিত করা হয়। ইহাকে যাহারা বর্ণনা করিয়াছেন তাহায়া কেবল বিস্ময় বোধ ও অজানা মনে করিয়াই বর্ণনা করিয়াছেন। এই অর্থের অধিকাংশ বর্ণনাই মিথ্যা ও بানোয়াট। এই সকল রিওয়ায়াতের মধ্যে আহমাদ ইبْن سালিح আল-মিসরী কর্তৃক বর্ণিত রিওয়ায়াত অপেক্ষাকৃত উত্তম। সূত্রটি হইল এইরূপ :
عَنْ أَحْمَدَ بْنِ صَالِحِ الْمِصْرِى عَنِ ابْنِ أَبِي فُدَيْكَ عَنْ مُحَمَّدِ بْنِ مُوسَى الْفِطْرِى عَنْ عَوْنِ بْنِ مُحَمَّدٍ عَنْ أُمِّهِ أُمِّ جَعْفَرٍ عَنْ أَسْمَاءَ.
(একমাত্র এই সূত্রে বর্ণিত রিওয়ায়াতই খায়বারের আস-সাহبا নামক স্থানে ঘটনাটি ঘটিয়াছিল বলিয়া উল্লেখ রহিয়াছে)।
আহমاد ইبْن سালিح রিওয়ায়াতটিকে সহীح বলিয়া ঘটনাটির যথার্থতার পক্ষে অভিমত ব্যক্ত করিয়াছেন বলিয়া বর্ণিত আছে। ইমাম তাহাবী তাঁহার মুশকিলুল آছার গ্রন্থে علی ইبْن ابدير রাহমানের বরাতে বলিয়াছেন, احمد ইبْن سালিح আল-মিসরী বলেন:
لا يَنْبَغِي لِمَنْ كَانَ سَبِيلَهُ الْعِلْمُ التَّخَلَّفُ عَنْ حِفْظِ حَدِيْثِ أَسْمَاءَ فِي رَبِّ الشَّمْسِ لأَنَّهُ مِنْ عَلَامَاتِ النُّبُوَّةِ.
"ইলম অন্বেষণকারীর জন্য আসমা (রা)-এর সূর্য ফিরাইয়া আনা সংক্রান্ত হাদীছখানা হইতে বিমুখ হওয়া উচিত নয়। কারণ ইহা নবুওয়াতের অন্যতম আলামত।"
এই অভিমতের পক্ষে আবূ জা'فر আত-তাহাবীও ঝুঁকিয়া পড়িয়াছেন। আবুল কاسিম আল-হাসকাফীর বর্ণনামতে মু'تازila মতাবলম্বী তর্কবাগিশ ابور ابدিল্লাহ আল-বাসرى বলেন:
عَوْدُ الشَّمْسِ بَعْدَ مُغِيبِهَا اكَدُ حَالاً فِيمَا يَقْتَضِى نَقْلُهُ لَأَنَّهُ وَإِنْ كَانَ فَضِيلَةً لَأَمِيرِ الْمُؤْمِنِينَ فَإِنَّهُ مِنْ أَعْلَامِ النُّبُوَّةِ.
"সূর্য অস্ত যাওয়ার পর ফিরিয়া আসার প্রেক্ষাপট অত্যন্ত শক্তিশালী যাহা বর্ণনার দাবি রাখে। কারণ ইহাতে আমীরুল মু'মিনীনের ফযীলতের কথা থাকিলেও ইহা নবুওয়াতের অন্যতম আলামত" (প্রাগুক্ত, পৃ. ১৫৮-১৫৯)।
অতঃপর ইব্‌ن কাছীর বলেন, এই বক্তব্যের সারকথা হইল, বিষয়টি মুتاواতির সূত্রে বর্ণিত হইবার বস্তু ছিল। ইহা ঐ সময় পাওয়া যায় যখন হাদীছটি সহীח হয়। কিন্তু ইহা তো এইরূপ বর্ণিত হয় নাই। সুতরাং প্রমাণিত হয় যে, বিষয়টি প্রকৃতপক্ষে সঠিক (صحیح) নয়। وَاللهُ أَعْلَمُ (প্রাগুক্ত)। সর্বযুগের ইমামগণ এইরূপ হাদীছের সহীح হওয়াকে অস্বীকার করিতেছেন। তাঁহারা ইহাকে প্রত্যাখ্যান করিয়া ইহার راবীগণের কঠোর সমালোচনা করিয়া আসিতেছেন। ইহাদিগের অন্যতম হইলেন মুহাম্মاد ইয়া'لا ইبْن 'উবায়د আত-تانافিসى, دیমাশকের খতীব ইবরাهیم ইبْن ইয়াকৃত আল-جاووزجانى, ابور বাক্স মুহাম্মاد ইبْن হাতিم আল-বুখারى (যিনি ইبْن زانجাবিয়া নামে খ্যাت), হাফیز ابور কাসیم ইन्न আসাকির এবং শায়خ ابور ফারাজ ইবনুল জাওযী প্রমুখ নবীন ও প্রবীণ হাদীছবেত্তাগণ। হাফিজ ابور الحاجাজ আল میزی ও ابور العباس ইبْن تایমیا এইরূপ রিওয়ায়াতকে সুস্পষ্টভাবে بানোয়াট বলিয়া আখ্যায়িত করিয়াছেন। হাকিম ابور ابدিল্লাহ নিশাপুরী স্বীয় সূত্রে علی ইবনুল মাদীনী হইতে নিম্নোক্ত উক্তি বর্ণনা করিয়াছেন :
خَمْسَةٌ أَحَادِيثَ يَرْوُونَهَا وَلَا أَصْلَ لَهَا عَنْ رَسُولُ الله ﷺ حَدِيثُ لَوْ دَقَ السَّائِلُ مَا أَفْلَحَ مَنْ رَدَّهُ وَحَدِيْثُ لا وَجْعَ إِلا وَجْعُ العَيْنِ وَلَا غَمُ إِلَّا غَمُ الدِّيْنِ وَحَدِيْثُ أَنَّ الشَّمْسِ رُدَّتْ عَلَى عَلَى بْنِ أَبِي طَالِبٍ وَحَدِيْثُ أَنَّى أَكْرَمُ عَلَى اللَّهِ مِنْ أَنْ يَدَعَنَّى تَحْتَ الْأَرْضِ مَأَتَى عَامٍ وَحَدِيْثُ أَفْطَرَ الحَاجِمُ وَالْمَحْجُومُ أَنَّهُمَا كَانَا يَعْتَابَانِ.
"পাঁচটি হাদীছ ইহারা বর্ণনা করেন, অথচ ইহা রাসূলুল্লাহ (س) হইতে বর্ণিত হইবার কোন প্রমাণ নাই। ১. ভিক্ষুক যদি সত্যবাদী হয় তাহা হইলে তাহাকে যে ফিরাইয়া দিবে তাহার কল্যাণ হইবে না। ২. চক্ষুর ব্যথা ছাড়া অন্য কোন ব্যথা নাই, দীনের চিন্তা ব্যতীত অন্য কোন চিন্তা নাই। ৩. সূর্য علی ইبْن ابی তালিব (রা)-এর জন্য ফিরাইয়া দেওয়া হইয়াছিল। ৪. আমি আল্লাহর অধিক করুণা অর্জনকারী হইব যে, আমাকে তিনি দুই শত বৎসর ভূগর্ভে রাখিয়া দিবেন। ৫. রক্তমোক্ষণকর্তা ও কৃতের রোযা ভঙ্গ হইয়া যায়। ইহারা গীবতে লিপ্ত হয়।"
ইমাম তাহাবীর নিকট সূর্য প্রত্যাগত হইবার বিষয়টি অস্পষ্ট থাকিলেও ইমাম ابور حনিফা (ر) হইতে ইহাকে অস্বীকার করা এবং ইহার راবীগণ সম্পর্কে বিদ্রূপ করিবার কথা বর্ণিত রহিয়াছে। ابور حনিফা (ر) একজন অতীব নির্ভরযোগ্য ইমাম। কৃষ্ণার একজন বাসিন্দা ছিলেন। এতদসত্ত্বেও তাঁহার সম্পর্কে আল্লাহ ও রাসূল প্রদত্ত ফযীলت ছাড়া বাড়তি 'علی (را) প্রীতির কোন অভিযোগ নাই।
'ইয়ূশা ইبْن نূন (আ) সম্পর্কে সূর্য ফিরিয়া আসিবার যেই ঘটনা বর্ণিত হইয়াছে ইহা আসলে সূর্য অস্ত যাইবার পর ফিরিয়া আসা নয়, বং সূর্য অস্তমিত হইতে কিছু সময়ের জন্য আটকিয়া থাকা (ইব্‌ن কাছীর, শামাইলুর রাসূল, পৃ. ১৬۰)। شایخ ইبْن تایমিয়া অভিযোগের জওয়াবে শী'আ গুরু جمالুদ্দীন یوسف ইবনুল-موتাহহার নামে পরিচিত আল-ইমামা নামে একটি গ্রন্থ প্রণয়ন করিয়াছেন। ইহাতে তিনি বলিয়াছেন, সূর্য অস্তমিত হইবার পর দুইবার প্রত্যাগত হইয়াছিল। প্রথমবার এই সম্পর্কে جابر ও ابور سعید (را) হইতে নিম্নোক্ত রিওয়ায়াতটি উল্লেখ করা হইয়াছে:
إِنْ رَسُولَ اللهِ ﷺ نَزَلَ عَلَيْهِ جِبْرِيلُ يَوْمًا يُنَاجِيهِ مِنْ عِنْدِ اللَّهِ فَلَمَّا تَغَشَاهُ الْوَحْى تَوَسَّدَ فَخِذَ أَمِيرِ الْمُؤْمِنِينَ فَلَمْ يَرْفَعْ رَأْسَهُ حَتَّى غَابَتِ الشَّمْسُ فَصَلَّى عَلِيُّ الْعَصْرَ بِالإيْمَاء. فَلَمَّا اسْتَيْقَظَ رَسُولُ اللهِ ﷺ قَالَ لَهُ سَلِ اللهَ أَنْ يُرَدَّ عَلَيْكَ الشَّمْسَ فَتُصَلَّى قَائِمًا فَدَعَا فَرُدَّتِ الشَّمْسُ فَصَلَّى الْعَصْرَ قَائِمًا.
