📘 সীরাত বিশ্বকোষ > 📄 বিষ প্রয়োগের ঘটনা

📄 বিষ প্রয়োগের ঘটনা


যুদ্ধের অবসান হইলে সাল্লাম ইব্‌ন মিশকামের স্ত্রী যয়নব বিন্দুল হারিছ একটি বকরী রান্না করিয়া রাসূলুল্লাহ (স)-কে উপঢৌকন দিল। ইহাতে সে বিষ মিশ্রিত করিয়াছিল (আসাহহুস সিয়ার, পৃ. ২০২)। ইবনুল জাওযিয়্যা বলেন, সে একটি বকরী ভূনা করিয়া ইহাতে বিষ মিশ্রিত করিল এবং জিজ্ঞাসা করিল, কোন অংশের গোস্ত তাঁহার নিকট সর্বাধিক প্রিয়। সাহাবা কিরাম বলিলেন, সামনের রানের গোস্ত। সুতরাং সে সামনের রানের গোশতে অধিক হারে বিষ মিশ্রিত করিল। রাসূলুল্লাহ (স) যখন রানের গোশতে কামড় দিলেন তখন ঐ রানটি অলৌকিকভাবে তাঁহাকে অবহিত করিল যে, তাহাতে বিষ মিশ্রিত। সুতরাং রাসূলুল্লাহ (স) গোস্ত খণ্ডটি ফেলিয়া দিলেন (যাদুল মা'আদ, ২খ., পৃ. ১৩৯)।
ইবন সা'দ তদীয় সূত্রে আবূ হুরায়রা (রা) হইতে বর্ণনা করিয়াছেন যে, খায়বার বিজিত হইবার পর মহানবী (স)-কে বিষমিশ্রিত ভূনা ছাগলের গোস্ত দেয়া হইয়াছিল। ঘটনা অবগতির পর রাসূলুল্লাহ (স) আদেশ করিলেন, এই স্থানে যত ইয়াহুদী আছে তাহাদিগকে একত্র কর। সাহাবা কিরাম ইয়াহূদীদিগকে একত্র করিলেন। রাসূলুল্লাহ (স) তাহাদিগকে বলিলেন, আমি তোমাদিগকে একটি বিষয়ে জিজ্ঞাসা করিব, তোমরা কি এই ব্যাপারে আমার নিকট সত্য বলিবে? তাহারা উত্তর দিল, হাঁ, সত্য বলিব, হে আবুল কাসিম! রাসূলুল্লাহ (স) জিজ্ঞাসা করিলেন, তোমাদের পিতা কে? তাহারা বলিল, আমাদের পিতা হইলেন অমুক। রাসূলুল্লাহ (স) বলিলেন, তোমরা মিথ্যা বলিতেছ, তোমাদের পিতা হইলেন অমুক। তাহারা বলিল, আপনি সত্য ও যথার্থ বলিয়াছেন। রাসূলুল্লাহ (স) বলিলেন, তোমরা কি আমার নিকট সত্য বলিবে, যদি আমি তোমাদিগকে একটি বিষয়ে জিজ্ঞাসা করি? তাহারা বলিল, হাঁ, হে আবুল কাসিম! যদি আমরা আপনার নিকট মিথ্যা বলি তাহা হইলে আপনি অবগত হইয়া যাইবেন। যেইভাবে আমাদের পিতার ব্যাপারে অবগত হইয়াছেন। রাসূলুল্লাহ (স) তাহাদিগকে জিজ্ঞাসা করিলেন, জাহান্নামের অধিবাসী কাহারা? তাহারা বলিল, আমরা সেখানে অল্পদিন থাকিব, ইহার পর আপনারা আমাদের উত্তরাধিকারী হইবেন। রাসূলুল্লাহ (স) বলিলেন, তোমরা সেখানে লাঞ্ছিত ও বঞ্চিত হইবে। সেখানে কস্মিন কালেও আমরা তোমাদের উত্তরাধিকারী হইব না। অতঃপর রাসূলুল্লাহ (স) বলিলেন, তোমরা কি আমার নিকট সত্য বলিবে, যদি আমি তোমাদিগকে একটি বিষয়ে জিজ্ঞাসা করি। তাহারা বলিল, হে আবুল কাসিম! হাঁ, সত্য বলিব। রাসূলুল্লাহ (স) তাহাদিগকে জিজ্ঞাসা করিলেন, তোমরা কি এই বকরীতে বিষ মিশ্রিত করিয়াছ। তাহারা বলিল, হাঁ। রাসূলুল্লাহ বলিলেন, তোমদিগকে এই কাজে কিসে প্ররোচিত করিল? তাহারা বলিল, আমরা মনে করিয়াছি, যদি আপনি মিথ্যাবাদী হন তাহা হইলে আমরা আপনার হইতে পরিত্রাণ লাভ করিব, আর যদি নবী হইয়া থাকেন তাহা হইলে ইহা আপনাকে ক্ষতিগ্রস্ত করিবে না (আত-তাবাকাতুল কুবরা, ২খ., পৃ. ১১৫-১১৬)।
ইন্ন হিশাম বলেন, বিষ মিশ্রিত রানটি যখন রাসূলুল্লাহ (স)-এর সামনে উপস্থিত করা হয় তখন তিনি ইহা হইতে এক খণ্ড গোশত লইয়া মুখে দিয়া ফেলিয়া দিয়াছিলেন। তাহার সঙ্গে বিশ্ব ইনুল বারাআ ইন্ন মা'রূরও ছিলেন। তিনি ইহা হইতে এক খণ্ড গোশত লইয়া গিলিয়া ফেলিলেন। রাসূলুল্লাহ (স) গোশত খণ্ড ফেলিয়া দিয়া বলিলেন, এই হাড়টি আমাকে সংবাদ দিতেছে যে, সে বিষযুক্ত। রাসূলুল্লাহ (স) সেই নারীকে ডাকিয়া জিজ্ঞাসা করিলে সে স্বীকারোক্তি করিল। তিনি তাহাকে জিজ্ঞাসা করিলেন, কিসে তোমাকে এইরূপ করিতে প্ররোচিত করিল। উত্তরে সে বলিল? আমার স্বজাতির প্রতি কৃত আপনার আচরণের কথা আপনার নিকট অবিদিত নয়। আমি মনে মনে ভাবিলাম, ইনি যদি রাজা-বাদশাহ হইয়া থাকেন, তবে তাহা হইতে নিষ্কৃতি পাওয়া যাইবে, আর যদি প্রকৃতই নবী হইয়া থাকেন, তাহা হইলে অচিরেই তিনি এই বিষয়ে অবগত হইবেন। বর্ণনাকারী বলেন, রাসূলুল্লাহ (স) সেই নারীকে ক্ষমা করিয়া দিয়াছিলেন। তবে বিশ্‌র এক গ্রাস ভক্ষণ করায় বিষক্রিয়ায় তিনি মারা যান।
ইবন ইসহাক বলেন, আমার নিকট মারওয়ান ইব্‌ন উছমান ইব্‌ন সা'ঈদ ইবনুল মু'আল্লা বর্ণনা করিয়াছেন, রাসূলুল্লাহ (স)-এর অন্তিম শয্যায় যখন বিশ্‌র বিন্ত আল-বারাআ ইবন মা'রূর (রা)-এর মাতা তাহাকে দেখিতে আসিয়াছিলেন তখন তিনি তাহাকে বলিয়াছিলেন, হে বিশ্বের মাতা! তোমার বিশ্‌রের সহিত খায়বারে আমি যেই গ্রাসটি মুখে তুলিয়াছিলাম তাহার বিষক্রিয়া এখনও আমি অনুভব করিতেছি। আমার ধমনী ছিঁড়িয়া যাইতেছে বলিয়া মনে হইতেছে (আস-সীরাতুন নাবাবিয়্যা, ৩খ., পৃ. ২৩৩)।
সেই নারীকে রাসূলুল্লাহ (স)-এর নিকট আনা হইলে সে বলিল, আমি আপনাকে হত্যা করিবার ইচ্ছা পোষণ করিয়াছিলাম। রাসূলুল্লাহ (স) বলিলেন, আমাকে হত্যা করিবার জন্য আল্লাহ তোমাকে ক্ষমতা দিবেন না। স্ত্রীলোকটির উক্তি শুনিয়া সাহাবাগণ বলিলেন, আমরা কি তাহাকে হত্যা করিব না? রাসূলুল্লাহ (স) বলিলেন, না, হত্যা করি ও না। অতঃপর রাসূলুল্লাহ (স) তাহাকে ভাল-মন্দ কিছুই বলিলেন না এবং তাহাকে কোন শাস্তিও দিলেন না। স্ত্রীলোকটিকে হত্যা করিবার ব্যাপারে মতবিরোধ রহিয়াছে। ইমাম যুহরী বলেন, স্ত্রীলোকটি ইসলাম গ্রহণ করিয়াছিল, সেইজন্য তাহাকে মুক্তি দেওয়া হইয়াছিল। এই সূত্রটি আবদুর রাযযাক মা'মার হইতে বর্ণনা করিয়াছেন। অতঃপর মা'মার বলেন, লোকজন বলিয়া থাকে, তাহাকে রাসূলুল্লাহ (স) হত্যা করিয়াছিলেন (যাদুল মা'আদ, ২খ., পৃ. ১৪০)।
দানাপুরী বলেন, বিশ্‌র ইবনুল বারাআ (রা) নিহত হইলে রাসূলুল্লাহ (স) স্ত্রীলোকটিকে ডাকাইয়া আনিয়া তাহাকে হত্যা করিবার নির্দেশ দিলেন। এই রিওয়ায়তটি আবূ সালামা কর্তৃক বর্ণিত। যুহরী ও আবূ সালামা-এর রিওয়ায়াত দুইটি মুরসাল। তবে এই ব্যাপারে আবূ হুরায়রা (রা) হইতে একটি মুত্তাসিল রিওয়ায়াত পাওয়া যায় যে, স্ত্রীলোকটিকে প্রথমে রাসূলুল্লাহ (স) মুক্তি দিয়াছিলেন, কিন্তু বিশ্‌র ইনুল বারাআ (রা) নিহত হইলে রাসূলুল্লাহ (স) তাহাকে হত্যা করিবার নির্দেশ দিয়াছিলেন (আসাহহুস সিয়ার, পৃ. ২০২)।
ইবন কায়্যিম আল-জাওযিয়্যা বলেন, বিষ প্রয়োগকৃত খাবারটি রাসূলুল্লাহ (স) ভক্ষণ করিয়াছিলেন কিনা এই ব্যাপারে মতপার্থক্য রহিয়াছে। তবে অধিকাংশ রিওয়ায়াত প্রমাণ করে যে, রাসূলুল্লাহ (স) ইহা হইতে ভক্ষণ করিয়াছিলেন এবং ইহার পর তিনি তিন বৎসর জীবিত ছিলেন। মৃত্যুশয্যায় শায়িত অবস্থায় তিনি বলিয়াছিলেন, যেই গ্রাসটি আমি খায়বারে ভক্ষণ করিয়াছিলাম ইহার বিষক্রিয়া এখনও আমি অনুভব করিতেছি। ইমাম যুহরী বলেন, সুতরাং রাসূলুল্লাহ (স) শহীদ হিসাবে ইন্তিকাল করেন (যাদুল মা'আদ, ২খ., পৃ. ১৪০)।

