📘 সীরাত বিশ্বকোষ > 📄 হাবশী রাখাল

📄 হাবশী রাখাল


কৃষ্ণকায় এক রাখালের ঘটনা সহীহ হাদীছসমূহে উদ্ধৃত হইয়াছে। ঘটনাটি এই দুর্গ বিজয়ের সময় সংঘটিত হয়। ইয়াহুদীগণ যখন যুদ্ধের প্রস্তুতি গ্রহণ করে তখন সে জিজ্ঞাসা করে, উহা কি ব্যাপার! তাহারা জবাব দেয়, ঐ ব্যক্তির বিরুদ্ধে আমরা যুদ্ধ করিব যে নিজকে আল্লাহ্ নবী বলিয়া দাবি করে। ইহা শুনিবামাত্র তাহার হৃদয়ে ইসলামের জযবা সৃষ্টি হয়। সে তাহার সকল বকরীসহ রাসূলুল্লাহ (স)-এর নিকট চলিয়া আসে এবং প্রশ্ন করে, আপনি কি বলেন এবং দাওয়াত দেন? তিনি জওয়াব দিলেন: আমি দীন ইসলাম গ্রহণের আহ্বান জানাই এবং এই দাওয়াত দেই যে, আল্লাহ ব্যতীত আর কাহারও দাসত্ব করিও না এবং আমি আল্লাহর প্রেরিত রাসূল। সে বলিল, আমি যদি আল্লাহতে বিশ্বাস স্থাপন করি এবং আপনার নবুওয়াত স্বীকার করি তাহা হইলে কি হইবে এবং ঐসব বকরী যাহা আমার নিকট আমানত রাখা হইয়াছে আমি ঐগুলি কি করিব? রাসূলুল্লাহ (স) বলিলেন: দুর্গের নিকটবর্তী হইয়া সকল বকরীকে তাড়া কর এবং ঢিল নিক্ষেপ কর যাহাতে সকল বকরী নিজ নিজ মালিকের নিকট চলিয়া যায়।
অন্য একট বর্ণনায় রহিয়াছে যে, সে বলিল, হে আল্লাহর রাসূল! আমি একজন কৃষ্ণকায় ব্যক্তি, আমার চেহারা কুৎসিত, শরীর হইতে দুর্গন্ধ বাহির হয় এবং আমর নিকট কোন সম্পদও নাই। এই অবস্থায় আমি যদি আল্লাহ্র পথে যুদ্ধ করিয়া নিহত হই তাহা হইলে কি আমি জান্নাত পাইব? রাসূলুল্লাহ (স) জওয়াব দিলেন, হাঁ, জান্নাত পাইবে। তারপর সে যুদ্ধ করে এবং শাহাদত লাভ করে। তাহার লাশ রাসূলুল্লাহ (স)-এর নিকট নীত হইলে তিনি বলিলেন, আল্লাহ তাহার চেহারা উজ্জ্বল করিয়া দিয়াছেন, তাহার শরীর সুগন্ধযুক্ত করিয়াছেন এবং সে জান্নাতের দুইজন হুর প্রাপ্ত হইয়াছে। সে আল্লাহ্র পথে জিহাদ ব্যতীত আর কোন আমল করে নাই, এক ওয়াক্ত সালাতও আদায় করে নাই, কিন্তু ঈমান এবং সত্যবাদিতার ফলে সে এই মর্যাদা প্রাপ্ত হইয়াছে (আসাহহুস সিয়ার, পৃ. ১৮৮)।

কৃষ্ণকায় এক রাখালের ঘটনা সহীহ হাদীছসমূহে উদ্ধৃত হইয়াছে। ঘটনাটি এই দুর্গ বিজয়ের সময় সংঘটিত হয়। ইয়াহুদীগণ যখন যুদ্ধের প্রস্তুতি গ্রহণ করে তখন সে জিজ্ঞাসা করে, উহা কি ব্যাপার! তাহারা জবাব দেয়, ঐ ব্যক্তির বিরুদ্ধে আমরা যুদ্ধ করিব যে নিজকে আল্লাহ্ নবী বলিয়া দাবি করে। ইহা শুনিবামাত্র তাহার হৃদয়ে ইসলামের জযবা সৃষ্টি হয়। সে তাহার সকল বকরীসহ রাসূলুল্লাহ (স)-এর নিকট চলিয়া আসে এবং প্রশ্ন করে, আপনি কি বলেন এবং দাওয়াত দেন? তিনি জওয়াব দিলেন: আমি দীন ইসলাম গ্রহণের আহ্বান জানাই এবং এই দাওয়াত দেই যে, আল্লাহ ব্যতীত আর কাহারও দাসত্ব করিও না এবং আমি আল্লাহর প্রেরিত রাসূল। সে বলিল, আমি যদি আল্লাহতে বিশ্বাস স্থাপন করি এবং আপনার নবুওয়াত স্বীকার করি তাহা হইলে কি হইবে এবং ঐসব বকরী যাহা আমার নিকট আমানত রাখা হইয়াছে আমি ঐগুলি কি করিব? রাসূলুল্লাহ (স) বলিলেন: দুর্গের নিকটবর্তী হইয়া সকল বকরীকে তাড়া কর এবং ঢিল নিক্ষেপ কর যাহাতে সকল বকরী নিজ নিজ মালিকের নিকট চলিয়া যায়।
অন্য একট বর্ণনায় রহিয়াছে যে, সে বলিল, হে আল্লাহর রাসূল! আমি একজন কৃষ্ণকায় ব্যক্তি, আমার চেহারা কুৎসিত, শরীর হইতে দুর্গন্ধ বাহির হয় এবং আমর নিকট কোন সম্পদও নাই। এই অবস্থায় আমি যদি আল্লাহ্র পথে যুদ্ধ করিয়া নিহত হই তাহা হইলে কি আমি জান্নাত পাইব? রাসূলুল্লাহ (স) জওয়াব দিলেন, হাঁ, জান্নাত পাইব। তারপর সে যুদ্ধ করে এবং শাহাদত লাভ করে। তাহার লাশ রাসূলুল্লাহ (স)-এর নিকট নীত হইলে তিনি বলিলেন, আল্লাহ তাহার চেহারা উজ্জ্বল করিয়া দিয়াছেন, তাহার শরীর সুগন্ধযুক্ত করিয়াছেন এবং সে জান্নাতের দুইজন হুর প্রাপ্ত হইয়াছে। সে আল্লাহ্র পথে জিহাদ ব্যতীত আর কোন আমল করে নাই, এক ওয়াক্ত সালাতও আদায় করে নাই, কিন্তু ঈমান এবং সত্যবাদিতার ফলে সে এই মর্যাদা প্রাপ্ত হইয়াছে (আসাহহুস সিয়ার, পৃ. ১৮৮)।

কৃষ্ণকায় এক রাখালের ঘটনা সহীহ হাদীছসমূহে উদ্ধৃত হইয়াছে। ঘটনাটি এই দুর্গ বিজয়ের সময় সংঘটিত হয়। ইয়াহুদীগণ যখন যুদ্ধের প্রস্তুতি গ্রহণ করে তখন সে জিজ্ঞাসা করে, উহা কি ব্যাপার! তাহারা জবাব দেয়, ঐ ব্যক্তির বিরুদ্ধে আমরা যুদ্ধ করিব যে নিজকে আল্লাহ্ নবী বলিয়া দাবি করে। ইহা শুনিবামাত্র তাহার হৃদয়ে ইসলামের জযবা সৃষ্টি হয়। সে তাহার সকল বকরীসহ রাসূলুল্লাহ (স)-এর নিকট চলিয়া আসে এবং প্রশ্ন করে, আপনি কি বলেন এবং দাওয়াত দেন? তিনি জওয়াব দিলেন: আমি দীন ইসলাম গ্রহণের আহ্বান জানাই এবং এই দাওয়াত দেই যে, আল্লাহ ব্যতীত আর কাহারও দাসত্ব করিও না এবং আমি আল্লাহর প্রেরিত রাসূল। সে বলিল, আমি যদি আল্লাহতে বিশ্বাস স্থাপন করি এবং আপনার নবুওয়াত স্বীকার করি তাহা হইলে কি হইবে এবং ঐসব বকরী যাহা আমার নিকট আমানত রাখা হইয়াছে আমি ঐগুলি কি করিব? রাসূলুল্লাহ (স) বলিলেন: দুর্গের নিকটবর্তী হইয়া সকল বকরীকে তাড়া কর এবং ঢিল নিক্ষেপ কর যাহাতে সকল বকরী নিজ নিজ মালিকের নিকট চলিয়া যায়।
অন্য একট বর্ণনায় রহিয়াছে যে, সে বলিল, হে আল্লাহর রাসূল! আমি একজন কৃষ্ণকায় ব্যক্তি, আমার চেহারা কুৎসিত, শরীর হইতে দুর্গন্ধ বাহির হয় এবং আমর নিকট কোন সম্পদও নাই। এই অবস্থায় আমি যদি আল্লাহ্র পথে যুদ্ধ করিয়া নিহত হইয়া তাহা হইলে কি আমি জান্নাত পাইব? রাসূলুল্লাহ (স) জওয়াব দিলেন, হাঁ, জান্নাত পাইব। তারপর সে যুদ্ধ করে এবং শাহাদত লাভ করে। তাহার লাশ রাসূলুল্লাহ (স)-এর নিকট নীত হইলে তিনি বলিলেন, আল্লাহ তাহার চেহারা উজ্জ্বল করিয়া দিয়াছেন, তাহার শরীর সুগন্ধযুক্ত করিয়াছেন এবং সে জান্নাতের দুইজন হুর প্রাপ্ত হইয়াছে। সে আল্লাহ্র পথে জিহাদ ব্যতীত আর কোন আমল করে নাই, এক ওয়াক্ত সালাতও আদায় করে নাই, কিন্তু ঈমান এবং সত্যবাদিতার ফলে সে এই মর্যাদা প্রাপ্ত হইয়াছে (আসাহহুস সিয়ার, পৃ. ১৮৮)।

কৃষ্ণকায় এক রাখালের ঘটনা সহীহ হাদীছসমূহে উদ্ধৃত হইয়াছে। ঘটনাটি এই দুর্গ বিজয়ের সময় সংঘটিত হয়। ইয়াহুদীগণ যখন যুদ্ধের প্রস্তুতি গ্রহণ করে তখন সে জিজ্ঞাসা করে, উহা কি ব্যাপার! তাহারা জবাব দেয়, ঐ ব্যক্তির বিরুদ্ধে আমরা যুদ্ধ করিব যে নিজকে আল্লাহ্ নবী বলিয়া দাবি করে। ইহা শুনিবামাত্র তাহার হৃদয়ে ইসলামের জযবা সৃষ্টি হয়। সে তাহার সকল বকরীসহ রাসূলুল্লাহ (স)-এর নিকট চলিয়া আসে এবং প্রশ্ন করে, আপনি কি বলেন এবং দাওয়াত দেন? তিনি জওয়াব দিলেন: আমি দীন ইসলাম গ্রহণের আহ্বান জানাই এবং এই দাওয়াত দেই যে, আল্লাহ ব্যতীত আর কাহারও দাসত্ব করিও না এবং আমি আল্লাহর প্রেরিত রাসূল। সে বলিল, আমি যদি আল্লাহতে বিশ্বাস স্থাপন করি এবং আপনার নবুওয়াত স্বীকার করি তাহা হইলে কি হইবে এবং ঐসব বকরী যাহা আমার নিকট আমানত রাখা হইয়াছে আমি ঐগুলি কি করিব? রাসূলুল্লাহ (স) বলিলেন: দুর্গের নিকটবর্তী হইয়া সকল বকরীকে তাড়া কর এবং ঢিল নিক্ষেপ কর যাহাতে সকল বকরী নিজ নিজ মালিকের নিকট চলিয়া যায়।
অন্য একট বর্ণনায় রহিয়াছে যে, সে বলিল, হে আল্লাহর রাসূল! আমি একজন কৃষ্ণকায় ব্যক্তি, আমার চেহারা কুৎসিত, শরীর হইতে দুর্গন্ধ বাহির হয় এবং আমর নিকট কোন সম্পদও নাই। এই অবস্থায় আমি যদি আল্লাহ্র পথে যুদ্ধ করিয়া নিহত হই তাহা হইলে কি আমি জান্নাত পাইব? রাসূলুল্লাহ (স) জওয়াব দিলেন, হাঁ, জান্নাত পাইব। তারপর সে যুদ্ধ করে এবং শাহাদত লাভ করে। তাহার লাশ রাসূলুল্লাহ (স)-এর নিকট নীত হইলে তিনি বলিলেন, আল্লাহ তাহার চেহারা উজ্জ্বল করিয়া দিয়াছেন, তাহার শরীর সুগন্ধযুক্ত করিয়াছেন এবং সে জান্নাতের দুইজন হুর প্রাপ্ত হইয়াছে। সে আল্লাহ্র পথে জিহাদ ব্যতীত আর কোন আমল করে নাই, এক ওয়াক্ত সালাতও আদায় করে নাই, কিন্তু ঈমান এবং সত্যবাদিতার ফলে সে এই মর্যাদা প্রাপ্ত হইয়াছে (আসাহহুস সিয়ার, পৃ. ১৮৮)।

📘 সীরাত বিশ্বকোষ > 📄 জনৈক ইয়াহুদীর ইসলাম গ্রহণ

📄 জনৈক ইয়াহুদীর ইসলাম গ্রহণ


এক রাত্রিতে 'উমার ইবনু'ল-খাত্তাব (রা) সৈন্যবাহিনীর নিরাপত্তামূলক পাহারায় রত ছিলেন। রাসূলুল্লাহ (স) এইভাবে প্রতি রাত্রে মুসলিম বহিনীর প্রহরায় কোনও এক সাহাবীকে নিয়োজিত রাখিতেন। ঐ রাত্রে মুসলমানগণ এক ইয়াহুদীকে পাকড়াও করিয়া উমার (রা)-এর নিকট লইয়া আসিলেন। তিনি তাহাকে হত্যা করিবার আদেশ দিলেন। ইয়াহুদী ঐ সময় বলিল, আমাকে তোমাদের নবীর কাছে লইয়া চল। তাঁহার সহিত আমার একটি কথা আছে। 'উমার (রা) তাহাকে রাসূলুল্লাহ (স)-এর নিকট পৌঁছাইয়া দিলেন। সে রাসূলুল্লাহ (স)-কে বলিল, "আমাকে নিরাপত্তা দান করুন, হে আবুল কাসিম! তাহা হইলে আমি আপনার কাছে তথ্য উপস্থাপন করিব।" রাসূলুল্লাহ (স) তাহাকে নিরাপত্তা দান করিলেন। ইয়াহুদী বলিল, খায়বারবাসিগণ মুসলিম বাহিনীর ভয়ে খুবই সন্ত্রস্ত। বিশেষত আজিকার যুদ্ধের জন্য ইহারা খুবই ভয়-ভীতি বিহ্বল। তাহারা আজ রাত্রে শিক্ দুর্গে স্থানান্তরিত হইতে চায়। যুদ্ধাস্ত্র ও খাদ্য-পানীয় একটি গোপন স্থানে তাহারা লুকাইয়া রাখিয়াছে। আমি ঐ স্থানটি চিনি। আগামী কল্য যখন এই দুর্গ বিজিত হইবে তখন আমি আপনার অনুগত লোকদিগকে তাহা দেখাইয়া দিব।
রাসূলুল্লাহ (স) বলিলেন : ইনশাআল্লাহ তোমাকে নিরাপত্তা দেওয়া হইল। ইয়াহুদী বলিল, আমার পরিবার-পরিজন ঐ দুর্গে অবস্থানরত, ইহাদিগকেও ক্ষমা করিয়া দিন। রাসূলুল্লাহ (স) উহাদিগকেও ক্ষমা করিয়া দিলেন। পরবর্তী দিন নাতা অঞ্চল বিজিত হইল এবং ইহার দুর্গও বিজিত হইল। ইয়াহুদীটি নিজ পরিবার-পরিজনসহ ঈমান আনিল (মাদারিজুন নুবৃওয়া, উরদু অনুবাদ, ২খ., পৃ. ৪০৮)।

এক রাত্রিতে 'উমার ইবনু'ল-খাত্তাব (রা) সৈন্যবাহিনীর নিরাপত্তামূলক পাহারায় রত ছিলেন। রাসূলুল্লাহ (স) এইভাবে প্রতি রাত্রে মুসলিম বহিনীর প্রহরায় কোনও এক সাহাবীকে নিয়োজিত রাখিতেন। ঐ রাত্রে মুসলমানগণ এক ইয়াহুদীকে পাকড়াও করিয়া উমার (রা)-এর নিকট লইয়া আসিলেন। তিনি তাহাকে হত্যা করিবার আদেশ দিলেন। ইয়াহুদী ঐ সময় বলিল, আমাকে তোমাদের নবীর কাছে লইয়া চল। তাঁহার সহিত আমার একটি কথা আছে। 'উমার (রা) তাহাকে রাসূলুল্লাহ (স)-এর নিকট পৌঁছাইয়া দিলেন। সে রাসূলুল্লাহ (স)-কে বলিল, "আমাকে নিরাপত্তা দান করুন, হে আবুল কাসিম! তাহা হইলে আমি আপনার কাছে তথ্য উপস্থাপন করিব। রাসূলুল্লাহ (স) তাহাকে নিরাপত্তা দান করিলেন। ইয়াহুদী বলিল, খায়বারবাসিগণ মুসলিম বাহিনীর ভয়ে খুবই সন্ত্রস্ত। বিশেষত আজিকার যুদ্ধের জন্য ইহারা খুবই ভয়-ভীতি বিহ্বল। তাহারা আজ রাত্রে শিক্ দুর্গে স্থানান্তরিত হইতে চায়। যুদ্ধাস্ত্র ও খাদ্য-পানীয় একটি গোপন স্থানে তাহারা লুকাইয়া রাখিয়াছে। আমি ঐ স্থানটি চিনি। আগামী কল্য যখন এই দুর্গ বিজিত হইবে তখন আমি আপনার অনুগত লোকদিগকে তাহা দেখাইয়া দিব।
রাসূলুল্লাহ (স) বলিলেন : ইনশাআল্লাহ তোমাকে নিরাপত্তা দেওয়া হইল। ইয়াহুদী বলিল, আমার পরিবার-পরিজন ঐ দুর্গে অবস্থানরত, ইহাদিগকেও ক্ষমা করিয়া দিন। রাসূলুল্লাহ (স) উহাদিগকেও ক্ষমা করিয়া দিলেন। পরবর্তী দিন নাতা অঞ্চল বিজিত হইল এবং ইহার দুর্গও বিজিত হইল। ইয়াহুদীটি নিজ পরিবার-পরিজনসহ ঈমান আনিল (মাদারিজুন নুবৃওয়া, উরদু অনুবাদ, ২খ., পৃ. ৪০৮)।