এই বর্ণনায় রহিয়াছে, 'علی (রা)-এর উরুর উপর রাসূলুল্লাহ (س)-এর মাথা থাকা অবস্থায় 'علی (را) ইশারায় সালাত আদায় করিয়াছিলেন। 'علی (را)-এর দু'আতেই সূর্যকে ফিরাইয়া দেওয়া হইয়াছিল।
দ্বিতীয়বার যখন 'علی (রা) ফুরাت নদী পাড়ি দিতে চাহিয়াছিলেন তখন অনেক সাহাবী তাঁহাদিগের বাহনের পরিচর্যায় মশগুল হইয়া পড়িয়াছিলেন। এই সময় তিনি কিছু সংখ্যক সাথী লইয়া আসরের সালাত আদায় করিলেন এবং অন্যদের সালাত কাযা হইয়া গেল। এই ব্যাপারে তাহারা কিছু বলাবলি করিতে লাগিল। 'علی (রা) সূর্য ফিরাইয়া দিবার দু'আ করিলেন। তখন সূর্যকে ফিরাইয়া দেওয়া হইয়াছিল। ইবনুল موتاحহার এই ব্যাপারে আল-হিময়ারীর নিম্নোক্ত কবিতার উদ্ধৃতি দিয়াছেন:
ردت عَلَيْهِ الشَّمْسُ لَمَّا فَاتَهُ + وَقْتُ الصَّلَاةِ وَقْتُ دَنَتْ لِلْمَغْرِبِ حَتَّى تَبَلَّجَ نُورُهَا فِي وَقْتِهَا + لِلْعَصْرِ ثُمَّ هَوَتْ هُوِي الْكَوْكَبِ وَعَلَيْهِ قَدْ رُدَّتْ بِبَابِلَ مَرَّةَ + أُخْرَى وَمَا رُدَّتْ لِخَلْقٍ مُقَرَّب.
এখানে বলা হইয়াছে, 'بابل' শহরে দ্বিতীয়বার 'علی (را)-এর জন্য সূর্যকে ফিরাইয়া দেওয়া হইয়াছিল। সূর্যকে অন্য কোন প্রিয় সৃষ্টির জন্য ফিরাইয়া দেওয়া হয় নাই।
এই সম্পর্কে ইব্‌ن تایمیا বলেন, সূর্যকে ফিরাইয়া আনার হাদীছ ابور জা'فر তাহাবী ও قازی আয়াযের মত কিছু লোক উল্লেখ করিয়াছেন। তাহারা ইহাকে রাসূলুল্লাহ (س)-এর অলৌকিক ঘটনাবলীর মধ্যে গণ্য করিয়াছেন। কিন্তু বিজ্ঞ হাদীছবেত্তাগণ ইহাকে মিথ্যা বানোয়াট হাদীছ বলিয়া অভিহিত করিয়াছেন। بابلএর ঘটনা সম্পর্কে ইব্‌ن কাছীর বলেন, ইহার কোন সনদ নাই। আমার ধারণা ইহা কোন "যিনدیق” শী'আ কর্তৃক আবিষ্কৃত ( والله اعلم)। আল-হিময়ারীর কবিতা সম্পর্কে তিনি বলেন, ইহা কোন অবস্থাতেই দলীল নয়। ইহা ইবনুল موتاحহারের মত বালখিল্যতা মাত্র। 'علی (রা) সম্পর্কে بابیلের ঘটনাটি সম্পর্কে ابور دাউদ তাঁহার সুনান গ্রন্থে বর্ণনা করিয়াছেন যে, 'علی (রা) بابل স্থানটি অতিক্রম করিবার সময় আসরের সালাতের সময় হইয়া গিয়াছিল। এতদসত্বেও তিনি এই স্থানটি অতিক্রম করিবার পূর্বে সালাত আদায় করেন নাই। এই সম্পর্কে তিনি বলিয়াছিলেন:
نَهَانِي خَلِيْلِي أَنْ أَصَلَّى بِأَرْضِ بَابِلَ فَإِنَّهَا مَلْعُونَةٌ.
"আমার বন্ধু রাসূলুল্লাহ (س) আমাকে নিষেধ করিয়াছিলেন "بابل” ভূমিতে সালাত আদায় করিতে। কারণ ইহা অভিশপ্ত স্থান" (شامائلور রাসূল, পৃ. ১৬۱-১৬۳)।
'علی (রা)-এর জন্য সূর্য অস্ত যাইবার পর তাহার পুনরুত্থان সম্পর্কিত এই দীর্ঘ আলোচনার পর এই কথার উপর বিশ্বাস স্থাপনের ধারে কাছেও যাওয়া যায় না। যাহারা হাদীছের শুদ্ধاشুদ্ধি লইয়া সূক্ষ্মাতিসূক্ষ্মভাবে গবেষণা করেন তাহাদিগের নিকট দিবালোকের মত প্রस्फুটিত হইয়া উঠিবে যে, ইহা আবিষ্কৃত মনগড়া হাদীছ। তবে যাহারা ইহার সত্যতা সম্পর্কে নীরব ছিলেন, যেমন قازی আয়ায ও ইমাম তাহাবী, তাহাদিগের নিকট হয়ত হাদীছগুলির সার্বিক বিষয় উত্থাপিত হয় নাই। তাহারা ভাবিয়াছেন, আল্লাহ তাঁহার বান্দা সৃষ্টিকুলের সেরা মানবের জন্য কি না করিতে পারেন। তাই কেহ ইহাকে আলামতে نبوت, কেহ مو'জিযা মনে করিয়া উল্লেখ করিয়াছেন। হাদীছ ও তাহার সনদের মধ্যে যে ব্যাপক অমিল রহিয়াছে ইহাকে মানিয়া লইবার কোনই পথ নাই। বিষয়টিকে যাহারা মানিয়া লইয়াছেন তাহারা যদি اهلے হক্কের অনুসারী হইয়া থাকেন তাহা হইলে তাহারা সনদ ও বর্ণনার প্রতি ভ্রুক্ষেপ না করিয়া কেবল কুদরতে ইলাহীর প্রতি লক্ষ্য করিয়াছেন। আর শী'আগণ তো ইহাকে স্বীয় স্বার্থসিদ্ধির লক্ষ্যে অবমূল্যায়ন করিয়াছে। কারণ اهلے হকের যাহারা ইহাকে সম্পূর্ণভাবে প্রত্যাখ্যান করেন নাই তাহারা ইহাকে রাসূলুল্লাহ (س)-এর মর্যাদার অন্তর্ভুক্ত ভাবিয়াছেন ( واللهُ اَعْلَمُ )।
খায়বার বিজয় সম্পর্কে হাসسان (রা)-এর কবিতা: ইبْن হিশام ইبْن إسحاق বরাতে বলেন, খায়বার দিবসে হাসসান ইبْن ছابিত (রা) নিম্নোক্ত কবিতা আবৃত্তি করিয়াছিলেন:
(১) بِئْسَمَا قَاتَلَتْ خَيَابِرُ عَمَّا + جَمَعُوا مِنْ مَزَارِعَ وَنَخِيلٍ (২) كَرِهُوا الْمَوْتَ فَاسْتَبِيحَ حِمَاهُمْ + وَأَقَرُّوا فِعْلَ اللَّهِيمِ الدَّلِيلِ (৩) أَمِنَ الْمَوْتِ يَهْرِبُوا فَإِنَّ الْمَوْتَ + مَوْتَ الْهَزَالِ غَيْرُ جَمِيل
(১) “খায়বারবাসীরা যে কৃষিজমি ও খেজুর বাগানের মালিক ছিল, তাহার প্রতিরক্ষায় যুদ্ধ ছিল অত্যন্ত নিকৃষ্ট। (২) তাহারা মৃত্যুকে অপসন্দ করিয়াছিল, ফলে তাহাদের সংরক্ষিত স্থান বৈধ করিয়া লওয়া হয়। তাহারা একান্ত ইতর শ্রেণীর আচরণ করিয়াছে। (৩) তাহারা কি মৃত্যু হইতে পলায়ন করিতে পারিবে? কাপুরুষদের মৃত্যু নিশ্চয়ই উত্তম ও কাংক্ষিত নহে।”
آیمان পক্ষ হইতে কৈফিয়ত: হাসسان ইبْن ছابিত (را) آیمان ইبْن উম্মু آیمان উবায়دের পক্ষ হইতে কৈফিয়ت দিয়াও কবিতা রচনা করেন। آیمان খায়বার যুদ্ধে অংশগ্রহণ করেন নাই। তিনি ছিলেন بانُ آوف ইبْن خازরাজ গোত্রের লোক। তাহার মাতা উممُ آیمان ছিলেন রাসূলুল্লাহ (س)-এর মুক্ত দাসী। তিনি উসামا ইبْن যায়د (را)-এর বৈপিত্রেয় ভাই। হাসسان (را) তাঁহার সেই কবিতায় বলেন:
سیرۃ وبشکوش (۱) عَلَى حِينٍ أَنْ قَالَتْ لأَيْمَنَ أُمُّهُ - جَبَنْتَ وَلَمْ تَشْهَدُ فَوَارِسَ خَيْبَرَ (۲) وَأَيْمَنُ لَمْ يُجِبْنَ ولكن مَهْرَهُ - أَضْرَبَهُ شُرْبُ الْمَدِيدَ الْمُخَمِّرِ (۳) ولولا الَّذِي قَدْ كَانَ مِنْ شَأْنِ مَهْرِهِ - لَقَاتَلَ فِيْهِمْ فَارِسًا غَيْرُ عُسْرٍ (٤) وَلَكِنَّهُ قَدْ صَدَّهُ فِعْلُ مَهْره - وَمَا كَانَ مِنْهُ عِنْدَهُ غَيْرُ أَيْسَرَ.
