📘 সীরাত বিশ্বকোষ > 📄 সাফিয়‍্যা (রা)-এর স্বপ্ন

📄 সাফিয়‍্যা (রা)-এর স্বপ্ন


সাফিয়্যা (রা)-এর মুখমণ্ডলে একটি নীল দাগ ছিল। ইহার কারণ তিনি নিজেই বর্ণনা করিয়াছেন। তিনি বলেন, কিছুদিন পূর্বে আমি একটি স্বপ্ন দেখিয়াছিলাম। আমি দেখিলাম, চাঁদ আমার কোলে। এই স্বপ্ন আমি আমার তৎকালীন স্বামী কিনানাকে অবহিত করিলাম। তিনি আমাকে প্রচণ্ডভাবে চপেটাঘাত করিয়া বলিলেন, তুমি তো মদীনার বাদশাহের প্রতি আসক্ত হইয়া পড়িয়াছ (আর-রাওদুল উনুফ, ৪খ., পৃ. ৪৩)। রাসূলুল্লাহ (স)-এর নিকট এই ঘটনার বিবরণ দিতে গিয়া সাফিয়‍্যা (রা) বলিলেন, হে আল্লাহ্র রাসূল! প্রকৃতপক্ষে আপনার সম্পর্কে আমার কিছুই জানা ছিল না।
তাঁহাকে উম্মাহাতুল মু'মিনীনের অন্তর্ভুক্ত করা হয়। ফিরিবার সময় আস-সাহ্বা' নামক স্থানে তাঁহাদের বাসর অনুষ্ঠিত হয়। তথায় রাসূলুল্লাহ (স) তিনদিন অবস্থান করেন। সেই রজনীতে কোন পূর্ব-সংকেত ব্যতিরেকে আবূ আয়্যুব আনসারী (রা) সমগ্র রাত পাহারা প্রদান করেন। প্রত্যূষে রাসূলুল্লাহ (স) তাহাকে এই অবস্থায় দেখিয়া জিজ্ঞাসা করিলেন, কেন এমন করিলে? তিনি জবাব দিলেন, হে আল্লাহ্র রাসূল! আমার আশংকা ছিল যে, এই মহিলার পিতা, ভ্রাতা, স্বামী সকলেই এই যুদ্ধে নিহত হইয়াছে। সুতরাং পিছনে সে যে কোন অনিষ্ট না করিয়া বসে। ইহা শুনিয়া রাসূলুল্লাহ (স) মৃদু হাসিলেন এবং তাহার জন্য দু'আ করিলেন (আসাহহুস সিয়ার, পৃ. ১৯৩, ১৯৪)।
হযরত সাফিয়্যা (রা)-এর সহিত রাসূলুল্লাহ (স)-এর বিবাহের ওয়ালীমা ও সাফিয়্যার হিজাব (পর্দা) সম্পর্কে বুখারী শরীফে নিম্নোক্ত হাদীছ বর্ণিত হইয়াছে:
حَدَّثَنَا سَعِيدُ بْنُ مَرْيَمَ قَالَ أَخْبَرَنَا مُحَمَّدُ بْنُ جَعْفَرِ بْنِ أَبِي كَثِيرٍ قَالَ أَخْبَرَنِي حُمَيْدٌ أَنَّهُ سَمِعَ أَنَسًا يَقُولُ أَقَامَ النَّبِيُّ ﷺ بَيْنَ خَيْبَرَ وَالْمَدِينَةَ ثَلَثَةَ لَيَالٍ يُبَنِّى عَلَيْهَا بِصَفِيَّةَ فَدَعَوْتُ الْمُسْلِمِينَ إِلَى وَلِيْمَتِهِ وَمَا كَانَ فِيهَا مِنْ خُبْزٍ وَلَا لَحْمِ وَمَا كَانَ فِيهَا إِلَّا أَنْ أَمَرَ بلالاً بالأَنْطَاعِ فَبُسِطَتْ فَالْقَى عَلَيْهَا الثَّمَرَ وَالأَقطَ وَالسَّمَنَ فَقَالَ الْمُسْلِمُونَ إِحْدَى أُمَّهَاتِ الْمُؤْمِنِينَ أَوْ مَا مَلَكَتْ يَمِينُهُ قَالُوا إِنْ حَجَبَهَا فَهِيَ إِحْدَى أُمَّهَاتِ الْمُؤْمِنِينَ فَإِنْ لَمْ يَحْجُبُهَا فَهِيَ مِمَّا مَلَكَتْ يَمِينُهُ فَلَمَّا ارْتَحَلَ وَطَأَ لَهَا خَلْفَهُ وَمَدَّ الْحِجَابَ.
"হুমায়দ বলেন, আমি আনাস (রা)-কে বলিতে শুনিয়াছি, রাসূলুল্লাহ (স) খায়বার ও মদীনার মধ্যবর্তী স্থানে তিন রাত অবস্থান করিয়াছিলেন। এই সময় তিনি সাফিয়্যা (রা)-এর সহিত মিলিত হইয়াছিলেন। অতঃপর আমি মুসলমানদেরকে ওয়ালীমা-র জন্য দাওয়াত করিলাম। ওয়ালীমাতে রুটি ও গোশত ছিল না। বিলাল (রা)-কে দস্তরখান বিছানোর আদেশ করা ছাড়া ইহাতে অন্য কিছু ছিল না। আদেশ অনুযায়ী দস্তরখান বিছানোর পর ইহাতে শুকনা খেজুর, পনির ও ঘি ঢালা হইয়াছিল। অতঃপর মুসলমানগণ বলিতে লাগিলেন, তিনি কি উম্মুল মু'মিনীনের একজন, না কি বাঁদী। তাহারা বলিলেন, যদি রাসূলুল্লাহ (স) তাঁহাকে পর্দার অন্তরালে রাখেন তাহা হইলে তিনি উম্মত জননীগণের একজন, আর যদি তাঁহাকে পর্দার অন্তরালে না ঢাকেন তাহা হইলে তিনি তাঁহার একজন বাঁদী। ইহার পর রাসূলুল্লাহ (স) রওয়ানা করিলে সাফিয়্যা (রা)-এর জন্য তাঁহার সওয়ারীর পিছনে বসিবার স্থান ঠিক করিলেন এবং তাঁহার জন্য পর্দা টানাইলেন" (বুখারী, কিতাবুল মাগাযী, বাব গাওয়া খায়বার, ২খ., পৃ. ৬০৬; আসাহহুস সিয়ার, পৃ. ১১৪)।
বুখারীর এক রিওয়ায়াত নিম্নরূপ:
عَنْ أَنَسِ بْنِ مَالِكَ أَنَّ رَسُولَ اللهِ اللهِ عَزَا خَيْبَرَ فَصَلَّيْنَا عِنْدَهَا صَلوةَ الْغَدَاةِ بِغَلَس فَرَكِبَ النَّبِيِّ ﷺ وَرَكِبَ أَبُو طَلْحَةَ وَأَنَا رَدِيفُ أَبِي طَلْحَةَ فَأَجْرِى نَبِيُّ اللَّهِ ﷺ فِي زُقَاقِ خَيْبَرَ وَأَنَّ رَكْبَتَى لَتَمَسُ فَخِذَ نَبِيُّ اللَّهِ اللهِ ثُمَّ حَسَرَ الإِزارِ عَنْ فَخِذِهِ حَتَّى أَنِّي أَنْظُرُ إِلى بِيَاضِ فَخِذِ نَبِيُّ اللَّهِ ﷺ فَلَمَّا دَخَلَ الْقَرْيَةَ قَالَ اللهُ أَكْبَرُ خَرِبَتْ خَيْبَرُ إِنَّا إِذَا نَزَلْنَا بِسَاحَةِ قَوْمٍ فَسَاءَ صَبَاحُ الْمُنْذِرِينَ قَالَهَا ثَلثًا قَالَ وَخَرَجَ الْقَوْمُ إِلى أَعْمَالِهِمْ فَقَالُوا مُحَمَّدٌ قَالَ عَبْدُ الْعَزِيزِ وَقَالَ بَعْضُ أَصْحَابِنَا وَالْخَمِيسَ يَعْنِيُّ الْجَيْشِ قَالَ فَأَصَبْنَاهَا عَنَوَةً فَجُمِعَ السَّبِيُّ فَجَاءَ دِحْيَةٌ فَقَالَ يَانَبِيُّ اللهِ أَعْطَنِي جَارِيَةً مِنَ السَّبِي فَقَالَ اذْهَبْ فَخُذْ جَارِيَةً فَأَخَذَ صَفِيَّةَ بِنْتَ حُيَى فَجَاءَ رَجُلٌ إِلَى النَّبِيُّ ﷺ فَقَالَ يَا نَبِيُّ اللَّهِ أَعْطَيْتَ دِحْيَةَ صَفِيَّةَ
بِنْتَ حُيَى سَيِّدَةَ قُرَيْظَةَ وَالنَّضِيرَ لَا تَصْلُحُ إِلا لَكَ قَالَ أَدْعُوهُ بِهَا فَجَاءَ بِهَا فَلَمَّا نَظَرَ إِلَيْهَا النَّبِيُّ ﷺ قَالَ خُذْ جَارِيَّةً مِنَ السَّبِي غَيْرَهَا قَالَ فَاعْتَقَهَا النَّبِيُّ ﷺ وَتَزَوجَهَا فَقَالَ لَهُ ثَابِتُ يَا أَبَا حَمْزَةً مَا أَصْدَقَهَا قَالَ نَفْسًا اَعْتَقَهَا وَتَزَوجَهَا حَتَّى إِذَا كَانَ بِالطَّرِيقِ.
বুখারীতে ওয়ালীমা সম্পর্কিত একটি বর্ণনায় উল্লেখ আছে:
فَأَصْبَحَ النَّبِيُّ ﷺ عَرُوسًا فَقَالَ مَنْ كَانَ عِنْدَهُ شَيْءٌ فَلْيَجِيْ بِهِ وَبَسَطَ نِطْعًا فَجَعَلَ الرَّجُلُ يَجِئُ بِالتَّمْرِ وَجَعَلَ الرَّجُلُ يَجِيُّ بِالسَّمَنِ قَالَ وَأَحْسِبُهُ قَدْ ذَكَرَ السَّوِيقَ قَالَ فَحَاسُوا حَيْسًا فَكَانَتْ وَلِيْمَةُ رَسُولِ الله ﷺ (صحيح البخاري مجلد ١ : ٤-٥٣ كتاب الصلوة باب ما يذكر في الفخذ).
"অতঃপর রাসূলুল্লাহ (স) সফররত অবস্থাতেই উম্মু সুলায়ম (রা) সাফিয়্যা (রা)-এর জন্য রাত্রিকালে রাসূলুল্লাহ (স)-এর সহিত বাসরের ব্যবস্থা করিয়াছিলেন। সকালে সকলকে রাসূলুল্লাহ (স) বলিলেন, যাহার নিকট যাহা আছে তাহা লইয়া আস। তিনি চামড়ার খাঞ্চা বিছাইয়া দিলেন। কেহ লইয়া আসিল শুকনা খেজুর, কেহ আনিল ঘি। বর্ণনাকারী বলেন, আমার মনে হয় ছাতু আনার কথাও উল্লেখ আছে। সবাই মিলিয়া তাহা দিয়া হায়স (ছাতু ও ঘি মিশ্রিত খাদ্য) তৈরী করিলেন। ইহাই ছিল রাসূলুল্লাহ (স)-এর ওয়ালীমা” (বুখারী, কিতাবুস সালাত, বাব মা যুযকারু ফি'ল-ফাখিয, ১খ., ৫৩-৫৪)।
সুনানে আবী দাউদের ভাষ্যকার 'আল্লামা মাযিরী বলিয়াছেন রাসূলুল্লাহ (স) সাফিয়্যা (রা)-কে দিহয়া (রা)-এর নিকট হইতে ফেরত লইয়া নিজে বিবাহ করিলেন। কারণ:
لِمَا فِيْهِ مِنْ انْتِهَالِهَا مَعَ مَرْتَبَتِهَا وَكَوْنِهَا بِنْتَ سَيِّدِهِمْ
"তিনি ছিলেন উচ্চমর্যাদাসম্পন্ন এবং ইয়াহূদী নেতার মেয়ে। এইজন্য তাঁহার অন্য কাহারও নিকট থাকা সমীচীন ছিল মা" (শিবলী নু'মানী ও সুলায়মান নাদবী, সীরাতুন নবী, ১খ., ২৮৪)।
ইবন হাজার আল-'আসকালানী বলেন, ইবন ইসহাকের মতে সাফিয়্যা (রা)-কে কামূস দুর্গ হইতে বন্দী করা হইয়াছিল। সাফিয়্যা (রা) ছিলেন কিনানা ইন্ন আবিল হুকায়কের স্ত্রী। তাঁহার সহিত তাঁহার চাচাতো ভগ্নিকে বন্দী করা হইয়াছিল। ভিন্নমতে তাঁহার স্বামীর চাচাত ভগ্নি বন্দী হইয়াছিল। সুহায়লী বলেন, খায়বারের গনীমত ভাগ করিবার পূর্বে দিহয়া (রা)-এর নিকট হইতে সাফিয়্যা (রা)-কে ফেরত লওয়া হইয়াছিল। সাফিয়্যা (রা)-এর পরিবর্তে দিহয়া (রা)-কে রাসূলুল্লাহ (স) যাহা দিয়াছিলেন তাহা বিনিময় হিসাবে নয়, অনুগ্রহ হিসাবে (ফাতহুল বারী, ৭খ., ৪৮০)।
সাফিয়্যা (রা) মহানবী (স)-এর পরিণীতা হইবার আরও একটি যুক্তি হইল, তিনি পিতা ও স্বামী উভয়ের পক্ষ হইতে রাজকীয় পরিবেশে জীবন যাপনের পর যখন পিতৃহারা ও স্বামীহারা হইয়া চরমভাবে অসহায় হইয়া পড়িলেন, এমতাবস্থায় তাঁহার বংশ মর্যাদা রক্ষার্থে এবং স্বজন হারানোর বেদনা দূর করিতে ইহা ছাড়া গত্যন্তর ছিল না। তিনি বাঁদী হিসাবেই রাসূলুল্লাহ (স)-এর নিকট থাকিতে পারিতেন। কিন্তু রাসূলুল্লাহ (স) তাহা করেন নাই। তাঁহার সামাজিক মর্যাদার প্রতি লক্ষ্য করিয়া তিনি তাঁহাকে আযাদ করিয়া দিলেন। অতঃপর তাঁহাকে নিজ স্ত্রী হিসাবে বরণ করিয়া লইলেন।
মুসনাদে আহমাদে বর্ণিত আছে (মিসর, ৩খ., ১৩৮), রাসূলুল্লাহ (স) সাফিয়‍্যা (রা)-কে দুইটি জিনিসের যে কোন একটি গ্রহণের অনুমতি প্রদান করিয়াছিলেন: হয় তিনি আযাদ হইয়া নিজ গৃহে চলিয়া যাইবেন অথবা তাঁহার সহিত বিবাহ বন্ধনে আবদ্ধ হইবেন। তিনি রাসূলুল্লাহ (স)-এর বিবাহে আবদ্ধ হইবার পন্থাটি স্বেচ্ছায় গ্রহণ করিয়াছিলেন। করুণা ও সদ্ব্যবহার ছাড়াও ইহা রাজনৈতিক ও ধর্মীয় দৃষ্টিকোণ হইতেও অত্যন্ত তাৎপর্যপূর্ণ ছিল। এই আচরণের ফলেই আরববাসীদের ইসলামের প্রতি আগ্রহ বৃদ্ধি পাইতেছিল। ইসলাম তাহার শত্রুদিগের পরিবার-পরিজনের সহিতও কতই না উত্তম আচরণ করে (শিবলী নু'মানী ও সুলায়মান নাদবী, সীরাতুন-নবী, ১খ., ২৮৪)।

