📄 কামূস দুর্গ
কামূস দুর্গ যখন অবরোধ করা হয় তখন রাসূলুল্লাহ (স) প্রচন্ড শিরপীড়ায় আক্রান্ত ছিলেন। ফলে রণাঙ্গনে অংশগ্রহণ করিতে পারেন নাই। সুতরাং এই অবস্থায় মুহাজির কিংবা আনসারদের মধ্য হইতে একজনকে তিনি সেনাপতি নিযুক্ত করিতেন। ইহা ছিল সর্বাপেক্ষা অধিক শক্তিশালী ও দুর্জয় কিল্লা। ফলে অবরোধ দীর্ঘস্থায়ী হয় এবং বিজয় বিলম্বিত হইতে থাকে। একদিন রণাঙ্গনে আবু বকর সিদ্দীক (রা) গমন করেন এবং দুর্গ বিজয়ের আপ্রাণ চেষ্টা করেন, কিন্তু দুর্গ জয় হইল না। রাসূলুল্লাহ (স) ঘোষণা করেন, আগামী কল্য আমি রণাঙ্গনের পতাকা এমন এক ব্যক্তির হাতে তুলিয়া দিব অথবা বলিলেন, আগামী কল্য এমন এক ব্যক্তি পতাকা গ্রহণ করিবে যে আল্লাহ ও রাসূল (স)-কে ভালবাসে এবং আল্লাহ ও রাসূলও তাহাকে ভালবাসেন। তাহাকেই মহান আল্লাহ এই দুর্গ বিজয়ের গৌরব প্রদান করিবেন।
সকল সাহাবী রাত্রিতে পরস্পর আলোচনা করেন যে, কাহার ভাগ্যে আগামী কল্য রণ-পতাকা জুটিবে? সকালে সাহাবীগণের সকলেই এই দুর্লভ ভাগ্যের প্রত্যাশায় রাসূলুল্লাহ (স)-এর নিকট আগমন করেন। তখন তিনি জিজ্ঞাসা করিলেন, 'আলী কোথায়? সকলে বলিলেন, চোখ উঠা রোগের কারণে তাহার চক্ষুতে দারুণ ব্যথা। তিনি আসিতে সক্ষম হইবেন না। রাসূলুল্লাহ (স) বলিলেন, তাহাকে ডাকিয়া আন। অতঃপর তিনি উপস্থিত হইলে রাসূলুল্লাহ (স) স্বীয় মুখ নিঃসৃত লালা তাহার চক্ষুতে লাগাইয়া দিলেন এবং আল্লাহর দরবারে দু'আ করিলেন। সঙ্গে সঙ্গে তাহার চক্ষু এমনভাবে নিরাময় হয় যেন পূর্বে কখনও চক্ষুর কোন রোগই ছিল না। অতঃপর 'আলী (রা)-কে সম্বোধন করিয়া বলিলেনঃ শত্রুর নিকট যাও। প্রথমে ইসলামের দা'ওয়াত দাও এবং আল্লাহর অধিকারসমূহ সম্পর্কে তাহাদিগকে বুঝাও। হে 'আলী! যদি তোমার মাধ্যমে এক ব্যক্তিও হিদায়াতপ্রাপ্ত হয়, তাহা হইলে উহা হইবে তোমার জন্য এক বিরাট নি'মত ও সাফল্য (আসাহহুস সিয়ার, পৃ. ১৯০)। আল-বিদায়া ওয়ান-নিহায়া গ্রন্থে ইমাম বুখারীর উক্ত বর্ণনার সাথে এই কথাও আছে, 'আলী বলিলেন, আমি কি রাসূলুল্লাহ (স) হইতে পিছনে পড়িয়া থাকিব? সুতরাং তিনি রাসূলুল্লাহ (স)-এর সহিত মিলিত হইলেন। (বুখারী, ২খ, ৬০৫)।
ইমাম নাসাঈ ও মুসলিম সূত্রে বর্ণিত এক হাদীছে আবূ হুরায়রা (রা) বলেন, রাসূলুল্লাহ (স) কর্তৃক উপরিউক্ত ঘোষণা শ্রবণ করিবার পর উমার (রা) বলেনঃ আমি ঐ দিন ব্যতীত আর কোন দিনই নেতৃত্ব লাভের আকাঙ্খা করি নাই। রাসূলুল্লাহ (স) 'আলী (রা)-কে এই অভিযানে প্রেরণ করিয়া বলিলেনঃ "যাও, যুদ্ধ কর, যতক্ষণ না বিজয় লাভ করিবে, এদিক সেদিক দৃষ্টিপাত করিও না।” 'আলী (রা) বলিলেন, কতক্ষণ পর্যন্ত লড়াই করিব? রাসূলুল্লাহ (স) বলিলেনঃ ইহাদিগের সহিত লড়াই করিতে থাকিবে যেই পর্যন্ত না ইহারা সাক্ষী দিবে যে, আল্লাহ ব্যতীত কোন ইলাহ নাই এবং মুহাম্মাদ আল্লাহর বান্দা ও রাসূল। উহারা যখন এই সাক্ষ্য দিবে তখন আমাদিগের হাত হইতে তাহাদের রক্ত ও সম্পদ রক্ষা পাইবে (আল-বিদায়া ওয়ান-নিহায়া, ২/৪খ., পৃ. ২১)। দিহলাবী বলেন, 'আলী (রা) রাসূলুল্লাহ (স)-এর এই সুসংবাদ শুনিয়া আল্লাহ্র দরবারে দু'আ করিলেন:
اللَّهُمَّ لَا مَا نِعَ لِمَا أَعْطَيْتَ وَلَا مُعْطَى لِمَا مَنَعْتَ.
“হে আল্লাহ! তুমি যাহা দান করিবে উহা কেহই রোধ করিতে পারিবে না এবং তুমি দিতে না চাহিলে কেহ দিতে পারিবে না।"
প্রথমে চক্ষুর রোগজনিত কারণে 'আলী (রা) খায়বার অভিযানে অংশগ্রহণ হইতে বিরত ছিলেন। তিনি মনে মনে ভাবিতেন, আমি যুদ্ধে উপস্থিত না ইইয়া ভাল কাজ করি নাই। সুতরাং তিনি সফরের প্রস্তুতি লইয়া মদীনা হইতে রওয়ানা করিলেন। পথিমধ্যে অথবা খায়বার পৌঁছিবার পর রাসূলুল্লাহ (স) তাহার আগমনী বার্তা পাইলেন। পরবর্তী দিনের সূচনাপর্বে রাসূলুল্লাহ (স) বলিলেন, আলীকে ডাক। সাহাবীগণ বলিলেন, তিনি এখানেই আছেন, কিন্তু তাহার চক্ষুর অসুস্থতার কারণে তিনি কাছের বস্তুও দেখিতে পান না। আদেশ হইল, তাহাকে আমার নিকট লইয়া আস। সালামা ইবনুল আকওয়া (রা) জিয়া তাহাকে হাত ধরিয়া রাসূলুল্লাহ (স)-এর নিকট লইয়া আসিলেন। অতঃপর রাসূলুল্লাহ (স) তাহার মাথা নিজ উরুর উপর রাখিলেন এবং নিজ মুখের লালা তাহার চক্ষুতে লাগাইয়া দিলেন ও দু'আ করিলেন। এই সময় তাঁহার চক্ষু হইতে ব্যথা সম্পূর্ণ দূরীভূত হইয়া গেল। ইহার পর আর কোন দিনই তাঁহার চক্ষু ও মাথাব্যথা হয় নাই। একটি বর্ণনায় পাওয়া যায়, রাসূলুল্লাহ (স) এই দু'আ করিয়াছিলেন :
اللَّهُمَّ اذْهَبْ عَنْهُ الْحَرَّ وَالْقَرِّ.
"হে আল্লাহ! তাহাকে গরম ও ঠাণ্ডার প্রকোপ হইতে রক্ষা করিও”।
ইব্ন আবী লায়লা বলেন, ইহার ফলে 'আলী (রা) অসহনীয় গরমের দিনে পশমী কাপড় পরিতেন এবং হিমেল শীতে হালকা-পাতলা কাপড় পরিধান করিতেন। ইহাতে তাঁহার শারীরিক কোন ক্ষতি হইত না। 'আলী (রা) শারীরিকভাবে সুস্থ হইয়া উঠিবার পর রাসূলুল্লাহ (স) নিজের খাস বর্ম তাঁহাকে পরাইয়া দিলেন এবং যুল-ফিকার তাঁহার হস্তে তুলিয়া দিয়া বলিলেন, "যাও, পিছপা হইও না যতক্ষণ না তোমার হাতে দুর্গ বিজিত হয়"।
অতঃপর 'আলী (রা) সামরিক পতাকা হস্তে ধারণ করিয়া রওয়ানা হইলেন এবং উহা একটি প্রস্তরময় টিলায় স্থাপন করিলেন। জনৈক ইয়াহুদী শাস্ত্রক দুর্গের উপর দাঁড়াইয়া এই দৃশ্য অবলোকন করিয়া জিজ্ঞাসা করিল, ওহে পতাকাধারী ব্যক্তি! আপনি কে? আপনার নাম কি? তিনি বলিলেন, আমি 'আলী ইব্ন আবী তালিব। অতঃপর ঐ ব্যক্তি স্বগোত্রীয়দেরকে বলিল, "তাওরাতের শপথ! তোমরা এই ব্যক্তির নিকট পরাজয় বরণ করিবে। সে বিজয়লাভ ব্যতিরেকে প্রত্যাবর্তন করিবে না"। সে আলী (রা)-এর গুণাবলী ও বীরত্ব সম্পর্কে অবগত ছিল।
'আলী (রা)-এর বিরুদ্ধে দুর্গ হইতে সর্বপ্রথম বীর ইয়াহুদী মারহাবের ভাই হারিছ বাহির হইয়াছিল। তাহার বর্শা ছিল অত্যন্ত ভারী। বাহির হইবামাত্র সে যুদ্ধ আরম্ভ করিল এবং কয়েকজন মুসলমানকে শহীদ করিল। অতঃপর 'আলী (রা) তাহার নিকটে পৌছিয়া গেলেন এবং একটিমাত্র আঘাতে তাহাকে হত্যা করিলেন। মারহাব তাহার ভ্রাতার হত্যার খবর শুনিয়া খায়বারের বীরদিগের একটি দল লইয়া অস্ত্রে সজ্জিত হইয়া প্রতিশোধ লইতে বাহির হইল। কথিত আছে যে, মারহাব খায়বারবাসীদের মধ্যে অত্যন্ত পরাক্রমশালী সুস্বাস্থ্যের অধিকারী যুদ্ধবাজ ব্যক্তি ছিল। বীরত্বে সে খায়বারবাসীদের মধ্যে অপ্রতিদ্বন্দ্বী ছিল। ঐদিন সে দুইটি বর্ম পরিধান করিয়া দুইটি পাগড়ী মাথায় বাঁধিয়া দুইখানা তরবারি হস্তে লইয়া বীরদর্পে রণক্ষেত্রে নিম্নোক্ত কবিতাটি আবৃত্তি করিতে করিতে বাহির হয় :
قَدْ عَلِمَتْ خَيْبَرُ أَنِّي مَرْحَبُ + شَاكِي السَّلَاحِ بَطَلَ مُجَرِّبٌ.
"খায়বারবাসী জানে আমি মারহাব, যে রণনিপুণ এবং মহাবীর হিসাবে পরীক্ষিত"। 'আলী (রা) এতদশ্রবণে আবৃত্তি করিলেন:
أَنَا الَّذِي سَمَّتْنِي أَمِي حَيْدَرَهُ + ضَرْغَامُ أَجَامٍ وَكَيْتُ قَسْوَرَهُ.
"আমি সেই বীর যাহার মাতা তাহার নাম রাখিয়াছেন হায়দার। আমি গভীর বনের সিংহ" (মাদারিজুন-নুবুওয়াত, পৃ. ৪১৩, ৪১৪)।
'আলী (রা) ও মারহাব কর্তৃক আবৃত্তিকৃত এই কবিতা বিভিন্ন গ্রন্থে ভিন্ন ভিন্নভাবে উদ্ধৃত হইয়াছে। দানাপুরীর গ্রন্থে মারহাব আবৃত্তি করিতে করিতে বাহির হয় নিম্নরূপঃ أَنَا الَّذِي سَمَّتْنِي أُمِّي مَرَحَبٌ + شَاكِ السَّلَاحِ بَلْ مُجَرَّبٌ.
"আমি সেই বীর যাহার মাতা তাহার নাম রাখিয়াছেন মারহাব। যিনি রণনিপুণ এবং মহা বীরবর হিসাবে পরীক্ষিত”।
'আলী (রা) এতদশ্রবণে আবৃত্তি করিলেন: أَنَا الَّذِي سَمُتْنِي أُمِّي حَيْدَرَةَ + كَلَيْثِ غَابَاتِ كَرِيْهِ الْمَنْظَرَه.
"আমি সেই বীরবর যাহার মাতা তাহার নাম রাখিয়াছেন হায়দার, যে বন্য হিংস্র সিংহতুল্য এবং যাহার চেহারা অত্যন্ত ভয়ঙ্কর" (আসাহহুস সিয়ার, পৃ. ১৯১)।
ইব্ন কাছীর এই কবিতাদ্বয়ে আরও কিছু বৃদ্ধি করিয়া উল্লেখ করিয়াছেনঃ মারহাব এই কবিতা আবৃত্তি করিতে করিতে বাহির হইল: قَدْ عَلِمَتْ خَيْبَرُ أَنِّي مَرْحَب - شاك السلاح بَطَلَ مُجَرَّبٌ إِذَ اللُّبُوتُ أَقْبَلَتْ تَلَهَبْ - وَاحْجَمَتْ عَنْ صَولَةِ الْمُغَلَبِ.
উত্তরে আলী (রা) আবৃত্তি করিলেন: أنَا الَّذِي سَمَتْنِي أَمِّي حَيْدَرَهُ + كَلَيْتُ غَابَت شَدِيدٌ الْقَسْوَرَةَ اكيلُكُمْ بِالصَّاعِ كَيْلَ السَّنْدَرَةِ
(আল-বিদায়া ওয়ান-নিহায়া, ২/৪খ., পৃ. ১৮৮, ১৮৯)।
মারহাব সংকল্প করিল, সে আগেই 'আলী (রা)-এর মাথায় আঘাত হানিবে। কিন্তু 'আলী (রা) লাফ দিয়া উঠিয়া যুল-ফিকার দিয়া তাহার মাথায় এত জোরে আঘাত হানেন যে, বর্মসহ মারহাবের মাথা কাটিয় গলদেশ পর্যন্ত দ্বিখণ্ডিত হইয়া যায়। এক বর্ণনায় আছে, উরু পর্যন্ত দুই টুকরা হইয়া যায়। অপর এক বর্ণনায় আছে যে, তাহার বাহনের গদি পর্যন্ত দ্বিখণ্ডিত হইয়া যায়।
অতঃপর মুসলিম বাহিনী তাঁহার নেতৃত্বে রণক্ষেত্রে অবতরণ করিয়া ইয়াহুদীদিগকে হত্যা করিতে লাগিল। সাতজন ইয়াহুদী বীরকে ঐ সময় হত্যা করা হয়। অবশিষ্টরা পরাজয় মানিয়া দুর্গ অভ্যন্তরে প্রবেশ করিতে লাগিল। আলী (রা) তাহাদিগকে ধাওয়া করিয়া অগ্রসর হইতেছিলেন। এমতাবস্থায় জনৈক ইয়াহুদী তাঁহার হাতে আঘাত হানিল। ফলে তাঁহার ঢাল ভূমিতে পড়িয়া গেল এবং অপর এক ইয়াহুদী তাহা উঠাইয়া লইয়া পলায়ন করিল। এই প্রেক্ষিতে আলী (রা)-এর মধ্যে আল্লাহ্র পক্ষ হইতে এমনই রূহানী শক্তি সঞ্চারিত হইল যে, তিনি দুর্গ পার্শ্বস্থিত গর্ত অতিক্রম করিয়া একেবারে দুর্গের দরজায় পৌঁছিয়া গেলেন এবং লৌহ নির্মিত দরজার একাংশ উপড়াইয়া ইহাকে ঢাল বানাইয়া যুদ্ধ অব্যাহত রাখিলেন।
ইমাম বাকির হইতে বর্ণিত আছে যে, আলী (রা) যখন কপাট উপড়াইবার জন্য টান দেন তখন সমগ্র দুর্গ হেলিয়া উঠে। এমন কি সাফিয়্যা বিন্ত হুয়ায় ইব্ন আখতাৰ খাট হইতে পড়িয়া যান এবং মুখমণ্ডলে আঘাত পান।
সীরাতবিদগণ বলেন: যুদ্ধশেষে 'আলী (রা) বেশ দূরে এই দরজা নিক্ষেপ করিলেন। ইহাও কথিত আছে যে, যুদ্ধশেষে আটজন শক্তিশালী ব্যক্তি একত্রে মিলিত হইয়া দরজাটি উল্টাইতে পারেন নাই। এমনকি চল্লিশজন মিলিয়া উহা উঠাইতে চাহিলেন, কিন্তু সক্ষম হন নাই। মাদারিজুন নুবুওয়াতে আছে যে, দরজাটির ওজন ছিল আট মন। তবে কোন কোন সীরাতবিদের মতে এই বর্ণনাগুলি দুর্বল, অনুপযোগী। 'আল্লামা সাখাবী মাকাসিদে হাসানা গ্রন্থে বলিয়াছেন, كُلُّهَا وَاهْيَةً "এই সকল বর্ণনা অলীক” (শিবলী নু'মানী ও সুলায়মান নাদবী, সীরাতুন্নবী, ১৯৮৫ খৃ.)।
মোটকথা, যখন কামূস দুর্গসহ অন্যান্য দুর্গে অবস্থানকারিগণ 'আলী (রা)-এর এই শৌর্য-বীর্য দেখিল তখন তাহারা اَلْأَمَانُ الْأَمَانُ )নিরাপত্তা, নিরাপত্তা) বলিয়া ফরিয়াদ করিতে লাগিল। 'আলী (রা) তাহাদিগকে রাসূলুল্লাহ (স)-এর ইঙ্গিতে এই শর্তের উপর নিরাপত্তা দিলেন যে, প্রত্যেক ব্যক্তি উটের উপর খাদ্য বোঝাই করিয়া শহর ত্যাগ করিয়া চলিয়া যাইবে এবং নগদ মুদ্রা, সাজ-সরঞ্জাম ও অস্ত্রপাতি মুসলমানগণের জন্য রাখিয়া যাইবে। কোন জিনিস লুকাইয়া রাখিবে না। যদি এমন কোন জিনিস বাহির হয় যাহার তথ্য দেওয়া হয় নাই তাহা হইলে তাহাদের নিরাপত্তা প্রত্যাহর করা হইবে।
রাসূলুল্লাহ (স)-এর নিকট যখন বিজয় সংবাদ পৌছিল তখন তিনি ইহার জন্য আল্লাহর শোকর আদায় করিলেন। কারণ ইহা ছিল ইসলাম প্রসারের এক মহাসোপান। 'আলী (রা) রাসূলুল্লাহ (স)-এর দরবারে উপস্থিত হইলে তিনি স্বীয় তাঁবু হইতে বাহির হইয়া তাহাকে স্বাগত জানাইলেন, আলিঙ্গন করিলেন, চক্ষু যুগলের মধ্যবর্তী স্থান চুম্বন করিলেন এবং বলিলেন:
بَلَغَنِي تَنَاءَكَ الْمَشْكُورُ وَضِيْعَكَ الْمَذْكُورُ قَدْ رَضِيَ اللَّهُ عَنْهُ وَرَضِيْتُ أَنَا عَنْكَ.