যুদ্ধের অবসান হইলে সাল্লাম ইব্‌ন মিশকামের স্ত্রী যয়নব বিন্দুল হারিছ একটি বকরী রান্না করিয়া রাসূলুল্লাহ (স)-কে উপঢৌকন দিল। ইহাতে সে বিষ মিশ্রিত করিয়াছিল (আসাহহুস সিয়ার, পৃ. ২০২)। ইবনুল জাওযিয়্যা বলেন, সে একটি বকরী ভূনা করিয়া ইহাতে বিষ মিশ্রিত করিল এবং জিজ্ঞাসা করিল, কোন অংশের গোস্ত তাঁহার নিকট সর্বাধিক প্রিয়। সাহাবা কিরাম বলিলেন, সামনের রানের গোস্ত। সুতরাং সে সামনের রানের গোশতে অধিক হারে বিষ মিশ্রিত করিল। রাসূলুল্লাহ (স) যখন রানের গোশতে কামড় দিলেন তখন ঐ রানটি অলৌকিকভাবে তাঁহাকে অবহিত করিল যে, তাহাতে বিষ মিশ্রিত। সুতরাং রাসূলুল্লাহ (স) গোস্ত খণ্ডটি ফেলিয়া দিলেন (যাদুল মা'আদ, ২খ., পৃ. ১৩৯)।
ইবন সা'দ তদীয় সূত্রে আবূ হুরায়রা (রা) হইতে বর্ণনা করিয়াছেন যে, খায়বার বিজিত হইবার পর মহানবী (স)-কে বিষমিশ্রিত ভূনা ছাগলের গোস্ত দেয়া হইয়াছিল। ঘটনা অবগতির পর রাসূলুল্লাহ (স) আদেশ করিলেন, এই স্থানে যত ইয়াহুদী আছে তাহাদিগকে একত্র কর। সাহাবা কিরাম ইয়াহূদীদিগকে একত্র করিলেন। রাসূলুল্লাহ (স) তাহাদিগকে বলিলেন, আমি তোমাদিগকে একটি বিষয়ে জিজ্ঞাসা করিব, তোমরা কি এই ব্যাপারে আমার নিকট সত্য বলিবে? তাহারা উত্তর দিল, হাঁ, সত্য বলিব, হে আবুল কাসিম! রাসূলুল্লাহ (স) জিজ্ঞাসা করিলেন, তোমাদের পিতা কে? তাহারা বলিল, আমাদের পিতা হইলেন অমুক। রাসূলুল্লাহ (স) বলিলেন, তোমরা মিথ্যা বলিতেছ, তোমাদের পিতা হইলেন অমুক। তাহারা বলিল, আপনি সত্য ও যথার্থ বলিয়াছেন। রাসূলুল্লাহ (স) বলিলেন, তোমরা কি আমার নিকট সত্য বলিবে, যদি আমি তোমাদিগকে একটি বিষয়ে জিজ্ঞাসা করি? তাহারা বলিল, হাঁ, হে আবুল কাসিম! যদি আমরা আপনার নিকট মিথ্যা বলি তাহা হইলে আপনি অবগত হইয়া যাইবেন। যেইভাবে আমাদের পিতার ব্যাপারে অবগত হইয়াছেন। রাসূলুল্লাহ (স) তাহাদিগকে জিজ্ঞাসা করিলেন, জাহান্নামের অধিবাসী কাহারা? তাহারা বলিল, আমরা সেখানে অল্পদিন থাকিব, ইহার পর আপনারা আমাদের উত্তরাধিকারী হইবেন। রাসূলুল্লাহ (স) বলিলেন, তোমরা সেখানে লাঞ্ছিত ও বঞ্চিত হইবে। সেখানে কস্মিন কালেও আমরা তোমাদের উত্তরাধিকারী হইব না। অতঃপর রাসূলুল্লাহ (স) বলিলেন, তোমরা কি আমার নিকট সত্য বলিবে, যদি আমি তোমাদিগকে একটি বিষয়ে জিজ্ঞাসা করি। তাহারা বলিল, হে আবুল কাসিম! হাঁ, সত্য বলিব। রাসূলুল্লাহ (স) তাহাদিগকে জিজ্ঞাসা করিলেন, তোমরা কি এই বকরীতে বিষ মিশ্রিত করিয়াছ। তাহারা বলিল, হাঁ। রাসূলুল্লাহ বলিলেন, তোমদিগকে এই কাজে কিসে প্ররোচিত করিল? তাহারা বলিল, আমরা মনে করিয়াছি, যদি আপনি মিথ্যাবাদী হন তাহা হইলে আমরা আপনার হইতে পরিত্রাণ লাভ করিব, আর যদি নবী হইয়া থাকেন তাহা হইলে ইহা আপনাকে ক্ষতিগ্রস্ত করিবে না (আত-তাবাকাতুল কুবরা, ২খ., পৃ. ১১৫-১১৬)।
ইন্ন হিশাম বলেন, বিষ মিশ্রিত রানটি যখন রাসূলুল্লাহ (স)-এর সামনে উপস্থিত করা হয় তখন তিনি ইহা হইতে এক খণ্ড গোশত লইয়া মুখে দিয়া ফেলিয়া দিয়াছিলেন। তাহার সঙ্গে বিশ্ব ইনুল বারাআ ইন্ন মা'রূরও ছিলেন। তিনি ইহা হইতে এক খণ্ড গোশত লইয়া গিলিয়া ফেলিলেন। রাসূলুল্লাহ (স) গোশত খণ্ড ফেলিয়া দিয়া বলিলেন, এই হাড়টি আমাকে সংবাদ দিতেছে যে, সে বিষযুক্ত। রাসূলুল্লাহ (স) সেই নারীকে ডাকিয়া জিজ্ঞাসা করিলে সে স্বীকারোক্তি করিল। তিনি তাহাকে জিজ্ঞাসা করিলেন, কিসে তোমাকে এইরূপ করিতে প্ররোচিত করিল। উত্তরে সে বলিল? আমার স্বজাতির প্রতি কৃত আপনার আচরণের কথা আপনার নিকট অবিদিত নয়। আমি মনে মনে ভাবিলাম, ইনি যদি রাজা-বাদশাহ হইয়া থাকেন, তবে তাহা হইতে নিষ্কৃতি পাওয়া যাইবে, আর যদি প্রকৃতই নবী হইয়া থাকেন, তাহা হইলে অচিরেই তিনি এই বিষয়ে অবগত হইবেন। বর্ণনাকারী বলেন, রাসূলুল্লাহ (স) সেই নারীকে ক্ষমা করিয়া দিয়াছিলেন। তবে বিশ্‌র এক গ্রাস ভক্ষণ করায় বিষক্রিয়ায় তিনি মারা যান।
ইবন ইসহাক বলেন, আমার নিকট মারওয়ান ইব্‌ন উছমান ইব্‌ন সা'ঈদ ইবনুল মু'আল্লা বর্ণনা করিয়াছেন, রাসূলুল্লাহ (স)-এর অন্তিম শয্যায় যখন বিশ্‌র বিন্ত আল-বারাআ ইবন মা'রূর (রা)-এর মাতা তাহাকে দেখিতে আসিয়াছিলেন তখন তিনি তাহাকে বলিয়াছিলেন, হে বিশ্বের মাতা! তোমার বিশ্‌রের সহিত খায়বারে আমি যেই গ্রাসটি মুখে তুলিয়াছিলাম তাহার বিষক্রিয়া এখনও আমি অনুভব করিতেছি। আমার ধমনী ছিঁড়িয়া যাইতেছে বলিয়া মনে হইতেছে (আস-সীরাতুন নাবabিয়্যা, ৩খ., পৃ. ২৩৩)।
সেই নারীকে রাসূলুল্লাহ (স)-এর নিকট আনা হইলে সে বলিল, আমি আপনাকে হত্যা করিবার ইচ্ছা পোষণ করিয়াছিলাম। রাসূলুল্লাহ (স) বলিলেন, আমাকে হত্যা করিবার জন্য আল্লাহ তোমাকে ক্ষমতা দিবেন না। স্ত্রীলোকটির উক্তি শুনিয়া সাহাবাগণ বলিলেন, আমরা কি তাহাকে হত্যা করিব না? রাসূলুল্লাহ (স) বলিলেন, না, হত্যা করি ও না। অতঃপর রাসূলুল্লাহ (স) তাহাকে ভাল-মন্দ কিছুই বলিলেন না এবং তাহাকে কোন শাস্তিও দিলেন না। স্ত্রীলোকটিকে হত্যা করিবার ব্যাপারে মতবিরোধ রহিয়াছে। ইমাম যুহরী বলেন, স্ত্রীলোকটি ইসলাম গ্রহণ করিয়াছিল, সেইজন্য তাহাকে মুক্তি দেওয়া হইয়াছিল। এই সূত্রটি আবদুর রাযযাক মা'মার হইতে বর্ণনা করিয়াছেন। অতঃপর মা'মার বলেন, লোকজন বলিয়া থাকে, তাহাকে রাসূলুল্লাহ (স) হত্যা করিয়াছিলেন (যাদুল মা'আদ, ২খ., পৃ. ১৪০)।
দানাপুরী বলেন, বিশ্‌র ইবনুল বারাআ (রা) নিহত হইলে রাসূলুল্লাহ (স) স্ত্রীলোকটিকে ডাকাইয়া আনিয়া তাহাকে হত্যা করিবার নির্দেশ দিলেন। এই রিওয়ায়তটি আবূ সালামা কর্তৃক বর্ণিত। যুহরী ও আবূ সালামা-এর রিওয়ায়াত দুইটি মুরসাল। তবে এই ব্যাপারে আবূ হুরায়রা (রা) হইতে একটি মুত্তাসিল রিওয়ায়াত পাওয়া যায় যে, স্ত্রীলোকটিকে প্রথমে রাসূলুল্লাহ (স) মুক্তি দিয়াছিলেন, কিন্তু বিশ্‌র ইনুল বারাআ (রা) নিহত হইলে রাসূলুল্লাহ (স) তাহাকে হত্যা করিবার নির্দেশ দিয়াছিলেন (আসাহহুস সিয়ার, পৃ. ২০২)।
ইবন কায়্যিম আল-জাওযিয়্যা বলেন, বিষ প্রয়োগকৃত খাবারটি রাসূলুল্লাহ (স) ভক্ষণ করিয়াছিলেন কিনা এই ব্যাপারে মতপার্থক্য রহিয়াছে। তবে অধিকাংশ রিওয়ায়াত প্রমাণ করে যে, রাসূলুল্লাহ (স) ইহা হইতে ভক্ষণ করিয়াছিলেন এবং ইহার পর তিনি তিন বৎসর জীবিত ছিলেন। মৃত্যুশয্যায় শায়িত অবস্থায় তিনি বলিয়াছিলেন, যেই গ্রাসটি আমি খায়বারে ভক্ষণ করিয়াছিলাম ইহার বিষক্রিয়া এখনও আমি অনুভব করিতেছি। ইমাম যুহরী বলেন, সুতরাং রাসূলুল্লাহ (স) শহীদ হিসাবে ইন্তিকাল করেন (যাদুল মা'আদ, ২খ., পৃ. ১৪০)।

যুদ্ধের অবসান হইলে সাল্লাম ইব্‌ন মিশকামের স্ত্রী যয়নব بিন্দুল হারিছ একটি বকরী রান্না করিয়া রাসূলুল্লাহ (س)-কে উপঢৌকন দিল। ইহাতে সে বিষ মিশ্রিত করিয়াছিল (আসাহহুস সিয়ার, পৃ. ২০২)। ইবনুল জাওযিয়্যা বলেন, সে একটি বকরী ভূনা করিয়া ইহাতে বিষ মিশ্রিত করিল এবং জিজ্ঞাসা করিল, কোন অংশের গোস্ত তাঁহার নিকট সর্বাধিক প্রিয়। সাহাবা কিরাম বলিলেন, সামনের রানের গোস্ত। সুতরাং সে সামনের রানের গোশতে অধিক হারে বিষ মিশ্রিত করিল। রাসূলুল্লাহ (س) যখন রানের গোশতে কামড় দিলেন তখন ঐ রানটি অলৌকিকভাবে তাঁহাকে অবহিত করিল যে, তাহাতে বিষ মিশ্রিত। সুতরাং রাসূলুল্লাহ (س) গোস্ত খণ্ডটি ফেলিয়া দিলেন (যাদুল মা'আদ, ২খ., পৃ. ১৩৯)।
ইবন সা'د তদীয় সূত্রে আবূ হুরায়রা (را) হইতে বর্ণনা করিয়াছেন যে, খায়বার বিজিত হইবার পর মহানবী (س)-কে বিষমিশ্রিত ভূনা ছাগলের গোস্ত দেয়া হইয়াছিল। ঘটনা অবগতির পর রাসূলুল্লাহ (س) আদেশ করিলেন, এই স্থানে যত ইয়াহুদী আছে তাহাদিগকে একত্র কর। সাহাবা কিরাম ইয়াহূদীদিগকে একত্র করিলেন। রাসূলুল্লাহ (س) তাহাদিগকে বলিলেন, আমি তোমাদিগকে একটি বিষয়ে জিজ্ঞাসা করিব, তোমরা কি এই ব্যাপারে আমার নিকট সত্য বলিবে? তাহারা উত্তর দিল, হাঁ, সত্য বলিব, হে আবুল কাসিম! রাসূলুল্লাহ (س) জিজ্ঞাসা করিলেন, তোমাদের পিতা কে? তাহারা বলিল, আমাদের পিতা হইলেন অমুক। রাসূলুল্লাহ (س) বলিলেন, তোমরা মিথ্যা বলিতেছ, তোমাদের পিতা হইলেন অমুক। তাহারা বলিল, আপনি সত্য ও যথার্থ বলিয়াছেন। রাসূলুল্লাহ (স) বলিলেন, তোমরা কি আমার নিকট সত্য বলিবে, যদি আমি তোমাদিগকে একটি বিষয়ে জিজ্ঞাসা করি? তাহারা বলিল, হাঁ, হে আবুল কাসিম! যদি আমরা আপনার নিকট মিথ্যা বলি তাহা হইলে আপনি অবগত হইয়া যাইবেন। যেইভাবে আমাদের পিতার ব্যাপারে অবগত হইয়াছেন। রাসূলুল্লাহ (س) তাহাদিগকে জিজ্ঞাসা করিলেন, জাহান্নামের অধিবাসী কাহারা? তাহারা বলিল, আমরা সেখানে অল্পদিন থাকিব, ইহার পর আপনারা আমাদের উত্তরাধিকারী হইবেন। রাসূলুল্লাহ (س) বলিলেন, তোমরা সেখানে লাঞ্ছিত ও বঞ্চিত হইবে। সেখানে কস্মিন কালেও আমরা তোমাদের উত্তরাধিকারী হইব না। অতঃপর রাসূলুল্লাহ (س) বলিলেন, তোমরা কি আমার নিকট সত্য বলিবে, যদি আমি তোমাদিগকে একটি বিষয়ে জিজ্ঞাসা করি। তাহারা বলিল, হে আবুল কাসিম! হাঁ, সত্য বলিব। রাসূলুল্লাহ (س) তাহাদিগকে জিজ্ঞাসা করিলেন, তোমরা কি এই বকরীতে বিষ মিশ্রিত করিয়াছ। তাহারা বলিল, হাঁ। রাসূলুল্লাহ বলিলেন, তোমদিগকে এই কাজে কিসে প্ররোচিত করিল? তাহারা বলিল, আমরা মনে করিয়াছি, যদি আপনি মিথ্যাবাদী হন তাহা হইলে আমরা আপনার হইতে পরিত্রাণ লাভ করিব, আর যদি নবী হইয়া থাকেন তাহা হইলে ইহা আপনাকে ক্ষতিগ্রস্ত করিবে না (আত-তাবাকাতুল কুবরা, ২খ., পৃ. ১১৫-১১৬)।
ইন্ন হিশাম বলেন, বিষ মিশ্রিত রানটি যখন রাসূলুল্লাহ (س)-এর সামনে উপস্থিত করা হয় তখন তিনি ইহা হইতে এক খণ্ড গোশত লইয়া মুখে দিয়া ফেলিয়া দিয়াছিলেন। তাহার সঙ্গে বিশ্ব ইনুল بারাআ ইন্ন মা'রূরও ছিলেন। তিনি ইহা হইতে এক খণ্ড গোশত লইয়া গিলিয়া ফেলিলেন। রাসূলুল্লাহ (س) গোশত খণ্ড ফেলিয়া দিয়া বলিলেন, এই হাড়টি আমাকে সংবাদ দিতেছে যে, সে বিষযুক্ত। রাসূলুল্লাহ (س) সেই নারীকে ডাকিয়া জিজ্ঞাসা করিলে সে স্বীকারোক্তি করিল। তিনি তাহাকে জিজ্ঞাসা করিলেন, কিসে তোমাকে এইরূপ করিতে প্ররোচিত করিল। উত্তরে সে বলিল? আমার স্বজাতির প্রতি কৃত আপনার আচরণের কথা আপনার নিকট অবিদিত নয়। আমি মনে মনে ভাবিলাম, ইনি যদি রাজা-বাদশাহ হইয়া থাকেন, তবে তাহা হইতে নিষ্কৃতি পাওয়া যাইবে, আর যদি প্রকৃতই নবী হইয়া থাকেন, তাহা হইলে অচিরেই তিনি এই বিষয়ে অবগত হইবেন। বর্ণনাকারী বলেন, রাসূলুল্লাহ (س) সেই নারীকে ক্ষমা করিয়া দিয়াছিলেন। তবে বিশ্‌র এক গ্রاس ভক্ষণ করায় বিষক্রিয়ায় তিনি মারা যান।
ইবন ইসহাক বলেন, আমার নিকট মারওয়ান ইব্‌ন উছমান ইব্‌ন সা'ঈd ইবনুল মু'আল্লা বর্ণনা করিয়াছেন, রাসূলুল্লাহ (س)-এর অন্তিম শয্যায় যখন বিশ্‌র بিন্ত আল-بারাআ ইবন মা'রূর (রা)-এর মাতা তাহাকে দেখিতে আসিয়াছিলেন তখন তিনি তাহাকে বলিয়াছিলেন, হে বিশ্বের মাতা! তোমার বিশ্‌রের সহিত খায়বারে আমি যেই গ্রাসটি মুখে তুলিয়াছিলাম তাহার বিষক্রিয়া এখনও আমি অনুভব করিতেছি। আমার ধমনী ছিঁড়িয়া যাইতেছে বলিয়া মনে হইতেছে (আস-সীরাতুন নাবabিয়্যা, ৩খ., পৃ. ২৩৩)।
সেই নারীকে রাসূলুল্লাহ (স)-এর নিকট আনা হইলে সে বলিল, আমি আপনাকে হত্যা করিবার ইচ্ছা পোষণ করিয়াছিলাম। রাসূলুল্লাহ (س) বলিলেন, আমাকে হত্যা করিবার জন্য আল্লাহ তোমাকে ক্ষমতা দিবেন না। স্ত্রীলোকটির উক্তি শুনিয়া সাহাবাগণ বলিলেন, আমরা কি তাহাকে হত্যা করিব না? রাসূলুল্লাহ (س) বলিলেন, না, হত্যা করি ও না। অতঃপর রাসূলুল্লাহ (স) তাহাকে ভাল-মন্দ কিছুই বলিলেন না এবং তাহাকে কোন শাস্তিও দিলেন না। স্ত্রীলোকটিকে হত্যা করিবার ব্যাপারে মতবিরোধ রহিয়াছে। ইমাম যুহরী বলেন, স্ত্রীলোকটি ইসলাম গ্রহণ করিয়াছিল, সেইজন্য তাহাকে মুক্তি দেওয়া হইয়াছিল। এই সূত্রটি আবদুর রাযযাক মা'মার হইতে বর্ণনা করিয়াছেন। অতঃপর মা'মার বলেন, লোকজন বলিয়া থাকে, তাহাকে রাসূলুল্লাহ (স) হত্যা করিয়াছিলেন (যাদুল মা'আদ, ২খ., পৃ. ১৪০)।
দানাপুরী বলেন, বিশ্‌র ইবনুল بারাআ (را) নিহত হইলে রাসূলুল্লাহ (স) স্ত্রীলোকটিকে ডাকাইয়া আনিয়া তাহাকে হত্যা করিবার নির্দেশ দিলেন। এই রিওয়ায়তটি আবূ সালামা কর্তৃক বর্ণিত। যুহরী ও আবূ সালামা-এর রিওয়ায়াত দুইটি মুরসাল। তবে এই ব্যাপারে আবূ হুরায়রা (রা) হইতে একটি মুত্তাসিল রিওয়ায়াত পাওয়া যায় যে, স্ত্রীলোকটিকে প্রথমে রাসূলুল্লাহ (স) মুক্তি দিয়াছিলেন, কিন্তু বিশ্‌ر ইনুল بারাআ (را) নিহত হইলে রাসূলুল্লাহ (স) তাহাকে হত্যা করিবার নির্দেশ দিয়াছিলেন (আসাহহুস সিয়ার, পৃ. ২০২)।
ইবন কায়্যিম আল-জাওযিয়্যা বলেন, বিষ প্রয়োগকৃত খাবারটি রাসূলুল্লাহ (স) ভক্ষণ করিয়াছিলেন কিনা এই ব্যাপারে মতপার্থক্য রহিয়াছে। তবে অধিকাংশ রিওয়ায়াত প্রমাণ করে যে, রাসূলুল্লাহ (س) ইহা হইতে ভক্ষণ করিয়াছিলেন এবং ইহার পর তিনি তিন বৎসর জীবিত ছিলেন। মৃত্যুশয্যায় শায়িত অবস্থায় তিনি বলিয়াছিলেন, যেই গ্রাসটি আমি খায়বারে ভক্ষণ করিয়াছিলাম ইহার বিষক্রিয়া এখনও আমি অনুভব করিতেছি। ইমাম যুহরী বলেন, সুতরাং রাসূলুল্লাহ (س) শহীদ হিসাবে ইন্তিকাল করেন (যাদুল মা'আদ, ২খ., পৃ. ১৪০)।