এক রাত্রিতে 'উমার ইবনু'ল-খাত্তাব (রা) সৈন্যবাহিনীর নিরাপত্তামূলক পাহারায় রত ছিলেন। রাসূলুল্লাহ (স) এইভাবে প্রতি রাত্রে মুসলিম বহিনীর প্রহরায় কোনও এক সাহাবীকে নিয়োজিত রাখিতেন। ঐ রাত্রে মুসলমানগণ এক ইয়াহুদীকে পাকড়াও করিয়া উমার (রা)-এর নিকট লইয়া আসিলেন। তিনি তাহাকে হত্যা করিবার আদেশ দিলেন। ইয়াহুদী ঐ সময় বলিল, আমাকে তোমাদের নবীর কাছে লইয়া চল। তাঁহার সহিত আমার একটি কথা আছে। 'উমার (রা) তাহাকে রাসূলুল্লাহ (স)-এর নিকট পৌঁছাইয়া দিলেন। সে রাসূলুল্লাহ (স)-কে বলিল, "আমাকে নিরাপত্তা দান করুন, হে আবুল কাসিম! তাহা হইলে আমি আপনার কাছে তথ্য উপস্থাপন করিব। রাসূলুল্লাহ (স) তাহাকে নিরাপত্তা দান করিলেন। ইয়াহুদী বলিল, খায়বারবাসিগণ মুসলিম বাহিনীর ভয়ে খুবই সন্ত্রস্ত। বিশেষত আজিকার যুদ্ধের জন্য ইহারা খুবই ভয়-ভীতি বিহ্বল। তাহারা আজ রাত্রে শিক্ দুর্গে স্থানান্তরিত হইতে চায়। যুদ্ধাস্ত্র ও খাদ্য-পানীয় একটি গোপন স্থানে তাহারা লুকাইয়া রাখিয়াছে। আমি ঐ স্থানটি চিনি। আগামী কল্য যখন এই দুর্গ বিজিত হইবে তখন আমি আপনার অনুগত লোকদিগকে তাহা দেখাইয়া দিব।
রাসূলুল্লাহ (স) বলিলেন : ইনশাআল্লাহ তোমাকে নিরাপত্তা দেওয়া হইল। ইয়াহুদী বলিল, আমার পরিবার-পরিজন ঐ দুর্গে অবস্থানরত, ইহাদিগকেও ক্ষমা করিয়া দিন। রাসূলুল্লাহ (স) উহাদিগকেও ক্ষমা করিয়া দিলেন। পরবর্তী দিন নাতা অঞ্চল বিজিত হইল এবং ইহার দুর্গও বিজিত হইল। ইয়াহুদীটি নিজ পরিবার-পরিজনসহ ঈমান আনিল (মাদারিজুন নুবৃওয়া, উরদু অনুবাদ, ২খ., পৃ. ৪০৮)।

এক রাত্রিতে 'উমার ইবনু'ল-খাত্তাব (রা) সৈন্যবাহিনীর নিরাপত্তামূলক পাহারায় রত ছিলেন। রাসূলুল্লাহ (স) এইভাবে প্রতি রাত্রে মুসলিম বহিনীর প্রহরায় কোনও এক সাহাবীকে নিয়োজিত রাখিতেন। ঐ রাত্রে মুসলমানগণ এক ইয়াহুদীকে পাকড়াও করিয়া উমার (রা)-এর নিকট লইয়া আসিলেন। তিনি তাহাকে হত্যা করিবার আদেশ দিলেন। ইয়াহুদী ঐ সময় বলিল, আমাকে তোমাদের নবীর কাছে লইয়া চল। তাঁহার সহিত আমার একটি কথা আছে। 'উমার (রা) তাহাকে রাসূলুল্লাহ (স)-এর নিকট পৌঁছাইয়া দিলেন। সে রাসূলুল্লাহ (স)-কে বলিল, "আমাকে নিরাপত্তা দান করুন, হে আবুল কাসিম! তাহা হইলে আমি আপনার কাছে তথ্য উপস্থাপন করিব। রাসূলুল্লাহ (স) তাহাকে নিরাপত্তা দান করিলেন। ইয়াহুদী বলিল, খায়বারবাসিগণ মুসলিম বাহিনীর ভয়ে খুবই সন্ত্রস্ত। বিশেষত আজিকার যুদ্ধের জন্য ইহারা খুবই ভয়-ভীতি বিহ্বল। তাহারা আজ রাত্রে শিক্ দুর্গে স্থানান্তরিত হইতে চায়। যুদ্ধাস্ত্র ও খাদ্য-পানীয় একটি গোপন স্থানে তাহারা লুকাইয়া রাখিয়াছে। আমি ঐ স্থানটি চিনি। আগামী কল্য যখন এই দুর্গ বিজিত হইবে তখন আমি আপনার অনুগত লোকদিগকে তাহা দেখাইয়া দিব।
রাসূলুল্লাহ (স) বলিলেন : ইনশাআল্লাহ তোমাকে নিরাপত্তা দেওয়া হইল। ইয়াহুদী বলিল, আমার পরিবার-পরিজন ঐ দুর্গে অবস্থানরত, ইহাদিগকেও ক্ষমা করিয়া দিন। রাসূলুল্লাহ (স) উহাদিগকেও ক্ষমা করিয়া দিলেন। পরবর্তী দিন নাতা অঞ্চল বিজিত হইল এবং ইহার দুর্গও বিজিত হইল। ইয়াহুদীটি নিজ পরিবার-পরিজনসহ ঈমান আনিল (মাদারিজুন নুবৃওয়া, উরদু অনুবাদ, ২খ., পৃ. ৪০৮)।

📘 সীরাত বিশ্বকোষ > 📄 সা'আব দুর্গ আক্রমণ ও আমের ইবনুল আকওয়া (রা)-এর শাহাদাতবরণ

📄 সা'আব দুর্গ আক্রমণ ও আমের ইবনুল আকওয়া (রা)-এর শাহাদাতবরণ


ইহার পর সা'আব দুর্গ অবরোধ করা হয়। ইয়াহুদীদের নেতা মারহাব অগ্রসর হইয়া সম্মুখ সমরের আহ্বান জানায়। 'আমের ইবনুল আকওয়া, যিনি কবিতা আবৃত্তি করিলে রাসূলুল্লাহ (স) "ইয়ারহামুকাল্লাহ” বলিয়া দু'আ করিয়াছিলেন, তিনি মুকাবিলায় অগ্রসর হন। মারহাব তাহার তরবারি দ্বারা তাহাকে আঘাত করিলে তিনি স্বীয় ঢালের সহায়তায় আত্মরক্ষা করেন। তাহার তরবারি 'আমের (রা)-এর ঢালে আটকা পড়ে। অতঃপর 'আমের (রা) শত্রুর পা লক্ষ্য করিয়া তরবারির আঘাত হানেন। কিন্তু তরবারি শত্রুর পা পর্যন্ত পৌঁছায় নাই এবং হেচকা টানের কারণে তাহার তরবারি তাহার স্বীয় উরু বা হাঁটুতে সজোরে আঘাত করে। ফলে তিনি শহীদ হন। এই ঘটনার পর সালামা ইবনুল আকওয়া (রা) কাঁদিতে কাঁদিতে রাসূলুল্লাহ (স)-এর নিকট আসেন। রাসূলুল্লাহ (স) তাঁহার অশ্রুপাতের কারণ জিজ্ঞাসা করিলেন। তিনি বলিলেন, সাহাবীগণ বলিতেছেন, 'আমেরের সকল আমল ব্যর্থ হইয়া গিয়াছে। কারণ তিনি স্বীয় তরবারির আঘাতে নিহত হইয়াছেন। রাসূলুল্লাহ (স) বলিলেনঃ তাহারা ভুল বলিতেছে। সে জিহাদ করিয়াছে; সে আল্লাহ্ পথের একজন মুজাহিদ। তিনি আমের (রা)-এর জানাযা পড়েন এবং সাহাবীগণও তাঁহার সহিত জানাযা পড়েন।
ইবন ইসহাক বলেন, বন্ সুহায়ম গোত্রের লোকজন পূর্বেই ইসলাম গ্রহণ করিয়াছিল। তাহারা রাসূলুল্লাহ (স)-এর খিদমতে উপস্থিত হইয়া বলিল, হে আল্লাহ্র রাসূল! আমরা ক্ষুধার তাড়নায় আর স্থির থাকিতে পারিতেছি না। আমাদের মৃত্যুর উপক্রম হইয়াছে। আমাদের নিকট খাদ্য বলিতে কিছুই নাই। এদিকে রাসূলুল্লাহ (স)-এর নিকটও তাহাদিগকে দেওয়ার মত কোন জিনিস ছিল না। তিনি আল্লাহর দরবারে দু'জা করিলেন, "হে জগতের প্রতিপালক! তুমি এই অভাবী লোকজনের অবস্থা সম্পর্কে অবগত এবং আমার নিকটও তাহাদিগকে দেওয়ার মত কিছুই নাই। হে প্রভু! তুমি আমাদের হস্তে এমন একটি দুর্গের পতন ঘটাও যাহাতে ঐ অভাবীদের দুর্দশা লাঘব হয়।" ইহার পরই সা'আব দুর্গ বিজিত হয়, সেখানে রসদপত্রের বিপুল সম্ভার মওজুদ ছিল (আসাহহুস সিয়ার, পৃ. ৮৯)।
মহান আল্লাহর দরবারে দু'আ করিবার পর রাসূলুল্লাহ (স) যুদ্ধের পতাকাটি মুনযির ইবনুল খাব্বাব (রা)-কে দান করিলেন। ইসলামী বাহিনী অতর্কিত অক্রমণ করিল এবং স্বয়ং তিনি সা'আব দুর্গের দ্বারপ্রান্তে চলিয়া গিয়া যুদ্ধে ঝাঁপাইয়া পড়িলেন। এইভাবেই সা'আব দুর্গ বিজিত হয়। এই দুর্গে লব্ধ প্রচুর খাদ্যদ্রব্য নিয়া আসা হইল এবং প্রচুর পরিমাণ মদ মাটিতে ঢালিয়া দেওয়া হইল। 'আবদুল্লাহ ইব্‌ন হিমার (রা) নামক জনৈক মুসলমান মাঝেমধ্যে সূরা পানে আসক্ত ছিলেন। ঐ দিন তিনি খায়বারবাসীদের সুরা হইতে কয়েক চুমুক পান করিলেন। রাসূলুল্লাহ (স) তাহাকে সুরাপানে বিরত থাকার নসীহত করিলেন, কিন্তু সাহাবীগণ তাহাকে ভর্ৎসনা করিতে লাগিলেন। ভর্সনাকারীদের মধ্যে উমার ইবনুল খাত্তাবও ছিলেন। রাসূলুল্লাহ (স) বলিলেন, হে উমার! তাহাকে ভর্ৎসনা করিও না। কারণ সে আল্লাহ ও আল্লাহ্র রাসূলকে ভালবাসে। এই ঘটনাটি মদ চূড়ান্তভাবে হারাম হওয়ার পূর্বের (মাদারিজুন নুবৃওয়া, উরদূ অনুবাদ, ২খ., ৪১০)।

ইহার পর সা'আব দুর্গ অবরোধ করা হয়। ইয়াহুদীদের নেতা মারহাব অগ্রসর হইয়া সম্মুখ সমরের আহ্বান জানায়। 'আমের ইবনুল আকওয়া, যিনি কবিতা আবৃত্তি করিলে রাসূলুল্লাহ (স) "ইয়ারহামুকাল্লাহ” বলিয়া দু'আ করিয়াছিলেন, তিনি মুকাবিলায় অগ্রসর হন। মারহাব তাহার তরবারি দ্বারা তাহাকে আঘাত করিলে তিনি স্বীয় ঢালের সহায়তায় আত্মরক্ষা করেন। তাহার তরবারি 'আমের (রা)-এর ঢালে আটকা পড়ে। অতঃপর 'আমের (রা) শত্রুর পা লক্ষ্য করিয়া তরবারির আঘাত হানেন। কিন্তু তরবারি শত্রুর পা পর্যন্ত পৌঁছায় নাই এবং হেচকা টানের কারণে তাহার তরবারি তাহার স্বীয় উরু বা হাঁটুতে সজোরে আঘাত করে। ফলে তিনি শহীদ হন। এই ঘটনার পর সালামা ইবনুল আকওয়া (রা) কাঁদিতে কাঁদিতে রাসূলুল্লাহ (স)-এর নিকট আসেন। রাসূলুল্লাহ (স) তাঁহার অশ্রুপাতের কারণ জিজ্ঞাসা করিলেন। তিনি বলিলেন, সাহাবীগণ বলিতেছেন, 'আমেরের সকল আমল ব্যর্থ হইয়া গিয়াছে। কারণ তিনি স্বীয় তরবারির আঘাতে নিহত হইয়াছেন। রাসূলুল্লাহ (স) বলিলেনঃ তাহারা ভুল বলিতেছে। সে জিহাদ করিয়াছে; সে আল্লাহ্ পথের একজন মুজাহিদ। তিনি আমের (রা)-এর জানাযা পড়েন এবং সাহাবীগণও তাঁহার সহিত জানাযা পড়েন।
ইবন ইসহাক বলেন, বন্ সুহায়ম গোত্রের লোকজন পূর্বেই ইসলাম গ্রহণ করিয়াছিল। তাহারা রাসূলুল্লাহ (স)-এর খিদমতে উপস্থিত হইয়া বলিল, হে আল্লাহ্র রাসূল! আমরা ক্ষুধার তাড়নায় আর স্থির থাকিতে পারিতেছি না। আমাদের মৃত্যুর উপক্রম হইয়াছে। আমাদের নিকট খাদ্য বলিতে কিছুই নাই। এদিকে রাসূলুল্লাহ (স)-এর নিকটও তাহাদিগকে দেওয়ার মত কোন জিনিস ছিল না। তিনি আল্লাহর দরবারে দু'জা করিলেন, "হে জগতের প্রতিপালক! তুমি এই অভাবী লোকজনের অবস্থা সম্পর্কে অবগত এবং আমার নিকটও তাহাদিগকে দেওয়ার মত কিছুই নাই। হে প্রভু! তুমি আমাদের হস্তে এমন একটি দুর্গের পতন ঘটাও যাহাতে ঐ অভাবীদের দুর্দশা লাঘব হয়।" ইহার পরই সা'আব দুর্গ বিজিত হয়, সেখানে রসদপত্রের বিপুল সম্ভার মওজুদ ছিল (আসাহহুস সিয়ার, পৃ. ৮৯)।
মহান আল্লাহর দরবারে দু'আ করিবার পর রাসূলুল্লাহ (স) যুদ্ধের পতাকাটি মুনযির ইবনুল খাব্বাব (রা)-কে দান করিলেন। ইসলামী বাহিনী অতর্কিত অক্রমণ করিল এবং স্বয়ং তিনি সা'আব দুর্গের দ্বারপ্রান্তে চলিয়া গিয়া যুদ্ধে ঝাঁপাইয়া পড়িলেন। এইভাবেই সা'আব দুর্গ বিজিত হয়। এই দুর্গে লব্ধ প্রচুর খাদ্যদ্রব্য নিয়া আসা হইল এবং প্রচুর পরিমাণ মদ মাটিতে ঢালিয়া দেওয়া হইল। 'আবদুল্লাহ ইব্‌ন হিমার (রা) নামক জনৈক মুসলমান মাঝেমধ্যে সূরা পানে আসক্ত ছিলেন। ঐ দিন তিনি খায়বারবাসীদের সুরা হইতে কয়েক চুমুক পান করিলেন। রাসূলুল্লাহ (স) তাহাকে সুরাপানে বিরত থাকার নসীহত করিলেন, কিন্তু সাহাবীগণ তাহাকে ভর্ৎসনা করিতে লাগিলেন। ভর্সনাকারীদের মধ্যে উমার ইবনুল খাত্তাবও ছিলেন। রাসূলুল্লাহ (স) বলিলেন, হে উমার! তাহাকে ভর্ৎসনা করিও না। কারণ সে আল্লাহ ও আল্লাহ্র রাসূলকে ভালবাসে। এই ঘটনাটি মদ চূড়ান্তভাবে হারাম হওয়ার পূর্বের (মাদারিজুন নুবৃওয়া, উরদূ অনুবাদ, ২খ., ৪১০)।

ইহার পর সা'আব দুর্গ অবরোধ করা হয়। ইয়াহুদীদের নেতা মারহাব অগ্রসর হইয়া সম্মুখ সমরের আহ্বান জানায়। 'আমের ইবনুল আকওয়া, যিনি কবিতা আবৃত্তি করিলে রাসূলুল্লাহ (স) "ইয়ারহামুকাল্লাহ” বলিয়া দু'আ করিয়াছিলেন, তিনি মুকাবিলায় অগ্রসর হন। মারহাব তাহার তরবারি দ্বারা তাহাকে আঘাত করিলে তিনি স্বীয় ঢালের সহায়তায় আত্মরক্ষা করেন। তাহার তরবারি 'আমের (রা)-এর ঢালে আটকা পড়ে। অতঃপর 'আমের (রা) শত্রুর পা লক্ষ্য করিয়া তরবারির আঘাত হানেন। কিন্তু তরবারি শত্রুর পা পর্যন্ত পৌঁছায় নাই এবং হেচকা টানের কারণে তাহার তরবারি তাহার স্বীয় উরু বা হাঁটুতে সজোরে আঘাত করে। ফলে তিনি শহীদ হন। এই ঘটনার পর সালামা ইবনুল আকওয়া (রা) কাঁদিতে কাঁদিতে রাসূলুল্লাহ (স)-এর নিকট আসেন। রাসূলুল্লাহ (স) তাঁহার অশ্রুপাতের কারণ জিজ্ঞাসা করিলেন। তিনি বলিলেন, সাহাবীগণ বলিতেছেন, 'আমেরের সকল আমল ব্যর্থ হইয়া গিয়াছে। কারণ তিনি স্বীয় তরবারির আঘাতে নিহত হইয়াছেন। রাসূলুল্লাহ (স) বলিলেনঃ তাহারা ভুল বলিতেছে। সে জিহাদ করিয়াছে; সে আল্লাহ্ পথের একজন মুজাহিদ। তিনি আমের (রা)-এর জানাযা পড়েন এবং সাহাবীগণও তাঁহার সহিত জানাযা পড়েন।
ইবন ইসহাক বলেন, বন্ সুহায়ম গোত্রের লোকজন পূর্বেই ইসলাম গ্রহণ করিয়াছিল। তাহারা রাসূলুল্লাহ (স)-এর খিদমতে উপস্থিত হইয়া বলিল, হে আল্লাহ্র রাসূল! আমরা ক্ষুধার তাড়নায় আর স্থির থাকিতে পারিতেছি না। আমাদের মৃত্যুর উপক্রম হইয়াছে। আমাদের নিকট খাদ্য বলিতে কিছুই নাই। এদিকে রাসূলুল্লাহ (স)-এর নিকটও তাহাদিগকে দেওয়ার মত কোন জিনিস ছিল না। তিনি আল্লাহর দরবারে দু'জা করিলেন, "হে জগতের প্রতিপালক! তুমি এই অভাবী লোকজনের অবস্থা সম্পর্কে অবগত এবং আমার নিকটও তাহাদিগকে দেওয়ার মত কিছুই নাই। হে প্রভু! তুমি আমাদের হস্তে এমন একটি দুর্গের পতন ঘটাও যাহাতে ঐ অভাবীদের দুর্দশা লাঘব হয়।" ইহার পরই সা'আব দুর্গ বিজিত হয়, সেখানে রসদপত্রের বিপুল সম্ভার মওজুদ ছিল (আসাহহুস সিয়ার, পৃ. ৮৯)।
মহান আল্লাহর দরবারে দু'আ করিবার পর রাসূলুল্লাহ (স) যুদ্ধের পতাকাটি মুনযির ইবনুল খাব্বাব (রা)-কে দান করিলেন। ইসলামী বাহিনী অতর্কিত অক্রমণ করিল এবং স্বয়ং তিনি সা'আব দুর্গের দ্বারপ্রান্তে চলিয়া গিয়া যুদ্ধে ঝাঁপাইয়া পড়িলেন। এইভাবেই সা'আব দুর্গ বিজিত হয়। এই দুর্গে লব্ধ প্রচুর খাদ্যদ্রব্য নিয়া আসা হইল এবং প্রচুর পরিমাণ মদ মাটিতে ঢালিয়া দেওয়া হইল। 'আবদুল্লাহ ইব্‌ن হিমার (রা) নামক জনৈক মুসলমান মাঝেমধ্যে সূরা পানে আসক্ত ছিলেন। ঐ দিন তিনি খায়বারবাসীদের সুরা হইতে কয়েক চুমুক পান করিলেন। রাসূলুল্লাহ (স) তাহাকে সুরাপানে বিরত থাকার নসীহত করিলেন, কিন্তু সাহাবীগণ তাহাকে ভর্ৎসনা করিতে লাগিলেন। ভর্সনাকারীদের মধ্যে উমার ইবনুল খাত্তাবও ছিলেন। রাসূলুল্লাহ (স) বলিলেন, হে উমার! তাহাকে ভর্ৎসনা করিও না। কারণ সে আল্লাহ ও আল্লাহ্র রাসূলকে ভালবাসে। এই ঘটনাটি মদ চূড়ান্তভাবে হারাম হওয়ার পূর্বের (মাদারিজুন নুবৃওয়া, উরদূ অনুবাদ, ২খ., ৪১০)।

