📘 সীরাত বিশ্বকোষ > 📄 মায়মূনা (রা)-এর সাথে রাসূলুল্লাহ (স)-এর বিবাহ

📄 মায়মূনা (রা)-এর সাথে রাসূলুল্লাহ (স)-এর বিবাহ


রাসূলুল্লাহ (স)-এর চাচা হযরত আব্বাস (রা)-এর স্ত্রী হযরত উম্মুল ফাদল, তাঁহার বোন হযরত মায়মুনার অভিভাবিকা ছিলেন। তাঁহারা উভয়ে ছিলেন হারিছের কন্যা। বিখ্যাত বীর খালিদ ইবনুল ওয়ালীদ-এর মা ছিলেন ইহাদের সহোদরা। হযরত মায়মূনা (রা)-এর বয়স তখন ছাব্বিশ বৎসর। হযরত উম্মুল ফাদল তাঁহার বোনকে উপযুক্ত পাত্রে পাত্রস্থ করার দায়িত্বভার ন্যস্ত করিলেন তাঁহার স্বামী হযরত আব্বাস (রা)-এর উপর।
উমরাতুল-কাযার সময় মুসলমানদের চালচলন দেখিয়া হযরত মায়মূনা ইসলামের প্রতি আকৃষ্ট হইয়া পড়েন এবং মনে মনে ইসলাম গ্রহণের সিদ্ধান্ত নেন। হযরত আব্বাস (রা) রাসূলুল্লাহ (স)-কে হযরত মায়মুনার ইসলাম গ্রহণের সিদ্ধান্তের কথা অবহিত করিলেন এবং তাঁহাকে বিবাহ করার জন্য রাসূলুল্লাহ (স)-এর নিকট প্রস্তাব পেশ করিলেন। তিনি চাচা আব্বাসের প্রস্তাব গ্রহণ করিলেন। চার শত দিরহামের মহরের বিনিময়ে বিবাহ সম্পন্ন হইল। মহর স্বয়ং হযরত আব্বাস (রা) পরিশোধ করিলেন। কোন কোন বর্ণনানুসারে বিবাহের প্রস্তাব স্বয়ং রাসূলুল্লাহ (স) হযরত জাফর-এর মাধ্যমে পাঠাইয়াছিলেন। হযরত আব্বাস (রা) প্রস্তাব গ্রহণ করেন এবং বিবাহ পড়াইয়া দেন (আল-বিদায়া ওয়ান-নিহায়া, ৪খ., পৃ. ৬১৯)।
এই বিষয়ে মতবিরোধ রহিয়াছে যে, হযরত মায়মূনা (রা)-র সঙ্গে রাসূলুল্লাহ (স)-এর এই বিবাহ 'উমরাহ সমাপ্ত করিয়া ইহরামমুক্ত হওয়ার পর না ইহরাম অবস্থায় সম্পূর্ণ হইয়াছিল? সহীহ বুখারীতে হযরত আবদুল্লাহ ইব্‌ন আব্বাস (রা)-এর একাধিক বর্ণনা এই যে, রাসূলুল্লাহ (স)-এর এই বিবাহ ইহরাম অবস্থায়, পক্ষান্তরে সহীহ মুসলিমের বর্ণনায় ইহরাম হইতে হালাল হওয়ার পর সম্পন্ন হইয়াছিল। হাফিজ ইব্‌ন হাজার আসকালানী বুখারীর বর্ণনাকে অগ্রাধিকার দিয়াছেন (ফাতহুল বারী, ৭খ., পৃ. ৩৮৫)।
সন্ধির শর্তাযায়ী তিন দিন পূর্ণ হইল। রাসূলুল্লাহ (স) হযরত মায়মূনা (রা)-এর ওয়ালীমা (বিবাহোত্তর বিবাহভোজ) করার জন্য কুরায়শদের নিকট আরও কিছু সময় থাকার অনুমতি চাওয়ার মনস্থ করিলেন। কুরায়শদের পক্ষ হইতে সুহায়ল ইন্ন আমর ও হুওয়ায়তির্ ইব্‌ আবদুল উয্যা আসিয়া হযরত আলী (রা)-কে বলিল, তিন দিন পূর্ণ হইয়া গিয়াছে। আপনি মুহাম্মাদকে বলুন, তিনি যেন মক্কা হইতে সঙ্গী-সাথীসহ চলিয়া যান। অপর রিওয়ায়াতে আসিয়াছে, মহানবী (স) আনসারদের সাথে বসিয়া কথা বলিতেছিলেন। এমন সময় কুরায়শ প্রতিনিধিদ্বয় আসিয়া বলিল, তিন দিন পূর্ণ হইয়া যাইতেছে; আপনি যথাসময়ে আমাদের ভূমি ছাড়িয়া চলিয়া যাইবেন। হযরত সা'দ ইবন উবাদা (রা) বলিলেন, তুমি অসত্য বলিয়াছ। ভূমি তোমার নহে, তোমার পূর্বপুরুষদেরও নহে। ভূমি হইল আল্লাহ্, আমরা যাইব না। তাঁহার কথা শুনিয়া রাসূলুল্লাহ (স) হাসিয়া বলিলেন, সা'দ! তুমি আমার গোত্রের লোকজনকে কষ্ট দিও না (ইব্‌ন হিশাম, পৃ. ৩৭২; আল-বিদায়া ওয়ান-নিহায়া, ৪খ., পৃ. ৬২০)।
তৎপর রাসূলুল্লাহ (স) বলিলেন, আমি মায়মূনার ওয়ালীমা করার ইচ্ছা করিয়াছি। আশা করি আপনারাও তাহাতে যোগদান করিবেন। এইজন্য কিছু সময় চাহিতেছি। তাহারা অত্যন্ত কর্কশ ভাষায় তাঁহার প্রস্তাব প্রত্যাখ্যান করিয়া বলিল, আপনি সময়মত শহর হইতে বাহির হইয়া যান। আমরা আপনার নিমন্ত্রণ গ্রহণ করিব না (আল-বিদায়া ওয়ান-নিহায়া, ৪খ., পৃ. ৬২০; সীরাতুল মুস্তাফা, ২খ., পৃ. ৪৪৮)।