(১) “আয়মানের মাতা যখন তাহাকে তিরস্কার করিয়া বলিয়াছিলেন, খায়বার যুদ্ধের অশ্বারোহীদের সঙ্গে যোগ না দিয়া হে আয়মান! তুমি কাপুরুষের মত কাজ করিলে। (২) আসলে সেই দিন আয়মান কোন কাপুরুষতা প্রদর্শন করে নাই, بং তাহার ঘোড়াটি آটা মিশ্রিত নেশাযুক্ত পানি পানে পীড়িত হইয়া পড়িয়াছিল। (৩) যদি সেই দিন তাহার ঘোড়াটির অবস্থা এমন না হইত তাহা হইলে সে অবশ্যই অশ্বারোহী দক্ষতার সহিত যুদ্ধ করিত। (৪) কিন্তু তাহাকে বাধা প্রদান করিয়াছে তাহার ঘোড়ার ক্রিয়া, অন্যথায় সে দক্ষতার সহিতই যুদ্ধ করিত।"
ইবْن হিশাম বলেন, ابور যায়د-এর মতে এই কবিতাগুচ্ছ کا'ب ইبْن মালিক রচিত, তবে উহাতে নিম্নরূপ পরিবর্তন রহিয়াছে:
وَلَكِنْ قَدْ صَدَّهُ شَأْنُ مَهْرِهِ - وَمَا كَانَ لَوْلا ذَاكُمْ بِمُقْصِرٍ.
"বং তাহাকে আটকাইয়াছে তাহার ঘোড়ার অবস্থা। যদি তাহা না হইত তাহা হইলে সে কোন ত্রুটি করিত না।"
ইবْن ইসহاق বলেন, ناجیا ইन्न জুনدوب আসলামী নিম্নোক্ত কবিতা রচনা করেন:
بالعباد الله فيمَ يَرْغَبُ - مَا هُوَ الأَ مَأْكَلُ وَمَشْرَبُ وَجَنَّةً فِيهَا نَعِيمٌ مُعْجَبٌ.
"আক্ষেপ আল্লাহব বান্দাদের জন্য! কিসের আসক্তিতে আচ্ছন্ন? ইহা তো কেবল পানাহারের স্থান, অথচ জান্নাতে রহিয়াছে আকর্ষণীয় নি'مت।"
নাجیا ইন্ন জুনদوب আরও বালিয়াছেন:
أَنَا لِمَنْ أَنْكَرَنِي ابْنَ جُنْدُبٍ يَارُبُ + قَرْنٍ فِي مَكْرِي أَنْكَبُ طَاحَ بِمَغْدَى أَنَسْرُ وَتَعْلَبُ.
"যে আমার পরিচয় জানে না আমি তাহার উদ্দেশ্যে বলিতেছি, আমি হইলাম জুনদوبের পুত্র। কত প্রতিপক্ষ আছে যাহারা যুদ্ধকালে আমার কৌশলের কাছে অধোমুখী হয় এবং তাহাদের মৃতদেহ হয় শকুন বা শিয়ালের সকালের খাবার।"
کا'বের কবিতা ইबْن হিশাম ابور যায়د আল-আনসারী হইতে বর্ণনা করিয়াছেন যে, کا'ب ইبْن মালিক (রা) খায়বার দিবসে নিম্নোক্ত কবিতা আবৃত্তি করিয়াছিলেন:
(১) وَنَحْنُ وَرَدْنَا خَيْبَراً وَفُرُوضَهُ - بِكُلِّ فَتَى عَارِيُّ الأَشَاجِعِ مَدُودٌ (২) جواد لَدَى الْغَايَاتِ لا وَاهِنِ الْقَوِيُّ - جَرِى عَلَى الْأَعْدَاءِ فِي كُلِّ مَشْهَدِ (৩) عَظِيمُ رَمَادِ القدر في كُلِّ شَتْوَة - ضَرُوبٌ بنصلِ الْمَشْرِفِي الْمُهَنَّدِ (٤) يَرَى الْقَتْلَ مَدْحًا إِنْ أَصَابَ شَهَادَةً - مِنَ اللَّهِ يَرْجُوهَا وَفَوْذَا بِأَحْمَدِ (٥) يَدُودُ وَيُحمى عن ذِمَارٍ مُحَمَّدٍ - وَيَدْفَعُ عَنْهُ بِالنِّسَانِ وَبِالْيَد. (৬) وَنَيْصُرُهُ مِنْ كُلِّ أَمْرٍ يُرِيبُهُ - يَجُودُ لِنَفْسٍ دُونَ نَفْسٍ مُحَمَّدٍ (۷) يَصْدَقُ بِالأَنْبَاءِ بِالْغَيْبِ مُخْلِصًا - يُرِيدُ بِذَاكَ الْفَوْزُ وَالْعِزَّ فِي غَد.
(১) "আমরা খায়বারে আর ইহার ঘাটিগুলিতে অবতরণ করিযাছি যুবা-কিশোরদের লইয়া, যাহাদের হাতের শিরাসমূহ স্পষ্ট হইয়া উঠে নাই;
(২) লক্ষ্য অর্জনে যাহারা দুর্বল নয়। প্রতিটি ময়দানে শত্রুদের মুকাবিলায় তাহারা সাহসী।
(৩) শীত মৌসুম তাহাদের চুলায় থাকে ছাইয়ের বিরাট স্তূপ।
(৪) নিহত হওয়াকে তাহারা প্রশংসনীয় কাজ মনে করে ও রাসূলুল্লাহ (স)-এর সন্তুষ্টির লাভের উপায় আল্লাহর পথে কাঙ্খিত শাহাদত অর্জন করিতে পারে।
(৫) মুহাম্মাদ (স)-এর অধিকারসমূহ সংরক্ষণে তাহারা সদা প্রস্তুত থাকে, মুখ ও হাত দ্বারা সর্বদা তাহারা তাহার বিরুদ্ধবাদীদেরকে প্রতিহত করে।
(৬) যে কোন আশংকাজনক কাজে তাঁহার সাহায্যে তাহারা আগাইয়া আসে। মুহাম্মাদ (স)-এর প্রাণ রক্ষার্থে তাহারা নিজেদের জীবন বিসর্জন দেয়।
(৭) গায়বের খবরাদিকে তাহারা নিষ্ঠার সহিত বিশ্বাস করে, ইহার দ্বারা তাহারা কাল কিয়ামতের সম্মান ও সফলতা কামনা করে" (ইبْن হিশام, سীরাতুন نبی, ৪খ., পৃ. ২৪۰; আল-বিদায়া ওয়ান-নিহায়া, ২/৪খ, পৃ. ২১۸)।

কথিত আছে যে, খায়বার যুদ্ধকালে সংঘটিত ঘটনাবলীর একটি এই যে, খায়বার হইতে প্রত্যাবর্তনকালে রাসূলুল্লাহ (স) 'আস-সাহবা' নামক স্থানে পৌঁছিলে এখানে সায়্যিদা সাফিয়্যা (রা)-এর সহিত তাঁহার বাসর হয়। এই স্থানেই তিনি 'আসরের সালাত আদায় করিলেন অতঃপর তাঁহার মাথা 'আলী (রা)-এর উরুর উপর রাখিয়া শুইলেন। এমতাবস্থায় ওহী আসিবার লক্ষণাদি তাঁহার মধ্যে পরিলক্ষিত হইল। 'আলী (রা) আসরের সালাত আদায় করেন নাই। ওহী অবতরণ এতই দীর্ঘায়িত হইল যে, সূর্য অস্তমিত হইয়া গেল। ওহী অবতরণ শেষ হইলে রাসূলুল্লাহ (স) 'আলী (রা)-কে জিজ্ঞাসা করিলেন, "আসরের সালাত আদায় করিয়াছ কি"? 'আলী (রা) নিবেদন করিলেন, হে আল্লাহ্র রাসূল! আমি সালাত আদায় করি নাই। রাসূলুল্লাহ (স) এই সময় দু'আ করিলেন, হে আমার প্রতিপালক! যদি আলী আপনার এবং আপনার রাসূলের আনুগত্যে ব্যস্ত থাকে, তাহা হইলে সূর্যকে আদেশ করুন উহা যেন পুনরায় দৃষ্ট হয়। ইহাতে সে আসরের সালাত আদায় করিতে সক্ষম হইবে। মহান আল্লাহ তাঁহার দু'আ কবুল করিলেন। ফলে সূর্য অস্তমিত হইবার পরও দ্বিতীয়বার উদিত হইল। সূর্যের কিরণ পাহাড় ও টিলায় বিকীরিত হইল। সৃষ্টিজগত ইহা প্রত্যক্ষ করিল। 'আলী (রা) উযু করিলেন এবং সালাত আদায় করিলেন।
'আল্লামা দিহলাবী বলেন, রাসূলুল্লাহ (স)-এর জন্য সূর্যকে ডুবিতে না দেওয়া ও ফিরাইয়া আনা তিনটি স্থানে পাওয়া যায়। (এক) মি'রাজ হইতে ফিরিবার পর যখন কোন এক কাফেলা সম্পর্কে কুরায়শদের দ্বারা জিজ্ঞাসিত হইয়া তিনি বলিয়াছিলেন যে, ইহারা বুধবার দিন এই স্থানে পৌঁছিবে। (দুই) খনদক দিবসে আসরের সালাত কাযা হইয়া গেলে রাসূলুল্লাহ (স) সূর্য ফিরাইয়া দিবার দু'আ করিয়াছিলেন। কিন্তু এই ব্যাপারে স্বতসিদ্ধ কথা হইল, সূর্য অস্তমিত হইবার পর রাসূলূল্লাহ (স) কাযা পড়িয়াছিলেন। (তিন) এখানকার বর্ণিত ঘটনা যে, 'আলী (রা)-এর আসরের সালাত কাযা হইয়া গেলে রাসূলুল্লাহ (স)-এর দু'আর ফলে সূর্যকে ফিরাইয়া দেওয়া হইয়াছিল। এই হাদীছগুলি সম্পর্কে মুহাদ্দিছগণ বিভিন্ন ব্যাখ্যা দিয়াছেন। যূশা' ইব্‌ন নূন (আ) সম্পর্কে একটি বিশুদ্ধ হাদীছ বর্ণিত:
لَمْ يُحْبَسِ الشَّمْسُ عَلَى أَحَدٍ إِلَّا لِيُوشَعَ بْنِ نُونٍ.