"আমার নিকট তোমার কৃতজ্ঞতাপূর্ণ প্রশংসা পৌছিয়াছে, তোমার শৌর্য-বীর্ষের বর্ণনা করা হইয়াছে, আল্লাহ তাহার প্রতি সদয় হইয়াছেন এবং আমি তোমার উপর সন্তুষ্ট"।
তখন 'আলী (রা) কাঁদিতে লাগিলেন। রাসূলুল্লাহ (স) জিজ্ঞাসা করিলেন, ইহা কিসের কান্না, আনন্দের না বেদনার? 'আলী (রা) বলিলেন, ইহা আনন্দের কান্না। আপনি আমার উপর সন্তুষ্ট আছেন, ইহাতে কি আমি আনন্দিত হইব না? রাসূলুল্লাহ (স) বলিলেনঃ শুধু আমিই তোমার উপর খুশী নহি বরং আল্লাহ, জিবরীল, মীকাঈল এবং সকল ফেরেশতা তোমার উপর সন্তুষ্ট (মাদারিজুন নুবুওয়া, প্রাগুক্ত)।
ইব্ন কায়্যিম আল-জাওযিয়্যা (র) বলেন, সহীহ মুসলিমে এইভাবে উল্লেখ আছে যে, 'আলী (রা) মারহাবকে হত্যা করিয়াছেন। কিন্তু মূসা ইব্ন উকবা, ইমাম যুহরী ও আবুল আসওয়াদের উদ্ধৃতিতে এবং ইউনুস ইব্ন বুকায়র ইবন ইসহাক সূত্রে উল্লেখ করিয়াছেন যে, জাবির ইবন আবদিল্লাহ বর্ণনা করিয়াছেন যে, মারহাবকে মুহাম্মাদ ইবন মাসলামা (রা) হত্যা করেন। মারহাব যখন দুর্গের ভিতর হইতে বীরদর্পে বাহির হইয়া তাহার মুকাবিলার জন্য আহ্বান করে তখন রাসূলুল্লাহ (স) জিজ্ঞাসা করিলেন, তাহাকে মুকাবিলা করিতে কে প্রস্তুত আছ? মুহাম্মাদ ইবন মাসলামা (রা) বলিলেন, হে আল্লাহর রাসূল! আমি তাহার মুকাবিলায় প্রস্তুত। এই ব্যক্তি আমার ভ্রাতা (মাহমূদ ইব্ন মাসলামা)-কে গতকাল শহীদ করিয়াছে। রাসূলুল্লাহ (স) তাহাকে অনুমতি প্রদান করিলেন। তিনি যখন অগ্রসর হন তখন উভয়ের মধ্যবর্তী স্থানে একটি বৃক্ষ আড়াল হয়। উভয়ই একে অপরকে আঘাত হানার জন্য সুযোগের সন্ধান করিতে থাকেন। অবশেষে মুহাম্মাদ ইবন মাসলামা (রা) তাহাকে হত্যা করেন। সালামা ইব্ন সালামা ও মুজাম্মি' ইবন হারিছাও বলিয়াছেন যে, মুহাম্মাদ ইবন মাসলামা মারহাবকে হত্যা করেন।
ওয়াকিদী বলেন, মুহাম্মাদ ইবন মাসলামা (রা)-এর তরবারির আঘাতে মারহাবের দুই পা দ্বিখণ্ডিত হইয়া যায়। তারপর তিনি তাহাকে ছাড়িয়া দেন এবং বলেন, যন্ত্রণার স্বাদ উপভোগ কর, যেমন আমার ভ্রাতা যন্ত্রণা সহ্য করিয়াছে। তারপর আলী (রা) অগ্রসর হইয়া মারহাবের শিরোচ্ছেদ করেন। অতঃপর তিনি মারহাবের তরবারি এবং অন্যান্য আসবাবপত্র লইয়া রাসূলুল্লাহ (স)-এর নিকট আসিলেন। তাহারা দুইজন রাসূলুল্লাহ (স)-এর সম্মুখে মারহাবের পরিত্যক্ত আসবাবপত্রের মালিকানা লইয়া বিতর্কে জড়াইয়া পড়েন। রাসূলুল্লাহ (স) মুহাম্মাদ ইবন মাসলামাকে তাহার তরবারি, বর্শা ও শিরস্ত্রাণ ইত্যাদি সবকিছু দান করেন।
মারহাবের পর তাহার ভ্রাতা ইয়াসির অগ্রসর হয়। তাহার মুকাবিলার জন্য যুবায়র ইবনুল আওওয়াম (রা) অগ্রসর হন। এই সময় যুবায়রের মাতা সাফিয়্যা (রা) রাসূলুল্লাহ (স)-কে বলিলেন, হে আল্লাহর রাসূল! সে আমার পুত্রকে হত্যা করিয়া ফেলিবে। তিনি বলিলেনঃ না, তোমার পুত্র তাহাকে হত্যা করিবে। অবশেষে যুবায়র (রা) ইয়াসিরকে হত্যা করেন। কামূস দুর্গের অবরোধ প্রায় বিশদিন স্থায়ী ছিল। ইহা ছিল সর্বাধিক শক্তিশালী দুর্গ (যাদুল মা'আদ, ২খ., ১৩৪, ১৩৫; আত-তাবারী, তারীখুল উমাম ওয়াল-মুলুক, ২খ., ৯২, ৯৩)।
এই ব্যাপারে ইব্ন হাজার আসকালানী বলেন, ইমাম মুসলিম কর্তৃক বর্ণিত হাদীছের বিরোধিতা করেন অনেক সীরাতবিদ। ইবন ইসহাক, মূসা ইব্ন উকবা ও আল-ওয়াকিদী দৃঢ় প্রত্যয় ব্যক্ত করিয়াছেন যে, মারহাবকে যিনি হত্যা করিয়াছেন তিনি হইলেন মুহাম্মাদ ইব্ন মাসলামা। ইহার অনুকূলে ইমাম আহমাদ হাসান পর্যায়ের সনদে জাবির (রা) হইতে একটি হাদীছ বর্ণনা করিয়াছেন। কেহ কেহ বলেন, মুহাম্মাদ ইবন মাসলামা মারহাবের মুকাবিলা করিয়া তাহার দুইটি পা দ্বিখণ্ডিত করিয়াছিলেন। পরে আলী (রা) তাহাকে হত্যা করেন। কেহ কেহ বলেন, মুহাম্মাদ ইব্ন মাসলামা (রা) যাহাকে হত্যা করেন সে ছিল মারহাবের ভাই আল-হারিছ। কিন্তু কোন কোন বর্ণনাকারীর নিকট তাহা স্পষ্ট ছিল না। তাই এই বিভ্রান্তি ঘটিয়াছে। যদি এইরূপ না হইয়া থাকে তাহা হইলে মারহাবকে আলী (রা) হত্যা করিয়াছিলেন বলিয়া সহীহ মুসলিমে যে বর্ণনা রহিয়াছে তাহাকে অগ্রাধিকার দিতে হইবে (ফাতহুল বারী, ৭খ., ৪৮৭)।
কামূس দুর্গ যখন অবরোধ করা হয় তখন রাসূলুল্লাহ (স) প্রচন্ড শিরপীড়ায় আক্রান্ত ছিলেন। ফলে রণাঙ্গনে অংশগ্রহণ করিতে পারেন নাই। সুতরাং এই অবস্থায় মুহাজির কিংবা আনসারদের মধ্য হইতে একজনকে তিনি সেনাপতি নিযুক্ত করিতেন। ইহা ছিল সর্বাপেক্ষা অধিক শক্তিশালী ও দুর্জয় কিল্লা। ফলে অবরোধ দীর্ঘস্থায়ী হয় এবং বিজয় বিলম্বিত হইতে থাকে। একদিন রণাঙ্গনে আবু বকর সিদ্দীক (রা) গমন করেন এবং দুর্গ বিজয়ের আপ্রাণ চেষ্টা করেন, কিন্তু দুর্গ জয় হইল না। রাসূলুল্লাহ (স) ঘোষণা করেন, আগামী কল্য আমি রণাঙ্গনের পতাকা এমন এক ব্যক্তির হাতে তুলিয়া দিব অথবা বলিলেন, আগামী কল্য এমন এক ব্যক্তি পতাকা গ্রহণ করিবে যে আল্লাহ ও রাসূল (স)-কে ভালবাসে এবং আল্লাহ ও রাসূলও তাহাকে ভালবাসেন। তাহাকেই মহান আল্লাহ এই দুর্গ বিজয়ের গৌরব প্রদান করিবেন।
সকল সাহাবী রাত্রিতে পরস্পর আলোচনা করেন যে, কাহার ভাগ্যে আগামী কল্য রণ-পতাকা জুটিবে? সকালে সাহাবীগণের সকলেই এই দুর্লভ ভাগ্যের প্রত্যাশায় রাসূলুল্লাহ (স)-এর নিকট আগমন করেন। তখন তিনি জিজ্ঞাসা করিলেন, 'আলী কোথায়? সকলে বলিলেন, চোখ উঠা রোগের কারণে তাহার চক্ষুতে দারুণ ব্যথা। তিনি আসিতে সক্ষম হইবেন না। রাসূলুল্লাহ (স) বলিলেন, তাহাকে ডাকিয়া আন। অতঃপর তিনি উপস্থিত হইলে রাসূলুল্লাহ (স) স্বীয় মুখ নিঃসৃত লালা তাহার চক্ষুতে লাগাইয়া দিলেন এবং আল্লাহর দরবারে দু'আ করিলেন। সঙ্গে সঙ্গে তাহার চক্ষু এমনভাবে নিরাময় হয় যেন পূর্বে কখনও চক্ষুর কোন রোগই ছিল না। অতঃপর 'আলী (রা)-কে সম্বোধন করিয়া বলিলেনঃ শত্রুর নিকট যাও। প্রথমে ইসলামের দা'ওয়াত দাও এবং আল্লাহর অধিকারসমূহ সম্পর্কে তাহাদিগকে বুঝাও। হে 'আলী! যদি তোমার মাধ্যমে এক ব্যক্তিও হিদায়াতপ্রাপ্ত হয়, তাহা হইলে উহা হইবে তোমার জন্য এক বিরাট নি'মত ও সাফল্য (আসাহহুস সিয়ার, পৃ. ১৯০)। আল-বিদায়া ওয়ান-নিহায়া গ্রন্থে ইমাম বুখারীর উক্ত বর্ণনার সাথে এই কথাও আছে, 'আলী বলিলেন, আমি কি রাসূলুল্লাহ (স) হইতে পিছনে পড়িয়া থাকিব? সুতরাং তিনি রাসূলুল্লাহ (স)-এর সহিত মিলিত হইলেন। (বুখারী, ২খ, ৬০৫)।
ইমাম নাসাঈ ও মুসলিম সূত্রে বর্ণিত এক হাদীছে আবূ হুরায়রা (রা) বলেন, রাসূলুল্লাহ (স) কর্তৃক উপরিউক্ত ঘোষণা শ্রবণ করিবার পর উমার (রা) বলেনঃ আমি ঐ দিন ব্যতীত আর কোন দিনই নেতৃত্ব লাভের আকাঙ্খা করি নাই। রাসূলুল্লাহ (স) 'আলী (রা)-কে এই অভিযানে প্রেরণ করিয়া বলিলেনঃ "যাও, যুদ্ধ কর, যতক্ষণ না বিজয় লাভ করিবে, এদিক সেদিক দৃষ্টিপাত করিও না।” 'আলী (রা) বলিলেন, কতক্ষণ পর্যন্ত লড়াই করিব? রাসূলুল্লাহ (স) বলিলেনঃ ইহাদিগের সহিত লড়াই করিতে থাকিবে যেই পর্যন্ত না ইহারা সাক্ষী দিবে যে, আল্লাহ ব্যতীত কোন ইলাহ নাই এবং মুহাম্মাদ আল্লাহর বান্দা ও রাসূল। উহারা যখন এই সাক্ষ্য দিবে তখন আমাদিগের হাত হইতে তাহাদের রক্ত ও সম্পদ রক্ষা পাইবে (আল-বিদায়া ওয়ান-নিহায়া, ২/৪খ., ২১)। দিহলাবী বলেন, 'আলী (রা) রাসূলুল্লাহ (স)-এর এই সুসংবাদ শুনিয়া আল্লাহ্র দরবারে দু'আ করিলেন:
اللَّهُمَّ لَا مَا نِعَ لِمَا أَعْطَيْتَ وَلَا مُعْطَى لِمَا مَنَعْتَ.
“হে আল্লাহ! তুমি যাহা দান করিবে উহা কেহই রোধ করিতে পারিবে না এবং তুমি দিতে না চাহিলে কেহ দিতে পারিবে না।"
প্রথমে চক্ষুর রোগজনিত কারণে 'আলী (রা) খায়বার অভিযানে অংশগ্রহণ হইতে বিরত ছিলেন। তিনি মনে মনে ভাবিতেন, আমি যুদ্ধে উপস্থিত না ইইয়া ভাল কাজ করি নাই। সুতরাং তিনি সফরের প্রস্তুতি লইয়া মদীনা হইতে রওয়ানা করিলেন। পথিমধ্যে অথবা খায়বার পৌঁছিবার পর রাসূলুল্লাহ (স) তাহার আগমনী বার্তা পাইলেন। পরবর্তী দিনের সূচনাপর্বে রাসূলুল্লাহ (স) বলিলেন, আলীকে ডাক। সাহাবীগণ বলিলেন, তিনি এখানেই আছেন, কিন্তু তাহার চক্ষুর অসুস্থতার কারণে তিনি কাছের বস্তুও দেখিতে পান না। আদেশ হইল, তাহাকে আমার নিকট লইয়া আস। সালামা ইবনুল আকওয়া (রা) জিয়া তাহাকে হাত ধরিয়া রাসূলুল্লাহ (স)-এর নিকট লইয়া আসিলেন। অতঃপর রাসূলুল্লাহ (স) তাহার মাথা নিজ উরুর উপর রাখিলেন এবং নিজ মুখের লালা তাহার চক্ষুতে লাগাইয়া দিলেন ও দু'আ করিলেন। এই সময় তাঁহার চক্ষু হইতে ব্যথা সম্পূর্ণ দূরীভূত হইয়া গেল। ইহার পর আর কোন দিনই তাঁহার চক্ষু ও মাথাব্যথা হয় নাই। একটি বর্ণনায় পাওয়া যায়, রাসূলুল্লাহ (স) এই দু'আ করিয়াছিলেন :
اللَّهُمَّ اذْهَبْ عَنْهُ الْحَرَّ وَالْقَرِّ.
"হে আল্লাহ! তাহাকে গরম ও ঠাণ্ডার প্রকোপ হইতে রক্ষা করিও”।
ইব্ন আবী লায়লা বলেন, ইহার ফলে 'আলী (রা) অসহনীয় গরমের দিনে পশমী কাপড় পরিতেন এবং হিমেল শীতে হালকা-পাতলা কাপড় পরিধান করিতেন। ইহাতে তাঁহার শারীরিক কোন ক্ষতি হইত না। 'আলী (রা) শারীরিকভাবে সুস্থ হইয়া উঠিবার পর রাসূলুল্লাহ (স) নিজের খাস বর্ম তাঁহাকে পরাইয়া দিলেন এবং যুল-ফিকার তাঁহার হস্তে তুলিয়া দিয়া বলিলেন, "যাও, পিছপা হইও না যতক্ষণ না তোমার হাতে দুর্গ বিজিত হয়"।
অতঃপর 'আলী (রা) সামরিক পতাকা হস্তে ধারণ করিয়া রওয়ানা হইলেন এবং উহা একটি প্রস্তরময় টিলায় স্থাপন করিলেন। জনৈক ইয়াহুদী শাস্ত্রক দুর্গের উপর দাঁড়াইয়া এই দৃশ্য অবলোকন করিয়া জিজ্ঞাসা করিল, ওহে পতাকাধারী ব্যক্তি! আপনি কে? আপনার নাম কি? তিনি বলিলেন, আমি 'আলী ইব্ন আবী তালিব। অতঃপর ঐ ব্যক্তি স্বগোত্রীয়দেরকে বলিল, "তাওরাতের শপথ! তোমরা এই ব্যক্তির নিকট পরাজয় বরণ করিবে। সে বিজয়লাভ ব্যতিরেকে প্রত্যাবর্তন করিবে না"। সে আলী (রা)-এর গুণাবলী ও বীরত্ব সম্পর্কে অবগত ছিল।
'আলী (রা)-এর বিরুদ্ধে দুর্গ হইতে সর্বপ্রথম বীর ইয়াহুদী মারহাবের ভাই হারিছ বাহির হইয়াছিল। তাহার বর্শা ছিল অত্যন্ত ভারী। বাহির হইবামাত্র সে যুদ্ধ আরম্ভ করিল এবং কয়েকজন মুসলমানকে শহীদ করিল। অতঃপর 'আলী (রা) তাহার নিকটে পৌছিয়া গেলেন এবং একটিমাত্র আঘাতে তাহাকে হত্যা করিলেন। মারহাব তাহার ভ্রাতার হত্যার খবর শুনিয়া খায়বারের বীরদিগের একটি দল লইয়া অস্ত্রে সজ্জিত হইয়া প্রতিশোধ লইতে বাহির হইল। কথিত আছে যে, মারহাব খায়বারবাসীদের মধ্যে অত্যন্ত পরাক্রমশালী সুস্বাস্থ্যের অধিকারী যুদ্ধবাজ ব্যক্তি ছিল। বীরত্বে সে খায়বারবাসীদের মধ্যে অপ্রতিদ্বন্দ্বী ছিল। ঐদিন সে দুইটি বর্ম পরিধান করিয়া দুইটি পাগড়ী মাথায় বাঁধিয়া দুইখানা তরবারি হস্তে লইয়া বীরদর্পে রণক্ষেত্রে নিম্নোক্ত কবিতাটি আবৃত্তি করিতে করিতে বাহির হয় :
قَدْ عَلِمَتْ خَيْبَرُ أَنِّي مَرْحَبُ + شَاكِي السَّلَاحِ بَطَلَ مُجَرِّبٌ.
"খায়বারবাসী জানে আমি মারহাব, যে রণনিপুণ এবং মহাবীর হিসাবে পরীক্ষিত"। 'আলী (রা) এতদশ্রবণে আবৃত্তি করিলেন:
أَنَا الَّذِي سَمَّتْنِي أَمِي حَيْدَرَهُ + ضَرْغَامُ أَجَامٍ وَكَيْتُ قَسْوَرَهُ.
"আমি সেই বীর যাহার মাতা তাহার নাম রাখিয়াছেন হায়দার। আমি গভীর বনের সিংহ" (মাদারিজুন-নুবুওয়াত, পৃ. ৪১৩, ৪১৪)।
'আলী (রা) ও মারহাব কর্তৃক আবৃত্তিকৃত এই কবিতা বিভিন্ন গ্রন্থে ভিন্ন ভিন্নভাবে উদ্ধৃত হইয়াছে। দানাপুরীর গ্রন্থে মারহাব আবৃত্তি করিতে করিতে বাহির হয় নিম্নরূপ: أَنَا الَّذِي سَمَّتْنِي أَمِّي مَرَحَبٌ + شَاكِ السَّلَاحِ بَلْ مُجَرَّبٌ.
"আমি সেই বীর যাহার মাতা তাহার নাম রাখিয়াছেন মারহাব। যিনি রণনিপুণ এবং মহা বীরবর হিসাবে পরীক্ষিত”
'আলী (রা) এতদশ্রবণে আবৃত্তি করিলেন: أَنَا الَّذِي سَمُتْنِي أُمِّي حَيْدَرَةَ + كَلَيْثِ غَابَاتِ كَرِيْهِ الْمَنْظَرَه.
"আমি সেই বীরবর যাহার মাতা তাহার নাম রাখিয়াছেন হায়দার, যে বন্য হিংস্র সিংহতুল্য এবং যাহার চেহারা অত্যন্ত ভয়ঙ্কর" (আসাহহুস সিয়ার, পৃ. ১৯১)।
ইব্ন কাছীর এই কবিতাদ্বয়ে আরও কিছু বৃদ্ধি করিয়া উল্লেখ করিয়াছেন: মারহাব এই কবিতা আবৃত্তি করিতে করিতে বাহির হইল: قَدْ عَلِمَتْ خَيْبَرُ أَنِّي مَرْحَب - شاك السلاح بَطَلَ مُجَرَّبٌ إِذَ اللُّبُوتُ أَقْبَلَتْ تَلَهَبْ - وَاحْجَمَتْ عَنْ صَولَةِ الْمُغَلَبِ.
উত্তরে আলী (রা) আবৃত্তি করিলেন: أنَا الَّذِي سَمَتْنِي أَمِّي حَيْدَرَهُ + كَلَيْتُ غَابَت شَدِيدٌ الْقَسْوَرَةَ اكيلُكُمْ بِالصَّاعِ كَيْلَ السَّنْدَرَةِ
(আল-বিদায়া ওয়ান-নিহায়া, ২/৪খ., ১৮৮, ১৮৯)।
মারহাব সংকল্প করিল, সে আগেই 'আলী (রা)-এর মাথায় আঘাত হানিবে। কিন্তু 'আলী (রা) লাফ দিয়া উঠিয়া যুল-ফিকার দিয়া তাহার মাথায় এত জোরে আঘাত হানেন যে, বর্মসহ মারহাবের মাথা কাটিয় গলদেশ পর্যন্ত দ্বিখণ্ডিত হইয়া যায়। এক বর্ণনায় আছে, উরু পর্যন্ত দুই টুকরা হইয়া যায়। অপর এক বর্ণনায় আছে যে, তাহার বাহনের গদি পর্যন্ত দ্বিখণ্ডিত হইয়া যায়।
অতঃপর মুসলিম বাহিনী তাঁহার নেতৃত্বে রণক্ষেত্রে অবতরণ করিয়া ইয়াহুদীদিগকে হত্যা করিতে লাগিল। সাতজন ইয়াহুদী বীরকে ঐ সময় হত্যা করা হয়। অবশিষ্টরা পরাজয় মানিয়া দুর্গ অভ্যন্তরে প্রবেশ করিতে লাগিল। আলী (রা) তাহাদিগকে ধাওয়া করিয়া অগ্রসর হইতেছিলেন। এমতাবস্থায় জনৈক ইয়াহুদী তাঁহার হাতে আঘাত হানিল। ফলে তাঁহার ঢাল ভূমিতে পড়িয়া গেল এবং অপর এক ইয়াহুদী তাহা উঠাইয়া লইয়া পলায়ন করিল। এই প্রেক্ষিতে আলী (রা)-এর মধ্যে আল্লাহ্র পক্ষ হইতে এমনই রূহানী শক্তি সঞ্চারিত হইল যে, তিনি দুর্গ পার্শ্বস্থিত গর্ত অতিক্রম করিয়া একেবারে দুর্গের দরজায় পৌঁছিয়া গেলেন এবং লৌহ নির্মিত দরজার একাংশ উপড়াইয়া ইহাকে ঢাল বানাইয়া যুদ্ধ অব্যাহত রাখিলেন।
ইমাম বাকির হইতে বর্ণিত আছে যে, আলী (রা) যখন কপাট উপড়াইবার জন্য টান দেন তখন সমগ্র দুর্গ হেলিয়া উঠে। এমন কি সাফিয়্যা বিন্ত হুয়ায় ইব্ন আখতাৰ খাট হইতে পড়িয়া যান এবং মুখমণ্ডলে আঘাত পান।
সীরাতবিদগণ বলেন: যুদ্ধশেষে 'আলী (রা) বেশ দূরে এই দরজা নিক্ষেপ করিলেন। ইহাও কথিত আছে যে, যুদ্ধশেষে আটজন শক্তিশালী ব্যক্তি একত্রে মিলিত হইয়া দরজাটি উল্টাইতে পারেন নাই। এমনকি চল্লিশজন মিলিয়া উহা উঠাইতে চাহিলেন, কিন্তু সক্ষম হন নাই। মাদারিজুন নুবুওয়াতে আছে যে, দরজাটির ওজন ছিল আট মন। তবে কোন কোন সীরাতবিদের মতে এই বর্ণনাগুলি দুর্বল, অনুপযোগী। 'আল্লামা সাখাবী মাকাসিদে হাসানা গ্রন্থে বলিয়াছেন, كُلُّهَا وَاهْيَةً "এই সকল বর্ণনা অলীক” (শিবলী নু'মানী ও সুলায়মান নাদবী, সীরাতুন্নবী, ১৯৮৫ খৃ.)।
মোটকথা, যখন কামূস দুর্গসহ অন্যান্য দুর্গে অবস্থানকারিগণ 'আলী (রা)-এর এই শৌর্য-বীর্য দেখিল তখন তাহারা اَلْأَمَانُ الْأَمَانُ )নিরাপত্তা, নিরাপত্তা) বলিয়া ফরিয়াদ করিতে লাগিল। 'আলী (را) তাহাদিগকে রাসূলুল্লাহ (স)-এর ইঙ্গিতে এই শর্তের উপর নিরাপত্তা দিলেন যে, প্রত্যেক ব্যক্তি উটের উপর খাদ্য বোঝাই করিয়া শহর ত্যাগ করিয়া চলিয়া যাইবে এবং নগদ মুদ্রা, সাজ-সরঞ্জাম ও অস্ত্রপাতি মুসলমানগণের জন্য রাখিয়া যাইবে। কোন জিনিস লুকাইয়া রাখিবে না। যদি এমন কোন জিনিস বাহির হয় যাহার তথ্য দেওয়া হয় নাই তাহা হইলে তাহাদের নিরাপত্তা প্রত্যাহর করা হইবে।
রাসূলুল্লাহ (স)-এর নিকট যখন বিজয় সংবাদ পৌছিল তখন তিনি ইহার জন্য আল্লাহর শোকর আদায় করিলেন। কারণ ইহা ছিল ইসলাম প্রসারের এক মহাসোপান। 'আলী (রা) রাসূলুল্লাহ (স)-এর দরবারে উপস্থিত হইলে তিনি স্বীয় তাঁবু হইতে বাহির হইয়া তাহাকে স্বাগত জানাইলেন, আলিঙ্গন করিলেন, চক্ষু যুগলের মধ্যবর্তী স্থান চুম্বন করিলেন এবং বলিলেন:
بَلَغَنِي تَنَاءَكَ الْمَشْكُورُ وَضِيْعَكَ الْمَذْكُورُ قَدْ رَضِيَ اللَّهُ عَنْهُ وَرَضِيْتُ أَنَا عَنْكَ.