সাফিয়্যা (রা)-এর মুখমণ্ডলে একটি নীল দাগ ছিল। ইহার কারণ তিনি নিজেই বর্ণনা করিয়াছেন। তিনি বলেন, কিছুদিন পূর্বে আমি একটি স্বপ্ন দেখিয়াছিলাম। আমি দেখিলাম, চাঁদ আমার কোলে। এই স্বপ্ন আমি আমার তৎকালীন স্বামী কিনানাকে অবহিত করিলাম। তিনি আমাকে প্রচণ্ডভাবে চপেটাঘাত করিয়া বলিলেন, তুমি তো মদীনার বাদশাহের প্রতি আসক্ত হইয়া পড়িয়াছ (আর-রাওদুল উনুফ, ৪খ., পৃ. ৪৩)। রাসূলুল্লাহ (স)-এর নিকট এই ঘটনার বিবরণ দিতে গিয়া সাফিয়‍্যা (রা) বলিলেন, হে আল্লাহ্র রাসূল! প্রকৃতপক্ষে আপনার সম্পর্কে আমার কিছুই জানা ছিল না।
তাঁহাকে উম্মাহাতুল মু'মিনীনের অন্তর্ভুক্ত করা হয়। ফিরিবার সময় আস-সাহ্বা' নামক স্থানে তাঁহাদের বাসর অনুষ্ঠিত হয়। তথায় রাসূলুল্লাহ (স) তিনদিন অবস্থান করেন। সেই রজনীতে কোন পূর্ব-সংকেত ব্যতিরেকে আবূ আয়্যুব আনসারী (রা) সমগ্র রাত পাহারা প্রদান করেন। প্রত্যূষে রাসূলুল্লাহ (স) তাহাকে এই অবস্থায় দেখিয়া জিজ্ঞাসা করিলেন, কেন এমন করিলে? তিনি জবাব দিলেন, হে আল্লাহ্র রাসূল! আমার আশংকা ছিল যে, এই মহিলার পিতা, ভ্রাতা, স্বামী সকলেই এই যুদ্ধে নিহত হইয়াছে। সুতরাং পিছনে সে যে কোন অনিষ্ট না করিয়া বসে। ইহা শুনিয়া রাসূলুল্লাহ (স) মৃদু হাসিলেন এবং তাহার জন্য দু'আ করিলেন (আসাহহুস সিয়ার, পৃ. ১৯৩, ১৯৪)।
হযরত সাফিয়্যা (রা)-এর সহিত রাসূলুল্লাহ (স)-এর বিবাহের ওয়ালীমা ও সাফিয়্যার হিজাব (পর্দা) সম্পর্কে বুখারী শরীফে নিম্নোক্ত হাদীছ বর্ণিত হইয়াছে:
حَدَّثَنَا سَعِيدُ بْنُ مَرْيَمَ قَالَ أَخْبَرَنَا مُحَمَّدُ بْنُ جَعْفَرِ بْنِ أَبِي كَثِيرٍ قَالَ أَخْبَرَنِي حُمَيْدٌ أَنَّهُ سَمِعَ أَنَسًا يَقُولُ أَقَامَ النَّبِيُّ ﷺ بَيْنَ خَيْبَرَ وَالْمَدِينَةَ ثَلثَةَ لَيَالٍ يُبَنِّى عَلَيْهَا بِصَفِيَّةَ فَدَعَوْتُ الْمُسْلِمِينَ إِلَى وَلِيْمَتِهِ وَمَا كَانَ فِيهَا مِنْ خُبْزٍ وَلَا لَحْمِ وَمَا كَانَ فِيهَا إِلَّا أَنْ أَمَرَ بلالاً بالأَنْطَاعِ فَبُسِطَتْ فَالْقَى عَلَيْهَا الثَّمَرَ وَالأَقطَ وَالسَّمَنَ فَقَالَ الْمُسْلِمُونَ إِحْدَى أُمَّهَاتِ الْمُؤْمِنِينَ أَوْ مَا مَلَكَتْ يَمِينُهُ قَالُوا إِنْ حَجَبَهَا فَهِيَ إِحْدَى أُمَّهَاتِ الْمُؤْمِنِينَ فَإِنْ لَمْ يَحْجُبُهَا فَهِيَ مِمَّا مَلَكَتْ يَمِينُهُ فَلَمَّا ارْتَحَلَ وَطَأَ لَهَا خَلْفَهُ وَمَدَّ الْحِجَابَ.
"হুমায়দ বলেন, আমি আনাস (রা)-কে বলিতে শুনিয়াছি, রাসূলুল্লাহ (স) খায়বার ও মদীনার মধ্যবর্তী স্থানে তিন রাত অবস্থান করিয়াছিলেন। এই সময় তিনি সাফিয়্যা (রা)-এর সহিত মিলিত হইয়াছিলেন। অতঃপর আমি মুসলমানদেরকে ওয়ালীমা-র জন্য দাওয়াত করিলাম। ওয়ালীমাতে রুটি ও গোশত ছিল না। বিলাল (রা)-কে দস্তরখান বিছানোর আদেশ করা ছাড়া ইহাতে অন্য কিছু ছিল না। আদেশ অনুযায়ী দস্তরখান বিছানোর পর ইহাতে শুকনা খেজুর, পনির ও ঘি ঢালা হইয়াছিল। অতঃপর মুসলমানগণ বলিতে লাগিলেন, তিনি কি উম্মুল মু'মিনীনের একজন, না কি বাঁদী। তাহারা বলিলেন, যদি রাসূলুল্লাহ (স) তাঁহাকে পর্দার অন্তরালে রাখেন তাহা হইলে তিনি উম্মত জননীগণের একজন, আর যদি তাঁহাকে পর্দার অন্তরালে না ঢাকেন তাহা হইলে তিনি তাঁহার একজন বাঁদী। ইহার পর রাসূলুল্লাহ (স) রওয়ানা করিলে সাফিয়্যা (রা)-এর জন্য তাঁহার সওয়ারীর পিছনে বসিবার স্থান ঠিক করিলেন এবং তাঁহার জন্য পর্দা টানাইলেন" (বুখারী, কিতাবুল মাগাযী, বাব গাওয়া খায়বার, ২খ., পৃ. ৬০৬; আসাহহুস সিয়ার, পৃ. ১১৪)।

সাফিয়্যা (রা)-এর মুখমণ্ডলে একটি নীল দাগ ছিল। ইহার কারণ তিনি নিজেই বর্ণনা করিয়াছেন। তিনি বলেন, কিছুদিন পূর্বে আমি একটি স্বপ্ন দেখিয়াছিলাম। আমি দেখিলাম, চাঁদ আমার কোলে। এই স্বপ্ন আমি আমার তৎকালীন স্বামী কিনানাকে অবহিত করিলাম। তিনি আমাকে প্রচণ্ডভাবে চপেটাঘাত করিয়া বলিলেন, তুমি তো মদীনার বাদশাহের প্রতি আসক্ত হইয়া পড়িয়াছ (আর-রাওদুল উনুফ, ৪খ., পৃ. ৪৩)। রাসূলুল্লাহ (س)-এর নিকট এই ঘটনার বিবরণ দিতে গিয়া সাফিয়‍্যা (রা) বলিলেন, হে আল্লাহ্র রাসূল! প্রকৃতপক্ষে আপনার সম্পর্কে আমার কিছুই জানা ছিল না।
তাঁহাকে উম্মাহাতুল মু'মিনীনের অন্তর্ভুক্ত করা হয়। ফিরিবার সময় আস-সাহ্বা' নামক স্থানে তাঁহাদের বাসর অনুষ্ঠিত হয়। তথায় রাসূলুল্লাহ (স) তিনদিন অবস্থান করেন। সেই রজনীতে কোন পূর্ব-সংকেত ব্যতিরেকে আবূ আয়্যুব আনসারী (রা) সমগ্র রাত পাহারা প্রদান করেন। প্রত্যূষে রাসূলুল্লাহ (স) তাহাকে এই অবস্থায় দেখিয়া জিজ্ঞাসা করিলেন, কেন এমন করিলে? তিনি জবাব দিলেন, হে আল্লাহ্র রাসূল! আমার আশংকা ছিল যে, এই মহিলার পিতা, ভ্রাতা, স্বামী সকলেই এই যুদ্ধে নিহত হইয়াছে। সুতরাং পিছনে সে যে কোন অনিষ্ট না করিয়া বসে। ইহা শুনিয়া রাসূলুল্লাহ (স) মৃদু হাসিলেন এবং তাহার জন্য দু'আ করিলেন (আসাহহুস সিয়ার, পৃ. ১৯৩, ১৯৪)।
হযরত সাফিয়্যা (রা)-এর সহিত রাসূলুল্লাহ (স)-এর বিবাহের ওয়ালীমা ও সাফিয়্যার হিজাব (পর্দা) সম্পর্কে বুখারী শরীফে নিম্নোক্ত হাদীছ বর্ণিত হইয়াছে:
حَدَّثَنَا سَعِيدُ بْنُ مَرْيَمَ قَالَ أَخْبَرَنَا مُحَمَّدُ بْنُ جَعْفَرِ بْنِ أَبِي كَثِيرٍ قَالَ أَخْبَرَنِي حُمَيْدٌ أَنَّهُ سَمِعَ أَنَسًا يَقُولُ أَقَامَ النَّبِيُّ ﷺ بَيْنَ خَيْبَرَ وَالْمَدِينَةَ ثَلثَةَ لَيَالٍ يُبَنِّى عَلَيْهَا بِصَفِيَّةَ فَدَعَوْتُ الْمُسْلِمِينَ إِلَى وَلِيْمَتِهِ وَمَا كَانَ فِيهَا مِنْ خُبْزٍ وَلَا لَحْمِ وَمَا كَانَ فِيهَا إِلَّا أَنْ أَمَرَ بلالاً بالأَنْطَاعِ فَبُسِطَتْ فَالْقَى عَلَيْهَا الثَّمَرَ وَالأَقطَ وَالسَّمَنَ فَقَالَ الْمُسْلِمُونَ إِحْدَى أُمَّهَاتِ الْمُؤْمِنِينَ أَوْ مَا مَلَكَتْ يَمِينُهُ قَالُوا إِنْ حَجَبَهَا فَهِيَ إِحْدَى أُمَّهَاتِ الْمُؤْمِنِينَ فَإِنْ لَمْ يَحْجُبُهَا فَهِيَ مِمَّا مَلَكَتْ يَمِينُهُ فَلَمَّا ارْتَحَلَ وَطَأَ لَهَا خَلْفَهُ وَمَدَّ الْحِجَابَ.
"হুমায়দ বলেন, আমি আনাস (রা)-কে বলিতে শুনিয়াছি, রাসূলুল্লাহ (স) খায়বার ও মদীনার মধ্যবর্তী স্থানে তিন রাত অবস্থান করিয়াছিলেন। এই সময় তিনি সাফিয়্যা (রা)-এর সহিত মিলিত হইয়াছিলেন। অতঃপর আমি মুসলমানদেরকে ওয়ালীমা-র জন্য দাওয়াত করিলাম। ওয়ালীমাতে রুটি ও গোশত ছিল না। বিলাল (রা)-কে দস্তরখান বিছানোর আদেশ করা ছাড়া ইহাতে অন্য কিছু ছিল না। আদেশ অনুযায়ী দস্তরখান বিছানোর পর ইহাতে শুকনা খেজুর, পনির ও ঘি ঢালা হইয়াছিল। অতঃপর মুসলমানগণ বলিতে লাগিলেন, তিনি কি উম্মুল মু'মিনীনের একজন, না কি বাঁদী। তাহারা বলিলেন, যদি রাসূলুল্লাহ (স) তাঁহাকে পর্দার অন্তরালে রাখেন তাহা হইলে তিনি উম্মত জননীগণের একজন, আর যদি তাঁহাকে পর্দার অন্তরালে না ঢাকেন তাহা হইলে তিনি তাঁহার একজন বাঁদী। ইহার পর রাসূলুল্লাহ (স) রওয়ানা করিলে সাফিয়্যা (রা)-এর জন্য তাঁহার সওয়ারীর পিছনে বসিবার স্থান ঠিক করিলেন এবং তাঁহার জন্য পর্দা টানাইলেন" (বুখারী, কিতাবুল মাগাযী, বাব গাওয়া খায়বার, ২খ., ৬০৬)।
বুখারীর এক রিওয়ায়াত নিম্নরূপ:
عَنْ أَنَسِ بْنِ مَالِكَ أَنَّ رَسُولَ اللهِ اللهِ عَزَا خَيْبَرَ فَصَلَّيْنَا عِنْدَهَا صَلوةَ الْغَدَاةِ بِغَلَس فَرَكِبَ النَّبِيِّ ﷺ وَرَكِبَ أَبُو طَلْحَةَ وَأَنَا رَدِيفُ أَبِي طَلْحَةَ فَأَجْرِى نَبِيُّ اللَّهِ ﷺ فِي زُقَاقِ خَيْبَرَ وَأَنَّ رَكْبَتَى لَتَمَسُ فَخِذَ نَبِيُّ اللهِ اللهِ ثُمَّ حَسَرَ الإِزارِ عَنْ فَخِذِهِ حَتَّى أَنِّي أَنْظُرُ إِلى بِيَاضِ فَخِذِ نَبِيُّ اللَّهِ ﷺ فَلَمَّا دَخَلَ الْقَرْيَةَ قَالَ اللهُ أَكْبَرُ خَرِبَتْ خَيْبَرُ إِنَّا إِذَا نَزَلْنَا بِسَاحَةِ قَوْمٍ فَسَاءَ صَبَاحُ الْمُنْذِرِينَ قَالَهَا ثَلثًا قَالَ وَخَرَجَ الْقَوْمُ إِلى أَعْمَالِهِمْ فَقَالُوا مُحَمَّدٌ قَالَ عَبْدُ الْعَزِيزِ وَقَالَ بَعْضُ أَصْحَابِنَا وَالْخَمِيسَ يَعْنِيُّ الْجَيْشِ قَالَ فَأَصَبْنَاهَا عَنَوَةً فَجُمِعَ السَّبِيُّ فَجَاءَ دِحْيَةٌ فَقَالَ يَانَبِيُّ اللهِ أَعْطِنِي جَارِيَةً مِنَ السَّبِي فَقَالَ اذْهَبْ فَخُذْ جَارِيَةً فَأَخَذَ صَفِيَّةَ بِنْتَ حَيَى فَجَاءَ رَجُلٌ إِلَى النَّبِيُّ ﷺ فَقَالَ يَا نَبِيُّ اللَّهِ أَعْطَيْتَ دِحْيَةَ صَفِيَّةَ بِنْتَ حُيَى سَيِّدَةَ قُرَيْظَةَ وَالنَّضِيرَ لَا تَصْلُحُ إِلا لَكَ قَالَ أَدْعُوهُ بِهَا فَجَاءَ بِهَا فَلَمَّا نَظَرَ إِلَيْهَا النَّبِيُّ ﷺ قَالَ خُذْ جَارِيَةً مِنَ السَّبِي غَيْرَهَا قَالَ فَاعْتَقَهَا النَّبِيُّ ﷺ وَتَزَوجَهَا فَقَالَ لَهُ ثَابِتُ يَا أَبَا حَمْزَةً مَا أَصْدَقَهَا قَالَ نَفْسًا اَعْتَقَهَا وَتَزَوجَهَا حَتَّى إِذَا كَانَ بِالطَّرِيقِ.
বুখারীতে ওয়ালীমা সম্পর্কিত একটি বর্ণনায় উল্লেখ আছে:
فَأَصْبَحَ النَّبِيُّ ﷺ عَرُوسًا فَقَالَ مَنْ كَانَ عِنْدَهُ شَيْءٌ فَلْيَجِيْ بِهِ وَبَسَطَ نِطْعًا فَجَعَلَ الرَّجُلُ يَجِئُ بِالتَّمْرِ وَجَعَلَ الرَّجُلُ يَجِئُ بِالسَّمَنِ قَالَ وَأَحْسِبُهُ قَدْ ذَكَرَ السَّوِيقَ قَالَ فَحَاسُوا حَيْسًا فَكَانَتْ وَلِيْمَةُ رَسُولِ الله ﷺ (صحيح البخاري مجلد ١ : ٤-٥٣ كتاب الصلوة باب ما يذكر في الفخذ).
"অতঃপর রাসূলুল্লাহ (স) সফররত অবস্থাতেই উম্মু সুলায়ম (রা) সাফিয়্যা (রা)-এর জন্য রাত্রিকালে রাসূলুল্লাহ (স)-এর সহিত বাসরের ব্যবস্থা করিয়াছিলেন। সকালে সকলকে রাসূলুল্লাহ (স) বলিলেন, যাহার নিকট যাহা আছে তাহা লইয়া আস। তিনি চামড়ার খাঞ্চা বিছাইয়া দিলেন। কেহ লইয়া আসিল শুকনা খেজুর, কেহ আনিল ঘি। বর্ণনাকারী বলেন, আমার মনে হয় ছাতু আনার কথাও উল্লেখ আছে। সবাই মিলিয়া তাহা দিয়া হায়س (ছাতু ও ঘি মিশ্রিত খাদ্য) তৈরী করিলেন। ইহাই ছিল রাসূলুল্লাহ (স)-এর ওয়ালীমা” (বুখারী, কিতাবুস সালাত, বাব মা যুযকারু ফি'ل-ফাখিয, ১খ., ৫৩-৫৪)।
সুনানে আবী দাউদের ভাষ্যকার 'আল্লামা মাযিরী বলিয়াছেন রাসূলুল্লাহ (স) সাফিয়্যা (রা)-কে দিহয়া (রা)-এর নিকট হইতে ফেরত লইয়া নিজে বিবাহ করিলেন। কারণ:
لِمَا فِيْهِ مِنْ انْتِهَالِهَا مَعَ مَرْتَبَتِهَا وَكَوْنِهَا بِنْتَ سَيِّدِهِمْ
"তিনি ছিলেন উচ্চমর্যাদাসম্পন্ন এবং ইয়াহূদী নেতার মেয়ে। এইজন্য তাঁহার অন্য কাহারও নিকট থাকা সমীচীন ছিল মা" (শিবলী নু'মানী ও সুলায়মান নাদবী, সীরাতুন নবী, ১খ., ২৮৪)।
ইবন হাজার আল-'আসকালানী বলেন, ইবন ইসহাকের মতে সাফিয়্যা (রা)-কে কামূس দুর্গ হইতে বন্দী করা হইয়াছিল। সাফিয়্যা (রা) ছিলেন কিনানা ইন্ন আবিল হুকায়কের স্ত্রী। তাঁহার সহিত তাঁহার চাচাতো ভগ্নিকে বন্দী করা হইয়াছিল। ভিন্নমতে তাঁহার স্বামীর চাচাত ভগ্নি বন্দী হইয়াছিল। সুহায়লী বলেন, খায়বারের গনীমত ভাগ করিবার পূর্বে দিহয়া (রা)-এর নিকট হইতে সাফিয়্যা (রা)-কে ফেরত লওয়া হইয়াছিল। সাফিয়্যা (রা)-এর পরিবর্তে দিহয়া (রা)-কে রাসূলুল্লাহ (স) যাহা দিয়াছিলেন তাহা বিনিময় হিসাবে নয়, অনুগ্রহ হিসাবে (ফাতহুল বারী)।
সাফিয়্যা (রা) মহানবী (স)-এর পরিণীতা হইবার আরও একটি যুক্তি হইল, তিনি পিতা ও স্বামী উভয়ের পক্ষ হইতে রাজকীয় পরিবেশে জীবন যাপনের পর যখন পিতৃহারা ও স্বামীহারা হইয়া চরমভাবে অসহায় হইয়া পড়িলেন, এমতাবস্থায় তাঁহার বংশ মর্যাদা রক্ষার্থে এবং স্বজন হারানোর বেদনা দূর করিতে ইহা ছাড়া গত্যন্তর ছিল না। তিনি বাঁদী হিসাবেই রাসূলুল্লাহ (স)-এর নিকট থাকিতে পারিতেন। কিন্তু রাসূলুল্লাহ (স) তাহা করেন নাই। তাঁহার সামাজিক মর্যাদার প্রতি লক্ষ্য করিয়া তিনি তাঁহাকে আযাদ করিয়া দিলেন। অতঃপর তাঁহাকে নিজ স্ত্রী হিসাবে বরণ করিয়া লইলেন।
মুসনাদে আহমাদে বর্ণিত আছে (মিসর, ৩খ., ১৩৮), রাসূলুল্লাহ (س) সাফিয়‍্যা (রা)-কে দুইটি জিনিসের যে কোন একটি গ্রহণের অনুমতি প্রদান করিয়াছিলেন: হয় তিনি আযাদ হইয়া নিজ গৃহে চলিয়া যাইবেন অথবা তাঁহার সহিত বিবাহ বন্ধনে আবদ্ধ হইবেন। তিনি রাসূলুল্লাহ (স)-এর বিবাহে আবদ্ধ হইবার পন্থাটি স্বেচ্ছায় গ্রহণ করিয়াছিলেন। করুণা ও সদ্ব্যবহার ছাড়াও ইহা রাজনৈতিক ও ধর্মীয় দৃষ্টিকোণ হইতেও অত্যন্ত তাৎপর্যপূর্ণ ছিল। এই আচরণের ফলেই আরববাসীদের ইসলামের প্রতি আগ্রহ বৃদ্ধি পাইতেছিল। ইসলাম তাহার শত্রুদিগের পরিবার-পরিজনের সহিতও কতই না উত্তম আচরণ করে (শিবলী নু'মানী ও সুলায়মান নাদবী, সীরাতুন-নবী, ১খ., ২৮৪)।