যুদ্ধের অবসান হইলে সাল্লাম ইব্‌ন মিশকামের স্ত্রী যয়নব বিন্দুল হারিছ একটি বকরী রান্না করিয়া রাসূলুল্লাহ (স)-কে উপঢৌকন দিল। ইহাতে সে বিষ মিশ্রিত করিয়াছিল (আসাহহুস সিয়ার, পৃ. ২০২)। ইবনুল জাওযিয়্যা বলেন, সে একটি বকরী ভূনা করিয়া ইহাতে বিষ মিশ্রিত করিল এবং জিজ্ঞাসা করিল, কোন অংশের গোস্ত তাঁহার নিকট সর্বাধিক প্রিয়। সাহাবা কিরাম বলিলেন, সামনের রানের গোস্ত। সুতরাং সে সামনের রানের গোশতে অধিক হারে বিষ মিশ্রিত করিল। রাসূলুল্লাহ (স) যখন রানের গোশতে কামড় দিলেন তখন ঐ রানটি অলৌকিকভাবে তাঁহাকে অবহিত করিল যে, তাহাতে বিষ মিশ্রিত। সুতরাং রাসূলুল্লাহ (স) গোস্ত খণ্ডটি ফেলিয়া দিলেন (যাদুল মা'আদ, ২খ., পৃ. ১৩৯)।
ইবন সা'দ তদীয় সূত্রে আবূ হুরায়রা (রা) হইতে বর্ণনা করিয়াছেন যে, খায়বার বিজিত হইবার পর মহানবী (স)-কে বিষমিশ্রিত ভূনা ছাগলের গোস্ত দেয়া হইয়াছিল। ঘটনা অবগতির পর রাসূলুল্লাহ (স) আদেশ করিলেন, এই স্থানে যত ইয়াহুদী আছে তাহাদিগকে একত্র কর। সাহাবা কিরাম ইয়াহূদীদিগকে একত্র করিলেন। রাসূলুল্লাহ (স) তাহাদিগকে বলিলেন, আমি তোমাদিগকে একটি বিষয়ে জিজ্ঞাসা করিব, তোমরা কি এই ব্যাপারে আমার নিকট সত্য বলিবে? তাহারা উত্তর দিল, হাঁ, সত্য বলিব, হে আবুল কাসিম! রাসূলুল্লাহ (স) জিজ্ঞাসা করিলেন, তোমাদের পিতা কে? তাহারা বলিল, আমাদের পিতা হইলেন অমুক। রাসূলুল্লাহ (স) বলিলেন, তোমরা মিথ্যা বলিতেছ, তোমাদের পিতা হইলেন অমুক। তাহারা বলিল, আপনি সত্য ও যথার্থ বলিয়াছেন। রাসূলুল্লাহ (স) বলিলেন, তোমরা কি আমার নিকট সত্য বলিবে, যদি আমি তোমাদিগকে একটি বিষয়ে জিজ্ঞাসা করি? তাহারা বলিল, হাঁ, হে আবুল কাসিম! যদি আমরা আপনার নিকট মিথ্যা বলি তাহা হইলে আপনি অবগত হইয়া যাইবেন। যেইভাবে আমাদের পিতার ব্যাপারে অবগত হইয়াছেন। রাসূলুল্লাহ (স) তাহাদিগকে জিজ্ঞাসা করিলেন, জাহান্নামের অধিবাসী কাহারা? তাহারা বলিল, আমরা সেখানে অল্পদিন থাকিব, ইহার পর আপনারা আমাদের উত্তরাধিকারী হইবেন। রাসূলুল্লাহ (স) বলিলেন, তোমরা সেখানে লাঞ্ছিত ও বঞ্চিত হইবে। সেখানে কস্মিন কালেও আমরা তোমাদের উত্তরাধিকারী হইব না। অতঃপর রাসূলুল্লাহ (স) বলিলেন, তোমরা কি আমার নিকট সত্য বলিবে, যদি আমি তোমাদিগকে একটি বিষয়ে জিজ্ঞাসা করি। তাহারা বলিল, হে আবুল কাসিম! হাঁ, সত্য বলিব। রাসূলুল্লাহ (স) তাহাদিগকে জিজ্ঞাসা করিলেন, তোমরা কি এই বকরীতে বিষ মিশ্রিত করিয়াছ। তাহারা বলিল, হাঁ। রাসূলুল্লাহ বলিলেন, তোমদিগকে এই কাজে কিসে প্ররোচিত করিল? তাহারা বলিল, আমরা মনে করিয়াছি, যদি আপনি মিথ্যাবাদী হন তাহা হইলে আমরা আপনার হইতে পরিত্রাণ লাভ করিব, আর যদি নবী হইয়া থাকেন তাহা হইলে ইহা আপনাকে ক্ষতিগ্রস্ত করিবে না (আত-তাবাকাতুল কুবরা, ২খ., পৃ. ১১৫-১১৬)।
ইন্ন হিশাম বলেন, বিষ মিশ্রিত রানটি যখন রাসূলুল্লাহ (স)-এর সামনে উপস্থিত করা হয় তখন তিনি ইহা হইতে এক খণ্ড গোশত লইয়া মুখে দিয়া ফেলিয়া দিয়াছিলেন। তাহার সঙ্গে বিশ্ব ইনুল বারাআ ইন্ন মা'রূরও ছিলেন। তিনি ইহা হইতে এক খণ্ড গোশত লইয়া গিলিয়া ফেলিলেন। রাসূলুল্লাহ (স) গোশত খণ্ড ফেলিয়া দিয়া বলিলেন, এই হাড়টি আমাকে সংবাদ দিতেছে যে, সে বিষযুক্ত। রাসূলুল্লাহ (স) সেই নারীকে ডাকিয়া জিজ্ঞাসা করিলে সে স্বীকারোক্তি করিল। তিনি তাহাকে জিজ্ঞাসা করিলেন, কিসে তোমাকে এইরূপ করিতে প্ররোচিত করিল। উত্তরে সে বলিল? আমার স্বজাতির প্রতি কৃত আপনার আচরণের কথা আপনার নিকট অবিদিত নয়। আমি মনে মনে ভাবিলাম, ইনি যদি রাজা-বাদশাহ হইয়া থাকেন, তবে তাহা হইতে নিষ্কৃতি পাওয়া যাইবে, আর যদি প্রকৃতই নবী হইয়া থাকেন, তাহা হইলে অচিরেই তিনি এই বিষয়ে অবগত হইবেন। বর্ণনাকারী বলেন, রাসূলুল্লাহ (স) সেই নারীকে ক্ষমা করিয়া দিয়াছিলেন। তবে বিশ্‌র এক গ্রাস ভক্ষণ করায় বিষক্রিয়ায় তিনি মারা যান।
ইবন ইসহাক বলেন, আমার নিকট মারওয়ান ইব্‌ন উছমান ইব্‌ন সা'ঈদ ইবনুল মু'আল্লা বর্ণনা করিয়াছেন, রাসূলুল্লাহ (স)-এর অন্তিম শয্যায় যখন বিশ্‌র বিন্ত আল-বারাআ ইবন মা'রূর (রা)-এর মাতা তাহাকে দেখিতে আসিয়াছিলেন তখন তিনি তাহাকে বলিয়াছিলেন, হে বিশ্বের মাতা! তোমার বিশ্‌রের সহিত খায়বারে আমি যেই গ্রাসটি মুখে তুলিয়াছিলাম তাহার বিষক্রিয়া এখনও আমি অনুভব করিতেছি। আমার ধমনী ছিঁড়িয়া যাইতেছে বলিয়া মনে হইতেছে (আস-সীরাতুন নাবাবিয়্যা, ৩খ., পৃ. ২৩৩)।
সেই নারীকে রাসূলুল্লাহ (স)-এর নিকট আনা হইলে সে বলিল, আমি আপনাকে হত্যা করিবার ইচ্ছা পোষণ করিয়াছিলাম। রাসূলুল্লাহ (স) বলিলেন, আমাকে হত্যা করিবার জন্য আল্লাহ তোমাকে ক্ষমতা দিবেন না। স্ত্রীলোকটির উক্তি শুনিয়া সাহাবাগণ বলিলেন, আমরা কি তাহাকে হত্যা করিব না? রাসূলুল্লাহ (স) বলিলেন, না, হত্যা করি ও না। অতঃপর রাসূলুল্লাহ (স) তাহাকে ভাল-মন্দ কিছুই বলিলেন না এবং তাহাকে কোন শাস্তিও দিলেন না। স্ত্রীলোকটিকে হত্যা করিবার ব্যাপারে মতবিরোধ রহিয়াছে। ইমাম যুহরী বলেন, স্ত্রীলোকটি ইসলাম গ্রহণ করিয়াছিল, সেইজন্য তাহাকে মুক্তি দেওয়া হইয়াছিল। এই সূত্রটি আবদুর রাযযাক মা'মার হইতে বর্ণনা করিয়াছেন। অতঃপর মা'মার বলেন, লোকজন বলিয়া থাকে, তাহাকে রাসূলুল্লাহ (স) হত্যা করিয়াছিলেন (যাদুল মা'আদ, ২খ., পৃ. ১৪০)।
দানাপুরী বলেন, বিশ্‌র ইবনুল বারাআ (রা) নিহত হইলে রাসূলুল্লাহ (স) স্ত্রীলোকটিকে ডাকাইয়া আনিয়া তাহাকে হত্যা করিবার নির্দেশ দিলেন। এই রিওয়ায়তটি আবূ সালামা কর্তৃক বর্ণিত। যুহরী ও আবূ সালামা-এর রিওয়ায়াত দুইটি মুরসাল। তবে এই ব্যাপারে আবূ হুরায়রা (রা) হইতে একটি মুত্তাসিল রিওয়ায়াত পাওয়া যায় যে, স্ত্রীলোকটিকে প্রথমে রাসূলুল্লাহ (স) মুক্তি দিয়াছিলেন, কিন্তু বিশ্‌র ইনুল বারাআ (রা) নিহত হইলে রাসূলুল্লাহ (স) তাহাকে হত্যা করিবার নির্দেশ দিয়াছিলেন (আসাহহুস সিয়ার, পৃ. ২০২)।
ইবন কায়্যিম আল-জাওযিয়্যা বলেন, বিষ প্রয়োগকৃত খাবারটি রাসূলুল্লাহ (স) ভক্ষণ করিয়াছিলেন কিনা এই ব্যাপারে মতপার্থক্য রহিয়াছে। তবে অধিকাংশ রিওয়ায়াত প্রমাণ করে যে, রাসূলুল্লাহ (স) ইহা হইতে ভক্ষণ করিয়াছিলেন এবং ইহার পর তিনি তিন বৎসর জীবিত ছিলেন। মৃত্যুশয্যায় শায়িত অবস্থায় তিনি বলিয়াছিলেন, যেই গ্রাসটি আমি খায়বারে ভক্ষণ করিয়াছিলাম ইহার বিষক্রিয়া এখনও আমি অনুভব করিতেছি। ইমাম যুহরী বলেন, সুতরাং রাসূলুল্লাহ (স) শহীদ হিসাবে ইন্তিকাল করেন (যাদুল মা'আদ, ২খ., পৃ. ১৪০)।