"আমার নিকট তোমার কৃতজ্ঞতাপূর্ণ প্রশংসা পৌছিয়াছে, তোমার শৌর্য-বীর্ষের বর্ণনা করা হইয়াছে, আল্লাহ তাহার প্রতি সদয় হইয়াছেন এবং আমি তোমার উপর সন্তুষ্ট"।
তখন 'আলী (রা) কাঁদিতে লাগিলেন। রাসূলুল্লাহ (স) জিজ্ঞাসা করিলেন, ইহা কিসের কান্না, আনন্দের না বেদনার? 'আলী (রা) বলিলেন, ইহা আনন্দের কান্না। আপনি আমার উপর সন্তুষ্ট আছেন, ইহাতে কি আমি আনন্দিত হইব না? রাসূলুল্লাহ (স) বলিলেনঃ শুধু আমিই তোমার উপর খুশী নহি বরং আল্লাহ, জিবরীল, মীকাঈল এবং সকল ফেরেশতা তোমার উপর সন্তুষ্ট (মাদারিজুন নুবুওয়া, প্রাগুক্ত)।
ইব্ন কায়্যিম আল-জাওযিয়্যা (র) বলেন, সহীহ মুসলিমে এইভাবে উল্লেখ আছে যে, 'আলী (রা) মারহাবকে হত্যা করিয়াছেন। কিন্তু মূসা ইব্ন উকবা, ইমাম যুহরী ও আবুল আসওয়াদের উদ্ধৃতিতে এবং ইউনুস ইব্ন বুকায়র ইবন ইসহাক সূত্রে উল্লেখ করিয়াছেন যে, জাবির ইবন আবদিল্লাহ বর্ণনা করিয়াছেন যে, মারহাবকে মুহাম্মাদ ইবন মাসলামা (রা) হত্যা করেন। মারহাব যখন দুর্গের ভিতর হইতে বীরদর্পে বাহির হইয়া তাহার মুকাবিলার জন্য আহ্বান করে তখন রাসূলুল্লাহ (স) জিজ্ঞাসা করিলেন, তাহাকে মুকাবিলা করিতে কে প্রস্তুত আছ? মুহাম্মাদ ইবন মাসলামা (রা) বলিলেন, হে আল্লাহর রাসূল! আমি তাহার মুকাবিলায় প্রস্তুত। এই ব্যক্তি আমার ভ্রাতা (মাহমূদ ইব্ন মাসলামা)-কে গতকাল শহীদ করিয়াছে। রাসূলুল্লাহ (স) তাহাকে অনুমতি প্রদান করিলেন। তিনি যখন অগ্রসর হন তখন উভয়ের মধ্যবর্তী স্থানে একটি বৃক্ষ আড়াল হয়। উভয়ই একে অপরকে আঘাত হানার জন্য সুযোগের সন্ধান করিতে থাকেন। অবশেষে মুহাম্মাদ ইবন মাসলামা (রা) তাহাকে হত্যা করেন। সালামা ইব্ন সালামা ও মুজাম্মি' ইবন হারিছাও বলিয়াছেন যে, মুহাম্মাদ ইবন মাসলামা মারহাবকে হত্যা করেন।
ওয়াকিদী বলেন, মুহাম্মাদ ইবন মাসলামা (রা)-এর তরবারির আঘাতে মারহাবের দুই পা দ্বিখণ্ডিত হইয়া যায়। তারপর তিনি তাহাকে ছাড়িয়া দেন এবং বলেন, যন্ত্রণার স্বাদ উপভোগ কর, যেমন আমার ভ্রাতা যন্ত্রণা সহ্য করিয়াছে। তারপর আলী (রা) অগ্রসর হইয়া মারহাবের শিরোচ্ছেদ করেন। অতঃপর তিনি মারহাবের তরবারি এবং অন্যান্য আসবাবপত্র লইয়া রাসূলুল্লাহ (স)-এর নিকট আসিলেন। তাহারা দুইজন রাসূলুল্লাহ (স)-এর সম্মুখে মারহাবের পরিত্যক্ত আসবাবপত্রের মালিকানা লইয়া বিতর্কে জড়াইয়া পড়েন। রাসূলুল্লাহ (স) মুহাম্মাদ ইবন মাসলামাকে তাহার তরবারি, বর্শা ও শিরস্ত্রাণ ইত্যাদি সবকিছু দান করেন।
মারহাবের পর তাহার ভ্রাতা ইয়াসির অগ্রসর হয়। তাহার মুকাবিলার জন্য যুবায়র ইবনুল আওওয়াম (রা) অগ্রসর হন। এই সময় যুবায়রের মাতা সাফিয়্যা (রা) রাসূলুল্লাহ (স)-কে বলিলেন, হে আল্লাহর রাসূল! সে আমার পুত্রকে হত্যা করিয়া ফেলিবে। তিনি বলিলেনঃ না, তোমার পুত্র তাহাকে হত্যা করিবে। অবশেষে যুবায়র (রা) ইয়াসিরকে হত্যা করেন। কামূস দুর্গের অবরোধ প্রায় বিশদিন স্থায়ী ছিল। ইহা ছিল সর্বাধিক শক্তিশালী দুর্গ (যাদুল মা'আদ, ২খ., ১৩৪, ১৩৫; আত-তাবারী, তারীখুল উমাম ওয়াল-মুলুক, ২খ., ৯২, ৯৩)।
এই ব্যাপারে ইব্ন হাজার আসকালানী বলেন, ইমাম মুসলিম কর্তৃক বর্ণিত হাদীছের বিরোধিতা করেন অনেক সীরাতবিদ। ইবন ইসহাক, মূসা ইব্ন উকবা ও আল-ওয়াকিদী দৃঢ় প্রত্যয় ব্যক্ত করিয়াছেন যে, মারহাবকে যিনি হত্যা করিয়াছেন তিনি হইলেন মুহাম্মাদ ইব্ন মাসলামা। ইহার অনুকূলে ইমাম আহমাদ হাসান পর্যায়ের সনদে জাবির (রা) হইতে একটি হাদীছ বর্ণনা করিয়াছেন। কেহ কেহ বলেন, মুহাম্মাদ ইবন মাসলামা মারহাবের মুকাবিলা করিয়া তাহার দুইটি পা দ্বিখণ্ডিত করিয়াছিলেন। পরে আলী (রা) তাহাকে হত্যা করেন। কেহ কেহ বলেন, মুহাম্মাদ ইব্ন মাসলামা (রা) যাহাকে হত্যা করেন সে ছিল মারহাবের ভাই আল-হারিছ। কিন্তু কোন কোন বর্ণনাকারীর নিকট তাহা স্পষ্ট ছিল না। তাই এই বিভ্রান্তি ঘটিয়াছে। যদি এইরূপ না হইয়া থাকে তাহা হইলে মারহাবকে আলী (রা) হত্যা করিয়াছিলেন বলিয়া সহীহ মুসলিমে যে বর্ণনা রহিয়াছে তাহাকে অগ্রাধিকার দিতে হইবে (ফাতহুল বারী, ৭খ., ৪৮৭)।
কামূس দুর্গ যখন অবরোধ করা হয় তখন রাসূলুল্লাহ (স) প্রচন্ড শিরপীড়ায় আক্রান্ত ছিলেন। ফলে রণাঙ্গনে অংশগ্রহণ করিতে পারেন নাই। সুতরাং এই অবস্থায় মুহাজির কিংবা আনসারদের মধ্য হইতে একজনকে তিনি সেনাপতি নিযুক্ত করিতেন। ইহা ছিল সর্বাপেক্ষা অধিক শক্তিশালী ও দুর্জয় কিল্লা। ফলে অবরোধ দীর্ঘস্থায়ী হয় এবং বিজয় বিলম্বিত হইতে থাকে। একদিন রণাঙ্গনে আবু বকর সিদ্দীক (রা) গমন করেন এবং দুর্গ বিজয়ের আপ্রাণ চেষ্টা করেন, কিন্তু দুর্গ জয় হইল না। রাসূলুল্লাহ (স) ঘোষণা করেন, আগামী কল্য আমি রণাঙ্গনের পতাকা এমন এক ব্যক্তির হাতে তুলিয়া দিব অথবা বলিলেন, আগামী কল্য এমন এক ব্যক্তি পতাকা গ্রহণ করিবে যে আল্লাহ ও রাসূল (স)-কে ভালবাসে এবং আল্লাহ ও রাসূলও তাহাকে ভালবাসেন। তাহাকেই মহান আল্লাহ এই দুর্গ বিজয়ের গৌরব প্রদান করিবেন।
সকল সাহাবী রাত্রিতে পরস্পর আলোচনা করেন যে, কাহার ভাগ্যে আগামী কল্য রণ-পতাকা জুটিবে? সকালে সাহাবীগণের সকলেই এই দুর্লভ ভাগ্যের প্রত্যাশায় রাসূলুল্লাহ (স)-এর নিকট আগমন করেন। তখন তিনি জিজ্ঞাসা করিলেন, 'আলী কোথায়? সকলে বলিলেন, চোখ উঠা রোগের কারণে তাহার চক্ষুতে দারুণ ব্যথা। তিনি আসিতে সক্ষম হইবেন না। রাসূলুল্লাহ (স) বলিলেন, তাহাকে ডাকিয়া আন। অতঃপর তিনি উপস্থিত হইলে রাসূলুল্লাহ (স) স্বীয় মুখ নিঃসৃত লালা তাহার চক্ষুতে লাগাইয়া দিলেন এবং আল্লাহর দরবারে দু'আ করিলেন। সঙ্গে সঙ্গে তাহার চক্ষু এমনভাবে নিরাময় হয় যেন পূর্বে কখনও চক্ষুর কোন রোগই ছিল না। অতঃপর 'আলী (রা)-কে সম্বোধন করিয়া বলিলেনঃ শত্রুর নিকট যাও। প্রথমে ইসলামের দা'ওয়াত দাও এবং আল্লাহর অধিকারসমূহ সম্পর্কে তাহাদিগকে বুঝাও। হে 'আলী! যদি তোমার মাধ্যমে এক ব্যক্তিও হিদায়াতপ্রাপ্ত হয়, তাহা হইলে উহা হইবে তোমার জন্য এক বিরাট নি'মত ও সাফল্য (আসাহহুস সিয়ার, পৃ. ১৯০)। আল-বিদায়া ওয়ান-নিহায়া গ্রন্থে ইমাম বুখারীর উক্ত বর্ণনার সাথে এই কথাও আছে, 'আলী বলিলেন, আমি কি রাসূলুল্লাহ (س) হইতে পিছনে পড়িয়া থাকিব? সুতরাং তিনি রাসূলুল্লাহ (স)-এর সহিত মিলিত হইলেন। (বুখারী, ২খ, ৬০৫)।
ইমাম নাসাঈ ও মুসলিম সূত্রে বর্ণিত এক হাদীছে আবূ হুরায়রা (রা) বলেন, রাসূলুল্লাহ (স) কর্তৃক উপরিউক্ত ঘোষণা শ্রবণ করিবার পর উমার (রা) বলেনঃ আমি ঐ দিন ব্যতীত আর কোন দিনই নেতৃত্ব লাভের আকাঙ্খা করি নাই। রাসূলুল্লাহ (স) 'আলী (রা)-কে এই অভিযানে প্রেরণ করিয়া বলিলেনঃ "যাও, যুদ্ধ কর, যতক্ষণ না বিজয় লাভ করিবে, এদিক সেদিক দৃষ্টিপাত করিও না।” 'আলী (রা) বলিলেন, কতক্ষণ পর্যন্ত লড়াই করিব? রাসূলুল্লাহ (স) বলিলেনঃ ইহাদিগের সহিত লড়াই করিতে থাকিবে যেই পর্যন্ত না ইহারা সাক্ষী দিবে যে, আল্লাহ ব্যতীত কোন ইলাহ নাই এবং মুহাম্মাদ আল্লাহর বান্দা ও রাসূল। উহারা যখন এই সাক্ষ্য দিবে তখন আমাদিগের হাত হইতে তাহাদের রক্ত ও সম্পদ রক্ষা পাইবে (আল-বিদায়া ওয়ান-নিহায়া, ২/৪খ., ২১)। দিহলাবী বলেন, 'আলী (রা) রাসূলুল্লাহ (স)-এর এই সুসংবাদ শুনিয়া আল্লাহ্র দরবারে দু'আ করিলেন:
اللَّهُمَّ لَا مَا نِعَ لِمَا أَعْطَيْتَ وَلَا مُعْطَى لِمَا مَنَعْتَ.
“হে আল্লাহ! তুমি যাহা দান করিবে উহা কেহই রোধ করিতে পারিবে না এবং তুমি দিতে না চাহিলে কেহ দিতে পারিবে না।"
প্রথমে চক্ষুর রোগজনিত কারণে 'আলী (রা) খায়বার অভিযানে অংশগ্রহণ হইতে বিরত ছিলেন। তিনি মনে মনে ভাবিতেন, আমি যুদ্ধে উপস্থিত না ইইয়া ভাল কাজ করি নাই। সুতরাং তিনি সফরের প্রস্তুতি লইয়া মদীনা হইতে রওয়ানা করিলেন। পথিমধ্যে অথবা খায়বার পৌঁছিবার পর রাসূলুল্লাহ (স) তাহার আগমনী বার্তা পাইলেন। পরবর্তী দিনের সূচনাপর্বে রাসূলুল্লাহ (স) বলিলেন, আলীকে ডাক। সাহাবীগণ বলিলেন, তিনি এখানেই আছেন, কিন্তু তাহার চক্ষুর অসুস্থতার কারণে তিনি কাছের বস্তুও দেখিতে পান না। আদেশ হইল, তাহাকে আমার নিকট লইয়া আস। সালামা ইবনুল আকওয়া (রা) জিয়া তাহাকে হাত ধরিয়া রাসূলুল্লাহ (স)-এর নিকট লইয়া আসিলেন। অতঃপর রাসূলুল্লাহ (স) তাহার মাথা নিজ উরুর উপর রাখিলেন এবং নিজ মুখের লালা তাহার চক্ষুতে লাগাইয়া দিলেন ও দু'আ করিলেন। এই সময় তাঁহার চক্ষু হইতে ব্যথা সম্পূর্ণ দূরীভূত হইয়া গেল। ইহার পর আর কোন দিনই তাঁহার চক্ষু ও মাথাব্যথা হয় নাই। একটি বর্ণনায় পাওয়া যায়, রাসূলুল্লাহ (স) এই দু'আ করিয়াছিলেন :
اللَّهُمَّ اذْهَبْ عَنْهُ الْحَرَّ وَالْقَرِّ.
"হে আল্লাহ! তাহাকে গরম ও ঠাণ্ডার প্রকোপ হইতে রক্ষা করিও”।
ইব্ন আবী লায়লা বলেন, ইহার ফলে 'আলী (রা) অসহনীয় গরমের দিনে পশমী কাপড় পরিতেন এবং হিমেল শীতে হালকা-পাতলা কাপড় পরিধান করিতেন। ইহাতে তাঁহার শারীরিক কোন ক্ষতি হইত না। 'আলী (রা) শারীরিকভাবে সুস্থ হইয়া উঠিবার পর রাসূলুল্লাহ (স) নিজের খাস বর্ম তাঁহাকে পরাইয়া দিলেন এবং যুল-ফিকার তাঁহার হস্তে তুলিয়া দিয়া বলিলেন, "যাও, পিছপা হইও না যতক্ষণ না তোমার হাতে দুর্গ বিজিত হয়"।
অতঃপর 'আলী (রা) সামরিক পতাকা হস্তে ধারণ করিয়া রওয়ানা হইলেন এবং উহা একটি প্রস্তরময় টিলায় স্থাপন করিলেন। জনৈক ইয়াহুদী শাস্ত্রক দুর্গের উপর দাঁড়াইয়া এই দৃশ্য অবলোকন করিয়া জিজ্ঞাসা করিল, ওহে পতাকাধারী ব্যক্তি! আপনি কে? আপনার নাম কি? তিনি বলিলেন, আমি 'আলী ইব্ন আবী তালিব। অতঃপর ঐ ব্যক্তি স্বগোত্রীয়দেরকে বলিল, "তাওরাতের শপথ! তোমরা এই ব্যক্তির নিকট পরাজয় বরণ করিবে। সে বিজয়লাভ ব্যতিরেকে প্রত্যাবর্তন করিবে না"। সে আলী (রা)-এর গুণাবলী ও বীরত্ব সম্পর্কে অবগত ছিল।
'আলী (রা)-এর বিরুদ্ধে দুর্গ হইতে সর্বপ্রথম বীর ইয়াহুদী মারহাবের ভাই হারিছ বাহির হইয়াছিল। তাহার বর্শা ছিল অত্যন্ত ভারী। বাহির হইবামাত্র সে যুদ্ধ আরম্ভ করিল এবং কয়েকজন মুসলমানকে শহীদ করিল। অতঃপর 'আলী (রা) তাহার নিকটে পৌছিয়া গেলেন এবং একটিমাত্র আঘাতে তাহাকে হত্যা করিলেন। মারহাব তাহার ভ্রাতার হত্যার খবর শুনিয়া খায়বারের বীরদিগের একটি দল লইয়া অস্ত্রে সজ্জিত হইয়া প্রতিশোধ লইতে বাহির হইল। কথিত আছে যে, মারহাব খায়বারবাসীদের মধ্যে অত্যন্ত পরাক্রমশালী সুস্বাস্থ্যের অধিকারী যুদ্ধবাজ ব্যক্তি ছিল। বীরত্বে সে খায়বারবাসীদের মধ্যে অপ্রতিদ্বন্দ্বী ছিল। ঐদিন সে দুইটি বর্ম পরিধান করিয়া দুইটি পাগড়ী মাথায় বাঁধিয়া দুইখানা তরবারি হস্তে লইয়া বীরদর্পে রণক্ষেত্রে নিম্নোক্ত কবিতাটি আবৃত্তি করিতে করিতে বাহির হয় :
قَدْ عَلِمَتْ خَيْبَرُ أَنِّي مَرْحَبُ + شَاكِي السَّلَاحِ بَطَلَ مُجَرِّبٌ.
"খায়বারবাসী জানে আমি মারহাব, যে রণনিপুণ এবং মহাবীর হিসাবে পরীক্ষিত"। 'আলী (রা) এতদশ্রবণে আবৃত্তি করিলেন:
أَنَا الَّذِي سَمَّتْنِي أَمِي حَيْدَرَهُ + ضَرْغَامُ أَجَامٍ وَكَيْتُ قَسْوَرَهُ.
"আমি সেই বীর যাহার মাতা তাহার নাম রাখিয়াছেন হায়দার। আমি গভীর বনের সিংহ" (মাদারিজুন-নুবুওয়াত, পৃ. ৪১৩, ৪১৪)।
'আলী (রা) ও মারহাব কর্তৃক আবৃত্তিকৃত এই কবিতা বিভিন্ন গ্রন্থে ভিন্ন ভিন্নভাবে উদ্ধৃত হইয়াছে। দানাপুরীর গ্রন্থে মারহাব আবৃত্তি করিতে করিতে বাহির হয় নিম্নরূপ: أَنَا الَّذِي سَمَّتْنِي أَمِّي مَرَحَبٌ + شَاكِ السَّلَاحِ بَلْ مُجَرَّبٌ.
"আমি সেই বীর যাহার মাতা তাহার নাম রাখিয়াছেন মারহাব। যিনি রণনিপুণ এবং মহা বীরবর হিসাবে পরীক্ষিত”
'আলী (রা) এতদশ্রবণে আবৃত্তি করিলেন: أَنَا الَّذِي سَمُتْنِي أُمِّي حَيْدَرَةَ + كَلَيْثِ غَابَاتِ كَرِيْهِ الْمَنْظَرَه.
"আমি সেই বীরবর যাহার মাতা তাহার নাম রাখিয়াছেন হায়দার, যে বন্য হিংস্র সিংহতুল্য এবং যাহার চেহারা অত্যন্ত ভয়ঙ্কর" (আসাহহুস সিয়ার, পৃ. ১৯১)।
ইব্ন কাছীর এই কবিতাদ্বয়ে আরও কিছু বৃদ্ধি করিয়া উল্লেখ করিয়াছেন: মারহাব এই কবিতা আবৃত্তি করিতে করিতে বাহির হইল: قَدْ عَلِمَتْ خَيْبَرُ أَنِّي مَرْحَب - شاك السلاح بَطَلَ مُجَرَّبٌ إِذَ اللُّبُوتُ أَقْبَلَتْ تَلَهَبْ - وَاحْجَمَتْ عَنْ صَولَةِ الْمُغَلَبِ.
উত্তরে আলী (রা) আবৃত্তি করিলেন: أنَا الَّذِي سَمَتْنِي أَمِّي حَيْدَرَهُ + كَلَيْتُ غَابَت شَدِيدٌ الْقَسْوَرَةَ اكيلُكُمْ بِالصَّاعِ كَيْلَ السَّنْدَرَةِ
(আল-বিদায়া ওয়ান-নিহায়া, ২/৪খ., ১৮৮, ১৮৯)।
মারহাব সংকল্প করিল, সে আগেই 'আলী (রা)-এর মাথায় আঘাত হানিবে। কিন্তু 'আলী (রা) লাফ দিয়া উঠিয়া যুল-ফিকার দিয়া তাহার মাথায় এত জোরে আঘাত হানেন যে, বর্মসহ মারহাবের মাথা কাটিয় গলদেশ পর্যন্ত দ্বিখণ্ডিত হইয়া যায়। এক বর্ণনায় আছে, উরু পর্যন্ত দুই টুকরা হইয়া যায়। অপর এক বর্ণনায় আছে যে, তাহার বাহনের গদি পর্যন্ত দ্বিখণ্ডিত হইয়া যায়।
অতঃপর মুসলিম বাহিনী তাঁহার নেতৃত্বে রণক্ষেত্রে অবতরণ করিয়া ইয়াহুদীদিগকে হত্যা করিতে লাগিল। সাতজন ইয়াহুদী বীরকে ঐ সময় হত্যা করা হয়। অবশিষ্টরা পরাজয় মানিয়া দুর্গ অভ্যন্তরে প্রবেশ করিতে লাগিল। আলী (রা) তাহাদিগকে ধাওয়া করিয়া অগ্রসর হইতেছিলেন। এমতাবস্থায় জনৈক ইয়াহুদী তাঁহার হাতে আঘাত হানিল। ফলে তাঁহার ঢাল ভূমিতে পড়িয়া গেল এবং অপর এক ইয়াহুদী তাহা উঠাইয়া লইয়া পলায়ন করিল। এই প্রেক্ষিতে আলী (রা)-এর মধ্যে আল্লাহ্র পক্ষ হইতে এমনই রূহানী শক্তি সঞ্চারিত হইল যে, তিনি দুর্গ পার্শ্বস্থিত গর্ত অতিক্রম করিয়া একেবারে দুর্গের দরজায় পৌঁছিয়া গেলেন এবং লৌহ নির্মিত দরজার একাংশ উপড়াইয়া ইহাকে ঢাল বানাইয়া যুদ্ধ অব্যাহত রাখিলেন।
ইমাম বাকির হইতে বর্ণিত আছে যে, আলী (রা) যখন কপাট উপড়াইবার জন্য টান দেন তখন সমগ্র দুর্গ হেলিয়া উঠে। এমন কি সাফিয়্যা বিন্ত হুয়ায় ইব্ন আখতাৰ খাট হইতে পড়িয়া যান এবং মুখমণ্ডলে আঘাত পান।
সীরাতবিদগণ বলেন: যুদ্ধশেষে 'আলী (রা) বেশ দূরে এই দরজা নিক্ষেপ করিলেন। ইহাও কথিত আছে যে, যুদ্ধশেষে আটজন শক্তিশালী ব্যক্তি একত্রে মিলিত হইয়া দরজাটি উল্টাইতে পারেন নাই। এমনকি চল্লিশজন মিলিয়া উহা উঠাইতে চাহিলেন, কিন্তু সক্ষম হন নাই। মাদারিজুন নুবুওয়াতে আছে যে, দরজাটির ওজন ছিল আট মন। তবে কোন কোন সীরাতবিদের মতে এই বর্ণনাগুলি দুর্বল, অনুপযোগী। 'আল্লামা সাখাবী মাকাসিদে হাসানা গ্রন্থে বলিয়াছেন, كُلُّهَا وَاهْيَةً "এই সকল বর্ণনা অলীক” (শিবলী নু'মানী ও সুলায়মান নাদবী, সীরাতুন্নবী, ১৯৮৫ খৃ.)।
মোটকথা, যখন কামূس দুর্গসহ অন্যান্য দুর্গে অবস্থানকারিগণ 'আলী (রা)-এর এই শৌর্য-বীর্য দেখিল তখন তাহারা اَلْأَمَانُ الْأَمَانُ )নিরাপত্তা, নিরাপত্তা) বলিয়া ফরিয়াদ করিতে লাগিল। 'আলী (রা) তাহাদিগকে রাসূলুল্লাহ (স)-এর ইঙ্গিতে এই শর্তের উপর নিরাপত্তা দিলেন যে, প্রত্যেক ব্যক্তি উটের উপর খাদ্য বোঝাই করিয়া শহর ত্যাগ করিয়া চলিয়া যাইবে এবং নগদ মুদ্রা, সাজ-সরঞ্জাম ও অস্ত্রপাতি মুসলমানগণের জন্য রাখিয়া যাইবে। কোন জিনিস লুকাইয়া রাখিবে না। যদি এমন কোন জিনিস বাহির হয় যাহার তথ্য দেওয়া হয় নাই তাহা হইলে তাহাদের নিরাপত্তা প্রত্যাহর করা হইবে।
রাসূলুল্লাহ (স)-এর নিকট যখন বিজয় সংবাদ পৌছিল তখন তিনি ইহার জন্য আল্লাহর শোকর আদায় করিলেন। কারণ ইহা ছিল ইসলাম প্রসারের এক মহাসোপান। 'আলী (রা) রাসূলুল্লাহ (স)-এর দরবারে উপস্থিত হইলে তিনি স্বীয় তাঁবু হইতে বাহির হইয়া তাহাকে স্বাগত জানাইলেন, আলিঙ্গন করিলেন, চক্ষু যুগলের মধ্যবর্তী স্থান চুম্বন করিলেন এবং বলিলেন:
بَلَغَنِي تَنَاءَكَ الْمَشْكُورُ وَضِيْعَكَ الْمَذْكُورُ قَدْ رَضِيَ اللَّهُ عَنْهُ وَرَضِيْتُ أَنَا عَنْكَ.