ইহার পর সা'আব দুর্গ অবরোধ করা হয়। ইয়াহুদীদের নেতা মারহাব অগ্রসর হইয়া সম্মুখ সমরের আহ্বান জানায়। 'আমের ইবনুল আকওয়া, যিনি কবিতা আবৃত্তি করিলে রাসূলুল্লাহ (স) "ইয়ারহামুকাল্লাহ” বলিয়া দু'আ করিয়াছিলেন, তিনি মুকাবিলায় অগ্রসর হন। মারহাব তাহার তরবারি দ্বারা তাহাকে আঘাত করিলে তিনি স্বীয় ঢালের সহায়তায় আত্মরক্ষা করেন। তাহার তরবারি 'আমের (রা)-এর ঢালে আটকা পড়ে। অতঃপর 'আমের (রা) শত্রুর পা লক্ষ্য করিয়া তরবারির আঘাত হানেন। কিন্তু তরবারি শত্রুর পা পর্যন্ত পৌঁছায় নাই এবং হেচকা টানের কারণে তাহার তরবারি তাহার স্বীয় উরু বা হাঁটুতে সজোরে আঘাত করে। ফলে তিনি শহীদ হন। এই ঘটনার পর সালামা ইবনুল আকওয়া (রা) কাঁদিতে কাঁদিতে রাসূলুল্লাহ (স)-এর নিকট আসেন। রাসূলুল্লাহ (স) তাঁহার অশ্রুপাতের কারণ জিজ্ঞাসা করিলেন। তিনি বলিলেন, সাহাবীগণ বলিতেছেন, 'আমেরের সকল আমল ব্যর্থ হইয়া গিয়াছে। কারণ তিনি স্বীয় তরবারির আঘাতে নিহত হইয়াছেন। রাসূলুল্লাহ (স) বলিলেনঃ তাহারা ভুল বলিতেছে। সে জিহাদ করিয়াছে; সে আল্লাহ্ পথের একজন মুজাহিদ। তিনি আমের (রা)-এর জানাযা পড়েন এবং সাহাবীগণও তাঁহার সহিত জানাযা পড়েন।
ইবন ইসহাক বলেন, বন্ সুহায়ম গোত্রের লোকজন পূর্বেই ইসলাম গ্রহণ করিয়াছিল। তাহারা রাসূলুল্লাহ (স)-এর খিদমতে উপস্থিত হইয়া বলিল, হে আল্লাহ্র রাসূল! আমরা ক্ষুধার তাড়নায় আর স্থির থাকিতে পারিতেছি না। আমাদের মৃত্যুর উপক্রম হইয়াছে। আমাদের নিকট খাদ্য বলিতে কিছুই নাই। এদিকে রাসূলুল্লাহ (স)-এর নিকটও তাহাদিগকে দেওয়ার মত কোন জিনিস ছিল না। তিনি আল্লাহর দরবারে দু'জা করিলেন, "হে জগতের প্রতিপালক! তুমি এই অভাবী লোকজনের অবস্থা সম্পর্কে অবগত এবং আমার নিকটও তাহাদিগকে দেওয়ার মত কিছুই নাই। হে প্রভু! তুমি আমাদের হস্তে এমন একটি দুর্গের পতন ঘটাও যাহাতে ঐ অভাবীদের দুর্দশা লাঘব হয়।" ইহার পরই সা'আব দুর্গ বিজিত হয়, সেখানে রসদপত্রের বিপুল সম্ভার মওজুদ ছিল (আসাহহুস সিয়ার, পৃ. ৮৯)।
মহান আল্লাহর দরবারে দু'আ করিবার পর রাসূলুল্লাহ (স) যুদ্ধের পতাকাটি মুনযির ইবনুল খাব্বাব (রা)-কে দান করিলেন। ইসলামী বাহিনী অতর্কিত অক্রমণ করিল এবং স্বয়ং তিনি সা'আব দুর্গের দ্বারপ্রান্তে চলিয়া গিয়া যুদ্ধে ঝাঁপাইয়া পড়িলেন। এইভাবেই সা'আব দুর্গ বিজিত হয়। এই দুর্গে লব্ধ প্রচুর খাদ্যদ্রব্য নিয়া আসা হইল এবং প্রচুর পরিমাণ মদ মাটিতে ঢালিয়া দেওয়া হইল। 'আবদুল্লাহ ইব্‌ন হিমার (রা) নামক জনৈক মুসলমান মাঝেমধ্যে সূরা পানে আসক্ত ছিলেন। ঐ দিন তিনি খায়বারবাসীদের সুরা হইতে কয়েক চুমুক পান করিলেন। রাসূলুল্লাহ (স) তাহাকে সুরাপানে বিরত থাকার নসীহত করিলেন, কিন্তু সাহাবীগণ তাহাকে ভর্ৎসনা করিতে লাগিলেন। ভর্সনাকারীদের মধ্যে উমার ইবনুল খাত্তাবও ছিলেন। রাসূলুল্লাহ (স) বলিলেন, হে উমার! তাহাকে ভর্ৎসনা করিও না। কারণ সে আল্লাহ ও আল্লাহ্র রাসূলকে ভালবাসে। এই ঘটনাটি মদ চূড়ান্তভাবে হারাম হওয়ার পূর্বের (মাদারিজুন নুবৃওয়া, উরদূ অনুবাদ, ২খ., ৪১০)।