সাফিয়্যা (রা)-এর মুখমণ্ডলে একটি নীল দাগ ছিল। ইহার কারণ তিনি নিজেই বর্ণনা করিয়াছেন। তিনি বলেন, কিছুদিন পূর্বে আমি একটি স্বপ্ন দেখিয়াছিলাম। আমি দেখিলাম, চাঁদ আমার কোলে। এই স্বপ্ন আমি আমার তৎকালীন স্বামী কিনানাকে অবহিত করিলাম। তিনি আমাকে প্রচণ্ডভাবে চপেটাঘাত করিয়া বলিলেন, তুমি তো মদীনার বাদশাহের প্রতি আসক্ত হইয়া পড়িয়াছ (আর-রাওদুল উনুফ, ৪খ., পৃ. ৪৩)। রাসূলুল্লাহ (স)-এর নিকট এই ঘটনার বিবরণ দিতে গিয়া সাফিয়‍্যা (রা) বলিলেন, হে আল্লাহ্র রাসূল! প্রকৃতপক্ষে আপনার সম্পর্কে আমার কিছুই জানা ছিল না।
তাঁহাকে উম্মাহাতুল মু'মিনীনের অন্তর্ভুক্ত করা হয়। ফিরিবার সময় আস-সাহ্বা' নামক স্থানে তাঁহাদের বাসর অনুষ্ঠিত হয়। তথায় রাসূলুল্লাহ (স) তিনদিন অবস্থান করেন। সেই রজনীতে কোন পূর্ব-সংকেত ব্যতিরেকে আবূ আয়্যুব আনসারী (রা) সমগ্র রাত পাহারা প্রদান করেন। প্রত্যূষে রাসূলুল্লাহ (স) তাহাকে এই অবস্থায় দেখিয়া জিজ্ঞাসা করিলেন, কেন এমন করিলে? তিনি জবাব দিলেন, হে আল্লাহ্র রাসূল! আমার আশংকা ছিল যে, এই মহিলার পিতা, ভ্রাতা, স্বামী সকলেই এই যুদ্ধে নিহত হইয়াছে। সুতরাং পিছনে সে যে কোন অনিষ্ট না করিয়া বসে। ইহা শুনিয়া রাসূলুল্লাহ (স) মৃদু হাসিলেন এবং তাহার জন্য দু'আ করিলেন (আসাহহুস সিয়ার, পৃ. ১৯৩, ১৯৪)।
হযরত সাফিয়্যা (রা)-এর সহিত রাসূলুল্লাহ (স)-এর বিবাহের ওয়ালীমা ও সাফিয়্যার হিজাব (পর্দা) সম্পর্কে বুখারী শরীফে নিম্নোক্ত হাদীছ বর্ণিত হইয়াছে:
حَدَّثَنَا سَعِيدُ بْنُ مَرْيَمَ قَالَ أَخْبَرَنَا مُحَمَّدُ بْنُ جَعْفَرِ بْنِ أَبِي كَثِيرٍ قَالَ أَخْبَرَنِي حُمَيْدٌ أَنَّهُ سَمِعَ أَنَسًا يَقُولُ أَقَامَ النَّبِيُّ ﷺ بَيْنَ خَيْبَرَ وَالْمَدِينَةَ ثَلَثَةَ لَيَالٍ يُبَنِّى عَلَيْهَا بِصَفِيَّةَ فَدَعَوْتُ الْمُسْلِمِينَ إِلَى وَلِيْمَتِهِ وَمَا كَانَ فِيهَا مِنْ خُبْزٍ وَلَا لَحْمِ وَمَا كَانَ فِيهَا إِلَّا أَنْ أَمَرَ بلالاً بالأَنْطَاعِ فَبُسِطَتْ فَالْقَى عَلَيْهَا الثَّمَرَ وَالأَقطَ وَالسَّمَنَ فَقَالَ الْمُسْلِمُونَ إِحْدَى أُمَّهَاتِ الْمُؤْمِنِينَ أَوْ مَا مَلَكَتْ يَمِينُهُ قَالُوا إِنْ حَجَبَهَا فَهِيَ إِحْدَى أُمَّهَاتِ الْمُؤْمِنِينَ فَإِنْ لَمْ يَحْجُبُهَا فَهِيَ مِمَّا مَلَكَتْ يَمِينُهُ فَلَمَّا ارْتَحَلَ وَطَأَ لَهَا خَلْفَهُ وَمَدَّ الْحِجَابَ.
"হুমায়দ বলেন, আমি আনাস (রা)-কে বলিতে শুনিয়াছি, রাসূলুল্লাহ (স) খায়বার ও মদীনার মধ্যবর্তী স্থানে তিন রাত অবস্থান করিয়াছিলেন। এই সময় তিনি সাফিয়্যা (রা)-এর সহিত মিলিত হইয়াছিলেন। অতঃপর আমি মুসলমানদেরকে ওয়ালীমা-র জন্য দাওয়াত করিলাম। ওয়ালীমাতে রুটি ও গোশত ছিল না। বিলাল (রা)-কে দস্তরখান বিছানোর আদেশ করা ছাড়া ইহাতে অন্য কিছু ছিল না। আদেশ অনুযায়ী দস্তরখান বিছানোর পর ইহাতে শুকনা খেজুর, পনির ও ঘি ঢালা হইয়াছিল। অতঃপর মুসলমানগণ বলিতে লাগিলেন, তিনি কি উম্মুল মু'মিনীনের একজন, না কি বাঁদী। তাহারা বলিলেন, যদি রাসূলুল্লাহ (স) তাঁহাকে পর্দার অন্তরালে রাখেন তাহা হইলে তিনি উম্মত জননীগণের একজন, আর যদি তাঁহাকে পর্দার অন্তরালে না ঢাকেন তাহা হইলে তিনি তাঁহার একজন বাঁদী। ইহার পর রাসূলুল্লাহ (স) রওয়ানা করিলে সাফিয়্যা (রা)-এর জন্য তাঁহার সওয়ারীর পিছনে বসিবার স্থান ঠিক করিলেন এবং তাঁহার জন্য পর্দা টানাইলেন" (বুখারী, কিতাবুল মাগাযী, বাব গাওয়া খায়বার, ২খ., পৃ. ৬০৬; আসাহহুস সিয়ার, পৃ. ১১৪)।

📘 সীরাত বিশ্বকোষ > 📄 খায়বারের দুর্গমালা বিজয়ের ধারাবাহিকতা

📄 খায়বারের দুর্গমালা বিজয়ের ধারাবাহিকতা


ইবন কাছীরের বর্ণনানুসারে প্রতীয়মান হয় যে, খায়বারে পর্যাক্রমে প্রথম নাঈম, কামূস সা'ব ইব্‌ন মু'আয, ওয়াতীহ ও সুলালিম বিজিত হইয়াছিল (আল-বিদায়া ওয়ান-নিহায়া, ২/৪খ., পৃ. ১৯৩-১৯৬)।

ইবন কাছীরের বর্ণনানুসারে প্রতীয়মান হয় যে, খায়বারে পর্যাক্রমে প্রথম নাঈম, কামূس সা'ব ইব্‌ন মু'আয, ওয়াতীহ ও সুলালিম বিজিত হইয়াছিল (আল-বিদায়া ওয়ান-নিহায়া, ২/৪খ., পৃ. ১৯৩-১৯৬)।

ইবন কাছীরের বর্ণনানুসারে প্রতীয়মান হয় যে, খায়বারে পর্যাক্রমে প্রথম নাঈম, কামূس সা'ব ইব্‌ن মু'আয, ওয়াতীহ ও সুলালিম বিজিত হইয়াছিল (আল-বিদায়া ওয়ান-নিহায়া, ২/৪খ., পৃ. ১৯৩-১৯৬)।

ইবন কাছীরের বর্ণনানুসারে প্রতীয়মান হয় যে, খায়বারে পর্যাক্রমে প্রথম নাঈম, কামূস সা'ব ইব্‌ন মু'আয, ওয়াতীহ ও সুলালিম বিজিত হইয়াছিল (আল-বিদায়া ওয়ান-নিহায়া, ২/৪খ., পৃ. ১৯৩-১৯৬)।

📘 সীরাত বিশ্বকোষ > 📄 ভূমি চাষাবাদের শর্তে ইয়াহূদীদের খায়বারে অবস্থান অনুমোদন

📄 ভূমি চাষাবাদের শর্তে ইয়াহূদীদের খায়বারে অবস্থান অনুমোদন


চুক্তিপত্রের শর্তানুযায়ী রাসূলুল্লাহ (স)-এর ইচ্ছা ছিল ইয়াহুদীদিগকে খায়বার হইতে উচ্ছেদ করা। কিন্তু ইয়াহুদীগণ রাসূলুল্লাহ (স)-এর নিকট প্রার্থনা করিল, আমাদিগকে এখানে বসবাসের এবং চাষাবাদের অনুমতি দিন। কারণ এই ব্যাপারে আমরা অত্যন্ত অভিজ্ঞ। রাসূলুল্লাহ (স) দেখিলেন, সাহাবীদের হাতে সময় নাই যে, তাহারা এখানকার সকল ভূমি স্বহস্তে চাষাবাদ করিতে পারিবে এবং দাসদের সংখ্যাও এই পরিমাণ নাই যে, তাহাদের দ্বারা সব চাষাবাদ করানো যায়। এইজন্য রাসূলুল্লাহ (স) এই শর্তে সম্মতি জ্ঞাপন করেন যে, তাহারা চাষাবাদ এবং বৃক্ষের পরিচর্যা করিবে। অতঃপর ফসল ও খেজুর যাহা উৎপন্ন হইবে ইহার অর্ধাংশ তাহারা পাইবে। যেহেতু প্রাথমিক পর্যায়ে এই ব্যবস্থা খায়বারে গৃহীত হয় সেই হেতু ইহার নামকরণ করা হয় খায়বার হইতে 'মুখাবারা' (আসাহহুস সিয়ার, পৃ. ১৯৫)।

চুক্তিপত্রের শর্তানুযায়ী রাসূলুল্লাহ (স)-এর ইচ্ছা ছিল ইয়াহুদীদিগকে খায়বার হইতে উচ্ছেদ করা। কিন্তু ইয়াহুদীগণ রাসূলুল্লাহ (স)-এর নিকট প্রার্থনা করিল, আমাদিগকে এখানে বসবাসের এবং চাষাবাদের অনুমতি দিন। কারণ এই ব্যাপারে আমরা অত্যন্ত অভিজ্ঞ। রাসূলুল্লাহ (স) দেখিলেন, সাহাবীদের হাতে সময় নাই যে, তাহারা এখানকার সকল ভূমি স্বহস্তে চাষাবাদ করিতে পারিবে এবং দাসদের সংখ্যাও এই পরিমাণ নাই যে, তাহাদের দ্বারা সব চাষাবাদ করানো যায়। এইজন্য রাসূলুল্লাহ (স) এই শর্তে সম্মতি জ্ঞাপন করেন যে, তাহারা চাষাবাদ এবং বৃক্ষের পরিচর্যা করিবে। অতঃপর ফসল ও খেজুর যাহা উৎপন্ন হইবে ইহার অর্ধাংশ তাহারা পাইবে। যেহেতু প্রাথমিক পর্যায়ে এই ব্যবস্থা খায়বারে গৃহীত হয় সেই হেতু ইহার নামকরণ করা হয় খায়বার হইতে 'মুখাবারা' (আসাহহুস সিয়ার, পৃ. ১৯৫)।