"আমার নিকট তোমার কৃতজ্ঞতাপূর্ণ প্রশংসা পৌছিয়াছে, তোমার শৌর্য-বীর্ষের বর্ণনা করা হইয়াছে, আল্লাহ তাহার প্রতি সদয় হইয়াছেন এবং আমি তোমার উপর সন্তুষ্ট"।
তখন 'আলী (রা) কাঁদিতে লাগিলেন। রাসূলুল্লাহ (স) জিজ্ঞাসা করিলেন, ইহা কিসের কান্না, আনন্দের না বেদনার? 'আলী (রা) বলিলেন, ইহা আনন্দের কান্না। আপনি আমার উপর সন্তুষ্ট আছেন, ইহাতে কি আমি আনন্দিত হইব না? রাসূলুল্লাহ (স) বলিলেনঃ শুধু আমিই তোমার উপর খুশী নহি বরং আল্লাহ, জিবরীল, মীকাঈল এবং সকল ফেরেশতা তোমার উপর সন্তুষ্ট (মাদারিজুন নুবুওয়া, প্রাগুক্ত)।
ইব্ন কায়্যিম আল-জাওযিয়্যা (র) বলেন, সহীহ মুসলিমে এইভাবে উল্লেখ আছে যে, 'আলী (রা) মারহাবকে হত্যা করিয়াছেন। কিন্তু মূসা ইব্ن উকবা, ইমাম যুহরী ও আবুল আসওয়াদের উদ্ধৃতিতে এবং ইউনুস ইব্ن বুকায়র ইবন ইসহাক সূত্রে উল্লেখ করিয়াছেন যে, জাবির ইবন আবদিল্লাহ বর্ণনা করিয়াছেন যে, মারহাবকে মুহাম্মাদ ইবন মাসলামা (রা) হত্যা করেন। মারহাব যখন দুর্গের ভিতর হইতে বীরদর্পে বাহির হইয়া তাহার মুকাবিলার জন্য আহ্বান করে তখন রাসূলুল্লাহ (স) জিজ্ঞাসা করিলেন, তাহাকে মুকাবিলা করিতে কে প্রস্তুত আছ? মুহাম্মাদ ইবন মাসলামা (রা) বলিলেন, হে আল্লাহর রাসূল! আমি তাহার মুকাবিলায় প্রস্তুত। এই ব্যক্তি আমার ভ্রাতা (মাহমূদ ইব্ن মাসলামা)-কে গতকাল শহীদ করিয়াছে। রাসূলুল্লাহ (স) তাহাকে অনুমতি প্রদান করিলেন। তিনি যখন অগ্রসর হন তখন উভয়ের মধ্যবর্তী স্থানে একটি বৃক্ষ আড়াল হয়। উভয়ই একে অপরকে আঘাত হানার জন্য সুযোগের সন্ধান করিতে থাকেন। অবশেষে মুহাম্মাদ ইবন মাসলামা (রা) তাহাকে হত্যা করেন। সালামা ইব্ن সালামা ও মুজাম্মি' ইবন হারিছাও বলিয়াছেন যে, মুহাম্মাদ ইবন মাসলামা মারহাবকে হত্যা করেন।
ওয়াকিদী বলেন, মুহাম্মাদ ইবন মাসলামা (রা)-এর তরবারির আঘাতে মারহাবের দুই পা দ্বিখণ্ডিত হইয়া যায়। তারপর তিনি তাহাকে ছাড়িয়া দেন এবং বলেন, যন্ত্রণার স্বাদ উপভোগ কর, যেমন আমার ভ্রাতা যন্ত্রণা সহ্য করিয়াছে। তারপর আলী (را) অগ্রসর হইয়া মারহাবের শিরোচ্ছেদ করেন। অতঃপর তিনি মারহাবের তরবারি এবং অন্যান্য আসবাবপত্র লইয়া রাসূলুল্লাহ (স)-এর নিকট আসিলেন। তাহারা দুইজন রাসূলুল্লাহ (স)-এর সম্মুখে মারহাবের পরিত্যক্ত আসবাবপত্রের মালিকানা লইয়া বিতর্কে জড়াইয়া পড়েন। রাসূলুল্লাহ (س) মুহাম্মাদ ইবন মাসলামাকে তাহার তরবারি, বর্শা ও শিরস্ত্রাণ ইত্যাদি সবকিছু দান করেন।
মারহাবের পর তাহার ভ্রাতা ইয়াসির অগ্রসর হয়। তাহার মুকাবিলার জন্য যুবায়র ইবনুল আওওয়াম (রা) অগ্রসর হন। এই সময় যুবায়রের মাতা সাফিয়্যা (را) রাসূলুল্লাহ (س)-কে বলিলেন, হে আল্লাহর রাসূল! সে আমার পুত্রকে হত্যা করিয়া ফেলিবে। তিনি বলিলেনঃ না, তোমার পুত্র তাহাকে হত্যা করিবে। অবশেষে যুবায়র (রা) ইয়াসিরকে হত্যা করেন। কামূس দুর্গের অবরোধ প্রায় বিশদিন স্থায়ী ছিল। ইহা ছিল সর্বাধিক শক্তিশালী দুর্গ (যাদুল মা'আদ, ২খ., ১৩৪, ১৩৫; আত-তাবারী, তারীখুল উমাম ওয়াল-মুলুক, ২খ., ৯২, ৯৩)।
এই ব্যাপারে ইব্ن হাজার আসকালানী বলেন, ইমাম মুসলিম কর্তৃক বর্ণিত হাদীছের বিরোধিতা করেন অনেক সীরাতবিদ। ইবন ইসহাক, মূসা ইব্ن উকবা ও আল-ওয়াকিদী দৃঢ় প্রত্যয় ব্যক্ত করিয়াছেন যে, মারহাবকে যিনি হত্যা করিয়াছেন তিনি হইলেন মুহাম্মাদ ইব্ن মাসলামা। ইহার অনুকূলে ইমাম আহমাদ হাসান পর্যায়ের সনদে জাবির (রা) হইতে একটি হাদীছ বর্ণনা করিয়াছেন। কেহ কেহ বলেন, মুহাম্মাদ ইব্ن মাসলামা মারহাবের মুকাবিলা করিয়া তাহার দুইটি পা দ্বিখণ্ডিত করিয়াছিলেন। পরে আলী (রা) তাহাকে হত্যা করেন। কেহ কেহ বলেন, মুহাম্মাদ ইব্ن মাসলামা (را) যাহাকে হত্যা করেন সে ছিল মারহাবের ভাই আল-হারিছ। কিন্তু কোন কোন বর্ণনাকারীর নিকট তাহা স্পষ্ট ছিল না। তাই এই বিভ্রান্তি ঘটিয়াছে। যদি এইরূপ না হইয়া থাকে তাহা হইলে মারহাবকে আলী (را) হত্যা করিয়াছিলেন বলিয়া সহীহ মুসলিমে যে বর্ণনা রহিয়াছে তাহাকে অগ্রাধিকার দিতে হইবে (ফাতহুল বারী, ৭খ., ৪৮৭)।
কামূস দুর্গ যখন অবরোধ করা হয় তখন রাসূলুল্লাহ (স) প্রচন্ড শিরপীড়ায় আক্রান্ত ছিলেন। ফলে রণাঙ্গনে অংশগ্রহণ করিতে পারেন নাই। সুতরাং এই অবস্থায় মুহাজির কিংবা আনসারদের মধ্য হইতে একজনকে তিনি সেনাপতি নিযুক্ত করিতেন। ইহা ছিল সর্বাপেক্ষা অধিক শক্তিশালী ও দুর্জয় কিল্লা। ফলে অবরোধ দীর্ঘস্থায়ী হয় এবং বিজয় বিলম্বিত হইতে থাকে। একদিন রণাঙ্গনে আবু বকর সিদ্দীক (রা) গমন করেন এবং দুর্গ বিজয়ের আপ্রাণ চেষ্টা করেন, কিন্তু দুর্গ জয় হইল না। রাসূলুল্লাহ (স) ঘোষণা করেন, আগামী কল্য আমি রণাঙ্গনের পতাকা এমন এক ব্যক্তির হাতে তুলিয়া দিব অথবা বলিলেন, আগামী কল্য এমন এক ব্যক্তি পতাকা গ্রহণ করিবে যে আল্লাহ ও রাসূল (স)-কে ভালবাসে এবং আল্লাহ ও রাসূলও তাহাকে ভালবাসেন। তাহাকেই মহান আল্লাহ এই দুর্গ বিজয়ের গৌরব প্রদান করিবেন।
সকল সাহাবী রাত্রিতে পরস্পর আলোচনা করেন যে, কাহার ভাগ্যে আগামী কল্য রণ-পতাকা জুটিবে? সকালে সাহাবীগণের সকলেই এই দুর্লভ ভাগ্যের প্রত্যাশায় রাসূলুল্লাহ (স)-এর নিকট আগমন করেন। তখন তিনি জিজ্ঞাসা করিলেন, 'আলী কোথায়? সকলে বলিলেন, চোখ উঠা রোগের কারণে তাহার চক্ষুতে দারুণ ব্যথা। তিনি আসিতে সক্ষম হইবেন না। রাসূলুল্লাহ (স) বলিলেন, তাহাকে ডাকিয়া আন। অতঃপর তিনি উপস্থিত হইলে রাসূলুল্লাহ (স) স্বীয় মুখ নিঃসৃত লালা তাহার চক্ষুতে লাগাইয়া দিলেন এবং আল্লাহর দরবারে দু'আ করিলেন। সঙ্গে সঙ্গে তাহার চক্ষু এমনভাবে নিরাময় হয় যেন পূর্বে কখনও চক্ষুর কোন রোগই ছিল না। অতঃপর 'আলী (রা)-কে সম্বোধন করিয়া বলিলেনঃ শত্রুর নিকট যাও। প্রথমে ইসলামের দা'ওয়াত দাও এবং আল্লাহর অধিকারসমূহ সম্পর্কে তাহাদিগকে বুঝাও। হে 'আলী! যদি তোমার মাধ্যমে এক ব্যক্তিও হিদায়াতপ্রাপ্ত হয়, তাহা হইলে উহা হইবে তোমার জন্য এক বিরাট নি'মত ও সাফল্য (আসাহহুস সিয়ার, পৃ. ১৯০)। আল-বিদায়া ওয়ান-নিহায়া গ্রন্থে ইমাম বুখারীর উক্ত বর্ণনার সাথে এই কথাও আছে, 'আলী বলিলেন, আমি কি রাসূলুল্লাহ (স) হইতে পিছনে পড়িয়া থাকিব? সুতরাং তিনি রাসূলুল্লাহ (স)-এর সহিত মিলিত হইলেন। (বুখারী, ২খ, ৬০৫)।
ইমাম নাসাঈ ও মুসলিম সূত্রে বর্ণিত এক হাদীছে আবূ হুরায়রা (রা) বলেন, রাসূলুল্লাহ (স) কর্তৃক উপরিউক্ত ঘোষণা শ্রবণ করিবার পর উমার (রা) বলেনঃ আমি ঐ দিন ব্যতীত আর কোন দিনই নেতৃত্ব লাভের আকাঙ্খা করি নাই। রাসূলুল্লাহ (স) 'আলী (রা)-কে এই অভিযানে প্রেরণ করিয়া বলিলেনঃ "যাও, যুদ্ধ কর, যতক্ষণ না বিজয় লাভ করিবে, এদিক সেদিক দৃষ্টিপাত করিও না।” 'আলী (রা) বলিলেন, কতক্ষণ পর্যন্ত লড়াই করিব? রাসূলুল্লাহ (স) বলিলেনঃ ইহাদিগের সহিত লড়াই করিতে থাকিবে যেই পর্যন্ত না ইহারা সাক্ষী দিবে যে, আল্লাহ ব্যতীত কোন ইলাহ নাই এবং মুহাম্মাদ আল্লাহর বান্দা ও রাসূল। উহারা যখন এই সাক্ষ্য দিবে তখন আমাদিগের হাত হইতে তাহাদের রক্ত ও সম্পদ রক্ষা পাইবে (আল-বিদায়া ওয়ান-নিহায়া, ২/৪খ., পৃ. ২১)। দিহলাবী বলেন, 'আলী (রা) রাসূলুল্লাহ (স)-এর এই সুসংবাদ শুনিয়া আল্লাহ্র দরবারে দু'আ করিলেন:
اللَّهُمَّ لَا مَا نِعَ لِمَا أَعْطَيْتَ وَلَا مُعْطَى لِمَا مَنَعْتَ.
“হে আল্লাহ! তুমি যাহা দান করিবে উহা কেহই রোধ করিতে পারিবে না এবং তুমি দিতে না চাহিলে কেহ দিতে পারিবে না।"
প্রথমে চক্ষুর রোগজনিত কারণে 'আলী (রা) খায়বার অভিযানে অংশগ্রহণ হইতে বিরত ছিলেন। তিনি মনে মনে ভাবিতেন, আমি যুদ্ধে উপস্থিত না ইইয়া ভাল কাজ করি নাই। সুতরাং তিনি সফরের প্রস্তুতি লইয়া মদীনা হইতে রওয়ানা করিলেন। পথিমধ্যে অথবা খায়বার পৌঁছিবার পর রাসূলুল্লাহ (স) তাহার আগমনী বার্তা পাইলেন। পরবর্তী দিনের সূচনাপর্বে রাসূলুল্লাহ (স) বলিলেন, আলীকে ডাক। সাহাবীগণ বলিলেন, তিনি এখানেই আছেন, কিন্তু তাহার চক্ষুর অসুস্থতার কারণে তিনি কাছের বস্তুও দেখিতে পান না। আদেশ হইল, তাহাকে আমার নিকট লইয়া আস। সালামা ইবনুল আকওয়া (রা) জিয়া তাহাকে হাত ধরিয়া রাসূলুল্লাহ (স)-এর নিকট লইয়া আসিলেন। অতঃপর রাসূলুল্লাহ (স) তাহার মাথা নিজ উরুর উপর রাখিলেন এবং নিজ মুখের লালা তাহার চক্ষুতে লাগাইয়া দিলেন ও দু'আ করিলেন। এই সময় তাঁহার চক্ষু হইতে ব্যথা সম্পূর্ণ দূরীভূত হইয়া গেল। ইহার পর আর কোন দিনই তাঁহার চক্ষু ও মাথাব্যথা হয় নাই। একটি বর্ণনায় পাওয়া যায়, রাসূলুল্লাহ (স) এই দু'আ করিয়াছিলেন :
اللَّهُمَّ اذْهَبْ عَنْهُ الْحَرَّ وَالْقَرِّ.
"হে আল্লাহ! তাহাকে গরম ও ঠাণ্ডার প্রকোপ হইতে রক্ষা করিও”।
ইব্ন আবী লায়লা বলেন, ইহার ফলে 'আলী (রা) অসহনীয় গরমের দিনে পশমী কাপড় পরিতেন এবং হিমেল শীতে হালকা-পাতলা কাপড় পরিধান করিতেন। ইহাতে তাঁহার শারীরিক কোন ক্ষতি হইত না। 'আলী (রা) শারীরিকভাবে সুস্থ হইয়া উঠিবার পর রাসূলুল্লাহ (স) নিজের খাস বর্ম তাঁহাকে পরাইয়া দিলেন এবং যুল-ফিকার তাঁহার হস্তে তুলিয়া দিয়া বলিলেন, "যাও, পিছপা হইও না যতক্ষণ না তোমার হাতে দুর্গ বিজিত হয়"।
অতঃপর 'আলী (রা) সামরিক পতাকা হস্তে ধারণ করিয়া রওয়ানা হইলেন এবং উহা একটি প্রস্তরময় টিলায় স্থাপন করিলেন। জনৈক ইয়াহুদী শাস্ত্রক দুর্গের উপর দাঁড়াইয়া এই দৃশ্য অবলোকন করিয়া জিজ্ঞাসা করিল, ওহে পতাকাধারী ব্যক্তি! আপনি কে? আপনার নাম কি? তিনি বলিলেন, আমি 'আলী ইব্ন আবী তালিব। অতঃপর ঐ ব্যক্তি স্বগোত্রীয়দেরকে বলিল, "তাওরাতের শপথ! তোমরা এই ব্যক্তির নিকট পরাজয় বরণ করিবে। সে বিজয়লাভ ব্যতিরেকে প্রত্যাবর্তন করিবে না"। সে আলী (রা)-এর গুণাবলী ও বীরত্ব সম্পর্কে অবগত ছিল।
'আলী (রা)-এর বিরুদ্ধে দুর্গ হইতে সর্বপ্রথম বীর ইয়াহুদী মারহাবের ভাই হারিছ বাহির হইয়াছিল। তাহার বর্শা ছিল অত্যন্ত ভারী। বাহির হইবামাত্র সে যুদ্ধ আরম্ভ করিল এবং কয়েকজন মুসলমানকে শহীদ করিল। অতঃপর 'আলী (রা) তাহার নিকটে পৌছিয়া গেলেন এবং একটিমাত্র আঘাতে তাহাকে হত্যা করিলেন। মারহাব তাহার ভ্রাতার হত্যার খবর শুনিয়া খায়বারের বীরদিগের একটি দল লইয়া অস্ত্রে সজ্জিত হইয়া প্রতিশোধ লইতে বাহির হইল। কথিত আছে যে, মারহাব খায়বারবাসীদের মধ্যে অত্যন্ত পরাক্রমশালী সুস্বাস্থ্যের অধিকারী যুদ্ধবাজ ব্যক্তি ছিল। বীরত্বে সে খায়বারবাসীদের মধ্যে অপ্রতিদ্বন্দ্বী ছিল। ঐদিন সে দুইটি বর্ম পরিধান করিয়া দুইটি পাগড়ী মাথায় বাঁধিয়া দুইখানা তরবারি হস্তে লইয়া বীরদর্পে রণক্ষেত্রে নিম্নোক্ত কবিতাটি আবৃত্তি করিতে করিতে বাহির হয় :
قَدْ عَلِمَتْ خَيْبَرُ أَنِّي مَرْحَبُ + شَاكِي السَّلَاحِ بَطَلَ مُجَرِّبٌ.
"খায়বারবাসী জানে আমি মারহাব, যে রণনিপুণ এবং মহাবীর হিসাবে পরীক্ষিত"। 'আলী (রা) এতদশ্রবণে আবৃত্তি করিলেন:
أَنَا الَّذِي سَمَّتْنِي أَمِي حَيْدَرَهُ + ضَرْغَامُ أَجَامٍ وَكَيْتُ قَسْوَرَهُ.
"আমি সেই বীর যাহার মাতা তাহার নাম রাখিয়াছেন হায়দার। আমি গভীর বনের সিংহ" (মাদারিজুন-নুবুওয়াত, পৃ. ৪১৩, ৪১৪)।
'আলী (রা) ও মারহাব কর্তৃক আবৃত্তিকৃত এই কবিতা বিভিন্ন গ্রন্থে ভিন্ন ভিন্নভাবে উদ্ধৃত হইয়াছে। দানাপুরীর গ্রন্থে মারহাব আবৃত্তি করিতে করিতে বাহির হয় নিম্নরূপ:
أَنَا الَّذِي سَمَّتْنِي أَمِّي مَرَحَبٌ + شَاكِ السَّلَاحِ بَلْ مُجَرَّبٌ.
"আমি সেই বীর যাহার মাতা তাহার নাম রাখিয়াছেন মারহাব। যিনি রণনিপুণ এবং মহা বীরবর হিসাবে পরীক্ষিত”
'আলী (রা) এতদশ্রবণে আবৃত্তি করিলেন: أَنَا الَّذِي سَمُتْنِي أُمِّي حَيْدَرَةَ + كَلَيْثِ غَابَاتِ كَرِيْهِ الْمَنْظَرَه.
"আমি সেই বীরবর যাহার মাতা তাহার নাম রাখিয়াছেন হায়দার, যে বন্য হিংস্র সিংহতুল্য এবং যাহার চেহারা অত্যন্ত ভয়ঙ্কর" (আসাহহুস সিয়ার, পৃ. ১৯১)।
ইব্ন কাছীর এই কবিতাদ্বয়ে আরও কিছু বৃদ্ধি করিয়া উল্লেখ করিয়াছেন: মারহাব এই কবিতা আবৃত্তি করিতে করিতে বাহির হইল: قَدْ عَلِمَتْ خَيْبَرُ أَنِّي مَرْحَب - شاك السلاح بَطَلَ مُجَرَّبٌ إِذَ اللُّبُوتُ أَقْبَلَتْ تَلَهَبْ - وَاحْجَمَتْ عَنْ صَولَةِ الْمُغَلَبِ.
উত্তরে আলী (রা) আবৃত্তি করিলেন: أنَا الَّذِي سَمَتْنِي أَمِّي حَيْدَرَهُ + كَلَيْتُ غَابَت شَدِيدٌ الْقَسْوَرَةَ اكيلُكُمْ بِالصَّاعِ كَيْلَ السَّنْدَرَةِ
(আল-বিদায়া ওয়ান-নিহায়া, ২/৪খ., পৃ. ১৮৮, ১৮৯)।
মারহাব সংকল্প করিল, সে আগেই 'আলী (রা)-এর মাথায় আঘাত হানিবে। কিন্তু 'আলী (রা) লাফ দিয়া উঠিয়া যুল-ফিকার দিয়া তাহার মাথায় এত জোরে আঘাত হানেন যে, বর্মসহ মারহাবের মাথা কাটিয় গলদেশ পর্যন্ত দ্বিখণ্ডিত হইয়া যায়। এক বর্ণনায় আছে, উরু পর্যন্ত দুই টুকরা হইয়া যায়। অপর এক বর্ণনায় আছে যে, তাহার বাহনের গদি পর্যন্ত দ্বিখণ্ডিত হইয়া যায়।
অতঃপর মুসলিম বাহিনী তাঁহার নেতৃত্বে রণক্ষেত্রে অবতরণ করিয়া ইয়াহুদীদিগকে হত্যা করিতে লাগিল। সাতজন ইয়াহুদী বীরকে ঐ সময় হত্যা করা হয়। অবশিষ্টরা পরাজয় মানিয়া দুর্গ অভ্যন্তরে প্রবেশ করিতে লাগিল। আলী (রা) তাহাদিগকে ধাওয়া করিয়া অগ্রসর হইতেছিলেন। এমতাবস্থায় জনৈক ইয়াহুদী তাঁহার হাতে আঘাত হানিল। ফলে তাঁহার ঢাল ভূমিতে পড়িয়া গেল এবং অপর এক ইয়াহুদী তাহা উঠাইয়া লইয়া পলায়ন করিল। এই প্রেক্ষিতে আলী (রা)-এর মধ্যে আল্লাহ্র পক্ষ হইতে এমনই রূহানী শক্তি সঞ্চারিত হইল যে, তিনি দুর্গ পার্শ্বস্থিত গর্ত অতিক্রম করিয়া একেবারে দুর্গের দরজায় পৌঁছিয়া গেলেন এবং লৌহ নির্মিত দরজার একাংশ উপড়াইয়া ইহাকে ঢাল বানাইয়া যুদ্ধ অব্যাহত রাখিলেন।
ইমাম বাকির হইতে বর্ণিত আছে যে, আলী (রা) যখন কপাট উপড়াইবার জন্য টান দেন তখন সমগ্র দুর্গ হেলিয়া উঠে। এমন কি সাফিয়্যা বিন্ত হুয়ায় ইব্ন আখতাৰ খাট হইতে পড়িয়া যান এবং মুখমণ্ডলে আঘাত পান।
সীরাতবিদগণ বলেন: যুদ্ধশেষে 'আলী (রা) বেশ দূরে এই দরজা নিক্ষেপ করিলেন। ইহাও কথিত আছে যে, যুদ্ধশেষে আটজন শক্তিশালী ব্যক্তি একত্রে মিলিত হইয়া দরজাটি উল্টাইতে পারেন নাই। এমনকি চল্লিশজন মিলিয়া উহা উঠাইতে চাহিলেন, কিন্তু সক্ষম হন নাই। মাদারিজুন নুবুওয়াতে আছে যে, দরজাটির ওজন ছিল আট মন। তবে কোন কোন সীরাতবিদের মতে এই বর্ণনাগুলি দুর্বল, অনুপযোগী। 'আল্লামা সাখাবী মাকাসিদে হাসানা গ্রন্থে বলিয়াছেন, كُلُّهَا وَاهْيَةً "এই সকল বর্ণনা অলীক” (শিবলী নু'মানী ও সুলায়মান নাদবী, সীরাতুন্নবী, ১৯৮৫ খৃ.)।
মোটকথা, যখন কামূস দুর্গসহ অন্যান্য দুর্গে অবস্থানকারিগণ 'আলী (রা)-এর এই শৌর্য-বীর্য দেখিল তখন তাহারা اَلْأَمَانُ الْأَمَانُ (নিরাপত্তা, নিরাপত্তা) বলিয়া ফরিয়াদ করিতে লাগিল। 'আলী (রা) তাহাদিগকে রাসূলুল্লাহ (স)-এর ইঙ্গিতে এই শর্তের উপর নিরাপত্তা দিলেন যে, প্রত্যেক ব্যক্তি উটের উপর খাদ্য বোঝাই করিয়া শহর ত্যাগ করিয়া চলিয়া যাইবে এবং নগদ মুদ্রা, সাজ-সরঞ্জাম ও অস্ত্রপাতি মুসলমানগণের জন্য রাখিয়া যাইবে। কোন জিনিস লুকাইয়া রাখিবে না। যদি এমন কোন জিনিস বাহির হয় যাহার তথ্য দেওয়া হয় নাই তাহা হইলে তাহাদের নিরাপত্তা প্রত্যাহর করা হইবে।
রাসূলুল্লাহ (স)-এর নিকট যখন বিজয় সংবাদ পৌছিল তখন তিনি ইহার জন্য আল্লাহর শোকর আদায় করিলেন। কারণ ইহা ছিল ইসলাম প্রসারের এক মহাসোপান। 'আলী (রা) রাসূলুল্লাহ (স)-এর দরবারে উপস্থিত হইলে তিনি স্বীয় তাঁবু হইতে বাহির হইয়া তাহাকে স্বাগত জানাইলেন, আলিঙ্গন করিলেন, চক্ষু যুগলের মধ্যবর্তী স্থান চুম্বন করিলেন এবং বলিলেন:
بَلَغَنِي تَنَاءَكَ الْمَشْكُورُ وَضِيْعَكَ الْمَذْكُورُ قَدْ رَضِيَ اللَّهُ عَنْهُ وَرَضِيْتُ أَنَا عَنْكَ.