📘 সীরাত বিশ্বকোষ > 📄 মদীনায় প্রত্যাবর্তন

📄 মদীনায় প্রত্যাবর্তন


রাসূলুল্লাহ (স) সন্ধির প্রতি সম্মান প্রদর্শন করিয়া কুরায়শদের মক্কা ত্যাগের দাবির ব্যাপারে আর কোন প্রকার আপত্তি করিলেন না। তিনি হযরত আবূ রাফে' (রা)-র মাধ্যমে সাহাবীগণকে মদীনা অভিমুখে রওয়ানা দেওয়ার নির্দেশ প্রদান করিলেন। যেরূপ শান-শওকতের সহিত তিনি সহাবীগণকে লইয়া মক্কায় প্রবেশ করিয়াছিলেন, অনুরূপভাবেই মক্কা হইতে প্রত্যাবর্তন করিলেন। দুই হাজার সাহাবী দল বাঁধিয়া আগাইয়া চলিলেন। মহানবী (স) হযরত মায়মূনা (রা)-কে সন্ধ্যার পর কাফেলায় লইয়া আসিবার জন্য স্বীয় দাস হযরত আবু রাফে' (রা)-কে প্রেরণ করিলেন।
মক্কা হইতে প্রায় দশ মাইল দূরে অবস্থিত সারিফ (سرف) নামক স্থানে পৌছিয়া কাফেলা বিশ্রামের জন্য তাঁবু গাড়িল। হযরত আবু রাফে এখানে হযরত মায়মূনা (রা) লইয়া আসিলেন। এখানেই মায়মূনার সহিত রাসূলুল্লাহ (স)-এর প্রথম রাত্রিযাপন হইল। উল্লেখ্য যে, হযরত মায়মূনা (রা) ছিলেন তাঁহার সর্বশেষ স্ত্রী। তিনি মহানবী (স) ইন্তিকালের পর পঞ্চাশ বৎসর জীবিত ছিলেন। আল্লাহর অপার মহিমা! যে 'সারিফ' নামক স্থানে রাসূলুল্লাহ (স)-এর সহিত তাহার প্রথম রজনী যাপিত হইয়াছিল, হিজরী ৬৩ সালে, মতান্তরে ৬০ সালে ঠিক সেই স্থানেই তাঁহার ইন্তিকাল হয় এবং সেখানেই তাঁহার কবর বিদ্যমান (যাদুল মাআদ, ১খ., পৃ. ১৭২; আল-বিদায়া ওয়ান-নিহায়া, ৪খ., পৃ. ৬২৪)।
উম্মুল মু'মিনীন হযরত মায়মূনা (রা) মদীনায় আসিবার সময় তাঁহার সহিত তাহার দুই বোনকেও লইয়া আসেন। তাঁহাদের একজনের নাম হযরত সালমা (রা)। তিনি ছিলেন সয়্যেদুশ শুহাদা হযরত হামযা (রা)-এর বিধবা স্ত্রী। অপরজন হযরত আম্মারাহ (রা); তখনও তিনি অবিবাহিতা ছিলেন।
রাসূলুল্লাহ (স) 'উমরাহর দীর্ঘ সফর শেষ করিয়া যিলহজ্জ মাসে মদীনায় ফিরিয়া আসেন।