চুক্তিপত্রের শর্তানুযায়ী রাসূলুল্লাহ (স)-এর ইচ্ছা ছিল ইয়াহুদীদিগকে খায়বার হইতে উচ্ছেদ করা। কিন্তু ইয়াহুদীগণ রাসূলুল্লাহ (স)-এর নিকট প্রার্থনা করিল, আমাদিগকে এখানে বসবাসের এবং চাষাবাদের অনুমতি দিন। কারণ এই ব্যাপারে আমরা অত্যন্ত অভিজ্ঞ। রাসূলুল্লাহ (স) দেখিলেন, সাহাবীদের হাতে সময় নাই যে, তাহারা এখানকার সকল ভূমি স্বহস্তে চাষাবাদ করিতে পারিবে এবং দাসদের সংখ্যাও এই পরিমাণ নাই যে, তাহাদের দ্বারা সব চাষাবাদ করানো যায়। এইজন্য রাসূলুল্লাহ (س) এই শর্তে সম্মতি জ্ঞাপন করেন যে, তাহারা চাষাবাদ এবং বৃক্ষের পরিচর্যা করিবে। অতঃপর ফসল ও খেজুর যাহা উৎপন্ন হইবে ইহার অর্ধাংশ তাহারা পাইবে। যেহেতু প্রাথমিক পর্যায়ে এই ব্যবস্থা খায়বারে গৃহীত হয় সেই হেতু ইহার নামকরণ করা হয় খায়বার হইতে 'মুখাবারা' (আসাহহুস সিয়ার, পৃ. ১৯৫)।

চুক্তিপত্রের শর্তানুযায়ী রাসূলুল্লাহ (স)-এর ইচ্ছা ছিল ইয়াহুদীদিগকে খায়বার হইতে উচ্ছেদ করা। কিন্তু ইয়াহুদীগণ রাসূলুল্লাহ (স)-এর নিকট প্রার্থনা করিল, আমাদিগকে এখানে বসবাসের এবং চাষাবাদের অনুমতি দিন। কারণ এই ব্যাপারে আমরা অত্যন্ত অভিজ্ঞ। রাসূলুল্লাহ (স) দেখিলেন, সাহাবীদের হাতে সময় নাই যে, তাহারা এখানকার সকল ভূমি স্বহস্তে চাষাবাদ করিতে পারিবে এবং দাসদের সংখ্যাও এই পরিমাণ নাই যে, তাহাদের দ্বারা সব চাষাবাদ করানো যায়। এইজন্য রাসূলুল্লাহ (স) এই শর্তে সম্মতি জ্ঞাপন করেন যে, তাহারা চাষাবাদ এবং বৃক্ষের পরিচর্যা করিবে। অতঃপর ফসল ও খেজুর যাহা উৎপন্ন হইবে ইহার অর্ধাংশ তাহারা পাইবে। যেহেতু প্রাথমিক পর্যায়ে এই ব্যবস্থা খায়বারে গৃহীত হয় সেই হেতু ইহার নামকরণ করা হয় খায়বার হইতে 'মুখাবারা' (আসাহহুস সিয়ার, পৃ. ১৯৫)।

📘 সীরাত বিশ্বকোষ > 📄 খায়বারের ভূমি বণ্টন

📄 খায়বারের ভূমি বণ্টন


খায়বারের যুদ্ধলব্ধ সম্পদের মধ্যে সেখানকার ভূমিই ছিল উল্লেখযোগ্য। রাসূলুল্লাহ (স) সেখানকার ভূমি বণ্টন করেন নিম্নরূপঃ আবূ দাউদে বুশায়র ইব্‌ন য়াসার হইতে বর্ণিত আছে যে,. সমুদয় ৩৬ ভাগে বিভক্ত করা হয়। তাহার পর তন্মধ্যে অর্ধাংশ অর্থাৎ আঠার অংশ বণ্টন না করিয়া রাষ্ট্রের মালিকানায় রাখা হয় যাহাতে ইহা হইতে প্রতিনিধি দল ও দূত প্রেরণ এবং অন্যান্য জাতীয় ও রাষ্ট্রীয় প্রয়োজন মিটানোর জন্য ব্যয় নির্বাহ করা যায়। অবশিষ্ট আঠার ভাগের প্রত্যেক ভাগকে ১০০ ভাগ করিয়া বণ্টন করা হয় (باب ماجاء في حكم ارض خيبر রাহীমিয়া পাবঃ দেওবন্দ, ২খ., পৃ. ৭৭)। ইব্‌ন শিহাব বলেন, কেবল হুদায়বিয়ার সন্ধিতে অংশগ্রহণকারিদের মধ্যেই এই অংশগুলি বণ্টন করা হয়। তাহাদের মধ্যে খায়বারে উপস্থিত অনুপস্থিত সকলকেই ভাগ দেওয়া হয়। সীরাতবিদগণ বলেন, হুদায়বিয়ার সন্ধিতে অংশগ্রহণকারিগণের মধ্যে কেবল জাবির ইব্‌ন আবদিল্লাহ (রা) খায়বারে অংশগ্রহণ করেন নাই, কিন্তু তাহাকে ইহার অংশ প্রদান করা হয়। যে অর্ধাংশ রাষ্ট্রের মালিকানায় পৃথক করিয়া রাখা হয় এবং বণ্টন করা হয় নাই তন্মধ্যে কাতিবা, ওয়াতীহ, সুলালিম এবং তৎসংলগ্ন ভূমি অন্তর্ভুক্ত ছিল এবং যে অর্ধাংশ বণ্টন করা হয় তন্মধ্যে শাক ও নাতা এবং তৎসংলগ্ন ভূমি অন্তর্ভুক্ত ছিল (আবূ দাউদ, প্রাগুক্ত)। বণ্টনযোগ্য আঠারটি অংশ কিভাবে বণ্টিত হয় এই ব্যাপারে ভিন্ন ভিন্ন বর্ণনা পাওয়া যায়। বুখারী ও মুসলিমে বর্ণিত আছে—
عَنِ ابْنِ عُمَرَ قَالَ قَسَمَ رَسُولُ اللهِ ﷺ يَوْمَ خَيْبَرَ لِلْفَرَسِ سَهْمَيْنِ وَلِلرَّاجِلِ سَهْما . "ইবন উমার (রা) বলেন, রাসূলুল্লাহ (স) খায়বার দিবসে অশ্বারোহীর জন্য দুই ভাগ ও পদাতিকের জন্য এক ভাগ হিসাবে বণ্টন করিয়াছিলেন" (বুখারী, কিতাবুল মাগাযী, বাব গাযওয়াতি খায়বার; মুসলিম, বাবু কায়ফিয়্যাতু কিসমাতিল গানীমাতি বায়নাল হাদিরীন)।
এই হাদীছ সম্পর্কে নাফে' (র)-এর ব্যাখ্যা হইল, যোদ্ধার সহিত যখন অশ্ব থাকিবে তখন তাহার অংশ হইবে তিনটি। অশ্ব না হইলে তাহার জন্য একটি অংশ (বুখারী, প্রাগুক্ত)। চৌদ্দ শত ব্যক্তির মধ্যে চৌদ্দটি অংশ বণ্টন করা হয়। কারণ এক একটি অংশ এক শতটি ছোট অংশে বিভক্ত ছিল। যুদ্ধে দুই শত অশ্ব ছিল। প্রত্যেক অশ্বারোহী দুইটি করিয়া ছোট অংশ লাভ করেন। এইজন্য চারটি বড় অংশ দুই শত অশ্বারোহীর জন্য নির্দিষ্ট করা হয়। এইভাবে আঠার অংশ পূর্ণ হয়। কিন্তু আবূ দাউদে মুজাম্মি' আল-আনসারী (রা) হইতে ইহার বিপরীত একটি বর্ণনা আছে:
قَالَ قُسِمَتْ خَيْبَرُ عَلَى أَهْلِ الْحُدَيْبِيَّةِ فَقَسَمَهَا رَسُولُ اللهِ ﷺ ثَمَانِيَةَ عَشَرَ سَهُمَا وَكَانَ الْجَيْشُ أَلْفًا وَخَمْسَ مِائَةٍ فِيهِمْ ثَلتُ مِائَةٍ فَأَرِسٍ فَأَعْطَى الْفَارِسَ سَهْمَيْنِ وَأَعْطَى الرَّاحِلَ سَهما .
(کتاب الخراج مَا جَاء فِي حُكْمِ أَرْضِ خَيْبَرَ )
মুজাম্মি' ইবন হারিছা (রা)-এর বর্ণনায় তিনটি বিষয়ে ভিন্নতা পরিলক্ষিত হয়। প্রথমত, অশ্বারোহীর জন্য ছোট একটি অংশ, দুইটি অংশ নয়। দ্বিতীয়ত, লোকসংখ্যা ছিল পনর শত এবং তৃতীয়ত, অশ্বের সংখ্যা ছিল তিন শত। এই হিসাবে পনরটি বড় অংশ পনর শত লোকের মধ্যে এবং তিন শত অশ্বের মধ্যে তিনটি অংশ। এইভাবে মোট আঠার অংশ পূর্ণ হয়।
ইমাম নাওয়াবী উল্লেখ করেন, অশ্বের অংশের মধ্যে মতপার্থক্য রহিয়াছে। অধিকাংশের মতে অশ্বের জন্য দুই অংশ। ইহাতে যাহারা পদাতিক ছিলেন তাহাদের মাথাপিছু এক অংশ এবং অশ্বারোহীদের জন্য তিন অংশ হইয়া যায়। এক অংশ আরোহীর আর দুই অংশ অশ্বের। ইব্‌ন আব্বাস (রা), মুজাহিদ, হাসান, ইব্‌ন সীরীন, উমার ইব্‌ন আবদিল আযীয, ইমাম মালিক, ইমাম আওযাঈ, সুফ্যান ছাওরী, শাফিঈ, লায়ছ, ইমাম আবূ ইউসুফ, ইমাম মুহাম্মাদ, ইমাম আহমাদ, ইসহাক, আবু উবায়দ ইব্‌ন জারীর (র) প্রমুখ এই মত পোষণ করেন। কিন্তু ইমাম আবূ হানীফা (র) বলেন, অশ্বরোহীর জন্য দুই অংশ হইবে, এক অংশ আরোহীর আর এক অংশ তাহার অশ্বের। বলা হয়, ইহার পক্ষে আলী (রা) ও আবূ মূসা আল-আশআরী (রা) ব্যতীত অন্য কাহারও কোন বর্ণনা নাই (নাওয়াবী, হাশিয়া মুসলিম, ২খ., পৃ. ৯২)। ইমাম আবূ হানীফা (র) মুজাম্মি' ইব্‌ন হারিছা (রা)-এর বর্ণনাকে দলীল হিসাবে পেশ করেন। কিন্তু ইমাম ইব্‌ন কায়্যিম (র) বলেন, ইমাম শাফি'ঈ (র)-এর মতে মুজাম্মি' ইব্‌ন হারিছা (রা)-এর অবস্থা পরিজ্ঞাত নয়। দ্বিতীয় দলীল এই যে, আবদুল্লাহ আল-উমারী নাফে' হইতে এবং তিনি ইব্‌ন উমার (রা) হইতে রিওয়ায়াত করেন যে, অশ্বারোহীর দুই অংশ এবং পদাতিকের এক অংশ। কিন্তু উবায়দুল্লাহ ইবন উমার নাফে' হইতে এবং তিনি ইব্‌ন উমার হইতে রিওয়ায়াত করেন যে, অশ্বের জন্য দুই অংশ এবং আরোহীর জন্য এক অংশ। সহীহ বুখারী ও মুসলিমের রিওয়ায়াত দ্বারা পরিষ্কার ভাবে বুঝা যায় যে, অশ্বারোহীর জন্য তিন অংশঃ দুই অংশ অশ্বের জন্য আর এক অংশ আরোহীর জন্য। উবায়দুল্লাহ তদীয় ভ্রাতা হইতে স্মরণশক্তিতে অগ্রণী ছিলেন (আসাহহুস সিয়ার, প্রাগুক্ত, পৃ. ১৯৭)। আবদুল্লাহ ও উবায়দুল্লাহ ভ্রাতৃদ্বয়ের রিওয়ায়াতের এই বিভিন্নতা সম্পর্কে ইমাম শাফি'ঈ (র) বলেন, সম্ভবত নাফে' (র) অশ্বের কথা (فرس) উল্লেখ করিয়াছিলেন এবং ইহাকে আবদুল্লাহ অশ্বারোহী (فارس) জ্ঞান করিয়াছেন। ইহা ছাড়া ওয়াকিদীর কোন কোন বর্ণনায় অশ্বারোহীর দুই অংশের কথা উল্লেখ আছে। কিন্তু সহীহ হাদীছ গ্রন্থের রিওয়ায়াতের মুকাবিলায় ওয়াকিদীর রিওয়ায়াতসমূহের দ্বারা দলীল পেশ করা শুদ্ধ হইতে পারে না।