"আমার নিকট তোমার কৃতজ্ঞতাপূর্ণ প্রশংসা পৌছিয়াছে, তোমার শৌর্য-বীর্ষের বর্ণনা করা হইয়াছে, আল্লাহ তাহার প্রতি সদয় হইয়াছেন এবং আমি তোমার উপর সন্তুষ্ট"।
তখন 'আলী (রা) কাঁদিতে লাগিলেন। রাসূলুল্লাহ (স) জিজ্ঞাসা করিলেন, ইহা কিসের কান্না, আনন্দের না বেদনার? 'আলী (রা) বলিলেন, ইহা আনন্দের কান্না। আপনি আমার উপর সন্তুষ্ট আছেন, ইহাতে কি আমি আনন্দিত হইব না? রাসূলুল্লাহ (স) বলিলেনঃ শুধু আমিই তোমার উপর খুশী নহি বরং আল্লাহ, জিবরীল, মীকাঈল এবং সকল ফেরেশতা তোমার উপর সন্তুষ্ট (মাদারিজুন নুবুওয়া, প্রাগুক্ত)।
ইব্ন কায়্যিম আল-জাওযিয়্যা (র) বলেন, সহীহ মুসলিমে এইভাবে উল্লেখ আছে যে, 'আলী (রা) মারহাবকে হত্যা করিয়াছেন। কিন্তু মূসা ইব্ন উকবা, ইমাম যুহরী ও আবুল আসওয়াদের উদ্ধৃতিতে এবং ইউনুস ইব্ন বুকায়র ইবন ইসহাক সূত্রে উল্লেখ করিয়াছেন যে, জাবির ইবন আবদিল্লাহ বর্ণনা করিয়াছেন যে, মারহাবকে মুহাম্মাদ ইবন মাসলামা (রা) হত্যা করেন। মারহাব যখন দুর্গের ভিতর হইতে বীরদর্পে বাহির হইয়া তাহার মুকাবিলার জন্য আহ্বান করে তখন রাসূলুল্লাহ (স) জিজ্ঞাসা করিলেন, তাহাকে মুকাবিলা করিতে কে প্রস্তুত আছ? মুহাম্মাদ ইবন মাসলামা (রা) বলিলেন, হে আল্লাহর রাসূল! আমি তাহার মুকাবিলায় প্রস্তুত। এই ব্যক্তি আমার ভ্রাতা (মাহমূদ ইব্ন মাসলামা)-কে গতকাল শহীদ করিয়াছে। রাসূলুল্লাহ (স) তাহাকে অনুমতি প্রদান করিলেন। তিনি যখন অগ্রসর হন তখন উভয়ের মধ্যবর্তী স্থানে একটি বৃক্ষ আড়াল হয়। উভয়ই একে অপরকে আঘাত হানার জন্য সুযোগের সন্ধান করিতে থাকেন। অবশেষে মুহাম্মাদ ইবন মাসলামা (রা) তাহাকে হত্যা করেন। সালামা ইব্ন সালামা ও মুজাম্মি' ইবন হারিছাও বলিয়াছেন যে, মুহাম্মাদ ইবন মাসলামা মারহাবকে হত্যা করেন।
ওয়াকিদী বলেন, মুহাম্মাদ ইবন মাসলামা (রা)-এর তরবারির আঘাতে মারহাবের দুই পা দ্বিখণ্ডিত হইয়া যায়। তারপর তিনি তাহাকে ছাড়িয়া দেন এবং বলেন, যন্ত্রণার স্বাদ উপভোগ কর, যেমন আমার ভ্রাতা যন্ত্রণা সহ্য করিয়াছে। তারপর আলী (রা) অগ্রসর হইয়া মারহাবের শিরোচ্ছেদ করেন। অতঃপর তিনি মারহাবের তরবারি এবং অন্যান্য আসবাবপত্র লইয়া রাসূলুল্লাহ (স)-এর নিকট আসিলেন। তাহারা দুইজন রাসূলুল্লাহ (স)-এর সম্মুখে মারহাবের পরিত্যক্ত আসবাবপত্রের মালিকানা লইয়া বিতর্কে জড়াইয়া পড়েন। রাসূলুল্লাহ (স) মুহাম্মাদ ইবন মাসলামাকে তাহার তরবারি, বর্শা ও শিরস্ত্রাণ ইত্যাদি সবকিছু দান করেন।
মারহাবের পর তাহার ভ্রাতা ইয়াসির অগ্রসর হয়। তাহার মুকাবিলার জন্য যুবায়র ইবনুল আওওয়াম (রা) অগ্রসর হন। এই সময় যুবায়রের মাতা সাফিয়্যা (রা) রাসূলুল্লাহ (স)-কে বলিলেন, হে আল্লাহর রাসূল! সে আমার পুত্রকে হত্যা করিয়া ফেলিবে। তিনি বলিলেনঃ না, তোমার পুত্র তাহাকে হত্যা করিবে। অবশেষে যুবায়র (রা) ইয়াসিরকে হত্যা করেন। কামূস দুর্গের অবরোধ প্রায় বিশদিন স্থায়ী ছিল। ইহা ছিল সর্বাধিক শক্তিশালী দুর্গ (যাদুল মা'আদ, ২খ., ১৩৪, ১৩৫; আত-তাবারী, তারীখুল উমাম ওয়াল-মুলুক, ২খ., ৯২, ৯৩)।
এই ব্যাপারে ইব্ন হাজার আসকালানী বলেন, ইমাম মুসলিম কর্তৃক বর্ণিত হাদীছের বিরোধিতা করেন অনেক সীরাতবিদ। ইবন ইসহাক, মূসা ইব্ন উকবা ও আল-ওয়াকিদী দৃঢ় প্রত্যয় ব্যক্ত করিয়াছেন যে, মারহাবকে যিনি হত্যা করিয়াছেন তিনি হইলেন মুহাম্মাদ ইব্ন মাসলামা। ইহার অনুকূলে ইমাম আহমাদ হাসান পর্যায়ের সনদে জাবির (রা) হইতে একটি হাদীছ বর্ণনা করিয়াছেন। কেহ কেহ বলেন, মুহাম্মাদ ইবন মাসলামা মারহাবের মুকাবিলা করিয়া তাহার দুইটি পা দ্বিখণ্ডিত করিয়াছিলেন। পরে আলী (রা) তাহাকে হত্যা করেন। কেহ কেহ বলেন, মুহাম্মাদ ইব্ন মাসলামা (রা) যাহাকে হত্যা করেন সে ছিল মারহাবের ভাই আল-হারিছ। কিন্তু কোন কোন বর্ণনাকারীর নিকট তাহা স্পষ্ট ছিল না। তাই এই বিভ্রান্তি ঘটিয়াছে। যদি এইরূপ না হইয়া থাকে তাহা হইলে মারহাবকে আলী (রা) হত্যা করিয়াছিলেন বলিয়া সহীহ মুসলিমে যে বর্ণনা রহিয়াছে তাহাকে অগ্রাধিকার দিতে হইবে (ফাতহুল বারী, ৭খ., ৪৮৭)।
📄 সাফিয়্যা (রা)
কিনানা ইব্ন আবিল হুকায়কেরই দুর্গ ছিল কামূস। ইয়াহুদীগণ যখন এই দুর্গ হইতে পলায়ন করে এবং দুর্গ বিজিত হয় তখন যাহারা বন্দী হইয়াছিল তাহাদের মধ্যে সাফিয়্যা বিন্ত হুয়ায় ইব্ন আখতাব এবং তাহার দুইজন চাচাতো ভগ্নিও ছিল। ইব্ন ইসহাক উল্লেখ করিয়াছেন যে, সাফিয়্যা (রা) ছিলেন কিনানা ইব্ন রাবী' ইব্ন আবিল হুকায়কের স্বল্পবয়সী ও সদ্য বিবাহিতা স্ত্রী। প্রথমে তিনি দিহয়া ইব্ন খালীফা আল-কালবী (রা)-এর ভাগে দাসী হিসাবে বণ্টিত হইয়াছিলেন। কিন্তু তাহার সামাজিক মর্যাদার বিবেচনায় সাহাবীগণ রাসূলুল্লাহ (স)-এর নিকট আসিয়া বলিলেন, সাফিয়্যা বিশিষ্ট সরদার তনয়া এবং অতিশয় পূত-পবিত্র চরিত্রের অধিকারিনী। দিহয়া কালবীর নিকট তাহাকে রাখা সমীচীন নয়। তিনি আপনারই যোগ্য। এই কারণে রাসূলুল্লাহ (স) তাহাকে দিহয়া কালবীর নিকট হইতে ক্রয় করিয়া লইলেন। তাহার ভগ্নীদেরকে তাহার হাতে সোপর্দ করিলেন (আসাহহুস সিয়ার, পৃ. ১৯৩)।
মাওলানা আবুল কালাম আযাদ বলেন, খায়বারের বন্দীদের মধ্যে সাফিয়্যা (রা)-ও ছিলেন। দিহয়া কালবী (রা) একজন দাসী দানের আবেদন করিলেন। রাসূলুল্লাহ (স) তাহাকে নিজ পসন্দে একজন গ্রহণ করিবার অনুমতি দান করিলেন। তিনি সাফিয়্যা (রা)-কে পছন্দ করিলেন। ইহাতে সাহাবীগণ বলিলেন, সাফিয়্যা নাঘীর ও কুরায়যা গোত্র দুইটির অধিপতির সম্ভ্রান্ত কন্যা। হে আল্লাহ্র রাসূল! আপনি ব্যতীত অন্য কেহই তাহার উপযুক্ত নয়। সুতরাং রাসূলুল্লাহ (স) দিহয়া (রা)-কে অন্য দাসী দিয়া সাফিয়্যা (রা)-কে দাসত্বমুক্ত করেন। অতঃপর তাঁহাকে বিবাহ করেন (রাসূলে রাহমাত, পৃ. ৪০৯)। আল্লামা শিবলী নু'মানী ও আল্লামা সায়্যিদ সুলায়মান নাদবী কর্তৃক রচিত সীরাতুন্নবীর (১খ., ২৮৩) বর্ণনা অনুযায়ী রাসূলুল্লাহ (স) সাফিয়্যার বিনিময়ে দিহয়া (রা)-কে সাতজন দাসী দিলেন। এই সকল রিওয়াত পরস্পরবিরোধী। এক সূত্রে এইরূপ বর্ণিত আছে,
عَنْ أَنَسِ بْنِ مَالِكَ قَالَ قَدِمْنَا خَيْبَرَ فَلَمَّا فَتَحَ اللهُ عَلَيْهِ الْحِصْنَ ذُكِرَ لَهُ جَمَالُ صَفِيَّةَ بنْتَ حُيَى ابْنِ أَخْطَبَ وَقَدْ قُتِلَ وَكَانَتْ عَرُوسًا فَاصْطَفَاهَا النَّبِيُّ ﷺ لِنَفْسِهِ فَخَرَجَ بِهَا حَتَّى بَلَغْنَا سَدَّ الصَّهْبَاءِ حَلَّتْ فَتَبَنَى بِهَا رَسُولُ اللهِ ﷺ ثُمَّ صُنِعَ حَيْسًا فِي نَطْعَ صَغِيرَة
ثُمَّ قَالَ لِي أَذِنْ مَنْ حَوْلَكَ فَكَانَتْ تِلْكَ وَلِيْمَةً عَلَى صَفِيَّةَ ثُمَّ خَرَجْنَا الْمَدِينَةَ فَرَأَيْتُ النَّبِيَّ يحوى لَهَا وَرَاءَهُ بِعَبَاءَةٍ ثُمَّ يَجْلِسُ عِنْدَ بَعِيرِهِ فَيَضَعُ رَكْبَتَهُ وَتَضَعُ صَفِيَّةُ رِجْلَهَا على ركبته حتى تركب.
“আনাস ইবন মালিক (রা) বলেন, আমরা খায়বারে আগমন করিলাম। অতঃপর মহান আল্লাহ যখন দুর্গের বিজয় দান করিলেন তখন রাসূলুল্লাহ (স)-এর সম্মুখে সাফিয়্যা বিন্ত হুয়াই ইব্ন আখতাবের সৌন্দর্যের কথা উল্লেখ করা হইল। তাঁহার প্রাক্তন স্বামী (কিনানা) নিহত হইয়াছিল। সাফিয়্যা (রা) ছিলেন নব বিবাহিতা। অতঃপর তাঁহাকে রাসূলুল্লাহ (স) নিজের জন্য মনোনীত করিলেন। ইহার পর তাঁহাকে লইয়া রাসূলুল্লাহ (স) রওয়ানা করিলেন। আমরা যখন আস-সাহ্'বার দোরগোড়ায় উপনীত হইলাম তখন সাফিয়্যা (রা) হায়েয হইতে পবিত্রতা অর্জন করিলেন। ফলে এখানেই রাসূলুল্লাহ (স) তাঁহার সহিত বাসরঘর করিলেন। ইহার পর ছোট একটি চামড়ার পাত্রে হায়স (ক্ষীর) তৈরী করা হইল। রাসূলুল্লাহ (স) আমাকে বলিলেনঃ তোমার আশেপাশের লোকদিগকে দাওয়াত দাও। ইহাই ছিল সাফিয়্যা (রা)-এর ওয়ালীমা। অতঃপর আমরা মদীনা অভিমুখে রওয়ানা করিলাম। পথিমধ্যে দেখিতে পাইলাম, রাসূলুল্লাহ (স) তাঁহার পিছন দিয়া সাফিয়্যা (রা)-এর জন্য একটি চাদর দ্বারা পর্দা করিয়াছেন। পরে তাঁহার উটের নিকট তিনি বসিয়া নিজ হাঁটু মেলিয়া রাখিলেন এবং সাফিয়্যা (রা) নিজ পা রাসূলুল্লাহ (স)-এর হাঁটুতে রাখিয়া সওয়ার হইলেন” (বুখারী, কিতাবুল মাগাযী, বাব গাওয়াতি খায়বার, ২খ., ৬০৬)।
বুখারীর এক রিওয়ায়াত নিম্নরূপঃ
عَنْ أَنَسِ بْنِ مَالِكَ أَنَّ رَسُولَ اللهِ اللهِ عَزَا خَيْبَرَ فَصَلَّيْنَا عِنْدَهَا صَلوةَ الْغَدَاةِ بِغَلَس فَرَكِبَ النَّبِيِّ ﷺ وَرَكِبَ أَبُو طَلْحَةَ وَأَنَا رَدِيفُ أَبِي طَلْحَةَ فَأَجْرِى نَبِيُّ اللَّهِ ﷺ فِي زُقَاقِ خَيْبَرَ وَأَنَّ رَكْبَتَى لَتَمَسُ فَخِذَ نَبِيُّ اللَّهِ اللهِ ثُمَّ حَسَرَ الإِزارِ عَنْ فَخِذِهِ حَتَّى أَنِّي أَنْظُرُ إِلى بِيَاضِ فَخِذِ نَبِيُّ اللَّهِ ﷺ فَلَمَّا دَخَلَ الْقَرْيَةَ قَالَ اللهُ أَكْبَرُ خَرِبَتْ خَيْبَرُ إِنَّا إِذَا نَزَلْنَا بِسَاحَةِ قَوْمٍ فَسَاءَ صَبَاحُ الْمُنْذِرِينَ قَالَهَا ثَلثًا قَالَ وَخَرَجَ الْقَوْمُ إِلى أَعْمَالِهِمْ فَقَالُوا مُحَمَّدٌ قَالَ عَبْدُ الْعَزِيزِ وَقَالَ بَعْضُ أَصْحَابِنَا وَالْخَمِيسَ يَعْنِيُّ الْجَيْشِ قَالَ فَأَصَبْنَاهَا عَنَوَةً فَجُمِعَ السَّبِيُّ فَجَاءَ دِحْيَةٌ فَقَالَ يَانَبِيُّ اللهِ أَعْطَنِي جَارِيَةً مِنَ السَّبِي فَقَالَ اذْهَبْ فَخُذْ جَارِيَةً فَأَخَذَ صَفِيَّةَ بِنْتَ حَيَى فَجَاءَ رَجُلٌ إِلَى النَّبِيُّ ﷺ فَقَالَ يَا نَبِيُّ اللَّهِ أَعْطَيْتَ دِحْيَةَ صَفِيَّةَ
بِنْتَ حُيَى سَيِّدَةَ قُرَيْظَةَ وَالنَّضِيرَ لَا تَصْلُحُ إِلا لَكَ قَالَ أَدْعُوهُ بِهَا فَجَاءَ بِهَا فَلَمَّا نَظَرَ إِلَيْهَا النَّبِيُّ ﷺ قَالَ خُذْ جَارِيَّةً مِنَ السَّبِي غَيْرَهَا قَالَ فَاعْتَقَهَا النَّبِيُّ ﷺ وَتَزَوجَهَا فَقَالَ لَهُ ثَابِتُ يَا أَبَا حَمْزَةً مَا أَصْدَقَهَا قَالَ نَفْسًا اَعْتَقَهَا وَتَزَوجَهَا حَتَّى إِذَا كَانَ بِالطَّرِيقِ.
বুখারীতে ওয়ালীমা সম্পর্কিত একটি বর্ণনায় উল্লেখ আছে:
فَأَصْبَحَ النَّبِيُّ ﷺ عَرُوسًا فَقَالَ مَنْ كَانَ عِنْدَهُ شَيْءٌ فَلْيَجِيْ بِهِ وَبَسَطَ نِطْعًا فَجَعَلَ الرَّجُلُ يَجِئُ بِالتَّمْرِ وَجَعَلَ الرَّجُلُ يَجِيُّ بِالسَّمَنِ قَالَ وَأَحْسِبُهُ قَدْ ذَكَرَ السَّوِيقَ قَالَ فَحَاسُوا حَيْسًا فَكَانَتْ وَلِيْمَةُ رَسُولِ الله ﷺ (صحيح البخاري مجلد ١ : ٤-٥٣ كتاب الصلوة باب ما يذكر في الفخذ).
"অতঃপর রাসূলুল্লাহ (স) সফররত অবস্থাতেই উম্মু সুলায়ম (রা) সাফিয়্যা (রা)-এর জন্য রাত্রিকালে রাসূলুল্লাহ (স)-এর সহিত বাসরের ব্যবস্থা করিয়াছিলেন। সকালে সকলকে রাসূলুল্লাহ (স) বলিলেন, যাহার নিকট যাহা আছে তাহা লইয়া আস। তিনি চামড়ার খাঞ্চা বিছাইয়া দিলেন। কেহ লইয়া আসিল শুকনা খেজুর, কেহ আনিল ঘি। বর্ণনাকারী বলেন, আমার মনে হয় ছাতু আনার কথাও উল্লেখ আছে। সবাই মিলিয়া তাহা দিয়া হায়স (ছাতু ও ঘি মিশ্রিত খাদ্য) তৈরী করিলেন। ইহাই ছিল রাসূলুল্লাহ (স)-এর ওয়ালীমা” (বুখারী, কিতাবুস সালাত, বাব মা যুযকারু ফি'ল-ফাখিয, ১খ., ৫৩-৫৪)।
সুনানে আবী দাউদের ভাষ্যকার 'আল্লামা মাযিরী বলিয়াছেন রাসূলুল্লাহ (স) সাফিয়্যা (রা)-কে দিহয়া (রা)-এর নিকট হইতে ফেরত লইয়া নিজে বিবাহ করিলেন। কারণ:
لِمَا فِيْهِ مِنْ انْتِهَالِهَا مَعَ مَرْتَبَتِهَا وَكَوْنِهَا بِنْتَ سَيِّدِهِمْ
"তিনি ছিলেন উচ্চমর্যাদাসম্পন্ন এবং ইয়াহূদী নেতার মেয়ে। এইজন্য তাঁহার অন্য কাহারও নিকট থাকা সমীচীন ছিল মা" (শিবলী নু'মানী ও সুলায়মান নাদবী, সীরাতুন নবী, ১খ., ২৮৪)।
ইবন হাজার আল-'আসকালানী বলেন, ইবন ইসহাকের মতে সাফিয়্যা (রা)-কে কামূস দুর্গ হইতে বন্দী করা হইয়াছিল। সাফিয়্যা (রা) ছিলেন কিনানা ইন্ন আবিল হুকায়কের স্ত্রী। তাঁহার সহিত তাঁহার চাচাতো ভগ্নিকে বন্দী করা হইয়াছিল। ভিন্নমতে তাঁহার স্বামীর চাচাত ভগ্নি বন্দী হইয়াছিল। সুহায়লী বলেন, খায়বারের গনীমত ভাগ করিবার পূর্বে দিহয়া (রা)-এর নিকট হইতে সাফিয়্যা (রা)-কে ফেরত লওয়া হইয়াছিল। সাফিয়্যা (রা)-এর পরিবর্তে দিহয়া (রা)-কে রাসূলুল্লাহ (স) যাহা দিয়াছিলেন তাহা বিনিময় হিসাবে নয়, অনুগ্রহ হিসাবে (ফাতহুল বারী, ৭খ., ৪৮০)।
সাফিয়্যা (রা) মহানবী (স)-এর পরিণীতা হইবার আরও একটি যুক্তি হইল, তিনি পিতা ও স্বামী উভয়ের পক্ষ হইতে রাজকীয় পরিবেশে জীবন যাপনের পর যখন পিতৃহারা ও স্বামীহারা হইয়া চরমভাবে অসহায় হইয়া পড়িলেন, এমতাবস্থায় তাঁহার বংশ মর্যাদা রক্ষার্থে এবং স্বজন হারানোর বেদনা দূর করিতে ইহা ছাড়া গত্যন্তর ছিল না। তিনি বাঁদী হিসাবেই রাসূলুল্লাহ (স)-এর নিকট থাকিতে পারিতেন। কিন্তু রাসূলুল্লাহ (স) তাহা করেন নাই। তাঁহার সামাজিক মর্যাদার প্রতি লক্ষ্য করিয়া তিনি তাঁহাকে আযাদ করিয়া দিলেন। অতঃপর তাঁহাকে নিজ স্ত্রী হিসাবে বরণ করিয়া লইলেন।
মুসনাদে আহমাদে বর্ণিত আছে (মিসর, ৩খ., ১৩৮), রাসূলুল্লাহ (স) সাফিয়্যা (রা)-কে দুইটি জিনিসের যে কোন একটি গ্রহণের অনুমতি প্রদান করিয়াছিলেন: হয় তিনি আযাদ হইয়া নিজ গৃহে চলিয়া যাইবেন অথবা তাঁহার সহিত বিবাহ বন্ধনে আবদ্ধ হইবেন। তিনি রাসূলুল্লাহ (স)-এর বিবাহে আবদ্ধ হইবার পন্থাটি স্বেচ্ছায় গ্রহণ করিয়াছিলেন। করুণা ও সদ্ব্যবহার ছাড়াও ইহা রাজনৈতিক ও ধর্মীয় দৃষ্টিকোণ হইতেও অত্যন্ত তাৎপর্যপূর্ণ ছিল। এই আচরণের ফলেই আরববাসীদের ইসলামের প্রতি আগ্রহ বৃদ্ধি পাইতেছিল। ইসলাম তাহার শত্রুদিগের পরিবার-পরিজনের সহিতও কতই না উত্তম আচরণ করে (শিবলী নু'মানী ও সুলায়মান নাদবী, সীরাতুন-নবী, ১খ., ২৮৪)।
কিনানা ইব্ন আবিল হুকায়কেরই দুর্গ ছিল কামূস। ইয়াহুদীগণ যখন এই দুর্গ হইতে পলায়ন করে এবং দুর্গ বিজিত হয় তখন যাহারা বন্দী হইয়াছিল তাহাদের মধ্যে সাফিয়্যা বিন্ত হুয়ায় ইব্ন আখতাব এবং তাহার দুইজন চাচাতো ভগ্নিও ছিল। ইব্ন ইসহাক উল্লেখ করিয়াছেন যে, সাফিয়্যা (রা) ছিলেন কিনানা ইব্ন রাবী' ইব্ন আবিল হুকায়কের স্বল্পবয়সী ও সদ্য বিবাহিতা স্ত্রী। প্রথমে তিনি দিহয়া ইব্ন খালীফা আল-কালবী (রা)-এর ভাগে দাসী হিসাবে বণ্টিত হইয়াছিলেন। কিন্তু তাহার সামাজিক মর্যাদার বিবেচনায় সাহাবীগণ রাসূলুল্লাহ (স)-এর নিকট আসিয়া বলিলেন, সাফিয়্যা বিশিষ্ট সরদার তনয়া এবং অতিশয় পূত-পবিত্র চরিত্রের অধিকারিনী। দিহয়া কালবীর নিকট তাহাকে রাখা সমীচীন নয়। তিনি আপনারই যোগ্য। এই কারণে রাসূলুল্লাহ (স) তাহাকে দিহয়া কালবীর নিকট হইতে ক্রয় করিয়া লইলেন। তাহার ভগ্নীদেরকে তাহার হাতে সোপর্দ করিলেন (আসাহহুস সিয়ার, পৃ. ১৯৩)।
মাওলানা আবুল কালাম আযাদ বলেন, খায়বারের বন্দীদের মধ্যে সাফিয়্যা (রা)-ও ছিলেন। দিহয়া কালবী (রা) একজন দাসী দানের আবেদন করিলেন। রাসূলুল্লাহ (স) তাহাকে নিজ পসন্দে একজন গ্রহণ করিবার অনুমতি দান করিলেন। তিনি সাফিয়্যা (রা)-কে পছন্দ করিলেন। ইহাতে সাহাবীগণ বলিলেন, সাফিয়্যা নাঘীর ও কুরায়যা গোত্র দুইটির অধিপতির সম্ভ্রান্ত কন্যা। হে আল্লাহ্র রাসূল! আপনি ব্যতীত অন্য কেহই তাহার উপযুক্ত নয়। সুতরাং রাসূলুল্লাহ (স) দিহয়া (রা)-কে অন্য দাসী দিয়া সাফিয়্যা (রা)-কে দাসত্বমুক্ত করেন। অতঃপর তাঁহাকে বিবাহ করেন (রাসূলে রাহমাত, পৃ. ৪০৯)। আল্লামা শিবলী নু'মানী ও আল্লামা সায়্যিদ সুলায়মান নাদবী কর্তৃক রচিত সীরাতুন্নবীর (১খ., ২৮৩) বর্ণনা অনুযায়ী রাসূলুল্লাহ (স) সাফিয়্যার বিনিময়ে দিহয়া (রা)-কে সাতজন দাসী দিলেন। এই সকল রিওয়াত পরস্পরবিরোধী। এক সূত্রে এইরূপ বর্ণিত আছে:
عَنْ أَنَسِ بْنِ مَالِكَ قَالَ قَدِمْنَا خَيْبَرَ فَلَمَّا فَتَحَ اللهُ عَلَيْهِ الْحِصْنَ ذُكِرَ لَهُ جَمَالُ صَفِيَّةَ بنْتَ حُيَى ابْنِ أَخْطَبَ وَقَدْ قُتِلَ وَكَانَتْ عَرُوسًا فَاصْطَفَاهَا النَّبِيُّ ﷺ لِنَفْسِهِ فَخَرَجَ بِهَا حَتَّى بَلَغْنَا سَدَّ الصَّهْبَاءِ حَلَّتْ فَتَبَنَى بِهَا رَسُولُ اللهِ ﷺ ثُمَّ صُنِعَ حَيْسًا فِي نَطْعَ صَغِيرَة ثُمَّ قَالَ لِي أَذِنْ مَنْ حَوْلَكَ فَكَانَتْ تِلْكَ وَلِيْمَةً عَلَى صَفِيَّةَ ثُمَّ خَرَجْنَا الْمَدِينَةَ فَرَأَيْتُ النَّبِيَّ يحوى لَهَا وَرَاءَهُ بِعَبَاءَةٍ ثُمَّ يَجْلِسُ عِنْدَ بَعِيرِهِ فَيَضَعُ رَكْبَتَهُ وَتَضَعُ صَفِيَّةُ رِجْلَهَا على ركبته حتى تركب.