"যূশা' ইব্‌ন নূন (আ) ব্যতীত আর কাহারও জন্য সূর্যকে অস্ত যাওয়া হইতে বিরত রাখা হয় নাই।” হাদীছটি মিশকাতে বুখারী ও মুসলিমের উদ্ধৃতিতে আবূ হুরায়রা (রা) হইতে বর্ণিত (মাদারিজুন নুবুওয়াত, প্রাগুক্ত, পৃ. ৪২৬)। হাদীছটি উপরে উল্লিখিত বর্ণনার পরিপন্থী। যেহেতু বিষয়টি অত্যন্ত বিরোধপূর্ণ, তাই এখানে বিস্তারিত আলোচনা তুলিয়া ধরা হইল যাহাতে বিষয়টি আরও স্পষ্ট হয়। এই প্রসংগে তিনি নিম্নোক্ত হাদীছ উল্লেখ করেন:
عَنْ أَسْمَاءَ بِنْتِ عُمَيْسٍ قَالَتْ كَانَ رَسُولُ اللهِ ﷺ يُوحِي إِلَيْهِ وَرَاسُهُ فِي حِجْرٍ عَلَى فَلَمْ يُصَلِّ الْعَصْرَ حَتَّى غَرَبَتِ الشَّمْسُ فَقَالَ رَسُولُ اللهِ ﷺ صَلَّيْتَ الْعَصْرَ وَقَالَ أَبُو أُمَيَّةَ صَلَّيْتَ يَا عَلِيُّ قَالَ لَا قَالَ رَسُولُ اللهِ ﷺ وَقَالَ أَبُو أُمَيَّةَ فَقَالَ النَّبِيُّ ﷺ اللَّهُمَّ إِنَّهُ كَانَ فِي طَاعَتِكَ وَطَاعَةِ نَبِيِّكَ وَقَالَ أَبُو أُمَيَّةَ رَسُولِكَ فَارْدُدْ عَلَيْهِ الشَّمْسَ قَالَتْ أَسْمَاءُ فَرَأَيْتُهَا غَرَبَتْ ثُمَّ رَأَيْتُهَا طَلَعْتُ بَعْدَ مَا غَرَبَتْ.
"আসমা বিন্ত 'উমায়স (রা) বলেন, রাসূলুল্লাহ (স)-এর উপর ওহী অবতীর্ণ হইতেছিল। এমতাবস্থায় তাহার মাথা 'আলী (রা)-এর কোলে ছিল। ফলে তিনি আসরের সালাত আদায় করিবার পূর্বেই সূর্য অস্তমিত হইয়া গেল। রাসূলুল্লাহ (স) অতঃপর জিজ্ঞাসা করিলেন, হে আলী! তুমি কি আসরের সালাত আদায় করিয়াছ? তিনি বলিলেন, না। রাসূলুল্লাহ (স) বলিলেন : হে আল্লাহ! নিশ্চয় 'আলী তোমার আনুগত্যে ও তোমার নবীর আনুগত্যে ছিল। সুতরাং তুমি তাহার জন্য সূর্যকে ফিরাইয়া দাও। আসমা (রা) বলেন, আমি দেখিলাম সূর্য অস্তমিত হইয়া গিয়াছে, অতঃপর তাহা উদিত দেখিলাম।"
আবূ আবদুল্লাহ ইব্‌ন মানদা সূত্রে বর্ণিত এই হাদীছকে শায়খ আবুল ফারাজ ইবনুল জাওযী (র) জাল (موضوع) হাদীছের মধ্যে গণ্য করিয়াছেন। আবূ জা'ফার আল-উকায়লী সূত্রেও একটি হাদীছ বর্ণিত আছে। ইবনুল জাওযী এই হাদীছকেও জাল (موضوع) বলিয়া অভিহিত করিয়াছেন। উক্ত হাদীছের বর্ণনাকারিগণের মধ্যেও বিভিন্নতা রহিয়াছে। হাফিজ ইব্‌ন 'আসাকির এই হাদীছকে মুনকার (منکر) বলিয়া অভিহিত করিয়াছেন। ইহাতে একাধিক অজ্ঞাত পরিচয় বর্ণনাকারী রহিয়াছেন। এই সম্পর্কে ইন্ন কাছীর তাঁহার অভিমত ব্যক্ত করেন যে, এই হাদীছ যত সনদেই বর্ণিত হইয়াছে সবগুলিই দুর্বল ও মুনকার। এমন কোন সনদ নাই যেখানে কোন না কোন এক শী'আ মতবাদী, অপরিচিত কিংবা প্রত্যাখ্যাত ব্যক্তি নাই।
এই প্রকার হাদীছের সনদ মুত্তাসিল হইলেও এইরূপ গুরুত্বপূর্ণ বিষয়ে খবরে ওয়াহিদ পর্যায়ের হাদীছ গ্রহণযোগ্য হয় না, খবরে মুতাওয়াতির কিংবা খবরে মাশহুর হইতে হয়। আমরা আল্লাহ্ কুদরত ও রাসূলুল্লাহ (স)-এর মাধ্যমে তাহার প্রকাশের সম্ভাবনাকে অস্বীকার করি না। সহীহ বুখারীর রিওয়ায়াতে বর্ণিত আছে, সূর্যকে যূশা' ইব্‌ নূন (আ)-এর জন্য ফিরাইয়া আনা হইয়াছিল। ইহা ছিল সেই দিনের ঘটনা যেই দিন তিনি বায়তুল মাকদিস অবরোধ করিয়াছিলেন। ইহা ছিল জুমু'আর দিন। অপরদিকে বনী ইসরাঈল শনিবার দিন যুদ্ধ করিত না। এই সময় যূশা' (আ) সূর্যের দিকে দৃষ্টিপাত করিলেন। সূর্যের তখন অস্ত যাওয়ার অবস্থা। তিনি বলিলেনঃ হে সূর্য! তুমি যেমন আদিষ্ট, আমিও তেমন আদিষ্ট। হে আল্লাহ! সূর্যকে আমার জন্য থামাইয়া রাখ। ফলে আল্লাহ তাঁহার জন্য সূর্যকে থামাইয়া রাখিয়াছিলেন, যতক্ষণ না তাহারা বায়তুল মাকদিস জয় করিয়াছিলেন। যূশা' ইবন নূন (আ), এমনকি সকল নবী হইতে রাসূলুল্লাহ (স)-এর মর্যাদা অনেক ঊর্ধ্বে। তবুও আমরা তাঁহার নিকট হইতে যাহা বিশুদ্ধ সূত্রে বর্ণিত আছে তাহাই বর্ণনা করিব। অন্য যাহা শুদ্ধ নহে তাহা তাঁহার সহিত সম্পৃক্ত করিব না। যদি এইরূপ বর্ণনা শুদ্ধ হইত তাহা হইলে সবার আগে আমরাই ইহা সমর্থন করিতাম (ইব্‌ন কাছীর, শামাইলুর রাসূল, পৃ. ১৪৪-১৪৮)।
অন্য আরও একটি সূত্রে এইরূপ বর্ণিত আছে:
عَنْ أَسْمَاءَ بِنْتِ عُمَيْسٍ قَالَتْ لَمَّا كَانَ يَوْمَ شُغْلِ عَلَى لِمَكَانِهِ مِنْ قَسْمِ الْمَغْنَمِ حَتَّى غربت الشَّمْسُ أَوْ كَادَتْ فَقَالَ رَسُولُ الله ﷺ أَمَا صَلَّيْتَ قَالَ لَا فَدَعَا اللَّهَ فَارْتَفَعَت الشَّمْسُ حَتَّى تَوَسَطَتِ السَّمَاءُ فَصَلَّى عَلِيُّ فَلَمَّا غَرَبَتِ الشَّمْسُ سَمِعْتُ لَهَا صَرِيرًا كَصَرِيرِ الْمِنْشَارِ فِي الْحَدِيدِ.