📘 সীরাত বিশ্বকোষ > 📄 হামযা (রা)-এর কন্যা উমামার ঘটনা

📄 হামযা (রা)-এর কন্যা উমামার ঘটনা


রাসূলুল্লাহ (স) যখন মক্কা হইতে মদীনা প্রত্যাবর্তনের উদ্যোগ নিলেন তখন হযরত হামযা (রা)-এর শিশু মেয়ে 'উমামা' চাচাজান, চাচাজান বলিয়া চিৎকার করিতে করিতে দৌঁড়াইয়া আসিয়া রাসূলুল্লাহ (স)-এর নিকট উপস্থিত হইল। হযরত আলী (রা) তাহাকে কোলে তুলিয়া লইয়া হযরত ফাতিমা (রা)-কে দিলেন এবং বলিলেন, দেখ, এই আমার চাচার মেয়ে। সর্বপ্রথম সে আমার ক্রোড়ে আসিয়াছে। কাজেই আমরা তাহাকে লালন-পালন করিব। কিন্তু হযরত আলী (রা)-এর ভ্রাতা হযরত জা'ফার ইব্‌ন আবু তালিব (রা) বলিলেন, উমামা আমার চাচার মেয়ে। উপরন্তু তাহার খালা আমার স্ত্রী। সুতরাং আমিই তাহার লালন-পালনের দায়িত্বভার গ্রহণ করিব। এদিকে হযরত যায়দ ইব্‌ন হারিছা (রা) বলিলেন, দেখুন, রাসূলুল্লাহ (স) আমাকে হযরত হামযার সহিত ভ্রাতৃত্ব বন্ধনে আবদ্ধ করিয়াছিলেন। এইজন্য উমামা আমার ভ্রাতুষ্পুত্রী, আমিই তাহার লালন-পালনের ভার গ্রহণ করিব। ইহা লইয়া তাঁহাদের মধ্যে বিতর্ক শুরু হইয়া গেল। মহানবী (স) সর্বদিক বিবেচনা করিয়া হযরত জা'ফরের স্ত্রী হযরত আসমার অনুকূলে রায় প্রদান করিলেন। যেহেতু মেয়ের খালা জা'ফরের ঘরে এবং খালা মাতৃতুল্য বিধায় সে সেখানে বেশী আদর পাইবে। উপরন্তু সে মেয়ে হওয়ার কারণে তাহার খালার তত্ত্বাবধানে লালিত-পালিত হইতে অধিক সাচ্ছন্দ্য বোধ করিবে (আল-বিদায়া ওয়ান-নিহায়া, ৪খ., পৃ. ৬২০)।
উমামার লালন-পালনের দায়িত্বভার গ্রহণের দাবি করিয়াছিল তিনজন। কিন্তু রাসূলুল্লাহ (স) সর্বদিক বিবেচনা করিয়া ফয়সালা করিয়াছেন চতুর্থ একজনের অনুকূলে। তাই আকাংখা বঞ্চিত হইয়া তাহারা মনক্ষুন্ন হইতে পারেন এই ভাবিয়া রাসূলুল্লাহ (স) প্রত্যেককে সম্বোধন করিয়া বলিলেন, হে আলী! জামাতা ও চাচাত ভাই হওয়ার কারণে তুমি আমার এবং আমি তোমার। হযরত জা'ফর (র)-কে সান্তনা দিয়া বলিলেন: হে জা'ফর! চারিত্রিক ও দৈহিক আকৃতিতে তুমি আমার সদৃশ। হযরত যায়দ ইবন হারিছা (রা)-কে ডাকিয়া বলিলেন: হে যায়দ! তুমি আমার (ধর্মীয়) ভাই ও বন্ধু (যাদুল মা'আদ, ১খ., পৃ. ১৫২; আল-বিদায়া ওয়ান-নিহায়া, ৪খ., ৬২৬)।
উক্ত ঘটনায় হযরত যায়দ ইবন হারিছা (রা) ভ্রাতৃত্বের দাবি করিয়াছেন। তাহা ছিল এই যে, মহানবী (স) হিজরতের পূর্বে মক্কায় অবস্থানকালে মুসলমানদের পরস্পরের মধ্যে ভ্রাতৃত্ব বন্ধন গড়িয়া দিয়াছিলেন। তবে এই ভ্রাতৃত্ব কেবল মুহাজিরদের মধ্যেই সীমাবদ্ধ ছিল। হিজরতের পর মদীনায় তিনি পুনরায় ভ্রাতৃত্ব বন্ধন গড়িয়া দিয়াছিলেন। ইহা ছিল মুহাজির ও আসনারদের মধ্যে ব্যাপকভাবে (আসাহহুস সিয়ার, পৃ. ২৩১)।
উল্লেখিত ঘটনা হইতে প্রমাণিত হয় যে, ইসলামের প্রভাবে মুসলিম মন-মস্তিষ্কে কত বিরাট বিপ্লব সৃষ্টি হইয়াছিল। এত দিন যাহারা কন্যা সন্তানকে জীবন্ত পুঁতিয়া ফেলিত, কন্যা সন্তান জন্ম হওয়াকে নিজেদের ও বংশের জন্য কলংকজনক মনে করিত, কন্যার পিতা হওয়াকে লজ্জার বিষয় বলিয়া গণ্য করিত, আজ ইসলামের শিক্ষার প্রভাবে তাহারাই একটি কন্যা সন্তানের লালন-পালনের জন্য নিজেদের মধ্যে প্রতিযোগিতা পর্যন্ত করিতেছেন।

