📘 সীরাত বিশ্বকোষ > 📄 হুদায়বিয়ার সন্ধির ফলাফল

📄 হুদায়বিয়ার সন্ধির ফলাফল


১। এই সন্ধি ছিল মুসলমানদের জন্য একটি ঐতিহাসিক রাজনৈতিক বিজয়। কারণ এই সন্ধির পূর্ব পর্যন্ত কুরায়শগণ রাসূলুল্লাহ (স)-কে একজন বিদ্রোহীর চাইতে অধিক গুরুত্ব দিত না। কিন্তু হুদায়বিয়ার সন্ধির মাধ্যমে তাহারা রাসূলুল্লাহ (স)-কে তাহাদের এমন একজন প্রতিপক্ষ হিসাবে স্বীকার করিয়া লইতে বাধ্য হইল যাঁহার সহিত সন্ধি করিতে হয়। প্রকারান্তরে ইহা ছিল "ইসলামকে একটি নূতন আবির্ভূত শক্তি" হিসাবে তাহাদের স্বীকৃতি।
২। এই সন্ধির শর্ত অনুযায়ী আগামীতে মুসলমানদের জন্য কা'বাঘর যিয়ারত, তাওয়াফ ও হজ্জ পালনের অধিকার স্বীকার করিয়া লওয়ার অর্থ হইল : মক্কাবাসীর নিকট ইসলামও একটি দীন হিসাবে স্বীকৃতি লাভ করা। অথচ ইতিপূর্বে তাহারা ইসলামকে দীন হিসাবে স্বীকারই করিত না।
৩। এই সন্ধির একটি ধারায় "দশ বৎসর পর্যন্ত উভয় পক্ষের মধ্যে" "যুদ্ধ নহে, শান্তি" প্রস্তাব গৃহীত হইয়াছিল। ইহার ফলে মুসলমানগণ মদীনার দক্ষিণ দিক তথা মক্কা ও তৎসংলগ্ন এলাকার সকল শত্রুদের আক্রমণ আশংকা হইতে উদ্বেগমুক্ত হইলেন। শান্তি ও নিরাপত্তার পরিবেশ সৃষ্টি হইল, যাহার ফলে মুসলমানগণ (দীর্ঘকাল ধরিয়া যেসব যুদ্ধ তাহাদের সকল শক্তি ও সামর্থ্য নিংড়াইয়া লাইতেছিল) তাহা হইতে স্বস্তির নিঃশ্বাস লইবার সুযোগ পাইলেন। অধিকন্তু এই শান্তি ও স্বস্তিকর পরিবেশে পূর্ণ একাগ্রতা ও মনোযোগ সহকারে ইসলামের দাওয়াতী দায়িত্ব পালন করার সর্বোত্তম সুযোগ মিলিয়া গেল। রাসূলুল্লাহ (স) বিশ্বময় ইসলাম প্রচারের কর্মসূচী বাস্তবায়ন শুরু করিলেন। পারস্য ও রোমের ন্যায় অপ্রতিদ্বন্দ্বী সম্রাটদেরকে পত্র লিখিয়া ইসলাম গ্রহণের আহ্বান জানাইলেন।
৪। দীর্ঘকাল ধরিয়া মক্কার কাফির-মুশরিকদের সহিত ইসলাম ও মুসলমানদের ঘোরতর বিরোধ ও শত্রুতা চলিয়া আসিতেছিল। ফলে অবাধ মেলামেশা ও পরস্পর আলোচনা করার সুযোগ হয় নাই বা পরস্পরকে নিকট হইতে জানিবার অবকাশও হয় নাই। এই সন্ধির ফলে উভয় পক্ষের উদারভাবে মেলামেশার সুযোগ ঘটিল। সুতরাং মক্কার মুশরিক ও কাফিরগণ ইসলামের সৌন্দর্য এবং মুসলমানদের বিনম্র ও সৌহার্দ্যপূর্ণ আচার-আচরণ ও চরিত্র মহিমা উপলব্ধি করিয়া মুগ্ধ হইতে লাগিল। তাহারা লক্ষ্য করিল যে, নিকৃষ্ট ধাতু যেমন পরশমণির সংস্পর্ষে স্বর্ণে পরিণত হয়, তদ্রুপ তাহাদের গোত্রের ও সমাজের সেই লোকগুলিও যেন রাসূলুল্লাহ (স)-এর সান্নিধ্যে আসিয়া ইসলাম গ্রহণ করিয়া সোনার মানুষে পরিণত হইয়াছে। শালীনতা, নম্রতা ও ভদ্রতার উচ্চ শিখরে তাহারা অধিষ্ঠিত। যাহারা ছিল চরিত্রহীন ও