'আমর ইবন ছাবিত হইতে বর্ণিত আছে:
قَالَ سَأَلْتُ عَبْدَ اللَّهِ بْنَ حَسَنِ بْنِ حُسَيْنِ بْنِ عَلَى بْنِ أَبِي طَالِبٍ عَنْ حَدِيْثِ رَدَّ الشَّمْسِ عَلَى عَلَى بْنِ أَبِي طَالِب هَلْ يُثْبِتُ عِنْدَكُمْ فَقَالَ لِي مَا أَنْزَلَ اللَّهُ فِي كِتَابِهِ أَعْظَمُ مِنْ رَدَّ الشَّمْسِ قُلْتُ صَدَقْتَ جَعَلَنِي اللهُ فِدَاكَ وَلَكِنَّى أَحَبُّ عَنْ أَسْمَعَهُ مِنْكَ فَقَالَ حَدَّثَنِي أَبِي الْحَسَنُ عَنْ أَسْمَاءَ بِنْتِ عُمَيْسٍ أَنَّهَا قَالَتْ أَقَبَلَ عَلِيُّ بْنُ أَبِي طَالِبٍ ذَاتَ يَوْمٍ وَهُوَ يُرِيدُ أَنْ يُصَلَّى العَصْرَ مَعَ رَسُولِ اللهِ ﷺ فَوَافَقَ رَسُولَ اللَّهِ ﷺ قَدْ انْصَرَفَ وَنَزَلَ عَلَيْهِ الْوَحْيُ فَاسْنَدَهُ إِلَى صَدْرِهِ فَلَمْ يَزَلْ مُسْنِدُهُ إِلَى صَدْرِهِ حَتَّى أَفَاقَ رَسُولَ اللَّهِ ﷺ فَقَالَ أَصَلَّيْتَ الْعَصْرَ يَا عَلِيُّ قَالَ جِئْتُ وَالْوَحْيُ يَنْزِلُ عَلَيْكَ فَلَمْ أَزَلْ مُسْنِدُكَ إِلِى صَدْرِي حَتَّى السَّاعَةَ فَاسْتَقْبَلَ رَسُولَ اللَّهِ ﷺ وَقَدْ غَرَبَتِ الشَّمْسُ وَقَالَ اللَّهُمْ إِنَّ عَلَيْا كَانَ فِي طاعَتِكَ فَارْدُدْهَا عَلَيْهِ قَالَتْ أَسْمَاءُ فَأَقْبَلَتِ الشَّمْسُ وَلَهَا صَرِيرٌ كَصَرِيرِ الرَّحَى حَتَّى كَانَتْ فِي مَوْضِعِهَا وَقْتُ الْعَصْرِ فَقَامَ عَلَى مُتَمَكِّنَا فَصَلَّى فَلَمَّا فَرَغَ رَجَعَتِ الشَّمْسُ وَلَهَا صَرِيرٌ كَصَرِيرِ الرَّحَى فَلَمَّا غَابَتْ اخْتَلَطَ الظَّلامُ وَبَدَتِ النُّجُومُ.
এই রিওয়ায়াতে রহিয়াছে, আবদুল্লাহ ইব্‌ন্ন হাসান ইবন হুসায়ন ইবন 'আলী (রা) বলিয়াছেন, আল্লাহ তা'আলা আল-কুরআনে সূর্য ফিরাইয়া লওয়ার বিষয় হইতে বড় অন্য কোন জিনিস অবতীর্ণ করেন নাই, অথচ কুরআনে ইহার কোন উল্লেখ নাই।
আবূ সা'ঈদ আল-খুদরী (রা) হইতে বর্ণিত আছে:
قَالَ الْحُسَيْنُ بْنُ عَلَى سَمِعْتُ أَبَا سَعِيدٍ الْخُدْرِى يَقُولُ دَخَلْتُ عَلَى رَسُولِ اللَّهِ ﷺ فَإِذَا رَأْسُهُ فِي حَجْرٍ عَلَى وَقَدْ غَابَتِ الشَّمْسُ فَانْتَبَهَ النَّبِيِّ ﷺ وَقَالَ يَا عَلِيُّ أَصَلَّيْتَ الْعَصْرَ قَالَ لَا يَا رَسُولَ اللهِ مَا صَلَّيْتُ كَرِهْتُ أَنْ أَضَعَ رَأْسَكَ مِنْ حَجْرِي وَأَنْتَ وَاجِعٌ فَقَالَ رَسُولُ اللهِ ﷺ يَا عَلِيُّ ادْعُ يَا عَلَى أَدْعُ أَنْ تُرَدُّ عَلَيْكَ الشَّمْسُ فَقَالَ عَلِيُّ يَا رَسُولَ اللَّهِ أَدْعُ أَنْتَ وَأَنَا أُؤَمِّنُ فَقَالَ يَارَبِّ أَنْ عَلِيًّا فِي طَاعَتِكَ وَطَاعَةِ نَبِيِّكَ فَارْدُدْ عَلَيْهِ الشَّمْسُ قَالَ أَبُو سَعِيدٍ فَوَاللَّهِ لَقَدْ سَمِعْتُ لِلشَّمْسِ صَرِيرًا كَصَرِيرِ النَّكْبَرَةِ حَتَّى رَجَعَتْ بَيْضَاءَ نقية.
এই রিওয়ায়াতে আছে যে, রাসূলুল্লাহ (স) অসুস্থ থাকায় 'আলী (রা)-এর কোলে মাথা রাখিয়াছিলেন। রাসূলুল্লাহ (স) প্রথমে 'আলী (রা)-কে সূর্য ফিরাইয়া দিবার জন্য দু'আ করিতে বলিয়াছিলেন। কিন্তু তিনি আরয করিলেন, হে আল্লাহ্র রাসূল! আপনিই দু'আ করুন, আমি আমীন বলিব। 'আলী ইব্‌ন আবী তালিব 'রা)-এর এই সম্পর্কিত রিওয়ায়াতটি হইল:
عَنْ جُوَيْرِيَّةَ بِنْتِ شَهْرٍ قَالَتْ خَرَجْتُ مَعَ عَلَى بْنِ أَبِي طَالِبٍ فَقَالَ يَا جُوَيْرِيَّةُ إِنَّ رَسُولَ اللهِ ﷺ كَانَ يُوحَى إِلَيْهِ وَرَاسُهُ فِي حَجْرِي فَذَكَرَ الْحَدِيثَ.
(শামাইলুর রাসূল, পৃ. ১৪৯-১৫০)।
এই সম্পর্কিত যতগুলি হাদীছ বর্ণিত আছে উহার কোনটিই সমালোচনামুক্ত নয়। এমনকি অনেক রাবী সম্পর্কে কট্টর শী'আ মতাবলম্বী হইবারও অভিযোগ বিদ্যমান। হাদীছবিদগণ এই সকল হাদীছের সমালোচনায় এমনভাবে মুখর যেন মনে হয়, রিওয়ায়াতগুলি শী'আরা আলী (রা)-এর মর্যাদা উচ্চাসনে সমাসীন করিবার লক্ষ্যে তৈরী করিয়াছে।
শামাইলুর রাসূলের গ্রন্থকার বিভিন্ন সূত্রে এই সম্পর্কিত হাদীছগুলি উল্লেখ করিয়া সনদ ও মূল বক্তব্যের খুটিনাটি আলোচনা করিয়াছেন। সূক্ষ্মাতিসূক্ষ্মভাবে সনদে উল্লিখিত রাবীগণের আকীদা ও তাহাদিগের অগ্রহণযোগ্যতা তুলিয়া ধরিয়াছেন, রিওয়ায়াতগুলি পরস্পর অমিল ও মুনকার হইবার কথা স্থানে স্থানে আলোচনা করিয়াছেন। অতঃপর 'আলী (রা) হইতে বর্ণিত রিওয়ায়াতটি সম্পর্কে বলেন, এই রিওয়ায়াত অন্ধকারে ঢাকা। ইহার অধিকাংশ বর্ণনাকারীর কোন পরিচয় নাই। ইহা হইতে প্রতীয়মান হয় যে, শী'আদের কালো হাত দ্বারা ইহা নির্মিত। যাহারা রাসূলুল্লাহ (স)-এর উপর মিথ্যা আরোপ করে আল্লাহ তাহাদিগকে অপদস্থ ও অভিশপ্ত করুন। কারণ রাসূলুল্লাহ (স) বলিয়াছেন :
مَنْ كَذَبَ عَلَيَّ مُتَعَمِّدًا فَلْيَتَبَوَّأْ مَقْعَدَهُ مِنَ النَّارِ. "যেই ব্যক্তি জ্ঞাতসারে আমার উপর মিথ্যা আরোপ করিবে তাহার আবাস জাহান্নাম।"
আগেকার রিওয়ায়াতটিকে খোদ 'আলী (রা)-এর সহিত সম্পর্কিত করা হয়, অথচ ইহাতে তাঁহার বিরাট মর্যাদার কথা বর্ণিত। কোন জ্ঞানবান মানুষের বিবেক 'আলী (রা) কর্তৃক নিজের প্রশংসা সম্বলিত এই রিওয়ায়াতকে তাঁহার সূত্রে বর্ণিত হইবার কথা বিশ্বাস করিতে পারে? 'আলী (রা) হইতে অন্য কোন রিওয়ায়াত এই রাবীগণ বর্ণনা করিয়াছেন বলিয়া কোন প্রমাণ নাই। 'আলী (রা) হইতে নির্ভরযোগ্য বর্ণনাকারী, যেমন উবায়দা আস-সালমানী, শুরায়হ আল-কা'বী, আমের আশ-শা'বী প্রমুখের কোন উল্লেখ নাই। অথচ এক অজানা-অচেনা মহিলার সূত্রে তাহার নিকট হইতে এইরূপ বর্ণনা কেমন করিয়া গ্রহণ করা যায়!