"আনাস ইবন মালিক (রা) বলেন, আমরা খায়বারে আগমন করিলাম। অতঃপর মহান আল্লাহ যখন দুর্গের বিজয় দান করিলেন তখন রাসূলুল্লাহ (স)-এর সম্মুখে সাফিয়্যা বিন্ত হুয়াই ইব্ন আখতাবের সৌন্দর্যের কথা উল্লেখ করা হইল। তাঁহার প্রাক্তন স্বামী (কিনানা) নিহত হইয়াছিল। সাফিয়্যা (রা) ছিলেন নব বিবাহিতা। অতঃপর তাঁহাকে রাসূলুল্লাহ (স) নিজের জন্য মনোনীত করিলেন। ইহার পর তাঁহাকে লইয়া রাসূলুল্লাহ (স) রওয়ানা করিলেন। আমরা যখন আস-সাহ্'বার দোরগোড়ায় উপনীত হইলাম তখন সাফিয়্যা (রা) হায়েয হইতে পবিত্রতা অর্জন করিলেন। ফলে এখানেই রাসূলুল্লাহ (স) তাঁহার সহিত বাসরঘর করিলেন। ইহার পর ছোট একটি চামড়ার পাত্রে হায়স (ক্ষীর) তৈরী করা হইল। রাসূলুল্লাহ (স) আমাকে বলিলেনঃ তোমার আশেপাশের লোকদিগকে দাওয়াত দাও। ইহাই ছিল সাফিয়্যা (রা)-এর ওয়ালীমা। অতঃপর আমরা মদীনা অভিমুখে রওয়ানা করিলাম। পথিমধ্যে দেখিতে পাইলাম, রাসূলুল্লাহ (স) তাঁহার পিছন দিয়া সাফিয়্যা (রা)-এর জন্য একটি চাদর দ্বারা পর্দা করিয়াছেন। পরে তাঁহার উটের নিকট তিনি বসিয়া নিজ হাঁটু মেলিয়া রাখিলেন এবং সাফিয়্যা (রা) নিজ পা রাসূলুল্লাহ (স)-এর হাঁটুতে রাখিয়া সওয়ার হইলেন" (বুখারী, কিতাবুল মাগাযী, বাব গাওয়াতি খায়বার, ২খ., ৬০৬)।
বুখারীর এক রিওয়ায়াত নিম্নরূপ:
عَنْ أَنَسِ بْنِ مَالِكَ أَنَّ رَسُولَ اللهِ اللهِ عَزَا خَيْبَرَ فَصَلَّيْنَا عِنْدَهَا صَلوةَ الْغَدَاةِ بِغَلَس فَرَكِبَ النَّبِيِّ ﷺ وَرَكِبَ أَبُو طَلْحَةَ وَأَنَا رَدِيفُ أَبِي طَلْحَةَ فَأَجْرِى نَبِيُّ اللَّهِ ﷺ فِي زُقَاقِ خَيْبَرَ وَأَنَّ رَكْبَتَى لَتَمَسُ فَخِذَ نَبِيُّ اللهِ اللهِ ثُمَّ حَسَرَ الإِزارِ عَنْ فَخِذِهِ حَتَّى أَنِّي أَنْظُرُ إِلى بِيَاضِ فَخِذِ نَبِيُّ اللَّهِ ﷺ فَلَمَّا دَخَلَ الْقَرْيَةَ قَالَ اللهُ أَكْبَرُ خَرِبَتْ خَيْبَرُ إِنَّا إِذَا نَزَلْنَا بِسَاحَةِ قَوْمٍ فَسَاءَ صَبَاحُ الْمُنْذِرِينَ قَالَهَا ثَلثًا قَالَ وَخَرَجَ الْقَوْمُ إِلى أَعْمَالِهِمْ فَقَالُوا مُحَمَّدٌ قَالَ عَبْدُ الْعَزِيزِ وَقَالَ بَعْضُ أَصْحَابِنَا وَالْخَمِيسَ يَعْنِيُّ الْجَيْشِ قَالَ فَأَصَبْنَاهَا عَنَوَةً فَجُمِعَ السَّبِيُّ فَجَاءَ دِحْيَةٌ فَقَالَ يَانَبِيُّ اللهِ أَعْطَنِي جَارِيَةً مِنَ السَّبِي فَقَالَ اذْهَبْ فَخُذْ جَارِيَةً فَأَخَذَ صَفِيَّةَ بِنْتَ حَيَى فَجَاءَ رَجُلٌ إِلَى النَّبِيُّ ﷺ فَقَالَ يَا نَبِيُّ اللَّهِ أَعْطَيْتَ دِحْيَةَ صَفِيَّةَ بِنْتَ حُيَى سَيِّدَةَ قُرَيْظَةَ وَالنَّضِيرَ لَا تَصْلُحُ إِلا لَكَ قَالَ أَدْعُوهُ بِهَا فَجَاءَ بِهَا فَلَمَّا نَظَرَ إِلَيْهَا النَّبِيُّ ﷺ قَالَ خُذْ جَارِيَّةً مِنَ السَّبِي غَيْرَهَا قَالَ فَاعْتَقَهَا النَّبِيُّ ﷺ وَتَزَوجَهَا فَقَالَ لَهُ ثَابِتُ يَا أَبَا حَمْزَةً مَا أَصْدَقَهَا قَالَ نَفْسًا اَعْتَقَهَا وَتَزَوجَهَا حَتَّى إِذَا كَانَ بِالطَّرِيقِ.
বুখারীতে ওয়ালীমা সম্পর্কিত একটি বর্ণনায় উল্লেখ আছে:
فَأَصْبَحَ النَّبِيُّ ﷺ عَرُوسًا فَقَالَ مَنْ كَانَ عِنْدَهُ شَيْءٌ فَلْيَجِيْ بِهِ وَبَسَطَ نِطْعًا فَجَعَلَ الرَّجُلُ يَجِئُ بِالتَّمْرِ وَجَعَلَ الرَّجُلُ يَجِيُّ بِالسَّمَنِ قَالَ وَأَحْسِبُهُ قَدْ ذَكَرَ السَّوِيقَ قَالَ فَحَاسُوا حَيْسًا فَكَانَتْ وَلِيْمَةُ رَسُولِ الله ﷺ (صحيح البخاري مجلد ١ : ٤-٥٣ كتاب الصلوة باب ما يذكر في الفخذ).
"অতঃপর রাসূলুল্লাহ (স) সফররত অবস্থাতেই উম্মু সুলায়ম (রা) সাফিয়্যা (রা)-এর জন্য রাত্রিকালে রাসূলুল্লাহ (স)-এর সহিত বাসরের ব্যবস্থা করিয়াছিলেন। সকালে সকলকে রাসূলুল্লাহ (স) বলিলেন, যাহার নিকট যাহা আছে তাহা লইয়া আস। তিনি চামড়ার খাঞ্চা বিছাইয়া দিলেন। কেহ লইয়া আসিল শুকনা খেজুর, কেহ আনিল ঘি। বর্ণনাকারী বলেন, আমার মনে হয় ছাতু আনার কথাও উল্লেখ আছে। সবাই মিলিয়া তাহা দিয়া হায়س (ছাতু ও ঘি মিশ্রিত খাদ্য) তৈরী করিলেন। ইহাই ছিল রাসূলুল্লাহ (স)-এর ওয়ালীমা” (বুখারী, কিতাবুস সালাত, বাব মা যুযকারু ফি'ল-ফাখিয, ১খ., ৫৩-৫৪)।
সুনানে আবী দাউদের ভাষ্যকার 'আল্লামা মাযিরী বলিয়াছেন রাসূলুল্লাহ (স) সাফিয়্যা (রা)-কে দিহয়া (রা)-এর নিকট হইতে ফেরত লইয়া নিজে বিবাহ করিলেন। কারণ:
لِمَا فِيْهِ مِنْ انْتِهَالِهَا مَعَ مَرْتَبَتِهَا وَكَوْنِهَا بِنْتَ سَيِّدِهِمْ
"তিনি ছিলেন উচ্চমর্যাদাসম্পন্ন এবং ইয়াহূদী নেতার মেয়ে। এইজন্য তাঁহার অন্য কাহারও নিকট থাকা সমীচীন ছিল মা" (শিবলী নু'মানী ও সুলায়মান নাদবী, সীরাতুন নবী, ১খ., ২৮৪)।
ইবন হাজার আল-'আসকালানী বলেন, ইবন ইসহাকের মতে সাফিয়্যা (রা)-কে কামূس দুর্গ হইতে বন্দী করা হইয়াছিল। সাফিয়্যা (রা) ছিলেন কিনানা ইন্ন আবিল হুকায়কের স্ত্রী। তাঁহার সহিত তাঁহার চাচাতো ভগ্নিকে বন্দী করা হইয়াছিল। ভিন্নমতে তাঁহার স্বামীর চাচাত ভগ্নি বন্দী হইয়াছিল। সুহায়লী বলেন, খায়বারের গনীমত ভাগ করিবার পূর্বে দিহয়া (রা)-এর নিকট হইতে সাফিয়্যা (রা)-কে ফেরত লওয়া হইয়াছিল। সাফিয়্যা (রা)-এর পরিবর্তে দিহয়া (রা)-কে রাসূলুল্লাহ (স) যাহা দিয়াছিলেন তাহা বিনিময় হিসাবে নয়, অনুগ্রহ হিসাবে (ফাতহুল বারী)।
সাফিয়্যা (রা) মহানবী (স)-এর পরিণীতা হইবার আরও একটি যুক্তি হইল, তিনি পিতা ও স্বামী উভয়ের পক্ষ হইতে রাজকীয় পরিবেশে জীবন যাপনের পর যখন পিতৃহারা ও স্বামীহারা হইয়া চরমভাবে অসহায় হইয়া পড়িলেন, এমতাবস্থায় তাঁহার বংশ মর্যাদা রক্ষার্থে এবং স্বজন হারানোর বেদনা দূর করিতে ইহা ছাড়া গত্যন্তর ছিল না। তিনি বাঁদী হিসাবেই রাসূলুল্লাহ (স)-এর নিকট থাকিতে পারিতেন। কিন্তু রাসূলুল্লাহ (স) তাহা করেন নাই। তাঁহার সামাজিক মর্যাদার প্রতি লক্ষ্য করিয়া তিনি তাঁহাকে আযাদ করিয়া দিলেন। অতঃপর তাঁহাকে নিজ স্ত্রী হিসাবে বরণ করিয়া লইলেন।
মুসনাদে আহমাদে বর্ণিত আছে (মিসর, ৩খ., ১৩৮), রাসূলুল্লাহ (স) সাফিয়্যা (রা)-কে দুইটি জিনিসের যে কোন একটি গ্রহণের অনুমতি প্রদান করিয়াছিলেন: হয় তিনি আযাদ হইয়া নিজ গৃহে চলিয়া যাইবেন অথবা তাঁহার সহিত বিবাহ বন্ধনে আবদ্ধ হইবেন। তিনি রাসূলুল্লাহ (স)-এর বিবাহে আবদ্ধ হইবার পন্থাটি স্বেচ্ছায় গ্রহণ করিয়াছিলেন। করুণা ও সদ্ব্যবহার ছাড়াও ইহা রাজনৈতিক ও ধর্মীয় দৃষ্টিকোণ হইতেও অত্যন্ত তাৎপর্যপূর্ণ ছিল। এই আচরণের ফলেই আরববাসীদের ইসলামের প্রতি আগ্রহ বৃদ্ধি পাইতেছিল। ইসলাম তাহার শত্রুদিগের পরিবার-পরিজনের সহিতও কতই না উত্তম আচরণ করে (শিবলী নু'মানী ও সুলায়মান নাদবী, সীরাতুন-নবী, ১খ., ২৮৪)।
কিনানা ইব্ن আবিল হুকায়কেরই দুর্গ ছিল কামূس। ইয়াহুদীগণ যখন এই দুর্গ হইতে পলায়ন করে এবং দুর্গ বিজিত হয় তখন যাহারা বন্দী হইয়াছিল তাহাদের মধ্যে সাফিয়্যা বিন্ত হুয়ায় ইব্ন আখতাব এবং তাহার দুইজন চাচাতো ভগ্নিও ছিল। ইব্ন ইসহাক উল্লেখ করিয়াছেন যে, সাফিয়্যা (রা) ছিলেন কিনানা ইব্ন রাবী' ইব্ন আবিল হুকায়কের স্বল্পবয়সী ও সদ্য বিবাহিতা স্ত্রী। প্রথমে তিনি দিহয়া ইব্ন খালীফা আল-কালবী (রা)-এর ভাগে দাসী হিসাবে বণ্টিত হইয়াছিলেন। কিন্তু তাহার সামাজিক মর্যাদার বিবেচনায় সাহাবীগণ রাসূলুল্লাহ (س)-এর নিকট আসিয়া বলিলেন, সাফিয়্যা বিশিষ্ট সরদার তনয়া এবং অতিশয় পূত-পবিত্র চরিত্রের অধিকারিনী। দিহয়া কালবীর নিকট তাহাকে রাখা সমীচীন নয়। তিনি আপনারই যোগ্য। এই কারণে রাসূলুল্লাহ (স) তাহাকে দিহয়া কালবীর নিকট হইতে ক্রয় করিয়া লইলেন। তাহার ভগ্নীদেরকে তাহার হাতে সোপর্দ করিলেন (আসাহহুস সিয়ার, পৃ. ১৯৩)।
মাওলানা আবুল কালাম আযাদ বলেন, খায়বারের বন্দীদের মধ্যে সাফিয়্যা (রা)-ও ছিলেন। দিহয়া কালবী (রা) একজন দাসী দানের আবেদন করিলেন। রাসূলুল্লাহ (স) তাহাকে নিজ পসন্দে একজন গ্রহণ করিবার অনুমতি দান করিলেন। তিনি সাফিয়্যা (রা)-কে পছন্দ করিলেন। ইহাতে সাহাবীগণ বলিলেন, সাফিয়্যা নাঘীর ও কুরায়যা গোত্র দুইটির অধিপতির সম্ভ্রান্ত কন্যা। হে আল্লাহ্র রাসূল! আপনি ব্যতীত অন্য কেহই তাহার উপযুক্ত নয়। সুতরাং রাসূলুল্লাহ (স) দিহয়া (রা)-কে অন্য দাসী দিয়া সাফিয়্যা (রা)-কে দাসত্বমুক্ত করেন। অতঃপর তাঁহাকে বিবাহ করেন (রাসূলে রাহমাত, পৃ. ৪০৯)। আল্লামা শিবলী নু'মানী ও আল্লামা সায়্যিদ সুলায়মান নাদবী কর্তৃক রচিত সীরাতুন্নবীর (১খ., ২৮৩) বর্ণনা অনুযায়ী রাসূলুল্লাহ (স) সাফিয়্যার বিনিময়ে দিহয়া (রা)-কে সাতজন দাসী দিলেন। এই সকল রিওয়াত পরস্পরবিরোধী। এক সূত্রে এইরূপ বর্ণিত আছে:
عَنْ أَنَسِ بْنِ مَالِكَ قَالَ قَدِمْنَا خَيْبَرَ فَلَمَّا فَتَحَ اللهُ عَلَيْهِ الْحِصْنَ ذُكِرَ لَهُ جَمَالُ صَفِيَّةَ بنْتَ حُيَى ابْنِ أَخْطَبَ وَقَدْ قُتِلَ وَكَانَتْ عَرُوسًا فَاصْطَفَاهَا النَّبِيُّ ﷺ لِنَفْسِهِ فَخَرَجَ بِهَا حَتَّى بَلَغْنَا سَدَّ الصَّهْبَاءِ حَلَّتْ فَتَبَنَى بِهَا رَسُولُ اللهِ ﷺ ثُمَّ صُنِعَ حَيْسًا فِي نَطْعَ صَغِيرَة ثُمَّ قَالَ لِي أَذِنْ مَنْ حَوْلَكَ فَكَانَتْ تِلْكَ وَلِيْمَةً عَلَى صَفِيَّةَ ثُمَّ خَرَجْنَا الْمَدِينَةَ فَرَأَيْتُ النَّبِيَّ يحوى لَهَا وَرَاءَهُ بِعَبَاءَةٍ ثُمَّ يَجْلِسُ عِنْدَ بَعِيرِهِ فَيَضَعُ رَكْبَتَهُ وَتَضَعُ صَفِيَّةُ رِجْلَهَا على ركبته حتى تركب.
"হুমায়দ বলেন, আমি আনাস (রা)-কে বলিতে শুনিয়াছি, রাসূলুল্লাহ (স) খায়বার ও মদীনার মধ্যবর্তী স্থানে তিন রাত অবস্থান করিয়াছিলেন। এই সময় তিনি সাফিয়্যা (রা)-এর সহিত মিলিত হইয়াছিলেন। অতঃপর আমি মুসলমানদেরকে ওয়ালীমা-র জন্য দাওয়াত করিলাম। ওয়ালীমাতে রুটি ও গোশত ছিল না। বিলাল (রা)-কে দস্তরখান বিছানোর আদেশ করা ছাড়া ইহাতে অন্য কিছু ছিল না। আদেশ অনুযায়ী দস্তরখান বিছানোর পর ইহাতে শুকনা খেজুর, পনির ও ঘি ঢালা হইয়াছিল। অতঃপর মুসলমানগণ বলিতে লাগিলেন, তিনি কি উম্মুল মু'মিনীনের একজন, না কি বাঁদী। তাহারা বলিলেন, যদি রাসূলুল্লাহ (স) তাঁহাকে পর্দার অন্তরালে রাখেন তাহা হইলে তিনি উম্মত জননীগণের একজন, আর যদি তাঁহাকে পর্দার অন্তরালে না ঢাকেন তাহা হইলে তিনি তাঁহার একজন বাঁদী। ইহার পর রাসূলুল্লাহ (স) রওয়ানা করিলে সাফিয়্যা (রা)-এর জন্য তাঁহার সওয়ারীর পিছনে বসিবার স্থান ঠিক করিলেন এবং তাঁহার জন্য পর্দা টানাইলেন" (বুখারী, কিতাবুল মাগাযী, বাব গাওয়া খায়বার, ২খ., ৬০৬)।
বুখারীর এক রিওয়ায়াত নিম্নরূপ:
عَنْ أَنَسِ بْنِ مَالِكَ أَنَّ رَسُولَ اللهِ اللهِ عَزَا خَيْبَرَ فَصَلَّيْنَا عِنْدَهَا صَلوةَ الْغَدَاةِ بِغَلَس فَرَكِبَ النَّبِيِّ ﷺ وَرَكِبَ أَبُو طَلْحَةَ وَأَنَا رَدِيفُ أَبِي طَلْحَةَ فَأَجْرِى نَبِيُّ اللَّهِ ﷺ فِي زُقَاقِ خَيْبَرَ وَأَنَّ رَكْبَتَى لَتَمَسُ فَخِذَ نَبِيُّ اللهِ اللهِ ثُمَّ حَسَرَ الإِزارِ عَنْ فَخِذِهِ حَتَّى أَنِّي أَنْظُرُ إِلى بِيَاضِ فَخِذِ نَبِيُّ اللَّهِ ﷺ فَلَمَّا دَخَلَ الْقَرْيَةَ قَالَ اللهُ أَكْبَرُ خَرِبَتْ خَيْبَرُ إِنَّا إِذَا نَزَلْنَا بِسَاحَةِ قَوْمٍ فَسَاءَ صَبَاحُ الْمُنْذِرِينَ قَالَهَا ثَلثًا قَالَ وَخَرَجَ الْقَوْمُ إِلى أَعْمَالِهِمْ فَقَالُوا مُحَمَّدٌ قَالَ عَبْدُ الْعَزِيزِ وَقَالَ بَعْضُ أَصْحَابِنَا وَالْخَمِيسَ يَعْنِيُّ الْجَيْشِ قَالَ فَأَصَبْنَاهَا عَنَوَةً فَجُمِعَ السَّبِيُّ فَجَاءَ دِحْيَةٌ فَقَالَ يَانَبِيُّ اللهِ أَعْطِنِي جَارِيَةً مِنَ السَّبِي فَقَالَ اذْهَبْ فَخُذْ جَارِيَةً فَأَخَذَ صَفِيَّةَ بِنْتَ حَيَى فَجَاءَ رَجُلٌ إِلَى النَّبِيُّ ﷺ فَقَالَ يَا نَبِيُّ اللَّهِ أَعْطَيْتَ دِحْيَةَ صَفِيَّةَ بِنْتَ حُيَى سَيِّدَةَ قُرَيْظَةَ وَالنَّضِيرَ لَا تَصْلُحُ إِلا لَكَ قَالَ أَدْعُوهُ بِهَا فَجَاءَ بِهَا فَلَمَّا نَظَرَ إِلَيْهَا النَّبِيُّ ﷺ قَالَ خُذْ جَارِيَّةً مِنَ السَّبِي غَيْرَهَا قَالَ فَاعْتَقَهَا النَّبِيُّ ﷺ وَتَزَوجَهَا فَقَالَ لَهُ ثَابِتُ يَا أَبَا حَمْزَةً مَا أَصْدَقَهَا قَالَ نَفْسًا اَعْتَقَهَا وَتَزَوجَهَا حَتَّى إِذَا كَانَ بِالطَّرِيقِ.