অজ্ঞতায় নিমজ্জিত, তাহারা আজ ইসলামের ছায়াতলে আসিয়া ফেরেশতার ন্যায় অতি পূতঃপবিত্র চরিত্রের এবং জ্ঞান-গরিমার অধিকারী। মক্কাবাসীর অনেকেই ইসলামের শিক্ষার সৌন্দর্যে এবং মুসলমানদের চরিত্র মাধুর্যে অনুপ্রাণিত হইয়া দলে দলে ইসলাম গ্রহণ করিতে লাগিল। সন্ধির পর মাত্র দুই বৎসরের মধ্যে এত বিপুল সংখ্যক আরব ইসলাম গ্রহণ করিল যাহা বিগত পনর বৎসরেও হয় নাই। ইমাম ইব্‌ন শিহাব যুহরী (র) বলেন, "ইহার পূর্বে ইসলামের এত বড় বিজয় আর অর্জিত হয় নাই। উভয় পক্ষের মধ্যে সন্ধি স্থাপিত হইল। যুদ্ধবিরতি হইল, লোকজন নির্ভয়ে নির্বিঘ্নে একজন অপরজনের সহিত মেলামেশার সুযোগ পাইল। ফলে যে কোন রুচিবান, সমঝদার লোক ইসলাম ও মুসলমানদের সান্নিধ্যে আসিয়া ইসলাম গ্রহণে ধন্য হইল। কেবল দুই বৎসরেই এত লোক ইসলাম গ্রহণ করিল যাহা অতীতের কয়েক গুণ বেশী” (ইন্ন হিশাম, ২খ., পৃ. ৩২২)।
ইমাম যুহরীর বক্তব্যের সমর্থনে দলীল এই যে, রাসূলুল্লাহ (স)-এর সহিত হুদায়বিয়ার সন্ধিকালে চৌদ্দ শত সাহাবী ছিলেন। আর ইহার দুই বৎসর পর মক্কা বিজয়ের সময় তাঁহার সহিত সফরসঙ্গী হইয়াছিলেন দশ হাজার মুসলমানের এক বিশাল কাফেলা।
কুরায়শদের প্রসিদ্ধ সেনাপতি খালিদ ইব্‌দুল ওয়ালীদ এবং আমর ইবনুল আস এই সন্ধির পর ইসলাম গ্রহণ করেন। তাই বলা যায়, হুদায়বিয়ার সন্ধি ছিল অন্তর-রাজ্য বিজয়ী এক "মহা বিজয়"।
৫। এত দিন ইসলামী শক্তি কুরায়শদের প্রতিরোধেই নিয়োজিত ছিল। এই সন্ধির পর রাসূলুল্লাহ (স) কুরায়শ পক্ষ হইতে শংকামুক্ত হইয়া তদপেক্ষা গুরুত্বপূর্ণ কাজে মনোনিবেশ করার সুযোগ লাভ করিলেন। ফলে সন্ধি-উত্তর মাত্র তিন বৎসরের মধ্যেই তিনি শান্তিপূর্ণ উপায়ে নিজ রাষ্ট্রকে প্রায় দশ গুণ সম্প্রসারিত করিয়া গোটা আরব উপদ্বীপকে অনুগত করিয়া লইয়াছিলেন। আরব হইতে রোমক ও ইরানী প্রভাব সম্পূর্ণরূপে দূর করিয়া তিনি এমন একটি শক্তিশালী ইসলামী রাষ্ট্রের ভিত্তি স্থাপন করিলেন যাহা তাঁহার পর পনর বৎসরের মধ্যেই গোটা এশিয়া, আফ্রিকা ও ইউরোপের তিন মহাদেশে বিস্তৃত হইয়াছিল।
৬। যে সকল মুসলমান অপারগতা ও অসহায়ত্বের দরুন তখনও মক্কায় থাকিয়া গিয়াছিলেন এবং মুশরিকদের লাঞ্ছনা-গঞ্জনার শিকার ছিলেন, এই সন্ধির বদৌলতে তাহারাও মুশরিকদের সকল প্রকার যুলুম ও নিপীড়ন হইতে স্বস্তি পাইলেন। আল্লাহ তাআলা অতি সত্ত্বর তাহাদের মুক্তির পথ খুলিয়া দিলেন।