📘 সীরাত বিশ্বকোষ > 📄 কামূস দুর্গ

📄 কামূস দুর্গ


কামূস দুর্গ যখন অবরোধ করা হয় তখন রাসূলুল্লাহ (স) প্রচন্ড শিরপীড়ায় আক্রান্ত ছিলেন। ফলে রণাঙ্গনে অংশগ্রহণ করিতে পারেন নাই। সুতরাং এই অবস্থায় মুহাজির কিংবা আনসারদের মধ্য হইতে একজনকে তিনি সেনাপতি নিযুক্ত করিতেন। ইহা ছিল সর্বাপেক্ষা অধিক শক্তিশালী ও দুর্জয় কিল্লা। ফলে অবরোধ দীর্ঘস্থায়ী হয় এবং বিজয় বিলম্বিত হইতে থাকে। একদিন রণাঙ্গনে আবু বকর সিদ্দীক (রা) গমন করেন এবং দুর্গ বিজয়ের আপ্রাণ চেষ্টা করেন, কিন্তু দুর্গ জয় হইল না। রাসূলুল্লাহ (স) ঘোষণা করেন, আগামী কল্য আমি রণাঙ্গনের পতাকা এমন এক ব্যক্তির হাতে তুলিয়া দিব অথবা বলিলেন, আগামী কল্য এমন এক ব্যক্তি পতাকা গ্রহণ করিবে যে আল্লাহ ও রাসূল (স)-কে ভালবাসে এবং আল্লাহ ও রাসূলও তাহাকে ভালবাসেন। তাহাকেই মহান আল্লাহ এই দুর্গ বিজয়ের গৌরব প্রদান করিবেন।
সকল সাহাবী রাত্রিতে পরস্পর আলোচনা করেন যে, কাহার ভাগ্যে আগামী কল্য রণ-পতাকা জুটিবে? সকালে সাহাবীগণের সকলেই এই দুর্লভ ভাগ্যের প্রত্যাশায় রাসূলুল্লাহ (স)-এর নিকট আগমন করেন। তখন তিনি জিজ্ঞাসা করিলেন, 'আলী কোথায়? সকলে বলিলেন, চোখ উঠা রোগের কারণে তাহার চক্ষুতে দারুণ ব্যথা। তিনি আসিতে সক্ষম হইবেন না। রাসূলুল্লাহ (স) বলিলেন, তাহাকে ডাকিয়া আন। অতঃপর তিনি উপস্থিত হইলে রাসূলুল্লাহ (স) স্বীয় মুখ নিঃসৃত লালা তাহার চক্ষুতে লাগাইয়া দিলেন এবং আল্লাহর দরবারে দু'আ করিলেন। সঙ্গে সঙ্গে তাহার চক্ষু এমনভাবে নিরাময় হয় যেন পূর্বে কখনও চক্ষুর কোন রোগই ছিল না। অতঃপর 'আলী (রা)-কে সম্বোধন করিয়া বলিলেনঃ শত্রুর নিকট যাও। প্রথমে ইসলামের দা'ওয়াত দাও এবং আল্লাহর অধিকারসমূহ সম্পর্কে তাহাদিগকে বুঝাও। হে 'আলী! যদি তোমার মাধ্যমে এক ব্যক্তিও হিদায়াতপ্রাপ্ত হয়, তাহা হইলে উহা হইবে তোমার জন্য এক বিরাট নি'মত ও সাফল্য (আসাহহুস সিয়ার, পৃ. ১৯০)। আল-বিদায়া ওয়ান-নিহায়া গ্রন্থে ইমাম বুখারীর উক্ত বর্ণনার সাথে এই কথাও আছে, 'আলী বলিলেন, আমি কি রাসূলুল্লাহ (স) হইতে পিছনে পড়িয়া থাকিব? সুতরাং তিনি রাসূলুল্লাহ (স)-এর সহিত মিলিত হইলেন। (বুখারী, ২খ, ৬০৫)।
ইমাম নাসাঈ ও মুসলিম সূত্রে বর্ণিত এক হাদীছে আবূ হুরায়রা (রা) বলেন, রাসূলুল্লাহ (স) কর্তৃক উপরিউক্ত ঘোষণা শ্রবণ করিবার পর উমার (রা) বলেনঃ আমি ঐ দিন ব্যতীত আর কোন দিনই নেতৃত্ব লাভের আকাঙ্খা করি নাই। রাসূলুল্লাহ (স) 'আলী (রা)-কে এই অভিযানে প্রেরণ করিয়া বলিলেনঃ "যাও, যুদ্ধ কর, যতক্ষণ না বিজয় লাভ করিবে, এদিক সেদিক দৃষ্টিপাত করিও না।” 'আলী (রা) বলিলেন, কতক্ষণ পর্যন্ত লড়াই করিব? রাসূলুল্লাহ (স) বলিলেনঃ ইহাদিগের সহিত লড়াই করিতে থাকিবে যেই পর্যন্ত না ইহারা সাক্ষী দিবে যে, আল্লাহ ব্যতীত কোন ইলাহ নাই এবং মুহাম্মাদ আল্লাহর বান্দা ও রাসূল। উহারা যখন এই সাক্ষ্য দিবে তখন আমাদিগের হাত হইতে তাহাদের রক্ত ও সম্পদ রক্ষা পাইবে (আল-বিদায়া ওয়ান-নিহায়া, ২/৪খ., পৃ. ২১)। দিহলাবী বলেন, 'আলী (রা) রাসূলুল্লাহ (স)-এর এই সুসংবাদ শুনিয়া আল্লাহ্র দরবারে দু'আ করিলেন:
اللَّهُمَّ لَا مَا نِعَ لِمَا أَعْطَيْتَ وَلَا مُعْطَى لِمَا مَنَعْتَ.
“হে আল্লাহ! তুমি যাহা দান করিবে উহা কেহই রোধ করিতে পারিবে না এবং তুমি দিতে না চাহিলে কেহ দিতে পারিবে না।"
প্রথমে চক্ষুর রোগজনিত কারণে 'আলী (রা) খায়বার অভিযানে অংশগ্রহণ হইতে বিরত ছিলেন। তিনি মনে মনে ভাবিতেন, আমি যুদ্ধে উপস্থিত না ইইয়া ভাল কাজ করি নাই। সুতরাং তিনি সফরের প্রস্তুতি লইয়া মদীনা হইতে রওয়ানা করিলেন। পথিমধ্যে অথবা খায়বার পৌঁছিবার পর রাসূলুল্লাহ (স) তাহার আগমনী বার্তা পাইলেন। পরবর্তী দিনের সূচনাপর্বে রাসূলুল্লাহ (স) বলিলেন, আলীকে ডাক। সাহাবীগণ বলিলেন, তিনি এখানেই আছেন, কিন্তু তাহার চক্ষুর অসুস্থতার কারণে তিনি কাছের বস্তুও দেখিতে পান না। আদেশ হইল, তাহাকে আমার নিকট লইয়া আস। সালামা ইবনুল আকওয়া (রা) জিয়া তাহাকে হাত ধরিয়া রাসূলুল্লাহ (স)-এর নিকট লইয়া আসিলেন। অতঃপর রাসূলুল্লাহ (স) তাহার মাথা নিজ উরুর উপর রাখিলেন এবং নিজ মুখের লালা তাহার চক্ষুতে লাগাইয়া দিলেন ও দু'আ করিলেন। এই সময় তাঁহার চক্ষু হইতে ব্যথা সম্পূর্ণ দূরীভূত হইয়া গেল। ইহার পর আর কোন দিনই তাঁহার চক্ষু ও মাথাব্যথা হয় নাই। একটি বর্ণনায় পাওয়া যায়, রাসূলুল্লাহ (স) এই দু'আ করিয়াছিলেন :
اللَّهُمَّ اذْهَبْ عَنْهُ الْحَرَّ وَالْقَرِّ.
"হে আল্লাহ! তাহাকে গরম ও ঠাণ্ডার প্রকোপ হইতে রক্ষা করিও”।
ইব্‌ন আবী লায়লা বলেন, ইহার ফলে 'আলী (রা) অসহনীয় গরমের দিনে পশমী কাপড় পরিতেন এবং হিমেল শীতে হালকা-পাতলা কাপড় পরিধান করিতেন। ইহাতে তাঁহার শারীরিক কোন ক্ষতি হইত না। 'আলী (রা) শারীরিকভাবে সুস্থ হইয়া উঠিবার পর রাসূলুল্লাহ (স) নিজের খাস বর্ম তাঁহাকে পরাইয়া দিলেন এবং যুল-ফিকার তাঁহার হস্তে তুলিয়া দিয়া বলিলেন, "যাও, পিছপা হইও না যতক্ষণ না তোমার হাতে দুর্গ বিজিত হয়"।
অতঃপর 'আলী (রা) সামরিক পতাকা হস্তে ধারণ করিয়া রওয়ানা হইলেন এবং উহা একটি প্রস্তরময় টিলায় স্থাপন করিলেন। জনৈক ইয়াহুদী শাস্ত্রক দুর্গের উপর দাঁড়াইয়া এই দৃশ্য অবলোকন করিয়া জিজ্ঞাসা করিল, ওহে পতাকাধারী ব্যক্তি! আপনি কে? আপনার নাম কি? তিনি বলিলেন, আমি 'আলী ইব্‌ন আবী তালিব। অতঃপর ঐ ব্যক্তি স্বগোত্রীয়দেরকে বলিল, "তাওরাতের শপথ! তোমরা এই ব্যক্তির নিকট পরাজয় বরণ করিবে। সে বিজয়লাভ ব্যতিরেকে প্রত্যাবর্তন করিবে না"। সে আলী (রা)-এর গুণাবলী ও বীরত্ব সম্পর্কে অবগত ছিল।
'আলী (রা)-এর বিরুদ্ধে দুর্গ হইতে সর্বপ্রথম বীর ইয়াহুদী মারহাবের ভাই হারিছ বাহির হইয়াছিল। তাহার বর্শা ছিল অত্যন্ত ভারী। বাহির হইবামাত্র সে যুদ্ধ আরম্ভ করিল এবং কয়েকজন মুসলমানকে শহীদ করিল। অতঃপর 'আলী (রা) তাহার নিকটে পৌছিয়া গেলেন এবং একটিমাত্র আঘাতে তাহাকে হত্যা করিলেন। মারহাব তাহার ভ্রাতার হত্যার খবর শুনিয়া খায়বারের বীরদিগের একটি দল লইয়া অস্ত্রে সজ্জিত হইয়া প্রতিশোধ লইতে বাহির হইল। কথিত আছে যে, মারহাব খায়বারবাসীদের মধ্যে অত্যন্ত পরাক্রমশালী সুস্বাস্থ্যের অধিকারী যুদ্ধবাজ ব্যক্তি ছিল। বীরত্বে সে খায়বারবাসীদের মধ্যে অপ্রতিদ্বন্দ্বী ছিল। ঐদিন সে দুইটি বর্ম পরিধান করিয়া দুইটি পাগড়ী মাথায় বাঁধিয়া দুইখানা তরবারি হস্তে লইয়া বীরদর্পে রণক্ষেত্রে নিম্নোক্ত কবিতাটি আবৃত্তি করিতে করিতে বাহির হয় :
قَدْ عَلِمَتْ خَيْبَرُ أَنِّي مَرْحَبُ + شَاكِي السَّلَاحِ بَطَلَ مُجَرِّبٌ.
"খায়বারবাসী জানে আমি মারহাব, যে রণনিপুণ এবং মহাবীর হিসাবে পরীক্ষিত"। 'আলী (রা) এতদশ্রবণে আবৃত্তি করিলেন:
أَنَا الَّذِي سَمَّتْنِي أَمِي حَيْدَرَهُ + ضَرْغَامُ أَجَامٍ وَكَيْتُ قَسْوَرَهُ.
"আমি সেই বীর যাহার মাতা তাহার নাম রাখিয়াছেন হায়দার। আমি গভীর বনের সিংহ" (মাদারিজুন-নুবুওয়াত, পৃ. ৪১৩, ৪১৪)।
'আলী (রা) ও মারহাব কর্তৃক আবৃত্তিকৃত এই কবিতা বিভিন্ন গ্রন্থে ভিন্ন ভিন্নভাবে উদ্ধৃত হইয়াছে। দানাপুরীর গ্রন্থে মারহাব আবৃত্তি করিতে করিতে বাহির হয় নিম্নরূপঃ أَنَا الَّذِي سَمَّتْنِي أُمِّي مَرَحَبٌ + شَاكِ السَّلَاحِ بَلْ مُجَرَّبٌ.
"আমি সেই বীর যাহার মাতা তাহার নাম রাখিয়াছেন মারহাব। যিনি রণনিপুণ এবং মহা বীরবর হিসাবে পরীক্ষিত”।
'আলী (রা) এতদশ্রবণে আবৃত্তি করিলেন: أَنَا الَّذِي سَمُتْنِي أُمِّي حَيْدَرَةَ + كَلَيْثِ غَابَاتِ كَرِيْهِ الْمَنْظَرَه.
"আমি সেই বীরবর যাহার মাতা তাহার নাম রাখিয়াছেন হায়দার, যে বন্য হিংস্র সিংহতুল্য এবং যাহার চেহারা অত্যন্ত ভয়ঙ্কর" (আসাহহুস সিয়ার, পৃ. ১৯১)।