📘 সীরাত বিশ্বকোষ > 📄 হাজ্জাজ ইব্‌ন 'ইলাতের ঘটনা

📄 হাজ্জাজ ইব্‌ন 'ইলাতের ঘটনা


হাজ্জাজ ইব্‌ন 'ইলাত আস-সুলামী ইসলাম গ্রহণ করিয়াছিলেন এবং খায়বার বিজয়ে অংশগ্রহণ করিয়াছিলেন। তাঁহার স্ত্রী ছিলেন উম্মু শায়বা বিন্ত আবী তালহা যিনি বানু 'আবদিদ দার গোত্রের মহিলা ছিলেন। হাজ্জাজ ইব্‌ন ইলাত একজন ধনাঢ্য ব্যক্তি ছিলেন এবং বানূ সুলায়ম গোত্রের ভূগর্ভস্থ খনিজ দ্রব্যসমূহের মালিক ছিলেন। রাসূলুল্লাহ (স) যখন খায়বারে বিজয় লাভ করিয়াছিলেন তখন তিনি রাসূলুল্লাহ (স)-কে বলিলেন, আমার স্বর্ণরাজি এবং সকল সম্পদ মক্কায় আমার স্ত্রীর নিকট রহিয়াছে। যদি সে আমার ইসলাম গ্রহণ করার কথা শ্রবণ করে তাহা হইলে তাহার নিকট হইতে কিছুই পাওয়া যাইবে না। যদি আপনি অনুমতি দান করেন তাহা হইলে খায়বার বিজয়ের সংবাদ পৌছিবার পূর্বেই আমি যেভাবেই হউক দ্রুত আমার স্ত্রীর নিকট পৌঁছিয়া আমার সম্পদ লইয়া আসিব।
রাসূলুল্লাহ (স) তাহাকে অনুমতি প্রদান করিলে তিনি অত্যন্ত ক্ষিপ্রগতিতে মক্কায় পৌছিয়া স্বীয় স্ত্রীকে বলিলেন, আমার যেই মালামাল তোমার নিকট আছে তাহা কাহাকেও বলিও না। শীঘ্র ইহা আমাকে বাহির করিয়া দাও। খায়বারে মুহাম্মাদ ও তাঁহার বাহিনী পরাজয় বরণ করিয়াছে এবং মুহাম্মাদ নিজেও বন্দী হইয়াছেন। তাঁহার সঙ্গী-সাথিগণ ছত্রভঙ্গ হইয়া গিয়াছে। আমি তাহাদের পরিত্যক্ত সম্পদরাজি খরিদ করিতে চাই। খায়বারবাসিগণ মুহাম্মাদ (স)-কে মক্কাবাসীর হাতে অর্পণ করিবে যাহাতে তাহারা তাঁহাকে হত্যা করিয়া তাহাদের লোক হত্যার প্রতিশোধ গ্রহণ করিতে পারে।
এই সংবাদ দ্রুত মক্কায় ছড়াইয়া পড়ে এবং কাফিরগণ অত্যন্ত আনন্দিত হয়। আর মুসলমানগণের মধ্যে নামিয়া আসে বিষাদের কালো ছায়া। রাসূলুল্লাহ (স)-এর পিতৃব্য 'আব্বাস (রা)-এর নিকট যখন এই দুঃসংবাদ পৌঁছে তখন তিনি বিষাদে একেবারে মুষড়াইয়া পড়েন এবং বসা হইতে দাঁড়াইয়া বাহির হইতে উদ্যত হইলেন, কিন্তু মেরুদণ্ড সোজা করিতে পারিলেন না। তখন তিনি তাঁহার কুছাম নামী এক পুত্রকে ডাকিয়া লইলেন। কুছামের চেহারার কিছুটা রাসূলুল্লাহ (স)-এর সহিত মিল ছিল। কুছামকে সামনে রাখিয়া তিনি নিম্নোক্ত কবিতাটি উচ্চস্বরে আবৃত্তি করিতেছিলেন যাহাতে আল্লাহ্র শত্রুরা তাহাকে ভৎসনা করিতে না পারে।
قُثَمٌ شَبِيهُ ذِي الْأَنْفِ الأَشَمِّ + فَتًى ذِي النَّعَمِ يَزْعَمُ مَنْ زَعَمَ.
"কুছাম হইল সুদর্শন নাসিকাসম্পন্ন এমন এক যুবকের সদৃশ যিনি অগণিত নি'মতপ্রাপ্ত, কেবল সুধীজনই তাহাকে চিনিতে ও বুঝিতে পারিবে” (যাদুল মা'আদ, পৃ. ১৪০)।
'আব্বাস (রা)-এর গৃহের সামনে জনতার ভিড় জমিল। ইহাদের মধ্যে কেহ ছিল মুসলিম, কেহ ছিল মুশরিক, কেহ ছিল আনন্দে আত্মহারা, কেহ ছিল দুঃখ-বিষাদে মৃতপ্রায়। মুসলিমগণ 'আব্বাস (রা)-এর কবিতা আবৃত্তি শুনিয়া উজ্জীবিত হইতে লাগিল এবং কাফিরগণ ভাবিল, 'আব্বাস (রা)-এর নিকট হয়ত এমন সংবাদ পৌছিয়াছে যাহা তাহাদের নিকট আসে নাই। অতঃপর 'আব্বাস (রা) প্রকৃত ঘটনা অবহিত হইবার জন্য স্বীয় ভৃত্যকে হাজ্জাজ (রা)-এর নিকট প্রেরণ করিলেন। হাজ্জাজ ভৃত্যটিকে বলিলেন, আবুল ফাদল কে আমার সালাম দিয়া বলিবে, আমি এখনই তাঁহার নিকট আসিতেছি। তিনি যেন নির্জন স্থানে একা একা কথা বলার ব্যবস্থা করেন। এই খবর শুনিয়া তিনি নিশ্চয় আনন্দিত হইবেন। ভৃত্যটি আসিয়া 'আব্বাস (রা)-কে সুসংবাদ প্রদান করে। এতদশ্রবণে তিনি আনন্দের অনাতিশয্যে বিষাদের সকল যন্ত্রণা ভুলিয়া যান। তিনি শয্যা হইতে উঠিয়া বসেন এবং ললাটে চুম্বন করিয়া তাহাকে আযাদ করিয়া দেন।
অতঃপর হাজ্জাজ (রা) তাঁহার নিকট আগমন করিয়া নিভৃতে তাঁহাকে প্রকৃত ঘটনা সবিস্তারে বর্ণনা করেন। কিন্তু তিনি তাঁহার নিকট হইতে প্রতিশ্রুতি গ্রহণ করেন যে, এই সংবাদ তিন দিনের জন্য কাহারও নিকট প্রকাশ করিবেন না। অতঃপর হাজ্জাজ (রা) বলিলেন, আমি যাহা কিছু বলিয়াছি তাহা সব রাসূলুল্লাহ (স)-এর অনুমতিক্রমেই বলিয়াছি। প্রকৃতপক্ষে রাসূলুল্লাহ (স) খায়বার বিজয় করিয়াছেন এবং ইয়াহুদীদের সম্পত্তি তিনি গনীমত হিসাবে গ্রহণ করিয়াছেন। তিনি সাফিয়্যা বিন্ত হুয়াই (রা)-কে বিবাহ করিয়াছেন। আমি শুধু আমার সম্পত্তি উদ্ধার করিবার জন্য আসিয়াছিলাম এবং আমার কার্য সম্পাদনের উদ্দেশ্যে এইরূপ বলিবার জন্য রাসূলুল্লাহ (স)-এর নিকট অনুমতি প্রার্থনা করিয়াছিলাম। তিনি আমাকে অনুমতি প্রদান করিয়াছিলেন। হাজ্জাজ তাঁহার ধন সম্পদ লইয়া চলিয়া গেলেন।
তিনদিন পর আব্বাস (রা) হাজ্জাজের স্ত্রীর (উম্মু শায়বা) নিকট গমন করিয়া বলিলেন, তোমার স্বামী কি করিয়াছে? সে বলিল, তিনি চলিয়া গিয়াছেন। স্ত্রীলোকটি আরও বলিল, হে আবুল ফাদল! আল্লাহ আপনাকে দুঃখ-ভারাক্রান্ত না করুন। আপনার নিকট যেই সংবাদ পৌঁছিয়াছে ইহাতে আমরাও ব্যথিত হইয়াছি। তিনি উত্তরে বলিলেন, হাঁ, আমার নিকট শুভ সংবাদ ব্যতীত অন্য কোন সংবাদ পৌঁছায় নাই। সকল প্রশংসা আল্লাহ্রই, হাজ্জাজ আমাকে এইরূপ সংবাদ প্রদান করিয়াছে। সে আমার নিকট তিন দিন পর্যন্ত বিষয়টি কোন কারণে গোপন রাখার আবেদন করিয়াছিল। ইহাতে মুসলমানগণের সকল দুঃখ-বিষাদ দূর হইয়া গেল। পক্ষান্তরে মুশরিকগণের অন্তরে দুঃখ-বেদনা ছায়াপাত করিল (যাদুল মা'আদ, ২খ., পৃ. ১৪০; আসাহহুস সিয়ার, পৃ. ২০২)।

হাজ্জাজ ইব্‌ন 'ইলাত আস-সুলামী ইসলাম গ্রহণ করিয়াছিলেন এবং খায়বার বিজয়ে অংশগ্রহণ করিয়াছিলেন। তাঁহার স্ত্রী ছিলেন উম্মু শায়বা বিন্ত আবী তালহা যিনি বানু 'আবদিদ দার গোত্রের মহিলা ছিলেন। হাজ্জাজ ইব্‌ন ইলাত একজন ধনাঢ্য ব্যক্তি ছিলেন এবং বানূ সুলায়ম গোত্রের ভূগর্ভস্থ খনিজ দ্রব্যসমূহের মালিক ছিলেন। রাসূলুল্লাহ (স) যখন খায়বারে বিজয় লাভ করিয়াছিলেন তখন তিনি রাসূলুল্লাহ (স)-কে বলিলেন, আমার স্বর্ণরাজি এবং সকল সম্পদ মক্কায় আমার স্ত্রীর নিকট রহিয়াছে। যদি সে আমার ইসলাম গ্রহণ করার কথা শ্রবণ করে তাহা হইলে তাহার নিকট হইতে কিছুই পাওয়া যাইবে না। যদি আপনি অনুমতি দান করেন তাহা হইলে খায়বার বিজয়ের সংবাদ পৌছিবার পূর্বেই আমি যেভাবেই হউক দ্রুত আমার স্ত্রীর নিকট পৌঁছিয়া আমার সম্পদ লইয়া আসিব।
রাসূলুল্লাহ (স) তাহাকে অনুমতি প্রদান করিলে তিনি অত্যন্ত ক্ষিপ্রগতিতে মক্কায় পৌছিয়া স্বীয় স্ত্রীকে বলিলেন, আমার যেই মালামাল তোমার নিকট আছে তাহা কাহাকেও বলিও না। শীঘ্র ইহা আমাকে বাহির করিয়া দাও। খায়বারে মুহাম্মাদ ও তাঁহার বাহিনী পরাজয় বরণ করিয়াছে এবং মুহাম্মাদ নিজেও বন্দী হইয়াছেন। তাঁহার সঙ্গী-সাথিগণ ছত্রভঙ্গ হইয়া গিয়াছে। আমি তাহাদের পরিত্যক্ত সম্পদরাজি খরিদ করিতে চাই। খায়বারবাসিগণ মুহাম্মাদ (স)-কে মক্কাবাসীর হাতে অর্পণ করিবে যাহাতে তাহারা তাঁহাকে হত্যা করিয়া তাহাদের লোক হত্যার প্রতিশোধ গ্রহণ করিতে পারে।
এই সংবাদ দ্রুত মক্কায় ছড়াইয়া পড়ে এবং কাফিরগণ অত্যন্ত আনন্দিত হয়। আর মুসলমানগণের মধ্যে নামিয়া আসে বিষাদের কালো ছায়া। রাসূলুল্লাহ (স)-এর পিতৃব্য 'আব্বাস (রা)-এর নিকট যখন এই দুঃসংবাদ পৌঁছে তখন তিনি বিষাদে একেবারে মুষড়াইয়া পড়েন এবং বসা হইতে দাঁড়াইয়া বাহির হইতে উদ্যত হইলেন, কিন্তু মেরুদণ্ড সোজা করিতে পারিলেন না। তখন তিনি তাঁহার কুছাম নামী এক পুত্রকে ডাকিয়া লইলেন। কুছামের চেহারার কিছুটা রাসূলুল্লাহ (স)-এর সহিত মিল ছিল। কুছামকে সামনে রাখিয়া তিনি নিম্নোক্ত কবিতাটি উচ্চস্বরে আবৃত্তি করিতেছিলেন যাহাতে আল্লাহ্র শত্রুরা তাহাকে ভৎসনা করিতে না পারে।
قُثَمٌ شَبِيهُ ذِي الْأَنْفِ الأَشَمِّ + فَتًى ذِي النَّعَمِ يَزْعَمُ مَنْ زَعَمَ.
"কুছাম হইল সুদর্শন নাসিকাসম্পন্ন এমন এক যুবকের সদৃশ যিনি অগণিত নি'মতপ্রাপ্ত, কেবল সুধীজনই তাহাকে চিনিতে ও বুঝিতে পারিবে" (যাদুল মা'আদ, পৃ. ১৪০)।
'আব্বাস (রা)-এর গৃহের সামনে জনতার ভিড় জমিল। ইহাদের মধ্যে কেহ ছিল মুসলিম, কেহ ছিল মুশরিক, কেহ ছিল আনন্দে আত্মহারা, কেহ ছিল দুঃখ-বিষাদে মৃতপ্রায়। মুসলিমগণ 'আব্বাস (রা)-এর কবিতা আবৃত্তি শুনিয়া উজ্জীবিত হইতে লাগিল এবং কাফিরগণ ভাবিল, 'আব্বাস (রা)-এর নিকট হয়ত এমন সংবাদ পৌছিয়াছে যাহা তাহাদের নিকট আসে নাই। অতঃপর 'আব্বাস (রা) প্রকৃত ঘটনা অবহিত হইবার জন্য স্বীয় ভৃত্যকে হাজ্জাজ (রা)-এর নিকট প্রেরণ করিলেন। হাজ্জাজ ভৃত্যটিকে বলিলেন, আবুল ফাদল কে আমার সালাম দিয়া বলিবে, আমি এখনই তাঁহার নিকট আসিতেছি। তিনি যেন নির্জন স্থানে একা একা কথা বলার ব্যবস্থা করেন। এই খবর শুনিয়া তিনি নিশ্চয় আনন্দিত হইবেন। ভৃত্যটি আসিয়া 'আব্বাস (রা)-কে সুসংবাদ প্রদান করে। এতদশ্রবণে তিনি আনন্দের অনাতিশয্যে বিষাদের সকল যন্ত্রণা ভুলিয়া যান। তিনি শয্যা হইতে উঠিয়া বসেন এবং ললাটে চুম্বন করিয়া তাহাকে আযাদ করিয়া দেন।
অতঃপর হাজ্জাজ (রা) তাঁহার নিকট আগমন করিয়া নিভৃতে তাঁহাকে প্রকৃত ঘটনা সবিস্তারে বর্ণনা করেন। কিন্তু তিনি তাঁহার নিকট হইতে প্রতিশ্রুতি গ্রহণ করেন যে, এই সংবাদ তিন দিনের জন্য কাহারও নিকট প্রকাশ করিবেন না। অতঃপর হাজ্জাজ (রা) বলিলেন, আমি যাহা কিছু বলিয়াছি তাহা সব রাসূলুল্লাহ (স)-এর অনুমতিক্রমেই বলিয়াছি। প্রকৃতপক্ষে রাসূলুল্লাহ (স) খায়বার বিজয় করিয়াছেন এবং ইয়াহুদীদের সম্পত্তি তিনি গনীমত হিসাবে গ্রহণ করিয়াছেন। তিনি সাফিয়্যা বিন্ত হুয়াই (রা)-কে বিবাহ করিয়াছেন। আমি শুধু আমার সম্পত্তি উদ্ধার করিবার জন্য আসিয়াছিলাম এবং আমার কার্য সম্পাদনের উদ্দেশ্যে এইরূপ বলিবার জন্য রাসূলুল্লাহ (স)-এর নিকট অনুমতি প্রার্থনা করিয়াছিলাম। তিনি আমাকে অনুমতি প্রদান করিয়াছিলেন। হাজ্জাজ তাঁহার ধন সম্পদ লইয়া চলিয়া গেলেন।
তিনদিন পর আব্বাস (রা) হাজ্জাজের স্ত্রীর (উম্মু শায়বা) নিকট গমন করিয়া বলিলেন, তোমার স্বামী কি করিয়াছে? সে বলিল, তিনি চলিয়া গিয়াছেন। স্ত্রীলোকটি আরও বলিল, হে আবুল ফাদল! আল্লাহ আপনাকে দুঃখ-ভারাক্রান্ত না করুন। আপনার নিকট যেই সংবাদ পৌঁছিয়াছে ইহাতে আমরাও ব্যথিত হইয়াছি। তিনি উত্তরে বলিলেন, হাঁ, আল্লাহ আমাকে বেদনাহত না করুন। আল্লাহরই প্রশংসা, আমি যাহা ভালবাসি তাহা ব্যতীত অন্য কিছুই সংঘটিত হয় নাই। আল্লাহ তাঁহার রাসূলকে খায়বারে বিজয় দান করিয়াছেন। সেখানে যুদ্ধলব্ধ সম্পদের ভাগ-বাটোয়ারা চলিতেছে। রাসূলুল্লাহ (স) সেখানে সাফিয়্যাকে তাঁহার নিজের জন্য মনোনীত করিয়াছেন। যদি তোমার স্বামীর সহিত তোমার কোন প্রয়োজন থাকে তাহা হইলে তুমি তাহার সহিত মিলিত হইয়া যাও। স্ত্রীলোকটি বলিল, আল্লাহ্র শপথ! আমার ধারণা হইতেছে আপনি সত্যবাদী। তিনি উত্তর দিলেন, আল্লাহ্র শপথ! আমি সত্যবাদী। তোমাকে যাহা বলিতেছি ঘটনা সেইরূপই ঘটিয়াছে। সে বলিল, আপনাকে এই সংবাদ কে প্রদান করিয়াছে? তিনি বলিলেন, তোমাকে যিনি সংবাদ দিয়াছেন তিনি আমাকে সংবাদ প্রদান করিয়াছেন।
আব্বাস (রা) এখান হইতে রওয়ানা করিয়া কুরায়শদের আসরে গমন করিলেন। তাহারা তাঁহাকে দেখিয়া বলিল, আল্লাহ্ শপথ! হে আবুল ফাদল! ইহাই ধৈর্য ও সহিষ্ণুতার সময়। ইহাতে তোমার কল্যাণ সাধিত হইবে। তিনি উত্তর দিলেন, হাঁ, আমার নিকট শুভ সংবাদ ব্যতীত অন্য কোন সংবাদ পৌঁছায় নাই। সকল প্রশংসা আল্লাহ্রই, হাজ্জাজ আমাকে এইরূপ সংবাদ প্রদান করিয়াছে। সে আমার নিকট তিন দিন পর্যন্ত বিষয়টি কোন কারণে গোপন রাখার আবেদন করিয়াছিল। ইহাতে মুসলমানগণের সকল দুঃখ-বিষাদ দূর হইয়া গেল। পক্ষান্তরে মুশরিকগণের অন্তরে দুঃখ-বেদনা ছায়াপাত করিল (যাদুল মা'আদ, ২খ., পৃ. ১৪০; আসাহহুস সিয়ার, পৃ. ২০২)।