মুওয়াত্তা মালিক, সিহাহ সিত্তা, সুনান ও মুসনাদ গ্রন্থমালার গ্রন্থকারগণ কর্তৃক এই হাদীছ প্রত্যাখ্যাত। এই সম্পর্কিত কোন "সহীহ" ও "হাসান” বর্ণনাও নাই। ইহাই বড় দলীল হইল যে, ইহাদিগের নিকট উক্ত রিওয়ায়াতের কোন ভিত্তি নাই। আবূ আবদুর রাহমান আন-নাসাঈ আলী (রা)-এর একটি চরিত গ্রন্থ রচনা করিয়াছেন। কিন্তু তাহাতে ইহার বর্ণনা নাই। আল-হাকেমও তাঁহার মুসতাদরাকে রিওয়ায়াতটি উল্লেখ করেন নাই। অথচ ইহাদিগকে সামান্য হইলেও 'আলী (রা) প্রীতির প্রতি সম্পর্কিত করা হয়। ইহাকে যাহারা বর্ণনা করিয়াছেন তাহায়া কেবল বিস্ময় বোধ ও অজানা মনে করিয়াই বর্ণনা করিয়াছেন। এই অর্থের অধিকাংশ বর্ণনাই মিথ্যা ও বানোয়াট। এই সকল রিওয়ায়াতের মধ্যে আহমাদ ইব্‌ন সালিহ আল-মিসরী কর্তৃক বর্ণিত রিওয়ায়াত অপেক্ষাকৃত উত্তম। সূত্রটি হইল এইরূপ :
عَنْ أَحْمَدَ بْنِ صَالِحِ الْمِصْرِى عَنِ ابْنِ أَبِي فُدَيْكَ عَنْ مُحَمَّدِ بْنِ مُوسَى الْفِطْرِى عَنْ عَوْنِ بْنِ مُحَمَّدٍ عَنْ أُمِّهِ أُمِّ جَعْفَرٍ عَنْ أَسْمَاءَ.
(একমাত্র এই সূত্রে বর্ণিত রিওয়ায়াতই খায়বারের আস-সাহবা নামক স্থানে ঘটনাটি ঘটিয়াছিল বলিয়া উল্লেখ রহিয়াছে)।
আহমাদ ইব্‌ন সালিহ রিওয়ায়াতটিকে সহীহ বলিয়া ঘটনাটির যথার্থতার পক্ষে অভিমত ব্যক্ত করিয়াছেন বলিয়া বর্ণিত আছে। ইমাম তাহাবী তাঁহার মুশকিলুল আছার গ্রন্থে আলী ইব্‌ন আবদির রাহমানের বরাতে বলিয়াছেন, আহমাদ ইব্‌ন সালিহ আল-মিসরী বলেন:
لا يَنْبَغِي لِمَنْ كَانَ سَبِيلَهُ الْعِلْمُ التَّخَلَّفُ عَنْ حِفْظِ حَدِيْثِ أَسْمَاءَ فِي رَبِّ الشَّمْسِ لأَنَّهُ مِنْ عَلَامَاتِ النُّبُوَّةِ.
"ইলম অন্বেষণকারীর জন্য আসমা (রা)-এর সূর্য ফিরাইয়া আনা সংক্রান্ত হাদীছখানা হইতে বিমুখ হওয়া উচিত নয়। কারণ ইহা নবুওয়াতের অন্যতম আলামত।"
এই অভিমতের পক্ষে আবূ জা'ফার আত-তাহাবীও ঝুঁকিয়া পড়িয়াছেন। আবুল কাসিম আল-হাসকাফীর বর্ণনামতে মু'তাযিলা মতাবলম্বী তর্কবাগিশ আবূ আবদিল্লাহ আল-বাসরী বলেন:
عَوْدُ الشَّمْسِ بَعْدَ مُغِيبِهَا اكَدُ حَالاً فِيمَا يَقْتَضِى نَقْلُهُ لَأَنَّهُ وَإِنْ كَانَ فَضِيلَةً لَأَمِيرِ الْمُؤْمِنِينَ فَإِنَّهُ مِنْ أَعْلَامِ النُّبُوَّةِ.
"সূর্য অস্ত যাওয়ার পর ফিরিয়া আসার প্রেক্ষাপট অত্যন্ত শক্তিশালী যাহা বর্ণনার দাবি রাখে। কারণ ইহাতে আমীরুল মু'মিনের ফযীলতের কথা থাকিলেও ইহা নবুওয়াতের অন্যতম আলামত" (প্রাগুক্ত, পৃ. ১৫৮-১৫৯)।
অতঃপর ইব্‌ন কাছীর বলেন, এই বক্তব্যের সারকথা হইল, বিষয়টি মুতাওয়াতির সূত্রে বর্ণিত হইবার বস্তু ছিল। ইহা ঐ সময় পাওয়া যায় যখন হাদীছটি সহীহ হয়। কিন্তু ইহা তো এইরূপ বর্ণিত হয় নাই। সুতরাং প্রমাণিত হয় যে, বিষয়টি প্রকৃতপক্ষে সঠিক (صحیح) নয়। وَاللهُ أَعْلَمُ (প্রাগুক্ত)। সর্বযুগের ইমামগণ এইরূপ হাদীছের সহীহ হওয়াকে অস্বীকার করিতেছেন। তাঁহারা ইহাকে প্রত্যাখ্যান করিয়া ইহার রাবীগণ সম্পর্কে কঠোর সমালোচনা করিয়া আসিতেছেন। ইহাদিগের অন্যতম হইলেন মুহাম্মাদ ইয়া'লা ইবন 'উবায়দ আত-তানাফিসী, দিমাশকের খতীব ইবরাহীম ইবন ইয়াকৃত আল-জাওযজানী, আবূ বাক্স মুহাম্মাদ ইবন হাতিম আল-বুখারী (যিনি ইব্‌ন যানজাবিয়্যা নামে খ্যাত), হাফিজ আবুল কাসিম ইন্ন আসাকির এবং শায়খ আবুল ফারাজ ইবনুল জাওযী প্রমুখ নবীন ও প্রবীণ হাদীছবেত্তাগণ। হাফিজ আবুল হাজ্জাজ আল মিযযী ও আবুল আব্বাস ইব্‌ন তায়মিয়্যা এইরূপ রিওয়ায়াতকে সুস্পষ্টভাবে বানোয়াট বলিয়া আখ্যায়িত করিয়াছেন। হাকিম আবূ আবদিল্লাহ নিশাপুরী স্বীয় সূত্রে আলী ইবনুল মাদীনী হইতে নিম্নোক্ত উক্তি বর্ণনা করিয়াছেন :
خَمْسَةٌ أَحَادِيثَ يَرْوُونَهَا وَلَا أَصْلَ لَهَا عَنْ رَسُولُ الله ﷺ حَدِيثُ لَوْ دَقَ السَّائِلُ مَا أَفْلَحَ مَنْ رَدَّهُ وَحَدِيْثُ لا وَجْعَ إِلا وَجْعُ العَيْنِ وَلَا غَمُ إِلَّا غَمُ الدِّيْنِ وَحَدِيْثُ أَنَّ الشَّمْسِ رُدَّتْ عَلَى عَلَى بْنِ أَبِي طَالِبٍ وَحَدِيْثِ أَنَا أَكْرَمُ عَلَى اللَّهِ مِنْ أَنْ يَدَعَنَّى تَحْتَ الْأَرْضِ مَأَتَى عَامٍ وَحَدِيثُ أَفْطَرَ الحَاجِمُ وَالْمَحْجُومُ أَنَّهُمَا كَانَا يَعْتَابَانِ.