ইব্‌ন কাছীর এই কবিতাদ্বয়ে আরও কিছু বৃদ্ধি করিয়া উল্লেখ করিয়াছেনঃ মারহাব এই কবিতা আবৃত্তি করিতে করিতে বাহির হইল: قَدْ عَلِمَتْ خَيْبَرُ أَنِّي مَرْحَب - شاك السلاح بَطَلَ مُجَرَّبٌ إِذَ اللُّبُوتُ أَقْبَلَتْ تَلَهَبْ - وَاحْجَمَتْ عَنْ صَولَةِ الْمُغَلَبِ.
উত্তরে আলী (রা) আবৃত্তি করিলেন: أنَا الَّذِي سَمَتْنِي أَمِّي حَيْدَرَهُ + كَلَيْتُ غَابَت شَدِيدٌ الْقَسْوَرَةَ اكيلُكُمْ بِالصَّاعِ كَيْلَ السَّنْدَرَةِ
(আল-বিদায়া ওয়ান-নিহায়া, ২/৪খ., পৃ. ১৮৮, ১৮৯)।
মারহাব সংকল্প করিল, সে আগেই 'আলী (রা)-এর মাথায় আঘাত হানিবে। কিন্তু 'আলী (রা) লাফ দিয়া উঠিয়া যুল-ফিকার দিয়া তাহার মাথায় এত জোরে আঘাত হানেন যে, বর্মসহ মারহাবের মাথা কাটিয় গলদেশ পর্যন্ত দ্বিখণ্ডিত হইয়া যায়। এক বর্ণনায় আছে, উরু পর্যন্ত দুই টুকরা হইয়া যায়। অপর এক বর্ণনায় আছে যে, তাহার বাহনের গদি পর্যন্ত দ্বিখণ্ডিত হইয়া যায়।
অতঃপর মুসলিম বাহিনী তাঁহার নেতৃত্বে রণক্ষেত্রে অবতরণ করিয়া ইয়াহুদীদিগকে হত্যা করিতে লাগিল। সাতজন ইয়াহুদী বীরকে ঐ সময় হত্যা করা হয়। অবশিষ্টরা পরাজয় মানিয়া দুর্গ অভ্যন্তরে প্রবেশ করিতে লাগিল। আলী (রা) তাহাদিগকে ধাওয়া করিয়া অগ্রসর হইতেছিলেন। এমতাবস্থায় জনৈক ইয়াহুদী তাঁহার হাতে আঘাত হানিল। ফলে তাঁহার ঢাল ভূমিতে পড়িয়া গেল এবং অপর এক ইয়াহুদী তাহা উঠাইয়া লইয়া পলায়ন করিল। এই প্রেক্ষিতে আলী (রা)-এর মধ্যে আল্লাহ্র পক্ষ হইতে এমনই রূহানী শক্তি সঞ্চারিত হইল যে, তিনি দুর্গ পার্শ্বস্থিত গর্ত অতিক্রম করিয়া একেবারে দুর্গের দরজায় পৌঁছিয়া গেলেন এবং লৌহ নির্মিত দরজার একাংশ উপড়াইয়া ইহাকে ঢাল বানাইয়া যুদ্ধ অব্যাহত রাখিলেন।
ইমাম বাকির হইতে বর্ণিত আছে যে, আলী (রা) যখন কপাট উপড়াইবার জন্য টান দেন তখন সমগ্র দুর্গ হেলিয়া উঠে। এমন কি সাফিয়্যা বিন্ত হুয়ায় ইব্‌ন আখতাৰ খাট হইতে পড়িয়া যান এবং মুখমণ্ডলে আঘাত পান।
সীরাতবিদগণ বলেন: যুদ্ধশেষে 'আলী (রা) বেশ দূরে এই দরজা নিক্ষেপ করিলেন। ইহাও কথিত আছে যে, যুদ্ধশেষে আটজন শক্তিশালী ব্যক্তি একত্রে মিলিত হইয়া দরজাটি উল্টাইতে পারেন নাই। এমনকি চল্লিশজন মিলিয়া উহা উঠাইতে চাহিলেন, কিন্তু সক্ষম হন নাই। মাদারিজুন নুবুওয়াতে আছে যে, দরজাটির ওজন ছিল আট মন। তবে কোন কোন সীরাতবিদের মতে এই বর্ণনাগুলি দুর্বল, অনুপযোগী। 'আল্লামা সাখাবী মাকাসিদে হাসানা গ্রন্থে বলিয়াছেন, كُلُّهَا وَاهْيَةً "এই সকল বর্ণনা অলীক” (শিবলী নু'মানী ও সুলায়মান নাদবী, সীরাতুন্নবী, ১৯৮৫ খৃ.)।
মোটকথা, যখন কামূস দুর্গসহ অন্যান্য দুর্গে অবস্থানকারিগণ 'আলী (রা)-এর এই শৌর্য-বীর্য দেখিল তখন তাহারা اَلْأَمَانُ الْأَمَانُ )নিরাপত্তা, নিরাপত্তা) বলিয়া ফরিয়াদ করিতে লাগিল। 'আলী (রা) তাহাদিগকে রাসূলুল্লাহ (স)-এর ইঙ্গিতে এই শর্তের উপর নিরাপত্তা দিলেন যে, প্রত্যেক ব্যক্তি উটের উপর খাদ্য বোঝাই করিয়া শহর ত্যাগ করিয়া চলিয়া যাইবে এবং নগদ মুদ্রা, সাজ-সরঞ্জাম ও অস্ত্রপাতি মুসলমানগণের জন্য রাখিয়া যাইবে। কোন জিনিস লুকাইয়া রাখিবে না। যদি এমন কোন জিনিস বাহির হয় যাহার তথ্য দেওয়া হয় নাই তাহা হইলে তাহাদের নিরাপত্তা প্রত্যাহর করা হইবে।
রাসূলুল্লাহ (স)-এর নিকট যখন বিজয় সংবাদ পৌছিল তখন তিনি ইহার জন্য আল্লাহর শোকর আদায় করিলেন। কারণ ইহা ছিল ইসলাম প্রসারের এক মহাসোপান। 'আলী (রা) রাসূলুল্লাহ (স)-এর দরবারে উপস্থিত হইলে তিনি স্বীয় তাঁবু হইতে বাহির হইয়া তাহাকে স্বাগত জানাইলেন, আলিঙ্গন করিলেন, চক্ষু যুগলের মধ্যবর্তী স্থান চুম্বন করিলেন এবং বলিলেন:
بَلَغَنِي تَنَاءَكَ الْمَشْكُورُ وَضِيْعَكَ الْمَذْكُورُ قَدْ رَضِيَ اللَّهُ عَنْهُ وَرَضِيْتُ أَنَا عَنْكَ.
"আমার নিকট তোমার কৃতজ্ঞতাপূর্ণ প্রশংসা পৌছিয়াছে, তোমার শৌর্য-বীর্ষের বর্ণনা করা হইয়াছে, আল্লাহ তাহার প্রতি সদয় হইয়াছেন এবং আমি তোমার উপর সন্তুষ্ট"।
তখন 'আলী (রা) কাঁদিতে লাগিলেন। রাসূলুল্লাহ (স) জিজ্ঞাসা করিলেন, ইহা কিসের কান্না, আনন্দের না বেদনার? 'আলী (রা) বলিলেন, ইহা আনন্দের কান্না। আপনি আমার উপর সন্তুষ্ট আছেন, ইহাতে কি আমি আনন্দিত হইব না? রাসূলুল্লাহ (স) বলিলেনঃ শুধু আমিই তোমার উপর খুশী নহি বরং আল্লাহ, জিবরীল, মীকাঈল এবং সকল ফেরেশতা তোমার উপর সন্তুষ্ট (মাদারিজুন নুবুওয়া, প্রাগুক্ত)।
ইব্‌ন কায়্যিম আল-জাওযিয়্যা (র) বলেন, সহীহ মুসলিমে এইভাবে উল্লেখ আছে যে, 'আলী (রা) মারহাবকে হত্যা করিয়াছেন। কিন্তু মূসা ইব্‌ন উকবা, ইমাম যুহরী ও আবুল আসওয়াদের উদ্ধৃতিতে এবং ইউনুস ইব্‌ন বুকায়র ইবন ইসহাক সূত্রে উল্লেখ করিয়াছেন যে, জাবির ইবন আবদিল্লাহ বর্ণনা করিয়াছেন যে, মারহাবকে মুহাম্মাদ ইবন মাসলামা (রা) হত্যা করেন। মারহাব যখন দুর্গের ভিতর হইতে বীরদর্পে বাহির হইয়া তাহার মুকাবিলার জন্য আহ্বান করে তখন রাসূলুল্লাহ (স) জিজ্ঞাসা করিলেন, তাহাকে মুকাবিলা করিতে কে প্রস্তুত আছ? মুহাম্মাদ ইবন মাসলামা (রা) বলিলেন, হে আল্লাহর রাসূল! আমি তাহার মুকাবিলায় প্রস্তুত। এই ব্যক্তি আমার ভ্রাতা (মাহমূদ ইব্‌ন মাসলামা)-কে গতকাল শহীদ করিয়াছে। রাসূলুল্লাহ (স) তাহাকে অনুমতি প্রদান করিলেন। তিনি যখন অগ্রসর হন তখন উভয়ের মধ্যবর্তী স্থানে একটি বৃক্ষ আড়াল হয়। উভয়ই একে অপরকে আঘাত হানার জন্য সুযোগের সন্ধান করিতে থাকেন। অবশেষে মুহাম্মাদ ইবন মাসলামা (রা) তাহাকে হত্যা করেন। সালামা ইব্‌ন সালামা ও মুজাম্মি' ইবন হারিছাও বলিয়াছেন যে, মুহাম্মাদ ইবন মাসলামা মারহাবকে হত্যা করেন।
ওয়াকিদী বলেন, মুহাম্মাদ ইবন মাসলামা (রা)-এর তরবারির আঘাতে মারহাবের দুই পা দ্বিখণ্ডিত হইয়া যায়। তারপর তিনি তাহাকে ছাড়িয়া দেন এবং বলেন, যন্ত্রণার স্বাদ উপভোগ কর, যেমন আমার ভ্রাতা যন্ত্রণা সহ্য করিয়াছে। তারপর আলী (রা) অগ্রসর হইয়া মারহাবের শিরোচ্ছেদ করেন। অতঃপর তিনি মারহাবের তরবারি এবং অন্যান্য আসবাবপত্র লইয়া রাসূলুল্লাহ (স)-এর নিকট আসিলেন। তাহারা দুইজন রাসূলুল্লাহ (স)-এর সম্মুখে মারহাবের পরিত্যক্ত আসবাবপত্রের মালিকানা লইয়া বিতর্কে জড়াইয়া পড়েন। রাসূলুল্লাহ (স) মুহাম্মাদ ইবন মাসলামাকে তাহার তরবারি, বর্শা ও শিরস্ত্রাণ ইত্যাদি সবকিছু দান করেন।
মারহাবের পর তাহার ভ্রাতা ইয়াসির অগ্রসর হয়। তাহার মুকাবিলার জন্য যুবায়র ইবনুল আওওয়াম (রা) অগ্রসর হন। এই সময় যুবায়রের মাতা সাফিয়্যা (রা) রাসূলুল্লাহ (স)-কে বলিলেন, হে আল্লাহর রাসূল! সে আমার পুত্রকে হত্যা করিয়া ফেলিবে। তিনি বলিলেনঃ না, তোমার পুত্র তাহাকে হত্যা করিবে। অবশেষে যুবায়র (রা) ইয়াসিরকে হত্যা করেন। কামূস দুর্গের অবরোধ প্রায় বিশদিন স্থায়ী ছিল। ইহা ছিল সর্বাধিক শক্তিশালী দুর্গ (যাদুল মা'আদ, ২খ., ১৩৪, ১৩৫; আত-তাবারী, তারীখুল উমাম ওয়াল-মুলুক, ২খ., ৯২, ৯৩)।
এই ব্যাপারে ইব্‌ন হাজার আসকালানী বলেন, ইমাম মুসলিম কর্তৃক বর্ণিত হাদীছের বিরোধিতা করেন অনেক সীরাতবিদ। ইবন ইসহাক, মূসা ইব্‌ন উকবা ও আল-ওয়াকিদী দৃঢ় প্রত্যয় ব্যক্ত করিয়াছেন যে, মারহাবকে যিনি হত্যা করিয়াছেন তিনি হইলেন মুহাম্মাদ ইব্‌ন মাসলামা। ইহার অনুকূলে ইমাম আহমাদ হাসান পর্যায়ের সনদে জাবির (রা) হইতে একটি হাদীছ বর্ণনা করিয়াছেন। কেহ কেহ বলেন, মুহাম্মাদ ইবন মাসলামা মারহাবের মুকাবিলা করিয়া তাহার দুইটি পা দ্বিখণ্ডিত করিয়াছিলেন। পরে আলী (রা) তাহাকে হত্যা করেন। কেহ কেহ বলেন, মুহাম্মাদ ইব্‌ন মাসলামা (রা) যাহাকে হত্যা করেন সে ছিল মারহাবের ভাই আল-হারিছ। কিন্তু কোন কোন বর্ণনাকারীর নিকট তাহা স্পষ্ট ছিল না। তাই এই বিভ্রান্তি ঘটিয়াছে। যদি এইরূপ না হইয়া থাকে তাহা হইলে মারহাবকে আলী (রা) হত্যা করিয়াছিলেন বলিয়া সহীহ মুসলিমে যে বর্ণনা রহিয়াছে তাহাকে অগ্রাধিকার দিতে হইবে (ফাতহুল বারী, ৭খ., ৪৮৭)।