মুজাম্মি' ইবন হারিছা (র)-এর রিওয়ায়াতে তিন শতটি ঘোড়ার কথা বলা হইয়াছে। কিন্তু জাবির ইবন 'আবদিল্লাহ, ইবন 'আব্বাস (রা), সালিহ্ ইব্‌ন কায়সান, বিশর ইবন ইয়াসার এবং সকল সীরাতবিদ বলেন, দুই শত ঘোড়া ছিল। এখন যদি দুই শত ঘোড়ার জন্য বড় চারটি অংশ পৃথক করা হয় তাহা হইলে অবশিষ্ট থাকিবে চৌদ্দ অংশ। এই কারণে সৈন্যসংখ্যা চৌদ্দ শত হওয়াই বাঞ্ছনীয়। অধিকাংশের মতে হুদায়বিয়াতে অংশগ্রহণকারীর সংখ্যাই ছিল অনুরূপ। কিন্তু যদি লোকসংখ্যা পনর শত হইয়াই থাকে তাহা হইলে সম্ভবত এক শত হইবে দাস-দাসী যাহাদিগকে ভূমির অংশ প্রদান করা হয় নাই। মোটকথা অংশ প্রাপ্তদের সংখ্যা ছিল চৌদ্দ শত (আসাহহুস সিয়ার, প্রাগুক্ত)।
অবশ্য একটি সমস্যা এই যে, খায়বার বিজয়ের প্রাককালে জাহাজ আরোহীগণের আগমন ঘটিয়াছিল। অর্থাৎ ইহারা ছিলেন জা'ফার ও আবূ মূসা আশ'আরী (রা) এবং তাঁহাদের সঙ্গীগণ যাঁহাদের সংখ্যা ছিল শতাধিক। সহীহ বুখারীতে আবূ মূসা (রা) হইতে বর্ণিত আছে, তিনি বলেন, রাসূলুল্লাহ (স) আমাদিগকে অংশ প্রদান করিয়াছিলেন। এইজন্য উপরে বর্ণিত অংশ বণ্টনের হিসাব যথার্থ হয় নাই। ইহার জওয়াবে বলা হয়, সম্ভবত তাহাদিগকে শুধু অস্থাবর সম্পত্তির অংশ প্রদান করা হইয়াছিল, স্থাবর সম্পত্তির (ভূমির) অংশ প্রদান করা হয় নাই। কারণ ইহা ছিল কেবলমাত্র বায়'আতুর রিদওয়ানে অংশগ্রহণকারিগণের পুরস্কার। ইহা ছাড়া রাসূলুল্লাহ (স) যখন খায়বারের উদ্দেশে যাত্রা করেন তখন আবূ হুরায়রা (রা) সবেমাত্র মদীনায় আগমন করেন এবং সিবা' ইন্ন 'উরফুতা (রা)-এর ইমামতিতে সালাত আদায় করেন। তবে বিজয় শেষে তিনি সেখানে উপনীত হইয়াছিলেন। অনুরূপ কথা আছে আবান (রা) সম্পর্কে। তাঁহাকে রাসূলুল্লাহ (স) একটি সারিয়‍্যাতে প্রেরণ করিয়াছিলেন। তিনিও সেখান হইতে খায়বার আগমন করেন। তিনিও বিজয় লাভের পরে পৌঁছিয়াছিলেন। তাঁহারা দুইজন গনীমতে অংশীদার হইবার কামনা করিয়াছিলেন। কিন্তু রাসূলুল্লাহ (স) তাঁহাদিগকে অংশ দেন নাই (আসাহহুস সিয়ার, প্রাগুক্ত)।
ইবন হিশাম ইবন ইসহাকের উদ্ধৃতি দিয়া বলেন, খায়বারের সম্পদরাশি অর্থাৎ আশ-শিক্ক, আন-নাতা, আল-কাতীবা ভাগ-বণ্টন করা হয়। আশ-শিক্ক ও আন-নাতা দুর্গে মুসলমানদের অংশ ধার্য করা হয়। আল-কাতীবায় আল্লাহ্র নামে "খুমুস” (এক-পঞ্চমাংশ) রাসূলুল্লাহ (স)-এর অংশ, তাঁহার নিকটাত্মীয়গণ, ইয়াতীম ও মিসকীনগণের অংশ, নবী সহধর্মিনীগণের ভাতা, রাসূলুল্লাহ (স) ও ফাদাকবাসিদের মধ্যে সন্ধির মাধ্যমরূপে যাহারা কাজ করিয়াছিলেন তাহাদের ভাতা ধার্য হয়। ইহাদিগের মধ্যে মুহায়্যা ইন্ন মাস'উদ (রা)-কে রাসূলুল্লাহ (স) ত্রিশ ওয়াসাক যব এবং ত্রিশ ওয়াসার খেজুর দান করিয়াছিলেন। আশ-শিক্ক ও আন-নাতা দুর্গ দুইটিকে ১৮টি ভাগে বিভক্ত করা হয়। তন্মধ্যে আন-নাতায় পাঁচ ভাগ ও আশ-শিক্ক দুর্গে তের ভাগ ছিল। এই আঠার অংশকে মোট আঠার শত অংশে বণ্টন করা হয়। সর্বমোট আঠার শত অংশকে আঠারটি ইউনিটে ভাগ করিয়া দেওয়া হয়। ইউনিটগুলি ছিল নিম্নলিখিত নামেঃ
১। 'আলী ইব্‌ন আবী তালিব (রা); ২। যুবায়র ইবনুল 'আওয়াম (রা); ৩। তালহা ইব্‌ 'উবায়দিল্লাহ (রা); ৪। 'উমার ইবনুল খাত্তাব (রা); ৫। 'আবদুর রাহমান ইবন 'আওফ (রা); ৬। 'আসিম ইবন 'আদী (রা); ৭। উসায়দ ইবন হুদায়র (রা); ৮। আল-হারিছ ইবনুল খাযরাজ (রা); ৯। না'ঈম (রা); ১০। বানু বায়াদা; ১১। বানু 'উবায়দ; ১২। বানু হারাম; ১৩। 'উবায়দুস সাহাম; ১৪। বানূ সা'ইদা; ১৫। বানূ গিফার ও আসলাম; ১৬। বানু নাজ্জার; ১৭। বানু হারিছা ও ১৮। বানু আওস।
আন-নাতা দুর্গের পাঁচটি ইউনিট ছিল। সর্বপ্রথম খায়বারের যেই ইউনিটটি পৃথক করা হয় তাহা হইল আন-নাতা দুর্গের যুবায়র ইবনুল 'আওয়াম (রা)-এর উপদুর্গ। ইহাতে খায়বারের খুওয়া ও পার্শ্ববর্তী গ্রাম দুইটি ছিল। দ্বিতীয় পর্যায়ে বায়াদা ইউনিট, তৃতীয় পর্যায়ে উসায়দ ইব্‌ন হুদায়র (রা)-এর ইউনিট, চতুর্থ পর্যায়ে বানু হারিছ ইব্‌ন খাযরাজের ইউনিট, পঞ্চম পর্যায়ে না'ঈমের ইউনিট। ইহাতে বানু 'আওফ ইব্‌ন খাযরাজ মুযায়না ও তাহাদিগের অংশীদারগণের ভাগ ছিল। এই স্থানেই মাহমূদ ইব্‌ন মাসলামা শহীদ হন। ইহার পর আশ-শিক্ক দুর্গ বণ্টনের পালা আসে। ইহা হইতে সর্বপ্রথম 'আসিম ইব্‌ন আদী (রা)-এর ইউনিট পৃথক করিয়া দেওয়া হয়। তাহারা ছিলেন 'আজলান গোত্রের লোক। রাসূলুল্লাহ (স)-এর অংশ ছিল তাহাদিগের সাথেই। তারপর পর্যায়ক্রমে 'আবদুর রাহমান ইবন 'আওফের ইউনিট, সা'ইদা, নাজ্জার, 'আলী ইব্‌ন আবী তালিব (রা), তালহা ইবন উবায়দিল্লাহ, গিফার ও আসলামের ইউনিট, উমার ইবনুল খাত্তাব (রা)-এর ইউনিট, সালামা ইবন উবায়দ ও বানু হারামের ইউনিটদ্বয়, হারিছার ইউনিট, উবায়দুস সাহ্হামের ইউনিট, আওসের ইউনিট। ইহা আল-লাফীফের ইউনিট। ইহাতে জুহায়না এবং সমস্ত আরব গোত্রসমূহের যাহারা খায়বারে অংশগ্রহণ করিয়াছিলেন তাহাদিগের অংশ ছিল। ইহার পর রাসূলুল্লাহ (স) আল-কাতীবা দুর্গ বণ্টনে মনোনিবেশ করেন। ইহা ছিল "খাস" উপত্যকা। এই প্রান্তরটি রাসূলুল্লাহ (স) তাঁহার আত্মীয়-স্বজন, সহধর্মিনীগণ ও অন্যান্য নারী-পুরুষগণের মধ্যে নিম্নরূপে বণ্টন করেন:
১। নবী তনয়া ফাতিমা (রা) ২০০ ওয়াসাক; ২। 'আলী ইব্‌ন আবী তালিব (রা) ১০০ ওয়াসাক; ৩। উসামা ইব্‌ন যায়দ (রা) ২০০ ওয়াসাক ফসল এবং ৫০ ওয়াসাক খেজুর; ৪। উম্মুল মুমিনীন 'আইশা (রা) ২০০ ওয়াসাক; ৫। আবূ বাক্স ইন্ন আবী কুহাফা (রা) ১০০ ওয়াসাক; ৬। 'আকীল ইব্‌ন আবী তালিব (রা) ১৪০ ওয়াসাক; ৭। বানূ জা'ফর (রা) (জা'ফার পুত্রগণ) ৫০ ওয়াসাক; ৮। রাবী'আ ইবনুল হারিছ (রা) ১০০ ওয়াসাক; ৯। সালত ইন্ন মাখরামা (রা), শুধু সালত-কে ৪০ ওয়াসাক ও তাঁহার দুই পুত্র ১০০ ওয়াসাক; ১০। আবূ নাবকা 'আলকামা ইবনুল মুত্তালিব (রা) ৫০ ওয়াসাক; ১১। রুকানা ইব্‌ন ইয়াযীদ ৫০ ওয়াসাক; ১২। কায়স ইব্‌ন মাখরামা ৩০ ওয়াসাক; ১৩। আবুল কাসিম ইব্‌ন মাখরামা ৪০ ওয়াসাক; ১৪। 'উবায়দা ইবনুল হারিছ (রা)-এর কন্যা ও হুসায়ন ইব্‌ন হারিছের কন্যা ১০০ ওয়াসাক; ১৫। উবায়দ ইব্‌ন 'আব্দ ইয়াযীদ (রা)-এর পুত্রগণ ৬০ ওয়াসাক; ১৬। আওস ইব্‌ন মাখরামার পুত্র ৩০ ওয়াসাক; ১৭। মিসতাহ ইব্‌ন উছাছা ও ইলয়াসের পুত্র ৫০ ওয়াসাক; ১৮। উমমু রুমায়ছা ৪০ ওয়াসাক; ১৯। না'ঈম ইব্‌ন হিন্দ ৩০ ওয়াসাক; ২০ বুহায়না বিনুতুল হারিছ ৩০ ওয়াসাক; ২১। 'উজায়র ইব্‌ন 'আব্দ ইয়াযীদ ৩০ ওয়াসাক; ২২। উম্মুল হাকাম ৩০ ওয়াসাক; ২৩। জামানা বিন্ত আবী তালিব ৩০ ওয়াসাক; ২৪। ইবনুল আরকাম ৫০ ওয়াসাক; ২৫। 'আবদুর রাহমান ইব্‌ন আবী বাক্স ৪০ ওয়াসাক; ২৬। হামনা বিন্ত জাহ্‌শ ৩০ ওয়াসাক; ২৭। উন্মু যুবায়র ৪০ ওয়াসাক; ২৮। দাবা'আ বিন্ত যুবায়র ৪০ ওয়াসাক; ২৯। আবূ খুনায়সের পুত্র ৩০ ওয়াসাক; ৩০। উম্মু তালিব ৪০ ওয়াসাক; ৩১। আবূ বুসরা ২০ ওয়াসাক; ৩২। নুমায়লা কালবী ৫০ ওয়াসাক; ৩৩। 'আবদুল্লাহ ইব্‌ন ওয়াহ্ব ও তাঁহার দুই কন্যা ৯০ ওয়াসাক; ইহা হইতে তাঁহার দুই পুত্রের ৪০ ওয়াসাক; ৩৪। উম্মু হাবীba বিন্ত জাহশ ৩০ ওয়াসাক; ৩৫। লামকু ইব্‌ন 'আবদা ৩০ ওয়াসাক; ৩৬। উন্মুহাতুল মু'মিনীন ৭০০ ওয়াসাক।