বুখারীতে ওয়ালীমা সম্পর্কিত একটি বর্ণনায় উল্লেখ আছে:
فَأَصْبَحَ النَّبِيُّ ﷺ عَرُوسًا فَقَالَ مَنْ كَانَ عِنْدَهُ شَيْءٌ فَلْيَجِيْ بِهِ وَبَسَطَ نِطْعًا فَجَعَلَ الرَّجُلُ يَجِئُ بِالتَّمْرِ وَجَعَلَ الرَّجُلُ يَجِيُّ بِالسَّمَنِ قَالَ وَأَحْسِبُهُ قَدْ ذَكَرَ السَّوِيقَ قَالَ فَحَاسُوا حَيْسًا فَكَانَتْ وَلِيْمَةُ رَسُولِ الله ﷺ (صحيح البخاري مجلد ١ : ٤-٥٣ كتاب الصلوة باب ما يذكر في الفخذ).
"অতঃপর রাসূলুল্লাহ (س) সফররত অবস্থাতেই উম্মু সুলায়م (را) সাফিয়্যা (را)-এর জন্য রাত্রিকালে রাসূলুল্লাহ (স)-এর সহিত বাসরের ব্যবস্থা করিয়াছিলেন। সকালে সকলকে রাসূলুল্লাহ (স) বলিলেন, যাহার নিকট যাহা আছে তাহা লইয়া আস। তিনি চামড়ার খাঞ্চা বিছাইয়া দিলেন। কেহ লইয়া আসিল শুকনা খেজুর, কেহ আনিল ঘি। বর্ণনাকারী বলেন, আমার মনে হয় ছাতু আনার কথাও উল্লেখ আছে। সবাই মিলিয়া তাহা দিয়া হায়س (ছাতু ও ঘি মিশ্রিত খাদ্য) তৈরী করিলেন। ইহাই ছিল রাসূলুল্লাহ (স)-এর ওয়ালীমা” (বুখারী, কিতাবুস সালাত, বাব মা যুযকারু ফি'ل-ফাখিয, ১খ., ৫৩-৫৪)।
সুনানে আবী দাউদের ভাষ্যকার 'আল্লামা মাযিরী বলিয়াছেন রাসূলুল্লাহ (স) সাফিয়্যা (রা)-কে দিহয়া (রা)-এর নিকট হইতে ফেরত লইয়া নিজে বিবাহ করিলেন। কারণ:
لِمَا فِيْهِ مِنْ انْتِهَالِهَا مَعَ مَرْتَبَتِهَا وَكَوْنِهَا بِنْتَ سَيِّدِهِمْ
"তিনি ছিলেন উচ্চমর্যাদাসম্পন্ন এবং ইয়াহূদী নেতার মেয়ে। এইজন্য তাঁহার অন্য কাহারও নিকট থাকা সমীচীন ছিল মা" (শিবলী নু'মানী ও সুলায়মান নাদবী, সীরাতুন নবী, ১খ., ২৮৪)।
ইবন হাজার আল-'আসকালানী বলেন, ইবন ইসহাকের মতে সাফিয়্যা (রা)-কে কামূس দুর্গ হইতে বন্দী করা হইয়াছিল। সাফিয়্যা (রা) ছিলেন কিনানা ইন্ন আবিল হুকায়কের স্ত্রী। তাঁহার সহিত তাঁহার চাচাতো ভগ্নিকে বন্দী করা হইয়াছিল। ভিন্নমতে তাঁহার স্বামীর চাচাত ভগ্নি বন্দী হইয়াছিল। সুহায়লী বলেন, খায়বারের গনীমত ভাগ করিবার পূর্বে দিহয়া (রা)-এর নিকট হইতে সাফিয়্যা (রা)-কে ফেরত লওয়া হইয়াছিল। সাফিয়্যা (রা)-এর পরিবর্তে দিহয়া (রা)-কে রাসূলুল্লাহ (স) যাহা দিয়াছিলেন তাহা বিনিময় হিসাবে নয়, অনুগ্রহ হিসাবে (ফাতহুল বারী)।
সাফিয়্যা (রা) মহানবী (স)-এর পরিণীতা হইবার আরও একটি যুক্তি হইল, তিনি পিতা ও স্বামী উভয়ের পক্ষ হইতে রাজকীয় পরিবেশে জীবন যাপনের পর যখন পিতৃহারা ও স্বামীহারা হইয়া চরমভাবে অসহায় হইয়া পড়িলেন, এমতাবস্থায় তাঁহার বংশ মর্যাদা রক্ষার্থে এবং স্বজন হারানোর বেদনা দূর করিতে ইহা ছাড়া গত্যন্তর ছিল না। তিনি বাঁদী হিসাবেই রাসূলুল্লাহ (স)-এর নিকট থাকিতে পারিতেন। কিন্তু রাসূলুল্লাহ (স) তাহা করেন নাই। তাঁহার সামাজিক মর্যাদার প্রতি লক্ষ্য করিয়া তিনি তাঁহাকে আযাদ করিয়া দিলেন। অতঃপর তাঁহাকে নিজ স্ত্রী হিসাবে বরণ করিয়া লইলেন।
মুসনাদে আহমাদে বর্ণিত আছে (মিসর, ৩খ., ১৩৮), রাসূলুল্লাহ (স) সাফিয়্যা (রা)-কে দুইটি জিনিসের যে কোন একটি গ্রহণের অনুমতি প্রদান করিয়াছিলেন: হয় তিনি আযাদ হইয়া নিজ গৃহে চলিয়া যাইবেন অথবা তাঁহার সহিত বিবাহ বন্ধনে আবদ্ধ হইবেন। তিনি রাসূলুল্লাহ (স)-এর বিবাহে আবদ্ধ হইবার পন্থাটি স্বেচ্ছায় গ্রহণ করিয়াছিলেন। করুণা ও সদ্ব্যবহার ছাড়াও ইহা রাজনৈতিক ও ধর্মীয় দৃষ্টিকোণ হইতেও অত্যন্ত তাৎপর্যপূর্ণ ছিল। এই আচরণের ফলেই আরববাসীদের ইসলামের প্রতি আগ্রহ বৃদ্ধি পাইতেছিল। ইসলাম তাহার শত্রুদিগের পরিবার-পরিজনের সহিতও কতই না উত্তম আচরণ করে (শিবলী নু'মানী ও সুলায়মান নাদবী, সীরাতুন-নবী, ১খ., ২৮৪)।
কিনানা ইব্ন আবিল হুকায়কেরই দুর্গ ছিল কামূস। ইয়াহুদীগণ যখন এই দুর্গ হইতে পলায়ন করে এবং দুর্গ বিজিত হয় তখন যাহারা বন্দী হইয়াছিল তাহাদের মধ্যে সাফিয়্যা বিন্ত হুয়ায় ইব্ন আখতাব এবং তাহার দুইজন চাচাতো ভগ্নিও ছিল। ইব্ন ইসহাক উল্লেখ করিয়াছেন যে, সাফিয়্যা (রা) ছিলেন কিনানা ইব্ন রাবী' ইব্ন আবিল হুকায়কের স্বল্পবয়সী ও সদ্য বিবাহিতা স্ত্রী। প্রথমে তিনি দিহয়া ইব্ন খালীফা আল-কালবী (রা)-এর ভাগে দাসী হিসাবে বণ্টিত হইয়াছিলেন। কিন্তু তাহার সামাজিক মর্যাদার বিবেচনায় সাহাবীগণ রাসূলুল্লাহ (স)-এর নিকট আসিয়া বলিলেন, সাফিয়্যা বিশিষ্ট সরদার তনয়া এবং অতিশয় পূত-পবিত্র চরিত্রের অধিকারিনী। দিহয়া কালবীর নিকট তাহাকে রাখা সমীচীন নয়। তিনি আপনারই যোগ্য। এই কারণে রাসূলুল্লাহ (স) তাহাকে দিহয়া কালবীর নিকট হইতে ক্রয় করিয়া লইলেন। তাহার ভগ্নীদেরকে তাহার হাতে সোপর্দ করিলেন (আসাহহুস সিয়ার, পৃ. ১৯৩)।
মাওলানা আবুল কালাম আযাদ বলেন, খায়বারের বন্দীদের মধ্যে সাফিয়্যা (রা)-ও ছিলেন। দিহয়া কালবী (রা) একজন দাসী দানের আবেদন করিলেন। রাসূলুল্লাহ (স) তাহাকে নিজ পসন্দে একজন গ্রহণ করিবার অনুমতি দান করিলেন। তিনি সাফিয়্যা (রা)-কে পছন্দ করিলেন। ইহাতে সাহাবীগণ বলিলেন, সাফিয়্যা নাঘীর ও কুরায়যা গোত্র দুইটির অধিপতির সম্ভ্রান্ত কন্যা। হে আল্লাহ্র রাসূল! আপনি ব্যতীত অন্য কেহই তাহার উপযুক্ত নয়। সুতরাং রাসূলুল্লাহ (স) দিহয়া (রা)-কে অন্য দাসী দিয়া সাফিয়্যা (রা)-কে দাসত্বমুক্ত করেন। অতঃপর তাঁহাকে বিবাহ করেন (রাসূলে রাহমাত, পৃ. ৪০৯)। আল্লামা শিবলী নু'মানী ও আল্লামা সায়্যিদ সুলায়মান নাদবী কর্তৃক রচিত সীরাতুন্নবীর (১খ., ২৮৩) বর্ণনা অনুযায়ী রাসূলুল্লাহ (স) সাফিয়্যার বিনিময়ে দিহয়া (রা)-কে সাতজন দাসী দিলেন। এই সকল রিওয়াত পরস্পরবিরোধী। এক সূত্রে এইরূপ বর্ণিত আছে,
عَنْ أَنَسِ بْنِ مَالِكَ قَالَ قَدِمْنَا خَيْبَرَ فَلَمَّا فَتَحَ اللهُ عَلَيْهِ الْحِصْنَ ذُكِرَ لَهُ جَمَالُ صَفِيَّةَ بنْتَ حُيَى ابْنِ أَخْطَبَ وَقَدْ قُتِلَ وَكَانَتْ عَرُوسًا فَاصْطَفَاهَا النَّبِيُّ ﷺ لِنَفْسِهِ فَخَرَجَ بِهَا حَتَّى بَلَغْنَا سَدَّ الصَّهْبَاءِ حَلَّتْ فَتَبَنَى بِهَا رَسُولُ اللهِ ﷺ ثُمَّ صُنِعَ حَيْسًا فِي نَطْعَ صَغِيرَة
"আনাস ইবন মালিক (রা) বলেন, আমরা খায়বারে আগমন করিলাম। অতঃপর মহান আল্লাহ যখন দুর্গের বিজয় দান করিলেন তখন রাসূলুল্লাহ (স)-এর সম্মুখে সাফিয়্যা বিন্ত হুয়াই ইব্ন আখতাবের সৌন্দর্যের কথা উল্লেখ করা হইল। তাঁহার প্রাক্তন স্বামী (কিনানা) নিহত হইয়াছিল। সাফিয়্যা (রা) ছিলেন নব বিবাহিতা। অতঃপর তাঁহাকে রাসূলুল্লাহ (স) নিজের জন্য মনোনীত করিলেন। ইহার পর তাঁহাকে লইয়া রাসূলুল্লাহ (স) রওয়ানা করিলেন। আমরা যখন আস-সাহ্'বার দোরগোড়ায় উপনীত হইলাম তখন সাফিয়্যা (রা) হায়েয হইতে পবিত্রতা অর্জন করিলেন। ফলে এখানেই রাসূলুল্লাহ (স) তাঁহার সহিত বাসরঘর করিলেন। ইহার পর ছোট একটি চামড়ার পাত্রে হায়স (ক্ষীর) তৈরী করা হইল। রাসূলুল্লাহ (স) আমাকে বলিলেনঃ তোমার আশেপাশের লোকদিগকে দাওয়াত দাও। ইহাই ছিল সাফিয়্যা (রা)-এর ওয়ালীমা। অতঃপর আমরা মদীনা অভিমুখে রওয়ানা করিলাম। পথিমধ্যে দেখিতে পাইলাম, রাসূলুল্লাহ (স) তাঁহার পিছন দিয়া সাফিয়্যা (রা)-এর জন্য একটি চাদর দ্বারা পর্দা করিয়াছেন। পরে তাঁহার উটের নিকট তিনি বসিয়া নিজ হাঁটু মেলিয়া রাখিলেন এবং সাফিয়্যা (রা) নিজ পা রাসূলুল্লাহ (স)-এর হাঁটুতে রাখিয়া সওয়ার হইলেন” (বুখারী, কিতাবুল মাগাযী, বাব গাওয়াতি খায়বার, ২খ., ৬০৬)।
বুখারীর এক রিওয়ায়াত নিম্নরূপ:
عَنْ أَنَسِ بْنِ مَالِكَ أَنَّ رَسُولَ اللهِ اللهِ عَزَا خَيْبَرَ فَصَلَّيْنَا عِنْدَهَا صَلوةَ الْغَدَاةِ بِغَلَس فَرَكِبَ النَّبِيِّ ﷺ وَرَكِبَ أَبُو طَلْحَةَ وَأَنَا رَدِيفُ أَبِي طَلْحَةَ فَأَجْرِى نَبِيُّ اللَّهِ ﷺ فِي زُقَاقِ خَيْبَرَ وَأَنَّ رَكْبَتَى لَتَمَسُ فَخِذَ نَبِيُّ اللهِ اللهِ ثُمَّ حَسَرَ الإِزارِ عَنْ فَخِذِهِ حَتَّى أَنِّي أَنْظُرُ إِلى بِيَاضِ فَخِذِ نَبِيُّ اللَّهِ ﷺ فَلَمَّا دَخَلَ الْقَرْيَةَ قَالَ اللهُ أَكْبَرُ خَرِبَتْ خَيْبَرُ إِنَّا إِذَا نَزَلْنَا بِسَاحَةِ قَوْمٍ فَسَاءَ صَبَاحُ الْمُنْذِرِينَ قَالَهَا ثَلثًا قَالَ وَخَرَجَ الْقَوْمُ إِلى أَعْمَالِهِمْ فَقَالُوا مُحَمَّدٌ قَالَ عَبْدُ الْعَزِيزِ وَقَالَ بَعْضُ أَصْحَابِنَا وَالْخَمِيسَ يَعْنِيُّ الْجَيْشِ قَالَ فَأَصَبْنَاهَا عَنَوَةً فَجُمِعَ السَّبِيُّ فَجَاءَ دِحْيَةٌ فَقَالَ يَانَبِيُّ اللهِ أَعْطَنِي جَارِيَةً مِنَ السَّبِي فَقَالَ اذْهَبْ فَخُذْ جَارِيَةً فَأَخَذَ صَفِيَّةَ بِنْتَ حُيَى فَجَاءَ رَجُلٌ إِلَى النَّبِيُّ ﷺ فَقَالَ يَا نَبِيُّ اللَّهِ أَعْطَيْتَ دِحْيَةَ صَفِيَّةَ
বুকখারীতে ওয়ালীমা সম্পর্কিত একটি বর্ণনায় উল্লেখ আছে:
فَأَصْبَحَ النَّبِيُّ ﷺ عَرُوسًا فَقَالَ مَنْ كَانَ عِنْدَهُ شَيْءٌ فَلْيَجِيْ بِهِ وَبَسَطَ نِطْعًا فَجَعَلَ الرَّجُلُ يَجِئُ بِالتَّمْرِ وَجَعَلَ الرَّجُلُ يَجِيُّ بِالسَّمَنِ قَالَ وَأَحْسِبُهُ قَدْ ذَكَرَ السَّوِيقَ قَالَ فَحَاسُوا حَيْسًا فَكَانَتْ وَلِيْمَةً رَسُولِ الله ﷺ (صحيح البخاري مجلد ١ : ٤-٥٣ كتاب الصلوة باب ما يذكر في الفخذ).
"অতঃপর রাসূলুল্লাহ (স) সফররত অবস্থাতেই উম্মু সুলায়ম (রা) সাফিয়্যা (রা)-এর জন্য রাত্রিকালে রাসূলুল্লাহ (স)-এর সহিত বাসরের ব্যবস্থা করিয়াছিলেন। সকালে সকলকে রাসূলুল্লাহ (স) বলিলেন, যাহার নিকট যাহা আছে তাহা লইয়া আস। তিনি চামড়ার খাঞ্চা বিছাইয়া দিলেন। কেহ লইয়া আসিল শুকনা খেজুর, কেহ আনিল ঘি। বর্ণনাকারী বলেন, আমার মনে হয় ছাতু আনার কথাও উল্লেখ আছে। সবাই মিলিয়া তাহা দিয়া হায়স (ছাতু ও ঘি মিশ্রিত খাদ্য) তৈরী করিলেন। ইহাই ছিল রাসূলুল্লাহ (স)-এর ওয়ালীমা” (বুখারী, কিতাবুস সালাত, বাব মা যুযকারু ফি'ল-ফাখিয, ১খ., ৫৩-৫৪)।
সুনানে আবী দাউদের ভাষ্যকার 'আল্লামা মাযিরী বলিয়াছেন রাসূলুল্লাহ (স) সাফিয়্যা (রা)-কে দিহয়া (রা)-এর নিকট হইতে ফেরত লইয়া নিজে বিবাহ করিলেন। কারণ:
لِمَا فِيْهِ مِنْ انْتِهَالِهَا مَعَ مَرْتَبَتِهَا وَكَوْنِهَا بِنْتَ سَيِّدِهِمْ
"তিনি ছিলেন উচ্চমর্যাদসম্পন্ন এবং ইয়াহূদী নেতার মেয়ে। এইজন্য তাঁহার অন্য কাহারও নিকট থাকা সমীচীন ছিল মা" (শিবলী নু'মানী ও সুলায়মান নাদবী, সীরাতুন নবী, ১খ., ২৮৪)।
ইবন হাজার আল-'আসকালানী বলেন, ইবন ইসহাকের মতে সাফিয়্যা (রা)-কে কামূস দুর্গ হইতে বন্দী করা হইয়াছিল। সাফিয়্যা (রা) ছিলেন কিনানা ইন্ন আবিল হুকায়কের স্ত্রী। তাঁহার সহিত তাঁহার চাচাতো ভগ্নিকে বন্দী করা হইয়াছিল। ভিন্নমতে তাঁহার স্বামীর চাচাত ভগ্নি বন্দী হইয়াছিল। সুহায়লী বলেন, খায়বারের গনীমত ভাগ করিবার পূর্বে দিহয়া (রা)-এর নিকট হইতে সাফিয়্যা (রা)-কে ফেরত লওয়া হইয়াছিল। সাফিয়্যা (রা)-এর পরিবর্তে দিহয়া (রা)-কে রাসূলুল্লাহ (স) যাহা দিয়াছিলেন তাহা বিনিময় হিসাবে নয়, অনুগ্রহ হিসাবে (ফাতহুল বারী)।
সাফিয়্যা (রা) মহানবী (স)-এর পরিণীতা হইবার আরও একটি যুক্তি হইল, তিনি পিতা ও স্বামী উভয়ের পক্ষ হইতে রাজকীয় পরিবেশে জীবন যাপনের পর যখন পিতৃহারা ও স্বামীহারা হইয়া চরমভাবে অসহায় হইয়া পড়িলেন, এমতাবস্থায় তাঁহার বংশ মর্যাদা রক্ষার্থে এবং স্বজন হারানোর বেদনা দূর করিতে ইহা ছাড়া গত্যন্তর ছিল না। তিনি বাঁদী হিসাবেই রাসূলুল্লাহ (স)-এর নিকট থাকিতে পারিতেন। কিন্তু রাসূলুল্লাহ (স) তাহা করেন নাই। তাঁহার সামাজিক মর্যাদার প্রতি লক্ষ্য করিয়া তিনি তাঁহাকে আযাদ করিয়া দিলেন। অতঃপর তাঁহাকে নিজ স্ত্রী হিসাবে বরণ করিয়া লইলেন।
মুসনাদে আহমাদে বর্ণিত আছে (মিসর, ৩খ., ১৩৮), রাসূলুল্লাহ (স) সাফিয়্যা (রা)-কে দুইটি জিনিসের যে কোন একটি গ্রহণের অনুমতি প্রদান করিয়াছিলেন: হয় তিনি আযাদ হইয়া নিজ গৃহে চলিয়া যাইবেন অথবা তাঁহার সহিত বিবাহ বন্ধনে আবদ্ধ হইবেন। তিনি রাসূলুল্লাহ (স)-এর বিবাহে আবদ্ধ হইবার পন্থাটি স্বেচ্ছায় গ্রহণ করিয়াছিলেন। করুণা ও সদ্ব্যবহার ছাড়াও ইহা রাজনৈতিক ও ধর্মীয় দৃষ্টিকোণ হইতেও অত্যন্ত তাৎপর্যপূর্ণ ছিল। এই আচরণের ফলেই আরববাসীদের ইসলামের প্রতি আগ্রহ বৃদ্ধি পাইতেছিল। ইসলাম তাহার শত্রুদিগের পরিবার-পরিজনের সহিতও কতই না উত্তম আচরণ করে (শিবলী নু'মানী ও সুলায়মান নাদবী, সীরাতুন-নবী, ১খ., ২৮৪)।
📄 সাফিয়্যা নামের কারণ
উম্মত জননী আইশা (রা) বলেন, كَانَتْ صَفَيَّةُ مِنَ الصَّفَى "সাফিয়্যা (রা) ছিলেন সাফী অংশের অন্তর্ভুক্ত” (আবু দাউদ, ২খ., পৃ.৭৩)।
ইব্ন আওন বলেন, আমি মুহাম্মাদ ইব্ন সীরীনকে রাসূলুল্লাহ (স)-এর অংশ ও সাফী সম্পর্কে জিজ্ঞাসা করিয়াছিলাম। তিনি বলিলেন, রাসূলুল্লাহ (স) যুদ্ধে শরীক না হইলেও তাঁহার জন্য একটি অংশ নির্দিষ্ট করা হইত। সাফী হইল 'খুমুস' (এক-পঞ্চমাংশ) পৃথক করিবার পূর্বে তাঁহার জন্য যেই অংশ গ্রহণ করা হইত" (আবূ দাউদ, প্রাগুক্ত)।
وَعَنْ عَامِرٍ الشَّعْبِي قَالَ كَانَ لِلنَّبِيِّ ﷺ سَهُمْ يُدْعَى الصَّفِيُّ إِنْ شَاءَ عَبْدًا وَإِنْ شَاءَ امَةً وَإِنْ شَاءَ فَرَسَا يَخْتَارُهُ قَبْلَ الخُمس (ابو داود كتاب الخراج باب ما جاء في سهم الصفى ).