কামূس দুর্গ যখন অবরোধ করা হয় তখন রাসূলুল্লাহ (স) প্রচন্ড শিরপীড়ায় আক্রান্ত ছিলেন। ফলে রণাঙ্গনে অংশগ্রহণ করিতে পারেন নাই। সুতরাং এই অবস্থায় মুহাজির কিংবা আনসারদের মধ্য হইতে একজনকে তিনি সেনাপতি নিযুক্ত করিতেন। ইহা ছিল সর্বাপেক্ষা অধিক শক্তিশালী ও দুর্জয় কিল্লা। ফলে অবরোধ দীর্ঘস্থায়ী হয় এবং বিজয় বিলম্বিত হইতে থাকে। একদিন রণাঙ্গনে আবু বকর সিদ্দীক (রা) গমন করেন এবং দুর্গ বিজয়ের আপ্রাণ চেষ্টা করেন, কিন্তু দুর্গ জয় হইল না। রাসূলুল্লাহ (স) ঘোষণা করেন, আগামী কল্য আমি রণাঙ্গনের পতাকা এমন এক ব্যক্তির হাতে তুলিয়া দিব অথবা বলিলেন, আগামী কল্য এমন এক ব্যক্তি পতাকা গ্রহণ করিবে যে আল্লাহ ও রাসূল (স)-কে ভালবাসে এবং আল্লাহ ও রাসূলও তাহাকে ভালবাসেন। তাহাকেই মহান আল্লাহ এই দুর্গ বিজয়ের গৌরব প্রদান করিবেন।
সকল সাহাবী রাত্রিতে পরস্পর আলোচনা করেন যে, কাহার ভাগ্যে আগামী কল্য রণ-পতাকা জুটিবে? সকালে সাহাবীগণের সকলেই এই দুর্লভ ভাগ্যের প্রত্যাশায় রাসূলুল্লাহ (স)-এর নিকট আগমন করেন। তখন তিনি জিজ্ঞাসা করিলেন, 'আলী কোথায়? সকলে বলিলেন, চোখ উঠা রোগের কারণে তাহার চক্ষুতে দারুণ ব্যথা। তিনি আসিতে সক্ষম হইবেন না। রাসূলুল্লাহ (স) বলিলেন, তাহাকে ডাকিয়া আন। অতঃপর তিনি উপস্থিত হইলে রাসূলুল্লাহ (স) স্বীয় মুখ নিঃসৃত লালা তাহার চক্ষুতে লাগাইয়া দিলেন এবং আল্লাহর দরবারে দু'আ করিলেন। সঙ্গে সঙ্গে তাহার চক্ষু এমনভাবে নিরাময় হয় যেন পূর্বে কখনও চক্ষুর কোন রোগই ছিল না। অতঃপর 'আলী (রা)-কে সম্বোধন করিয়া বলিলেনঃ শত্রুর নিকট যাও। প্রথমে ইসলামের দা'ওয়াত দাও এবং আল্লাহর অধিকারসমূহ সম্পর্কে তাহাদিগকে বুঝাও। হে 'আলী! যদি তোমার মাধ্যমে এক ব্যক্তিও হিদায়াতপ্রাপ্ত হয়, তাহা হইলে উহা হইবে তোমার জন্য এক বিরাট নি'মত ও সাফল্য (আসাহহুস সিয়ার, পৃ. ১৯০)। আল-বিদায়া ওয়ান-নিহায়া গ্রন্থে ইমাম বুখারীর উক্ত বর্ণনার সাথে এই কথাও আছে, 'আলী বলিলেন, আমি কি রাসূলুল্লাহ (স) হইতে পিছনে পড়িয়া থাকিব? সুতরাং তিনি রাসূলুল্লাহ (স)-এর সহিত মিলিত হইলেন। (বুখারী, ২খ, ৬০৫)।
ইমাম নাসাঈ ও মুসলিম সূত্রে বর্ণিত এক হাদীছে আবূ হুরায়রা (রা) বলেন, রাসূলুল্লাহ (স) কর্তৃক উপরিউক্ত ঘোষণা শ্রবণ করিবার পর উমার (রা) বলেনঃ আমি ঐ দিন ব্যতীত আর কোন দিনই নেতৃত্ব লাভের আকাঙ্খা করি নাই। রাসূলুল্লাহ (স) 'আলী (রা)-কে এই অভিযানে প্রেরণ করিয়া বলিলেনঃ "যাও, যুদ্ধ কর, যতক্ষণ না বিজয় লাভ করিবে, এদিক সেদিক দৃষ্টিপাত করিও না।” 'আলী (রা) বলিলেন, কতক্ষণ পর্যন্ত লড়াই করিব? রাসূলুল্লাহ (স) বলিলেনঃ ইহাদিগের সহিত লড়াই করিতে থাকিবে যেই পর্যন্ত না ইহারা সাক্ষী দিবে যে, আল্লাহ ব্যতীত কোন ইলাহ নাই এবং মুহাম্মাদ আল্লাহর বান্দা ও রাসূল। উহারা যখন এই সাক্ষ্য দিবে তখন আমাদিগের হাত হইতে তাহাদের রক্ত ও সম্পদ রক্ষা পাইবে (আল-বিদায়া ওয়ান-নিহায়া, ২/৪খ., ২১)। দিহলাবী বলেন, 'আলী (রা) রাসূলুল্লাহ (স)-এর এই সুসংবাদ শুনিয়া আল্লাহ্র দরবারে দু'আ করিলেন:
اللَّهُمَّ لَا مَا نِعَ لِمَا أَعْطَيْتَ وَلَا مُعْطَى لِمَا مَنَعْتَ.
“হে আল্লাহ! তুমি যাহা দান করিবে উহা কেহই রোধ করিতে পারিবে না এবং তুমি দিতে না চাহিলে কেহ দিতে পারিবে না।"
প্রথমে চক্ষুর রোগজনিত কারণে 'আলী (রা) খায়বার অভিযানে অংশগ্রহণ হইতে বিরত ছিলেন। তিনি মনে মনে ভাবিতেন, আমি যুদ্ধে উপস্থিত না ইইয়া ভাল কাজ করি নাই। সুতরাং তিনি সফরের প্রস্তুতি লইয়া মদীনা হইতে রওয়ানা করিলেন। পথিমধ্যে অথবা খায়বার পৌঁছিবার পর রাসূলুল্লাহ (স) তাহার আগমনী বার্তা পাইলেন। পরবর্তী দিনের সূচনাপর্বে রাসূলুল্লাহ (স) বলিলেন, আলীকে ডাক। সাহাবীগণ বলিলেন, তিনি এখানেই আছেন, কিন্তু তাহার চক্ষুর অসুস্থতার কারণে তিনি কাছের বস্তুও দেখিতে পান না। আদেশ হইল, তাহাকে আমার নিকট লইয়া আস। সালামা ইবনুল আকওয়া (রা) জিয়া তাহাকে হাত ধরিয়া রাসূলুল্লাহ (স)-এর নিকট লইয়া আসিলেন। অতঃপর রাসূলুল্লাহ (স) তাহার মাথা নিজ উরুর উপর রাখিলেন এবং নিজ মুখের লালা তাহার চক্ষুতে লাগাইয়া দিলেন ও দু'আ করিলেন। এই সময় তাঁহার চক্ষু হইতে ব্যথা সম্পূর্ণ দূরীভূত হইয়া গেল। ইহার পর আর কোন দিনই তাঁহার চক্ষু ও মাথাব্যথা হয় নাই। একটি বর্ণনায় পাওয়া যায়, রাসূলুল্লাহ (স) এই দু'আ করিয়াছিলেন :
اللَّهُمَّ اذْهَبْ عَنْهُ الْحَرَّ وَالْقَرِّ.
"হে আল্লাহ! তাহাকে গরম ও ঠাণ্ডার প্রকোপ হইতে রক্ষা করিও”।
ইব্‌ন আবী লায়লা বলেন, ইহার ফলে 'আলী (রা) অসহনীয় গরমের দিনে পশমী কাপড় পরিতেন এবং হিমেল শীতে হালকা-পাতলা কাপড় পরিধান করিতেন। ইহাতে তাঁহার শারীরিক কোন ক্ষতি হইত না। 'আলী (রা) শারীরিকভাবে সুস্থ হইয়া উঠিবার পর রাসূলুল্লাহ (স) নিজের খাস বর্ম তাঁহাকে পরাইয়া দিলেন এবং যুল-ফিকার তাঁহার হস্তে তুলিয়া দিয়া বলিলেন, "যাও, পিছপা হইও না যতক্ষণ না তোমার হাতে দুর্গ বিজিত হয়"।
অতঃপর 'আলী (রা) সামরিক পতাকা হস্তে ধারণ করিয়া রওয়ানা হইলেন এবং উহা একটি প্রস্তরময় টিলায় স্থাপন করিলেন। জনৈক ইয়াহুদী শাস্ত্রক দুর্গের উপর দাঁড়াইয়া এই দৃশ্য অবলোকন করিয়া জিজ্ঞাসা করিল, ওহে পতাকাধারী ব্যক্তি! আপনি কে? আপনার নাম কি? তিনি বলিলেন, আমি 'আলী ইব্‌ন আবী তালিব। অতঃপর ঐ ব্যক্তি স্বগোত্রীয়দেরকে বলিল, "তাওরাতের শপথ! তোমরা এই ব্যক্তির নিকট পরাজয় বরণ করিবে। সে বিজয়লাভ ব্যতিরেকে প্রত্যাবর্তন করিবে না"। সে আলী (রা)-এর গুণাবলী ও বীরত্ব সম্পর্কে অবগত ছিল।
'আলী (রা)-এর বিরুদ্ধে দুর্গ হইতে সর্বপ্রথম বীর ইয়াহুদী মারহাবের ভাই হারিছ বাহির হইয়াছিল। তাহার বর্শা ছিল অত্যন্ত ভারী। বাহির হইবামাত্র সে যুদ্ধ আরম্ভ করিল এবং কয়েকজন মুসলমানকে শহীদ করিল। অতঃপর 'আলী (রা) তাহার নিকটে পৌছিয়া গেলেন এবং একটিমাত্র আঘাতে তাহাকে হত্যা করিলেন। মারহাব তাহার ভ্রাতার হত্যার খবর শুনিয়া খায়বারের বীরদিগের একটি দল লইয়া অস্ত্রে সজ্জিত হইয়া প্রতিশোধ লইতে বাহির হইল। কথিত আছে যে, মারহাব খায়বারবাসীদের মধ্যে অত্যন্ত পরাক্রমশালী সুস্বাস্থ্যের অধিকারী যুদ্ধবাজ ব্যক্তি ছিল। বীরত্বে সে খায়বারবাসীদের মধ্যে অপ্রতিদ্বন্দ্বী ছিল। ঐদিন সে দুইটি বর্ম পরিধান করিয়া দুইটি পাগড়ী মাথায় বাঁধিয়া দুইখানা তরবারি হস্তে লইয়া বীরদর্পে রণক্ষেত্রে নিম্নোক্ত কবিতাটি আবৃত্তি করিতে করিতে বাহির হয় :
قَدْ عَلِمَتْ خَيْبَرُ أَنِّي مَرْحَبُ + شَاكِي السَّلَاحِ بَطَلَ مُجَرِّبٌ.
"খায়বারবাসী জানে আমি মারহাব, যে রণনিপুণ এবং মহাবীর হিসাবে পরীক্ষিত"। 'আলী (রা) এতদশ্রবণে আবৃত্তি করিলেন:
أَنَا الَّذِي سَمَّتْنِي أَمِي حَيْدَرَهُ + ضَرْغَامُ أَجَامٍ وَكَيْتُ قَسْوَرَهُ.
"আমি সেই বীর যাহার মাতা তাহার নাম রাখিয়াছেন হায়দার। আমি গভীর বনের সিংহ" (মাদারিজুন-নুবুওয়াত, পৃ. ৪১৩, ৪১৪)।
'আলী (রা) ও মারহাব কর্তৃক আবৃত্তিকৃত এই কবিতা বিভিন্ন গ্রন্থে ভিন্ন ভিন্নভাবে উদ্ধৃত হইয়াছে। দানাপুরীর গ্রন্থে মারহাব আবৃত্তি করিতে করিতে বাহির হয় নিম্নরূপ: أَنَا الَّذِي سَمَّتْنِي أَمِّي مَرَحَبٌ + شَاكِ السَّلَاحِ بَلْ مُجَرَّبٌ.
"আমি সেই বীর যাহার মাতা তাহার নাম রাখিয়াছেন মারহাব। যিনি রণনিপুণ এবং মহা বীরবর হিসাবে পরীক্ষিত”
'আলী (রা) এতদশ্রবণে আবৃত্তি করিলেন: أَنَا الَّذِي سَمُتْنِي أُمِّي حَيْدَرَةَ + كَلَيْثِ غَابَاتِ كَرِيْهِ الْمَنْظَرَه.
"আমি সেই বীরবর যাহার মাতা তাহার নাম রাখিয়াছেন হায়দার, যে বন্য হিংস্র সিংহতুল্য এবং যাহার চেহারা অত্যন্ত ভয়ঙ্কর" (আসাহহুস সিয়ার, পৃ. ১৯১)।
ইব্‌ন কাছীর এই কবিতাদ্বয়ে আরও কিছু বৃদ্ধি করিয়া উল্লেখ করিয়াছেন: মারহাব এই কবিতা আবৃত্তি করিতে করিতে বাহির হইল: قَدْ عَلِمَتْ خَيْبَرُ أَنِّي مَرْحَب - شاك السلاح بَطَلَ مُجَرَّبٌ إِذَ اللُّبُوتُ أَقْبَلَتْ تَلَهَبْ - وَاحْجَمَتْ عَنْ صَولَةِ الْمُغَلَبِ.
উত্তরে আলী (রা) আবৃত্তি করিলেন: أنَا الَّذِي سَمَتْنِي أَمِّي حَيْدَرَهُ + كَلَيْتُ غَابَت شَدِيدٌ الْقَسْوَرَةَ اكيلُكُمْ بِالصَّاعِ كَيْلَ السَّنْدَرَةِ
(আল-বিদায়া ওয়ান-নিহায়া, ২/৪খ., ১৮৮, ১৮৯)।
মারহাব সংকল্প করিল, সে আগেই 'আলী (রা)-এর মাথায় আঘাত হানিবে। কিন্তু 'আলী (রা) লাফ দিয়া উঠিয়া যুল-ফিকার দিয়া তাহার মাথায় এত জোরে আঘাত হানেন যে, বর্মসহ মারহাবের মাথা কাটিয় গলদেশ পর্যন্ত দ্বিখণ্ডিত হইয়া যায়। এক বর্ণনায় আছে, উরু পর্যন্ত দুই টুকরা হইয়া যায়। অপর এক বর্ণনায় আছে যে, তাহার বাহনের গদি পর্যন্ত দ্বিখণ্ডিত হইয়া যায়।
অতঃপর মুসলিম বাহিনী তাঁহার নেতৃত্বে রণক্ষেত্রে অবতরণ করিয়া ইয়াহুদীদিগকে হত্যা করিতে লাগিল। সাতজন ইয়াহুদী বীরকে ঐ সময় হত্যা করা হয়। অবশিষ্টরা পরাজয় মানিয়া দুর্গ অভ্যন্তরে প্রবেশ করিতে লাগিল। আলী (রা) তাহাদিগকে ধাওয়া করিয়া অগ্রসর হইতেছিলেন। এমতাবস্থায় জনৈক ইয়াহুদী তাঁহার হাতে আঘাত হানিল। ফলে তাঁহার ঢাল ভূমিতে পড়িয়া গেল এবং অপর এক ইয়াহুদী তাহা উঠাইয়া লইয়া পলায়ন করিল। এই প্রেক্ষিতে আলী (রা)-এর মধ্যে আল্লাহ্র পক্ষ হইতে এমনই রূহানী শক্তি সঞ্চারিত হইল যে, তিনি দুর্গ পার্শ্বস্থিত গর্ত অতিক্রম করিয়া একেবারে দুর্গের দরজায় পৌঁছিয়া গেলেন এবং লৌহ নির্মিত দরজার একাংশ উপড়াইয়া ইহাকে ঢাল বানাইয়া যুদ্ধ অব্যাহত রাখিলেন।
ইমাম বাকির হইতে বর্ণিত আছে যে, আলী (রা) যখন কপাট উপড়াইবার জন্য টান দেন তখন সমগ্র দুর্গ হেলিয়া উঠে। এমন কি সাফিয়্যা বিন্ত হুয়ায় ইব্‌ন আখতাৰ খাট হইতে পড়িয়া যান এবং মুখমণ্ডলে আঘাত পান।
সীরাতবিদগণ বলেন: যুদ্ধশেষে 'আলী (রা) বেশ দূরে এই দরজা নিক্ষেপ করিলেন। ইহাও কথিত আছে যে, যুদ্ধশেষে আটজন শক্তিশালী ব্যক্তি একত্রে মিলিত হইয়া দরজাটি উল্টাইতে পারেন নাই। এমনকি চল্লিশজন মিলিয়া উহা উঠাইতে চাহিলেন, কিন্তু সক্ষম হন নাই। মাদারিজুন নুবুওয়াতে আছে যে, দরজাটির ওজন ছিল আট মন। তবে কোন কোন সীরাতবিদের মতে এই বর্ণনাগুলি দুর্বল, অনুপযোগী। 'আল্লামা সাখাবী মাকাসিদে হাসানা গ্রন্থে বলিয়াছেন, كُلُّهَا وَاهْيَةً "এই সকল বর্ণনা অলীক” (শিবলী নু'মানী ও সুলায়মান নাদবী, সীরাতুন্নবী, ১৯৮৫ খৃ.)।
মোটকথা, যখন কামূস দুর্গসহ অন্যান্য দুর্গে অবস্থানকারিগণ 'আলী (রা)-এর এই শৌর্য-বীর্য দেখিল তখন তাহারা اَلْأَمَانُ الْأَمَانُ )নিরাপত্তা, নিরাপত্তা) বলিয়া ফরিয়াদ করিতে লাগিল। 'আলী (را) তাহাদিগকে রাসূলুল্লাহ (স)-এর ইঙ্গিতে এই শর্তের উপর নিরাপত্তা দিলেন যে, প্রত্যেক ব্যক্তি উটের উপর খাদ্য বোঝাই করিয়া শহর ত্যাগ করিয়া চলিয়া যাইবে এবং নগদ মুদ্রা, সাজ-সরঞ্জাম ও অস্ত্রপাতি মুসলমানগণের জন্য রাখিয়া যাইবে। কোন জিনিস লুকাইয়া রাখিবে না। যদি এমন কোন জিনিস বাহির হয় যাহার তথ্য দেওয়া হয় নাই তাহা হইলে তাহাদের নিরাপত্তা প্রত্যাহর করা হইবে।
রাসূলুল্লাহ (স)-এর নিকট যখন বিজয় সংবাদ পৌছিল তখন তিনি ইহার জন্য আল্লাহর শোকর আদায় করিলেন। কারণ ইহা ছিল ইসলাম প্রসারের এক মহাসোপান। 'আলী (রা) রাসূলুল্লাহ (স)-এর দরবারে উপস্থিত হইলে তিনি স্বীয় তাঁবু হইতে বাহির হইয়া তাহাকে স্বাগত জানাইলেন, আলিঙ্গন করিলেন, চক্ষু যুগলের মধ্যবর্তী স্থান চুম্বন করিলেন এবং বলিলেন:
بَلَغَنِي تَنَاءَكَ الْمَشْكُورُ وَضِيْعَكَ الْمَذْكُورُ قَدْ رَضِيَ اللَّهُ عَنْهُ وَرَضِيْتُ أَنَا عَنْكَ.
"আমার নিকট তোমার কৃতজ্ঞতাপূর্ণ প্রশংসা পৌছিয়াছে, তোমার শৌর্য-বীর্ষের বর্ণনা করা হইয়াছে, আল্লাহ তাহার প্রতি সদয় হইয়াছেন এবং আমি তোমার উপর সন্তুষ্ট"।
তখন 'আলী (রা) কাঁদিতে লাগিলেন। রাসূলুল্লাহ (স) জিজ্ঞাসা করিলেন, ইহা কিসের কান্না, আনন্দের না বেদনার? 'আলী (রা) বলিলেন, ইহা আনন্দের কান্না। আপনি আমার উপর সন্তুষ্ট আছেন, ইহাতে কি আমি আনন্দিত হইব না? রাসূলুল্লাহ (স) বলিলেনঃ শুধু আমিই তোমার উপর খুশী নহি বরং আল্লাহ, জিবরীল, মীকাঈল এবং সকল ফেরেশতা তোমার উপর সন্তুষ্ট (মাদারিজুন নুবুওয়া, প্রাগুক্ত)।
ইব্‌ন কায়্যিম আল-জাওযিয়্যা (র) বলেন, সহীহ মুসলিমে এইভাবে উল্লেখ আছে যে, 'আলী (রা) মারহাবকে হত্যা করিয়াছেন। কিন্তু মূসা ইব্‌ন উকবা, ইমাম যুহরী ও আবুল আসওয়াদের উদ্ধৃতিতে এবং ইউনুস ইব্‌ন বুকায়র ইবন ইসহাক সূত্রে উল্লেখ করিয়াছেন যে, জাবির ইবন আবদিল্লাহ বর্ণনা করিয়াছেন যে, মারহাবকে মুহাম্মাদ ইবন মাসলামা (রা) হত্যা করেন। মারহাব যখন দুর্গের ভিতর হইতে বীরদর্পে বাহির হইয়া তাহার মুকাবিলার জন্য আহ্বান করে তখন রাসূলুল্লাহ (স) জিজ্ঞাসা করিলেন, তাহাকে মুকাবিলা করিতে কে প্রস্তুত আছ? মুহাম্মাদ ইবন মাসলামা (রা) বলিলেন, হে আল্লাহর রাসূল! আমি তাহার মুকাবিলায় প্রস্তুত। এই ব্যক্তি আমার ভ্রাতা (মাহমূদ ইব্‌ন মাসলামা)-কে গতকাল শহীদ করিয়াছে। রাসূলুল্লাহ (স) তাহাকে অনুমতি প্রদান করিলেন। তিনি যখন অগ্রসর হন তখন উভয়ের মধ্যবর্তী স্থানে একটি বৃক্ষ আড়াল হয়। উভয়ই একে অপরকে আঘাত হানার জন্য সুযোগের সন্ধান করিতে থাকেন। অবশেষে মুহাম্মাদ ইবন মাসলামা (রা) তাহাকে হত্যা করেন। সালামা ইব্‌ন সালামা ও মুজাম্মি' ইবন হারিছাও বলিয়াছেন যে, মুহাম্মাদ ইবন মাসলামা মারহাবকে হত্যা করেন।
ওয়াকিদী বলেন, মুহাম্মাদ ইবন মাসলামা (রা)-এর তরবারির আঘাতে মারহাবের দুই পা দ্বিখণ্ডিত হইয়া যায়। তারপর তিনি তাহাকে ছাড়িয়া দেন এবং বলেন, যন্ত্রণার স্বাদ উপভোগ কর, যেমন আমার ভ্রাতা যন্ত্রণা সহ্য করিয়াছে। তারপর আলী (রা) অগ্রসর হইয়া মারহাবের শিরোচ্ছেদ করেন। অতঃপর তিনি মারহাবের তরবারি এবং অন্যান্য আসবাবপত্র লইয়া রাসূলুল্লাহ (স)-এর নিকট আসিলেন। তাহারা দুইজন রাসূলুল্লাহ (স)-এর সম্মুখে মারহাবের পরিত্যক্ত আসবাবপত্রের মালিকানা লইয়া বিতর্কে জড়াইয়া পড়েন। রাসূলুল্লাহ (স) মুহাম্মাদ ইবন মাসলামাকে তাহার তরবারি, বর্শা ও শিরস্ত্রাণ ইত্যাদি সবকিছু দান করেন।
মারহাবের পর তাহার ভ্রাতা ইয়াসির অগ্রসর হয়। তাহার মুকাবিলার জন্য যুবায়র ইবনুল আওওয়াম (রা) অগ্রসর হন। এই সময় যুবায়রের মাতা সাফিয়্যা (রা) রাসূলুল্লাহ (স)-কে বলিলেন, হে আল্লাহর রাসূল! সে আমার পুত্রকে হত্যা করিয়া ফেলিবে। তিনি বলিলেনঃ না, তোমার পুত্র তাহাকে হত্যা করিবে। অবশেষে যুবায়র (রা) ইয়াসিরকে হত্যা করেন। কামূস দুর্গের অবরোধ প্রায় বিশদিন স্থায়ী ছিল। ইহা ছিল সর্বাধিক শক্তিশালী দুর্গ (যাদুল মা'আদ, ২খ., ১৩৪, ১৩৫; আত-তাবারী, তারীখুল উমাম ওয়াল-মুলুক, ২খ., ৯২, ৯৩)।
এই ব্যাপারে ইব্‌ন হাজার আসকালানী বলেন, ইমাম মুসলিম কর্তৃক বর্ণিত হাদীছের বিরোধিতা করেন অনেক সীরাতবিদ। ইবন ইসহাক, মূসা ইব্‌ন উকবা ও আল-ওয়াকিদী দৃঢ় প্রত্যয় ব্যক্ত করিয়াছেন যে, মারহাবকে যিনি হত্যা করিয়াছেন তিনি হইলেন মুহাম্মাদ ইব্‌ন মাসলামা। ইহার অনুকূলে ইমাম আহমাদ হাসান পর্যায়ের সনদে জাবির (রা) হইতে একটি হাদীছ বর্ণনা করিয়াছেন। কেহ কেহ বলেন, মুহাম্মাদ ইবন মাসলামা মারহাবের মুকাবিলা করিয়া তাহার দুইটি পা দ্বিখণ্ডিত করিয়াছিলেন। পরে আলী (রা) তাহাকে হত্যা করেন। কেহ কেহ বলেন, মুহাম্মাদ ইব্‌ন মাসলামা (রা) যাহাকে হত্যা করেন সে ছিল মারহাবের ভাই আল-হারিছ। কিন্তু কোন কোন বর্ণনাকারীর নিকট তাহা স্পষ্ট ছিল না। তাই এই বিভ্রান্তি ঘটিয়াছে। যদি এইরূপ না হইয়া থাকে তাহা হইলে মারহাবকে আলী (রা) হত্যা করিয়াছিলেন বলিয়া সহীহ মুসলিমে যে বর্ণনা রহিয়াছে তাহাকে অগ্রাধিকার দিতে হইবে (ফাতহুল বারী, ৭খ., ৪৮৭)।