খায়বারের যুদ্ধলব্ধ সম্পদের মধ্যে সেখানকার ভূমিই ছিল উল্লেখযোগ্য। রাসূলুল্লাহ (স) সেখানকার ভূমি বণ্টন করেন নিম্নরূপঃ আবূ দাউদে বুশায়র ইব্‌ন য়াসার হইতে বর্ণিত আছে যে,. সমুদয় ৩৬ ভাগে বিভক্ত করা হয়। তাহার পর তন্মধ্যে অর্ধাংশ অর্থাৎ আঠার অংশ বণ্টন না করিয়া রাষ্ট্রের মালিকানায় রাখা হয় যাহাতে ইহা হইতে প্রতিনিধি দল ও দূত প্রেরণ এবং অন্যান্য জাতীয় ও রাষ্ট্রীয় প্রয়োজন মিটানোর জন্য ব্যয় নির্বাহ করা যায়। অবশিষ্ট আঠার ভাগের প্রত্যেক ভাগকে ১০০ ভাগ করিয়া বণ্টন করা হয় (باب ماجاء في حكم ارض خيبر রাহীমিয়া পাবঃ দেওবন্দ, ২খ., পৃ. ৭৭)। ইব্‌ন শিহাব বলেন, কেবল হুদায়বিয়ার সন্ধিতে অংশগ্রহণকারিদের মধ্যেই এই অংশগুলি বণ্টন করা হয়। তাহাদের মধ্যে খায়বারে উপস্থিত অনুপস্থিত সকলকেই ভাগ দেওয়া হয়। সীরাতবিদগণ বলেন, হুদায়বিয়ার সন্ধিতে অংশগ্রহণকারিগণের মধ্যে কেবল জাবির ইব্‌ন আবদিল্লাহ (রা) খায়বারে অংশগ্রহণ করেন নাই, কিন্তু তাহাকে ইহার অংশ প্রদান করা হয়। যে অর্ধাংশ রাষ্ট্রের মালিকানায় পৃথক করিয়া রাখা হয় এবং বণ্টন করা হয় নাই তন্মধ্যে কাতিবা, ওয়াতীহ, সুলালিম এবং তৎসংলগ্ন ভূমি অন্তর্ভুক্ত ছিল এবং যে অর্ধাংশ বণ্টন করা হয় তন্মধ্যে শাক ও নাতা এবং তৎসংলগ্ন ভূমি অন্তর্ভুক্ত ছিল (আবূ দাউদ, প্রাগুক্ত)। বণ্টনযোগ্য আঠারটি অংশ কিভাবে বণ্টিত হয় এই ব্যাপারে ভিন্ন ভিন্ন বর্ণনা পাওয়া যায়। বুখারী ও মুসলিমে বর্ণিত আছে—
عَنِ ابْنِ عُمَرَ قَالَ قَسَمَ رَسُولُ اللهِ ﷺ يَوْمَ خَيْبَرَ لِلْفَرَسِ سَهْمَيْنِ وَلِلرَّاجِلِ سَهْما .
"ইবন উমার (রা) বলেন, রাসূলুল্লাহ (স) খায়বার দিবসে অশ্বারোহীর জন্য দুই ভাগ ও পদাতিকের জন্য এক ভাগ হিসাবে বণ্টন করিয়াছিলেন" (বুখারী, কিতাবুল মাগাযী, বাব গাযওয়াতি খায়বার; মুসলিম, বাবু কায়ফিয়্যাতু কিসমাতিল গানীমাতি বায়নাল হাদিরীন)।
এই হাদীছ সম্পর্কে নাফে' (র)-এর ব্যাখ্যা হইল, যোদ্ধার সহিত যখন অশ্ব থাকিবে তখন তাহার অংশ হইবে তিনটি। অশ্ব না হইলে তাহার জন্য একটি অংশ (বুখারী, প্রাগুক্ত)। চৌদ্দ শত ব্যক্তির মধ্যে চৌদ্দটি অংশ বণ্টন করা হয়। কারণ এক একটি অংশ এক শতটি ছোট অংশে বিভক্ত ছিল। যুদ্ধে দুই শত অশ্ব ছিল। প্রত্যেক অশ্বারোহী দুইটি করিয়া ছোট অংশ লাভ করেন। এইজন্য চারটি বড় অংশ দুই শত অশ্বারোহীর জন্য নির্দিষ্ট করা হয়। এইভাবে আঠার অংশ পূর্ণ হয়। কিন্তু আবূ দাউদে মুজাম্মি' আল-আনসারী (রা) হইতে ইহার বিপরীত একটি বর্ণনা আছে:
قَالَ قُسِمَتْ خَيْبَرُ عَلَى أَهْلِ الْحُدَيْبِيَّةِ فَقَسَمَهَا رَسُولُ اللهِ ﷺ ثَمَانِيَةَ عَشَرَ سَهُمَا وَكَانَ الْجَيْشُ أَلْفًا وَخَمْسَ مِائَةٍ فِيهِمْ ثَلتُ مِائَةٍ فَارِسٍ فَأَعْطَى الْفَارِسَ سَهْمَيْنِ وَأَعْطَى الرَّاحِلَ سَهما .
(کتاب الخراج مَا جَاء فِي حُكْمِ أَرْضِ خَيْبَرَ )
মুজাম্মি' ইবন হারিছা (রা)-এর বর্ণনায় তিনটি বিষয়ে ভিন্নতা পরিলক্ষিত হয়। প্রথমত, অশ্বারোহীর জন্য ছোট একটি অংশ, দুইটি অংশ নয়। দ্বিতীয়ত, লোকসংখ্যা ছিল পনর শত এবং তৃতীয়ত, অশ্বের সংখ্যা ছিল তিন শত। এই হিসাবে পনরটি বড় অংশ পনর শত লোকের মধ্যে এবং তিন শত অশ্বের মধ্যে তিনটি অংশ। এইভাবে মোট আঠার অংশ পূর্ণ হয়।
ইমাম নাওয়াবী উল্লেখ করেন, অশ্বের অংশের মধ্যে মতপার্থক্য রহিয়াছে। অধিকাংশের মতে অশ্বের জন্য দুই অংশ। ইহাতে যাহারা পদাতিক ছিলেন তাহাদের মাথাপিছু এক অংশ এবং অশ্বারোহীদের জন্য তিন অংশ হইয়া যায়। এক অংশ আরোহীর আর দুই অংশ অশ্বের। ইব্‌ন আব্বাস (রা), মুজাহিদ, হাসান, ইব্‌ন সীরীন, উমার ইব্‌ন আবদিল আযীয, ইমাম মালিক, ইমাম আওযাঈ, সুফ্যান ছাওরী, শাফিঈ, লায়ছ, ইমাম আবূ ইউসুফ, ইমাম মুহাম্মাদ, ইমাম আহমাদ, ইসহাক, আবু উবায়দ ইব্‌ন জারীর (র) প্রমুখ এই মত পোষণ করেন। কিন্তু ইমাম আবূ হানীফা (র) বলেন, অশ্বরোহীর জন্য দুই অংশ হইবে, এক অংশ আরোহীর আর এক অংশ তাহার অশ্বের। বলা হয়, ইহার পক্ষে আলী (রা) ও আবূ মূসা আল-আশআরী (রা) ব্যতীত অন্য কাহারও কোন বর্ণনা নাই (নাওয়াবী, হাশিয়া মুসলিম, ২খ., পৃ. ৯২)। ইমাম আবূ হানীফা (র) মুজাম্মি' ইব্‌ন হারিছা (রা)-এর বর্ণনাকে দলীল হিসাবে পেশ করেন। কিন্তু ইমাম ইব্‌ন কায়্যিম (র) বলেন, ইমাম শাফি'ঈ (র)-এর মতে মুজাম্মি' ইব্‌ন হারিছা (রা)-এর অবস্থা পরিজ্ঞাত নয়। দ্বিতীয় দলীল এই যে, আবদুল্লাহ আল-উমারী নাফে' হইতে এবং তিনি ইব্‌ন উমার (রা) হইতে রিওয়ায়াত করেন যে, অশ্বারোহীর দুই অংশ এবং পদাতিকের এক অংশ। কিন্তু উবায়দুল্লাহ ইবন উমার নাফে' হইতে এবং তিনি ইব্‌ন উমার হইতে রিওয়ায়াত করেন যে, অশ্বের জন্য দুই অংশ এবং আরোহীর জন্য এক অংশ। সহীহ বুখারী ও মুসলিমের রিওয়ায়াত দ্বারা পরিষ্কার ভাবে বুঝা যায় যে, অশ্বারোহীর জন্য তিন অংশঃ দুই অংশ অশ্বের জন্য আর এক অংশ আরোহীর জন্য। উবায়দুল্লাহ তদীয় ভ্রাতা হইতে স্মরণশক্তিতে অগ্রণী ছিলেন (আসাহহুস সিয়ার, প্রাগুক্ত, পৃ. ১৯৭)। আবদুল্লাহ ও উবায়দুল্লাহ ভ্রাতৃদ্বয়ের রিওয়ায়াতের এই বিভিন্নতা সম্পর্কে ইমাম শাফি'ঈ (র) বলেন, সম্ভবত নাফে' (র) অশ্বের কথা (فرس) উল্লেখ করিয়াছিলেন এবং ইহাকে আবদুল্লাহ অশ্বারোহী (فارس) জ্ঞান করিয়াছেন। ইহা ছাড়া ওয়াকিদীর কোন কোন বর্ণনায় অশ্বারোহীর দুই অংশের কথা উল্লেখ আছে। কিন্তু সহীহ হাদীছ গ্রন্থের রিওয়ায়াতের মুকাবিলায় ওয়াকিদীর রিওয়ায়াতসমূহের দ্বারা দলীল পেশ করা শুদ্ধ হইতে পারে না।
মুজাম্মি' ইবন হারিছা (র)-এর রিওয়ায়াতে তিন শতটি ঘোড়ার কথা বলা হইয়াছে। কিন্তু জাবির ইবন 'আবদিল্লাহ, ইবন 'আব্বাস (রা), সালিহ্ ইব্‌ন কায়সান, বিশর ইবন ইয়াসার এবং সকল সীরাতবিদ বলেন, দুই শত ঘোড়া ছিল। এখন যদি দুই শত ঘোড়ার জন্য বড় চারটি অংশ পৃথক করা হয় তাহা হইলে অবশিষ্ট থাকিবে চৌদ্দ অংশ। এই কারণে সৈন্যসংখ্যা চৌদ্দ শত হওয়াই বাঞ্ছনীয়। অধিকাংশের মতে হুদায়বিয়াতে অংশগ্রহণকারীর সংখ্যাই ছিল অনুরূপ। কিন্তু যদি লোকসংখ্যা পনর শত হইয়াই থাকে তাহা হইলে সম্ভবত এক শত হইবে দাস-দাসী যাহাদিগকে ভূমির অংশ প্রদান করা হয় নাই। মোটকথা অংশ প্রাপ্তদের সংখ্যা ছিল চৌদ্দ শত (আসাহহুস সিয়ার, প্রাগুক্ত)।
অবশ্য একটি সমস্যা এই যে, খায়বার বিজয়ের প্রাককালে জাহাজ আরোহীগণের আগমন ঘটিয়াছিল। অর্থাৎ ইহারা ছিলেন জা'ফার ও আবূ মূসা আশ'আরী (রা) এবং তাঁহাদের সঙ্গীগণ যাঁহাদের সংখ্যা ছিল শতাধিক। সহীহ বুখারীতে আবূ মূসা (রা) হইতে বর্ণিত আছে, তিনি বলেন, রাসূলুল্লাহ (স) আমাদিগকে অংশ প্রদান করিয়াছিলেন। এইজন্য উপরে বর্ণিত অংশ বণ্টনের হিসাব যথার্থ হয় নাই। ইহার জওয়াবে বলা হয়, সম্ভবত তাহাদিগকে শুধু অস্থাবর সম্পত্তির অংশ প্রদান করা হইয়াছিল, স্থাবর সম্পত্তির (ভূমির) অংশ প্রদান করা হয় নাই। কারণ ইহা ছিল কেবলমাত্র বায়'আতুর রিদওয়ানে অংশগ্রহণকারিগণের পুরস্কার। ইহা ছাড়া রাসূলুল্লাহ (স) যখন খায়বারের উদ্দেশে যাত্রা করেন তখন আবূ হুরায়রা (রা) সবেমাত্র মদীনায় আগমন করেন এবং সিবা' ইন্ন 'উরফুতা (রা)-এর ইমামতিতে সালাত আদায় করেন। তবে বিজয় শেষে তিনি সেখানে উপনীত হইয়াছিলেন। অনুরূপ কথা আছে আবান (রা) সম্পর্কে। তাঁহাকে রাসূলুল্লাহ (স) একটি সারিয়‍্যাতে প্রেরণ করিয়াছিলেন। তিনিও সেখান হইতে খায়বার আগমন করেন। তিনিও বিজয় লাভের পরে পৌঁছিয়াছিলেন। তাঁহারা দুইজন গনীমতে অংশীদার হইবার কামনা করিয়াছিলেন। কিন্তু রাসূলুল্লাহ (স) তাঁহাদিগকে অংশ দেন নাই (আসাহহুস সিয়ার, প্রাগুক্ত)।
ইবন হিশাম ইবন ইসহাকের উদ্ধৃতি দিয়া বলেন, খায়বারের সম্পদরাশি অর্থাৎ আশ-শিক্ক, আন-নাতা, আল-কাতীবা ভাগ-বণ্টন করা হয়। আশ-শিক্ক ও আন-নাতা দুর্গে মুসলমানদের অংশ ধার্য করা হয়। আল-কাতীবায় আল্লাহ্র নামে "খুমুস” (এক-পঞ্চমাংশ) রাসূলুল্লাহ (স)-এর অংশ, তাঁহার নিকটাত্মীয়গণ, ইয়াতীম ও মিসকীনগণের অংশ, নবী সহধর্মিনীগণের ভাতা, রাসূলুল্লাহ (স) ও ফাদাকবাসিদের মধ্যে সন্ধির মাধ্যমরূপে যাহারা কাজ করিয়াছিলেন তাহাদের ভাতা ধার্য হয়। ইহাদিগের মধ্যে মুহায়্যা ইন্ন মাস'উদ (রা)-কে রাসূলুল্লাহ (স) ত্রিশ ওয়াসাক যব এবং ত্রিশ ওয়াসার খেজুর দান করিয়াছিলেন। আশ-শিক্ক ও আন-নাতা দুর্গ দুইটিকে ১৮টি ভাগে বিভক্ত করা হয়। তন্মধ্যে আন-নাতায় পাঁচ ভাগ ও আশ-শিক্ক দুর্গে তের ভাগ ছিল। এই আঠার অংশকে মোট আঠার শত অংশে বণ্টন করা হয়। সর্বমোট আঠার শত অংশকে আঠারটি ইউনিটে ভাগ করিয়া দেওয়া হয়। ইউনিটগুলি ছিল নিম্নলিখিত নামেঃ
১। 'আলী ইব্‌ন আবী তালিব (রা); ২। যুবায়র ইবনুল 'আওয়াম (রা); ৩। তালহা ইব্‌ 'উবায়দিল্লাহ (রা); ৪। 'উমার ইবনুল খাত্তাব (রা); ৫। 'আবদুর রাহমান ইবন 'আওফ (রা); ৬। 'আসিম ইবন 'আদী (রা); ৭। উসায়দ ইবন হুদায়র (রা); ৮। আল-হারিছ ইবনুল খাযরাজ (রা); ৯। না'ঈম (রা); ১০। বানু বায়াদা; ১১। বানু 'উবায়দ; ১২। বানু হারাম; ১৩। 'উবায়দুস সাহাম; ১৪। বানূ সা'ইদা; ১৫। বানূ গিফার ও আসলাম; ১৬। বানু নাজ্জার; ১৭। বানু হারিছা ও ১৮। বানু আওস।
আন-নাতা দুর্গের পাঁচটি ইউনিট ছিল। সর্বপ্রথম খায়বারের যেই ইউনিটটি পৃথক করা হয় তাহা হইল আন-নাতা দুর্গের যুবায়র ইবনুল 'আওয়াম (রা)-এর উপদুর্গ। ইহাতে খায়বারের খুওয়া ও পার্শ্ববর্তী গ্রাম দুইটি ছিল। দ্বিতীয় পর্যায়ে বায়াদা ইউনিট, তৃতীয় পর্যায়ে উসায়দ ইব্‌ন হুদায়র (রা)-এর ইউনিট, চতুর্থ পর্যায়ে বানু হারিছ ইব্‌ন খাযরাজের ইউনিট, পঞ্চম পর্যায়ে না'ঈমের ইউনিট। ইহাতে বানু 'আওফ ইব্‌ন খাযরাজ মুযায়না ও তাহাদিগের অংশীদারগণের ভাগ ছিল। এই স্থানেই মাহমূদ ইব্‌ন মাসলামা শহীদ হন। ইহার পর আশ-শিক্ক দুর্গ বণ্টনের পালা আসে। ইহা হইতে সর্বপ্রথম 'আসিম ইব্‌ন আদী (রা)-এর ইউনিট পৃথক করিয়া দেওয়া হয়। তাহারা ছিলেন 'আজলান গোত্রের লোক। রাসূলুল্লাহ (স)-এর অংশ ছিল তাহাদিগের সাথেই। তারপর পর্যায়ক্রমে 'আবদুর রাহমান ইবন 'আওফের ইউনিট, সা'ইদা, নাজ্জার, 'আলী ইব্‌ন আবী তালিব (রা), তালহা ইবন উবায়দিল্লাহ, গিফার ও আসলামের ইউনিট, উমার ইবনুল খাত্তাব (রা)-এর ইউনিট, সালামা ইবন উবায়দ ও বানু হারামের ইউনিটদ্বয়, হারিছার ইউনিট, উবায়দুস সাহ্হামের ইউনিট, আওসের ইউনিট। ইহা আল-লাফীফের ইউনিট। ইহাতে জুহায়না এবং সমস্ত আরব গোত্রসমূহের যাহারা খায়বারে অংশগ্রহণ করিয়াছিলেন তাহাদিগের অংশ ছিল। ইহার পর রাসূলুল্লাহ (স) আল-কাতীবা দুর্গ বণ্টনে মনোনিবেশ করেন। ইহা ছিল "খাস" উপত্যকা। এই প্রান্তরটি রাসূলুল্লাহ (স) তাঁহার আত্মীয়-স্বজন, সহধর্মিনীগণ ও অন্যান্য নারী-পুরুষগণের মধ্যে নিম্নরূপে বণ্টন করেন:
১। নবী তনয়া ফাতিমা (রা) ২০০ ওয়াসাক; ২। 'আলী ইব্‌ন আবী তালিব (রা) ১০০ ওয়াসাক; ৩। উসামা ইব্‌ন যায়দ (রা) ২০০ ওয়াসাক ফসল এবং ৫০ ওয়াসাক খেজুর; ৪। উম্মুল মুমিনীন 'আইশা (রা) ২০০ ওয়াসাক; ৫। আবূ বাক্স ইন্ন আবী কুহাফা (রা) ১০০ ওয়াসাক; ৬। 'আকীল ইব্‌ন আবী তালিব (রা) ১৪০ ওয়াসাক; ৭। বানূ জা'ফর (রা) (জা'ফার পুত্রগণ) ৫০ ওয়াসাক; ৮। রাবী'আ ইবনুল হারিছ (রা) ১০০ ওয়াসাক; ৯। সালত ইন্ন মাখরামা (রা), শুধু সালত-কে ৪০ ওয়াসাক ও তাঁহার দুই পুত্র ১০০ ওয়াসাক; ১০। আবূ নাবকা 'আলকামা ইবনুল মুত্তালিব (রা) ৫০ ওয়াসাক; ১১। রুকানা ইব্‌ন ইয়াযীদ ৫০ ওয়াসাক; ১২। কায়স ইব্‌ন মাখরামা ৩০ ওয়াসাক; ১৩। আবুল কাসিম ইব্‌ন মাখরামা ৪০ ওয়াসাক; ১৪। 'উবায়দা ইবনুল হারিছ (রা)-এর কন্যা ও হুসায়ন ইব্‌ন হারিছের কন্যা ১০০ ওয়াসাক; ১৫। উবায়দ ইব্‌ন 'আব্দ ইয়াযীদ (রা)-এর পুত্রগণ ৬০ ওয়াসাক; ১৬। আওস ইব্‌ন মাখরামার পুত্র ৩০ ওয়াসাক; ১৭। মিসতাহ ইব্‌ন উছাছা ও ইলয়াসের পুত্র ৫০ ওয়াসাক; ১৮। উমমু রুমায়ছা ৪০ ওয়াসাক; ১৯। না'ঈম ইব্‌ন হিন্দ ৩০ ওয়াসাক; ২০ বুহায়না বিনুতুল হারিছ ৩০ ওয়াসাক; ২১। 'উজায়র ইব্‌ন 'আব্দ ইয়াযীদ ৩০ ওয়াসাক; ২২। উম্মুল হাকাম ৩০ ওয়াসাক; ২৩। জামানা বিন্ত আবী তালিব ৩০ ওয়াসাক; ২৪। ইবনুল আরকাম ৫০ ওয়াসাক; ২৫। 'আবদুর রাহমান ইব্‌ন আবী বাক্স ৪০ ওয়াসাক; ২৬। হামনা বিন্ত জাহ্‌শ ৩০ ওয়াসাক; ২৭। উন্মু যুবায়র ৪০ ওয়াসাক; ২৮। দাবা'আ বিন্ত যুবায়র ৪০ ওয়াসাক; ২৯। আবূ খুনায়সের পুত্র ৩০ ওয়াসাক; ৩০। উম্মু তালিব ৪০ ওয়াসাক; ৩১। আবূ বুসরা ২০ ওয়াসাক; ৩২। নুমায়লা কালবী ৫০ ওয়াসাক; ৩৩। 'আবদুল্লাহ ইব্‌ন ওয়াহ্ব ও তাঁহার দুই কন্যা ৯০ ওয়াসাক; ইহা হইতে তাঁহার দুই পুত্রের ৪০ ওয়াসাক; ৩৪। উম্মু হাবীবা বিন্ত জাহশ ৩০ ওয়াসাক; ৩৫। লামকু ইব্‌ন 'আবদা ৩০ ওয়াসাক; ৩৬। উন্মুহাতুল মু'মিনীন ৭০০ ওয়াসাক।