"পাঁচটি হাদীছ ইহারা বর্ণনা করেন, অথচ ইহা রাসূলুল্লাহ (স) হইতে বর্ণিত হইবার কোন প্রমাণ নাই। ১. ভিক্ষুক যদি সত্যবাদী হয় তাহা হইলে তাহাকে যে ফিরাইয়া দিবে তাহার কল্যাণ হইবে না। ২. চক্ষুর ব্যথা ছাড়া অন্য কোন ব্যথা নাই, দীনের চিন্তা ব্যতীত অন্য কোন চিন্তা নাই। ৩. সূর্য আলী ইব্‌ন আবী তালিব (রা)-এর জন্য ফিরাইয়া দেওয়া হইয়াছিল। ৪. আমি আল্লাহর অধিক করুণা অর্জনকারী হইব যে, আমাকে তিনি দুই শত বৎসর ভূগর্ভে রাখিয়া দিবেন। ৫. রক্তমোক্ষণকর্তা ও কৃতের রোযা ভঙ্গ হইয়া যায়। ইহারা গীবতে লিপ্ত হয়।”
ইমাম তাহাবীর নিকট সূর্য প্রত্যাগত হইবার বিষয়টি অস্পষ্ট থাকিলেও ইমাম আবূ হানীফা (র) হইতে ইহাকে অস্বীকার করা এবং ইহার রাবীগণ সম্পর্কে বিদ্রূপ করিবার কথা বর্ণিত রহিয়াছে। আবু হানীফা (র) একজন অতীব নির্ভরযোগ্য ইমাম। কৃষ্ণার একজন বাসিন্দা ছিলেন। এতদসত্ত্বেও তাঁহার সম্পর্কে আল্লাহ ও রাসূল প্রদত্ত ফযীলত ছাড়া বাড়তি 'আলী (রা) প্রীতির কোন অভিযোগ নাই।
'ইয়ূশা ইব্‌ নূন (আ) সম্পর্কে সূর্য ফিরিয়া আসিবার যেই ঘটনা বর্ণিত হইয়াছে ইহা আসলে সূর্য অস্ত যাইবার পর ফিরিয়া আসা নয়, বরং সূর্য অস্তমিত হইতে কিছু সময়ের জন্য আটকিয়া থাকা (ইব্‌ন কাছীর, শামাইলুর রাসূল, পৃ. ১৬০)। শায়খ ইব্‌ তায়মিয়্যার অভিযোগের জওয়াবে শী'আ গুরু জামালুদ্দীন ইউসুফ ইবনুল-মুতাহ্হার নামে পরিচিত আল-ইমামা নামে একটি গ্রন্থ প্রণয়ন করিয়াছেন। ইহাতে তিনি বলিয়াছেন, সূর্য অস্তমিত হইবার পর দুইবার প্রত্যাগত হইয়াছিল। প্রথমবার এই সম্পর্কে জাবির ও আবূ সাঈদ (রা) হইতে নিম্নোক্ত রিওয়ায়াতটি উল্লেখ করা হইয়াছে।
إِنْ رَسُولَ اللهِ ﷺ نَزَلَ عَلَيْهِ جِبْرِيلُ يَوْمًا يُنَاجِيهِ مِنْ عِنْدِ اللَّهِ فَلَمَّا تَغَشَاهُ الْوَحْى تَوَسَّدَ فَخِذَ أَمِيرِ الْمُؤْمِنِينَ فَلَمْ يَرْفَعْ رَأْسَهُ حَتَّى غَابَتِ الشَّمْسُ فَصَلَّى عَلِيُّ الْعَصْرَ সী.বি.-৭/৩৭
بِالإيْمَاء. فَلَمَّا اسْتَيْقَظَ رَسُولُ اللهِ ﷺ قَالَ لَهُ سَلِ اللهَ أَنْ يُرَدَّ عَلَيْكَ الشَّمْسَ فَتُصَلَّى قَائِمًا فَدَعَا فَرُدَّتِ الشَّمْسُ فَصَلَّى الْعَصْرَ قَائِمًا.
এই বর্ণনায় রহিয়াছে, 'আলী (রা)-এর উরুর উপর রাসূলুল্লাহ (স)-এর মাথা থাকা অবস্থায় 'আলী (রা) ইশারায় সালাত আদায় করিয়াছিলেন। 'আলী (রা)-এর দু'আতেই সূর্যকে ফিরাইয়া দেওয়া হইয়াছিল।
দ্বিতীয়বার যখন 'আলী (রা) ফুরাত নদী পাড়ি দিতে চাহিয়াছিলেন তখন অনেক সাহাবী তাঁহাদিগের বাহনের পরিচর্যায় মশগুল হইয়া পড়িয়াছিলেন। এই সময় তিনি কিছু সংখ্যক সাথী লইয়া আসরের সালাত আদায় করিলেন এবং অন্যদের সালাত কাযা হইয়া গেল। এই ব্যাপারে তাহারা কিছু বলাবলি করিতে লাগিল। 'আলী (রা) সূর্য ফিরাইয়া দিবার দু'আ করিলেন। তখন সূর্যকে ফিরাইয়া দেওয়া হইয়াছিল। ইবনুল মুতাহহার এই ব্যাপারে আল-হিময়ারীর নিম্নোক্ত কবিতার উদ্ধৃতি দিয়াছেন:
ردت عَلَيْهِ الشَّمْسُ لَمَّا فَاتَهُ + وَقْتُ الصَّلَاةِ وَقْتُ دَنَتْ لِلْمَغْرِبِ حَتَّى تَبَلَّجَ نُورُهَا فِي وَقْتِهَا + لِلْعَصْرِ ثُمَّ هَوَتْ هُوِي الْكَوْكَبِ وَعَلَيْهِ قَدْ رُدَّتْ بِبَابِلَ مَرَّةَ + أُخْرَى وَمَا رُدَّتْ لِخَلْقٍ مُقَرَّب.
এখানে বলা হইয়াছে, 'বাবিল' শহরে দ্বিতীয়বার 'আলী (রা)-এর জন্য সূর্যকে ফিরাইয়া দেওয়া হইয়াছিল। সূর্যকে অন্য কোন প্রিয় সৃষ্টির জন্য ফিরাইয়া দেওয়া হয় নাই।
এই সম্পর্কে ইব্‌ন তায়মিয়‍্যা বলেন, সূর্যকে ফিরাইয়া আনার হাদীছ আবূ জা'ফার তাহাবী ও কাযী আয়াযের মত কিছু লোক উল্লেখ করিয়াছেন। তাহারা ইহাকে রাসূলুল্লাহ (স)-এর অলৌকিক ঘটনাবলীর মধ্যে গণ্য করিয়াছেন। কিন্তু বিজ্ঞ হাদীছবেত্তাগণ ইহাকে মিথ্যা বানোয়াট হাদীছ বলিয়া অভিহিত করিয়াছেন। বাবিলের ঘটনা সম্পর্কে ইব্‌ন কাছীর বলেন, ইহার কোন সনদ নাই। আমার ধারণা ইহা কোন "যিনদীক” শী'আ কর্তৃক আবিষ্কৃত ( والله اعلم)। আল-হিময়ারীর কবিতা সম্পর্কে তিনি বলেন, ইহা কোন অবস্থাতেই দলীল নয়। ইহা ইবনুল মুতাহহারের মত বালখিল্যতা মাত্র। 'আলী (রা) সম্পর্কে বাবিলের ঘটনাটি সম্পর্কে আবূ দাউদ তাঁহার সুনান গ্রন্থে বর্ণনা করিয়াছেন যে, 'আলী (রা) বাবিল স্থানটি অতিক্রম করিবার সময় আসরের সালাতের সময় হইয়া গিয়াছিল। এতদসত্বেও তিনি এই স্থানটি অতিক্রম করিবার পূর্বে সালাত আদায় করেন নাই। এই সম্পর্কে তিনি বলিয়াছিলেন:
نَهَانِي خَلِيْلِي أَنْ أَصَلَّى بِأَرْضِ بَابِلَ فَإِنَّهَا مَلْعُونَةٌ.
"আমার বন্ধু রাসূলুল্লাহ (স) আমাকে নিষেধ করিয়াছিলেন "বাবিল” ভূমিতে সালাত আদায় করিতে। কারণ ইহা অভিশপ্ত স্থান" (শামাইলুর রাসূল, পৃ. ১৬১-১৬৩)।
'আলী (রা)-এর জন্য সূর্য অস্ত যাইবার পর তাহার পুনরুত্থান সম্পর্কিত এই দীর্ঘ আলোচনার পর এই কথার উপর বিশ্বাস স্থাপনের ধারে কাছেও যাওয়া যায় না। যাহারা হাদীছের শুদ্ধাশুদ্ধি লইয়া সূক্ষ্মাতিসূক্ষ্মভাবে গবেষণা করেন তাহাদিগের নিকট দিবালোকের মত প্রস্ফুটিত হইয়া উঠিবে যে, ইহা আবিষ্কৃত মনগড়া হাদীছ। তবে যাহারা ইহার সত্যতা সম্পর্কে নীরব ছিলেন, যেমন কাযী আয়ায ও ইমাম তাহাবী, তাহাদিগের নিকট হয়ত হাদীছগুলির সার্বিক বিষয় উত্থাপিত হয় নাই। তাহারা ভাবিয়াছেন, আল্লাহ তাঁহার বান্দা সৃষ্টিকুলের সেরা মানবের জন্য কি না করিতে পারেন। তাই কেহ ইহাকে আলামতে নবুওয়াত, কেহ মু'জিযা মনে করিয়া উল্লেখ করিয়াছেন। হাদীছ ও তাহার সনদের মধ্যে যে ব্যাপক অমিল রহিয়াছে ইহাকে মানিয়া লইবার কোনই পথ নাই। বিষয়টিকে যাহারা মানিয়া লইয়াছেন তাহারা যদি আহলে হক্কের অনুসারী হইয়া থাকেন তাহা হইলে তাহারা সনদ ও বর্ণনার প্রতি ভ্রুক্ষেপ না করিয়া কেবল কুদরতে ইলাহীর প্রতি লক্ষ্য করিয়াছেন। আর শী'আগণ তো ইহাকে স্বীয় স্বার্থসিদ্ধির লক্ষ্যে অবমূল্যায়ন করিয়াছে। কারণ আহলে হকের যাহারা ইহাকে সম্পূর্ণভাবে প্রত্যাখ্যান করেন নাই তাহারা ইহাকে রাসূলুল্লাহ (স)-এর মর্যাদার অন্তর্ভুক্ত ভাবিয়াছেন ( واللهُ اَعْلَمُ )।
খায়বার বিজয় সম্পর্কে হাসসান (রা)-এর কবিতা
ইব্‌ন হিশাম ইব্‌ন ইসহাকের বরাতে বলেন, খায়বার দিবসে হাসসান ইব্‌ন ছাবিত (রা) নিম্নোক্ত কবিতা আবৃত্তি করিয়াছিলেন:
(১) بِئْسَمَا قَاتَلَتْ خَيَابِرُ عَمَّا + جَمَعُوا مِنْ مَزَارِعَ وَنَخِيلٍ
(২) كَرِهُوا الْمَوْتَ فَاسْتَبِيحَ حِمَاهُمْ + وَأَقَرُّوا فِعْلَ اللَّهِيمِ الدَّلِيلِ
(৩) أَمِنَ الْمَوْتِ يَهْرِبُوا فَإِنَّ الْمَوْتَ + مَوْتَ الْهَزَالِ غَيْرُ جَمِيل
(১) “খায়বারবাসীরা যে কৃষিজমি ও খেজুর বাগানের মালিক ছিল, তাহার প্রতিরক্ষায় যুদ্ধ ছিল অত্যন্ত নিকৃষ্ট।
(২) তাহারা মৃত্যুকে অপসন্দ করিয়াছিল, ফলে তাহাদের সংরক্ষিত স্থান বৈধ করিয়া লওয়া হয়। তাহারা একান্ত ইতর শ্রেণীর আচরণ করিয়াছে।
(৩) তাহারা কি মৃত্যু হইতে পলায়ন করিতে পারিবে? কাপুরুষদের মৃত্যু নিশ্চয়ই উত্তম ও কাংক্ষিত নহে।"
আয়মানের পক্ষ হইতে কৈফিয়ত
হাসসান ইব্‌ন ছাবিত (রা) আয়মান ইব্‌ন উম্মু আয়মান উবায়দের পক্ষ হইতে কৈফিয়ত দিয়াও কবিতা রচনা করেন। আয়মান খায়বার যুদ্ধে অংশগ্রহণ করেন নাই। তিনি ছিলেন বানু আওফ ইব্‌ন খাযরাজ গোত্রের লোক। তাহার মাতা উম্মু আয়মান ছিলেন রাসূলুল্লাহ (স)-এর মুক্ত দাসী। তিনি উসামা ইব্‌ন যায়দ (রা)-এর বৈপিত্রেয় ভাই। হাসসান (রা) তাঁহার সেই কবিতায় বলেন:
(১) عَلَى حِينٍ أَنْ قَالَتْ لأَيْمَنَ أُمُّهُ - جَبَنْتَ وَلَمْ تَشْهَدُ فَوَارِسَ خَيْبَرَ
(২) وَأَيْمَنُ لَمْ يُجِبْنَ ولكن مَهْرَهُ - أَضْرَبَهُ شُرْبُ الْمَدِيدَ الْمُخَمِّرِ
(৩) ولولا الَّذِي قَدْ كَانَ مِنْ شَأْنِ مَهْرِهِ - لَقَاتَلَ فِيْهِمْ فَارِسًا غَيْرُ عُسْرٍ
(٤) وَلَكِنَّهُ قَدْ صَدَّهُ فِعْلُ مَهْره - وَمَا كَانَ مِنْهُ عِنْدَهُ غَيْرُ أَيْسَرَ.