কামূس দুর্গ যখন অবরোধ করা হয় তখন রাসূলুল্লাহ (স) প্রচন্ড শিরপীড়ায় আক্রান্ত ছিলেন। ফলে রণাঙ্গনে অংশগ্রহণ করিতে পারেন নাই। সুতরাং এই অবস্থায় মুহাজির কিংবা আনসারদের মধ্য হইতে একজনকে তিনি সেনাপতি নিযুক্ত করিতেন। ইহা ছিল সর্বাপেক্ষা অধিক শক্তিশালী ও দুর্জয় কিল্লা। ফলে অবরোধ দীর্ঘস্থায়ী হয় এবং বিজয় বিলম্বিত হইতে থাকে। একদিন রণাঙ্গনে আবু বকর সিদ্দীক (রা) গমন করেন এবং দুর্গ বিজয়ের আপ্রাণ চেষ্টা করেন, কিন্তু দুর্গ জয় হইল না। রাসূলুল্লাহ (স) ঘোষণা করেন, আগামী কল্য আমি রণাঙ্গনের পতাকা এমন এক ব্যক্তির হাতে তুলিয়া দিব অথবা বলিলেন, আগামী কল্য এমন এক ব্যক্তি পতাকা গ্রহণ করিবে যে আল্লাহ ও রাসূল (স)-কে ভালবাসে এবং আল্লাহ ও রাসূলও তাহাকে ভালবাসেন। তাহাকেই মহান আল্লাহ এই দুর্গ বিজয়ের গৌরব প্রদান করিবেন।
সকল সাহাবী রাত্রিতে পরস্পর আলোচনা করেন যে, কাহার ভাগ্যে আগামী কল্য রণ-পতাকা জুটিবে? সকালে সাহাবীগণের সকলেই এই দুর্লভ ভাগ্যের প্রত্যাশায় রাসূলুল্লাহ (স)-এর নিকট আগমন করেন। তখন তিনি জিজ্ঞাসা করিলেন, 'আলী কোথায়? সকলে বলিলেন, চোখ উঠা রোগের কারণে তাহার চক্ষুতে দারুণ ব্যথা। তিনি আসিতে সক্ষম হইবেন না। রাসূলুল্লাহ (স) বলিলেন, তাহাকে ডাকিয়া আন। অতঃপর তিনি উপস্থিত হইলে রাসূলুল্লাহ (স) স্বীয় মুখ নিঃসৃত লালা তাহার চক্ষুতে লাগাইয়া দিলেন এবং আল্লাহর দরবারে দু'আ করিলেন। সঙ্গে সঙ্গে তাহার চক্ষু এমনভাবে নিরাময় হয় যেন পূর্বে কখনও চক্ষুর কোন রোগই ছিল না। অতঃপর 'আলী (রা)-কে সম্বোধন করিয়া বলিলেনঃ শত্রুর নিকট যাও। প্রথমে ইসলামের দা'ওয়াত দাও এবং আল্লাহর অধিকারসমূহ সম্পর্কে তাহাদিগকে বুঝাও। হে 'আলী! যদি তোমার মাধ্যমে এক ব্যক্তিও হিদায়াতপ্রাপ্ত হয়, তাহা হইলে উহা হইবে তোমার জন্য এক বিরাট নি'মত ও সাফল্য (আসাহহুস সিয়ার, পৃ. ১৯০)। আল-বিদায়া ওয়ান-নিহায়া গ্রন্থে ইমাম বুখারীর উক্ত বর্ণনার সাথে এই কথাও আছে, 'আলী বলিলেন, আমি কি রাসূলুল্লাহ (س) হইতে পিছনে পড়িয়া থাকিব? সুতরাং তিনি রাসূলুল্লাহ (স)-এর সহিত মিলিত হইলেন। (বুখারী, ২খ, ৬০৫)।
ইমাম নাসাঈ ও মুসলিম সূত্রে বর্ণিত এক হাদীছে আবূ হুরায়রা (রা) বলেন, রাসূলুল্লাহ (স) কর্তৃক উপরিউক্ত ঘোষণা শ্রবণ করিবার পর উমার (রা) বলেনঃ আমি ঐ দিন ব্যতীত আর কোন দিনই নেতৃত্ব লাভের আকাঙ্খা করি নাই। রাসূলুল্লাহ (স) 'আলী (রা)-কে এই অভিযানে প্রেরণ করিয়া বলিলেনঃ "যাও, যুদ্ধ কর, যতক্ষণ না বিজয় লাভ করিবে, এদিক সেদিক দৃষ্টিপাত করিও না।” 'আলী (রা) বলিলেন, কতক্ষণ পর্যন্ত লড়াই করিব? রাসূলুল্লাহ (স) বলিলেনঃ ইহাদিগের সহিত লড়াই করিতে থাকিবে যেই পর্যন্ত না ইহারা সাক্ষী দিবে যে, আল্লাহ ব্যতীত কোন ইলাহ নাই এবং মুহাম্মাদ আল্লাহর বান্দা ও রাসূল। উহারা যখন এই সাক্ষ্য দিবে তখন আমাদিগের হাত হইতে তাহাদের রক্ত ও সম্পদ রক্ষা পাইবে (আল-বিদায়া ওয়ান-নিহায়া, ২/৪খ., ২১)। দিহলাবী বলেন, 'আলী (রা) রাসূলুল্লাহ (স)-এর এই সুসংবাদ শুনিয়া আল্লাহ্র দরবারে দু'আ করিলেন:
اللَّهُمَّ لَا مَا نِعَ لِمَا أَعْطَيْتَ وَلَا مُعْطَى لِمَا مَنَعْتَ.
“হে আল্লাহ! তুমি যাহা দান করিবে উহা কেহই রোধ করিতে পারিবে না এবং তুমি দিতে না চাহিলে কেহ দিতে পারিবে না।"
প্রথমে চক্ষুর রোগজনিত কারণে 'আলী (রা) খায়বার অভিযানে অংশগ্রহণ হইতে বিরত ছিলেন। তিনি মনে মনে ভাবিতেন, আমি যুদ্ধে উপস্থিত না ইইয়া ভাল কাজ করি নাই। সুতরাং তিনি সফরের প্রস্তুতি লইয়া মদীনা হইতে রওয়ানা করিলেন। পথিমধ্যে অথবা খায়বার পৌঁছিবার পর রাসূলুল্লাহ (স) তাহার আগমনী বার্তা পাইলেন। পরবর্তী দিনের সূচনাপর্বে রাসূলুল্লাহ (স) বলিলেন, আলীকে ডাক। সাহাবীগণ বলিলেন, তিনি এখানেই আছেন, কিন্তু তাহার চক্ষুর অসুস্থতার কারণে তিনি কাছের বস্তুও দেখিতে পান না। আদেশ হইল, তাহাকে আমার নিকট লইয়া আস। সালামা ইবনুল আকওয়া (রা) জিয়া তাহাকে হাত ধরিয়া রাসূলুল্লাহ (স)-এর নিকট লইয়া আসিলেন। অতঃপর রাসূলুল্লাহ (স) তাহার মাথা নিজ উরুর উপর রাখিলেন এবং নিজ মুখের লালা তাহার চক্ষুতে লাগাইয়া দিলেন ও দু'আ করিলেন। এই সময় তাঁহার চক্ষু হইতে ব্যথা সম্পূর্ণ দূরীভূত হইয়া গেল। ইহার পর আর কোন দিনই তাঁহার চক্ষু ও মাথাব্যথা হয় নাই। একটি বর্ণনায় পাওয়া যায়, রাসূলুল্লাহ (স) এই দু'আ করিয়াছিলেন :
اللَّهُمَّ اذْهَبْ عَنْهُ الْحَرَّ وَالْقَرِّ.
"হে আল্লাহ! তাহাকে গরম ও ঠাণ্ডার প্রকোপ হইতে রক্ষা করিও”।
ইব্‌ন আবী লায়লা বলেন, ইহার ফলে 'আলী (রা) অসহনীয় গরমের দিনে পশমী কাপড় পরিতেন এবং হিমেল শীতে হালকা-পাতলা কাপড় পরিধান করিতেন। ইহাতে তাঁহার শারীরিক কোন ক্ষতি হইত না। 'আলী (রা) শারীরিকভাবে সুস্থ হইয়া উঠিবার পর রাসূলুল্লাহ (স) নিজের খাস বর্ম তাঁহাকে পরাইয়া দিলেন এবং যুল-ফিকার তাঁহার হস্তে তুলিয়া দিয়া বলিলেন, "যাও, পিছপা হইও না যতক্ষণ না তোমার হাতে দুর্গ বিজিত হয়"।
অতঃপর 'আলী (রা) সামরিক পতাকা হস্তে ধারণ করিয়া রওয়ানা হইলেন এবং উহা একটি প্রস্তরময় টিলায় স্থাপন করিলেন। জনৈক ইয়াহুদী শাস্ত্রক দুর্গের উপর দাঁড়াইয়া এই দৃশ্য অবলোকন করিয়া জিজ্ঞাসা করিল, ওহে পতাকাধারী ব্যক্তি! আপনি কে? আপনার নাম কি? তিনি বলিলেন, আমি 'আলী ইব্‌ন আবী তালিব। অতঃপর ঐ ব্যক্তি স্বগোত্রীয়দেরকে বলিল, "তাওরাতের শপথ! তোমরা এই ব্যক্তির নিকট পরাজয় বরণ করিবে। সে বিজয়লাভ ব্যতিরেকে প্রত্যাবর্তন করিবে না"। সে আলী (রা)-এর গুণাবলী ও বীরত্ব সম্পর্কে অবগত ছিল।
'আলী (রা)-এর বিরুদ্ধে দুর্গ হইতে সর্বপ্রথম বীর ইয়াহুদী মারহাবের ভাই হারিছ বাহির হইয়াছিল। তাহার বর্শা ছিল অত্যন্ত ভারী। বাহির হইবামাত্র সে যুদ্ধ আরম্ভ করিল এবং কয়েকজন মুসলমানকে শহীদ করিল। অতঃপর 'আলী (রা) তাহার নিকটে পৌছিয়া গেলেন এবং একটিমাত্র আঘাতে তাহাকে হত্যা করিলেন। মারহাব তাহার ভ্রাতার হত্যার খবর শুনিয়া খায়বারের বীরদিগের একটি দল লইয়া অস্ত্রে সজ্জিত হইয়া প্রতিশোধ লইতে বাহির হইল। কথিত আছে যে, মারহাব খায়বারবাসীদের মধ্যে অত্যন্ত পরাক্রমশালী সুস্বাস্থ্যের অধিকারী যুদ্ধবাজ ব্যক্তি ছিল। বীরত্বে সে খায়বারবাসীদের মধ্যে অপ্রতিদ্বন্দ্বী ছিল। ঐদিন সে দুইটি বর্ম পরিধান করিয়া দুইটি পাগড়ী মাথায় বাঁধিয়া দুইখানা তরবারি হস্তে লইয়া বীরদর্পে রণক্ষেত্রে নিম্নোক্ত কবিতাটি আবৃত্তি করিতে করিতে বাহির হয় :
قَدْ عَلِمَتْ خَيْبَرُ أَنِّي مَرْحَبُ + شَاكِي السَّلَاحِ بَطَلَ مُجَرِّبٌ.
"খায়বারবাসী জানে আমি মারহাব, যে রণনিপুণ এবং মহাবীর হিসাবে পরীক্ষিত"। 'আলী (রা) এতদশ্রবণে আবৃত্তি করিলেন:
أَنَا الَّذِي سَمَّتْنِي أَمِي حَيْدَرَهُ + ضَرْغَامُ أَجَامٍ وَكَيْتُ قَسْوَرَهُ.
"আমি সেই বীর যাহার মাতা তাহার নাম রাখিয়াছেন হায়দার। আমি গভীর বনের সিংহ" (মাদারিজুন-নুবুওয়াত, পৃ. ৪১৩, ৪১৪)।
'আলী (রা) ও মারহাব কর্তৃক আবৃত্তিকৃত এই কবিতা বিভিন্ন গ্রন্থে ভিন্ন ভিন্নভাবে উদ্ধৃত হইয়াছে। দানাপুরীর গ্রন্থে মারহাব আবৃত্তি করিতে করিতে বাহির হয় নিম্নরূপ: أَنَا الَّذِي سَمَّتْنِي أَمِّي مَرَحَبٌ + شَاكِ السَّلَاحِ بَلْ مُجَرَّبٌ.
"আমি সেই বীর যাহার মাতা তাহার নাম রাখিয়াছেন মারহাব। যিনি রণনিপুণ এবং মহা বীরবর হিসাবে পরীক্ষিত”
'আলী (রা) এতদশ্রবণে আবৃত্তি করিলেন: أَنَا الَّذِي سَمُتْنِي أُمِّي حَيْدَرَةَ + كَلَيْثِ غَابَاتِ كَرِيْهِ الْمَنْظَرَه.
"আমি সেই বীরবর যাহার মাতা তাহার নাম রাখিয়াছেন হায়দার, যে বন্য হিংস্র সিংহতুল্য এবং যাহার চেহারা অত্যন্ত ভয়ঙ্কর" (আসাহহুস সিয়ার, পৃ. ১৯১)।
ইব্‌ন কাছীর এই কবিতাদ্বয়ে আরও কিছু বৃদ্ধি করিয়া উল্লেখ করিয়াছেন: মারহাব এই কবিতা আবৃত্তি করিতে করিতে বাহির হইল: قَدْ عَلِمَتْ خَيْبَرُ أَنِّي مَرْحَب - شاك السلاح بَطَلَ مُجَرَّبٌ إِذَ اللُّبُوتُ أَقْبَلَتْ تَلَهَبْ - وَاحْجَمَتْ عَنْ صَولَةِ الْمُغَلَبِ.
উত্তরে আলী (রা) আবৃত্তি করিলেন: أنَا الَّذِي سَمَتْنِي أَمِّي حَيْدَرَهُ + كَلَيْتُ غَابَت شَدِيدٌ الْقَسْوَرَةَ اكيلُكُمْ بِالصَّاعِ كَيْلَ السَّنْدَرَةِ
(আল-বিদায়া ওয়ান-নিহায়া, ২/৪খ., ১৮৮, ১৮৯)।
মারহাব সংকল্প করিল, সে আগেই 'আলী (রা)-এর মাথায় আঘাত হানিবে। কিন্তু 'আলী (রা) লাফ দিয়া উঠিয়া যুল-ফিকার দিয়া তাহার মাথায় এত জোরে আঘাত হানেন যে, বর্মসহ মারহাবের মাথা কাটিয় গলদেশ পর্যন্ত দ্বিখণ্ডিত হইয়া যায়। এক বর্ণনায় আছে, উরু পর্যন্ত দুই টুকরা হইয়া যায়। অপর এক বর্ণনায় আছে যে, তাহার বাহনের গদি পর্যন্ত দ্বিখণ্ডিত হইয়া যায়।
অতঃপর মুসলিম বাহিনী তাঁহার নেতৃত্বে রণক্ষেত্রে অবতরণ করিয়া ইয়াহুদীদিগকে হত্যা করিতে লাগিল। সাতজন ইয়াহুদী বীরকে ঐ সময় হত্যা করা হয়। অবশিষ্টরা পরাজয় মানিয়া দুর্গ অভ্যন্তরে প্রবেশ করিতে লাগিল। আলী (রা) তাহাদিগকে ধাওয়া করিয়া অগ্রসর হইতেছিলেন। এমতাবস্থায় জনৈক ইয়াহুদী তাঁহার হাতে আঘাত হানিল। ফলে তাঁহার ঢাল ভূমিতে পড়িয়া গেল এবং অপর এক ইয়াহুদী তাহা উঠাইয়া লইয়া পলায়ন করিল। এই প্রেক্ষিতে আলী (রা)-এর মধ্যে আল্লাহ্র পক্ষ হইতে এমনই রূহানী শক্তি সঞ্চারিত হইল যে, তিনি দুর্গ পার্শ্বস্থিত গর্ত অতিক্রম করিয়া একেবারে দুর্গের দরজায় পৌঁছিয়া গেলেন এবং লৌহ নির্মিত দরজার একাংশ উপড়াইয়া ইহাকে ঢাল বানাইয়া যুদ্ধ অব্যাহত রাখিলেন।
ইমাম বাকির হইতে বর্ণিত আছে যে, আলী (রা) যখন কপাট উপড়াইবার জন্য টান দেন তখন সমগ্র দুর্গ হেলিয়া উঠে। এমন কি সাফিয়্যা বিন্ত হুয়ায় ইব্‌ন আখতাৰ খাট হইতে পড়িয়া যান এবং মুখমণ্ডলে আঘাত পান।
সীরাতবিদগণ বলেন: যুদ্ধশেষে 'আলী (রা) বেশ দূরে এই দরজা নিক্ষেপ করিলেন। ইহাও কথিত আছে যে, যুদ্ধশেষে আটজন শক্তিশালী ব্যক্তি একত্রে মিলিত হইয়া দরজাটি উল্টাইতে পারেন নাই। এমনকি চল্লিশজন মিলিয়া উহা উঠাইতে চাহিলেন, কিন্তু সক্ষম হন নাই। মাদারিজুন নুবুওয়াতে আছে যে, দরজাটির ওজন ছিল আট মন। তবে কোন কোন সীরাতবিদের মতে এই বর্ণনাগুলি দুর্বল, অনুপযোগী। 'আল্লামা সাখাবী মাকাসিদে হাসানা গ্রন্থে বলিয়াছেন, كُلُّهَا وَاهْيَةً "এই সকল বর্ণনা অলীক” (শিবলী নু'মানী ও সুলায়মান নাদবী, সীরাতুন্নবী, ১৯৮৫ খৃ.)।
মোটকথা, যখন কামূس দুর্গসহ অন্যান্য দুর্গে অবস্থানকারিগণ 'আলী (রা)-এর এই শৌর্য-বীর্য দেখিল তখন তাহারা اَلْأَمَانُ الْأَمَانُ )নিরাপত্তা, নিরাপত্তা) বলিয়া ফরিয়াদ করিতে লাগিল। 'আলী (রা) তাহাদিগকে রাসূলুল্লাহ (স)-এর ইঙ্গিতে এই শর্তের উপর নিরাপত্তা দিলেন যে, প্রত্যেক ব্যক্তি উটের উপর খাদ্য বোঝাই করিয়া শহর ত্যাগ করিয়া চলিয়া যাইবে এবং নগদ মুদ্রা, সাজ-সরঞ্জাম ও অস্ত্রপাতি মুসলমানগণের জন্য রাখিয়া যাইবে। কোন জিনিস লুকাইয়া রাখিবে না। যদি এমন কোন জিনিস বাহির হয় যাহার তথ্য দেওয়া হয় নাই তাহা হইলে তাহাদের নিরাপত্তা প্রত্যাহর করা হইবে।
রাসূলুল্লাহ (স)-এর নিকট যখন বিজয় সংবাদ পৌছিল তখন তিনি ইহার জন্য আল্লাহর শোকর আদায় করিলেন। কারণ ইহা ছিল ইসলাম প্রসারের এক মহাসোপান। 'আলী (রা) রাসূলুল্লাহ (স)-এর দরবারে উপস্থিত হইলে তিনি স্বীয় তাঁবু হইতে বাহির হইয়া তাহাকে স্বাগত জানাইলেন, আলিঙ্গন করিলেন, চক্ষু যুগলের মধ্যবর্তী স্থান চুম্বন করিলেন এবং বলিলেন:
بَلَغَنِي تَنَاءَكَ الْمَشْكُورُ وَضِيْعَكَ الْمَذْكُورُ قَدْ رَضِيَ اللَّهُ عَنْهُ وَرَضِيْتُ أَنَا عَنْكَ.
"আমার নিকট তোমার কৃতজ্ঞতাপূর্ণ প্রশংসা পৌছিয়াছে, তোমার শৌর্য-বীর্ষের বর্ণনা করা হইয়াছে, আল্লাহ তাহার প্রতি সদয় হইয়াছেন এবং আমি তোমার উপর সন্তুষ্ট"।
তখন 'আলী (রা) কাঁদিতে লাগিলেন। রাসূলুল্লাহ (স) জিজ্ঞাসা করিলেন, ইহা কিসের কান্না, আনন্দের না বেদনার? 'আলী (রা) বলিলেন, ইহা আনন্দের কান্না। আপনি আমার উপর সন্তুষ্ট আছেন, ইহাতে কি আমি আনন্দিত হইব না? রাসূলুল্লাহ (স) বলিলেনঃ শুধু আমিই তোমার উপর খুশী নহি বরং আল্লাহ, জিবরীল, মীকাঈল এবং সকল ফেরেশতা তোমার উপর সন্তুষ্ট (মাদারিজুন নুবুওয়া, প্রাগুক্ত)।
ইব্‌ন কায়্যিম আল-জাওযিয়্যা (র) বলেন, সহীহ মুসলিমে এইভাবে উল্লেখ আছে যে, 'আলী (রা) মারহাবকে হত্যা করিয়াছেন। কিন্তু মূসা ইব্‌ن উকবা, ইমাম যুহরী ও আবুল আসওয়াদের উদ্ধৃতিতে এবং ইউনুস ইব্‌ن বুকায়র ইবন ইসহাক সূত্রে উল্লেখ করিয়াছেন যে, জাবির ইবন আবদিল্লাহ বর্ণনা করিয়াছেন যে, মারহাবকে মুহাম্মাদ ইবন মাসলামা (রা) হত্যা করেন। মারহাব যখন দুর্গের ভিতর হইতে বীরদর্পে বাহির হইয়া তাহার মুকাবিলার জন্য আহ্বান করে তখন রাসূলুল্লাহ (স) জিজ্ঞাসা করিলেন, তাহাকে মুকাবিলা করিতে কে প্রস্তুত আছ? মুহাম্মাদ ইবন মাসলামা (রা) বলিলেন, হে আল্লাহর রাসূল! আমি তাহার মুকাবিলায় প্রস্তুত। এই ব্যক্তি আমার ভ্রাতা (মাহমূদ ইব্‌ن মাসলামা)-কে গতকাল শহীদ করিয়াছে। রাসূলুল্লাহ (স) তাহাকে অনুমতি প্রদান করিলেন। তিনি যখন অগ্রসর হন তখন উভয়ের মধ্যবর্তী স্থানে একটি বৃক্ষ আড়াল হয়। উভয়ই একে অপরকে আঘাত হানার জন্য সুযোগের সন্ধান করিতে থাকেন। অবশেষে মুহাম্মাদ ইবন মাসলামা (রা) তাহাকে হত্যা করেন। সালামা ইব্‌ن সালামা ও মুজাম্মি' ইবন হারিছাও বলিয়াছেন যে, মুহাম্মাদ ইবন মাসলামা মারহাবকে হত্যা করেন।
ওয়াকিদী বলেন, মুহাম্মাদ ইবন মাসলামা (রা)-এর তরবারির আঘাতে মারহাবের দুই পা দ্বিখণ্ডিত হইয়া যায়। তারপর তিনি তাহাকে ছাড়িয়া দেন এবং বলেন, যন্ত্রণার স্বাদ উপভোগ কর, যেমন আমার ভ্রাতা যন্ত্রণা সহ্য করিয়াছে। তারপর আলী (را) অগ্রসর হইয়া মারহাবের শিরোচ্ছেদ করেন। অতঃপর তিনি মারহাবের তরবারি এবং অন্যান্য আসবাবপত্র লইয়া রাসূলুল্লাহ (স)-এর নিকট আসিলেন। তাহারা দুইজন রাসূলুল্লাহ (স)-এর সম্মুখে মারহাবের পরিত্যক্ত আসবাবপত্রের মালিকানা লইয়া বিতর্কে জড়াইয়া পড়েন। রাসূলুল্লাহ (س) মুহাম্মাদ ইবন মাসলামাকে তাহার তরবারি, বর্শা ও শিরস্ত্রাণ ইত্যাদি সবকিছু দান করেন।
মারহাবের পর তাহার ভ্রাতা ইয়াসির অগ্রসর হয়। তাহার মুকাবিলার জন্য যুবায়র ইবনুল আওওয়াম (রা) অগ্রসর হন। এই সময় যুবায়রের মাতা সাফিয়্যা (را) রাসূলুল্লাহ (س)-কে বলিলেন, হে আল্লাহর রাসূল! সে আমার পুত্রকে হত্যা করিয়া ফেলিবে। তিনি বলিলেনঃ না, তোমার পুত্র তাহাকে হত্যা করিবে। অবশেষে যুবায়র (রা) ইয়াসিরকে হত্যা করেন। কামূس দুর্গের অবরোধ প্রায় বিশদিন স্থায়ী ছিল। ইহা ছিল সর্বাধিক শক্তিশালী দুর্গ (যাদুল মা'আদ, ২খ., ১৩৪, ১৩৫; আত-তাবারী, তারীখুল উমাম ওয়াল-মুলুক, ২খ., ৯২, ৯৩)।
এই ব্যাপারে ইব্‌ن হাজার আসকালানী বলেন, ইমাম মুসলিম কর্তৃক বর্ণিত হাদীছের বিরোধিতা করেন অনেক সীরাতবিদ। ইবন ইসহাক, মূসা ইব্‌ن উকবা ও আল-ওয়াকিদী দৃঢ় প্রত্যয় ব্যক্ত করিয়াছেন যে, মারহাবকে যিনি হত্যা করিয়াছেন তিনি হইলেন মুহাম্মাদ ইব্‌ن মাসলামা। ইহার অনুকূলে ইমাম আহমাদ হাসান পর্যায়ের সনদে জাবির (রা) হইতে একটি হাদীছ বর্ণনা করিয়াছেন। কেহ কেহ বলেন, মুহাম্মাদ ইব্‌ن মাসলামা মারহাবের মুকাবিলা করিয়া তাহার দুইটি পা দ্বিখণ্ডিত করিয়াছিলেন। পরে আলী (রা) তাহাকে হত্যা করেন। কেহ কেহ বলেন, মুহাম্মাদ ইব্‌ن মাসলামা (را) যাহাকে হত্যা করেন সে ছিল মারহাবের ভাই আল-হারিছ। কিন্তু কোন কোন বর্ণনাকারীর নিকট তাহা স্পষ্ট ছিল না। তাই এই বিভ্রান্তি ঘটিয়াছে। যদি এইরূপ না হইয়া থাকে তাহা হইলে মারহাবকে আলী (را) হত্যা করিয়াছিলেন বলিয়া সহীহ মুসলিমে যে বর্ণনা রহিয়াছে তাহাকে অগ্রাধিকার দিতে হইবে (ফাতহুল বারী, ৭খ., ৪৮৭)।