খায়বারের যুদ্ধলব্ধ সম্পদের মধ্যে সেখানকার ভূমিই ছিল উল্লেখযোগ্য। রাসূলুল্লাহ (স) সেখানকার ভূমি বণ্টন করেন নিম্নরূপঃ আবূ দাউদে বুশায়র ইব্‌ن য়াসার হইতে বর্ণিত আছে যে,. সমুদয় ৩৬ ভাগে বিভক্ত করা হয়। তাহার পর তন্মধ্যে অর্ধাংশ অর্থাৎ আঠার অংশ বণ্টন না করিয়া রাষ্ট্রের মালিকানায় রাখা হয় যাহাতে ইহা হইতে প্রতিনিধি দল ও দূত প্রেরণ এবং অন্যান্য জাতীয় ও রাষ্ট্রীয় প্রয়োজন মিটানোর জন্য ব্যয় নির্বাহ করা যায়। অবশিষ্ট আঠার ভাগের প্রত্যেক ভাগকে ১০০ ভাগ করিয়া বণ্টন করা হয় (باب ماجاء في حكم ارض خيبر রাহীমিয়া পাবঃ দেওবন্দ, ২খ., পৃ. ৭৭)। ইব্‌ন শিহাব বলেন, কেবল হুদায়বিয়ার সন্ধিতে অংশগ্রহণকারিদের মধ্যেই এই অংশগুলি বণ্টন করা হয়। তাহাদের মধ্যে খায়বারে উপস্থিত অনুপস্থিত সকলকেই ভাগ দেওয়া হয়। সীরাতবিদগণ বলেন, হুদায়বিয়ার সন্ধিতে অংশগ্রহণকারিগণের মধ্যে কেবল জাবির ইব্‌ন আবদিল্লাহ (রা) খায়বারে অংশগ্রহণ করেন নাই, কিন্তু তাহাকে ইহার অংশ প্রদান করা হয়। যে অর্ধাংশ রাষ্ট্রের মালিকানায় পৃথক করিয়া রাখা হয় এবং বণ্টন করা হয় নাই তন্মধ্যে কাতিবা, ওয়াতীহ, সুলালিম এবং তৎসংলগ্ন ভূমি অন্তর্ভুক্ত ছিল এবং যে অর্ধাংশ বণ্টন করা হয় তন্মধ্যে শাক ও নাতা এবং তৎসংলগ্ন ভূমি অন্তর্ভুক্ত ছিল (আবূ দাউদ, প্রাগুক্ত)। বণ্টনযোগ্য আঠারটি অংশ কিভাবে বণ্টিত হয় এই ব্যাপারে ভিন্ন ভিন্ন বর্ণনা পাওয়া যায়। বুখারী ও মুسলিমে বর্ণিত আছে—
عَنِ ابْنِ عُمَرَ قَالَ قَسَمَ رَسُولُ اللهِ ﷺ يَوْمَ خَيْبَرَ لِلْفَرَسِ سَهْمَيْنِ وَلِلرَّاجِلِ سَهْما .
"ইবন উমার (রা) বলেন, রাসূলুল্লাহ (স) খায়বার দিবসে অশ্বারোহীর জন্য দুই ভাগ ও পদাতিকের জন্য এক ভাগ হিসাবে বণ্টন করিয়াছিলেন" (বুখারী, কিতাবুল মাগাযী, বাব গাযওয়াতি খায়বার; মুসলিম, বাবু কায়ফিয়্যাতু কিসমাতিল গানীমাতি বায়নাল হাদিরীন)।
এই হাদীছ সম্পর্কে নাফে' (র)-এর ব্যাখ্যা হইল, যোদ্ধার সহিত যখন অশ্ব থাকিবে তখন তাহার অংশ হইবে তিনটি। অশ্ব না হইলে তাহার জন্য একটি অংশ (বুখারী, প্রাগুক্ত)। চৌদ্দ শত ব্যক্তির মধ্যে চৌদ্দটি অংশ বণ্টন করা হয়। কারণ এক একটি অংশ এক শতটি ছোট অংশে বিভক্ত ছিল। যুদ্ধে দুই শত অশ্ব ছিল। প্রত্যেক অশ্বারোহী দুইটি করিয়া ছোট অংশ লাভ করেন। এইজন্য চারটি বড় অংশ দুই শত অশ্বারোহীর জন্য নির্দিষ্ট করা হয়। এইভাবে আঠার অংশ পূর্ণ হয়। কিন্তু আবূ দাউদে মুজাম্মি' আল-আনসারী (রা) হইতে ইহার বিপরীত একটি বর্ণনা আছে:
قَالَ قُسِمَتْ خَيْبَرُ عَلَى أَهْلِ الْحُدَيْبِيَّةِ فَقَسَمَهَا رَسُولُ اللهِ ﷺ ثَمَانِيَةَ عَشَرَ سَهُمَا وَكَانَ الْجَيْشُ أَلْفًا وَخَمْسَ مِائَةٍ فِيهِمْ ثَلتُ مِائَةٍ فَارِسٍ فَأَعْطَى الْفَارِسَ سَهْمَيْنِ وَأَعْطَى الرَّاحِلَ سَهما .
(کتاب الخراج مَا جَاء فِي حُكْمِ أَرْضِ خَيْبَرَ )
মুজাম্মি' ইবন হারিছা (রা)-এর বর্ণনায় তিনটি বিষয়ে ভিন্নতা পরিলক্ষিত হয়। প্রথমত, অশ্বারোহীর জন্য ছোট একটি অংশ, দুইটি অংশ নয়। দ্বিতীয়ত, লোকসংখ্যা ছিল পনর শত এবং তৃতীয়ত, অশ্বের সংখ্যা ছিল তিন শত। এই হিসাবে পনরটি বড় অংশ পনর শত লোকের মধ্যে এবং তিন শত অশ্বের মধ্যে তিনটি অংশ। এইভাবে মোট আঠার অংশ পূর্ণ হয়।
ইমাম নাওয়াবী উল্লেখ করেন, অশ্বের অংশের মধ্যে মতপার্থক্য রহিয়াছে। অধিকাংশের মতে অশ্বের জন্য দুই অংশ। ইহাতে যাহারা পদাতিক ছিলেন তাহাদের মাথাপিছু এক অংশ এবং অশ্বারোহীদের জন্য তিন অংশ হইয়া যায়। এক অংশ আরোহীর আর দুই অংশ অশ্বের। ইব্‌ন আব্বাস (রা), মুজাহিদ, হাসান, ইব্‌ন সীরীন, উমার ইব্‌ন আবদিল আযীয, ইমাম মালিক, ইমাম আওযাঈ, সুফ্যান ছাওরী, শাফিঈ, লায়ছ, ইমাম আবূ ইউসুফ, ইমাম মুহাম্মাদ, ইমাম আহমাদ, ইসহাক, আবু উবায়দ ইব্‌ন জারীর (র) প্রমুখ এই মত পোষণ করেন। কিন্তু ইমাম আবূ হানীফা (র) বলেন, অশ্বরোহীর জন্য দুই অংশ হইবে, এক অংশ আরোহীর আর এক অংশ তাহার অশ্বের। বলা হয়, ইহার পক্ষে আলী (রা) ও আবূ মূসা আল-আশআরী (রা) ব্যতীত অন্য কাহারও কোন বর্ণনা নাই (নাওয়াবী, হাশিয়া মুসলিম, ২খ., পৃ. ৯২)। ইমাম আবূ হানীফা (র) মুজাম্মি' ইব্‌ন হারিছা (রা)-এর বর্ণনাকে দলীল হিসাবে পেশ করেন। কিন্তু ইমাম ইব্‌ن কায়্যিম (র) বলেন, ইমাম শাফি'ঈ (র)-এর মতে মুজাম্মি' ইব্‌ন হারিছা (রা)-এর অবস্থা পরিজ্ঞাত নয়। দ্বিতীয় দলীল এই যে, আবদুল্লাহ আল-উমারী নাফে' হইতে এবং তিনি ইব্‌ن উমার (রা) হইতে রিওয়ায়াত করেন যে, অশ্বারোহীর দুই অংশ এবং পদাতিকের এক অংশ। কিন্তু উবায়দুল্লাহ ইবন উমার নাফে' হইতে এবং তিনি ইব্‌ن উমার হইতে রিওয়ায়াত করেন যে, অশ্বের জন্য দুই অংশ এবং আরোহীর জন্য এক অংশ। সহীহ বুখারী ও মুসলিমের রিওয়ায়াত দ্বারা পরিষ্কার ভাবে বুঝা যায় যে, অশ্বারোহীর জন্য তিন অংশঃ দুই অংশ অশ্বের জন্য আর এক অংশ আরোহীর জন্য। উবায়দুল্লাহ তদীয় ভ্রাতা হইতে স্মরণশক্তিতে অগ্রণী ছিলেন (আসাহহুস সিয়ার, প্রাগুক্ত, পৃ. ১৯৭)। আবদুল্লাহ ও উবায়দুল্লাহ ভ্রাতৃদ্বয়ের রিওয়ায়াতের এই বিভিন্নতা সম্পর্কে ইমাম শাফি'ঈ (র) বলেন, সম্ভবত নাফে' (র) অশ্বের কথা (فرس) উল্লেখ করিয়াছিলেন এবং ইহাকে আবদুল্লাহ অশ্বারোহী (فارس) জ্ঞান করিয়াছেন। ইহা ছাড়া ওয়াকিদীর কোন কোন বর্ণনায় অশ্বারোহীর দুই অংশের কথা উল্লেখ আছে। কিন্তু সহীহ হাদীছ গ্রন্থের রিওয়ায়াতের মুকাবিলায় ওয়াকিদীর রিওয়ায়াতসমূহের দ্বারা দলীল পেশ করা শুদ্ধ হইতে পারে না।
মুজাম্মি' ইবন হারিছা (র)-এর রিওয়ায়াতে তিন শতটি ঘোড়ার কথা বলা হইয়াছে। কিন্তু জাবির ইবন 'আবদিল্লাহ, ইবন 'আব্বাস (রা), সালিহ্ ইব্‌ن কায়সান, বিশর ইবন ইয়াসার এবং সকল সীরাতবিদ বলেন, দুই শত ঘোড়া ছিল। এখন যদি দুই শত ঘোড়ার জন্য বড় চারটি অংশ পৃথক করা হয় তাহা হইলে অবশিষ্ট থাকিবে চৌদ্দ অংশ। এই কারণে সৈন্যসংখ্যা চৌদ্দ শত হওয়াই বাঞ্ছনীয়। অধিকাংশের মতে হুদায়বিয়াতে অংশগ্রহণকারীর সংখ্যাই ছিল অনুরূপ। কিন্তু যদি লোকসংখ্যা পনর শত হইয়াই থাকে তাহা হইলে সম্ভবত এক শত হইবে দাস-দাসী যাহাদিগকে ভূমির অংশ প্রদান করা হয় নাই। মোটকথা অংশ প্রাপ্তদের সংখ্যা ছিল চৌদ্দ শত (আসাহহুস সিয়ার, প্রাগুক্ত)।
অবশ্য একটি সমস্যা এই যে, খায়বার বিজয়ের প্রাককালে জাহাজ আরোহীগণের আগমন ঘটিয়াছিল। অর্থাৎ ইহারা ছিলেন জা'ফার ও আবূ মূসা আশ'আরী (রা) এবং তাঁহাদের সঙ্গীগণ যাঁহাদের সংখ্যা ছিল শতাধিক। সহীহ বুখারীতে আবূ মূসা (রা) হইতে বর্ণিত আছে, তিনি বলেন, রাসূলুল্লাহ (স) আমাদিগকে অংশ প্রদান করিয়াছিলেন। এইজন্য উপরে বর্ণিত অংশ বণ্টনের হিসাব যথার্থ হয় নাই। ইহার জওয়াবে বলা হয়, সম্ভবত তাহাদিগকে শুধু অস্থাবর সম্পত্তির অংশ প্রদান করা হইয়াছিল, স্থাবর সম্পত্তির (ভূমির) অংশ প্রদান করা হয় নাই। কারণ ইহা ছিল কেবলমাত্র বায়'আতুর রিদওয়ানে অংশগ্রহণকারিগণের পুরস্কার। ইহা ছাড়া রাসূলুল্লাহ (س) যখন খায়বারের উদ্দেশে যাত্রা করেন তখন আবূ হুরায়রা (রা) সবেমাত্র মদীনায় আগমন করেন এবং সিবা' ইন্ন 'উরফুতা (রা)-এর ইমামতিতে সালাত আদায় করেন। তবে বিজয় শেষে তিনি সেখানে উপনীত হইয়াছিলেন। অনুরূপ কথা আছে আবান (রা) সম্পর্কে। তাঁহাকে রাসূলুল্লাহ (س) একটি সারিয়‍্যাতে প্রেরণ করিয়াছিলেন। তিনিও সেখান হইতে খায়বার আগমন করেন। তিনিও বিজয় লাভের পরে পৌঁছিয়াছিলেন। তাঁহারা দুইজন গনীমতে অংশীদার হইবার কামনা করিয়াছিলেন। কিন্তু রাসূলুল্লাহ (س) তাঁহাদিগকে অংশ দেন নাই (আসাহহুস সিয়ার, প্রাগুক্ত)।
ইবন হিশাম ইবন ইসহাকের উদ্ধৃতি দিয়া বলেন, খায়বারের সম্পদরাশি অর্থাৎ আশ-শিক্ক, আন-নাতা, আল-কাতীবা ভাগ-বণ্টন করা হয়। আশ-শিক্ক ও আন-নাতা দুর্গে মুসলমানদের অংশ ধার্য করা হয়। আল-কাতীবায় আল্লাহ্র নামে "খুমুস” (এক-পঞ্চমাংশ) রাসূলুল্লাহ (س)-এর অংশ, তাঁহার নিকটাত্মীয়গণ, ইয়াতীম ও মিসকীনগণের অংশ, নবী সহধর্মিনীগণের ভাতা, রাসূলুল্লাহ (স) ও ফাদাকবাসিদের মধ্যে সন্ধির মাধ্যমরূপে যাহারা কাজ করিয়াছিলেন তাহাদের ভাতা ধার্য হয়। ইহাদিগের মধ্যে মুহায়্যা ইন্ন মাস'উদ (রা)-কে রাসূলুল্লাহ (স) ত্রিশ ওয়াসাক যব এবং ত্রিশ ওয়াসার খেজুর দান করিয়াছিলেন। আশ-শিক্ক ও আন-নাতা দুর্গ দুইটিকে ১৮টি ভাগে বিভক্ত করা হয়। তন্মধ্যে আন-নাতায় পাঁচ ভাগ ও আশ-শিক্ক দুর্গে তের ভাগ ছিল। এই আঠার অংশকে মোট আঠার শত অংশে বণ্টন করা হয়। সর্বমোট আঠার শত অংশকে আঠারটি ইউনিটে ভাগ করিয়া দেওয়া হয়। ইউনিটগুলি ছিল নিম্নলিখিত নামেঃ
১। 'আলী ইব্‌ন আবী তালিব (রা); ২। যুবায়র ইবনুল 'আওয়াম (রা); ৩। তালহা ইব্‌ 'উবায়দিল্লাহ (রা); ৪। 'উমার ইবনুল খাত্তাব (রা); ৫। 'আবদুর রাহমান ইবন 'আওف (রা); ৬। 'আসিম ইবন 'আদী (রা); ৭। উসায়د ইবন হুদায়ر (রা); ৮। আল-হারিছ ইবনুল খাযরাজ (রা); ৯। না'ঈম (রা); ১০। বানু বায়াদা; ১১। বানু 'উবায়د; ১২। বানু হারাম; ১৩। 'উবায়দুস সাহাম; ১৪। বানূ সা'ইদা; ১৫। বানূ গিফার ও আসলাম; ১৬। বানু নাজ্জার; ১৭। বানু হারিছা ও ১৮। বানু আওس।
আন-নাতা দুর্গের পাঁচটি ইউনিট ছিল। সর্বপ্রথম খায়বারের যেই ইউনিটটি পৃথক করা হয় তাহা হইল আন-নাতা দুর্গের যুবায়র ইবনুল 'আওয়াম (রা)-এর উপদুর্গ। ইহাতে খায়বারের খুওয়া ও পার্শ্ববর্তী গ্রাম দুইটি ছিল। দ্বিতীয় পর্যায়ে বায়াদা ইউনিট, তৃতীয় পর্যায়ে উসায়د ইব্‌ن হুদায়ر (রা)-এর ইউনিট, চতুর্থ পর্যায়ে বানু হারিছ ইব্‌ن খাযরাজের ইউনিট, পঞ্চম পর্যায়ে না'ঈমের ইউনিট। ইহাতে বানু 'আওف ইب্‌ن খাযরাজ মুযায়نا ও তাহাদিগের অংশীদারগণের ভাগ ছিল। এই স্থানেই মাহমূদ ইব্‌ن মাসলামা শহীদ হন। ইহার পর আশ-শিক্ক দুর্গ বণ্টনের পালা আসে। ইহা হইতে সর্বপ্রথম 'আসিম ইب্‌ن আদী (রা)-এর ইউনিট পৃথক করিয়া দেওয়া হয়। তাহারা ছিলেন 'আজলান গোত্রের লোক। রাসূলুল্লাহ (س)-এর অংশ ছিল তাহাদিগের সাথেই। তারপর পর্যায়ক্রমে 'আবদুর রাহমান ইب্‌ن 'আওف (را)-এর ইউনিট, সা'ইদা, নাজ্জার, 'আলী ইب্‌ن আবী তালিব (را), তালহা ইব্‌ن উবায়دিল্লাহ, গিফার ও আসলামের ইউনিট, উমার ইب্‌ن খাত্তাব (را)-এর ইউনিট, সালামা ইب্‌ن উবায়د ও বানু হারামের ইউনিটদ্বয়, হারিছার ইউনিট, উবায়دوس সাহামের ইউনিট, আওসের ইউনিট। ইহা আল-লাফীফের ইউনিট। ইহাতে জুহায়نا এবং সমস্ত আরব গোত্রসমূহের যাহারা খায়বারে অংশগ্রহণ করিয়াছিলেন তাহাদিগের অংশ ছিল। ইহার পর রাসূলুল্লাহ (س) আল-কাতীবা দুর্গ বণ্টনে মনোনিবেশ করেন। ইহা ছিল "খাস" উপত্যকা। এই প্রান্তরটি রাসূলুল্লাহ (س) তাঁহার আত্মীয়-স্বজন, সহধর্মিনীগণ ও অন্যান্য নারী-পুরুষগণের মধ্যে নিম্নরূপে বণ্টন করেন:
১। নবী তনয়া ফাতিমা (রা) ২০০ ওয়াসাক; ২। 'আলী ইব্‌ن আবী তালিব (را) ১০০ ওয়াসাক; ৩। উসামা ইب্‌ن যায়د (را) ২০০ ওয়াসাক ফসল এবং ৫০ ওয়াসাক খেজুর; ৪। উম্মুল মুমিনীন 'আইশা (را) ২০০ ওয়াসাক; ৫। আবূ বাক্স ইন্ন আবী কুহাফা (را) ১০০ ওয়াসাক; ৬। 'আকীল ইب্‌ن আবী তালিব (را) ১৪০ ওয়াসাক; ৭। বানূ জা'ফর (را) (জা'ফার পুত্রগণ) ৫০ ওয়াসাক; ৮। রাবী'আ ইবনুল হারিছ (را) ১০০ ওয়াসাক; ৯। সালت ইন্ন মাখরামা (را), শুধু সালت-কে ৪০ ওয়াসাক ও তাঁহার দুই পুত্র ১০০ ওয়াসাক; ১০। আবূ নাবকা 'আলকামা ইবনুল মুত্তালিব (রা) ৫০ ওয়াসাক; ১১। রুকানা ইب্‌ن ইয়াযید ৫০ ওয়াসাক; ১২। কায়س ইب্‌ن মাখরামা ৩০ ওয়াসাক; ১৩। আবুল কাসিম ইব্‌ن মাখরামা ৪০ ওয়াসাক; ১৪। 'উবায়دا ইবনুল হারিছ (রা)-এর কন্যা ও হুসায়ন ইب্‌ن হারিছের কন্যা ১০০ ওয়াসাক; ১৫। উবায়د ইب্‌ن 'আব্দ ইয়াযید (রা)-এর পুত্রগণ ৬০ ওয়াসাক; ১৬। আওس ইب্‌ن মাখরামার পুত্র ৩০ ওয়াসাক; ১৭। মিসতাহ ইব্‌ن উছাছা ও ইলয়াসের পুত্র ৫০ ওয়াসাক; ১৮। উমमु রুমায়ছা ৪০ ওয়াসাক; ১৯। না'ঈم ইب্‌ن হিন্দ ৩০ ওয়াসাক; ২০ বুহায়نا বিনুতুল হারিছ ৩০ ওয়াসাক; ২১। 'উজায়ر ইب্‌ن 'আব্দ ইয়াযید ৩০ ওয়াসাক; ২২। উম্মুল হাকাম ৩০ ওয়াসাক; ২৩। জামানা বিন্ত আবী তালিব ৩০ ওয়াসাক; ২৪। ইবনুল আরকাম ৫০ ওয়াসাক; ২৫। 'আবদুর রাহমান ইব্‌ن আবী বাক্স ৪০ ওয়াসাক; ২৬। হামনা বিন্ত জাহ্‌শ ৩০ ওয়াসাক; ২৭। উন্মু যুবায়ر ৪০ ওয়াসাক; ২৮। দাবা'আ بিন্ত যুবায়ر ৪০ ওয়াসাক; ২৯। আবূ খুনায়সের পুত্র ৩০ ওয়াসাক; ৩০। উম্মু তালিব ৪০ ওয়াসাক; ৩১। আবূ বুসرا ২০ ওয়াসাক; ৩২। নুমায়লা কালবী ৫০ ওয়াসাক; ৩৩। 'আবদুল্লাহ ইب্‌ن ওয়াহ্ব ও তাঁহার দুই কন্যা ৯০ ওয়াসাক; ইহা হইতে তাঁহার দুই পুত্রের ৪০ ওয়াসাক; ৩৪। উম্মু হাবীবা বিন্ত জাহশ ৩০ ওয়াসাক; ৩৫। লামকু ইب্‌ن 'আবদা ৩০ ওয়াসাক; ৩৬। উন্মুহাতুল মু'মিনীন ৭০০ ওয়াসাক।