হাজ্জাজ ইব্‌ن 'ইলাত আস-সুলামী ইসলাম গ্রহণ করিয়াছিলেন এবং খায়বার বিজয়ে অংশগ্রহণ করিয়াছিলেন। তাঁহার স্ত্রী ছিলেন উম্মু শায়با بিন্ত আবী তালহা যিনি বানু 'আবদিদ দার গোত্রের মহিলা ছিলেন। হাজ্জাজ ইব্‌ন ইলাত একজন ধনাঢ্য ব্যক্তি ছিলেন এবং বানূ সুলায়م গোত্রের ভূগর্ভস্থ খনিজ দ্রব্যসমূহের মালিক ছিলেন। রাসূলুল্লাহ (স) যখন খায়বারে বিজয় লাভ করিয়াছিলেন তখন তিনি রাসূলুল্লাহ (স)-কে বলিলেন, আমার স্বর্ণরাজি এবং সকল সম্পদ মক্কায় আমার স্ত্রীর নিকট রহিয়াছে। যদি সে আমার ইসলাম গ্রহণ করার কথা শ্রবণ করে তাহা হইলে তাহার নিকট হইতে কিছুই পাওয়া যাইবে না। যদি আপনি অনুমতি দান করেন তাহা হইলে খায়বার বিজয়ের সংবাদ পৌছিবার পূর্বেই আমি যেভাবেই হউক দ্রুত আমার স্ত্রীর নিকট পৌঁছিয়া আমার সম্পদ লইয়া আসিব।
রাসূলুল্লাহ (স) তাহাকে অনুমতি প্রদান করিলে তিনি অত্যন্ত ক্ষিপ্রগতিতে মক্কায় পৌছিয়া স্বীয় স্ত্রীকে বলিলেন, আমার যেই মালামাল তোমার নিকট আছে তাহা কাহাকেও বলিও না। শীঘ্র ইহা আমাকে বাহির করিয়া দাও। খায়বারে মুহাম্মাদ ও তাঁহার বাহিনী পরাজয় বরণ করিয়াছে এবং মুহাম্মাদ নিজেও বন্দী হইয়াছেন। তাঁহার সঙ্গী-সাথিগণ ছত্রভঙ্গ হইয়া গিয়াছে। আমি তাহাদের পরিত্যক্ত সম্পদরাজি খরিদ করিতে চাই। খায়বারবাসিগণ মুহাম্মাদ (স)-কে মক্কাবাসীর হাতে অর্পণ করিবে যাহাতে তাহারা তাঁহাকে হত্যা করিয়া তাহাদের লোক হত্যার প্রতিশোধ গ্রহণ করিতে পারে।
এই সংবাদ দ্রুত মক্কায় ছড়াইয়া পড়ে এবং কাফিরগণ অত্যন্ত আনন্দিত হয়। আর মুসলমানগণের মধ্যে নামিয়া আসে বিষাদের কালো ছায়া। রাসূলুল্লাহ (স)-এর পিতৃব্য 'আব্বাস (রা)-এর নিকট যখন এই দুঃসংবাদ পৌঁছে তখন তিনি বিষাদে একেবারে মুষড়াইয়া পড়েন এবং بসা হইতে দাঁড়াইয়া বাহির হইতে উদ্যত হইলেন, কিন্তু মেরুদণ্ড সোজা করিতে পারিলেন না। তখন তিনি তাঁহার কুছাম নামী এক পুত্রকে ডাকিয়া লইলেন। কুছামের চেহারার কিছুটা রাসূলুল্লাহ (স)-এর সহিত মিল ছিল। কুছامকে সামনে রাখিয়া তিনি নিম্নোক্ত কবিতাটি উচ্চস্বরে আবৃত্তি করিতেছিলেন যাহাতে আল্লাহ্র শত্রুরা তাহাকে ভৎসনা করিতে না পারে।
قُثَمٌ شَبِيهُ ذِي الْأَنْفِ الأَشَمِّ + فَتًى ذِي النَّعَمِ يَزْعَمُ مَنْ زَعَمَ.
"কুছام হইল সুদর্শন নাসিকাসম্পন্ন এমন এক যুবকের সদৃশ যিনি অগণিত নি'মতপ্রাপ্ত, কেবল সুধীজনই তাহাকে চিনিতে ও বুঝিতে পারিবে" (যাদুল মা'আদ, পৃ. ১৪۰)।
'আব্বাস (রা)-এর গৃহের সামনে জনতার ভিড় জমিল। ইহাদের মধ্যে কেহ ছিল মুসলিম, কেহ ছিল মুশরিক, কেহ ছিল আনন্দে আত্মহারা, কেহ ছিল দুঃখ-বিষাদে মৃতপ্রায়। মুসলিমগণ 'আব্বাস (রা)-এর কবিতা আবৃত্তি শুনিয়া উজ্জীবিত হইতে লাগিল এবং কাফিরগণ ভাবিল, 'আব্বাস (রা)-এর নিকট হয়ত এমন সংবাদ পৌছিয়াছে যাহা তাহাদের নিকট আসে নাই। অতঃপর 'আব্বাস (রা) প্রকৃত ঘটনা অবহিত হইবার জন্য স্বীয় ভৃত্যকে হাজ্জাজ (রা)-এর নিকট প্রেরণ করিলেন। হাজ্জাজ ভৃত্যটিকে বলিলেন, আবুল ফাদল কে আমার সালাম দিয়া বলিবে, আমি এখনই তাঁহার নিকট আসিতেছি। তিনি যেন নির্জন স্থানে একা একা কথা বলার ব্যবস্থা করেন। এই খবর শুনিয়া তিনি নিশ্চয় আনন্দিত হইবেন। ভৃত্যটি আসিয়া 'আব্বাস (রা)-কে সুসংবাদ প্রদান করে। এতদশ্রবণে তিনি আনন্দের অনাতিশয্যে বিষাদের সকল যন্ত্রণা ভুলিয়া যান। তিনি শয্যা হইতে উঠিয়া বসেন এবং ললাটে চুম্বন করিয়া তাহাকে আযাদ করিয়া দেন।
অতঃপর হাজ্জাজ (রা) তাঁহার নিকট আগমন করিয়া নিভৃতে তাঁহাকে প্রকৃত ঘটনা সবিস্তারে বর্ণনা করেন। কিন্তু তিনি তাঁহার নিকট হইতে প্রতিশ্রুতি গ্রহণ করেন যে, এই সংবাদ তিন দিনের জন্য কাহারও নিকট প্রকাশ করিবেন না। অতঃপর হাজ্জাজ (রা) বলিলেন, আমি যাহা কিছু বলিয়াছি তাহা সব রাসূলুল্লাহ (স)-এর অনুমতিক্রমেই বলিয়াছি। প্রকৃতপক্ষে রাসূলুল্লাহ (স) খায়বার বিজয় করিয়াছেন এবং ইয়াহুদীদের সম্পত্তি তিনি গনীমত হিসাবে গ্রহণ করিয়াছেন। তিনি সাফিয়্যা بিন্ত হুয়াই (را)-কে বিবাহ করিয়াছেন। আমি শুধু আমার সম্পত্তি উদ্ধার করিবার জন্য আসিয়াছিলাম এবং আমার কার্য সম্পাদনের উদ্দেশ্যে এইরূপ বলিবার জন্য রাসূলুল্লাহ (স)-এর নিকট অনুমতি প্রার্থনা করিয়াছিলাম। তিনি আমাকে অনুমতি প্রদান করিয়াছিলেন। হাজ্জাজ তাঁহার ধন সম্পদ লইয়া চলিয়া গেলেন।
তিনদিন পর আব্বাস (রা) হাজ্জাজের স্ত্রীর (উম্মু শায়বা) নিকট গমন করিয়া বলিলেন, তোমার স্বামী কি করিয়াছে? সে বলিল, তিনি চলিয়া গিয়াছেন। স্ত্রীলোকটি আরও বলিল, হে আবুল ফাদল! আল্লাহ আপনাকে দুঃখ-ভারাক্রান্ত না করুন। আপনার নিকট যেই সংবাদ পৌঁছিয়াছে ইহাতে আমরাও ব্যথিত হইয়াছি। তিনি উত্তরে বলিলেন, হাঁ, আল্লাহ আমাকে বেদনাহত না করুন। আল্লাহরই প্রশংসা, আমি যাহা ভালবাসি তাহা ব্যতীত অন্য কিছুই সংঘটিত হয় নাই। আল্লাহ তাঁহার রাসূলকে খায়বারে বিজয় দান করিয়াছেন। সেখানে যুদ্ধলব্ধ সম্পদের ভাগ-باটোয়ারা চলিতেছে। রাসূলুল্লাহ (স) সেখানে সাফিয়্যাকে তাঁহার নিজের জন্য মনোনীত করিয়াছেন। যদি তোমার স্বামীর সহিত তোমার কোন প্রয়োজন থাকে তাহা হইলে তুমি তাহার সহিত মিলিত হইয়া যাও। স্ত্রীলোকটি বলিল, আল্লাহ্র শপথ! আমার ধারণা হইতেছে আপনি সত্যবাদী। তিনি উত্তর দিলেন, আল্লাহ্র শপথ! আমি সত্যবাদী। তোমাকে যাহা বলিতেছি ঘটনা সেইরূপই ঘটিয়াছে। সে বলিল, আপনাকে এই সংবাদ কে প্রদান করিয়াছে? তিনি বলিলেন, তোমাকে যিনি সংবাদ দিয়াছেন তিনি আমাকে সংবাদ প্রদান করিয়াছেন।
আব্বাস (রা) এখান হইতে রওয়ানা করিয়া কুরায়শদের আসরে গমন করিলেন। তাহারা তাঁহাকে দেখিয়া বলিল, আল্লাহ্ শপথ! হে আবুল ফাদল! ইহাই ধৈর্য ও সহিষ্ণুতার সময়। ইহাতে তোমার কল্যাণ সাধিত হইবে। তিনি উত্তর দিলেন, হাঁ, আমার নিকট শুভ সংবাদ ব্যতীত অন্য কোন সংবাদ পৌঁছায় নাই। সকল প্রশংসা আল্লাহ্রই, হাজ্জাজ আমাকে এইরূপ সংবাদ প্রদান করিয়াছে। সে আমার নিকট তিন দিন পর্যন্ত বিষয়টি কোন কারণে গোপন রাখার আবেদন করিয়াছিল। ইহাতে মুসলমানগণের সকল দুঃখ-বিষাদ দূর হইয়া গেল। পক্ষান্তরে মুশরিকগণের অন্তরে দুঃখ-বেদনা ছায়াপাত করিল (যাদুল মা'আদ, ২খ., পৃ. ১৪۰; আসাহহুস সিয়ার, পৃ. ২০২)।