"আমের আশ-শা'বী (র) বলেন, রাসূলূল্লাহ (স)-এর জন্য একটি অংশ ছিল যাহাকে 'সাফী' বলিয়া অভিহিত করা হইত। 'খুমুস' পৃথক করিবার পূর্বে তিনি নিজ পছন্দ মত যাহা গ্রহণ করিতেন- তাহা গোলাম অথবা বাঁদী কিংবা ঘোড়া যাহাই হউক"।
وَعَنْ قَتَادَةَ قَالَ كَانَ رَسُولُ اللهِ ﷺ إِذَا غَدًا كَانَ لَهُ سَهْمُ صَافٍ يَأْخُذُهُ مِنْ حَيْثُ شَاءَ فَكَانَتْ صَفِيَّةٌ مِنْ ذَلِكَ السَّهْمِ وَكَانَ إِذَا لَمْ يَغْزُو ضُرِبَ لَهُ بِسَهْمِهِ وَلَمْ يُخَيَّرُ.
"কাতাদা (র) বলেন, রাসূলুল্লাহ (স) যখন যুদ্ধে অংশগ্রহণ করিতেন তখন তাঁহার জন্য "সাফী'র এক অংশ থাকিত। তিনি যেখান হইতে ইচ্ছা তাহা গ্রহণ করিতেন। এইরূপ অংশেরই অধীনে ছিলেন সাফিয়্যা (রা)। তিনি সরাসরি যুদ্ধে অংশগ্রহণ না করিলেও তাঁহার জন্য তাঁহার অংশ পৃথক করা হইত, অন্য কিছু গ্রহণের অধিকার থাকিত না" (আবূ দাউদ, প্রাগুক্ত)।
এই হাদীছ তিনটি দ্বারা বুঝা যাইতেছে যে, সাফিয়্যা (রা) ছিলেন রাসূলুল্লাহ (স.)-এর বিশেষ অংশ। ইহাও বুঝা যাইতেছে যে, 'খুমুস' পৃথক করিবার পূর্বে তিনি সাফিয়্যা (রা)-কে গ্রহণ করিয়াছিলেন। সুতরাং ইতিপূর্বে যেই কথা বলা হইয়াছে যে, সাফিয়্যা (রা) দিহয়া কালবী (রা)-এর ভাগে পড়েন নাই, বরং তিনি তাঁহাকে রাসূলুল্লাহ (স)-এর আদেশ পাইয়া স্বতস্ফূর্তভাবে গ্রহণ করিয়াছিলেন। ইবন হাজার উপরিউক্ত হাদীছগুলি বর্ণনা করিয়া বলেন, কেহ কেহ বালিয়াছেন, সাফিয়্যা (রা)-কে বন্দী করিবার পূর্বে তাঁহার নাম ছিল যয়নব। অতঃপর তিনি সাফী-র মধ্যে গণ্য হইবার পর তাঁহার নাম হইল সাফিয়্যা (ফাতহুল বারী, ৭খ., ৪৮০)।
উম্মত জননী আইশা (রা) বলেন, كَانَتْ صَفَيَّةُ مِنَ الصَّفَى "সাফিয়্যা (রা) ছিলেন সাফী অংশের অন্তর্ভুক্ত” (আবু দাউদ, ২খ., পৃ.৭৩)।
ইব্ন আওন বলেন, আমি মুহাম্মাদ ইব্ন সীরীনকে রাসূলুল্লাহ (স)-এর অংশ ও সাফী সম্পর্কে জিজ্ঞাসা করিয়াছিলাম। তিনি বলিলেন, রাসূলুল্লাহ (স) যুদ্ধে শরীক না হইলেও তাঁহার জন্য একটি অংশ নির্দিষ্ট করা হইত। সাফী হইল 'খুমুস' (এক-পঞ্চমাংশ) পৃথক করিবার পূর্বে তাঁহার জন্য যেই অংশ গ্রহণ করা হইত" (আবূ দাউদ, প্রাগুক্ত)।
وَعَنْ عَامِرٍ الشَّعْبِي قَالَ كَانَ لِلنَّبِيِّ ﷺ سَهُمْ يُدْعَى الصَّفِيُّ إِنْ شَاءَ عَبْدًا وَإِنْ شَاءَ امَةً وَإِنْ شَاءَ فَرَسَا يَخْتَارُهُ قَبْلَ الخُمس (ابو داود كتاب الخراج باب ما جاء في سهم الصفى ).
"আমের আশ-শা'বী (র) বলেন, রাসূলূল্লাহ (স)-এর জন্য একটি অংশ ছিল যাহাকে 'সাফী' বলিয়া অভিহিত করা হইত। 'খুমুস' পৃথক করিবার পূর্বে তিনি নিজ পছন্দ মত যাহা গ্রহণ করিতেন- তাহা গোলাম অথবা বাঁদী কিংবা ঘোড়া যাহাই হউক"।
وَعَنْ قَتَادَةَ قَالَ كَانَ رَسُولُ اللهِ ﷺ إِذَا غَدًا كَانَ لَهُ سَهْمُ صَافٍ يَأْخُذُهُ مِنْ حَيْثُ شَاءَ فَكَانَتْ صَفِيَّةٌ مِنْ ذَلِكَ السَّهْمِ وَكَانَ إِذَا لَمْ يَغْزُو ضُرِبَ لَهُ بِسَهْمِهِ وَلَمْ يُخَيَّرُ.
"কাতাদা (র) বলেন, রাসূলুল্লাহ (স) যখন যুদ্ধে অংশগ্রহণ করিতেন তখন তাঁহার জন্য "সাফী'র এক অংশ থাকিত। তিনি যেখান হইতে ইচ্ছা তাহা গ্রহণ করিতেন। এইরূপ অংশেরই অধীনে ছিলেন সাফিয়্যা (রা)। তিনি সরাসরি যুদ্ধে অংশগ্রহণ না করিলেও তাঁহার জন্য তাঁহার অংশ পৃথক করা হইত, অন্য কিছু গ্রহণের অধিকার থাকিত না" (আবূ দাউদ, প্রাগুক্ত)।
এই হাদীছ তিনটি দ্বারা বুঝা যাইতেছে যে, সাফিয়্যা (রা) ছিলেন রাসূলুল্লাহ (স.)-এর বিশেষ অংশ। ইহাও বুঝা যাইতেছে যে, 'খুমুস' পৃথক করিবার পূর্বে তিনি সাফিয়্যা (রা)-কে গ্রহণ করিয়াছিলেন। সুতরাং ইতিপূর্বে যেই কথা বলা হইয়াছে যে, সাফিয়্যা (রা) দিহয়া কালবী (রা)-এর ভাগে পড়েন নাই, বরং তিনি তাঁহাকে রাসূলুল্লাহ (স)-এর আদেশ পাইয়া স্বতস্ফূর্তভাবে গ্রহণ করিয়াছিলেন। ইবন হাজার উপরিউক্ত হাদীছগুলি বর্ণনা করিয়া বলেন, কেহ কেহ বালিয়াছেন, সাফিয়্যা (রা)-কে বন্দী করিবার পূর্বে তাঁহার নাম ছিল যয়নব। অতঃপর তিনি সাফী-র মধ্যে গণ্য হইবার পর তাঁহার নাম হইল সাফিয়্যা (ফাতহুল বারী, ৭খ., ৪৮০)।
উম্মত জননী আইশা (রা) বলেন, كَانَتْ صَفَيَّةُ مِنَ الصَّفَى "সাফিয়্যা (রা) ছিলেন সাফী অংশের অন্তর্ভুক্ত” (আবু দাউদ, ২খ., পৃ.৭৩)।
ইব্ন আওন বলেন, আমি মুহাম্মাদ ইব্ن সীরীনকে রাসূলুল্লাহ (স)-এর অংশ ও সাফী সম্পর্কে জিজ্ঞাসা করিয়াছিলাম। তিনি বলিলেন, রাসূলুল্লাহ (স) যুদ্ধে শরীক না হইলেও তাঁহার জন্য একটি অংশ নির্দিষ্ট করা হইত। সাফী হইল 'খুমুস' (এক-পঞ্চমাংশ) পৃথক করিবার পূর্বে তাঁহার জন্য যেই অংশ গ্রহণ করা হইত" (আবূ দাউদ, প্রাগুক্ত)।
وَعَنْ عَامِرٍ الشَّعْبِي قَالَ كَانَ لِلنَّبِيِّ ﷺ سَهُمْ يُدْعَى الصَّفِيُّ إِنْ شَاءَ عَبْدًا وَإِنْ شَاءَ امَةً وَإِنْ شَاءَ فَرَسَا يَخْتَارُهُ قَبْلَ الخُمس (ابو داود كتاب الخراج باب ما جاء في سهم الصفى ).
"আমের আশ-শা'বী (র) বলেন, রাসূলূল্লাহ (স)-এর জন্য একটি অংশ ছিল যাহাকে 'সাফী' বলিয়া অভিহিত করা হইত। 'খুমুস' পৃথক করিবার পূর্বে তিনি নিজ পছন্দ মত যাহা গ্রহণ করিতেন- তাহা গোলাম অথবা বাঁদী কিংবা ঘোড়া যাহাই হউক"।
وَعَنْ قَتَادَةَ قَالَ كَانَ رَسُولُ اللهِ ﷺ إِذَا غَدًا كَانَ لَهُ سَهْمُ صَافٍ يَأْخُذُهُ مِنْ حَيْثُ شَاءَ فَكَانَتْ صَفِيَّةٌ مِنْ ذَلِكَ السَّهْمِ وَكَانَ إِذَا لَمْ يَغْزُو ضُرِبَ لَهُ بِسَهْمِهِ وَلَمْ يُخَيَّرُ.
"কাতাদা (র) বলেন, রাসূলুল্লাহ (স) যখন যুদ্ধে অংশগ্রহণ করিতেন তখন তাঁহার জন্য "সাফী'র এক অংশ থাকিত। তিনি যেখান হইতে ইচ্ছা তাহা গ্রহণ করিতেন। এইরূপ অংশেরই অধীনে ছিলেন সাফিয়্যা (রা)। তিনি সরাসরি যুদ্ধে অংশগ্রহণ না করিলেও তাঁহার জন্য তাঁহার অংশ পৃথক করা হইত, অন্য কিছু গ্রহণের অধিকার থাকিত না" (আবূ দাউদ, প্রাগুক্ত)।
এই হাদীছ তিনটি দ্বারা বুঝা যাইতেছে যে, সাফিয়্যা (রা) ছিলেন রাসূলুল্লাহ (س.)-এর বিশেষ অংশ। ইহাও বুঝা যাইতেছে যে, 'খুমুস' পৃথক করিবার পূর্বে তিনি সাফিয়্যা (রা)-কে গ্রহণ করিয়াছিলেন। সুতরাং ইতিপূর্বে যেই কথা বলা হইয়াছে যে, সাফিয়্যা (রা) দিহয়া কালবী (রা)-এর ভাগে পড়েন নাই, বরং তিনি তাঁহাকে রাসূলুল্লাহ (স)-এর আদেশ পাইয়া স্বতস্ফূর্তভাবে গ্রহণ করিয়াছিলেন। ইবন হাজার উপরিউক্ত হাদীছগুলি বর্ণনা করিয়া বলেন, কেহ কেহ বালিয়াছেন, সাফিয়্যা (রা)-কে বন্দী করিবার পূর্বে তাঁহার নাম ছিল যয়নব। অতঃপর তিনি সাফী-র মধ্যে গণ্য হইবার পর তাঁহার নাম হইল সাফিয়্যা (ফাতহুল বারী, ৭খ., ৪৮০)।
উম্মত জননী আইশা (রা) বলেন, كَانَتْ صَفَيَّةُ مِنَ الصَّفَى "সাফিয়্যা (রা) ছিলেন সাফী অংশের অন্তর্ভুক্ত” (আবু দাউদ, ২খ., পৃ.৭৩)।
ইব্ন আওন বলেন, আমি মুহাম্মাদ ইব্ন সীরীনকে রাসূলুল্লাহ (স)-এর অংশ ও সাফী সম্পর্কে জিজ্ঞাসা করিয়াছিলাম। তিনি বলিলেন, রাসূলুল্লাহ (স) যুদ্ধে শরীক না হইলেও তাঁহার জন্য একটি অংশ নির্দিষ্ট করা হইত। সাফী হইল 'খুমুস' (এক-পঞ্চমাংশ) পৃথক করিবার পূর্বে তাঁহার জন্য যেই অংশ গ্রহণ করা হইত" (আবূ দাউদ, প্রাগুক্ত)।
وَعَنْ عَامِرٍ الشَّعْبِي قَالَ كَانَ لِلنَّبِيِّ ﷺ سَهُمْ يُدْعَى الصَّفِيُّ إِنْ شَاءَ عَبْدًا وَإِنْ شَاءَ امَةً وَإِنْ شَاءَ فَرَسَا يَخْتَارُهُ قَبْلَ الخُمس (ابو داود كتاب الخراج باب ما جاء في سهم الصفى ).
"আমের আশ-শা'বী (র) বলেন, রাসূলূল্লাহ (স)-এর জন্য একটি অংশ ছিল যাহাকে 'সাফী' বলিয়া অভিহিত করা হইত। 'খুমুস' পৃথক করিবার পূর্বে তিনি নিজ পছন্দ মত যাহা গ্রহণ করিতেন- তাহা গোলাম অথবা বাঁদী কিংবা ঘোড়া যাহাই হউক"।
وَعَنْ قَتَادَةَ قَالَ كَانَ رَسُولُ اللهِ ﷺ إِذَا غَدًا كَانَ لَهُ سَهْمُ صَافٍ يَأْخُذُهُ مِنْ حَيْثُ شَاءَ فَكَانَتْ صَفِيَّةُ مِنْ ذَلِكَ السَّهْمِ وَكَانَ إِذَا لَمْ يَغْزُو ضُرِبَ لَهُ بِسَهْمِهِ وَلَمْ يُخَيَّرُ.
"কাতাদা (র) বলেন, রাসূলুল্লাহ (স) যখন যুদ্ধে অংশগ্রহণ করিতেন তখন তাঁহার জন্য "সাফী'র এক অংশ থাকিত। তিনি যেখান হইতে ইচ্ছা তাহা গ্রহণ করিতেন। এইরূপ অংশেরই অধীনে ছিলেন সাফিয়্যা (রা)। তিনি সরাসরি যুদ্ধে অংশগ্রহণ না করিলেও তাঁহার জন্য তাঁহার অংশ পৃথক করা হইত, অন্য কিছু গ্রহণের অধিকার থাকিত না" (আবূ দাউদ, প্রাগুক্ত)।
এই হাদীছ তিনটি দ্বারা বুঝা যাইতেছে যে, সাফিয়্যা (রা) ছিলেন রাসূলুল্লাহ (স.)-এর বিশেষ অংশ। ইহাও বুঝা যাইতেছে যে, 'খুমুস' পৃথক করিবার পূর্বে তিনি সাফিয়্যা (রা)-কে গ্রহণ করিয়াছিলেন। সুতরাং ইতিপূর্বে যেই কথা বলা হইয়াছে যে, সাফিয়্যা (রা) দিহয়া কালবী (রা)-এর ভাগে পড়েন নাই, বরং তিনি তাঁহাকে রাসূলুল্লাহ (স)-এর আদেশ পাইয়া স্বতস্ফূর্তভাবে গ্রহণ করিয়াছিলেন। ইবন হাজার উপরিউক্ত হাদীছগুলি বর্ণনা করিয়া বলেন, কেহ কেহ বালিয়াছেন, সাফিয়্যা (রা)-কে বন্দী করিবার পূর্বে তাঁহার নাম ছিল যয়নব। অতঃপর তিনি সাফী-র মধ্যে গণ্য হইবার পর তাঁহার নাম হইল সাফিয়্যা (ফাতহুল বারী, ৭খ., ৪৮০)।
📄 কুল্লা দুর্গ
এই দুর্গটিও ছিল অতিশয় সুরক্ষিত এবং ইহা পাহাড়ের চূড়ায় অবস্থিত। কুল্লা শব্দের অর্থ হইল পাহাড়ের চূড়া। দুর্গটি পরবর্তীতে যুবায়র দুর্গ হিসাবে পরিচিতি লাভ করে। কারণ দুর্গটি যুদ্ধলব্ধ সম্পদ বণ্টনের সময় যুবায়র (রা)-এর ভাগে পড়িয়াছিল বলিয়া ইহাকে এই নামে ডাকা হইত। একাধারে তিন দিন পর্যন্ত দুর্গ অবরোধ করিয়া রাখা হয়, কিন্তু দুর্গের পতন ঘটানো সম্ভব হয় নাই। ইতেমধ্যে একজন ইয়াহুদী রাসূলুল্লাহ (স)-এর নিকট আগমন করিয়া বলিল, হে আবুল কাসিম! আপনি এক মাস যুদ্ধ করিয়া দুর্গের পতন ঘটাইতে সক্ষম হইবেন না। অবশ্য একটি বিকল্প ব্যবস্থা আছে যাহার মাধ্যমে আপনি তাহাদিগকে আত্মসমর্পণে বাধ্য করিতে সক্ষম হইবেন। পাহাড়ের নিম্নদেশে পানির একটি ঝর্ণা আছে, উহা হইতে রাত্রিকালে এই দুর্গবাসীরা পানি সংগ্রহ করিয়া থাকে। ঝর্ণাটি বন্ধ করিয়া দিলেই তাহারা নিরুপায় হইবে। রাসূলুল্লাহ (স) প্রত্যূষে গমন করিয়া ঝর্ণাটি বন্ধ করিয়া দেন। ইহার ফলে দুর্গবাসীরা দুর্গাভ্যন্তর হইতে বাধ্য হইয়া বাহির হয় এবং তাহাদের সঙ্গে তুমুল যুদ্ধ হয়। যুদ্ধে দশজন ইয়াহুদী নিহত হয় এবং কতিপয় মুসলিম শহীদ হন। অতঃপর দুর্গ বিজিত হয় (আসাহহুস সিয়ার, পৃ. ১৯৪; সীরাতে মুহসিমি কাইনাত, পৃ. ২৯৩, ২৯৪)।
এই দুর্গটিও ছিল অতিশয় সুরক্ষিত এবং ইহা পাহাড়ের চূড়ায় অবস্থিত। কুল্লা শব্দের অর্থ হইল পাহাড়ের চূড়া। দুর্গটি পরবর্তীতে যুবায়র দুর্গ হিসাবে পরিচিতি লাভ করে। কারণ দুর্গটি যুদ্ধলব্ধ সম্পদ বণ্টনের সময় যুবায়র (রা)-এর ভাগে পড়িয়াছিল বলিয়া ইহাকে এই নামে ডাকা হইত। একাধারে তিন দিন পর্যন্ত দুর্গ অবরোধ করিয়া রাখা হয়, কিন্তু দুর্গের পতন ঘটানো সম্ভব হয় নাই। ইতেমধ্যে একজন ইয়াহুদী রাসূলুল্লাহ (স)-এর নিকট আগমন করিয়া বলিল, হে আবুল কাসিম! আপনি এক মাস যুদ্ধ করিয়া দুর্গের পতন ঘটাইতে সক্ষম হইবেন না। অবশ্য একটি বিকল্প ব্যবস্থা আছে যাহার মাধ্যমে আপনি তাহাদিগকে আত্মসমর্পণে বাধ্য করিতে সক্ষম হইবেন। পাহাড়ের নিম্নদেশে পানির একটি ঝর্ণা আছে, উহা হইতে রাত্রিকালে এই দুর্গবাসীরা পানি সংগ্রহ করিয়া থাকে। ঝর্ণাটি বন্ধ করিয়া দিলেই তাহারা নিরুপায় হইবে। রাসূলুল্লাহ (স) প্রত্যূষে গমন করিয়া ঝর্ণাটি বন্ধ করিয়া দেন। ইহার ফলে দুর্গবাসীরা দুর্গাভ্যন্তর হইতে বাধ্য হইয়া বাহির হয় এবং তাহাদের সঙ্গে তুমুল যুদ্ধ হয়। যুদ্ধে দশজন ইয়াহুদী নিহত হয় এবং কতিপয় মুসলিম শহীদ হন। অতঃপর দুর্গ বিজিত হয় (আসাহহুস-সিয়ার, পৃ. ১৯৪; সীরাতে মুহসিমি কাইনাত, পৃ. ২৯৩, ২৯৪)।
এই দুর্গটিও ছিল অতিশয় সুরক্ষিত এবং ইহা পাহাড়ের চূড়ায় অবস্থিত। কুল্লা শব্দের অর্থ হইল পাহাড়ের চূড়া। দুর্গটি পরবর্তীতে যুবায়র দুর্গ হিসাবে পরিচিতি লাভ করে। কারণ দুর্গটি যুদ্ধলব্ধ সম্পদ বণ্টনের সময় যুবায়র (রা)-এর ভাগে পড়িয়াছিল বলিয়া ইহাকে এই নামে ডাকা হইত। একাধারে তিন দিন পর্যন্ত দুর্গ অবরোধ করিয়া রাখা হয়, কিন্তু দুর্গের পতন ঘটানো সম্ভব হয় নাই। ইতেমধ্যে একজন ইয়াহুদী রাসূলুল্লাহ (স)-এর নিকট আগমন করিয়া বলিল, হে আবুল কাসিম! আপনি এক মাস যুদ্ধ করিয়া দুর্গের পতন ঘটাইতে সক্ষম হইবেন না। অবশ্য একটি বিকল্প ব্যবস্থা আছে যাহার মাধ্যমে আপনি তাহাদিগকে আত্মসমর্পণে বাধ্য করিতে সক্ষম হইবেন। পাহাড়ের নিম্নদেশে পানির একটি ঝর্ণা আছে, উহা হইতে রাত্রিকালে এই দুর্গবাসীরা পানি সংগ্রহ করিয়া থাকে। ঝর্ণাটি বন্ধ করিয়া দিলেই তাহারা নিরুপায় হইবে। রাসূলুল্লাহ (স) প্রত্যূষে গমন করিয়া ঝর্ণাটি বন্ধ করিয়া দেন। ইহার ফলে দুর্গবাসীরা দুর্গাভ্যন্তর হইতে বাধ্য হইয়া বাহির হয় এবং তাহাদের সঙ্গে তুমুল যুদ্ধ হয়। যুদ্ধে দশজন ইয়াহুদী নিহত হয় এবং কতিপয় মুসলিম শহীদ হন। অতঃপর দুর্গ বিজিত হয় (আসাহহুস-সিয়ার, পৃ. ১৯৪; সীরাতে মুহসিমি কাইনাত, পৃ. ২৯৩, ২৯৪)।
এই দুর্গটিও ছিল অতিশয় সুরক্ষিত এবং ইহা পাহাড়ের চূড়ায় অবস্থিত। কুল্লা শব্দের অর্থ হইল পাহাড়ের চূড়া। দুর্গটি পরবর্তীতে যুবায়র দুর্গ হিসাবে পরিচিতি লাভ করে। কারণ দুর্গটি যুদ্ধলব্ধ সম্পদ বণ্টনের সময় যুবায়র (রা)-এর ভাগে পড়িয়াছিল বলিয়া ইহাকে এই নামে ডাকা হইত। একাধারে তিন দিন পর্যন্ত দুর্গ অবরোধ করিয়া রাখা হয়, কিন্তু দুর্গের পতন ঘটানো সম্ভব হয় নাই। ইতেমধ্যে একজন ইয়াহুদী রাসূলুল্লাহ (স)-এর নিকট আগমন করিয়া বলিল, হে আবুল কাসিম! আপনি এক মাস যুদ্ধ করিয়া দুর্গের পতন ঘটাইতে সক্ষম হইবেন না। অবশ্য একটি বিকল্প ব্যবস্থা আছে যাহার মাধ্যমে আপনি তাহাদিগকে আত্মসমর্পণে বাধ্য করিতে সক্ষম হইবেন। পাহাড়ের নিম্নদেশে পানির একটি ঝর্ণা আছে, উহা হইতে রাত্রিকালে এই দুর্গবাসীরা পানি সংগ্রহ করিয়া থাকে। ঝর্ণাটি বন্ধ করিয়া দিলেই তাহারা নিরুপায় হইবে। রাসূলুল্লাহ (স) প্রত্যূষে গমন করিয়া ঝর্ণাটি বন্ধ করিয়া দেন। ইহার ফলে দুর্গবাসীরা দুর্গাভ্যন্তর হইতে বাধ্য হইয়া বাহির হয় এবং তাহাদের সঙ্গে তুমুল যুদ্ধ হয়। যুদ্ধে দশজন ইয়াহুদী নিহত হয় এবং কতিপয় মুসলিম শহীদ হন। অতঃপর দুর্গ বিজিত হয় (আসাহহুস-সিয়ার, পৃ. ১৯৪; সীরাতে মুহসিমি কাইনাত, পৃ. ২৯৩, ২৯৪)।