খায়বারের যুদ্ধলব্ধ সম্পদের মধ্যে সেখানকার ভূমিই ছিল উল্লেখযোগ্য। রাসূলুল্লাহ (স) সেখানকার ভূমি বণ্টন করেন নিম্নরূপঃ আবূ দাউদে বুশায়র ইব্‌ন য়াসার হইতে বর্ণিত আছে যে,. সমুদয় ৩৬ ভাগে বিভক্ত করা হয়। তাহার পর তন্মধ্যে অর্ধাংশ অর্থাৎ আঠার অংশ বণ্টন না করিয়া রাষ্ট্রের মালিকানায় রাখা হয় যাহাতে ইহা হইতে প্রতিনিধি দল ও দূত প্রেরণ এবং অন্যান্য জাতীয় ও রাষ্ট্রীয় প্রয়োজন মিটানোর জন্য ব্যয় নির্বাহ করা যায়। অবশিষ্ট আঠার ভাগের প্রত্যেক ভাগকে ১০০ ভাগ করিয়া বণ্টন করা হয় (باب ماجاء في حكم ارض خيبر রাহীমিয়া পাবঃ দেওবন্দ, ২খ., পৃ. ৭৭)। ইব্‌ন শিহাব বলেন, কেবল হুদায়বিয়ার সন্ধিতে অংশগ্রহণকারিদের মধ্যেই এই অংশগুলি বণ্টন করা হয়। তাহাদের মধ্যে খায়বারে উপস্থিত অনুপস্থিত সকলকেই ভাগ দেওয়া হয়। সীরাতবিদগণ বলেন, হুদায়বিয়ার সন্ধিতে অংশগ্রহণকারিগণের মধ্যে কেবল জাবির ইব্‌ন আবদিল্লাহ (রা) খায়বারে অংশগ্রহণ করেন নাই, কিন্তু তাহাকে ইহার অংশ প্রদান করা হয়। যে অর্ধাংশ রাষ্ট্রের মালিকানায় পৃথক করিয়া রাখা হয় এবং বণ্টন করা হয় নাই তন্মধ্যে কাতিবা, ওয়াতীহ, সুলালিম এবং তৎসংলগ্ন ভূমি অন্তর্ভুক্ত ছিল এবং যে অর্ধাংশ বণ্টন করা হয় তন্মধ্যে শাক ও নাতা এবং তৎসংলগ্ন ভূমি অন্তর্ভুক্ত ছিল (আবূ দাউদ, প্রাগুক্ত)। বণ্টনযোগ্য আঠারটি অংশ কিভাবে বণ্টিত হয় এই ব্যাপারে ভিন্ন ভিন্ন বর্ণনা পাওয়া যায়। বুখারী ও মুসলিমে বর্ণিত আছে—
عَنِ ابْنِ عُمَرَ قَالَ قَسَمَ رَسُولُ اللهِ ﷺ يَوْمَ خَيْبَرَ لِلْفَرَسِ سَهْمَيْنِ وَلِلرَّاجِلِ سَهْما .
"ইবন উমার (রা) বলেন, রাসূলুল্লাহ (স) খায়বার দিবসে অশ্বারোহীর জন্য দুই ভাগ ও পদাতিকের জন্য এক ভাগ হিসাবে বণ্টন করিয়াছিলেন" (বুখারী, কিতাবুল মাগাযী, বাব গাযওয়াতি খায়বার; মুসলিম, বাবু কায়ফিয়্যাতু কিসমাতিল গানীমাতি বায়নাল হাদিরীন)।
এই হাদীছ সম্পর্কে নাফে' (র)-এর ব্যাখ্যা হইল, যোদ্ধার সহিত যখন অশ্ব থাকিবে তখন তাহার অংশ হইবে তিনটি। অশ্ব না হইলে তাহার জন্য একটি অংশ (বুখারী, প্রাগুক্ত)। চৌদ্দ শত ব্যক্তির মধ্যে চৌদ্দটি অংশ বণ্টন করা হয়। কারণ এক একটি অংশ এক শতটি ছোট অংশে বিভক্ত ছিল। যুদ্ধে দুই শত অশ্ব ছিল। প্রত্যেক অশ্বারোহী দুইটি করিয়া ছোট অংশ লাভ করেন। এইজন্য চারটি বড় অংশ দুই শত অশ্বারোহীর জন্য নির্দিষ্ট করা হয়। এইভাবে আঠার অংশ পূর্ণ হয়। কিন্তু আবূ দাউদে মুজাম্মি' আল-আনসারী (রা) হইতে ইহার বিপরীত একটি বর্ণনা আছে:
قَالَ قُسِمَتْ خَيْبَرُ عَلَى أَهْلِ الْحُدَيْبِيَّةِ فَقَسَمَهَا رَسُولُ اللهِ ﷺ ثَمَانِيَةَ عَشَرَ سَهُمَا وَكَانَ الْجَيْشُ أَلْفًا وَخَمْسَ مِائَةٍ فِيهِمْ ثَلتُ مِائَةٍ فَارِسٍ فَأَعْطَى الْفَارِسَ سَهْمَيْنِ وَأَعْطَى الرَّاحِلَ سَهما .
(کتاب الخراج مَا جَاء فِي حُكْمِ أَرْضِ خَيْبَرَ )
মুজাম্মি' ইবন হারিছা (রা)-এর বর্ণনায় তিনটি বিষয়ে ভিন্নতা পরিলক্ষিত হয়। প্রথমত, অশ্বারোহীর জন্য ছোট একটি অংশ, দুইটি অংশ নয়। দ্বিতীয়ত, লোকসংখ্যা ছিল পনর শত এবং তৃতীয়ত, অশ্বের সংখ্যা ছিল তিন শত। এই হিসাবে পনরটি বড় অংশ পনর শত লোকের মধ্যে এবং তিন শত অশ্বের মধ্যে তিনটি অংশ। এইভাবে মোট আঠার অংশ পূর্ণ হয়।
ইমাম নাওয়াবী উল্লেখ করেন, অশ্বের অংশের মধ্যে মতপার্থক্য রহিয়াছে। অধিকাংশের মতে অশ্বের জন্য দুই অংশ। ইহাতে যাহারা পদাতিক ছিলেন তাহাদের মাথাপিছু এক অংশ এবং অশ্বারোহীদের জন্য তিন অংশ হইয়া যায়। এক অংশ আরোহীর আর দুই অংশ অশ্বের। ইব্‌ন আব্বাস (রা), মুজাহিদ, হাসান, ইব্‌ন সীরীন, উমার ইব্‌ন আবদিল আযীয, ইমাম মালিক, ইমাম আওযাঈ, সুফ্যান ছাওরী, শাফিঈ, লায়ছ, ইমাম আবূ ইউসুফ, ইমাম মুহাম্মাদ, ইমাম আহমাদ, ইসহাক, আবু উবায়দ ইব্‌ন জারীর (র) প্রমুখ এই মত পোষণ করেন। কিন্তু ইমাম আবূ হানীফা (র) বলেন, অশ্বরোহীর জন্য দুই অংশ হইবে, এক অংশ আরোহীর আর এক অংশ তাহার অশ্বের। বলা হয়, ইহার পক্ষে আলী (রা) ও আবূ মূসা আল-আশআরী (রা) ব্যতীত অন্য কাহারও কোন বর্ণনা নাই (নাওয়াবী, হাশিয়া মুসলিম, ২খ., পৃ. ৯২)। ইমাম আবূ হানীফা (র) মুজাম্মি' ইব্‌ন হারিছা (রা)-এর বর্ণনাকে দলীল হিসাবে পেশ করেন। কিন্তু ইমাম ইব্‌ন কায়্যিম (র) বলেন, ইমাম শাফি'ঈ (র)-এর মতে মুজাম্মি' ইব্‌ন হারিছা (রা)-এর অবস্থা পরিজ্ঞাত নয়। দ্বিতীয় দলীল এই যে, আবদুল্লাহ আল-উমারী নাফে' হইতে এবং তিনি ইব্‌ন উমার (রা) হইতে রিওয়ায়াত করেন যে, অশ্বারোহীর দুই অংশ এবং পদাতিকের এক অংশ। কিন্তু উবায়দুল্লাহ ইবন উমার নাফে' হইতে এবং তিনি ইব্‌ন উমার হইতে রিওয়ায়াত করেন যে, অশ্বের জন্য দুই অংশ এবং আরোহীর জন্য এক অংশ। সহীহ বুখারী ও মুসলিমের রিওয়ায়াত দ্বারা পরিষ্কার ভাবে বুঝা যায় যে, অশ্বারোহীর জন্য তিন অংশঃ দুই অংশ অশ্বের জন্য আর এক অংশ আরোহীর জন্য। উবায়দুল্লাহ তদীয় ভ্রাতা হইতে স্মরণশক্তিতে অগ্রণী ছিলেন (আসাহহুস সিয়ার, প্রাগুক্ত, পৃ. ১৯৭)। আবদুল্লাহ ও উবায়দুল্লাহ ভ্রাতৃদ্বয়ের রিওয়ায়াতের এই বিভিন্নতা সম্পর্কে ইমাম শাফি'ঈ (র) বলেন, সম্ভবত নাফে' (র) অশ্বের কথা (فرس) উল্লেখ করিয়াছিলেন এবং ইহাকে আবদুল্লাহ অশ্বারোহী (فارس) জ্ঞান করিয়াছেন। ইহা ছাড়া ওয়াকিদীর কোন কোন বর্ণনায় অশ্বারোহীর দুই অংশের কথা উল্লেখ আছে। কিন্তু সহীহ হাদীছ গ্রন্থের রিওয়ায়াতের মুকাবিলায় ওয়াকিদীর রিওয়ায়াতসমূহের দ্বারা দলীল পেশ করা শুদ্ধ হইতে পারে না।
মুজাম্মি' ইবন হারিছা (র)-এর রিওয়ায়াতে তিন শতটি ঘোড়ার কথা বলা হইয়াছে। কিন্তু জাবির ইবন 'আবদিল্লাহ, ইবন 'আব্বাস (রা), সালিহ্ ইব্‌ন কায়সান, বিশর ইবন ইয়াসার এবং সকল সীরাতবিদ বলেন, দুই শত ঘোড়া ছিল। এখন যদি দুই শত ঘোড়ার জন্য বড় চারটি অংশ পৃথক করা হয় তাহা হইলে অবশিষ্ট থাকিবে চৌদ্দ অংশ। এই কারণে সৈন্যসংখ্যা চৌদ্দ শত হওয়াই বাঞ্ছনীয়। অধিকাংশের মতে হুদায়বিয়াতে অংশগ্রহণকারীর সংখ্যাই ছিল অনুরূপ। কিন্তু যদি লোকসংখ্যা পনর শত হইয়াই থাকে তাহা হইলে সম্ভবত এক শত হইবে দাস-দাসী যাহাদিগকে ভূমির অংশ প্রদান করা হয় নাই। মোটকথা অংশ প্রাপ্তদের সংখ্যা ছিল চৌদ্দ শত (আসাহহুস সিয়ার, প্রাগুক্ত)।

লিঙ্ক শেয়ার করুন
close

লিঙ্ক কপি করুন

0:00
0:00