হাজ্জাজ ইব্‌ন 'ইলাত আস-সুলামী ইসলাম গ্রহণ করিয়াছিলেন এবং খায়বার বিজয়ে অংশগ্রহণ করিয়াছিলেন। তাঁহার স্ত্রী ছিলেন উম্মু শায়বা বিন্ত আবী তালহা যিনি বানু 'আবদিদ দার গোত্রের মহিলা ছিলেন। হাজ্জাজ ইব্‌ন ইলাত একজন ধনাঢ্য ব্যক্তি ছিলেন এবং বানূ সুলায়ম গোত্রের ভূগর্ভস্থ খনিজ দ্রব্যসমূহের মালিক ছিলেন। রাসূলুল্লাহ (স) যখন খায়বারে বিজয় লাভ করিয়াছিলেন তখন তিনি রাসূলুল্লাহ (স)-কে বলিলেন, আমার স্বর্ণরাজি এবং সকল সম্পদ মক্কায় আমার স্ত্রীর নিকট রহিয়াছে। যদি সে আমার ইসলাম গ্রহণ করার কথা শ্রবণ করে তাহা হইলে তাহার নিকট হইতে কিছুই পাওয়া যাইবে না। যদি আপনি অনুমতি দান করেন তাহা হইলে খায়বার বিজয়ের সংবাদ পৌছিবার পূর্বেই আমি যেভাবেই হউক দ্রুত আমার স্ত্রীর নিকট পৌঁছিয়া আমার সম্পদ লইয়া আসিব।
রাসূলুল্লাহ (স) তাহাকে অনুমতি প্রদান করিলে তিনি অত্যন্ত ক্ষিপ্রগতিতে মক্কায় পৌছিয়া স্বীয় স্ত্রীকে বলিলেন, আমার যেই মালামাল তোমার নিকট আছে তাহা কাহাকেও বলিও না। শীঘ্র ইহা আমাকে বাহির করিয়া দাও। খায়বারে মুহাম্মাদ ও তাঁহার বাহিনী পরাজয় বরণ করিয়াছে এবং মুহাম্মাদ নিজেও বন্দী হইয়াছেন। তাঁহার সঙ্গী-সাথিগণ ছত্রভঙ্গ হইয়া গিয়াছে। আমি তাহাদের পরিত্যক্ত সম্পদরাজি খরিদ করিতে চাই। খায়বারবাসিগণ মুহাম্মাদ (স)-কে মক্কাবাসীর হাতে অর্পণ করিবে যাহাতে তাহারা তাঁহাকে হত্যা করিয়া তাহাদের লোক হত্যার প্রতিশোধ গ্রহণ করিতে পারে।
এই সংবাদ দ্রুত মক্কায় ছড়াইয়া পড়ে এবং কাফিরগণ অত্যন্ত আনন্দিত হয়। আর মুসলমানগণের মধ্যে নামিয়া আসে বিষাদের কালো ছায়া। রাসূলুল্লাহ (স)-এর পিতৃব্য 'আব্বাস (রা)-এর নিকট যখন এই দুঃসংবাদ পৌঁছে তখন তিনি বিষাদে একেবারে মুষড়াইয়া পড়েন এবং বসা হইতে দাঁড়াইয়া বাহির হইতে উদ্যত হইলেন, কিন্তু মেরুদণ্ড সোজা করিতে পারিলেন না। তখন তিনি তাঁহার কুছাম নামী এক পুত্রকে ডাকিয়া লইলেন। কুছামের চেহারার কিছুটা রাসূলুল্লাহ (স)-এর সহিত মিল ছিল। কুছামকে সামনে রাখিয়া তিনি নিম্নোক্ত কবিতাটি উচ্চস্বরে আবৃত্তি করিতেছিলেন যাহাতে আল্লাহ্র শত্রুরা তাহাকে ভৎসনা করিতে না পারে।
قُثَمٌ شَبِيهُ ذِي الْأَنْفِ الأَشَمِّ + فَتًى ذِي النَّعَمِ يَزْعَمُ مَنْ زَعَمَ.
"কুছাম হইল সুদর্শন নাসিকাসম্পন্ন এমন এক যুবকের সদৃশ যিনি অগণিত নি'মতপ্রাপ্ত, কেবল সুধীজনই তাহাকে চিনিতে ও বুঝিতে পারিবে" (যাদুল মা'আদ, পৃ. ১৪০)।
'আব্বাস (রা)-এর গৃহের সামনে জনতার ভিড় জমিল। ইহাদের মধ্যে কেহ ছিল মুসলিম, কেহ ছিল মুশরিক, কেহ ছিল আনন্দে আত্মহারা, কেহ ছিল দুঃখ-বিষাদে মৃতপ্রায়। মুসলিমগণ 'আব্বাস (রা)-এর কবিতা আবৃত্তি শুনিয়া উজ্জীবিত হইতে লাগিল এবং কাফিরগণ ভাবিল, 'আব্বাস (রা)-এর নিকট হয়ত এমন সংবাদ পৌছিয়াছে যাহা তাহাদের নিকট আসে নাই। অতঃপর 'আব্বাস (রা) প্রকৃত ঘটনা অবহিত হইবার জন্য স্বীয় ভৃত্যকে হাজ্জাজ (রা)-এর নিকট প্রেরণ করিলেন। হাজ্জাজ ভৃত্যটিকে বলিলেন, আবুল ফাদল কে আমার সালাম দিয়া বলিবে, আমি এখনই তাঁহার নিকট আসিতেছি। তিনি যেন নির্জন স্থানে একা একা কথা বলার ব্যবস্থা করেন। এই খবর শুনিয়া তিনি নিশ্চয় আনন্দিত হইবেন। ভৃত্যটি আসিয়া 'আব্বাস (রা)-কে সুসংবাদ প্রদান করে। এতদশ্রবণে তিনি আনন্দের অনাতিশয্যে বিষাদের সকল যন্ত্রণা ভুলিয়া যান। তিনি শয্যা হইতে উঠিয়া বসেন এবং ললাটে চুম্বন করিয়া তাহাকে আযাদ করিয়া দেন।
অতঃপর হাজ্জাজ (রা) তাঁহার নিকট আগমন করিয়া নিভৃতে তাঁহাকে প্রকৃত ঘটনা সবিস্তারে বর্ণনা করেন। কিন্তু তিনি তাঁহার নিকট হইতে প্রতিশ্রুতি গ্রহণ করেন যে, এই সংবাদ তিন দিনের জন্য কাহারও নিকট প্রকাশ করিবেন না। অতঃপর হাজ্জাজ (রা) বলিলেন, আমি যাহা কিছু বলিয়াছি তাহা সব রাসূলুল্লাহ (স)-এর অনুমতিক্রমেই বলিয়াছি। প্রকৃতপক্ষে রাসূলুল্লাহ (স) খায়বার বিজয় করিয়াছেন এবং ইয়াহুদীদের সম্পত্তি তিনি গনীমত হিসাবে গ্রহণ করিয়াছেন। তিনি সাফিয়্যা বিন্ত হুয়াই (রা)-কে বিবাহ করিয়াছেন। আমি শুধু আমার সম্পত্তি উদ্ধার করিবার জন্য আসিয়াছিলাম এবং আমার কার্য সম্পাদনের উদ্দেশ্যে এইরূপ বলিবার জন্য রাসূলুল্লাহ (স)-এর নিকট অনুমতি প্রার্থনা করিয়াছিলাম। তিনি আমাকে অনুমতি প্রদান করিয়াছিলেন। হাজ্জাজ তাঁহার ধন সম্পদ লইয়া চলিয়া গেলেন।
তিনদিন পর আব্বাস (রা) হাজ্জাজের স্ত্রীর (উম্মু শায়বা) নিকট গমন করিয়া বলিলেন, তোমার স্বামী কি করিয়াছে? সে বলিল, তিনি চলিয়া গিয়াছেন। স্ত্রীলোকটি আরও বলিল, হে আবুল ফাদল! আল্লাহ আপনাকে দুঃখ-ভারাক্রান্ত না করুন। আপনার নিকট যেই সংবাদ পৌঁছিয়াছে ইহাতে আমরাও ব্যথিত হইয়াছি। তিনি উত্তরে বলিলেন, হাঁ, আল্লাহ আমাকে বেদনাহত না করুন। আল্লাহরই প্রশংসা, আমি যাহা ভালবাসি তাহা ব্যতীত অন্য কিছুই সংঘটিত হয় নাই। আল্লাহ তাঁহার রাসূলকে খায়বারে বিজয় দান করিয়াছেন। সেখানে যুদ্ধলব্ধ সম্পদের ভাগ-বাটোয়ারা চলিতেছে। রাসূলুল্লাহ (স) সেখানে সাফিয়্যাকে তাঁহার নিজের জন্য মনোনীত করিয়াছেন। যদি তোমার স্বামীর সহিত তোমার কোন প্রয়োজন থাকে তাহা হইলে তুমি তাহার সহিত মিলিত হইয়া যাও। স্ত্রীলোকটি বলিল, আল্লাহ্র শপথ! আমার ধারণা হইতেছে আপনি সত্যবাদী। তিনি উত্তর দিলেন, আল্লাহ্র শপথ! আমি সত্যবাদী। তোমাকে যাহা বলিতেছি ঘটনা সেইরূপই ঘটিয়াছে। সে বলিল, আপনাকে এই সংবাদ কে প্রদান করিয়াছে? তিনি বলিলেন, তোমাকে যিনি সংবাদ দিয়াছেন তিনি আমাকে সংবাদ প্রদান করিয়াছেন।
আব্বাস (রা) এখান হইতে রওয়ানা করিয়া কুরায়শদের আসরে গমন করিলেন। তাহারা তাঁহাকে দেখিয়া বলিল, আল্লাহ্ শপথ! হে আবুল ফাদল! ইহাই ধৈর্য ও সহিষ্ণুতার সময়। ইহাতে তোমার কল্যাণ সাধিত হইবে। তিনি উত্তর দিলেন, হাঁ, আমার নিকট শুভ সংবাদ ব্যতীত অন্য কোন সংবাদ পৌঁছায় নাই। সকল প্রশংসা আল্লাহ্রই, হাজ্জাজ আমাকে এইরূপ সংবাদ প্রদান করিয়াছে। সে আমার নিকট তিন দিন পর্যন্ত বিষয়টি কোন কারণে গোপন রাখার আবেদন করিয়াছিল। ইহাতে মুসলমানগণের সকল দুঃখ-বিষাদ দূর হইয়া গেল। পক্ষান্তরে মুশরিকগণের অন্তরে দুঃখ-বেদনা ছায়াপাত করিল (যাদুল মা'আদ, ২খ., পৃ. ১৪০; আসাহহুস সিয়ার, পৃ. ২০২)।

📘 সীরাত বিশ্বকোষ > 📄 আবুল ইয়াসারের ঘটনা

📄 আবুল ইয়াসারের ঘটনা


ইবন ইসহাক আবুল ইয়াসার হইতে বর্ণনা করিয়াছেন, তিনি বলেন, আল্লাহ্র শপথ! এক সন্ধ্যায় খায়বারে আমরা রাসূলুল্লাহ (স)-এর নিকট ছিলাম। এমন সময় জনৈক ইয়াহুদীর ছাগলের পাল দুর্গের দিকে যাওয়ার পথে রাসূলুল্লাহ (স)-এর সামনে পড়িল। এই সময় আমরা ইয়াহুদীদিগকে অবরোধ করিয়া রাখিয়াছিলাম। ছাগলগুলিকে দেখিয়া রাসূলুল্লাহ (স) বলিলেন, এই ছাগলগুলি হইতে কে আমাদিগকে আহার করাইবে। আবুল ইয়াসার বলেনঃ আমি বলিলাম, আমি পারিব, হে আল্লাহ্র রাসূল! রাসূলুল্লাহ (স) আমাকে ইহা বাস্তবায়নের আদশ দিলেন। অতঃপর আমি উট পাখির মত দ্রুতবেগে ছুটিলাম। রাসূলুল্লাহ (স) আমাকে দৌঁড়াইতে দেখিয়া বলিলেন, اللهم أمتعنا به (হে আল্লাহ! আমাদিগকে তাহার দ্বারা উপকৃত কর)। আবুল ইয়াসার বলেন, এমন সময় আমি ছাগলগুলির নাগাল পাই যখন পালের প্রথম ছাগল দুর্গের ভিতর ঢুকিয়া পড়িয়াছিল। আমি পালের পিছনের দুইটি ছাগল ধরিয়া বগলদাবা করিয়া এমনভাবে দৌঁড়াইয়া চলিয়া আসিলাম যেন আমার কাছে কিছুই নাই। ছাগল দুইটি আনিয়া রাসূলুল্লাহ (স)-এর খেদমতে পেশ করিলাম। লোকজন তাহা যবেহ করিল এবং সবাই মিলিয়া তাহা ভক্ষণ করিলাম। আবুল ইয়াসার রাসূলুল্লাহ (স)-এর বদরী সাহাবীদের মধ্যে সর্বশেষে ইন্তেকাল করেন (৫৫ হি.)। পরবর্তীতে তিনি এই ঘটনা বর্ণনাকালে কাঁদিতেন (আস-সীরাতুন নাবাবিয়্যা, পৃ. ২৩১)।

ইবন ইসহাক আবুল ইয়াসার হইতে বর্ণনা করিয়াছেন, তিনি বলেন, আল্লাহ্র শপথ! এক সন্ধ্যায় খায়বারে আমরা রাসূলুল্লাহ (স)-এর নিকট ছিলাম। এমন সময় জনৈক ইয়াহুদীর ছাগলের পাল দুর্গের দিকে যাওয়ার পথে রাসূলুল্লাহ (স)-এর সামনে পড়িল। এই সময় আমরা ইয়াহুদীদিগকে অবরোধ করিয়া রাখিয়াছিলাম। ছাগলগুলিকে দেখিয়া রাসূলুল্লাহ (স) বলিলেন, এই ছাগলগুলি হইতে কে আমাদিগকে আহার করাইবে। আবুল ইয়াসার বলেনঃ আমি বলিলাম, আমি পারিব, হে আল্লাহ্র রাসূল! রাসূলুল্লাহ (স) আমাকে ইহা বাস্তবায়নের আদশ দিলেন। অতঃপর আমি উট পাখির মত দ্রুতবেগে ছুটিলাম। রাসূলুল্লাহ (স) আমাকে দৌঁড়াইতে দেখিয়া বলিলেন, اللهم أمتعنا به (হে আল্লাহ! আমাদিগকে তাহার দ্বারা উপকৃত কর)। আবুল ইয়াসার বলেন, এমন সময় আমি ছাগলগুলির নাগাল পাই যখন পালের প্রথম ছাগল দুর্গের ভিতর ঢুকিয়া পড়িয়াছিল। আমি পালের পিছনের দুইটি ছাগল ধরিয়া বগলদাবা করিয়া এমনভাবে দৌঁড়াইয়া চলিয়া আসিলাম যেন আমার কাছে কিছুই নাই। ছাগল দুইটি আনিয়া রাসূলুল্লাহ (স)-এর খেদমতে পেশ করিলাম। লোকজন তাহা যবেহ করিল এবং সবাই মিলিয়া তাহা ভক্ষণ করিলাম। আবুল ইয়াসার রাসূলুল্লাহ (স)-এর বদরী সাহাবীদের মধ্যে সর্বশেষে ইন্তেকাল করেন (৫৫ হি.)। পরবর্তীতে তিনি এই ঘটনা বর্ণনাকালে কাঁদিতেন (আস-সীরাতুন নাবabিয়্যা, পৃ. ২৩১)।

ইবন ইসহাক আবুল ইয়াসার হইতে বর্ণনা করিয়াছেন, তিনি বলেন, আল্লাহ্র শপথ! এক সন্ধ্যায় খায়বারে আমরা রাসূলুল্লাহ (স)-এর নিকট ছিলাম। এমন সময় জনৈক ইয়াহুদীর ছাগলের পাল দুর্গের দিকে যাওয়ার পথে রাসূলুল্লাহ (س)-এর সামনে পড়িল। এই সময় আমরা ইয়াহুদীদিগকে অবরোধ করিয়া রাখিয়াছিলাম। ছাগলগুলিকে দেখিয়া রাসূলুল্লাহ (স) বলিলেন, এই ছাগলগুলি হইতে কে আমাদিগকে আহার করাইবে। আবুল ইয়াসার বলেনঃ আমি বলিলাম, আমি পারিব, হে আল্লাহ্র রাসূল! রাসূলুল্লাহ (স) আমাকে ইহা বাস্তবায়নের আদশ দিলেন। অতঃপর আমি উট পাখির মত দ্রুতবেগে ছুটিলাম। রাসূলুল্লাহ (স) আমাকে দৌঁড়াইতে দেখিয়া বলিলেন, اللهم أمتعنا به (হে আল্লাহ! আমাদিগকে তাহার দ্বারা উপকৃত কর)। আবুল ইয়াসার বলেন, এমন সময় আমি ছাগলগুলির নাগাল পাই যখন পালের প্রথম ছাগল দুর্গের ভিতর ঢুকিয়া পড়িয়াছিল। আমি পালের পিছনের দুইটি ছাগল ধরিয়া বগলদাবা করিয়া এমনভাবে দৌঁড়াইয়া চলিয়া আসিলাম যেন আমার কাছে কিছুই নাই। ছাগল দুইটি আনিয়া রাসূলুল্লাহ (س)-এর খেদমতে পেশ করিলাম। লোকজন তাহা যবেহ করিল এবং সবাই মিলিয়া তাহা ভক্ষণ করিলাম। আবুল ইয়াসার রাসূলুল্লাহ (স)-এর বদরী সাহাবীদের মধ্যে সর্বশেষে ইন্তেকাল করেন (৫৫ হি.)। পরবর্তীতে তিনি এই ঘটনা বর্ণনাকালে কাঁদিতেন (আস-সীরাতুন নাবabিয়্যা, পৃ. ২৩১)।

ইবন ইসহাক আবুল ইয়াসার হইতে বর্ণনা করিয়াছেন, তিনি বলেন, আল্লাহ্র শপথ! এক সন্ধ্যায় খায়বারে আমরা রাসূলুল্লাহ (স)-এর নিকট ছিলাম। এমন সময় জনৈক ইয়াহুদীর ছাগলের পাল দুর্গের দিকে যাওয়ার পথে রাসূলুল্লাহ (স)-এর সামনে পড়িল। এই সময় আমরা ইয়াহুদীদিগকে অবরোধ করিয়া রাখিয়াছিলাম। ছাগলগুলিকে দেখিয়া রাসূলুল্লাহ (স) বলিলেন, এই ছাগলগুলি হইতে কে আমাদিগকে আহার করাইবে। আবুল ইয়াসার বলেনঃ আমি বলিলাম, আমি পারিব, হে আল্লাহ্র রাসূল! রাসূলুল্লাহ (স) আমাকে ইহা বাস্তবায়নের আদশ দিলেন। অতঃপর আমি উট পাখির মত দ্রুতবেগে ছুটিলাম। রাসূলুল্লাহ (স) আমাকে দৌঁড়াইতে দেখিয়া বলিলেন, اللهم أمتعنا به (হে আল্লাহ! আমাদিগকে তাহার দ্বারা উপকৃত কর)। আবুল ইয়াসার বলেন, এমন সময় আমি ছাগলগুলির নাগাল পাই যখন পালের প্রথম ছাগল দুর্গের ভিতর ঢুকিয়া পড়িয়াছিল। আমি পালের পিছনের দুইটি ছাগল ধরিয়া বগলদাবা করিয়া এমনভাবে দৌঁড়াইয়া চলিয়া আসিলাম যেন আমার কাছে কিছুই নাই। ছাগল দুইটি আনিয়া রাসূলুল্লাহ (স)-এর খেদমতে পেশ করিলাম। লোকজন তাহা যবেহ করিল এবং সবাই মিলিয়া তাহা ভক্ষণ করিলাম। আবুল ইয়াসার রাসূলুল্লাহ (স)-এর বদরী সাহাবীদের মধ্যে সর্বশেষে ইন্তেকাল করেন (৫৫ হি.)। পরবর্তীতে তিনি এই ঘটনা বর্ণনাকালে কাঁদিতেন (আস-সীরাতুন নাবাবিয়্যা, পৃ. ২৩১)।