(১) “আয়মানের মাতা যখন তাহাকে তিরস্কার করিয়া বলিয়াছিলেন, খায়বার যুদ্ধের অশ্বারোহীদের সঙ্গে যোগ না দিয়া হে আয়মান! তুমি কাপুরুষের মত কাজ করিলে।
(২) আসলে সেই দিন আয়মান কোন কাপুরুষতা প্রদর্শন করে নাই, বরং তাহার ঘোড়াটি আটা মিশ্রিত নেশাযুক্ত পানি পানে পীড়িত হইয়া পড়িয়াছিল।
(৩) যদি সেই দিন তাহার ঘোড়াটির অবস্থা এমন না হইত তাহা হইলে সে অবশ্যই অশ্বারোহী দক্ষতার সহিত যুদ্ধ করিত।
(৪) কিন্তু তাহাকে বাধা প্রদান করিয়াছে তাহার ঘোড়ার ক্রিয়া, অন্যথায় সে দক্ষতার সহিতই যুদ্ধ করিত।"
ইবন হিশাম বলেন, আবূ যায়দ-এর মতে এই কবিতাগুচ্ছ কা'ব ইব্‌ন মালিক রচিত, তবে উহাতে নিম্নরূপ পরিবর্তন রহিয়াছে:
وَلَكِنْ قَدْ صَدَّهُ شَأْنُ مَهْرِهِ - وَمَا كَانَ لَوْلا ذَاكُمْ بِمُقْصِرٍ.
"বরং তাহাকে আটকাইয়াছে তাহার ঘোড়ার অবস্থা। যদি তাহা না হইত তাহা হইলে সে কোন ত্রুটি করিত না।"
ইবন ইসহাক বলেন, নাজিয়া ইন্ন জুনদুব আসলামী নিম্নোক্ত কবিতা রচনা করেন:
بالعباد الله فيمَ يَرْغَبُ - مَا هُوَ الأَ مَأْكَلُ وَمَشْرَبُ وَجَنَّةً فِيهَا نَعِيمٌ مُعْجَبٌ.
"আক্ষেপ আল্লাহব বান্দাদের জন্য! কিসের আসক্তিতে আচ্ছন্ন? ইহা তো কেবল পানাহারের স্থান, অথচ জান্নাতে রহিয়াছে আকর্ষণীয় নি'মত।"
নাজিয়া ইন্ন জুনদুব আরও বলিয়াছেন,
أَنَا لِمَنْ أَنْكَرَنِي ابْنَ جُنْدُبٍ يَارُبُ + قَرْنٍ فِي مَكْرِي أَنْكَبُ طَاحَ بِمَغْدَى أَنَسْرُ وَتَعْلَبُ.
"যে আমার পরিচয় জানে না আমি তাহার উদ্দেশ্যে বলিতেছি, আমি হইলাম জুনদুবের পুত্র। কত প্রতিপক্ষ আছে যাহারা যুদ্ধকালে আমার কৌশলের কাছে অধোমুখী হয় এবং তাহাদের মৃতদেহ হয় শকুন বা শিয়ালের সকালের খাবার।"
কা'বের কবিতা ইব্‌ন হিশাম আবূ যায়দ আল-আনসারী হইতে বর্ণনা করিয়াছেন যে, কা'ব ইবন মালিক (রা) খায়বার দিবসে নিম্নোক্ত কবিতা আবৃত্তি করিয়াছিলেন:
(১) وَنَحْنُ وَرَدْنَا خَيْبَراً وَفُرُوضَهُ - بِكُلِّ فَتَى عَارِيُّ الأَشَاجِعِ مَدُودٌ (২) جواد لَدَى الْغَايَاتِ لا وَاهِنِ الْقَوِيُّ - جَرِى عَلَى الْأَعْدَاءِ فِي كُلِّ مَشْهَدِ (৩) عَظِيمُ رَمَادِ القدر في كُلِّ شَتْوَة - ضَرُوبٌ بنصلِ الْمَشْرِفِي الْمُهَنَّدِ (٤) يَرَى الْقَتْلَ مَدْحًا إِنْ أَصَابَ شَهَادَةً - مِنَ اللَّهِ يَرْجُوهَا وَفَوْذَا بِأَحْمَدِ (٥) يَدُودُ وَيُحمى عن ذِمَارٍ مُحَمَّدٍ - وَيَدْفَعُ عَنْهُ بِالنِّسَانِ وَبِالْيَد. (৬) وَنَيْصُرُهُ مِنْ كُلِّ أَمْرٍ يُرِيبُهُ - يَجُودُ لِنَفْسٍ دُونَ نَفْسٍ مُحَمَّدٍ (۷) يَصْدَقُ بِالأَنْبَاءِ بِالْغَيْبِ مُخْلِصًا - يُرِيدُ بِذَاكَ الْفَوْزُ وَالْعِزَّ فِي غَد.
(১) "আমরা খায়বারে আর ইহার ঘাটিগুলিতে অবতরণ করিযাছি যুবা-কিশোরদের লইয়া, যাহাদের হাতের শিরাসমূহ স্পষ্ট হইয়া উঠে নাই;
(২) লক্ষ্য অর্জনে যাহারা দুর্বল নয়। প্রতিটি ময়দানে শত্রুদের মুকাবিলায় তাহারা সাহসী।
(৩) শীত মৌসুম তাহাদের চুলায় থাকে ছাইয়ের বিরাট স্তূপ।
(৪) নিহত হওয়াকে তাহারা প্রশংসনীয় কাজ মনে করে ও রাসূলুল্লাহ (স)-এর সন্তুষ্টির লাভের উপায় আল্লাহর পথে কাঙ্খিত শাহাদত অর্জন করিতে পারে।
(৫) মুহাম্মাদ (স)-এর অধিকারসমূহ সংরক্ষণে তাহারা সদা প্রস্তুত থাকে, মুখ ও হাত দ্বারা সর্বদা তাহারা তাহার বিরুদ্ধবাদীদেরকে প্রতিহত করে।
(৬) যে কোন আশংকাজনক কাজে তাঁহার সাহায্যে তাহারা আগাইয়া আসে। মুহাম্মাদ (স)-এর প্রাণ রক্ষার্থে তাহারা নিজেদের জীবন বিসর্জন দেয়।
(৭) গায়বের খবরাদিকে তাহারা নিষ্ঠার সহিত বিশ্বাস করে, ইহার দ্বারা তাহারা কাল কিয়ামতের সম্মান ও সফলতা কামনা করে" (ইব্‌ন হিশাম, আস-সীরাতুন নাবাবিয়্যা, ৩খ., পৃ. ২৪০; আল-বিদায়া ওয়ান-নিহায়া, ২/৪খ, পৃ. ২১৮)।

লিঙ্ক শেয়ার করুন
close

লিঙ্ক কপি করুন

0:00
0:00