📘 সীরাত বিশ্বকোষ > 📄 মক্কায় উমরাতুল কাযার প্রভাব

📄 মক্কায় উমরাতুল কাযার প্রভাব


মুসলমানদের প্রত্যেকেই ছিলেন ইসলামী আদর্শের মূর্ত প্রতীক। তাহারা জামাআতবদ্ধ হইয়া নামায আদায় করিতেছিলেন। এই নামাযের মাধ্যমে তাহাদের সকল গর্ব-অহমিকা' দূর হইয়া যাইতেছিল। তাহাদের স্বাস্থ্যবানগণ দুর্বলদের সহায়তা করিতেছিলেন। বিত্তবানগণ বিত্তহীনদের সাহায্য করিতেছিলেন। রাসূলুল্লাহ (স) একজন দয়ালু পিতার মত তাহাদের মধ্যে চলাফেরা করিতেছিলেন। কাহারও সাথে স্মিত হাস্যে কথা বলিতে ছিলেন, আবার কাহারও সাথে কৌতুক করিতেছিলেন। তবে সে কৌতুকও ছিল অর্থপূর্ণ।
কুরায়শগণ পাহাড়-পর্বতের চূড়ায় দাঁড়াইয়া ও বসিয়া এক মনে এক দৃষ্টিতে বিস্ময়ের সাথে এ দৃশ্যগুলি দেখিতেছিল। সত্যিই ইহা ছিল ইতিহাসের এক অভূতপূর্ব বিস্ময়কর দৃশ্য। তাহারা দেখিতেছিল, মুসলমানগণ মদ পান করেন না। কোন অবৈধ বস্তুই তাহারা স্পর্শ করেন না। কোন প্রকার ঝগড়া-ফাসাদে তাহারা লিপ্ত হন না। তাহারা আল্লাহ্র কোন নির্দেশ অমান্য করেন না, বরং তাহা পালনের জন্য সর্বদা সচেষ্ট থাকেন। এই দৃশ্য কুরায়শদের অন্তরে কী পরিমাণ রেখাপাত করিয়াছিল তাহা সহজেই অনুমেয়। উমরাতুল-কাযা পালনের পরবর্তী ঘটনাবলী ইহার প্রমাণ বহন করে।
খালিদ ইব্‌দুল ওয়ালীদ ছিলেন কুরায়শদের শ্রেষ্ঠতম বীর। উহুদ প্রান্তরে তিনিই যুদ্ধের গতি পাল্টাইয়া দিয়াছিলেন কুরায়শদের অনুকূলে। উমরাতুল-কাযার কিছু দিন পর তিনি কুরায়শদের এক সমাবেশে ভাষণ দিতে গিয়া বলিলেন, প্রত্যেক জ্ঞানী ব্যক্তির নিকট একথা স্পষ্ট হইয়া গিয়াছে যে, মুহাম্মাদ (স) কবি কিংবা যাদুকর নহেন। তাঁহার বাণী বিশ্ব-প্রতিপালকেরই ওহী। তাঁহাকে অনুসরণ করা প্রত্যেক লোকের একান্ত কর্তব্য। সমাবেশের লোকজন তাঁহার বক্তব্যে আপত্তি জানাইল। তিনি নির্ভীক কণ্ঠে ঘোষণা করিলেন, তোমাদের আপত্তিই হইল অজ্ঞতা-প্রসূত। এখন আমার নিকট সত্য প্রকাশিত হইয়াছে। আমি ইসলাম গ্রহণ করিলাম। হযরত খালিদের পর বহু সংখ্যক কুরায়শ ইসলামের সুশীতল ছায়াতলে আশ্রয় গ্রহণ করিতে লাগিলেন। এসবই ছিল উমরাতুল-কাযা পালনের সময় রাসূলুল্লাহ (স) ও মুসলমানগণকে অতি নিকট হইতে পর্যবেক্ষণ করার ও জানার প্রভাব ও সুফল।

লিঙ্ক শেয়ার করুন
close

লিঙ্ক কপি করুন

0:00
0:00