📘 সীরাত বিশ্বকোষ > 📄 খায়বার বিজয় ও কতিপয় ফিকহী বিধান

📄 খায়বার বিজয় ও কতিপয় ফিকহী বিধান


খায়বার যুদ্ধ হইতে কতিপয় ফিকহী বিধান উদ্ভূত হইয়াছে। তন্মধ্যে উল্লেখযোগ্য হইল:
১। মুখাবারা (বর্গা প্রথা): এই যুদ্ধে অনেক ভূখণ্ড বিজিত হইয়াছিল। এই সকল জমি খায়বারবাসীদিগকে ফসলের ভাগের উপর চাষাবাদ করিতে দেওয়া হয়। রাসূলুল্লাহ (স) তাহাদিগকে ফসল উৎপাদনের জন্য বীজ সরবরাহ করিয়াছিলেন বলিয়া কোন রিওয়ায়াত পাওয়া যায় না। প্রকৃতপক্ষে বীজ এবং শ্রম খায়বারবাসিগণই প্রদান করিয়াছিল এবং ভূমি ছিল মুসলমানগণের। ইহা দ্বারা বুঝা গেল যে, বর্গা প্রথায় ভূমির মালিকের বীজ সরবরাহ করা জরুরী নয় (আসাহহুস সিয়ার, পৃ. ২০৪)।
২। ইবন ইসহাক মাকতুল সূত্রে বর্ণনা করিয়াছেন যে, খায়বার যুদ্ধের সময় চারিটি বিষয় নিষিদ্ধ করা হয়। প্রথমত, অন্তঃসত্তা যুদ্ধবন্দী মহিলাদের সাথে সন্তান প্রসব না করা পর্যন্ত সহবাস করা নিষিদ্ধ। দ্বিতীয়ত, গৃহপালিত গাধার গোস্ত ভক্ষণ করা নিষিদ্ধ। তৃতীয়ত, হিংস্র জন্তুর গোস্ত খাওয়া যাইবে না। চতুর্থত, গনীমতের সম্পদ বণ্টিত হইবার পূর্বে বিক্রয় করা যাইবে না।
৩। সহীহ বুখারীতে বর্ণিত আছে, জুবায়র ইবন মুত'ইম (রা) বলেন, আমি এবং উছমান ইব্‌ন আফফান (রা) রাসূলুল্লাহ (স)-এর নিকট আগমন করিয়া বলিলাম, হে আল্লাহ্র রাসূল' আপনি খায়বারের 'খুমুস' অর্থাৎ রক্ষিত এক-পঞ্চমাংশ হইতে বানুল মুত্তালিবকে অংশ দান করিলেন এবং আমাদিগকে দিলেন না। প্রকৃতপক্ষে আপনার সহিত আমাদিগের ও তাহাদিগের একই সম্পর্ক। রাসূলুল্লাহ (স) উত্তরে বলিলেন, বানু হাশিম ও বানুল মুত্তালিব একই মর্যাদার অধিকারী। অন্য রিওয়ায়াতে আছে, রাসূলুল্লাহ (স) বলিলেন, বানু হাশিম ও বানু আবদিল মুত্তালিব সমমর্যাদার অধিকারী। তাহারা আমাদিগকে জাহিলিয়্যা ও ইসলামী যুগে বিচ্ছিন্ন করে নাই। এই কারণে রাসূলুল্লাহ (স) বানু আব্দ শাম্স ও বানু নাওফালকে কিছুই দেন নাই।
ইমাম শাফি'ঈ (র) বলিয়াছেন, বানু মুত্তালিবও বানু হাশিমের সহিত গিরিসংকটে (الشعب) প্রবেশ করিয়াছিল। ইহারা তাহাদিগের সহায়তাকারী ছিলঃ ইসলামী যুগেও, জাহিলিয়্যা যুগেও। ইব্‌ন কাছীর বলেন, আবূ তালিব বানু আব্দ শাম্স ও বানু নাওফালকে নিম্নোক্ত কবিতার মাধ্যমে ভর্ৎসনা করিয়াছিলেন:
جَزَى اللَّهُ عَنَّا عَبْدَ شَمْسٍ وَنَوْفَلاً + عُقُوبَةَ شَرِّ عَاجِلا غَيْرَ أَجِلٍ.
"আল্লাহ আমাদিগের পক্ষ হইতে 'আব্দ শামস ও নাওফালকে তাহাদিগের অপকর্মের প্রতিদান দান করুন অনতিবিলম্বে অতি শীঘ্রই” (আল-বিদায়া ওয়ান-নিহায়া, ২/৪খ., ২০১-২০২)।
৪। ইতোপূর্বে জানা গিয়াছে যে, এই যুদ্ধের জন্য রাসূলুল্লাহ (স) মুহাররাম মাসে অর্থাৎ সপ্তম হিজরীর প্রথমদিকে যাত্রা করিয়াছিলেন। ইহা হইতে জানা গেল যে, নিষিদ্ধ মাসসমূহে যুদ্ধে লিপ্ত হওয়া নিষিদ্ধ নয়। সকলেই এই কথায় একমত যে, যদি কাফিরদিগের পক্ষ হইতে প্রথমে যুদ্ধের সূচনা হয় তাহা হইলে নিষিদ্ধ মাস হইলে মুসলিমদিগের জন্য যুদ্ধে লিপ্ত হওয়া বৈধ। মতবিরোধ শুধু এই বিষয়ে যে, নিষিদ্ধ মাসসমূহে মুসলিমগণের যুদ্ধের সূচনা করা বৈধ কিনা? চারি ইমামের মতানুসারে ইহা বৈধ; পূর্বে নিষিদ্ধ ছিল। এখন তাহা রহিত হইয়া গিয়াছে। কিন্তু ইমাম আতা প্রমুখ ফিকহবিদগণ বলেন, নিষিদ্ধ হওয়ার এই বিধান রহিত হয় নাই। এই মাসসমূহে যুদ্ধ করা হারাম। তবে অধিকাংশ উলামা যেই খায়বার হইতে নিষিদ্ধ মাসে যুদ্ধের বৈধতার যেই দলীল উপস্থাপন করেন তাহা এই কারণে যথার্থ নহে যে, যদিও রাসূলুল্লাহ (স) মুহাররাম মাসের শেষাংশে রওয়ানা করিয়াছিলেন কিন্তু যুদ্ধ সংঘটিত হইয়াছিল সফর মাসে। অবশ্য তাইফের অবরোধের ঘটনা দ্বারা দলীল গ্রহণ করা সঠিক। কারণ তাইফ অবরোধ বিশ দিনেড় ঊর্ধ্বে ছিল এবং শেষ কয়েক দিন যুল-কা'দা মাসের দিবস (আসাহহুস সিয়ার, পৃ. ২০৫)।
এই ব্যাপারে ইবনুল কায়্যিম আল-জাওযিয়‍্যা বলেন, নিষিদ্ধ মাসে যুদ্ধ বৈধ হইবার দলীল খায়বার হইতে বায়'আতুর রিদওয়ান শক্তিশালী। কারণ ইহা যুল-কা'দাতে অনুষ্ঠিত হইয়াছিল। কিন্তু বায়'আতুর রিদওয়ানও প্রকৃত দলীল হইতে পারে না। কারণ রাসূলুল্লাহ (স) যখন উছমান (রা)-এর নিহত হইবার সংবাদ পাইয়াছিলেন তখন তিনি এই বায়'আত গ্রহণ করিয়াছিলেন। অতঃপর আল-জাওযিয়্যা বলেন, খায়বার ও বায়আতুর রিদওয়ান এই দুইটি অভিযান হইতে তাইফ অবরোধের ঘটনা অত্যন্ত শক্তিশালী। কারণ তায়েফে যুদ্ধে রাসূলুল্লাহ (স) শাওয়াল মাসে বাহির হইয়াছিলেন এবং বিশোর্ধ্ব দিবস ইহার অধিবাসিগণকে অবরোধ করিয়া রাখিয়াছিলেন। এই দিনগুলির কিছু অংশ যুল-কা'দা মাসের ছিল। এই দলীলটি শক্তিশালী হইবার কারণ হইল, মক্কা বিজয়ের পর রাসূলুল্লাহ (স) উনিশ দিন সেখানে অবস্থান করিয়াছিলেন। মক্কা বিজয় হইয়াছিল বিশ রামাদান। উনিশ দিন অবস্থানের পর রাসূলুল্লাহ (স) হাওয়াযিনের দিকে শাওওয়াল মাসের বিশ দিন অবশিষ্ট থাকিতে রওয়ানা করিয়াছিলেন। হাওয়াযিন জয় করিয়া ইহার গনীমতসমূহ বণ্টন করিবার পর সেখান হইতে তায়েফে রওয়ানা করিয়াছিলেন। অতঃপর সেখানকার অধিবাসিগণকে বিশের অধিক দিবস অবরোধ করিয়া রাখিয়াছিলেন। ইহা দ্বারা নিশ্চিত প্রতীয়মান হয় যে, অবরোধের কয়েকটি দিবস যুল-কা'দা মাসের দশ দিন। তায়েফ অবরোধ করিয়া রাখিবার পক্ষে যাহারা দৃঢ় মনোভাব পোষণ করিয়াছেন তাহাদিগের ব্যাপারে আক্ষেপ করা ছাড়া উপায় নাই (যাদুল মা'আদ, ২খ., ১৫৭)।
গৃহপালিত গাধার গোস্ত হারাম ঘোষণা ৫। সহীহ সনদ দ্বারা প্রমানিত যে, রাসূলুল্লাহ (স) গৃহপালিত গাধা খায়বার দিবসে হারাম ঘোষণা করিয়াছিলেন। তিনি ইহাও ঘোষণা করিয়াছেন যে, এই গাধা অপবিত্র। সাহাবীগণের কাহারও উক্তি ছিল যে, ভারবাহী জন্তু হইবার কারণে ইহা হারাম হইয়াছিল। আবার কেহ বলিয়াছেন, যত্রতত্র অপবিত্র জিনিস ভক্ষণ করিবার কারণে হারাম ছিল। কিন্তু রাসূলুল্লাহ (স)-এর উক্তি أَنَّهَا رَجْسٌ সর্বাধিক গ্রহণযোগ্য। রাসূলুল্লাহ (স)-এর এই উক্তির আল্লাহ তা'আলার নিম্নোক্ত বাণীর সহিত কোন দ্বন্দু নাই:
قُلْ لَا أَجِدُ فِيْمَا أُوحِيَ إِلَى مُحَرَّمًا عَلَى طاعم يَطْعَمُهُ إِلَّا أَنْ يَكُونَ مَيْتَةً أَوْ دَمًا مَّسْفُوْحًا أَوْ لَحْمَ خِنْزِيرٍ فَإِنَّهُ رِزْسٌ أَوْ فِسْقًا أُهِلَّ لِغَيْرِ اللَّهِ بِهِ.
"বল, আমার প্রতি যে ওহী নাযিল হইয়াছে তাহাতে লোকে যাহা আহার করে তাহার মধ্যে আমি কিছুই হারাম পাই না মড়া, বহমান রক্ত ও শূকরের মাংস ব্যতীত। কেননা এইগুলি অবশ্যই অপবিত্র অথবা যাহা অবৈধ, আল্লাহ ছাড়া অন্যের নামে উৎসর্গের কারণে" (৬:১৪৫)।
কারণ উক্ত আয়াত অবতীর্ণ হইবার সময় ইহাতে বর্ণিত চারিটি জিনিস ব্যতীত অন্য কোন খাদ্যদ্রব্য হারাম ছিল না। আর হারাম বা নিষিদ্ধকরণ প্রক্রিয়াটি ধাপে ধাপে অনুষ্ঠিত হইতেছিল। সুতরাং গৃহপালিত গাধার নিষিদ্ধকরণ প্রক্রিয়াটি ইহার পরে নূতনভাবে ঘোষিত হইয়াছিল। ইহার ব্যাপারে কুরআনে কোন আয়াত নাযিল হয় নাই। রাসূলুল্লাহ (স)-এর এই উক্তিটি আল-কুরআন যাহা বৈধ ঘোষণা করিয়াছে তাহা রদ করিবার জন্য নয়, আল-কুরআনের ব্যাপকতা (عموم)-কে সংকীর্ণ করিবার জন্য তো নয়ই। সুতরাং নাসিখ-মানসূখের প্রশ্ন এখানে অবান্তর (যাদুল মা'আদ, ২খ., ১৪২)। রাসূলুল্লাহ (স) আদেশ করিয়াছিলেন, গাধার গোস্ত ফেলিয়া দাও এবং পাত্রটি ভাঙ্গিয়া ফেল। কিন্তু জনৈক ব্যক্তি আবেদন করিল, হে আল্লাহ্ রাসূল! গোস্ত ফেলিয়া দেওয়া যায় এবং পাত্র ধৌত করা যায়। রাসূলুল্লাহ (স) বলিলেন, আচ্ছা, ধৌত করিয়া লও। প্রথম আদেশ কার্যকরী হইবার পূর্বেই রহিত হইয়া গেল এবং এই কথা অবহিত হওয়া গেল যে, পাত্রের অপবিত্র জিনিস ধৌত করিয়া লইলে পাত্র পবিত্র হইয়া যায় (আসাহহুস সিয়ার, পৃ. ২০৫)।
মুত'আ বিবাহ সংক্রান্ত বিধান মুত'আ বিবাহ হইল নির্দিষ্ট পরিমাণ মোহরানা দিয়া একটি নির্দিষ্ট সময়সীমার জন্য কোন মহিলাকে বিবাহ করা (আসাহহুস সিয়ার, পৃ. ২০৫)। ইহাতে কোন সন্দেহ নাই যে, ইসলামের প্রাথমিক যুগে মুত'আ বিবাহের অনুমতি ছিল। তবে তাহা ছিল একান্ত প্রয়োজনে। যেইভাবে প্রাণ রক্ষার্থে মৃত জন্তু বা শূকরের মাংস খাওয়ার অনুমতি রহিয়াছে, অনুরূপ আত্মসংযমে একান্ত অপারগতায় তৎকালে মুত'আ বিবাহের অনুমতি ছিল। এই প্রসংগে নিম্নোক্ত রিওয়ায়াতটি উল্লেখ করা যাইতে পারে:
قَالَ ابْنُ شِهَابٍ فَأَخْبَرَنِي خَالِدُ بْنُ الْمُهَاجِرِ سَيْفُ اللَّهِ أَنَّهُ بَيْنَا هُوَ جَالِسٌ عِنْدَ رَجُلٍ جَاءَهُ رَجُلٌ فَاسْتَفْتَاهُ فِي الْمُتْعَةِ فَأَمَرَهُ بِهَا فَقَالَ لَهُ ابْنُ أَبِي عَمْرَةَ الْأَنْصَارِيُّ مَهْلاً قَالَ مَا هِيَ وَاللَّهِ لَقَدْ فَعَلْتُ فِي عَهْدِ اِمَامِ الْمُتَّقِينَ قَالَ ابْنُ أَبِي عَمْرَةَ إِنَّهَا كَانَتْ رُخْصَةً فِي أَوَّلِ الْإِسْلَام لِمَنِ اضْطُرَّ إِلَيْهَا كَالمَيْتَةِ وَالدَّمِ وَلَحْمِ الْخِنْزِيرِ ثُمَّ أَحْكَمَ اللَّهُ الدِّيْنَ وَنَهَى عَنْهَا .
"ইব্‌ন শিহাব বলেন, আমাকে খালিদ ইবনুল মুহাজির সায়ফুল্লাহ জানাইয়াছেন যে, তিনি জনৈক লোকের নিকট উপবিষ্ট ছিলেন। এমন সময় ঐ লোকটির নিকট অপর একজন লোক আসিয়া মুত'আ সম্পর্কে তাহার অভিমত জানিতে চাহিল। উপবিষ্ট লোকটি তাহাকে উহার অনুমতি দিল। এই সময় ইব্‌ন আবী আমরা আল-আনসারী (রা) তাহাকে বলিলেন, আচ্ছা একটু থাম। লোকটি বলিল, কি হইয়াছে? আল্লাহর শপথ! আমরা ইহা রাসূলুল্লাহ (স)-এর যুগে করিয়াছি। ইব্‌ন আবী আমরা (রা) বলিলেন, ইসলামের প্রাথমিক যুগে কেহ আত্মসংযমে অপারগ হইয়া গেলে তাহার জন্য মুত'আ করার অনুমতি ছিল, যেমনটি অনুমতি ছিল মৃত জন্তু, রক্ত ও শূকরের মাংস ভক্ষণ করার। অতঃপর আল্লাহ দীনকে সুদৃঢ় ভিত্তির উপর প্রতিষ্ঠিত করিলেন এবং মুত'আকে নিষিদ্ধ করিলেন" (সহীহ মুসলিম, নিকাহ, বাব ৩, নং ৩৪২৯/২৭)।
কায়স বলেন, আমি আবদুল্লাহ ইব্‌ন্ন মাস'উদ (রা)-কে বলিতে শুনিয়াছি: আমরা রাসূলুল্লাহ (স)-এর সহিত যুদ্ধে অংশগ্রহণ করিতাম। আমাদের সঙ্গে স্ত্রীলোক থাকিত না। একদা আমরা বলিলাম, আমরা কি নির্বীর্য হইয়া যাইব না? রাসূলুল্লাহ (স) আমাদিগকে নির্বীর্য হইতে নিষেধ করিলেন। অতঃপর আমাদিগকে বস্ত্রের বিনিময়ে একটি নির্দিষ্ট সময় পর্যন্ত কোন স্ত্রীলোককে বিবাহ করিবার অনুমতি প্রদান করিলেন। অতঃপর আবদুল্লাহ (রা) পাঠ করিলেনঃ "হে ঈমানদারগণ! তোমাদের জন্য যে সকল পবিত্র জিনিস আল্লাহ হালাল করিয়াছেন সেইগুলিকে তোমরা হারাম করিও না। কারণ সীমা লঙ্ঘনকারীদিগকে আল্লাহ ভালবাসেন না" (৫:৮৭ বুখারী, ২খ., ৭৫৯; মুসলিম, ১খ., ৪৫০)।
উক্ত হাদীছে নির্বীর্য হইবার আবেদনও প্রমাণ করে মুত'আ একান্ত অপারগ অবস্থায় বৈধ ছিল।
জাবির ইবন আবদিল্লাহ ও সালামা ইবনুল আকওয়া' (রা) বলেন, قَالَ خَرَجَ عَلَيْنَا مُنَادِى رَسُولِ اللهِ ﷺ فَقَالَ إِنَّ رَسُولَ اللَّهِ ﷺ قَدْ أَذِنَ لَكُمْ أَنْ تَسْتَمْتِعُوا يَعْنِي مُتْعَةَ النِّسَاءِ وَفِي رِوَايَةٍ أَنَّ رَسُولَ اللَّهِ ﷺ أَتَانَا فَأَذِنَ لَنَا فِي المتعة.
"রাসূলুল্লাহ (স)-এর একজন ঘোষক আমাদের নিকট আসিয়া বলিলেন, রাসূলুল্লাহ (স) তোমাদের জন্য মহিলাদের সহিত মুত'আ বিবাহের অনুমতি প্রদান করিয়াছেন। অন্য রিওয়ায়াতে আছে, রাসূলুল্লাহ (স) আমাদের মধ্যে আসিয়া আমাদিগকে মুত'আর অনুমতি প্রদান করিলেন” (মুসলিম, ২খ., ৪৫০)।
জাবির ও সালামা (রা)-এর বর্ণনায় যদিও এই কথার উল্লেখ নাই যে, কোন পটভূমিতে মুত'আর অনুমতি দেওয়া হইয়াছিল, বলা বাহুল্য তাহাও প্রয়োজনের উপর নির্ভরশীল ছিল। কারণ বিশদ রিওয়ায়াতসমূহে প্রয়োজনের কথা উল্লেখ করা হইয়াছে। অবশ্য পরবর্তী কালে মুت'আ বিবাহের এই অনুমতি প্রত্যাহার করিয়া লওয়া এবং বিদ'আতী রাফেযীগণ (শী'আ) ব্যতীত ইসলামের অনুসারী সকলেই এই ব্যাপারে ঐকমত্য পোষণ করিয়াছেন (আসাহহুস সিয়ার, পৃ. ২০৫)। হানাফী মাযহাবের প্রখ্যাত আইন গ্রন্থ হিদায়া-র গ্রন্থকার ইমাম মালিক (র) সম্পর্কে বলেন যে, তিনি মুত'আ বিবাহকে জায়েজ মনে করিতেন। কিন্তু ইমাম মালিক (র)-এর দিকে এইরূপ কথার সংশ্লিষ্টতা সম্পূর্ণ ভুল। হিদায়ার ভাষ্যকার ও অন্যান্য বিশেষজ্ঞগণ পরিষ্কার ভাষায় বলিয়াছেন যে, হিদায়া গ্রন্থকার এই ক্ষেত্রে তথ্যবিভ্রাটের শিকার হইয়াছেন। কিছু কিছু লোক দাবি করেন যে, ইব্‌ন আব্বাস (রা) শেষ জীবন পর্যন্ত মুত'আ বৈধ হইবার অভিমত পোষণ করিতেন। প্রকৃত পক্ষে এই দাবি যথার্থ নয়। কারণ ইমাম তিরমিযী তাঁহার সুনান গ্রন্থে মুত'আ অধ্যায়ে যেই দুইটি হাদীছ বর্ণনা করিয়াছেন তন্মধ্যে দ্বিতীয় হাদীছটি স্বয়ং ইব্‌ন আব্বাস (রা) হইতে বর্ণিত :
عَنِ ابْنِ عَبَّاسٍ قَالَ إِنَّمَا كَانَتِ الْمُتْعَةُ فِي أَوَّلِ الإِسْلَامِ حَتَّى إِذَا نَزَلَتِ الْآيَةُ إِلَّا عَلَى أَزْوَاجِهِمْ أَوْ مَا مَلَكَتْ أَيْمَانُهُمْ قَالَ ابْنُ عَبَّاسٍ فَكُلُّ فَرْجِ سِوَاهُمَا فَهُوَ حَرَامٌ.
"ইব্‌ন আব্বাস (রা) বলেন, মুত'আ ইসলামের প্রাথমিক পর্যায়ে বৈধ ছিল। তবে তাহা আল-কুরআনের আয়াত "একমাত্র তোমাদিগের স্ত্রী ও বাঁদীগণ ব্যতীত” (২৩ঃ ৬) অবতীর্ণ হইবার পূর্ব পর্যন্ত। অতঃপর ইব্‌ন আব্বাস (রা) বলেন, শরী'আতসম্মত স্ত্রী ও বাঁদীগণ ছাড়া অন্য সকলের সঙ্গে যৌন-সম্ভোগ হারাম"।
তবে একথা সমর্থনযোগ্য যে, ইবন 'আব্বাস (রা) তাঁহার জীবনের কিছুকাল পর্যন্ত মুত'আ বিবাহকে বৈধ মনে করিতেন। অতঃপর 'আলী (রা)-এর বুঝানোতে এবং আল-কুরআনের আয়াত إِلَّا عَلَى أَزْوَاجِهِمْ أَوْ مَا مَلَكَتْ أَيْمَانُهُمْ সম্পর্কে অবগত হইয়া তিনি তাঁহার মত প্রত্যাহার করিয়াছেন। 'আলী ইব্‌ন আবী তালিব (রা) ইবন 'আব্বাস (রা)-কে বুঝাইয়াছেন বলিয়া মুসলিমের নিম্নোক্ত রিওয়ায়তে পাওয়া যায় :
عَنْ عَلِيٌّ أَنَّهُ سَمِعَ ابْنَ عَبَّاسٍ يَلِيْنُ فِي مُتْعَةِ النِّسَاءِ فَقَالَ مَهْلاً يَا ابْنَ عَبَّاسِ فَإِنَّ رَسُولَ اللَّهِ ﷺ نَهَى عَنْهَا يَوْمَ خَيْبَرَ وَعَنْ لُحُومِ الْحُمُرِ الْإِنْسِيَّةِ.
"আলী (রা) হইতে বর্ণিত। তিনি ইব্‌ন্ন 'আব্বাস (রা) সম্পর্কে শুনিতে পাইলেন যে, তিনি মুত'আ বিবাহ সম্পর্কে নমনীয় মনোভাব পোষণ করেন। 'আলী (রা) বলিলেন, হে আব্বাস পুত্র! এই মনোভাব পরিহার কর। কারণ রাসূলুল্লাহ (স) খায়বার দিবসে মুত'আ ও গৃহপালিত গাধার গোস্ত নিষিদ্ধ করিয়াছেন" (মুসলিম, ১খ., ৪৫২)।
মুফতী শফী (র) বিস্ময় প্রকাশ করিয়া বলেন, শী'আগণ 'আলী (রা)-এর সহিত ভালবাসা ও তাঁহার অনুসারী হইবার দাবি করা সত্ত্বেও আশ্চর্য ব্যাপার হইল যে, তাহারা মুত'আ বৈধ হইবার অভিমত পোষণ করে। কিন্তু এই মাসআলায় 'আলী (রা) যে তাহাদিগের মতের বিপরীত মনোভাব পোষণ করেন, এই সম্পর্কে তাহারা কি অবহিত নহে (মাআরিফুল কুরআন, ২খ., ৫ম অংশ, পৃ. ১৮)!