কামূস দুর্গ যখন অবরোধ করা হয় তখন রাসূলুল্লাহ (স) প্রচন্ড শিরপীড়ায় আক্রান্ত ছিলেন। ফলে রণাঙ্গনে অংশগ্রহণ করিতে পারেন নাই। সুতরাং এই অবস্থায় মুহাজির কিংবা আনসারদের মধ্য হইতে একজনকে তিনি সেনাপতি নিযুক্ত করিতেন। ইহা ছিল সর্বাপেক্ষা অধিক শক্তিশালী ও দুর্জয় কিল্লা। ফলে অবরোধ দীর্ঘস্থায়ী হয় এবং বিজয় বিলম্বিত হইতে থাকে। একদিন রণাঙ্গনে আবু বকর সিদ্দীক (রা) গমন করেন এবং দুর্গ বিজয়ের আপ্রাণ চেষ্টা করেন, কিন্তু দুর্গ জয় হইল না। রাসূলুল্লাহ (স) ঘোষণা করেন, আগামী কল্য আমি রণাঙ্গনের পতাকা এমন এক ব্যক্তির হাতে তুলিয়া দিব অথবা বলিলেন, আগামী কল্য এমন এক ব্যক্তি পতাকা গ্রহণ করিবে যে আল্লাহ ও রাসূল (স)-কে ভালবাসে এবং আল্লাহ ও রাসূলও তাহাকে ভালবাসেন। তাহাকেই মহান আল্লাহ এই দুর্গ বিজয়ের গৌরব প্রদান করিবেন।
সকল সাহাবী রাত্রিতে পরস্পর আলোচনা করেন যে, কাহার ভাগ্যে আগামী কল্য রণ-পতাকা জুটিবে? সকালে সাহাবীগণের সকলেই এই দুর্লভ ভাগ্যের প্রত্যাশায় রাসূলুল্লাহ (স)-এর নিকট আগমন করেন। তখন তিনি জিজ্ঞাসা করিলেন, 'আলী কোথায়? সকলে বলিলেন, চোখ উঠা রোগের কারণে তাহার চক্ষুতে দারুণ ব্যথা। তিনি আসিতে সক্ষম হইবেন না। রাসূলুল্লাহ (স) বলিলেন, তাহাকে ডাকিয়া আন। অতঃপর তিনি উপস্থিত হইলে রাসূলুল্লাহ (স) স্বীয় মুখ নিঃসৃত লালা তাহার চক্ষুতে লাগাইয়া দিলেন এবং আল্লাহর দরবারে দু'আ করিলেন। সঙ্গে সঙ্গে তাহার চক্ষু এমনভাবে নিরাময় হয় যেন পূর্বে কখনও চক্ষুর কোন রোগই ছিল না। অতঃপর 'আলী (রা)-কে সম্বোধন করিয়া বলিলেনঃ শত্রুর নিকট যাও। প্রথমে ইসলামের দা'ওয়াত দাও এবং আল্লাহর অধিকারসমূহ সম্পর্কে তাহাদিগকে বুঝাও। হে 'আলী! যদি তোমার মাধ্যমে এক ব্যক্তিও হিদায়াতপ্রাপ্ত হয়, তাহা হইলে উহা হইবে তোমার জন্য এক বিরাট নি'মত ও সাফল্য (আসাহহুস সিয়ার, পৃ. ১৯০)। আল-বিদায়া ওয়ান-নিহায়া গ্রন্থে ইমাম বুখারীর উক্ত বর্ণনার সাথে এই কথাও আছে, 'আলী বলিলেন, আমি কি রাসূলুল্লাহ (স) হইতে পিছনে পড়িয়া থাকিব? সুতরাং তিনি রাসূলুল্লাহ (স)-এর সহিত মিলিত হইলেন। (বুখারী, ২খ, ৬০৫)।
ইমাম নাসাঈ ও মুসলিম সূত্রে বর্ণিত এক হাদীছে আবূ হুরায়রা (রা) বলেন, রাসূলুল্লাহ (স) কর্তৃক উপরিউক্ত ঘোষণা শ্রবণ করিবার পর উমার (রা) বলেনঃ আমি ঐ দিন ব্যতীত আর কোন দিনই নেতৃত্ব লাভের আকাঙ্খা করি নাই। রাসূলুল্লাহ (স) 'আলী (রা)-কে এই অভিযানে প্রেরণ করিয়া বলিলেনঃ "যাও, যুদ্ধ কর, যতক্ষণ না বিজয় লাভ করিবে, এদিক সেদিক দৃষ্টিপাত করিও না।” 'আলী (রা) বলিলেন, কতক্ষণ পর্যন্ত লড়াই করিব? রাসূলুল্লাহ (স) বলিলেনঃ ইহাদিগের সহিত লড়াই করিতে থাকিবে যেই পর্যন্ত না ইহারা সাক্ষী দিবে যে, আল্লাহ ব্যতীত কোন ইলাহ নাই এবং মুহাম্মাদ আল্লাহর বান্দা ও রাসূল। উহারা যখন এই সাক্ষ্য দিবে তখন আমাদিগের হাত হইতে তাহাদের রক্ত ও সম্পদ রক্ষা পাইবে (আল-বিদায়া ওয়ান-নিহায়া, ২/৪খ., পৃ. ২১)। দিহলাবী বলেন, 'আলী (রা) রাসূলুল্লাহ (স)-এর এই সুসংবাদ শুনিয়া আল্লাহ্র দরবারে দু'আ করিলেন:
اللَّهُمَّ لَا مَا نِعَ لِمَا أَعْطَيْتَ وَلَا مُعْطَى لِمَا مَنَعْتَ.
“হে আল্লাহ! তুমি যাহা দান করিবে উহা কেহই রোধ করিতে পারিবে না এবং তুমি দিতে না চাহিলে কেহ দিতে পারিবে না।"
প্রথমে চক্ষুর রোগজনিত কারণে 'আলী (রা) খায়বার অভিযানে অংশগ্রহণ হইতে বিরত ছিলেন। তিনি মনে মনে ভাবিতেন, আমি যুদ্ধে উপস্থিত না ইইয়া ভাল কাজ করি নাই। সুতরাং তিনি সফরের প্রস্তুতি লইয়া মদীনা হইতে রওয়ানা করিলেন। পথিমধ্যে অথবা খায়বার পৌঁছিবার পর রাসূলুল্লাহ (স) তাহার আগমনী বার্তা পাইলেন। পরবর্তী দিনের সূচনাপর্বে রাসূলুল্লাহ (স) বলিলেন, আলীকে ডাক। সাহাবীগণ বলিলেন, তিনি এখানেই আছেন, কিন্তু তাহার চক্ষুর অসুস্থতার কারণে তিনি কাছের বস্তুও দেখিতে পান না। আদেশ হইল, তাহাকে আমার নিকট লইয়া আস। সালামা ইবনুল আকওয়া (রা) জিয়া তাহাকে হাত ধরিয়া রাসূলুল্লাহ (স)-এর নিকট লইয়া আসিলেন। অতঃপর রাসূলুল্লাহ (স) তাহার মাথা নিজ উরুর উপর রাখিলেন এবং নিজ মুখের লালা তাহার চক্ষুতে লাগাইয়া দিলেন ও দু'আ করিলেন। এই সময় তাঁহার চক্ষু হইতে ব্যথা সম্পূর্ণ দূরীভূত হইয়া গেল। ইহার পর আর কোন দিনই তাঁহার চক্ষু ও মাথাব্যথা হয় নাই। একটি বর্ণনায় পাওয়া যায়, রাসূলুল্লাহ (স) এই দু'আ করিয়াছিলেন :
اللَّهُمَّ اذْهَبْ عَنْهُ الْحَرَّ وَالْقَرِّ.
"হে আল্লাহ! তাহাকে গরম ও ঠাণ্ডার প্রকোপ হইতে রক্ষা করিও”।
ইব্‌ন আবী লায়লা বলেন, ইহার ফলে 'আলী (রা) অসহনীয় গরমের দিনে পশমী কাপড় পরিতেন এবং হিমেল শীতে হালকা-পাতলা কাপড় পরিধান করিতেন। ইহাতে তাঁহার শারীরিক কোন ক্ষতি হইত না। 'আলী (রা) শারীরিকভাবে সুস্থ হইয়া উঠিবার পর রাসূলুল্লাহ (স) নিজের খাস বর্ম তাঁহাকে পরাইয়া দিলেন এবং যুল-ফিকার তাঁহার হস্তে তুলিয়া দিয়া বলিলেন, "যাও, পিছপা হইও না যতক্ষণ না তোমার হাতে দুর্গ বিজিত হয়"।
অতঃপর 'আলী (রা) সামরিক পতাকা হস্তে ধারণ করিয়া রওয়ানা হইলেন এবং উহা একটি প্রস্তরময় টিলায় স্থাপন করিলেন। জনৈক ইয়াহুদী শাস্ত্রক দুর্গের উপর দাঁড়াইয়া এই দৃশ্য অবলোকন করিয়া জিজ্ঞাসা করিল, ওহে পতাকাধারী ব্যক্তি! আপনি কে? আপনার নাম কি? তিনি বলিলেন, আমি 'আলী ইব্‌ন আবী তালিব। অতঃপর ঐ ব্যক্তি স্বগোত্রীয়দেরকে বলিল, "তাওরাতের শপথ! তোমরা এই ব্যক্তির নিকট পরাজয় বরণ করিবে। সে বিজয়লাভ ব্যতিরেকে প্রত্যাবর্তন করিবে না"। সে আলী (রা)-এর গুণাবলী ও বীরত্ব সম্পর্কে অবগত ছিল।
'আলী (রা)-এর বিরুদ্ধে দুর্গ হইতে সর্বপ্রথম বীর ইয়াহুদী মারহাবের ভাই হারিছ বাহির হইয়াছিল। তাহার বর্শা ছিল অত্যন্ত ভারী। বাহির হইবামাত্র সে যুদ্ধ আরম্ভ করিল এবং কয়েকজন মুসলমানকে শহীদ করিল। অতঃপর 'আলী (রা) তাহার নিকটে পৌছিয়া গেলেন এবং একটিমাত্র আঘাতে তাহাকে হত্যা করিলেন। মারহাব তাহার ভ্রাতার হত্যার খবর শুনিয়া খায়বারের বীরদিগের একটি দল লইয়া অস্ত্রে সজ্জিত হইয়া প্রতিশোধ লইতে বাহির হইল। কথিত আছে যে, মারহাব খায়বারবাসীদের মধ্যে অত্যন্ত পরাক্রমশালী সুস্বাস্থ্যের অধিকারী যুদ্ধবাজ ব্যক্তি ছিল। বীরত্বে সে খায়বারবাসীদের মধ্যে অপ্রতিদ্বন্দ্বী ছিল। ঐদিন সে দুইটি বর্ম পরিধান করিয়া দুইটি পাগড়ী মাথায় বাঁধিয়া দুইখানা তরবারি হস্তে লইয়া বীরদর্পে রণক্ষেত্রে নিম্নোক্ত কবিতাটি আবৃত্তি করিতে করিতে বাহির হয় :
قَدْ عَلِمَتْ خَيْبَرُ أَنِّي مَرْحَبُ + شَاكِي السَّلَاحِ بَطَلَ مُجَرِّبٌ.
"খায়বারবাসী জানে আমি মারহাব, যে রণনিপুণ এবং মহাবীর হিসাবে পরীক্ষিত"। 'আলী (রা) এতদশ্রবণে আবৃত্তি করিলেন:
أَنَا الَّذِي سَمَّتْنِي أَمِي حَيْدَرَهُ + ضَرْغَامُ أَجَامٍ وَكَيْتُ قَسْوَرَهُ.
"আমি সেই বীর যাহার মাতা তাহার নাম রাখিয়াছেন হায়দার। আমি গভীর বনের সিংহ" (মাদারিজুন-নুবুওয়াত, পৃ. ৪১৩, ৪১৪)।
'আলী (রা) ও মারহাব কর্তৃক আবৃত্তিকৃত এই কবিতা বিভিন্ন গ্রন্থে ভিন্ন ভিন্নভাবে উদ্ধৃত হইয়াছে। দানাপুরীর গ্রন্থে মারহাব আবৃত্তি করিতে করিতে বাহির হয় নিম্নরূপ:
أَنَا الَّذِي سَمَّتْنِي أَمِّي مَرَحَبٌ + شَاكِ السَّلَاحِ بَلْ مُجَرَّبٌ.
"আমি সেই বীর যাহার মাতা তাহার নাম রাখিয়াছেন মারহাব। যিনি রণনিপুণ এবং মহা বীরবর হিসাবে পরীক্ষিত”
'আলী (রা) এতদশ্রবণে আবৃত্তি করিলেন: أَنَا الَّذِي سَمُتْنِي أُمِّي حَيْدَرَةَ + كَلَيْثِ غَابَاتِ كَرِيْهِ الْمَنْظَرَه.
"আমি সেই বীরবর যাহার মাতা তাহার নাম রাখিয়াছেন হায়দার, যে বন্য হিংস্র সিংহতুল্য এবং যাহার চেহারা অত্যন্ত ভয়ঙ্কর" (আসাহহুস সিয়ার, পৃ. ১৯১)।
ইব্‌ন কাছীর এই কবিতাদ্বয়ে আরও কিছু বৃদ্ধি করিয়া উল্লেখ করিয়াছেন: মারহাব এই কবিতা আবৃত্তি করিতে করিতে বাহির হইল: قَدْ عَلِمَتْ خَيْبَرُ أَنِّي مَرْحَب - شاك السلاح بَطَلَ مُجَرَّبٌ إِذَ اللُّبُوتُ أَقْبَلَتْ تَلَهَبْ - وَاحْجَمَتْ عَنْ صَولَةِ الْمُغَلَبِ.
উত্তরে আলী (রা) আবৃত্তি করিলেন: أنَا الَّذِي سَمَتْنِي أَمِّي حَيْدَرَهُ + كَلَيْتُ غَابَت شَدِيدٌ الْقَسْوَرَةَ اكيلُكُمْ بِالصَّاعِ كَيْلَ السَّنْدَرَةِ
(আল-বিদায়া ওয়ান-নিহায়া, ২/৪খ., পৃ. ১৮৮, ১৮৯)।
মারহাব সংকল্প করিল, সে আগেই 'আলী (রা)-এর মাথায় আঘাত হানিবে। কিন্তু 'আলী (রা) লাফ দিয়া উঠিয়া যুল-ফিকার দিয়া তাহার মাথায় এত জোরে আঘাত হানেন যে, বর্মসহ মারহাবের মাথা কাটিয় গলদেশ পর্যন্ত দ্বিখণ্ডিত হইয়া যায়। এক বর্ণনায় আছে, উরু পর্যন্ত দুই টুকরা হইয়া যায়। অপর এক বর্ণনায় আছে যে, তাহার বাহনের গদি পর্যন্ত দ্বিখণ্ডিত হইয়া যায়।
অতঃপর মুসলিম বাহিনী তাঁহার নেতৃত্বে রণক্ষেত্রে অবতরণ করিয়া ইয়াহুদীদিগকে হত্যা করিতে লাগিল। সাতজন ইয়াহুদী বীরকে ঐ সময় হত্যা করা হয়। অবশিষ্টরা পরাজয় মানিয়া দুর্গ অভ্যন্তরে প্রবেশ করিতে লাগিল। আলী (রা) তাহাদিগকে ধাওয়া করিয়া অগ্রসর হইতেছিলেন। এমতাবস্থায় জনৈক ইয়াহুদী তাঁহার হাতে আঘাত হানিল। ফলে তাঁহার ঢাল ভূমিতে পড়িয়া গেল এবং অপর এক ইয়াহুদী তাহা উঠাইয়া লইয়া পলায়ন করিল। এই প্রেক্ষিতে আলী (রা)-এর মধ্যে আল্লাহ্র পক্ষ হইতে এমনই রূহানী শক্তি সঞ্চারিত হইল যে, তিনি দুর্গ পার্শ্বস্থিত গর্ত অতিক্রম করিয়া একেবারে দুর্গের দরজায় পৌঁছিয়া গেলেন এবং লৌহ নির্মিত দরজার একাংশ উপড়াইয়া ইহাকে ঢাল বানাইয়া যুদ্ধ অব্যাহত রাখিলেন।
ইমাম বাকির হইতে বর্ণিত আছে যে, আলী (রা) যখন কপাট উপড়াইবার জন্য টান দেন তখন সমগ্র দুর্গ হেলিয়া উঠে। এমন কি সাফিয়্যা বিন্ত হুয়ায় ইব্‌ন আখতাৰ খাট হইতে পড়িয়া যান এবং মুখমণ্ডলে আঘাত পান।
সীরাতবিদগণ বলেন: যুদ্ধশেষে 'আলী (রা) বেশ দূরে এই দরজা নিক্ষেপ করিলেন। ইহাও কথিত আছে যে, যুদ্ধশেষে আটজন শক্তিশালী ব্যক্তি একত্রে মিলিত হইয়া দরজাটি উল্টাইতে পারেন নাই। এমনকি চল্লিশজন মিলিয়া উহা উঠাইতে চাহিলেন, কিন্তু সক্ষম হন নাই। মাদারিজুন নুবুওয়াতে আছে যে, দরজাটির ওজন ছিল আট মন। তবে কোন কোন সীরাতবিদের মতে এই বর্ণনাগুলি দুর্বল, অনুপযোগী। 'আল্লামা সাখাবী মাকাসিদে হাসানা গ্রন্থে বলিয়াছেন, كُلُّهَا وَاهْيَةً "এই সকল বর্ণনা অলীক” (শিবলী নু'মানী ও সুলায়মান নাদবী, সীরাতুন্নবী, ১৯৮৫ খৃ.)।
মোটকথা, যখন কামূস দুর্গসহ অন্যান্য দুর্গে অবস্থানকারিগণ 'আলী (রা)-এর এই শৌর্য-বীর্য দেখিল তখন তাহারা اَلْأَمَانُ الْأَمَانُ (নিরাপত্তা, নিরাপত্তা) বলিয়া ফরিয়াদ করিতে লাগিল। 'আলী (রা) তাহাদিগকে রাসূলুল্লাহ (স)-এর ইঙ্গিতে এই শর্তের উপর নিরাপত্তা দিলেন যে, প্রত্যেক ব্যক্তি উটের উপর খাদ্য বোঝাই করিয়া শহর ত্যাগ করিয়া চলিয়া যাইবে এবং নগদ মুদ্রা, সাজ-সরঞ্জাম ও অস্ত্রপাতি মুসলমানগণের জন্য রাখিয়া যাইবে। কোন জিনিস লুকাইয়া রাখিবে না। যদি এমন কোন জিনিস বাহির হয় যাহার তথ্য দেওয়া হয় নাই তাহা হইলে তাহাদের নিরাপত্তা প্রত্যাহর করা হইবে।
রাসূলুল্লাহ (স)-এর নিকট যখন বিজয় সংবাদ পৌছিল তখন তিনি ইহার জন্য আল্লাহর শোকর আদায় করিলেন। কারণ ইহা ছিল ইসলাম প্রসারের এক মহাসোপান। 'আলী (রা) রাসূলুল্লাহ (স)-এর দরবারে উপস্থিত হইলে তিনি স্বীয় তাঁবু হইতে বাহির হইয়া তাহাকে স্বাগত জানাইলেন, আলিঙ্গন করিলেন, চক্ষু যুগলের মধ্যবর্তী স্থান চুম্বন করিলেন এবং বলিলেন:
بَلَغَنِي تَنَاءَكَ الْمَشْكُورُ وَضِيْعَكَ الْمَذْكُورُ قَدْ رَضِيَ اللَّهُ عَنْهُ وَرَضِيْتُ أَنَا عَنْكَ.
"আমার নিকট তোমার কৃতজ্ঞতাপূর্ণ প্রশংসা পৌছিয়াছে, তোমার শৌর্য-বীর্ষের বর্ণনা করা হইয়াছে, আল্লাহ তাহার প্রতি সদয় হইয়াছেন এবং আমি তোমার উপর সন্তুষ্ট"।
তখন 'আলী (রা) কাঁদিতে লাগিলেন। রাসূলুল্লাহ (স) জিজ্ঞাসা করিলেন, ইহা কিসের কান্না, আনন্দের না বেদনার? 'আলী (রা) বলিলেন, ইহা আনন্দের কান্না। আপনি আমার উপর সন্তুষ্ট আছেন, ইহাতে কি আমি আনন্দিত হইব না? রাসূলুল্লাহ (স) বলিলেনঃ শুধু আমিই তোমার উপর খুশী নহি বরং আল্লাহ, জিবরীল, মীকাঈল এবং সকল ফেরেশতা তোমার উপর সন্তুষ্ট (মাদারিজুন নুবুওয়া, প্রাগুক্ত)।
ইব্‌ন কায়্যিম আল-জাওযিয়্যা (র) বলেন, সহীহ মুসলিমে এইভাবে উল্লেখ আছে যে, 'আলী (রা) মারহাবকে হত্যা করিয়াছেন। কিন্তু মূসা ইব্‌ন উকবা, ইমাম যুহরী ও আবুল আসওয়াদের উদ্ধৃতিতে এবং ইউনুস ইব্‌ন বুকায়র ইবন ইসহাক সূত্রে উল্লেখ করিয়াছেন যে, জাবির ইবন আবদিল্লাহ বর্ণনা করিয়াছেন যে, মারহাবকে মুহাম্মাদ ইবন মাসলামা (রা) হত্যা করেন। মারহাব যখন দুর্গের ভিতর হইতে বীরদর্পে বাহির হইয়া তাহার মুকাবিলার জন্য আহ্বান করে তখন রাসূলুল্লাহ (স) জিজ্ঞাসা করিলেন, তাহাকে মুকাবিলা করিতে কে প্রস্তুত আছ? মুহাম্মাদ ইবন মাসলামা (রা) বলিলেন, হে আল্লাহর রাসূল! আমি তাহার মুকাবিলায় প্রস্তুত। এই ব্যক্তি আমার ভ্রাতা (মাহমূদ ইব্‌ন মাসলামা)-কে গতকাল শহীদ করিয়াছে। রাসূলুল্লাহ (স) তাহাকে অনুমতি প্রদান করিলেন। তিনি যখন অগ্রসর হন তখন উভয়ের মধ্যবর্তী স্থানে একটি বৃক্ষ আড়াল হয়। উভয়ই একে অপরকে আঘাত হানার জন্য সুযোগের সন্ধান করিতে থাকেন। অবশেষে মুহাম্মাদ ইবন মাসলামা (রা) তাহাকে হত্যা করেন। সালামা ইব্‌ন সালামা ও মুজাম্মি' ইবন হারিছাও বলিয়াছেন যে, মুহাম্মাদ ইবন মাসলামা মারহাবকে হত্যা করেন।
ওয়াকিদী বলেন, মুহাম্মাদ ইবন মাসলামা (রা)-এর তরবারির আঘাতে মারহাবের দুই পা দ্বিখণ্ডিত হইয়া যায়। তারপর তিনি তাহাকে ছাড়িয়া দেন এবং বলেন, যন্ত্রণার স্বাদ উপভোগ কর, যেমন আমার ভ্রাতা যন্ত্রণা সহ্য করিয়াছে। তারপর আলী (রা) অগ্রসর হইয়া মারহাবের শিরোচ্ছেদ করেন। অতঃপর তিনি মারহাবের তরবারি এবং অন্যান্য আসবাবপত্র লইয়া রাসূলুল্লাহ (স)-এর নিকট আসিলেন। তাহারা দুইজন রাসূলুল্লাহ (স)-এর সম্মুখে মারহাবের পরিত্যক্ত আসবাবপত্রের মালিকানা লইয়া বিতর্কে জড়াইয়া পড়েন। রাসূলুল্লাহ (স) মুহাম্মাদ ইবন মাসলামাকে তাহার তরবারি, বর্শা ও শিরস্ত্রাণ ইত্যাদি সবকিছু দান করেন।
মারহাবের পর তাহার ভ্রাতা ইয়াসির অগ্রসর হয়। তাহার মুকাবিলার জন্য যুবায়র ইবনুল আওওয়াম (রা) অগ্রসর হন। এই সময় যুবায়রের মাতা সাফিয়্যা (রা) রাসূলুল্লাহ (স)-কে বলিলেন, হে আল্লাহর রাসূল! সে আমার পুত্রকে হত্যা করিয়া ফেলিবে। তিনি বলিলেনঃ না, তোমার পুত্র তাহাকে হত্যা করিবে। অবশেষে যুবায়র (রা) ইয়াসিরকে হত্যা করেন। কামূস দুর্গের অবরোধ প্রায় বিশদিন স্থায়ী ছিল। ইহা ছিল সর্বাধিক শক্তিশালী দুর্গ (যাদুল মা'আদ, ২খ., ১৩৪, ১৩৫; আত-তাবারী, তারীখুল উমাম ওয়াল-মুলুক, ২খ., ৯২, ৯৩)।
এই ব্যাপারে ইব্‌ন হাজার আসকালানী বলেন, ইমাম মুসলিম কর্তৃক বর্ণিত হাদীছের বিরোধিতা করেন অনেক সীরাতবিদ। ইবন ইসহাক, মূসা ইব্‌ন উকবা ও আল-ওয়াকিদী দৃঢ় প্রত্যয় ব্যক্ত করিয়াছেন যে, মারহাবকে যিনি হত্যা করিয়াছেন তিনি হইলেন মুহাম্মাদ ইব্‌ন মাসলামা। ইহার অনুকূলে ইমাম আহমাদ হাসান পর্যায়ের সনদে জাবির (রা) হইতে একটি হাদীছ বর্ণনা করিয়াছেন। কেহ কেহ বলেন, মুহাম্মাদ ইবন মাসলামা মারহাবের মুকাবিলা করিয়া তাহার দুইটি পা দ্বিখণ্ডিত করিয়াছিলেন। পরে আলী (রা) তাহাকে হত্যা করেন। কেহ কেহ বলেন, মুহাম্মাদ ইব্‌ন মাসলামা (রা) যাহাকে হত্যা করেন সে ছিল মারহাবের ভাই আল-হারিছ। কিন্তু কোন কোন বর্ণনাকারীর নিকট তাহা স্পষ্ট ছিল না। তাই এই বিভ্রান্তি ঘটিয়াছে। যদি এইরূপ না হইয়া থাকে তাহা হইলে মারহাবকে আলী (রা) হত্যা করিয়াছিলেন বলিয়া সহীহ মুসলিমে যে বর্ণনা রহিয়াছে তাহাকে অগ্রাধিকার দিতে হইবে (ফাতহুল বারী, ৭খ., ৪৮৭)।

লিঙ্ক শেয়ার করুন
close

লিঙ্ক কপি করুন

0:00
0:00