৭। এই সন্ধির মাধ্যমে আরব সমাজে রাসূলুল্লাহ (স)-এর উন্নত চরিত্রের কতিপয় অপ্রকাশিত দিক প্রকাশ পাইল। যথা : যুদ্ধের প্রতি তাঁহার নিস্পৃহ মানসিকতা, সন্ধি ও শান্তির প্রতি তাঁহার আবেগোদ্দীপ্ত প্রেরণা, ধৈর্য ও সহিষ্ণুতা প্রীতি, কা'বা ঘরের প্রতি অগাধ ভক্তি ও শ্রদ্ধা। অপর দিকে আরবের জনগোষ্ঠী দেখিল, কুরায়শগণ অন্যায় জিদের বশবর্তী হইয়া এই নিরস্ত্র শান্তিকামী হজ্জযাত্রীদলকে মক্কায় প্রবেশ করিতে দিল না, আল্লাহর ঘর যিয়ারত হইতে বিরত থাকিতে বাধ্য করিল। ফলে একদিকে কুরায়শদের বিরুদ্ধে সারা আরবের জনমনে ক্ষোভ দানা বাঁধিতে লাগিল। অপরদিকে ইসলাম ও মুসলমানদের প্রতি ভালবাসা, সহানুভূতি এবং রাসূলের প্রতি অনুরাগ ও শ্রদ্ধাবোধ সৃষ্টি হইতে লাগিল। ইহা ছিল একটি দুর্লভ অর্জন।
৮। এই সন্ধির ফলে মক্কায় কাফির-মুশরিকদের অধীনে থাকা মুসলিম নারীদের মুক্তির পথ উন্মুক্ত হইল। বহু সংখ্যক নারী নূতনভাবে ইসলাম গ্রহণ করিয়া মদীনায় হিজরত করিতে শুরু করিলেন। বহু মুসলিম নারী ইসলাম গ্রহণের অপরাধে দীর্ঘদিন যাবৎ তাহাদের স্বামী, পিতা কিংবা ভাইয়ের নির্যাতন ও নিপীড়নের লক্ষ্যবস্তুতে পরিণত হইয়াছিলেন। যেহেতু এই সন্ধিতে নারীদের বিরুদ্ধে কোন ধারা সন্নিবেশিত ছিল না, তাই সন্ধির পরপরই মুসলিম নারীগণ মদীনায় আশ্রয়ের সুযোগ পাইয়া গেলেন। কুরায়শণণ প্রথম প্রথম আপত্তি করিলেও যেহেতু সন্ধিতে এই ব্যাপারে সুস্পষ্ট কোন বাধা-নিষেধ ছিল না তাই তাহারা তাহাদের দাবি প্রত্যাহার করিতে বাধ্য হয়।
৯। উল্লেখ্য যে, কুরায়শ ও খায়বারের ইয়াহুদীদের মধ্যে এই মর্মে একটি চুক্তি ছিল যে, মুহাম্মাদ (স) যদি তাহাদের মধ্য হইতে কোন এক পক্ষের উপর আক্রমণ করেন, তবে অপর পক্ষ মদীনায় সৈন্য পরিচালনা করিবে। হুদায়বিয়ার সন্ধির মাধ্যমে রাসূলুল্লাহ (স) কার্যত কুরায়শ ও খায়বারের ইয়াহুদীদের প্রত্যেককে অপর পক্ষ হইতে সম্পূর্ণ বিচ্ছিন্ন করিয়া দিয়াছিলেন। ফলে রাসূলুল্লাহ (স)-এর পক্ষে খায়বার আক্রমণের পথ উন্মুক্ত হইল। তিনি হুদায়বিয়া হইতে ফিরিয়া এক মাসের মধ্যেই খায়বার অবরোধ করিলেন এবং বিজয় লাভ করিলেন।
হুদায়বিয়া হইতে ফিরিবার পথে নাযিলকৃত সূরা আল্-ফাতহে আল্লাহ তা'আলা এই খায়বার বিজয়েরও সুসংবাদ প্রদান করেন। ইরশাদ হইল:
فَأَنْزَلَ السَّكِينَةَ عَلَيْهِمْ وَأَثَابَهُمْ فَتْحًا قَرِيبًا . وَمَغَانِمَ كَثِيرَةً يَأْخُذُونَهَا وَكَانَ اللَّهُ عَزِيزًا حكيما .
"অনন্তর তিনি তাহাদের দান করিলেন প্রশান্তি এবং তাহাদেরকে দিলেন একটি আসন্ন বিজয় এবং আরও বহু গনীমত যাহা তাহারা হস্তগত করিবে। আল্লাহ পরাক্রমশালী, প্রজ্ঞাময়" (৪৮: ১৮-১৯)।
উক্ত আয়াতে আসন্ন বিজয় দ্বারা সর্বসম্মতভাবে খায়বার বিজয়ের প্রতি ইঙ্গিত করা হইয়াছে (তাফসীর ইব্‌ন কাছীর, ৪খ., পৃ. ১৭২)।

লিঙ্ক শেয়ার করুন
close

লিঙ্ক কপি করুন

0:00
0:00