খায়বার যুদ্ধ হইতে কতিপয় ফিকহী বিধান উদ্ভূত হইয়াছে। তন্মধ্যে উল্লেখযোগ্য হইল:
১। মুখাবারা (বর্গা প্রথা): এই যুদ্ধে অনেক ভূখণ্ড বিজিত হইয়াছিল। এই সকল জমি খায়বারবাসীদিগকে ফসলের ভাগের উপর চাষাবাদ করিতে দেওয়া হয়। রাসূলুল্লাহ (স) তাহাদিগকে ফসল উৎপাদনের জন্য বীজ সরবরাহ করিয়াছিলেন বলিয়া কোন রিওয়ায়াত পাওয়া যায় না। প্রকৃতপক্ষে বীজ এবং শ্রম খায়বারবাসিগণই প্রদান করিয়াছিল এবং ভূমি ছিল মুসলমানগণের। ইহা দ্বারা বুঝা গেল যে, বর্গা প্রথায় ভূমির মালিকের বীজ সরবরাহ করা জরুরী নয় (আসাহহুস সিয়ার, পৃ. ২০৪)।
২। ইবন ইসহাক মাকতুল সূত্রে বর্ণনা করিয়াছেন যে, খায়বার যুদ্ধের সময় চারিটি বিষয় নিষিদ্ধ করা হয়। প্রথমত, অন্তঃসত্তা যুদ্ধবন্দী মহিলাদের সাথে সন্তান প্রসব না করা পর্যন্ত সহবাস করা নিষিদ্ধ। দ্বিতীয়ত, গৃহপালিত গাধার গোস্ত ভক্ষণ করা নিষিদ্ধ। তৃতীয়ত, হিংস্র জন্তুর গোস্ত খাওয়া যাইবে না। চতুর্থত, গনীমতের সম্পদ বণ্টিত হইবার পূর্বে বিক্রয় করা যাইবে না।

খায়বার যুদ্ধ হইতে কতিপয় ফিকহী বিধান উদ্ভূত হইয়াছে। তন্মধ্যে উল্লেখযোগ্য হইল:
১। মুখাবারা (বর্গা প্রথা): এই যুদ্ধে অনেক ভূখণ্ড বিজিত হইয়াছিল। এই সকল জমি খায়বারবাসীদিগকে ফসলের ভাগের উপর চাষাবাদ করিতে দেওয়া হয়। রাসূলুল্লাহ (স) তাহাদিগকে ফসল উৎপাদনের জন্য বীজ সরবরাহ করিয়াছিলেন বলিয়া কোন রিওয়ায়াত পাওয়া যায় না। প্রকৃতপক্ষে বীজ এবং শ্রম খায়বারবাসিগণই প্রদান করিয়াছিল এবং ভূমি ছিল মুসলমানগণের। ইহা দ্বারা বুঝা গেল যে, بর্গা প্রথায় ভূমির মালিকের বীজ সরবরাহ করা জরুরী নয় (আসাহহুস সিয়ার, পৃ. ২০৪)।
২। ইবন ইসহাক মাকতুল সূত্রে বর্ণনা করিয়াছেন যে, খায়বার যুদ্ধের সময় চারিটি বিষয় নিষিদ্ধ করা হয়। প্রথমত, অন্তঃসত্তা যুদ্ধবন্দী মহিলাদের সাথে সন্তান প্রসব না করা পর্যন্ত সহবাস করা নিষিদ্ধ। দ্বিতীয়ত, গৃহপালিত গাধার গোস্ত ভক্ষণ করা নিষিদ্ধ। তৃতীয়ত, হিংস্র জন্তুর গোস্ত খাওয়া যাইবে না। চতুর্থত, গনীমতের সম্পদ বণ্টিত হইবার পূর্বে বিক্রয় করা যাইবে না।

খায়বার যুদ্ধ হইতে কতিপয় ফিকহী বিধান উদ্ভূত হইয়াছে। তন্মধ্যে উল্লেখযোগ্য হইল:
১। মুখাবারা (বর্গা প্রথা): এই যুদ্ধে অনেক ভূখণ্ড বিজিত হইয়াছিল। এই সকল জমি খায়বারবাসীদিগকে ফসলের ভাগের উপর চাষাবাদ করিতে দেওয়া হয়। রাসূলুল্লাহ (স) তাহাদিগকে ফসল উৎপাদনের জন্য বীজ সরবরাহ করিয়াছিলেন বলিয়া কোন রিওয়ায়াত পাওয়া যায় না। প্রকৃতপক্ষে বীজ এবং শ্রম খায়বারবাসিগণই প্রদান করিয়াছিল এবং ভূমি ছিল মুসলমানগণের। ইহা দ্বারা বুঝা গেল যে, বর্গা প্রথায় ভূমির মালিকের বীজ সরবরাহ করা জরুরী নয় (আসাহহুস সিয়ার, পৃ. ২০৪)।
২। ইবন ইসহাক মাকতুল সূত্রে বর্ণনা করিয়াছেন যে, খায়বার যুদ্ধের সময় চারিটি বিষয় নিষিদ্ধ করা হয়। প্রথমত, অন্তঃসত্তা যুদ্ধবন্দী মহিলাদের সাথে সন্তান প্রসব না করা পর্যন্ত সহবাস করা নিষিদ্ধ। দ্বিতীয়ত, গৃহপালিত গাধার গোস্ত ভক্ষণ করা নিষিদ্ধ। তৃতীয়ত, হিংস্র জন্তুর গোস্ত খাওয়া যাইবে না। চতুর্থত, গনীমতের সম্পদ বণ্টিত হইবার পূর্বে বিক্রয় করা যাইবে না।

লিঙ্ক শেয়ার করুন
close

লিঙ্ক কপি করুন

0:00
0:00